তিমির প্রেম – ৪
চার
ছেলেবেলা থেকেই তিমির প্রতি দাঙ্গ কৌতূহল মোয়াটের। দাদুর কোলে বসে একটা ছড়া শুনতেন, তখন থেকেই তাঁর চরিত্রে তিমি-প্রেমের সূচনা। ছড়াটার শুরু:
ইন দা নর্থ সী লিভড আ হোয়েল,
বিগ অভ বোন অ্যাণ্ড লার্জ অভ টেইল…
কিভাবে সমস্ত সাগরের অধীশ্বর হয়ে উঠেছিল তিমিটা, ছড়াটায় তারই বর্ণনা করা হয়েছে। পানির দেশের সবাই তাকে সালাম জানায়, সমীহ করে। তারপর হঠাৎই একদিন অবাক হয়ে লক্ষ করল তিমি, একটা বিজাতীয় বড়সড় জিনিস তার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, তাকে বিন্দুমাত্র তোয়াজ করছে না কিংবা সম্মান জানাচ্ছে না। কি, এত বড় বেয়াদবি! তিমি-রাজের মেজাজ গেল বিগড়ে। বেয়াদব জানোয়ারটাকে সামান্য শিক্ষা দেবার জন্যে ছুটে গিয়ে ডানা দিয়ে জোরে এক চড় কষাল। ব্যস, তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তিমি-রাজের বিশাল দেহ। বেয়াদব জানোয়ারটা যে আসলে ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডো বুঝতে পারেনি তিমি।
ছোটদের ছেলে ভোলানো ছড়া কিংবা গল্পে নীতিবাক্যের ছড়াছড়ি। এই বিশেষ ছড়াটাতেও নীতিবাক্য আছে। ছড়াকার বোঝাতে চেয়েছেন, বেশি কৌতূহল ভাল নয়। কিন্তু মোয়াটের উপর এই ছড়ার প্রভাব উল্টো হয়ে দেখা দিল। তিমির প্রতি তাঁর কৌতূহল গেল আরও বেড়ে, সঙ্গে সঙ্গে সহানুভূতিও হলো। রাগ হলো সাবমেরিনটার ক্যাপ্টেনের ওপর। তাঁর মনে হলো, গর্দভ ক্যাপ্টেনটা ইচ্ছে করেই চমৎকার জীবটাকে হত্যা করল।
বড় হলেন মোয়াট আর তিমির প্রতি ছেলেবেলার তীব্র আগ্রহ আরও বাড়ল। জীবজগতের বৃহত্তম প্রাণীটির প্রতি বাড়ল কৌতূহল। তিমি সম্পর্কে লেখা যেখানে যত বই পেলেন পড়ে শেষ করলেন। ছবি দেখে তিমির চেহারা মনে গেঁথে নিলেন। ছোট আকারের দু-একটা জ্যান্ত কিংবা মৃত তিমি দেখলেন, কিন্তু বড় জাতের তিমি নিউ ফাউণ্ডল্যাণ্ডে আসার আগে পর্যন্ত দেখেননি।
১৯৬২ সালে প্রথম বড় জাতের তিমি দেখেন মোয়াট। সেদিন ক্লেয়ারের সঙ্গে রান্নাঘরে ছিলেন। হঠাৎ প্রতিবেশী ওনি স্টিকল্যাণ্ডের চিৎকার শোনা গেল। ছুটতে ছুটতে এসেছে সে।
‘স্যার, ও স্যার, জলদি বেরোন! এসে গেছে ওরা!’
ছুটে বেরিয়ে এলেন মোয়াট, ‘কারা, কারা এসেছে ওনি?’
‘ওই যাদের কথা এতদিন বলেছি, তিমির ঝাঁক!’
