তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৮
অষ্টম অধ্যায়
বায়োলজি ল্যাবে ঢোকার আগে দাঁড়িয়ে পড়ল খুঁটি। ওর ঠিক ডানদিকেই সেভেন-বি। তার বাইরে একটা ছেলে কান ধরে নিলডাউন হয়ে আছে। ভেতরে মাধবস্যার ক্লাস নিচ্ছে। এই স্কুলে মাধবস্যার ক্লাস নিচ্ছে আর বাইরে কেউ কান ধরে দাঁড়িয়ে নেই, এ দৃশ্য আজ অবধি দেখেনি খুঁটি৷ হাসলে, হাই তুললে, আঙুল মটকালে, ক্লাস চলাকালীন লুকিয়ে টিফিন খেলে, জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলে, সবেতেই উনি ক্লাস থেকে বের করে দেন।
ও একবার চারপাশ দেখে নিয়ে ছেলেটার কাছে এগিয়ে আসে। তারপর নিচু হয়ে চাপা গলায় বলে, ‘কী খোকা? পড়া করোনি?’
‘না, ক্লাসে গান গাইছিলাম। তাই কান ধরে দাঁড়াতে বলেছে। জিভ দিয়ে আফসোসের শব্দ করে খুঁটি, ‘গান গাওয়াতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কান ধরার সঙ্গে নিলডাউন হতে বলল কেন?’
‘গান গাওয়াতে দোষের কী আছে জিগ্যেস করেছিলাম।’
খুঁটি একটু ঘাবড়ে যায়। ছেলেটার কাঁধে একবার সহমর্মিতার চাপড় মেরে বায়োলজি ল্যাবের ভিতর ঢুকে যায়। ঢুকেই বেদান্ত আর নহরকে দেখতে পায় ও।
গত এক মাসে ওদের পাঁচজনের মধ্যে ভালোমতো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। চারজনে একই বেঞ্চে বসছিল। নহরকেও ওদের মধ্যে টেনে এনেছে। সে অবশ্য বিশেষ আপত্তি করেনি। চারজনের সঙ্গে সময় কাটাতে মন্দ লাগে না ওর। নহর এমনিতে চুপচাপ। কিন্তু এই চারজনের মধ্যে থাকলে মাঝে মাঝে মজার মজার গল্প বলে। ও একবার মা বাবার সঙ্গে মুসৌরি বেড়াতে গেছিল, সেই গল্প বলে।
সাম্য আর আগমনী কখনও পাহাড় দেখেনি। ছোটবেলায় আঁকার খাতায় যেরকম তিনকোনা পাহাড় এঁকেছিল, সেইরকম একটা কাঁচা ধারণাই ওদের মাথার মধ্যে রয়ে গেছে। নহরের গল্প শুনতে শুনতে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থেকেছে সাম্য। বাইরে দুলন্ত বাবলা গাছের ফাঁক গলে দুপুরের রোদ এসে পড়েছে ক্লাসরুমের সিমেন্টের মেঝেতে। সেই রোদের ভিতর মিহি ধুলোর ছুটোছুটি দেখতে দেখতে ওর মন চলে গেছে কোনও হিল স্টেশনে। সেখানে সবুজ ঘাসের উপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির ঝিমঝিম ধারায় স্নান করছে একটা হলদে স্কুলড্রেস পরা মেয়ে। তার মাথার চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ভেজা ঘাসের উপর জমা জলে পা ফেলার ছপ ছপ আওয়াজ হচ্ছে।
সাম্য ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। ওর পকেটে রাখা সিগারেটের ঠোঙা ভিজে চুপসে গেছে, তাতেও কিচ্ছু যায় আসেনি। ফিরবে কী করে, জানে না। বাবা ব্যাটের বাড়ি মেরে হাড় ভেঙে দেবে, তাতেও কিছু যায় আসেনি। এক একটা মানুষ থাকে তাদের মুখের দিকে একবার তাকালে আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না। সাম্য জানে মেঘাকেও ঠিক তেমনই দেখতে। মেয়েটা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে ওর দিকে, উৎসাহে লাফিয়ে ওঠে, ‘সাম্য! তুই এখানে!’
সাম্য হেসেছে, তারপর মেয়েটার মুখ থেকে জলের ধারা মুছে দিয়ে বলেছে, ‘কী ভেবেছিলি? আসতে পারব না?’
মেয়েটা তেমন ভেজা ইউনিফর্মেই জড়িয়ে ধরে ওকে। বৃষ্টির ধারা নামে ওদের গা দিয়ে। ওর কাঁধে মাথা রেখেই মেঘা ফিসফিস করে বলে, ‘কোথাও চলে যাস না যেন।’
‘ভালোবাসলে কোথাও চলে যাওয়া যায় না।’
এসব ভাবনায় নিজেই হেসে ফেলে সাম্য। আদৌ এসব কোনওদিন হবে কিনা কে জানে! কেবল নহরের মুখ থেকে গল্প শোনে ও। পাহাড়ের গল্প, পাহাড়ি শহরের বুকে মিশে থাকা একটা মেয়ের গল্প।
নহর যখন গল্প বলে, মনে হয় সত্যি সত্যি চোখের সামনে যেন জলে ভেজা রঙিন ছবি ফুটিয়ে তুলছে। ক্লাস ফাঁকা পেলে ছাদের পাঁচিলের খোপে বসে ওরা গল্প করে পাঁচজন। নহর সিগারেট খায় না। খুঁটি খুব একটা জোর জবরদস্তিও করেনি ওকে। সে আমসত্ত্ব খেতে ভালোবাসে৷ খুঁটি টিফিন বক্সে করে রোজই আমসত্ত্ব নিয়ে আসে নহরের জন্য।
বেদান্তর ফোনে আপাতত সাম্যর অর্কুট অ্যাকাউন্ট খোলা আছে৷ রোজই স্কুল শেষ করে একবার করে সেই অ্যাকাউন্ট চেক করে ব্যাদা। মেঘা সরকারের প্রোফাইল থেকে নতুন কোনও স্ক্র্যাপ এসেছে কিনা। না এলে আর আলাদা করে জানায় না।
বায়লজি স্যার শিশিরবাবু এখনও আসেনি। ছেলেপুলেরা সব এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। হাতের সামনে যে শিশি পাচ্ছে সেটা নিয়েই নাড়াচাড়া করছে। মাইক্রোস্কোপের উপরে ঝুঁকে পড়ে এটা সেটা স্লাইডে গুঁজে কীসব দেখার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যেই নহরকে দেখা যায়।
দেওয়ালে ঝুলন্ত কঙ্কালটার সামনে দাঁড়িয়ে এক মনে কী যেন দেখছিল বেদান্ত। খুঁটি তার পিঠে টোকা দেয়, ‘এ ভাই। কী দেখছিস বল তো?’
