তিমির প্রেম – ১২
বারো
তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিয়ে ক্লেয়ারকে সাথে করে বেরিয়ে পড়লেন মোয়াট। এমনিতেই যথেষ্ট দেরি করে ফেলেছেন, আর না। একটা ডোরি নিয়ে অন্ডরিজেস পণ্ডে চললেন দুজনে। অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন মোয়াট, কিন্তু ক্লেয়ার স্বাভাবিক রয়েছেন। সেদিনের কথা ডায়রিতে লিখেছেন তিনি:
‘রীতিমত ঝড় বইছে যেন। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় চল্লিশ-পঞ্চাশ মাইল। তাই প্রথমটায় ওকে বলেছিলাম, তুমি একাই যাও। ও বলল, এমন দুর্লভ জিনিস দেখার সুযোগ পেয়েও যদি অবহেলা করো পরে সারাজীবন আফসোস করবে। ভেবে-চিন্তে রাজি হয়ে গেলাম। আসলে, তখনও এখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি। ভাবছিলাম, কি হবে গিয়ে? বড় জোর পনেরো-বিশ ফুট লম্বা একটা ডলফিন দেখতে পাব।
‘দক্ষিণ প্রণালী দিয়ে হ্রদে ঢুকে মনে হলো সকালের রোদে পাহাড়তলীটা যেন ঝিমোচ্ছে। ত্রিসীমানায় মানুষজন তো দূরের কথা, প্রাণের কোন সাড়াই নেই। নীল আকাশে চক্রাকারে পাক খাচ্ছে কেবল একঝাঁক সী-গাল। আমার মনে হলো, যদি কোন তিমি হ্রদে এসেও থাকে, চলে গেছে অনেক আগেই
‘চমকে উঠলাম হঠাৎ! আমাদের নৌকার সামনেই কালোমতো কি একটা ভেসে উঠল! হ্যাঁ, তিমিই-প্ৰকাণ্ড তিমি! পঞ্চাশ-ষাট ফুটের কম না! বার তিনেক শ্বাস নিয়ে ডুব দিল আবার। আমরা স্তম্ভিত।
‘এরপর শুরু হলো প্রতীক্ষা। মিনিটগুলোকে মনে হচ্ছে ঘণ্টা। সকালের সূর্য মাথার ওপর উঠে এলো। ইতিমধ্যে গ্রীন আর মার্ডকও এসে হাজির হয়েছে। দুটো নৌকাই হ্রদের মাঝামাঝি রেখে চুপচাপ অপেক্ষা করছি আমরা। আস্তে আস্তে তিমিটার সাহস যেন বাড়ল, যেন বুঝতে পারল, ওকে আর সবার মতো গুলি করতে আসিনি আমরা, আমরা ওর বন্ধু। অতি ধীরে, আরও আরও কাছে এসে সে ভেসে উঠল। যেন আড়-চোখে খেয়াল রাখছে কি করি আমরা। শেষ পর্যন্ত সাহস করে একেবারে কাছে চলে এলো সে, আমাদের নৌকা দুটোর তলায়, পানির পাঁচ- সাত ফুট গভীরে। পরিষ্কার পানিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওকে, এমন কি গুলির আঘাতের চিহ্নগুলোও দেখতে পাচ্ছি। আশ্চর্য! এমন নিরীহ, সুন্দর জীবটিকে হত্যা করতে চেয়েছিল ওরা!
পরে আমাকে ড্যানি গ্রীন বলেছিলেন, ইচ্ছে করলে লেজের এক আঘাতেই আমাদের দুটো নৌকা গুঁড়িয়ে ফেলতে পারত তিমিটা, যেভাবে অনায়াসে মুরগীর ডিম আমরা ভেঙে ফেলি। কিন্তু তা সে করেনি। কেন? চার পাঁচ দিন ধরে ওর ওপর যে অত্যাচার করেছে মানুষ, সে জন্যে কোন প্রতিশোধ স্পৃহা জাগল না কেন ওর মনে? এমন উদারতা ও কোথায় পেল? তাহলে কি ধরে নেব শুধু দৈহিক বিশালতাতেই নয়, সহনশীলতায়, হৃদয়ের প্রসারতায়ও মানুষকে ছাড়িয়ে গেছে সে?’
