তিমির প্রেম – ২
দুই
দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে তৃতীয়বার বার্জিওতে ফিরে এলেন ফার্লে মোয়াট। বার্জিওর বাসিন্দা এখন তাঁরা। ভাড়াটে নন, বাড়ির মালিক। দশ বছর আগে ১৯৫৭ সালে নিউফাউণ্ডল্যাণ্ডের এই জনবিরল দক্ষিণ প্রান্তে যখন প্রথম এসেছিলেন তখনি ইচ্ছেটা জেগেছিল মোয়াটের মনে, ওখানকার ধীবর পল্লীতে কিছুদিন বাস করবেন, ওদের সঙ্গে মিলে মিশে গিয়ে ওদের হাসি আনন্দের ভাগীদার হবেন, কিছু লিখবেন ওদের নিয়ে। তাঁর যোগ্য সহধর্মিণী ক্লেয়ার। স্বামীর আনন্দের জন্যে শহরের সুখ-সুবিধাকে বলি দিয়ে যে কোন অজ পাড়াগাঁয়ে থাকতেও মোটেই আপত্তি নেই তাঁর।
প্রথম যখন এসেছিলেন মোয়াট, দ্বীপপুঞ্জের এই অংশে ধীবরদের কুটিরগুলো ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, বেশ দূরে দূরে। শতকরা একশোজনই ছিল মৎস্যজীবী। সাত-আট হাত লম্বা ডোরি নৌকায় করে সাগরে মাছ ধরত ওরা, আজও ধরে, ধরছে গত তিন-চারশো বছর থেকেই, বংশানুক্রমে। প্রচণ্ড শীত। বছরের বেশ কয়েক মাস বরফ পড়ে এখানে। শীত-কাতুরে দ্বীপটা তখন বরফের সাদা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঝিমোয়। তারপর একদিন দেখা যায় বরফ গলতে শুরু করেছে। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল হয়ে ওঠে পথ-ঘাট। বসে থেকে থেকে গায়ে-গতরে ঘুণ ধরে গিয়েছিল মৎস্যজীবীদের, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে তারা। সী-গাল-ডাকা ভোরে, পুব আকাশটা লালচে হবার আগেই শোরগোল পড়ে যায়। মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে ওরা, ফিরে আসে সূর্য ডুবলে, কালপুরুষ যখন মাঝ-আকাশে।
মাছ ধরতে যারা যেতে পারে না, তারাও বসে থাকে না, জাল বোনে, শুকায়! শুকনো মাছ প্যাকিং বাক্সে ভরে, শহরে চালান দেয়ার জন্যে। এসব কাজ অবশ্য মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চাদের। সাত-আট বছর বয়েস হলেই বাচ্চা আর বাচ্চা থাকে না ওদেশে, নৌকা নিয়ে দাদুর সঙ্গে পাড়ি জমায় দূর-সমুদ্রে। আবার সত্তর পার হলেও বুড়ো বুড়ো হয় না, নাতির হাত ধরে নৌকায় চেপে বসে। তাই মাছ ধরার মৌসুমে পুরুষরা যারা ডাঙায় থাকে তারা হয় একেবারে নাবালক নয়তো পরপারের ডাকের অপেক্ষা করছে।
দশ বছর আগে, যখন প্রথম বার্জিওতে এসেছিলেন মোয়াট, এখানকার জীবনযাত্রা ছিল অন্যরকম। কাজের সময় কাজ, এই ছিল রীতি। যখন কাজ থাকত ওদের মুহূর্তের ফুরসত মিলত না। অবসর সময়ে নাচ-গান, হৈ-হুল্লোড়, হাসি-আনন্দে মেতে থাকত। ভয়াবহ ঝড়ের রাতে বড় বড় ঢেউ যখন করাল রূপ নিয়ে আছড়ে পড়ত পাড়ের পাথরে, পাষাণ-চত্বরে এসে ঝাপটে পড়ত সী- গালের মৃতদেহ, ঘরে বন্দি হয়ে নিশ্চুপ বসে প্রহরের পর প্রহর গুণত তখন মেয়ে- বুড়ো-বাচ্চারা। ওরা জানত, বার-সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া দু-একটা নৌকা ফিরবে না আর কোনদিন। কাকে যে টান দেবে সাগর জানার উপায় নেই, যারা গেছে তারা ফিরে না এলে বোঝা যাবে না। তাই দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করত ওরা।
