তিমির প্রেম – ১৭
সতেরো
পরদিন সকালে নিতান্ত অপ্রত্যাশিতভাবেই মোয়াটকে টেলিফোন করল ডাক্তার। বলল, ‘ওনি স্টিকল্যাণ্ডের কাছে শুনলাম, তিমিটা নাকি ভীষণ অসুস্থ? ওর কথায় মনে হলো সেপটিমিয়া, ঘা সেপটিক হয়ে গেছে। আমরা কোন সাহায্য করতে পারি?’
ডাক্তারের বৌ স্থানীয় পৌরসভার হেলথ অফিসার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মোয়াটের ওপর চটা, খবরের কাগজে বার্জিওর, প্রকারান্তরে তাদের কলঙ্ক ফাঁস করে দেয়ায়। কিন্তু এখন এই অযাচিত চৌলিফোন! ঠেলা খেয়েছে নাকি ওপর মহল থেকে?
‘কি পারেন না পারেন আপনি নিজেই ভাল করে জানেন সেটা,’ মোয়াটের গলায় ঝাঁঝ, ‘ক্ষতগুলো সেপটিক হয়ে গেছে। পুঁজ পড়ছে। একটু চুপ করে ভাবলেন তিনি। তিমিনীর কথা চিন্তা করেই একটু স্বর নরম করলেন, ‘কোনরকম চিকিৎসা সম্ভব?’
‘চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু এখানকার হাসপাতালে যথেষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক নেই। একটু যদি চেষ্টা করে বাইরে থেকে আনাতে পারেন…’
‘ঠিক আছে। চেষ্টা করছি আমি,’ বলে রিসিভার রেখে দিলেন মোরাট।
ডাক্তারের ফোন পাবার আগে, আগের রাতেই একটা প্রেস-রিলিজ খসড়া তৈরি করে রেখেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘তিমিটা ইনফেকশনে মারা যেতে বসেছে। স্থানীয় বীরেরা দশদিন আগে যে বীরত্ব দেখিয়েছে এতক্ষণে তার বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে…’ মাঝে আরও অনেক কথা লিখে উপসংহারে লিখেছেন, ‘বার্জিওর বীরেরা ছাড়াও দুনিয়ায় মানুষ আছেন, তাঁরা কি কিছু সাহায্য করতে পারবেন? অ্যান্টিবায়োটিক, সিরিঞ্জ ইত্যাদি পাঠিয়ে?’
লেখা কাগজটা ক্লেয়ারের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন মোয়াট, পড়ে দেখো।’
একবার পড়েই শিউরে উঠলেন ক্লেয়ার। বললেন, ‘এই বিবৃতি কিছুতেই পাঠিও না। এর ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে তোমার বিদ্বেষ, তোমার ঘৃণা। দেখো, ওদের রাইফেলের বুলেটই ফিরে গিয়ে ওদের আঘাত করবে। প্লীজ, এটা নয়, নতুন করে লেখো! শান্ত হও!’
শেষ পর্যন্ত ক্লেয়ারের পরামর্শ মেনে নিলেন মোয়াট। নতুন করে রিপোর্ট লিখলেন। অনেক মোলায়েম ভাষায়। টেলিফোনে লং রেঞ্জ কল চাইতেই অপারেটর মেয়েটি বলল, ‘এখুনি দিচ্ছি, স্যার। তিমিনী কেমন আছে, স্যার?’ এই প্রশ্নটা করার জন্যেই যেন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে সে।
‘সে খবর জানানোর জন্যেই লাইন চাইছি।’
টরন্টো অফিসের সংবাদ সংস্থার অফিসার মোয়াটের রিপোর্ট লিখে নিলেন। বললেন, ‘কাল সকালেই এখানকার প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় তোমার খবর বেরোবে, ফার্লে।’
হলোও তাই। কথা রেখেছেন অফিসার। কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক কোটি পাঠক পরদিন খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় পড়ল :
মবি জো-এর রক্ষক আজ রাতে একটি জরুরী আবেদন প্রচার করেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, বুলেটের আঘাতে বন্দিনীর দেহে যে ক্ষত হয়েছিল, ওগুলো সেপটিক হয়ে গেছে। ফার্লে মোয়াটের মতে তিমিনী অত্যন্ত অসুস্থ। স্থানীয় ডাক্তার দম্পতি চিকিৎসার ভার নিতে রাজি। অভাব ওষুধের। ওদের প্রয়োজন আট ডোজ ইনজেকশন—প্ৰতি ডোজ একশো ষাট গ্রাম টেট্রাসিলিন হাইড্রোক্লোরাইড। একটা প্রকাণ্ড সিরিঞ্জ ও চাই—যাতে অন্তত তিন পাইণ্ট ওষুধ ধরে। উপযুক্ত স্টেনলেস স্টীলের সুচও চাই, অন্তত দেড় ফুট লম্বা।