চরকির মতো পাক খেয়ে গিয়ে ঘরে ঢুকলেন মোয়াট। টেবিলে রাখা দূরবীনটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়েই যন্ত্রটা চোখে লাগিয়ে ওনির নির্দেশিত দিকে তাকালেন। ওই তো, তীর থেকে সিকি মাইলও হবে না, সাগরে ঘুরপাক খাচ্ছে কয়েকটা জীব। তিমি! দূর থেকে অবশ্য তেমন বড় দেখাচ্ছে না, দেখাও যাচ্ছে না পরিষ্কার, শুধু যখন শ্বাস নিতে ভেসে উঠছে পিঠ দেখা যাচ্ছে। তবে ওদের পানির ফোয়ারা এখান থেকেও দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। নিঃশ্বাস ফেলার সময় সৃষ্টি হয় এই ফোয়ারা। আরেকটা দূরবীন নিয়ে ক্লেয়ারও এসে দাঁড়িয়েছেন মোয়াটের পাশে। তিনিও দেখছেন অতিকায় প্রাণীগুলোকে। দুজনেই স্তম্ভিত! মহাসাগরের সেই মহাবিস্ময় যেন অযাচিতই এসে দাঁড়িয়েছে আজ তাঁদের দোরগোড়ায়।
যেন শুনতে পেয়ে চলে যাবে তিমিগুলো এই জন্যে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন ক্লেয়ার, ‘কি মনে হয়, কোন বড় জাতের তিমি?’
মোয়াটকে জবাব দিতে হলো না, অবশ্য সঠিক জবাবটা তাঁর জানাও নেই। পেছন থেকে বলে উঠল একটা কণ্ঠ, ‘হ্যাঁ, মামণি, বড়ই ওরা। ফিন হোয়েল।’
চোখ থেকে দূরবীন না সরিয়েই জিজ্ঞেস করলেন আবার ক্লেয়ার, কি করে বুঝলে?’
শ্বাস ফেলার কায়দা দেখে। দেখছ না কতবড় ফোয়ারা!’
‘ওই ফিন হোয়েল ঠিক কত বড় হবে?’
‘কমপক্ষে ছয়-ডোরি একেকটা।’
‘ছয়-ডোরি মানে?’
ইঞ্চি-ফুটের হিসেব বোঝে না বার্ট চাচা, মিটার সেন্টিমিটারও না। তার দুনিয়ায় দৈর্ঘ্যের মাপকাঠি হলো মাছধরা ডোরি নৌকা। মনে মনে হিসেব করে নিলেন মোয়াট, সত্তর ফুট লম্বা হবে একেকটা তিমি।
চাচা বলল, ‘সারাটা শীতকাল দ্বীপের আশেপাশেই থাকবে ওরা, পাক খাবে পানিতে। বছরের এই সময়ে হেরিং খেতে আসে…’
‘কিন্তু আমি তো জানতাম শুধু ক্রিল খায় ফিন হোয়েল!’ বাধা দিয়ে বললেন মোয়াট।
হো হো করে হেসে উঠল চাচা। যেন, মোয়াটের বোকামিতে দারুণ মজা পেয়েছে। ‘শুধু ক্রিল তো খায় নীল তিমি। ওরা আরও বড়, সাত আট ডোরি লম্বা। ফিন হোয়েল গরমকালে ক্রিল খায়, শীতে হেরিং। তোমাদের কেতাবে সব সত্যি কথা লেখা থাকে না।’
তিমি দেখা ও বার্ট চাচার সঙ্গে আলাপ একই সঙ্গে চলল মোয়াট দম্পতির। বুঝতে অসুবিধে হলো না তাঁদের, তিমি সম্পর্কে অসামান্য জ্ঞান রাখে নিরক্ষর এই মৎসজীবী। জীবনভর ডোরি নিয়ে সাগরে সাগরে ঘুরেছে, পানির দেশের খবরাখবর তার নখদর্পণে। এই সব খবর সংগ্রহ করেছে সে নিজের চোখে দেখে, নিজের কানে শুনে। তার অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে সাগর, তিন তিনটে পুত্র, দুটি পৌত্র, কিন্তু তবু তার কোন অভিমান নেই। সাগরকে অভিশাপ দেয় না, ভালবাসে। বার্ট চাচার সাগর-প্রীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোয়াট বলেছেন, ‘অনেক সময় দেখেছি কর্মহীন অবসরে সাগরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকে ও। এখনও, এই বৃদ্ধ বয়েসেও ডোরি নিয়ে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ে। আমার বিশ্বাস, মাছ ধরার ওছিলায় আর একবার সাগরের বুকের মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে চায় আংকেল বার্ট, পাড়ে বসে থেকে থেকে যখন ও হাঁপিয়ে ওঠে মাছ ধরার ছুতোয় বেরিয়ে পড়ে তখন। হয়তো, দিগন্ত বিস্তৃত বাল্য-সখীর কানে কানে দুটো প্রাণের কথা বলে আসে। আন্টি সেটা বোঝে, জানে, ওই নীলাম্বরী-পরা সীমাহীন পানির জগৎ আংকেলের জীবনের প্রথম প্রেম, আন্টির সতীন। তাই ফিরে এলে স্বামীর কাছে কখনও জানতে চায় না দ্যাট ওয়োম্যান, ‘মাছ পেলে কিছু?’ বরং হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘প্রাণটা জুড়াল তো?’
