তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৯
নবম অধ্যায়
গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছিল আগমনী। সন্ধেবেলা ওর ফ্ল্যাটের ঠিক বাইরে একটা হলদে আলো জ্বলে। কাচের জানলা দিয়ে বিছানার উপর এসে পড়ে সেটা। এখন চোখ খুলতেই আলোটাকে বড় বেশি উজ্জ্বল মনে হল। মাঝেমাঝে অফিসে থাকতে আগমনীর মনে পড়ে আলোটার কথা। হয়তো ওর ফাঁকা ফ্ল্যাটের বিছানায় এসে শুয়ে আছে আলোটা। ওর বালিশের উপর মাথা রেখে ভাবছে কখন ও ফিরবে। কখন দরজা খোলার আওয়াজ শুনতে পাবে।
মাঝে মাঝে এসব ভাবনায় নিজেই হেসে ফেলে ও। তাও বাড়ি ফিরে বিছানার চাদরে পড়ে থাকা আলোটার উপর হাত বুলিয়ে দেয়। কোনওদিন ক্লান্ত শরীরে জামাকাপড় না খুলেই সটান শুয়ে পড়লে আলোটাও ওর বুকের উপরে ঘুমিয়ে পড়ে। কখনও মনে হয় আলোটাই হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওর মাথায়।
আজ হাত বাড়িয়ে সেটাকে ধরার চেষ্টা করল আগমনী, কিন্তু তার আগেই ওর আঙুল ছুঁয়ে মিলিয়ে গেল আলোটা। ঘরে অন্য লোক আছে বুঝেই যেন জানলা গলে পালিয়ে গেল।
আশেপাশে তাকিয়ে বিছানার উপর ধড়ফড় করে উঠে বসতে যেতেই একটা হাত ওর মাথার উপর দিয়ে থামিয়ে দিল কেউ। স্পর্শটা চেনা লাগল আগমনীর।
‘শুয়ে থাক, উঠিস না এখন! অপরাজিতার গলা।
‘কী…কী হয়েছে আমার?’ চোখে ঝাপসা দেখে আগমনী। শম্পা বসে আছে ওর একপাশে। আর কেউ নেই ঘরে। মাথার ভিতরে একটা তীব্র ঝিমঝিমে ব্যথা। বুকে হাত রেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। ক’টা বাজে এখন?’
‘ডাক্তারবাবু তোমাকে উঠতে বারণ করেছে।’ শম্পার গলা শোনা যায়।
‘কৌশিক? ও কোথায় গেল?’
‘কাল থেকে সারাদিন এখানেই পড়েছিল। আজ আমি বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। সন্ধেবেলা আবার আসবে।’ অপরাজিতা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে, ‘গাড়িতে আসতে আসতে আবার তোর নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। এখন কোনও চাপ নেই৷ জাস্ট রেস্ট নে কয়েকটা দিন।’
‘তোমার শরীর এখন কেমন লাগছে দিদি?’ শম্পার হাতের স্পর্শে জলের ছোঁয়া লাগে ওর কপালে। ঘুম ভাঙার পর আচমকা ধড়ফড়ানিটা কমে এসেছে এতক্ষণে।
মাথার চুল খামচে ধরে আবার ছেড়ে দেয় আগমনী, ‘ঠিক আছি এখন নর্থ বেঙ্গল যাবার কথা ছিল…’ মাথার ভিতর সমস্তটা সাজিয়ে নিতে সময় লাগে ওর, ‘কৌশিককে একটা ফোন করতে হবে, আমার ফোন…
‘আপাতত তোর শুধু রেস্ট নেওয়ার কথা। আমি অফিসে বলে দিয়েছি, ম্যানেজ হয়ে যাবে।’
বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করে আগমনী। পরক্ষণেই গা গুলিয়ে ওঠে। গলার ভিতর থেকে বমি উঠে আসে। কপালটা চেপে ধরে বিছানাতেই বসে পড়ে আবার, ‘আমার মাথাটা…’
এগিয়ে এসে ওকে ধরে নেয় শম্পা। অপরাজিতার মুখ লাল হয়ে ওঠে। পাশে বসে বলে, ‘তুই এগুলো কী পাগলামি শুরু করেছিস বল তো?’
‘পাগলামি?’ মাথাটা চেপে ধরে বিড়বিড় করে আগমনী।
‘নয়? আজ তিনদিন হল অফিসকাছারি ফেলে, খাওয়া ঘুম ফেলে সারাক্ষণ একটা ছবির পেছনে লেগে রয়েছিস। কী, ছোটবেলার হারানো বন্ধুদের খুঁজে বের করতে হবে। আদৌ তারা এ দেশে আছে কিনা জানিস না, সত্যি বন্ধুত্ব ছিল কিনা জানিস না, থাকলেও তোকে মনে রেখেছে কিনা জানিস না…’
‘তোর কীসের এত সমস্যা হচ্ছে?’ মাথার ব্যথাটা বেড়ে উঠেছে আগমনীর। কপাল চেপে ধরেই সে বলে।
‘আর কার সমস্যা হচ্ছে ভাই?’ অপরাজিতার গলা নরম হয়ে আসে, ‘তোর সমস্যায় আমি ছাড়া আর কার যায় আসে?’
‘দরকার নেই কারো।’ কপালে হাত বোলাতে বোলাতেই বলে আগমনী, ‘আমার লাগবে না কাউকে।’
‘এই চারজনের সঙ্গে যদি তোর প্রাণের বন্ধুত্বও থাকত না, তাহলে আজ এই ফ্রাস্ট্রেটেড ইগোইস্টিক মানুষটাকে দেখলে হতাশ হত তারা।’ ওর মাথায় হাত রাখে অপরাজিতা, নরম গলায় বলে, ‘তুই একটা ক্রাইসিসে ভুগছিস। তোর বর্তমান অবস্থাটাকে মেনে নিতে পারছিস না৷ আমি জানি, মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয়। কিন্তু তুই নিজের মধ্যে নেই মণি।’
‘কতদিন?’ টেবিলের পাশে পড়ে থাকা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।
‘কতদিন মানে?’
