তিমির প্রেম – ৫
পাঁচ
২ জানুয়ারী শনিবার, ১৯৬৭ সাল। কৃষ্ণা প্রতিপদ। সাবেক মাছধরা ডোরিটা নিয়ে যখন বেরোল কেনেথ আর ডগ দুই ভাই, পুব-আকাশের গায়ে তখনও ঘুম জড়ানো কুয়াশা। মাডিহোল থেকে যাত্রা করল ওরা, গন্তব্য হা-হা প্রণালী। সারা দিন মাছ ধরে পড়ন্ত বেলায় ডোরি বোঝাই হেরিং নিয়ে বাড়ি ফিরছে, গ্রীনহিল দ্বীপ পাক দিয়ে যাওয়াই নিয়ম, কিন্তু ওরা অল্ডরিজেস পণ্ডের পথ ধরেছে। ওপথে যাওয়া কিছুটা কষ্টকর হলেও শর্টকাট, সে জন্যেই চলেছে। সকালে যাওয়ার সময়ই সাউথ গাট দ্বীপের কাছে এক ঝাঁক ডানা তিমি দেখেছিল ওরা, কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করেনি। কারণ, এই তিমিরা যে এ বছরও বার্জিওর কাছে সাগরে আস্তানা গেড়েছে এটা জানা আছে ওদের।
আকাশে মেঘ। পশ্চিম দিকটা গ্র্যানিট কালো। আবহাওয়ার খবর, ঝড় হতে পারে। তাই পাঁচ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন বসানো ডোরিটা নিয়ে নিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে ডেরায় ফিরতে আগ্রহী দুই ভাই। পুশথ্রু প্রণালীর ভেতর দিয়ে সাবধানে অল্ডরিজেস পণ্ডে ডোরিটা ঢোকাল ওরা। প্রথমে কিছু টের পায়নি, কিন্তু হ্রদের মাঝামাঝি আসতেই অদ্ভুত এক আওয়াজ উঠল ‘হুউস্!’
চমকে উঠল ওরা। খোলা সাগরে এই আওয়াজ প্রায়ই শোনে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু এই অল্ডরিজেস পণ্ডে! সাংঘাতিক কাণ্ড!
অনেক দিন পর অনুভূতিটা মোয়াটের কাছে বর্ণনা করেছে কেনেথ। সত্যি বলতে লজ্জা নেই, স্যার, একেবারে চুপসে গেলাম আমি। জানি তো শব্দটা কে করেছেন! ঘুরে চাইতেই চোখে পড়ল ওনাকে, ইয়া বড় এক তিমি! যদি কম করেও বলি তো লম্বায় পাঁচ ডোরি! ফিসফিস করে ডগকে বললাম, মা-মেরীর নাম কর্!’
ডোরিটার দিকে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকল তিমি। তারপর যেমন হুস করে ভেসে উঠেছিল আবার ভুস করে ডুব দিল। পুরোদমে ইঞ্জিন চালাল ডগ। হাল ঘুরিয়ে দক্ষিণ প্রণালীর দিকে চলল দ্রুত। কিন্তু কয়েক গজ যেতে না যেতেই আবার দেখা দিল তিমি। নৌকা থেকে দূরে হ্রদের মাঝখানে ভেসে উঠল। তারপর তীব্র গতিতে ছুটে গেল দক্ষিণ প্রণালীর দিকে। অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল কেনেথ আর ডগ। ওরা ভাবছে অগভীর সরু প্রণালী দিয়ে পালানোর চেষ্টা করবে বিশাল জীবটা, এবং তাহলেই হয়েছে। ডুবো পাহাড়ের চোখা পাথরে পেট চিরে গিয়ে ওখানেই মরবে। সরু প্রণালী দিয়ে ওর বিশাল দেহ গলতে চাইবে না কিছুতেই। কিন্তু প্রণালীর মুখের কাছে গিয়েই আচমকা ব্রেক কষে দাঁড়াল তিমিটা। কি করে অতবড় দেহের সাংঘাতিক গতিবেগ চোখের পলকে থামিয়ে দিল জীবটা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পরক্ষণেই মোড় ঘুরল, দ্রুত ছুটল আবার। এগিয়ে আসছে নৌকার দিকে। ‘সামাল সামাল’ করে উঠল দুই ভাই। নির্ঘাত নৌকার গায়ে ধাক্কা মারবে তিমি। কিন্তু না, ডোরির পাঁচ হাত দূরে এসে থমকে দাঁড়াল ওটা।
তিমিটাও বুঝেছে, কিছুতেই প্রণালীর অগভীর পথ দিয়ে বেরোতে পারবে না। অবাক হয়ে ভাবতে লাগল কেনেথ, বেরোতে যদি না পারে ঢুকল কোন পথে ওটা? এই হ্রদে ঢোকার আর তো কোন পথ নেই?
