তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৭
সপ্তম অধ্যায়
‘সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরে তোর এই এক বায়নাক্কা নিয়ে আমি আর পারি না বাবা।’
উপরের লফট থেকে বঁটিটা নামাতে গিয়ে মায়ের গজগজ শুনতে পেল গেদু। তবে বিশেষ কান দিল না তাতে। আজ রাতে ওর মাছ ভাজা খেতে ইচ্ছা হয়েছে। গেদু জানে, ও আবদার করলে মা আর না করতে পারবেন না।
বঁটি নিয়ে মাছ কাটতে বসে গেল মা। গেদু বই নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। ও মাছ খেতে ভালোবাসে বটে, কিন্তু মাছ কাটা দেখতে পারে না। কাটাকাটিতে ভয় পায় ও। টাটকা মাছ কাটলে মাছের ভেতর থেকে লালচে রক্ত বেরিয়ে আসে। বটির গায়ে মাখনের মতো লেগে থাকে সেই রক্ত। কখনও জ্যান্ত মাছ শ্বাস নিতে না পেরে মেঝের উপরেই মাথা ঠুকে লাফাতে লাফাতে মরে যায়। সেটা দেখলেও ওর মন খারাপ হয়ে যায়। মায়ের অবশ্য হয় না। মায়ের ওসব দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে।
বাবা আর ঠাম্মা অবশ্য মাকে এসব কাটাকাটির কাজ করতে দেন না। বিশেষ করে ছুরি কাঁচির ধারে কাছে যাওয়া এক্কেবারে নিষেধ। কেন নিষেধ, সে কথা ওরা গেদুকে খুলে বলেনি। ওর বয়স আট পেরিয়েছে এ বছর। এখনও কী এমন কথা যে বলা যায় না?
আজ গেদুর এতই মাছ খেতে ইচ্ছা করেছে যে বাবা ঠাম্মার কথা মনেই পড়েনি বিশেষ। ওরা দুজনেই আজ বাড়ি নেই। ওরা মা ব্যাটায় মাছ ভেজে খাবে। মজা হবে।
এ ঘর থেকে পড়াশোনা করতে করতেও মায়ের গজগজানি শুনতে পায় গেদু। বিশেষ কান দেয় না। ও জানে একটু পরেই মা শান্ত হয়ে যাবে। ওর পাশে শুয়ে সারাদিনের হাবিজাবি কথা শোনাবে।
সামনে খুলে রাখা ইতিহাস বইতে মন দেয় গেদু। ঘরেব আলোটা অন্যদিনের থেকে একটু কম মনে হচ্ছে। তাও মন বসাতে অসুবিধা হচ্ছে না। একটু মন বসিয়ে তাড়াতাড়ি পড়াটা করে নিলেই রাতে…
হুট করে একটা ব্যাপার খেয়াল করে গেদু। মা আর আগের মতো গজগজ করছে না। তার বদলে হাসির আওয়াজ আসছে পাশের ঘর থেকে।
কয়েক সেকেন্ড আওয়াজটা শুনে কেমন যেন সন্দেহ হয় গেদুর। বিছানা আর ইতিহাস বই ছেড়ে উঠে আসে সে। পায়ে পায়ে পাশের ঘরের চলে আসে। এবং আসতেই অবাক হয়ে যায়।
মায়ের মাথার চুল খোলা। কেটে ছিন্নভিন্ন করা মাছটা ঘরের এককোণে পড়ে আছে। বোঝা যায় কাটতে কাটতে সেটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মা। সেটার দিকে চেয়েই হাসছে…আর হাতটা…
গেদু অবাক চোখে দেখে মায়ের হাতটা আস্তে আস্তে বঁটিটা তুলে আনছে গলার কাছে। টিউব লাইটের জোরালো আলোয় চকচক করছে তার ধারালো ফলাটা।
‘মা, কী করছ তুমি?’
ওকে দরজার কাছে দেখতে পেয়ে ফিরে তাকায় মা। একটা নরম হাসি খেলে যায় মায়ের মুখে।
‘গেদু, এসেছিস গেদু…’
‘মা তুমি!…’ ও এক পা এগিয়ে যায় মায়ের দিকে।
‘তোকে আমি মাছ ভাজা খাওয়াতে পারলাম না রে গেদু…’ কথাটা বলেই মা গলার কাছে ধরা বঁটিটা সজোরে চালিয়ে দেয় নিজের গলায়। অনেকক্ষণ চেপে রাখা পেচ্ছাপের মতো চড়চড়িয়ে লাল রক্ত বেরিয়ে আসে। তীব্র চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেলেন মহিলা। তারপর নিজের রক্তের উপর শুয়েই ছটফট করতে লাগলেন। গলাকাটা মাছের মতোই।
‘এ কী করলে তুমি মা!’ সজোরে চিৎকার করে গেদু ছুটে গেল সেই দিকে। তারপর…
তারপর আচমকাই ঘুমটা ভেঙে গেল কৌশিকের।
জানলার দিকে চেয়ে বুঝতে পারল বাইরে ঝড় শুরু হয়েছে, সেই সঙ্গে বৃষ্টি। ঝোড়ো হাওয়ার ভেজা স্পর্শেই ভেঙে গেছে ঘুমটা। বিছানার উপর ধড়মড় করে উঠে বসল ও। কৌশিক জানে, এ স্বপ্নটা ওর পিছু ছাড়বে না! আজ বাইশ বছর হয়ে গেল, তাও টাটকা স্মৃতির মতো জেগে আছে মাথার ভিতর। বিষণ্ণতায় ভরে যায় ওর মনটা। কিছু একটা করার কথা ছিল কিন্তু না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বুকের উপর হাত রেখে নিজেকে শান্ত করল কৌশিক। পাশে টেবিলের উপরে রাখা বোতলটা নিয়ে জল খেল অনেকটা। হঠাৎ কী খেয়াল হতে ও উঠে পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পাশের ঘরের দরজা বন্ধ। মৃদু ঠেলা দিতে খুলে গেল। বিছানার উপর শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধা৷ এগিয়ে গিয়ে তার কপালে হাত রাখল কৌশিক, ‘ঠাম্মা…ঠাম্মা…জেগে আছ?’
মহিলা বিরক্ত হলেন, ‘বলিহারি তোর বাতিক। রোজ রাতে এসে খালি ঠাম্মা জেগে আছ, জেগে আছ…আমাকে কি একটু শান্তিতে ঘুমুতে দিবি না বাপ?’
