তিমির প্রেম – ৭
সাত
তিন মাস হলো বাচ্চার বয়েস। লম্বা হয়েছে তিরিশ হাত। ওজন সাত টন, অর্থাৎ প্রায় দুশো মন। রীতিমতো একটা দৈত্য, অথচ এখনও দুগ্ধপোষ্য শিশু। তিন মাসে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে মা-তিমি। কারণ রাবারে সঞ্চিত চর্বিকে খাবারে পরিণত করে নিজের শরীরের জ্বালানী যেমন জোগাড় করতে হয়েছে, বাচ্চার জন্যে দুধও সরবরাহ করতে হয়েছে। নীল তিমির মতো ডানা তিমিরা ও বাচ্চা হওয়ার পর ছয় মাস প্রায় উপোসই থাকে। সেই ক্রিল-অঞ্চলে আবার যাওয়ার আগে খাবার বলতে তার বরাতে বিশেষ কিছু জোটে না। ছয় মাসের আগে যায় না যে তার কারণ আছে। তখন শীতকাল। গিয়ে কোন লাভ নেই। প্রচণ্ড শীতে চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ। খাবারের চিহ্নও মেলে না।
বাচ্চাটার জখম ভাল হয়ে গেছে। উপকূল ছেড়ে তাই আরও দক্ষিণে চলতে শুরু করেছে মা-তিমি। দক্ষিণ আটলাণ্টিক অতিক্রম করে দক্ষিণ মেরুর ক্রিল- অঞ্চলে পৌঁছতে পৌঁছতে গরমকাল এসে যাবে। সেপ্টেম্বরের মোটামুটি তৃতীয় সপ্তাহে সূর্য বিষুব সংক্রান্তি অতিক্রম করে দক্ষিণায়নের পথে যাত্রা শুরু করলেই কি করে যেন টের পেয়ে যায় তিমিরা। সারা শরীর চনমন করে ওঠে। পুরুষ তিমি সঙ্গে থাকলে তিমিনীকে ডেকে তখন বলে, ‘সময় হয়েছে, চলো যাই।’
অবাক হয় না তিমিনী, জানতে চায় না কোথায় যেতে বলা হচ্ছে। তারও জানা আছে কোথায় যেতে হবে।
দলে দলে দক্ষিণে রওনা দেয় তিমিরা। যাবে বরফের দেশে। সেই যেখানে আছে সাদা বরফের ভাসমান পাহাড়, আছে লক্ষ-কোটি পেঙ্গুইন তিমিদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই যেন সূর্যও চলতে থাকে মকর সংক্রান্তির দিকে।
উপকূলের তিন-চার মাইল দূর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে মা ও ছেলে। রোজ তিরিশ-চল্লিশ কিলোমিটার এগোয়। পারলে মাটির আরও কাছ ঘেঁষে এগোত। পারে না তার কারণ, সৈকতের কাছাকাছি পানি কম, এতবড় শরীর নিয়ে নড়াচড়া মুশকিল, তাছাড়া সেখানে জেলে ডিঙির ভিড়। মানুষকে এড়িয়ে চলে দানবেরাও।
মন্টিভিডিওর কাছাকাছি এসে মোড় নিয়ে দক্ষিণ-পুবে চলল দুজনে। মহীসোপান অতিক্রম করে করে এতদিনে গভীর সাগরে পড়েছে। ভূগোলের ছাত্র হলে এবং মানুষের লেখা বই পড়লে জানত ওরা, জায়গাটার নাম আর্জেন্টিনা বেসিন। আরও দুটো নাম আছে এর, গর্জনশীল চল্লিশা ও অশ্ব-অক্ষাংশ। ভূগোলের ছাত্র না হয়েও একটা কথা ঠিকই জানে মা-তিমি, পানির গভীরতা এখানে পনেরো থেকে বিশ হাজার ফুট। সাগর এখানে ভীষণ অশান্ত। সদা-চঞ্চল, সদা-উচ্ছ্বাসে ভরা এক চিরযৌবনা নতর্কী যেন।
সাগরের এই এলাকাটা মা-তিমির খুব প্রিয়। সে কথা জানে না বাচ্চা ছেলে। জানার কথাও নয় তার। এখানে এলেই মায়ের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। মধুযামিনীর স্মৃতি বিজড়িত এই জায়গা। পাঁচ বছর আগে এখানেই দেখা হয়েছিল খোকার বাপের সঙ্গে। তখন ওর ভরা যৌবন। তেল চকচকে নিটোল দেহ। ঘুরে বেড়ায় একা একা। ভাল লাগে না, কিছুই ভাল লাগে না তার তখন। সঙ্গীর প্রয়োজন, একথা বুঝতে পারে না তরুণী তিমি, কিন্তু সারাক্ষণ মনে হয়, কি যেন চাই, কিছু একটা, যা তার এই ভাল-না-লাগাকে দূর করে দেবে।
হঠাৎই একদিন দূর থেকে শব্দ-তরঙ্গের মাধ্যমে ভেসে এলো এক অদ্ভুত মাদকতা ভরা ডাক।
কে ডাকে এমন করে? অবাক হয় তিমিনী। কেন ডাকে? কি চায়?
