তিমির প্রেম – ৮
আট
ক্রিল-অঞ্চলে মেলা বসেছে যেন তিমিদের।
পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন রকমের তিমি এসে জুটেছে এখানে। ব্যাপার দেখে খোকা তো একেবারে তাজ্জব। এই বিশেষ জায়গাটা দক্ষিণ জর্জিয়ারও আরও দক্ষিণে। ক্রিল কোন বিশেষ একটা প্রাণী নয়, কয়েক ধরনের প্রাণীর সমষ্টিগত নাম। এর সিংহভাগটা হচ্ছে ইউফোরিয়া সুপার্বা। এ হলো তিমির ভাত। এর সঙ্গে তরকারির মতো আছে সাইক্লপস, টেরাপড়, মোলাসেস ইত্যাদি। ঝিল্লিমুখো বা বেলিন হোয়েলের একমাত্র খাদ্য ক্রিল, আর কিছু খেতে পারে না ওরা। ডানা তিমির এটা প্রধান খাদ্য, তবে একমাত্র নয়। আকালের সময় অন্য খাবারও খায়, যেমন হেরিং মাছ।
প্রায় সব সাগরেই কম বেশি ক্রিল থাকে। এরা থাকে সাগরের উপরিভাগে। তবে সব চেয়ে বেশি থাকে দক্ষিণ কিংবা উত্তর অঞ্চলের সাগরে, এত বেশি ক্রিল আর কোথাও পাওয়া যায় না। গ্রীষ্মকালে টনে টনে জন্মায় এরা ওখানে। এরও কারণ আছে। বছরের ওই সময়ে ওই এলাকায় ক্রিলের খাদ্য প্ল্যাংকটন পাওয়া যায় প্রচুর। দক্ষিণার্ধের গ্রীষ্মকালে অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে, যখন দক্ষিণ মেরুবলয়ের বরফ অনেকখানি গলে যায়, আর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই আকাশে সূর্য থাকে, তখন প্ল্যাংকটন আর ক্রিলের বংশ বৃদ্ধি ঘটতে থাকে অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে, খাবার জন্যে এসে ভিড় জমায় তিমির দেল।
কিছুদিন ধরেই খোকার মনে খটকাটা লেগে আছে। ওর মুখে ঝিল্লি গজাচ্ছে কেন? ভালই তো ছিল, এই অহেতুক আপদ আবার কেন? কিন্তু ও তো এখনও জানে না চিরকাল মায়ের দুধ খেয়ে কাটাতে পারবে না। তার আসল খাদ্য ক্রিল খেতে হলে এই ঝিল্লির একান্ত প্রয়োজন।
ছয় মাস হয়েছে খোকার বয়েস। ওর উপরের চোয়ালে দশ-বারো মিলিমিটার তফাতে গজানো ঝিল্লিগুলো এতদিনে প্রায় তিরিশ সেন্টিমিটার, মানে প্রায় ফুটখানেক লম্বা হয়েছে। আরও একটা ব্যাপার, প্রায় শ-খানেক খাঁজ আছে তার গলায়। তার মায়েরও আছে। আছে ডানা তিমিদের সবারই। ক্রিল অঞ্চলে এসে মা এবং অন্যান্য তিমিদের প্রতি কড়া নজর রেখেছে খোকা। ওদের কাণ্ড কারখানা দেখছে মনোযোগ দিয়ে। প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি। বিশাল হাঁ করে সামনের দিকে ধীরে ধীরে সাঁতরাচ্ছে বড়রা। অবাক হয়ে দেখেছে খোকা। এ কি কাণ্ডরে বাবা! ব্যাপারটা বুঝল মার খেয়ে। মায়ের কাছে দুধ খেতে গিয়ে জোর এক থাপ্পড় খেল। কি বুঝল সে-ই জানে। কিন্তু এর পরই মায়ের দেখাদেখি সে-ও হাঁ করে থেকে পানি কেটে চলল।
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই এই অদ্ভুত আচরণের কারণ পরিষ্কার হয়ে গেল খোকার কাছে। বুঝল কেন তার মুখে ঝিল্লি গজিয়েছে। গলায় অতগুলো খাঁজ থাকার কারণও আর অজানা রইল না তার কাছে।