সে বছর সারাটা শীতকাল ধরে তিমিগুলোকে দেখলেন মোয়াট। প্ৰায় প্রতিদিনই সান্ধ্য আসরে তিমির প্রসঙ্গ এসে যায়। বার্ট চাঁচী, ওনি, হান-ভাইদের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করেন মোয়াট দম্পতি। বাইরের ঘরে অতিথিরা সবাই কার্পেটের ওপর পা-মুড়ে বসে, একমাত্র চাচা ছাড়া। সে বসে তার জন্যে নির্দিষ্ট প্যাকিং বাক্সের ওপর। কাঠের পাইপে ধূমপান করে চলে একটানা।
সন্ধ্যাবেলায় দুটো কারণে মোয়াটের ড্রইংরূমে এসে জমায়েত হয় ওরা। প্রথম কারণ, ড্রইংরূমে সারাক্ষণই আগুন জ্বলে ফায়ার-প্লেসে, ওরা গরীব, জ্বালানি কেনার পয়সা নেই; দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণটা হলো এই বহিরাগত পরিবারের দুজনেরই কাছে এমন একটা কিছু ওরা পায়, যা দ্বীপের আর কারও কাছে নেই। সবাই কথা বলে অনর্গল। চুপচাপ বসে থাকে চাচা, ছেলে-ছোকরাদের কথা শোনে, মাঝে মাঝে মুচকে হাসে। কিন্তু তিমির কথা উঠে পড়লেই আর সবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে একটানা বকবক করে যায়। স্মৃতির ঝুলি থেকে তুলে এনে তিমি সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতার গল্প শোনায়।
কথা প্রসঙ্গে চাচাকে একদিন একটা কঠিন প্রশ্ন করে বসলেন মোয়াট, ভেবেছিলেন উত্তরটা জানা নেই বৃদ্ধের, কাত হয়ে যাবে। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীদেরও জানা ছিল না তখনও। কোন বইতেই কোন যুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজে পাননি মোয়াট। কিন্তু উত্তরটা সহজেই দিয়েছিল অভিজ্ঞ বৃদ্ধ, তাকে কাত করতে গিয়ে উল্টে নিজেই কাত হলেন মোয়াট। স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি।
মোয়াট জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা আংকেল, একটা কথা তো তুমি মানো, জীবজগতে প্রত্যেকটি প্রাণীর ডান-অঙ্গ তার বাম-অঙ্গের নকল? মানে, ডান দিকে কান, পাখনা, হাত থাকলে বাঁ-দিকেও থাকবে, এবং তা একই রকম? ডান গালে দাড়ি থাকলে বাঁ গালেও থাকবে? পশু, পাখি, মাছ, কীট-পতঙ্গ সবার ক্ষেত্রেই এই আইন সমানভাবে প্রযোজ্য, মানো তো?’