কাগজ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একের পর এক ফোন আসতে লাগল মোয়াটের কাছে। মন্ট্রিলের এক ওষুধ কোম্পানি জানাল, আটশো গ্রাম অ্যান্টিবায়োটিক প্লেনে করে পাঠাচ্ছে। ব্রন্স চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ জানালেন, বড় সিরিঞ্জ তাঁদের আছে, প্লেন চার্টার করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ভ্যাংকুভার অ্যাকোয়ারিয়ামের প্রধানও জানালেন, অনতিবিলম্বে সুচ পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন তিনি। সেন্ট জন থেকে একজন প্রথিতযশা ভেটেরেনারি সার্জন জানালেন, নিজের খরচে প্লেনে বার্জিও আসছেন তিনি। ডক্টর শেভিল, সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর টেলিফোনও এল। তিনি জানালেন, একটি চার্টার্ড প্লেনে করে বার্জিওয় এসেছিলেন তিনি, কিন্তু ঝড়ের জন্যে নামতে পারেননি। যন্ত্রপাতি সমেত তাঁকে প্যারাসুটে বেঁধে ফেলে দিতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু রাজি হয়নি পাইলট। ফোনে জানালেন, এবারে তিনি হেলিকপ্টার নিয়ে আসছেন।
রাগ গলে পানি হয়ে গেল মোয়াটের। পৃথিবীটা শুধু এক তরফা মানুষেই ভর্তি নয়। তাহলে টিকত না দুনিয়া। এখানে জর্জির মতো মানুষরা যেমন আছে, তেমনি আছে ডক্টর শেভিলের মতো বিজ্ঞানী। সত্তর বছরের বৃদ্ধ, এই বয়েসে প্যারাসুট নিয়ে জীবনে প্রথমবার লাফ দিতে চান। কি জন্যে? একটা তিমিকে বাঁচাতে। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল মোয়াটের মনে। অসংখ্য মানুষের শুভেচ্ছা আছে তাঁর জন্যে। না, হার মানবেন না। ‘বার্ট-চাচার মেয়েকে’ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতেই হবে। শুধু বাঁচানোই নয়, তাকে মুক্তিও দিতে’ হবে। নইলে টেক্সাস স্কুলের বাচ্চাগুলোর কাছে কি জবাব দেবেন তিনি?
আধুনিক পৃথিবীতে খবরের কাগজের ক্ষমতা, অবদান যে কতখানি তার হিসেব করা যাবে না। রাত বারোটায় ফোন করল বার্জিওর মহাপরাক্রমশালী মেয়র। মোয়াট রিসিভার কানে ঠেকাতেই বলল, ‘জেগেই আছেন দেখছি! অবশ্য এরকমই আশা করেছিলাম। দারুণ কাণ্ড বাধিয়েছেন সাহেব! পৃথিবীর মানচিত্রে আজ সবাই বার্জিওকে খুঁজছে। বুঝেছেন, আর হপ্তাখানেক এভাবে চালাতে পারলে হয়তো খোদ স্মউলডই এসে হাজির হবেন। না কি বলেন?’
শরীর মন স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত মোয়াটের। বললেন, এ কথা জানাতেই কি এত রাতে ফোন করেছেন?’
‘আরে না-না, আপনি রাগ করছেন কেন? আসলে তিমিনীর খোঁজ নেয়ার জন্যেই ফোন করেছি। কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?’
লোকটার নির্লজ্জতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মোয়াট। তবু নিরুত্তাপ কণ্ঠেই বললেন, ‘ভোর রাত থেকেই প্লেনে করে যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র, বিশেষজ্ঞরা এসে যাবেন। তাঁদের রিসিভ করতে পারেন?’
পারব না মানে, বলেন কি, অ্যাঁ! ওরা যে বার্জিওর মেহমান…
একটা খারাপ কথা বেরিয়ে যাচ্ছিল মোয়াটের মুখ দিয়ে। কিন্তু সামলে নিয়ে বললেন, ‘পৌরসভার কোন নাইট গার্ডকে অল্ডরিজেসে পাঠিয়ে দিন। তিমিনীকে এখন নজরবন্দি করে রাখা দরকার। আপনার লোককে বলবেন, কোন খবর থাকলে যেন সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোনে জানায়।—
‘শিওর, ফার্লে!’ একেবারে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছে বেহায়া লোকটা। গা জ্বলে গেল মোয়াটের, কিন্তু কিছু বললেন না। মেয়র বলেই চলল, ‘তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমি নিজেই যাচ্ছি সব ব্যবস্থা করতে। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে এ কাজ আর কারও ওপর ছেড়ে দিতে ভরসা হয় না।’
আর একটি বিনিদ্র রাত। শুধু মোয়াটেরই নয়, ক্লেয়ারেরও সমস্ত দিনের উত্তেজনায় স্নায়ুগুলো এমন চড়ে গেছে যে কিছুতেই ঘুম এল না। মুখোমুখি দুজনে বসে কাটিয়ে দিলেন রাতটা, ভোরের প্রতীক্ষায়। বারে বারে কফি করে আনলেন ক্লেয়ার। ভোর হলো। চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে নাস্তা করতে বসলেন দুজনে। ঝড়- বৃষ্টি থেমে গেছে। বাতাসে কেমন একটা খুশির আমেজ। ঝলমলে রোদ উঠেছে। আকাশটা অদ্ভুত নীল।
বাজল দিনের প্রথম টেলিফোন। রিসিভার ধরতেই ভেসে এল মেয়রের গলা, ফার্লে, এই মাত্র খবর পেলাম, সকাল থেকে আর দেখা যাচ্ছে না মবি জো-কে। সকালে লোক এসে খবর দিয়েছে, দু-ঘণ্টার মধ্যে একবারও শ্বাস নিতে ওঠেনি তিমিনী।—আমার কি মনে হয় জানো…রাতেই যে করেই হোক পালিয়েছে সে।—এখন কি কৈফিয়ত দিই…’
দাঁতে দাঁত চেপে বললেন মোয়াট, কৈফিয়ত? কিসের কৈফিয়ত?’
