তিমির প্রেম – ১৬
ষোলো
অসহায় হয়ে ঘরের কোণে বসে বসে নিঃশব্দে কাঁদে বার্ট চাচা। বুড়ো হয়েছে, গায়েও আর আগের মতো শক্তি পায় না, তাছাড়া তার মতো গরিব একজন মানুষ কান্না ছাড়া প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আর কি-ই বা করতে পারে? তাই শুধু কাঁদে।
নিতান্তই মনমরা হয়ে পড়েছেন মোয়াট। তাঁর সান্ত্বনা এখন পোস্ট অফিস, ডাকে আসা চিঠির বাণ্ডিল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে চিঠি। প্রেরকদের কাউকেই চেনেন না তিনি, জানতে চায় তারা, তিমিনী কেমন আছে? একই অনুরোধ তাদের সবার, যে করেই হোক তিমিনীকে যেন বাঁচিয়ে রাখেন মোয়াট, যেন তাকে মুক্তি দেন।
দক্ষিণ আমেরিকার কোন এক অফিসের কর্মীদের পক্ষ থেকে একটা চেক এসে হাজির, তার সঙ্গে ছোট্ট চিঠি। তিমিনীর জন্যে খরচের টাকা পাঠানো হয়েছে। টেক্সাসের কোন এক স্কুলের বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা নিজেদের টিফিনের পয়সা থেকে বাঁচিয়ে দশ সেন্ট করে চাঁদা তুলে দশ ডলার জমিয়েছে। ব্যাংক- ড্রাফটে সেই টাকা পাঠিয়েছে ওরা। সঙ্গে কাঁচা হাতের লেখা একটা চিঠি, ‘স্যার, দশ ডলারে আর কটা হেরিংই বা পাওয়া যাবে? তবু ওই টাকায় যা পাওয়া যায় কিনে খাওয়াবেন তিমিনীকে। আর তার বাচ্চা হলে অবশ্যই জানাবেন। আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনের নিউ অ্যারাইভাল কলামে লিখব।’ চিঠির শেষে পুনশ্চ দিয়ে লিখেছে, ‘স্যার, প্লীজ দেখবেন, ওকে শেষ পর্যন্ত যেন ছেড়ে দেয়া হয়।’
তিমিনীর প্রতি মানুষের ভালবাসার আর এক নিদর্শন টেলিফোন অপারেটর মেয়েটি। তাকেও জীবনে কোনদিন দেখেননি মোয়াট, তার কণ্ঠস্বরই শুধু চেনেন। ওই মেয়েটির সাহায্য না পেলে লঙ-ডিসট্যান্স কলগুলো সহজে পেতেন না। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করছে মেয়েটা নিজের ইচ্ছেতেই, শুধু মোয়াটকে সাহায্য করার জন্যে। সেদিন ধন্যবাদ দেয়ায় জবাব দিয়েছে মেয়েটি, ‘আমাকে ধন্যবাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই, স্যার। ভাববেন না আপনার জন্যে করছি এসব। আমিও তিমিনীকে ভালবাসি।’
আরেক সোমবার। সকাল থেকেই প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বইছে, সেই সঙ্গে বৃষ্টি। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় আশি মাইল। নৌকা নিয়ে বেরোনোর সাহস পায়নি কোন জেলে। আর সকলের মতোই ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছেন মোয়াট। সময় কাটছে না, হঠাৎই মাথায় একটা বুদ্ধি এল। অটোয়াতে নৌরক্ষা বাহিনীতে একজন বন্ধু আছে তাঁর। ট্রাংক-কলে বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানালেন মোয়াট, ‘আমাকে কিছু ডুবুরি পাঠিয়ে সাহায্য করতে পারো? সাউথ চ্যানেলের সাত-আট ফুট নিচে পানির তলা থেকে কয়েকটা পাথর সরিয়ে দেবে তারা?’
কথা শুনেই টেলিফোনের ও-প্রান্ত থেকে বন্ধুর ভ্রূকুঞ্চনটা মানসচক্ষে দেখতে পেলেন মোয়াট। ‘তোমার মতলবটা কি, ফার্লে?’
‘রাতারাতি সাউথ চ্যানেলের গভীরতা তিন-চার ফুট বাড়িয়ে দেয়া দরকার। পারবে?’
‘বুঝেছি,’ গম্ভীর হয়ে গেল বন্ধু। ‘কাজটা অসম্ভব ছিল না, কিন্তু এখন আর সম্ভব নয়। তিমিনী মবি জো হবার আগে এই বুদ্ধি মাথায় ঢোকেনি কেন তোমার?’
‘কেন, এখন অসম্ভব কেন?’
