Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    তৃতীয় পুরুষ – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প359 Mins Read0

    ০৫. কাজলের মনের মধ্যে একটা বিচিত্র অস্থিরতা

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    কাজলের মনের মধ্যে একটা বিচিত্র অস্থিরতা ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছিল।

    কিছুই করা হইতেছে না, অথচ অমোঘ গতিতে সময় কাটিয়া যাইতেছে। এক-একদিন বিছানায় শুইয়া অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করিবার পবেও ঘুম আসে না। বালিশে কান পাতিলে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ ধ্বক ধ্বক করিয়া জানাইয়া দেয়—সময চলিয়া যাইতেছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা আর কোলাহলের ভিতর সে নিজের মুখোমুখি হইবার সুযোগ পায় না, কিন্তু রাত্রিবেলা দিনের সমস্ত কাজ ফুরাইয়া আসিলে নৈশ স্তব্ধতার একান্ত মুহূর্তগুলিতে তাহার মনে হয় জীবনে অনেক কিছু করিবার আছে, জীবন-মৃত্যু-অস্তিত্বের যে কুয়াশাচ্ছন্ন উত্তরহীন প্রশ্নের জগৎ—সেখানে আগ্রহের মশাল জ্বালিয়া ভ্রমণের প্রয়োজন আছে। দেরি হইয়া যাইতেছে, অথচ কীভাবে অগ্রসর হইতে হয় তাহা সে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে না।

    একদিন কলেজের এক বন্ধুর কথায় তাহার মনে খুব আঘাত লাগিল।

    প্রাণতোষ ছেলেটাকে কাজলের কোনোদিনই বিশেষ পছন্দ হইত না। এক ধরনের মানুষ আছে যাহারা পৃথিবীর সবকিছুর বিরোধিতা করিযা আনন্দ পায়। প্রাণতোষ সেই ধরনের লোক। সে সোচ্চারে নিজের মত জাহির করিয়া থাকে, তাহার মতামত কাহাকেও আঘাত কবিতেছে কিনা সে বিষয়ে তাহার কোনো পরোয়া নাই। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মহাপুরুষত্ব সম্বন্ধে সে অকাতরে সন্দেহ প্রকাশ করে, সবার যে বিষয়ে স্বাভাবিক শ্রদ্ধা আছে সে বিষয়ে তীক্ষ কটু কথা বলিয়া সে চমক সৃষ্টি করিয়া থাকে। প্রতিষ্ঠিত সমস্ত ধ্যানধারণাকে ভালোমন্দ নির্বিশেষে সে আঘাত করিতে উদ্যত, অনেকেই তাহাকে বীর ও সংস্কারক বলিয়া ভুল করে, কাজেই অপ্রিয়বাদী প্রাণতোষেরও একটি ভক্তের দল ছিল।

    অফ পিরিয়ডে কাজল একদিন কমন রুমে বসিয়া বই পড়িতেছে, এমন সময় কোথা হইতে প্রাণতোষ আসিয়া উপস্থিত। এককোণে কাজলকে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া সে প্রশ্ন করিল—কী অমিতাভ, ক্লাস নেই?

    বই হইতে মুখ তুলিয়া কাজল বলিল—না, এস.বি. আজ আসেন নি–

    -কী পড়ছে ওখানা? ক্লাসের বই?

    কাজল প্রাণতোষকে বিলক্ষণ চেনে, কিন্তু মিথ্যা বলিয়াও লাভ নাই—সে হয়তো এখনই বইখানা দেখিতে চাহিবে। একটু ইতস্তত করিয়া সে বলিল–না, ক্লাসের বই নয়। বিংহ্যাম মাচু-পিছু আবিষ্কার করার পর যে প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেটা পড়ছি।

    প্রাণতোষ মুখের একটা বিচিত্র ভঙ্গি করিয়া বলিল—মাচু-পিচ্চু আবার কী?

    –স্প্যানিয়ার্ডদের তাড়া খেয়ে ইকারা পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছিল জানো তো? সেই যে-কর্টেজ আর পিজারোর ব্যাপার। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। আন্ডিজের গোলকধাঁধার মধ্যে কোথায় তারা নতুন করে বসতি স্থাপন করেছিল এতদিন তা জানা ছিল না। বিংহ্যাম সাহেব এই শতাব্দীর প্রথম দিকে ইনকাদের সেই গোপন শহর খুঁজে বার করেন, সেই হল মাচু-পিছু।

    প্রাণতোষ তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল–তোমার খালি ওইসব পড়া! আরে কোথায় কোন সাহেব কী আবিষ্কার করেছে তা জেনে কী হবে বলতে পারো? আমাদের দেশেও তো পণ্ডিত রয়েছে, তাদের আবিষ্কারের মূল্য কী কম?