মা চলে যাবার পর ঠাম্মা আর বাবার কাছেই মানুষ হয়েছে কৌশিক। বাবা একটা ঠিকাদারের কাছে কেরানির কাজ করতেন। অভাবের সংসার। বছর তিনেক আগে দুম করেই একদিন বাবা মারা যায় কৌশিকের। একেবারে হুট করেই ঘটে যায় ঘটনাটা। শুয়ে থাকতে থাকতে হার্ট অ্যাট্যাক। কৌশিক তেমন কিছু করার সুযোগ পায়নি। তবে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে ও একাই ছিল। বাবা বেশিদিন ভোগেননি। মা চলে যাওয়ার পর থেকে একরকম মরেই বেঁচে ছিলেন।
বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে ঠাম্মা ছাড়া আর কেউ নেই ওদের দোতলা বাড়িতে। তারপর থেকে রাতে ঘুমাতে গেলেই খালি মনে হয় ঠাম্মার কোনও বিপদ হল না তো। বারবার উঠে এসে ডাকে। ইদানীং খানিকটা বিরক্তই হন ঠাম্মা।
মায়ের কথা ওর বিশেষ মনে পড়ে না। বাবার কথা মনে পড়ে সারাক্ষণ।
ছোট থেকে রাতে বাবা আর ঠাম্মার মাঝখানে ঘুমাত কৌশিক। বাবা ওকে গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। কোনওদিন তিনি ক্লান্ত থাকলে ঠাম্মা ছোটবেলার গল্প বলতেন। মাঝে মাঝে ও কার দিকে ফিরে শোবে সেই নিয়ে বাবা আর ঠাম্মার মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত। ও নিজে অবশ্য দুদিকে ফিরে শুলেই একই গন্ধ পেত। যেদিন বাবার বুকে মুখ গুঁজে শুত কৌশিক, সেদিন সারারাত ঠাম্মার হাতটা পড়ে থাকত ওর পিঠে।
‘ভাবলাম জানলা দিয়ে ছাট আসছে কিনা, ঝড় উঠেছে তো… কথাটা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল কৌশিক। ঠাম্মা হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরেন। ‘এইখানটায় বোস তো বাপ…’ হাত দিয়ে বিছানাটা দেখান বৃদ্ধা৷ কৌশিক বাধ্য ছেলের মতো বসে পড়ে।
‘ঝড় বাইরে উঠেছে না ভিতরে?’ হাসি মুখেই জিগ্যেস করেন মহিলা। শীর্ণ হাতটা চেপে ধরে কৌশিক, ‘আমার ভয় করে ঠাম্মা!’
‘সে তো আগেও করত। কিন্তু এখন তো বয়স হয়েছে দাদা। এখন ভয় পেলে আর ঠাম্মাকে ডাকলে হয়?’
‘আমি তোমার পাশে শোব একটু?’ ধরা গলায় কথাটা জিগ্যেস করে কৌশিক। ঠাম্মার বিছানাটা ছোট। খুব নরম বিছানায় শুতে পারেন না বলে আলাদা খাট বানিয়ে দিয়েছে কৌশিক।
‘আয়, শো এখানে।’
কৌশিক শুয়ে পড়তে বৃদ্ধা একটা হাত রাখেন ওর পেটের উপর। আস্তে আস্তে সেই ক্লান্ত নিঃশ্বাসের শব্দটা বেড়ে ওঠে। যেন কষ্ট করে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন তিনি। মাঝে মাঝে ছেদ পড়ছে শব্দে। ঠোঁটটা বেঁকে যাচ্ছে তখন। বাইরে ঝড়ের আওয়াজের ছন্দের সঙ্গে যেন মিশে যায় শব্দটা। কাঠের জানলা চুঁইয়ে জল নামছে। মৃদু স্বরে একবার বাজ পড়ল যেন। কৌশিক চুপ করে শুয়ে নিঃশ্বাসের আওয়াজটা শুনতে থাকে। ওর বুকের মাঝে ভয়টা আরও জমাট বাঁধতে থাকে। আরও জোরে বাজ পড়ল কি একবার?
হঠাৎ একটা ভয় চেপে ধরে কৌশিককে। ও জানে আর কয়েক মাস কিংবা বছর পরে এই বিছানাটা খালি হয়ে যাবে। বিছানার চাদরের এই পুরোনো কাপড়ের গন্ধটা ফিকে হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
অস্বস্তিটা বেড়ে উঠতে ফোনটা খুলে ফেসবুকে যায় কৌশিক। অকারণে অর্থহীন রিল দেখতে শুরু করে। একটা টিয়া পাখিকে কেউ খিস্তি শেখাচ্ছে, বড় ক্রেন এনে দামি দামি কিছু গাড়িকে পিষে ফেলা হচ্ছে। তারপর কয়েকটা বিড়াল, কয়েকটা বাচ্চার লুকোচুরি খেলা…রিল দেখতে দেখতে খানিকটা সময় কেটে যায় বটে, তারপর নিজেরই বিরক্তি লাগে।
ফেসবুক বন্ধ করে মেসেঞ্জার খোলে কৌশিক। ক’দিন আগেই ওর জন্মদিন গেছে। তখন একদিনে আচমকা অনেকগুলো মেসেজ এসেছিল ওর ফোনে। সময় করে সবক’টার রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। আপাতত সেই আনরেড মেসেজগুলোর একটা খোলে কৌশিক। ইউজার আপাতত অনলাইন নেই।
‘ভাই, আছিস? একটু দরকার আছে।’ মেসেজটা সেন্ড করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কৌশিক। ওপাশ থেকে মিনিটখানেক পর রিপ্লাই আসে, ‘আগে বল আমি জেগে আছি, কে বলল তোকে?’
‘রাত দেড়টার সময় একটা বছর আঠাশের অবিবাহিত মেয়ে ঘুমায় না। তাছাড়া তোর পিরিয়ড চলছে।’
ওপাশ থেকে আবার রিপ্লাই আসে, ‘আমার পিরিয়ড চলছে কে বলল তোকে?’