‘এ বিষয়ে টেলিফোনে আলাপ করাটাই উচিত হচ্ছে না। কোনখান থেকে কে শুনে ফেলবে…’
একটি মহিলা কণ্ঠ বাধা দিল, ‘এক্সকিউজ মি, স্যারস! নিশ্চিন্তে আলাপ করতে পারেন আপনারা। গড নোজ, আগামী তিন মিনিটের জন্যে একেবারে বধির হয়ে যাব আমি।’
‘কে?’ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন বন্ধু, ‘কে আপনি?’
বার্জিওর অপারেটর। মনেপ্রাণে চাই আমি তিমিনী মুক্তি পাক।’
‘ও! থ্যাংক ইউ,’ ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিলেন বন্ধু। নৌ-বিভাগের উচ্চপদস্থ অফিসার। তিমিনীর মুখ চেয়ে ওপরঅলাকে চটানোর সাহস তাঁর নেই।
রিসিভার ক্রেডলে রেখে সবে ইজিচেয়ারে গা এলিয়েছেন মোয়াট, আবার বেজে উঠল টেলিফোন। রিসিভার তুলে কানে ঠেকাতেই শুনলেন উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, ‘স্যার, আমি ডগ বলছি! অনেকক্ষণ থেকে ধরার চেষ্টা করছি আপনাকে…শুনুন, আমি অল্ডরিজেস পণ্ডের দিকে গিয়েছিলাম…একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটেছে! আবার ডাঙায় উঠে পড়েছে তিমিনী…গা থেকে রক্ত পড়ছে, ও…ও বোধহয় মারা যাচ্ছে…’
মোয়াটের মনে হলো তাঁর হৃৎপিণ্ডে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে কেউ। কোনমতে সামলে নিয়ে বললেন, ‘আমি…আমি এখুনি আসছি!’
বর্ষাতিটা গায়ে চাপিয়ে ঝড়-তুফানের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে এলেন মোয়াট। ভয়ানক খেপে গেছে যেন প্রকৃতি বার্জিওবাসীদের ওপর। বড় বড় ঢেউ ছুটে আসছে সাগরের দিক থেকে, প্রচণ্ড গর্জন। সন্তানহারা মায়ের বুক ভাঙা হাহাকার কিংবা বিলাপ নয়, প্রতিবাদের চাপা গুমরানি। ধ্বংসের মাতন জেগেছে সাগরে। ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। কিন্তু কোনটাতে লোক নেই। বাধ্য হয়ে জেলে পাড়ায় চললেন তিনি। দুয়েকজনকে অনুরোধ করে দেখলেন, কিন্তু এই দুর্যোগে কেউই নৌকা ভাসাতে রাজি হলো না। অগত্যা বার্ট চাচার দ্বারস্থ হলেন। বর্ষণমুখর দুরন্ত সাগরে নৌকা চালানোর মতো দৈহিক ক্ষমতা আজ আর নেই চাচার, তবু জেলে পাড়ায় সে মাতব্বর। কাউকে যদি বলে কয়ে রাজি করাতে পারে, এই আশায়ই চাচাকে গিয়ে ডাকলেন মোয়াট।
মোয়াটের কথা ধৈর্য ধরে শুনল চাচা। তারপর বলল, ‘এই দুর্যোগে কাকে মরতে যেতে বলব? চল, আমিই যাচ্ছি।’
কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল চাচী, ‘কিন্তু…’
চাচীর মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়াল চাচা। হাসল। বলল, ‘ভয় পেয়ে গেলে? এমন দুর্যোগে কি আর কোনদিন সাগরে নামিনি? ভয় নেই, উয়োম্যান, সাগর আমাকে খাবে না। ঠিক ফিরিয়ে দেবে। আজ তিনকুড়ি বছর ধরে তো দেখছ…’
চাচী জানে, একবার যখন যাবে বলেছে, বাধা দিয়ে লাভ হবে না, বুড়ো যাবেই। তাই আর কিছু বলল না। নিঃশব্দে যথারীতি একটা পুঁটুলি আর খাবার পানির বোতলটা এনে তুলে দিল চাচার হাতে।
অন্ডরিজেসের পশ্চিম পাড়ে দেখা পাওয়া গেল ওদের। তিমিনী আর ডগ। শুয়ে আছে তিমিনী, তার সামনে বসে ডগ। তিমিনীর দেহের চারভাগের তিনভাগ বালিতে। লেজটা পানিতে। দুই চোখ বোজা। বৃষ্টির মধ্যেও তীব্র দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগল মোয়াটের। এ গন্ধ তাঁর চেনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই গন্ধের সঙ্গে ভালমতোই পরিচয় ঘটেছে তাঁর। গ্যাংগ্রিন! তিমিনীর মুখের কাছে গলগলে কাদামতো, তাতে বিজ বিজ করছে মরা হেরিং। ডাঙায় উঠে বমি করেছে বেচারী। অসুস্থ! অত্যন্ত অসুস্থ! দশ কোটি বছরের ধাইমাকে ছেড়ে আজ মরার সময় আপন-মায়ের কোলে এসে যেন ঠাঁই নিয়েছে নিশ্চিন্তে মরবে বলে!
দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে বসে আছে ডগ। কখন এসেছে কে জানে? বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, কিন্তু আকাশের গোমড়া মুখে হাসি ফোটেনি। ত্রি-সীমানায় আর কোন নৌকা নেই, মানুষ নেই। ডগের জামা-প্যান্টে কাদা, ভিজে চুপচুপে। এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল বার্ট চাচা। মুখ তুলে চেয়ে উঠে দাঁড়াল ডগ। ‘আংকেল…ও আমার কথা শুনছে না! আর বোধহয় বাঁচতে চায় না…’
মাথা নাড়ল চাচা। এগিয়ে গেল। তিমিটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘কার ওপর অভিমান করছিস, মা? ওরা যে মানুষ, ওদের ওপর রাগ করে লাভ আছে? ওরা কি তোর অভিমান বোঝে? নেমে যা। মরবি তো জানিই। বাচ্চাটাকেও বাঁচাতে পারলি না, তবে এই এখানে শুকনোতে মরবি কেন? শেয়ালে-শকুনে টেনে খাবে! যা নিজের ঘরে যা…’
অভিমানী মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যেন শ্বশুরবাড়ি পাঠাচ্ছে বৃদ্ধ পিতা।
ততক্ষণে তিমিনীর একটা পাখনার কাছে এগিয়ে গেছেন মোয়াট। সারা গায়ে বসন্তের গুটির মতো বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। প্রতিটি ক্ষতের মুখে পুঁজ জমেছে। পুঁজ জমেছে সাত-আট ফুট লম্বা গভীর ক্ষতটায়। বীজাণুর আক্রমণ! বিশালতম জীব একেবারে কাবু হয়ে গেছে ক্ষুদ্রতম জীবের ভয়াবহ আক্রমণে।
তীব্র গর্জনে মোয়াটের চিন্তায় বাধা পড়ল। বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে মেঘের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা এরোপ্লেন। ফিল্ম কোম্পানির প্লেন। যন্ত্রপাতি নিয়ে কোথাও নামতে পারছে না। বার্জিওতে এয়ারস্ট্রীপ নেই, ফাঁকা মাঠে নামতে হবে। কিন্তু বাতাস আর বৃষ্টির জন্যে নামতে সাহস পায়নি পাইলট। অল্ডরিজেস পণ্ডের ওপর ঘুরে ঘুরে পাক খেতে লাগল প্লেনটা। ক্রমেই আরও, আরও নিচে নেমে আসছে। নিচে থেকেই প্লেনের ভেতরে ক্যামেরাম্যানকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্যামেরা জুম করে মুভি শট নিচ্ছে, এমন দুর্লভ দৃশ্য আর কোনদিন পাবে কিনা সন্দেহ।
ব্যাপারটা ভীষণ রাগিয়ে দিল মোয়াটকে। তিনি বলেছেন, ‘সে সময়ে যদি আমার হাতে রাইফেল থাকত, তবে হয়তো নিজেকে সামলাতে পারতাম না। গুলিই করে বসতাম!
মিনিট দশেক পরে চলে গেল প্লেনটা। এতক্ষণে চোখ মেলে চাইল তিমিনী। শব্দকে ওর ভীষণ ভয়।
কাদা পানিতেই হাঁটু গেড়ে বসল বার্ট চাচা। তিমিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, ‘দেখলি তো মা, ওরা তোকে এখানে শান্তিতে মরতেও দেবে না। যা মা, আর পাগলামি করিস না…’
কি বুঝল তিমিনী কে জানে! কিন্তু নড়ে উঠল। আগের বারের মতোই তিল তিল করে মুখ ঘোরাল। কিন্তু আজ ও সাংঘাতিক অসুস্থ। গায়ে জোর নেই। অতি কষ্টে যেন বুড়ো বাপের কথা রাখতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে হ্রদের পানিতে ফিরে গেল সে।
ফেরার জন্যে নৌকায় উঠতে যাচ্ছে তিনজনেই, হঠাৎ সাউথ চ্যানেলের মুখের হাত পঞ্চাশ দূর থেকে ডেকে উঠল মদ্দাটা।
মোয়াটের মনে হলো: রুদ্ধকণ্ঠের চাপা সেই দেহাতীত, অপার্থিব আর্তনাদ যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে। আসছে সাগরের অন্তরাত্মা থেকে, অথবা পাহাড়ের বুক ভেদ করে, কিংবা মহাকাশের অন্তর বিদীর্ণ করে।
এমন করে ডাকল কেন তিমিটা? সঙ্গিনীকে শেষ বিদায় সম্ভাষণ জানাল?
