তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে – ৭
৭
একটু আগে চাঁদ উঠেছে। আলো এখনো স্পষ্ট হয় নি। স্বপ্ন স্বপ্ন আলো। নবনী এবং শাহেদ হাঁটছে। নবনী তার অভ্যাসমতো মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। পায়ের নিচে চকচকে সাদা বালি। নবনীর মনে হচ্ছে চিনির দানার উপর দিয়ে হাঁটছে। খানিকটা বালি এনে জিভে ছোঁয়ালে মিষ্টি লাগবে। নবনী নিচু হয়ে কিছু বালি হাতে নিল। শাহেদ বলল, ‘কী করছ?’
‘কিছু করছি না। বালি নিয়ে খেলছি। তুমি হাতে নিয়ে দেখ কী ঝকঝকে বালি! হাত পাত, তোমার হাতে কিছু বালি দিয়ে দি।’
শাহেদ বলল, ‘শ্রাবণীর মধ্যে তো আছেই, তোমার মধ্যেও অনেক ছেলেমানুষি আছে।’
নবনী বলল, ‘আমাদের সবার মধ্যেই আছে। তোমারও আছে।’
‘থাকলেও চাপা পড়ে আছে। পাথর চাপা।’
‘পাথরটা সরিয়ে ফেল। তারপর আমার সঙ্গে কিছু ছেলেমানুষি কর।
শাহেদ হাসতে হাসতে বলল, ‘কী করতে বলছ?’
তোমার যা করতে ইচ্ছা হয় কর। জুতা খুলে ফেলে চল আমরা ঐ চরে চলে যাই। মাঝখানে পানি খুব অল্প। হাঁটু-পানিও না।’
‘চল যাই।’
তারা চরে গিয়ে উঠল। চরের বালি আরো পরিষ্কার। ঝকঝক করছে। নবনী বলল, ‘তোমার কাছে কি মনে হচ্ছে না সাদা চাদর বিছানো?’
‘আমার কাছে বালি বিছানো বলেই মনে হচ্ছে। ছেলেরা বাই নেচার প্রাকটিক্যাল ধরনের হয়। কল্পনাবিলাস ছেলেদের এমনিতে কম। আমার আরো কম। আমি হলাম ব্যবসায়ী মানুষ।
‘ব্যবসায়ী মানুষের কল্পনাশক্তি থাকে না?
‘খুব কম থাকে। তুমি একজন কবি-সাহিত্যিকের নাম বলতে পারবে না যে ব্যবসায়ী। চরের বালি দেখে আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে এই বালি নিয়ে বিক্রি করা যায় কিনা।
‘কেন বাজে রসিকতা করছ? এস বসি।’
‘তোমার সুন্দর শাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে না?’
‘হোক নষ্ট।’
তারা পাশাপাশি বসল। নবনী হালকা গলায় বলল, ‘তুমি হঠাৎ চলে আসায় আমি যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছি তা কোনোদিন তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার ছুটিটাই অন্য রকম হয়ে গেছে।’
‘তোমার ভাবভঙ্গি দেখে আমি অবশ্যি কিছু বুঝতে পারি নি। শ্রাবণী বরং অনেক হৈচৈ করেছে।’
‘আমি শ্রাবণীর মতো না। আনন্দিত হলেও চুপ করে থাকি। কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকি।’
‘গাছের মতো?’
‘হ্যাঁ, গাছের মতো। নিজের আনন্দ বা দুঃখের কোনো কথাই কাউকে জানাতে ইচ্ছা করে না।’
শাহেদ সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে বলল, ‘একজন কেউ বোধহয় থাকা দরকার যাকে সব কথা বলা যায়।’
‘হয়তো দরকার। আমি ঠিক করেছি কি জান? আমি সারা জীবনে শুধু এক জন মানুষ রাখব যাকে সবকিছু বলব। কখনো দ্বিতীয় কেউ থাকবে না।’
‘সেই ভাগ্যবান এক জনটি কি আমি?’
নবনী ছোট করে নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘এখনো ঠিক জানি না।’
‘এখনো জানি না মানে!’
‘সত্যি জানি না।’
‘যে ছেলেটিকে তুমি দুদিন পর বিয়ে করতে যাচ্ছ তাকে তুমি সব কথা বলতে পারবে না?’
