Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় রচনাবলী

    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প591 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩. কুসীর পূর্ব বৃত্তান্ত

    তৃতীয় ভাগ
    প্রথম পরিচ্ছেদ – সূতিকাগার

    কুসীর পূর্ব বৃত্তান্ত অবগত হইতে হইলে, আমাদিগের চব্বিশ পরগণা জেলার অন্তঃপাতী সামান্য একখানি গ্রামে গমন করিতে হইবে। সেই গ্রামে একটি একতালা সেই কোটা বাড়ীতে দুইটি ঘর আছে। তাহার সম্মুখে একখানি চালা ঘর আছে। সেই চালার এক ভাগ দমা দ্বারা আবৃত। সেই ভাগে রাম হয়। অপর ভাগ আবৃত নহে, তাহাতে কাঠ পাতা খুঁটে প্রভৃতি দ্রব্য থাকে।

    চালার সে ভাগে এখন কাষ্ঠ প্রভৃতি দ্রব্য নাই। কাচা নারিকেল পাতা দিয়া এখন সেই ভাগ সামান্যভাবে আবৃত করা হইয়াছে। আস্ত নারিকেল পাতাগুলি এরূপ দূরে দূরে সন্নিবেশিত হইয়াছে যে, তাহা দ্বারা কেবল একটু আড়াল হইয়াছে মাত্র।

    আমি এখনকার কথা বলিতেছি না; পনর ষোল বৎসর পূর্বে যাহা ঘটিয়াছিল, সেই কথা বলিতেছি। এ সমুদয় ঘটনা আমি চক্ষে দেখি নাই; সে স্থানে আমি উপস্থিতও ছিলাম না। কুসীর মাসী ও অন্যান্য লোকের মুখে যাহা শুনিয়াছি, তাহাই আমি বলিতেছি।

    বর্ষাকাল। দুর্জয় বাদল। টিপ টিপ করিয়া সর্বদাই জল পড়িতেছে। মাঝে মাঝে এক একবার ঘোর করিয়া প্রবল ধারায় বৃষ্টি হইতেছে। হু-হু করিয়া শীতল পূর্ব বায়ু প্রবাহিত হইতেছে। ঘর হইতে বাহির হয়, কাহার সাধ্য? এই দুর্যোগে নারিকেল পত্র দ্বারা আবৃত সেই চালার ভিতর এক ভদ্রমহিলা শয়ন করিয়া আছে। একখানি গলিত, নানা স্থানে ছিন্ন পুরাতন ময়লা বস্ত্র স্ত্রীলোকটি পরিধান করিয়াছিলেন। সেইরূপ একখানি ছিন্ন, পুরাতন মাদুর ও ছোট একটি ময়লা বালিশ ভিন্ন আর কিছু বিছানা ছিল না। যে মৃত্তিকার উপর এই মাদুরটি বিস্তৃত ছিল, তাহা নিতান্ত আর্দ্র ছিল। তাহা ব্যতীত নারিকেলপাতার ফাক দিয়া, মাঝে মাঝে জলের ঝাপটা আসিতেছিল; তাহাতে বিছানা, স্ত্রীলোকটির পরিধেয় কাপড় ও সর্বশরীর ভিজিয়া যাইতেছিল, পাতার ফাক দিয়া সর্বদাই বাতাস আসিতেছিল। সেই ভিজা মেঝেতে, ভিজা মাদুরের ভিজা কাপড়ে স্ত্রীলোকটি পড়িয়া ছিল। এরূপ অবস্থায় সহজ মানুষের কম্প উপস্থিত হয়। কিন্তু সে স্ত্রীলোকটির অবস্থা সহজ ছিল না। বিছানার নিকট কিঞ্চিৎ দূরে কাঠের আগুন জ্বলিতেছিল বটে, কিন্তু তাহাতে সে চালার ভিতর বিন্দুমাত্র উত্তাপের সঞ্চার হয় নাই। স্ত্রীলোক এবং আগুন এই দুইয়ের মধ্যস্থলে ছিন্ন বস্ত্র দ্বারা আবৃত একটি নবপ্রসূত শিশু নিদ্রা যাইতেছিল। আজ চারিদিন এই শিশু জন্মগ্রহণ করিয়াছে। ইহাই সূতিকাগার। যে স্ত্রীলোকটি মাদুরে শয়ন করিয়াছিলেন, তিনিই প্রসূতি। এই সঙ্কট সময়ে তিনি এইরূপ আর্দ্র নারিকেলপাতায় সামান্যভাবে আবৃত চালাঘরে পড়িয়া ভিজিতেছিলেন। কেবল তাহা নহে। তিনি উকট রোগগ্রস্ত হইয়াছিলেন। প্রসবের একদিন পরে তাহার জ্বর হয়, তাহার পরদিনই সেই জ্বর,–বিকারে পরিণত হয়; এক্ষণে তিনি একেবারে জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িয়াছেন। জ্ঞানশূন্য হইয়া ক্রমাগত এ পাশ ওপাশ করিতেছেন; ক্রমাগত তাহার মস্তক সেই ক্ষুদ্র বালিশের উপর হইতে পড়িয়া যাইতেছেন। কখনও উচ্চৈঃস্বরে কখনও বা বিড়বিড় করিয়া তিনি বকিতেছেন। তাহার শিয়রদেশে আর একটি স্ত্রীলোক বসিয়া আছেন। তিনি দাই নহেন, ভদ্র-কন্যা বলিয়া তাহাকে বোধ হয়। পীড়িতা স্ত্রীলোকের সহিত তাহার মুখের সাদৃশ্য দেখিয়া, তাহাকে বড় ভগিনী বলিয়া বোধ হয়। পীড়িতার মস্তক যখন বালিশ হইতে নীচে পড়িয়া যাইতেছিল, তখন তাহার মস্তক পুনরায় তিনি বালিশের উপর তুলিতেছিলেন। ঘোর তৃষ্ণায় কাতর হইয়া পীড়িতা তখন হাঁ করিতেছিলেন, তখন একটু জল দিয়া তিনি তাহার শুষ্ক মুখ ক্ষণকালের নিমিত্ত সিক্ত করিতেছিলেন। পীড়িতা যখন বিড়বিড় করিয়া বকিতেছিলেন, তখন তিনি তাহার মস্তক অবনত করিয়া তাহার মুখের নিকট আপনার কান রাখিয়া কথা বুঝিবার জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। কিন্তু সে সমুদয় প্রলাপ বাক্য, সে কথার কোন অর্থ ছিল না। বিকারের বলে পীড়িতা যখন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিতেছিলেন, তখন তিনি মাঝে মাঝে তাহাকে প্রবোধ দিয়া বলিতেছিলেন,—ক্ষান্ত। স্থির হও; ক্ষান্ত। স্থির হও। রোগীর সেবা করিতে করিতে মাঝে মাঝে তিনি সেই নবপ্রসূত শিশুটিকে তুলিয়া পালিতা দ্বারা গাভীদুগ্ধ পান করাইতেছিলেন। পীড়িত ও অপর সেই স্ত্রীলোকটি ব্যতীত এ বাড়ীতে জনমানব আর কেহ ছিল না। অপর স্ত্রীলোকটি পীড়িতার বড় ভগিনী বটেন। তাহার বাটী এই গ্রাম হইতে আট দশ ক্রোশ দূরে। ভগিনীর পূর্ণ গর্ভাবস্থা উপস্থিত হইলে, তাহার শুশ্রুষার নিমিত্ত তিনি আসিয়াছিলেন। তাহার পর এই বিপদ!

     

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – পীড়িতা প্রসূতি

    পীড়িতা প্রসূতির এইরূপ অবস্থা। সে সংসারের এইরূপ অবস্থা। অপরাহ্ন হইয়াছে, বেলা প্রায় ছয়টা বাজিয়া গিয়াছে। বৃষ্টি নিয়তই পড়িতেছে। মেঘাচ্ছন্ন পৃথিবীকে সন্ধ্যার অন্ধকার ঢাকিবার উপক্রম করিতেছে। এই সময় একজন প্রতিবাসিনী ভিজিতে ভিজিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

    প্রতিবাসিনী জিজ্ঞাসা করিলেন,–বৌ এখন কেমন আছে গা?

    পীড়িতার ভগিনী উত্তর করিলেন,আর বাছা! কেমন থাকার কথা আর নেই। এখন রাতটি কাটিলে হয়।

    এই বলিয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন। চক্ষু দিয়া তাহার টপ টপ করিয়া, জল পড়িতে লাগিল। পীড়িতার মাথা পুনরায় বালিশের নিম্নে গিয়া পড়িল। আঁচল দিয়া চকু মুছিয়া তাড়াতাড়ি তিনি মাথাটি তুলিয়া বালিশের উপর রাখিলেন।

    প্রতিবাসিনী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,–রসময়ের কোন খবর নাই?

    ভগিনী উত্তর করিলেন,পর তাহাকে পত্র দিয়াছি। চিঠিখানি রেজোরি করিয়াছি, কাল সে পাইয়া থাকিবে। আজ তাহার আসা উচিত ছিল, কিন্তু এ দুর্যোগে সে কি করিয়া আসিবে, তাই ভাবিতেছি।

    প্রতিবাসিনী জিজ্ঞাসা করিলেন,–খুকী কেমন আছে?

    ভগিনী উত্তর করিলেন,–সে আছে ভাল। পোড়ারমুখী মাকে খাইতে আসিয়াছিল। দেখ গা পৃথিবীতে আর আমাদের কেহ নাই; মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই। সংসারে আমরা কেবল এই ক্ষান্ত ছিল। দিদি বলিতে ক্ষান্ত অজ্ঞান হইত। আমার ছেলে-পিলে নাই। মনে করিয়াছিলাম, ক্ষান্তর পাচটা হইবে; তাদের মুখ দেখিয়া আমি সুখী হইব। কর্তাও ক্ষান্তকে বড় ভালবাসেন। রায় মহাশয়ের পত্র যাই তিনি পাইলেন, আর তৎক্ষণাৎ আমাকে পাঠাইয়া দিলেন। ক্ষান্তর ছেলে হইবে, মনে মনে কত আশা করিয়া আমি আসিলাম। ক্ষান্ত

    যে আমাকে ফেলিয়া চলিয়া যাইবে, এ কথা কখনও মনে ভাবি নাই।

    এই কথা বলিয়া তিনি পুনরায় কাঁদিতে লাগিলেন। প্রতিবাসিনী প্রবোধ দিয়া বলিলেন,–ভয় নাই, ভাল হইবে। মানুষের রোগ কি হয় না! যদুর স্ত্রীর আঁতুড়ে এইরূপ হইয়াছিল। ভাল হইয়া আবার কত ছেলে-পিলে তাহার হইয়াছে। দাই কোথায় গেল?

    ভগিনী উত্তর করিলেন,–দুই প্রহরের সময় খাইবার নিমিত্ত সে বাটী গিয়াছে। সেই পর্যন্ত এখনও আসে নাই; বোধ হয় শীঘ্রই আসিবে।

    প্রতিবাসিনী বলিলেন,—ঔষধ-পালা কিছুই হয় নাই?

    ভগিনী উত্তর করিলেন, এ গ্রামে ডাক্তার নাই, কবিরাজ নাই, ঔষধ-পালা কি করিয়া হইবে? দাই কি ঔষধ দিয়াছিল।

    প্রতিবাসিনী বলিলেন,–দাই আসিলে, তেল গরম করিয়া সর্ব শরীরে মাখাইয়া উত্তমরূপে তাপ দিতে বলিবে। এই বলিয়া প্রতিবাসিনী চলিয়া গেলেন।

    বলা বাহুল্য যে, এই পীড়িতা স্ত্রীলোকটি আর কেহ নহেন, ইনি রসময়বাবুর প্রথম পক্ষের স্ত্রী। রসময়বাবু তখন কলিকাতায় কর্ম করিতেন। তিনি তখন অতি অল্প বেতন পাইতেন। দাস দাসী রাখিবার তখন তাহার ক্ষমতা ছিল না। তাহার জন্য অভিভাবকও কেহ ছিলেন না। অগত্যা স্ত্রীকে একেলা ছাড়িয়া কলিকাতায় তাহাকে থাকিতে হইত। কিন্তু তাহার জন্য বিশেষ ভাবনার কোন কারণ ছিল না; প্রতিবাসী ও প্রতিবাসিনীগণ সকলেই তাঁহার স্ত্রীর তত্ত্বাবধান করিতেন। এই বিপদের সময়ও তাহারা দিনের মধ্যে ভিজিতে ভিজিতে অনেক বার আসিয়া তত্ত্ব লইতেছিলেন। আবশ্যক হইলে তাহারা ডাক্তার আনিয়া দিতেন। কিন্তু চারি ক্রোশ দূরে একখানি গণ্ডগ্রাম হইতে ডাক্তার আনিতে হইত। একবার ডাক্তার আনিতে দশ টাকা খরচ হয়। সে টাকা রসময়বাবুর স্ত্রীর ভগিনীর হাতে ছিল না। প্রসবকালে ভগিনীর সেবা করিবার নিমিত্ত সম্প্রতি তিনি সেই গ্রামে আসিয়াছিলেন। তাহার স্বামী অল্প বেতনে সামান্য একটি চাকরী করিয়া দিনপাত করিতেন। সেজন্য টাকাকড়ি লইয়া তিনি ভগিনীর গৃহে আগমন করেন নাই। বাধা দিয়া টাকা কর্জ করিবেন এরূপ গহনাও তাহার নিকট ছিল না। সময়বাবুর নিকট তিনি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। ভগিনীপতি শীঘ্রই আসিয়া উপস্থিত হইবে। সে আসিয়া ডাক্তার আনবে, সেই প্রতীক্ষায় তিনি পথপানে চাহিয়া ছিলেন।

    রসময়বাবু সন্ধ্যার পর আসিয়া উপস্থিত হইলেন। স্ত্রীর অবস্থা দেখিয়া তিনি অধীর হইয়া পড়িলেন। সেই রাত্রিতেই তিনি চারি ক্রোশ দূরে ডাক্তার আনিতে দৌড়িলেন। কিন্তু সে দুর্যোগে পালকী-বেহারাগণ বাহির হইতে সম্মত হইল না। স্ত্রীর অবস্থা বলিয়া ডাক্তারের নিকট হইতে কিছু ঔষধ লইয়া বিরস বদনে রাত্রি দুইটার সময় তিনি প্রত্যাগমন করিলেন।

     

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ – খুকীকে ভুলিও না

    পরদিন প্রাতঃকালে ডাক্তার আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এরূপ লোগ আমি অনেক দেখিয়াছি; ভালরূপ চিকিৎসা হইলেও এ রোগে কচিৎ কেহ রক্ষা পাইয়া থাকে। ডাক্তার আসিয়া প্রথম সূতিকাঘর দেখিয়াই জ্বলিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,–এরূপ স্থানে সুস্থ মানুষ থাকিলেও মরিয়া যায়। কোন্ প্রাণে পীড়িতা প্রসূতিকে আপনারা এরূপ স্থানে রাখিয়াছেন?

    রসময়বাবু কোন উত্তর করিলেন না। কিন্তু একজন প্রবীণ প্রতিবাসী বলিলেন,–আপনি যে বিলাতী সাহেব দেখিতে পাই। আপনার বাড়ীতে কি হয়? আপনি যখন জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন আপনার আঁতুড় ঘরের জন্য মাবেল পাথরের মনুমেন্ট প্রস্তুত হইয়াছিল না কি?

    ডাক্তার কিছু অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন,—প্রসূতিকে আপনারা ঘরের মধ্যে লইয়া যাইতে পারেন না?