হাঁ করে এগিয়ে যেতেই অনেকখানি পানি ঢুকে গেল খোকার মুখে। মায়ের দেখাদেখি মুখ বন্ধ করতেই ঝিল্লির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল পানি। মুখ গহ্বরে আটকে গেল অসংখ্য ক্রিল। জিভটা টাকরায় ছোঁয়াতেই…আরি, এ কি, এ তো দারুণ মজা। অদ্ভুত একটা স্বাদ! কোঁৎ করে ক্রিলগুলো গিলে নিল খোকা।
ক্রিলের স্বাদ পেয়েছে সে। এবার আর মাকে বলে দিতে হলো না। হাঁ করে পানি কেটে এগিয়ে চলল একটানা, কয়েক সেকেণ্ড পর পরই মুখ বন্ধ করে। আটকে যাওয়া ক্রিলগুলো খেয়ে নিয়ে আবার হাঁ করে। দিন নেই রাত নেই, যতক্ষণ জেগে আছে শুধু খেয়েই চলেছে ওরা।
ক্রিল অঞ্চলে এসে খোকা বেজায় খুশি। চল্লিশ অক্ষাংশের সেই নীলচে সবুজ উষ্ণ স্রোত অনেক পেছনে পড়ে আছে। বরফ ঠাণ্ডা সাগর এখানে। পানিতে ভাসছে প্রকাণ্ড বড় সব বরফের চাঙড়। পানির ওপরে আছে যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি ডুবে আছে। আরও অনেক পরিবর্তন লক্ষ করছে সে চারদিকে। সেই তারায় ভরা আকাশটা কোথায় হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে চাঁদের হাসি। সাগরের ওপর দিকটায় তো এমন নীরন্ধ্র অন্ধকার দেখেনি সে এর আগে! কিছুটা আলো থাকতই। চোখ ধাঁধানো রূপ নিয়ে সূর্য জ্বলছে না আর। এক চোখা দৈত্যের মত ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে চব্বিশ ঘণ্টাই দিগন্তের কাছে চুপ করে বসে থাকে এখন সে—শীত কাতুরে হয়ে পড়েছে যেন। বসে আছে তো আছেই সূর্য, একবারও দিগন্তের ওপারে ঘুমাতে যায় না। তাই বুঝি ওর এমন ঘুম ঘুম চেহারা। এই অবস্থাতেই একটানা চার-পাঁচ মাস ডিউটি দিতে হবে তাকে। তারপর ছুটি। আবার একটানা সাত-আট মাস ঘুমাবে।
দেখেটেখে খোকা তো তাজ্জব! মাঝরাতে সুর্য! এমন কথা শোনেনি সে কখনও! সে তো আর ভূগোলের ছাত্র নয়। জানে না মেরু অঞ্চলে এই-ই নিয়ম।
বরফের পাহাড়ে প্রতিফলিত হয়ে পিঠে এসে পড়া রোদটা যে আরামদায়ক, বোঝে খোকা। আশেপাশে নতুন নতুন পাখি আর জীবের সমাবেশ। এসব প্রাণী কখনও দেখেনি সে। এক জাতের পাখি দেখে এখানে, অ্যালবাট্রসের চেয়েও বড়, অথচ উড়তে পারে না। বিচিত্র থপ থপ শব্দ করে হেঁটে বেড়ায় বরফের ওপর। মানুষের ভাষা জানলে তাকে বলে দেয়া যেত ওগুলো পেঙ্গুইন। পেটটা সাদা, শরীরের তুলনায় অনেক খুদে দুটো কালো রঙের ডানা এই পাখির। নীল মাছগুলোকেও অবাক চোখে দেখে খোকা। সিন্ধুঘোটকও কম বিস্মিত করে না তাকে।
খায় আর অবাক হয়ে এসব দেখে খোকা। আরও একটা ব্যাপারে মনটা তার খুশি। এর আগে মা আর খালাকে ছাড়া অন্য কোন স্বজাতীয়কে দেখেনি সে। খালার কথাও তেমন মনে পড়ে না। সেই কোন শৈশবেই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু এখানে, অলিতে গলিতে, সাগর পথের বাঁকে বাঁকে তার নানা জাতভাই। কেউ কেউ এগিয়ে এসে ওর পিঠে ডানা বুলিয়ে আদর করে। যেন প্যারাম্বুলেটরে বসা ফুটফুটে বাচ্চাকে মায়ের সঙ্গে পার্কের চত্বরে দেখে এগিয়ে এসে গাল টিপে আদর করে দিচ্ছে মানুষ। খায় আর খুশিতে ধেই ধেই করে নাচে খোকা।
