তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৬
ষষ্ঠ অধ্যায়
স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। কিন্তু প্র্যাক্টিকাল ক্লাসের ঠেলায় বেরোতে বেরোতে চারটে বেজেছে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে মাঠের একপাশের দোলনার উপরে বসেছিল বেদান্ত। একটু দূরে একটা বেঞ্চও আছে, কিন্তু বেঞ্চে বসার একটা আলাদা ঝামেলা আছে। চেনা পরিচিত কেউ মাঠ দিয়ে পার হলে ওকে দেখতে পেয়ে পাশে এসে বসতে পারে। সেটা একেবারেই পছন্দ করে না বেদান্ত। দোলনায় বসলে পাশে কারো বসার উপায় নেই। তাছাড়া শনিবার বিকেলের এই সময়টা ও একেবারেই কারো সঙ্গে ভাগ করতে চায় না।
আপাতত দ্রুত কাজ করছে ওর হাত। নাহ্, দেরি হয়ে গেছে। শুরুর দিকের খানিকটা মিস হয়ে গেছে। কপাল থেকে ঘাম মুছে নেয় বেদান্ত। তারপর হেডফোনের দুটো দিক কানে গুঁজে নিয়ে ভলিউমটা বাড়িয়ে নেয়। ফোনের ভিতর থেকে পরিচিত স্বর ভেসে আসে। দোলনার একদিকের চেনের উপর মাথা এলিয়ে দেয় সে। বিকেলের আলো এক ধাক্কায় মুছে যায় ওর চোখের সামনে থেকে। মনে হয় গ্রাম্য কোন রাস্তায় হেঁটে চলেছে ও। দূর থেকে ভেসে আসছে গলার আওয়াজটা। ওর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে দুটো দীর্ঘ ছায়া। তাদের মধ্যে একটা ছায়ার হাত এগিয়ে আসে ওর গলা লক্ষ্য করে।
‘এই হারামজাদা, তুই স্কুলে ফোন নিয়ে আসিস?’ ছায়ার ধাক্কায় প্রায় দোলনা থেকে ছিটকে পড়ছিল বেদান্ত। থতমত খেয়ে কোনওরকমে সামলে নেয়া কান থেকে হেডফোন না খুলেই পেছনে ফিরে তাকায়। ওরই দুই ক্লাসমেট এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। বাঁকা চোখে ভ্রুকুটি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
অবজ্ঞার ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয় বেদান্ত। আবার হেডফোন থেকে ভেসে আসা স্বরে মন দিতে যায়, একটা ভারী হেঁড়ে গলা সেখানে ঘোষণা করছে, ‘গল্পের পরবর্তী অংশ ব্রেকের পর।’
খানিক বিরক্ত হয়েই কান থেকে হেডফোন খুলে রাখে বেদান্ত। কর্কশ গলায় বলে, ‘ফালতু বিরক্ত করছিস কেন বে?’
আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ওর দিকে এগিয়ে যায় খুঁটি। ‘স্কুলে ফোন নিয়ে এসে আবার চোপা! অ্যা? হেডুকে বলব শালা?
মুখ বাঁকায় বেদান্ত, ‘তাতে কী হয়েছে? তোদের মতো থ্রিজিপি পানু-ফানু দেখি না।’
‘কী করিস তাহলে?’
‘গল্প শুনি রেডিয়োতে। রবিবার বারোটা থেকে হয়। আর শালা ওই সময়েই ম্যাথ ক্লাস থাকে। তাই শনিবার বিকেলে রিপিট শুনি। তোরা এসে কেঁচিয়ে দিলি, যতসব!’
ব্যাদার মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। ইলেভেনে ওঠার পর থেকে ‘মুখে নেওয়া, মুখে নেওয়া’ শুনতে শুনতে একরকম হেদিয়ে গেছিল বেচারা। তাছাড়া টেন পাশ করা একটা ছেলে টিফিনবেলায় প্রেম ভালোবাসা না করে গল্পের বই হাতে বসে আছে এ ব্যাপারটায় ক’দিন হল খানিক পিয়ার প্রেশারও খাচ্ছিল। ফলে এখন এই নেশা ধরেছে। রেডিয়োতে ক’দিন আগে শুরু হয়েছে এই প্রোগ্রামটা। এক একদিন রাতের রিপিট ব্রডকাস্টটা বেদান্ত ওদের বাড়ির বড় রেডিয়োতে চালিয়ে দেয়। মা বাবা আর ও মিলে একসঙ্গে গল্প শোনে। ইলেভেনে উঠলেও ব্যাদার একটু একটু ভয় লাগে এখনও। তখন দু’পাশে বাবা-মা আছে জানলে সে ভয় ওর কেটে যায়।
ব্যাদার ফোনে গান ডাউনলোড করা যায় না। শুধু রেডিয়ো শোনা যায়৷ একবার ব্যাদার দাদা ফিলিপ কোম্পানির একটা এমপিথ্রি প্লেয়ার কিনেছিল। সেইটার উপর একটা চাপা লোভ আছে ওর। তাতে যখন তখন চাইলেই চন্দ্রবিন্দু কি ভূমির গান শোনা যায়। ব্যাদা ঠিক করেছে কোনওদিন পয়সা জমাতে পারলে সবার আগে ওইটাই কিনবে।
ওর পেছনে এসে দাঁড়ানো ছেলেদুটোর মুখে ছায়া নামে। ভুল সময়ে এসে পড়ে বিরক্ত করেছে ছেলেটাকে। খুঁটি নরম গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগে দোলনাটা ধরে হালকা ঠেলা দেয় সাম্য, ‘আসলে মার্কেটে তোর ব্যাপারে একটা গুজব আছে৷ সেটাই তোকে বলতে…’
রাগত চোখে একবার ওদের দিকে তাকায় বেদান্ত। সাম্য ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ‘আরে না না, ওটা না। ওটা সবাই জানে। অন্য একটা…’
‘চাইটা কী তোদের?’