‘তোর ফেসবুক পোস্ট। প্রোফাইলে দেখলাম, দিন পঁচিশ আগে পরপর শিট পোস্টিং করছিলি। আন্দাজ করে নিলাম। এক যদি না এর মধ্যে প্রেগন্যান্ট হয়ে যাস।’
‘গট ইয়োর পয়েন্ট, এবার বল কী চাই?
‘আমি তোকে একবার কল করতে পারি? মেসেঞ্জারেই?’
‘কর।’
কলটা রিসিভ হতে ওপাশ থেকেই আগে গলা শোনা যায়, ‘বল ভাই, কী ঘোটালা পাকিয়েছিস জীবনে?’
‘কিছু না।’
‘বাবা! বাবুর মন খারাপ হয়েছে, কিন্তু জিগ্যেস করলে বলবেন কিছু না৷ তোরও কি পিরিয়ড হয়েছে নাকি?’
বিরক্ত হয় কৌশিক, ‘মন খারাপ হয়নি, আমার ভয় লাগছে।’
‘কীসের ভয়?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে কৌশিক, তারপর বলে, ‘আমার ঠাম্মার নিঃশ্বাসের আওয়াজের…’
‘সেটা কী জিনিস?’
‘তোকে অত না জানলেও চলবে। তুই জাস্ট কথা বল আমার সঙ্গে। জাস্ট লুজ টক।’
বড় করে একটা শ্বাস নেয় আগমনী, ‘তোর কি সমস্যা জানিস গেদু? তোর ভিতরে ভয়, মন খারাপ, ডিপ্রেশন যে অনুভূতিটাই থাক না কেন তুই সেটাকে এড়ানোর জন্য ইগো বলে একটা বালস্য বাল অনুভূতিকে সিংহাসনে বসাচ্ছিস। ‘কাউকে সমস্যা বলে কী হবে? আমি নিজেই শের, আমার সমস্যা কেউ বুঝবে না’–এই সব। ভাবছিস তোর ওই ইগো বাকিগুলোকে হারিয়ে তোকে বাঁচাবে। কিন্তু গেস ওয়াট, ইগো নামের রাজাটা একটা মিরজাফরের বাচ্চা। ও তলায় তলায় ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আছে। উলটে তোর বন্ধু ছিল যারা, তাদেরকেও কাটিয়ে দিয়ে তোকে একা পেয়ে পেছনে গুঁজে দেবে।’
কিছুক্ষণ কোনও উত্তর দেয় না কৌশিক। নিঃশ্বাসের আওয়াজটা আগের থেকে বেশি থেমে থেমে আসছে। সেটা চাপা দেওয়ার জন্যই বলে, মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। জানিস, আমরা যেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি অন্যের ঠিক সেটাই লক্ষ্য করি। যার টাক পড়ছে সে অন্যের হেয়ার লাইন ফলো করে, যার কোলেস্ট্রল বেশি সে অন্যের লিপিড প্রোফাইল জানতে চায়, যার চাকরি হচ্ছে না সে বাসে ট্রামে রাস্তায় অন্য লোক দেখে ভাবে এরও বুঝি চাকরি নেই!
‘বুঝলাম, বলতে কী চাইছিস?
‘যার জীবনে একবার মৃত্যু স্পর্শ বুলিয়ে যায়, সে সারাক্ষণ পরিচিত মানুষের থেকে মৃত্যুর দূরত্ব মাপে। ঠোটটা কালো হয়ে যাচ্ছে? বুকটা ওঠানামা করছে তো? পোষা কুকুরটা আজ জল খাচ্ছে না কেন? বাজ পড়ছে, এখন বাইরে বেরোল কেন?’
‘তোর ঠাম্মাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে?’
‘না, আমি জানি চিন্তা করে লাভ নেই। আমার ঠাম্মা চিরকাল বাঁচবে না। আমার চিন্তা হচ্ছে, বিপদের আশঙ্কা করতে করতে আমাকে সবসময় জেগে থাকতে হবে বলে। জেগে থাকলে আশঙ্কা হবে, আবার আশঙ্কা হলে জেগে থাকব…’
হাসে আগমনী, ‘আজ ঘুমিয়ে পড়, আমি ফোনটা ধরে আছি। নিঃশ্বাসে কোনও সমস্যা হলে তোকে কল করে তুলে দেব, কেমন?’
‘তাতে ঘুম আসবে?’
‘কীসে ঘুম আসবে কে বলতে পারে গেদু। তুই ডাক্তার হয়েও বলতে পারবি না, কার কী হলে ঘুম আসে।’
‘বেশ, আজ হল। কিন্তু কাল কী হবে? একমাস পরে কী হবে?’ কৌশিকের গলা কাতর শোনায়।
‘যদি আমার পিরিয়ড চলে, আমি জেগে থাকব। যদি তোর পিরিয়ড চলে তুই জেগে থাকবি…
‘হেসে ফেলে কৌশিক। তারপর একদিক ফিরে শোয়, করছিস তুই এখন?’
‘চুলে তেল দিচ্ছি।’
‘এত রাতে কেন?’
‘তেল দিলে পুরো ডাইনি দেখায় মাইরি। অন্য কেউ না দেখে ফেলে তাই রাতে এসব করি। ঘুমা এখন…’
উলটোদিক থেকে আর কোনও কথা ভেসে আসে না৷ নিজের মনেই গুনগুন করে একটা গান ধরে আগমনী। চুলে তেল দিতে দিতে গান গাওয়া ওর স্বভাব। আয়নার সামনে বসে বুকের উপর চুলগুলো ফেলে সেভাবেই অনেকক্ষণ বসে থাকে।
কৌশিকের কিন্তু তক্ষুনি ঘুম আসে না৷ অনেকক্ষণ ধরে শুনতে থাকে সেই গান। ফোনের কল রেকর্ডার অন করে রেকর্ড করে কিছুটা। কাল ফোন না হলে এটাই শুনবে ঘুমানোর আগে। ধীরে ধীরে আগমনীর গলার আওয়াজে ক্লান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। কৌশিকের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে।
কল রেকর্ড শোনার দরকার হয়নি অবশ্য। পরেরদিনও ফোন করেছিল আগমনী। তারপরের দিনও। রাজ্যের হাবিজাবি গল্প করেছে দুজনে। নর্থ ইন্ডিয়ার কোথায় গেলে বরফ পাওয়া যায়, নেটফ্লিক্সের কোন সিরিজের শেষটা একেবারে ধেড়িয়েছে, অফিসের কোন ছেলেটা ওর পেছনে ছকবাজি করেছে।
এত কিছুর মাঝে হুট করে কখনও আগমনী বলেছে, ‘আমাদের কলেজের দিনগুলোই ভালো ছিল, বল?’
