তিমির প্রেম – ৬
ছয়
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে বাচ্চা-তিমি। এখন সে একাই পানির ওপর মাথা জাগিয়ে শ্বাস নিতে পারে অনায়াসে। নাকের ফুটোর পর্দাটা এখন ঠিক মতোই খোলে, সময় মতো বন্ধ হয়। সাঁতারও রপ্ত হয়ে গেছে ভাল- মতো। বুঝে গেছে ও, ওর বগলের কাছে যে এক জোড়া ডানা আছে, মানুষের হাতের হাড়ের সঙ্গে যার অনেক মিল, ওদুটো কায়দা মতো নাড়াতে পারলে ডাইনে বাঁয়ে বাঁক নেয়া যায়। উল্টে যাওয়া ঠেকানো যায়।
ইতিমধ্যে ওদের ছেড়ে চলে গেছে খালা। গেছে ঘটনা চক্রে। হঠাৎ করেই সেদিন একটা পুরুষ ডানা তিমি এসে হাজির। মা-তিমিই তিমির ভাষায় তার বান্ধবীকে যেতে বলল। বাচ্চাটার দেখাশোনা সে এখন নিজেই করতে পারবে। প্রথমে একটু যাব-না, যাব-না ভাব করছিল খালা, কিন্তু ইদানীং পুরুষ তিমির সংখ্যা এতই কমে গেছে, শেষ পর্যন্ত সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না সে। চলেই গেল।’
কে. জি. স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করেছে যেন মা-তিমি। এই স্কুলের শিক্ষয়িত্ৰী সে নিজেই। হাতেকলমে শিক্ষা দরকার এই প্রতিকূল পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে। প্রথম পাঠ নিল ছেলে,মাকে ঘিরে চক্কর মারা। তার চেয়ে চারগুণ বড় মায়ের শরীর। পাক খেতে শিখল বাচ্চা। গায়ে গা লাগবে না, দূরেও যেতে পারবে না, শুধুই ক্রমাগত পাক খেতে হবে। দ্বিতীয় শিক্ষা, ডাইভ দেয়া এবং ভেসে ওঠা। কঠিন কাজ। নামতে হবে একেবারে খাড়া, কুয়ার দড়িতে বাঁধা পানিভরা বালতির মতো, কিন্তু উঠতে হবে ত্যাড়ছা হয়ে। অহেতুক শেখাচ্ছে তাকে এসব মা, তা নয়, বেঁচে থাকার জন্যে এসব অতি জরুরী। দিন কয়েকের মধ্যেই অবশ্য ডাইভ দেয়া আর ভেসে ওঠা শিখে ফেলল বুদ্ধিমান ছেলে। তিন নম্বর শিক্ষা,সামনের দিকে শব্দ তরঙ্গ ছুঁড়ে দেয়া এবং সেটা ফিরে এলে বুঝতে পারা কি জিনিসে ঘা খেয়ে ফিরে এসেছে। এ-যেন অনেকটা কান দিয়ে দেখার মতো ব্যাপার। ডলফিনের মতোই তিমিও শব্দ-তরঙ্গের প্রতিঘাতেই বুঝে নিতে পারে সামনে কি আছে, কত বড় জন্তু, তার গতি কোন দিকে, গতিবেগ কত, সব। সেটা মাছ, হাঙর, কিলার হোয়েল, নাকি অন্য কোন কিছু, তা-ও বোঝে।
আসলে রাজা মাত্রেই যেন অন্ধ। সে পানির দুনিয়ারই হোক আর ডাঙারই হোক; জন্তুই হোক, কিংবা মানুষ। বিশালত্বের দিক দিয়ে পানির রাজা তিমি, চোখের চেয়ে কানের জোর বেশি, নির্ভরও করে কানেরই উপর। বড় হিসেবে হাতিকে ডাঙার রাজা ধরা যেতে পারে। তারও রয়েছে দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা। কুতকুতে চোখে দূরের জিনিস তো দূরের কথা, কাছের জিনিসও ভালমতো দেখতে পায় না। এই প্রাণীটি নির্ভর করে তার অসামান্য ঘ্রাণশক্তির ওপর। শুঁড়টা আকাশের দিকে তুলে একবার শ্বাস টেনেই বুঝতে পারে সে মাইলখানেক দূরে যে প্রাণীটি আছে সে জিরাফ, সিংহ না মানুষ! আর মানুষ রাজার তো কথাই নেই। তার পারিষদবর্গের আনা খোঁজ-খবর শোনে কান দিয়ে, নিজের চোখে প্ৰায় কিছুই দেখে না। রাজ্য শাসন করে এই কানের ওপর নির্ভর করেই, আর তাইতেই মাঝে মাঝে দারুণ বিপত্তি ঘটে, অপদস্ত হতে হয়, এমন কি রাজ্য বা প্রাণ নিয়েও টানাটানি পড়ে কারও কারও।
দেড় মাস হয়েছে বাচ্চাটার বয়েস। একদিনের ঘটনা। মাকে ছেড়ে এখন সে দূরে যেতে সাহস পায়। পানির দুনিয়াটাকে চিনছে ধীরে ধীরে। আপত্তি করে না মা, কিন্তু সজাগ দৃষ্টি রাখে। মাঝে মাঝে শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে জেনে নেয় দুষ্টু ছেলেটা কোথায় আছে, কি করছে। সেদিন মায়ের একটু ঝিমুনি এসেছে, আর এই সুযোগে বেশ দূরে চলে এলো বাচ্চাটা। লক্ষ করেছে, সবাই সমীহ করে চলে ওর মাকে, পথ ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। সে হাঙরই হোক, অক্টোপাসই হোক কিংবা দানবীয় স্কুইড। এই জন্যেই আরও বেশি সাহস পেয়েছে সে।
কিন্তু এই প্রতিকূল দুনিয়ায় কারও ওপর যে নির্ভর করে চলা যায় না, সে মায়ের মতো আপনজন হলেও না, খুব অল্প বয়েসেই বুঝতে পারল বাচ্চা ছেলে। চলতে চলতে হঠাৎই ওর কানে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো। কৌতূহলী হয়ে আরও একটু এগিয়ে গেল। কিসের শব্দ দেখে অবাক হয়ে গেল। তাজ্জব ব্যাপার! এক ঝাঁক ম্যাকারেলকে ঘিরে ক্রমাগত পাক খাচ্ছে একটা থ্রেশার হাঙর। বাচ্চাটা বুঝতে পারছে না এটা খেলা নয়, আসলে পাক খেতে খেতে মাছগুলোকে সঙ্কুচিত পরিসরে বন্দি করে আনছে হাঙর। এভাবেই মাছ ধরে এই ভয়ঙ্কর প্রাণীগুলো। বিহ্বল হয়ে আথালি-পাথালি ছুটছে মাছেরা, কিন্তু হাঙরের মরণ পাক থেকে বেরোতে পারছে না কিছুতেই। বাচ্চা তিমি তো থ। থেশ্রার হাঙরের আনাগোনার শব্দ শুনেছে কেবল এতদিন, চোখে দেখেনি, মা সঙ্গে থাকায় কাছেই ঘেষতে সাহস পায়নি থেশ্রার। এখন একেবারে তার গায়ের ওপর এসে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেল বাচ্চাটা, কি করবে বুঝে উঠতে পারল না।
তিমির বাচ্চাটাকে দেখে ফেলল থেশ্রার। ভাগ্য খুলে গেল ম্যাকারেলের ঝাঁকের। পরিত্রাণ পেয়ে গেল ওরা। সোজা বাচ্চা তিমির দিকে ছুটে এল হাঙর। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ঘুরেই মায়ের কাছে ছুটল বাচ্চাটা। কিন্তু হাঙরের সঙ্গে পাল্লা দেয়া তার কাজ নয়। মুহূর্তে তার কাছে পৌঁছে গেল থেশ্রার। ক্ষুরের মত ধারালো দাঁত বসিয়ে দিল গায়ে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল বাচ্চা তিমি। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে ক্ষতস্থান থেকে। মাত্র দেড় মাস বয়েসেই ক্ষুধার্ত হাঙরের ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করল সে।
ভারি খুশি থেশ্রার। নেহাতই বরাত জোরে ম্যাকারেলের চেয়ে অনেক ভাল খাবার জুটে গেছে। স্তন্যপায়ী জন্তুর তুলতুলে মাংস। মুখের গ্রাসটা গিলে নিয়ে আবার প্রকাণ্ড হাঁ করে বাচ্চা তিমির দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু দ্বিতীয়বার কামড় বসানোর সুযোগ আর তার হলো না। বিশাল এক ভাসমান পর্বত যেন উল্কা এক্সপ্রেসের মত ছুটে এসে প্রচণ্ড গতিতে ঢুঁ মারল থ্রেশারের গায়ে। একশো টন ওজনের জলদানবের গতির সেই প্রচণ্ড ভরবেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল হাঙরের দেহ।
হাঙরটাকে শেষ করেই সন্তানের কাছে ছুটে গেল মা। বাচ্চার ক্ষতস্থানে আলতো করে ডানা বুলাতে লাগল। যন্ত্রণায় কাত্রাচ্ছে বাচ্চাটা। ওষুধ নেই, ব্যাণ্ডেজ নেই, কাটা ঘায়ে নোনা পানি লাগছে, যন্ত্রণা তো হবেই। বিকল্প ব্যবস্থা নিল তিমি-মাতা। চালকুমড়ো সাইজের বোঁটাটা তাড়াতাড়ি বাচ্চার ফানেল জিভে ঢুকিয়ে দিল।
ভরপেটে দুধ খেয়ে গোঙানি থামল বাচ্চার। কিন্তু এখনও কাতর সে। মা- তিমি তাকে নিয়ে এবার নাক বরাবর পশ্চিমে চলতে লাগল। মহীসোপান অতিক্রম করে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে রওনা দিল দুজনে। এটাও তিমির জন্মগত সংস্কার। শুধু ডানা তিমিই নয়, সব জাতের তিমিই এই কাজ করে। উপকূল থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন, শত শত কিংবা হাজার হাজার মাইল, অসুস্থ বা আহত হলেই রওনা দেবে ডাঙার দিকে। কেন এমন করে ওরা, তার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি আজও।
কে জানে, হয়ত তিমির রক্তে মিশে আছে দশ কোটি বছর আগের একটা বোধ। একটা বিলুপ্ত স্মৃতি। এক সময় যে ডাঙায় ছিল, এত বছরের বিবর্তনেও ভুলতে পারেনি সেটাকে। ভুলতে পারেনি মাটিই ছিল তার ঘর। সে জন্যেই বুঝি মৃত্যুর মুখোমুখি হলেই প্রাণটা কেঁদে ওঠে মাটির জন্যে, অদ্ভুত কোন আকুতি চাপ সৃষ্টি করতে থাকে তার ওপর, টেনে নিয়ে চলে ডাঙার দিকে।