‘একটা প্রেমের কবিতা লিখে দিতে হবে।’ সাম্যর গলা কয়েক পর্দা নেমে আসে।
‘কেন, তোরা ম্যাগাজিন খুলছিস নাকি?’
‘সেরকমই কিছু ধরে নে।’ খুঁটি আগ বাড়িয়ে বলে৷
‘বেশ, তোদের ধরে নেওয়া ম্যাগাজিনের জন্য ধরে নে আমি একটা স্বরচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত দিলাম, এবার ফুটে যা… হাত উলটে মশা তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করে ব্যাদা।
‘আহ্, ওসব নয়।’ হাত দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খুঁটিকে দেখায় সাম্য, ‘ও একজনকে দেবে। একটা মেয়েকে।’
বেদান্তর মুখে একটা বাঁকা হাসি ফোটে। এতক্ষণে প্রথম খুঁটির দিকে তাকায়, ‘তোদের কি মনে হয় কবিতা দিলে মেয়ে পটে যায়?’
‘আমার না, ওর মনে হয়।’ ইশারায় সাম্যকে দেখায় খুঁটি।
ব্যাদার ক্লান্ত মুখে একটা রাবীন্দ্রিক ঢং এসে মেশে, ‘দেখ ভাই, মেয়ে না পটলে তখন কবিতা লেখা যায়। কবিতা লিখে মেয়ে পটানো যায় না।’
‘তাহলে তো তোর লিখতে কোনও সমস্যাই হবে না।’ খুঁটি কী যেন ভেবে বলে।
বেদান্তর চোখে আবার রাগ রাগ ভাবটা ফিরে আসে। নাকের উপরে এসে পড়া চশমাটা তর্জনী দিয়ে ঠেলে চোখে তুলে নিয়ে বলে, ‘মেয়ে না পটুক, তোদের মতো মেয়েদের হাতে ক্যালানি তো খাই না।’
‘মেয়ের দাদার হাতে তো খাও।’ সাম্য দুম করেই বলে বসে কথাটা। ফাঁকা মাঠে যেন প্রতিধ্বনিত হয় শব্দগুলো। বেদান্ত কেমন হকচকিয়ে গেছিল। কান থেকে হেডফোন নামিয়ে কিছুক্ষণ একটানা সাম্যর দিকে চেয়ে থাকে। তারপর মুখ নেমে আসে নীচের দিকে।
‘ভাই, এটা কী কেস?’ চাপা গলায় সাম্যকে জিগ্যেস করে খুঁটি।
সাম্য দোলনায় আরেকটু জোরে ঠেলা দেয়, ‘ক্লাস নাইনে ম্যাথ কোচিংয়ে দিয়া সেন বলে একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম ভালোবাসা হয় চাঁদের। কিছু লাভলেটার ফাভলেটার লিখেছিল। সেই সব ব্যাগে রেখেই মেয়েটা মাধ্যমিক দিতে ঢুকেছিল। মায়ের হাতে সেই চিঠি ধরা পড়ে যায়। ও মনে হয় পেছন থেকে জড়িয়ে পিঠে চুমুফুমু খাওয়ার কথা লিখেছিল।’
খুঁটি ভর্ৎসনা করে, ‘শালার শখ দেখো না, পিঠে চুমু খাবে।’
ব্যাদা ফুঁসে ওঠে, ‘আমার গার্লফ্রেন্ড কুমির ছিল নাকি যে পিঠে চুমু খেতে গেলে কাঁটা ফুটে যাবে?’
সাম্য হাত তুলে বাকি গল্পটা শেষ করে, ‘সেই চিঠি পড়ার পরে মেয়েটা বাড়িতে উদমা ক্যাল খায়। ব্যাদাকেও রাস্তায় মেয়ের দাদা ফেলে ক্যালায়।’
‘রাস্তায়।’ খুঁটি ভুরু কুঁচকে তাকায়, ‘লোকজনের সামনে?’
‘তো কি দীঘার হোটেলে নিয়ে গিয়ে কেলাবে? শুধু তাই নয়, তারপর থেকে মেয়েটাও গায়েব হয়ে যায়।’
‘গায়েব বলতে?’
‘ইলেভেনে উঠে মেয়েটা ফ্যামিলির সঙ্গে কোথাও চলে যায়। ব্যাদা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। ওরা ফ্ল্যাট বেচে দিয়ে কোথাও চলে যায়।’
অন্যদিকের চেন ধরে দোলনাটা থামিয়ে দেয় খুঁটি। গড়গড়ে গলায় বলে, ‘তোকে রাস্তায় ফেলে বাংলা মার দিল, তুই কিছু বলতে পারলি না?’