    রসময়বাবু উত্তর করিলেন,—পল্লীগ্রাম। দুই-চারিটা নাকরকেলপাতা দিয়া চিরকাল আমাদের আঁতুড় ঘর হয়। আজ যদি আমি তাহার অন্যথা করি, তাহা হইলে সকলে আমার নিন্দা করিবে।

    ডাক্তার আর কোন কথা বলিলেন না, বলিবার বড় প্রয়োজনও ছিল না; কারণ, পীড়িতার তখন আসন্নকাল উপস্থিত হইয়াছিল। ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া ডাক্তার চলিয়া গেলেন।

    পীড়িতা প্রসূতি যে এপাশ ওপাশ করিতেছিলেন ক্রমে তাহা স্থির হইয়া আসিল। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস কার্য অতি কষ্টে সম্পন্ন হইতে লাগিল। রসময়বাবু ও তাহার শালী বুঝিলেন যে, আর অধিক বিলম্ব নাই। দুইজনে দুই পার্শ্বে বসিয়া রহিলেন। অবিরল ধারায় চক্ষুর জল পড়িয়া, দুইজনের বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল।

    অপরাহ্ন প্রায় তিনটা বাজিয়া থাকিবে, এমন সময় রোগিণীর সহসা একটু জ্ঞানের উদয় হইল। বিস্মিত মনে তিনি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। তাহার পর অতি ধীরে ধীরে তিনি বলিলেন,–এ কি। আমি কোথায়?

    মস্তক অবনত করিয়া রসময়বাবু তাঁহার মুখের নিকট আপনার কর্ণ রাখিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ তিনি আর কোন কথা বলিলেন না। স্থিরভাবে তিনি যেন চিন্তা করিতে লাগিলেন।

    বলিলেন। তাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঐফুলিও না। তবে

    চিন্তা করিয়া তাহার যেন সকল কথা মনে হইল। তখন ভগিনীর মুখের দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন,–দিদি।

    নিকটে অগ্রসর হইয়া, ভগিনী মস্তক অবনত করিয়া, কান পাতিয়া রহিলেন। রোগিণী অতি মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন,—যা হইয়াছিল, তা আছে?

    ভগিনী উত্তর করিলেন,—আছে বই কি।

    এই বলিয়া তিনি তাড়াতাড়ি খুকীকে লইয়া তাহার সম্মুখে ধরিলেন। রোগিণী আস্তে আস্তে খুকীর ক্ষুদ্র হস্তটি ধরিয়া ভগিনীর হস্তের উপর রাখিয়া বলিলেন, তোমাকে দিলাম।

    তাহার পর রসময়বাবুর হাতটি ধরিয়া তিনি সেইরূপ মৃদুস্বরে বলিলেন,–বাবু। তবে যাই। কিছু মনে করিও না। তুমি পুনরায় বিবাহ করিবে। আমাকে একেবারে ভুলিও না। খুকী দিদির কাছে থাকিবে? খুকীকে ভুলিও না। তবে যাই।

    অতি কষ্টে, হাঁপাতে হাঁপাতে, এক একটি করিয়া এই কথাগুলি তিনি রসময়বাবুকে বলিলেন। তাহার পর আর তিনি কথা কহিতে পারিলেন না। পরমুহূর্তেই তাহার ভগিনী কাঁদিয়া উঠিলেন। এই অল্প বয়সেই তাহার ইহলীলা সমাপ্ত হইয়া গেল। কাঁদিতে কাঁদিতে রসময়বাবু সে স্থান হইতে বাহির হইয়া আসিলেন।

    কিছুদিন পরে রসময়বাবু শালী, খুকীকে লইয়া স্বগ্রামে প্রস্থান করিলেন। রসময়বাবুও কলিকাতা চলিয়া গেলেন। রসময়বাবু একবার আমাকে বলিয়াছিলেন যে, তাহার অন্তঃকরণ নিতান্ত কোমল। সে কথা সত্য। বর্মাণীর মৃত্যুর পর তিনি যে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছিলেন, তাহা আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছিলাম। আমি শুনিয়াছি যে, তাহার এই প্রথম স্ত্রীবিয়োগের পরেও তিনি শোকে অধীর হইয়া পড়িয়াছিলেন। সূতিকাগারে পত্নীর পীড়া হইয়াছে, এই কথা শুনিয়া রোগিণীর নিমিত্ত কলিকাতা হইতে তিনি এক বোতল ব্রাণ্ডি লইয়া গিয়াছিলেন। শোক-নিবারণের নিমিত্ত সেই ব্র্যাণ্ডি তিনি একটু একটু পান করিতে আরম্ভ করিলেন। মদ্যপান করিতে তিনি এইরূপে শিক্ষা করিলেন। পত্নীবিয়োগে রসময়বাবু এতদূর অধীর হইয়া পড়িলেন যে, কাজ-কর্ম তিনি আর কিছুই করিতে পারিলেন না। চাকরী ছাড়িয়া পাগলের ন্যায় তিনি দেশ-পর্যটনে বাহির হইলেন। বহুদেশ ভ্রমণ করিয়া, অবশেষে তিনি ব্ৰহ্মদেশে গিয়া উপস্থিত হইলেন। সেই স্থানে রসময়বাবুর সহিত আমার আলাপ পরিচয় হয়।

     

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ – নিবিড় বনে দেবকন্যা

    রসময়বাবুর শালী,–কন্যাটিকে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। যখন সে ছয় মাসের হইল, তখন তাঁহারা স্ত্রী-পুরুষ পরামর্শ করিয়া, তাহার নাম কুসুমকুমারী রাখিলেন। বলা বাহুল্য যে, তাহাকে বিবাহ করিবার নিমিত্ত ফোক্‌লা দিগম্বর মহাশয়ের শুভাগমন হইয়াছে। ব্রহ্মদেশে কর্ম পাইয়া রসময়বাবু প্রথম প্রথম ভায়রাভাইকে চিঠিপত্র লিখিতেন। কুসীর প্রতিপালনের নিমিত্ত মাঝে মাঝে টাকাও পাঠাইতেন। কুশীর যখন পাঁচ বৎসর বয়স, তখন বর্মাণী তাহার গৃহের গৃহিণীত্ব-পদ প্রাপ্ত হইল। সেই সময় হইতে তাহার পান-দোষও দিন দিন বৃদ্ধি হইতে লাগিল! ক্রমে ক্রমে তিনি ভায়রাভাইকে পত্রাদি লেখা বন্ধ করিয়া দিলেন। ক্রমে ক্রমে তিনি কুসীকে বিস্মৃত হইলেন। সেই সময় হইতে কন্যার প্রতিপালনের নিমিত্ত আর একটি পয়সাও তিনি প্রেরণ করিলেন না।

    কুসীর মেসোমহাশয় আট টাকা বেতনের সামান্য একটি চাকরী করিতেন। পল্লীগ্রামের খরচ অল্প, সেই আট টাকাতেই কোনরূপে তাহার দিনপাত হইত। ইহাতে কষ্টে সংসার চলে বটে, কিন্তু সঞ্চয় কিছু হয় না। সে নিমিত্ত কুসীর বয়ঃক্রম যখন দশ বৎসর হইল, তখন তাহার বিবাহের নিমিত্ত ইনি বড়ই চিন্তিত হইলেন। তিনি দেখিলেন যে অতি সংক্ষেপে বিবাহ দিলেও দুই শত টাকার কমে হয় না। কিন্তু যখন দুইটি পয়সা হাতে নাই, তখন দুই শত টাকা তিনি কোথায় পাইবেন? কুসীর বিবাহের নিমিত্ত রসময়বাবুকে ইনি বার বার পত্র লিখিলেন। রসময়বাবু একখানি পত্রেরও উত্তর দিলেন না। কুসীর বয়স বারো বৎসর উত্তীর্ণ হইয়া গেল, তবুও তাহার বিবাহ হইল না। এই সময় আর একটা বিপদ ঘটিল। কুসীর মেসোমহাশয় পীড়াগ্রস্ত হইয়া শয্যাশায়ী হইয়া পড়িলেন। কুসীর বিবাহ দেওয়া দূরে থাকুক, তাহাদের দিন চলা ভার হইয়া উঠিল।

    আমাদের চিন্তা করা বৃথা, যিনি মাথার উপরে আছেন, তিনি যাহা করেন, তাহাই হয়। মেসোমহাশয়ের বাটী হইতে কিছুদূরে গ্রামের প্রান্তভাগে বৃহৎ একটি বাগান আছে? সেই বাগানের মাঝখানে একটি পুষ্করিণী আছে। উপরে আম, কাঁঠাল, নারিকেল প্রভৃতি ফলের গাছ, নিম্নে ঘোট ঘোট বন-গাছ নানা প্রকার তরু-পল্লীর সম্বলিত নিবিড় বন দ্বারা পুকুরটির চারি ধার আবৃত রহিয়াছে। পুকুরটিতে বাঁধা ঘাট নাই; সে স্থানে বড় কেহ স্নান করিতে অথবা জল আনিতে যায় না। দুই ধারে বন মাঝখানে গরু ও মানুষ-জন যাইবার নিমিত্ত সামান্য একটু সঙ্কীর্ণ পথ। সেই পথ পুষ্করিণীর এক পার্শ্বে একটি মেটে ঘাটে গিয়া শেষ হইয়াছে। মানুষে এ ঘাটটি প্রস্তুত করে নাই, গরু-বাছুর নামিয়া সামান্য একটু ঘাটের মত হইয়াছে এই মাত্র। স্থানটি নির্জন।।

    একদিন অপরাহ্নে, এই নির্জন স্থানে, জলের ধারে সেই মেটে ঘাটে বসিয়া, একটি বালিকা হাপুশ-নয়নে কাঁদিতেছিল। বালিকা? বালিকা বটে, কিন্তু বয়ঃক্রম দ্বাদশ উত্তীর্ণ হইয়া থাকিবে। তবে তাহার সিঁথিতে সিন্দুর ছিল না। আমি অবশ্য তাহা দেখি নাই; কারণ, আমি সে স্থানে উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু পুষ্করিণীর অপর পার্শ্বে বনের ভিতর লুকায়িত থাকিয়া, ছোট একগাছি ছিপ লইয়া, যে লোকটি সমুদয় দেখিয়াছিল। কি নিমিত্ত বালিকা ক্রন্দন করিতেছিল, তাহাও সে বুঝিতে পারিয়াছিল। একবার ঐ লোকটিকে ভাল করিয়া দেখ। ফুট গৌরবর্ণ বিমলকান্তি, সত্য-উচ্চভাব-দয়া-মায়া-পূর্ণ মুখশ্রী,নানা গুণ সম্পন্ন ঐ যে যুবক বনের ভিতর বসিয়া আছে, উহাকে একবার ভাল করিয়া দেখ। যেদিন কুলী মাতৃহীনা হয়, সেই রাত্রিতে বিধাতা আসিয়া উহারই নাম শিশুর ললাটে লিখিয়াছিলেন।, যুবকের বয়ঃক্রম সতের কি আঠারো হইবে। কিছুক্ষণ পূর্বে বাম হন্তে একটু ময়দা মাখিতে মাখিতে দক্ষিণ হস্তে পুঁটিমাছ ধরিবার ছোট ছিপ গাছটি লইয়া, সে এই পুষ্করিণীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। প্রথম ঘাটের নিকট গিয়া দেখিল যে সে স্থানে অতিশয় রৌদ্র। সে নিমিত্ত পুকুরের বিপরীত দিকে গিয়া অতি কষ্টে জঙ্গল ঠেলিয়া, বনের ভিতর সে মাছ ধরিতে বসিয়াছিল।

    অল্পক্ষণ পরেই ঘাটের দিকে মানুষের পদশব্দ হইল। সে চাহিয়া দেখিল। আলৌকিক রূপলাবন্য সম্পন্ন এক বালিকাকে সেই নির্জন স্থানে একাকী আসিতে দেখিয়া যুবক চমকিত হইল। বালিকার যৌবন আগতপ্রায়! এ নিবিড় বনে—এই নির্জন স্থানে কোন দেবকন্যা আগমন করিলেন না কি! এমন রূপ তো কখনও দেখি নাই। অনিমেষ নয়নে সে বালিকার দিকে চাহিয়া রহিল। সামান্য একখানি পাছা-পেড়ে বিলাতী শাড়ী সেই বালিকা পরিধান করিয়াছিল।

    কিন্তু তাহার উজ্জল শুভ্র দেহের উপর স্থানে কাপড়ের কালো পাড়টি পড়িয়া, কি এক অপূর্ব সৌন্দর্যের আবির্ভাব হইয়াছিল। হাতে গাছকত কাচের চুড়ী ব্যতীত তাহার শরীরে অন্য কোন অলঙ্কার ছিল না। কিন্তু সেই গোল কোমল শুভ্র হস্তে কৃষ্ণবর্ণের চুড়ী-কেমন অপূর্ব লোভর সৃষ্টি করিয়াছিল। নিবিড় চাকচিক্যশালী কেশগুলি, মস্তকের মধ্যস্থলে কেমন একটি সুক্ষ্ম রেখা দ্বারা দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল। ললাটের উপর সাঁথির আরম্ভ-স্থলে সিন্দুরবিন্দু ছিল না। নিমেষের মধ্যে তাহাও যুবকের নয়নগোচর হইয়াছিল। মস্তক অবনত করিয়া বালিকা আসিতেছিল, সে নিমিত্ত চক্ষুদ্বয় ভূমির দিকে অবনত ছিল। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের সুদীর্ঘ ঘন অবনত সেই চক্ষু-পল্লবশ্রেণী দেখিলেই মানুষের মন মোহিত হইয়া যায়। কিন্তু তাহার অন্তরালে যে তরল অনল গঠিত নীলপঙ্কজ-সদৃশ্য নয়ন দুটি রহিয়াছে। তাহা দেখিলে মানুষের কি হয়? আর গোপন করিবার আবশ্যক কি? এই বালিকা আমাদের কুসী। তাই বলি, হে ফোগলে! আর জন্মে তুমি কিরূপ তপস্যা করিয়াছিলে?