‘কতদিন আমি নিজের মধ্যে নেই? একমাস? দু’মাস? পাঁচ বছর?’ উঠে দাঁড়ায় আগমনী, ‘আজ পনেরো বছর হয়ে গেল আমি বদলে গেছি। ঠিক আছে। তাতেও চাপ নেই, কিন্তু আমি জানি, এই বদলে যাওয়া মানুষটা আমি নই অপু এই স্বার্থপর, হতাশ, জীবনের সব ক্ষেত্রে হেরে গিয়ে শুধু পয়সার পেছনে ছুটে বেড়ানো মানুষটা আমি নই।’
‘ওটা আমাদের বড় হওয়ার একটা পার্ট মণি…’ অপরাজিতার গলা মৃদু হয়ে আসে, ‘আমাদের হাসিখুশি রোদ ঝলমলে দিন, দুর্গাপুজোয় ক্যাপ ফাটানোর দিন, নতুন গল্পের বই আর বোকা বোকা প্রেমের দিন হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কে যেন পয়সা, ‘কর্পোরেট ল্যাডার আর ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডের দিন হাতে ধরিয়ে দেয়। আমাদের স্বার্থপর হওয়া ছাড়া, হেরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না… কী করবি বল?’
‘জঙ্গলে চলে যাব শালা… সজোরে ঝাড়া মেরে বিছানা থেকে উঠে পড়ে আগমনী, ‘আমার কেউ নেই, আমি জঙ্গলে চলে যাব…
অপু হাসে, ‘বাঙালি ওসব ভাবে মাঝে মাঝে। জঙ্গলে চলে যাব, পাহাড়ে বাড়ি বানাব, বরফের দেশে ইগলু বানিয়ে থাকব। পারে না, তার কারণ এই কনসেপ্টে একটা গোলমাল আছে৷ বাঙালি ভাবে সংসার ছেড়ে দিলে হয়তো শান্তি পাওয়া যাবে, বাট ফ্যাক্ট ইজ, সেই লেভেলের শান্তি মনে না থাকলে সংসার ছাড়া যায় না।’
‘আমার ছাড়বার মতো সংসার কই?’
অপুর হাসিটা এবার আরও চওড়া হয়, ‘জ্ঞান ফেরার পর সবার আগে কার খোঁজ করেছিলি মনে আছে?’
ঠোঁট ওলটায় আগমনী, ‘ওর প্রতি আমার আর কোনও ফিলিংস নেই। জাস্ট এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াতে হয়…তাছাড়া…’
‘কী?’
আগমনী হাসে, ‘ছেলেটা অত বোঝে ফোঝে না। একটু ক্যাবলা টাইপের। তাই মেজাজ গরম থাকলে ওর ওপর বের করা যায়। সেটা মন্দ লাগে না…’
‘বি কেয়ারফুল মাই লেডি…’ ভুরু কুঁচকে বলে অপু, ‘যে কোনও সময় বিপদ ঘটতে পারে।’
‘কীসের বিপদ?’
অপু পকেট থেকে বের করে একটা সিগারেট ধরায়, ‘এই ধর, কুড়ির পর থেকে মেয়েদের আর হাইট বাড়ে না, রাগ বাড়ে। চতুর্দিকের সব কিছুতে হতাশ হয়, নয়তো রেগে যায়। এই জমা হওয়া রাগ মেয়েরা হাতের কাছে যাকে পায় র্যান্ডম বের করতে থাকে। একটু একটু করে সেই র্যান্ডম কেউ পার্টিকুলার কেউ হয়ে যায়। তারপর দিনের পর দিন সেই নিরস্ত্র ইন্দ্রজিৎকে বাণ মারতে মারতে অজান্তেই কখন বিভীষণের মনে সহানুভূতি জন্মায়। আর সেটাই তার কাল হয়…’ সিগারেটে আর একটা বড় টান দেয় অপু, ‘কুড়ি বাইশ পেরিয়ে যাওয়া মেয়েদের পটানো খুব সহজ। বুদ্ধি করে তার গোপন রাগের জায়গাটা খুঁচিয়ে দিয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে বসে থাকো। এ জিনিস রোজ সকাল বিকেলে করতে পারলেই কেল্লা ফতে!’
আগমনী কী যেন ভাবে। তারপর বলে, ‘মানে তুই বলতে চাইছিস ওকে রাগ দেখানো আমার উচিত হচ্ছে না?’
ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে বিছানায় শুইয়ে দেয় অপু, ‘আমি বলতে চাইছি তোর আপাতত রেস্ট দরকার। যা ভাবার গেদু আসার পর ভাবা যাবে। এখন শুয়ে পড় দেখি…’
শম্পা বালিশটা ওর মাথার নিচে টেনে দেয়। আগমনী বাধ্য মেয়ের মতো আবার শুয়ে পড়ে বিছানায়। মাথার ঝিমঝিম ভাবটা সকালের হ্যাংওভারের মতো লেগেই রয়েছে। অবশ্য মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন নিজেই কখনও কখনও হ্যাংওভার দিয়ে প্রমাণ করতে চায়, বেঁচে থাকাটাও একরকমের নেশা। সেটা মাত্ৰা বুঝে করতে হয়। যতটা দিয়েছে ততটা নিয়ে খুশি না থাকলে, যতটা কেড়ে নিয়েছে সেটা মানিয়ে না নিলে, ফেলে আসা সময়ের, যত্নের, স্নেহের খোঁজে অবেলায় বেরিয়ে পড়লে সে বুঝিয়ে দিতে চায় কাজটা ঠিক হয়নি।
আজকাল চোখ বন্ধ করলেই চারটে বন্ধুর মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগমনীর। গেল কোথায় ছেলে-মেয়েগুলো? ওদের কাছে কি কিছু রাখতে দিয়েছিল আগমনী?