প্রথমবার বেশিদিন থাকতে পারেননি, তাই পাঁচ বছর পরে আবার বার্জিওয় ফিরে এলেন মোয়াট। প্রথমবারের মতো এবারেও একটা বাসা ভাড়া করে থাকবেন ভাবলেন, কিন্তু পাঁচ বছরেই অনেক পাল্টে গেছে দ্বীপপুঞ্জটা। এই সময়ে ওখানে একটা ভাল বাসা পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। অনেক খুঁজে বার্জিওর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্র্যাণ্ডির পশ্চিম প্রান্তে একটা দ্বিতল বাঙলো মতো বাড়ি পেলেন। মালিক জানাল, ভাড়া দেবে না, তবে বিক্রি করতে রাজি আছে। টিলার মাথায় সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা বাড়িটাকে দেখে ভাল লেগে গেল লেখকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের সাগরের দিকে তাকালেন। এলোমেলো উড়ছে এক ঝাঁক সী-গাল, দাগ কেটে গেল তাঁর শিল্পী মনে। দামদর করে কিনেই ফেললেন বাড়িটা।
দ্বিতীয়বার বার্জিওয় গিয়ে দ্বীপবাসী অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে মোয়াট দম্পতির, ভাব হয়েছে। পরিচিতদের মধ্যে বাইরের লোকও আছে, তারা সবাই পয়সা-ওয়ালা। কিন্তু যারা বন্ধু, তারা সবাই দ্বীপবাসী, দরিদ্র, দিন-আনে-দিন-খায় গোছের।
মোয়াট দম্পতির বন্ধুত্ব হয়েছে সাধারণ মৎস্যজীবী হান-পরিবার আর বার্ট চাচার সঙ্গে। হানেরা দুই ভাই, বড় কেনেথ আর ছোট ডগলাস। বড়জন বিয়ে করেছে সেই কবে, কিন্তু কোন অজানা কারণে বিয়ের প্রতি একবারেই ঝোঁক নেই ছোট ভাইয়ের। জাত ব্যবসা ত্যাগ করেনি ওরা। বহু প্ররোচনা সত্ত্বেও মাছ ধরা ছেড়ে কারখানার খাতায় নাম লেখায়নি। আগের মতই ডোরি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়, ফিরে আসে নৌকা বোঝাই মাছ নিয়ে। তবে আজকাল আর বরফজাত করার ঝক্কি নেই, সোজা গিয়ে কারখানায় বেচে দিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে ফেরে।
আজব চরিত্রের লোক ‘আংকেল বাট’। কার চাচা? দ্বীপে গিয়ে নাম শুনেই প্রশ্নটা মাথায় এসেছে মোয়াটের। বার্ট চাচার ভাইপো কে? খোঁজ নিয়ে পরে জেনেছেন, গোটা দ্বীপের সবাই এই বিশেষ চাচার ভাইপো। ষাটের ওপরে বয়েস হলেই এই দ্বীপে পুরুষেরা ছেলে-ছোকরাদের চাচা আর মেয়েরা চাচী। দশ- পনেরো বছর আগেই চাচা হয়েছে বার্ট। বৌকে ভালবাসে। কারণ অনেকগুলো ছেলেপুলে নাকি তাকে উপহার দিয়েছিল চাচী। তারা কেউ নেই এখন দ্বীপে। কেউ গিয়েছিল দূর সাগরে মাছ ধরতে, ফেরেনি আর। কেউ গেছে বিদেশে চাকরি করতে, তারাও ফেরেনি। বার্ট চাচার সংসারে এখন চাচী বাদে আর একটা মাত্র সদস্য, একটা কুকুর, নাম সীজার। আজব এই চাচা লোকের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে চাচীর কথা উঠলে ‘মাই ওয়াইফ’ না বলে বলে ‘মাই উয়োম্যান’ কিংবা ‘দ্যাট উয়োম্যান’।
এহেন বার্ট চাচা রোজ সন্ধ্যায় এসে বসত মোয়াটের ড্রইংরুমে। চেয়ারে বসবে না কিছুতেই। বলে বলে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা করলেন মোয়াটের স্ত্রী ক্লেয়ার। ড্রইংরুমের একধারে একটা প্যাকিং বাক্স রেখে দিলেন। ওটার ওপর জাঁকিয়ে বসে চাচা, মন দিয়ে রেডিওতে সান্ধ্য সংবাদটা শোনে। খবর শেষ হওয়ার পর। রাজই প্রথমে একটা গাল দেয়, ‘শুয়োর! শুয়োর! সব শালা শুয়োরের বাচ্চা!’