     

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ – অপরাহ্নের অবগাহন

    পুষ্করিণীর অপর পার্শ্বে বসিয়া ছিপগাছটি হাতে করিয়া, যুবক অনিমেষ-নয়নে কুসীর দিকে চাহিয়া রহিল। বামকক্ষে কলসী লইয়া ভূমির দিকে দৃষ্টি রাখিয়া কুসী দ্রুতবেগে সেই সামান্য ঘাট দিয়া জল অভিমুখে নামিতে লাগিল। ঘাটের সঙ্কীর্ণ পথ পিচ্ছিল ছিল, সহসা পদস্থলিত হইয়া কুসী ভূমির উপর পতিত হইল। পতিত হইয়া সেই নিম্নগামী পথ দিয়া আরও কিছুদূর সে হড়িয়া পড়িল। কক্ষদেশ হইতে কলসীটি পৃথক হইয়া গেল, পরক্ষণেই তাহা গড়াইয়া জলে গিয়া পড়িল। আশ্বিন মাস। পুষ্করিণী তখন জলপূর্ণ ছিল। যে স্থানে কলসীটি ড়ুবিয়া গেল, সে স্থানে গুটিকত বুদবুদ উঠিল। কুসী তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল। সেই বুদবুদের দিকে চাহিয়া সে কাঁদিতে লাগিল।

    যুবক মনে করিল যে, বালিকাকে অতিশয় আঘাত লাগিয়া থাকিবে, সেজন্য সে কাঁদিতেছে। সেই মুহূর্তে সে উঠিয়া দাঁড়াইল। কোন কথা না বলিয়া, বন ভাঙ্গিয়া অতি দ্রুতবেগে সে উপরে উঠিতে চেষ্টা করিল। বনে ছিপের সূতা জড়াইয়া গেল। ব্যস্ত হইয়া এক টান মারিয়া সে সূতা ছিড়িয়া ফেলিল। ছিপগাছটি এক গাছে লাগিল। ক্রোধভরে ছিপটি ভাঙ্গিয়া সে দূরে নিক্ষেপ করিল। বন পার হইয়া সে উপরে উঠিল; বন পার হইয়া পুষ্করিণীর পাড় প্রদক্ষিণ করিয়া, যথাসাধ্য দ্রুতবেগে সে ঘাটের দিকে দৌড়িতে লাগিল। কাটা-খোঁচায় তাহার পরিধেয় কাপড় ফালাফালা হইয়া ছিড়িয়া গেল; পদদ্বয়ের নানাস্থান হইতে রক্তধারা পড়িতে লাগিল। সে সমুদয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া সে বন-জঙ্গল অতিক্রম করিতে লাগিল। অবশেষে ব্যস্ত হইয়া, সে সেই ঘাটের উপরে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর বালিকার নিকট যাইবার নিমিত্ত সেই পিচ্ছিল নিম্নগামী পথ দিয়া সে-ও দ্রুতবেগে নামিতে লাগিল। কিন্তু হায়! কথায় আছে,–দেবি তুমি যাও কোথা? না, তাড়াতাড়ি যেথা। তাড়াতাড়িতে যুবকেরও পদস্থলিত হইল, যুবকও পড়িয়া গেল; সেই পিচ্ছিল নিম্নগামী পথ দিয়া একেবারে সে জলে গিয়া পড়িল। কিনারার অতি অল্পদূরেই গভীর জল ছিল। ক্ষণকালের নিমিত্ত যুবক একেবারে ড়ুবিয়া গেল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে ভাসিয়া উঠিল। যদি সে সাঁতার না জানিত, তাহা হইলে, আজ এই স্থানে ঘোর বিপদ ঘটিত। তাহা হইলে, আমার এ পুস্তকও আর লেখা হইত না।

    যাহা হউক, সামান্য একটু সন্তরণ দিয়া, যুবক পুনরায় কুলে আসিয়া উপনীত হইল। সে স্থানে আসিয়া অতি সাবধানে অতি ধীরে ধীরে, পায়ের নখ আর্দ্র মৃত্তিকার উপর প্রোথিত করিয়া, পুনরায় সে উঠিতে লাগিল। যে স্থানে বালিকা উপবেশন করিয়াছিল তাহার নিকটে আসিয়া সে-ও তাহার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল।

    যুবক যখন মাছ ধরিতেছিল, তখন কুসী তাহাকে দেখে নাই। তাহার পর বনে যখন শব্দ হইতে লাগিল, তখন সে মনে করিল যে, গরু-বাছুরে বুঝি এইরূপ শব্দ করিতেছে। ঘাটের উপর আসিয়া যুবক উপস্থিত হইলে, কুসী সেই দিকে চাহিয়া দেখিল। সেই নির্জন স্থানে অকস্মাৎ একজন মানুষ দেখিয়া তাহার অতিশয় ভয় হইল; পরক্ষণেই যখন সেই মানুষ উপবিষ্ট অবস্থায় দুই হাত দুই দিকে মাটিতে রাখিয়া হড়হড় শব্দে অতি দ্রুতবেগে জল অভিমুখে নামিতে লাগিল, তখন কুসী ঘোরতর বিস্মিত হইল। অবশেষে যখন সে জলে ড়ুবিয়া গেল, তখন তাহার ভয়ের আর সীমা রহিল না। লোক ডাকিবার নিমিত্ত সে চীৎকার করিতে উদ্যত হইল। কিন্তু পরক্ষণেই সে-মানুষ ভাসিয়া উঠিল। এ সমুদয় ঘটনা অতি অল্পকালের মধ্যেই ঘটিয়া গেল। একটি ঘটনার পর আর একটি ঘটনা এত সত্বর ঘটিয়া গেল যে, কোন্ অবস্থায় কি করা কর্তব্য, সে কথা ভাবিবার চিন্তিবার নিমিত্ত কুসী আর সময় পাইল না। সাঁতার দিয়া কুলে উপনীত হইয়াও যুবক সহজে উপরে উঠিতে পারে নাই। স্থানটি এমনি পিচ্ছিল ছিল, আর নিকটেই জল এত গভীর ছিল যে, দুই তিন বার চেষ্টা করিয়াও সে সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে নাই। নিকটে গিয়া হাত ধরিয়া তাহাকে তুলিবার নিমিত্ত কুলী এই সময় উঠিয়া দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু সে উঠিতে পারিল না। তাহার দক্ষিণ পায়ের গাঁঠিতে অতিশয় বেদনা হইল। পড়িয়া গিয়া তাহার পায়ে যে আঘাত লাগিয়াছে, পুর্বে সে জানিতে পারে নাই। উঠিতে গিয়া এখন সে তাহা জানিতে পারিল।

     

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – পায়ে বড় ব্যথা

    যাহা হউক, অতি কষ্টে উপরে উঠিয়া যুবক বালিকার নিকট আসিয়া বসিল। ইহার পূর্বেই কুসীর ক্রন্দন থামিয়া গিয়াছিল। এখন আর বিপদের আশঙ্কা নাই। যেভাবে যুবকের পতন হইয়াছিল, কুসীর এখন তাহাই স্মরণ হইল। কুসীর গণ্ডদেশে কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হইয়া ওষ্ঠদ্বয়ে ঈষৎ হাসির চিহ্ন উদিত হইল। যুবকও হাসিয়া ফেলিল।

    তাহার পর যুবক বলিল,–তুমিও তো পড়িয়া গিয়াছিলে! তুমি মনে করিয়াছ, তাহা আমি দেখি নাই। কিন্তু পুষ্করিণী ও-পারে বনের ভিতর বসিয়া আমি সব দেখিয়াছি। তোমাকে কি বড় লাগিয়াছে? তাই কি তুমি কাঁদিতেছিলে?

    কুসীর এখন লজ্জা হইল। লজ্জায় তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। ঘাড় হেঁট করিয়া সে চুপ করিয়া রহিল।

    যুবক পুনরায় বলিল,আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, তোমাকে কি বড় লাগিয়াছে? সেই জন্য কি তুমি কাঁদিতেছিলে?

    কুসী দেখিল যে, উত্তর না দিলে আর চলে না। আস্তে আস্তে সে বলিল,–আমি সেজন্য কাঁদি নাই।

    যুবক জিজ্ঞাসা করিল,–তবে কি জন্য কাঁদিতেছিলে?

    কুসী পুনরায় চুপ করিয়া রহিল। কিন্তু যুবক ছাড়িবার পাত্র নহে। বার বার সে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল,—তবে কেন তুমি কাঁদিতেছিলে?

    নিরূপায় হইয়া কুসী সেইরূপ মৃদুস্বরে উত্তর করিল,—আমি জল লইতে আসিয়াছিলাম। আমার কলসী জলে পড়িয়া গিয়াছে। আমাদের বাড়ীতে আর কলসী নাই।

    যুবক বলিল,–ওঃ! দুই পয়সার একটা মেটে কলসীর জন্য তুমি কাঁদিতেছিলে? তাহার জন্য আবার কান্না কি?

    কুসী উত্তর করিল, মাসী-মা আমাকে বকিবেন?

    যুবক উত্তর করিল,হঠাৎ তুমি পড়িয়া গিয়াছ; তাই কলসীও গিয়াছে, সেজন্য তিনি বকিবেন কেন।

    কুলীর ইচ্ছা নয় যে, সকল কথার উত্তর প্রদান করে। কিন্তু সে অপরিচিত যুবক কিছুতেই তাহাকে ছাড়ে না। বাড়ী পলাইবার নিমিত্ত, কুসীর এখন চেষ্টা হইল, কিন্তু তাহার পায়ে অতিশয় ব্যথা হইয়াছিল।

    যুবক বলিল,–তুমি বাড়ী পলাইবার জন্য ইচ্ছা করিতেছ। কিন্তু আমার সকল কথার উত্তর না দিলে কিছুতেই আমি পথ ছাড়িয়া দিব না। তুমি বলিলে তোমাদের বাড়ীতে আর কলশী নাই; পিত্তলের ঘড়া আছে?

    কুসী উত্তর করিল,–না।

    যুবক জিজ্ঞাসা করিল,–কখনও ছিল?

    কুসী উত্তর করিল,–ছিল।

    যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—সে ঘড়া কি হইয়াছে? চোরে লইয়া গিয়াছে?

    কুসী বলিল, আমি বাড়ী যাই।

    যুবক দেখিল যে, বালিকা বিরক্ত হইতেছে। আর অধিক কথা সে জিজ্ঞাসা করিল না। সে বলিল,–রও! তোমার কলসী আমি তুলিয়া দিতেছি।

    কুসী তাহাকে নিবারণ করিতে না করিতে, সে জলে ঝাপ দিল। ড়ুব দিয়া কলসী তুলিল, কিন্তু পূর্ণর্ঘড়া গভীর জল হইতে উপরে তুলিতে না তুলিতে, দুই খণ্ড হইয়া ভাঙ্গি য়া গেল।

    তখন যুবক বলিল,–ঐ যা! কলসীটি ভাঙ্গিয়া গেল। এবার কিন্তু আমার দোষ।

    পুনরায় অতি সাবধানে পদক্ষেপ করিয়া যুবক উপরে উঠিয়া কুসীর নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। বাটী প্রত্যাগমন করিবার নিমিত্ত কুসী এইবার দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু সে দাঁড়াইতে পারিল না, একটু উঠিয়া পুনরায় বসিয়া পড়িল; তাহার পায়ে অতিশয় বেদনা হইল। কুসী কাঁদিতে লাগিল।

    যুবক জিজ্ঞাসা করিল,–তোমার পায়ে অতিশয় লাগিয়াছে?

    কুসী উত্তর করিল,—আমি দাঁড়াইতে পারিতেছি না। উঠিতে গেলেই আমার পায়ের গাঁটিতে বড় লাগে। আমি কি করিয়া বাড়ী যাইব।

    যুবক বলিল,–চল! আমি তোমার হাত ধরিয়া লইয়া যাই।

    কুসী বলিল,–না। তুমি আমার বাড়ীতে যদি খবর দাও।

    যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—কোন্ বাড়ী? কাহার বাড়ী?

    কুসী উত্তর করিল,–নিমাই হালদারের বাড়ী আমার মাসীকে বলিবে।

     

    সপ্তম পরিচ্ছেদ – বাঙ্গাল দেশের মানুষ

    আর কোন কথা না বলিয়া, যুবক তৎক্ষণাৎ সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল; নিমাই হালদারের বাটী অনুসন্ধান করিয়া, কুসীর মাসীকে সে সংবাদ প্রদান করিল। মাসী আসিয়া কুসীকে কোলে লইয়া গৃহে গমন করিলেন।

    শুষ্ক বস্ত্র পরিধান করিয়া কিছুক্ষণ পরে যুবক, পুনরায় নিমাই হালদারের বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইল। হালদার মহাশয়ের কেবল একখানি মেটে ঘর ছিল। ঘরের ভিতর তজোপোষের উপর তিনি শয়ন করিয়াছিলেন। সেই ঘরের দাওয়া বা পিড়াতে একটি মাদুরের উপর পা ছড়াইয়া, দেওয়ালের গায়ে কাষ্ঠ পিড়া ঠেস দিয়া, কুসী তখন বসিয়াছিল। মাসী তাহার নিকটে বসিয়া পৈতা কাটিতেছিলেন।

    মাসীকে যুবক জিজ্ঞাসা করিল,–তোমাদের মেয়েটি বড় পড়িয়া গিয়াছিল। তাহাকে কি অধিক আঘাত লাগিয়াছে।

    মাসী উত্তর করিলেন,–কুসী দাঁড়াইতে পারিতেছে না। সে জন্য বোধ হয়, অধিক লাগিয়া থাকিবে। হালদার মহাশয় বড় পিটপিটে লোক। তিনি বলেন যে, যে পুষ্করিণীতে অধিক লোক স্নান করে, গায়ের তেল-ময়লা সব ধুইয়া যায়, সে পুকুরের জল খাইতে নাই। তাই কুসী ঐ বাগানের পুষ্করিণী হইতে জল লইয়া আসে। কিন্তু যে ঘাট! ভাগ্যে মেয়ে আমার জলে পড়ে নাই। বোসোনা বাছা!

    এই বলিয়া মাসী একখানি তালপাতার চটি সরাইয়া দিলেন। যুবক সেই চটির উপর উপবেশন করিল।

    মাসী পুনরায় বলিলেন,–কুসী তোমার অনেক সুখ্যাতি করিতেছিল। তুমি তাহাকে তুলিতে গিয়া নিজে পড়িয়া গিয়াছিলে? তাহার পর ড়ুব দিয়া কলসী তুলিতে গিয়াছিলে? কলসীর জন্য কুসী কাঁদিতেছিল। কি করিব, বাছা! এখন আমাদের বড় অসময় পড়িয়াছে। কর্তা বিছানায় পড়িয়া আছেন। সংসার চলা আমাদের ভার হইয়াছে। দুই পয়সার কলসীর বটে, কিন্তু এখন আমাদের দুইটি পয়সা নয়, দুইটি মোহর। তুমি বুঝি রামপদদের বাড়ীতে আসিয়াছ?

    যুবক উত্তর করিল,হাঁ গো। আমি রামপদর বন্ধু। কলিকাতায় আমরা এক বাসায় থাকি, এক কলেজে পড়ি। এবার পূজার ছুটির সময় আমি বাড়ী যাই নাই। রামপদ আমাকে এ স্থানে ধরিয়া আনিয়াছে।

    মাসী বলিলেন,–কলিকাতা হইতে রামপদর একজন বন্ধু আসিয়াছে তা শুনিয়াছি কিন্তু তোমাকে দেখি নাই। তোমাদের বাড়ী কোথায়?

    যুবক উত্তর করিল,–আমাদের বাড়ী বাঙ্গালা দেশে। আমরা হ্যান ক্যান করিয়া কথা বলি। বাঙ্গালা কথা কখনও শুনিয়াছেন?

    কুসী শুনেনি?

    মেয়েটির নাম বুঝি কুসী?

    বাঙ্গাল কথার নাম শুনিয়া কুসী ইষৎ হাসিল, কিন্তু কোন উত্তর করিল না। মস্তক অবনত করিয়া সে পায়ের নখ খুঁটিতে লাগিল।

    মাসী বলিলেন,—হাঁ, বাছা! ছদিনের মেয়ে আমার হাতে দিয়া কুসীর মা চলিয়া গিয়াছে। আমি ইহাকে প্রতিপালন করিয়াছি। আমরাই ইহার নাম কুসুমকুমারী রাখিয়াছি। দুঃখের কথা বলিব কি, বাছা! ইহার বাপ বেশ দু-পয়সা রোজগার করে, কিন্তু মেয়ের খোঁজ-খবর কিছুই লয় না। এই এত বড় মেয়ে হইল, এখনও ইহার আমরা বিবাহ দিতে পারি নাই। একবার সাগরে গিয়া, আমি বাঙ্গাল দেশের মানুষ দেখিয়াছিলাম। কিন্তু তোমার কথা তো বাছা সেরূপ নয়। তোমার কথা খুব মিষ্ট, শুনিলে প্রাণ শীতল হয়। তোমার নাম কি বাছা?