‘কেন?’
‘এই এত দুশ্চিন্তা ছিল না।’
একদিন একটা রুফটপ ক্যাফেতে বসে কফি খাবে ঠিক করেছিল ওরা। সেদিন কালো রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছিল কৌশিক। ছাদজুড়ে উষ্ণ জোনাকি আলো জ্বলছিল। সেই আলো এসে পড়েছিল কৌশিকের চোখে মুখে। তিরতির করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চলছিল স্পিকারে।
ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে
আমার মুখর পাখি—তোমার প্রাসাদপ্রাঙ্গণে।।
মনে করে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো
আমার হাতের রাখী–তোমার কনককঙ্কণে…
সেই অ্যাম্বিয়েন্সের ঠ্যালায় গুবলে গিয়ে দুম করে কৌশিকের ঠোঁটে একটা পেল্লাই চুমু খেয়ে ফেলেছিল আগমনী। তারপর ‘এক্সকিউজ মি’ বলে ওয়াশ রুমে এসে মুখ ধুয়েছিল পনেরো মিনিট।
তবে কৌশিক আগমনীকে অফিশিয়ালি প্রপোজ করেছিল, গড়িয়াহাট যাওয়ার পথে একটা ভিড় বাসে। দুজনে সিট থেকে উঠে কোনওরকমে এপাশ ওপাশের অফিস যাত্রীদের এগিয়ে আসা ভুঁড়ি আর ঘেমো বগলের ফাঁক দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছিল। কৌশিকের পিঠের ব্যাগটাকে চেপে ধরে ওকে অন্ধের মতো ফলো করছিল আগমনী। গুঁতোগুতির মধ্যে পাশের এক কাকিমার সঙ্গে ক্যচালে হারছে দেখে ‘ইংরিজিতে ফটরফটর করা শুরু করেছিল আগমনী। কাকিমা ইংরিজির সামনে খাপ খুলতে পারেনি বটে, কিন্তু নেমে যাওয়ার ঠিক আগে আগমনীর মুখে ঘেমো হাত ঘষে দিয়েছিল…
কোনওরকমে হাঁচড়পাঁচড় করে নিচে নেমে রাস্তার ধারে বমি করেছিল আগমনী। সে এক বিদিকিচ্ছিরি আর লজ্জাজনক অবস্থা। রাস্তার লোক ঘেন্না ঘেন্না মুখ করে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
সেসবে পাত্তা না দিয়ে বোতল থেকে জল নিয়ে ওর মুখ ধুইয়ে দিয়েছিল কৌশিক। তারপর ‘এখন ঠিক লাগছে?’ জিগ্যেস করার বদলে আচমকাই বলেছিল, ‘আমাকে কালো বিড়াল হতে দিবি?’
‘অ্যাঁ?’ কোনওরকমে বমি চাপতে চাপতে জিগ্যেস করেছিল আগমনী।
ওর দিকে এগিয়ে এসেছিল কৌশিক, ‘না মানে, তোর মাথার চুল এখন ভিজে আছে, সকালের রুটি তরকারি বাঁদিকের গালে লেগে আছে৷ কমপ্লিটলি ডাইনি দেখাচ্ছে!’
আগমনী হাত দিয়ে মুছতে যাচ্ছিল মুখটা। তার আগেই কৌশিক এগিয়ে এসে দু’হাত রেখেছিল ওর গালে, ‘আর আমি আমার বাকি জীবন এই ডাইনিটার সঙ্গে কালো বিড়াল হয়ে থাকতে চাই!
কিছু বুঝতে টুঝতে না পেরে আবার হড়হড় করে বমি করে ফেলেছিল আগমনী।
নিউটাউনের কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে গাড়িটা যখন তিনতলা জান্নাতের গেটে এসে থামল, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। নিউটাউনের ভিতরে যে ছোট ছোট পল্লী গ্রামগুলো এখনও রয়ে গেছে তারই একটায় বাড়ি সাহিন আলিদের। স্বামীস্ত্রী ছাড়াও আরও জ্ঞাতিগুষ্টির লোক নিয়ে থাকে তারা। বাড়িটার নাম জান্নাত। সল্টলেক থেকে এখানে আসতে যে এতটা সময় লাগবে তা আগে ভাবেনি ওরা। এ জায়গাটা প্রায় গ্রামাঞ্চলই বলা যায়। আসার পথে একটা এঁদো পুকুর, তার পাশে খান পাঁচেক সিড়িঙ্গে তালগাছ নজরে পড়ে। রাস্তাটাও গলির মুখে এত সরু হয়ে গেছে যে গাড়ি ঢুকতে চায়নি। তবে ‘জান্নাত’ বাড়িটা জমকালো। বেশ কয়েক ঘর ফ্যামিলি থাকে এখানে। সাহিন আলিদেরই জ্ঞাতিগুষ্টি হবে।
সদর দরজা পেরোলে বাইরে লম্বাটে একটা উঠোন। সেটা পেরোলে তিনতলা বাড়ি। বাড়িতে আধুনিকতার তেমন ছাপটাপ নেই। তবে ভালোরকম পয়সা খরচ করে বানানো সেটা চেহারা দেখলে বোঝা যায়।
সেই উঠোনের একপাশে কলতলায় একজন মাঝবয়সি লোক স্নান করছিলেন। তাকে সাহিন আলির কথা জিগ্যেস করতে তিনিই হাঁক দিলেন। উপর থেকে সম্মতি পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এল ওরা।
কাল স্কুল থেকে ফেরার পথে সাহিন আলিকে আবার ফোন করেছিল কৌশিক। ফোনে একরকম ঝুলোঝুলি শুরু করে। নহরের ব্যাপারে কিছু জানার আছে তার। ভদ্রলোক প্রথমে রাজি হননি। শেষে পীড়াপীড়িতে আজ বিকেলবেলা ওদের বাড়ি আসতে বলেছেন।
সাহিন আলির বয়স ষাটের কাছাকাছি। মোটাসোটা গোলগাল ভদ্রলোক গায়ে একটা পুরোনো আদ্দির পাঞ্জাবি, চামড়ার রং তামাটে। চোখে ঘোলা কাচের চশমা। নামাজ পড়ার অভ্যাস আছে বোঝা যায়, কপালের মাঝে কালচে গোল দাগ।
বাইরের ঘরে ওদের বসতে বলে ভিতরে গেলেন ভদ্রলোক। মিনিট খানেক তার আর পাত্তা পাওয়া গেল না।
ভিতর থেকে ভেসে আসা আওয়াজ শুনে বোঝা যায় ঘরের ভিতরে আরও মহিলারা আছেন। কেউ মনে হয় রাতের রান্নাবান্না চাপিয়েছে। বাসনপাতির ঠং ঠং শব্দ আসছে থেকে থেকে। চারদিকের দেওয়ালে হালকা অযত্নের ছাপ পড়েছে।
খানিকক্ষণ পরে ভিতর থেকে ফিরে এলেন সাহিন আলি। লুঙিটা হাটু অবধি তুলে ওদের উলটোদিকের সোফায় বসতে বসতে বললেন, ‘আসলে এতদিন পরে আমার মেয়ের ব্যাপারে খোঁজখবর করছেন আপনারা…’ দুজনের দিকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিলেন তিনি।
ছবিটা পকেট থেকে বের করে লোকটার দিকে এগিয়ে দেয় আগমনী, ‘এই ছবিটা আছে আমার কাছে।’
ভদ্রলোক ঘোলাটে চশমাটা ভালো করে আটকে নেন চোখে, ছবির উপর থেকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলেন, ‘এরপর আর ওর কোনও ছবি তোলা হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না। এই স্কুল পাস করার আগে আগেই তো…’
‘আপনার কাছে ওর অন্য ছবি আছে আর?’