তার মায়ের অবস্থাটা কিন্তু বিপরীত। সে মোটেও খুশি নয়। একে তো অন্যান্য বারের মত এবার সঙ্গে স্বামী নেই। তাছাড়া তার মনে হচ্ছে এ বছর মেলাটা তেমন জমেনি। আগেকার দিনে গায়ে গায়ে-লাগা ভিড় হতো। এর লেজের ঝাপটা, ওর ডানার গুঁতো, সবার মুখেই সারাক্ষণ লেগে থাকত যেন সরি। অথচ এ বছর মেলাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। একটা হাম্পব্যাকও নজরে পড়ছে না। এ বছর আসেনি নাকি ওরা? নিঃশেষ হয়ে গেল? একেবারে ফুরিয়ে গেল হাম্পব্যাক? কেন? সেই তিন নম্বর শত্রুর অত্যাচারে নয় নীল তিমিও নেই এ বছর। অথচ মাত্র পাঁচ-সাত বছর আগেও ঝাঁকে ঝাঁকে আসত ওরা। কি প্রকাণ্ড তাদের দেহ। কি রাজকীয় চাল-চলন। স্বচ্ছন্দ গতি দেখলে বিশ্বাসই হতে চায় না অত বড় জীবটা অত হালকা ভাবে নড়াচড়া করতে পারে। দেখলেই সম্ভ্রমে মাথাটা নিচু হয়ে যেত মা তিমির। নিজের শৈশবে মায়ের সঙ্গে যখন ক্রিল অঞ্চলে আসত, মেলায় হাজারে হাজারে নীল তিমি দেখলে সসম্ভ্রমে সরে দাঁড়াত সে।
সাগর-বিজ্ঞানীদের প্রচারিত পত্রিকা পড়ে না মা-তিমি, তাই পরিসংখ্যানটা জানা নেই তার, কিন্তু বেশ বুঝতে পারে দিন দিনই শেষ হয়ে আসছে এই বৃহত্তর প্রজাতি। ব্লু, হাম্পব্যাক, রাইট তিমিরা তো বটেই ফিন-রাও কমে আসছে দ্রুত। এখন হত্যা-উৎসব চলছে স্পার্ম তিমিদের নিয়ে। পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে শুধু সাউথ জর্জিয়া দ্বীপের আশেপাশেই বছরে তিন-চার হাজার নীল তিমি হত্যা করা হতো। সেই অত্যাচারটা চলছে এখন স্পার্ম তিমিদের ওপর।
ক্রিল খায় আর সারাক্ষণ বাচ্চাটার দিকে নজর রাখে মা-তিমি। তার শুধু এক দুশ্চিন্তা, কখন হুড়মুড় করে এসে পড়ে মহাশত্রুর দল! আসবেই সে জানে। প্ৰতি বছরই নিয়মিত আসে। শুরু হয়ে যাবে তখন হত্যা উৎসব। আনন্দমেলা মুহূর্তে রক্তমেলায় রূপ নেবে। লালে লাল হয়ে যাবে বরফের বলয়ে আটকে পড়া সাগরের পানি। মহাশত্রুদের ফেলে দেয়া তিমির দেহাবশেষের পচা দুর্গন্ধে ভারি হয়ে উঠবে আবহাওয়া। এখনও এই ভয়ঙ্কর শত্রুকে চেনেনি খোকা। হাঙরকে চিনেছে, চিনেছে খুনী তিমিকে, কিন্তু জাত শত্রুগুলোকে চেনেনি এখনও। খোকাকে চিনিয়ে দিতে হবে, ভাবে মা। কিন্তু চিনিয়েই বা কি হবে? ওদের হাত থেকে আত্মরক্ষার উপায় তো তার নিজেরই জানা নেই।
বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। এসে গেল তারা তিমির ঝাঁকের মতই দলে দলে। দূর থেকেই দেখা গেল তাদের নিঃশ্বাসের কালো ধোঁয়া। হুঁশিয়ার হয়ে গেল তিমির দল।
এই সময় এক ব্যাপার ঘটল একদিন। একটা অতি প্রকাণ্ড স্বজাতীয়কে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে এলো খোকা। এত বড় তিমি জীবনে দেখেনি সে। এগিয়ে গেল মা-তিমি। দেখেই চিনল। এই তো, রাজা! প্রকাণ্ড এক মদ্দা নীল তিমি ।
সসম্ভ্রমে সরে গেল মা। অতি দ্রুত তার দিকে ছুটে আসছে নীল। কাছে এসেই থমকে গেল। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে লজ্জা পেল যেন।
মা-তিমি ডানা তিমি। নীল নয়।
বলি বলি করেও সঙ্কোচে প্রশ্নটা করতে পারল না মা-তিমি, ‘আপনি বুঝি একা?’