    যুবক উত্তর করিল,–আমার নাম হীরালাল। আমরা ব্রাহ্মণ, বাঁড়ুয্যে।

    এইরূপ কথাবার্তার পর হীরালাল চলিয়া গেল।

    সে রাত্রিতে কুসীর অনেকক্ষণ পর্যন্ত কি নিদ্রা আসে নাই? হীরালালের মুখ বারবার তাহার মনে কি উদয় হইয়াছিল? হীরালাল কখন্ কি বলিয়াছিল তাহার এক একটি কথা কি তাহার মনে অঙ্কিত হইয়াছিল? আবার হীরালাল আসিবে কি না, আবার তাহার সহিত দেখা হইবে কি না, এ কথা সে কি বার বার ভাবিয়াছিল? পাছে তাহার সহিত আর দেখা

    হয়, সেই চিন্তা করিয়া তাহার চক্ষুদ্বয় কি ছল্‌ছল্‌ করিয়াছিল? হীরালাল ব্রাহ্মণ, বাঁড়ুয্যে। ইহা শুনিয়া কুসীর মনে কি কোনরূপ আশার সঞ্চার হইয়াছিল? আমি এ সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না।

     

    অষ্টম পরিচ্ছেদ – রামপদর ক্রোধ

    এক প্রতিবাসীর পুত্রের নাম রামপদ। রামপদ কলিকাতায় থাকিয়া কলেজে বিদ্যা অধ্যয়ন করে। হীরালাল ও রামপদ এক বাসায় থাকে, এক কলেজে পড়ে; দুই জনে বড় ভাব। এবার পূজার ছুটিতে হীরালাল দেশে গমন করে নাই। অনেক অনুরোধ করিয়া, রামপদ তাহাকে আপনার বাটীতে আনিয়াছে।

    কলিকাতায় সর্বদা আবদ্ধ থাকিতে হয়; সে জন্য পল্লীগ্রামে আসিয়া হীরালালের আর আনন্দের সীমা নাই। সকাল, সন্ধ্যা, সে মাঠে-ঘাটে ভ্রমণ করিত; এর বাড়ী, যাইত। আর যখন তখন পুটুলে ছিপগাছটি লইয়া, এ-পুকুর সে-পুকুর করিয়া বেড়াইত বড় মাছ ধরিবার নিমিত্ত ছিপ ফেলিয়া, তীর্থের কাকের ন্যায় একদৃষ্টে ফাতাপানে চাহিয়া থাকিবার ধৈৰ্য্য তাহার ছিল না।

    সেইদিন সন্ধ্যাবেলা হীরালাল ও রামপদ পুস্তক হাতে লইয়া বসিল। অধ্যয়ন করিতেছি এই কথা বলিয়া, মনকে প্রবোধ দিবার নিমিত্ত তাহারা পুস্তক হাতে লইয়াছিল, পড়িবার নিমিত্ত নহে; পুস্তক হাতে করিয়া গল্প-গুজব করিলে, বড় একটা দোষ হয় না। দুই জন্যেই কিন্তু সুবুদ্ধি বালক। বিদ্যালয়ে ইহাদের বিলক্ষণ সুখ্যাতি আছে। ছুটির সময় দিন-কত আলস্যে কাটাইলে বিশেষ কোন ক্ষতি হইবে না;—এইরূপ মনে করিয়া পড়াশুনা আপাততঃ তাহারা তুলিয়া রাখিয়াছে।

    অন্যমনস্ক ভাবে পুস্তকখানির পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে হীরালাল বলিল,–রামপদ। আজ ভাই আমি এক Adventure-য়ে (ঘটনায়) পড়িয়াছিলাম।

    রামপদ বলিল,–এক প্রকাণ্ড বাঘ তোমাকে গ্রাস করিতে আসিয়াছিল? আর তুমি অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করিয়া তাহার পা ধরিয়া আছাড় মারিয়াছিলে?

    হীরালাল কিছু রাগতঃ হইয়া উত্তর করিল,–তামাসার কথা নয়। বড়ই শশাচনীয় অবস্থা। আহা! এরূপ সোনার প্রতিমা কতই না কষ্ট পাইতেছে। তাহার সেই মলিন মুখখানি মনে করিলে, আমার বুক ফাটিয়া যায়।

    রামপদ বলিল,–বুঝিয়াছি কি হইয়াছে, তুমি লভে (ভালবাসায়) পড়িয়াছ। তুমি কুসীকে দেখিয়াছ। আমার অনুমান যদি ঠিক হয়, তাহা হইলে তোমাকে দোষ দিই না। পথের লোকও কুসীর রূপে মোহিত হয়; শত্রুকেও মুগ্ধ হইয়া তাহার পানে চাহিয়া দেখিতে হয়। কেন যে এখনও কোনও বড়মানুষের ঘরে তাহার বিবাহ হয় নাই, তাহাই আশ্চৰ্য্য কথা। যদি এক গোত্র না হইত, তাহা হইলে আমি নিজেই কুসীকে বিবাহ করিতাম।

    হীরালাল উত্তর করিল,–লভে পড়ি আর না পড়ি, কিন্তু এরূপ লক্ষ্মীরূপিণী বালিকা যে অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট পাইতেছে, তাহা শুনিলে বড় দুঃখ হয়। এই পাড়াগাঁয়ে, গরীবের ঘরে, এমন অদ্ভুত সুন্দরী কন্যা কি করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, তাই আমি ভাবিতেছি।

    রামপদ বলিল,–
    Full many a gem of purest ray serene,
    The dark unfathomed caves of occan dear;
    Full many a flower is born to blush unseen,
    And waste its sweetness in the desertair.

    [কত শত মণি যার কিরণ উজ্জ্বল,
    সিন্ধু মাঝে আছে যথা সলিল অতল।
    কত শত ফুল ফুটে অরণ্য-ভিতর,
    বৃথা নষ্ট হয় যার গন্ধ মনোহর।।]

    কুসীকে তুমি কোথায় দেখিলে?

    হীরালাল যে স্থানে মাছ ধরিতে গিয়াছিল, সেই পুকুরে কুসী কিরূপে পড়িয়া গিয়াছিল, অবশেষে মাসীর সহিত কিরূপ কথাবার্তা হইয়াছিল, আদ্যোপান্ত সমুদয় কথা সে রামপদর নিকট বর্ণনা করিল।

    তাহার পর হীরালাল বলিল,–ইংরাজী পুস্তকে সেকালের নাইট (বীর) দিগের কথা অনেক পড়িয়াছি। কিরূপে কোন দুবৃত্ত দানব পরমাসুন্দরী কোন রাজকন্যাকে হরণ করিয়া দুর্গমধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিত, কিরূপে কোন্ বীর তুমুল যুদ্ধ করিয়া সেই দানবকে নিধন করিয়া রাজকন্যার উদ্ধারসাধন করিত, কিরূপ অশ্রুপূর্ণ নয়নে সেই যুবতী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিত, সেই ঢুলু ঢুলু নয়নের কুটিল কটাক্ষে দিশাহারা হইয়া কিরূপে বীর আপনার মনপ্রাণ তাহার পায়ে সঁপিত, আজ সেই সকল কথা ক্রমাগত আমার মনে উদিত হইতেছে।

    রামপদ বলিল,–দেখ হীরালাল! তাহারা গরীব, তাহারা পীড়িত, তাহারা বিপন্ন। তাহাদের কথা লইয়া এরূপ তামাসা-ফষ্টি করা তোমার উচিত নয়। তাহারা আমাদের প্রতিবাসী। আমরা ও গ্রামের সকলে তাহাদের রক্ষক।

    হীরালাল বলিল,–তুমি রাগ কর, এমন কথা আমি কিছু বলি নাই। আমি প্রকৃতই তাহাদের দুঃখে নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছি। আমা দ্বারা তাহাদের যদি কোন সাহায্য হয়, তাহা করিতে আমি প্রস্তুত আছি।

    রামপদ উত্তর করিল,–তাহারা তোমার নিকট বোধ হয় ভিক্ষা প্রার্থনা করে নাই।

    হীরালাল বলিল,–তুমি এই বলিলে যে, কুসী তোমার সোত্র, তবে তুমি রাগ কর। কেন?

    রামপদ হাসিয়া উঠিল। রামপদ বলিল,–হীরালাল! তোমার সহিত আমার কখনও ঝগড়া হয় নাই, আজও হইবে না।

    তাহার পর, কুসী, তাহার পিতা, মাসী ও মোসোমহাশয়ের সমুদয় পরিচয় রামপদ প্রদান করিল; আর তাহাদের বর্তমান অবস্থা কি, তাহাও সে হীরালালকে বলিল, তাহাদের অবস্থার কথা শুনিয়া, হীরালালের মনে আরও দুঃখ হইল।

     

    নবম পরিচ্ছেদ — নানা প্রতিবন্ধকতা

    আহারাদির পর শয্যায় শয়ন করিয়া অনেক রাত্রি পর্যন্ত হীরালাল কুসীকে চিন্তা করিতে লাগিল। অবশেষে অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া মনে মনে সে এই স্থির করিল যে, কুসীর সহিত আর আমি সাক্ষাৎ করিব না। সাক্ষাৎ করিয়া কোন ফল নাই; মনে অসুখ হইবে ব্যতীত আর সুখ হইবে না।

    পরদিন প্রাতঃকালে উঠিয়া সে মাঠের দিকে বেড়াইতে গেল। মাঠে যাইলে কি হইবে মন তাহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করিল। সেই মনে কুসীর মুখখানি চিত্রিত হইয়াছিল। মন হইতে সেই চিত্রখানি মুছিয়া ফেলিবার নিমিত্র হীরালাল বার বার চেষ্টা করিতে লাগিল। একেবারে মুছিয়া ফেলা দূরে থাকুক, অধিকক্ষণের নিমিত্ত সে তাহা আচ্ছাদিত অবস্থাও রাখিতে পারিল না। অন্য চিন্তা দ্বারা এক একবার সে সেই চিত্রখানিকে আবৃত করে, কিন্তু আবার একটু অনমনস্ক হয়, আর পুনরায় তাহা বাহির হইয়া পড়ে। হীরালালের তখন যেন চমক হয়, সে তখন আপনাকে ভৎর্সনা করিয়া বলে,—দূর ছাই! আবার তাহাকে ভাবিতেছি!

    মাঠ হইতে বাটী প্রত্যাগমনের দুইটি পথ ছিল; একটি কুসীর বাটীর সম্মুখ হইয়া, অপরটি অন্য দিক দিয়া। ভুলক্রমে অবশ্য, হীরালাল প্রথম পথটি অনুসরণ করিল। ভুলক্রমে যখন এই পথে আসিয়া পড়িয়াছি, তখন কুসী আজ কেমন আছে না দেখিয়া যাওয়াটাও ভাল হয় না। সেই কথা জিজ্ঞাসা করিবার নিমিত্ত ভুলক্রমে মেসোমহাশয়ের বাটীতে সে গমন করিল।

    পূর্বদিন অপেক্ষা কুসীর বেদনা অধিক হইয়াছিল। সেজন্য মাসীকে হীরালাল বলিল,– কুসীর পায়ে একটু ঔষধ দিতে হইবে, ও-বেলা আমি ঔষধ আনিয়া দিব। এ কথাটাও কি সে ভুলক্রমে বলিয়াছিল?

    হীরালাল যে ডাক্তারখানা হইতে মূল্য দিয়া ঔষধ আনিবে, মাসী তাহা বুঝিতে পারেন নাই। সে জন্য তিনি কোনও আপত্তি করিলেন না। আজ মেসোমহাশয়ের সহিতও হীরালালের আলাপ হইল। ঘরের ভিতর গিয়া তাহার তক্তপোষের এক পার্শ্বে বসিয়া হীরালাল অনেকক্ষণ গল্প-গাছা করিল। মেলোমহাশয় কুসীর ও কুসীর পিতার কথা অনেক বলিলেন। তাহার বাড়ী কোথায়, তাহারা কোন্ গাঁই, কাহার সন্তান স্বভাব কি ভঙ্গ, সে সকল পরিচয়ও হীরালালকে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন। মেসোমহাশয়ের নিজের পীড়ার কথাও অনেক হইল।

    অপরাহ্নে হীরালাল যথারীতি আর একগাছি ছিপ ইয়া রামপদদিগের ঘর হইতে বাহির হইল। কিন্তু সে দিন সে মাছ ধরিতে যাইল না। লোককে জিজ্ঞাসা করিয়া একটি মাঠ পার হইয়া নিকটস্থ একটি গ্রাম অভিমুখে গমন করিতে লাগিল। সেই গ্রামে ডাক্তারখানা ছিল। সেই গ্রামে উপস্থিত হইয়া ডাক্তারের সহিত পরামর্শ করিয়া, সে কুসীর জন্য কিছু ঔষধ ক্রয় করিল। যাহাতে শরীরে বল হয় ও রাত্রিতে নিদ্রা হয়, মেসোমহাশয়ের নিমিত্ত কিছু ঔষধ লইল। কুসীর ঔষধ শিশিতে ও মেসোমহাশয়ের ঔষধ কৌটাতে ছিল। ভুল হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না। পথে আসিতে আসিতে সে দুইটি ঔষধ হইতেই ডাক্তারখানার কাগজ তুলিয়া ফেলিল; কুসীদের বাটীতে আসিয়া সে ঔষধ দুইটি মাসীকে প্রদান করিল। পায়ে কিরূপে ঔষধ লাগাইতে হয়, তাহা ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিতে অনেক বিলম্ব হয়; সেই জন্য তাহা বুঝাইয়া দিবার নিমিত্ত কুসীর নিকট হীরালালকে অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিতে হইল। কুসীর নিকট হীরালাল বসিয়া কেবল যে ঔষধের কথা বলিল, তাহা নহে, বঙ্গদেশের কথা, কলিকাতার কথা, নানাপ্রকার গল্প হইল। পূর্বদিন অপেক্ষা আজ কুসী কিছু ভয়-ভাঙ্গা হইয়াছিল বটে, কিন্তু লজ্জায় সর্বদাই তাহাকে মুখ অবনত করিয়া থাকিতে হইয়াছিল। মাঝে মাঝে কেবল দুই একটি কথার উত্তর দিতে সমর্থ হইয়াছিল। হীরালাল চলিয়া গেলে কুসী মনে মনে ভাবিল,–ইহাকে দেখিলেই আমার এত লজ্জা হয় কেন? অন্য লোককে দেখিলে তো এত লজ্জা হয় না।

    সেই রাত্রিতে গৃহিণীকে সম্বোধন করিয়া মেসোমহাশয় বলিলেন,–ছোকরা বড় ভাল। বড়ঘরের ছেলে। অমনি একটি ছেলের হাতে কুসীকে দিয়া মরিতে পারিতাম। কিন্তু তাহার পরিচয় লইয়া বুঝিতে পারিলাম যে, সে আশা বৃথা। ইহারা বঙ্গদেশের বড় কুলীন; আমাদের ঘরে ইহারা বিবাহ করিবে না।।

    সেই দিন সন্ধ্যাবেলা হীরালাল বলিল,–রামপদ! কুসীদের অবস্থা আমি যতই ভাবিতেছি, ততই আমার মনে দুঃখ হইতেছে। কুসীর মেসোমহাশয় অধিক দিন বোধ হয়, আর বাঁচিবেন না; তখন ইহাদের দশা কি হইবে?

    রামপদ উত্তর করিল,–তুমি দুই দিনের জন্য এখানে আসিয়াছ, ইহাদের কথায় তোমার থাকিবার আবশ্যক কি? তুমি যদি না আসিতে, তাহা হইলে কি হইত? পাড়াপ্রতিবাসী আমরা পাঁচজনে আছি, আমরা অবশ্য দেখিতাম।

    হীরালাল বলিল,–তবে এখন দেখ না কেন? সে দিন দুপয়সার একটি মেটে কলসীর জন্য সে কাঁদিতে লাগিল। নিতান্ত অভাব না হইলে দুই পয়সার কলসীর জন্য কেহ কাঁদে না!

