তিমির প্রেম – ১৪
চোদ্দ
সোমবার দুপুরে ওনি স্টিকল্যাণ্ড মোয়াটকে ডাকতে এল, ‘স্যার, অল্ডরিজেস পণ্ডে যাবেন নাকি একবার? চলুন, দেখি আংকেলের ফন্দিতে কোন কাজ হলো কিনা?’
‘আংকেলের ফন্দি!’
‘বিস্তারিত শোনাল ওনি। বার্ট চাচার জ্বর সেরেছে। উঠে বসেছে এতদিনে। আগের রাতে ডগ হান গিয়ে সব খুলে বলেছে তাকে। চাচা বলেছিল, জলদি মেয়েটাকে কিছু খাওয়াতে হবে। না, মরা মাছ সে খাবে না। খাওয়াতে হবে জ্যান্ত হেরিং। কি করে খাওয়ানো যায় সে ফন্দিটাই বাতলেছে—জোয়ারের পানির সঙ্গে প্রতিদিনই বেশ কিছু হেরিং অল্ডরিজেস পণ্ডে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই কি করে যেন বুঝে ফেলে মাছগুলো তিমিটার উপস্থিতি। ভাটার টান শুরু হবার আগেই ওগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে পালিয়ে যায়। বার্ট চাচা বলেছে, ভরা, জোয়ারের পর সাউথ চ্যানেলের মুখ জাল দিয়ে আটকে দিতে হবে।
ভোর রাতে হানেরা দুই ভাই গিয়ে চ্যানেলের মুখ আটকে দিয়ে এসেছে। এখন ভাটা, পানি নেমে যাচ্ছে। গিয়ে দেখতে চায় ওনি অবস্থাটা।
সাউথ চ্যানেলের কাছাকাছি গিয়েই মদ্দা তিমিটাকে দেখতে পেলেন মোয়াট। মাডি কোভ-এর বুড়ো জেলেটি ঠিকই বলেছিল। তিমিটাকে শুধু দেখলেনই না তার ডাকও শুনলেন মোয়াট। তিনি বলেছেন, এ ডাক নয়, বুকফাটা আর্তনাদ।’ এই আর্তনাদের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি: গভীর কাঁপা কাঁপা এই আওয়াজ। যেন কুয়াশা ঢাকা মধ্যরাতে বহুদূর থেকে ভেসে আসছে গির্জার প্রার্থনা সংগীতের অর্গান পাইপের একটানা শব্দ। শুনলে কেন যেন গা শিরশির করে, বিচলিত বোধ হয়, মনে হয় চেনাজানা দুনিয়ার বাইরে থেকে বুঝি ভেসে আসছে কোন অশরীরী আত্মার আর্তি।
একবারই ডাকল মদ্দাটা। আরও ডাক শোনার জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন মোয়াট, কিন্তু আর ডাকল না তিমি। চলেও গেল না, সাউথ চ্যানেলের মুখের কাছে ক্রমাগত পাক খেয়েই চলল। বোটটাকে প্রণালীর আরও কাছাকাছি নিয়ে গেল ওনি। দেখে গভীর সাগরে তলিয়ে গেল তিমিটা।
তারা সাউথ চ্যানেলে ঢুকতে না ঢুকতেই ভেসে উঠল তিমিনী। মাথা উঁচু করে দেখল নৌকার লোকদের। যেন বুঝতে চাইছে, তার শুভাকাঙ্ক্ষী পরিচিতরাই এল কিনা।
এই সময়ই একটা কাণ্ড ঘটল। তিমিনীকে গভীরভাবে লক্ষ করছিল বলে খেয়াল করেনি এতক্ষণ বোটের কেউ। পশ্চিমে স্থির হয়ে ভাসছিল আরেকটা বোট। তিমিটা মাথা তোলার সঙ্গে সঙ্গে স্টার্ট দিয়ে উল্কার মতো ছুটে এল ওটা। সোজা ছুটে গেল তিমিনীর মাথার ওপর দিয়ে। বিপদের গন্ধ পেয়ে চোখের পলকে ডুব দিল সে, কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেল। ওর শিরদাঁড়ায় ঘষা খেল স্পীডবোটের তলা। উল্লাসে চিৎকার করে উঠল স্পীডবোটের যাত্রীরা।
বোটের লোকগুলো মোয়াটের চেনা। দলপতি জর্জি নেই, কিন্তু দলের অন্যেরা আছে।
ঘুরে আবার এগিয়ে এল বোট। নির্লজ্জের মতো হি-হি করে হাসছে বখাটে ছেলেগুলো। মাথায় রক্ত চড়ে গেল মোয়াটের। রাগে অন্ধ হয়ে গেলেন তিনি। চেঁচিয়ে বললেন, ‘এই কি করো! যাও এখান থেকে! জানো না, তিমিনীকে বিরক্ত করতে মানা করে দেয়া হয়েছে?’