‘বাহ্! মবি জো যে পালাল…’
‘পালায়নি সে! মারা গেছে!’
‘অ্যাঁ!’ আঁতকে উঠল মেয়র, মারা গেছে! স্মলউড তো তাহলে…’
জবাব দেয়ার মতো মেজাজ নেই মোয়াটের। তিমিনী যে পালায়নি এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। সে উপায় থাকলে প্রথম দিনই পালাত। এখন সে অসুস্থ, সারা গায়ে দগদগে ঘা। যদি সত্যিই দু-ঘণ্টা ধরে শ্বাস নিতে না উঠে থাকে তো তার সব যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। শ্বাস নিতে ওঠার আর কোন প্রয়োজন নেই ওর।
মেয়র এবং মোয়াট দুজনেই রিসিভার কানে ঠেকিয়ে রেখেছেন, কিন্তু নির্বাক। পুরো দুই মিনিট পর কথা বলল মেয়র, ‘না মিস্টার মোয়াট, এ হতে পারে না!’ ভীষণ ভয় পেয়েছে লোকটা। ধার করা অন্তরঙ্গতা চলে গেছে ভয়ের চোটে। গলা কাঁপা কাঁপা, ‘মবি জো মরতে পারে না! প্লীজ, মেনে নিন আমার কথা! ও কাল রাতে মুক্ত সাগরে ফিরে গেছে! প্লীজ!’
অত ভয় পাচ্ছেন কেন, মেয়র সাহেব? আমি মেনে নিলেই তো হলো না, আর আমার মানা না মানায় কিছু যায় আসেও না আপনাদের। সে মেনে নিলেই হলো।’
‘সে? সে কে?’ আঁতকে উঠল মেয়র।
‘না, স্মলউড নন। আমি তিমিনীর কথা বলছি। সত্তর ফুট লম্বা শরীর তার, আশি টন ওজন। তার ওপর গর্ভিণী। আপনার মিথ্যের চাদর দিয়ে তার অতবড় দেহটাকে কিছুতেই ঢাকা দিতে পারবেন না।’
‘আপনি বুঝতে পারছেন না। ভেসে উঠতে তার দিন দুই-তিন সময় লাগবে। যদি আমরা প্রচার করি তিমিটা পালিয়েছে, তাহলে বহিরাগতরা সব ফিরে যাবে। কিন্তু যদি জানতে পারে ওরা তিমিনী মৃত, উফ্…খুন করবে ওরা আমাদের। আর তারপর স্মলউড…’
‘আপনার পিঠের চামড়া তুলে নেবে। এতক্ষণে একটা সত্যি কথা বলেছেন। তাই তো আপনাদের পাওনা, নয় কি? খুনোখুনি খেলার নিয়মই তো এই। দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ! না? তা আপনার ভয় কি? আপনার পক্ষে তো জর্জি আর তার লোকজন আছে, আপনাকে ইলেকশনে জেতাবে, বিপদ এলে রক্ষা করবে, কাজেই ভয় কি?’
মোয়াট ভেবেছেন, এতবড় অপমানের পর লাইন কেটে দেবে মেয়র, কিংবা গাল দেবে, কিন্তু কোনটাই করল না সে। উল্টে অনুরোধ-উপরোধ শুরু করল, ‘প্লীজ, মিস্টার মোয়াট, খবরটা কেউ জানে না। আপনার কথা সবাই মেনে নেবে। এই অপরিসীম লজ্জার হাত থেকে বার্জিওকে রক্ষা করুন। এ তো আপনারও শহর।
‘না!’ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ধমকে উঠলেন মোয়াট, ‘এ শহর আমার নয়। দু-সপ্তাহ ধরে একঘরে হয়ে আছি আমরা। চলে যাইনি, শুধু ওই তিমিনীর জন্যেই। আমাকে সে মুক্তি দিয়ে গেল। ওর লাশ ভেসে ওঠার আগেই হয়তো চলে যাব…’ ঠকাস করে রিসিভারটা ক্রেডলে নামিয়ে রাখলেন তিনি।
স্বামীর কাঁধে হাত রাখলেন ক্লেয়ার। বললেন, তাই ভাল। চলো আবার বেরিয়ে পড়ি আমরা। কয়টা দিন যে কি করে কেটেছে…’
কয় দিনে একজন প্রতিবেশীও মোয়াটের বাড়ি আসেনি। পথে ঘাটে দেখা হলে মুখ তুলে তাকায়নি কেউ। যারা রোজ সন্ধ্যায় তাঁদের ড্রইংরূমে এসে আড্ডা জমাত—কেনেথ, ডগ, সিম, বার্ট চাচা, ওনি, ধোপানি, মুদি, রুটিওয়ালা, পোস্টম্যান—কেউ না। প্রাণের ভয় কার না আছে? শুধু মোয়াটের মুখের দিকে চেয়েই এতদিন চুপ করে ছিলেন ক্লেয়ার, এখন সময় এসেছে বুঝে মনোগত ইচ্ছেটা জানিয়ে দিলেন।
‘না, ক্লেয়ার, এখন নয়। আরও কিছুদিন বাধ্য হয়েই থাকতে হবে। তারপর একেবারেই চলে যাব বার্জিও ছেড়ে। বাড়ি বেচে দিয়ে যাব। আর কোনদিন ফিরব না। এদের সঙ্গে আর জোড়া লাগবে না আমাদের। বার্জিওবাসীর চোখে আজ আমরা অবাঞ্ছিত।
আবার বাজল টেলিফোন। তুলে নিয়ে বললেন, ‘মোয়াট।’
‘স্যার, আমি, টেলিফোন অপারেটর।…মেয়র সাহেব আর আপনার কথা শুনছিলাম!…তা, স্যার, ওটা কি সত্যিই…
