Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    তিথিডোর – বুদ্ধদেব বসু

    বুদ্ধদেব বসু এক পাতা গল্প613 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ১.৩ কোথাও যাব না

    কোথাও যাব না, তোমার কাছেই থাকব। কিন্তু যেতেই হয়। শাশ্বতীর পালা এল।

    কয়েকমাস আগে রাজেনবাবু এসেছেন নিজের বাড়িতে। টালিগঞ্জে। ব্রিজের কাছাকাছি, রসা রোড থেকে একটু পশ্চিমে ঢুকে, ছোটো একটু জমি শস্তায় কিনেছিলেন অনেকদিন আগে কোনো এক ফাঁকে। হঠাৎ স্থির করলেন বাড়ি করবেন। একেবারে হঠাৎ নয়, ছমাস আগে থেকে মাস্টারের নিয়মিত আনাগোনা সত্ত্বেও রাজেনবাবু মনে মনে যা ভয় করেছিলেন তা-ই হল, বিজু ফেল করল ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায়। ফেল করে কয়েকদিন খুব মন খারাপ করে থাকল; তারপরই মেতে গেল গরচা ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন-এর সীতা নাটকের ধুমধামে। সোজা কথা নাকি, তাকে সাজাতে হবে তুঙ্গভদ্রা! এ-ছেলের হাতে, রাজেনবাবু ভাবলেন, কাচা টাকা না পড়াই ভাল। অবশ্য টাকা যে তার বলবার মতো কিছু আছে তা নয়। সরকারি সিঁড়ির ধাপে-ধাপে উঠে এতদিনে সাতশো টাকার একটি আসনে বসেছেন বটে, কিন্তু জীবন ভরে অনেক দেনা করতে, অনেক দেনা শুধতে হয়েছে। দশ বছর ধরে স্ত্রীর অসুখ, তিনটি মেয়ের বিয়ে, আর ছেলেমেয়ের সুখের জন্যে হিসেবহীন খরছ কী আর থাকে! তবু, প্রভিডেন্ট ফান্ডটা অনেকবার অনেক মার খেয়েও টায়ে-টুয়ে টিকে আছে, ইনশিওরেন্সের পলিসি দুটোও পেকে এল। বাংলাদেশের অধিকাংশ চাকুরে ভদ্রলোকের টাকা জমাবার উপায় যে দুটি মাত্র, তারই প্রথমটিকে প্রায় নিঃশেষ করে রাজেনবাবু বাড়িটি তুললেন।

    বড়ো বাড়ি হল না। একতলা, থাকবার ঘর খানচারেক। চেহারাটাও জাহাজ কি এরোপ্লেন কি লেবং-এর রেসকোর্সের মতো না-নেহাতই সাদাসিধে বাড়ি একটি, যেখানে মানুষ থাকে, খায়, ঘুমোয়। শাশ্বতী সুখী হল না মোটেও। আবার রাস্তার নাম বিধু ঘোষ লেন, সেটাও অপছন্দ। বাড়িটা এখানে কেন করলে, বাবা? একদিন সে না বলে পারল না। এখানে ভাল লাগে না তোর, না রে?

    পাড়াটা বড়ো—শাশ্বতী বলতে যাচ্ছিল গরিব। কিন্তু হারীতবাবুর কথাবার্তা শুনে সে গরিবদের শ্রদ্ধা করতে শিখেছে। সত্যি, তারাই তো সংসার চালাচ্ছে, তারাই সব। একটু থেমে সে কথা শেষ করল—বড়ো পাতিবুর্জোয়া। বি. এ. পড়নি মেয়ের কথা শুনে রাজেনবাবু অবাক, পাতি–? কী বলল? পাতিবজরা? পাতিবিজোড়? পাতিবাছুর? বড্ডো–কী?

    এই আর কী! বাবার অজ্ঞতা সহাস্যে ক্ষমা করল শাশ্বতী—দেখছ না, কী রকম ঘেঁষাঘেঁষি। আর বাচ্চাগুলো কী রকম নোংরা হয়ে ঘুরে বেড়ায়! জানলার তাকে পা ঝুলিয়ে বসে স্বাতী একটা কাচা পেয়ারা চিবিয়ে খাচ্ছিল। হঠাৎ কথাটা কানে যেতেই বলে উঠল-ঘেঁষাঘেঁষি! বলো কী ছোড়দি! এদিকটা কী রকম খোলা মাঠ, গাছপালা, আর কতখানি আকাশ! বাব্বাঃ! যতীন দাস রোডের কথা ভাবতে হাঁপ ধরে এখন! শাশ্বতী হেসে উঠল তার ভঙ্গি দেখে। বলল— দোতলা করলে না কেন, বাবা?

    সবটাই আমি করে ফেলব? বিজুর জন্য কিছু বাকি থাক!

    দোতলা দিয়ে হবেই বা কী? এই বেশ। ঠিক যেটুকু দরকার সেটুকু। বেশি-বেশি আমার ভাল লাগে না!-একহাতে জানালার শিক ধরে স্বাতী পা দোলাতে লাগল। তক্ষুনি আবার জুড়ে দিল—একতলাই সবচেয়ে ভালো লাগে আমার। বাইরেটা খুব কাছে হয় একতলা হলে। কেমন সুন্দর বাগান করি দ্যাখো না! ছোটো একতলা বাড়ির মতো সুন্দর নাকি আর কিছু? প্রতিপক্ষকে আর কিছু বলবার সুযোগই দিল না স্বাতী। নিজেই জজ হয়ে নিজের পক্ষে রায় দিল, আর নিশ্চিন্ত হয়ে পেয়ারায় কামড় বসাল তারপর।

    কিন্তু প্রতিপক্ষ ছাড়ল না, পরে নিরিবিলি ঘরে আবার তর্ক তুলল—আচ্ছা স্বাতী, তুই কেন ভাবিস যে তোর যা ভাল লাগে, সকলেরই তা-ই?

    বা-রে! তাই বলে আমার ভাল লাগাটা বলতেও পারব না আমি?

    তোর ভাবখানা এইরকম যেন তোর ইচ্ছেমতোই চলবে জগৎ-সংসার।

    জগৎ-সংসার তো না, শুধু দু-একজন—

    দুই আর কেন, শাশ্বতী বাধা দিল কথায়—ওরকম মানুষ একজনের বেশি তো হতে পারে না, আর হলেও বিপদ।

    মানে?

    ন্যাকা! এদিকে নভেল পড়ে পেকে ঢোল!

    স্বাতী সত্যিই বোঝেনি কথাটা, বুঝল ছোড়দির ঠোঁটের বাঁকা হাসি দেখে। হাসির উত্তরে একটু বেশি গম্ভীর হয়ে বলল—তা এই বাড়ির কথা নিয়ে ঝগড়া কর কেন, এ বাড়িতে তুমি তো আর থাকবে না বেশিদিন!

    তুই-ই যেন থাকবি!

    নিশ্চয়ই! কথাটা ঠেলে উঠল ভিতর থেকে, কিন্তু আসতে-আসতে যেন জোর কমে গেল, শেষ পর্যন্ত পৌঁছলই না। একটু চুপ করে থেকে কী একটা অন্য কথা বলতে গেল ছোড়দি, শোনো–।

    চুপ কর এখন—বলে শাশ্বতী টেবিল থেকে একখানা বই তুলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। শোনো না—স্বাতীর স্বর ব্যাকুল। না!—শাশ্বতী বই খুলল চোখের সামনে। শোনো  একটু। প্রায় কান্নার সুরে স্বাতী প্রার্থনা জানাল-মারকস-এর বই এক্ষুনি না পড়লে চলবে না তোমার? মারকস না রে, মার্ক্স শাশ্বতী হেসে শুধরে দিল—দেখি একটু পাতা-টাতা উল্টিয়ে, হারীতবাবু আবার তো আসবেন সন্ধেবেলা। অবাক হল স্বাতী। যে কথাটা বলবার জন্য ছটফট করছিল, সেটা ভুলে গেল। তাতে কী?—খুবই ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন তার।

    হারীতবাবুই দিয়েছেন কিনা বইটা।

    আজই বুঝি ফেরত দিতে হবে? তা আর-কদিন রাখতে দেবে না বললে?

    এ-সব তো আর সত্যি পড়বার বই নয়! শাশ্বতী মুখ টিপে হাসল।—দেখে রাখি একটু এলে বলতে হবে তো দু-একটা কথা।

    এমন একটা তাজ্জব কথা স্বাতী তার পনেরো বছরের জীবনে শশানেনি। না-পড়েও ভান করতে হবে অন্যের কাছে? কেন? ভাল না লাগে না-পড়লেই হয়, মুশকিল আর কী! চোখ-ভরা প্রশ্ন নিয়ে ছোড়দির দিকে সে তাকাল, কিন্তু ছোড়দির মুখ আড়াল করেছে দুখানা হলদের উপর কালোতে ছাপা মলাট। শাশ্বতী উঠল খানিক পরেই। টেবিলে সারে দাঁড়ানো পাঠ্যবইয়ের মাথায় অপাঠ্য বইখানাকে সযত্নে শুইয়ে রেখে চলে গেল গা ধুতে। ছোড়দির ব্যস্ত ভাব দেখে হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেল স্বাতীর। টেবিলের ধারে দাঁড়িয়ে বইখানা তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে পাতা ওল্টাতে লাগল। কেমন ভয় হল তার, বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল, কখন কোন পাতার ফাঁক থেকে আবার ঝিলিক দেয় নীল রঙের খাম। কতক্ষণে সব পাতা ওল্টাবে… বইখানা উপুড় করে জোর কঁকানি দিল কয়েকবার। না কিছু নেই। ঠিক জায়গায় আবার শুইয়ে রাখল মার্ক্সকে, কী ভালমানুষের মতোই শুয়ে আছে বইখানা, কিন্তু, কিন্তু…কিন্তু কী?