    কাজল অবাক হইয়া বলিল—সে কথা কে বলেছে? তুমি কী বলতে চাও?

    -তোমাকে সব সময় বিদেশী বইপত্র পড়তে দেখি। এটা একরকমের স্বজাতিবিরোধ।

    কাজল রাগ করিতে গিয়াও হাসিয়া ফেলিল বলিল—প্রাণতোষ, আসলে তুমি তর্ক করতে ভালোবাসা, নইলে এক সামান্য কাবণে এত গুরুতর অভিযোগ করতে না

    কাজলের হাসি দেখিয়া প্রাণতোষ চটিয়াছিল, তাছাড়া নিজেকে সে কঠোর যুক্তিবাদী মনে করিয়া থাকে। কাজেই সে রূঢ়স্বরে বলিল—আমি যে অর্থে কথাটা বলেছি তুমি ধরতে পারোনি। আসলে পরাধীন থেকে থেকে আমাদের ভেতরে সাহেবদের সবকিছু দেখে মুগ্ধ হবার একটা প্রবণতা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। সাহেবদের বই ভালো, গবেষণা উঁচুদরের, তাদের পোশাক আশাক ভালো—আর আমাদের সমস্তই ফাঁকি–

    —ইংরেজি বই পড়লে কী তাই প্রমাণিত হয়?

    —সবসময় ইংরেজি বই পড়লে তাই মানে দাঁড়ায বটে। বাংলায় কী ভালো বই লেখা হয়নি? এটা দাসত্বসুলভ মনোভাবের প্রকাশ।

    এবার কাজলও চটিল, সে বলিল—দেশের সাহিত্যের কথা বলছো? আমি তো দু-বকমই পড়ি। তুমি কী কী পড়েছো?

    প্রাণতোষ থতমত খাইয়া গেল।

    কাজল আবার বলিল—কৃষ্ণচরিত্র পড়েছ? প্রভাতবাবুর গল্প আর উপন্যাস? রবি ঠাকুরের কী পড়া আছে?

    প্রাণতোষ জেদের গলায় বলিল—-রবীন্দ্রনাথ আমি অনেক পড়েছি–

    -ওরকম বললে হবে না। আমি এঁদের বই প্রায় সবই বহুবার করে পড়েছি। কাজেই আমার অন্য বইও পড়বার অধিকার আছে।

    কমনরুমে দুই-একজন করিয়া ছেলের ভিড় বাড়িতেছিল। তাহাদের মধ্যে প্রাণতোষের ভক্তরা কেহ কেহ রহিয়াছে। গরম আরহাওয়ার আভাস পাইয়া তাহারা অন্যদিকে তাকাইয়া থাকিবার ভান করিয়া তর্ক শুনিতে লাগিল। ভক্তদলের সামনে অপদস্থ হইবার আশঙ্কায় প্রাণতোষ মরীয়া হইয়া উঠিল। সে বলিল—কেবল বই পড়ার জন্যই বলছি না, তোমার রুচির মধ্যে একটা escapism আছে, সেটা মানো তো?

    কাজল বই মুড়িয়া রাখিয়া বলিল—কী রকম?

    –মানুষের জীবনটা গোলাপফুল দিয়ে বানানো শয্যা নয়, এখানে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। সেই বাস্তবের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তুমি সারাদিন নক্ষত্রজগৎ আর পামীরের মালভূমি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করো—এটা এসকেপিজম নয়?

    –কিন্তু এই বিশ্বের সবটাই তো ফিজিক্যালি বাস্তব, কাজেই তা নিয়ে ভাবনাচিন্তায় দোষ কোথায়?

    প্রাণতোষ ব্যঙ্গের হাসি হাসিয়া বলিল—তুমি বুঝবে না। যাদের কঠোর পরিশ্রম করে উদরাম্নের সংস্থান করতে হয় তাদের কাছে ডাল-ভাতের জগৎটা অনেক বেশি বাস্তব। মহাশূন্যে কখানা নক্ষত্র জন্মালে কী মরলল, কিংবা আফ্রিকার জঙ্গলে কী কী প্রাণী পাওয়া যায় এসব খবরে তাদের প্রয়োজন নেই–