বাড়ি ফিরে অনেক ভেবে-চিন্তে এই দার্শনিক মন্তব্য লিখেছেন ক্লেয়ার।
ডোরিতে বসে দেখতে দেখতে অন্য কথা ভাবছিলেন মোয়াট। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিমিনীটা যেন কি বলতে চায়, কিন্তু মুখে ভাষা নেই বলে পারছে না। সে নিঃসঙ্গ, সে বন্দিনী, তাই যেন সাহায্য চাইছে মানুষের কাছে। ইতিমধ্যে ডোরি নিয়ে হানেরা দুই ভাইও এসে হাজির হয়েছে। মাছ ধরতে নয়, তিমিটাকে দেখতে।
তিনটা নৌকার তলা দিয়ে বার বার চলে যাচ্ছে তিমিটা, সাবলীল স্বচ্ছন্দ গতি। মাঝে মাঝে পানি থেকে মুখ তুলে দেখছে নৌকার যাত্রীদের।
‘আমি সত্যিই দুঃখিত মিস্টার মোয়াট,’ বলল মার্ডক। ‘কথা দিচ্ছি, আর কেউ গুলি করবে না ওকে। দরকার হলে এখানে ক্যাম্প করে দিনরাত পাহারা দেব আমি।’
অনেকক্ষণ দেখার পর বাড়ি ফিরে চললেন মোয়াট। অনেক কাজ পড়ে আছে। নিজের অজান্তেই দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। লিখেছেন:
‘মার্ডকের কথায় সিদ্ধান্তটা সম্পর্কে সচেতন হলাম। অন্তরের অবচেতনে এই সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে বসে আছি আমি। বুঝে গিয়েছি পরিষ্কার, তিমিটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। সারা জীবনে এর আগে কোনদিন কোন দায়িত্বে নিজেকে এভাবে জড়াইনি। আমি আজও জানি না, কেন সেদিন সিদ্ধান্ত টাকে ব্রত হিসেবেই নিয়ে ফেলেছিলাম। যদি অতীন্দ্রিয়বাদে বিশ্বাসী হতাম তো বলতে পারতাম, একটা আর্ত আহ্বান শুনেছিলাম আমি। কে জানে, হয়তো একেবারে’ পাগলামি নয় কথাটা। পরে যা ঘটল, তাতে সে সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। হ্যাঁ, একটা আদিম আর্তনাদে আমার অন্তরাত্মা বিচলিত বোধ করেছিল। বিজাতীয় একটা জীব আর একটা বিজাতীয় জীবের কাছে আদিম অন্ধ বাণীহীন আর্তনিনাদে অন্তিম আকুতি জানিয়েছিল যা প্রত্যাখ্যান করা একেবারেই অসম্ভব ছিল আমার পক্ষে।
‘বাড়ি ফেরার পথে গভীর চিন্তায় ডুবে রইলাম। দায়িত্ব আমি নিয়েছি, মনে মনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ওই হতভাগিনীকে। কোন কিছুতেই প্রতিজ্ঞা থেকে বিরত হব না আমি। কিন্তু কেমন করে ওকে বাঁচাব? ডোরিটার মতোই আশা-আশঙ্কায় মন দুলছিল আমার। একটা কথা নিঃসন্দেহে বুঝে গেছি, একা ওকে বাঁচাতে পারব না আমি। দল ভারি করতে হবে আমাকে, সহকারী চাই, এবং সাহায্যকারী। বন্দিনী হতভাগিনীর অনেক বন্ধুর প্রয়োজন।’
বাড়ি ফিরেই মাছের কারখানার ম্যানেজারকে ফোন করলেন মোয়াট। শ্রমিকদের বড়কর্তা সে, তাকেই আগে দলে টানতে হবে। অনেক করে বোঝাতে চাইলেন তাকে মোয়াট, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। তাঁকে পাত্তাই দিল না লোকটা। একটা তিমি মরল কি বাঁচল তাতে কার কি? মোয়াটের বার বার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত নোটিশ টাঙিয়ে দিতে রাজি হলো ম্যানেজার, তাতে লেখা থাকবে, শ্রমিকদের কেউ যেন তিমিটাকে বিরক্ত না করে।
লোকটার নিরুত্তাপ উদাসীনতায় মনে মনে রেগে গেলেন মোয়াট, কিন্তু অন্য এক ধরনের উপকার হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, যে যুক্তির প্রেরণায় অভিভূত হয়েছেন তিনি, সেটা সবার মগজে ঢুকবে না। ওদের বোধগম্য করতে হলে, ওদের দৃষ্টিভঙ্গিতে লাভজনক কোন কিছু খুঁজে বের করতে হবে। মনে মনে খসড়াটা খাড়া করে নিলেন মোয়াট।
ওদের বলতে হবে, এটা এক দুর্লভ সুযোগ। কাছ থেকে এভাবে কোন ডানা তিমিকে দেখার সুযোগ হয়নি মানুষের। খবরটায় আলোড়ন জাগবে বিজ্ঞান জগতে, তিমিনীকে দেখতে ছুটে আসবে হাজার হাজার মানুষ, আসবেন বিজ্ঞানীরা। টুরিস্ট বাড়বে। খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে এই আশ্চর্য খবর, বিখ্যাত হয়ে যাবে বার্জিও। এবং এই সুযোগে দুটো পয়সা কামানোরও সুযোগ হবে বার্জিওবাসীর।
বার্জিওর বাইরে ফোনের লাইন পাওয়া খুবই কষ্টকর এবং ঝামেলার ব্যাপার। বহু চেষ্টায় ট্রাংক-কলে সেণ্ট জনের ফেডারেল ফিশারিজ-এর অফিসে যোগাযোগ করলেন মোয়াট। সরকারী অফিসের সিনিয়র বায়োলজিস্ট সব শুনে বললেন, ‘মিস্টার মোয়াট, ভুল করেছেন আপনি। আপনাকে অবশ্য দোষ দেয়া যায় না, অনেকেই করে এই ভুল। এটা ফিশারিজ ডিপার্টমেন্ট, মাছ নিয়ে গবেষণা করি আমরা। তিমি মাছ নয়, স্তন্যপায়ী জন্তু। আয়্যাম সরি।’ বলেই লাইনটা কেটে দিল সরকারী দপ্তরের পাশ করা সিনিয়র বায়োলজিস্ট!