ঘরে উপস্থিত দুজন বাইরে বেরিয়ে যায়। আর সেই সুযোগে আলোটা আবার এসে পড়ে ওর বুকের উপর। ধীরে ধীরে সেই আলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় আগমনী। হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হ্যাংওভারটা কমে আসে…
বিকেল শেষ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বারান্দার বিড়ালটা আজ রেলিঙের একদিকে ঘটি হয়ে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে এক মনে কী যেন দেখে চলেছে। হাতের সিগারেটটা ঝাঁকিয়ে বাইরে ছাই ফেলে অপরাজিতা। শম্পার মুখে অনেকক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন ঝুলে ছিল, সেটাই করে বসে, ‘দিদির কী হয়েছে অপুদি?’
অপুর মুখে ছায়া ঘনিয়ে আসে, ‘সব সিমটম শুনেটুনে ডাক্তার বলল অ্যালজাইমার্স সেট ইন করার প্রাইমারি স্টেজ হতে পারে। ভুলে যাওয়ার রোগ…’
‘মানে?’ শম্পাকে উদ্বিগ্ন দেখায়।
‘মানে ধর, ওর যত বয়স বাড়বে তত ও সব ভুলে যেতে থাকবে। লোকের নাম ধাম, পরিচয়, ঘটনা। জিনিসটা সবারই হয়, ওর ক্ষেত্রে একটু অল্প বয়সে…।’
‘মানে আমাকেও চিনতে পারবে না? ‘
করুণ হাসি ফোটে অপুর মুখে, ‘তুই তো কাছেই থাকিস, রোজ একবার করে এসে চিনিয়ে দিস।’
বারান্দার মেঝের উপর সার বেঁধে রাখা গাছের টবের দিকে চেয়েছিল শম্পা, হঠাৎ বলে, ‘ওই জন্যই মনে হয় দিদি মাঝে মাঝে কিছু কথা ভুলে যায়।’
‘কীরকম কথা?’ অপু ভুরু কুঁচকে তাকায় ওর দিকে।
শম্পা একটু ভেবে বলে, ‘দিদি ছাড়াও ঘরে কেউ আসে। আমি তো সারাদিন থাকি না, তাই জানতে পারি না। কিন্তু জিগ্যেস করলে বলে কেউ আসেনি সারাদিন।’
‘আসে যে সেটা তুই জানলি কী করে?’
‘চোখে পড়ে। জানলায় কার যেন হাতের ছাপ থাকে, ঘরে একটা গন্ধ…।’
‘বটে। আর?’
‘মাঝে মাঝে বারান্দায় এসে দেখি টবের মাটি ভিজে। গাছগুলোতে কেউ জন্ম দিয়েছে। বৃষ্টি হলে হতে পারে, কিন্তু না হলে তো হওয়ার কথা না। দিদিকে জিগাস করলে বলে দেয়নি…এদিকে…’
অপরাজিতা কিছু বলে না। টবের গাছগুলোর দিকে তাকায়। শেষ বিকেলের আলোয় সবুজ রং মরে আসছে।
‘বেড়ালটা আগে যখন তখন ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ত। আমি মাঝে মাঝে বারান্দায় ভাগিয়ে দিতাম। কিন্তু এখন ঘরের ভিতরে খেতে দিলেও আসতে চায় না।’ শম্পা বিড়ালের দিকে তাকিয়ে বলে।
‘এটার সঙ্গে তো ভুলে যাওয়ার সম্পর্ক নেই…’ অপু কী যেন ভেবে বলে, ‘জানলায় হাতের ছাপ কবে দেখেছিস?