‘একটু খুঁজে দেখতে হবে। ওর মায়ের কাছে…’ কথাটা বলতে গিয়েও শেষ করেন না তিনি। ছবিটা আগমনীকে ফিরিয়ে দেন আবার।
‘ও কী করে মারা গেল বলুন তো? মানে আপনার যদি বলতে তেমন কোনও অসুবিধা না থাকে৷’
মুখের উপর একবার হাত চালিয়ে নেন সাহিন আলি, ‘অসুখ করেছিল। ব্রেইন টিউমার। ইলেভেনের মাঝামাঝি ব্যাপারটা ধরা পড়ে। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেত, আর মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা…’
‘জানি কী কী হয়। ওটা বাদ দিন।’ কৌশিক থামিয়ে দেয় তাকে।
‘ও যখন জন্মায় তখন আমার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না৷ তাছাড়া আমরা তখন গ্রামে থাকতাম। সেখানকার পরিবেশ ভালো নয়। বুঝলাম, এখানে থাকলে আমার মেয়ে মানুষ হবে না। যেটুকু যা পয়সাকড়ি ছিল তাই দিয়ে শহরে এসে ব্যবসা শুরু করলাম। বলতে নেই, তাতেই অবস্থা খানিক ফিরেছে আর কী।’ বিনয়ের হাসি হাসলেন সাহিন আলি। ভিতরের ঘর থেকে ভেসে আসা রান্নার আওয়াজ এখন থেমে গেছে।
‘ওকে তো কিডন্যাপ করা হয়েছিল, তাই না?’
উপরে নিচে বিমর্ষ মাথা নাড়ালেন ভদ্রলোক, ‘হ্যাঁ, টিউশনি থেকে ফেরার সময় গাড়ি করে তুলে নিয়ে যায়। আমার মোবাইল নম্বরেই ফোন আসে। দশ লক্ষ টাকা চায়। দুম করে অতগুলো ক্যাশ টাকা জোগাড় করাও সহজ ব্যাপার নয়। আমরা টাকাটা জোগাড় করতে করতেই একটা দিন কেটে গেল। পরদিন ভোরবেলা ও ফিরে এল।’
‘মানে টাকাটা আপনারা পাঠানোর আগেই?’ আগমনী অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
‘হ্যাঁ, সেটাই আশ্চর্যের। তবে মেয়েটা শকে ছিল কয়েকদিন। অন্তত মাসখানেক কোনও কথা বলেনি। হয়তো ওরা কোনওভাবে ভয়-টয় দেখিয়েছিল।’
‘কিডন্যাপ কে করেছিল, কোথায় রেখেছিল, কিচ্ছু বলেনি?’
‘উঁহু।’
‘কিডন্যাপার ধরা পড়েনি।’ কৌশিক প্রশ্ন করে।
‘না। সত্যি বলতে কী আমরা আর তেমন চেষ্টা করিনি থানা পুলিশ করার। ওরা যখন টাকাপয়সা না নিয়েই ফিরিয়ে দিয়েছে তখন কী দরকার আর শত্রুতা বাড়িয়ে। আমার মনে হয় কোনও অ্যামেচার ক্রিমিনালের কাজ। তবে তারপর থেকেই অসুস্থ ছিল মেয়েটা। মাঝে মাঝেই তুমুল জ্বর আসত আর অসহ্য মাথা ব্যথা হত। কিন্তু কিছুতেই ডাক্তার দেখাতে চাইত না। আমরা জোর করলে আরও রেগে যেত। ভীষণ জেদী হয়ে গেছিল ও। অসুখটাকেই যেন ভালোবেসে ফেলেছিল। সে অসুখ আর সারল না।’
কথাটা শেষ করে বড় করে দম নিলেন সাহিন আলি।
‘কিডন্যাপের পরেও তো বছর দুয়েক মতো বেঁচে ছিল। তখন কেমন ছিল বিহেভিয়ার?’
সাহিন আলির মুখে করুণ হাসি ফোটে, ‘প্রথমদিকে তো কোনও কথাই বলত না। চুপ করে জানলার ধারে বসে থাকত পাথরের মতো৷ স্কুলে ভর্তি করে দিতে নতুন বন্ধুবান্ধব পেয়ে একটু একটু করে স্বাভাবিক হল।’
‘স্কুলের কোনও বন্ধুর কথা আলাদা করে বলেনি?’
দু’দিকে মাথা নাড়েন সাহিন আলি, ‘নাহ্, আমাদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলত না। ওর মাকে বলে থাকতে পারে। তবে ওর মনের ভিতরে কিছু একটা চলত সেটা ও ঘুমোলে বুঝতে পারতাম।’
‘ঘুমোলে! কীভাবে?’