প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি বোধ করতেন ক্লেয়ার, কিন্তু এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে ডেকে হয়তো জিজ্ঞেস করেন, ‘কি আংকেল, কাকে গাল দিচ্ছ অমন করে?’
ভীষণ অবাক হয়ে যায় চাচা। ধবধবে সাদা চুলে ছাওয়া মাথা নেড়ে দাড়িতে আঙুলের দু-একটা খোঁচা দিয়ে বলে, ‘গাল দিচ্ছি! কই, না তো! শুয়োরকে শুয়োর বললে গাল দেয়া হয় নাকি?’
প্রশ্ন করেন মোয়াট, ‘ওরা কারা, চাচা? কাদের কথা বলছ?’
‘সব কটা শুয়োরের বাচ্চার কথা। তোমার এই রেডিওর ভেতরের শুয়োরটা থেকে শুরু করে ডাক্তার, মেয়র, স্মলউড, সব্বার কথাই বলছি। লর্ড যীসাস জানেন, দারুণ সুখে ছিলাম আমরা এখানে। দ্বীপের সমস্ত লোকেরা যেন এক পরিবারের লোক। কারও কোন বিপদ হলে দ্বীপের সবাই গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। ওই মেয়েমানুষটা, মানে তোমাদের চাচীর যখন প্রথম বাচ্চা হলো, আমাদের টমের বাপ…দূর, কি যে বলি, টমকেই তোমরা দেখোনি, তার বাপকে চিনবে কি করে…হ্যাঁ, আমার প্রথম ছেলে আরকি, যখন হলো, তামাম দ্বীপের লোক এসে ভেঙে পড়ল আমার বাড়িতে। আমাকে কুটোটি সরাতে হয়নি। ওরাই ধাই ডাকল, পানি গরম করল, নাড়ি কাটল, স্যাক দিল… সব করল। আর আজ? পাশের বাড়িতে কে মারা গেল সে খবরই রাখে না কোন শালা। যদি কেউ ব্যথায় ককায় তো বড়জোর উঠে গিয়ে ওপাশের জানালাটা লাগিয়ে দেয়। মানুষগুলো আর মানুষ আছে নাকি? ধাড়ি শুয়োরদের পাল্লায় পড়ে শুয়োরের বাচ্চা হয়ে যায়নি সব?’
সহানুভূতি দেখান মোয়াট, ‘যুগের হাওয়া।’
‘যুগ না, বাবা, যুগ না। লোভ। কারখানা বসিয়ে দেদার টাকা কামানোর লোভ। আর কি বড় বড় গালগল্প ঝেড়েছে স্মলউডের বাচ্চা, হেন করবে, তেন করবে। আহা, কত করেছে, এক্কেবারে বেহেশত বানিয়ে দিয়েছে!’
