তিমির প্রেম – ১১
এগারো
সেদিন রোববার। সাবাথ ডে। স্বয়ং ঈশ্বরই নাকি সপ্তাহের ছয় দিন কাজ করে এই দিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, কারখানার কর্মীরা তো পড়বেই। এদিনটা ছুটির, খেয়াল খুশির। নির্মল আনন্দের। তিমিনীটার কথা মুখে মুখে রটে গেছে। তাই সেদিন গ্রামের গির্জায় উপস্থিতি কম। সেজেগুজে নৌকা নিয়ে দলে দলে চলেছে সবাই আটকে-পড়া তিমিনীকে দেখতে। দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে থেকে এসব কিছুই জানলেন না মোয়াট।
সূর্য ওঠার আগেই বিশ-পঁচিশজন বাহাদুর শিকারী হ্রদের বিভিন্ন প্রান্তে পজিশন নিয়েছে। সঙ্গে এনেছে প্রচুর গুলি। আগের রাতেই স্থানীয় দোকানদারকে দোকান খুলতে বাধ্য করেছে জর্জির দল, শেষ গুলিটিও কিনে নিয়েছে।
চারদিক থেকে ঘিরে ফেলায় হ্রদের মাঝামাঝি জায়গায় সরে এলো নিরুপায় তিমিনী। ঘাটের দিকে আসেই না আর। দক্ষিণ প্রণালী দিয়ে মুক্ত সাগরে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা আর করছে না সে। পানির গভীরতা অনেক কমে গেছে সেখানে। বুঝে ফেলেছে যেমন করেই হোক অন্তত একটা মাস থাকতে হবে তাকে এই বদ্ধ হ্রদে, বন্দি হয়ে। গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোর জন্যে টিকে থাকতে হবে যে করেই হোক। মারা গেলে চলবে না।
বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নিয়ে সাগরের গভীরে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত ব্যবস্থা আছে তিমির দেহযন্ত্রে। বুক ভরে বাতাস টেনে নিয়েও বেশি গভীরে ডুবতে পারে না মানুষ। বরং হিতে-বিপরীত হয়। এই বাতাসই তাকে ঠেলে পানির ওপরে তুলে দেয়। ফুসফুসে বাতাস ভরে ডুবুরিরা পানির তলায় যাতায়াত করার ফলে অনেক সময় একটা বিশেষ অসুখে আক্রান্ত হয়, তাকে বলে কেইসন ডিজিজ। এই রোগ হলে হাতে-পায়ে-ঘাড়ে খিল ধরে যায়, অনেক সময় মারাও যায় রোগী। এসব কিছুই হয় না তিমির। অথচ মানুষ ডুবুরির চেয়ে অনেক অনেক বেশি গভীরে ডোবে সে, পানির তলায় থাকেও অনেক বেশি সময়। একটানা তিরিশ-চল্লিশ মিনিট পানির তলায় থেকে ভেসে ওঠার পর একটা বিশেষ কায়দায় শ্বাস নেয়। এক সেকেণ্ডের ভেতর পুরো নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দেয়। প্রথমেই পুরো শ্বাস নেয় না, অল্প কিছুটা নেয়, দুই-তিন মিনিট পর দ্বিতীয়বার, আরও দুই-তিন মিনিট পর তৃতীয়বার নেয়। আরও কিছুটা বিরতি দিয়ে চতুর্থবার নেয়ার পর আর ভয় নেই। যত ইচ্ছে শ্বাস নিতে পারে। ভাগ ভাগ করে ধীরে ধীরে ফুসফুসে টেনে নেয়া বাতাসের অক্সিজেন তার রক্তকণিকায় মিশে যায় দ্রুত। তারপর আবার যখন ডুব মারার সময় হয়, ফুসফুসটা মোটেও বিস্ফারিত নয় তার। বাতাসের অক্সিজেন আগেই শরীরের সমস্ত শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেছে। এটা এক অদ্ভুত অবিশ্বাস্য প্রক্রিয়া। মানুষ কিংবা অন্যান্য স্থলচর জীবের মত তিমির দেহের অক্সিজেনের ভাঁড়ার তার ফুসফুস নয়, সারা দেহের লোহিত রক্তকণিকা। জীব-বিবর্তনের মাধ্যমে বুঝে নিয়েছে সে এভাবে ফুসফুস বাতাসে সারা দেহে ছড়িয়ে দিতে না পারলে সাগরে বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে পারবে না, জলচর হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