‘কী বলব?’ দোলনা ছেড়ে উঠে পড়ে বেদান্ত, ‘হারামির বাচ্চা আরও দুটো ছেলে নিয়ে এসেছিল।’
ওহ্, একা আসলে যেন এত বড় তির মেরে দিত, ফুটো মস্তান আমাদের!’ সাম্য ব্যঙ্গ করে বলে।
‘দেখ, মারপিট করাটা আমার কাপ-অফ-টি নয়।’
‘কারণ কাপ-অফ-টি খাওয়ার বয়সে তুমি শালা হরলিক্স খাচ্ছ।’ খুঁটির দিকে ফেরে সাম্য, ‘মেয়েটা রিয়েলি ভালোবাসত ওকে। বাড়ির লোকের মার খেয়েও লুকিয়ে লুকিয়ে ওকেই ফোন করত বারবার। বোঝানোর চেষ্টা করত। কিন্তু এ শালা সেই মেয়ের দাদার মার খাওয়ার পর থেকে পুরো মেনি বিড়াল হয়ে গেল।’
অবাক চোখে সাম্যর দিকে তাকায় বেদান্ত, ‘শালা, তুই মানুষ না খবরের কাগজ? পেছন ঘোর তো, খেলার পাতাটা পড়ি।’
রসিকতাটা গায়ে মাখে না ওরা দুজন। ব্যাদার পাশে বসে পড়ে খুঁটি। তারপর পিঠে হাত রেখে বলে, ‘এটা কিন্তু ঠিক হয়নি ভাই। সত্যি ভালোবাসত তোকে। জাস্ট একটু মারের ভয় পেয়ে…’
ওর হাতটা এক ধাক্কায় সরিয়ে দেয় বেদান্ত, ‘একটু মার? তোরা দেখেছিলি তখন আমাকে? হুঁ! বড় বড় কথা…’ হুট করেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে নিরীহ ছেলেটা। বুকের উপরে হাত চাপড়ায় সে, উন্মাদের মতো জমাট বাধা রাগ বেরিয়ে আসে বুক ফুঁড়ে, ‘এক বাজার লোকের সামনে বাপ-মা তুলে নোংরা খিস্তি খেয়েছিস কোনওদিন? মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেছিল শালা। পেটে এমন লাথি মেরেছিল যে সারাদিন বমি হয়েছিল আমার। বাড়ি ফিরে মাকে মুখ দেখাতে পারিনি। সারাদিন বাথরুমে পেট চেপে বসে থেকে বমি করেছি। নেই, নেই, আমার অত সাহস…আমি…’ বাকি কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে যায় বেদান্ত। সাম্য একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। দোলনার পাশেই বসে পড়ে।
‘মার খেয়ে শালা ভয়ই লেগেছিল শুধু। আমি বই মুখে দিয়ে পড়ে থাকা ছেলে। ঝুট ঝামেলার মধ্যে থাকিনি কোনওদিন। ভালোবাসা বুঝতাম, মানে বেশ নরম নরম লেপের মতো একটা ফিলিংস। যেদিন পেলাম না, ভাবলাম এটা আদৌ ভালোবাসাই নয়। তারপর ও চলে গেল। আর ফোন করল না, দেখতে পেলাম না, মুখটা ঝাপসা হতে শুরু করল। তখন বুঝতে পারলাম… ‘একটু থেমে দম নেয় বেদান্ত, ‘বুঝতে পারলাম ভুল হয়ে গেছে। আমাকে আর একটু সাহসী হতে হত। খুব খুঁজেছিলাম ওকে। দাদা ফাদার পরোয়া করিনি। মার খেলে খাব। কিন্তু…কিন্তু…খুঁজে পেলাম না ভাই আর ওকে…’ মোটা চশমাটা চোখ থেকে খুলে নেয় বেদান্ত। তারপর জামার হাত মুছে নেয় চোখটা। নাক টানে। খুঁটির হাতটা আবার ওর মাথায় উঠে আসে। খানিকটা মায়াই লাগছে খুঁটির।
‘মেয়েটাকে তুইও ভালোবাসতিস না?’
বেদান্ত উত্তর দেয় না। হাওয়ার দোলাতেই বুঝি মৃদু দুলতে থাকে। ব্রেকের পর আবার ফিরে এসেছে সেই হেঁড়ে গলা। কিন্তু ব্যাদার সেটা কানে দিতে আর ইচ্ছা করে না৷
‘চিন্তা করিস না ভাই।’ খুঁটি ওর পিঠে চাপড় মেরে আশ্বস্ত করে, ‘ওই দাদাকে আমি দেখে নেব।’
হাতের মধ্যে মুখ ঢেকেছিল ব্যাদা। খুঁটির কথাটা শুনে মুখ তোলে, ‘নিজের চেহারাটা দেখেছিস? তোকে বেঞ্চের উপর শুইয়ে পেন ফাইটিং খেললে অগ্নি জেলের কাছেও হেরে যাব।’
অপমানটা গায়ে লাগতে লাগতেও লাগে না খুঁটির। মাঝে মাঝে ওর নিজেরও মনে হয় যতটা মারকুটে ওর হওয়ার কথা ততটা কেবল এই রোগাটে চেহারার জন্যেই হতে পারে না। দিয়া সেনের দাদাকে ওর একার পক্ষে কাত করা সম্ভব নয়।
তিনজন মিলে চুপচাপ মাঠের ধারে বসে ভাবতে থাকে। দিয়া সেনের দাদা কি সবসময়ই সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঘোরে? ওর কি পেট খারাপ হয় না? কোনওদিন ল্যাং খেয়ে গোঁড়ালি মচকে যায় না? তখন বাগে পেয়ে দুঘা দেওয়া যায় যদি?
দম বন্ধ করা কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যায়। তিনজনের কেউ কোনও কথা বলে না। এখনও মৃদু দুলছে দোলনাটা। অল্প ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে।
সাম্য এতক্ষণ পাথরের মতো বসেছিল। একটা বড়সড় শ্বাস নিয়ে বলে, ‘দেখ, তোর এই দিয়া সেনকে খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তার বদলে তোকে শুধু একটা কবিতা লিখে দিতে হবে ভাই।’
‘খুঁজে দিবি? কী করে?’ আবার নাক টানে বেদান্ত। ভেজা গলায় জিগ্যেস করে।
কাগজের ঠোঙা থেকে বের করে একটা চারমিনার ধরায় সাম্য, ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ফাঁকা মাঠের দিকে চেয়ে থেকে বলে, ‘তুই ওর বাবার নাম জানিস?’
‘শাশ্বত সেন।’
‘হুম। একটা সহজ উপায় আছে, কিন্তু সেটার জন্য এখন বছর দেড়েক বসে থাকতে হবে।’
‘মানে?’
‘দেখ,’ সাম্য হাত তুলে ব্যাপারটা খোলসা করে, ‘এইচএস পাস করে আমরা কলেজে উঠব। দিয়া সেন যেখানেই থাকুক সেও কোনও না কোনও কলেজে ভর্তি হবে। ওই সময় সমস্ত কলেজে চান্স পাওয়া ক্যান্ডিডেটদের লিস্টগুলো ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করতে হবে। তার মধ্যে স্টুডেন্ট আর বাপের নাম দেওয়া থাকে। সার্চ করে দিয়া সেন আর শাশ্বত সেন মিলে গেলেই বোঝা যাবে কোন কলেজে পড়ে আর রোল নম্বর কী।’
‘তারপর?’