আসলে ঢুকেছে সে ওই প্রণালী দিয়েই। শুক্রবার রাতে পূর্ণিমার ভরা কোটালে পানিস্ফীতিতে সাময়িকভাবে প্রণালীর গভীরতা পাঁচ-ছয় ফুট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন ঢুকেছে। এখন ভাটার টানে পানি নেমে গেছে, বেরোতে পারছে না আর। আবার জোয়ার আসবে, ভাবছে কেনেথ। কিন্তু ভরা কোটাল নয়, প্রতিপদের জোয়ার। তাতে পানি খুব একটা বাড়বে না, সে সময় তিমিটা বেরোতে পারবে কিনা বলা মুশকিল।
প্রণালী দিয়ে বেরোনোর বার-কয়েক ব্যর্থ চেষ্টা করল তিমি। বুঝল, এভাবে হবে না। পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট এক সামুদ্রিক পানির হ্রদে বন্দি হয়েছে। এক মাসের জন্যে। পরবর্তী চান্দ্র মাসের ভরা কোটাল পর্যন্ত চলবে ওর এই বন্দিদশা।
তিমিটা চেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়েছে দেখে ভাইয়ের কানে কানে বলল কেনেথ, ‘হাঁপিয়ে পড়েছে। এই সুযোগ। খুব ধীরে ধীরে পাড় দে।’
মোয়াটের কাছে বলেছে সে, ‘বললে বিশ্বাস করবেন না স্যার, তখনই কাণ্ডটা ঘটল। তিমির হুস-হুসানি আমার ভালমতোই জানা। হাজার বার শুনেছি ওই শব্দ গভীর সাগরে, দেখেছি, শুধু ব্রহ্মতালুটা পানির ওপরে জাগিয়ে ওরকম হুউস্ করে ওঠে। পানির তলায় তখন পিঠের ছায়া দেখা যায়। আর এই তিমিটা করল কি জানেন, একেবারে খাড়া! পিঠ পর্যন্ত পানির ওপরে! ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ফেলছে আর আমাদের দেখছে। বললে বিশ্বাস করবেন না স্যার, ওটার দুচোখে আকুতি! যেন জিজ্ঞেস করছে আমাদের, তোমরা তো এ-পাড়ার ছেলে। এখান থেকে বেরোনোর আর কোন পথ জান কি? জানলে বলো না! আমি তখন থরথর করে কাঁপছি, ভয়ে, উত্তেজনায়। বিশাল ওই দৈত্যটা মুখ হাঁ করলে ডোরি-সুদ্ধ ঢুকে যাব আমরা ওর ভেতর। চেঁচিয়ে বললাম ডগকে, ডগ, যা থাকে কপালে, টান দে! যত জোরে পারিস! কি করে যে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি দু-ভাইয়ে, প্ৰভু যীশু জানে। বাপ-দাদার আশীর্বাদ ছিল তাই এযাত্রা বেঁচে গেছি!’
দ্বীপে ফিরে এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা চেনা-জানা যাকেই সামনে পেয়েছে তাকেই শুনিয়েছে ডগ আর কেনেথ। অনেকেই বিশ্বাস করেনি, করার কথাও নয়। ওই অল্ডরিজেস পণ্ডে কোন তিমি ঢুকতে পারে, ভাবতেই পারেনি দ্বীপের লোকে। তাছাড়া এর আগে কখনও ওই হ্রদে তিমি ঢোকেওনি।
মুখে মুখে কথাটা ছড়িয়ে গেল।
ডোরি থেকে মাছ নামাচ্ছে হানেরা দুই ভাই। এই সময়ে ওখানে হাজির হয়ে গেল বার্ট চাচা। তার পিছু পিছু এলো জনা পাঁচেক লোক। ওদের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল চাচা। লোকগুলো তার মতে বাজে লোক। মৎস্যজীবী নয় ওরা, কারখানার শ্রমিক-মজুর। ওদের দলপতির নাম জর্জি। সে-ই এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ‘এই যে কেনেথ, তোমরা নাকি অল্ডরিজেস পণ্ডে একটা তিমি দেখেছ?’