‘হ্যাঁ, মারা গেছে। আবার লঙ-ডিসট্যান্স লাইন দিন। টরেন্টো প্রেস। যাঁরা এখনও রওনা হননি, তাঁদের নিষেধ করতে হবে। ওষুধ, সিরিঞ্জ, তিমি-বিশেষজ্ঞ আসার আর দরকার নেই। খেলা শেষ…’
‘দিচ্ছি স্যার, মেয়েটির কণ্ঠে স্পষ্ট বিষণ্নতা, ‘কিন্তু ও-কি, ও-কি সত্যিই মারা গেছে?’
ধৈর্য হারালেন মোয়াট। জীবনে যা কোনদিন করেননি, চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, মরেছে! কানে যায়নি কথাটা! নাকি ধরে নিয়ে গিয়ে তোমার মুখ ওর পচা লাশের গায়ে না ঘষা পর্যন্ত বুঝতে পারবে না!’
আস্তে করে স্বামীর পিঠে হাত রাখলেন ক্লেয়ার। নিজের স্বামীকে অচেনা লাগছে তাঁর কাছে। অভদ্র ভাষায় অপরিচিতা মহিলার সঙ্গে জীবনে এই প্রথম খারাপ ব্যবহার করলেন তাঁর স্বামী, মনের অবস্থা কেমন হয়েছে বুঝতে পারছেন তিনি। মোয়াটের চোখের পানি টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে টেলিফোনের মাউথ পীসের ওপর।
অপারেটর মেয়েটি রাগ করল না, মোয়াটের মনের অবস্থা ঠিকই বুঝতে পারল। জবাবে বলল, ‘বিশ্বাস করুন মিস্টার মোয়াট, এখন সেই ইচ্ছাই জাগছে আমার মনে। ওর গলিত দেহে বারবার মুখ ঘষে বলতে ইচ্ছে করছে, আমাদের ক্ষমা করো তুমি, ক্ষমা করো, ক্ষমা করে দিয়ে যাও!’
বুঝতে পারলেন মোয়াট, ওপাশের মাউথ পীসেও নোনা পানির ফোঁটা জমছে। তাঁর আর ক্লেয়ারের মতোই দুই সপ্তাহ ধরে একটানা পরিশ্রম করে গেছে মেয়েটা।
টেলিফোন-টেলিগ্রাম করেই সকালটা কাটল। ইতিমধ্যেই হয়তো কিছু লোক রওনা হয়ে গেছে। তাদের ভোগান্তিই সার হবে। যারা হয়নি, তাদের রোখার চেষ্টা করলেন মোয়াট। ফাঁকে ফাঁকে খবর নিচ্ছেন, তিমিনীর মৃতদেহ ভেসে উঠেছে কিনা। সারা দ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছে তিমিনীর মৃত্যুর খবর। বার্জিও ত্যাগের ব্যাপারে মত পাল্টেছেন মোয়াট। আগামী দিন বেলা আড়াইটায় একটা ফেরি স্টিমার আছে, তাতেই রওনা হয়ে যাবেন। পরে সময় করে একবার এসে বিক্রি করে দিয়ে যাবেন বাড়িটা।
আকাশ পরিষ্কার। একটা ডোরিও নেই ঘাটে। হয়তো মাঝ-সাগরে চলে গেছে মাছ ধরতে, কিংবা অন্য কোথাও গেছে। দেখে মনে হয় যেন ভয়ে পালিয়েছে সবাই।
ওদিকে স্মলউডের কাছে তিমিনীর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে গেছে। দুঃখ প্রকাশ করে খবরের কাগজের রিপোর্টারদের কাছে বক্তব্য পেশ করেছেন তিনি:
সেন্ট জন্স, নিউফাউণ্ডল্যাণ্ড ৪ঠা ফেব্রুয়ারি—সংসদ সভায় আজ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, অল্ডরিজেস পণ্ডে মবি জো-এর যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে। গতকাল থেকে সে আর শ্বাস নেয়ার জন্যে ভেসে ওঠেনি। সংবাদে প্রকাশ, তার পলায়ন সম্ভব ছিল না, ফলে অনুমান করা হচ্ছে সে মারা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী এজন্যে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, মানুষের যেটুকু সাধ্য তা করা হয়েছিল। তবু তাকে বাঁচানো গেল না।
সারাদিনে কেউ মোয়াটের সঙ্গে দেখা করতে এল না। বাড়ির সামনে একটু ফাঁকা মাঠে রোজ খেলতে আসে জেলে পাড়ার ছেলেরা, আজ তারাও কেউ নেই। হয়তো বাপ-মায়ের নিষেধ। মানুষের সাড়াশব্দ যা পেলেন মোয়াট, তা ফোনে, সবই দূরদেশের মানুষ। তাদের সঙ্গেও বন্ধন একে একে ছিন্ন হচ্ছে। তিমিনীর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে গেছে বেতারে।
পড়ন্ত বেলায় স্ত্রীকে ডেকে বললেন মোয়াট, ‘ফোন এলে তুমি ধোরো, আমি একটু পোস্ট অফিস থেকে ঘুরে আসি।’
‘এই অবেলায় আবার যাবে? ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি এসো। কাল সারারাত ঘুমোওনি…’
‘তুমি বুঝি খুব ঘুমিয়েছ?’