‘তারপর সেই কলেজের সেই ডিপার্টমেন্টের কোনও না কোনও ছাত্রের সঙ্গে লাইন করে ফেলতে পারলেই দিয়া সেন অবধি পৌঁছানো যাবে। সমস্যা খালি একটাই।’ সাম্যর মুখে ছায়া নামে।
‘কী?’ খুঁটি জিগ্যেস করে।
‘দিয়া সেন, শাশ্বত সেন দুটোই কমন নাম। গোটা পশ্চিমবঙ্গে ওই নামের বাবা মেয়ে গোটা কুড়ি তো থাকবেই। তাছাড়া এত দেরি হলে মেয়েটা আবার নতুন বয়ফ্রেন্ড…’ কথাটা শেষ করে না সাম্য, ‘উঁহু, শুধু লিস্ট জোগাড় করলে হবে না। লিস্টের সঙ্গে ছবি থাকতে হবে। হুম…তুই আমার উপর ছেড়ে দে, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বড়জোড় ক’দিন একটু অপেক্ষা করতে হবে।’ হাসি মুখে ব্যাদার হাঁটুতে চাপড় মারে সে৷
হাতের ফোনটা গুটিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে রাখে ব্যাদা। কবজি দিয়ে চোখের জলটা মুছে নেয়। চশমা বসে বসে ওর চোখের মাঝে একটা খয়েরি দাগ হয়ে গেছে। ওই দাগটা কেউ দেখে ফেললে ভিতর ভিতর অস্বস্তি হয় ওর।
‘দিয়ার জন্য অপেক্ষা করাই যায়। জানিস?’ খুঁটির পিঠে হাত রেখে বলে ব্যাদা, ‘কেউ ভালোবাসলে তার জন্য অপেক্ষা করতে কষ্ট হয় না ভাই।’
দোলনার একদিকে হেলান দিয়ে বসে সাম্য। গলাটা উদাস হয়ে যায় ওর, ‘হ্যাঁ ভাই, আমরা সবাই কিছু না কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছি। তুই ভাবছিস কবে কলেজে উঠবি, খুঁটি ভাবছে মৌসুমি কবে ওকে নিজে থেকে একটু পাত্তা ফাত্তা দেবে…ছোটরা বড় হওয়ার অপেক্ষা করছে, বড়রা ছোট হওয়ার অপেক্ষা করছে…’
খুঁটি একটু অবাক হয়, ‘এ ভাই, কী আটভাট বকছিস, বড়রা আবার ছোট হবে কী করে?’
‘বড় হতে হতে। আমার ফুলদাদু মরার আগে ক’মাস বিছানায় হিসি করত। খুব ভূতের ভয় পেত আর খালি মাকে ডাকত। এদিকে মা পঞ্চাশ বছর আগে মরে গেছে।
‘আর তুই? তুই কীসের অপেক্ষা করছিস?’ খুঁটির মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বেদান্ত জিগ্যেস করে।
সাম্য হাসে, ‘আমি অপেক্ষা করছি কবে বর্ষা নামবে।’
সরু করে কাটা কাসুন্দি মাখানো আমড়ায় কামড় দিয়ে জামা কাপড় থাপড়াচ্ছিল আগমনী, দাঁতটা টকে গেছে একেবারে। এই শিরশিরে ঝাল আর দাঁত কনকন করার ব্যাপারটা দারুণ লাগে ওর। বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার আছে জিনিসটার মধ্যে।
আমড়ার আঁটির গায়ে খড়খড়ে রোঁয়া থাকে। নরম কাসুন্দি তার ভিতর অবধি ঢুকে যায়। সেই রোঁয়া মুখের মধ্যে নিয়ে চুষলে লুকিয়ে থাকা কাসুন্দি বেরিয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এই জিনিসটায় বরাবর ভারি মজা পায় ও। আজও জগেনকাকার হাত থেকে কাগজের মোড়ক নিয়ে আটিটা মুখে পুরে দিয়েছিল। তখনই জামা থাবড়ে বুঝতে পারল, ওর পকেটে থাকা দশটাকার নোটটা কোথায় পড়ে গেছে৷ পকেট ফাঁকা।
প্রমাদ গুনল আগমনী। এর মধ্যে আরও জনাপাঁচেক ছেলেমেয়ে আমড়া নিয়ে ওর পাশ থেকে সরে গেছে। জগেনকাকাও টাকার জন্য তাড়া লাগায়নি ৷ কিন্তু ভুলে তো যাবে না। কী বলবে এবার?
একবার প্রচ্ছন্নভাবে ওর দিকে তাকায় জগেনকাকা, ‘কেয়া হুয়া বেটি?’