    রামপদ বলিল,–তাহাদের প্রতি যদি তোমার এতই দয়া হইয়াছে, তাহা হইলে তাহাদের দুঃখ নিবারণ কর না কেন? কুসী ব্রাহ্মণের মেয়ে, মনে করলেই তুমি তাহাকে বিবাহ করিতে পার। তুমি বড় মানুষের ছেলে, তোমাদের অর্থের অভাব নাই; তুমি কুসীকে বিবাহ করিলেই তাহাদের দুঃখমোচন হয়।

    হীরালাল উত্তর করিল,–মনে করিলেই আমি সে কাজ করিতে পারি না। অনেক প্রতিবন্ধক আছে।

    রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,–প্রতিবন্ধক কি, তা শুনিতে পাই না?

    হীরালাল উত্তর করিল,–আমি স্বভাবকুলীন, কুসীকে বিবাহ করিলে আমার কুল ভাঙ্গিয়া যাইবে।

    রামপদ বলিল,–লেখা-পড়া শিখিয়া তোমার বিদ্যা বড় মন্দ হয় নাই! এক কর্ম কর,–পাঁচ শত বিবাহ কর, নম্বর-ওয়ারি পত্নীদিগের খাতা কর, এ শশুরবাড়ী হইতে সে শ্বশুরবাড়ী গস্ত করিয়া বেড়াও; দুই তিন বৎসর অন্তর এক এক শ্বশুরবাড়ী গিয়া দেখ যে, চমৎক্তার খোকা-খুকী দ্বারা তোমার স্ত্রীর কোল আলোকিত হইয়া আছে।

    হীরালাল উত্তর করিল,—কুলীনগিরির কথা ছাড়িয়া ক্লিাম। আমি স্বকৃতভঙ্গ হইলেও চারি পুরুষ পর্যন্ত বংশের সম্মান থাকিবে; ততদিন কুলীনগিরি উঠিয়া যাইবে। কিন্তু বিশেষ প্রতিবন্ধক এই যে, আমার পিতামাতা বর্তমান। পিতার অমতে একাজ কি করিয়া করি? তাহার পর দেশে এক ব্যক্তির কন্যার সহিত বিবাহ দিবেন বলিয়া, শিশুকাল হইতে পিতা আমার সম্বন্ধ স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। সে ব্যক্তির এই এক কন্যা ব্যতীত অন্য সন্তানসন্তুনি নাই। তাহার সমুদয় বিষয় আমি পাইব।

    রামপদ উত্তর করিল,–সম্পত্তির কথা বড় ধরিনা। কিন্তু তোমার পিতার অমতে এরূপ কাজ তুমি কি করিয়া করিবে, তাহাই ভাবিতেছি।

    হীরালাল বলিল,–তাহা করিলে পিতা আর আমার মুখদর্শন করিবেন না।

    রামপদ বলিল,–তুমি কলিকাতা চলিয়া যাও; আর তুমি এস্থানে থাকিও না।

     

     

    দশম পরিচ্ছেদ – তোমার কি মত

    হীরালাল সত্বর কলিকাতা চলিয়া যাইবে, ইহাই স্থির হইল। পরদিন প্রাতঃকালে কুসীকে একবার দেখিতে যাইল। মেসোমহাশয়ের বাটীতে গমন করিয়া তাহার নিকট ও মাসীর নিকট সে বিদায় গ্রহণ করিল। তাহার পর, কি সূত্রে সে কুসীর নিকট সে বিদায় গ্রহণ করিবে, তাহাই সে ভাবিতে লাগিল।

    হীরালাল যখন তাহাদের বাটীতে আসিল, তখন কুসী পিড়াতে মাদুরে বসিয়া গৈতা কাটিতেছিল। দূর হইতে হীরালালকে দেখিয়া সে কাটনার ডালাটি আপনার পশ্চাতে লুকায়িত করিল ও তাহার পর ভাল মানুষের মত পুনরায় দেয়ালে ঠেস দিয়া বসিল। হীরালাল কিন্তু ডালা দেখিতে পাইয়াছিল। কুসী এখনও চলিতে ফিরিতে পারে না। হীরালাল তাহার নিকট গিয়া বলিল,–তোমার পায়ের ব্যথা কমে নাই? তুমি বোধ হয়, দোষ কি আর যে পায়ে ভাল করিয়া ঔষধ দাও না। কই! তোমার পা দেখি!

    যদি বা পা একটু ভোলা ছিল, তা হীরালালের এই কথা শুনিবামাত্র সমুদয় পা-টুকু কুসী ভাল করিয়া কাপড় দিয়া ঢাকিয়া ফেলিল।

    হীরালাল হাসিয়া বলিল,–বা! বেশ! আমি পা দেখিতে চাহিলাম, তুমি আরও ভাল করিয়া ঢাকিয়া ফেলিলে! তোমার যে পায়ে আঘাত লাগিয়াছে, সেই পা একবার আমি দেখিব, তাহাতে দোষ কি আছে?

    মাসীও, কুসীকে বকিতে লাগিলেন। মাসী বলিলেন,–একবার পা-টা দেখাইতে দোষ কি আছে? মেয়ের সকল তাতেই লজ্জা!

    হীরালাল কুসীর নিকটে বসিয়া পড়িল। হীরালাল বলিল,–যদি তুমি আপনি আপনি দেখাও তো ভাল, তা না হইলে এখনি তোমার পা আমি টানিয়া বাহির করিব। তখন বেদনায় তুমি কাঁদিয়া ফেলিবে।

    নিরুপায় হইয়া কুসী পা একটু বাহির করিল; কিন্তু হীরালাল যাই পা টিপিয়া দেখিবার উপক্ৰম করিল, আর কুসী তাড়াতাড়ি পুনরায় ঢাকিয়া ফেলিল। হীরালাল ঈষৎ হাসিয়া বলিল,–ভয় নাই! তোমার পা আমি খাইয়া ফেলিব না। একটু হাত দিয়া দেখি, কোথায় অধিক ব্যথা, তাহা হইলে বুঝিতে পারিব।

    পুনরায় পা বাহির করিতে কুসী কিছুতেই সম্মত হইল না। মাসী বকিতে লাগিলেন। হীরালাল বুঝাইতে লাগিল। অনেক সাধ্যসাধনার পর অগত্যা পুনরায় সে পায়ের তলভাগ একটু বাহির করিল। যে যে স্থান স্ফীত হইয়াছিল ও যে, যে স্থানে বেদনা ছিল, হীরালাল টিপিয়া টিপিয়া দেখিলে লাগিল।

    পা পরীক্ষা করিতে করিতে হীরালাল অতি মৃদুস্বরে বলিল,–কুসী কাল আমি কলিকাতা চলিয়া যাইব।

    হীরালাল যাই একথা বলিল, আর তৎক্ষণাৎ কুসী আপনার পা সরাইয়া লইল। যে পা আজ কয়দিন সে অতি ভয়ে-ভয়ে অতি ধীরে ধীরে নাড়িতে-চাড়িতেছিল, এখন ব্যথা, বেদনা, ক্লেশ সব বিস্মৃত হইয়া, সেই পা অতি সত্বর সরাইয়া লইল। কিন্তু এরূপ করিয়া তাহার যে বেদনা হয় নাই তাহা নহে, কারণ, সেই মুহূর্তেই ক্লেশের চিহ্ন তাহার মুখমণ্ডলে প্রতীয়মান হইল।।

    হীরালালের হৃদয়-তন্ত্রী সেই মুহূর্তে বাজিয়া উঠিল। কেন কুসী হঠাৎ আপনার পা সরাইয়া লইল, হীরালাল তাহা বুঝিতে পারিল। কুসী ঈষৎ রাগ করিল; তাহাতেই পৃথিবী অন্ধকার দেখিল। হীরালাল বুঝিল যে, নিয়তি তাকে এই স্থানে টানিয়া আনিয়াছে।কুসী কিনা সংসার বৃথা! জীবন বৃথা! কুলমর্যাদা? ধনসম্পত্তি? কুসীর তুলনায় সে সমুদয় কি ছার বস্তু! আবশ্যক হইলে সে কুসীর নিমিত্ত প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন করিতে পারে। কুসী অভাবে প্রাণে প্রয়োজন কি? তোমরা হীরালালকে দোষ দিও না। এ নূতন কথা নহে, চিরকাল এরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে; এখনও ঘটিতেছে। অসংখ্য নরনারী এই সংসারক্ষেত্রে নিয়তই বিচরণ করিতেছে। স্ত্রী-পুরুষ সম্বন্ধে কিছুদিন ইহলোকে আবদ্ধ থাকিয়া, কালগ্রাসে পতিত হইতেছে। তাহাতে বিশেষত্ব কিছুই নাই। কিন্তু প্রকৃত যে যাহার পুরুষ, প্রকত যে যাহার প্রকৃতি, যখন এইরূপ দুই জনে সহসা চারি চক্ষু হইয়া যায়, তখনই পুরুষ-প্রকৃতির অর্থ মানুষের উপলব্ধি হয়। সেই দুই জনে বুঝিতে পারে যে, তাহারা দুই নহে, তাহারা এক;–এক মন, এক প্রাণ, কেবল দেহ ভিন্ন। তাহারা বুঝিতে পারে যে, এক নিয়তিসূত্রে বিধাতা দুইজনকে একত্রে বন্ধন করিয়াছেন। সে বন্ধন কে বিচ্ছিন্ন করিতে পারে? হীরালাল তাহা বুঝিতে পারিল; কুসী তাহা বুঝিতে পারিল না; কিন্তু অনুভব করিল। অবলম্বিত তরুকে সহসা কাড়িয়া লইলে লতার যে গতি হয়, কুসীর প্রাণের আজ সেই অবস্থা হইল। জগতে আর যেন তাহার কেহই নাই,—সেইরূপ নিঃসহায় ভাব দ্বারা কুসীর মন আচ্ছন্ন হইল; লতার ন্যায় ভূতলে পড়িয়া, কুসীর প্রাণ যেন ধূলায় ধূসরিত হইতে লাগিল। যাহাতে কান্না না আসিয়া যায়, মস্তক অবনত করিয়া কুসী সেই চেষ্টা করিতে লাগিল।

    হীরালাল বলিল,–আমি কলিকাতা যাইব শুনিয়া, তুমি আমার উপর রাগ করিলে?

    কোন উত্তর নাই।

    হীরালাল পুনরায় বলিল,–কুসী! বল না, কি হইয়াছে? চুপ করিয়া রহিলে কেন?

    কোন উত্তর নাই। মস্তক আরও অবনত হইল।

    হীরালাল পুনরায় বলিল,–আমি কলিকাতা যাই, তাহা তোমার ইচ্ছা নহে?

    কোন উত্তর নাই।

    হীরালাল পুনরায় বলিল,–কেবল হাঁ কি না এই দুইটি কথার একটি কথা বল। আমি কলিকাতায় যাইব কি না যাইব? হাঁ কি না?

    কোন উত্তর নাই।

    হীরালাল পুনরায় বলিল,–আমি সত্য বলিতেছি, তুমি যাহা বলিবে, তাহাই আমি করিব। তুমি যদি কলিকাতায় যাইতে বল, তাহা হইলে আমি যাইব; তুমি যদি যাইতে মানা কর, তাহা হইলে আমি যাইব না। আচ্ছা! কথা কহিয়া বলিতে হইবে না; তুমি ঘাড় নাড়িয়া বল,—আমি কি করিব? আমি যাইব কি যাইব না?

    যতদূর সাধ্য, ততদূর মস্তক অবনত করিয়া, কুসী এইবার ঈষৎ ঘাড় নাড়িল।

    হীরালাল বলিল,–তবে আমি যাইব না?

    আরও একটু স্পষ্টভাবে কুসী ঘাড় নাড়িল।

    কিন্তু হীরালাল যেন বুঝিয়াও বুঝিল না। হীরালাল বলিল,–তোমার ঘাড় নাড়া আমি ভালরূপ বুঝিতে পারিতেছি না। এইবার তুমি কথা কহিয়া বল।।

    কুসী অতি মৃদুস্বরে বলিল,–না।

    হীরালাল বলিল,–তা বেশযতদিন আমার ছুটি থাকিবে ততদিন আমি কলিকাতা যাইব না। এখন আমার দিকে চাহিয়া দেখ।

    যদি বা কুসী মুখখানি অল্প তুলিয়াছিল, কিন্তু হীরালাল যাই বলিল,–আমার দিকে চাহিয়া দেখ—আর সেই মুহূর্তেই পুনরায় তাহা অবনত হইয়া গেল।

    হীরালাল বলিল,–আমার দিকে যদি তুমি চাহিয়া না দেখ, তাহা হইলে কিন্তু আমি কলিকাতায় চলিয়া যাইব।

     

    একাদশ পরিচ্ছেদ – সংসারের কথা

    চাহিয়া দেখিবে কি, কুসীর চক্ষু তখন জলে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু হীরালাল কলিকাতা যাইবার ক্স দেখাইল। সেজন্য অগত্যা তাহাকে মুখ তুলিতে হইল। আঁচলে চক্ষু দুইটি মুছিয়া, ঈষৎ হাসিমুখে হীরালালের দিকে সে চাহিয়া দেখিল। কালো মেঘ দ্বারা কতক আচ্ছাদিত,সূর্যকিরণ দ্বারা কতক আলোকিত,—আকাশ যেরূপ দেখায়, কুসীর মুখখানি তখন সেইরূপ দেখাইতে লাগিল।

    হীরালাল বলিল,–আজ কয়দিন দেখিতেছি, তোমার বাম গালে একটু কালি লাগিয়াছে। যখন তোমার হাসি হাসি মুখ হয়, তখন ঠিক ঐ স্থানটিতে টোল পড়ে। তাহাতে বড় সুন্দর দেখায়; সেইজন্য ঐ কালো দাগটি আমি ধুইয়া ফেলিতে বলি নাই।

    আরও একটু সহাস্যবদনে কুসী বলিল,–যাও! তুমি যেন আর জান না! তুমি আমাকে ক্ষেপাইতেছ। ও কালির দাগ নয়, উহাকে তিল, না জরুর, না কি বলে।

    হীরালাল বলিল,–বটে! তবে ছুরি দিয়া চাচিয়া ফেলিলেই চলিবে।

    কুসী বলিল,–যাও!

    হীরালাল বলিল,–কুসী! তামাসার কথা নহে। আমি তোমাকে দুই কথা জিজ্ঞাসা করি। তোমাদের সংসারের কথা। আমাকে পর ভাবিও না। ঠিক ঠিক উত্তর দাও।

    মৃদুস্বরে কুসী জিজ্ঞাসা করিল,—কি কথা?

    হীরালাল বলিল,–তোমার মেসোমহাশয়ের যে রোগ হইয়াছে, তাকে পক্ষাঘাত বলে। ভাল হইয়া আর যে তিনি কাজকর্ম করিতে পারিবেন, তাহা বোধ হয় না। এমন কি, অধিক দিন তিনি না বাঁচিলেও বাঁচিতে পারেন। তাহার অবর্তমানে তোমাদের সংসার চলিবে কি করিয়া, তাহাই আমি ভাবিতেছি।

    হীরালাল যে তাহাকে বিবাহ করিবে, কুসীর মনে সে চিন্তা একেবারেই উদিত হয় নাই। নাটক নভেলের লভ কাহাকে বলে, ভালোবাসা কাহাকে বলে, সে সব কথা কুসী কিছু জানে না। হীরালাল কলিকাতা চলিয়া যাইবে, তাহা শুনিয়া তাহার মনে দুঃখ হইল; পৃথিবী সে শূন্য দেখিল, তাহাই সে জানে। কোন বিষয় গোপন করিতে সে শিক্ষা করে নাই; সেজন্য তাহার মনের ভাব মুখে প্রকাশ হইয়া পড়িল, সেজন্য সে তাহাকে কলিকাতা যাইতে মানা করিল।

    হীরালাল যখন সংসারের কথা জিজ্ঞাস করিল, কুসী তাহার কিছুই উত্তর করিতে পারিল না। সে কেবল বলিল,–আমি জানি না।

    হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,–এখন তোমাদের সংসার কি করিয়া চলিতেছে?