ধীরে সুস্থে পোড়া তামাকটুকু ফেলে পাইপে নতুন তামাক ভরল চাচা। আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, ‘না, সবার ক্ষেত্রে নয়। ব্যতিক্রম আছে, এবং সেটা ডানা তিমির বেলায়। এদের ডান দিকের ঝিল্লির সঙ্গে বাঁয়ের ঝিল্লির রঙের কোন মিলই নেই। ডানের ঝিল্লি এই আমার দাড়ির মত সাদা ধবধবে। বাঁয়ের ঝিল্লি মামণির চুলের মত কালো কুচকুচে।’
স্তব্ধ হয়ে গেলেন মোয়াট। তার প্রকাশ করার আগেই প্রশ্নটা ঠিক বুঝে নিয়েছে চাচা। যেন তিনি ল্যাঙ মারার কথা ভাবতেই ঠিক বুঝে নিয়ে জিজ্ঞেস করে বসেছে চাচা, কি হলো, ল্যাঙ মারতে চাইছ বুঝি?’
বুঝে গেলেন মোয়াট, আরও অনেক কিছুই জানে চাচা। চেপে ধরলেন, ‘চাচা, এই অদ্ভুত ব্যতিক্রম কেন?’
চাপা হাসিটা ছড়িয়ে গেল বৃদ্ধের মুখে। পাইপটা দাঁতে কামড়ে ধরেছে। ফুক ফুক করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘হুঁম! জব্বর প্রশ্ন! তা তোমাদের কেতাবে কি লেখা আছে?’
‘জাহান্নামে যাক কেতাব!’ অস্থির হয়ে উঠেছেন মোয়াট, ‘তুমি বলো। কারণটা জানো তুমি।’
নীরব হাসিতে ঢাকা পড়ল সাগর-প্রেমিকের সাগর-নীল দুই চোখের তারা। বলল, ‘তা অবশ্য জানি।’
‘তো বলছ না কেন?’
ফায়ারপ্লেসের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে আগুনে আঁচ নিতে নিতে বলল চাচা, ‘একটা গল্প শোনো। অনেক অনেক দিন আগে, তখন আমার বয়েস দশ কি বারো। দাদুর সঙ্গে ডোরি নিয়ে মাছ ধরতে যেতাম। ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা তিমি আসত তখন এই বার্জিওর সাগরে। হাম্পব্যাক, স্পার্ম এমন কি নীল তিমিও। তবে ডানারাই আসত বেশি। আমাদের ডোরির আশেপাশে নিঃশ্বাস ফেলত ওরা। ফোয়ারার পানি বৃষ্টির ছাঁটের মত এসে গায়ে লাগত আমাদের। যেন জানত ওরা ওদেরই মতো মাছ ধরতে আসি আমরাও, তাই ভাব জমাত। একদিন সাঁঝ হয় হয়, ডোরির এক মাথায় বসে আছি আমি, পাশে দাদু। ডোরি বোঝাই হেরিং। ফিরব ফিরব করছি, হঠাৎ দাদু বলল, দেখ দেখ দাদু, ডানা ব্যাটার কাণ্ডটা দেখ! দেখলাম, অদ্ভুত কায়দায় হেরিং ধরছে একটা প্রকাণ্ড ডানা তিমি। চরকির মত পাক খাচ্ছে। প্রথমে বড় বড় পাক, তার বেড়াজালে পড়ে বোকা হয়ে গেছে হেরিংগুলো, এলোপাতাড়ি ছুটছে। পাকের ব্যস ক্রমে ছোট করে আনতে লাগল তিমি, আসলে মাছগুলোকে অল্প জায়গায় ঠাসবুনোট করে ফেলার ইচ্ছে। হঠাৎই থমকে দাঁড়াল তিমিটা, তারপর বিশাল দেহের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত ছুটে গেল। বিশাল হাঁ। আটকে পড়া সব কটা হেরিংকে গিলে ফেলল। একটা মাছও পালাতে পারল না। খাওয়া শেষে জোরে একবার নিঃশ্বাস ফেলল ডানা, তারপর ভারি পাথরের মতো তলিয়ে গেল পানির তলায়।’
থামল বার্ট চাচা। নিজের সিংহাসনে নড়েচড়ে পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল। সমানে ধোঁয়া বেরুচ্ছে ঠোঁটের দুই কোণ দিয়ে।
‘তো কি হলো?’ জিজ্ঞেস করলেন মোয়াট।’
‘তিমিটা পাক খাচ্ছিল ঘড়ির কাঁটা যেদিকে ঘোরে সেদিকে।’
‘তাতেই বা কি হলো?’ অপেক্ষা করতে করতে বিরক্তই হয়ে উঠেছেন মোয়াট, আর এটাই যেন উপভোগ করছে চাচা।
নির্বিকার কণ্ঠে বলল সে, ‘ডানা তিমি এভাবেই মাছ ধরে। বহুবার দেখেছি আমি। কক্ষনো উল্টো দিকে পাক খায় না ওরা।’
ধৈর্যচ্যুতি ঘটল এবার মোয়াটের। ধমকে উঠলেন, ‘একবারও অস্বীকার করিনি আমি তোমার কথা! কিন্তু আসল প্রশ্ন থেকে দূরে সরে এসেছ কেন? বোকা পাঁঠা পেয়েছ আমাকে?’
সাগরের সঙ্গে থেকে থেকে আংকল বার্টের ধৈর্যও সাগরেরই মতো অপরিসীম। শান্ত কণ্ঠে বলল, কেতাব পড়ে পড়ে আসল বুদ্ধি গুলিয়ে খেয়েছ বুঝতে পারছি, নইলে এতক্ষণে সব অনুমান করে ফেলার কথা….’
অমার্জিত ভাষায় একটা অসামান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য দিল বৃদ্ধ, যেটা উদ্ঘাটন করতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। পাকের কেন্দ্রে মাছগুলো বন্দি হবার পর বৃত্ত-কেন্দ্রকে আলোকিত করার প্রয়োজন পড়ে তিমির। প্রধান কারণটি হলো হেরিং-গুলোকে সাময়িক অন্ধ করে ফেলা। এটা করে তিমি আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে। বার্ট চাচার মতে অন্ধকারে কখনও হেরিং ধরে না ডানা তিমি, মানে ধরতে পারে না। তিমির ডান চোয়ালের ঝিল্লিগুলো উজ্জ্বল-সাদা, এবং যেহেতু ডানে পাক খায় ডানা, সূর্যের আলো তাই ঝিল্লিতে প্রতিফলিত হয়ে আলোকিত করে তোলে বৃত্তের কেন্দ্রের পানি। অকস্মাৎ চোখে উজ্জ্বল আলোর ছটা লেগে প্রায় অন্ধ হয়ে যায় হেরিং, চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্যে চোখে কিছুই দেখতে পায় না। আর এই সুযোগে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে টপাটপ সব কটা মাছকে গিলে ফেলে তিমি। হাত কিংবা ডানাওয়ালা প্রায় সমস্ত জীবের মধ্যেই দেখা যায় ডান হাত কিংবা ডান পাখার জোর বাঁ দিকেরটার তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি। ডানা তিমিরও তাই। ডান ডানায় জোর বেশি হওয়ায় ক্লকওয়াইজ ঘুরতে সুবিধে হয় তার। আর এই জন্যেই লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে জিরাফ যেমন গাছের উঁচু ডালের পাতা খাওয়ার প্রয়োজনে গলাকে লম্বা করেছে, গঙ্গাফড়িং তার গায়ের রং করেছে ঘাসের মত সবুজ, জেব্রা আর বাঘ গায়ে জড়িয়েছে উজ্জ্বল রঙের ডোরাকাটা চাদর, তেমনি ফিন হোয়েল বা ডানা তিমিও তার মুখ-বিবরের ডান প্রান্তের ঝিল্লিকে করে তুলেছে মসৃণ অ্যালুমিনিয়মের মতো চকচকে।
প্রায়ই এমন সব আজব তথ্য দিয়ে মোয়াটকে স্তম্ভিত করে দেয় বার্ট চাচা।