‘আসলে টাকা এনেছিলাম, কিন্তু টাকাটা…
‘হারিয়ে ফেলেছিল, আমি খুঁজে পেয়েছি।’ কথাটা আগমনীর ঠিক পাশ থেকে ভেসে এসেছে৷ একটা হাত এগিয়ে এসে খুচরো টাকা এগিয়ে দেয় জগেনকাকার দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নহরকে দেখতে পায় আগমনী। মুখে একটা নরম হাসি লেগে আছে মেয়েটার। চেহারায় এতক্ষণ ক্লাস করার ক্লান্তির কোনও ছাপ নেই। বরং মিহি লাবণ্য খেলা করছে।
টাকাটা দিয়ে চলে যাচ্ছিল নহর, আগমনী খপ করে ওর হাত চেপে ধরে, ‘এই, ওটা আমার টাকা ছিল না, তুই নিজে থেকে…
‘ধরে নে আমার অনেক ধার আছে তোর কাছে৷ না হলে পরে দিয়ে দিস আমাকে। চিন্তার কী আছে? স্কুলের বন্ধু তো পালিয়ে যেতে পারে না৷ নহর জান্নাত…’ ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটা। আগমনীও হাত বাড়ায়। হুট করে ওর মনে হয় নহরের হাতের স্পর্শে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা আছে। যেন হাতটা কেবল ধরল না, নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।
সেদিন ক্লাসের মধ্যে নহর অসুস্থ হওয়ার পর মাসখানেক কেটে গেছে। এর মধ্যে আড়চোখে আগমনী নিজেও খেয়াল করেছে মেয়েটা ক্লাস করতে করতে মাঝে মধ্যেই ওর দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফোটে ওর। সাম্য বলেছিল, ক’দিন আগে নাকি স্যারেরাও বলাবলি করছিল নহরের কিছু একটা বিচ্ছিরি রোগ আছে৷ সেই রোগ নিয়ে একরকম মনের জোরেই ও স্কুল করে। মেয়েটার প্রতি একরকম মায়া লাগে আগমনীর। এত মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ের শরীরে এত যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে, মুখ দেখলে বোঝা যায় না। মনে হয় ওর সহ্যশক্তি বেশি।
‘আচ্ছা আমি আসি।’ কথাটা বলে উলটোদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল নহর। আগমনী ওকে থামিয়ে দেয়। একটা আমড়া ওর মুখে তুলে দিতে দিতে বলে, ‘তোর বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে নাকি?’
‘উঁহু, শুধু কুকুরটাকে খাওয়াতে হবে। রোজ খাওয়াই তো৷ আজ দেখতে না পেলে ওর মন খারাপ হবে।
‘তাহলে খাইয়ে নিয়ে একটু মাঠে চল আমার সঙ্গে, আমড়া খেয়ে বাড়ি চলে যাব।’
‘আচ্ছা, চল।’
নহর হাসে। কুকুরটার গায়ের রং কালো। তবে মুখটা ভারি আদুরে। নহরকে দেখলেই লেজ নাড়তে নাড়তে ওর কাছে চলে আসে। নহর টিফিন বক্স খুলে কয়েকটা বিস্কুট তুলে দেয় ওর মুখে। খানিক হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়।
দুজনে হাঁটতে শুরু করে সামনের দিকে। স্কুলচত্বর এবার ফাঁকা হতে শুরু করেছে। চারপাশে ঘিরে থাকা গাছগুলো আরেকটু বুঝি ঝুঁকে পড়েছে পিচরাস্তার বুকে। আমড়ার টক স্বাদ মুখে মেখে রাস্তায় বুটের শব্দ তুলে হাঁটতে থাকে ওরা। নহর আগমনীর থেকে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা। নাকটা কী আশ্চর্য খাড়া ওর। হিংসা হওয়ার বদলে খানিক মুগ্ধ লাগে আগমনীর। বিশেষ করে ওর কোঁকড়া চুলটা…..
হাঁটতে হাঁটতে কী যেন ভাবছিল আগমনী। একসময় নিজেকে সামলে নিয়ে একটু লাজুক গলাতেই বলে, ‘আসলে তোর সঙ্গে অনেকদিন ধরেই কথা বলার ইচ্ছা ছিল আমার।’
‘আমার সঙ্গে? কেন বল তো?’
ছেলেমানুষি হাসি খেলে যায় ওর মুখে, ‘ব্যাদা বলছিল, ওর ছোটবেলার একটা ফেয়ারি টেলের বইতে একটা প্রিন্সেস আছে৷ ইনা। ঠিক তোর মতোই দেখতে। আমরা তোকে আড়ালে ইনা বলেই ডাকি কিন্তু…’ আগমনী খেলার ছলে বলে।
‘মনস্টার কে ছিল?’
‘মানে?’একটু অবাক হয় আগমনী।
‘ফেয়ারি টেলে প্রিন্সেস আছে যেমন একটা রাক্ষসও তো থাকবে, সেটা কে ছিল খেয়াল করিসনি?’
একবার একটু থতমত খায় আগমনী, ‘উঁহু, আমার বইটা পড়া হয়নি। ব্যাদার কাছেই আছে।’
‘সময়।’
‘কী?’
মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করে নহর। আগমনী ওর পিছু নেয়, ‘পৃথিবীতে আসলে নানারকম নামে একটাই রাক্ষস আছে৷ কিন্তু সত্যিকারের রূপ ওইটাই সময়।’
‘কী বলছিস, কিছুই বুঝতে পারছি না ভাই।’ আগমনী একটু ভ্যাবাচাকা খায়।
‘মানে ধর, আজ স্কুল শুরুর সময় তোর হাতে টাকাটা ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। কোন জিনিসটা বদলেছে বলে চলে গেল টাকাটা? তারপর ধর, ছোটবেলার পুতুল, দাদু-ঠাকুমা, মায়ের আদর—যা কিছু হারিয়ে ফেলেছিস সব কে যেন নিয়ে গেছে!
এতক্ষণে ব্যাপারটা বোধগম্য হয় আগমনীর, ‘কিন্তু সময়ই তো দিয়েছিল সব। সময় না এগোলে আমরা নতুন কিছু তো পাব না কোনওদিন!
নহর এক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে। থমকে আগমনীর দিকে তাকায়, মায়া জড়ানো চোখে কেটে কেটে উচ্চারণ করে, ‘যে কিচ্ছু দিতে চায় না তাকে কিপটে বলে। আর যে দিয়েও কেড়ে নেয় তাকে রাক্ষস বলে।’
নহরের ঘোলাটে চোখের মণিটা কি আরও বড় হয়ে গেল? একটু ভয়ই লাগে ওর। সেই ভয়েই কিনা জানে না, যে প্রশ্নটা করবে না ভেবেছিল সেটাই করে ফেলল, ‘সাম্য বলছিল, তুই নাকি মাঝে মাঝে আমার দিকে চেয়ে থাকিস?’