ব্যাদা তেমনই ভাবুক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে, ‘যে লোকটা বডি ডোনেট করেছে, তাকে দেখতে কেমন ছিল ভাবার চেষ্টা করছি।’
খুঁটি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে, ‘ভেবে দেখ, লোকটা যখন বেঁচে ছিল, কত লোক ওকে বলেছে ‘আমি তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি।’ এদিকে দেখ, আমরা ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি, কিন্তু কেমন দেখতে তাই জানি না।’
‘তাও তো চিনি, এদিকে বায়োলজিকালি নিজেকেই কখনও হাড়ে হাড়ে চিনতে পারব না।’
খুঁটি কিছুক্ষণ থম মেরে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে, ‘তোর এইসব কথা নিজে থেকে মাথায় আসে, নাকি কোনও গল্পের বই থেকে টুকে দিস?’
‘অন্যের কবিতা দিয়ে মেয়ে পটানোর ধান্দায় থাকা খোকা আবার টোকাটুকি নিয়ে জ্ঞান দিতে এসেছে!’ বেদান্ত নাক বেঁকায়। তারপর কঙ্কালের কাছ থেকে সরে এসে বলে, ‘ভালো কথা, আজ সাম্য কই?’
‘আসেনি, মণিও আসেনি। খচ্চরগুলো কী করছে কে জানে!’
এই কারণেই সকাল থেকে মাথা গরম হয়েছিল খুঁটির। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওরা স্কুলে আসবে কিনা আগমনীর ফোনে এসএমএস করে জানিয়ে দেয় সবাই। আজ সে নিজেই এসে পৌঁছায়নি। একজন মিসিং থাকলেই সারাদিন মন ব্যাজার হয়ে থাকে ওদের, সেখানে দুজন লাপাতা। অবশ্য খুঁটি লক্ষ করেছে, মণি বায়োলজি প্র্যাক্টিকাল করতে চায় না। সম্ভবত ব্যাঙ-ট্যাং কাটতে ভয় পায় ও।
ব্যাদাকে আগে তেমন ভালো লাগত না খুঁটির। কেমন যেন মিটমিটে বদমাস মনে হত ছেলেটাকে। মাঝে মাঝে চশমা নামিয়ে হেব্বি সেয়ানার মতো তাকায় চারদিকে। যেন দুনিয়ায় ওর থেকে জ্ঞানী কেউ নেই। তবে পরে খুঁটি বুঝতে পেরেছে ব্যাদা স্বভাবে একটু ক্যাটক্যাটে হলেও মানুষ খারাপ নয়। দিয়া সেনের ব্যাপারটা একেবারে চেপে গেছিল। এখন ওদের নিজেদের মধ্যে কেসটা জানাজানি হয়ে যেতে কখনও মুখ খোলে। সেসব গল্প শুনে খুঁটির মনে হয় মেয়েটা সত্যি একেবারে প্রাণ ঢেলে ভালোবাসত ছেলেটাকে।
ব্যাদার ছোট থেকে টিনটিনের বইয়ের শখ। দুটো বই ছিল ওর, তাও ইংরিজিতে। সেগুলোকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোদ্দবার করে পড়ত। দিয়া সেন জন্মদিনে দুটো পছন্দের বার্বি পুতুল পেয়েছিল, সেগুলো এক বান্ধবীর কাছে বেচে দিয়ে সেই টাকা দিয়ে টিনটিনের বই কিনেছিল বাবার সঙ্গে কলেজ স্ট্রিট গিয়ে। বাবা অবশ্য সেটা খেয়াল করেনি।
বাড়িতে প্রেম ধরা পড়ে যাওয়ার পর মেয়েটা যখন বাপ মা আর দাদার কাছে ক্যালানি খাচ্ছে, তখন একবার এসটিডি বুথ থেকে ফোন করে ব্যাদাকে বলেছিল, ‘চল ব্যাদা, আমরা পালিয়ে বিয়ে করে নিই।”
ব্যাদা খচে গিয়েছিল, ‘তোর মাথা খারাপ? আঠেরোর নিচে বিয়ে করলে পুলিশে ধরে।’
‘তাহলে কত লোকে বাল্যবিবাহ করে যে!’ অসহায় হয়ে বলেছিল দিয়া৷
‘ওটা ইলিগাল। বাল্যবিবাহ বলে কিছু হয় না।’ ব্যাদা ভেবে বলেছিল, ‘নেহাত বালের বিবাহ কথাটা বলতে খারাপ লাগে তাই মিষ্টি করে বাল্যবিবাহ বলে।’
দিয়া সেন গুজগুজ করে খানিকটা কেঁদে ফোন রেখে দিয়েছিল। তারপর বাড়ি ফিরে আবার মার খেয়েছিল।
ব্যাদার এখন মাঝে মাঝেই মনে পড়ে দিয়ার মুখটা। নরম মুখ, সরু খুঁতনি। ভুরুতে একটা বোকাবোকা অবোধ ভাব। অবোধ বলেই হয়তো ওর মতো আলুভর্তা ছেলেকে ভালোবেসেছিল।
শেষবার ওকে দেখেছিল, বাগুইয়াটির রিকশাস্ট্যান্ডে। ব্যাদা রিকশাতেই ছিল। দিয়া রিকশা থেকে নেমে মিষ্টি করে হেসে হাত নেড়েছিল, ‘পরের বেস্পতিবার আবার দেখা করব কিন্তু, ভুলে যাস না ব্যাদা৷’
একবার খুঁটি বাগুইয়াটির দোকানে ব্যাদাকে রোল খাওয়াতে নিয়ে গেছিল। তখন সেই রিকশাস্ট্যান্ডের কাছটায় তাকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিল ব্যাদা।’ টপটপ করে দু’ফোটা জল পড়ছিল ওর চোখ দিয়ে। অন্য কেউ দেখতে পায়নি কিন্তু সাম্য দেখে ফেলে খোঁচা দিয়েছিল খুঁটির হাতে, ‘ব্যাদা, কাঁদছে, এই ব্যাদা…
বেদান্ত মুহূর্তে জল মুছে নিয়ে বলেছিল, ‘কোথায় কাঁদছি শালা?’