ম্লান হাসলেন ক্লেয়ার। বললেন, ‘না তা ঘুমোইনি। আজ একটু সকাল সকাল শুয়ে পড়তে চাই। কাল তো যেতে হবে।’
আরেকটা নোটিশ লিখেছেন ক্লেয়ার:
এই বাড়ি বিক্রয় হবে।
সদর দরজার ওপর নোটিশটা টাঙিয়ে দিয়ে পথে নামলেন মোয়াট। পোস্ট অফিসের পথটা বাজারের মধ্যে দিয়ে। জন-বিরল অবশ্যই নয়। তাছাড়া দুর্যোগের পর আবহাওয়া ভাল হয়েছে, সুতরাং ভিড় স্বভাবতই বেশি। চলতে চলতে অনেক পরিচিত মুখ নজরে পড়ল, কিন্তু কেউই কথা বলল না। এই সময় হঠাৎ মুখোমুখি পড়ে গেল জর্জির দল। পাঁচ-সাতজন ছেলে আর সমপরিমাণ মেয়ে দল বেঁধে কোথায় চলেছে। মোয়াটকে দেখেই চাপা হাসিতে ভেঙে পড়ল ওরা।
ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন মোয়াট। গান ধরল মেয়েগুলো, ‘মবি জো ইজ ডেড অ্যাণ্ড গন, ফারলে মোয়াট, হি ওট স্টে লং…’
পোস্ট অফিসে যেতে মন আর চাইল না মোয়াটের। জনাকীর্ণ পথ ছেড়ে একটা নির্জন টিলার মাথায় উঠে এলেন সূর্যাস্ত দেখার জন্যে। একেবারে নির্জনে শুধু নিজের সান্নিধ্যে একটু সময় কাটাতে চান।
টিলার মাথা নির্জন। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। দূরে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা পাহাড়। তিনশো বছর আগে চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্যে ওখানেই উঠে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন জেমস কুক।
অনেক, অনেকক্ষণ একভাবে বসে রইলেন মোয়াট। পরাজয়টা শেলের মতো বাজছে বুকে। অনেক ভাবলেন। ধীরে ধীরে একটা সত্য ভেসে উঠল চোখের সামনে। মনে হলো, সব বুঝি বৃথা যায়নি। এই পরাজয় আসলে পরাজয় নয়, প্রকারান্তরে তিনিই জিতেছেন। বিশ্ববাসীর কাছে হেরেছে বরং জর্জি-মেয়রের দল। আর, লাভ কি কিছুই হয়নি? অফিসের সেই অচেনা কর্মচারীরা কি লাভের খাতায় পড়ে না? টেক্সাস স্কুলের বাচ্চা ছেলের দল? অপরিচিতা ওই টেলিফোন অপারেটর?
আবার দুচোখ ভরে পানি এল মোয়াটের। চারদিকে ঘন অন্ধকার…কেউ জানতে পারবে না তিনি কাঁদছেন। কিন্তু কেন? তিমিনীর জন্যে কাঁদছেন তিনি? নাকি কাঁদছেন বার্জিওর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গেল বলে? হ্যাঁ, সেটাও বেদনার। কারণ দ্বীপটিকে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছেন তিনি। কষ্ট হচ্ছে সরল-মূর্খ জেলেগুলোর জন্যে, তাদেরকে ছেড়ে যেতে হবে বলে। সব চেয়ে বেশি দুঃখ হচ্ছে মানুষ জাতটার জন্যে। এত উন্নতি করল, কিন্তু আজও তার পাশবিকতাকে অতিক্রম করতে পারল না!