নহরকে খুব একটা বিচলিত দেখায় না, ‘থাকি তো৷ কেন? থাকা অন্যায়?’
‘ওমা! অন্যায় হবে কেন! কিন্তু কী দেখিস বল তো?’
নহরের মুখে মিচকে হাসি খেলে যায়, ‘জানি না কেন, তোকে খুব চেনা লাগে আমার।’
এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সব কিছু কেমন যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সাম্য, ব্যাদা আর খুঁটির সঙ্গে ওর ভালোই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে এতদিনে। গত মাসখানেক একসঙ্গেই বসেছে ওরা। সাম্য বসে ওর একেবারে পাশে। তার একটা গোপন কারণ আছে।
এক আগমনী ছাড়া আর কেউ সাম্যর মেঘা সরকারের কেস জানে না। সাম্য জানাতে চায়ও না। ফলে মেঘা সরকারের যাবতীয় গল্প ওকেই বসে বসে শুনতে হয়। অবশ্য ওর নিজেরও শুনতে খারাপ লাগে না৷
কখনও সাম্যকে মেঘা জিগ্যেস করেছে, ‘এই শোন, আমাকে কেমন দেখতে বলে মনে হয় তোর?
সাম্য উত্তর দিয়েছে, ‘তা জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় তোর গায়ে বৃষ্টির মতো গন্ধ।’
‘ধুর বোকা! বৃষ্টির গন্ধ হয় নাকি? গন্ধ তো মাটির হয়। তার উপর বৃষ্টি এসে পড়লে গন্ধ বের হয়। রোদে পুড়ে মাটি যত শক্ত হয়, তত সুন্দর গন্ধ হয় তার।’
আগমনী মুসৌরির টিকিটের ব্যাপারে মাকে একবার বলেওছিল৷ কিন্তু মা পাত্তা দেয়নি তেমন। হতাশ হয়ে স্কুলে এসে ও সাম্যকে জিগ্যেস করেছিল, ‘হ্যাঁ রে, আমি যদি তোকে টিকিট জোগাড় করে না দিতে পারি তাহলে তুই রেগে যাবি না তো?’
সাম্য মিষ্টি করে হেসেছিল, ‘ধুর, কলেজে উঠে টিউশনি করে পয়সা জমাব, তখন যাব।’
‘সিগারেটের ঠোঙাটা ফেলে দে, তাহলে এখনই জমে যাবে।’ সাম্য চোখ গোলগোল করে, ‘আরে, ট্রেনের টিকিটের অনেক দাম। অত টাকা পাব কোথায়?’
‘তাহলে কলেজে উঠে ফেলে দিস।’
‘ধুস, ঠোঙা ফেলতে যাব কেন? এখন সিগারেট জমাই, তখন পয়সা জমাব।’ হেসে বলেছিল সাম্য।
মাঝে মাঝে এসব দেখে হালকা হিংসা মতো হয় আগমনীর। ও নিজে সেভাবে কাউকে ভালোটালো বাসেনি। ক্লাস নাইনে এক বাংলার স্যার ওর বাড়িতে পড়াতে এসে ওকে একা পেয়ে একবার প্রপোজ করে দিয়েছিল। ও নিজেও ঝোঁকের মাথায় হ্যাঁ বলে দিয়েছিল। তাতে উৎসাহ পেয়ে পরদিন সেই স্যার ওকে একরকম জোর করেই চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেছিল। আগমনী ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছিল। তারপর থেকে কাউকে ভালো লাগলে ও নিজেই নিজেকে সামলে নেয়।
আজ মাঠে ঢুকে সাম্যদের দেখতে পায় আগমনী। সেদিকেই এগিয়ে আসে ওরা। দোলনার পাশেই ছড়িয়ে বসে আছে ছেলে তিনটে। জামা প্যান্টে ধুলো লেগে আছে ওদের। বেদান্তকেও তার মধ্যে চোখে পড়ে আলাদা করে। নিজেদের মধ্যে কী যেন গল্প করে চলেছে।
আগমনী আমড়ার মোড়ক নামিয়ে রাখে ওদের সামনে, তারপর খুঁটির পিঠে একটা চাপড় মেরে বলে, ‘কী নিয়ে গল্প হচ্ছে ভাই, কেচ্ছা?’
‘না, ক্যালানি।’
‘কে দিয়েছে?’
‘দেয়নি, খেয়ে এসেছে দাদার কাছে।’
আগমনী একটু চমকায়, ‘কার দাদা? নাম কী?’
‘আহ্…’ বিরক্ত হয় খুঁটি, ‘দুনিয়ার সব সুন্দরী মেয়েদের দাদাদের একটাই নাম হয়। বোকাচো।’
আগমনী ব্যাপারটা নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা করে, তারপর বলে, ‘তো চ, আমরা মালটাকে দু’ঘা দিয়ে আসি।’
‘আগে খুঁজে তো বের করি, তারপর…’
‘ভাই সেই আইসক্রিমওয়ালাটা…’ খুঁটির কথার মাঝেই ছেদ পড়ে। হুট করেই চিৎকার করে উঠেছে বেদান্ত। ওর চোখ আপাতত চলে গেছে মাঠের বাইরের ফাঁকা রাস্তাটায়। সেখান দিয়ে বিকেলের আলো মেখে ধীর পায়ে গাড়ি ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে একটা আইসক্রিমওয়ালা। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। সেই দিকেই আঙুল তুলে চিৎকার করছে বেদান্ত।
খুঁটি আর সাম্য তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে তাড়া খাওয়া হরিণের মতো দৌড়াতে শুরু করে সেদিকে লক্ষ্য করে। আগমনী আর নহর প্রথমে কিছুটা থতমত খেয়ে গেছিল। কী করবে বুঝতে না পেরে ওরাও পেছন পেছন দৌড়াতে শুরু করে।
নহর সেই অবস্থাতেই একবার চাপা গলায় জিগ্যেস করে, ‘ভাই, আমরা দৌড়াচ্ছি কেন? আমার কাছে কিন্তু আইসক্রিম কেনার টাকা নেই!