‘মাঝে মধ্যেই দেখি। এই তো আজই ছিল। এসো না, দেখাচ্ছি।’
সিগারেটটা জানলার বাইরে ফেলে দিয়ে ভিতরের ঘরে ঢুকে আসে ওরা। আগমনী আপাতত পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে। হলুদ ডোরাকাটা একটা টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট পরে আছে ও। ওর ঘুম পাতলা। পায়ে কোনও শব্দ না করে দুজনের জানলার কাছে এসে দাঁড়াল।
অপরাজিতা ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করে। হাতের ছাপটা খুব একটা বড় নয়। জানলার ওপাশে কেউ হাত রাখার ফলে কিছুটা অংশের ধুলো সরে গেছে। সেই আউটলাইনটুকু ছাড়া আর কিছুই বোঝা সম্ভব নয়।
হঠাৎ একটা ব্যাপার চোখে পড়ে অপুর। হাতের আউটলাইনটা পারফেক্ট নয়। কড়ে আঙুলের পাশে অতিরিক্ত খানিকটা জায়গার ধুলো সরে গেছে। হ্যাঁ, অনামিকাতেও তাই। মধ্যমার পাশেও খানিকটা যেন বেঁকে গেছে লাইনটা। হাতটা তুলে নেওয়ার সময়ই কি….কিন্তু তাহলে তো একদিকেই বাঁকবে সব ক’টা লাইন… দুদিকেই বেঁকেছে মানে…
চকিতে শম্পার দিকে ফেরে অপু, ‘এটা একটা হাতের ছাপ নয়। অপরাজিতার গলা থমথমে শোনায়, ‘একটা হাতের উপরে আরও একজন হাত রেখেছিল…’
কৌশিক যখন বাড়ি ফিরল তখন দুপুর নামতে শুরু করেছে। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় ঘুম হয়নি ওর। শরীরটাও ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মাথার ভিতরে একটা ঝিমঝিম ব্যথা৷
বাড়িতে ঢুকে একবার স্নান করা দরকার। ভিতরের ঘর থেকে টিভির আওয়াজ আসছে। সাবিত্রী সম্ভবত সিরিয়াল দেখছেন এখন। অকারণেই ঠাম্মার মুখটা একবার দেখে স্নানে যেতে ইচ্ছে করল কৌশিকের।
সাত-পাঁচ ভেবে আগে ঠাম্মার ঘরেই ঢুকে এল সে। ঠিক পাঁচটায় টিভিতে কী একটা সিরিয়াল শুরু হয়। সেটাই দেখছেন বৃদ্ধা৷ কৌশিক তার পাশে গিয়ে বসতে একটু সরে বসলেন সাবিত্রী। হাত দিয়ে সোফাতে পাশের জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন, ‘বোস, খাবার ফ্রিজে রাখা আছে। গরম করে…’
‘আমি বাড়ি ফিরলেই সবার আগে খাবারের কথা বলো কেন?’ কৌশিক মৃদু গলায় অনুযোগ করে।
‘ছেলেপুলে বড় হলে অন্য ঝঞ্ঝাট ঝামেলার কথা কি মা বাপেরা বোঝে খাবারটুকুনি বোঝে, তাই ওটাই বলে বারবার।’
কৌশিকের শরীর ঝিমিয়ে আসছিল, ঠাম্মার কোলেই মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সে, ‘নিজেকেও একটু বোঝাও এবার, কবে থেকে বলছি, ডাক্তার বলেছে ছানির অপারেশনটা করিয়ে নাও…’
‘ময়নার মাও তো বলে নাতিটার একটা বিয়ে দিতে, আমি কান দিই? যতদিন তুই ডাক্তারের কথা শুনবি না ততদিন আমি ময়নার মায়ের কথা শুনব না।’
কৌশিক এবার হেসে ফেলে। দু’হাতে ঠাম্মার কোমর জড়িয়ে ধরে, ‘তোমার আগমনীর কথা মনে আছে ঠাম্মা, কলেজে…’
‘সেই যে লম্বা করে মেয়েটা?’
‘ওর একটা রোগ হয়েছে। জানো, ছোটবেলার কথা ভুলে যাচ্ছে সব। আস্তে আস্তে সব ভুলে যাবে…’
সাবিত্রীর মুখটা ঝুলে আসে, ‘আমারও তো কই মনে পড়ে না ছেলেবেলার কথা। তোর বাবার কথা পড়ে অবশ্য, তোর মায়েরও। তাও সব ফিকে হয়ে গেছে…’ তারপর নরম হাসি ফুটিয়ে বলেন, ‘একেবারে ভুলে গেলে আমার কাছে চলে আসতে বলিস। দুই ভুলো বুড়ি একসঙ্গে টিভি দেখব…’
ঠাম্মার চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিল কৌশিক। সেটা নিজের জামায় মুছতে মুছতে বলল, ‘চশমায় এত দাগ লেগে থাকে, দেখো কী করে?’
‘রোজ পরতে পরতে আর অসুবিধা হয় না। তাছাড়া, এই বয়সে যত না দেখি তত ভালো। ভালো কথা, তোকে উল এনে রাখতে বলেছিলাম, আনিসনি? জিভ কাটে কৌশিক, ‘দৌড়াদৌড়িতে একদম ভুলে গেছি। আজ রাতে এনে দেব, শিওর।’
ঠাম্মার এই স্বভাবটা ছোট থেকে দেখে আসছে কৌশিক। সময় পেলেই ছাদে বসে উল বুনত ঠাম্মা। এখন বয়স হয়ে চোখের দৃষ্টি কমে আসতে খানিক বাধ্য হয়েই সে শখ ছাড়তে হয়েছে। তবে দিন কতক আগে আবার বায়না ধরেছেন তিনি। সামনে শীতকাল আসছে, কৌশিকের জন্য একটা সোয়েটার বানাবেন। উল বাকি থেকে গেলে একটা টুপি বানিয়ে দেবেন।
কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে থেকে উঠে পড়ে কৌশিক। স্নান করে খেয়ে নিতে হবে। ময়নার মা একটু পরেই চলে আসবে। তাকে ঠাম্মার পাশে রেখে বেরোতে হবে ওকে। পথে ঠাম্মার রিপোর্টগুলো তুলে নিতে হবে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাতিবাগানের আরসালনের মাটন বিরিয়ানি আর চিজ কাবাব তুলে নিল কৌশিক। তারপর বাইক ছুটিয়ে দিল আগমনীর ফ্ল্যাটের উদ্দেশে।
সন্ধে আটটার দিকে আগমনীর ফ্ল্যাটে পৌঁছায় কৌশিক। ততক্ষণে অপরাজিতা বেরোনোর তোড়জোড় করছে। শম্পা কাজকর্ম সেরে বেরিয়ে গেছে বিকেলে।
‘ও কোথায়?’ অপুকে বসার ঘরে দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করল কৌশিক।
‘ছাদে গেছে, বলল হাওয়া খেয়ে আসছে।’
ছাদের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল, অপরাজিতা থামিয়ে দিল তাকে৷ সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, ‘গেদু শোন…
অপরাজিতার গলায় স্বাভাবিকের থেকে গম্ভীর শোনায়। কৌশিক মনে মনে প্রমাদ গোনে। আবার বড়সড় মোনোলগ ঝাড়বে।
‘তোকে একটা কথা বলার ছিল।’
‘বল?’