মনে মনে বিজ্ঞানীর মুণ্ডুপাত করে মন্ট্রিলে লাইন পাবার চেষ্টা করতে লাগলেন মোয়াট। ওখানে ফেডারেল ফিশারিজের হেড অফিস। অফিসের বড় সাহেব অর্থাৎ বড় জীববিজ্ঞানী, তাঁকে পেলে হয়তো কাজ হবে। ঘণ্টা তিনেক একটানা চেষ্টা করার পরে তাঁকে পাওয়া গেল। সেণ্ট জনের সিনিয়র বায়োলজিস্টের মতো এই বিজ্ঞানী অতটা অভদ্র নন। মন দিয়ে মোয়াটের কথা শুনলেন তিনি। কিন্তু কাজ হলো না। তিনি জানালেন, তাঁদের কর্মচারীর তালিকায় একজন তিমি বিশেষজ্ঞ আছেন, কিন্তু আপাতত অফিসে নেই। ওয়াশিংটনের জাদুঘরে মৃত তিমির কঙ্কাল নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত তিনি এখন। মূল্যবান গবেষণা ছেড়ে সাধারণ একটা তিমিকে বাঁচানোর জন্যে বার্জিওতে যাওয়ার আদেশ দেয়া যাবে না তাঁকে
ক্রমে ক্রমে মোয়াটের অবস্থাও বন্দি তিমিনীর মতো হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি সরে যাওয়ায় যেন সঙ্কীর্ণ পরিবেশে বন্দি হয়ে পড়েছেন তিনি। আশ্চর্য লাগছে তাঁর কাছে। এতবড় দুর্লভ সুযোগ কি বিজ্ঞান নেবে না? মুখ ফিরিয়ে থাকবেন জীববিজ্ঞানীরা? তাঁদের সচেতন করে তোলার কি কোন উপায়ই নেই? নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র মনে হতে লাগল মোয়াটের ।
কথাটা মনে পড়ল হঠাৎ করেই। ক্ষমতাশালী লোক একজন আছেন, তবে তিনি কোন জীববিজ্ঞানী নন। একজন বড় ধরনের পাবলিশার, মোয়াটের বইগুলো তিনিই প্রকাশ করেছেন। নাম, জ্যাক ম্যাকক্লিল্যাণ্ড। থাকেন টরেন্টোতে। এবারেও অনেক চেষ্টা করে লাইন নিতে হলো মোয়াটকে। ধুরন্ধর ব্যবসায়ী জ্যাক। মাঝরাতে বিছানা থেকে টেনে তোলায়ও বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না। সব শুনে ভরসা দিলেন তিনি, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন প্রথম শ্রেণীর জীববিজ্ঞানীকে বার্জিওয় পাঠাতে না পারছেন, ক্ষান্ত হবেন না।
সে রাতে অন্তত সাত-আটজন জীববিজ্ঞানীর ঘুম ভাঙালেন জ্যাক। কিন্তু লাভ হলো না। একজন ব্রিটিশ-কলম্বিয়ান তিমি বিশেষজ্ঞ তো ফোনেই ছোটখাট একটা বক্তৃতা শুনিয়ে দিলেন জ্যাককে
‘ফিন হোয়েল হেরিং মাছ খায় না। মেরু অঞ্চলে গিয়ে প্ল্যাংকটন খায়। সুতরাং বন্দি অবস্থায় ওটাকে খাওয়ানোর প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া না খাওয়ালেও কোন ক্ষতি নেই। রাবারে খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে তিমি, এতেই আগামী ছয় মাস অনায়াসে টিকে থাকতে পারবে সে। আর সব চেয়ে বড় কথা, আহত হলে কিংবা মরার সময় হলেই শুধু উপকূলে কিংবা ডাঙার অতি কাছাকাছি আসে ডানা তিমি। বার্জিওর তিমিটার আসলে মরণ ঘনিয়ে এসেছে, বুঝতে পেরেই ওই অগভীর হ্রদে এসেছে ওটা। কাজেই ওটাকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে বিশেষ লাভ নেই।’
ব্যস, এক লেকচারেই জ্যাক ম্যাকক্লিল্যাণ্ড ঠাণ্ডা।
শনিবার দিন ফোনে মোয়াটকে বলেছেন জ্যাক, লুক, ফার্লে, হতাশ হয়ো না! তুমি যখন বলছ, অবিশ্বাস্য হলেও বিশ্বাস করছি আমি কথাটা। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখো। কয়েকটা গাধা বোঝেনি বলে যে দুনিয়াসুদ্ধ লোক কেউই এর গুরুত্ব বুঝবে না, এ হতে পারে না। সারা দুনিয়া তোলপাড় করে ছাড়ব। কাউকে না কাউকে বার্জিওয় যেতে রাজি করাবই আমি।’
জ্যাকের কাছে এর বেশি আর কি আশা করতে পারেন মোয়াট? শেষে হাতের কাছে যাকে পাওয়া গেল অশিক্ষিত সেই তিমি-বিজ্ঞানীরই দ্বারস্থ হলেন তিনি।
ব্রিটিশ-কলাম্বিয়ান বিজ্ঞানীর কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেল বাৰ্ট চাচা। বকাঝকা করতে লাগল বিজ্ঞানীকে। বলল, ‘লিখে পড়ে ব্যাটা আরও বড় গাধা হয়েছে, বুঝেছ! ক্রিল খেয়ে ফিরে এসে হেরিং খায় ডানা তিমি নীল তিমির মত উপোস করে না। আর পেটে বাচ্চা থাকলে তো খেতেই হবে তাকে। আর শুধু মরতেই ডাঙার দিকে আসে না ওরা, এমনিতেও আসে। ওইসব গাধাদের কথা বাদ দাও, আমি যা বলছি শোনো। এখন তিনটে জরুরী কাজ আছে তোমার হাতে। এক, ওই জংলী শুয়োরগুলোকে ঠেকানো। দুই, মেয়েটাকে হেরিং মাছ খাওয়ানো।’ পাইপ ধরাতে থামল চাচা।
‘আর তিন নম্বর?’ জিজ্ঞেস করলেন মোয়াট।
‘সেটা পরে বলব। আগে এই কাজ দুটো সারো।’
সকাল থেকে চেষ্টা শুরু করলেন মোয়াট, দুপুরের দিকে ট্রাংক-কলে লাইন পেলেন। গোটা নিউ ফাউণ্ডল্যাণ্ডের মৎস্য মন্ত্রকের মন্ত্রীমহোদয় প্রথমেই জানতে চাইলেন কার সঙ্গে কথা বলছেন। মোয়াট জানালেন তিনি একজন লেখক- সাংবাদিক। সাংবাদিককে কমবেশি পরোয়া করে চলে ছোট বড় সবাই। তাই লাইনটা কেটে না দিয়ে মোয়াটের কথা মন দিয়ে শুনলেন মন্ত্রী। শেষে বললেন, ‘এমনিতেই ফিশারিজ মিনিস্ট্রির কত জরুরী কাজ পড়ে আছে, সেগুলোই সারতে পারছি না। কোথায় একটা তিমি আটকে পড়েছে এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এখন নেই।’ লাইন কেটে দিলেন মন্ত্রী ।
সেদিন ডায়রীয় পাতায় মোয়াটের কথা লিখেছেন ক্লেয়ার: পাগলের মত লাগছিল ওকে।’
মন্তব্যটা পড়ে মোয়াট বললেন, ‘হতে পারে। হয়তো পাগলামিতেই পেয়ে বসেছে আমাকে! দুনিয়ার সবার কাছে এটা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা, আমার কাছে নয় কেন? আমি কেন নাক গলাতে যাই? কিন্তু বাধা যতই প্রচণ্ড হয়ে উঠছে আমার অস্থিরতাও বাড়ছে। আমি যে ওই বন্দিনীকে কথা দিয়েছি, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা আমি করব।’
স্ত্রীকে ডেকে বললেন মোয়াট, ‘ক্লেয়ার, আমি সামান্য মানুষ, কিন্তু একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে আমার হাতে। ভালোয় ভালোয় সারতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হলো না, এবারে সেই অস্ত্রই প্রয়োগ করব আমি। জানি, ফল ভয়াবহ হবে। বিপদে পড়ব আমরা দুজনে। কি বলো, চেষ্টা করে দেখব?’
অবাক চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন ক্লেয়ার। বুঝতে পারলেন না কিছু।
‘আমি সাংবাদিক,’ বললেন মোয়াট, ‘যদি তুমি মত দাও, সব ঘটনা প্রেসকে জানাব। পুরো ঘটনা। তিমিটাকে গুলি করা থেকে শুরু করে মন্ত্রীর উদাসীনতা পর্যন্ত, সঅব। সাংবাদিক জগতে সুনাম আছে আমার, জানো তুমি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবে খবরটা।’
চোখ নামিয়ে ভাবছেন ক্লেয়ার। জানেন তিনি, বার্জিওকে দারুণ ভালবাসেন মোয়াট। তিনি এখন যা করতে চাইছেন, তাতে বার্জিওর বাস তাঁদের উঠবে। সব কথা প্রেসকে জানালে আর তাঁরা টিকতে পারবেন না এখানে।
মনে মনে জবাবটা গুছিয়ে নিলেন ক্লেয়ার। তারপর বললেন, ‘যদি এছাড়া আর কোন উপায় না থাকে…আমি চাই তিমিনাটা বেঁচে যাক, আফটার অল সে প্রেগন্যান্ট! আমিও তো মায়ের জাত! কিন্তু…কিন্তু… বুঝতেই পারছ। আবার আমাদের বাড়িঘর বেচে দিয়ে…’
টেলিফোনটা বেজে উঠল এই সময়। ছুটে গিয়ে তুলে নিলেন মোয়াট। অপারেটর জানাল একটা টেলিগ্রাম আছে। ফোনোগ্রাম। ম্যাসেজটা পড়ে শোনাল অপারেটর:
নিউ ইংল্যাণ্ডের একাধিক জীববিজ্ঞানীকে আপনার তিমির কথা জানিয়েছি। সকলেই অত্যন্ত উত্তেজিত। নোট রাখতে শুরু করুন। যতক্ষণ না বিজ্ঞানীরা পৌঁছাচ্ছেন, রাখবেন।
— ড. ডেভিড সার্জেন্ট
এই প্রথম আশার আলো দেখলেন মোয়াট। একজন প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী ড. ডেভিড সার্জেন্ট, নামটা তাঁর পরিচিত। সম্ভবত জ্যাক ম্যাকক্লিল্যাণ্ডের কাছে খবর পেয়েছেন বিজ্ঞানী।
এই প্রথম মোয়াটের মনে হলো, তিমিনীর একটা সুরাহা হতেও পারে। পরদিন ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতেই এসে মোয়াটের দরজায় টোকা দিল কেউ। এই সময় কে? দরজা খুলে বের হলেন মোয়াট। ডগ হান দাঁড়িয়ে আছে।
‘কি ব্যাপার, ডগ! এই সময়ে তুমি?’
ডগ স্বল্পভাষী, লাজুক স্বভাবের। মোয়াটের বিস্ময় দেখে খেয়াল হলো ওর, এত সকালে কোন ভদ্রলোকের বাড়িতে হানা দেয়া সৌজন্যের বরখেলাপ। দুই হাত কচলে সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, ‘না মানে…ইয়ে, ‘আজ রোববার তো…’
‘রোববার, তাতে কি হয়েছে?’
‘ না, মানে…ওরা আজ দল বেঁধে আবার হয়তো অল্ডরিজেস পণ্ডে…’
তাই তো! কথাটা আরও আগেই আমার খেয়াল হওয়া উচিত ছিল, ভাবলেন মোয়াট। আর একটি সাবাথ ডে ফিরে এসেছে বন্দিনীর জীবনে। তাই আজ মাছ ধরতে যায়নি ডগ হান, ডোরি নিয়ে এত ভোরে এসে হানা দিয়েছে মোয়াটের বাড়িতে। ওকে অপেক্ষা করতে বলে তৈরি হতে ভেতরে চলে গেলেন তিনি। কে এসেছে জানতে চাইলেন ক্লেয়ার।
‘ডগ। তিমিনীর জন্যে তার এতটা দুশ্চিন্তা, জানতাম না!’
কম্বলের তলায় থেকেই বললেন ক্লেয়ার, ‘জানতে না? আমি তো জানতাম। তোমার আমার মত ডগেরও রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে হতভাগিনী।’
‘তুমি জানতে!’ অবাক হলেন মোয়াট, ‘কি করে?’
‘তিমিনী যে মা হতে যাচ্ছে।’
‘তাতে কি…’ বলতে বলতেই থেমে গেলেন মোয়াট। ক্লেয়ারের দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হেসে উঠলেন, ‘একেই বলে মেয়ে মানুষের মন। একটা রোমান্টিক প্রেমের গল্পের ইঙ্গিত পেয়ে গেছ। যেহেতু ডগের প্রেমিকা…দূর, এসব অতি কল্পনার কোন মানে হয় না। ওটা একটা তিমিনী, বুঝলে, মানবী নয়।’
অন্ডরিজেস পণ্ডে এসে মোয়াট দেখলেন তখনও ভাল করে আলো ফোটেনি। হালকা কুয়াশা হ্রদের ওপর। শীতের সাঁঝে কিষাণী যেমন মশা তাড়ানোর জন্যে খড় পাতা পুড়িয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, তেমনি খণ্ড খণ্ড ধোঁয়াটে কুয়াশার ফাঁক দিয়ে হ্রদের অন্য পাড়ের একটু আধটু চোখে পড়ছে। কম্বলের তলায় শুয়ে যেন গভীর নিদ্রায় অচেতন অল্ডরিজেস। কিন্তু এই সকালেই দশ-বারো জন দর্শক হাজির হয়ে গেছে। অবশ্য ওদের কারও হাতেই বন্দুক নেই, শুধুই দর্শক ওরা।
ডগকে নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলেন মোয়াট। কয়েকজন মোয়াটের বেশ পরিচিত, অন্যেরা মুখচেনা। আশ্চর্য, কেউই কিন্তু গুড মর্নিং জানাল তাঁকে। গরজ বেশি, তাই গায়ে পড়েই আলাপ করলেন তিনি। প্রচারের যুগ, ক্যানভাসিং ছাড়া ভোটই পাওয়া যায় না, বন্ধু পাওয়া যাবে কোথায়?
ছোটখাটো একটা বক্তৃতা শুরু করলেন মোয়াট, ‘কতবড় সৌভাগ্য বার্জিওর, এতবড় একটা জীবকে অতিথি হিসেবে পেয়েছে। আর কোনও দেশ কোন কালে এতবড় একটা জ্যান্ত তিমিকে এভাবে কাছে পেয়েছে? এই তো এল বলে, দু-চারদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানীর দল এসে যাবেন। আসবে প্রেস, ক্যামেরা, মুভি, টি-ভি।’
লোকগুলো নির্বিকার।
লক্ষ করলেন না মোয়াট এমন নয়, কিন্তু না থেমে বলেই গেলেন তিনি, ‘এই তো গতরাতেই ফোনোগ্রামে মেসেজ পেয়েছি…’ রঙ চড়ালেন, ‘দলে দলে বিদেশী আসা মানেই আর্থিক লাভ। টুরিস্ট এযুগের লক্ষ্মী
কিন্তু মোয়াটের কথায় বিন্দুমাত্র মন নেই কারও। তাঁর কথার মাঝখানেই ফস করে বলে ফেলল একজন বুড়ো জেলে, ‘পণ্ডে আর একটা হেরিংও নেই। সব খেয়ে সাবাড় করেছে!’
এতক্ষণ বুঝলেন মোয়াট, তিমিনী বার্জিওর লোকের প্রতিদ্বন্দ্বীও বটে। ওরা যে মৎস্যজীবী। সবাই তো বার্ট চাচা কিংবা ডগ হানের মতো উদার নয়।
এই সময় হই হই করতে করতে চার-পাঁচটা স্পীড বোট নিয়ে জর্জির দল হাজির হয়ে গেল। তবে আজ ওদের হাতে বন্দুক নেই। আছে ট্রানজিস্টর আর বিয়ারের বোতল। বোট থেকে নেমে সদলবলে এগিয়ে এল ওরা। মোয়াটকে যেন দেখতেই পেল না।
একজন বলল, ‘কি বলিস, জর্জি? পুলিশ বাধা না দিলে এতদিনে হারামজাদীকে সাবাড় করে ফেলা যেত।’
বিয়ারের বোতল খোলায় ব্যস্ত জর্জি। জবাব দিল না।
ঢ্যাঙ্গা মতো এক ছোকরা, গালে ক্ষুর লাগায়নি এখনও, হালকা রোঁয়ার মত লালচে দাড়ি দেখলে ঘিন ঘিন করে ওঠে গা, সে বলল, ‘কোথা থেকে এসব বাজে ঝামেলা এসে হাজির হয়! আহাহা, তিমি-প্রেমিক। জীবে দয়া— শালাহ্!
মোয়াটকে দেখিয়ে মাটিতে থুথু ফেলল জর্জি। নিজের বুকে টোকা দিয়ে বন্ধুকে বলল, ‘কোন শালাকেই পরোয়া করে না এই বান্দা। মরদের বাচ্চা হলে, সামনাসামনি লড়তে আসবে। মাগী-মানুষের মতো পুলিশের পায়ে মাথা ঠোকা কেন?’