আঠারো-উনিশ বছরের সেই রোঁয়াদাড়ি ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে বোটের পুরোভাগে। মোয়াটের ধমকানি গায়ে না মেখে হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করল, ‘তা কে মানা করল? জন্তু-প্রেমিক নাকি?’
মিছে কথা বললেন মোয়াট, ‘মানা করেছেন প্রধানমন্ত্রী জো স্মলউড। শোনোনি আজকের রেডিও ব্রডকাস্ট? পাঁচ মিনিটের মধ্যে পশু ছেড়ে না গেলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কমপ্লেন করে সোজা হাজতে পাঠাব আমি তোমাদের। যাও, ভাগো!’
মোয়াটের এতবড় কথার পরেও কিন্তু আক্রমণাত্মক কোন কিছু করল না ছোকরাগুলো। স্মলউডের নাম শুনেই বেলুনের মতো চুপসে গেছে। রেডিও ব্রডকাস্ট ওরা শোনেনি। কি জানি, সত্যিই যদি ঘোষণা করা হয়ে থাকে? নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কি শলাপরামর্শ করল ওরা।
নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন মোয়াট, জোরে জোরে ওদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে মিনিট গুণছেন।
ধমকটা কাজে লাগল। স্পীডবোটের মুখ ঘোরাল ওরা। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে পণ্ড ছেড়ে চলে গেল।
আবার নীরবতা ঘনিয়ে এল হ্রদের চারপাশে। সেই নীল আকাশ, নীল হ্রদের পানি আর এক ঝাঁক সাদা-সী গাল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই কি করে যেন বুঝে নিল তিমিনী শত্ৰু নৌকাটা চলে গেছে। ফিরে এল সে। ডোরিটাকে ঘিরে পাক খেতে লাগল। স্পীডবোটের ঘষা খেয়ে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবারে দেখা গেল। পিঠে সাত-আট ফুট লম্বা একটা ক্ষতচিহ্ন, চামড়া ছিঁড়ে রাবার বেরিয়ে পড়েছে।
এরপর সারাটা দিন ওনিকে নিয়ে পণ্ডে রইলেন মোয়াট। পাহারা দিলেন আর কেউ তিমিনীকে বিরক্ত করতে এল না। সাঁঝের দিকে এল মার্ডক। তার ওপর তিমিনীর ভার দিয়ে ওনিকে নিয়ে ফিরে এলেন মোয়াট।
ওদিকে একের পর এক ফোন-কল আসছে। রিসিভ করতে করতে পাগল হওয়ার জোগাড় হয়েছে ক্লেয়ারের। কল আসছে অধিকাংশই বাইরের দুনিয়া থেকে। সাধারণ লোক তো করছেই, করছে খবরের কাগজের রিপোর্টার, বৈমানিক, সরকারী অফিসারেরা। টেলিগ্রাম এসেছে আটটা। একটা টেলিগ্রাম পড়ে তো আনন্দে ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে হলো মোয়াটের। সকালে জর্জির দলকে মিথ্যে ধমক দেয়াটা আর মিথ্যে রইল না। টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন স্মলউড স্বয়ং। বুঝলেন মোয়াট, প্রেসের গুণ।
টেলিগ্রামটাতে লেখা :
আপনার প্রেরিত সংবাদে আনন্দিত। তিমিটাকে খাওয়ানোর জন্যে আপনি এক হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন। টাকাটা সরকারী ফাণ্ড থেকে দিয়ে দেয়া হবে। বার্জিওর জেলেদের সহায়তায় তিমিটাকে জীবিত রাখুন। প্রীতি ও শুভেচ্ছান্তে,
–জে. আর. স্মলউড
মোয়াট টেলিগ্রামটা পড়ে টেবিলে নামিয়ে রাখার পর ব্লেয়ার বললেন, তোমার বন্ধু জ্যাক ফোন করেছিল। বলেছে, যথেষ্ট নাচানাচি করছে স্মলউড, কিন্তু তার সঙ্গে তুমিও যেন না, নাচো।’
‘মানে?’
‘জ্যাক বলেছে, টাকা খরচ করলে ওটা আর ফেরত পাবে না ধরে নিয়েই
করবে।’
‘সেটা আগেই বুঝেছি আমি। ওটা কি, কি বানাচ্ছ?’