    কুসী উত্তর করিল,–মেসোমহাশয়ের কিছু জমি আছে। তিনি ধান পাইয়াছিলেন। তাহাতেই এখন চলিতেছে।

    হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,—সে ধানে বারো মাস চলে?

    কুসী বলিল,–সে কথা আমি বলিব না। ঘরের কথা বলিতে নাই।

    হীরালাল বলিল,–তবে তুমি আমাকে পর ভাব! এ তোমার বড় অন্যায়। আমার দিব্যি! তোমাকে বলিতেই হইবে। আমি বৃথা এ সব কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি না। বিশেষ কারণ আছে, সেইজন্য জিজ্ঞাসা করিতেছি।।

    নিরুপায় হইয়া কুসীকে সকল কথা বলিতে হইল। লজ্জায় আধোবদন হইয়া সে বলিল,–বারো মাস চলে না। আর অল্পই ধান আছে। পৌষ মাসের এ দিকে পুনরায় আর আমরা ধান পাইব না। সেজন্য যাহাতে পৌষ মাস পর্যন্ত চলে, আমরা তাহাই করিতেছি।

    হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,–সে আবার কি?

    কুসী পুনরায় চুপ করিয়া রহিল। কিন্তু হীরালাল কিছুতেই ছাড়িল না।

    তখন ছলছল চক্ষে কুসী বলিল,–মাসী-মা এখন একবেলা আহার করেন। সেইরূপ করিতে আমিও চাহিয়াছিলাম। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনিলেন না। তাঁহাকে লুকাইয়া যতদূর পারি, ততদূর আমিও অল্প আহার করিতেছি।

    হীরালাল বলিল,–সর্বনাশ! কুসী! তুমি আধপেটা খাইয়া থাক?

    কুসী উত্তর করিল,—না, তা নয়। আমি অধিক করিয়া তরকারি খাই।

    হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,–মাছ-তরকারির পয়সা কোথা হইতে হয়?

    কুসী উত্তর করিল,—মাছ আমরা কিনি না। তরকারি আমাদের কিনিতে হয় না। পাড়ায় যাহার বাড়ীতে যাহা হয়, আমাদিগকে সকলে তাহা দিয়া যায়। তারপর সজিনা শাক আছে, কলমি শাক আছে, ড়ুমুর আছে, থোড় আছে, পাড়িয়া কি তুলিয়া কি কাটিয়া আনিলেই হয়। অধিক করিয়া সেই সব খাইলে আর ক্ষুধা পায় না।

    হীরালাল জিজ্ঞাসা করিলে,–তেল নুন কি করিয়া হয়?

    কাটনার ডালার দিকে দৃষ্টি করিয়া, কুসী উত্তর করিল,–মাসী-মা ও আমি দুজনেই পৈতা কাটি। আমি একদিনে একটা পৈতা কাটিতে পারি। তাহা এক পয়সায় বিক্রীত হয়। মাসী-মা চক্ষে ভাল দেখিতে পান না। দুই দিনে তিনি একটা পৈতা কাটতে পারেন। রাত্রিতে সূতা কাটিলে আমি আরও অধিক পৈতা কাটিতে পারি। কিন্তু তাহাতে তেল খরচ হয়।

    এইসব কথা শুনিয়া হীরালালের মনে বড় কষ্ট হইল। কুসীর দুঃখে হীরালালের বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। আর কোন কথা না বলিয়া, হীরালাল তখন সে স্থান হইতে উঠিল; দ্রুতবেগে রামপদর নিকট গমন করিল। যে পথ দিয়া হীরালাল চলিয়া গেল, কুসী বিরসবদনে একদৃষ্টে সেইদিকে চাহিয়া রহিল। কুসী ভাবিল,–এমন কি কথা বলিয়াছি যে, ইনি রাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। আমরা বড় দুঃখী, সেইজন্য কি ইনি চলিয়া গেলেন? আর কখনও কি আসিবেন না। এইরূপ ভাবিয়া কুসী দীর্ঘনিঃশাস পরিত্যাগ করিল।

    বড় ঘরের নিকট সামান্য একটি রান্নাচালা ছিল। কুসীর মাসী তাহার ভিতর রন্ধন করিতেছিলেন। তিনি গোপনভাবে হীরালাল ও কুসীর ভাব-ভক্তি নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। কিন্তু তাহাদের কথাবার্তা তিনি শুনিতে পান নাই। হীরালাল চলিয়া যাইলে, তিনি বড় ঘরে প্রবেশ করিয়া হাসিতে হাসিতে স্বামীকে বলিলেন,—বিধাতা বা আপনি কুসীর বর আনিয়া দিলেন।

    তাঁহার স্বামী বলিলেন,–তুমি পাগল না কি!

    গৃহিণী বলিলেন,–দেখিতে পাইবে!

    এই বলিয়া পুনরায় তিনি রান্নাচালায় প্রতিগমন করিলেন।

     

    দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – The Die is cast

    বাটী গিয়া হীরালাল বলিল,–রামপদ! The Die is cast (পাশা ফেলিয়াছি; অর্থাৎ এ কাজ করিব বলিয়া সঙ্কল্প করিয়াছি)।

    রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,—কি হইয়াছে?

    হীরালাল উত্তর করিল,–কুসীর মুখে আজ তাহাদের সংসারের কথা যাহা শুনিলাম, তাহাতে আমার মন বড়ই অস্থির হইয়াছে। আমি তাহাকে নিশ্চয় বিবাহ করিব।

    রামপদ বলিল,–তোমার পিতা?

    হীরালাল উত্তর করিল,—আমার কপালে যাহা থাকে, তাহাই হইবে। পিতা অতিশয় রাগ করিবেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। তিনি যেরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লোক, তাহাতে চাই কি আমাকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিলেও দিতে পারেন; আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করিলেও করিতে পারেন। কিন্তু সে ভয় করিয়া আমি কাপুরুষ হইতে পারি না। আজ আমি যাহা শুনিলাম, তাহা শুনিয়া যদি আমি চুপ করিয়া থাকি, যদি যথাসাধ্য তাহার প্রতীকার করিতে চেষ্টা না করি, তাহা হইলে আমা অপেক্ষা নরাধাম আর পৃথিবীতে নাই। এখন তুমি সহায়তা কর।

    রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,—এ বিষয়ে আমি তোমার কি সহায়তা করিতে পারি।

    হীরালাল উত্তর করিল,–তুমি কুসীর মেসোমহাশয়ের নিকট গমন কর। তাহাকে এ বিষয়ে সম্মত কর। তাহার নিকট কোন কথা গোপন করিবে না। আমি যে পিতার বিনা অনুমতিতে এ কাজ করিতেছি, তাহাকে সে কথা বলিবে। পিতার অনুমতি প্রার্থনা করিতে গেলে, এ কাজ যে কিছুতেই হইবে না, তাহাও তাহাকে বলিবে। এই কাজের জন্য আমার পিতা যে আমাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিতে পারেন, তাহাও তাহাকে বলিবে। কারণ, যদি তাহাদের মনে টাকা কি গহনার লোভ থাকে, আর কার্যে যদি তাহা না হয়, তাহা হইলে পরে তাহারা আমার উপর দোষারোপ করিতে পারেন। সেজন্য কোন কথা তাঁহাদিগের নিকট গোপন করিবে না। আর একটা কথা, এই বিবাহ কাৰ্য্য আপাততঃ গোপনে সম্পন্ন করিতে হইবে, দুই বৎসর কাল এ কথা গোপন রাখিতে হইবে। তাহার পরে যাহা হয় হইবে।

    রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,—যদি সত্য সত্যই তোমার পিতা তোমাকে বাটী হইতে দূর করেন, তাহা হইলে তুমি কি করিবে? নিজের বা কি করিবে, আর ইহাদের বা কি উপকার করিতে পারিবে?

    হীরালাল উত্তর করিল,—সেইজন্য বিবাহ গোপন করিতে চাহিতেছি, সেইজন্য এ কথা আপাততঃ গোপন রাখিতে ইচ্ছা করিতেছি। শুন রামপদ! আমি মনে মনে এই স্থির করিয়াছি; কলিকাতার খরচের নিমিত্ত পিতা আমাকে মাসে মাসে টাকা প্রদান করেন, তাহা হইতে আমি কিছু কিছু বাঁচাইতে পারিব। আপাততঃ সেই টাকা আমি মেসোমহাশয়কে দিব। চাকরী করিয়া কুসীর মেসোমহাশয় যে বেতন পাইতেন, তাহা অপেক্ষা আমি অধিক দিতে পারিব। সুতরাং এ পল্লীগ্রামে তাহাদের আর অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট থাকিবে না। তাহার পর, বড়দিনের ছুটির সময় আমি দেশে গিয়া, মাতার নিকট হইতে কিছু টাকা লইয়া আসিব। কুসীর মেসোমহাশয়ের ভালরূপ চিকিৎসা হয় নাই। এ রোগে চিকিৎসা হইলেও যে বিশেষ কিছু ফল হইবে, তাহা বোধ হয় না। তবু, তাঁহাকে কলিকাতা লইয়া গিয়া একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব। সেই সময় কলিকাতাতেই আমি গোপনে কুসীকে বিবাহ করিব। কেবল তুমি ও আর দুই চারিজন আমাদের বন্ধু সে কথা জানিবে, আর কাহাকেও জানিতে দিব না। আমার বোধ হয় যে, পরবৎসর আমি বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিব। যদি বি-এল পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হইতে পারি, তাহা হইলে পরীক্ষার পরেই পিতার নিকট গিয়া সকল কথা প্রকাশ করিব। পিতা যদি ক্ষমা করেন তো ভালই; কিন্তু যদি রাগ করিয়া তিনি আমার খরচপত্র বন্ধ করিয়া দেন, তাহা হইলে ওকালতী করিয়া হউক, অথবা কেরাণীগিরি করিয়া হউক, কুসীকে আমি প্রতিপালন করিতে পারি। সুবিধার বিষয় এই যে, ইহার ভিতর পিতা আমাকে বিবাহ করিতে বলিবেন না। আমি বিএল, কি এম-এ, পাশ করিলে, তবে তিনি আমার বিবাহ দিবেন; এই কথা স্থির হইয়াছে।

    রামপদর সহিত হীরালালের এইরূপ অনেক কথা হইল, দুইজনে অনেক পরামর্শ করিল।

    সেইদিন সন্ধ্যাবেলা কুসীর মেসোমহাশয়ের নিকট গমন করিল। পিতার অমতে হীরালাল এই কাজ করিবে, সেজন্য মেসোমহাশয় প্রথম এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। কিন্তু রামপদ তাহাকে বুঝাইয়া বলিল যে, সম্মতি প্রার্থনা করিতে গেলে হীরালালের পিতা কিছুতেই সম্মতি দান করিবেন না। তাহার এই গীড়িত অবস্থা, তাহার অর্থ নাই, কুসীর পিতার ব্যবহার, এইরূপ নানা বিষয় রামপদ মেসোমহাশয়কে বুঝাইয়া বলিল। মাসী-মাও হীরালালের পক্ষ হইয়া স্বামীকে বুঝাইতে লাগিলেন। অবশেষে অগত্যা কুলীর মেসোমহাশয় এ কাজ করিতে সম্মত হইলেন।

    মেসোমহাশয় বলিলেন,–আমি নিশ্চয় বুঝিতেছি যে, এরূপ কাজ করা আমার উচিত নয়। কিন্তু উপায় নাই। কুসীর পিতাকে আমি কত যে চিঠি লিখিয়াছি, তাহা বলিতে পারি না। আমার একখানি পত্রেরও সে উত্তর দিল না। সে একেবারে বে-হেড হইয়া গিয়াছে। পরমা সুন্দরী মেয়ে, আমার অবর্তমানে তাহার কি হইবে—তাহাই ভাবনা। কোন একটি ভদ্রলোকের ছেলের হাতে তাহাকে সমর্পণ করিয়া যাইতে পারিলে, আমি নিশ্চন্ত হই; সেইজন্য আমি সম্মত হইলাম। যদি ইহাতে কোন পাপ থাকে, ভগবান্ আমাকে ক্ষমা করিবেন।

    হীরালালের সহিত কুসীর বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির হইল। কিন্তু এক রামপদ ভিন্ন এ কথা আর কেহ জানিতে পারিল না।

    এ বিষয়ে আর অধিক কিছু বলিবার নাই। যতদিন কুসীর পায়ে বেদনা ছিল, ততদিন হীরালাল আসিয়া তাহার নিকট বসিয়া গল্প করিত। বেদনা ভাল হইয়া গেলে পাছে হীরালাল আর না আসে, পাছে সেরূপ কথাবার্তা আর না হয়, সেজন্য কুসীর পা সুস্থ হইতে কি কিছু বিলম্ব হইয়াছিল? অবশেষে তাহার পা যখন একান্তই ভাল হইয়া গেল, তখন কুসী কি পায়ের উপর রাগ করে নাই? কি জানি! পরের কথায় আমার আবশ্যক কি! আর একটি কথা, ইহার মধ্যে হীরালালের সহিত কুসীর কি একবারও বিবাদ হয় নাই? একবার কেন? প্রায় প্রতিদিনই বিবাদ হইত। কিরূপে পায়ে ঔষধ দিতে হইবে তাহা লইয়া বিবাদ হইত। হীরালাল দুই বেলা কুসীর কাটনা ডালা ভাঙ্গিয়া দিতে যাইত, তাহা লইয়া বিবাদ হইত। হীরালাল নিজে পৈতা-সূতা কাটিতে গিয়া কুসীর টেকো আড়া করিয়া দিত; তাহা লইয়া ঝগড়া হইত। এইরূপ নানা কারণে দুইজনে বিবাদ হইত। কুসী বড় দুষ্ট! বিবাদের পর প্রায় এক মিনিট কাল সে হীরালালের সহিত কথা কহিত না, মুখ হাঁড়ি করিয়া থাকিত। হীরালাল সেজন্য মাসীর নিকট নালিশ করিত। মাসী বলিতেন,যা বাছা! তোদের ও শিয়াল-কুকুরের ঝগড়া! সেই কথা শুনিয়া কাজেই কুসীর মুখে হাসির উদয় হইত, কাজেই তাহাকে পুনরায় কথা কহিতে হইত। হায়! সে এক সুখের দিন গিয়াছে!

    হীরালালের ছুটি ফুরাইল, পরদিন হীরালাল কলিকাতা যাইবে। সেদিন কতবার হীরালাল কুসীর নিকট বিদায় গ্রহণ করিতে গিয়াছিল। বিদায় গ্রহণ আর ফুরায় না। ভাগ্যে নিমাই হালদারের বাড়ী গ্রামের প্রান্তভাগে ছিল। তা না হইলে, পাড়ার লোকে কি মনে করিত, কে জানে!

    এই সকল বিদায় গ্রহণের সময়, একবার হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,—কুসী! তুমি লিখিতে-পড়িতে পার?