আগমনী কী উত্তর দেবে বুঝতে পারে না। সামনে তিনটে ছেলে ‘আইসক্রিম আইসক্রিম’ চিৎকার করতে করতে মাঠ ফেলে সামনের রাস্তাটার উপর গিয়ে উঠেছে ততক্ষণে। ওদের চিৎকার শুনে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে লোকটা।
আগমনী লক্ষ করে লোকটা ফিরে তাকাতেই তিনজন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায়। যেন এতক্ষণে যে কারণে গাড়ির পেছনে ছুটছিল ওরা সেটা আচমকাই মিথ্যে হয়ে গেছে। ফাঁকা রাস্তার উপর ধপ করে বসে পড়ে খুঁটি। সাম্য আর বেদান্ত বুকে হাত রেখে জোরে জোরে হাঁপাতে থাকে।
‘হল কী রে? আমরা দৌড়লাম কেন?’
ব্যাদার উপরে একরকম হামলে পড়ে সাম্য, ‘সব শালা এই গর্দভটার জন্য। অত বড় চশমাটা নাকের উপর কি শো পিস হিসেবে রাখা আছে?’
‘আরে আমি কী করব, দেখে মনে হল…’
খুঁটি এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর উপর, ‘তোকে দেখেও তো বাঁদর বাচ্চা বলে মনে হয় আমার। তার জন্য কলা দিতে হবে?’
হাত তুলে ওদের দুজনকে নিরস্ত করে আগমনী, ‘আরে থাম তোরা। হয়েছে কী বল আগে আমাকে।’
খুঁটি একটু দম নেয়। হাতের উলটোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে, ‘অনেক আগের কেস। তখন তোরা ভর্তি হসনি। ক্লাস টেনে একদিন টিফিনে ক্রিকেট খেলছি, এমন সময় দেখলাম মাঠের পাশ দিয়ে একটা বুড়ো আইসক্রিমওয়ালা যাচ্ছে। গরমকাল, সবাই হাঁসফাঁস করছি। সবাই মিলে ঠিক করলাম আইসক্রিম খেতে হবে, কিন্তু পকেটে পয়সা নেই। একটা চ্যালেঞ্জ হল। লোকটাকে টুপি পরিয়ে আইসক্রিম খেতে হবে। আমরা সবাই এসে আইসক্রিম চাইলাম। বুড়ো সরল বিশ্বাসে দশ বারোটা ছেলেকে আইসক্রিম খাওয়াল। খেয়ে দেয়ে আমরা ফিরে যাচ্ছি, তখন সে পয়সা চাইতে কেউ কেউ দৌড়ে পালিয়ে গেল, কেউ ওখানেই দাঁড়িয়ে দাঁত কেলাতে লাগল।’
কথাটা বলে একটু থামল খুঁটি। মুখে ক্লান্তি আরও ঘন হয়ে এল তার, ‘আমাদের শালা খারাপ লেগেছিল খুব। বয়স্ক গরীব লোক, ছেঁড়া জামা গায়ে, এই রোদে একটা ছাতাও নেই। কতই বা আর রোজগার করে? তাকে টুপি পরিয়ে দিলাম? লোকটা ভাঙা দাঁতের ফাঁকে হাসছিল। বুঝেছিলাম ওটা কষ্টের হাসি…পয়সা পাবে না বুঝে সে চলেই যাচ্ছিল। বললাম, দাদু পয়সা দিতে পারব না। আমাদের সঙ্গে একটু ক্রিকেট খেলবে? তাতে সে আরও খানিকটা তেমন করে হেসে আমার মাথায় হাত রেখে ওরকমই ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল…’
ব্যাদার কলার ছেড়ে দিল সাম্য। নিজের জামা থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘তারপর থেকে একশোটাকা চাঁদা তুলে রেখে দিয়েছি। ভেবেছিলাম ফের কোনওদিন লোকটাকে দেখতে পেলে আইসক্রিম না খেয়েই দিয়ে দেব টাকাটা। কিন্তু তাকে আর কোনওদিন দেখতে পাইনি!’
বেদান্ত এতক্ষণ দাবড়ানি খেয়ে চুপ করে ছিল। এবার সে খানিক প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করল, ‘একইরকম দেখতে রে ভাই, আমি কী করে বুঝব…
আইসক্রিমের গাড়ি নিয়ে যাওয়া ছেলেটা ওদের ডাক শুনে পেছন ফিরেছিল। এতক্ষণে সে বুঝতে পারে এই পাঁচজন এমনিই ডেকেছে তাকে। বিক্রি হবে না৷ সে আবার সামনে ঘুরে গাড়িতে ঠেলা দেয়।
নহর এগিয়ে আসে। তারপর ছেলেটার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে, ‘এ বেচারার মন খারাপ হয়ে গেল। টাকাটা তো আছে, চ, একটা আইসক্রিম কিনি।
প্রস্তাবটা মনে ধরে বাকি চারজনের। মাটি থেকে উঠে আইসক্রিম গাড়িটার দিকে এগিয়ে আসে ওরা। ছেলেটার মুখে হাসি ফোটে। গাড়ির ভিতর জড়িয়ে রাখা ছেঁড়া ন্যাকড়া বের করে মুখের ঘাম মোছে ও। রোদের তাপ আরও কিছুটা মরে আসে। একটু পরেই সন্ধে নেমে যাবে।
একটা অরেঞ্জ কাঠি আইসক্রিম কিনে মাঠের পাঁচিলের উপরে উঠে বসে ওরা। তারপর পাঁচজনে পালা করে খায় সেটা। একবার মাত্র চুষে পাশের জনকে দিয়ে দিতে হবে। কামড়ানো নিষিদ্ধ।
‘তুই এই স্কুলেই কেন ভর্তি হলি বল তো?’ নহরের একপাশে বসেছিল খুঁটি, অন্য পাশে আগমনী। খুঁটি আইসক্রিমটা ওর হাতে দিতে দিতে জিগ্যেস করল।
‘আমার পছন্দ হয়েছিল। বাবা-মাকে জোর করলাম।’
‘স্কুল আবার পছন্দ হবে কী করে?’ খুঁটি অবাক হয়।
‘এই ধর স্কুল ড্রেসটা। এটা আমার ফেভারিট কালার।’
সাম্য অবাক চোখে চায় ওর দিকে, ‘কিন্তু এই ড্রেস তো অনেক স্কুলেরই হয়!’