দূরত্বটা ঠিক আন্দাজ করতে পারে না তিমিনী। এজন্যে তাকে দোষ দেয়া যায় না। ডাকটা এসেছে ছয়-সাতশো কিলোমিটার দূর থেকে। দক্ষিণ আটলান্টিকের পানির নিচ দিয়ে দিকে দিকে শব্দ-তরঙ্গ ছুঁড়ে দিচ্ছিল পুরুষ তিমিটা। তারই একটা তরঙ্গ তিমিনীর রাডারের পর্দায়ও এসে ধাক্কা দেয়। এক ধরনের পুলক, এক ধরনের শিহরণ অনুভব করল সে। বুঝতে পারছে না কেন এমন লাগছে তার। সাড়া দিয়ে বসল নিজের অজান্তেই।
ছোটবেলায় বাপ-মায়ের সঙ্গেই থাকে ডানা তিমি। এক পরিবারে তিন- চারজন, বাপ-মা এবং একটি কি দুটি সন্তান। এই পরিবারকে বলে পড়, অবশ্য মানুষের ভাষায়, তিমিরা কি বলে কে জানে। আদৌ ওদের বলার প্রয়োজন পড়ে কিনা তাই বা কে জানে। মানুষের মতো অত নিয়ম-কানুন আর জটিলতার মধ্যে তো জড়াতে যায় না ওরা। নাম-ধামেরও নিশ্চয় থোড়াই পরোয়া করে।
বাচ্চারা বড় হয়। যৌবনে পা দেয়। বারো-তেরো বছর বয়েসেই মা হওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায় মেয়ে-তিমি।
একটা কঠোর নিয়ম মেনে চলে তিমিরা। রক্তের সম্পর্কের কারও সঙ্গে ভুলেও মিলিত হয় না। যৌবনে পা দিয়ে দৈহিক চাহিদা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে পড় ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে তরুণ-তরুণীরা। তখন তারা বেপরোয়া, উদ্দাম ।
অন্যান্য জানোয়ারের মতো তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় যাকে পায় তার সঙ্গেই মিলিত হয় না ওরা। সাময়িক যৌন উত্তেজনার বশে হুট করে কিছু করে বসে না। অনেক সময় নিয়ে, ভেবে-চিন্তে তারপর জোড় বাঁধে। তিমি সমাজে জোড়া ভাঙার নিয়ম নেই। একবার বাঁধলে একজন আরেকজনের সঙ্গে থেকে যায় আমৃত্যু। বিবাহ-বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই ওদের সমাজে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন তিমিনী পর পুরুষের সঙ্গে ব্যাভিচার করে না।
দুজনেই দুজনের দিকে এগোতে লাগল ওরা, অবিশ্বাস্য দ্রুতগতি। ঘণ্টায় গড়ে বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে দুজনে। দেখা হলো এক সময়। পরিচয় হলো, প্রণয় হলো, হলো পরিণয়।
তারপর কেটেছে দীর্ঘ পাঁচ-পাঁচটা বছর। বড় কম সময় নয়। ক্রিল-অঞ্চলে যাতায়াতের পথে পাঁচ বছরে অন্তত দশ বার এই অশান্ত অশ্ব-অক্ষাংশ অতিক্রম করেছে খোকার বাপ-মা। আজ খোকার সঙ্গে সাগরের এই এলাকাটা পার হতে গিয়ে মায়ের স্মৃতিতে প্রথম যৌবনের সেই মিলন মধুর মুহূর্তগুলো ভেসে উঠল। আর সেই সূত্রে বহুবারের মত আরেকবার মনে পড়ে গেল স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাটাও। মর্মান্তিক! এর জন্যে দায়ী তাদের চেয়ে অনেক অনেক ছোট দুপেয়ে কিছু নিষ্ঠুর জীব।