‘তিমি নয়,’ কেনেথের আগেই বলল বার্ট চাচা, ‘তিমিনী…’
অবাক হয়ে চাচার দিকে তাকাল কেনেথ, ‘তুমিও দেখেছ নাকি ওটাকে?’
‘না।’
‘তো জানলে কি করে?’ প্রশ্নটা করল ডগ।
‘অনুমান। আমি জানি আমার অনুমান ঠিক, যদি সত্যিই কোন তিমিকে অল্ডরিজেসে দেখে থাকো তোমরা।’
‘দেখেছি মানে, ভালমতো দেখেছি। অনেকক্ষণ ধরে দেখেছি,’ জোর দিয়ে বলল কেনেথ।
‘কি করে দেখলে?’ জিজ্ঞেস করল জর্জি।
বার বার বললেও তিমির গল্পে ক্লান্তি আসে না বার্জিও-বাসীদের। গোড়া থেকে সবিস্তারে আর সবারই মতো জর্জি এবং তার দলবলকেও কাহিনীটা শোনাল কেনেথ।
‘এখন গেলে পাব ওটাকে?’ জানতে চাইল জর্জি।
‘হয়তো। আবার জোয়ার আসার আগে ব্যাটা…’
‘আবার ব্যাটা!’ ধমকে উঠল চাচা। ‘বলেছি না ওটা তিমিনী… ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, জোয়ার আসার আগে ও-বেটি পালাতে পারবে না।’
‘পালাবে কিরে!’ বলল বার্ট চাচা, ‘ও তো আরও এক মাস থাকবে অল্ডরিজেসে। ঢুকেছিল পূর্ণিমার ভরা কোটালের সময়। তখন পানি বেশি ছিল, ঢুকেছে। কিন্তু এখন পানি নেমে গেছে, তাই তো বেরোতে পারছে না। আবার এক মাস পরে ভরা-কোটালের রাতে পানি বাড়বে, তখন বেরোবে। তাছাড়া ও পোয়াতি…?
‘তুমি কি করে জানলে?’ চাচার কথার মাঝখানেই বাধা দিল ডগ, ‘এমন ভাবে বলছ, যেন এই মাত্র তিমিনীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলে এসেছে!’
‘সন্দেহ হচ্ছে, না?’ চোখ দুটো যেন হাসছে চাচার, ‘বাজি ধরবি নাকি? তামাকের খুব টানাটানি যাচ্ছে ইদানীং তা বেশ তো, এক টিন তামাকই না হয় বাজি ধরে ফেল। আমি বলছি, উনিশে ফেব্রুয়ারীর আগে কিছুতেই যাচ্ছে না ও।’ সবজান্তার হাসি হাসল চাচা, ‘আবার যখন পূর্ণিমা আসবে, মেয়েটা জানে, তার আগে ওর বিশাল বপুটা কিছুতেই সাউথ চ্যানেল দিয়ে পার করতে পারবে না। ও এমন কিছু করবে না এখন, যার ফলে ওর তলপেটে চোট লাগে। বেচারী মা হতে যাচ্ছে যে।’
এসব কথায় কিন্তু তেমন মন নেই. জর্জির। অন্য কথা ভাবছে সে। চাচার কথা শেষ হতেই চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তার মানে এখনও আছে তিমিটা হ্রদে?’
‘তো এতক্ষণ বলছি কি, তোমার মাথা আর আমার মুণ্ডু!’ চটে উঠল বার্ট চাচা।
আর কোন কথা বলল না জর্জি। নিজের দলবল নিয়ে চলে গেল। দ্রুত।
অনেক অনেক দিন পরে তিমিনীটার কথা উঠলেই বার বার আক্ষেপ করেছে বার্ট চাচা আর হান-ভাইয়েরা, বিশ্বাস করুন, যদি জর্জিদের মতলবটা জানতাম তখন, তো খিল এঁটে দিত য মুখে। তিমিনীর ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করতাম না।’
মোয়াট বিশ্বাস করেছেন ওদের কথা। সত্যিই জর্জির দলের আসল উদ্দেশ্য টের পেলে খবরটা একেবারেই চেপে যেত হান-ভাইয়েরা, কিছুই বলত না বার্ট চাচা।
.