রাত হলো। উঠে পড়লেন মোয়াট। ফেরার পথে কারও দিকে তাকালেন না। টর্চের আলোয় পথ দেখে দেখে নিঃশব্দে হেঁটে বাড়ি ফিরে এলেন।
সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়েই লক্ষ করলেন নোটিশটা নেই। কে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে! প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠলেন মোয়াট। ওরা ভেবেছে কি? ওদের আর ছাড়বেন। এই অত্যাচার আর সহ্য করা যায় না।
ঘরে ঢুকে কিন্তু চমকে উঠনে মোয়াট। ড্রইংরুমে বিশ-পঁচিশজন নারী-পুরুষ-বাচ্চা জমায়েত হয়েছে। সবাই ইচ্ছে মতো জায়গায় বসেছে, কিন্তু সোফা বা চেয়ারে বসেনি কেউ। আগের মতোই। ফায়ার প্লেসে গনগনে আগুন।
মোয়াটকে দেখেই প্যাকিং বাক্সের সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বার্ট চাচা, ‘এই যে, এসেছ। ফিরতে এত রাত করলে যে?’
টেনে ওকে বসিয়ে দিল ওনি। যেন কিছুই হয়নি এমনি ভঙ্গিতে বলল, ‘ওসব পরে জিজ্ঞেস করো আংকেল, আগে গল্পটা শেষ করো।’
মোয়াটের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে আবার সিংহাসনে বসে পড়ল চাচা। অসমাপ্ত কথার খেই ধরল, ‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। আমি তখন টমের বয়েসী। দাদুর সঙ্গে সবে ডোরি নিয়ে যেতে শুরু করেছি। একদিন হয়েছে কি…’
এসেছে সবাই। ওনি, কেনেথ, ডগ, সিম, ও’নীল, ধোপানী, মুদি, পোস্টম্যান—অধিকাংশই সস্ত্রীক এবং কাচ্চা-বাচ্চাসহ। যেন কিসের উৎসব বসেছে মোয়াটের বাড়িতে।
আড়ালে স্বামীকে ডেকে নিয়ে বললেন ক্লেয়ার, তুমি যাবার পর থেকেই আসছে ওরা। একজনের পর একজন। এমন তো অনেকদিন হয়নি! ব্যাপারটা কি?
‘বুঝলাম না। নোটিশটার কি হলো?’
‘আংকেলের কাজ। এসেই খেপে গেছে। টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে!’
বেশিক্ষণ কিন্তু বসল না আগন্তুকেরা। কেনেথ বলল, ‘আপনাদের বিশ্রাম দরকার। আজ আমরা উঠি। কাল এসে জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে।’
হঠাৎই যেন মনে পড়ে গেল কথাটা চাচার। বলল, ‘ওহহো, ভুলেই গেছি। ও মা-মণি, আমার মেয়েমানুষটা বলে দিয়েছে কাল রাতে তোমরা আমার ওখানে খাবে। সামান্য আয়োজন…’
ওনি স্টিকল্যাণ্ড হাসতে হাসতে বলল, ‘কিন্তু খাবার আগে আমরা সবাই মিলে গপ্পো না মারলে খিদে লাগবে কেন?’
হাসতে হাসতে গেল ওরা সবাই। আশ্চর্য, তিমিনীর কথা উচ্চারণও করল না কেউ।
দরজা পর্যন্ত ওদের এগিয়ে দিলেন মোয়াট। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল চাচা, ‘তোমরা এগোও। আমি আসছি।’
ওরা কয়েক পা এগিয়ে যেতেই মোয়াটের হাত চেপে ধরল চাচা। বলল, ‘আমরা গরিব, মূর্খ মানুষ। আমাদের ওপর রাগ কোরো না।’
‘কিন্তু এত কাণ্ডের পর আর কি আমাদের এখানে থাকা উচিত হবে?’
‘কেন হবে না? বার্জিওতে শুধুই কি শুয়োরের বাস? আমরা কি মরে গেছি?’
হেসে বললেন মোয়াট, ‘না, মরোনি। এই তো দেখছি দল বেঁধে এসেছ আমার দুঃখের ভাগীদার হতে। কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারবে না, আংকেল। তোমাদের জেনারেশন শেষ। এরপর বার্জিওয় বুনো শুয়োরের পালই শুধু থাকবে।’
‘হয়তো বা! কিন্তু তাই বলে আগে থেকেই হার মানব কেন? দরকার হলে লড়ে মরব!’
একটু আগের ড্রইংরুমের চেহারাটা মনের পর্দায় ভেসে উঠল মোয়াটের। তাঁর ড্রইংরুমটা যেন মেরুবলয়ের ক্রিল অঞ্চল। মহাশত্রুর তাড়া খেয়ে যত রকমের তিমিরা এসে জড় হয়েছে—ফিন, হাম্পব্যাক, বো-হেড, রাইট, ব্লু, স্পার্ম সবাই। ওরা জানে ওরা ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু তবু, আজও শেষ হয়ে যায়নি। চারদিকে মহাশত্রুদের চাপে কুঁকড়ে আসছে, কিন্তু হাল ছাড়ছে না। এরই মাঝে, বার্ট চাচা যেন পোড় খাওয়া এক নীল তিমি। সঙ্গীকে খুঁজছে না, তবে উদাসী বাউলের মতো একতারা হাতে যেন একাকী গেয়ে চলেছে বেলা শেষের গান।
পরদিন সকালে উঠেই গোছানো মালপত্র খুলে ফেললেন মোয়াট আর ক্লেয়ার। স্থির করেছেন, এভাবে শেয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে পালাবেন না। যাবেন না বার্জিও থেকে। কেন যাবেন? শুধু তো বুনো শুয়োরের বাসই নয় এখানে, বার্ট চাচা আর ডগ হানের মতো মানুষও আছে।
ঝনঝন করে টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে শুনে মোয়াটকে ডাকলেন ক্লেয়ার, ‘তোমাকে চাইছেন। লেডী ডাক্তার…’
রিসিভার কানে ঠেকিয়ে মোয়াট বললেন, ‘বলুন।’
‘সরি, মিস্টার মোয়াট। এইমাত্র খবর এসেছে, তিমিনীর মৃতদেহ ভেসে উঠেছে। এখন কি করি…’
‘আমি কি জানি?’