‘সব ড্রেসের ভিতর তো তোরা থাকিস না…’
আগমনী কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল। কিন্তু করল না। ওর মনে হল নহর কিছু একটা গোপন করতে চাইছে৷ তবে আপাতত আর সেটা নিয়ে খোঁচাতে ইচ্ছা করল না।
এতক্ষণে আইসক্রিমটা গলতে শুরু করেছে। নহর কোনওরকমে শেষের
দিকটায় ঠোঁট বসাতে যায় কিন্তু তার আগেই গলন্ত আইসক্রিমের খানিকটা খসে পড়ে যায় মাটিতে। নহর বিরক্ত হয়।
ব্যাপারটা দেখে ব্যাদা হাসে, তারপর বলে, ‘তোর সম্পর্কে কত গুজব শুনেছিলাম আগে। এখন তো সাধারণ মানুষ বলেই মনে হচ্ছে।’
‘কী শুনেছিলি?’ নহর রুমালের কোণে হাত মোছে৷
‘এই যে তুই মাঝেমধ্যে কোথায় যেন গায়েব হয়ে যাস। কোথায় যাস কেউ ধরতে পারে না! আমার তো মনে হয়, তোর কিছু হিডেন পাওয়ার ফাওয়ার আছে, ওয়ান্ডার ওম্যানের মতো! তুই প্রিন্সেস ইনা৷’
নহরের মুখে রহস্যময় হাসি খেলে যায়, ‘আমরা সবাই কখনও না কখনও গায়েব হয়ে যাই। ওটা কোনও ব্যাপার নয়।’
‘তাহলে তোর কথাই সবাই আলাদা করে বলে কেন?’ সাম্য এবার জিগ্যেস করে।
‘কারণ আমি ঠিক কখন গায়েব হচ্ছি সেটা মন দিয়ে কেউ দেখে না। কেউ যদি সারাক্ষণ আমার উপর নজর রাখে সে বুঝতে পারবে আমি কোথায় যাচ্ছি।’
খুঁটি পাঁচিলের উপরে জাঁকিয়ে বসে, ‘বেশ, এবার থেকে আমাদের বেঞ্চেই বসবি। দেখি কোথায় যাস।’
নহর এখনও আগের মতোই হাসছে, ‘পারবি না।’
‘কেন?’
কী যেন ভাবে মেয়েটা, ‘আমার এক বন্ধু একটা অদ্ভুত কথা বলে। আমরা যখন ছোট থাকি তখন আমাদের কাছে সবকিছু থাকে। আইসক্রিম, বন্ধু, খেলার মাঠ, ভোরের কুয়াশা, আদর-যত্ন, সব! তারপর আস্তে আস্তে আইসক্রিম গলতে থাকে। বড় হতে হতে সব নষ্ট হয়ে যায়। মাথার চুল পড়ে যায়, গায়ের চামড়া কুঁচকে যায়, মাঠে গিয়ে খেলার ইচ্ছা চলে যায়। এই যে আমরা পাঁচজন এখানে বসে আছি। একটা সময় পরে হয়তো আর চিনতেও পারব না একে অপরকে!’
খুঁটি কাঁধ ঝাঁকায়, ‘তোর বন্ধুরা এত ভারী ভারী কথা বলে? আমি তো বন্ধুদের মুখে একটাই জ্ঞান শুনেছি খালি। মাস্টারবেট করলে মুখে ব্রন বের হয়।’
‘ভালো কবিতা লিখলে মেয়ে পটে যায়।’ বেদান্ত মাঝখানে ফুট কাটে। ওর ফোনে উঁকি মারে সাম্য। তারপর শিরদাঁড়া সোজা করে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে, ‘এবার উঠতে হবে ভাই। দেরি করলে আবার বাড়িতে ঝাড় খাব। কাল দেখা হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ চল।’ কথাটা বলে নহর হাতের আইসক্রিমটা বাড়িয়ে দেয় আগমনীর দিকে। সেটা হাতে নিয়ে মুখে দিতে যাচ্ছিল আগমনী। কিন্তু তার আগেই থমকে যায়।
‘হল কী? ধর…’ আইসক্রিমটা এগিয়ে দিয়ে আবার ওকে তাড়া দেয় নহর। তার চোখে এখনও একটু আগের নরম মায়াবি ভাবটা লেগে আছে৷
‘হ্যাঁ, দে।’ ধরা গলায় কথাটা বলেই পাঁচিল থেকে নিচে নেমে আসে আগমনী। আর নামতেই একটা অদ্ভুত খেয়াল আসে ওর মাথায়। মনে হয় আলো কমে আসা মাঠের অন্ধকার কোণগুলো থেকে লুকিয়ে কেউ চেয়ে আছে ওর দিকে। এক জোড়া জঘন্য হিংস্র চোখ। জিভ দিয়ে লালা ঝরছে প্রাণীটার। লোলুপ দৃষ্টিতে ওদের পাঁচজনকে দেখে চলেছে।
একটু আগে নহরের বলা কথাটা মনে পড়ে যায় আগমনীর, ‘পৃথিবীতে আসলে নানারকম নামে একটাই রাক্ষস আছে। তবে তার আসল নাম…’