    এখানে কাজল রাগের মাথায় একটা ভুল করিল, সে বলিল–দেখ প্রাণতোষ, বাস্তব জিনিসটার অনেক aspect আছে। অ্যাবসলিউট বাস্তব বলে তো কিছু হয় না। প্রতিদিনের ডালভাত-চচ্চড়ি খাওয়ার সাধারণ জীবনটা যেমন বাস্তব, তেমনি এই বিশাল জগতের দূরতম কোণে যা ঘটছে তাও আমার কাছে বাস্তব। তা নিয়ে চর্চায় কোনো অন্যায় আছে বলে মনে করি না–

    প্রাণতোষ বলিল—আমি ঠিক সেই কথাটাই বলতে চাচ্ছি, তুমি আমার কথাটাই বললে। ওই জগৎটা তোমার কাছে বাস্তব, কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি সাধাবণ মানুষের কাছে নিতান্ত অলীক। হয়েছে কী অমিতাভ, আমি একথা বলছি বলে রাগ কোরো না—সত্যের খাতিরে বলতেই হচ্ছে— ইউ হ্যাভ বীন বর্ন উইথ এ সিলভার স্পুন ইন মাউথ! কালকের খাবার কোথা থেকে আসবে এ চিন্তায় তোমাকে ছটফট করতে হয় না—কাজেই তোমার পক্ষে রঙিন কল্পনায় বিভোর থাকতে অসুবিধে নেই। তুমি হচ্ছ গিয়ে প্রিভিলেজড় শ্রেণীর লোক। তাছাড়া যেসব লোকের বই পড়ে পুলকিত হচ্ছে তাদের মতো কিছু করে দেখাতে পারলেও বুঝতাম। তাও তুমি পারবে না, কারণ প্রিভিলেজড় জীবনযাপন করে ইউ হ্যাভ গন সফ্‌ট্‌—

    কাজলকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া প্রাণহোষের ভক্তেব দল ধরিয়া লইল কাজল তর্কযুদ্ধে হারিয়া গিয়াছে। তাহারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া কাছে আসিয়া বসিল।

    এ ধরনের আলোচনার উপর কাজল বিশেষ গুরুত্ব দিয়া থাকে। সারাদিন ধরিয়া তাহার মন বিষণ্ণ হইয়া রহিল। প্রাণতোষ কিছুটা তর্কের জন্যই তর্ক করিয়াছে, তাহার যুক্তিগুলি বেশিব ভাগই নড়বড়ে এবং তাহার ভিতর আক্রমণের ইচ্ছাই সুস্পষ্ট—তবু প্রাণতোষের কথার মধ্যে কিছু সাববত্তা আছে তাহা সে অনুভব করিতে পারিল। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন সম্বন্ধে প্রাণতোষ যাহা বলিয়াছে তাহা শোনা কথা মাত্র, দারিদ্র এবং সংগ্রাম কাহাকে বলে প্রাণতোষ তাহার কী জানে? তাহার বাবা এই কলিকাতা শহরে প্রথম যৌবনে কী ভয়ানক দারিদ্রের সহিত সংগ্রাম করিয়াছে। কোনোদিন খাইযাছে, কোনোদিন খাইতে পায় নাই। থাকিবার জায়গা ছিল না, পড়িবার খরচ ছিল না—তাহা সত্ত্বেও বাবা সুদূরের স্বপ্ন দেখিয়াছে, লেখক হইয়া উঠিয়াছে। আর প্রাণতোষ, ক্রিমিনাল কোর্টের বিখ্যাত উকিলের ছেলে—পাঞ্জাবি আর পাম্পশু পায়ে কলেজে আসিয়া কথায় কথায় সিগারেট খায়-শখের মানবদরদ দিয়া সে কী বুঝিবে সংগ্রাম কাহাকে বলে? কাজল বুঝিল সমস্ত তর্কটা প্রাণতোষের বুদ্ধির ব্যায়াম মাত্র। কিন্তু সংগ্রামের সহিত সুন্দরের সাধনায় যে কোনো বিরোধ নাই এ বিষয়ে তাহার বাবার উদাহরণটা সময়মতো মনে আসিল না। অবশ্য প্রাণতোষ নিশ্চয় একটা ভয়ানক উল্টা যুক্তি দেখাইত। ভালোই হইয়াছে বাবার কথাটা মাথায় আসে নাই। প্রাণতোষকে বিশ্বাস নাই, হয়তো একটা খারাপ কথা বলিয়া ফেলিত। বাবার সম্বন্ধে কোনো অসম্মানজনক কথা সে সহ্য করিতে পারিত না।

    কিন্তু গত কয়েকদিন হইতে জীবনের সার্থকতার বিষয়ে সে নিজে যাহা ভাবিতেছে, বা প্রভাত পিকনিকের আগের দিন রাত্রে তাহাকে যে কথা বলিয়াছিল, প্রাণতোষ ঠিক সেখানে আর একবার আঘাত করিল। সে কেবলমাত্র বই পড়িতেছে আর স্বপ্ন দেখিতেছে। ইংরাজিতে যাহাকে আমচেয়ার ট্রাভেলার বলে সে তাহাতেই পরিণত হইতে চলিয়াছে নাকি? সে কী সত্যই গন সফট?