‘দেখ, আমার পক্ষে কাজকর্ম ফেলে মাঝেমধ্যে এখানে এসে পড়ে থাকা সম্ভব নয়।’
‘সেটা ওকে বল, আমাকে বলছিস কেন?’
অপু এগিয়ে আসে ওর দিকে, ‘ও আগে থেকেই জানে। না জানলে নিজের একটু যত্ন নিত।’
কৌশিক কাঁধ ঝাঁকায়, ‘ঠিক আছে, আমার এক্স আমাকেই বুঝে নিতে হবে। তুই দূর হ এখন।
অপু চোখমুখের উদ্বিগ্ন ভাবটা ঝেড়ে ফেলে, ‘গ্রো আপ গেদু। একটা মানুষের সঙ্গে প্রেম করা, লয়াল থাকা, মাঝে মধ্যে ফুল টুল দেওয়া, বিরিয়ানি খাওয়ানো, এদিক-ওদিক ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার থেকে খারাপ সময়ে তাকে সামলানো অনেক বেশি কঠিন কাজ। প্রথমটাতেই ডাহা ফেল করে বসে আছিস, পরেরটার ক্যান্ডিডেট লিস্টে একেবারে শেষে নাম এসেছে…তোকে আমি কী করে বিশ্বাস করি?’
হাতে ধরা খাবারের প্যাকেটটা তুলে ধরে কৌশিক, ‘বিশ্বাস করতে হবে না, আমি খাবারগুলো দিয়েই চলে যাব।’
অপু হাসে, ‘সেটাই বলছি। খাবারগুলো দিয়ে চলে যাস না। ওর খাবার যতটা দরকার তার থেকে বেশি খাবারগুলো দিয়ে চলে না যাওয়া একটা মানুষ দরকার। তুই কবে বুঝবি সেটা?’
ইদানীং কৌশিকের মনে হয় আগমনীর ফ্ল্যাটের সবক’টা আলো একসঙ্গে লো-ভোল্টেজ হয়েছে। উজ্জ্বল হয়ে আর কোনওটাই জ্বলে না। সারাক্ষণ এক বিচিত্র বিষণ্ণতা ঘিরে রাখে জায়গাটাকে। তার মধ্যে অপরাজিতার মুখের আলোআঁধারি বাতাসকে আরও ভারী করে তুলেছে যেন।
আমি ইয়ার্কি মারছি না গেদু। মণি আমার অনেক দিনের বন্ধু। সত্যি চিন্তা হয় ওকে নিয়ে। খেয়াল রাখার মতো কেউ নেই। আমি না থাকলে….
কৌশিকের অস্বস্তিটা বেড়ে ওঠে। ও উত্তর দেয় না, অপু আর একটু এগিয়ে আসে ওর দিকে, ‘তুই ভালো রাখতে পারবি ওকে? এক্স-টেক্স বলে না, সুস্থ হয়ে গেলে আবার রাতে খাট কাঁপিয়ে সেক্স হবে বলে না, তুই নিজে একটা বেটার হিউম্যান বিয়িং হতে পারবি বলে না, ওর আর কেউ নেই বলে না, আমি বলছি বলেও না…জাস্ট ও ভালো থাকলে তোর ভালো ঘুম হবে বলে?’
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে কৌশিক। তারপর হাতের উলটোদিক দিয়ে নাকের ডগা ঘষে নিয়ে ধীরে ধীরে বলে, ‘যদি খাট কাঁপিয়ে রাতে সেক্স হয়, তাহলে ভালো ঘুম হবে কী করে?
অপরাজিতার মুখ রাগে লাল হতে যাচ্ছিল। খিস্তি করতে যাচ্ছিল। তার আগেই ওর গালে হাত রাখে কৌশিক, ‘চিন্তা করিস না। আমি আছি।’
‘দূর হ শালা ছোটলোক!’ পেটে ধাক্কা মেরে ওকে সরিয়ে দেয় অপরাজিতা।
ছাদে এসে আগমনীকে দেখতে পায় কৌশিক। একদিকের সিমেন্টের পাঁচিল ধরে দাঁড়িয়েছিল আগমনী। কৌশিক যে ছাদে এসে পৌঁছেছে খেয়াল করেনি। একটু আগে অপুর মুখ থেকে ডাক্তারের কথাটা শুনেছে আগমনী। শুনেটুনে একটা বিচিত্র অনুভূতি হয়েছে ওর। নিজের মাথাটাকে একটা ব্যাঙ্কের ভল্ট বলে মনে হচ্ছে। তার ভিতর থেকে মিস্টার ইন্ডিয়ার মতো অদৃশ্য কোনও আততায়ী এসে একটা একটা করে নোট চুরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। আগমনী ভাবার চেষ্টা করল ঠিক কোন ভল্টে সব থেকে দামি নোটগুলো আছে। ওর মাথায় কিছু এল না। শুধু নীচতলার কার্নিশ থেকে সাদা বিড়ালটা ডেকে উঠল একবার।
ছাদে উঠে কৌশিক ধীর পায়ে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, ‘শুনলাম তোর মাথা খারাপ হয়েছে?’