‘হয়তো পারব। কিন্তু আমি এখনো জানি না। স্বামী হলেই তাকে সব কথা বলা যায় তা তো না। বেশিরভাগ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিন্তু অনেক দূরত্ব থাকে। আমার বাবা-মাকে দিয়েই দেখি—তাঁরা দীর্ঘদিন পাশাপাশি বাস করছেন। রাতের পর রাত একই খাটে ঘুমাচ্ছেন। বাবার অসুখ হলে মা রাত জেগে সেবা করছেন। কিন্তু কী ভয়ঙ্কর দূরত্ব তাঁদের মধ্যে! আমার ধারণা, মা সারা জীবন এমন কাউকে পান নি যাকে সব কথা বলতে পারেন, আবার বাবাও হয়তো কাউকে পান নি যাকে সব বলতে পারেন।’
‘তাঁদের হয়তো দরকার নেই।’
‘হ্যাঁ, তাও হতে পারে। তাদের হয়তো প্রয়োজন নেই কিন্তু আমার আছে। আমি একজন কাউকে আমার সব কথা বলতে চাই।’
শাহেদ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, ‘আমাকে বিবেচনার মধ্যে রাখতে পার। তোমার সব গোপন কথা শুনতে হলে কী সব গুণাগুণ থাকতে হবে তা অবশ্যি জানি না।’
‘তুমি আমার কথাগুলি খুব হালকাভাবে নিচ্ছ।’
‘হালকাভাবে নিচ্ছি না নবনী। আমি খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছি। তোমাকে আমি ঠিক বুঝতে পারি না।’
‘বুঝতে না পারার মতো কী করলাম?’
‘অনেক কিছুই তুমি কর। তুমি আমাকে কনফিউজ করতে চাও।’
‘একটা উদাহরণ দাও!’
‘থাক, উদাহরণ দিতে চাচ্ছি না।’
নবনী বলল, ‘তোমার কিছু মনে পড়ছে না বলে উদাহরণ দিতে পারছ না। মনে পড়লে নিশ্চয়ই দিতে।
শাহেদ বলল, ‘মনে পড়লেও দিতাম না। উদাহরণ দেয়া মানে ঝগড়া করা। এখানে আমি ঝগড়া করতে চাই না। আমি অন্য কিছু চাই।’
নবনী ক্ষীণ গলায় বলল, ‘কী চাও?’
তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই তুমি বলেছিলে, আমি যা চাব তাই পাব।’
নবনী বলল, ‘চল উঠা যাক। আমাদের নিতে আসছে।
‘কে নিতে আসছে?’
‘রহমত ভাই আসছে— ঐ দেখ।’
নবনী উঠে দাঁড়াল। রহমত লম্বা লম্বা পা ফেলে এদিকেই আসছে। শাহেদ বলল, ‘ওকে চলে যেতে বল। আমার বসে থাকতে ভালো লাগছে। বসি আরো কিছুক্ষণ।’
নবনী বলল, ‘আমার বসে থাকতে ভালো লাগছে না। শীত লাগছে।’
শাহেদ বলল, ‘মনে হচ্ছে হঠাৎ তুমি আমার উপর রেগে গেছ। তোমাকে রাগানোর মতো কিছু কি করেছি?’
নবনী জবাব দিল না। ডাকবাংলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল। পেছনে পেছনে শাহেদ আসছে। চাঁদের আলো এখন আরো পরিষ্কার হয়েছে। অস্পষ্ট ছায়া ছায়া ভাব দূর হয়েছে।
.
ঘরে ঢুকে নবনী দেখল জাহানারা শোবার ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছেন। তাঁর মাথার চুলে বিলি করে দিচ্ছে মিলু বুয়া। নবনী বলল, ‘কী হয়েছে?’ জাহানারা বললেন, ‘মাথা কেমন জানি করছে। তোরা খেয়ে নে। আমি উঠতে পারব না।’
‘বেশি খারাপ লাগছে, মা?’
জাহানারা জবাব দিলেন না। নবনী বলল, ‘ডাক্তারকে খবর দিতে বলব?’
জাহানারা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘কাউকে খবর দিতে হবে না। তুই যা।’
নবনী বের হয়ে এল। জাহানারা মিলুকে দরজা বন্ধ করে দিতে বললেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল।
রাতে শ্রাবণীও কিছু খেল না। তার নাকি গলা ব্যথা করছে। খাবার টেবিলে জামিল সাহেবও গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। নবনী বলল, ‘তোমারও কি শরীর খারাপ লাগছে বাবা?’