    কথাটা একেবারে অস্বীকার করা যায় না। তাহার বাবা প্রায় এই বয়েসে জীবনের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে নামিয়া পড়িয়াছে—কোথায় কোথায় ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আর সে? সে স্তুপাকাব বইপত্র পড়িয়া অর্থহীন ইনফরমেশনের বোঝা মাথায় লইয়া ঘুরিতেছে। শুনিতে যতই খারাপ লাগুক, প্রাণতোষের কথা একেবারে যুক্তিহীন নহে।

    কিন্তু সে যে জীবনের গভীর রহস্যানুভূতির দিকটা একেবারে উড়াইয়া দিতে পারে না। বর্তমান পৃথিবীটা যাহাদের আত্মত্যাগ এবং মহৎ ক্রিয়াকলাপের উপর দাঁড়াইয়া আছে, তাহাদের জীবনী পড়িতে তাহার ভালো লাগে। দূর সমুদ্রের বুকে চাদের আলো পড়িয়া যে স্বপ্নরাজ্যের জন্ম দেয়, নীল আকাশের বুকে উড়ন্ত দুগ্ধধবল শঙ্খচিলের কর্কশ ডাকে সে রাজ্যের আহ্বান তাহার মনের দরজায় আসিয়া কড়া নাড়ে। তাহার ঘুমের মধ্যে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর দৌড়াইয়া পাব হয় জিরাফের দল, নিম্পাদপ পেয়ারিতে আরক্ষ তৃণের গুচ্ছ কাপে নির্জন দ্বিপ্রহর ব্যাপিয়া বহমান বায়ুপ্রবাহে, আঙ্গাভা উপসাগবে ভাসমান হিমশৈলের উপর বিশ্রাম করে চিকনদেহ সীলমাছের ঝাক। আরও কত কী! এই মুহূর্তেই হয়তো ছায়াপথের অপর প্রান্তে দুইটি নক্ষত্রে সংঘর্ষ হইতেছে, কোনো অজানা গ্রহে অঙ্কুরিত হইতেছে নতুন প্রাণ। প্রাণতোষ যাহাই বলুক—এই অকারণ স্বপ্নদর্শিতাই— যাহা ডাল-ভাতের জীবনে কোনো কাজে আসে না—মানুষের সভ্যতাকে যুগে যুগে অগ্রসর হইতে সাহায্য করিয়াছে।

    সেদিন সকালে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া কাজলের মনে হইল—আজ দিনটা বেশ ভালো কাটিবে। কেন একথা মনে হইল তাহা সে বলিতে পারে না। কিন্তু বাড়ির সামনের নিমগাছে প্রভাতেব স্নিগ্ধ রৌদ্র, বাতাসের ঝরঝরে তাজা ভাব আর ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের বাহিরে অবস্থিত একটা বহস্যময় অনুভূতি তাহাকে জানাইয়া দিল—আজ একটি বিশেষ দিন। এগারোটায় জরুরি ক্লাস আছে বলিয়া আজ তাহাকে নটার মধ্যে বাহির হইতে হইবে। স্নান করিতে ঢুকিয়া আপনমনে সে তাহার প্রিয় একটি গান গাহিতেছিল—আজি দক্ষিণপবনে দোলা লাগিল মনে। সে লক্ষ করিয়া দেখিয়াছে, সকালবেলা কোনো একটা গানের সুর মনে আসিলে এবং কয়েকবার গুনগুন করিলে সারাদিন সেটি মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আজও তাহাই হইল, ট্রেনে যাইতে যাইতে, কলেজে ক্লাসের ভিতর এবং কমনরুমে সে সারাদিন ধরিয়া গানটা গাহিল। কমনরুমে পাশে বসিয়া প্রভাত গ্রিস ল সম্বন্ধে ভাষাতত্ত্বের নোট লিখিতেছিল, গান শুনিয়া সে আড়চোখে কাজলের দিকে তাকাইয়া অনুচ্চস্বরে বলিল–ব্যাপার কী?