আগমনী মুখে কিছু বলে না। ওর দিকে না ফিরেই আলগা হাসে।
‘ভাগ্যিস মাথা খারাপ হয়েছে, পেট খারাপ হয়নি। তাহলে ভালো মন্দ খাওয়া বন্ধ হয়ে যেত…’ কথাটা বলে হাসে কৌশিক, ‘তোর জন্য মাটন বিরিয়ানি আর কাবাব এনেছি ভাই, নীচে রাখা আছে, চল।’
আগমনী কানের পাশে উড়ন্ত চুল গুঁজে নরম গলায় বলে, ‘উঁহু। কোলেস্ট্রল বেশি এসেছে, মটন বন্ধ।
জিভ দিয়ে চুকচুক করে শব্দ করে কৌশিক, ‘এহ্, হার্টের কথা ভেবে তুই পাঁঠা খাচ্ছিস না জানলে পাঁঠাটা খুব হার্ট হতো!’
হেসে ফেলে আগমনী, তারপর আদুরে গলায় বলে, ‘আচ্ছা খাইয়ে দে, তাহলে খাব।’
এক ছুটে নীচ থেকে বিরিয়ানিটা নিয়ে আসে কৌশিক। তারপর আলুটা ভেঙে ওর মুখের সামনে ধরে। আগমনী সেটা চিবতে চিবতে বলে, ‘দুর্গাপুজো আসছে? নারে গেদু?’
‘হ্যাঁ, এই তো দু’মাস পরে।’
বাইরের দিকে তাকিয়ে আগমনীর মনটা উদাস হয়ে যায়, ‘এবার আমার একটাও জামা হয়নি। আগে দুর্গাপুজো এলে নতুন জামা হত, এখন মন খারাপ হয়ে যায়।’
‘আচ্ছা তোকে একবার ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাব…’ নিজের মুখে বিরিয়ানি তুলতে তুলতে বলে কৌশিক, ‘অষ্টমীর দিন ভিড়ে গুঁতোগুঁতি করে ঠাকুর দেখব।’
‘ধুর, আমার অত ভিড় ভালো লাগে না। দুটো দেখে পালিয়ে আসব…’ অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় আগমনী, ‘এই বাংলা ঋতুর নামগুলো কী আদুরে ছিল, না? হেমন্তকাল, শরৎকাল, বসন্তকাল…শুনলেই মনে হত গ্রামের বাড়ির কোনও আমুদে দাদু মাথায় গামছা দিয়ে একগাদা ফলমূল, সোয়েটার আর পান্তুয়া নিয়ে বাড়ি আসছে যেন। এখন এই উইন্টার সামারের মধ্যে সেই আদর কোথায়?’
‘আমার ঠাম্মাকে উল কিনে দিয়েছি। একটা সোয়েটার বুনছে, জানিস? ওটা শেষ হলে তোকে দিয়ে দেব।’
মৃদু হাওয়া খেলে যায় ওদের শরীর বেয়ে। বর্ষাকাল এখনও যায়নি। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। ঠান্ডা জোলো হাওয়া ভেসে আসছে থেকে থেকে৷ গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নিয়েছে আগমনী।
‘ঠাম্মা কেমন আছে?’ সে জিগ্যেস করে।
‘ভালো আছে। ঠাম্মাকে তোর কথা বলছিলাম৷’
‘কী বললি? মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
কৌশিক হাসে, ‘নাহ্, ঠাম্মা রিলেট করতে পারে তোর সঙ্গে। মানুষ কৈশোর, যৌবন, মধ্যবয়স সব মানিয়ে নেয় মোটামুটি। শুধু বার্ধক্যটা পারে না। তুই মিডল এজের আগেই হাঁফিয়ে গেছিস।’
আগমনী উত্তর দেয় না। আগের মতোই নীচে পড়ে থাকা শহরের দিকে চেয়ে থাকে একটানা।
‘কী ভাবছিস বল তো?’ কৌশিক জিগ্যেস করে।
আগমনী মুখ ফিরিয়ে নেয়। ছাদের আর একটু ভিতরের দিকে সরে আসে, গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে মিহি গলায় বলে, ‘তোর মনে আছে গেদু, একদিন তুই আমায় বলেছিলি, আমি যা চাইব তাই দিবি?’
‘তখন বন্ধু ছিলাম, পটানোর জন্য বলেছিলাম।’
আগমনী হাসে। রসিকতার মেজাজটাকে সযত্নে সরিয়ে রাখে। আগের মতোই মৃদু স্বরে বলে, ‘কয়েকটা বন্ধু খুঁজে দিবি আমাকে?’
‘সেই চেষ্টাতেই আছি তো সোনা। একটা নয় চারটে বন্ধু।’
আগমনী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ‘কী জানি, অপু বলছিল, এমনও হতে পারে আদৌ ওই চারজন আমার বন্ধু ছিলই না। জাস্ট একটা ফটো তুলেছিলাম। কিন্তু…’
‘কিন্তু কী?’
আগমনীর মুখে একটা বিচিত্র হাসি খেলে যায়, ‘ওই চারজন বন্ধু ছিল কিনা জানি না। তবে একজন ছিল মনে আছে। তাকে হারিয়ে ফেলেছি তাও মনে আছে।’
‘কে?’
‘তুই…’
বাঁকা হাসি হাসে কৌশিক, ‘আমার বন্ধুত্বটা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি জানতাম না। আমার কোনওদিন মনে হয়নি আমি ভালো বন্ধু হতে পারি বলে…’
‘বন্ধু হবার ওটাই মজা গেদু। ভালো হতে হয় না। বয়ফ্রেন্ডকে ভালো হতে হয়, সন্তান হলে বাবা-মা’র মুখ উজ্জ্বল করতে হয়। ভালো স্ত্রী, ভালো ভাইবোন হতে হয়। শুধু বন্ধু হলে ভালো হওয়ার দায় থাকে না। জাস্ট বন্ধু হলেই চলে…’
কৌশিক উত্তর দেয় না। দুজনের মাঝে বেশ খানিকটা নিস্তব্ধতা মাথা গুঁজে থাকে। একসময় রেলিঙের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কৌশিক। মনে হয় বহু দূর থেকে ভেসে আসে তার গলা, ‘আমাকে ভালোবেসেছিলি বলে আফসোস হয় না তোর?’