বার্ট চাচার কথা শুনতে মোয়াটের মতোই ক্লেয়ারেরও ভাল লাগে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ড্রইংরুমে ঢোকেন তিনি। ফায়ার প্লেসের আগুনটা উস্কে দিয়ে খোঁচা দেন চাচাকে, ‘কেন চাচা, কত কিছুই তো হলো। রাস্তা হয়েছে, ইলেকট্রিসিটি এসেছে, রেডিও শুনছ, সিনেমা দেখতে পারছ। উন্নতি কম হয়েছে?’
‘কচু হয়েছে!’ ফায়ার প্লেসের আগুনের মতোই জ্বলে ওঠে চাচা। ‘পিত্তি জ্বালানো কথা বলো না বলে দিচ্ছি, হ্যাঁ! একে উন্নতি বলো? বেল পাকলে কাকের কি? রাস্তা হয়েছে, তা তো ওদের জন্যে। ওদের গাড়ি চলে। বিজলি আছে আমাদের কারও ঘরে? রেডিও না শুনে আর সিনেমা না দেখে কি চলছিল না আমাদের এতদিন? সারা দ্বীপে কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। হাঁটতে গেলেই পায়ে বাধে তোবড়ানো টিন আর বিয়ারের বোতল। আকাশটাকে আলকাতরার রঙ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে রাক্ষুসে কারখানার চিমনির ধোঁয়া। এতবড় সাগরের টলটলে পানিকেও নোংরা করে ছেড়েছে পচা তেল। আর তুমি, মামণি বলছ উন্নতি? ওয়াক, থুহ্!’
ডোরি নিয়ে মাছ ধরতে না বেরোলে মাঝেমধ্যে কেনেথ হানও আসে। মোয়াটকে বলে, ‘আপনি স্যার একটু বুঝিয়ে বলুন না ছোঁড়াটাকে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়েস হয়ে গেল আর কবে বিয়ে করবে?’
‘আমি কি করব বলো?’ মোয়াট বলেন, ‘বিয়ে করতে না চাইলে তুমিই বা অমন জোরাজুরি করো কেন?’
মাথা নেড়ে কেনেথ বলে, ‘সে অনেক কথা, স্যার। বলব একদিন। নিজেকেই অপরাধী মনে হয়। বলব, সব বলব একদিন।’
কিন্তু বলে না কেনেথ। সে না বললেও কথাটা কানে এলো মোয়াটের। কথায় কথায় ক্লেয়ারকে সব বলে দিয়েছে কেনেথের স্ত্রী। একটি মেয়েকে ভালবেসেছিল ডগলাস। দ্বীপেরই মেয়ে। ডগলাসের বয়েস তখন বাইশ-তেইশ হবে। মেয়েটির উনিশ। বিয়েটা হতো, কিন্তু গোলমাল বেধে গেল হঠাৎ করেই। জানা গেল কুমারি মেয়েটি মা হতে চলেছে। এসব অনেক দিন আগের কথা। তখনও আধুনিক হয়নি বার্জিও, স্মলউডও আসেনি। দ্বীপের লোকে মেয়েটিকে একঘরে করল। ভাইকে এসে ধরল ডগলাস। হলপ করে বলল, মেয়েটির পেটে তারই বাচ্চা, কিন্তু বিশ্বাস করল না কেনেথ, বিয়েতে রাজি হলো না। মেয়েটিও কিছুতেই স্বীকার করল না কে তার সর্বনাশ করেছে। শেষে এক ঝড়ের রাতে আত্মহত্যা করল সে। সেই থেকে বিয়ের নাম শুনলেই মুখ বাঁকায় ডগলাস।
এদের নিয়েই মোটামুটি দিন কাটে মোয়াট দম্পতির। ডাকপিয়ন, দুধওয়ালা, মুদি, রুটিওয়ালা, ধোপা, এরা হলো তাঁদের বন্ধু। মাঝে মাঝেই সময় পেলে তারা আসে। কিন্তু তবু অতি সূক্ষ্ম একটা ফাঁক থেকেই যায়। দেশী আর বিদেশীর ফাঁক নয়, শিক্ষিত আর অশিক্ষিতের ফাঁক। শ্রদ্ধা আর সম্মানের চোখে দেখে তাঁদেরকে গরীব লোকগুলো। নানা ব্যাপারে তাঁদের কাছে পরামর্শ নিতে আসে। মোয়াটের ড্রইংরুমে ঢোকে, তাঁদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করে, এমনকি নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপারও বলতে একটু দ্বিধা করে না, তবু সোফায় বসতে পারে না তারা। মোয়াট কাউকে মানা করেননি, ওরাই বসে না।