খুঁটি ওর চোখ থেকে মোটা কাচের চশমাটা খুলে নিয়ে নিজের জামায় মুছতে মুছতে দেখেছিল ব্যাদার চোখটা আসলে যতটা দেখায় তার চেয়ে অনেক ছোট। চশমা না থাকলে ওর মুখে একটুও সেয়ানা ভাব নেই। বরং দিয়া সেনের মতোই একটা অবোধ নিরীহ ভাব আছে সেখানে।
‘আচ্ছা, কাঁদিস না ভাই।’ সাম্য পিঠে হাত রেখেছিল ওর, ‘তোর রোলটা ডবল এগ করে দেব।’
‘দিয়া সেনের দাদার ডবল এগ দিয়ে… যোগ করেছিল খুঁটি।
তবে ব্যাদা জানে দিয়া সেন যেখানেই থাক ওকে এখনও ভালোবাসে। মানুষ এমন দুম করে ভালোবাসা থেকে মুখ ফিরেয়ে নিতে পারে না। ভালোবাসা পরীক্ষায় চোতা করার মতো। প্রথম প্রথম ভয় লাগে, অস্বস্তি হয়। তারপর একবার চোতা করে পাশ করে গেলে আর না দেখে পরীক্ষা দেওয়াই যায় না৷
আপাতত দুজনে হাঁটতে হাঁটতে নহরের দিকে সরে আসে। গতদিনের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটেছে। প্রথমদিন ব্যাঙ কাটিয়েছেন শিশিরবাবু। তারপর ভিতরের সব মালমশলা তুলে এনে আলাদা করে দেখিয়েছেন৷ চিত হয়ে হাত পা বেঁধে শুয়ে থাকা ব্যাঙের পেট কে কাটবে সেটা নিয়ে একটা সোরগোল পড়েছিল। কেউই স্কালপেল হাতে নিতে রাজি নয়। শেষে নহরই এগিয়ে আসে। ব্যাঙের পেটে সবে চাকু চালাতে যাবে এমন সময় ক্লোরোফর্মে অজ্ঞান হয়ে থাকা ব্যাঙটা হঠাৎ করেই জেগে উঠে বেঁধে রাখা হাত-পা ছোড়ার চেষ্টা করে। সবাই মুখ দিয়ে আওয়াজ করে দু’পা পিছিয়ে যায়, এমনকী খোদ শিশিরবাবু ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। ঠিক এই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পাউরুটি কাটার মতো জেগে ওঠা ব্যাঙের গলার কাছে আঙুল চেপে ধরে পেটের উপরে ছুরি টেনে দেয় নহর।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছটফটানি থেমে যায়। তবে ল্যাবের মধ্যে একটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একটা জীবিত প্রাণীকে ছটফট করে মরতে দেখা সহজ কথা নয়। শিশিরবাবু খানিক বকাঝকা করে সবাইকে শান্ত করেন।
তবে তারপর থেকেই নহরকে নিয়ে বাকি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একটা গুঞ্জন ওঠে। তার চোখ দেখে মনে হয় সে নাকি জ্যান্ত মানুষের পেটেও অনায়াসে ছুরি চালিয়ে দিতে পারে। তবে ব্যাদা আর খুঁটি জানে নহরের চোখটা অমন ঘাপলা গোছের হলেও মনটা নরম। রাস্তার কুকুর আর বেড়ালকে সে খুব ভালোবাসে। মাঝে মাঝে নিজের গোটা টিফিনটা খাইয়ে দেয়।
এতক্ষণে ক্লাসে ঢুকছেন শিশিরবাবু। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়ের দল একেবারে মাঝের ডায়াসের আশেপাশে ভিড় করে আসে। আজ মনে হয় ব্যাঙের লম্বচ্ছেদ হবে না। তার বদলে আঙুল ফুটো করে রক্ত নিয়ে সেই রক্ত স্লাইডে তুলে মাইক্রোস্কোপের নিচে কিছু একটা দেখানোর কথা আছে৷
‘তুই ব্যাপারটা করলি কী করে বল তো?’ খুঁটি নহরের পাশে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করে।
‘কী করলাম?’ নহর মাইক্রোস্কোপের নলে চোখ লাগিয়েই বলে।
‘ওই যে নিখুঁতভাবে ব্যাঙটাকে কেটে দিলি?’
‘ব্যাঙই তো, মানুষ হলে আলাদা কথা ছিল।’
খুঁটি কাঁধ ঝাঁকায়, ‘কী জানি, আমার তোর মতো অত সাহস নেই।’
নহর মুখ তুলে হাসি মুখে ওর দিকে তাকায়, ‘আমি তোর থেকে বেশি ভিতু খুঁটি। আমার চেয়ে কম শক্তিশালী একটা প্রাণীকে মেরে ফেলতে সাহস লাগে না, ভিতু হতে হয়।’
ব্যাদার দিকে ঘোরে খুঁটি, ‘দিয়া সেনের দাদার পেটে তাহলে নহরই ছুরি চালাবে। তুই আর আমি হাত পা ধরে থাকব।’ কথাটা বলে নহরের দিকে তাকায় খুঁটি, ‘কী রে, তুই রাজি আছিস তো?’
নহর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই স্যারের উঁচু গলায় নিজের নামটা শুনতে পেয়ে থমকে যায়—
‘নহর জান্নাত, কী গল্প করছ ওখানে?’