‘উঁহু, ভালোবাসার আগে দুম করে একদিন চুমু খেয়ে ফেলেছিলাম বলে আফসোস হয়। তারপরে নিজের কাছে আর এটা স্বীকার করতে পারিনি যে ঝোঁকের মাথায় একটা বন্ধুকে চুমু খেয়ে ফেলেছি। ছোট থেকে কেউ পবিত্র, দাগহীন, সতীলক্ষ্মী নারীর আইডিয়াটা মাথার মধ্যে বুনে দিয়েছিল। সেটাকে দাঁত কামড়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। নিজেকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেছি বারবার যে তোকে আমি ভালোবেসেছি বলে চুমু খেয়েছি। নিজের এই অন্যায়টা স্বীকার করতে পারিনি যে আমার একটা ইম্পারফেক্ট শরীর আছে, এবং সেই শরীরের একটা হরমনের বালছাল খেলায় জাস্ট একটা গান্ডুপনা করে ফেলেছি।
ঠোঁট ওলটায় কৌশিক, কিছুক্ষণ সময়ে নিয়ে বলে, ‘ঠিক বলেছিস ভাই। শালা প্রেম করতে গিয়ে আমাদের বন্ধুত্বটাই যেন কোথায় হারিয়ে গেল।’
মাটন চিবতে চিবতে আগমনী বলে, ‘তুই তো জানিস, আমার যখন অল্প বয়স তখন বাবা মরে যায়। মায়ের তখনও যৌবন ছিল। কিন্তু মা কোনওদিন কারো সঙ্গে প্রেম করেনি। পারতপক্ষে পুরুষ মানুষ দেখলেই এড়িয় যেত। এদিকে মা সুন্দরী ছিল, কবিতা লিখত, ভালো গান গাইতে পারত। শেষ বয়স পর্যন্ত দেখেছি, এটা মায়ের গর্বের জায়গা ছিল। মাঝে মাঝেই গর্ব করে বলত, কত বছর তাকে ছেড়ে কাটিয়ে দিলাম কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক অবধি হল না।’
‘তাতে তোর ভালো লাগেনি? মা তোকে রেখে আর কারো সঙ্গে ঘুরে বেড়ালে তোর নিজের অপমানজনক মনে হত না সেটা?’
‘আমি সেই নিয়ে কাটিয়ে দিতাম গেদু। আমাকে সারাজীবন একটা দুঃখী মায়ের স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয়েছে৷’ দূরে ব্যস্ত শহরের দিকে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয় আগমনী, ‘অন্য কাউকে ভালো রাখতে গেলে নিজের ভালো থাকাটা সব থেকে জরুরি। মা কোনওদিন সেটাই বুঝল না… অন্য কারো সঙ্গে শোয়া তো দূরের কথা, লোকে অন্য কারো সঙ্গে শুয়েছে বলবে, সেই সম্ভবনাতেই সারাজীবন দুটো মানুষকে অসুখী রেখে দিল…’ একটু থেমে বিড়বিড় করে আগমনী, ওর গলা উদাস শোনায়, ‘যে ভালোবাসা মানুষের শরীর মনে ফসল ফলাতে পারত, আমরা সেটাকে একটা মানুষকে অন্য কারো সঙ্গে না শুতে দেওয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা বানিয়ে দিলাম।’ কথাটা বলে কৌশিকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘বাদ দে ওসব। তুই সেই কিডন্যাপারের কিছু কনট্যাক্ট পেলি?’
‘ঠিক কন্ট্যাক্ট নয়। ব্যানার্জী বলল, কিডন্যাপটা করেছিল মোট তিনজন। তার মধ্যে দুজন একেবারে মার্কামারা ক্রিমিনাল। অন্য ছেলেটি, আই মিন গোরাচাঁদ সে এই ঘটনার পর আর কোনও ক্যাচালের মধ্যে থাকেনি। মনে হয় ভয় পেয়েছিল। তারই একটা ঠিকানা আছে ব্যানার্জীর কাছে।’
‘ফোন নম্বর নেই?’
‘উঁহু। ওই কেস খাওয়ার পর সে নর্থ বেঙ্গল চলে যায়। ওখানে বাড়িঘর ছিল। সেসব এখন মনে হয় আর নেই। আপাতত নর্থ বেঙ্গলেরই কোনও একটা হোমস্টেতে কাজফাজ করে। কারো সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ রাখে না। একটু আন্ডারগ্রাউন্ড থাকে আর কী।’
আগমনীকে ভাবুক দেখায়, ‘আমাদের তাহলে এই গোরাচাঁদের সঙ্গেই কন্ট্যাক্ট করতে হবে। কিডন্যাপ হওয়ার পর নহরের কী হয়েছিল, সেটা ওর থেকে ভালো কেউ জানবে না। আমার আরও দিন পাঁচেকের ছুটি আছে। তার মধ্যেই নর্থ বেঙ্গল ঢুঁ মেরে আসতে হবে।’ বলে হাসে আগমনী।
‘হাসছিস কেন?’ ওর মুখে বিরিয়ানি গুঁজে দিতে দিতে বলে কৌশিক৷
‘নহর স্কুলে আসার জন্য মার অবধি খেয়েছে। ভেবে দেখ কত ভালো বন্ধুত্ব ছিল আমাদের…আর তোরা আমাকে বিশ্বাস করছিলিস না…’
‘আমি কখন বিশ্বাস করলাম না?’
সারাদিন খালি পেটে থাকার পর একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে আগমনী। ওর আর দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করে না। ছাদের মেঝেতেই চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। কৌশিক ওর পাশে বসে কোলে তুলে নেয় মাথাটা।
তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আগমনী বলে, ‘আমি জানি, তুই কেন এতকিছু করছিস আমার জন্য…’
‘তাই নাকি! কেন?’
‘তোর মায়ের জন্য। মায়েরও মাথার রোগ ছিল, কিন্তু তোর তখন বয়স কম ছিল। কিছু করতে পারিসনি। তোর মনে হয় আমার রোগটা সারিয়ে দিতে পারলে তোর স্বপ্নের উৎপাতটা কমে যাবে, তাই না?’
কৌশিক পেছন দিকে দু’হাত ভর দিয়ে বসে বিড়বিড় করে বলে, ‘সেদিন ঘর জুড়ে রক্ত আর মাছের আঁশটে গন্ধ ছিল। পরদিন লোক পাঠিয়ে ওরা সব পরিষ্কার করে নিয়ে চলে গেল। আঁশটে গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের গায়ের গন্ধটাও চলে গেল। সেদিন শিখেছিলাম মানুষ চলে গেলে স্মৃতি থেকে যেতে পারে তার গন্ধ আর পড়ে থাকে না। তখন ছোট ছিলাম, সামলে নিয়েছিলাম…’ মুখ নামিয়ে ওর দিকে তাকায় কৌশিক, ‘তোর গন্ধটা আমি হারাতে চাই না মণি। তোর নিঃশ্বাসের আওয়াজটা আমাকে শান্তি দেয়। বড় হলে শান্ত করার মতো বেশি কিছু আর পড়ে থাকে না। তোকে আমি হারাতে চাই না…’
আকাশের দিকে তাকায় আগমনী। কলকাতার যে জায়গায় ওদের বাড়ি তাতে খুব বেশি খোলা আকাশ দেখা যাওয়ার কথা নয়। তাও মৃদু আলোয় জ্বলতে থাকা কয়েকটা তারা চোখে পড়ে ওর। আঙুল বাড়িয়ে সেই তারা গোনার চেষ্টা করে। তারপর ব্যর্থ হয়ে নীচে নেমে আসে হাতটা। কৌশিকের হাতের তালুতে আশ্রয় খুঁজে নেয়।
‘আমাকে আমার ছোটবেলাটা খুঁজে দিবি গেদু? এই বয়সের ভারে হাঁপিয়ে যাওয়া, রুগ্ন, কুৎসিত, হিসেব মেলাতে মেলাতে পাথর হয়ে যাওয়া মানুষটাকে তার মিষ্টি রোদের দিনগুলো খুঁজে দিবি?’
আগমনীর মাথাটা ধীরে ধীরে কোল থেকে নামিয়ে কৌশিক শুয়ে পড়ে ওর পাশে। শক্ত করে ধরে ওর হাতটা। আকাশের তারার দিকে নিবদ্ধ হয়ে যায় ওদের দৃষ্টি। হঠাৎ করেই ওর মনের ভিতর একদলা অভিমানের মেঘ জমা হয়। আগমনীর ঘাড় ধরে ওর বলতে ইচ্ছা করে, ‘দিস ইস নট ফেয়ার গেম মণি। আমি তোর জীবনে শুধু ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার হয়ে রয়ে গেলাম। যার কাজ কেবল অন্য ব্রাউজার ডাউনলোড করে দেওয়া। তুই বন্ধু খুঁজলি, প্রেম খুঁজলি, শরীর, মন, শরীরের মধ্যে মন, মনের মধ্যে আস্ত শরীর, সব খুঁজলি, শুধু আমাকে খুঁজলি না…অথচ আমি এই সব ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য কী মারাত্মক ছটফটানি নিয়ে স্টেজের এক পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম…আমি সব চরিত্রগুলো মুখস্ত করেও কোনও চরিত্র পেলাম না…দিস ইজ নট ফেয়ার…’
কিন্তু তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে সেদিন অভিমানটা ধূমকেতুর মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। ওর মনের ভিতরে কোনও গোঁয়ার বাচ্চা বলে উঠল, ‘বেশ করেছি। বেশ করেছি আমার শরতের আকাশ তোর বেখেয়ালী অ্যাসফাল্টের ধোঁয়ায় কালো করে দিয়েছি। আমার যত্নে বোনা গমের খেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছি তোর ভবঘুরে উড়োজাহাজের চোখ টানতে। বেশ করেছি আমার ঘুমাপাড়ানি চাঁদের বুড়ির মুখে হাত চেপে ধরে তোর রাত জাগা বন্ধুত্বহীনতার গল্প শুনে, একাকীত্বের গল্প শুনে। বেশ করেছি…আমি এমন কিছু করেছি যা আমার চেয়ে ঢের বড়। আমার প্রেম, আমার যৌনতা, আমার ভালোবাসা, যন্ত্রণা, জন্ম, মৃত্যুর চেয়ে ঢের বড়। আমি শালা কোনও মানবীর প্রেম না পেয়ে বুক চাপড়ে হস্তমৈথুন করে ঘুমিয়ে যাওয়া লাফাঙ্গা নই…আমি তোকে মানবী হয়ে বাঁচতে দিইনি৷ আমি তোর পায়ের কাছে নিজের আয়ু বাজি রেখে অমরত্ব রেখে গেছি…বেশ করেছি আমি।’
এত কথা বলা যায় না। চোখে তারার আলো মেখে আগমনীর দিকে চায় কৌশিক। প্রায় নিভে আসা স্বরে বলে, ‘আচ্ছা বেশ, আমি খুঁজে দেব। কিন্তু তারপর আমায় ভুলে যাস না… কেমন?’