মোটর বোট নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিল জর্জির দল। প্রথমেই অল্ডরিজেস পণ্ডে গেল না। যার যার বাড়ি গেল। বাড়ি থেকে যখন ফের রওনা দিল তখন ওদের সঙ্গে তিনটে মারাত্মক অস্ত্র। .৩০৩ লী এনফিল্ড সার্ভিস রাইফেল, আর প্রচুর বুলেট।
ঠিক গোধূলি বেলা সাউথ চ্যানেলে এসে পৌছুল জর্জির দলের মোটর বোট। পশ্চিম আকাশ লালে লাল। যেন হারপুনের ঘায়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা ডানা তিমির রক্তের ফোয়ারা রাঙিয়ে দিয়েছে আকাশটাকে। আর প্রচণ্ড হাহাকারে ফেটে পড়ছে গোধূলি। অভিশাপ দিচ্ছে মানুষ জাতটাকে।
বেশ আলো আছে তখনও। হঠাৎই একটা অদ্ভুত শব্দে চমকে উঠল জর্জির দল। তিমিনীটা ডাকছে। ডাকটার বর্ণনা দিয়েছেন মোয়াট: শুনলে মনে হয় খালি তেলের টিনের ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে দিয়ে হাম্বা হাম্বা করছে গরু, যদিও শব্দটা আরও অনেক অনেক বেশি জোরাল।
ত্রিসীমানায় কেউ নেই। কাকে ডাকছে তিমিনী? অবাক হলো ওরা। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড পরেই বুঝল ব্যাপারটা। সাউথ চ্যানেলের ওপারে সাগরের দিক থেকে এলো আরেকটা গুরুগম্ভীর আওয়াজ। তিমিনীর ডাকের জবাব দিচ্ছে আরেকটা তিমি কিংবা তিমিনী।
বার্ট চাচার মতো অভিজ্ঞতা নেই ওদের, মদ্দা আর মাদী তিমির ডাকের তফাৎটা বোঝে না। তাজ্জব হয়ে কান পেতে শুনতে লাগল এই ডাকাডাকি।
কিছুক্ষণ শুনে বোট থেকে লাফ দিয়ে তীরে নামল ওরা, পাঁচজন এসেছে। ততক্ষণে বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে তিমিনীটা। জালে আটকা পড়া প্রকাণ্ড রুই মাছের মতো ঘাই মেরে মেরে যেন তোলপাড় করছে হ্রদের শান্ত পানি। সময় নষ্ট করল না ওরা। তিন দিক থেকে পজিশন নিল। রাইফেলের প্রচণ্ড গর্জনে সচকিত হয়ে উঠল শান্ত ঝিমন্ত হ্রদটা।
ভয় পেয়ে আতঙ্কিত চিৎকার করে উড়ে গেল এক ঝাঁক সী-গাল। পাহাড়ের মাথায় মাথায় প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হলো যেন, কিন্তু কেউ কর্ণপাত করল না। নিষ্ঠুর এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরেই যেন পশ্চিমের সাগরে তাড়াহুড়ো করে তলিয়ে গেল সূর্যটা।
কথায় কথায় পরে জর্জিদের একজনকে বলতে শোনা গেছে, ‘এত্তোবড় শরীর, টিপ ফসকানোর প্রশ্নই ওঠে না। সব কটা গুলি লেগেছে। একটাও মিস হয়নি। তবে জায়গামতো লাগাতে পারিনি। চোখ সই করেছিলাম। প্রমাণ সাইজ ডিনার প্লেটের সমান একেকটা চোখ, কিন্তু বেশি নড়াচড়া করছিল তিমিটা। আলোও কমে এসেছিল, তাই টিপ ঠিক রাখতে পারিনি।’
আরেকজন বলেছে, ‘খালি ডুব মারে হারামজাদী। চেঁচিয়ে বললাম, যা না শালী, যা লুকা পানির তলায়। কিন্তু থাকবি কতক্ষণ? ভেসে তোকে উঠতেই হবে। ঠিক তাই। পনেরো মিনিটের বেশি থাকতে পারে না। শ্বাস নিতে ওঠে। আবার গুলি খায়, আবার ডুব মারে।’
.