    মাথায় তোয়ালে চেপে ঘরে আসতে-আসতে শাশ্বতী বলল—তুই যা এবার।

    পরে যাব।

    এই তোর এক বদভ্যাস, স্বাতী। তোয়ালে নামিয়ে শাশ্বতী চিরুনি হাতে নিল—অন্তত বিকেলে তো একটু ফিটফাট হতে হয়?

    আমি সারাদিনই ফিটফাট-স্বাতী ধুপ করে শুয়ে পড়ল খাটে।

    শুলি যে?

    শুই না!

    যত অসময়ে!–কালো চুলে সাদা-সাদা আঙুল দ্রুত ওঠাপড়া করতে লাগল শাশ্বতীর। আচ্ছা ছোড়দি, দু-আঙুলে কপালের চামড়া একটু টেনে ধরে স্বাতী বলল—শুভ্রবাবুর খবর কী?

    কী অদ্ভুত! আমি কী করে জানব?

    আমাদের এ বাড়িতে একদিনও আসেননি-না?

    ও বাড়িতেও আর আসত কই শিগগির। খেটে-খেটেই ফুরসৎ নেই? ঐ ফিতেটা দে তো। বড়ো যে দরদ দেখছি তার জন্য। দু-চক্ষে দেখতে পারতিস না তো!

    আমার ইচ্ছায় তো জগৎ চলে না—স্বাতী পাশ ফিরে একটি হাত রাখল শালের তলায়। আমি দেখতে না পারলেই তো মন্দ হয়ে যায় না মানুষ। জবাব না দিয়ে শাশ্বতী হেজেলিন-স্নোর মুখ খুলল। হলদে আর কালো মলাটের সেই শশাওয়ানো বইটার উপর আবার চোখ পড়ল স্বাতীর।

    ছোড়দি, মার্ক্স কী?

    মার্ক্স—মার্ক্স একজন মানুষ।

    তার লেখা বই?

    তার—তার বিষয়ে।

    বিষয়ে মানে?

    মানে-–শাশ্বতীর পাউডার-প্যাডটা থেমে গেল মুখের উপর, এই আর কী। ইনক্সা আনন-রেণু মুখে বুলোতে-বুলোতে সে কথা শেষ করল—জানতে চাস তো হারীতবাবুকে জিজ্ঞেস করিস। তিনি জানেন বুঝি এ-সব?

    জানেন না! কত বড়ো বিদ্বান! লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের পাশ করা! শাশ্বতী সরে এসে একখানা শাড়ি পরতে লাগল যার রং ঠিক কালোজামের ভিতরটার মতো। ওঁর কাছে ইকনমিক্স পড়ো বুঝি তুমি?

    যাঃ!

    যাঃ কেন? পড়লেই পার, প্রায়ই তোত আসেন।

    কী অদ্ভুত! প্রায়ই আসেন কখন? শাশ্বতী কোঁচার মতো করে কোমরে গুঁজল শাড়ি। তারপর পিঠের উপর দিয়ে আঁচলটা ঘুরিয়ে আনতে-আনতে বলল–কী ওঁদের সভা-টভা সব হয়— তারই খবর দিয়ে যান মাঝে-মাঝে। তোকে বলি না কতবার যেতে। যাস না তো কখনো? কী হয় সভায়?

    কত রকম হয়! গান, বক্তৃতা, তর্কাতর্কি—

    বাজে! স্বাতী ঠোঁট বাঁকাল।

    বাজে কী রে? হারীতবাবু চমৎকার বলেন—কত শিক্ষা হয় ওঁর কথা শুনলে। শাড়িটাকে এখানে কুঁচকে, ওখানে একটু টান করে দিতে-দিতে শাশ্বতী আর একবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। স্বাতী তার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বলল—দিদি, তোমার ঐ চৌকো বাক্সের পাউডারটা কিন্তু বিশ্রী।

    বিশ্রী? শাশ্বতী হেসে উঠল।

    বড্ডো কটকটে।

    ফেস-পাউডার কিনা। স্বাতীর কথা উড়িয়ে দিল শাশ্বতী। কিন্তু আয়নায় সূক্ষ্ম চোখে একটু তাকিয়েও দেখল। খুব কি উগ্র হয়েছে? না, ঠিকই। তবু আর একবার পাউডার-প্যাড হাতে নিয়ে বলল, কে একজন লেখক না তার ফ্যাশনেবল নায়িকার মুখে কিউটিকুরা পাউডার মাখিয়েছিলেন? কী বুদ্ধি!

    কেন? আর একবার তাজ্জব বনল স্বাতী।

    কিউটিকুরা বুঝি মুখে মাখে?

    মাখে না? প্রতিবাদের বেগে স্বাতী উঠে বসল একেবারে—আমি তো মাখি। তুমিও তো মেখেছ কত। কথাটা যেন শুনতেই পায়নি, এমনিভাবে শাশ্বতী বলল—সেদিন ঐ লেখককে নিয়ে কী ঠাট্টা অগ্রণী সংঘে! সবশেষে হারীতবাবু তুললেন ঐ পাউডারের কথাটা—

    তাঁর কাছে অনেক রকম শিক্ষাই তো হয় তাহলে—স্বাতী যেন অভিভূত হয়ে পড়ল হারীতবাবুর জ্ঞানের পরিধিতে। বোনকে নরম হতে দেখে শাশ্বতী সুখী হয়ে বলল–তুই দেখিস এটা মেখে। কত ভালল, তুলনা হয় না।

    তা তুমি যা-ই বল, কিউটিকুরার মতো গন্ধ নয় আর কিছুরই–বলতে বলতে স্বাতী উঠে দাঁড়াল।

    হারীত যখন এল, তার একটু আগে রাজেনবাবু ফিরেছেন আপিশ থেকে। আর স্বাতী ছোটো পটে করে তার চা নিয়ে এসেছে বসবার ঘরে। বাবার চা ঢেলে দিয়ে স্বাতী হেসে বলল–আমি একটু চা খাই, বাবা?

    রোজ-বোজ আর অনুমতি চাওয়া কেন?

    তবে রোজ খাব, কেমন বাবা? এখন তো বড়োই হয়েছি—না? বাবার গলা একটুখানি জড়িয়ে ধরেই স্বাতী সরে এল চায়ের কাছে। তুমি একটু খাবে, ছোড়দি? একটু দূরে জানলার কাছে ইজিচেয়ারে শাশ্বতী সেজে-গুজে বসে ছিল সেই হলদে-কালো মলাটের বইটা চোখের সামনে খুলে। সংক্ষেপে জবাব দিল–না। চামচে দিয়ে চা খেতে-খেতে স্বাতী বলল–ঈশ কী ভালো হয়েছে চা-টা, চমৎকার!

    স্বাতী, তোর চামচে দিয়ে চা খাওয়াটা ছাড় তো! ছুটে এল সুশিক্ষিত শাশ্বতীর মন্তব্য।

    কেন, কী হয়?

    কেউ খায় না।

    খায় না আবার! অনেককে আমি দেখেছি—

    তারা সব ক্যাবলা।

    চামচে দিয়ে যারা খায় না, তারা বুঝি কেউ ক্যাবলা না? মুখে ও-কথা বলে স্বাতী চামচে রেখে দু-আঙুলে পেয়ালা তুলল বয়স্ক ধরনে। তারপরেই—নাঃ, চামচে দিয়েই ভাল! বলে তাকাল ছোড়দির দিকে। কিন্তু শাশ্বতী হঠাৎ মেন-একটু চঞ্চল হয়ে উঠে গম্ভীরভাবে চোখ ডোবাল বইয়ে। বাইরে জুতোর শব্দ হল, আর মৃদু কিন্তু স্পষ্ট তিনটি বিলিতি টোকা পড়ল দরজায়। রাজেনবাবু বললেন–দ্যাখ-তো কে। কিন্তু স্বাতী বসে-বসেই বলল–আসুন। পরদা ঠেলে হারীত ঘরে এল। ঢিলেঢালা রকমের একটা পাতলুন পরা, আর গলা-খোলা শার্ট। ঢুকেই রাজেনবাবুকে দেখে দু-হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে বলল—এই যে, ভাল? স্বাতী, চা-রাজেনবাবুর ব্যস্ত ভাব।

    না না, আমি চা না, এইমাত্রহারীত একটু ঝুঁকে স্বাতীর দিকে তাকাল—এসে অসুবিধে করলুম কি? ভাবখানা এইরকম যেন ঘরের তিনজনের মধ্যে স্বাতীই প্রধান। স্বাতী হেসে ফেলল। কীরকম জোর দিয়ে-দিয়ে কথা বলেন ভদ্রলোক, চা-কে বলেন চ্চা, এসে, কে এশ-শে। অসুবিধে কী, একটু থামল স্বাতী, আবার বলল—বসুন। স্বাতীর অনুরোধ উপেক্ষা করল না হারীত। কয়েক পা হেঁটে গিয়ে শাশ্বতীর পাশের চেয়ারটিতে বসলকী, পড়লেন?