রোববার সকালে যারা তিমিনী-হত্যায় মেতেছিল তারা এসব জানত না, কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই বন্দিনীর শ্বাসগ্রহণের ছন্দটা বুঝে ফেলল। কাজেই বিশ-পঁচিশ মিনিট পর পর মাথা তোলার সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে না আর কেউ, অপেক্ষা করে। কারণ ওরা জেনে গেছে অন্তত পাঁচ-সাত মিনিট পানিতে মাথা জাগিয়ে ভেসে থাকতে হবে এখন তিমিনীকে। মিনিট দুয়েক গেলে যখন একটু স্থির হয় তিমিনী অমনি এক সঙ্গে বন্ধুক গর্জে ওঠে। সাবাথ ডে-র নির্মল প্রভাতের নৈঃশব্দ্য ভেঙে খানখান হয় যায়। হ্রদে ঘেরা পাহাড়ের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে সে শব্দ।
যেন মহা-উৎসব সাজে সেজেছে সমস্ত অল্ডরিজেস পণ্ড। কয়েকশো নর-নারী, বুড়ো, বাচ্চা এসে জমা হয়েছে। সারাদিনের জন্যে। দোকানদাররা ঠেলাগাড়িতে করে খাবার নিয়ে এসে বিক্রি করছে, যেন মেলা বসেছে। এমন অদ্ভুত নিরাপদ- শিকার দৃশ্য সপরিবারে দেখার দুর্লভ সুযোগ এর আগে কখনও পায়নি ওরা।
সবাই যে আনন্দ পেয়েছিল সে কথা বলা ঠিক হবে না। মাড়ি হোলের এক বুড়ো জেলে অনেকদিন পরে মোয়াটকে বলেছিল, ‘আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল স্যার। শুধুই কাঁদলো বেচারা মেয়েটা। কেন যে মরতে এসেছিল! কিচ্ছু করতে পারলাম না আমি। কেন, ওকে এভাবে মারল কেন ওরা? ওকে মেরে কেউ মাং খাবে না, ওর চামড়া দিয়েও বানানো যায় না কিছু। তাহলে কেন? আসলে বি জানেন, স্যার? টাকার গরম। পয়সা ওদের কাছে খোলামকুচি! তাই গাঁটের পয়স খরচ করে বুলেট কিনে গুলি করে গেল সারাদিন।’
জিজ্ঞেস করেছেন মোয়াট, ‘চারদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে খেপে যায়নি তিমিনীটা?’
‘না। কাউকে কিচ্ছু বলেনি। তেড়েও যায়নি কারও দিকে। শুধু নীরবে মার খেয়ে গেছে সারাটা দিন।’
‘ডাকেনি? আর্তনাদ করেনি?’
‘টুঁ শব্দটিও করেনি। তবে হ্যাঁ, দক্ষিণ খাঁড়ির বাইরে থেকে ওর মদ্দাটা বারে- বারে ডেকেছিল।’
‘ওটা যে ওরই সঙ্গী জানলে কি করে?’
‘ওরই সঙ্গী জানি আমি। সারাদিন ঘোরাঘুরি করেছে, এটা না বোঝার ব্যাপার নয়। হলপ করে বলতে পারি আমি, ওটা ওরই মদ্দা।’
রোববার পর্যন্ত কি পরিমাণ গুলি খেয়েছে তিমিনী জিজ্ঞেস করে সঠিক হিসেবটা জানতে পারেননি মোয়াট। পরে নিজেই অনুসন্ধান করেছেন গিয়ে বলেছেন, ‘ঠিক সংখ্যাটা জানতে পারিনি আমিও। স্থানীয় দোকানদারও আমাকে জানায়নি শনিবার রাতে সে কয় ডজন কিংবা কয় গ্রোস বুলেট বিক্রি করেছে। যারা গুলি ছুঁড়েছিল তারা আমার শত্রু, কাজেই ওদের কাছ থেকেও জানা সম্ভব হয়নি। তবে আমি আর ক্লেয়ার অল্ডরিজেস পণ্ডের চারপাশে ঘুরে ঘুরে চারশো তিনটি গুলির খোসা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। সব .৩০৩ বোর রাইফেলের। যতগুলে খোল পেয়েছি তার অর্ধেক গুলিও যদি খেয়ে থাকে তিমিনী তাহলে তার সহ্য ক্ষমতার প্রশংসা করতে হয়। অতগুলো আঘাত নীরবে সহ্য করেছিল সে! আর আর্তনাদ করে ফিরছিল বার সাগরে ওর মদ্দাটা। ও কি বুঝতে পেরেছিল তার প্রিয়তমার ওপর নৃশংস অত্যাচার চলেছে?
