তিমির প্রেম – ৯
নয়
বেশ কয়েক বছর পর।
খোকা আর এখন সেই ছোট্টটি নেই। রীতিমতো তাগড়া জোয়ান। আকারে পঞ্চান্ন ফুট, ওজন পঁচাত্তর টনের কাছাকাছি। বিবাহিত। তিমি সমাজে এক বিশ্ব রেকর্ড করে বসে আছে সে। গোলার্ধ বদল করেছে। আগে যা কোন তিমি কখনও করত না।
কখনও গোলার্ধ বদল করে না ঝিল্লি মুখোরা। দক্ষিণ গোলার্ধের তিমিরা উত্তর গোলার্ধে আসে না, কিংবা উত্তর গোলার্ধের ওরা যায় না দক্ষিণে। তাই বলে বিষুবরেখা যে অতিক্রম করে না তা নয়। তবে গ্রীষ্মকালীন খাদ্য সংগ্রহের এলাকাটা ঝিল্লিমুখোর কাছে অপরিবর্তনীয়। উত্তর মেরু অঞ্চলে ক্রিল খাবার সময় হলো এপ্রিল থেকে জুলাই, আর দক্ষিণ মেরুতে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। ফলে যেখানেই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, মায়ের পিছু পিছু গিয়ে জীবনের শুরুতে যে অঞ্চলে ক্রিল খাওয়া শুরু করেছে, প্রতিটি গ্রীষ্মকাল সেখানেই ফিরে ফিরে যাবে। ক্বচিৎ কখনও কেউ বিষুব রেখা অতিক্রম করলেও গ্রীষ্মকালে তার জীবন ছন্দের সূত্রে বাঁধা নির্দিষ্ট মেরুর ক্রিল অঞ্চলে সে ফিরে আসতে বাধ্য। অথচ এই তরুণ নায়ক এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম। যতই দিন যাবে, তিমি সমাজে এই ব্যতিক্রম বাড়বে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম অলক্ষ্যে থেকে কাজ করছে, এই নিয়ম এড়ানোর সাধ্য নেই কোন জীবের। চিরন্তন তিমি সমাজের নিয়মাবলী একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছে। বেঁচে থাকার তাগিদেই করছে ওরা এসব।
জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর মায়ের সঙ্গে দক্ষিণ আটলান্টিকে ঘোরাফেরা করেছে খোকা। নতুন স্বামীকে নিয়ে ঘর বেঁধেছে তখন মা-তিমি। যৌবনে পা দিয়েই ঘর ছেড়ে নিজের ভাগ্য নির্ধারণে বেরিয়ে পড়ল খোকা। কয়েকটি তরুণ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ওই এলাকাতেই ঘোরাফেরা করল দিন কয়েক, তারপর সরে যেতে থাকল দূর থেকে দূরে। একবার তো একটা দলের সঙ্গে নিউজিল্যাণ্ড আর অস্ট্রেলিয়ার মাঝের তাসমান সাগরেও কাটিয়ে এসেছে একটা মরশুম। এই সময়ে অনেক তরুণী তিমির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার। তাদের মধ্যে গায়ে পড়া স্বভাবের অনেকেই ছিল, কিন্তু একজনকেও পছন্দ হয়নি খোকার। বন্ধুত্ব হয়েছে ভাব হয়েছে, পাশাপাশি সাঁতার কেটেছে, খেলেছে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। তিমির প্রেম বলতে যা বোঝায় তা হয়নি।
পনেরো বছর বয়েসে জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতা প্রচুর হয়েছে খোকার। দেখেছে টাইফুনের বিধ্বংসী রূপ। সাগরের ওপর ভয়ঙ্কর ঝড়ের মাতামাতি, অথচ তলায় কোন অস্থিরতা নেই। একেবারে শান্ত। জলস্তম্ভ দেখেছে সে। দূর থেকে। প্রচণ্ড শক্তি ওগুলোর! খোকার অতবড় দেহটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। কোনমতে সেটা থেকে মুক্তি পেয়ে ভয়ে পানির তলায় গিয়ে লুকিয়েছিল খোকা। মিনিট পনেরো পরে শ্বাস নিতে উঠে তো তাজ্জব! সাগর একেবারে শান্ত। একটু আগের উদ্দামতার কোন চিহ্নই নেই আর।