মাত্র মাস পাঁচেক আগে বিধবা হয়েছে মা-তিমি। দক্ষিণ মেরুর ক্রিল-অঞ্চলে থেকে ফিরছিল। খোকা তখন পেটে। চলতে চলতে স্ত্রীর কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়েছিল স্বামী। হঠাৎ শব্দ-তরঙ্গের মাধ্যমে টের পেল সামনে প্রকাণ্ড কি একটা পানিতে ভাসছে। এটা পানির কোন জীব নয়, তবু পানিতেই থাকে। চেনে ওকে তিমি-মা। ওদের ভাষায় কি বলে জানা নেই, তবে মানুষের ভাষায় জাহাজ।
মাঝ সাগরে এমন আজব জীবের সাক্ষাৎ ওরা প্রায়ই পায়। তারা কোন ক্ষতি করে না। পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কিন্তু কিছু কিছু আছে যারা যায় তো না-ই বরং দেখা পেলেই তাড়া করে। বোঝার উপায় নেই কোনটা করবে, আর কোনটা করবে না। কাজেই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল তিমি-মা। সঙ্গীকে হুঁশিয়ার করার জন্যে একটা শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে দিল। কিন্তু জবাব পাওয়ার আগেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম হলো তার। শব্দ লক্ষ্য করে প্রাণপণে ছুটে গেল তিমি-মা।
কিন্তু এ কি দৃশ্য! তার অসীম বলশালী জীবন-সঙ্গী, যার প্রতাপে কোন হাঙ্গর, খুনী তিমি ওদের ধারে কাছে ঘেঁষতে সাহস পেত না, সেই মহা পরাক্রমশালী সম্রাট নিথর ভাসছে পানিতে! তা-ও চিৎ হয়ে! দেখেই বুঝল মা- তিমি, মারা গেছে তার স্বামী।
যদি তখনও বেঁচে থাকত খোকার বাপ, যদি অন্তিম মুহূর্তে জীবন সঙ্গিনীর একটু সান্ত্বনার প্রত্যাশী হয়ে থাকত, তাহলে মা তিমি তার কাছে ছুটে যেত। কিন্তু মৃত্যুকে সে চেনে। তাই মৃত স্বামীর চেয়ে সন্তানের ভাবনাই বেশি ভেবেছিল সে। পালিয়ে এসেছিল। দশ কোটি বছর ধরে একটানা রাজত্ব করে আজ দুপেয়ে কিছু ক্ষুদে জীবের ভয়ে পালিয়ে আসতে হয় তাদের। না এসে উপায় নেই। মহাশত্রু অসীম ক্ষমতাশালী।
অতীত দিনের কথা ভাবতে ভাবতে খোকাকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে মা-তিমি কখনও পানিতে ডুবে কখনও ভেসে খুনসুটি করতে করতে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে বাচ্চাটা। পানির গভীরে এখন বেশ ডুব দিতে পারে সে, এক ডুবে দুশে মিটার নেমে যায়। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে বায়না ধরে, আরও গভীরে যাবে পাতালের রাজ্যে কি আছে দেখবে। মানব শিশুর মতো তারও কি ধারণা, পানির একেবারে নিচের তলায় আছে শঙ্ক-কড়ি-প্রবাল ঘেরা রাজপ্রাসাদ, সেখানে মুক্তোর ঝালর ঝোলান সোনার পালঙ্কে শুয়ে ঘুমায় সমুদ্র-রাজের কন্যা?
যেতে দিতে রাজি হয় না মা-তিমি। অঙ্ক না জানলেও প্রকৃতির কাছে শিখেে সে বেশি গভীরে গেলে পানির প্রচণ্ড চাপ সইতে পারবে না খোকা। কিন্তু তর্ রোজ রোজ বায়না ধরে ছেলে। শেষে একদিন রাগই হলো মায়ের। বলল, ‘যা না গিয়ে দেখ না কেমন লাগে!’
অনুমতি পেয়ে তক্ষুনি রওনা দিল খোকা, কিন্তু পালিয়ে এলো প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই।
মা-তিমি জিজ্ঞেস করে, ‘এলি কেন? দেখলি না?’
‘না মা, আর যাব না। ওরেব্বাপরে, সে কি চাপ! জান বেরিয়ে যেতে বসেছিল!’