    সবটা হয়নি—চোখ আনত শাশ্বতীর, কণ্ঠ ক্ষীণ।

    হাঁটুতে হাঁটু তুলে টিপে টিপে পাইপে তামাক ভরতে-ভরতে হারীত বলল—বিষয়টা শক্ত। তবে এ ছাড়া তো আর বিষয় নেই আজকাল। আমরা অবশ্য দিব্যি খেয়ে-দেয়ে চাদের বিষয়ে পদ্য লিখে দিন কাটাচ্ছি। এদিকে একটা বডোরকমের লড়াই—পাইপ মুখে তুলে সে কথাটা শেষ করল—বাধল বলে। সেজন্য এখন থেকেই দেশলাই জ্বালতে গিয়ে হঠাৎ থেমে, পাইপটা মুখ থেকে হাতে নামিয়ে গেঞ্জি-পরা বাবাটির দিকে তাকিয়ে বলল-I am sorry.

    না, না, তাতে কী! আমি বরং—রাজেনবাবু উঠতে গেলেন।

    আপনি বসুন—দেবতার বরদানের মতো হাতটি উঁচু করল হারীত—এতে অবশ্য কিছু নেই, তবে আমাদের দেশে একটা নিয়ম যখন আছে, আমি বরং বাইরে একটু পাইচারি…। স্বদেশের প্রথাকে প্রতি পদক্ষেপ সম্মানিত করে হারীত পাইপ হাতে বেরিয়ে গেল।

    ******

    একটু পরে চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে রাজেনবাবু আস্তে-আস্তে উঠে ভিতরে এলেন। শাশ্বতী বসে বসে কয়েকটা আঁকাবাঁকা ভঙ্গি করল শরীরের, আর বসেই রইল। স্বাতী এল বাবার সঙ্গে-সঙ্গে-একটু বেড়াতে যাবে, বাবা?

    চল। রাজেনবাবু তক্ষুনি রাজী।

    চলো, ঐ মাঠটায় হাঁটি একটু।

    বেশ। দু-মিনিটে তৈরি হয়ে এল স্বাতী—বাবা। শুয়ে পড়লে? যাবে না—হঠাৎ থেমে বাবার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে স্বাতী বলল—থাক বাবা, না গেলাম।

    কেন রে? চল আমি এমনিই শুয়েছিলাম একটু—

    স্বাতী শিয়রে বসে বলল—না বাবা, তুমি শোও, আমি তোমার পাকা চুল বাছি।

    আর কি বাছবার সময় আছে?

    ইশ, কটাই বা চুল পেকেছে তোমার, তাই নিয়ে এত জাক? হাত দিয়ে চুল সরাতে-সরাতে তক্ষুনি আবার বলল–উঃ! কত! সঙ্গে সঙ্গে—পট্‌।

    লাগে!–রাজেনবাবু নড়ে উঠলেন।

    কী ছেলেমানুষের মতো কর! চুপ করে শোও না! বাবার মাথাটি স্বাতী ঘুরিয়ে নিল নিজের ইচ্ছেমতো। চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে বলল—সুন্দর চুল তোমার, বাবা!

    হবেই! স্বাতীর বাবা তো আমি–আবছা শশানাল বাবার গলা। বাবার যখন একটা চুলও পাকেনি, কেমন ছিলেন দেখতে? সে যেন বাবাকে একরকমই দেখেছে বরাবর, মনে হয় এ-রকম ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না কখনো। কিন্তু সত্যি-ততা আর তা-ই নয়। পুরোনো দু-একটা ছবি আছে বাবার। এতই অন্যরকম যে, দেখলে হাসি পায়। কিন্তু যখনকার ছবি তখন তোঠিকই ছিল। বাবা—স্বাতী ডাকল—ও বাবা! ভারি নিশ্বাসের শব্দ শুনল উত্তরে। ও মা! ঘুমিয়ে পড়লে কেমন অবাক লাগল স্বাতীর, বাবাকে এই সন্ধ্যেবেলায় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়তে দেখে। নড়ল না, চুপ করে বসে রইল সেখানেই, আলো কমে-কমে রাত নামল ঘরে…বাইরে থেকে হঠাৎ ভেসে এল হাসির শব্দ, সরু মোটা গলায় মেশানো।

    ******

    সন্ধ্যের পর স্কুলের পড়া নিয়ে বসে স্বাতী বলে উঠল—ছোড়দি, হারীতবাবুর বইটা। বইটা কী?

    ফিরিয়ে দিলেই পারতে, পড়বে-তো আর না—

    তোর তাতে কী! ঝামটা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে শাশ্বতী ভাবতে লাগল, হারীত যে বলে গেল রোববার বিকেলে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটুটে যেতে, সেটা কেমন করে সম্ভব হবে।

    পরের দিনও এই কথাই ভাবছিল সে। দুপুরবেলা বই হাতে পাড়ার দুটি সহপাঠিনীর সঙ্গে কলেজের উল্টোদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। অগ্রণী সঙ্রে যে কটি সভায় সে গিয়েছে, সবই রাসবিহারী এভিনিউর এক বডোলোকের বাড়িতে। একা যাওয়া-আসা করা গেছে সহজেই। কিন্তু কলেজ স্কোয়্যার! এদিকে হারীতের কাছে প্রকাশ করেনি তার এই অসুবিধের কথাটা। কী ভাববে সে! কত মেয়ে আজকাল একলা টহল দেয় সারা শহর, আর সে বুঝি–। উঠে পড়ুন–ছোটো ছাইরঙের একটি গাড়ি এসে থামল ঠিক তার সামনে। উঠে পড়ুন– হাত নেড়ে আবার ডাকল হারীত।

    আপনি!

    আসুন, হারীত হাত বাড়িয়ে দরজা খুলে দিল। শাশ্বতীর চেহারাটা হল মূর্তিমতী দ্বিধা। আমতা-আমতা করে বলল—না, আমি ট্রামেই। পাশের মেয়েটি কানে-কানে বলল-কে রে?

    হারীত গলা বাড়িয়ে বলল—ও, বন্ধুদের জন্যে বুঝি? তা সকলকে তুলে নিতে পারলে আমি তো সুখী হতাম খুব। কিন্তু দেখছেন তো একজনের বেশি…অতএব আপনারা অনুমতি করলে–একটু হেসে সে অন্য মেয়ে দুটির দিকে তাকাল। যা–পাশের মেয়েটি আস্তে একটু ঠেলে দিল শাশ্বতীকে দয়া-মায়াও নেই তোর?

    ঐ যে ট্রাম-বলে এগিয়ে গেল অন্য মেয়েটি। ট্রাম চলে গেল বন্ধু দুজনকে নিয়ে। কেমন একটা ট্রেন-ফেল-করা চেহারা করে শাশ্বতী দাঁড়িয়ে রইল সাড়ে দশটা বেলার বড়ো রাস্তার ব্যস্ততার মধ্যে। হারীত বলল—আর ভাবছেন কী? শাশ্বতী গম্ভীর হয়ে বলল—অনেক ধন্যবাদ মিস্টার নন্দী, কিন্তু।

    ওহ! ডোন্ট বি সিলি! এমন একটা অসহিষ্ণু অথচ সকৌতুক মুখভঙ্গি হল হারীতের, যে শাশ্বতী আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি বেঁকল ডান দিকে হাজরা রোড ধরে। এ কী! শাশ্বতী দরজা ধরে চেঁচিয়ে উঠল—এদিকে না! হারীত কোনো জবাব না দিয়ে গাড়িটিকে আস্তে দাঁড় করাল একটি পেট্রলপাম্পে। স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল শাশ্বতীর, মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—ও!

    পকেট থেকে পাইপ বের করল হারীত। গাড়ির গায়ে ঠুকে ঠুকে পোড়া তামাক ফেলে ল্লি। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল—আপনি ভেবেছিলেন আমি আপনাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি? আগুনের রঙ ছড়িয়ে পড়ল শাশ্বতীর কুমারী মুখে। দৃশ্যটা উপভোগ করতে-করতে হারীত আবার বলল–আর সে রকম কোনো দুরভিসন্ধি যদি আমার থাকেই, আপনি ভয় পাবেন কেন? নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না? শাশ্বতী মুখ ফিরিয়ে দেখতে লাগল কাচের স্তম্ভে ফিকে-সোনালি পেট্রলের বুড়বুড়ি-তোলা নেমে আসা। একটু পরে গাড়ি চলল রসা রোড ধরে বরাবর দক্ষিণে। জ্বলজ্বলে রোদ, ট্রাম-বাস ভরতি, প্রত্যেকটি বাড়িফেরা ট্রামে তার কলেজের মেয়েরা। কী অস্বস্তি! মনে হচ্ছে অপরাধ করলাম চিবিয়ে চিবিয়ে হারীত বলল। গাড়িটা বেশ তো—এতক্ষণে শাশ্বতী কিছু বলবার কথা খুঁজে পেল।

    আমার এক বন্ধুর গাড়ি, আমি ব্যবহার করি। বড্ডো ছোটো, অসুবিধে হচ্ছে?

    হলেই বা কী করা!

    বইগুলো অন্তত কোল থেকে নামাতে পারেন।

    থাক। রাসবিহারী এভিনিউর মোড় পার হতে হতে হারীত বললনাঃ, আপনাকে কষ্ট দিলাম, কিন্তু আমি তো আর আপনার সুখের জন্য আপনাকে আসতে বলিনি।

    তবে?

    আমার সুখের জন্য—নিশ্চয়ই!

    শাশ্বতী মুখ নিচু করল।

    রোববার আসছেন তো?