‘সবচেয়ে অবাক ব্যাপার,’ মোয়াট বলেছেন, ‘দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে বসে বৃহস্পতিবারের আগে এর কিছুই জানতে পারিনি আমরা। আর রোববারে আমি আর ক্লেয়ার পিকনিক করেছিলাম নির্জন এক পাহাড়ের চূড়ায় বসে।’
সোমবার সারাদিন ঝড়ো হাওয়ার চাদর মুড়ি দিয়ে থাকল গোটা দ্বীপ। অশান্ত সাগরের দিক থেকে একটানা ধেয়ে এলো চাপা গোঙানি আর বৃষ্টির ছাট। ঢেউয়ের পর ঢেউ অশান্তভাবে আছাড়ি-পিছাড়ি আর্তনাদ করল বার্জিওর সাগর সৈকতে। এ যেন সাগরের প্রতিবাদ। বন্দিনী মেয়ের দুঃখে উথলে উঠেছে বুঝি মাতৃহৃদয়।
মঙ্গলবারে কিছুটা পরিষ্কার হলো আবহাওয়া। অপেক্ষা করেই ছিল অতি উৎসাহীরা। তিমিটার খবর নিতে হয়। এতক্ষণেও কি তার লাশ ভেসে ওঠেনি? নাকি দু-তিনশো গুলি হজম করেও মরেনি সে? তাহলে তো আরও কিছু মার লাগাতে হয়! কিন্তু আর গুলি নেই বার্জিওতে। বার্জিওর ছোট্ট বন্দুকের দোকানের সমস্ত বুলেট, এমন কি দোকানদার ছাড়াও যার কাছে যা ছিল খরচ করে ফেলা হয়েছে। কি করা যায়? ভাবনাতেই পড়ল খুনীর দল।
বুদ্ধি বাতলাল দলপতি জর্জি। বার্জিও দ্বীপের একান্তে ছোট্ট একটা প্লেটুন আছে। কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে তারা নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। বেশ কিছু রাইফেল আর কাতুর্জ সেখানকার স্টোরে জমা আছে। ঘটনাচক্রে ওই প্লেটুনেরও কিছু জওয়ান রোববারের হত্যা-যজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। তাদেরকে নিয়েই বড়কর্তার কাছে গিয়ে ধরনা দিল জর্জি। বেশি অনুরোধ করতে হলো না, বেশ কিছু কাতুর্জ ইস্যু করে দিলো কর্তা, কিন্তু কতগুলো, জানতে পারেননি মোয়াট।
টোটা পাওয়া গেছে। মঙ্গলবারে অল্ডরিজেস পণ্ডে আবার জমায়েত হলো জর্জির দল। নাহ্ তিমিনী মরেনি। কড়া জান! সহ্য ক্ষমতা আছে বলতে হবে। প্রাণ-খুলে গালাগালি করল ওকে জর্জিরা। বিয়ার খেল এবং গুলি চালাল। সকাল থেকে সন্ধ্যা। ভাবখানা, দেখা যাক, কত সইতে পারিস তুই?
মঙ্গল এবং বুধ। পুরো দুটো দিন গুলি খেল তিমিনী। রোববারেও খেয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে এই দুই দিনের তফাত আছে। রোববারের গুলিগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল, রাবার ভেদ করে গভীরে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু আর্মি রাইফেলের বুলেট রাবার ভেদ করে গভীরে ঢুকে গিয়ে তিমিনীর শরীরে মারাত্মক আঘাত হানছিল। তবু নাকি একবারও আর্তনাদ করেনি তিমিনী। হ্রদের বাইরে সাগর থেকে ডেকে ডেকে সারা হয়েছে শুধু ওর সঙ্গী।
ভিন্নধর্মী কয়েকজনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল বৃহস্পতিবারে। এরা সবাই অশিক্ষিত জেলে। সেদিন সন্ধ্যায় গুটি গুটি এসে হাজির হলো ওরা মোয়াটের ড্রইংরুমে। বিপদে আপদে প্রায়ই আসে ওরা তাঁর পরামর্শ নিতে, উপর-মহলে আর্জি পাঠানোর দরকার হলে দরখাস্ত লিখিয়ে নিতে, অথচ এই প্রথম পুরো পাঁচটা দিন ওরা কেউ তাঁর কাছে আসেনি। মনে মনে একটু যে দুঃখ না পেয়েছেন মোয়াট, তা নয়। অনুযোগ করে বলেছেনও তিনি, হাজার হোক আমি বাইরের লোক!’
ওরা কেন আসেনি, তার কারণটা ভিন্ন। তিমিনীকে নিয়ে এই কেলেঙ্কারীর কথাটা তাঁকে জানাতে সঙ্কোচ বোধ করছিল ওরা। ওদের আচরণে এটা বুঝতে পেরে পরে অনুযোগ তুলে নিয়েছিলেন মোয়াট।
বৃহস্পতিবারে ওরা কজন দল বেঁধে এলো, কিন্তু সহজে মুখ খুলতে পারল না কেউ তিমিনীর ব্যাপারে। অন্যান্য ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা যথেষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারলেন মোয়াট তাতে প্রাণ নেই। কথা বলতে বলতে প্রায় সারাক্ষণই.এ- ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কি একটা কথা বলি বলি করেও যেন বলতে পারছে না কেউ।
রাত বাড়ল। উঠল ওরা। দরজা পর্যন্ত ওদের এগিয়ে দিতে এলেন মোয়াট। শেষ পর্যন্ত এই সময় কথাটা আর না বলে পারল না একজন, ‘হ্যাঁ, ভাল কথা, তিমির কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন, স্যার। ওটা বেঁচে আছে এখনও।’
‘কোন তিমি? যে ঝাঁকটা এসেছে এ বছর?’
‘আরে না, না। আমি ওই অল্ডরিজেস পণ্ডের তিমিনীটার কথা বলছি।’
‘তিমিনী! অল্ডরিজেস পণ্ডে! কি তিমি? বাচ্চা?’
‘না বাচ্চা হবে কেন? বিশাল তিমিনী। কি জাতের জানি না, তবে অনেক বড়…সে যাক, পরে কথা হবে…’
কথা আটকে যাচ্ছে লোকটার। ‘তো এখন যাই…স্যার।’ যেন পালিয়ে বাঁচল সে। অন্যেরাও চলে গেল।
পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন ক্লেয়ার। তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন মোয়াট, ‘কি ব্যাপার বলো তো? বিশাল তিমি! অল্ডরিজেস পণ্ডে!’
‘তুমিও যেমন,’ ঠোঁট উল্টে বললেন ক্লেয়ার, ‘ওদের কথা বিশ্বাস করছ! তিলকে তাল করে ওরা, জানো না? বড় আকারের কোন ডলফিন-টলফিন হবে হয়তো। ওই সরু খাঁড়ি দিয়ে তিমি ঢুকতে পারে কখনও?’
কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারলেন না মোয়াট। লোকগুলো এমন করছিল কেন? এলোই বা কেন এমন দল বেঁধে? তিমির কথা বলতে? তাহলে প্রশ্ন করা মাত্র পালিয়ে গেল কেন? এই সময় খেয়াল হলো তাঁর, তিন-চার দিন ধরে বার্ট চাচাও রেডিও শুনতে আসছে না। নাহ্, ব্যাপারটা জানতে হচ্ছে। ওভারকোটটা গায়ে চাপিয়ে পথে বের হলেন তিনি। কাছেই হান-ভাইদের ছাপরা। কিন্তু পাওয়া গেল না ওদের। কেনেথের বউ জানাল, সকালে মাছ ধরতে বেরিয়ে গেছে ওরা, ফেরেনি। তিমির প্রসঙ্গে ঢোক গিলল কেনেথের বউ। মনে হলো কিছু চেপে যেতে চাইছে।
রাত হয়েছে অনেক। তবু হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলেন মোয়াট। বাড়িতেই আছে বাৰ্ট চাচা। মদে চুর। মাথায় একটা ব্যাণ্ডেজ। ও, এই জন্যেই কয়েকদিন রেডিও শুনতে আসছে না সে! জিজ্ঞেস করলেন মোয়াট, ‘এই যে আংকেল, মাথা ফাটালে কি করে?’
‘জংলী শুয়োর।’
‘জংলী শুয়োর! এই দ্বীপে জংলী শুয়োর কোত্থেকে এলো?