তাই হবে। কারণ এ বছর এই প্রথম এ অঞ্চলে নীল তিমি নজরে পড়ল মা- তিমির। সংখ্যাগণিতের হিসেবে বলে, সারা পৃথিবীতে মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার নীল তিমি অবশিষ্ট আছে আর। সেটা জানার কথা নয় মা-তিমির। মানুষের তাড়নায় এমন দলছুট হয়ে গেছে নীলেরা একে অপরের সন্ধান এখন পায় না বললেই চলে। স্বভাবতই বংশবিস্তারও কমে গেছে ওদের। হয়তো এই শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে ওরা, যেমন গেছে ডোডো পাখি, যেতে বসেছে কোয়ালা, পাণ্ডা, অপোসাম, প্ল্যাটিপাস।
মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে যায় মা তিমির। এই বিশাল ক্রিল অঞ্চলের মেলায় হাজার হাজার অন্য জাতের অপেক্ষাকৃত ছোট তিমির ভিড়ে ক্রমাগত শব্দ- তরঙ্গ ছেড়ে চলেছে নিঃসঙ্গ-সঞ্চারী বিশাল মদ্দা নীল তিমিটা, সাড়া দাও! সাড়া দাও! তুমি কি এসেছ?
বয়েস হয়েছে নীল তিমিটার। প্রৌঢ়। বহু মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছে নিশ্চয়। কে জানে, তার স্ত্রী-সন্তানেরা তারই চোখের সামনে হয়তো হারপুন-গানের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মরেছে। অমোঘ মৃত্যুকে নিতান্ত কপাল জোরেই এড়িয়ে বেঁচে আছে সে। তিমি-শিকারীর জাহাজকে অগ্রাহ্য করে সঙ্গিনী-লাভের আশায় এসে হাজির হয়েছে এই তিমি-মেলার মহাসঙ্গমে। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না একজনকেও।
উদাস বাউলের মত একতারা বাজিয়ে যেন ডেকেই চলেছে কেবল, সাড়া দাও! সাড়া দাও! সাড়া দাও!
.
প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ক্রিল উৎসব। মেলায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। শীত বাড়ছে একটু একটু করে। বড় হচ্ছে বরফের পাহাড়গুলো। বরফের বলয়ের মাঝে মাঝে জেগে থাকা সাগরের নীল নীল টুকরোগুলো শীতে গুটিয়ে আসছে। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আর একটিও থাকবে না। চিহ্নমাত্র থাকবে না নীলের। চারদিকে শুধু দেখা যাবে বরফ আর বরফ। ওই বরফের ফাঁদে আটকে পড়লে নির্ঘাত মৃত্যু। কাজেই রোজ তল্পিতল্পা গুটিয়ে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দিকে রওনা হয়ে যাচ্ছে কিছু না কিছু তিমি। ছয় মাসের জন্যে। পেট ভরা এখন সকলেরই, রাবারে সঞ্চিত আগামী দিনের খাবার।
মেলায় কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছে মা-তিমির। এই কয় মাস এক সঙ্গেই ঘোরাফেরা করেছে তারা। ক্রিল অঞ্চলের মহাভোজনে অংশীদার হয়েছে। এমন ভাবে ঝাঁক বাঁধাটা তিমির স্বভাব, এতে হাঙরের দল বা খুনী তিমির ঝাঁকের সঙ্গে মোকাবেলা করা সহজ।
নতুন একটা পরিবার এসেছে এ বছর মেলায়। স্বামী-স্ত্রী এবং একটি ছেলে। আরেকটা পরিবার এসেছে। একেবারে নব-দম্পতি। বাচ্চা হয়নি এখনও। দুনিয়া এখনও ওদের চোখে রঙিন। ওদের কাণ্ডকারখানা দেখে আর মনে মনে হাসে মা-তিমি। নিজের কথা মনে পড়ে যায়, পুরানো দিনের স্মৃতি। খোকার বাপের সঙ্গে এমন আদুরেপনাই করত সে।
মেলা ভাঙার মাসখানেক আগে ঘটল দুর্ঘটনা। মর্মান্তিক। সেই আজব জীবের কাণ্ড! কান ফাটানো বিস্ফোরণের পরই পেট উল্টে ভেসে রইল নতুন জোড়ার মেয়ে তিমিটা। এরপর থেকেই মনমরা হয়ে গেল মদ্দাটা। মা তিমির অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গেই তবু আছে সে, কিন্তু উদাস, নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই।
নরওয়েজিয়ান, রাশিয়ান, ডাচ আর জাপানী তিমি-শিকারীদের চার-চারটে দল এসে জুটেছে। এক এক দলে সাত-আটটা করে জাহাজ। ক্রমাগত তাড়া করে ফিরছে তিমিদের। এতদিনে খোকা ভালমতোই চিনেছে ওদের। বারে বারে চোখের ওপর মৃত্যুকে দেখেছে। বুঝেছে যে তিমিরা পেট আকাশপানে মেলে দিয়ে চিৎ হয়ে যায় তারা আর কোনদিন উপুড় হয় না। চিনেছে ওই ধাতব প্ৰতিধ্বনি, ভাসমান তিন নম্বরের গায়ে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসা শব্দ-তরঙ্গ। বুঝেছে, ওরা তিমিদের জাত দুশমন, মহাশত্ৰু।
মহাশত্রুদের বিরুদ্ধে কিছুই করার নেই, কিন্তু ওদের হাত থেকে আত্মরক্ষার কিছু উপায় খোকাকে শিখিয়েছে মা-তিমি। শ্বাস নেয়ার সময় মাথাটা পানির ওপরে তোলার আগে উঁচুমানের শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে বুঝে নিতে হবে কোনও ধাতব মহাশত্রু ধারে কাছে আছে কিনা।
‘যদি থাকে,’ মা-তিমি সাবধান করে, ‘তো খবরদার মাথা তুলবি না। ডুব- সাঁতারে এগিয়ে যাবি যতটা পারিস। তারপর আবার শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে বুঝে নিবি জীবগুলো আছে কিনা। যদি থাকে, তো এবারেও মাথা তুলবি না। যতই শ্বাসকষ্ট হোক। আরও সরে যাবি। নইলে আণ্টির অবস্থা হবে।’ নব-দম্পতির তিমিনীটার কথা মনে করিয়ে দিল মা।
আন্টির কি অবস্থা হয়েছে, মনে আছে খোকার। ভুলতে পারেনি। ওই দৃশ্য ভোলা যায় না। তাছাড়া বীভৎস মৃত্যুকে সেবারই প্রথম দেখল। ধাইমাকে মনে নেই, কিন্তু নতুন আন্টির কথা মনে আছে। মাত্র তো এই সেদিন ঘটল ঘটনাটা। তিমিনীটার সঙ্গে খুব ভাব হয়েছিল খোকার। আণ্টি ওকে ভালবাসত খুব। প্রায়ই মাকে ছেড়ে তার সঙ্গে এদিক ওদিক বেড়াতে যেত খোকা। সীলেদের পাড়ায়, পেঙ্গুইন কিংবা সিন্ধু-ঘোটকের এলাকায়ই যেত বেশি। মায়ের দুধ তো ছেড়ে দিয়েছে, তাই খালার সঙ্গে আরও দূরে যেতেও অসুবিধে হতো না। বেড়ানো শেষ হলে খালার সঙ্গে আবার ঠিক ফিরে আসত মায়ের কাছে।
তখন পুরো মরশুম চলছে তিমিদের। শুধু খাওয়া আর খাওয়া। পুরো মরশুম তিমি-শিকারিদেরও, কেবলই খুন আর খুন। দুটো মদ্দা, তিনটে মাদী আর দুটো বাচ্চার ঝাঁকটা চলছিল তখন দক্ষিণ শেটল্যাণ্ড দ্বীপের পুব দিক দিয়ে দক্ষিণমুখো, ওয়েডেল-সী বরাবর। ওদের অবস্থানটা প্রায় ৩০ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ, মেরুবলয়ের ওপর। সামনে মাইলের পর মাইল নিশ্ছিদ্র বরফের পাহাড়, যে বরফ গলে না সারা বছরে কখনও।