বোর্ডটা তুলে দেখালেন ক্লেয়ার। সারাদিনে ফোন-কল রিসিভ করার ফাঁকে ফাঁকে প্রকাণ্ড এক কাঠের বোর্ডে রঙ তুলি দিয়ে একটা নোটিশ লিখেছেন-
সাবধান!
এই তিমিটিকে কোনভাবে বিরক্ত
করবেন না।
অল্ডরিজেস পণ্ড সাময়িকভাবে
নৌকাযাত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা।
বিশেষ অনুমতি ছাড়া হ্রদে প্রবেশ নিষেধ।
আদেশক্রমে—
নিউফাউণ্ডল্যাণ্ড সরকার।
মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে শুধু বার্জিও নয়, মোয়াটও বিখ্যাত হয়ে গেলেন। অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে অকল্পনীয় সব ফোন-কল টেলিগ্রাম আসতে থাকল। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দ্বিতীয় আরেকটি টেলিগ্রাম এসে হাজির:
আপনাকে সরকারীভাবে ওই তিমির অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়েছে। দায়-দায়িত্ব সব আপনার। এ জন্যে যথোচিত সম্মান আপনার প্রাপ্য হয়ে রইল। প্রীতি ও শুভেচ্ছান্তে,
—জে.আর.স্মলউড
ক্যানাডিয়ান প্রেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের রিপোর্ট ছাপা হলো সেদিনকার সংবাদপত্রে
প্রধানমন্ত্রী আজ সংসদ বৈঠকে ঘোষণা করেছেন, বার্জিওতে বন্দি তিমির রক্ষক রূপে সাহিত্যিক ফার্লে মোয়াটকে নিযুক্ত করা হয়েছে। জনৈক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন-আশি টন ওজনের প্রকাণ্ড জলজন্তুর এই অভিভাবককে কি জাতের উপাধি দান করা যাবে সেটা এখনও স্থির করা যায়নি, কারণ ব্যাপারটা পৃথিবীর ইতিহাসে অভূতপূর্ব। রক্ষক-সাহেবের জন্যে যথোপযুক্ত জমকালে ইউনিফর্মের অর্ডার দিতে হবে। সদস্যরা একথায়, সমম্বরে হেসে ওঠায় স্মলউড বলেন—এটাকে হালকা করে দেখবেন না আপনারা। ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রাচীন ভূতপূর্ব এই উপনিবেশে আবার নতুন ‘তিহাস রচিত হতে চলেছে।
শোনা যাচ্ছে, তিমিটার একটা নামকরণও করা হবে। কেউ কেউ বলছেন নামটা হওয়া মবি জো! উপযুক্ত নাম। বিখ্যাত কিন্তু কল্পিত মবি ডিক-এর মতো এই তিমিও বিশ্ববিখ্যাত হতে চলেছে। হয়তো সেই সূত্রে সাহিত্যিক ফার্লে মোয়াটের নামও হয়ে যাবে ফার্লে আহাব
কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন জানিয়েছে, ছবি তোলার জন্যে একটি টীম পাঠিয়েছে ওরা, দলপতি বব ব্রুক্স। ক্যানাডিয়ান মেরিন লাইফ পাঠাচ্ছে একজন সরকারী তিমি-বিশেষজ্ঞকে। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী ডক্টর উইলিয়াম শোভিল নিজে থেকেই টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অনুরোধ করেছেন, তিনি মোয়াটের অতিথি হতে চান। এমনি আরও সব প্রস্তাব।
দু-একটা মজার প্রস্তাবও এসেছে। লুইজিয়ানার এক সার্কাসের মালিক জ্যান্ত অবস্থায় তিমিনীকে কিনতে চান। মোয়াট কত দাম চাইছেন?
মনট্রিলের একজন ধনকুবের লিখেছেন, আগামী বিশ্ব-মেলায়, অর্থাৎ এক্সপো ৬৭-তে তিনি তিমিনীকে উপস্থিত করতে চান। জীবিত অবস্থায় তাকে হস্তান্তর করলে নগদ এক লক্ষ ডলার দিতে রাজি আছেন। মোয়াট বেচতে রাজি আছেন কিনা জানতে চেয়েছেন ধনকুবের।
টেলিগ্রামের বাণ্ডিল মোয়াটের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন ক্লেয়ার, ‘বলো, কাকে কি বলি!’
‘বাদ দাও ওসব কথা,’ বললেন মোয়াট, ‘তিমিটাকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন আসল ব্যাপার। ওকে খাওয়াব কি? কি ভাবে খাওয়াব?’
‘সে বিষয়েও নানা খবর আছে। হেরিং ধরার সিনার জাহাজ পাঠাচ্ছে নাকি কর্তৃপক্ষ। জ্যান্ত হেরিং ধরে সাউথ চ্যানেল দিয়ে পাচার করা হবে হ্রদে।’
পাঠাচ্ছে! কিন্তু সেটা কবে? এদিকে যে না খেয়ে খেয়ে মারা যেতে বসেছে তিমিটা। ওদের ওই পাঁয়তারাই সার। আসলে ব্যবস্থা করতে হবে আমাদেরই।’
‘হ্যাঁ, কি যেন বলতে এসেছিল তোমাকে আংকেল বার্ট। না পেয়ে একাই পণ্ডে চলে গেছে।’
একটু যেন ভরসা পেলেন মোয়াট। অশিক্ষিত তিমি-বিশেষজ্ঞ কাজে হাত দিয়েছে। এবারে ঠিকই খাবার পাবে তিমিনী। ডোরি নিয়ে তক্ষুণি রওনা হয়ে গেলেন মোয়াট। বার্ট চাচাকে খুঁজে বের করতে হবে।
মোটেই বেগ পেতে হলো না। সহজেই বার্ট চাচার দেখা পেলেন মোয়াট। সাউথ চ্যানেলের মুখের কাছে ডোরিটা নোঙর করে চুপচাপ বসে আছে চাচা। একা।
মোয়াটকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে হাসল। মাথায় ব্যাণ্ডেজ নেই। মেজাজ খুশি খুশি। বোধহয় সাগরের কাছাকাছি এসেই তিরিক্ষি মেজাজটা শান্ত হয়ে গেছে। মোয়াটকে ডেকে বলল, ‘বুঝলে, তিমিটা আমার নাক কেটে দিয়েছে!
মোয়াট ভাবলেন, এমন কিছু করেছে তিমিনী যা বার্ট চাচারও ধারণার বাইরে। সেটা কি জানার জন্যে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু প্রকাশ না করে উল্টে ভুল ধরার চেষ্টা করলেন মোয়াট, ‘ওটা তিমি নয় আংকেল, তিমিনী।’
রাগ করল না চাচা। আবার হাসল। পোড়া তামাকটুকু ফেলে দিয়ে পাইপে নতুন তামাক ভরতে ভরতে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল। তারপর হাসি মুখে বলল, ‘তোমার মতো লেখা পড়া জানা লোক না হতে পারে তোমাদের এই আংকেল বার্ট, কিন্তু নারী-পুরুষের ভেদাভেদ বুঝবে না এতটা মূৰ্খ নয়। আমি তিমিনীর কথা বলছি না, বলছি বাইরের সাগরের ওই তিমির কথা।’
‘ও তোমার নাক কাটল কি করে?’ এবারে আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলেন না মোয়াট।
‘অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আমার মুখ থেকে না শুনে নিজের চোখেই দেখো। এক কাজ করো। আমার ডোরিটায় এসে বসো। তোমার নাকও কাটবে ব্যাটা।’
নিজের ডোরি নোঙর করে রেখে বার্ট চাচার ডোরিতে এসে তার পাশাপাশি বসলেন মোয়াট। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। বড়জোর আধঘণ্টা পেরিয়েছে, নিঃশব্দে মোয়াটের কাঁধে হাত রেখে আলতো চাপ দিল চাচা। আঙুল তুলে ইঙ্গিত দেখাল। মদ্দাটা এসে গেছে। সাউথ চ্যানেলের মুখের বাইরে সাগরে ক্রমাগত পাক খাচ্ছে। মাচায় বসা বাঘ শিকারীর মতো নিঃসাড়ে লক্ষ করছেন মোয়াট।
ক্লকওয়াইজ পাক খাচ্ছে তিমিটা, প্রথমে প্রকাণ্ড বৃত্ত, তারপর আস্তে আস্তে ছোট করে আনছে বৃত্তটা। শেষ দিকে অত্যন্ত ছোট একটা পাক খেয়েই যেন গোঁত্তা মারল বৃত্তের কেন্দ্রে। এরপর যা দেখলেন মোয়াট, স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এমন অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখবেন জীবনে কল্পনাও করেননি।
পোল ভল্টের প্রতিযোগীর মতো সাউথ চ্যানেলের প্রতিবন্ধকতার ওপারে লাফ দিয়ে উঠল প্রকাণ্ড তিমিটা, সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে কয়েক হাজার গ্যালন পানি গড়িয়ে পড়ল অল্ডরিজেস পণ্ডে। দূর থেকেও পরিষ্কার দেখা গেল, সূর্যের আলোয় পানির মধ্যে কি যেন চিকচিক করছে। মোয়াটকে বলে দিতে হলো না, তিনি বুঝলেন, ওগুলো হেরিং। জ্যান্ত।
বার্ট চাচার দিকে চাইলেন মোয়াট। বৃদ্ধের সাগর-নীল দুই চোখের কোণে মুক্তোর মতো চিকচিক করছে দুই ফোঁটা অশ্রু। আবেগভরে মোয়াটের একটা হাত নিজের দুই হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘জানতাম তিমিরা প্রেম করে। কিন্তু ঠিক কতখানি গভীর ওদের প্রেম জানা ছিল না। আজ বুঝলাম। আমরা জানতাম আট- নয় দিন ধরে না খেয়ে থেকেছে মেয়েটা। কিন্তু ভুল। কেউ টের পাইনি, ভাবতেই পারিনি ওপারে থেকে জ্যান্ত হেরিং ধরে চালান দিচ্ছে ব্যাটা তিমির বাচ্চা। লর্ড যীসাসই জানে, ওই মদ্দা শালার পো নিজে না থেকে বৌকে খাওয়াচ্ছে কিনা!’
খুশি হয়ে উঠেছে মোয়াটের মন। আর ভয় নেই। বন্দিনীকে গুলি করা বন্ধ হয়েছে, বিরক্ত করা নিষিদ্ধ হয়েছে, অনাহারেও মরতে হবে না তাকে। দশ দিন কেটে গেছে, ভালয় ভালয় আর হপ্তা-দুই পাড়ি দিতে পারলেই এ যাত্রা বেঁচে যাবে তিমিনী।
ফেরার পথে একনাগাড়ে বকর বকর করে চলেছেন মোয়াট। কিন্তু মোটেই উৎফুল্ল হতে পারছে না চাচা। গম্ভীর ভাবে কি যেন ভাবছে। হঠাৎ-ই এক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে উঠল, ‘থাম তো!’
চমকে উঠে চুপ করে গেলেন মোয়াট। আমতা আমতা করে বললেন, তুমি…তুমি অমন খেপে উঠলে কেন হঠাৎ আংকেল?’
‘খেপব না? বেঁচে গেলেই কি, যদি মুক্তি না পায়?
‘কেন আগামী পূর্ণিমায় পানি বাড়লে …
‘নাহ্ খামোকাই লেখাপড়া শিখেছ,’ হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল বার্ট চাচা। ডোরি থেকে নিচু হয়ে এক আঁজলা পানি তুলে নিয়ে অহেতুক মাথায় মুখে মাখল। তারপর বলল, ‘মনে আছে তোমার, মোট তিনটে সমস্যার কথা বলেছিলাম?’
ঘাড় নাড়লেন মোয়াট, ‘হ্যাঁ, আছে।’
‘তিন নম্বর সমস্যাটা কি জানো? মানুষশত্রু। তাদের হাত থেকে তিমিনীকে রক্ষা করতে হবে। পারবে?’
‘কেন পারব না…সব তো…’ বার্ট চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন মোয়াট। তাই তো। একথাটা তো একবারও চিন্তা করেননি তিনি। আগামী পূর্ণিমা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেও তো তিমিনীর কোন উপকার হবে না! নিজের টেবিলে পড়ে থাকা তিনটে টেলিগ্রামের কথা মনে পড়ে গেল মোয়াটের। বুঝে গেলেন, তিমিনীকে বাঁচানোর জন্যে হঠাৎ কেন অত পাগল হয়ে উঠেছে স্মলউড নামের অতিলোভী জীবটা। হয়তো এরই মধ্যে কোন সার্কাস পার্টির মালিকের সঙ্গে কিংবা অন্য কোন ধনকুবেরের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট সই করে ফেলেছে সে।
ঠিকই বলেছে বার্ট চাচা, ‘বেঁচে গেলেই কি, যদি মুক্তি না পায়?’
যেদিন সাউথ চ্যানেল দিয়ে ঢুকেছে সেদিনই মানুষের পায়ে দাসখত লিখে দিয়েছে তিমিনী। হয় বন্দি হবে স্মলউডদের কালো-কুৎসিত রোমশ বাহুর আলিঙ্গনে নয়ত মারা যাবে জর্জিদের অমানুষিক পাশবিক অত্যাচারে।