দিন যায়। এরই মধ্যে একদিন এক কাণ্ড হলো। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ হাতছানি দিয়ে অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাচ্ছে যেন অশ্ব-অক্ষাংশের উত্তাল সাগর। একটু আগে একটা জাহাজ পশ্চিমে চলে গেছে, তার নিঃশ্বাসের কালে ধোঁয়া পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এক্কা-দোক্কা খেলছে যেন এক ঝাঁক উড়ুক্কু মাছ, তড়াক তড়াক করে লাফিয়ে উঠছে, ঝুপ ঝুপ করে নেমে আসছে পানিতে। খোশ মেজাজে দক্ষিণে চলেছে মায়ে-ছেলেতে হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, ডানা দিয়ে খোকাকে এক থাপ্পড় মারল মা-তিমি। পরক্ষণেই ডাইভ দিল। মাথা নিচু করে খাড়া নেমে চলল সাগরের গভীরে। এই সঙ্কেতের অর্থ বোঝে খোকা। যত্ন করে শিখিয়েছে তাকে মা। এই সঙ্কেত পাওয়া মাত্র আর দেরি করা চলবে না, মায়ের সঙ্গে সঙ্গে যেতে হবে তক্ষুণি।
ডুবছে তো ডুবছেই। মায়ের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে আছে খোকা। খেলাটা প্রথমে ভালই লাগল খোকার, কিন্তু খানিক পরেই টের পেল, না, এ তো খেলা নয়? কোন বিপদের গন্ধ পেয়েছে নিশ্চয় মা। কিন্তু কি বিপদ? মা-তো ভয় পায় না কাউকে?
ভুল করেছে খোকা। তার মা-ও কিছু কিছু জিনিসকে ভয় পায়। টের পেয়েছে মা-তিমি, দক্ষিণ থেকে সোজা এদিকে এগিয়ে আসছে এক ঝাঁক খুনী তিমি। দল ছুট দু-একটা খুনী তাকে দেখলে পালানোর পথ পায় না। কিন্তু আসছে এক ঝাঁক, এগারোটা। এতগুলোর সঙ্গে একলা পারবে না সে।
নেমেই চলেছে ওরা। দুশো কিলোমিটার, সোয়া দুশো, আড়াইশো, তিনশো-নাহ্ আর পারে না খোকা। হাজার ফুট নামার পর রীতিমতো শ্বাস কষ্ট হতে লাগল তার। এত নিচে এর আগে কখনও নামেনি সে। মনে হচ্ছে বিশাল সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরা হয়েছে তাকে। যে কোন মুহূর্তে ফেটে যাবে বুক। কিন্তু উপায় নেই। মায়ের হুকুম। অমান্য করার সাহস তার নেই।
হাজার ফুট নেমে থামল মা-তিমি। একটা শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে দিল সোজা ওপর দিকে। তারপর উঠতে শুরু করল, খাড়া নয়, কোণাকুণি, পঞ্চাশ ডিগ্রী কোণ করে।
কিন্তু এই কষ্টের মানে কি? এতে তো উঠতে বেশি সময় লাগবে? বুঝতে পারছে না খোকা। সে তো আর জানে না তার মা পানি-গতিবিদ্যায় একজন বিশারদ। আরও দশ-বারো মিনিট পরে যখন ভেসে উঠবে ওরা, খুনী তিমির ঝাঁকটা তখন পৌঁছে যাবে ওরা দুজনে যেখানে ডুব মেরেছিল সেই খানটায়। পৌঁছেই মা-তিমির ছুঁড়ে দেয়া শব্দ-তরঙ্গ গ্রহণ করবে। খোঁজাখুঁজি করবে ওখানেই। কল্পনাও করবে না ওদেরকে কায়দা করে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল পানির জগতের অসামান্য বুদ্ধিমান বিশালদেহী দুটো প্রাণী। খুনী তিমিদের অনেক পেছনে গিয়ে ভাসবে মা-তিমি। কাজেই তার শ্বাস ফেলার সময় ফোয়ারা নজরে পড়বে না খুনীদের। এমন বুদ্ধিমত্তার তুলনা একমাত্র মানুষের সঙ্গেই করা চলে।
খোকার দম শেষ। ডুব দেয়ার আগে জানত না, নইলে আরও অনেক বেশি অক্সিজেন জমা করে নিত রক্তকণিকায়। পানির তলায় সেই কখন থেকে আছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। বাতাস চাই এখন। বাতাস। বাতাস অক্সিজেন মেশানো তাজা বাতাস।
সহ্য ক্ষমতার শেষ সীমা অতিক্রম করল। মরিয়া হয়ে মায়ের সঙ্গ ত্যাগ করল খোকা। খাড়া উঠে যেতে শুরু করল। তৈরিই ছিল মা। এই ভুলটা করবে ছেলে, জানা ছিল তার। ধাঁ করে ছুটে এসে ডানা দিয়ে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় কষাল ছেলের মুখে। ব্যথায় টনটন করে উঠল খোকার মুখ। তীব্র যন্ত্রণা। কিন্তু এরপর যতই কষ্ট হোক আর মায়ের অবাধ্য হলো না সে। বুঝতে পারল, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে যন্ত্রণা দিতে বাধ্য হচ্ছে মা। কিন্তু কেন? কি কারণ।
ক্রমেই কমছে পানির চাপ। দেহটা বাঁকা করে ওপরে উঠছে তিমি-মা, সঙ্গে খোকা। শেষ পর্যন্ত ভুস করে ভেসে উঠল পানির ওপরে। খোলা আকাশের নিচে খোলা বাতাসে পৌঁছেছে ওরা। বুক ভরে শ্বাস নিল খোকা। আহ্ কি আরাম! ঘন ঘন সাত-আটবার শ্বাস নিয়ে শক্তি-সঞ্চারী অক্সিজেন ছড়িয়ে দিল সারা দেহের রক্তকণিকায়। এদিক ওদিক কোথাও খুনীদের দেখতে পেল না মা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
এতক্ষণে খোকাকে কাছে টেনে নিয়ে ডানা দিয়ে আদর করল মা-তিমি। মুখের যেখানটায় থাপ্পড় মেরেছিল সেখানে ডানা বুলাতে বুলাতে তিমির ভাষায় জিজ্ঞেস করল যেন, ‘মেরেছি বলে রাগ করেছো, বাপ?’
জবাবে মায়ের পেটে এক ঢুঁ মারল বাচ্চাটা।
উঁচু-মানের কিছু শব্দ-তরঙ্গ উত্তর দিকে ছুঁড়ে দিল মা-তিমি। দেখাদেখি খোকাও তাই করল। খুনী তিমিগুলোর দেহে প্রতিহত হয়ে প্রতিধ্বনি ফিরে এল ওদের প্রখর শ্রুতিতে। শব্দ তরঙ্গটা ভিন্ন জাতের। শব্দের পার্থক্য বুঝে নিল খোকা। মনে রাখল। সামান্যতম ভুল হলে চলবে না। টিকতে পারবে না এই কঠিন পৃথিবীতে।
বিচিত্র কিছু শব্দ করল মা-তিমি। খোকাকে যেন বলল, ‘ওগুলো খুনী তিমি। আমাদের যম! মনে থাকবে তো?’
‘থাকবে!’ ঘাড় নেড়ে সায় দিল যেন খোকা।
‘বলো তো কটা তিমি আছে ঝাঁকে?’
‘দশটা।’
‘হয়নি। আবার গুণে দেখো।’
আবার শব্দ তরঙ্গ ছুঁড়ল খোকা। ইতিমধ্যে আরও এগিয়ে গেছে খুনী তিমির দল। তবু বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘দশ নয় মা, এগারোটা।’
খুশি হলো মা-তিমি। তার শিক্ষা সার্থক হয়েছে। বলল, ‘মনে রাখবি, এই হলো আমাদের দুই নম্বর শত্রু!’
ডানা তিমির শত্রু মোট তিন জাতের। প্রথম দুটো ওদের নিজেরই প্রজাতির।একটা নারহোয়েল, সুযোগ মতো পেলে অনেক সময় আক্রমণ করে বসে। দ্বিতীয় শত্রুটা খুনী তিমি। ঝাঁক বেঁধে চলে। দলছুট কোন ডানা তিমিকে পেলেই আক্রমণ করে, অনেকটা বুনো কুকুরের মত। ছিঁড়ে-খুঁড়ে খেয়ে ফেলে। সময় মতো টের পেলে এই দুই জাতের শত্রুর হাত থেকে অনেক সময় পালিয়ে বাঁচতে পারে তিমি, রেহাই পেয়ে যায়। কিন্তু তৃতীয় শত্রুর খপ্পরে একবার পড়লে আর রেহাই নেই। মুহূর্তে প্রাণটা খোয়াতে হয়। সেই শত্রু হলো মানুষ, তিমি শিকারির দল।
বিপদে কি করে রক্ষা পেতে হয় এই তিন মাসেই খোকাকে সব শিখিয়েছে মা-তিমি, তিন নম্বর শত্রুর ব্যাপারটা বাদে। এই শত্রুকে কি করে ঠেকাতে হয়, নিজেরই জানা নেই তার, ছেলেকে শেখাবে কি?
আবার এগিয়ে চলল দুজনে।