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবার চেষ্টা করেন ভদ্রলোক, ‘এত আগের ঘটনা তো, আমার বিশেষ মনে নেই। বলত কোথায় নাকি একটা যুদ্ধ হয়েছিল, একটা রাক্ষসের সঙ্গে লড়াই করেছিল ও। তাছাড়া আরও কিছু বলত… কিন্তু…’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌশিক। এখানে এসে আদৌ তেমন উপকার কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। পনেরো বছর আগে মরে যাওয়া একটা মানুষের ব্যাপারে এমন বিক্ষিপ্ত কিছু উদ্ভট খবরে আগমনীর আখেরে লাভ হবে না। তবে মেয়েটার একটা ছবি পাওয়া গেলে সেটা দেখে ওর কিছু মনে পড়তে পারে।
আগমনী কিছুক্ষণ চিন্তায় ডুবে থাকে। তারপর একগাল কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে, ‘আপনি এতটা সময় দিলেন আমাদের। কী বলে যে ধন্যবাদ জানাব…’
‘ওহ্, ভালো কথা…’ কী যেন ভুলে গেছিলেন ভদ্রলোক, ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ও কিডন্যাপ হয়ে ফিরে আসার পরে ব্যাপারটা পাড়ার লোকের মুখে মুখে হালকা জানাজানি হয়। ওর একটা ছবিও বেরিয়েছিল সে সময়ের কাগজে। একেবারে পেছনের দিকে ছোট করে টুকরো খবর। সেই ছবি দেখে এক ভদ্রলোক যোগাযোগ করেন আমাদের সঙ্গে। সামথিং ব্যানার্জি। পুরো নামটা আমার মনে নেই। নানারকম প্রশ্ন করেছিলেন মনে আছে। তারপর আর যোগাযোগ রাখেননি।’
‘ওনার কোনও কন্ট্যাক্ট…’
সাহিন আলি সোফা ছেড়ে উঠে পড়েন। গলা তুলে হাঁক দেন, ‘শুনছ, তোমার কাছে নহরের ছবি থাকলে এদের একটু দেখাও না।’
ভিতরের ঘরের দিকে চেয়ে কথাটা বলে নিজের ফোনে কী যেন খুঁজতে থাকেন তিনি।
আগমনী তাকিয়ে দেখে ডাইনিংয়ের দরজা এক প্রৌঢ় মহিলা বেরিয়ে এসেছেন। ফিকে গোলাপি রঙের একটা শাড়ি গায়ে জড়ানো তার। কপাল অবধি ঢাকা ঘোমটায়। ছিপছিপে চেহারা। তবে মুখে ব্যাক্তিত্বের ছাপ আছে। এক নজর দেখে রাশভারী বলে মনে হয়।
‘এসো আমার সঙ্গে…’ গমগমে গলা ভেসে আসে।
ওরা দুজনেই উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু মহিলা হাত তুলে কৌশিককে থামিয়ে দেন, ‘তুমি না৷’ আগমনীকে দেখিয়ে বলেন, ‘তুমি এসো শুধু।’
আগমনী একটু থতমত খেয়ে পা বাড়ায় ভেতরের ঘরের দিকে। টিউব লাইটের উজ্জ্বল আলোয় ভরে আছে ঘরগুলো। এ বাড়িরই কোনও প্রান্তে টিভি চলছে। সেখান থেকে সন্ধের নিউজ চ্যানেলের শব্দ ভেসে আসছে৷ মহিলা প্যাসেজ পেরিয়ে একটা আধা অন্ধকার ঘরের দরজায় ঠেলা দেন। তারপর হাত দিয়ে ভিতরে নির্দেশ করেন, ‘এসো…’
আগমনী ভেবেছিল মহিলা ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাবেন। কিন্তু সেটা হয় না। একটা নীল নাইটল্যাম্প জ্বলছে ঘরের মধ্যে। সেই আলো তার মুখে পড়ে ভারি বিশ্রী একটা জ্যামিতি তৈরি করেছে। খানিকটা ভয়ই লাগে আগমনীর।
‘সত্যি করে বলো তো…’ সজোরে ওর হাত চেপে ধরেন মহিলা, ‘তোমরা কেন এসেছ এখানে?’
আগমনীর মনে হয় ওর চামড়ায় নখ বসে যাবে। আমতা আমতা করে ও, ‘আমার আসলে মনে পড়ছে না ওর কথা। ওর একটা ছবি আছে আমার কাছে। কিন্তু আর কিছুই…’
‘চুপ, একদম চুপ…’ চাপা হিংস্র গলায় গর্জে ওঠেন মহিলা, ‘পনেরো বছর আগে মারা যাওয়া বান্ধবীর কথা আজ মনে পড়েছে তোমার? ঠিক করে বলো, কেন এসেছ? কী জানতে পেরেছ ওর ব্যাপারে?’
আগমনীর অসহায় লাগে। মহিলার কি মাথায় গোলমাল আছে! ও ককিয়ে ওঠে, ‘আমি সত্যি বলছি। দেখুন, আপনার কাছে যদি কোনও ছবি না থাকে আমরা এক্ষুনি চলে যাব।’
‘ছবি? ছবি কী হবে তোমার?’ মহিলার গলা শ্বাপদের মতো শোনায়, ‘তুমি চিনতে না ওকে? ও তো তোমার বাড়িতেও গেছে।’
‘আমার বাড়ি গেছে। কবে?’
মহিলার গলার স্বর এবার খাটো হয়ে আসে, ‘টুয়েলভে ওঠার পর নহর অসুস্থ থাকত বেশিরভাগ দিন। তখন খালি তোমার বাড়ি যাওয়ার বায়না করত। আমরাও আর বাধা দিতাম না। ওর বাবা একটা রিকশা করে দিত, সেটা করেই যেত।’
আগমনীকে অসহায় দেখায়, ‘কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার কাছে ওর কোনও ছবি নেই।’
ওর হাতটা ছেড়ে দেন মহিলা। আগের মতোই হিংস্র গলায় বলেন, ‘নেই, আমার কাছেও ওর কোনও ছবি নেই। সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেছি। আরও যা যা কিছু ছিল, সব সব…’
‘পুড়িয়ে ফেলেছেন! কিন্তু কেন?’