‘কিন্তু আপনিই তো ওর রক্ষক। সরকার নিয়োজিত…’
ভুল করছেন। জ্যান্ত তিমিনীর রক্ষক ছিলাম। তার লাশের নয়। সেটা আপনাদের দায়দায়িত্ব। ও এখন আপনাদের সম্পত্তি।’
কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না। ওটা পচে গেলে ভয়ানক দুর্গন্ধ হবে! মহামারী দেখা দেবে এ অঞ্চলে!’
‘তা তো দেবেই। আপনি হেলথ অফিসার, ব্যবস্থা করুন। ফোনটা আমাকে নয়, মেয়র সাহেবকে করা উচিত ছিল আপনার।
‘শুনুন, শুনুন…প্লীজ, লাইন কেটে দেবেন না। প্রেসে দয়া করে খবরটা জানিয়ে দিন আপনি।—একটা রেডিও অ্যানাউন্সমেন্ট হওয়া দরকার। অল্ডরিজেস পণ্ডের এক মাইলের মধ্যে যাতে কেউ না যায়।’
প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন মোয়াট, কিন্তু মহামারীতে মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনাটা বিবেচনা করে রাজি হয়ে গেলেন। প্রেসে খবরটা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেতারে ঘোষিত হলো, অল্ডরিজেস পণ্ড নিষিদ্ধ এলাকা!
ঘণ্টাখানেক পর ফোন করল মেয়র। বলল, ‘এ আপনি কি করলেন? ওটা নিষিদ্ধ করে দিলেন। কারখানা যে বন্ধ করে দিতে হবে।’
‘দেবেন,’ মোয়াটের কণ্ঠ নির্বিকার, মাত্র তো দু-তিন মাস সময় লাগবে লাশটা গলে-পচে মিশে যেতে।’
আতঙ্কে শিউরে উঠল মেয়র, ‘বলেন কি! সর্বনাশ হয়ে যাবে! পালে পালে শকুন এসে জমবে মরা খেতে। এর আগেই তিমিনীর লাশ সরানোর ব্যবস্থা করতে পারেন না?’
সাবাথ ডে-তে বলা মেয়রের কথা অনুকরণ করে বললেন মোয়াট, ‘কি লাভ বলুন? তিমিটা তো মরেছেই। মাঝখান থেকে আমি কেন শকুনদের আনন্দে বাধা দিই…’
অপমানটা বুঝেও সহ্য করে গেল মেয়র। না বোঝার ভান করে বলল, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না, দু-তিন মাস কারখানা বন্ধ থাকলে সর্বনাশ হয়ে যাবে…প্রচণ্ড লোকসান হবে…’
সহজ কণ্ঠে বললেন মোয়াট, ‘চিন্তাটা আরও দুই হপ্তা আগে করলে ভাল হত। বার বার জর্জির দলকে থামাতে অনুরোধ করেছি আপনাকে। শোনেননি। এখন ঠেলা সামলান।’ মেয়রকে সতর্ক করে দেয়ার জন্যে যোগ করলেন, ‘আর হ্যাঁ, অন্ডরিজে পণ্ড নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষিত হয়েছে, ভাল হয়েছে। যদি এটা নিয়ে আর বেশি বাড়াবাড়ি করেন, তো যে-কোন সময় আমি প্রেসকে জানিয়ে দেব, জর্জির দলকে আর্মি অ্যামুনিশান সাপ্লাই করে তিমিনীকে আপনিই খুন করিয়েছেন। গত কয়েক দিনে যা দেখলেন, তাতে বিশ্বাস হয় আমার কথা? জানাতে পারব?’
থতমত খেয়ে গেল মেয়র। কথা বন্ধ হয়ে গেছে। তাকে সামলানোর সুযোগ না দিয়েই বললেন মোয়াট, ‘এনশেন্ট মেরিনারের কথাটা নিশ্চয় মনে আছে, মেয়র সাহেব? তার কাঁধে ঝুলছিল একটা মৃত আলবাট্রস! কতই বা ওজন ছিল পাখীটার? তাতেই হিমসিম খেয়ে গিয়েছিল বেচারা। আর আপনি আশি টন ওজনের এক প্রকাণ্ড তিমিকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ভোগান্তি তো একটু হবেই।’ লাইন কেটে দিলেন তিনি। কায়দা মতো ঝাল ঝাড়তে পেরে একটু হালকা হয়েছে মন।
একটু পরেই এল বার্ট চাচা। সব শুনে বলল, ‘ঠিক হয়েছে। হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী, ব্যাটা এখন কেন কাঁদিস? তুমি দেখে নিও, এরপর আর কোনদিন তোমাকে ঘাঁটাতে সাহস পাবে না শুয়োরটা। তো, তিনমাসের আগে বুঝি লাশটার গতি করার কোন উপায় জানো না?’