ওরা যে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে সেটা চোখে পড়েছে স্যারের। মুখ জুড়ে বিরক্তির ছাপ পড়েছে তার।
‘এদিকে এসো তিনজন।’
তিনবন্ধু একে অপরের মুখের দিকে একবার দেখে নিয়ে পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে যায়।
শিশিরবাবু বয়স ষাটের কাছাকাছি। মুখের দিকে তাকালে সবার আগে চোখে পড়ে কাঁচা পাকা একটা মোটা গোঁফ। তার দু’প্রান্ত নীচের দিকে নেমে এসেছে। হাঁ মুখটা অস্বাভাবিক রকমের বড়। তার থেকেও বড় লোকটার হাতের পাঞ্জা। অমন হাতের একটা চড় খেলে ছেলেদের ব্রহ্মতালু অবধি গরম হয়ে যায়। তবে মেয়েদের গায়ে পারতপক্ষে হাত তোলেন না ভদ্রলোক।
বুকে খানিক ভয় নিয়েই স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরা। স্যার ইশারা করতে ডায়াসের উপর উঠে দাঁড়ায় তিনজনে। স্যারের ঠিক পাশে নহর, তার পাশে খুঁটি, তারপর বেদান্ত।
‘বেজায় সাহসী মেয়ে তুমি…’ কথাটা বলে নহরের কাঁধে হালকা চাপড় মারেন শিশিরবাবু। খুঁটির বুকের দুরুদুরু ভাবটা কমে আসে। মারধোর করবেন বলে মনে হচ্ছে না। উলটে প্রশংসাই করছেন।
‘তোমার টেস্টের রেজাল্টও তো খুব ভালো। আমি নিজে দেখেছি, এখানে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?’
নহর দু’দিকে মাথা নাড়ায়৷
‘কোনও সমস্যা হলে আমাকে বলবে। নতুন স্কুল জয়েন করেছ, এখন নানারকম সমস্যা…’
হঠাৎ খুঁটির মনে হল স্যারের কথার ফাঁকে কখন যেন নহরের বাঁ-হাতটা জড়িয়ে গেছে ওর হাতে। এবং সেই হাতের একটা নখ চেপে বসছে ওর হাতের তালুতে। খুঁটির হাতটা একরকম খামচে ধরেছে নহর। কিন্তু কেন? হল কী মেয়েটার? খুঁটি ঘাবড়ে যায়। মুখ তুলে নহরের দিকে তাকাতে প্রথমে ও কিছুই বুঝতে পারে না, তারপর স্পষ্ট হয় ব্যাপারটা।
শিশিরবাবুর অস্বাভাবিক বড় হাতটা একটা অশ্লীল ভঙ্গিতে খেলা করছে নহরের কাঁধ আর পিঠের আশেপাশে। কখনও হাত বুলানোর অছিলায় পৌঁছে যাচ্ছে ওর ইউনিফর্মের ভিতরে। শক্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে নহর। কেবল ওর নখটা আরও শক্ত করে গেঁথে আছে খুঁটির তালুতে। কম্পাস ফোঁটার মতো তীব্র যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল খুঁটি। তাও ওর হাতটা ছাড়ছে না নহর।
খানিক পরে নহরের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন শিশিরবাবু।
‘এসো, তোমাদের রক্ত দেখাই…’ কথাটা বলে দ্রুত তিনি ক্লাসের অন্য দিকে মাইক্রোস্কোপের কাছে সরে যেতেই ক্লাসের ভিড়টাও অনুসরণ করে তাকে।
নহর এখনও পাথরের মতোই দাঁড়িয়ে ছিল। খুঁটি চাপা গলায় বিড়বিড় করে উঠল, ‘শুয়োরের বাচ্চা শালা… হেডস্যারকে বলে ব্যবস্থা করছি আজই…’
বেদান্ত মুখ দিয়ে তাচ্ছিল্যের শব্দ করল একটা, ‘হেডস্যার জানে না নাকি? কোনও লাভ নেই।
‘তুই কী করে জানলি?’ ওর দিকে ফিরে তাকায় খুঁটি।
‘মণি বলছিল। ও এই জন্যই বায়োলজি ল্যাবে আসে না।’
‘আর তুই সেটা এতদিন আমাকে জানাসনি?’
‘কী হতো জানালে? আজ জানলি। কী করবি তুই? স্যারকে গিয়ে মারবি?’
‘আমি না হোক সাম্য কিছু করতে পারত।
‘সাম্য? কেন ও শক্তিমানের নাতি? ও এই স্কুলের স্টুডেন্ট নয়? ওর ফেল করার ভয় নেই? ও বললেই সবাই বিশ্বাস করে নেবে?’
খুঁটির মাথাটা হুট করেই গরম হয়ে যায়। বেদান্তর দিকে তেড়ে যায় সে, ‘সবাই তোর মতো ন্যালাখাপা নয় ব্যাদা। যা হচ্ছে সব চুপচাপ মেনে নেব?’
‘যা না, কী করবি কর গিয়ে…’ আঙুল তুলে স্যারের দিকে দেখায় ব্যাদা, ‘বড় চোপা চালাচ্ছিলি না? একে মেরে দেব, ওকে মেরে দেব…যা মেরে আয়…’
খুঁটির মাথার আগুনটা আরও কয়েক পরত বেড়ে ওঠে। দ্রুত পা ফেলে এগোতে যাচ্ছিল সে। কাঁধে একটা হাতের স্পর্শে থেমে যায়।
‘হাতটা দে…’ নহর একটা হাত বাড়িয়ে আছে ওর দিকে। ওর কোঁকড়া চুল সামনে এসে মুখের অনেকটা ঢেকে রেখেছে। চোখ দুটো ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না। তাও গলার স্বরে এমন কিছু আছে যেটা খুঁটি অমান্য করতে পারল না। বাধ্য ছেলের মতো নখ লেগে কেটে যাওয়া হাতটা বাড়িয়ে দিল ওর দিকে।
হাতটা বেসিনের উপরে রেখে রক্তলাগা জায়গাটা ধুয়ে দেয় নহর। তারপর ইউনিফর্মের পকেট থেকে বের করে এক চিমটে বোরোলিন লাগাতে থাকে ওখানে।
‘তুইও কিছু করবি না?’ অবাক হয়ে মেয়েটার শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করে খুঁটি।
‘যদি করতে পারতাম তাহলে তোর হাতে নখ বসে যেত না।’ হেসে ওর দিকে চায় নহর, ‘তোর খুব ব্যথা লাগেনি তো?’