    গান থামাইয়া কাজল বলিল—কিসের কী ব্যাপার?

    –খুশি যে আর ধরে না! গুনগুন গান চলেছে! একবার ঝেড়ে কাশা দেখি

    —কী যা তা বলছো! এমনিই সকাল থেকে সুরটা—খুশির কী দেখলে?

    প্রভাত সব বুঝি গোছের মুখভাব করিয়া বলিল–দেখ ভাই, আলল, ধূপের গন্ধ, প্রেম আর বাছুরের শিং-এ যদি ভেতরে থাকে তো ফুটে বেরুবেই। এ জিনিস গোপন করে রাখা যায় না—

    কাজল রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া বসিয়া রহিল। প্রভাত হাসিতে হাসিতে আবার ভাষাতত্ত্বের নোট লেখা শুরু করিল।

    কিন্তু সকালের অহেতুক আনন্দ যে প্রতিশ্রুতি বহন করিয়া আনিয়াছিল, সন্ধ্যা অবধি তাহা বাস্তবে রূপায়িত হইবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরিয়া কাজল ভাবিল যাই, একটু আড্ডা দিয়ে আসি। শিবদাস-অভয় ওদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না–

    নাইটস্কুল উঠিয়া গিয়াছে। দাবার আসর বসিতে দেরি হইতেছিল, তাছাড়া বিদ্যালয়ের বালকেরা আলস্যবশত দুরে না গিয়া বারান্দার ধারেই যথেচ্ছ প্রাকৃতিক আহ্বানে সাড়া দিত। ফলে স্থানটিতে যে আরহাওয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহাকে ঠিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিমণ্ডল বলা যায়। রামযদু সরকার নিতান্ত বিরক্ত হইয়া একদিন জানাইয়া দিলেন—যথেষ্ট হইয়াছে, আর নয়। এবার তাহারা স্কুলের জন্য অন্য স্থান দেখিয়া লইতে পারে। ছেলেদের উৎসাহও কমিয়া আসিয়াছিল। কাজেই কয়েকমাস চলিবার পর স্কুল উঠিয়া গেল।

    শহরের ঘিঞ্জি বসতি ছাড়াইয়া যে পথটি নদীর দিকে চলিয়া গেল, তাহারই ধারে একটি সুপ্রাচীন বটগাছ আছে। গাছটির বয়েস কম করিয়া শ-দেড়েক বছর হইবে, অনেকখানি জায়গা ঝুরি নামিয়া অধিকার করিয়া রহিয়াছে। সন্ধ্যার পর কোনো কোনো দিন এইখানে কাজল এবং তাহার বন্ধুদের আসর বসে। গলা ছাড়িয়া গান গাহিবার বা কবিতা আবৃত্তি করিবার পক্ষে এমন জায়গা আর নাই। লুকাইয়া ধূমপান করিবার জন্যও আদর্শ জায়গা বটে।

    পড়ার টেবিলে বই এবং খাতা পত্র রাখিয়া কাজল আডিডায় যাইবার জন্য বাড়ির বাহির হইতেছে, এমন সময় হৈমন্তী ডাকিয়া বলিল–কী রে, খাবার খেয়ে যাবিনে? এই তো এলি, আবার কোথায় বেরুচ্ছিস?

    —এই একটু কাছেই যাবো। দরকার আছে। দেরি হবে না, ফিরে এসে পড়তে বসবো। তুমি বরং এ ঘরটায় একটু ধুনো দিয়ে রেখো, বড্ড মশা কামড়ায়–

    —খেয়ে যাবিনে? হালুয়া করে রেখেছি, খাবি?

    —রাত্তিরে খাবোখন, বুটির সঙ্গে দিয়ো। এখন খিদে নেই—

    কী মনে পড়ায় হৈমন্তী বলিল—ভালো কথা, তোর একটা চিঠি এসেছে আজ দুপুরে। পড়ার টেবিলে টেবিলক্লথের তলায় চাপা দিয়ে রেখেছি। দেখিস

    —কার চিঠি মা?

    —তা কী জানি! খামের চিঠি-বন্ধুবান্ধব কারও হবে—

    হৈমন্তী চলিয়া গেলে কাজল আবার নিজের ঘরে ফিরিয়া আসিল। তাহাকে কে চিঠি লিখিয়াছে? ছুটির সময় কলেজের বন্ধুবা পুরী, দার্জিলিং বা বৈদ্যনাথ ধাম বেড়াইতে গেলে সেখান হইতে চিঠি লেখে বটে, কিন্তু এখন তো কলেজ পুরাদমে চলিতেছে। চিঠি লিখিবার মতো পরিচিত অন্য কাহারও কথা তাহার মনে আসিল না।

    টেবিলক্লথের নিচে হইতে চিঠি বাহির হইল। আকাশী নীল রঙের খাম, ছয় পয়সার ডাকটিকিট আঁটা। খামের উপর ইংরাজিতে তাহার নাম ও ঠিকানা লেখা আছে। কিন্তু হস্তাক্ষর পবিচিত নহে।

    খাম খুলিতেই পালা এযাব মেলের কাগজে লেখা দুই-তিন পৃষ্ঠার চিঠি। পাতা উল্টাইযা চিঠির শেষে কাহার নাম রহিয়াছে দেখিতে গিয়া কাজল অবাক হইয়া গেল। এ কাহার নাম? সে ঠিক দেখিতেছে তো?

    অপালা তাহাকে চিঠি লিখিয়াছে!

    উঃ, ভাগ্যিস মা চিঠিটা খুলিয়া পড়ে নাই! মায়ের সহিত তাহার সম্পর্কের কোনো আড়াল গড়িয়া ওঠে নাই, অপরের চিঠি পড়িবাব ভদ্রসমাজে যে একটা নিষেধ আছে তাহা এখানে খাটে না। অনেক সময়েই তাহার ফিরিতে দেরি হইলে হৈমন্তী অসংকোচে তাহার চিঠি খুলিয়া পড়িয়া ফেলে। অবশ্য অপালা কী লিখিয়াছে সে জানে না, হয়তো হৈমন্তী এ চিঠি পড়িলে এমন কিছু আসে-যায় না—তবু কেমন একটা সংকোচের বোধ তাহাকে চাপিয়া ধরিল।

    কাজলের আর বন্ধুদের সহিত গল্প করিতে যাইবার উৎসাহ ছিল না। অন্যদিন এইসময়ে বাড়ি থাকিতে হইলে সে হাঁপাইয়া ওঠে। আজ মনে হইল—আবার কে এখন বাহির হয়! রোজ রোজ আচ্ছা ভালো লাগে না। বরং বাড়িতে বসিয়া বার্কের কনসিলিয়েশন স্পীচটা শেষ করিয়া ফেলা যাইবে।

    পড়ার টেবিলে বসিয়া কাজল চিঠির ভাজ খুলিল, তারপর কী ভাবিয়া উঠিয়া গিয়া দরজাটা সন্তর্পণে বন্ধ করিয়া ছিটকিনি তুলিয়া দিল।

    চিঠি পড়িতে শুরু করার সময়ে কাজলের মনে হইল একমিনিট আগে অবধি তাহার জীবন যেরকম ছিল, এই চিঠি পড়ার পর আর তাহা থাকিবে না—একেবারে বদল হইয়া যাইবে। কিছুদিন আগে পড়া কোন্ এক ইংরাজি উপন্যাসের নায়ক যেন বলনাচের আসরে পঞ্চদশী মেয়রের কন্যাকে দেখিয়া ভাবিয়াছিল-Life will never be the same again! ঠিক তেমন।

    অপালা লিখিয়াছে :

    শ্রদ্ধাস্পদেষু,

    আপনি হয়তো ভেবেছিলেন আমি এমনি ঝোকের মাথায় ঠিকানা নিয়েছি, কিন্তু কোনোদিনই চিঠি লিখবো না। প্রথম কারও সঙ্গে পরিচয় হলে অনেকেই আগ্রহ করে ঠিকানা নেয়, যোগাযোগ রাখার সদিচ্ছা সত্যিই থাকে, কিন্তু সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য পরিচয়ের স্মৃতি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে, চিঠি লেখা আর হয়ে ওঠে না। আমার ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। ছোটবেলা থেকে মাতৃভাষার চর্চায় বঞ্চিত থাকার পর এখন নতুন উৎসাহে আমি প্রচুর বাংলা চিঠি লিখে থাকি। আমার হাতের লেখাটা বিশেষ খারাপ নয়, বলুন? আর আমার বয়েসী মেয়ের আপনার বয়েসী ছেলেকে চিঠি লেখার বিষয়ে বাঙালি সমাজে যে একটা নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটাও আমার ক্ষেত্রে খাটে না তা তো আপনাকে সেদিন বলেইছি—কারণ আমি বাঙালি সমাজ বলতে যা বোঝায় তার ভেতরে মানুষ হইনি। একদিক দিয়ে তাতে আমার উপকারই হয়েছে। মাঝে-মধ্যে ছুটিতে যখন বাংলাদেশে যাই, দেখি বাংলার মেয়েরা নানান অকারণ এবং অসহ্য সামাজিক নিয়মের বাঁধনে আধমরা হয়ে বাঁধা পড়ে আছে। তাদের মনের প্রসার নেই, চোখে দীপ্তি নেই—দেখলে এত খারাপ লাগে যে কী বলবো! তাদের দোষ নেই, শত শত বছরের সংস্কার এবং নিষেধের বাধা কাটিয়ে ওঠা দারুণ শক্তিমানের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না, তারা হঠাৎ কী করে পেরে উঠবে? এইসব মেয়েদের জন্য বড়ো কষ্ট হয়, পৃথিবীটা যে আসলে কত বড়ো, কত সুন্দর তা ওরা জানতেই পারলো না।

    গতবার ছুটিতে বাড়ি এসে বর্ধমান জেলার এক অজ পাড়াগায়ে বাবার দূর-সম্পর্কের এক পিসিমার কাছে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। ভারি সরল মেয়েটি, এমনিতে লেখাপড়া কিছু জানে না, কিন্তু স্বভাবে একটা সহজাত বুদ্ধির ছাপ আছে। তার মধ্যে ভদ্রতা, সেবা আর অতিথিপরায়ণতা যা দেখেছি তাতে অবাক হতে হয়েছে, শহরের অনেক তথাকথিত বড়োলোকের মেয়ের মধ্যে তেমন থাকে না। এই মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল—আচ্ছা দিদি, পাহাড় কেমন দেখতে? আমি অনেকক্ষণ ধরে তাকে বুঝিয়েছিলাম পাহাড় দেখতে কেমন, পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সকালবেলা সূর্যোদয় দেখতে কেমন লাগে। আরও কত গল্প করেছিলাম। মেয়েটা বলেছিল—আমার খুব ইচ্ছে করে কোথাও বেড়াতে যাই, কিন্তু কে নিয়ে যাবে বলো? এই তো সামনের বছরই বোধহয় আমার বিয়ে হয়ে যাবে, বাবা খুব চেষ্টা করছেন। তারপর সারাজীবন ভাত রান্না, কাপড়কাঁচা ছেলে মানুষ করা—আর কোনোদিন বেরুতে পারব না–

    আমার এত মায়া হল! ওকে কথা দিয়ে এসেছি এবার যখন ছুটিতে যাবো, তখন ওকে দু-এক মাসের জন্য আমার সঙ্গে নিয়ে আসবো। যদি অবশ্য ততদিনে ওর বিয়ে না হয়ে যায়। কিন্তু এ তো গেল একটা মেয়ের কথা, বাংলাদেশে এমন হতভাগ্য মেয়ে হাজার হাজার আছে। তাদের কী হবে? সবাইকে তো আমি বেড়াতে নিয়ে আসতে পারবো না?

    তাই একদিক দিয়ে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী বলে মনে হয়।

    আপনাকে চিঠি লেখার আর একটা কারণ–আপনার বাবার বইগুলি আমি পড়তে শুরু করেছি। কেমন লাগছে জানতে চাইবেন নিশ্চয়। শুধু একটা কথাই বলি, তার থেকে যতটা পারেন বুঝে নেবেন। কথাটা এই-—কেবলমাত্র অপূর্বকুমার রায়ের বই পড়বার জন্যই আমার বাংলা শেখা উচিত ছিল। একটু একটু করে পড়ছি, আর দেখছি উনি যেন ঠিক আমার মনের কথাটি বলছেন। গ্রামের শান্ত, সুন্দর পরিবেশ-বাঁশবন, পাখির ডাক, সজনের ফুল—আবার তার সঙ্গে মায়ের মায়ের ভালোবাসা দিয়ে মাখা নিম্পাপ শৈশব, মাঠের ওপারে নীল দিগন্তের দিকে তাকিয়ে সুদূরের কল্পনায় মগ্ন হয়ে যাওয়া—এসব কথা এত সহজভাবে আর কে বলতে পেরেছেন? আপনার বাবার লেখা ভালো লেগেছে—এটা আপনাকে জানানো দরকার ছিল।