রাত দশটা নাগাদ বার্ট চাচার বাড়িতে এসে হাজির হলো ডগলাস।
সবে খাওয়া সেরে পাইপটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়েছে চাচা এমন সময় ঘরে ঢুকল সে। চাচার দিকে তাকিয়ে হাসল। পকেট থেকে ছোট্ট একটা টিন বের করে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এটা টেস্ট করে দেখো তো আংকেল। ভাল লাগলে রেখে দাও।’
টিনটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার ডগলাসের মুখের দিকে তাকাল চাচা। একটু যে অবাক হয়নি তা নয়। তাকে তামাকের টিন প্রেজেন্ট করছে ডগলাস!…নাহ্, বোঝা যাচ্ছে না!
‘তা হঠাৎ এই উপহার কেনরে, ডগ?’ তামাকের টিনটা তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল চাচা।
‘বা-রে, দেব না? তামাক ছাড়া যে তুমি আবার গল্প বলতে পারো না। ‘
‘গল্প! আজ আবার কি নতুন গল্প শুনবি? আর তার জন্যে তামাকই বা কেন? রোজ এমনিই তো গল্প শোনাই তোদের।’
‘তিমির গল্প শুনব আজ।
‘তিমির গল্পও তো অনেক বলেছি।’
‘না, আজ বিশেষ করে ওই তিমিনীটার গল্প শুনব। তিমির ব্যাপারে অনেক কিছু জানো তুমি, এতদিন শুধু এটাই ভেবেছি, কিন্তু আজ বিকেলে বুঝেছি ওদের নাড়ীর খবর পর্যন্ত তোমার জানা। ওদের জন্মের ইতিহাস আজও জানি না আমি। একদিন কথায় কথায় বলেছিলে, তিমিরা মানুষেরই মত প্রেম করে, কথাটা মনে গেঁথে আছে আমার। আজ আমি কিছুতেই ছাড়ছি না তোমাকে। সব, সব বলতে হবে আজ।’
‘সব শুনবি, না?’ টেবিল থেকে রুটি কাটার ছুরিটা নিয়ে মাথা ঢুকিয়ে চাঁড় দিয়ে টিনের মুখ খোলার চেষ্টা করছে চাচা। সামান্য চেষ্টায়ই খুলে গেল ঢাকনা। ভেতরের তামাকের গন্ধ শুঁকল সে। বলল, ‘বাহ্, ভালো তামাক এনেছিস তো, ডগ!’
‘ওনিও তাই বলে দিয়েছে। বলেছে ভাল না হলে, তোমার পছন্দ না হলে ফেরত নেবে।’
দু’-আঙ্গুলে চিমটি দিয়ে খানিকটা তামাক তুলে নিয়ে পাইপে ভরল চাচা। তারপর আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, ‘গল্প এখানে জমবে না, ডগ! চল, অন্য কোথাও যাই।’ এক মুহূর্ত কি ভাবল চাচা। বলল, ‘চল এক কাজ করি, ডোরি নিয়ে অল্ডরিজেসেই চলে যাই। তিমিনীকেও দেখব, গল্পও বলব। রাতটা খুব সুন্দর!’
আনন্দে লাফিয়ে উঠল ডগলাস। ‘দারুণ, দারুণ হবে আংকেল। চলো, আর এক মুহূর্তও এখানে নয়।’
এঁটো বাসন ধুয়ে গোছাতে গোছাতে সবই শুনল চাচী। কিছু বলল না। বাধাও দিল না। জানে, দিয়ে লাভ নেই। একবার যখন স্থির করেছে তার স্বামী অল্ডরিজেসে যাবে, তো যাবেই। বার্ট চাচাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘কখন ফিরবে?’