ধমকে উঠল চাচা, ‘কানা নাকি? চারিদিকে অত অত শুয়োর, দেখতে পাও না!’ বলেই আপাদমস্তক কম্বলে ঢাকল সে। বদ্ধ মাতাল।
পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারল না চাচীও। শুধু জানাল, পরশু নাকি কি একটা খবর পেয়ে পড়িমরি করে ছুটতে ছুটতে অল্ডরিজেস পণ্ডে যায় বাৰ্ট চাচা। তারপর মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসেছে।
কৌতূহল আরও বাড়ল মোয়াটের। আবার সেই অল্ডরিজেস পণ্ড! কি খবর শুনে ছুটে গিয়েছিল বার্ট চাচা? কিন্তু বুড়োর মুখ থেকে আর কোন কথাই আদায় করা গেল না।
ফেরার পথে ওনি স্টিকল্যাণ্ডের দোকানটা খোলা আছে দেখলেন মোয়াট। পাড়ার মুদি-কাম-কফিওয়ালা সে। হ্যারিকেনের আলোতে ক্যাশ মেলাচ্ছে। মোয়াটের একের পর এক প্রশ্নে তিমিনীটার কথা স্বীকার না করে পারল না। জানাল, শুক্রবার থেকেই পণ্ডে আটকে আছে তিমিনী। বাচ্চাও আছে তার পেটে। বার্ট চাচার কাছে শুনেছে ওনি, জাতে ওটা ডানা তিমি।
স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মোয়াট। আর যে-ই করুক তিমির ব্যাপারে ভুল করার মানুষ বার্ট চাচা নয়। মাদী ডানা তিমি হলে সেটা পঞ্চাশ-ষাট ফুট লম্বা হবেই, বেশিও হতে পারে, অনুমান করলেন তিনি। ঢুকল কেমন করে ওটা, জানতে চাইলেন মোয়াট।
বার্ট চাচার কাছে শোনা থিওরিটা গড় গড় করে আউড়ে গেল ওনি।
উত্তেজনায় ওনির হাতটা চেপে ধরলেন মোয়াট, ‘এতদিন…এতদিন আমাকে শোনাওনি কেন?’
‘শোনাব কি, স্যার! লজ্জা, লজ্জায় বলতে পারিনি… যে কেলেঙ্কারীটা করল হারামজাদারা…’
‘কেলেঙ্কারি! কিসের কেলেঙ্কারি?’
‘গুলি করেছে ওরা তিমিটাকে…’
কথাটাকে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না মোয়াট। ভাবলেন, .২২ বোরের স্পোর্টসগান দিয়ে তিমিটাকে দু-দশটা গুলি যদি করেই থাকে কেউ, তো তাতে ভাবনার কিছুই নেই। একটা প্রাপ্তবয়স্ক ডানা তিমি সেটা ফুঁ দিয়ে ঝেড়ে ফেলে দেবে শরীর থেকে। রাত হয়েছে, এখন আর কিছুই করা যাবে না। আগামী দিন সকালে ভাল করে খোঁজখবর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘরে ফিরে চললেন তিনি।
উত্তেজনায় সারাটা রাত ভাল করে ঘুমাতেই পারলেন না। অল্ডরিজেস পণ্ডে পাঁচ-ছয় দিন ধরে একটা বিশাল তিমি আটকে আছে আর তিনি কিছুই জানতেন না! ভোর হতে না হতেই ড্যানি গ্রীনকে ফোন করলেন। দ্বীপের পূর্ব উপকূলে থাকেন তিনি, রয়্যাল ক্যানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের একটি নিজস্ব মোটর লঞ্চ আছে, তারই ক্যাপ্টেন। মোয়াটের প্রশ্নে বললেন, ‘ঠিকই শুনেছেন। ফিন না হাম্পব্যাক বলতে পারব না, আমি দেখিনি। তবে যে তিমিই হোক, বড় জাতের।…এখনও বেঁচে আছে বলে মনে হয় না। গত তিন-চার দিনে দু-তিনশো বুলেট খেয়েছে তো।’
বিস্তারিত বিবরণ শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মোয়াট। আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘কি বলছেন আপনি, ক্যাপ্টেন! বাধা দেননি আপনারা? অল্ডরিজেস পণ্ডে এমন একটা তিমি আটকে থাকলে সেটা তো ওয়ার্ল্ড নিউজ। সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে বার্জিওর নাম। জীব বিজ্ঞানীরা ছুটে আসবেন ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া-জাপান থেকে। আর আপনারা ওটার ওপর গুলি চালাতে দিলেন? আপনার অ্যাসিসট্যান্ট করছে কি?’
‘ছুটিতে,’ জানালেন গ্রীন, ‘বদলে নতুন অবশ্য একজন এসেছে। নাম, মার্ডক। বেচারি নতুন লোক, ঝামেলা এড়াতে চেয়েছে।’
‘আর যেন কেউ গুলি না ছোঁড়ে,’ অনুরোধ করলেন মোয়াট, দয়া করে মার্ডককে ব্যবস্থা করতে বলে দিন।’
‘দেখি কি করা যায়,’ রিসিভার নামিয়ে রাখলেন গ্রীন।
একটু পরে নিজেই মোয়াটকে টেলিফোন করল মার্ডক। দুঃখ প্রকাশ করে বলল, যা হবার হয়ে গেছে। তবে এখন থেকে যাতে আর কেউ তিমিটাকে বিরক্ত করতে না পারে, দেখবে সে।