ঘটনার দিন। সন্ধ্যা হয় হয়। কমে এসেছে সূর্যের আলো। পানির তলা দিয়ে দক্ষিণমুখো এগিয়ে চলেছে সাতজনে। অনেকক্ষণ পানির তলায় থেকে থেকে বাতাসের প্রয়োজন অনুভব করছে সবাই। এবারে উঠতে হবে। কিন্তু তার আগে শব্দ-তরঙ্গ ছেড়ে দিয়ে দেখল, সর্বনাশ! খুব কাছেই একটা ধাতব জন্তু! আর ওঠা হলো না। মোড় নিয়ে পুবমুখো চলল ওরা। প্রায় মাইল তিনকে দূরে গিয়ে দলের নেতা বয়স্ক মদ্দা তিমি আবার শব্দ-তরঙ্গ ছাড়ল। বিপদ কাটেনি। এবারেও শিকারী জাহাজের খোলে প্রতিহত হয়ে ফিরে এলো শব্দ-তরঙ্গ। এখন উপায়? বাচ্চা দুটো আর পারছে না। তার চেয়েও কাহিল অবস্থা নব-পরিণীতার। কারণ ক্রিল অঞ্চলে এসে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে সে। সকলের বাধা নিষেধ অগ্রাহ্য করে ভেসে উঠল সে। তার ইচ্ছে টুক করে একবার দম নিয়েই আবার ডুব দেবে। কিন্তু সে সুযোগটুকুও বেচারি পেল না। পানি থেকে মাথা তুলতে না তুলতেই হারপুন গানের শব্দ হলো। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।
আণ্টির কাছ থেকে মাত্র কয়েক হাত পেছনে পানির নিচে থেকে ঘটনাটা পরিষ্কার দেখতে পেল খোকা। কি যেন একটা বিঁধে আছে খালার পিঠে। খোকা তিমির জানার কথা নয় ওটাই হারপুনের পেছন ভাগ। রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে তার আশপাশের পানি।
কয়েক সেকেণ্ড পরই একটা লম্বা সরু কি যেন এসে বিধল আন্টির পিঠে আরও কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই খালার দেহটা ফুলে-ফেঁপে ঢোল হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে কাত হয়ে গেল দেহটা, তারপর উল্টে গেল, পেটটা আকাশের দিকে। মারা গেছে। শুধু সে একাই নয়, পেটের বাচ্চাটাও মারা গেছে নিষ্ঠুর শিকারীর আক্রমণে। লাশটার ওপর অহেতুক পাক খাচ্ছে কয়েকটা সী-গাল। কিসের আকর্ষণে খোকা জানে না নতুন আন্টির দেহটা বিশাল ধাতব জন্তুটার দিকে ভেসে চলল।
বজ্রাহত, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল খোকা। আত্মস্থ হতেই নিজের দেহের যাতনা টের পেল। আর দম নেই তার। বুক ফেটে যেতে চাইছে। নাহ্, আর পারা যায় না।
মাথা তুলতে যাবে হঠাৎ প্রচণ্ড এক গুঁতো খেল পাঁজরে। নিচ থেকে ঘা মেরেছে মা-তিমি। এখন মাথা জাগালেই নির্ঘাত মৃত্যু। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল খোকা। কিন্তু মায়ের নির্দেশ পেয়ে গেছে। দম বন্ধ হয়ে মরে গেলেও এখন মাথা তোলা চলবে না। যত কষ্টই হোক। পানির আরও গভীরে তলিয়ে গেল ছয় জনের দলটা।