‘না, আমার শরীর ঠিকই আছে। তোর মাকে নিয়ে সমস্যা। রাতে ঘুমায় না। জেগে বসে থাকে। কাল রাত তিনটার সময়ে উঠে দেখি সে ডাইনিং হলে বসে আছে। উলের কি যেন বানাচ্ছে। আমি বললাম, কী বানাচ্ছ? সে বলল, কিছু না।’
নবনী বলল, ‘নতুন জায়গায় মার ঘুম আসে না।’
জামিল সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, ‘নতুন জায়গা পুরাতন জায়গা কিছু না—কোনো জায়গাতেই তার ঘুম আসে না। বাড়িতেও তো ঘুমায় না।’
শাহেদ বলল, ‘ভালো কোনো ডাক্তার-টাক্তার দেখানো দরকার মনে হয়।’
জামিল সাহেব বললেন, ‘ভালো ডাক্তারের তো অভাব নেই। প্রচুর আছে। দেশে আছে। বিদেশে আছে। দেখাতে না চাইলে কীভাবে কী করব! ছুটি কাটাতে এসে যদি এমন অসুখ-বিসুখের যন্ত্রণায় পড়ি তাহলে ভালো লাগে? রান্না ছাড়াও তো এই পৃথিবীতে আরো কাজকর্ম আছে!’
নবনী বলল, ‘বাবা, তুমি বেশি রেগে যাচ্ছ।’
‘আমি খুব কম রেগেছি, মা, খুবই কম। আমি সবাইকে সবার মতো থাকতে দেই। কারোর ছুটি নষ্ট করতে চাই না। আমার থিওরি হল—বেড়াতে এসেছি। বেড়াতে এসে যে যেভাবে আনন্দ পেতে চায়—পাক। তোর মা রান্নাঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে চাচ্ছে— থাক। শ্রাবণী একবার রাত তিনটার সময় একা একা নদীর পাড়ে গেল। আমি রাগ করেছি, কিন্তু কিছুই বলি নি। এখন শুনলাম সে একটা মই জোগাড় করেছে— ছাদে উঠবে। ছাদ এমন কী জিনিস যে মই এনে উঠতে হবে?’
নবনী হেসে ফেলল। মেয়ের হাসিমুখ দেখে জামিল সাহেবও কিছুক্ষণের মধ্যে হেসে ফেললেন। শাহেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পারিবারিক অনেক সমস্যা তোমার সামনেই আলাপ করলাম। তোমাকে পরিবারের এক জন ধরি বলেই তা করেছি। আমি আমার সমস্যা বলে বেড়াই না। ইচ্ছাও করে না। সময়ও নেই।’
শাহেদ প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বলল, ‘এত জায়গা থাকতে আপনি এখানে ছুটি কাটাতে কেন এসেছেন, চাচা?’
‘যুবক বয়সে একবার এখানে এসেছিলাম। পাখি শিকারের জন্যে এসেছিলাম। এই ডাকবাংলোয় ছিলাম। এখান থেকে দশ মাইল দূরে ‘মাহিন্দার জলা’ নামে একটা বিলের মতো আছে। সেখানে পাখি শিকারের জন্যে গিয়েছিলাম। অদ্ভুত দৃশ্য! আবারো সেই দৃশ্য দেখার জন্যেই এসেছি। দৃশ্য কি দেখব—যন্ত্রণায়-যন্ত্রণায় অস্থির!’
‘এবারো কি পাখি শিকারে যাবেন?’
‘পাগল হয়েছ। মন্ত্রী হয়ে পাখি শিকারে গেলে উপায় আছে? সব পত্রিকায় ফ্রন্ট পেজে ছবি চলে যাবে। তবে তোমরা যাও, দেখে আস। পাখি শিকারের দরকার নেই। ব্যাপার কি দেখে আস। থানার একটা স্পিডবোট আছে। নষ্ট ছিল। ঠিক করেছে। কাল ভোরে তোমাদের নিয়ে যাবে।’
‘আপনি যাবেন না?’
‘না, আমি যাব না। আমি সঙ্গে থাকলে তোমরা মন খুলে হৈচৈও করতে পারবে না। তাছাড়া এদিকে আমার কিছু কাজও আছে।’
শাহেদ বলল, ‘বেড়াতে এসেছেন, এখন আবার কাজ কি? আপনিও চলুন। সবাই মিলে হৈচৈ করে আসি।’
জামিল সাহেবের খাওয়া হয়ে গেছে। তিনি হাত ধুতে ধতে বললেন, ‘আমি যেতাম। পাখি দেখার জন্যেই এসেছি। কিন্তু এখন যদি যাই—আমাকে একা যেতে হবে। নবনীর মাকে সঙ্গে নেয়া যাবে না। এই ভাবে যাওয়া যায় না।
শাহেদ বলল, ‘আমরা উনাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করব।’
‘পারবে না। পৃথিবীর সব কাজ পারবে। এই কাজটা পারবে না। আমার অ্যাডভাইস হচ্ছে—চেষ্টা করতেও যেও না। তার মেজাজ এখন আকাশে উঠে আছে। চেষ্টা করতে যাবে, সে একটা বিশ্রী কাণ্ড করবে। আমি চাই না এখন একটা বিশ্রী কাণ্ড হোক। নবনী!