বিচিত্র ধাতব জন্তুকেও ডুবে যেতে দেখেছে খোকা। রক্ত মাংসে গড়া নয় জন্তুটা, ধাতব শব্দের তরঙ্গ প্রতিহত করে। জলচর জীব, অথচ ডুবসাঁতার দিতে জানে না, এ কেমন কথা! সারাক্ষণ পেটটাকে আকাশের দিকে মেলে দিয়ে তরতরিয়ে ছুটতে থাকে। ওই জন্তুটা কি খায়, জানা নেই খোকার। তবে তার ধারণা ওই ভয়ঙ্কর বিশাল জীবটা তিমি খেতেই অভ্যস্ত। জন্তুটা শ্বাস ফেলে অনেকটা ওদেরই মতো। তিমিরা শ্বাস ফেলার সময় পানির ফোয়ারা ওঠে আর ওই আজব জীবটার বেরোয় কালো ধোঁয়া। পরিষ্কার আকাশটাকে কালোই করে ফেলে। বিচ্ছিরি! মা বলেছিল ওর নাম মহাশত্রু। ব্যাটাদের দুচোখে দেখতে পারে না খোকা।
একদিন ওই ভয়ঙ্কর জীবের একটাকে মরতে দেখল খোকা। যত বড় ক্ষমতাশালীই হোক, মরার সময় সবাই একরকম অসহায়। মরে গিয়ে সোজা সাগরে ডুবে গেল মহাশত্রু ব্যাটা। মরা শত্রুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওটার পিছু পিছু অনেকখানি নেমে গিয়েছিল খোকা। ওর নিচে নামার মধ্যে সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু মরা জন্তুটার নেই। দ্রুত নেমে গেল ওটা অন্ধকার সাগর-গভীরে। ওখানে কি আছে জানে না খোকা। জানার বহু চেষ্টা করেছে, কিন্তু নামতেই পারে না। অত নিচে পানির ভয়াবহ চাপ সহ্য করার উপযোগী নয় তার শরীর
দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠছে ক্রিল অঞ্চলের বাৎসরিক মেলাটা। কিন্তু বাধ্য হয়েই প্রতি বছর ওখানে যেতে হয়। অনেক স্বজাতীয়ের দেখা পায়, কিন্তু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর মায়ের দেখা আর কোনদিন পায়নি খোকা। কে জানে সে এখনও বেঁচে আছে কিনা! হয়তো তাকে মেরে ফেলেছে মহাশত্রুরা।
প্রাণ ধারণের তাগিদেই স্বজাতীয়দের সঙ্গে ক্রিল খেতে আসতে হয় খোকাকে। কিন্তু আর বুঝি পারা যায় না। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মহাশত্রুদের অত্যাচারে। দিন দিন বেড়েই চলেছে ওদের নিষ্ঠুরতা। ইদানীং নতুন এক জাতের পাখির আবির্ভাব হচ্ছে ক্রিল অঞ্চলে। মহাশত্রুগুলোর মতোই এরাও ধাতব। এই জাতের পাখি সাগরের ওপরের আকাশে আরও দেখেছে সে, কিন্তু মেলায় আবির্ভূত পাখিগুলো একটু অন্যরকম। অ্যালবাট্রেসের মতো বাতাসে ভেসে চলে ওরা কিন্তু ডানা নাড়ে না। প্রচণ্ড শব্দ করে, আর পিঠের ওপরে কি যেন একটা ঘোরে বনবন করে। খোকার সবচেয়ে অবাক লাগে, পাখিগুলোকে আকাশের যে কোন জায়গায় একেবারে স্থির হয়ে ভেসে থাকতে পারে দেখে। এদের অত্যাচার পানির মহাশত্রুর চেয়ে অনেক বেশি। কি করে যেন টের পায় ওরা কোথায় শ্বাস ফেলতে মাথা তুলবে তিমি। জায়গামতো ঠিক হাজির থাকে। চুপি চুপি শ্বাস ফেলতে উঠে যেই ফোয়ারা ছুঁড়বে তিমি, অমনি দ্দিড়িম! রক্তের তুবড়ি ছুটবে নিহত তিমির গা থেকে, মরে যাবে চোখের পলকে। নাহ্, ক্রিল খাওয়া বুঝি ছেড়েই দিতে হবে এবার! কিন্তু তাহলে বাঁচবে কি খেয়ে?