নিহত তিমিনীর স্বামী কিন্তু বৌয়ের পিছু পিছু ছোটেনি। বিবর্তন কিংবা প্রজাতিগত শিক্ষা যা-ই হোক, পঞ্চাশ বছর আগে ওরা যা করত এখন আর তা করে না। সে আমলে হারপুন বেঁধা সঙ্গিনীকে ফেলে কোন পুরুষ তিমিই পালাত না। বরং তিমি শিকারীর নৌকাকে পাল্টা আক্রমণ করে বসত। হারপুনের মাথায় তখন বিস্ফোরক লাগানোর কায়দা আবিষ্কার হয়নি, কাজেই তিমির সঙ্গে যুদ্ধটা হতো দীর্ঘস্থায়ী। শিকারীদের নৌকা টেনে নিয়ে চলত পিঠে হারপুন বেঁধা তিমিনী। মরণান্তিক যন্ত্রণা সহ্য করে ডুবিয়ে দিতে চাইত নৌকাটাকে। তার সঙ্গে সঙ্গে থাকত মদ্দাটা, একবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। মাঝে মাঝেই এগিয়ে এসে লেজের ঝাপটায় নৌকা উল্টে দেয়ার চেষ্টা করত। অবশ্য বিশেষ সুবিধে করতে পারত না। বরং লাভ হতো শিকারীদের। মাদীটাকে হারপুনে গাঁথতে পারলেই মদ্দাটাকেও কাছে পেয়ে যেত ওরা।
ইদানীং আর অমন করে না মদ্দা তিমি। বাধ্য হয়ে। কারণ এখন তিমির সঙ্গে মানুষের লড়াইটা খুব ক্ষণস্থায়ী। হারপুন গান লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেই কেবল তিমি বাঁচবে, নইলে তাৎক্ষণিক মৃত্যু। তিমিরা তাই আর তিমিনীর জন্যে প্রাণ দিতে ছুটে আসে না। অবশ্যম্ভাবীকে মেনে নিয়ে বরং তলিয়ে যায় গভীর পানিতে।
মরশুম শেষ। আর এখানে থাকা উচিত না। যে কোন সময় বরফের বেড়াজালে আটকে যেতে পারে। মাইলের পর মাইল শুধু বরফের ঢেলা ভাসছে পানিতে। নাক তুলে শ্বাস নেয়ারও জায়গা পাওয়া যাবে না আর দিন কয়েক পর, বরফের জন্যে। তলা দিয়ে সাঁতরে যে সরে যাবে তারও উপায় থাকবে না। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত হয়ে যাবে বরফ। এক ডুবে অতটা যাওয়ার ক্ষমতা নেই তিমির। কাজেই চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
বেশির ভাগ তিমিই চলে গেছে যার যার অভ্যস্ত অঞ্চলে। বাপ-মা-ছেলে তিনজনের পরিবারটা এসেছে প্রশান্ত মহাসাগরের দিক থেকে। শীতকালটা ঈস্টার দ্বীপের কাছাকাছি কাটায় ওরা। বিদায় নিয়ে একদিন চলে গেল ওরাও। নব- দম্পতির বাসা ছিল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে। মাদীটা তো মরেই গেল, মদ্দাটা ভাঙা মন নিয়ে কোথায় যাবে কে জানে।
একে একে চলে গেল সবাই। এখন আছে শুধু মা-তিমি, খোকা আর তরুণ মদ্দাটা। এবারে তাদেরও যেতে হবে।
একটা কথা মা আর মদ্দা তিমি গত কদিন ধরেই ভাবছে। ব্যাপারটা হলে খুব খারাপ হয় না। কিন্তু খোকার সামনে বলতে লজ্জা পাচ্ছে দুজনেই। লজ্জার মাথা খেয়ে মা-তিমি শেষে জিজ্ঞেসই করে ফেলল, ‘তুমি কোন দিকে যাবে? একাই তো যেতে হবে তোমাকে?’
‘একা কেন?’ সাহস সঞ্চয় করল মদ্দাটাও, ‘তোমরাও এসো না আমার সঙ্গে? আমার ওদিকটা বেশ নিরাপদ। হেরিংও পাওয়া যায় যথেষ্ট।’
যা বোঝার ঠিকই বুঝল মা-তিমি। না বোঝার কিছু নেই। নিঃসঙ্গ দুজনেই। অতীতকে আঁকড়ে থেকে লাভ নেই। যে হারে নিঃশেষ হয়ে আসছে ওরা তাতে ভাবালুতা সাজে না। জীব-রক্ষার প্রয়োজনে প্রকতিই দশ কোটি বছরের সংস্কারগুলো থেকে একটু একটু করে মুক্তি দিচ্ছে ওদের, সুযোগটা নেবে না কেন ওরা?
এসবের কিছুই বোঝেনি খোকা। বোঝার কথাও নয়। এখনও সে নেহায়েত বাচ্চা। বোঝার বয়েস হতে অনেক দেরি।