হাতটা টেনে সরিয়ে নেয় খুঁটি, ‘কিন্তু ওই লোকটার কিছু হবে না?’
‘ইলেভেনে আর আটখানা বায়োলজি প্র্যাকটিক্যাল আছে। ওটুকু আমি সহ্য করে নেব।’
‘কাপুরুষের দল সব। সাম্যটা থাকলে কিছু একটা বুদ্ধি বের করে…’ গজগজ করতে করতে টেবিলের উপর চাপড় মারে খুঁটি।
বেদান্ত ওর পেছনে এসে দাঁড়ায়, ‘মাথা গরম করিস না ভাই, আমরা আজই শেষ স্কুলে আসিনি। স্কুল ছাড়ার আগে ও শালার একটা ব্যাবস্থা করে যাব। এদিকে আয়।’
হুট করেই খুঁটির কাঁধে হাত রাখে ব্যাদা। সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা অনুভব করে একটু ঘাবড়ে যায়। দু’বার চাপড় মেরে বলে, ‘এই ভাই, তুই এই কুকুর মরা গরমে জামার ভেতর জামা পরেছিস কেন?’
খুঁটির মুখের ভাব পালটে যায়, নিরুৎসাহ গলায় বলে, ‘কারণ আজ স্কুলের পরে একটা জায়গায় যেতে হবে। সেখানে ইউনিফর্ম পরে যাওয়া যাবে না।’
‘কোথায় যাবি?’
‘প্রপোজ করতে।’
‘কাকে?’
কটমট চোখে ব্যাদার দিকে তাকায় খুঁটি, ‘মৌসুমিকে।’
ব্যাদা ব্যাপারটা বুঝতে পারে না, সে কিছু বলার আগেই নহর বলে, ‘কিন্তু সে তো তোর কোচিংয়ে পড়ে।
এতক্ষণে প্রথম খুঁটির মুখে হাসি ফোটে, ‘মণি বলেছে, মেয়েদের প্রপোজ করতে হলে সব থেকে বড় এলিমেন্ট হল সারপ্রাইজ। মেয়েরা সারাক্ষণ একটা অহঙ্কার অহঙ্কার মুখোশ পরে থাকে বুঝলি, দুম করে ক্যালানের মতো প্রপোজ করলে না-ই বলে দেবে। সারপ্রাইজ ঠিকঠাক দিতে পারলে ঘাবড়ে গিয়ে মুখোশটা খুলে ফেলে। তখন হ্যাঁ বলে দেওয়ার চান্স বেশি।’
ব্যাদা বিড়বিড় করে, ‘দেখিস, ওর মুখোশ খোলার বদলে তোরই কিছু খুলে টুলে না যায়…’
খুঁটি বুকে হাত ঠোকে, ‘আরে, কোচিংয়ে প্রপোজ করার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই। করতে হলে ওদের স্কুলে ওর মায়ের সামনে একেবারে বুক চিতিয়ে প্রপোজ করব।’
‘স্কুলের সামনে!’ নহর আঁতকে ওঠে।
‘বৃহস্পতিবার করে ওর মা ওকে স্কুল থেকে আনতে যায়। বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। বেরোলেই একেবারে নিলডাউন হয়ে…’ মিটিমিটি হাসে খুঁটি।
‘তোর ভয় করছে না?’ নহর অবাক গলায় জিগ্যেস করে।
‘ভয় কী জিনিস ঋতবান সেন জানে না।’
বেদান্তর গলা গম্ভীর শোনায়, ‘সেই সঙ্গে মেয়ের মায়ের হাতে ক্যালানি কাকে বলে তাও জানে না।’
কথাটা গায়ে মাখে না খুঁটি, নহরের দিকে ফিরে বলে, ‘তুই সাইকেল চালাতে পারিস?’
‘উঁহু।’
‘ঠিক আছে৷ দশটাকা আছে?’
‘তা আছে৷’
‘গ্রেট! ছুটি হলে এখানে না দাঁড়িয়ে অনাদির দোকানের সামনে দাঁড়াবি।’ স্কুলের থেকে খানিকটা দূরে একটা সাইকেলের দোকান আছে অনাদির। বাচ্চা ছেলেদের সাইকেল ভাড়া দেয়। ঘণ্টায় দশ টাকা। তবে কিছু একটা আইডেন্টিফিকেশন রেখে যেতে হয় তার কাছে। খুঁটির অবশ্য সেসব কিছু লাগে না। ওর সঙ্গে অনাদির মোটামুটি একটা দোস্তি হয়ে গেছে।
স্কুল ছুটি হতে আর দাঁড়াল না নহর। ব্যাদার সঙ্গে একরকম দৌড়ে অনাদির দোকানের সামনে পৌঁছতেই দুটো সাইকেলের একটার উপরে খুঁটিকে দেখা গেল। গায়ের ইউনিফর্মটা খুলে ব্যাগে ঢুকিয়েছে। চুলেও মনে হল জলটল দিয়ে কিছু কায়দা করেছে।
সাইকেলের সামনে পৌঁছেতেই অন্য সাইকেলটার দিকে ইশারা করল খুঁটি, ‘তুই নহরকে নিয়ে ওটায় ওঠ।’
ব্যাদা অপরাধী গলায় মাথা নিচু করল, ‘আমি ডাবল ক্যারি করতে পারি না, তুই নে।’
‘তুই নে…’ ভেংচি কাটে খুঁটি, ‘একটা মেয়েকে প্রপোজ করতে যাব আরেকটা মেয়েকে সাইকেলের পেছনে নিয়ে। কী ভাববে বল তো?’
ব্যাদা আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল সাইকেলে। পেছনের ক্যারিয়ারে বসল নহর। দুটো হাত রাখল ব্যাদার কাঁধে। তারপর দুজনেই সজোরে সাইকেল ছুটিয়ে দিল। ওদের ছুটি মানে মৌসুমিদের ছুটি হয়েছে গেছে এতক্ষণে।
মৌসুমিদের স্কুলটাও সল্টলেকেই। সাইকেল চালিয়ে সেখানে পৌঁছতে ওদের মিনিট পনেরোর বেশি লাগল না। এর মধ্যে উত্তাল হাওয়ার ঝাপটা লেগে খুঁটির চুল ঘেঁটে গেছে। তবে সেদিকে বিশেষ নজর নেই ওর। বুকের ভিতর একটা চাপা ধুকপুকুনি শুরু হয়েছে। কাজটা কাঁচা হচ্ছে কি? সাম্যর কথায় চোখ বন্ধ করে ভরসা করে যে সবসময় লাভ হয়েছে তাও নয়।
নহর একবার পাশের সাইকেল থেকেই গলা তুলে বলে, ‘তোর স্ট্র্যাটেজিতে ভুল হচ্ছে ভাই, মেয়েরা ছেলেদের ট্যালেন্ট দেখলে গলে যায়। তোর কী কী অ্যাচিভমেন্ট আছে একটু বল তো?’
খুঁটি খানিক ভেবে বলে, ‘লাস্ট ইয়ার ওয়ার্ল্ড কাপে ইতালিকে সাপোর্ট করেছিলাম আর ইতালিই চাম্পিয়ান হয়েছিল।’
নহর কপাল চাপড়ায়, ‘ধ্যাত্তেরি! ওটা তোর অ্যাচিভমেন্ট কই হল? বড়জোর লাক বলা যায়!’
‘লাকের জোরে ইতালি ওয়ার্ল্ড কাপ জিতে গেল আর মৌসুমির মন গলবে না?’
ব্যাদা চুপ করে সাইকেল চালাচ্ছিল। একবার ঘন্টি বাজিয়ে বলে, ‘গলতেই পারে। তবে মৌসুমিকে আনলাকি বলতে হয় তাহলে।’
স্কুলের সামনে পৌঁছে সাইকেল থেকে নেমে এল ওরা তিনজন। বেশ খানিকক্ষণ আগে ছুটি হয়েছে। একটা বড় ভিড় বেরিয়ে গেছে স্কুল চত্বর ছেড়ে। কিছু গাড়ি দাঁড় করানো আছে স্কুলের আশেপাশে। অল্পবয়সি ইউনিফর্ম পরা কয়েকটা মেয়েকে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেল। ওদের দিকে তারা ঘুরেও তাকাল না।
‘ও এতক্ষণে বেরিয়ে গেছে, চল ভাই ফিরে যাই।’ ব্যাদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
‘ফিরে যাব! এই তো এলাম।’ খুঁটি অবাক হয়ে বলে।
—তুই এত উসখুস করছিস কেন বল তো?’ নহর প্রশ্ন করে। এতক্ষণ সে খেয়াল করেছে সাইকেল চালাতে চালাতেও মাঝেমাঝে অস্থির হয়ে পড়ছিল ব্যাদা৷ বারবার টলে যাচ্ছিল। কৌতূহলে প্রশ্নটা সে করেই ফেলে।
আমতা আমতা করে ব্যাদা, ‘মা…মানে গার্লস স্কুলের সামনে আমাদের স্কুলের ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে থাকা কি ঠিক হচ্ছে? হাজার হোক স্কুলের একটা প্রেস্টিজ আছে।’
‘অত ভয় পেলে তোর শুধু স্কুলই থাকবে, বউদি থাকবে না।’ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আবার সামনে তাকায় খুঁটি।
ব্যাদার মুখ কাঁচুমাচু দেখায়। অনেকক্ষণ থেকে একটা কথা বলার চেষ্টা করেও পারেনি সে। এতক্ষণে বলেই ফেলে, ‘আসলে…আমার…ইয়ে…হিসি পেয়েছে…. দু’পায়ের মাঝখানটা খপ করে ধরে ফেলে নহরের দিক থেকে মুখ ফেরায়, ‘অনেকক্ষণ থেকে পেয়েছে, এখন…
মাথা চাপড়ায় খুঁটি, একটা ঝোপের দিকে আঙুল দেখিয়ে দেয়, ‘এখানেই পেতে হল! আচ্ছা ঠিক আছে, ওখানে কর।’
ব্যাদা বিরক্ত হয়, ‘মেয়েদের স্কুলের সামনে হিসি করব! তোর একটা আক্কেল নেই?’
‘তো মেয়েরা কি জানে না তুই হিসি করিস?’