‘ধরে এমন তালিম দিয়ে দেব একদিন…’ বলল ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা।
‘হয়েছে, বকর বকর থামা!’ ধমক দিল জর্জি, ‘এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছাগল মানুষ করার চেয়ে চল যাই, যা করতে এসেছি করিগে।’
বিয়ারের বোতল নিয়ে যে যার বোটে ফিরে গেল ওরা। বুঝলেন মোয়াট, শুধু তাকে দুকথা শোনানোর জন্যেই নেমেছিল। কিন্তু হাতে রাইফেল-বন্দুক নেই, কি করতে এসেছে? কিভাবে ক্ষতি করতে পারে অত বড় প্রাণীটার?
বোঝা গেল কয়েক মিনিট পরেই। চার-পাঁচটা বোট নিয়ে তিমিনীকে এলোপাতাড়ি তাড়া করতে লাগল ওরা। ভয় পেয়ে ছুটাছুটি শুরু করল ওটা।
শয়তানের দল বুঝে নিয়েছে, দানবাকৃতি হলে কি হবে, তিমিনীটা একেবারেই নিরীহ, শান্ত, ওর কাছ থেকে বিপদের সম্ভাবনা নেই। এবং এই দুর্বলতার সুযোগটাই নিল ওরা। মাঝে মধ্যে অন্তত নির্বিষ ঢোঁড়া সাপের মত ফোঁস করেও যদি উঠত তিমিটা, তাহলেও ভয় পেত ওরা। কিন্তু বেচারী যে হিংসা জানে না, প্রতিবাদে রুখে ওঠার শিক্ষা পায়নি।
এলোপাতাড়ি ছুটাছুটিতে দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল ক্ষুধার্ত প্রাণীটা। ইতিমধ্যে জল-পুলিশের মোটর বোট নিয়ে এসে পৌঁছেছে মাৰ্ডক।
ডগ হান কম কথা বলে, কিন্তু এখন মুখর হয়ে উঠল। মার্ডক বোট থেকে নামতে না নামতেই ছুটে গেল ওর কাছে, ‘দোহাই, সার্জেণ্ট! ওদের থামান!
হতাশভাবে হাত নাড়ল মার্ডক। ডগকে নয়, মোয়াটকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আয়্যাম সরি, স্যার। বে-আইনী কিছু করছে না ওরা। গুলি আমি করতে দেব না, কিন্তু অল্ডরিজেস পণ্ডে স্পীড বোট চালানোয় আইনের কোন বাধা নেই।’
আইন! আইন! সভ্য মানুষের অসভ্যতা চালানোর মস্ত হাতিয়ার! মনে মনে খেপে গেলেন মোয়াট। স্যামসন বন্দি হবার পরে সম্রাটও তাই বলেছিলেন, বন্দি বীরের অঙ্গ স্পর্শ করা হবে না, শুধু জ্বলন্ত অঙ্গার খণ্ড ধরে রাখা হবে তাঁর চোখের আধ ইঞ্চি সামনে। তাতে আইনত কোন বাধা নেই!
মার্ডককে দেখেই তার পিছু পিছু এসেছে জর্জির দল। একটু যে শঙ্কিত না হয়েছিল, তা নয়। কিন্তু মার্ডকের কথা শোনার পরই পৈশাচিক আনন্দে হুল্লোড় করে উঠল ওরা। বন্দুক নয়, শব্দ দিয়ে জব্দ করবে প্রতিপক্ষকে।
আবার তিমিনীকে ধাওয়া করল ওরা। স্পীড বোটের শব্দ সহ্য করতে পারছে না সে, বোঝা যাচ্ছে। হতভাগ্য জানোয়ারটাকে শ্বাস নেবার অবকাশ দিচ্ছে না জর্জির দল। ক্রমাগত ওর ঘাড়ের ওপর নিয়ে যাচ্ছে বোটগুলো, মাথা জাগাবার উপক্রম করেও আবার বাধ্য হয়েই ডুব দিতে হচ্ছে তাকে। পাগলের মতো হ্রদের এপ্রান্তে ওপ্রান্তে এলোপাতাড়ি ছুটছে জানোয়ারটা, মাঝেমধ্যে দেহটা খাড়া করে তুলে ঘাই দিচ্ছে, উল্লাসে ফেটে পড়ছে তখন জর্জিরা।
কিছুই করতে পারছেন না মোয়াট। অসংখ্য পিশাচের বিরুদ্ধে একা কি করবেন?
পূর্ব দিগ্বলয় ছেড়ে উঠে এসেছে সূর্য। বাতাসে ভেসে আসছে রবিবার সকালে গির্জার প্রার্থনা সভায় আহ্বান। মোয়াট ভাবছেন, স্বয়ং ঈশ্বর কি শুধু গির্জার ওই চার দেয়ালের মাঝেই বন্দি হয়ে আছেন? বাইরে বেরিয়ে পিশাচগুলোকে সাজা দেবার কি তাঁর কোন ক্ষমতা নেই?