‘কারণ ও আমার মেয়ে নয়! ওকে আমার ভয় লাগত…’
উত্তরটা আগমনীর পায়ের তলা আচমকাই ঠান্ডা করে দেয়। এ ঘরে যে নীল আলো জ্বলছে তাতে ঘরের ভিতরের আসবাবগুলোর কোনায় কোনায় মিহি অন্ধকার আরও জমাট বেঁধেছে। তার গভীরে কোথায় কী লুকানো আছে কে বলতে পারে?
‘ভয়…পান…’ কেটে কেটে শব্দগুলো উচ্চারণ করে আগমনী, ‘কিন্তু আপনি হঠাৎ নিজের মেয়েকে ভয় পেতে যাবেন কেন?’
‘কারণ…’ মহিলার শ্বাসের শব্দ দ্রুত হয়ে আসে। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি আগমনীর কানে এসে পৌঁছায়, ‘কারণ আমার যে মেয়ে হারিয়ে গেছিল সে আর ফিরে আসেনি। অন্য কেউ এসেছিল।’
উত্তরটা মগজস্থ করতে একটু সময় লাগে আগমনীর। থমথমে গলায় ও বলে, ‘আপনাকে কে বলল এসব?’
বিরক্ত হয়ে দেওয়ালের উপরেই চাপড় মারেন মহিলা। হাতে চুড়ির গোছা ঝনঝন করে ওঠে তার, ‘ওর গায়ে অনেকগুলো দাগ ছিল। সেগুলো একদিনে হয় না। আগে যা ভালোবাসত, পরে সেটাই আর পছন্দ করত না। যেখানে যেতে চাইত সেখানে মারলেও যেত না। ক্লাস টেন পর্যন্ত একেবারে স্কুলে যেতে চাইত না, কিন্তু ইলেভেনে…’ মহিলা একটু থেমে দম নেন, ‘ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ফেলত মাঝে মাঝে। তখন ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা বলত। একটা কাক, কালো কুকুর আর শেয়ালের কথা বলত থেকে থেকে…’
‘ওকে কিডন্যাপাররা জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে রেখেছিল নাকি?’
‘আমি জানি না৷’ দু’পাশে মাথা নাড়ায় মহিলা, আগমনীর হাতের উপর নখের চাপ কমে আসে, ঘরের বিছানার উপরেই ধপ করে বসে পড়ে মানুষটা। চাপা স্বরে বলতে থাকেন, ‘ওদের হাত থেকে ফিরে এসে চুপচাপ থাকত মেয়েটা। দেড় বছর আমাদের সঙ্গে বিশেষ কথা বলেনি। কেবল স্কুলে যেতে ভালোবাসত। যতই শরীর খারাপ হোক, স্কুলে যাওয়া আটকানো যেত না। একদিন জ্বর গায়ে স্কুলে যেতে এত বায়না করছিল, যে আমি লাঠি দিয়ে বেধড়ক মেরেছিলাম ওকে। অত মার খেয়েও ওকে আটকানো যায়নি!’
‘আপনারা এসবের কারণ জানতে চাননি?’
‘জিগ্যেস করলেও বলত না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম ভালো বন্ধু হয়েছে হয়তো। কিন্তু দিন দিন মেয়েটা কেমন হয়ে যাচ্ছিল যেন…অচেনা, ‘অচেনা একটা মানুষ!’
‘ওর বন্ধুদের মধ্যে কেউ এ বাড়িতে আসেনি?’
‘প্রথম প্রথম ওর বাবা গাড়ি করে স্কুলে দিয়ে আসত। তারপর টুয়েলভে উঠে একাই রিকশা করে স্কুলে যেত। তোমার কথা আমরা জানতাম। বাকি বন্ধুদের ব্যাপারে কোনও কথা বলত না আমাদের। শুধু…’ হঠাৎ কী যেন ভেবে থমকে যান মহিলা, ‘শুধু একজনকে ছাড়া।’
‘কে?’
ওর দিকে মুখ তুলে তাকান তিনি, ‘নাম বলেনি কোনওদিন। তবে বলত সে নাকি আমাদের বাড়িতেই থাকে।’
‘বাড়িতে?’
অদ্ভুত হাসি খেলে যায় মহিলার মুখে, ‘হ্যাঁ, আমরা দেখতে পেতাম না, কিন্তু সে আছে। শুধু তাই নয়, বলত সেই কিডন্যাপারদের থেকে বাঁচিয়ে এখানে এনেছে।’
আগমনীর মাথার ভিতরে সমস্ত ব্যাপারটা গুলিয়ে যায়। সে আর কিছু জিগ্যেস করে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আঁচল থেকে চাবি বের করে এনে দ্রুত হাতে ঘরের আলমারিটা খোলেন৷ তারপর থরে থরে সাজানো জামাকাপড়ের ভিতর থেকে একটা খাম বের করে ছুড়ে দেন ওর দিকে, ‘ওর ছবি দেখবে বলছিলে না? এই দেখো, একটাই ছবি আছে আমার কাছে…তুমি নিয়ে যাও…
কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা তুলে নেয় আগমনী। তার ভিতর থেকে বের হয়ে আসে একটা পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া ছবি। সম্ভবত স্টুডিওতে তোলা৷ চেয়ারে বসে মিষ্টি করে ক্যামেরার দিকে চেয়ে হাসছে একটা বছর দশেকের মেয়ে। পানপাতার মতো মুখ। মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল তার। গভীর দুটো চোখ। ঠোঁটের পাশে একটা ছোট তিল।
আগমনী ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে। এখানে আলো কম। ব্যর্থ হয়ে পকেটে ঢুকিয়ে নেয় ছবিটা।
মহিলা এখন অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তার ধরা গলা ভেসে আসে, ‘তোমরা কী জানতে পেরেছ আমি জানি না। কিন্তু আমি মা হয়ে বলছি, যে মেয়েটাকে আমরা কবর দিয়েছি সে আমাদের মেয়ে ছিল না। অন্য কিছুতে বদলে গিয়েছিল…’
নিউটাউনের সাদা আলোগুলো ক্রমশ ছুটে যাচ্ছিল ওদের গাড়ির পেছন দিকে। সেদিকে একমনে চেয়ে ছিল আগমনী। চোখের মণি স্থির হয়ে আছে ওর। কৌশিক এর মাঝে এটা সেটা প্রশ্ন করেছে ওকে। কিন্তু ও সাড়া দেয়নি৷
কস্তো মাজা হে রাইলাইমা
রামাইলো উকালি উরালি
রেডিয়ো থেকে ভেসে আসা গানটা মন দিয়ে শুনছিল আগমনী। একঝাঁক অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে সুর করে গাইছে গানটা। কোথায় যেন কথাগুলোর মানে জেনেছিল ও। উঁচু নিচু পাহাড়ের পথে দুড়দাড় বেগে এগিয়ে চলা একটা রেলগাড়ির ঝাঁকুনিতে দুলে দুলে নাচছে একপাল পাহাড়ি ছেলেমেয়ে। ছোটবেলায় রেলগাড়ি শব্দটা কী মিষ্টি ছিল! মনে হত তাতে চড়লে আরামসে গল্পের বইয়ের দেশে পৌঁছে যাওয়া যায়। ট্রেন শব্দটা শুধু বড় হয়ে যাওয়ার ঘ্যানঘ্যানে অফিসে নিয়ে যেতে পারে।
আচমকা গাড়িটা ব্রেক কষতে চটক ভাঙে আগমনীর। পাশে তাকিয়ে দেখে কৌশিকের মাথাটা ঠুকে গেছে সামনের সিটে। ও হাত বাড়িয়ে কপালের সামনের দিকটা স্পর্শ করে, ‘এই লাগেনি তো তোর?