‘আমি জানি অন্তত।’ নহর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলে৷
‘তাই বলে করতে তো দেখিসনি।’
খুঁটি ওর পিঠে একটা চাপড় মারে, ‘অপদার্থ! তুই কি কখক নেচে নেচে হিসি করিস নাকি? কেউ দেখার জন্য চোখ মেলে বসে নেই, তুই করে দে।’
ব্যাদা কিছু একটা প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, তার আগেই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই ওই, বেরিয়েছে…’
‘সেকী এর মধ্যেই বেরিয়ে গেল। প্যান্টেই…’
ব্যাদা বিরক্ত হয়, ‘আহ্, হিসি না, মৌসুমি বেরিয়েছে। স্কুলের গেট থেকে৷ দেখ না শালা।’
খুঁটি আর নহর চেয়ে দেখে সত্যি স্কুলের বড় দরজা দিয়ে মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে মৌসুমি। সারা মুখে ক্লান্তির ছাপ। ধীরে ধীরে হেঁটে রাস্তার মোড়ের দিকে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে কীসব বলছে মায়ের দিকে চেয়ে। ‘গোলাপটা দে…’ ব্যাদার দিকে চেয়ে বলে খুঁটি৷
ব্যাদা এক হাতে কুঁচকি চেপে ধরেই অন্য হাতে গোলাপ এগিয়ে দেয় খুঁটির দিকে। খুঁটি গোলাপটা প্যান্টের পেছনে গুঁজে ভারিক্কি চালে এগিয়ে যায় মোড়ের দিকে। বাকি দুজনেও গলি থেকে বেরিয়ে ওকে দুরুদুরু পায়ে অনুসরণ করে।
মায়ের সঙ্গে বেশ খানিকটা হেঁটে এসেছিল মৌসুমি। আচমকা মাঝরাস্তার গলির ফাঁক থেকে লাল জামা পরে খুঁটিকে এগিয়ে আসতে দেখে সে কিছুটা অবাকই হয়। সামনে এসে পড়তে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘তুই…এখানে। তোর স্কুল তো…’
‘আমার তোকে কিছু দেওয়ার আছে মৌ…’ কথাটা বলে মৌসুমির মায়ের দিক থেকে একবার চোখ ফিরিয়ে নেয় খুঁটি। তারপর ধপ করেই দুটো হাঁটু মাটিতে রেখে নিলডাউন হয়ে বসে পড়ে। পিচের রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে হাঁটু ছড়ে যায়। খুঁটি ব্যথায় চেঁচাতে গিয়েও সামলে নেয় নিজেকে। চোখ বুজে হেসে পেছনের পকেট থেকে বের করে আনা গোলাপটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে।
সামনে থেকে কোনও সাড়া শব্দ আসে না। খুঁটির কানের পাশ দিয়ে হাওয়া বইতে থাকে। মেয়েদের হেঁটে যাওয়ার শব্দ হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আবার সচল হয়। ব্যাপার কী? সামনে আওয়াজ নেই, হওয়ার কথাও নয়। মৌসুমির এতক্ষণে সারপ্রাইজের চোটে বাক্যিহারা হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু ওর পেছন দাঁড়িয়ে থাকা দুই বন্ধুও চুপ কেন?
ধীরে ধীরে চোখ খোলে খুঁটি। মৌসুমির হতবাক হয়ে যাওয়া মুখটা চোখে পড়ে ওর। ওর মায়ের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটাও। তবে যেটা দেখতে পেয়ে ও আঁতকে ওঠে সেটা হল একটা পেনসিল।
ওর নিজের হাতে গোলাপের বদলে ধরা আছে একটা পেনসিল। মৌসুমির নাকের ডগায় দোল খাচ্ছে সেটা। ওহ্, ব্যাদা হারামি শালা ওকে ঝোঁকের মাথায় গোলাপের বদলে পেনসিল ধরিয়ে দিয়েছে। গোলাপটা ওর হাতেই রয়ে গেছে।
‘তু…তুই আমাকে পেনসিল দিচ্ছিস কেন?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করে মৌসুমি।
খুঁটি ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে, ‘পে…পেনসিল…না তো৷ ইয়ে আসলে ওইটা দিতে গিয়েছিলাম…’
পেছন ফিরে ব্যাদার হাতে ধরা গোলাপের দিকে ইশারা করতে যায় খুঁটি। সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হয় ব্যাদা আপাতত গোলাপ নয়, নিজের কুঁচকিটা খামচে ধরে আছে। ঢোঁক গেলে সে। ব্যাদার দিকে কটমট করে তাকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার আগেই মাথার চুলে টান পড়ে।
‘কুঁচকি দেবে ভেবেছিলে, তাই তো?’ মহিলা চুল টেনে সোজা হয়ে দাঁড় করিয়ে দেন ওকে, ‘তোমার লজ্জা করে না স্কুলের মধ্যে আমার মেয়েকে এইভাবে অপদস্থ করতে? দাঁড়াও, তোমার…’
হঠাৎ ব্যাদার ব্যাগ থেকে কী একটা তুলে নিয়ে দৌড়ে এসে সেটা মৌসুমির হাতে ধরিয়ে দেয় নহর। তারপর খুঁটির জামার কলার খামচে ধরে টান দেয় সজোরে, বাতাসে ভেসে আসা ওর থমথমে স্বর শোনা যায়, ‘ভাই পালা, কেলিয়ে ঠ্যাং ভেঙে দিলে সারাজীবন নিলডাউন হয়েই থাকতে হবে।’
আর কোনওদিকে তাকায় না খুঁটি। মাটি থেকে উঠে পড়ে তিনজনেই দৌড়াতে শুরু করে গলির ভিতর দাঁড় করিয়ে রাখা সাইকেল দুটোর দিকে। গোটা ঘটনাটা এতই দ্রুত ঘটে যায়, যে মৌসুমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনজন নিমেষে কোথায় যেন উবে যায়।
সে মায়ের হাত ধরে কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। চিৎকার করে কীসব অভিসম্পাত করে চলেছেন মহিলা। তার মাঝেই সেই পরিচিত হাসিটা খেলে যায় মৌসুমির মুখে। হাতের গোলাপটা দ্রুত ইউনিফর্মের পকেটে লুকিয়ে রাখে সে।
খানিকটা দূর এসে মাটিতে পা রেখে সাইকেল থামায় ওরা। ব্যাদা একরকম লাফাতে লাফাতে রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। খুঁটি সাইকেলটা একদিকের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রেখে দৌড়ে এসে ওর পিঠে একটা ধাক্কা মারে, ‘ছোটলোক শালা, শুয়োর! গোলাপের বদলে পেনসিল ধরিয়ে দিলি হাতে! জানোয়ার! আমার বুক ভরা ভালোবাসা প্রকাশ হতে পারল না…’
ব্যাদা আরামের হাসি হাসতে হাসতেও খেঁকিয়ে ওঠে, ‘আর আমার পেটভরা হিসি প্রকাশ হয়ে গেলে ভালো হত? এত হিসি পেয়েছিল মাথার ঠিক ছিল না।’ ব্যাদা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে।
‘তোর শালা মাথাতেও ওই হিসিই আছে। সারাক্ষণ ভুল দেখে চলেছিস। এবার কী হবে?’ খুঁটির গলা প্রায় আর্তনাদের মতো শোনায়।
নহর জামার হাতায় ঘাম মোছে, ‘কী আর হবে, আমাদের গায়ে স্কুলড্রেস ছিল, ওর মা এসে স্কুলে রিপোর্ট করলে তিনজনকেই টিসি দিয়ে দেবে।’
ব্যাদার হিসি করা শেষ হয়েছিল। মুখে একটা প্রশান্তির হাসি খেলে তার, ‘এই, একটু জল দে তো, হাত ধুই।’
নহর ব্যাগের ভিতর থেকে জল এনে ওর হাতে ঢেলে দেয়। ধোয়া হাতটা নিজের প্যান্টেই মুছে ফেলে। তারপর একগাল হেসে বলে, ‘তোর অত ভয়ের কী আছে, শিশিরবাবুর আটটা বায়োলজি প্র্যাক্টিকাল করতে হবে না৷’
খুঁটির মাথার দপদপানিটা এতক্ষণে একটু কমেছে। হাজার হোক গোলাপটা দেওয়া তো হয়েছে মৌসুমিকে। পরের দিন কোচিংয়ে গিয়ে যা হওয়ার হবে। মনটা শান্তই লাগে ওর।
‘চ, বাড়ি যাই আজ।’ নহরের বোতলের জলে মুখ ধুতে ধুতে কথাটা বলে সাইকেলের কাছে ফিরে আসতে যাচ্ছিল খুঁটি। হঠাৎ কী একটা চোখে পড়ায় ওর মুখে নতুন রং এসে লাগে।
ব্যাদার কাছে সরে এসে চাপা গলায় বলে, ‘এ ভাই, ওই গাড়িটা চেনা চেনা লাগছে না?’
