তিমির প্রেম – ১৩
তেরো
রবিবারের ঘটনার পর নিজের অসহায় অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝে নিলেন মোয়াট। শুধু জর্জিরাই নয়, ডাক্তার-মেয়রের মতো ভারিক্কি লোকেরাও এখন তাঁর বিপক্ষে যাবে। ঘটনার নাটকীয়তায় সেদিন ওরা সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করেছিল বটে, কিন্তু একটা নগণ্য জেলের গাল খাওয়া সহ্য করবে না ওরা কিছুতেই। প্রত্যাঘাত হানবেই। এবং সেটা শুধু ডগের ওপরই নয়, আসবে মোয়াট-দম্পতি, তাঁদের সমর্থক এবং অবশ্যই তিমিনীর ওপরও। অস্ত্রটা নিক্ষেপ করার এইই সময়, উপলব্ধি করলেন মোয়াট। আর দেরি করা যাবে না।
সোমবার। সকাল দশটায় ক্যানাডিয়ান প্রেসকে একটা বিস্তারিত আর্জেন্ট টেলিগ্রাম পাঠালেন মোয়াট:
সত্তর ফুট লম্বা প্রায় আশি টন ওজনের একটি ডানা তিমি একুশে জানুয়ারি থেকে এখানকার একটি হ্রদে বন্দি হয়ে আছে। হ্রদটি একটি অ্যাকোয়ারিয়ামের মতো, দৈর্ঘ্যে প্রস্থে আধ মাইল করে, যাতে তিমি নড়াচড়া করতে পারে। প্রথম পাঁচ দিন রাইফেলের গুলিতে তাকে বিপর্যস্ত করেছে স্থানীয় কিছু অতি উৎসাহী যুবক। এখনও স্পীডবোট নিয়ে তাকে ক্রমাগত উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে। স্থানীয় জল পুলিশের সাহায্যে গুলিবর্ষণ বন্ধ করেছি, কিন্তু অন্যান্য বিপদের আশঙ্কা যায়নি। বড় জাতের তিমির এভাবে বন্দি হওয়াটা অভূতপূর্ব সংবাদ। বৈজ্ঞানিক গবেষণারও অপূর্ব সুযোগ পাওয়া গেছে। অনাহারে তিমিনী দুর্বল। ওজন দ্রুত কমছে। তাছাড়া আর সব মোটামুটি ঠিকই আছে। তিমিনী বড়ই শান্ত। অত্যাচারে যারা জর্জরিত করেছে, তাদেরকে একেবারে হাতের কাছে পেয়েও কিচ্ছু বলে না। বিস্তারিত সংবাদের জন্যে বার্জিওতে আমাকে টেলিফোন করুন। সাহায্য চাই। অত্যন্ত জরুরী।
অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেল। ওই দিনই বেলা বারোটায় রেডিওর সংবাদে মোয়াটের টেলিগ্রামটি পড়ে শোনানো হলো। এরপর থেকে টেলিফোনে বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন তিনি।
বার্জিও এবং তার আশেপাশের কিছু তথাকথিত হোমড়া-চোমড়া লোক উদাসীন হলেও তিমি সম্পর্কে দারুণ আগ্রহী উন্নত বিশ্ব। তারা খবরটা শুনেই লুফে নিল। তাছাড়া প্রায় একই ধরনের আর একটি ঘটনা ঘটছে তখন বার্জি ও থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে।
ম্যাকেঞ্জি নদীর মোহনার কাছে এস্কিমোদের এক গ্রামে সতেরোটা সাদা তিমি বরফের বলয়ে আটকে পড়েছে। গ্রামের নাম ইনুভিক। তিমিগুলো উষ্ণতর অঞ্চলে সরে যাবার আগেই দুর্ঘটনাক্রমে তাদের চারদিকে বরফের বলয় ঘিরে আসে। বন্দি অঞ্চলের বাইরে যেদিকেই তাকানো যায়, চল্লিশ-পঞ্চাশ মাইল বরফের পুরু আস্তরণে ঢাকা। নিচে পানি আছে অবশ্যই, কিন্তু অত পথ এক ডুবে যেতে পারবে না তিমিগুলো। বন্দি তিমিনীকে মেরে ফেলার দিকে ঝোঁক বার্জিওর মেয়রের, কিন্তু ঠিক উল্টো কাজ করছেন ইনুভিকের মোড়ল। গ্রামবাসীদের নিয়ে তিমিগুলোকে বাঁচাতে উঠে পড়ে লেগেছেন তিনি। সভ্য দুনিয়ায় খবর পাঠিয়ে হেলিকপ্টারে করে বরফ কাটার আধুনিক যন্ত্র আনিয়েছেন। দিবারাত্র তিন শিফটে কাজ করাচ্ছেন, যে করেই হোক বরফ কেটে বাঁচাতে হবে তিমিগুলোকে। কিন্তু শীত যত বাড়ছে, অবস্থা তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে।
যে রবিবারে জনাকীর্ণ অল্ডরিজেসে শিক্ষিত মেয়র মোয়াটকে শোনাচ্ছে, কি লাভ বলুন? তিমিটা তো মরবেই। মাঝখান থেকে আমি কেন ছেলেছোকরাদের আনন্দে বাধা দিই? ঠিক সেই রবিবারেই নিজের লোকদের ভিন্ন জাতের কথা শোনাচ্ছেন ইনুভিক গ্রামের মোড়ল। সেদিন সেখানে তাপাঙ্ক শূন্যের চল্লিশ ডিগ্ৰী নিচে নেমেছে। গ্রামের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড তুষার-ঝড় বইছে। চারদিকে শুধু বরফ, বরফ আর বরফ। সেই ভয়ানক দুর্যোগের মাঝে ম্যাকেঞ্জির অশিক্ষিত মোড়ল সে গ্রামে জর্জির বয়েসী যুবকদের বলছেন, ‘না হাল ছেড়ো না। প্রয়োজন হয় সারা রাত একনাগাড়ে বরফ কাটব। কিন্তু ওই সতেরোটা অসহায় জীবকে বাঁচাতেই হবে।’
কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও তিমিগুলোকে বাঁচাতে পারলেন না মোড়ল। টেলিগ্রামে খবর পাঠিয়েছেন, ‘পারলাম না। সারা রাতের পরিশ্রম ব্যর্থ হয়েছে। বরফের কবরে অন্তিম সমাধি হয়েছে সতেরোটি তিমির।’
টেলিগ্রামটা পত্রিকা অফিসের সম্পাদকের টেবিলে পড়ে আছে। ঠিক তার পাশেই পড়ে আছে আর একটি বিপরীতধর্মী টেলিগ্রাম, মোয়াটের পাঠানো ।
খবর পরিবেশন করাটাও একটা আর্ট। সম্পাদকের সেটা জানা আছে। পাশাপাশি দুটো কলামে, সাজিয়ে গুছিয়ে দুটো খবর বের করা হলো কাগজে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সম্পাদক সাহেব, ইনুভিক এবং বার্জিও : দেবতা এবং দানব: মানবিকতা এবং পাশবিকতা: বিউটি অ্যাণ্ড দা বীস্ট