এর আগের রোববারের মতো এই সাবাথ ডেতেও গির্জার উপস্থিতি কম। দলে দলে লোক এসে জড় হচ্ছে হ্রদের পাড়ে। বন্দি তিমিকে দেখতে, তার অসহায়ত্ব দেখে মজা পেতে। ছানা-পোনা নিয়ে একটা মোটর বোটে করে এসেছে ডাক্তার দম্পতি। পাশে বড় বাস্কেট, তাতে সারাদিনের জন্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম—বিয়ারের বোতল, লাঞ্চ প্যাকেট, থার্মোস, দূরবীন, ক্যামেরা ইত্যাদি। আর একটা মোটর লঞ্চে করে এসেছে মেয়র। ডেকে দাঁড়িয়ে মুভি ক্যামেরায় তিমিটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ডগকে বললেন মোয়াট, ‘মেয়র সাহেবের লঞ্চের গায়ে বোটটা ভেড়াও তো ডগ।
কাছাকাছি আসতেই চেঁচিয়ে মেয়রকে বললেন মোয়াট, ‘দোহাই আপনার, ওদের থামান! আপনার কথা না শুনে পারবে না ওরা। দয়া করে তিমিটাকে জ্বালাতে মানা করুন, প্লীজ!’
এগিয়ে এসেছে জর্জি আর মার্ডকের বোট দুটোও। জর্জিরা বুঝে গেছে, আর শয়তানী চলবে না। মেয়র নিষেধ করলে না থেমে উপায় নেই। মেয়রের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে জর্জির দল।
সময় নিচ্ছে মেয়র। মুভি ক্যামেরা প্যান করায় ব্যস্ত। তিমিটা ডুব দেয়ার পর মুখ তুলল। হাসি হাসি মুখ। জবাব দিল, ‘কি লাভ বলুন? তিমিটা তো মরবেই। আমি কেন মাঝখান থেকে ছেলেছোকরাদের আনন্দে বাধা দিই?’
পরের বারে ইলেকশনে ভোট জোগাড়ের ইচ্ছেতে আগেই পথ কিছুটা সাফ করে রাখল দারুণ স্বার্থপর লোকটা।
উল্লাসে ফেটে পড়ল জর্জির দল, ‘ব্রেভো, মেয়র সাহেব! এই না হলে আমাদের মেয়র!’
তাই তো, এই না হলে জর্জির দলের মেয়র! বুঝলেন মোয়াট, সব চেষ্টা বৃথা। তিমিনী মরবেই। এবং আজই। ঠেকাবে না কেউ। তবু কি একটা কথা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলা হলো না। তার আগেই ঘটে গেল ঘটনা।
মেয়রের উৎসাহ পেয়ে চতুগুণ আনন্দে উদ্যমে তিমিটাকে আবার আক্রমণ করল জর্জির দল। তিন দিক থেকে তিনটে বোট নিয়ে তুমুল গতিতে ছুটে গেল। এভাবে আক্রান্ত হয়ে মতিভ্রম ঘটল তিমিনীর। ভুল করল, কিংবা এটা ওর নিরুপায় আত্মসমর্পণ। হ্রদের পশ্চিম দিকে সোজা ছুটে গেল তিমিনী। পাথর নেই সেদিকে, নরম বালিতে ঢাকা পাড়। বিদ্যুৎ-গতিতে ছুটে গেল সে! শেষ মুহূর্তে বোধহয় গতি সংবরণ করতে পারল না, কিংবা আত্মহত্যার কথাই ভেবে স্বেচ্ছায় গতি থামাল না! ঢালু বালুকাবেলার ওপর দিয়ে সোজা উঠে গেল ডাঙায়।
বিস্ময়ে-উল্লাসে একযোগে চিৎকার করে উঠল দর্শকরা।
তিমিনীর দেহের চারভাগের তিনভাগ এখন ডাঙায়। লেজসহ পেছনের সামান্য অংশ ছাড়া পুরো শরীরটাই শুকনোয়। অনুমান করলেন মোয়াট, ওর দেহের যা ওজন তাতে তলপেটটা নিশ্চয় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। আর পালাতে চায় না যেন তিমিনী। পেটের বাচ্চাকে বাঁচাতে তার সাধ্যমতো সে করেছে, কিন্তু মানুষ নামক কিছু নিষ্ঠুর জন্তুর সঙ্গে পেরে না উঠে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে। অনিবার্য মৃত্যুর পায়ে অন্তিম আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে আছে সে।
পরিষ্কার দেখলেন মোয়াট, মাদী তিমিই ওটা। গর্ভবতী। বিন্দুমাত্র ভুল নেই অশিক্ষিত তিমি বিশেষজ্ঞের অনুমানে। তিমিনীর সারাদেহে বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। ক্ষতের মুখে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। সাত দিনের অনাহারে অত্যাচারে রোগা হয়ে গেছে সে। পিঠের শিড়দাঁড়া ফুটে উঠেছে চামড়ার নিচে। প্রথম যেদিন দেখেছিলেন, তেমন তেল চিকচিক করছে না আর তিমিনীর চামড়ায়। পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট।
স্বর্ণমুদ্রার থলির মুখ খুলে গিয়ে ভেতরের সবকিছু মাটিতে ছড়িয়ে পড়লে যেভাবে ছুটে যায় লুটেরার দল তিমিনীকে লক্ষ্য করে তেমনি ছুটে গেল জনতা। লাফিয়ে বোট থেকে তীরে নেমেছে জর্জির দল। গুলি ছোঁড়াতে আইনের বাধা আছে কিন্তু পাথর ছোঁড়াতে নয়। মুমূর্ষু তিমিনীর গায়ে পাথর ছুঁড়তে লাগল ওরা। টু শব্দ করল না জানোয়ারটা। ধ্যান-মগ্নের মতো চোখ বুজে পড়ে রইল।
আর সহ্য করতে পারল না ডগ হান। বোট থেকে লাফিয়ে নেমে খেপার মতো ছুটে গেল। তার গায়েও পাথর পড়ছে। খেয়ালই নেই। তিমিনীর একেবারে মুখের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দুহাতে ওর মাথা জড়িয়ে ধরতে গেল, কিন্তু বেড়ে পেল না। চিৎকার করে জানোয়ারটাকে বলতে লাগল, ‘না না’ কিছুতেই না! এভাবে হার মানতে পারো না তুমি! আমরা তো আছি তোমার পেছনে। এই দেখো না, আমি, আমাকে চিনতে পারছ না? আমি ডগলাস হান। ঠিক তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি!’