    দেখি।

    দেখি আবার কেন?

    এত দূর—

    দূর? দূর আবার কী! আসতেই হবে আপনাকে। শাশ্বতী এক হাতে কপালের চুল সরাল। তার ঈষৎ নোওয়ানো আধখানা মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা নতুন কথা ঝিলিক দিল হারীতের মনে—আচ্ছা ভাববেন না, আমি যাবার সময় তুলে নেব আপনাকে।

    না, না!

    এতে আঁৎকাবার কী আছে?

    মিছিমিছি অসুবিধে—

    অন্তত ট্রাম-বাস-এর চেয়ে বেশি অসুবিধে না—

    সে কথা না—

    তবে আবার কী! ছটায় তৈরি থাকবেন, আমাকে যেতে হবে একটু আগেই।

    না, সত্যি দেখুন—

    সত্যি দেখুন! মুখে-মুখে ঠাট্টা করে উঠল হারীত। শাশ্বতী হেসে ফেলল।

    বড়ো রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে শাশ্বতী গলিটুকু হেঁটে এল। কেন, বাড়ি পর্যন্ত গাড়িতে এলে কী হত? সত্যি, কী বিশ্রী আমার মনের এই—! বাজে সব! মানে হয় না কোননা, রোববার যাব হারীতের সঙ্গে গাড়িতে নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!

    ******

    কিন্তু হল না। রাজেনবাবু বললেন—তুই একা ওর সঙ্গে যাবি কী রে?

    গেলে কী হয়?

    হবে আবার কী—এ রকম যায় না। তুই ওকে না বলে আয়।

    না! যে-বাবার মুখে কোনোদিন কোনো না শোনেনি সে-বাবার মুখে না! যেখানে গেলে নানা বিষয়ে শিক্ষা হয়, সেখানেও নিজের ইচ্ছেমত যেতে পারবে না, এত পরাধীন সে! আর এতদিন ধরে সে ভেবে এসেছে তার বাবা অন্য বাবাদের মতো নয়! মাথা ঝেকে বলে উঠল–আমি পারব না কিছু বলতে।

    আমিই বলে আসি তবে।

    না, না! কিন্তু ততক্ষণে রাজেনবাবু অন্তর্হিত। একটু পরে ঢাকাই জামদানি পরা শাশ্বতী শুনল ছছাটো গাড়িটির চলে যাওয়ার শব্দ। ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে রাজেনবাবু বললেন—কী রে, তোর মন খারাপ হল নাকি খুব? কী

    বললে তুমি হারীতবাবুকে?

    বললাম, শাশ্বতী আজ যাবে না।

    এই বললে তুমি! শাশ্বতী আর্ত ভঙ্গিতে হাত তুলল।

    কী বলব তবে?

    বলতে পারলে না অসুখ করেছে?

    কেন, অসুখ করেছে নাকি তোর? রাগে শাশ্বতীর ইচ্ছে করল গায়ের জামা-কাপড় টেনে ছিড়তে। ছি ছি, এর পরে কী করে মুখ দেখাবে সে? আর বাবা কী-রকম মানুষ, দিব্যি বলে এলেন সে যাবে না! অপমান করলেন একজন উঁচু দরের মানুষকে! আর কি সে আসবে? না, আসবে তো না-ই, তার উপর কী ভেবে গেল তাকে! কী বিশ্রী, কী-রকম একটা জড়ভরত ভূত! যদি কোনোরকমে আজকের সভাটায় সে যেতে পারত, তাহলে..তাহলে অন্তত বুঝিয়ে বলতে পারত—

    তা এতই যদি তোর যাবার ইচ্ছে—ঠিক তার মনের কথাটাই বাবার মুখে শুনতে পেল শাশ্বতী— বিজুকে নিয়ে বাস-এ চলে যা। কিন্তু বিজু রাজি হল না। শার্টের কলারটা উঁচু করে তুলে দিয়ে সে তখন বেরোচ্ছে আড্ডা দিতে।-বক্তৃতা নাকি? সর্বনাশ! আমি ওর মধ্যে নেই। একদিন না-হয় গেলি একটু ছোড়দিকে নিয়ে—রাজেনবাবু অনুরোধ জানালেন!–আমি না!—ত্বরিতে নিষ্ক্রান্ত হল বিজু। তখন রাজেনবাবু বললেন—তাহলে চল আমিই। বাবার সঙ্গে? তা হোক, তবু তো যাওয়া হবে। শাশ্বতী উঠল তার বিপর্যস্ত প্রসাধনের মেরামত করতে। রাজেনবাবু ডাকলেন–স্বাতী, যাবি নাকি?

    কোথায়, বাবা? স্বাতী ছুটে এল পাশের ঘর থেকে।

    তোর ছোড়দিকে নিয়ে মিটিং-এ যাচ্ছি—

    তুমি কেন?

    যাই। একটু বেড়ানোও হবে আমার।

    না, তুমি যাবে না।… হাসছ কী? একটাই রোববার। এখন আবার বাস-এর ঝাঁকানি খেতে খেতে কলেজ স্কোয়্যার-পাগল?

    রোববারটা এমনিই বসে-বসে—

    বসে-বসে না আরো-কিছু! কেন, দাদা যেতে পারে না?

    তার সময় হয় না।

    যত সময় বুঝি তোমার? এমন রাগ হয় সত্যি–!

    ঘরে এল ব্যাগধারিণী শাশ্বতী।

    ছোড়দি, বাবা কিন্তু যাবেন না। তাকে দেখামাত্র স্বাতীর ঘোষণা। শাশ্বতী থমকে দাঁড়াল ঘরের মধ্যে।

    —যাই না! রাজেনবাবু দেখলেন শাশ্বতীর মুখে মেঘ আর স্বাতীর চোখে বিদ্যুৎ। অসহায়ভাবে বললেন–যাই কেমন? তুইও চল।

    ছোড়দি, তুমি কেমন? স্বাতী দাঁড়াল কোনের মুখোমুখি বাবাকে আবার টেনে নিয়ে যাচ্ছ—

    আহা, ও-তো কিছু বলেনি–

    স্বাতী!–শাশ্বতী গর্জন করে উঠল—তুই এ বাড়ির কর্তা হলি কবে থেকে?

    ককখনো না!–স্বাতীও গলা চড়াল-ককখনো তুমি যাবে না বাবা—আমি বারণ করছি! চাইনে, চাইনে যেতে—এ বাড়িতেই আর থাকব না আমি! শাশ্বতী ছুটে গিয়ে জানালার শিক ধরে ফোঁপাতে লাগল।

    ******

    মিথ্যে হল না মুখের কথা, একটি মাসও কাটল না এরপর, হারীত বিয়ের প্রস্তাব জানাল। সেদিনও রবিবার। বাজার নিয়ে এসে রাজেনবাবু বাইরের ঘরে বসে কাগজ পড়ছেন, হারীত ঢুকল গটগট করে।সেদ্দিন তার পোশাকটা—বোধহয় আইনত শীতঋতু আরম্ভ হয়েছে বলেই একটু আঁটোসাঁটো। পালুনে কড়া ইস্ত্রি, নেকটাইটি পরিষ্কার। শরীরের একটা কুণ্ঠিত ভঙ্গি দিয়ে রাজেনবাবু অভ্যর্থনা জানালেন। বসুন। বলে কাগজের পাতাগুলি গুছিয়ে নিয়ে তিনি উঠতে যাচ্ছিলেন, হারীত বলল-আপনি উঠবেন না, আপনার সঙ্গেই আমার কথা। রাজেনবাবু শান্ত চোখে যুবকের মুখের দিকে তাকালেন।—কথাটা হচ্ছে-হারীত চেয়ারে পিঠ খাড়া করে হাতলে দুটো টোকা দিল—আমি শাশ্বতীকে বিয়ে করতে চাই। আপনি নিশ্চয়ই বুঝেছেন যে শাশ্বতীরও এ-ই ইচ্ছে, এখন আপনার মত হলেই হয়ে যায়।

    শাশ্বতী—নামটা হারীতের মুখে একটুও মধুর শুনলেন না রাজেনবাবু। কেন-যে এই ছেলেটিকে ভালো লাগে না! খারাপ তো কিছু নয়—ভালো ছেলে! শিক্ষিত, বিলেত-ফেরৎও, উৎসাহী, বুদ্ধিমান। তবু-ওর চাল-চলন, হাব-ভাব, কথা বলার ধরন—সব যেন…। অন্য তিন জামাই এসে দাঁড়াল চোখের সামনে…দিলখোলা ফুর্তিবাজ জামাই প্রমথেশ, একটু রাগী হেমাঙ্গ… কিন্তু চাপা ঠোঁটের কম কথায় বেশি বুদ্ধির মানুষ, উশকোখুশকো চুলে দিশেহারা অরুণ; তাদের পাশে এই—এই—কী? কী জানি! আজকালকার ভালো-ভালো ছেলেরা বুঝি এইরকমই, আমি পুরোনো লোক আমার চোখের দোষ। কন্যাপক্ষকে নীরব দেখে পাণিপ্রার্থী আরো বলল— আমার সম্বন্ধে কিছু খবর আপনাকে জানাবার আছে, চাকরি করি ইনশিওরেন্স আপিশে। এখন পাচ্ছি তিনশো, প্রসপেক্ট আছে। বাবা উকিল—আইনের বই-টই লেখেন, থাকেন ভবানীপুরে ঠাকুরদার আমলের বাড়িতে, দুই কাকাও সেখানে—আমি সম্প্রতি আলাদা ফ্ল্যাট নিয়েছি রাসবিহারী এভিনিউয়ে।

    —কেন? একটুও দেরি না করে আপনার মেয়েরই সুখের জন্য—জবাব দিল হারীত। চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল—তাহলে আপনি কী বলেন?