‘জ্বি বাবা।’
‘তোর মাকে কিছু খাওয়াতে পারিস কিনা দেখ। সে দুপুরেও কিছু খায় নি।
.
জাহানারার ঘরের দরজা বন্ধ। তিনি দরজা খুললেন না। ভেতর থেকে মিলু বলল, ‘আফা, আপনেরে চইল্যা যাইতে বলছে।’ নবনী বলল, ‘ঠাণ্ডা পানি এনেছি মা। দরজা খোল। পানিটা রেখে যাই।’ জাহানারা কঠিন গলায় বললেন, ‘পানি লাগবে না। তুই ঘুমাতে যা।’
.
নবনী ঘুমাতে এল অনেক রাতে। বারটা পার করে। শ্রাবণী জেগে আছে। গভীর মনোযোগে বই পড়ছে। গল্পের বই না, পাঠ্যবই। সব গল্পের বই সুটকেসে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে পাঠ্যবইয়ের পালা। নবনী বলল, ‘এখনো জেগে আছিস! তোর না গলাব্যথা?’
শ্রাবণী বলল, ‘শুধু গলাব্যথা না আপা। জ্বর এসেছে। কপালে হাত দিয়ে দেখ।’
নবনী কপালে হাত দিল। আসলেই জ্বর। বেশ জ্বর। নবনী বলল, ‘তুই এই জ্বর নিয়ে দিব্যি পড়াশোনা করে যাচ্ছিস?’
‘হুঁ। আমি কোনো কিছুকেই পাত্তা দেই না। তাছাড়া আমার হচ্ছে ভালুক জ্বর। এই আছে এই নেই। তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করে যখন বিছানায় শুতে যাব তখন দেখবে জ্বর নেই।’
‘তুই কি কিছু খাবি? খিদে লেগেছে?’
‘না। তেঁতুলের আচার খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। সেটা তো এখানে পাওয়া যাবে না। কাল চেয়ারম্যান চাচাকে বলব।’
নবনী খাটে বসতে বসতে বলল, ‘তুই খুব সুখে আছিস।’
শ্রাবণী বলল, ‘হ্যাঁ সুখে আছি। আমাকে কেউ অসুখী করতে পারবে না। আমাকে অসুখী করা খুব কঠিন। তুমি আমার মতো না। তোমাকে এক সেকেন্ডে অসুখী করা যায়।’
‘চুপ কর তো। আয়, ঘুমাতে আয়।’
শ্রাবণী বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে গেল। বোনকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আজ আমরা খানিকক্ষণ গল্প করব। কেমন আপা?’
‘আচ্ছা। গল্প কর, আমি শুনি।’
‘শাহেদ ভাই আসায় ভালোই হয়েছে। তোমার সঙ্গে আমি খানিকক্ষণ গল্প করার সুযোগ পাচ্ছি।’
‘এমনিতে বুঝি আমার সঙ্গে গল্প করার সুযোগ পাস না?’
‘উঁহু, পাই না। রাতে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করার অন্যরকম আনন্দ। আচ্ছা আপা, আজ নাকি তুমি ঐ মাস্টার সাহেবের খোঁজে গিয়েছিলে?’
‘কে বলল?’
‘আমি অনুমান করছি। চেয়ারম্যান চাচা বললেন, তুমি বটগাছের কাছে গিয়েছিলে। সেখান থেকে ধারণা করলাম, তুমি নিশ্চয়ই ইংরেজির অধ্যাপকের সন্ধানে গিয়েছ।’
‘আমি গাছটাই দেখতে গিয়েছিলাম—কারো সন্ধানে যাই নি।
‘রেগে যাচ্ছ কেন, আপা? সাধারণ কথা বলছি—তুমি রেগে যাচ্ছ। ঐ ভদ্রলোক সম্পর্কে তোমার এক ধরনের কৌতূহল আছে বলেই আবারো তুমি বটগাছটার কাছে গিয়েছ। তুমি মনে মনে আশা করছিলে যে বটগাছের কাছে ঐ ভদ্রলোকের দেখা পেয়ে যাবে।’
‘আমি এমন কিছুই ভাবি নি। তুই কি মনের ডাক্তার হয়ে গেছিস?’