আচমকা একটা পাথর এসে পড়ল ডগের কপালের এক পাশে। চামড়া কেটে গিয়ে দর দর করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। ঝটকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়াল ডগলাস, ফিরে তাকাল। ধক ধক করে জ্বলছে চোখ। উন্মাদ খুনীর দৃষ্টি।
কিন্তু ছুটে গিয়ে কাউকে আক্রমণ করল না সে। হাত দিয়ে কপালের রক্তও মুছল না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে গাল দিয়ে উঠল, ‘শুয়োরের বাচ্চারা! লজ্জা করে না তোদের! দেখছিস না এটা মাদী তিমি!’
জনতা স্তম্ভিত। ডগের চিৎকারে, ওর চেহারায়, ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, ভাষা খুঁজে পেল না কেউ। প্রতিবাদ করার সাহসও পেল না।
জনতার পুরোভাগে দাঁড়িয়ে ডাক্তার আর মেয়র। তাদের দিকে তাকাল ডগ। আঙুল তুলে বলল, ‘আপনারা না ভদ্দর লোক?’ ছুটে গিয়ে তিমিনীর চেপ্টে যাওয়া বিশাল তলপেটে থাবা মেরে বলল, ‘দেখতে পাচ্ছেন না, ওর পেটে বাচ্চা? আপনাদের ঘরে মা-বোন নেই? তাদের পোয়াতি হতে দেখেননি কখনও? উলঙ্গ করে দেখতে এসেছেন এই মেয়েটাকে?’
পাগল হয়ে গেছে যেন ডগ। জনতার জবাবের অপেক্ষা না করে ছুটে গেল তিমিনীর কাছে। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বিড়বিড় করে যেন কি বলল, যেন চুমো খেল। তারপর ওর পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে ধাক্কা দিতে লাগল পানির দিকে। পাগলই হয়ে গেছে ডগ হান। আশি-নব্বই টন জগদ্দল পাহাড়কে ঠেলে সরাবে! গায়ের জোরে! একা?
ডগ কি বুঝতে পারছে না, ইচ্ছে করলেও আর বাঁচবে না এখন তিমিনী? যা কিছু কেরামতি ওর পানির তলায়, ডাঙায় কোন ক্ষমতাই নেই। ওই প্ৰকাণ্ড দেহ নিয়ে কোন দিন আর পানিতে নামতে পারবে না…কিন্তু এ কি! তিমিনী যে চোখ মেলল। স্পন্দন জাগল তার অনড় দেহে। নড়ছে সে, হ্যাঁ, তিল তিল করে সরছে।
বিশাল জনতা স্তব্ধ। কারও মুখে কথা নেই। ডানায় ভর দিয়ে অতি ধীরে একশো আশি ডিগ্রী মোড় ঘুরল জানোয়ারটা। লেজটা ডাঙায় উঠে এসেছে, মুখটা পানির একেবারে প্রান্তে। এক সেকেণ্ড থামল, দম নিল। তারপর কুমির যেভাবে চার পায়ে ভর দিয়ে নামে, অনেকটা তেমনি করে ডানায় ভর দিয়ে তিল তিল করে পানির দিকে এগিয়ে গেল সে। হয়তো এভাবে বুকে হেঁটে এগিয়ে যাবার ব্যাপারটা তার রক্তে মিশে আছে এখনও। সেই দশ কোটি বছর আগে তার পূর্বপুরুষরা এমনি করেই তো পানিতে নেমেছিল।
গোটা জনতাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আবার পানিতে ফিরে গেল তিমিনী।
অতিকায় দেহ নিয়ে তলিয়ে গেল অল্ডরিজেস হ্রদের পানিতে।
নাটকের চরম ক্লাইম্যাক্সটা তখনও বাকি। একদৃষ্টে তিমিনীর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন মোয়াট, এখন ফিরে চেয়ে দেখলেন মাথা নিচু করে একে একে যার যার নৌকায় গিয়ে উঠছে জনতা।
কারও মুখে কোন কথা নেই। জর্জির দল পর্যন্ত চুপ। আধ ঘণ্টার মধ্যেই জনশূন্য হয়ে গেল জায়গাটা। মাথার ওপর চক্রাকারে পাক খাচ্ছে কয়েকটা সী- গাল। তীরে দাঁড়িয়ে শুধু মোয়াট আর ডগ হান।
নাটকের নায়িকা হ্রদের গভীরে, মাথা তুলছে না।
একটা পাথরের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল ডগ। দুই হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজল। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। এগিয়ে গেলেন মোয়াট। ডাকলেন, ‘ডগ, ওঠো । চলো যাই।’
ডগ হান সাড়া দিল না। একভাবেই বসে রইল।
ঝুঁকে ওর একটা হাত ধরে টান দিলেন মোয়াট। ধীরে ধীরে মুখ তুলে চাইল ডগ। কপালের রক্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে চোখের পানি। টপ টপ করে কয়েক ফোঁটা ঝরে পড়ল ওর শার্টে, বুকের কাছটায়। কেন কাঁদছে ডগ? তিমিনীর জন্যে? না তার হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয়ার জন্যে, যাকে ওই তিমিনীর মতোই একঘরে করে মরতে বাধ্য করেছিল কুৎসিত গেঁয়ো-সমাজ?