    -তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলবো।

    –নিশ্চয়ই, ও-সব ফর্মালিটি তো আছেই। তবে এবিষয়ে বাবার যখন আলাদা কোনো মত নেই, আপনি আমার সঙ্গেহারীত উত্তরের জন্য রাজেনবাবুর মুখের দিকে তাকাল, উত্তর না পেয়ে উঠে দাঁড়াল। আচ্ছা, চলি। কাল আবার আসবো এই সময়ে। দরজার দিকে যেতে যেতে একটু থামলো রাজেনবাবুর সামনে, গলা নিচু করে চোখে কেমন একটা উদাস ভাব এনে বলল একটা কথা বলি, এ বিয়ে হবেই, আশা করি মিছিমিছি একটা গোযোগ…! দেখি।

    হারীত চলে যাবার পর রাজেনবাবু তেমনি বসে রইলেন চেয়ারটিতে। কী দোষ? হারীতের কী দোষ? কেন মনে হচ্ছে না চমৎকার, কেন সুখী হতে পারছেন না—কেন তার মুখে দেখতে পাচ্ছেন না প্রমথেশের ভালোমানুষি, হেমাঙ্গর ধার, অরুণের লাবণ্য? কেন ওদের পাশে বসাতে গিয়েই মন কুঁকড়ে ফিরে আসছে? কিন্তু মেয়ে তাকে পছন্দ করেছে, মেয়ে সুখী হবে, আমি কে? কিছুই কি নই? আমার না ওরা? না। ফল কি গাছের? মুকুল গাছের, ফুল গাছের, ফল পৃথিবীর। যে মুহূর্তে পাকলো সেই মুহূর্তে দিতে হবে পৃথিবীকে, না দিলে ফল পচবে, গাছ মরবে।…যদি পড়ে পোড়া জমিতে, জোলো জমিতে, মরুভূমিতে?… কে জানে, কেউ কি বলতে পারে? কাকে জিগেস করবেন? কার সঙ্গে কথা বলবেন আজ? বিছানায় শুয়ে, অত কষ্ট পেয়ে, রোগে ধুকতে-পুঁকতে, তবু-ততা সে ছিল! গেল কোথায়?…তবে কি সত্যি চলে গেল, আর দেখবো না, তার মেয়ের বিয়েতেও দেখতে পাবো না একবার?

    বাবা!—এইমাত্র স্নান করেছে স্বাতী, পরেছে লাল পাড়ের সাদা একটি শাড়ি, ভিজে চুল মেলে দিয়েছে পিঠে। তাকিয়ে রাজেনবাবু কথা বলতে পারলেন না। বলবার কিছু নেই, বললেও কেউ শুনবে না। দিতে হবে, আমাকেও দিতে হবে, আমার কাছেও পৃথিবীর পাওনা ছিল তিনটি, চারটি, পাঁচটি কন্যা।

    —বাবা, তুমি যেন বড়ো চিন্তিত?

    –শোন স্বাতী, তোকে একটা কথা বলি—

    —কী, বাবা?

    –আচ্ছা, হারীতের সঙ্গে তোর ছোড়দির বিয়ে হলে কেমন হয় রে?

    —ভালো-তো!

    –ভালো? তোর ভালো লাগে হারীতকে?

    —আমার? স্বাতী আর-কিছু বলল না। রাজেনবাবু জিগেস করলেন-শাশ্বতী বেশ সুখী হবে, তোর মনে হয়?

    -কেন হবে না? বলে স্বাতী ঘুরে দাঁড়ালো, একটু-যেন লাজুক ধরনে। চোখে লাগল লাল পাড়ের ঝলকানি। এরকম তো হয়েছিল। আগে একবার… হঠাৎ মনে হল রাজেনবাবুর, ঠিক এরকম, এমনি এক অঘ্রানের সকালে…ঠিক এই মুহূর্তটি, এই ঘর-আলোকরা লাল পাড়, ভিজে চুলের গন্ধ, ঘুরে দাঁড়ানোর চমক—কবে? কবে? সে কি এ জন্মে, সে কি আর-এক জন্মে? সে কি এই জগতে? না আর-এক জগতে? সে কি আমি? সে কি সত্যি আমি? সে আরএকটি পনেরো বছরের মেয়ে, তাকে মনে পড়ে না? আমাকে আর মনে পড়ে না? আমাকে আর মনে পড়ে না তোমার?—ছোড়দিকে ডাকব, বাবা? স্বাতী নিচু হয়ে থুতনি রাখলো বাবার কাঁধে। মাথা সরিয়ে নিলেন রাজেনবাবু, দুই চোখ ভরে দেখতে লাগলেন, যেন স্বাতীকে আগে দ্যাখেননি। সেই কোঁকড়া-কালো মাথাটা, যত মুখ জীবনে দেখেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মুখ। সে-মুখ তো নেই আর! যে-মুখে শুধু আনন্দ ছিল, শুধু অমৃত, সে-মুখে কেন আশঙ্কা, কেন অশান্তি? কী-যেন লুকোনো আছে, সেই লুকোনোকে তার ভয়। চোখ এমন বড়ো-বড়ো ছিল না তার, এমন বাঁকাও ছিল না। কখনো এমন আশ্চর্য লাগেনি তার মুখ, এত আশ্চর্য যে অচেনা…যদিও চারটি মেয়েকে এর আগে বড়ো হতে দেখেছেন, তবু রাজেনবাবু যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না যে এ তারই কন্যা।

    –কিছু বলছে না যে? আবার প্রশ্ন স্বাতীর–আচ্ছা, বলে রাজেনবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, আর সেদিন থেকেই লেগে গেলেন টাকা যোগাড়ের চেষ্টায়। তারিখ পড়ল অঘ্রানেরই শেষে। দেখতে দেখতে পাড়ায় ছড়াল বিয়েবাড়ির শোর।

    ******

    যাকে বলে বিয়েবাড়ি! ভিড়, হৈ-চৈ, অফুরন্ত রান্না আর খাওয়া। এক বছরে যদিও তিন মেয়েই যাওয়া-আসা করেছে দু-একবার, আর পুজোর সময় একবার তো আর সরস্বতী একসঙ্গেও এসেছিল কিছুদিন—তবু চেষ্টা করেও তিন মেয়েকে একত্র করতে পারেননি রাজেনবাবু। খুব আশা ছিল যে শাশ্বতীর বিয়ের সময়…কিন্তু হলো না। হেমাঙ্গ রেনাল-কলিকে ভুগছে, তাকে নিয়ে আসা অসম্ভব, তাকে রেখে আসাও তা-ই। লম্বা একটি চিঠিতে মহাশ্বেতা কদল বাবার কাছে পাঠাল সেই খামেই পাঁচশো টাকার ড্রাফট, আর পার্সেলে বর্মি স্যাকরার শিল্পকলার কয়েকটি নমুনা। নতুন বাড়িতে মেয়ে-জামাইরা এই প্রথম এল। সবচেয়ে বড়ো পুব-দক্ষিণ-খোলা ঘরটি, শাশ্বতী আর স্বাতী যেটাতে থাকে—মানে থাকতো সেটি রাজেনবাবু দিলেন শ্বেতাকে—সে বড়ো বলে নয়, তার ছেলেপুলে বেশি বলে। তার ঘর হল সরস্বতীর, আর বিজুর ছোটো ঘরে ছোটো দুই মেয়েকে দিয়ে তিনি এলেন বাইরের ঘরে—এলেন মানে আর কী, রাত্তিরের শোওয়াটা নিয়েই তো কথা।

    -আমি? আমি কোথায় পোব? বিজু গনগন করল। রাজেনবাবু বললেন—কেন? বাইরের ঘরে তো কত জায়গা।

    —মেঝেতে?

    রাজেনবাবু তক্তাপোশ আনালেন। স্বাতী বললো–তুমি বুঝি মেঝেতে শশাবে বাবা, আর দাদা তাপপাশে?

    –মেঝেতেই আরাম।

    —আমি পড়ব কোথায়? আমার পরীক্ষা না?

    —পরীক্ষা তো স্বাতীরও, রাজেনবাবু মাথা চুলকোলেন—তা একটা দিন–।

    –ঈশ! এমনিই পড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছিস! স্বাতী ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো-খুব সুবিধেই হলো তোর, চমৎকার ছুততা হলো একটা। বিজু রাগ করে দু-তিন খানা বই আর একটি বালিশ নিয়ে চলে গেল তার এক বন্ধুর বাড়িতে। শ্বেতা থেমে-থেমে বলল—সত্যি, ওকে কেন—আমরা নাহয়–ওর পরীক্ষা–।

    —ভালো-তো! রাজেনবাবু বললেন–যদি রাগ করেও একটু পড়ে-উড়ে, তবে-তো ভালোই।

    –তা-ওকে ডেকে আনবে না?