কৌশিক হাসে, ‘সাক্ষাৎ হেডেক পাশে বসে রয়েছে যখন আর নতুন করে কী হবে।’
আগমনী সামনে তাকায়। জ্যামে গাড়ি আটকে আছে। সন্ধের দিকে এ রাস্তাটায় গাড়ি থেমে থেমেই চলে।
‘এবার কী করা যায় বল তো? এখন তো দেখছি আমরা চারজন ছাড়া আরও এক বন্ধু ছিল নহরের। প্রবাবলি ইমাজিনারি ফ্রেন্ড।’ কৌশিক ভেবে চিনতে বলে।
‘আমার যতদূর মনে হচ্ছে এই বন্ধুই সেই স্কুলে দেখা গায়েব হয়ে যাওয়া লোকটা…স্ট্রেঞ্জ। কিন্তু তাই যদি হয় তাহলে স্কুলে বাকিরা কী করে দেখল তাকে?’
মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। কৌশিক বলে, ‘বিশ্বজিৎ ব্যানার্জির কন্ট্যাক্ট পাওয়া গেছে। পেশায় সাংবাদিক ছিলেন, এককালে কিছু বইটইও লিখেছেন। যিনি নহরের খোঁজখবর নিয়েছিলেন ওর কিডন্যাপের পর। তাকে জিগ্যেস করে দেখব?’
সামনের ব্যস্ত রাস্তার দিকে চেয়ে কৌশিকের কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয় আগমনী, ‘ধুর, আমি কেমন কেলিয়ে যাচ্ছি শালা। কী হবে এত ছোটাছুটি করে? মেয়েটা যখন মরেই গেছে…’
‘বাকি তিনজন?’
আগমনী হাসে, ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে ওর দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে ছেলের মুখের দিকে চায়, ‘কে জানে কোথায় আছে। হয়ত চিমসে রোগা ছেলেটা ইয়া মোটা হয়ে গেছে। কেউ বিয়ে করে ব্যাঙ্গালোরে সেটেল হয়ে গেছে। মাস গেলে এখন ইএমআই-এর চিন্তা। দাড়িওয়ালা ছেলেটা হয়তো এখন ক্লিন শেভড। আমার মতোই আইটি প্রফেশনাল।’
কৌশিক ছবিটার দিকে চায়, ‘ছবিটা তোলার সময়ে হাসতে হাসতে কী ভাবছে বল তো এরা?’
‘এই সময়ে মানুষের চোখে স্বপ্ন থাকে…’ গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকায় আগমনী, ‘কে জানে, পূরণ হয়েছে কিনা। বা হয়তো কোনও স্বপ্ন ছিল কিনা ভুলেই গেছে…আমার মতো…’
প্রসঙ্গটা পালটে ফেলে কৌশিক, ‘ভালো কথা, তোকে তো ছবি দেখালেন মহিলা। কই, দেখা আমাকে…’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আগমনী। তারপর ব্যাগের ভিতর থেকে বের করে খামসুদ্ধ ছবিটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে, ‘দেখ…’
ছবিটা চোখের সামনে মেলে ধরে কৌশিক, হাতের ছবিটার সঙ্গে নতুন ছবিটা মিলিয়ে দেখে। ভুরুটা হালকা কুঁচকে যায় তার। সেটা লক্ষ করেই আগমনী বলে, ‘কী হল তোর আবার?’
নতুন ছবিটা হাত দিয়ে দেখায় কৌশিক, ‘তোর এতে কিছু গোলমাল লাগছে না?’
ভালো করে ছবিটা দেখে আগমনী। বিশেষ করে নহরের মুখটা। নাহ্, কোনও পার্থক্য নেই দুটো মুখে। এক চুল, এক মুখ, ঠোঁটের পাশে একই জায়গায় তিল। দুটো মানুষের চেহারার মধ্যে এক বছর পাঁচেকের বয়সের পার্থক্য ছাড়া আর কোনও তফাত নেই।
কৌশিক কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ওর ফোনটা বেজে ওঠে। আননোন নম্বর।
সেটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা অমায়িক গলা শোনা যায়, ‘হেল্লো, আমি বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী বলছি। আলিদা বলল, আপনারা আমার খোঁজ করছিলেন?’
‘হ্যাঁ, মানে নহর জান্নাতের কিডন্যাপিংয়ের ব্যাপারে আপনি খোঁজখবর করেছিলেন, সেই নিয়েই…’
‘বুঝেছি। তবে আমার কাছে তেমন কিছু জানতে পারবেন বলে মনে হয় না। আই মিন দেয়ার ইজ সামওয়ান হু ক্যান টেল বেটার স্টোরি দ্যান মি।’
‘সেটা কে?’
ওপাশ থেকে একটা নরম হাসির শব্দ পাওয়া যায়, ‘দ্যা ডেভিল হিমসেলফ। তার সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারেন আপনারা।’
‘মানে? কার কথা বলছেন?’
‘নহর জান্নাত বলে মেয়েটিকে কে কিডন্যাপ করেছিল, আমি জানি…’