‘ঠিক নেই। তুমি কাজ শেষ করে শুয়ে পড়ো,’ বলে ডগলাসকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো চাচা।
বিকেলের দিকে আসি আসি করেও আসেনি ঝড়। মেঘ কেটে গেছে। আকাশে ভরা চাঁদ। অল্ডরিজেসের পানিকে মনে হচ্ছে তরল রুপা। পাড়ের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে অকারণেই গা ছম ছম করে। হু-হু বইছে মাতাল হাওয়া।
সাউথ চ্যানেলের কাছে ডোরিটা নোঙর করল ডগলাস। আরাম করে বসে পাইপ টানছে বাৰ্ট চাচা। হ্রদের ঠিক মাঝখানে ভাসছে তিমিনী। চুপচাপ। বিকেলে কি পরিমাণ অত্যাচার সহ্য করেছে সে, জানে না চাচা কিংবা ডগলাস। চাঁদের আলোয় দূর থেকে দেখে এই সময় ওটাকে কেমন যেন অপার্থিব মনে হলো ডগলাসের কাছে। বার্ট চাচার পাশাপাশি এসে বসল সে, ‘শুরু করো চাচা…’
সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে আংকেল বার্ট। ডগলাসের পেটে কনুয়ের খোঁচা মেরে বলল, ‘ওই যে, ওই-ই যে দক্ষিণে দেখতে পাচ্ছিস, ব্যাটা ঠিকই আছে। বৌকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। ওই মদ্দাটার জন্ম থেকেই শুরু করি, কি বলিস, অ্যাঁ?’
এমন করে বলল চাচা, যেন ওটার ঘরের খবর নিয়ে এসেছে। তিমির কথা বলতে গেলে এভাবেই কথা বলে সে, এতদিনে জানা হয়ে গেছে ডগলাসের। তবু কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘ওকে তুমি চেনো নাকি?’
‘চিনব না কেন? ওরা সবাই এক। একজনের গল্প বললেই সবার কথা বলা হয়ে যায়।’
দক্ষিণে, সাগরের পানিতে ভেসে ওঠা মদ্দা তিমিটার দিকে তাকাল ডগলাস, ‘ঠিক আছে, বলো।’
পাইপে নতুন করে তামাক ভরে আগুন ধরাল বাট চাচা। কষে এক টান দিয়ে নাকমুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শুরু করল, ‘এখান থেকে অনেক, অনেক দূরে…বুঝলি ডগ, দক্ষিণ সাগরে…’
.
কয়েক সেকেণ্ড চুপচাপ পাইপ টানল বার্ট চাচা। চাঁদের দিকে তাকাল, তীরের পাহাড়ের দিকে তাকাল, তাকাল হ্রদের পানিতে ভেসে থাকা তিমিনীর দিকে। তারপর আগের কথার খেই ধরে বলতে শুরু করল আবার, ‘তরমুজের মতো বোঁটা তো বাড়িয়ে দিল মা। ঠোঁট নেই বলে চুষে তো খেতে পারে না, তাই হাতখানেক লম্বা জিভটা সূচালো করে ফানেলের মত পাকিয়ে বোঁটার গায়ে লেপটে দিল বাচ্চা। চাপ দিতে হলো না। বোঁটায় জিভ জড়াতেই ওর কণ্ঠনালীতে অঝোরে ঝরে পড়তে লাগল বটের আঠার মত ঘন দুধ। গরুর দুধের চেয়ে দশগুণ বেশি চর্বি এই দুধে।
আট-দশ বালতি দুধ খেয়ে শান্ত হলো বাচ্চাটা। পেট ভরতেই চোখ ছোট ছোট হয়ে এলো তার। ঘুম পেয়েছে। কিন্তু একটানা ঘুম দেয়ার জো নেই তিমির, সে বাচ্চাই হোক আর ধাড়ি। প্রতি ঘণ্টায় দু-তিন বার ভেসে উঠে শ্বাস নিতে হয়। কাজেই একেকবারে দশ-বিশ মিনিটের বেশি ঘুমাতে পারে না। দশ কোটি বছর আগে সাগরে নেমেছে ওরা, কিন্তু তবু মাছের মতো কানকো দিয়ে অক্সিজেন শুষে নেয়ার অভ্যাস করতে পারল না আজও।
বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়তেই তার চিবুকের তলায় একটা ডানা নিয়ে গিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখল মা-তিমি। ছেলে এখনও ভেসে থেকে ঘুমাতে শেখেনি, তাই এই সাবধানতা। আসলে কিন্তু এর প্রয়োজন নেই, প্রকৃতি বাচ্চাকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করেই রাখে। তবু মায়ের মন তো, কিছুতেই বুঝতে চায় না। মানুষের মতোই তিমিও বাচ্চার জন্যে ভাবে। ঘুমালে পানিতে ডুবে যাওয়ার ভয় নেই মানুষের বাচ্চার, কিন্তু স্বপ্ন দেখে যেন ভয়ে ককিয়ে না ওঠে এজন্যে একটা হাত আলতো করে বাচ্চার গায়ে ছুঁইয়ে রাখে পাশে ঘুমন্ত মা।
বাচ্চাটার জন্ম হয়েছে পনেরোই জুন। শীতকাল। না, চমকে ওঠার কিছু নেই, জুন মাসটা শীতকালই। কারণ তার জন্ম হয়েছে দক্ষিণ আটলাণ্টিকে। বিষুব রেখার ওপারে। দক্ষিণ আমেরিকার রিয়ো ডি জেনিরো বন্দর থেকে কয়েক-শো মাইল পুবে। সোজা কথা, দক্ষিণ গোলার্ধে। সেখানে জুন মাস পড়ে শীতের মাঝামাঝি। মা-তিমির ব্লাবার এখন দশ ইঞ্চি পুরু। পিঠের চামড়ার ঠিক নিচেই থাকে এই ব্লাবার। এতে খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে তিমি। আগের গ্রীষ্মে দক্ষিণ মেরুর ক্রিল-এলাকায় চরতে গিয়েছিল সে, তার আগের গ্রীষ্মেও গিয়েছে। আসলে জন্মের পর প্রত্যেক গ্রীষ্মই ওই অঞ্চলে কাটায় তিমি। সেখানে চার থেকে ছয় মাস ক্রিল আর প্ল্যাংকটন খায়। ক্রিল হলো অতি খুদে কুচো-চিংড়ি জাতীয় কয়েক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীর সমষ্টিগত নাম। এই জিনিস খেয়েই মা-তিমির রাবার অত পুরু হয়েছে। বাচ্চাটা যতদিন পেটে ছিল ক্রিল অঞ্চল থেকে ফিরে এসেও মাঝে মাঝেই হেরিং খেয়েছে সে। এখন আর মাস পাঁচ-ছয় একেবারে কিছু না খেলেও চলবে ওর। গ্রীষ্মকালে ক্রিল খেয়ে বাড়তি খাদ্য ব্লাবারে মজুত করে তিমি তারপর শীত পড়তে শুরু করলেই চলে আসে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে।
আগের বছরের খাবারের সঞ্চয় থেকেই গোটা শীতকালটা কাটাবে মা-তিমি, নিজেও বাঁচবে, বাচ্চাকেও দুধ খাইয়ে বাঁচাবে। ছয় মাস মায়ের দুধ খাবে বাচ্চাটা, গ্রীষ্মকাল না আসা পর্যন্ত। তারপর মায়ের সঙ্গে যাবে ক্রিল অঞ্চলে। ক্রিল খাওয়া শিখবে।
ছয় মাসেই অনেক বড় হয়ে যাবে বাচ্চা। অবিশ্বাস্য রকম এদের বাড়ন। তিমির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ে ব্লু হোয়েল বা নীল তিমি। দিনে এদের বাচ্চার ওজন বাড়ে এক কুইন্টাল, অর্থাৎ সপ্তাহে প্রায় চার কিলোগ্রাম। আর জন্মের পর প্রথম কয় দিনে লম্বায় বাড়ে দৈনিক এক হাত করে।
এই বাচ্চাটা কিন্তু নীল তিমি না, ডানা তিমি, অর্থাৎ ফিন হোয়েল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি। এরা একশো ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, ওজনে হয় দেড়শো টন পর্যন্ত। এর পরেই আসে ডানা তিমি। লম্বায় হয় আশি ফুট, ওজন সোয়াশো টন। অন্যান্য বড় জাতের তিমির মধ্যে আছে সেঈ, হাম্পব্যাক, রাইট, বো-হেড, নারহোয়েল। কিন্তু এরা কেউই আকারে-ওজনে নীল কিংবা ডানা তিমির কাছাকাছি নয়। তার চেয়েও ছোট কিলার হোয়েল, ডলফিন, শুশুক; ওদের বৃহত্তম দুই প্রজাতির তুলনায় একবারেই নগণ্য।