    -আসবেই।

    সারাদিন বাইরে কাটিয়ে সন্ধ্যের একটু আগে বাড়ি এসে বিজু হাঁক দিলো–স্বাতী আমার মশারি দে। শ্বেতা তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলল বেশ ছেলে! কোথায় ছিলি রে সারাদিন? আয়কী খাবি? বিজু মোট গলায় বললো—আমি চলে যাবো এক্ষুনি।

    —যা, ঘরে যা। তোর ঘর ঠিক করে দিয়েছি।

    ঘরে এসে বিজু অবাক। পরিষ্কার গুছোনো টেবিল, নতুন সুজনি দিয়ে ঢাকা বিছানা, আর বোন দুটোর চিহ্নমাত্র নেই। হাত-পা ছড়িয়ে তক্ষুনি শুয়ে পড়ল লম্বা হয়েউঃ বড়ো ঘোরাঘুরি হয়েছে সারাদিন। সন্ধ্যের পর শ্বেতা বলল–বাবা, আমি বাইরের ঘরেই বিছানা করতে বললাম, এখানে এক খাটে শাশ্বতী আর স্বাতী, আর-এক খাটে তুমি–

    —কেন?

    —বিজুকে তার ঘরেই দিয়েছি।

    —আর তুই বুঝি ছেলেপুলে নিয়ে এই ঠাণ্ডায়–

    –ঠাণ্ডা কোথায় কলকাতায় আবার শীত! মস্ত বিছানা হবে মেঝেতে, ছেলেপুলে নিয়ে বেশ ছড়িয়ে শোব।

    -হ্যাঁ, তাই বেশ। যা গড়ায় ওর এক-একজন! বলে প্রমথেশ এমনভাবে হেসে উঠল যেন এই গড়ানোটা খুব একটা আনন্দের ব্যাপার।

    –বিজুকে এ-রকম প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না—বললো সরস্বতী।

    —প্ৰশ্ৰয় কী রে? শ্বেতা জবাব দিলো—সকলেরই সুবিধে, আর ওর বুঝি অসুবিধে হবে?

    –অসুবিধে আবার কী-বোনেদের জন্য একটু কষ্ট করতে পারে না? দুদিনেরই তো ব্যাপার।

    —আহ—ছেলেমানুষ—ওর আবার।–

    –আমি-তো দেখছি ওর ছেলেমানুষি ঘুচবে না কখনোই। তোমাকে বললাম, বাবা, ওকে দিল্লিতে আমার কাছে রাখো, ঠিক মানুষ হয়ে যেতো ওখানে।

    —সত্যি নাকি রে? তবে আমার ডালিমটাকে রাখি তোর কাছে—এক্কেবারে পড়তে চায় না হনুমান! ছাইরঙের গরম স্যুট পরে অরুণ এসে দাঁড়াল—শোনো, একটা রুমাল দিতে পারো?

    –স্যুটকেসেই আছে দ্যাখো না, স্বামীর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল সরস্বতী।

    –খুঁজে পাচ্ছি না তো—

    –তুমি আবার কবে কী খুঁজে পাও। যা তো গীতি, বাবার একখানা রুমাল বের করে দে। গীতিও সেজেছিলো বাবার সঙ্গে বেরোবে বলে; পুতুলের মতো মাথা নেড়ে বললো–আমি পারবে না।

    —পারবি না! কিছুই পারবি না তোরা! সবই যদি আমাকেই করতে হবে, তা হলে আর ছেলেমেয়ে হয়ে আমার লাভ কী হলো!

    —আহা, দে না খুঁজে, রাজেনবাবু নিচু গলায় বললেন। মেয়ের গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে মাথায় কাপড় টেনে সরস্বতী উঠে দাঁড়ালো। শ্বেতা বলে উঠলো—তোর শাড়িটা দিসরে আমাকে পাড় লাগিয়ে দেব।

    —এটা? সরস্বতী একটু যেন অবাক হল।—এগুলো তো পাড় ছাড়াই পরে।

    –নাকি? পাড়-ছাড়া শাড়ির ফ্যাশন হয়েছে আজকাল? মা-গো, মা-গো! শ্বেতার যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না।

    —মনে নেই তোমার, সেই মিসেস দে—জজ-সাহেবের স্ত্রী—ঘর ভরে গেলো প্রমথেশের উচ্চহাসিতে।

    ******

    রাত্রে বিছানায় শুয়ে শাশ্বতী বললো স্বাতীকে—বড়দিটা কীরকম হয়ে গেছে রে!

    —কী হয়েছে?

    —কেমন বাঙাল-বাঙাল! স্বাতী একটু ভেবে বলল—আমার কিন্তু অন্যরকম লাগে।

    —কীরকম? লেপের তলায় বোনের আরো একটু গা ঘেঁষে স্বাতী চুপি-চুপি বলল–ঠিক মা-র মতো।

    –কী গরম রে? শাশ্বতী লেপ সরিয়ে দিল পায়ের উপর থেকে।

    –ছোড়দি, মাকে তোমার মনে পড়ে?

    –বাঃ, পড়ে না?

    —আমার কিন্তু মনে হয় ভুলেই গেছি। বড়দি যেদিন এলেন না—আমি কীরকম চমকেছিলাম প্রথম দেখে—ঠিক যেন.. দূর!

    মা বুঝি ও-রকম ছিলেন। ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখিস।

    কী জানি, আমি-ততা বড়দিকে বেশি দেখিনি, তাই বোধহয়—

    জামাইবাবুটা ক্যাবলা, একটু পরে শাশ্বতী মন্তব্য করলো—সেইজন্যেই বড়দি ওরকম হয়ে গেছে।

    যাঃ, জামাইবাবু খুব ভাললা—চমৎকার।

    ভালো সত্যি অরুণদা। কিন্তু কী-রকম বুড়োটে হয়ে গেছে রে এর মধ্যে! তোর সঙ্গে আজকাল বেশি ভাব দেখি না তার?

    দেখাই হয় না।

    তোর মনে আছে, স্বাতী–শাশ্বতী নড়ে-চড়ে বোনের মুখের কাছে মুখ আনল—সেই যে কেঁদেছিলি অরুণদাকে বিয়ে করবো বলে?

    যাঃ!

    কেঁদে একেবারে গঙ্গা-যমুনা! আর কী মেরেছিলি আমাকে–মনে নেই?

    যাঃ!

    কাণ্ডই করেছিলি, সত্যি…দিদিরা হেসে খুন! কথাটা মনে করে সেইরকমই হাসল শাশ্বতী, যেরকম দিদিরা হেসেছিল কথাটা শুনে দশ বছর আগে। কিন্তু ঠিক কি সে-রকম? একটু চুপ করে থেকে স্বাতী যেন আপন মনে বলল–আজ এক শুক্কুরবার গেল, আবার শুক্কুরবারেই তো—

    নে, ঘুমো এখন।

    ছোড়দি, একটা কথা বলবে?

    কী? একটু লজ্জা শাশ্বতীর মুখে।

    কেমন লাগছে?

    কেমন আবার! শাশ্বতী এক ঝটকায় পাশ ফিরল।

    ******

    দুপুরবেলায় সিনেমা দেখে বিকেলের রোদুরে বেরিয়ে আসতে যেমন লাগে, তেমনি লাগল হারীতের পরের শুক্রবারের রাত-শেষে শনিবারের সকালবেলায়। লোকজন, চলাফেরা, হাসি, কথা, ব্যস্ততা, রোদুরে মাখা শীতের সকাল, আর সে ঘুম থেকে উঠল একটা অচেনা বাড়ির অচেনা ঘরের মেঝেতে। পাশে আলপনা, হাতে হলদে সুতো, পরনে গরল। যেন সিনেমা শেষ, সকলে মিশে গেছে রাস্তার ভিড়ে, সে পড়ে আছে সিঁড়িতে একলা। নাঃ, এক পেয়ালা চা খেয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। গায়ের আড়মোড়া ভেঙে হারীত উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে হাত-মুখ ধুয়ে, গরদ ছেড়ে সাধারণ কাপড় পরে ঘরে এসে দ্যাখে রীতিমতো ভিড়। মেঝেতে মস্ত রুপোর ট্রেতে চা-শুধু কি চা! রুটি-মাখন, ডিমের পোচ, সোনারঙের মোটা-মোটা মর্তমান কলা, আবার ফুলো-ফুলো লুচি, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, সন্দেশ, পান্তুয়া, সরভাজা… হারীতের ভির্মি লাগল।

    সরস্বতী বলল—কী নন্দী-সাহেব, রাত্তিরে একটু ঘুমিয়েছিলে কি?

    খুব ঘুমিয়েছিলাম—হারীত গম্ভীরভাবে বসল এসে মেঝের বিছানাতেই, যেহেতু ঘরে চেয়ারটেয়ার কিছু নেই।

    ও মা, বিয়ের কাপড় ছেড়ে ফেললে! শেতা ব্যস্ত হয়ে উঠল–বাসি-বিয়ে হবে না?

    আরো গভীরভাবে হারীত বললো—আমি একটু বেরোবো।

    এখন! এখন কোথায় যাবে! আঁৎকে উঠল শ্বেতা। কতকিছু আছে এখন—

    আ–হা। মোটাসোটা প্রমথেশ খাটে এসে জুড়ে বসল-তোমাদের ওসব নিয়ম-টিয়ম ছাড়ো তো একটু! আজকালকার ছেলেদের কি ভালো লাগে ওসব! দাও, চা দাও ওকে।

    স্বাতী, যা তো তোর ছোড়দিকে ডেকে নিয়ে আয়।–এটা বোধহয় আজকালকার ছেলেটির ভালো লাগবে। সরস্বতী কটাক্ষ হানলো হারীতকে।

    মিছিমিছি লজ্জায় ফেলা বেচারাকে—মাথার কাপড়টি আরো একটু টেনে দিয়ে শ্বেতা বললো। কিন্তু না! বেনারসি আর গয়না-পরা শাশ্বতী বেশ হাসিমুখেই ঘরে এসে বড়োজামাইবাবুর কাছে বসল খাটে ঠেসান দিয়ে। এই ভুল করলে! ওখানে ওর পাশে গিয়েই বোসো না, একটু দেখি আমরা! বলে প্রমথেশ অনুমোদনের জন্য আর সকলের দিকে তাকাতে লাগল।

    আর জ্বালিয়ো না তো বাপু! শ্বেতা উব-হাঁটু হয়ে ট্রের কাছে বসে খাবার-সাজানো-সাজানো থালা এগিয়ে দিতে লাগল হারীতের দিকে।

    এ-সব দিয়ে কী হবে?