শ্রাবণী হালকা গলায় বলল, ‘আমাদের সমস্যা কি জান আপা? আমরা বেশিরভাগ সময়ই জানি না আমরা কী চাই। যেটা চাই বলে মনে হয় আসলে সেটা চাই না। তুমি তীব্রভাবে শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গ কামনা করছ। এটা এক ধরনের ভ্রান্তিও হতে পারে। হয়তো তুমি অন্য কিছু চাচ্ছ—বুঝতে পারছ না।’
নবনী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এইসব কথা তুই কোন উপন্যাস থেকে বলছিস?’
শ্রাবণী খিলখিল করে হেসে ফেলল। নবনী বলল, ‘হাসি বন্ধ কর। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে।’
শ্রাবণী আরো শব্দ করে হেসে উঠল। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, ‘তোমার রাগ আমি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছি। এই যে শাহেদ ভাইয়ের কথাই ধর। শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, কৃতী এবং সুপুরুষ একজন মানুষ। নিজের উপর তাঁর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। তাঁর ধারণা, নিজেকে তিনি ভালো করেই জানেন। আসলে কিন্তু জানেন না।’
‘তার মানে কি?’
‘আমার ধারণা—তোমার চেয়ে আমি—আমি শ্রাবণী চৌধুরী তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চট করে রেগে যেও না আপা—প্রমাণ দিচ্ছি। আমি এই শীতের মধ্যে তাকে কুয়োর পানিতে গোসল করতে বললাম, তিনি যথারীতি গোসল করে ঠাণ্ডা বাধালেন। আমি বললাম, শাহেদ ভাই কুয়োতলায় চা খেতে খুব ভালো লাগে। উনি রেগুলার সেখানে চা খাওয়া শুরু করলেন। বিকেলে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলছিলাম। তুমি চুপচাপ একা বসে ছিলে। তিনি তোমাকে ফেলে আমার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেই আনন্দ পাচ্ছিলেন। খেলাটা তাঁর কাছে জরুরি ছিল না। আমার সঙ্গটা অনেক জরুরি ছিল। এই যে তিনি সব কাজকর্ম ফেলে এখানে ছুটে এলেন তার পেছনে তোমার যতটা ভূমিকা, আমার ধারণা—আমার নিজের ভূমিকা অনেক বেশি।’
নবনী বলল, ‘তোর জ্বর অনেক বেড়েছে। তুই অসুস্থ মেয়ের মতো কথা বলছিস। এসব সুস্থ কোনো মেয়ের কথা না। এসব হল বিকারগ্রস্ত মেয়ের কথা। সমস্যা শাহেদের না, সমস্যা তোর।’
শ্রাবণী হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘আমার কোনোই সমস্যা নেই, আপা। আমার সমস্যা থাকলে এত সহজে এইসব কথা তোমাকে বলতে পারতাম না। সমস্যা কোথায় আমি তোমাকে ধরিয়ে দিলাম। আমি যা বলছি তা যে জ্বরের ঘোরে অসুস্থ হয়ে বলছি তাও কিন্তু না। আমি যা বলেছি তা প্রমাণ করে দিতে পারব।’
‘কীভাবে?’
কাল আমাদের তিনজনের পাখি শিকারে যাবার কথা। শেষ মুহূর্তে আমি বলব, ‘যাব না। তখন দেখবে শাহেদ ভাই বলবেন, থাক, বাদ দাও। যাওয়া বাতিল হয়ে যাবে।
নবনী ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘তুই এমন সব অদ্ভুত কথা বলছিস কেন রে শ্রাবণী? তোর কী হয়েছে?’
‘আমার কিছুই হয় নি, আপা। যা সত্যি আমি তাই বলছি।’
‘যা সত্যি তা তুই বলছিস না। দিনরাত গল্পের বই পড়ে পড়ে তোর মাথা অন্য রকম হয়ে গেছে। তুই বানিয়ে বানিয়ে প্রচুর মিথ্যা কথা বলছিস। এখানে কোনো ইংরেজ মহিলার কবর নেই। তুই আমাকে বললি, কবর আছে—আমি খোঁজ নিলাম ….
নবনী থেমে গেল। আর কথা বলা অর্থহীন। শ্রাবণী ঘুমিয়ে পড়েছে।