    ছোটবেলায় বাবা একবার আমাকে স্টিভেনসনের দু-তিনখানা বই কিনে দিয়েছিলেন। ট্রেজার আইল্যান্ড পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেন কী অপার মুক্তির সন্ধান এনে দিল বইখানা! নীল সমুদ্র, নির্জন দ্বীপ, পালতোলা জাহাজে করে দুঃসাহসিক অভিযান-রাত্তিরে তো লং জন সিলভারকে কদিন স্বপ্নই দেখে ফেললাম। পৃথিবীটা ছোট নয়, শুধু আমার পরিবার, দেশ বা এই গ্রহটা নিয়ে বিশ্ব গঠিত নয়—কোটি কোটি নক্ষত্র আর নীহারিকা দিয়ে তৈরি এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের যে রূপ, তার আরছা আভাস সেই বয়েসেই যেন দূর থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। তারপর এতদিন কত মানুষের সঙ্গে মিশেছি, কত লেখাপড়া জানা পণ্ডিতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু কারও কাছে এসব কথা আর শুনিনি। সবাই সাধারণ কথা বলে, সবাই তুচ্ছ কথা বলে। এই প্রথম আপনার বাবার বইয়ের ভেতরে আমার ছোটবেলার স্বপ্নের প্রতিধ্বনি পেলাম।

    আর সেদিন পিকনিকে গিয়ে আপনার সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল তাতে বুঝেছিলাম, আমাদের চিন্তার বেশ একটা মিল আছে। আপনি বোধহয় এই মানসিকতা আপনার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। জানেন, আমার পরিচিত মানুষ অনেক আছে, কিন্তু আমার বন্ধু কেউ নেই। অনেক চিন্তা মনে আসে—যা বলবার লোক পাই না। আপনাকে বন্ধু মনে করে যদি মাঝে মাঝে চিঠি লিখি তাহলে আপনি কী আমাকে বেহায়া মেয়ে মনে করবেন?

    চেস্টারটন পড়তে শুরু করেছি। এবার আসবার সময় কিনে নিয়ে এসেছিলাম। গতকাল Hammer of God শেষ করেছি। দেখা হলে আলোচনা করব। ততদিনে সব গল্প পড়া হয়ে যাবে।

    একবার আমাদের এখানে বেড়াতে আসুন না। আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বাবাকে বলেছি, উনি খুব খুশি হয়েছেন। আপনি এলে ভারি আনন্দ পাবেন।

    আশা করি ভালো আছেন। নমস্কার নেবেন। ইতি–
    অপালা

    চিঠি পড়া শেষ করিয়া কাজল অন্যমনস্কের মতো কাগজ কয়খানা খামে ভরিয়া টেবিলে রাখিয়া দিল। জানালা দিয়া মৃদু বাতাস আসিতেছে। জানালার ঠিক বাহিরেই একটা টগর গাছ, অন্ধকারের ভিতব তাহার আরছা আদল বোঝা যায়। শেলী লিখিয়াছিলেন—The champak odours fail! কী যেন নাম কবিতাটার? Lines to an Indian Air? প্রথম পড়িবার সময় মনের ভিতর চম্পকসুরভিত একঝলক বসন্তের বাতাস বহিয়া গিয়াছিল। হঠাৎ এখন সেই অনুভূতিটা যেন আবার ফিরিয়া আসিল। কিংবা ঠিক অতটা নহে—তবু কেমন একটা ঘোর-ঘোর ভাব। অবশ্য ইহাকে নিশ্চয় প্রেমপত্র বলা চলে না, ট্রাডিশনাল প্রেমপত্রের কোনো লক্ষণ ইহাতে নাই। কিন্তু এই প্রথম একজন মেয়ে তাহাকে চিঠি লিখিয়াছে। এতদিনে তাহার জীবনে এমন কিছু ঘটিল, যাহা একান্তভাবে তাহার নিজের।

    এ চিঠি সে কাহাকেও দেখাইবে না, অন্য কাহারও ইহাতে কিছুমাত্র অধিকার নাই। একটা বয়স পর্যন্ত মানুষের জীবনে কোনো গোপনীয়তা থাকে না, ফলে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের চিহ্নও থাকে না। গোপনীয়তার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয় আঁটে, কিন্তু তাহার জন্য কিছু মূল্যও দিতে হয়।

    যাই যাই করিয়াও সরল শৈশবের যেটুকু অংশ প্রথম যৌবন পর্যন্ত থাকিয়া যায়, সেই অনাবিল সারল্য মূল্য হিসাবে বিসর্জিত হয়।

    অবশ্য অপালা প্রেমপত্র লেখে নাই। সাধারণ চিঠি—যেমন বন্ধু বন্ধুকে লেখে।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদাবিদার – তারক রায়
    Next Article কাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    অলাতচক্র – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারানাথ তান্ত্রিক – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    কাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.