তৃতীয়বার ফিরেও এই সহজ সরল মানুষগুলোর কাছে একই রকম শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্ব পেলেন মোয়াট দম্পতি। পাঁচ বছর আগে যাওয়ার সময় বাড়ির চাবি দিয়ে গিয়েছিলেন এক ধোপানীর কাছে। আগে জেলেনী ছিল সে। এক ঝড়ের রাতে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরেনি তার স্বামী। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে দ্বীপের আরও কিছু হতভাগীর মতো সাহেব-সুবোদের কাপড় ধোয়ার কাজ নিয়েছে সে।
বাড়িটাকে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখেছে। ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে। পর্দাগুলো ধবধবে পরিষ্কার। এমনকি রান্নাঘর আর বাথরুমের বালতিতে পানিও রাখা আছে। দেখে খুশি হলেন মোয়াট।
তাঁরা এসেছেন খবর পেয়ে দল বেঁধে দেখা করতে এলো বন্ধুরা। পাঁচ বছরের জমা খবর উগড়ে দিতে লাগল:
আংকেল ফ্রেড সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি, কেনেথ হানের একটা মেয়ে হয়েছে, গত বছর ক্যারিবু হরিণ তেমন ধরা পড়েনি, মাছের ঝাঁক এ মরশুমে কম, জালের সুতার দাম বাড়ছে, প্রতি শনিবার কারখানার মাঠে সিনেমা দেখানো হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ব্যাগ থেকে ক্যাণ্ডি আর কেক বের করলেন ক্লেয়ার। সবাইকে ভাগ করে দিলেন। চাচী আসেনি, হয়তো পরে আসবে। কিন্তু চাচা ঠিকই এসে হাজির হয়েছে। তার জন্যে একটা কাঠের পাইপ এনেছেন ক্লেয়ার, চাচীর জন্যে ঘাসের চটি।
উপহার পেয়ে চাচা আনন্দে ডগমগ। তামাক ছাড়াই পাইপে কষে টান দিল কয়েকবার, তারপর হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওহহো ভুলেই গিয়েছিলাম। মামণি, আজ আর রান্নাঘরের ঝামেলায় যেও না। ওই মেয়েমানুষটা বলে দিয়েছে তোমরা আজ আমাদের ওখানে খাবে। গোছাতে তো সময় লাগবে, রান্নাটা আজ আর পেরে উঠবে না।’
রাতের খাওয়াটা বার্ট চাচার ওখানেই খেতে হলো তাঁদেরকে। একা হাতে বেশি করে কিছু করে উঠতে পারেনি চাচী। বয়সও হয়েছে। আগের মতো আর খাটতে পারে না। নিজ হাতে তৈরি বাদামী পাঁউরুটি, কড়া করে ভাজা হেরিং মাছ, ম্যাকারেল মাছের গ্রেভি, আর ঘরে তৈরি মদ দিয়ে খাওয়াটা মোটামুটি মন্দ জমল না।
ক্লেয়ার রান্নার প্রশংসা করতেই ঘাড় দুলিয়ে সায় দিল চাচা, ‘তা মামণি ঠিকই বলেছ। ওই মেয়েমানুষটা রাঁধে ভাল। তবে তোমার কাছে অত ভাল লেগেছে কেন জানো? সাংঘাতিক খিদে, আর কিছু না। নইলে ওই দু-চার টুকরো বাসি মাছ, ও আবার খাবার হলো নাকি?’