কেন, কোন ব্যবস্থা করতে পারবে নাকি তুমি?’ জিজ্ঞেস করলেন ক্লেয়ার।
‘এক ঘণ্টার মধ্যে পারব। যন্ত্রপাতি কিচ্ছু লাগবে না, শুধু একটা মোটর লঞ্চ চাই। আমি একাই সাউথ চ্যানেল পার করে দিয়ে আসব ওকে।’
‘কি করে?’
ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল বার্ট চাচা। ফারাকটা আসলে জীবিত আর মৃত তিমির মধ্যে। মরে ভেসে উঠেছে তিমিনী, তার মানে পচে ঢোল হয়ে তবেই ভেসেছে। এখন তার শরীরের বেশির ভাগই পানির ওপরে থাকবে। লেজে একটা দড়ি বেঁধে টেনে ওকে সাউথ চ্যানেল পার করে দিতে পারবে এখন যে কোন ইঞ্জিন চালিত বোট।
মেয়রকে টেলিফোন করলেন মোয়াট। চমকে উঠল মেয়র। ভাবল, সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে, নইলে মোয়াট টেলিফোন করতেন না। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ব্যাপার?’
বললেন মোয়াট।
‘আহ্, বাঁচালেন আমাকে, মিস্টার মোয়াট! এক্ষুণি, এই মুহূর্তে লঞ্চের ব্যবস্থা করছি আমি।
আধঘণ্টা পরে ডোরি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন মোয়াট। ক্লেয়ার সঙ্গে এলেন না, বীভৎস দৃশ্যটা দেখতে পারবেন না তিনি। ডগও সঙ্গী হলো না। সাথে চলল কেনেথ, বার্ট চাচা আর স্টিকল্যাণ্ড।
আজ আর অল্ডরিজেসে দর্শনার্থীর ভীড় নেই। এলাকাটা সত্যিই এতদিনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। আকাশটা তেমনি গভীর নীল, অন্ডরিজেস পশুও নীল চাদর মুড়ি দেয়া। চার দিকে ঝলমলে রোদ। দূর আকাশে ভাসছে এক ঝাঁক সী- গাল। কিন্তু সেই নির্জন অপরূপ প্রকৃতির রাজ্যে বাতাস আর আগের মতো নিৰ্মল নয়, দুর্গন্ধে ভারি হয়ে আছে।
আসার পথে মদ্দা তিমিটাকে দেখে এসেছে চারজনেই। ক্রমাগত পাক খাচ্ছে সে সাউথ চ্যানেলের মুখের কাছে, একটু পর পরই মাথা তুলে কি দেখছে। হয়তো উৎকর্ণ হয়ে আছে একটা ডাকের জন্যে, যে ডাক উতলা করে তুলেছিল তাকে একদিন। আজ দুদিন ডাকটা শুনতে পাচ্ছে না বেচারা। তিমিনীর মৃত্যুটা কি টের পেয়েছে সে?
সাউথ চ্যানেল অতিক্রম করে হ্রদে ঢুকতেই তিমিনীর দেখা মিলল। চিৎ হয়ে ভাসছে। ফুলে-ফেঁপে ঢোল। মুখটা পানির নিচে, শক্ত হয়ে যাওয়া ডানা দুটো আকাশের দিকে মেলা। তলপেটটা এই প্রথম স্পষ্ট দেখলেন মোয়াট। পেটের বাচ্চাটাও নিশ্চয় ফুলেছে, বেঢপ ফুলে রয়েছে তিমিনীর তলপেটে।
তিমিনীর লাশের কাছে এগিয়ে গেল লঞ্চ। সবার মুখে রুমাল চাপা দেয়া। তিমিনীর লেজে রশি বাঁধা হলো। লঞ্চের মুখ ঘোরাল সারেং।
টান পড়ল। মুখ ঘুরল তিমিনীর। লেজটা সাগরের দিকে। এতদিন পর আবার সাগরে ফিরে যাচ্ছে তিমিনী।
সাউথ চ্যানেলের যে সঙ্কীর্ণ পথ আপ্রাণ চেষ্টায়ও পেরোতে পারেনি তিমিনী, মৃত্যুর মহিমায় অনায়াসে সে পথ পার হয়ে গেল। কোথাও বাধল না তার দেহটা।
বাইরের সাগরে জবাই করা ছাগলের মতো ছটফট করছে মদ্দা তিমিটা, বার বার ঘাই দিচ্ছে। দূরের গির্জা থেকে ভেসে এল এই সময় রোববারের নিয়মিত প্রার্থনা সভার আহ্বান।
ঢং ঢং ঢং বাজছে গির্জার ঘণ্টা।
কেমন অপার্থিব লাগছে সেই শব্দ! যেন মৃত্যুর ওপার থেকে আসছে!
***