ব্যাদার আগে নহর সেদিকে মুখ তুলে তাকায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে, ‘শিশির হারামজাদাটার গাড়ি। ওকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় রোজ। ‘আজ এখানে দাঁড় করানো আছে কেন?’ খুঁটি ভাবুক গলায় কথাটা বলে সতর্কভাবে এগিয়ে যায় সেদিকে।
রাস্তাটা মোটামুটি ফাঁকা। স্কুলের দিকে পার্কিং করার জায়গা না পেয়ে এখানেই পার্ক করে গেছে ড্রাইভার। তাকে কাছে পিঠে কোথাও দেখা গেল না। অন্য কোনও লোকও নেই। বেবাক ফাঁকা রাস্তা। সেটা লক্ষ করে খানিকদূর দৌড়ে এসে সাইডগ্লাসে একটা সজোরে লাথি মারল খুঁটি। লাথির ধাক্কায় সেটা খুলে ছিটকে পড়ল একটু দূরে। খুঁটির মুখে একটা বিজয়ীর হাসি খেলে গেল।
এই খুঁটি, গাড়িটা ভাঙছিস কেন? কেউ দেখলে…’ কথাটা বলেই ব্যাদার পিঠে টোকা দেয় নহর, ‘থামা ওকে, এমনিতেই কেস খেয়ে আছি গলা অবধি।’
ব্যাদা কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে একটা ভালো সাইজের আধলা ইট তুলে নিয়ে বসিয়ে দেয় গাড়ির কাচের উপর। মুহূর্তে সেটা ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গাড়ির ভিতর। সজোরে হর্ন বেজে ওঠে। কিন্তু ছেলেদুটো পাত্তা দেয় না তাতে৷
নহর এবার নিজে ছুটে এসে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বুঝতে পারে ব্যাপারটা ওর হাতের বাইরে। খুঁটি অন্য দিকের কাচটাও ভেঙে ফেলেছে এতক্ষণে। বনেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তা থেকে একটা ইটের টুকরো তুলে নেয় হাতে। তারপর ব্যাদার দিকে চেয়ে উঁচু গলায় বলে, ‘ভাই, শুয়োরের বাচ্চা লিখে দেব?’
‘ধুর, বাংলা গায়ে লাগবে না। ইংরেজি দে।’
খুঁটি কয়েক পলক চুপ করে থেকে কী যেন ভাবে। তারপর আবার গলা তুলে বলে, ‘বাস্টার্ড বানান কী হয় রে?
‘বাস তো জানিস, তারপর টার্ড লিখে দে।
খুঁটি যতক্ষণে লেখে তার মধ্যে ইটের আঘাতে গাড়ির বেশ কয়েক জায়গা তুবড়ে দিয়েছে ব্যাদা। ভিতরের একটা কাচও অবশিষ্ট নেই আর।
লেখা শেষ’ করে একটু দূরে সরে আসে ওরা। ব্যাদা নহরের দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করে।
এতক্ষণে হাসি ফোটে নহরের মুখে। সে ছুটে এসে এক লাফ মেরে উঠে পড়ে ভুল বানানে বাস্টার্ড লেখা ভাঙা বনেটের উপর। সেখান থেকে আর একটা লাফে গাড়ির মাথায়। হাত দুটোকে আকাশের দিকে ছুড়ে গলা ফেড়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘শুয়োরের বাচ্চা শিশির, বলেছিলি না সমস্যা হলে তোকে বলতে? শালা তুই আমার সমস্যা! তোদের মতো সবাই আমাদের সমস্যা…’
ওর দুই বন্ধুও এতক্ষণে উঠে এসেছে গাড়ির মাথায়। হর্নের আওয়াজ সপ্তমে পৌঁছেছে। কিন্তু সে আওয়াজ ছাপিয়ে গেছে ওদের চিৎকার। হাসতে হাসতে নহরকে জড়িয়ে ধরে ওরা দুজন। মেয়েটারও দুটো হাত ঘিরে ধরে ওদেরকে।
বিকেলের রোদ মরে আসে চারদিকে। কেবল ঝুঁকে পড়া গাছের ফাঁক গলে ওদের উপর খানিকটা রোদ খেলা করে যায়। নহর খুঁটি আর ব্যাদার কাঁধের উপর মুখ রেখে ফিসফিস করে বলে, ‘তোদের ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছা করবে না আমার…’
ব্যাদা একটু অবাক হয়, ‘যাবিই বা কেন?’
নহরের শরীর এতক্ষণে হুড়োহুড়িতে ঝিমিয়ে আসছিল। মাথাটা চেপে ধরে গাড়ির ছাদেই বসে পড়ে ও। দম নিয়ে শান্ত গলায় বলে, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচব না ভাই।’