    কুসী উত্তর করিল,–রামপদ ও গ্রামের অন্যান্য লোক মেয়েদের একটি স্কুল করিয়াছে। ছেলেবেলায় সেই স্কুলে আমি পড়িতে যাইতাম। আমার মাসীও লেখাপড়া জানেন। তাহার নিকট আমি রামায়ণ ও মহাভারত পড়িতে শিখিয়াছিলাম।

    হীরালাল বলিল,–আমি তোমার নিকট খানকত খাম দিয়া যাইব। তাহার উপর আমার নাম ও কলিকাতার ঠিকানা লেখা থাকিবে। মাঝে মাঝে আমি তোমাকে পত্র দিব। তোমার মেসোমহাশয় কেমন থাকেন, তুমি আমাকে লিখিবে। মেসোমহাশয় কেমন কেবল তাহাই জানিবার নিমিত্ত হীরালালের বাসনা। কুসীর চিটিতে যে আর কোন কথা লেখা থাকে, তাহা তাহার বাসনা নয়। না, মোটে নয়, একেবারেই নয়। হীরালাল! পৃথিবীর লোক কি সব বোকা।

    পরদিন হীরালাল ও রামপদ কলিকাতা যাত্রা করিল।

     

    ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – শুভ সংবাদ বা মন্দ সংবাদ

    কলিকাতা প্রত্যাগমন করিয়া হীরালাল কলেজে অধ্যয়ন করিতে লাগিল। পিতা তাহাকে যে খরচ দিতেন, তাহা হইতে কিছু টাকা বাঁচাইয়া মেসোমহাশয়ের নিকট সে পাঠাইত। মেসোমহাশয়ের সংসারে অন্নকষ্ট দূর হইল।

    বড়দিনের ছুটির সময় হীরালাল দেশে গমন করিল। হীরালালের আর দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিল। কিন্তু মাতা,কনিষ্ঠ পুত্র হীরালালকেই অধিক ভালবাসতেন। সে যখন যাহা চাহিত, তাহাকে তিনি দিতেন। মাতার নিকট হইতে কিছু টাকা লইয়া হীরালাল কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিল। কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া মেসোমহাশয়কে সে স্থানে আনিবার নিমিত্ত রামপদকে তাহাদিগের গ্রামে প্রেরণ করিল। স্ত্রী ও কুসীকে লইয়া অল্পদিন পরে তিনি কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হীরালাল তাহাদের জন্য একটি বাটী ভাড়া করিয়াছিল। তাহারা সেই বাটীতে রহিলেন।

    বড় বড় ডাক্তার আনিয়া, হীরালাল মেলোমহাশয়কে দেখাইল। কিছুদিন ডাক্তারি চিকিৎসা চলিল; কিন্তু তাহাতে বিশেষ কিছু উপকার হইল না। অবশেষে তাহার কবিরাজী চিকিৎসা হইতে লাগিল।

    পৌষ-মাস মেসোমহাশয় কলিকাতা আসিয়াছিলেন। মাঘ মাসে হীরালালের সহিত কুসীর বিবাহ কার্য সম্পন্ন হইল। মেসোমহাশয় পীড়িত; সেজন্য কুসীর মাসি কন্যা সম্প্রদান করিলেন। বিবাহ অতি গোপনে হইল। কলিকাতার ঠিকা পুরোহিত, ঠিকা নাপিত, রামপদ ও হীরালালের তিন চারি জন বন্ধু, কলিকাতার জনকত সধবা ব্রাহ্মণী, বিবাহ কালে কেবল এই কয়জন উপস্থিত ছিলেন। মেলোমশাহয়ের গ্রামের লোক, অথবা তাঁহারা কি হীরালালের আত্মীয়-স্বজন হেই এ কথা জানিতে পারিল না। দুই বত্সর কাল এ কথা গোপন রাখিতে হইবে, তাহাই তখন স্থির হইল। বিবাহের কিছুদিন পরে মেসোমহাশয় কুসীকে লইয়া স্বগ্রামে প্রত্যাগমন করিলেন।

    পরবৎসর পূজার পূর্বে হীরালাল শুনিল যে, তড়িৎ-চিকিৎসায় পক্ষাঘাত রোগের বিশেষ উপকার হয়। সেজন্যও বটে, আর কুসীর সহিত সাক্ষাৎ হইবে বলিয়াও বটে, রামপদ দ্বারা পুনরায় সে মেসোমহাশয়কে কলিকাতায় আনয়ন করিল। কুসীর সহিত হীরালালের যে বিবাহ হইয়াছিল, রামপদ ভিন্ন গ্রামের অন্য কেহ সে কথা জানিত না। সর্বদা যাতায়াত করিলে প্রতিবাসীদিগের মনে পাছে কোনরূপ সন্দেহ জন্মে, সেজন্য হীরালাল নিজে আর সে গ্রামে বড় যাইত না। সংসার খরচ ও কলকাতা-গমনের ব্যয় সম্বন্ধে কুসীর মাসী সকলকে বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার ভগিনীপতি, অর্থাৎ কুসীর পিতা, পুনরায় টাকা পাঠাইতে আরম্ভ করিয়াছেন।

    মেসোমহাশয় সপরিবারে কলিকাতা আগমন করিলেন। হীরালালের উদ্যোগে তাহার তাড়িৎ-চিকিৎসা হইতে লাগিল। ক্রমে পূজার সময় উপস্থিত হইল। কলিকাতার বিদ্যালয়সমূহ পূজার ছুটিতে বন্ধ হইল। সেই অরকাশে কুসীকে লইয়া হীরালাল কাশী বেড়াইতে গেল। মাসী ও মেসোমহাশয় কলিকাতায় রহিলেন।

    হীরালালের অনেক দেশের লোক কাশী-বাসী হইয়া আছে। পাছে তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ হয়, পাছে তাহারা হীরালালের বাসায় আসিয়া কুসীকে দেখিতে পায়, সেই ভয়ে সে কাশীর বাহিরে একটি বাগানের ভিতর নিভৃতে বাস করিতেছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর কুসীকে লইয়া সে নানাস্থানে বেড়াইতে যাইত। সেইজন্য কসী কাশীর পথ-ঘাট চিনিতে সমর্থ হইয়াছিল।

    স্ত্রীলোক সঙ্গে লইয়া একাকী বিদেশে যাইতেছে, চোর-ডাকাত মন্দলোকের ভয় আছে, সেজন্য কোন বন্ধুর নিকট হইতে হীরালাল একটি পাঁচনলি পিস্তল চাহিয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু পিস্তলের পাস তাহার নিকট ছিল না। কাশীতে গিয়া সে কথা তাহার স্মরণ হইল। যে বাগানে সে বাস করিতেছিল, সে স্থানে পিস্তল ছুঁড়িলে পাছে পুলিসের লোক আসিয়া কোন কথা জিজ্ঞাসা করে, সে নিমিত্ত একদিন প্রাতঃকালে সে দূরে মাঠের মাঝে গিয়ে নির্জন স্থানে বসিয়া পিস্তলটি পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছিল। পিস্তলের ব্যবহার হীরালাল ভালরূপে জানিত না। অসাবধানবশতঃ সহসা একবার আওয়াজ হইয়া, তাহার স্কন্ধদেশে গুলি প্রবেশ করিল। বয়োঃক্রমসুলভ সাহস ও চপলতাবশতঃ নিজেই ছুরি দিয়া তাহার স্কন্ধের মাংস কাটিয়া সে গুলিটি বাহির করিয়াছিল। তাহার পর চাদরখানি ছিড়িয়া সেই ক্ষতস্তানের উপর বাঁধিয়া, বাসায় প্রত্যাগমন করিয়াছিল। সেই ক্ষতস্থান হইতে অতিশয় রক্তস্রাব হয়। বলা বাহুল্য যে, হীরালাল কাশীর সেই বাবু ব্যতীত আর কেহ নহে। পিস্তলের গুলির দ্বারা সে আহত হইয়াছে। তাহা শুনিয়া কুসীর পাছে অতিশয় ভয় হয়, পাছে কান্নাকাটি করে, সেজন্য এ ঘটনার প্রকৃত বিবরণ কুসীকে প্রদান করে নাই।

    পূজার ছুটির পর হীরালাল কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিল। তড়িৎ-চিকিৎসায় মেসোমহাশয়ের প্রথম প্রথম কিছু উপকার হইয়াছিল বটে কিন্তু সে উপকার চিরস্থায়ী হইল না। আরোগ্যলাভ সম্বন্ধে হতাশ হইয়া, মেসোমহাশয়, স্ত্রী ও কুসীকে লইয়া গ্রামে প্রত্যাগমন করিলেন।

    হীরালাল যখন কাশী গিয়াছিল, সেই সময় দেশে এক বড় শোচনীয় ঘটনা ঘটিয়াছিল। পূজার ছুটির সময় রামপদ গ্রামে গিয়াছিল। ছুটির শেষ ভাগে রামপদ ম্যালেরিয়া জ্বর দ্বারা আক্রান্ত হইয়া, চারিদিনের জ্বরে মৃত্যুমুখে পতিত হইল। কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া হীরালাল সেই শোকসংবাদ শুনিয়া, নিতান্ত কাতর হইয়া পড়িল। রামপদ উচ্চভাবাপন্ন পরোপকারী সত্যনিষ্ঠ যুবক ছিল। দেশের দূরদৃষ্ট যে, এরূপ যুবক অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হইল!

    ক্রমে শীতকাল উপস্থিত হইল। অগ্রহায়ণ মাসে আর একটি বিপদ ঘটিল। একদিন রাত্রিকালে কিরূপ এক প্রকার শব্দ হইয়া, মেসোমহাশয়ের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাৰ্য্য সম্পন্ন হইতেছিল। সেই শব্দে তাহার গৃহিণীর ও কুসীর নিদ্রাভঙ্গ হইল। দুইজনে উঠিয়া দেখিলেন যে, মেসোমহাশয়ের জ্ঞান নাই, মুখে কথা নাই। তাহার পরদিন তাহার মৃত্যু হইল। সকলেই জানিত যে, তিনি আর অধিক দিন জীবিত থাকিবেন না। তাহার পর, শেষ অবস্থায় তাহার বাঁচিয়া থাকা এক প্রকার বিড়ম্বনা হইয়াছিল। সে তাহার মৃত্যুজনিত শোক পূর্ব হইতেই আত্মীয়-স্বজনের একপ্রকার সহ্য হইয়াছিল। এখন কুসীর অভিভাবক বল, সহায় বল, সম্পত্তি বল, এক হীরালাল ব্যতীত জগতে আর কেহ রহিল না।

     

    চর্তুদশ পরিচ্ছেদ – ঘোরতর অপমান

    মেসোমহাশয়ের মৃত্যুর অল্পদিন পরেই বি-এল পরীক্ষার সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। কুসীর অবস্থা স্মরণ করিয়া, হীরালাল রাত্রিদিন পরিশ্রম করিয়াছিল। বি-এল পরীক্ষায় সে অনায়াসে উত্তীর্ণ হইল। এম-এ পরীক্ষা সে দিয়াছিল কি না তাহা আমি জানি না, বলিতে পারি না।।

    বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, হীরালাল তৎক্ষণাৎ দেশে গমন করিতে পারে নাই। বৈশাখ মাসে সে দেশে গমন করিল। দেশ হইতে কুসীকে যে দুইখানি পত্র সে লিখিয়াছিল, তাহা আমি দেখিয়াছি। কুসী ও হীরালাল, এই দুইজনের মধ্যে যেরূপ পবিত্র প্রণয়, তাহাতে সে পত্র সাধারণের পাঠোপযোগী নহে। এরূপ অবস্থায় বাক্য দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করিতে না পারিয়া, হৃদয়ের আবেগে মানুষ কত কি যে বলিয়া ফেলে তাহা পাঠ করিলে লেখককে পাগল বলিয়া সন্দেহ হয়। হীরালালকে সাধারণের নিকট হাস্যাস্পদ করা আমার অভিপ্রায় নহে। সে নিমিত্ত দুইখানি চিঠির কেবল সারাংশ এ স্থানে প্রদান করিলাম।

    প্রথম চিঠিখানির সারাংশ এইরূপ,–

    প্রাণাধিকা কুসী!

    আমি নিরাপদে বাটী পৌছিয়াছি। আমাকে দেখিয়া পিতা, মাতা, ভ্রাতা সকলেই সাতিশয় আনন্দিত হইয়াছেন। পিতার নিকট এখনও আমাদের গোপন কথা বলিতে সাহস করি নাই। এত আনন্দে পাছে নিরানন্দ হয়, এত আদরে পাছে আমার অনাদর হয়, সেই ভয়ে আমি যেন কাপুরুষের মত হইয়া আছি। কিন্তু শীঘ্রই আমাকে সে কথা বলিতে হইবে। কারণ, ইহার মধ্যেই পূর্বসম্বন্ধ অনুসারে আমার বিবাহের কথা দুই একবার উত্থাপিত হইয়াছিল। দুই একদিনের মধ্যে সাহসে ভর করিয়া পিতার নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত প্রকাশ করিব; তাহার পর, কপালে যাহা আছে, তাহাই হইবে। পিতা আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লোক; সেইজন্য আমার বড় ভয় হইতেছে।

    চারি পাঁচ দিন পরে কুসী দ্বিতীয় পত্রখানি পাইল। তাহার মর্ম এইরূপ—

    প্রাণাধিকা কুসী!

    ঘোর বিপদ! আমি আজ পনর মাস ধরিয়া যে ভয় করিতেছিলাম, তাহাই ঘটিয়াছে। তোমার সহিত আমার বিবাহের কথা পিতার নিকট প্রকাশ করিলাম। ক্রোধে পিতা কাপিতে লাগিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন,–তোর আর মুখদর্শন করিব না। এই মুহূর্তে তুই আমার বাড়ী হইতে দূর হইয়া যা। আমি চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। মনে করিলাম যে, একটু রাগ পড়িলে তিনি আমাকে ক্ষমা করিবেন। কিন্তু কুসী! কি ঘৃণার কথা। আমাকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিবার নিমিত্ত তিনি দ্বারবানদিগকে আজ্ঞা করিলেন!

    এরূপ অপমানিত আমি জন্মে কখনও হই নাই। শিশুকাল হইতে আমি আদরে লালিত-পালিত হইয়াছিলাম। দ্বারবান আমাকে গলা ধাক্কা দিয়া বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিবে! ছি ছি, কি ঘৃণার কথা।

    যাই হউক কুসী, ভয় করিও না। তোমার জন্য আমি এরূপ অপমানিত হইলাম, সেজন্য মনে তুমি দুঃখ করিও না।।

    পিতা আমার মুখ দেখিবেন না? বেশ! আমিও তাহাকে আমার মুখ দেখাইতে ইচ্ছা করি না। আমি তাহার বাড়ীতে আর যাইব না। তাহার টাকা, তাহার সম্পত্তি—আমি আর কিছুই চাই না। লজ্জায় ঘৃণায় ক্রোধে আমি আত্মহত্যা করিব বলিয়া, মনে করিয়াছিলাম। আমি মনে করিলাম যে, যেমন তিনি আমাকে অপমান করিয়েছেন, তেমন আমি তাহাকে পুত্রশোকে কাতর করিব। অপমানের জ্বালায় আমি এত জ্ঞানশূন্য পাগলের মত হইয়াছিলাম যে, আমার নিশ্চয় বোধ হয়, আমি এ কাজ করিয়া ফেলিতাম। কিন্তু কুসী! তিমিরাবৃত আকাশে যেরূপ চাঁদের উদয় হয় আমারও অন্ধকারময় মনে সেই সময় তোমার চাঁদ মুখখানি উদয় হইল। সেই মধুমাখা মুখখানি স্মরণ করিয়া, আমার মন হইতে সকল দুঃখ দুর হইল।

    যাহা হউক, কুসী! তুমি ভয় করিও না। আমি যদি মানুষ হই, আমার নাম যদি হীরালাল হয়, তাহা হইলে দেখিও, আমি অর্থ উপার্জন করিতে পারি কি না। সেজন্য, কুসী, তুমি কিছুমাত্র ভয় করিও না। তবে আপাততঃ তোমাকে বসনে-ভূষণে সুসজ্জিত করিতে পারিলাম না, তাহাই আমার দুঃখ।

    আমি একজন প্রতিবাসীর বাটীতে আছি। অদ্য সন্ধ্যাবেলা সেই স্থানে গোপনে মাতার সহিত সাক্ষাৎ করিব। তাহার নিকট হইতে বিদায় হইয়া, কল্যই কলিকাতা রওনা হইব। দুই চারিদিনের মধ্যে তোমার সাক্ষাৎ হইলে সমুদয় বৃত্তান্ত আরও ভাল করিয়া তোমাকে বলিব।

    দুই চারিদিন অতীত হইয়া গেল, আট দিন অতিবাহিত হইল, দশ দিন অতিবাহিত হইল, হীরালাল কুসীর সহিত সাক্ষাৎ করিল না। হীরালাল আর কোন চিঠিপত্র লিখল না। হীরালালের কোন সংবাদ নাই। কুসী ও তাহার মাসী-মা বড়ই উদ্বিগ্ন হইলেন। দিনের পর দিন যতই যাইতে লাগিল। কুসী যে কোনও সন্ধান লইবে, তাহার উপায় ছিল না। কাহাকে সে পত্র লিখিবে? পাছে কুসীর পত্র কাহারও হাতে পড়ে, সে জন্য হীরালাল তাহাকে দেশের ঠিকানাসম্বলিত খাম দিয়া যায় নাই। হীরালালের বাড়ী কোথায়, কুসী তাহা জানিত না। মাসীও জানিতেন না। জানিত কেবল রামপদ, আর জানিতেন মেসোমহাশয়। তাহারা জীবিত নাই। তাহার পর হীরালালের ঠিকানা জানিলেও কুসী কি করিয়া পত্র লিখিবে! সে নিজের বাড়ীতে নাই। তাহার পিতা তাহার উপর খড়গহস্ত হইয়াছেন। বিবাহর সময় হীরালালের যে দুই চারজন বন্ধু উপস্থিত ছিল, তাহাদের নাম-ধাম কুসী কিছুই জানে না। হীরালালের সন্ধান করিবার কোন উপায় ছিল না। পনর দিন এইভাবে কাটিয়া গেল। দুর্ভাবনার আর সীমা পরিসীমা রহিল না।।

    যোল দিনের দিন, কুসী দূর হইতে ডাক-পেয়াদাকে দেখিতে পাইল। কুসীর আর আনন্দের সীমা রহিল না। ডাকহরকরা তাহাদের বাড়ী পর্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হয়, সে বিলম্ব কুসীর সহ্য হইল না। দৌড়িয়া আগে গিয়া তাহার নিকট হইতে পত্ৰ চাহিয়া লইল। একখানি ছাপা কাগজ ডাকে আসিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের উপর যে শিরোনামা লেখা ছিল, তাহা দেখিয়া কুসীর মুখখানি মলিন হইল। দুইখানিই তাহার মাসীর নামে আসিয়াছিল। শিরোনামা হীরালালের হস্তাক্ষরে লিখিত হয় নাই। অজানিত অপরিচিত হস্তাক্ষরে মাসীকে কে পত্র লিখিল, কাগজ ও চিঠিখানি হাতে লইয়া কুসী তাহাই ভাবিতে লাগিল। চিঠিখানির সহিত আর একখানি ক্ষুদ্র হরিদ্রাবণের কাগজ সংলগ্ন ছিল।

     

    পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ – রেজিষ্টারি চিঠি

    ডাকহরকরা বলিল,–একখানি রেজিষ্টারি চিঠি, বাড়ী চল, রসিদে সহি করিয়া দিবে। তোমার মাসীর চিঠি।

    চিঠি ও কাগজখানি হাতে লইয়া, বিরসবদনে কুসী গৃহ অভিমুখে চলিতে লাগিল। ডাকহরকরা তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতে লাগিল। গৃহে আসিয়া কুন্সী ঘরের ভিতর হইতে দোয়াত-কলম বাহির করিয়া দিল। মাসী রসিদে স্বাক্ষর করিলেন। ডাকহরকরা মোহর দেখিয়া লইতে বলিল। মোহর ঠিক ছিল। চিঠি দিয়া ডাকহরকরা চলিয়া গেল।

    চিঠিখানির চারিদিকে সূতা দিয়া বাঁধা ছিল, খামের বিপরীত দিকে সেই সূততার সহিত জড়িত গালার মোইর ছিল। দাঁত দিয়া কুসী সূতা ছিন্ন করিয়া চিঠিখানি মাসীর হাতে দিল। ছাপা কাগজখানি সে আপনি খুলিতে খুলিতে বলিল,–এ দেখিতেছি খবরের কাগজ। তোমার নামে আবার খবরের কাগজ কে পাঠাইল?

    মাসীও সেই সময়ে চিঠিখানি খুলিলেন। চিঠির সঙ্গে অনেকগুলি নোটও বাহির হইয়া পড়িল। পত্রখানি দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু বয়সের গুণে মাসীর দৃষ্টিশক্তির হ্রাস হইয়াছিল। পড়িতে তাহার বিলম্ব হইল।।

    খবরের কাগজখানি খুলিয়া কুসী দেখিল যে, তাহার একপার্শ্বে লাল রেখার দ্বারা কে চিহ্নিত করিয়াছে; প্রথমেই কুসী সেই অংশ পাঠ করিতে লাগিল।

    কিছুক্ষণ পরেই অতি কাতর স্বরে কুসী বলিয়া উঠিল,—এ কি মাসি! এ কি সর্বনাশ।

    এই কথা বলিয়া সে মাসীর দিকে দৃষ্টি করিল। সে দেখিল যে, পত্রখানি মাসীর হাতে আছে বটে, কিন্তু তিনি তাহা পড়িতেছেন না। মাসীর হাত থর-থর করিয়া কাপিতেছে।

    মাসীর হাত হইতে কুসী চিঠিখানি কাড়িয়া লইল। নিমেষের মধ্যে তাহার চক্ষু পত্রের উপর হইতে নীচে পর্যন্ত ভ্রমণ করিল। পরক্ষণেই কুসী মূচ্ছিত হইয়া ভূতলে পতিত হইল।

    প্রতিবাসীদিগের নিকট এখন আর কোন কথা গোপন করিবার আবশ্যকতা ছিল না। কিন্তু গত পনর মাস ধরিয়া কুসীর বিবাহের কথা মাসী সকলের নিকট গোপন করিতে ছিলেন। এ কথা গোপন করা তাহার একপ্রকার অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল। সেই অভ্যাসবশতঃ তিনি চীৎকার করিয়া ক্রন্দন করিলেন না। কোনরূপ গোল করিলেন না। তাহার নিজেরও মূৰ্ছা হইবার উপক্রম হইয়াছিল। কিন্তু বিশেষরূপ চেষ্টা করিয়া, তিনি আপনার মন সংযত করিলেন। তাহার চক্ষেও সেই সময় জল আসিয়া গেল, সেই জলের সহায়তায় তিনি কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্য ধরিতে সমর্থ হইলেন। মূর্তিা কুসীকে কোলে লইয়া তিনি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন; তজোপোষের উপর সেই অবসন্ন দেহ শয়ন করাইলেন। তাহার পর, পুনরায় বাহিরে আসিয়া চিঠি, নোট ও খবরের কাগজ লইয়া গেলেন। ঘরের ভিতরে একটি ভাঙ্গা বাক্সের ভিতর সাবধানে সেগুলি রাখিয়া দিলেন।

    চিঠিপত্র রাখিয়া মাসী কুসীর নিকট আসিয়া উপবেশন করিলেন। কুসীর মুখে জল দিয়া তাহার শিয়রে বসিয়া নীরবে তাহাকে বাতাস করিতে লাগিলেন। তাহার চক্ষু হইতে ক্রমাগত বারিধারা বিগলিত হইতে লাগিল। কথা কহিবার তাহার শক্তি ছিল না।

    কিছুক্ষণ পরে কুসী একবার চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া দেখিল। কিন্তু সে পাগলের দৃষ্টি, সহজ দৃষ্টি নহে। কি ঘটনা ঘটিয়াছে, কেন সে বিছানায় শুইয়া আছে, মাসী কেন কাঁদিতেছেন, কুসী যেন কিছুই জানে না। একদৃষ্টিতে একদিক্‌ পানে সে চাহিয়া ভাবিতে লাগিল। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া, সকল কথা তাহার যেন স্মরণ হইল। যা তাহার স্মরণ হইল, আর,মাসী! এ কি হইল!—এই কথা বলিয়া সে পুনরায় মূচ্ছিত হইল।

    ক্ষণকালের নিমিত্ত জ্ঞান ও পরক্ষণেই অজ্ঞান, এইরূপ অবস্থা কুসীর বার বার হইতে লাগিল। তাহার নিকট বসিয়া নীরবে মাসী কাঁদিতে লাগিলেন ও তাহার শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন।

    সন্ধ্যার পূর্বে ডাকহরকরা চিঠি দিয়া গিয়াছিল। ক্রমে সন্ধ্যা হইল, ক্রমে রাত্রি হইল। রাত্রি যখন প্রায় দশটা, তখন কুসীর ভালরূপে একবার জ্ঞানের উদয় হইল। কুসী বলিল,–মাসী।

    সে চিঠি আর সে কাগজ একবার দেখি।

    নীরবে বাক্স হইতে চিঠি ও কাগজ আনিয়া তিনি কুসীর হাতে দিলেন। তজোপোষের নিকট প্রদীপটি সরাইয়া দিলেন। কুসীর চক্ষুতে জলের লেশমাত্র নাই। ধীরভাবে বিশেষরূপে মনোযোগের সহিত কুসী পত্রখানি প্রথম আদ্যোপান্ত পাঠ করিল। তাহার পর খবরের কাগজের লাল চিহ্নিত স্থানটিও সেইরূপ ধীরভাবে পাঠ করা যেই সমাপ্ত হইল, আর কুসীর হাত কাঁপিতে লাগিল। তাহার হাত হইতে কাগজ দুইখানি পড়িয়া গেল। অবশেষে প্রবল বেগে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, কুসী পুনরায় মূর্হিত হইল।

    সে চিঠি ও সংবাদপত্র আমি দেখিয়াছি। চিঠিখানিতে এইরূপ লেখা ছিল—

    প্রণাম পুরঃসর নিবেদন–

    হীরালালবাবু আমার পরম বন্ধু ছিলেন। গত ১৯শে বৈশাখ রাত্রিকালে পদ্মা নদীতে নৌকাড়ুবি হইয়া, তিনি মারা পড়িয়াছেন। সেজন্য আমি যে কি পর্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি, তাহা বলিতে পারি না বিধাতার লিখন, কে খাইতে পারে?

    আপনার নিকট পাঠাইবার নিমিত্ত, দেশ হইতে হীরালালবাবু আমার নিকট দুইশত টাকা প্রেরণ করিয়াছিলেন। কার্যে ব্যস্ত থাকা প্রযুক্ত এতদিন আমি পাঠাইতে পারি নাই। এক্ষণে সেই টাকা আপনার নিকট পাঠাইলাম।

    হীরালালবাবুর নব-বিবাহিতা পত্নীর জন্য আমি বড়ই কাতর হইয়াছি। তাহাকে আপনি বিশেষ সাবধানে রাখিবেন। অধিক আর কি লিখিব। ইতি—লোচন ঘোষ।

    লোচন ঘোষ কে, তাহা মাসীও জানিতেন না। লোচন ঘোষের নাম পর্যন্ত মাসী কখনও শ্রবণ করেন নাই। চিঠিতে তাহার ঠিকানা ছিল না।

    খবরের কাগজে সংবাদটি এইরূপে প্রকাশিত হইয়াছিল;–

    পদ্মা নদীতে সম্প্রতি এক বিষম দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। সেদিন হরিহরপুর হইতে একখানি নৌকা গোয়ালন্দ অভিমুখে আসিতেছিল। দাঁড়ি-মাঝি ব্যতীত নৌকাতে অনেকগুলি আরোহী ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ ঝড় উঠিয়া নৌকাখানি জলমগ্ন হইল। দুইজন মাঝি ব্যতীত নৌকার সমস্ত লোক জলমগ্ন হইয়া মারা পড়িয়াছে। আমরা শুনিয়া আরও দুঃখিত হইলাম যে, মজিদপুরের সুপ্রসিদ্ধ জমিদার শ্রীযুক্ত বাবু বিধুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কনিষ্ঠ পুত্র হীরালালবাবু এই নৌকাতে ছিলেন। হীরালালবাবু বাটীতে রাগ করিয়া কলিকাতা আসিতেছিলেন। সে নিমিত্ত তিনি এরূপ নৌকাতে আরোহন করিয়াছিলেন। হীরালালবাবু গত বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। তাঁহার অকালমৃত্যুতে আমরা নিতান্ত দুঃখিত হইলাম।

    পূর্বেই বলিয়াছি যে, এই সমুদয় পূর্ব-বিবরণ কুসীর মাসী আমাকে যে ভাবে বলিয়াছিলেন, আমি এ স্থানে সে ভাবে বলি নাই। আমি আমার নিজের কথায় তাহা বর্ণনা করিলাম। কুসুমের মাসী এই সমুদয় পূর্ব কথা অতি সংক্ষেপে বলিয়াছিলেন। এই সমুদয় কথা বলিতে অতি অল্প সময়ই লাগিয়াছিল। পরে অন্য লোকের নিকট হইতে আমি যে সমুদয় তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়াছি, তাহাও এই মাসীর বিবরণের ভিতর যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়াছি। সে জন্য আমার বিবরণ কিছু বিস্তারিত হইয়াছে।

    কুসুমের মাসী এই পর্যন্ত পূর্ব-পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, এমন সময় রসময়বাবু দূর হইতে জিজ্ঞাসা করিলেন,—তোমাদের কথা এখনও শেষ হয় নাই? এদিকে যে অনেক কাজ পড়িয়া আছে! তাহার উত্তরে, মাসী অল্প উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন,—যাই!

    তাহার পর আমাকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, রায় মহাশয় এদিকে আসিতেছে। দোহাই তোমার! প্রকাশ করিও না। আমার মুখে চুণ কালি দিও না। আর সকল কথা পরে বলিব।

    রসময়বাবু নিকটে আসিয়া শালীকে বিবাহ সম্বন্ধে কোন একটা দ্রব্যের কথা বলিলেন। কুসুমের মাসী তৎক্ষণাৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

    তাহার পর রসময়বাবু আমাকে বলিলেন,–কুসুমের কি রোগ হইয়াছে, অহা কি কিছু বুঝিতে পারিলেন? এখন একটু যেন ভাল আছে বলিয়া বোধ হয়। আমার স্ত্রীর অনেক সাধ্য সাধনায় এখন একটু দুধ পান করিয়াছে।

    আমি উত্তর করিলাম,–কতকটা বুঝিয়াছি; তাহাকে একটু ঔষধ দিতে হইবে। একটা শিশি দিতে পারেন?এই কথা বলিয়া আমি বাহিরে গমন করিলাম। রসময়বাবুও একটা শিশি লইয়া বাহিরে আসিলেন।

    আমার ব্যাগ হইতে ঔষধ বাহির করিয়া, তাহা প্রস্তুত করিতে করিতে আমি ভাবিলাম,—তবে এ বিধবা বিবাহ। বাবু জীবিত নাই। যাহাদের কন্যা, তাহারা বুঝিবে। আমার কথায় কাজ কি? কিন্তু বাবুর জন্য আমার বড় দুঃখ হইল। তাহার সেই হাসি মুখখানি আমার মনে পড়িতে লাগিল। ঔষধ প্রস্তুত করিয়া আমি রসময়বাবুকে দিলাম; তিনি বাটীর ভিতর গমন করিলেন। আমি বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন করিলাম।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleনিতু বলছি – তৌহিদুর রহমান
    Next Article ছেড়ে আসা গ্রাম – দক্ষিণারঞ্জন বসু
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }