তিমির প্রেম – ১৫
পনেরো
আমূল বদলে গেছে পরিস্থিতি।
সেদিনের সেই উচ্ছ্বাসের পর থেকে মোয়াটের সামনে আসেনি ডগ হান। সম্পূর্ণ অন্য কারণে অসহযোগে করে চলেছে বার্ট চাচা মোয়াটের সঙ্গে দেখা অবশ্য করে। তার বক্তব্য ‘বলির পাঁঠা’ কে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কোন মাথাব্যথা নেই তার। নিজের দোকান নিয়ে ব্যস্ত ওনি স্টিকল্যাণ্ড, মাছ ধরতে রোজ ভোরে বেরিয়ে যায় কেনেথ, ফেরে গভীর রাতে। ওদের কেউই আর মোয়াটের বৈঠকখানায় সান্ধ্য আসর জমাতে আসেন না।
ওদিকে গোটা বার্জিও এখন মোয়াটের বিরুদ্ধে। সে-কথা জানাতেও তাদের সঙ্কোচ নেই। ডাক্তার টেলিফোন করে জানাল, ‘কাজটা আপনি ভাল করেননি, মিস্টার মোয়াট। খবর পাঠানোর ব্যাপারে একজন বহিরাগত হিসেবে আরও সংযত হওয়া উচিত ছিল।’
মানুষ যে কতটা কুৎসিত চরিত্রের হতে পারে তার প্রমাণ মেয়র নিজে। পৌরসভার তরফ থেকে হ্যাণ্ডবিল বিলি করেছে সে: মবি জো জাতীয় সম্পত্তি। তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। মবি জো-র মাধ্যমে আজ বিশ্বের কাছে পরিচিত বার্জিও। বহু বিজ্ঞানী, ট্যুরিস্ট অনতিবিলম্বে এখানে আসবেন। বার্জিওবাসী যেন সুব্যবহার করে তাঁদের সঙ্গে। আর এভাবেই বার্জিওর সুনাম আরও বৃদ্ধি পাবে, দ্বীপের নানা অভিযোগের দিকে নজর পড়বে কর্তৃপক্ষের। বহিরাগত কোন কোন লোক হয়তো দ্বীপবাসীর নামে কুৎসা রটাতে চাইবে, এতে বার্জিওবাসীদের উত্তেজিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সংযত হওয়া ভদ্রতার লক্ষণ।
রোজই একবার অল্ডরিজেস পণ্ডে যান মোয়াট। বন্দিনীকে দেখে আসেন। প্রায়ই নির্জন থাকে হ্রদ আর তার আশেপাশের অঞ্চল। মাঝেমধ্যে দেখা যায় দর্শনার্থী জমেছে, কিন্তু তারা দেখেও দেখে না মোয়াটকে। এরই মাঝে ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনা।
একদিন গিয়ে দেখেন মোয়াট, আবার দশ পনেরোটা ডোরি নিয়ে একদল ছোকরা হাজির হয়েছে হ্রদে। স্পীডবোট নয়, নৌকা। তিমিনীর পিছু পিছু নৌকা বাইছে ওরা। ওদের মধ্যে রয়েছে মোয়াটের অতি পরিচিত বারি রোজ। বেআইনী কাজ করায় একবার বারি রোজ-এর ট্রেড-লাইসেন্স বাতিল হতে চলেছিল। বছর দুয়েক আগের ঘটনা সেটা। মোয়াটকে এসে ধরেছিল বারি রোজ। তিনিই দরখাস্ত লিখে কর্তৃপক্ষের কাছে তদবির করে রোজের লাইসেন্স বাতিল হওয়া বন্ধ করেছিলেন। সেই লোকটাই আজ যেন মোয়াটকে দেখে চিনতেই পারল না।
রোজের নৌকার কাছে নৌকা নিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন মোয়াট, ‘রোজ, নোটিশটা দেখোনি?’
‘দেখব না কেন?’ কর্কশ কণ্ঠে জবাব দিল রোজ। ‘অতবড় নোটিশ দেখব না, কানা তো আর নই! কেন, আপনি তো জানেনই আমি লেখাপড়া জানি না। নোটিশে কি লেখা আছে জানব কি করে?’
স্তব্ধ হয়ে গেলেন মোয়াট। বারি রোজের কাছ থেকে এমন ব্যবহার আশা করেননি। তবু বললেন, ‘ও হ্যাঁ ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি পড়তে জানো না। নোটিশটায় লেখা আছে…’ পড়ে শোনালেন মোয়াট, যদিও জানেন তিনি নোটিশের বক্তব্য জানাই আছে রোজের।
‘আমি নৌকা নিয়ে কোথায় যাব না যাব,’ কর্কশ কণ্ঠেই বলল রোজ, ‘সেটা আমার ব্যাপার। অল্ডরিজেস পশু কারও বাপের খাস তালুক নয় যে নোটিশ টাঙালেই কেঁচো হয়ে যাব।’
এই সময় মার্ডক সেখানে এসে পড়ায় ঘটনাটা ওইখানেই চাপা পড়ল।
আর একদিন পোস্ট অফিসের সামনে। উইণ্ডো ডেলিভারি থেকে একগাদা চিঠি নিয়ে বেরোতেই জিম ব্রোকারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মোয়াটের। জিমের সঙ্গেও বেশ পরিচিত তিনি। বার্জিওতে মোয়াটের বাড়িটা দালালী করে জিমই কিনিয়ে দিয়েছিল। সব সময় দেখা হলেই মোয়াটকে সম্মান জানাত জিম, এই প্রথম কোন ধরনের অভিবাদন করল না। মোয়াটই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর, জিম?’
জবাব দিল না জিম। থুথু ফেলল। ইচ্ছে করেই মাটিতে না ফেলে ফেলল মোয়াটের জুতোর ওপর।
থমকে দাঁড়ালেন মোয়াট, ‘এটা কি ব্যবহার, জিম?’
আপনার মতো মানুষের প্রশ্নের জবাব।’
‘আমার মতো মানুষ!’
‘আপনার মতো বিদেশী, যারা অন্যের দেশে এসে তাদের নামে বদনাম রটায়।’
জিম ব্রোকারের হাত মুঠোবদ্ধ। এতক্ষণে লক্ষ করলেন মোয়াট, লোকটা একা নয়। তার আশেপাশে জর্জির দলের দু-তিনজনও দাঁড়িয়ে আছে। ওরা লক্ষ করেছে নিশ্চয়, ঠিক এই সময়েই রোজ পোস্ট অফিসে আসেন মোয়াট। কাজেই আক্রমণের এটা পূর্ব পরিকল্পিত ভূমিকা।
‘আপনি আর আপনার ওই হতচ্ছাড়া তিমি। ওটা মরবেই, কারও বাপের সাধ্যি নেই ওকে বাঁচায়। কিন্তু একা মরবে না সে, আপনিও মরবেন। নেহাত প্রাণে যদি বেঁচেই যান, তো এখানকার বাস আপনার উঠবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।’
আর একটিও কথা না বলে সেখান থেকে সরে এলেন মোয়াট।
হতাশ হলো জর্জির দল।