    খাও একটু?

    একটু?

    কাল-তো উপোশ করেছিলে–

    না। উপোশ কেন করব? শ্বেতা হেসে ফেলল—আচ্ছা, কাল না-হয় উপোশ করনি। তাই বলে আজ করবে নাকি?

    —একটু চা দিন। সরস্বতী এগিয়ে এলো চা ঢালতে। হারীত বলল, আপনারা? হাত নেড়ে জবাব দিল প্রমথেশ—আমাদের হয়ে গেছে অনেক আগে। বুঝছ না, মফস্বলের অভ্যেস, ঘুম ভেঙেই খিদে।

    —আপনি? প্রশ্নের লক্ষ সরস্বতী। মুখ টিপে হেসে সরস্বতী বললো—আগে বললে না—বসে থাকতুম তোমার জন্যে। ঢিলেঢালা ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা অরুণ ঘরে ঢুকে সোজা বসে পড়ল মেঝের উপর, কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল—আমাকে একটু চা। সরস্বতী চা ঢেলে প্রথমে দিলো জামাইকে, তারপর স্বামীকে।

    খাটের দিকে তাকিয়ে হারীত বললো—শাশ্বতী, তুমি?

    প্রমথেশ হা-হা করে হেসে উঠল, শ্বেতা হাসি লুকোল আঁচলে, আর সরস্বতী সহজভাবে বললচা খাবি, শাশ্বতী? শ্বেতা মুখ তুলে হারীতের দিকে তাকাল—ওর জন্য ভাবতে হবে না তোমাকে-তুমি খাও-তো এবার!

    একটি ডিম খেল হারীত, তারপর চায়ে চুমুক দিতে লাগল।

    তা হবে না, সব খেতে হবে। লুচির থালা এগিয়ে দিল শ্বেতা। হারীত শিউরে সরে এল। খাও!

    না।

    খা–ও!

    দেখুন, সকালে কিছু খাই না—

    রোজ-রোজ কি বিয়ে করো যে রোজকার মতো খেতে হবে? চালাকি, না? খাও শিগগির! অনেকটা আলু-ভাজা একখানা লুচিতে মুড়ে শ্বেতা গুঁজে দিল হারীতের হাতের মধ্যে। হারীত কাতরভাবে লুচিখানা খেয়ে উঠল।–আর কী খাবে? আসরে নামল সরস্বতী।

    আর না।

    ও, বড়দির হাতই পছন্দ তোমার? দাও বড়দি, আরো কিছু দাও নন্দীর হাতে। উনি আবার নিজে হাতে নিয়ে খেতে জানেন না।

    কিন্তু সন্দেশের বিরুদ্ধে একেবারে উপুড় হয়ে পড়ল হারীত। রীতিমতো সত্যাগ্রহ। শালিরাও ছাড়ল না, হত্যা দিল দু-দিক থেকে দু-জনে। শাশ্বতী বলে উঠল খাট থেকে এ কী একগুঁয়েমি! এত করে বলছে, খাও না!

    ও মা! এর মধ্যে এত? শ্বেতা হেসে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে, আর সরস্বতী একটু-যেন শুকনো গলায় বলল—আমরা তো ফেল হলুম রে, এবার তুই আয়, দ্যাখ পারিস যদি! দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রাজেনবাবু বললেন—খাওয়া নিয়ে জবরদস্তি কী বিশ্রী! যে যে-রকম ভালোবাসে সে রকম দিলেই হয়। মৃদুস্বরে বললেন, কিন্তু শুনতে পেলো সকলেই।

    তা—তা—ইচ্ছে করলে আর—থাকগে! মুখ ভার হল সরস্বতীর।–সকলের অভ্যেস তো একরকম না–বলে রাজেনবাবু অন্য দিকে চলে গেলেন।

    শ্বশুরকে দেখে হাতের সিগারেট নামিয়ে রেখেছিলো অরুণ, ত্বরিতে তুলে নিয়ে বলল–স্ত্রী যদি এক মাইল দূরে খাটে বসে থাকে, তাহলে কি আর খেতে ভালো লাগে কারো! শাশ্বতী এসো না এখানে? জমিদারি ধরনে পায়ের পাতায় হাত বুলোতে-বুলোতে একটু দুলে-দুলে প্রমথেশ বললো–তুমি তো বেশ লোক হে! বসেছ তো গিয়ে নিজের স্ত্রীটির মুখোমুখি, তার উপর আবার—

    বাঃ, তাই বলে অন্যের স্ত্রীর দিকে নজর দেব না একটুও!—কিছু মনে করো না, হারীত। সভাস্থল থেকে একটু দূরে জানালার ধারে বসেছিল স্বাতী, অরুণের কথাটা শুনে চোখ তুলে তাকাল। শালির বিয়েতে খুব-যে রস! উশকোখুশকো চুলের হাসিমুখ মানুষটিকে তীর ছুঁড়ল সরস্বতী। কিছুতেই খেলে না তো!—বলে শ্বেতা আঁচলে মুখ মুছে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু দমল না; দুপুরবেলা নতুন জামাইকে সাজিয়ে দিল মস্ত রুপোর থালায় বাটি-চেপে-গোলকরা ফুলের মতো ভাত, আর থালাটি ঘিরে হারের লহরের মতো ঝকঝকে কাঁসার ছছাটো-বড়ো বাটিযেন সাতাশবৌ নিয়ে চাদ। হারীত এসে বসতেই শ্বেতা বললো–খেতে হবে না, শুধু দেখবার জন্য দিয়েছি। দেখবার যোগ্যই—হারীতকে স্বীকার করতে হল। বলে দিন সবচেয়ে ভালো রান্না কোন কোনটা। শেতা খুশি হয়ে বলল—সবটাই চেখে দ্যাখো একটু-একটু।

    চেখে দেখব? বাকিটা ফেলা যাবে তো?

    সে তোমাকে ভাবতে হবে না!

    কী অপব্যয়! কত খাবার নষ্ট! সারি-সারি বাটির উপর চোখ বুলিয়ে হারীত স্বগতোক্তি করল। তা না-হলে আর বিয়ে কী!—শুক্তোটাকে উপেক্ষা করে ছোলার ডালের হেঁচকি দিয়ে খাওয়া আরম্ভ করলো প্রমথেশ–সেই সি. আর, দাশের গল্প জানো না-মেয়ের বিয়ের সময় খাজাঞ্চি এস্টিমেট দিল একলাখ টাকার। হেসে বললেন দাশসাহেব—আরে একলাখ টাকা তো চুরিই হবে, লাগবে কত বললা! বলে প্রমথেশ মাথা উঁচু করে হেসে উঠল।

    এই করে-করেই তো এই অবস্থা হয়েছে আমাদের। হারীত মাছের চপের কোনা ভেঙে মুখে দিল।–তা দেরি নেই আর, আসছে দিন! এ যাত্রাও কোনোরকমে ঠেকিয়ে রাখল চেম্বারলেন, কিন্তু যুদ্ধ হবেই, তখন দেখা যাবে কোথায় থাকে এসব!

    মানুষের আনন্দ-উৎসব বন্ধ হবে ভেবে তুমি যেন বেশ উৎসাহিত?—চুমুক দিয়ে শুক্তোর ঝোল খেয়ে নিল অরুণ-ডাক্তার। রাজেনবাবু নেবু নিংড়ে নিচ্ছিলেন ডালে, চোখ না তুলেই আস্তে বললেন—তা সত্যিই তো, অপব্যয়টা আমাদের বড়ো বেশি।

    অপব্যয় যখন হয়েই গেছে, সদ্ব্যবহার করা যাক! প্রমথেশ পাতে নিল উচ্ছে দিয়ে বাঁধা মৌরলা মাছ। সহজে কি শিক্ষা হবে আমাদের? রাস্তায় না খেয়ে মরবে মানুষ, তবে তো–হারীত বেছে বেছে হাত দিল সর্ষে-নারকোলের চিংড়িতে।

    মানুষের যারা উপকার করে তাদের কী মুশকিল! সাদা-সাদা লাউয়ের তরকারি দিয়ে একটু ভাত মেখে নিয়ে অরুণ বলল—মানুষ ভালো থাকলে ভালোই লাগে না তাদের।

    হঠাৎ বাবার কাঁধে মাথা হেলিয়ে জলের মতো ছলছল শব্দে হেসে উঠল স্বাতী! হারীত চট করে চোখ তুলে তাকাল একবার, তারপর খেতে লাগল নিঃশব্দে, গম্ভীরভাবে। স্বাতী, তুমি যে বসলে না?-প্রমথেশ কথা বদলাল।

    আমি দিদিদের সঙ্গে খাবো।

    কেন, ওকে আর বিজুকে বসিয়ে দিলেই হতো নতুন জামাইয়ের সঙ্গে।

    বিজু তো সেই কখন খেয়ে বেরিয়ে গেছে–জবাব দিলো শ্বেতা—আর স্বাতী—

    না, না—অরুণ বলে উঠল—ও-সব একসঙ্গে খাওয়া-টাওয়া হাইজিনিক নয়।

    তোমার মুখে এ কথা? সরস্বতী হাসল।—স্বাতী সঙ্গে না বসলে তোমার তো খাওয়াই হতো না।

    তার অবশ্য আলাদা কারণ আছে। কী স্বাতী, মনে নেই? অরুণ এক ঝলক তাকাল স্বাতীর দিকে।

    তোমাদের এসব সেকেলে ঠাট্টা নন্দীর ভালো লাগছে না, রাশ টানল সরস্বতী।–তা একেলে ঠাট্টা শুনি না দু-একটা! যাকে লক্ষ করে শ্বেতার টিপ্পনি, সে একটু লাল হল, কিন্তু থালা থেকে চোখ তুলল না। স্বাতী উঠে এল সেখান থেকে। আবছা মনে পড়ে, অরুণদাকে তার কী-ভালো লাগত ছেলেবেলায়; অত ভালো কাউকেই যেন আর লাগল না। শুভ্র, শুভ্রর বন্ধুরা, হারীতবাবু কেউ কি সেই অরুণদার মতো?…কিন্তু সে রকম আর নেই কেন, সে অরুণদার কী হল?..বড়ো হতে হতে ছেলেবেলার ভালোলাগা আর থাকে না বুঝি? ভাগ্যিস সে বড়ো হয়েছে—এখন থেকে ভালোলাগা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত, আর তো বদল হবে না-না কি হবে? সর্বনাশ!—স্বাতীর যেন দম বন্ধ হল মুহূর্তের জন্য। তা-ই যদি হয়, তাহলে ভালোলাগায় বিশ্বাস কী! শাশ্বতীর কাছে গিয়ে সে বলল—আচ্ছা ছোড়দি, একবার যাকে আমাদের ভালোলাগে, তাকেই কি ভালোলাগে বরাবর?

    কী বোকার মতো কথা! ছোড়দির সিঁদুর-ভরা মাথার দিকে স্বাতী একটু তাকিয়ে রইল চুপ করে। হঠাৎ বলল–ছোড়দি, আজ চলে যাবে?

    বিজুটা কই রে?

    জানি না তো!

    কখন থেকে দেখছি না ওকে?

    দাদা তো বাইরে বাইরেই—

    দেখে আয় তো, ফিরেছে নাকি। স্বাতী ঘুরে এসে বলল–না ছোড়দি, দাদা বাড়ি নেই। ট্যাক্সিতে ওঠবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শাশ্বতী বিজুর খোঁজ করল, কিন্তু বিজু ফিরল রোদেপোড়া চেহারা আর স্যান্ডেল-পরা ধুলো-মাখা পা নিয়ে সন্ধেবেলা। ঢুকেই বাড়ির থমথমে চুপচাপ ভাবটা তার ভালো লাগল না। এ-ঘরে ও-ঘরে কয়েকবার উঁকি-ঝুকি দিয়ে স্বাতীকে জিজ্ঞেস করল ছোড়দি কই? স্বাতী ভারি গলায় বলল—চলে গেছে। কথাটা যেন ধাক্কা দিল বিজুকে। সামলে নিয়ে বলল, কখন গেলো?

    বিকেলে।

    আমাকে আগে বলতে পারিস না? বিজুর গলা চড়ল। আলাদা করে আবার বলতে হবে নাকি?

    কেন বলবি না আমাকে?

    চ্যাঁচাসনে, দাদা!

    কত খোঁজ করলে তোর। শ্বেতা নিশ্বাস ছেড়ে বলল।

    তা এক কাজ কর না-হাত-পা ধুয়ে একবার ঘুরে আয় ওখান থেকে—কত খুশি হবে! বয়ে গেছে আমার।

    ওকে কিছু বোলো না, বড়দি—স্বাতী বললো। ও কি এ-বাড়ির লোক যে ওর কিছু এসে যায়?

    নই-ই তো! এ বাড়ির লোক তো নই-ই আমি! গলা ছেড়ে চীৎকার করল বিজু। আমি এবাড়ির লোক হলে কি আর এটাও জানতে পেতাম না যে ছোড়দি কখন যাবে!

    তবে-তো বুঝিসই, জবাব দিল স্বাতী।

    বুঝি না? বিজু যেন চোখ দিয়ে পুড়িয়ে ফেলল স্বাতীকে—সবই বুঝি। এ-বাড়ি তোর, এ-বাড়িতে তুই-ই সব, তোর কথায় সবাই ওঠে বসে—আমার কোনো জায়গা নেই এখানে। এতদিন ছোড়দির জন্য তোর জ্বলুনি-তো কম ছিল না, এবার সেও বিদায় হল? কেমন! আহ্লাদে নাচ এবার! মুখ লাল করে গলার রগ ফুলিয়ে, ঠোঁটে ফেনা তুলে, বাড়ির বিমর্ষ অবসন্ন প্রত্যেকটি মানুষের কানে বিজু তার মনের কথা সেঁধিয়ে দিল। একটি কন্যার সদ্যবিচ্ছেদে যা হয়নি, সেই রকম একটা আঘাত হঠাৎ যেন আকাশ থেকে নামল। কিন্তু কেন জানিস? আবার শোনা। গেল বিজুর গলা—কেন আমি এ-বাড়ির লোক নই, জানিস? তোর জন্য! শুনে রাখ, স্বাতী, আমি-যে বাড়ি থাকি না, আমি-যে ঘুরে-ঘুরে বেড়াই, আমার-যে পড়াশুনা হলো না—সব তোর জন্য! তোর রাজত্বে আমিও থাকব ভেবেছিস! আমি আর না–! এই আমি চললাম! বুকে চাপড় মেরে একহাত লাফিয়ে উঠে, পায়ের কাছে ঢনাৎ করে একটা কেটলি উল্টিয়ে বিজু বেরিয়ে গেল বন্দুকের গুলির মতো।

    কী অসভ্য ছেলে! পাশের ঘরে রাজেনবাবু বললেন চাপা গলায়। আর সবাই যেন স্তম্ভিত হয়ে রইল কয়েক মিনিট। তারপর প্রমথেশ ফিশফিশ করে বলল-দ্যাখোনা, সত্যি চলে গেলে নাকি?

    কেন-যে যেখানে সেখানে রাখে সব! শ্বেতা কেটলিটি তুলে রেখে বাবার কাছে এলো-বাবা, তুমিও তো ওকে একটু ডাকলে-টাকলে পারো মাঝে-মাঝে! বড়োসড়ো হয়েছে এখন ওয়াইল্ড! এই একটি ইংরিজি শব্দ ছাড়া আর কোনো কথা সরস্বতীর মনে এল না।—একেবারে ওয়াইল্ড!

    মা তো নেই, শেতা তাড়াতাড়ি বললো—আর এ-বয়সে সব ছেলেই একটু না একটু বিগড়োয়। বাবা যদি একটু ওর সঙ্গে…

    না—সরস্বতী বাধা দিলো, ওসব কিছু না—শাসন চাই, কড়া শাসন। বাবা অমন অসম্ভব ভালোমানুষ বলেই তো মাথায় চড়েছে। কোনো মেয়ের কথার উত্তরেই রাজেনবাবু কিছু বললেন না। হঠাৎ আবার শোনা গেল দুমদাম পায়ের শব্দ; যেন রাস্তায় মার খেয়েছে এই রকম একটা চেহারা করে বিজু ঘরের মধ্যে এসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললো—বলতে পারলে না? আমাকে বলতে পারলে না তোমরা? কেউ বলতে পারলে না? বলেই ছিটকে শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে শাশ্বতীর খাটে, মুখে বালিশ চেপে বিশ্রী বীভৎস আওয়াজ করে ডেকে উঠলোছোড়দি—ঈ। ও-ও ছোড়দি! একেবারেই অসভ্যের মতো হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। বারান্দার একটি থামে হেলান দিয়ে স্বাতী যেন শীতের ছাইরঙা-সন্ধ্যার মধ্যে মিশেছিল এতক্ষণ, চমকে উঠল দাদার অন্যরকম চীৎকার শুনে। বিজু সহজে থামল না, আর শুনতে শুনতে স্বাতীর গলা আটকে এল, ঠোঁট কেঁপে উঠল, তার মুখ তাকে অমান্য করে বিকৃত হল নানা রকম রেখায়, আর ফোঁটা ফোঁটা গরম শরীর-নিংড়োনো জল গড়িয়ে পড়তে লাগল চোখ বেয়ে গালে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleপিরানদেল্লোর গল্প – সম্পাদনা : বুদ্ধদেব বসু
    Next Article ছায়া কালো কালো – বুদ্ধদেব বসু

    Related Articles

    বুদ্ধদেব বসু

    বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা – বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    বুদ্ধদেব বসু

    ছোটগল্প – বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    বুদ্ধদেব বসু

    ছায়া কালো কালো – বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    বুদ্ধদেব বসু

    পিরানদেল্লোর গল্প – সম্পাদনা : বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    বুদ্ধদেব বসু

    রাত ভ’রে বৃষ্টি – বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    বুদ্ধদেব বসু

    আমার ছেলেবেলা – বুদ্ধদেব বসু

    October 30, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }