Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় রচনাবলী

    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প591 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন

    চতুর্থ ভাগ
    প্রথম পরিচ্ছেদ – মৃত্যু নহে মূর্চ্ছা

    বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন করিয়া, নীরবে একপার্শ্বে আমি উপবেশন করিলাম। সে স্থানে বসিয়া একবার দিগম্বরবাবুর মুখপানে চাহিয়া দেখি, একবার বাবুর মুখখানি স্মরণ করি। দেবকুমার ও বাঁদরের যদি তুলনা হয়, তথাপি এ দুইজনে তুলনা হয় না। বাবুর জন্য শোক হইল, কুসীর দুঃখে ঘোরতর দুঃখিত হইলাম। আজ কুসীর মৃত্যু না হউক, কিন্তু কুসী যে আর অধিক দিন বাঁচিবে না, তাহা এখন আমি নিশ্চয় বুঝিলাম। কুসী মরিয়া যাইবে, তাহা ভাবিয়া আর আমার বড় কষ্ট হইল না। বাবু যে স্থানে গিয়াছে, কুসীও সেই স্থানে যাউক, এখন বরং সে ইচ্ছা আমার মনে উদয় হইল।

    রাত্রি দশটা বাজিয়া গেল, পুনরায় বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইল। রসময়বাবু নিজে এবার বর লইতে আসিলেন।

    আমাকে দেখিয়া তিনি বলিলেন,–আপনি এখানে বসিয়া আছেন? আপনাকে এতক্ষণ খুঁজিতেছিলাম। কেন ভাই, এত বিমর্ষ কেন?

    আমি উত্তর করিলাম,—আপনার কন্যার জন্য আমি কিছু চিন্তিত আছি।

    রসময়বাবু উত্তর করিলেন,–একবার এই কাজটা ভালয় ভালয় হইয়া গেলে হয়। স্ত্রীলোক। গহনা-গাঁটি পাইয়া মনে আনন্দ হইলে, এরূপ ভাবটা কাটিয়া যাইবে। শুনিয়াছি, বাতশ্লেষ্ম বিকার হইলে একটা না একটা অঙ্গহানি হয়; অঙ্গহানি না হইয়া কুসীর মন বিকৃত হইয়াছে।

    বর ও বরযাত্রিগণ গাত্ৰোস্থান করিলেন। রসময়বাবুর বৈঠকখানাটি প্রশস্ত ছিল; তাহার একপার্শ্বে বাড়ীর ভিতরের সামিল ছোট একটি ঘর ছিল। বৈঠকখানার সেই অংশে ক্ষুদ্র ঘর দিয়া বাটীর ভিতর যাইবার দ্বারের নিকট কন্যা সম্প্রদানের স্থান হইয়াছিল। বৈঠকখানার অবশিষ্ট অংশে বরযাত্রী ও কন্যা যাত্রীদিগের বসিবার স্থান হইয়াছিল। বর, বরযাত্রী ও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগন সভায় উপবেশন করিলেন। রসময়বাবুর বাটীর বাগান ও সম্মুখে প্রশস্ত রাজপথ লোকে পূর্ণ হইয়া গেল। বাটীর ভিতর বাঙ্গালী, পঞ্জাবী ও হিন্দুস্থানী স্ত্রীগণের কলরব প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল।

    বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইল। কন্যা সম্প্রদান করিবার নিমিত্ত রসময়বাবু সভাস্থ লোকদিগের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তাহার পর, বিবাহ স্থানে তিনি নিজের আসনে গিয়া উপবেশন করিলেন; বর তাহার সম্মুখে উপবিষ্ট হইলেন। দুই পুরোহিত দুইজনের পশ্চাতে বসিলেন।

    যথাবিধি সঙ্কল্পাদি মন্ত্র পাঠের পর, বিবাহ স্থলে কন্যা আনয়নের নিমিত্ত আদেশ হইল। একপার্শ্বে বসিয়া নীরবে আমি এই সমুদয় ব্যাপার দর্শন করিতে লাগিলাম। একজন বলিষ্ঠ পঞ্জাবী স্ত্রীলোক কন্যাকে কোলে করিয়া বাহিরে আনিল। তাহার পশ্চাতে কুসুমের মাসী ও অন্যান্য স্ত্রীগণ আগমন করিলেন।

    পূর্বেই বলিয়াছি যে, বৈঠকখানার যে পার্শ্বে কন্যা-সম্প্রদানের নিমিত্ত স্থান হইয়াছিল, তাহার পশ্চাদিকে বাড়ীর ভিতরের সামিল ছোট একটি ঘর ছিল। সেই দ্বারের নিকট কুসুমের মাসী ও অন্যান্য স্ত্রীগণ উপবেশন করিলেন।

    পঞ্জাবী স্ত্রীলোকটি কন্যাকে আনিয়া নির্দিষ্ট আসনে বসাইল। কিন্তু যাই সে ছাড়িয়া দিল, আর কন্যা তৎক্ষণাৎ মুখ থুবড়িয়া ভূতলে পতিত হইল।

    কি হইল, কি হইল বলিয়া কন্যার পিতা, বর, পুরোহিতদ্বয় ও অন্যান্য লোক ব্যস্ত হইয়া তুলিতে গেলেন! চারিদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়িয়া গেল। বাটীর ভিতর দিকে সেই ছোট ঘরটিতে কুসুমের মাসী বসিয়াছিলেন। ও মা! এ কি হইল। বলিয়া তিনি কাঁদিয়া উঠিলেন। সে স্থানে উপবিষ্টা অন্যান্য স্ত্রীগণও তাহার কান্নার সহিত আপন আপন সুরে জুড়িয়া দিলেন।

    আমি অন্যমনস্ক হইয়া কি ভাবিতেছিলাম। সহসা এই গোলযোগে আমার চমক হইল। আমি ডাক্তার,আমি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না; সত্বর সেই ধরাশায়িনী কন্যার নিকট গিয়া উপস্থিত হইলাম।।

    রসময়বাবু, কন্যার এক হাত ধরিয়া, তাহাকে তুলিতে চেষ্টা করিতেছিলেন; দিগম্বর বাবু অপর হাত ধরিয়া টানাটানি করিতেছিলেন। আমি তাহাদিগকে নিষেধ করিলাম।

    কুসুমের মুখ পাত্রের উপর পড়িয়াছিল। নিকটে বসিয়া অতি সাবধানে তাহার মুখটি তুলিয়া, আমি আমার উরুদেশে রাখিলাম। তাহার মুখটি ফিরাইয়া আমি দেখিলাম যে, তাহার নাসিকা হইতে শশাণিস্রাব হইতেছে, আম্রপাত্রের কাণা লাগিয়া তাহার ওষ্ঠও কাটিয়া গিয়াছে। সেই কর্তিত স্থান দিয়াও রক্ত পড়িতেছিল। নাসিকা ও মুখে রক্ত দেখিয়া আমার বড় ভয় হইল। মনে করিলাম যে, কুসুম বরাবর যাহা বলিয়া আসিতেছিল, তাহাই বা সত্য হয়। তাহার নাড়ী টিপিয়া দেখিলাম। নাড়ী দেখিয়া আমার মন আশ্বাসিত হইল। সে যে মৃত্যুমুখে পতিত হয় নাই, কেবল মূৰ্ছিত হইয়াছে, নাড়ী দেখিয়া তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। কোসা হইতে জল লইয়া তাহার চক্ষু ও মুখে সিঞ্চন করিলাম। বাটীর ভিতর হইতে শীঘ্র পাখা আনিবার নিমিত্ত রসময়বাবুকে প্রেরণ করিলাম। বর, বরযাত্রী প্রভৃতি লোকগণ চারিদিকে বায়ুরোধ করিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। তাহাদিগকে দূরে সরিয়া যাইতে বার বার বলিলাম। কিন্তু কেহই আমার কথা শুনিলেন না। জনতা করিয়া সেই মুচ্ছিতা কন্যাকে ঘিরিয়া সকলে দাঁড়াইলেন। সকলেই ঔষধ জানেন। সেই সমুদয় ঔষধ প্রয়োগ করিবার নিমিত্ত সকলে আমাকে পরামর্শ দিতে লাগিলেন।

    রসময়বাবু দৌড়িয়া বাড়ীর ভিতর হইতে পাখা লইয়া আসিলেন। দ্বারের নিকটে কুসুমের মাসী বসিয়া হায় হতাশ করিতেছিলেন। নিকটে আসিয়া আমি তাঁহাকে বাতাস করিতে বলিলাম। কুসুমের মাথা আমার উরুদেশে রহিল। বামহস্তে আমি তাহার নাড়ী ধরিয়া রহিলাম। দক্ষিণহস্তে তাহার মুখে জল সিঞ্চন করিয়া, তাহার চৈতন্য উৎপাদনের নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিলাম।

     

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – তুমি তো বড় তেরপেণ্ড

    এই বিপদের সময় দিগম্বরবাবু এক গোল উপস্থিত করিলেন। আমাকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন,–তুমি তো বড় তেরপেণ্ড দেখিতে পাই! কি বলিয়া তুমি আমার স্ত্রীকে কোলে লইয়া বসিলে? ডাক্তারি করিবে, ডাক্তারি কর; পরের স্ত্রীকে কোলে করিয়া ডাক্তারি করিতে হয়, এ তো কখনও শুনি নাই।

    এই বলিয়া তিনি আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া, কুসীকে আমার কোল হইতে কাড়িয়া লইতে চেষ্টা করিলেন। অচেতন হইয়া কুসী পড়িয়া আছে, তাহার প্রাণসংশয়; এরূপ সময়ে ফোকলার এই পাগলামি দেখিয়া আমার কিছু রাগ হইল। আমি বলিলাম—You are a brute (অর্থাৎ তুমি একটা পশু)

    দিগম্বরবাবু আরও বুক্রোধাবিষ্ট হইয়া, আমাকে এক ধাক্কা মারিলেন। আমি ঝুঁকিয়া পড়িলাম। পুনরায় উঠিয়া, বরযাত্রীগণকে সম্বোধন করিয়া আমি বলিলাম,–মহাশয়গণ। এ বে-পাগলা বুড়াকে লইয়া আপনারা বাসায় গমন করুন। কন্যার অবস্থা দেখুন,বাঁচে কি না তাহার ঠিক নাই। এ সময়ে এরূপ পাগলামি ভাল দেখায় না।

    হবু-জামাজার ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া, ঘৃণায় ও ক্রোধে রসময়বাবুর চক্ষুদ্বয় আরক্ত হইয়া উঠিল। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি আত্মসংবরণ করিয়া, দিগম্বরবাবুকে বাসায় লইয়া যাইবার নিমিত্ত, অতি বিনয়ভাবে সকলের নিকট অনুরোধ করিলেন।

    দুইজন বরযাত্রী দিগম্বরবাবুর দুই হাত ধরিয়া টানিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই যাইবেন না। ক্রোধে তিনি কপিতে লাগিলেন। অতিশয় বল প্রকাশ করিয়া, আমার দিকে ঝুঁকিয়া ঝুঁকিয়া, ঘুসি দেখাইয়া তিনি আস্ফালন করিতে লাগিলেন। দুইজনে তাঁহাকে টানিয়া রাখিয়াছিল, তাহা না হইলে, আমাকে বোধ হয়, চড়টা চাপড়টা, কিলটা-ঘুসিটা খাইতে হইত। সেই সময় ফোকলা মুখে হাউ হাউ করিয়া তিনি কত কি বলিতে লাগিলেন। তাঁহার মুখগহূরের দুইপার্শ্বে সাদা ফেকো পড়িয়াছিল, তাহা ঢাকিবার নিমিত্ত তোকরা পান সর্বদাই তিনি মুখে রাখিতেন। তাম্বুলরঞ্জিত লালা, রক্তের ন্যায় তাহার কয় দিয়া প্রবাহিত হইতে লাগিল। ফুলকাটা কামিজের বক্ষদেশ ও বেলফুলের মালা ভিজিয়া গেল। ঘোর উগ্রমূর্তি। তাহার উপর শোণিত-প্রায় লালার প্রবাহ,—তাহাকে ঠিক যেন রক্তমুখী মন্দা-কালীর ন্যায় দেখাইতে লাগিল। একে সেই হাউ হাউ, তাহার উপর আমার মন তখন মূচ্ছিত কুসীর দিকে, সকল কথা আমি তাহার বুঝতে পারিলাম না। দুই একটা কথা কেবল আমার কর্ণগোচর হইল, যথা,–তুমি আমাকে বুড়ো বলিলে! এরূপ কটু কথা কেহ কখন আমাকে বলে নাই। তোমার নামে আমি ড্যামেজের নালিশ করিব। তোমাকে জেলে দিব; যত টাকা খরচ হয়, তাহা করিব। ইত্যাদি।

    রসময়বাবু একটু রাগিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,–মহাশয়গণ! আপনারা কি তামাসা দেখিতেছেন? কন্যার অবস্থা দেখিয়া, আপনাদের কি একটু দয়া হয় না? আর তোমার বাপু কি একটু জ্ঞান নাই? আমার কন্যা যদি বাঁচে, তবে তো তোমার সহিত বিবাহ হইবে? এখন আপনারা বাসায় গমন করুন।

    রসময়বাবুর এই কথা শুনিয়া, দিগম্বরবাবু একটু নরম হইলেন। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, আর আমি গোল করিব না। আমি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিব। আমার হাতে একখানা পাখা দাও, আমার স্ত্রীকে আমি বাতাস করি।

    যেমন করিয়াই হউক, পাগলাকে এখন শান্ত করাই শ্রেয় মনে করিলাম। চক্ষু টিপিয়া রসময়বাবুকে আমি ইসারা করিলাম। তিনি দিগম্বরবাবুর হাতে একখানি পাখা দিলেন। দিগম্বরবাবু আমার নিকটে বসিয়া, কুসীর মুখপানে একদৃষ্টে চাহিয়া, বাতাস করিতে লাগিলেন। দুই একবার পাখা নাড়িয়া মূচ্ছিতা কুসীকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন,– কন্যা! তোমার জন্য আমি অনেক গহনা আনিয়াছি। একবার গহনা আনয়াছি। আমাদের বসায় আছে। তুমি চক্ষু চাহিয়া দেখা এখনই সে গহনা তোমাকে আমি দেখাই।

    গহনার লোভে কুসী চক্ষু চাহিল না। মৃতবৎ সে পড়িয়া রহিল।

    দিগম্বরবাবু উচ্চৈঃস্বরে চাকরকে ডাকিলেন,—কিঁষ্টা! কিঁষ্টা! কিঁষ্টা! কুঁথায় রে!

    ভিড়ের ভিতর হইতে কিঁষ্টা উত্তর দিল,—হো! পদাই আজ্ঞা। অর্থাৎ আমি পশ্চাতেই আছি।

    দিগম্বরবাবু বলিলেন,–বাসায় যা,ছোটু সিংহের কাছ হইতে গহনার বাক্সটা চাহিয়া আন।

    রসময়বাবু বিরক্ত হইয়া বলিলেন,—আপনি নিতান্ত পাগল! ছিঃ!।

    মানুষ সব কি বে-আড়া! দিগম্বরবাবু সকলের প্রশংসাভাজন হইতে এত চেষ্টা করিতেছেন, কিন্তু তবুও কেহ তাহার প্রশংসা করে না। গহনা দেখিয়া কোথায় সকল লোকে তাঁহাকে ধন্য ধন্য করিবে, না গহনার নাম শুনিয়া সকলে বিরক্ত হইল! দুঃখিত হইয়া কিঁষ্টাকে তিনি গহনার বাক্স আনিতে মানা করিলেন। সকলের অত্যাচারে নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া, বিরসবদনে তিনি পুনরায় কুসীকে বাতাস করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু দুই চারিবার পাখা নাড়িয়া, এবার তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া চুপি চুপি বলিলেন, আমি তোমাদিগকে বেশ চিনি। লোকের কান মলিয়া তোমরা ভিজিট নাও। বাপের ব্যায়রাম হইলেও, ভিজিট ছাড় না। তোমরা ভিজিটখোর। আমি যা বলি তা যদি কর, তাহা হইলে তোমাকে আমি ভিজিট দিব। কন্যার মাথাটি তুমি আমার কোলে দাও। পর-পুরুষের কোলে যুবতী স্ত্রীলোকের মাথা রাখা উচিত নয়, তাই বলিতেছি।

    আমি সে কথার কোন উত্তর করিলাম না। ভিজিটের লোভে কুসীর মস্তক তাঁহার কোলে দিলাম না। কুসীকে এখন চেতন করিতে পারিলাম না, সে জন্য আমার বড় ভয় হইল। তাহার নাসিকা হইতে যে রক্তস্রাব হইতেছিল, তাহা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। তাহার নাড়ী অতিশয় দুর্বল হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাহাতে বিশেষ কোন ভয়ের লক্ষণ দেখিতে পাইলাম না। কিন্তু এখনও চেতন হয় না কেন? পাছে সহসা হৃৎপিণ্ডের কাৰ্য্য বন্ধ হইয়া যায়, সে জন্য আমার বড় ভয় হইল। হৃৎপিণ্ড পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত মস্তক অবনত করিয়া, আমি আমার কর্ণ,কুসীর বক্ষস্থলের বামপ্রদেশে রাখিতে যাইতেছি, এমন সময় দিগম্বরবাবু বলিয়া উঠিলেন,–ও আবার কি! বেল্লিক! এই বলিয়া আমার সেই কিঞ্চিৎ অবনত বামগালে ঠাস করিয়া তিনি সবলে এক চপেটাঘাত করিলেন।

    চারিদিকে সকলে ছি ছি করিয়া উঠিল। আমি স্তম্ভিত হইলাম। কিন্তু এ বিষয় লইয়া আর অধিক গোল হইল না; কারণ, সেই সময় সকলের দৃষ্টি অন্যদিকে পড়িল। যেস্থানে কুসীকে লইয়া আমি বসিয়াছিলাম, তাহার চারিদিকে লোক দাঁড়াইয়াছিল। বার বার অনুরোধ করিয়াও, আমি সে ভিড় কমাইতে পারি নাই। সেই ভিড়ের পশ্চাৎ দিকে এখন একটু গোল উঠিল। সকলে দেখিল যে একজন সন্ন্যাসী অতি ব্যগ্রভাবে দুই হাতে দুই দিকে লোক সরাইয়া, ভিড় ঠেলিয়া অগ্রসর হইতেছেন। গৈরিক বস্ত্র দ্বারা সন্ন্যাসীর দেহ আবৃত ছিল। তাহার শরীর ধূলায় ধূসরিত হইয়াছিল। ভিড় ঠেলিয়া সন্ন্যাসী ক্রমে আমাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন।

     

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ – দেখ না দাদা

    আমার গালে চড় মারিয়া দিগম্বরবাবু একটু অপ্রতিভ হইয়াছিলেন। সন্ন্যাসীকে দেখিয়া এখন তিনি বলিয়া উঠিলেন,ভাল হইয়াছে যে, এই সন্ন্যাসীঠাকুর আসিয়াছেন। কন্যাকে ইনি এখনই ভাল করিবেন। ইহারা সন্ন্যাসী, পবিত্র পুরুষ, পর-স্ত্রী ইহারা স্পর্শ করেন না। দূর হইতে ঝাড়-ফুঁক করিবেন। ডাক্তারবাবু কিছু মনে করিও না। এখন তুমি সরিয়া যাও, ডাক্তারি চিকিৎসা আর আমি করাইব না। আমি ইহাকে কোলে লইয়া বসি। সন্ন্যাসীঠাকুর দূরে বসিয়া ঝাড়-ফুঁক করিবেন।

    সন্ন্যাসীঠাকুর কিন্তু দূর হইতে ঝাড়-ফুক করিলেন না। দিগম্বরবাবুর পা মাড়াইয়া তিনি আমার নিকট উপস্থিত হইলেন। তাহার পায়ের অঙ্গুলীতে যে জুতার কড়া ছিল, সন্ন্যাসীঠাকুরের পা ঠিক তাহার উপর পড়িয়াছিল। যাতনায় দিগম্বরবাবু উঃ কবিয়া উঠিলেন। তাহার সে কাতরতা-সূচক শব্দের প্রতি ভ্রক্ষেপ না করিয়া, সন্ন্যাসীঠাকুর সবলে তাহাকে এক ঠেলা মারিলেন। দিগম্বরবাবু শুইয়া পড়িলেন। তাহাতে একটু স্থান হইল। সেই স্থানে বসিয়া তিনি আমাকে অন্যদিকে ঠেলিয়া দিলেন। আমিও অন্যদিকে শুইয়া পড়িলাম। তাহাতে একটু স্থান হইল।এদিকে এক ঠেলা ওদিকে এক ঠেলা মারিয়া সন্যাসীঠাকুর যে . স্থান করিলেন, সেই স্থানে তিনি ভাল করিয়া উপবেশন করিলেন। তাহার পর বাম হাতে কুসীর গলদেশ বেষ্টন করিয়া, আমার উরুদেশ হইতে তাহাকে উত্তোলন করিলেন। কুসীর মস্তক তাঁহার বাম হাতের উপর রহিল। অর্ধশায়িতভাবে কন্যাকে বসাইয়া, তিনি নিজের মস্তক অবনত করিয়া, কুসীর, দক্ষিণ কর্ণে অতি মৃদুস্বরে বলিলেন,–কুসী! কুসী!

    দিগম্বরবাবু জ্বলিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,–ও ভাই রসময়! দেখ না দাদা, এ আবার কি বলে!

    রসময় কোন উত্তর করিলেন না; বিস্মিত হইয়া সন্ন্যাসীর মুখপানে চাহিয়া রহিলেন।

    দিগম্বরবাবু এবার সন্ন্যাসী ঠাকুরকে লক্ষ্য করিয়াছিলেন,—বলি, ও গোঁসাইজি! এ তোমার কিরূপ ব্যবহার বল দেখি! আমি তোমাকে ভাল মানুষ মনে করিয়াছিলাম। কিন্তু এই ভিজিট-খোরের চেয়ে তুমি আবার এককাঠি সরেশ! ইনি তবু পায়ের উপর কন্যাকে রাখিয়াছিলেন। তুমি তাহাকে বুকে তুলিয়া লইলে! কন্যা যে বালিকা নয়, পূর্ণ যুবতী, তাহা কি তোমার জ্ঞান নাই? ভণ্ড তপস্বি।

    দিগম্বরবাবুর কথায় কেহ উত্তর করিল না। পাগল বলিয়া সকলে তাহার কথা তুচ্ছ করিল। কন্যার কানের নিকট মুখ রাখিয়া, সন্ন্যাসী মৃদুস্বরে বারবার কেবল—কুসী! কুলী। বলিয়া ডাকিতে লাগিলেন।

    সন্ন্যাসীর আশ্চর্য শক্তি দেখিয়া রসময়বাবু প্রভৃতি সকলেই বিস্মিত হইলেন; সন্ন্যাসী সম্পূর্ণ অপরিচিত লোক; রসময়বাৰু কখন তাহাকে দর্শন করেন নাই; উজিরগড়ের কেহ তাহাকে কখন দেখে নাই। তথাপি তিনি রসময়বাবুর কন্যার নাম—ভাল নাম নহে, ডাক নাম,উচ্চারণ করিতে সমর্থ হইলেন। সন্ন্যাসী-মহাদিগের কিছুই অবিদিত থাকে না। ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সকলই তাহারা প্রত্যক্ষ দেখিয়া থাকেন।

    সন্ন্যাসীর অদ্ভুত আরও বিশেষরূপ পরিচয় শীঘ্রই সকলে পাইল। তিনি কোনরূপ ঔষধ প্রদান করিলেন না, অথবা কোনরূপ মন্ত্র পাঠ করিলেন না। কেবল কন্যার নাম ধরিয়া ডাকিলেন। কিন্তু তাহাতেই সেই মৃতপ্রায় কন্যা জীবন প্রাপ্ত হইল। এতক্ষণ ধরিয়া যাহার আমি চৈতন্য উৎপাদন করিতে পারি নাই, সন্ন্যাসীঠাকুরের অদ্ভুত তপস্যা বলে এখন তাহার চৈতন্য হইল। কুসী প্রথমে একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিল। তাহার পর, সে চক্ষু উন্মীলন করিল। কিছুক্ষণের নিমিত্ত সন্ন্যাসীর মুখের দিকে সে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। পুনরায় একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। চক্ষু, উন্মীলন, সন্ন্যাসীর প্রতি দৃষ্টি, দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ, চক্ষু মুদ্রিকরণ, তিন চারিবার সে এইরূপ করিল। শেষবার যখন সে চক্ষু উন্মীলন করিল, তখন ধীরে ধীরে বাম হস্তে মাথার কাপড়টি খুঁজিয়া, ঘোমটাটি টানিয়া দিল। তাহার পর দক্ষিণ হস্তটি সন্ন্যাসীর গলদেশের পশ্চাদভাগে রাখিল। অবশেষে আপনার মস্তকটি সন্ন্যাসীর বাম হাত হইতে সরাইয়া, তাঁহার বক্ষঃস্থলে রাখিল। হস্তও মস্তক এইরূপ রাখিয়া, সে চক্ষু বুজিল। সুস্থ হইয়া যে সে এখন নিদ্রা যাইবে, তাহার ভাব দেখিয়া এইরূপ সকলের বোধ হইল।

    কুসুম বালিকা নহে। সন্ন্যাসীর বক্ষঃস্থলে কি ভাবিয়া সে আপনার মস্তক রাখিল। সন্ন্যাসীও বৃদ্ধ ছিলেন না; তাহার বয়স অধিক হয় নাই। তথাপি কুসুম তাহাকে দেখিয়া কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হইল না। যুবক ও উলঙ্গ শুকদেব গোস্বামীকে দেখিয়া অস্পরাগণ লজ্জা করে নাই, কিন্তু বৃদ্ধ বল—পরিধেয় ব্যাসকে দেখিয়া তাহারা লজ্জা করিয়াছিল! সন্ন্যাসীর অদ্ভুত মাহাত্ম দেখিয়া, রসময়বাবু প্রভৃতি সকলেই বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন।

    কেবল দিগম্বরবাবু সন্ন্যাসীর মাহাত্ম দর্শনে মুগ্ধ হইলেন না। রসময়বাবুকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন-রসময়! তোমার কি ঘৃণা পিত্তি একেবারে নাই হে? তোমার চক্ষের উপর তোমার যুবতী কন্যাকে কেহ বা কোলে করিতেছে, কেহ বা বুকে করিয়া সইতেছে, ইহাতে তোমার কি লজ্জা বোধ হয় না? ছিঃ?

    তাহার পর সন্ন্যাসীকে সম্বোধন করিয়া তিনি বললেন,–সন্ন্যাসীঠাকুর! কন্যার এখন জ্ঞান হইয়াছে। আর ইহার চিকিৎসা করিতে হইবে না। এ রসময়ের কন্যা; আমি ইহার বর। আমার সহিত এখনি ইহার বিবাহ হইবে। কতক মন্ত্র বলা হইয়াছে, আর গোটাকতক মন্ত্র বলিলেই হয়। কন্যাকে ছাড়িয়া দিয়া, এখন আপনি একটু সরিয়া বসুন। বাকী কয়টা মন্ত্র আমি পড়িয়া লই। আসুন পুরোহিত মহাশয় আসুন! রসময়! আয় দাদা! কাজটা শেষ করিয়া ফেলি। এই সব গোলমালে লগ্ন ভ্ৰষ্ঠ হইয়া গেল।

    হবু জামাতাকে রসময়বাবু এখন বিলক্ষণ চিনিয়াছিলেন। তাহার প্রতি এখন তাহার ঘোরতর অভক্তি জন্মিয়াছিল। রসময়বাবু তাহাকে কি উত্তর দিবেন, তাহা ভাবিতেছেন, এমন সময় বৈঠকখানার বাহিরে সেই জনতার ভিতর আবার কি গোল হইল। আমার মুখপানে চাহিয়া রসময়বাবু বলিলেন-আবার কি উৎপাত ঘটে দেখ। সকলেই কন্যার বিবাহ দিয়া থাকে কিন্তু এমন কেলেঙ্কারি আর কখনও দেখি নাই। লোকের কাছে যে মুখ দেখাইব, সে যে আর আমার রইল না।

     

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ – গলাভাঙ্গা দিগম্বরী

    বাস্তবিক এই সময় আর একটি ঘটনা ঘটিল। ভিড় ঠেলিয়া একজন মানুষ বৈঠকখানার ভিতর প্রবেশ করিলেন। তাহার লম্বা-চওড়া চেহারা দেখিয়া, প্রথম তাহাকে পুরুষ-মানুষ বলিয়া আমার ভ্রম হইয়াছিল; কিন্তু তাহার পরিধেয় বস্ত্র দেখিয়া সে ভ্রম আমার দূর হইল। চওড়া কস্তাপেড়ে শাড় তিনি পরিয়াছিলেন। মুখখানি বড় একটি হাঁড়ির মতো ছিল। সেই হাঁড়ির মধ্যস্থলে উচ্চ নাসিকা দ্বারা, দুই পার্শ্ব দুই গালের অস্থি দ্বারা, নিম্নদেশ মুখ-গহুর দ্বারা, আর তাহার উপর কতকগুলি বড় বড় গোঁফের কেশ দ্বারা সুশোভিত ছিল। যদি কোন মানুষের ঠিক বাঁশির মত নাক থাকে তাহা হইলে তাহার ছিল। মাথার সম্মুখভাগে টাক পড়িয়াছিল। কতক সেই টাকের উপর হইতে, কতক কাঁচা-পাকা চুলের ভিতর হইতে সিন্দুরের ছটা বাহির হইতেছিল। শীতলাদেবী কি সুভদ্র ঠাকুরাণীরও লালটদেশের এতখানি অংশ সিন্দুরে রঞ্জিত ছিল কিনা, তা সন্দেহ। সেই সিন্দুরের ছটা দেখিয়া বোধ হয়, যেন তাঁহার সমস্ত শরীরটি পতি ভক্তিকে পূর্ণ হইয়া গিয়াছে; শরীরে পতিভক্তি আর ধরে না, তাই তাহার কতকটা এখন মাতা কুঁড়িয়া বাহির হইতেছে। স্ত্রীলোকটি শ্যামবর্ণা, তাহার দেহটি যেমনি দীর্ঘে, তেমনি প্রস্থে; পাঠানদিগের দেশেও তাহার প্রতি একবার ফিরিয়া চাহিতে হয়; তাহার নাকে নখ ও হাতে শাঁখা ছিল। বয়ঃক্রমে পঞ্চাশের অধিক হইবে। কিন্তু এখনও তাঁহার দেহে যে অপরিমিতবল ছিল, তাহার আকৃতি ও ভঙ্গীতে প্রকাশ পাইতেছিল। স্ত্রীলোকটি যে আমাদের দেশের লোক, বাঙ্গালী, পরিধেয় বস্ত্র দেখিয়া প্রথমেই তাহা আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম। আরও ভালরূপে নিরীক্ষণ করিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম যে, তিনি ভদ্রকন্যা ও ভদ্ররমণী, আকৃতি-প্রকৃতি যেরূপ হউক না কেন। সিঁন্দুর প্রসঙ্গে আমি তাহার পতিভক্তির উল্লেখ করিয়াছি। সেই সম্বন্ধে তাহার দন্তপূর্ণ মুখখানি আরও পরিচয় প্রদান করিতেছিল। সেই মুখখানি যেন পৃথিবীর সমস্ত নারীকুলকে বলিতেছিল, ওরে অভাগীরা! পতিপরায়ণা সতী কাহারে বলে, যদি তোদের দেখিতে সাধ থাকে, তবে আয়। এই আমাকে দেখিয়া যা; আমি তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, সাক্ষাৎ পভিত্তি মূর্তিমতী হইয়া আমি এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠান করিয়াছি।

    জনতা ঠেলিয়া তিনি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া অধভন্ন গম্ভীর স্বরে তিনি বলিলেন,–কৈ! কোথায়! সে ফোক্‌লা কোথায়। সে মুখ পোড় নচ্ছার কোথায়!

    তাহার মূর্তি দেখিয়া, সকলে অবাক হইয়াছিল; এখন তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া সকলে আরও অবাক হইল। অর্ধভন্ন গুরুগম্ভীর স্বর। কিসের সহিত সে স্বরের তুলনা করিব? ছেড়া জয়টাকের শব্দের সহিত? এতক্ষণ ঘরের ভিতর কত গোলমাল হইতেছিল; কুসুমের চৈতন্য উৎপাদনের নিমিত্ত কত লোক কত ঔষধের কথা বলিতেছিল; তাহার পর বিবাহের কথা, সন্ন্যাসী মহান্তের কথা;সকলেই একসঙ্গে নানারূপ কথোপকথন করিতেছিল। কিন্তু এখন তাহার সেই কণ্ঠস্বর শুনিয়া, সকলেই একেবারে নিস্তব্ধ হইল। পিপীলিকার পদশব্দটি পর্যন্ত ঘরে আর রইল না।

    গলাভাঙ্গা স্ত্রীলোকটি পুনরায় বলিলেন,–কৈ। সে ফোলা মুখপোড়া কোথায়?

    আমার নিকটে বসিয়া, ফোলা একদৃষ্টে কুসী ও সন্ন্যাসীর মুখপানে চাহিয়া পাখা নাড়িতেছিলেন।ফোল্লা মুখপোড়া কোথায়? এই গম্ভীর শব্দ শুনিয়া তাহার মুখ শুকাইয়া এতটুকু হইয়া গেল। পাখাখানি তাহার হাত হইতে পড়িয়া গেল। আমার পশ্চাৎ দিকে তিনি লুকাইতে চেষ্টা করিলেন। স্ত্রীলোকটি কে, তখন আমি বুঝিতে পারিলাম, ফোল্লাকে আমি লুকাইতে দিলাম না; আমার পশ্চাৎ দিকে তিনিও যত সরিয়া আসেন, আমিও তত সরিয়া যাই।

    ইতিমধ্যে সেই স্ত্রীলোকের দৃষ্টি তাহার উপর পড়িল। তিনি বলিলেন,–এই যে পোড়া মুখ লুকাইতেছেন। হারে! ডাক্রা এ সব তোর কি কারখানা বল্ দেখি?

    দিগম্বরবাবু বলিলেন,–কে ও! মনুর মা! তুমি কোথা হইতে?

    গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,—কি হইয়াছে? তোমার মুণ্ডু হইয়াছে। এইজন্য বুঝি আমাকে দেশে পাঠান হল। আমি যেন আর কোন খবর পাইব না। আমার যেন আর কেউ নাই! তাই সে দিন খবর পাইয়াছি। আমি বলিলাম—বিন্দী! চল! ফোল্লা মুখপোড়া আবার মরিতেছে

    ভিড়ের একপার্শ্ব হইতে কে একজন বলিয়া উঠিল,–হা গো! এই আমি। আমার নাম বিন্দী!

    সকলের দৃষ্টি এখন বিন্দীর উপর পড়িল। বিন্দী গলা-ভাঙ্গার সংসারে চাকরাণী ছিল। স্ত্রী-পুরুষের যুদ্ধের সময় বিন্দী গৃহিনীর বিশেষরূপ সহায়তা করিত। সেজন্য গলা-ভাঙ্গা তাহাকে বড় ভালবাসিতেন! বিন্দী এখন সেততাগিরি করে। রসময়বাবুর অফিসের (পাঞ্জাবী নহে) হিন্দুস্থানী চাপরাসীকে সম্মুখে পাইয়া, বিন্দী তাহাকে পরিচয় দিতে আরম্ভ করিল। বিন্দী বলিল,–এই দেখ দেখি গা! মিসের একবার আঙ্কেল।

    আর একবার অমনি করিয়াছিল। তোর বয়স হইয়াছে। ঘরে অমন গিন্নী রহিয়াছে। কেন, আমার গিন্নী-মা দেখিতে মন্দ কি? চক্ষের কোল একটু বসিয়া গেছে, এই যা! তোর ছেলে রহিয়াছে। মেয়ে রহিয়াছে। নাতি রহিয়াছে। নাতিনী রহিয়াছে। তোর আবার বে কেন?

    হিন্দুস্থানী চাপরাসী কোন সময়ে কলিকাতা আসিয়াছিল, সে জন্য বাঙ্গলা ভাষা সে অতি সুন্দর জানিত। বিশুদ্ধ বাঙ্গলায় সে বলিল,–হামিও সেই বাত বলি। বুড়ো আদমির আবার শাদি-বিহা কাহে, শাদি-বিহা হো তোর হামার।

    বিন্দী বলিল,দূর মুখ-পোড়া! না, তামাসার কথা নয়। প্রয়াগে থাকিতে বুড়ো আর একবার এই রঙ্গ করিয়াছিল। আমার গেরোশন্নি হইয়াছে, এই কথা বলিয়া বুড়ো আর একজন মেয়েকে বে করিতে চাহিয়াছেন। বালাই আর কি! গেরো-শন্নি হবে কেন গা! আমার গিন্নী-মা কেমন শক্ত, কেমন দড় রহিয়াছিল। আর দেখ জমাদ্দার! এই কারে দোষ দিব! এই বাবুগুলোই বা কি বল দেখি? চোখের মাথা খেয়ে গয়নার লোভে এই তিনকেলে ফোকলা বুড়োর হাতে তারে মেয়ে খুঁজে দেবে, তা ও বেচারাই বা করে কি?

    চাপরাসী বলিল,–হামিও সেই বাত বলি।

    বিন্দী বলিল,–হাঁ ভাই জমাদ্দার! তুমি বিবেচনা করিয়া দেখ। ভাগ্যে গিন্নীমায়ের ভগিনীপতির ভায়রা ভাই খবরটি দিল, তাই তো তিনি জানিতে পারিলেন। তাই গিন্নী-মা বলিলেন,–বিন্দী! বুড়ো আমার মেতেছে। চল, ফের যাই; গিয়া ঝাটার বাড়ীতে বিষ ঝাড়াই। আমি বলিলাম, যাব বই কি, গিন্নী-মা! যখন তোমার এমন বিপদ, তখন আমি তোম ক নিয়ে যাব। আমি পথেঘাট সব জানি। কত লোককে আমি কাশী বৃন্দাবনে নিয়ে যাই। ঠাকুরবাড়ীও কতবার গিয়াছি। মেয়েমানুষ হইলে কি হয় গিন্নী-মাকে পিণ্ডিতে তো আনিলাম বাছা।।

    গলা-ভাঙ্গা এখন বিন্দীর কথাটি লুফিয়া লইলেন। তিনি বলিলেন,—হাঁ, বিন্দী বলিয়াছে ভাল। আমারা দুইজনে পিণ্ডিতে আসিলাম। তোমার বাসায় যেখানে তোমার পিণ্ডি চটিকান রহিয়াছে, সেই বাড়ীতে যাইলাম। বিছানার শিয়রে, দেয়ালের গায়ে,—দেখিলাম, ছোট একটি বাঁধানো ছবি রহিয়াছে। এই ছুঁড়ির ছবি বুঝি! লোকের মুখে শুনিলাম যে, বাবু বে করিতে গিয়াছেন। হ্যা রে, মুখপোড়া! তোর না দুটো আইবুড়ো বড় বড় নাতিনী রহিয়াছে।

    ভয়ে দিগম্বরবাবু একেবারে কাটা হইয়া গিয়াছেন। বিবাহ বিষয়ে এখন তিনি সম্পূর্ণ হতাশ হইলেন। তাহার যে গৃহ-শূন্য হয় নাই, তিনি যে মিথ্যা কথা বলিয়াছিলেন, সে কথা এখন প্রকাশ হইয়া পড়িল। তিনি যে ধনবান লোক, তাহার স্ত্রীর ভাব দেখিয়া তাহাও বোধ হইল না। তাহার সব মিথ্যা, সব ফাকি,আমার মনে এইরূপ বিশ্বাস হইল। দিগম্বরবাবু ভাবিলেন যে তাহার যে স্ত্রী আছে,—বিশেষতঃ এরূপ খাণ্ডার স্ত্রী আছে, তাহা জানিয়া, রসময়বাবু আর তাহার সহিত কন্যার বিবাহ দিবেন না। রসময়বাবু সম্মত হইলেই বা ফল কি? স্ত্রী তাহা হইলে প্রহারের চোটে তাহার হাড়-গোড় চূর্ণ করিয়া দিবে। গলা-ভাঙ্গার হাতে কতবার তাহার উত্তম-মধ্যম হইয়া গিয়াছে। এলাহাবাদে থাকিতে এইরূপ আর একবার তিনি বিবাহের আয়োজন করিয়াছিলেন। মৌ হইতে সেবার যখন এলাহাবাদে বদলি হইয়াছিলেন। উত্তর পশ্চিম হইতে পঞ্জাবে বদলি হইবার সময় এবারও সেইরূপ গৃহিণীকে সঙ্গে লইয়া আসেন নাই। তাহাকে দেশে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহার পত্নীবিয়োগ হইয়াছে—পঞ্জাবে আসিয়া সকলকে এইরূপ পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। এই ভয়ে তিনি দেশে এতবড় বিঙ্গী কুসীকে বিবাহ করিতে সম্মত হন নাই। এলাহাবাদে যে বিবাহের সম্বন্ধ হইয়াছিল, তাহাতে দিগম্বরবাবুকে এবারের মত বরসজ্জা করিতে হয় নাই। বিবাহদিনের পূর্বেই তাহার স্ত্রী আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। তাহার পর, গাত্র বেদনার যোগাড় হইয়া পড়ে, সেজন্য ভয়ে জড়সড় হইয়া তিনি সুর ফিরাইলেন।

     

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ – সূতা বাঁধা কেন ড্যাক্‌রা

    দিগম্বরবাবু বলিলেন,–বে! কার রে? আমি বে করতে আসি নাই মাইরি বলিতেছি, আমি বে করিতে আসি নাই। হয় না হয়, তুমি বরং এই রসময়বাবুকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ। না, দাদা?

    গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,–তোর বে নয়? তবে তোর হাতে সূতা বাঁধা কেন রে ড্যাক্‌রা?,

    দিগম্বরবাবু উত্তর করিলেন,হাতে সূতা বাঁধা? কার? আমার?

    স্ত্রী বলিলেন,–একবার ন্যাকামি দেখ! হাতে সূতা বাঁধা কেন তা বল?

    বিন্দী ও সেই কথায় যোগ দিয়া বলিল,–তা বাছা! তোমার বলিতে হইবে। হাতে সূতা বাঁধা কেন, তা তোমায় বলিতে হইবে।

    নিজের হাতে সূতা দেখিয়া দিগম্বরবাবু অতিশয় বিস্মিত হইলেন। কিরূপে কোথা হইতে তাহার হাতে সূতা আসিয়া গেল, ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি তাহা মনে করিতে পারিলেন না। কিন্তু ইহার কারণ না বলিলেও নয়। সেজন্য একটু ইতস্ততঃ করিয়া তিনি উত্তর করিলেন,—হাতে সূতা বাধা! তাই তো! ওটা আমার ঠাওর হয় নি।

    গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,—ওটা তোমার ঠাওর হয় নি। পিণ্ডিতে চল। তোমার বাসায় গিয়া যাহাতে ঠাওর হয়, তাই করিব। ঝাটার বাড়িতে তোমার ঠাওর করিয়া দিব। তবে আমার নাম জগদম্বা বানী।

    বরযাত্রীদিগের একজন ভিড়ের মাঝখান হইতে বলিলেন,–জগদম্বা বানী! না গলাভাঙ্গা দিগম্বরী?

    দিগম্বরবাবুর স্ত্রী এই কথা শুনিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন। তৎক্ষণাৎ সেই দিকে ফিরিয়া বলিলেন,–কোন আটকুঁড়ীর বেটা কথা বলে রে? তোর মা হউক গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী। মর্‌! যত বড় মুখ, তত বড় কথা। হাড়হাবাতে বাহাত্তুরে ফোক্‌লা। তোর জন্যে আমাকে এইরূপ অপমান হইতে হইল।

    দেশে ও অন্যান্য স্থানে দিগম্বরবাবুর স্ত্রীকে অনেকেই জানিত। কেবল জানিত তাহা নহে, স্ত্রী-পুরুষ সকলেই তাহাকে ভয় করিত। বরযাত্রীদিগের মধ্যে কেহ বোধ হয়, ইহার সুখ্যাতি শুনিয়া থাকিবে। পরিচিত লোকে আড়ালে ইহাকে গলাভাঙ্গা দিগম্বরী বলিত। কিন্তু তাহার সম্মুখে সে নাম উচ্চারণ করে, কাহার সাধ্য। দিগম্বরী ইহার প্রকৃত নাম নহে, ইহার প্রকৃত নাম জগদম্বা। দিগম্বরবাবুর স্ত্রী, সেইজন্য দুষ্টলোকে ইহার নাম দিগম্বরী রাখিয়াছিল। তাহার পর কর্তাটির যখন নিজস্ব একটি বিশেষণ আছে, তখন ইহারও একটি বিশেষণ আবশ্যক। ইহার কণ্ঠস্বর ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘগর্জনের ন্যায়; সেজন্য দিগম্বরী নামের পূর্বে গলা-ভাঙ্গা বিশেষণটিও দুষ্টলোকে যোগ করিয়াছিল। আমি পূর্বেই বলিয়াছি যে, ইহার যে গলা-ভাঙ্গা নাম হইবে, সে কিছু বিচিত্র কথা নহে। নামকরণের ভার আমার উপর হইলে, আমিও ঐ নামটি তাহাকে বাছিয়া দিতাম।

    আড়াল হইতে কে তাহাকে গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী বলিল, সেজন্য প্রথম তাহার অতিশয় ক্রোধ হইল। তাহার পর, তাঁহার অপমান বোধ হইল। তাহার পর তাহার দুঃখ হইল। তাহার পর তাহার কায়া আসিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ সভাস্থলেই তিনি থপ্ করিয়া বসিয়া পড়িলেন। তাহার পর ঘরের দেওয়ালটিতে তিনি ঠেস দিলেন, তাহার পর পা দুইটি তিনি ছড়াইয়া দিলেন। অবশেষে তাহার ফাটা কণ্ঠভেরীর গগনস্পশী শব্দে তিনি জগৎ নিনাদিত করিলেন। এ দুঃখের সময়, তাহার জীবিত পুত্র, কন্যা, পৌত্র, দৌহিত্র,—তাহাদিগকে তাহার স্মরণ হইল না। ত্রিশ বৎসর পূর্বে আঁতুড়ঘরে তাহার একটি তিনদিনের কন্যা মারা পড়িয়াছিল, তাহাকে এখন তাহার স্মরণ হইল। সেই শোক এখন তাহার উথলিয়া পড়িল। তাহাকে স্মরণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে তিনি ক্রন্দন করিতে লাগিলেন,–কোথায় রে! খুকী রে! একবার দেখিয়া যা! এখানে তোর মায়ের দশা কি হইয়াছে। তোর মাকে গলা-ভাঙ্গা বলিয়া আঁটকুড়ার বেটারা অপমান করিতেছে। কোথায় রে! আমার খুকী কোথায় গেলি রে! ইত্যাদি। আহা! বড় দুঃখের বিষয় যে, সে খুকী থাকিলে, এতক্ষণ কোকালে আসিয়া রক্ষা করিত! বিবাহ-সভায় হুলস্থূল পড়িয়া গেল। নূতন ধরণের এই অভিনয় দেখিয়া, সভার সভ্যগণ পরম প্রীতি উপভোগ করিতে লাগিলেন।

    এইরূপে কিছুক্ষণ কাঁদিয়া গলা-ভাঙ্গার নিদ্রার আবেশ হইল। কান্নার সুর কিছু ঢিমে হইল, মাঝে মাঝে কথার ফাক পড়িতে লাগিল; ক্রমে তাহার চুল আসিল। ঢুল আসায় তাঁহার মস্তক সম্মুখ দিকে অবনত হইতে লাগিল। একটু অবনত হইল, আরও অবনত হইল, আরও অবনত হইল। ক্রমে পাযের নিকট মস্তক আসিয়া উপস্থিত হইল। আমি মনে করিলাম, এইবার ইহাকে ধরা উচিত হইতেছ, তা না হইলে মুখ থুবুড়িয়া ইহার মস্তক মাটিতে গিয়া পড়িবে। কিন্তু মাথা যাই মাটিতে পড়-পড় হইল, আর তৎক্ষণাৎ ইনি সোজা হইয়া বসিলেন। সোজা হইয়া মৃদুস্বরে একবার বলিলেন,–কোথায় আমার খুকী রে। এই কথা বলিয়া পুনরায় তাহার টুল আসিয়া গেল। পুনরায় সেইভাবে তাহার মস্তক অবনত হইতে আরম্ভ হইল। পুনরায় তিনি মাটিতে পড়-পড় হইলেন। যাই পতিতপ্রায় হইলেন, আর সেই মুহূর্তে পুনরায় তিনি সোজা হইয়া, কোথায় আমার খুকী রে? এই কথা বলিয়া একবার মৃদুস্বরে কাদিলেন। আবার পুনরায় চুল আসিয়া গেল, এইরূপ ক্রমাগত হইতে লাগিল। প্রতিবার যাই তিনি পড়-পড় হইতে লাগিলেন, আর সেই সময় আমার বক্ষস্থল ধড়ফড় করিয়া উঠিতে লাগিল। আমি মনে করিলাম এইবার মাটিতে পড়িয়া ঐ বাঁশী-নাক

    হেঁচিয়া যায়। তাহাকে ধরিবার নিমিত্ত দুই একবার আমি প্রস্তুতও হইয়াছিলাম। ফলকথা, তাঁহার বার বার এই পড়-পড় ভাব আমার পক্ষে একপ্রকার সাজা হইয়াছিল।

    রসময়বাবু অবাক। একবার গলা-ভাঙ্গার দিকে, একবার দিগম্বরের দিকে, একবার আমার দিকে একবার রসময়বাবু কেন? অনেকেই সে রাত্রিতে অবাক হইয়াছিল। উপন্যাসেও এরূপ ঘটনা হয় না। সকলেই বুঝিল যে, এ বিবাহ আর হইবে না।

    এই সময় বাড়ীর ভিতর হইতে পঞ্জাবী চাকরাণী আসিয়া রসময়বাবুকে ডাকিল। রসময়বাবু তাহার সঙ্গে বাটীর ভিতর গমন করিলেন। একটু পরেই ফিরিয়া আসিয়া তিনি আমাকে ডাকিলেন। আমিও তাহার সঙ্গে বাটীর ভিতর গমন করিলাম।

    রসময়বাবু আমাকে বলিলেন,–যাদববাবু! কি কেলেঙ্কারি। কি লজ্জা। এ অঞ্চলে আমি আর মুখ দেখাইতে পারিব না। সে যাহা হউক, আবার এক বিপদের কথা শুনুন। আমার শালী কোথায় চলিয়া গিয়াছেন। আমার স্ত্রীর নিকট হইতে কুড়িটি টাকা লইয়া তিনি কোথায় গিয়াছেন। আমার স্ত্রী অত বুঝিতে পারে নাই। সে মনে করিল, বিবাহের কি কাজের জন্য টাকার প্রয়োজন হইয়াছে। তাহার পর, কোন স্থানে তাহাকে দেখিতে না পাইয়া, সে ও চাকরাণী তন্ন তন্ন করিয়া সকল স্থানে অম্বেষণ করিয়াছে। আমিও সকল স্থানে খুঁজিয়া দেখিলাম কোন স্থানে তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। কি কুক্ষণে আজ রাত্রি প্রভাত হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না। চাকরীর স্থানে আমার অপমানের আর সীমা রহিল না।।

    আমি বলিলাম,–কুসুমের মূর্চ্ছা হইলে, তিনি তাহাকে পাখার বাতাস করিতেছিলেন। যখন সন্ন্যাসীঠাকুর আসিয়া আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া, কুসুমকে আমার নিকট হইতে কাড়িয়া লইলেন, সেই সময় হইতে আর আমি তাহাকে দেখি নাই।

    রসময়বাবু উত্তর করিলেন,–হাঁ! সেই সময় তিনি বাটীর ভিতর গমন করেন। ছোটঘর হইতে আমার স্ত্রীকে ডাকিয়া, তাহার নিকট হইতে টাকা চাহিয়া লইলেন। আমার স্ত্রী পুনরায় বাহিরের ছোটঘরে প্রত্যাগমন করিল; আমার শালী বাটীর ভিতর রহিলেন। তাহার পর, আর কেহ তাহাকে দেখে নাই। কিছুক্ষণ পরে আমার স্ত্রী বাটীর ভিতর আসিয়া, তাহাকে দেখিতে না পাইয়া, চারিদিকে অম্বেষণ করিতে লাগিল; তাঁহাকে দেখিতে পাই না। তিনি বাটীতে নাই; তিনি কোথায় চলিয়া গিয়াছেন। কেন, তা বলিতে পারি না।

    আমি বলিলাম,—তবে কি তিনি বাগানের দ্বার দিয়া গিয়াছেন?

    রসময়বাবু উত্তর করিলেন,হাঁ! তাহাই বোধ হয়।

    আমি বলিলাম,–আমি তাহার অনুসন্ধান করিতে যাইতেছি। অন্য কোন বাঙ্গালীর বাটীতে বোধ হয় থাকিবেন। আপনি কুসীর নিকট গমন করুন। সন্ন্যাসী মহাশয় বড়ই উপকার করিয়াছেন। কুসুম পাছে মারা পড়ে, সেজন্য আমার বড় ভয় হইয়াছিল। তিনি কুসুমের জীবন দান করিয়াছেন। তাহার অনুমতি লইয়া, কুসুমকে আপনি বাটীর ভিতর আনয়ন করুন। তাহাকে সে স্থানে আর রাখা উচিত হয় না। বরযাত্রীদিগকেও বিদায় করুন। দিগম্বরবাবুর সহিত কন্যার বিবাহ দিতে আর বোধ হয়, আপনার ইচ্ছা নাই?

    রসময়বাবু উত্তর করিলেন,–রাম! আমি তো ক্ষেপি নি।

     

    যষ্ঠ পরিচ্ছেদ – রেল-ষ্টেশন

    আমি খিড়কি দ্বার অভিমুখে যাইলাম; রসময়বাবু বৈঠকখানা-ঘরে প্রত্যাগমন করিলেন। খিড়কি-দ্বার দিয়া আমি বাগানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সে স্থানে অনেকগুলি ঐ দেশী স্ত্রী ও পুরুষ দাঁড়াইয়া বিবাহের তামাসা দেখিতেছিল। মাসীর কথা আমি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। একজন স্ত্রীলোক আমাকে বলিল যে, কিছুক্ষণ পূর্বে সে যখন এই বাটীতে আসিতেছিল, তখন পথে তাহার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। সেই পথ দিয়া তিনি দ্রুতবেগে যাইতেছিলেন। সে কোন পথ, তাহা আমি জানিয়া লইলাম। সে রাস্তার নাম ষ্টেশন-রোড রেল-ষ্টেশন অভিমুখে তাহা গিয়াছে। সেই রাস্তার উপর হারাণবাবুর বাড়ী। আমি মনে করিলাম যে, মাসী বোধ হয় হারাণবাবুর বাড়ীতে গিয়াছেন।

    সেই পথ ধরিয়া হারাণবাবুর গৃহ অভিমুখে আমি গমন করিতে লাগিলাম। গ্রীষ্মকাল। সুন্দর চন্দ্রালোকে দিনের মত পথ-ঘাট আলোকিত হইয়াছিল। সেজন্য পথ চলিতে আমার কষ্ট হইল না। কুসুমের বাটী হইতে হঠাৎ কেন বাহির হইলেন, সেই কথা আমি ভাবিতে লাগিলাম। কুসীর তিনি বিধবা বিবাহ দিতেছেন। এই কথা প্রকাশ হইবার কোনরূপ সূচনা হইয়া থাকিবে, সেই ভয়ে বোধ হয়, তিনি বাটী হইতে বাহির হইয়াছেন। মনে মনে আমার এইরূপ সন্দেহ হইল।

    যাহা হউক, দিগম্বরবাবুর সহিত কুসীর যে বিবাহ হইল না, সেজন্য আমি আহ্লাদিত হইলাম। আহ্লাদ আর কি করিয়া বলিব? মৃত হীরালামকে তো আর ফিরিয়া আনিতে পারিব না। সন্ন্যাসীঠাকুর আপাততঃ কুসীর চেতনা উৎপাদন করিলেন। তাহাকে সম্পূর্ণরূপে ভাল করিলেও তিনি করিতে পারেন। কিন্তু তাহাতে আর আহ্লাদ কি? এ জীবনে কুসীর আর সুখ হইবে না। চিরকাল তাহাকে দুঃখে কাটাইতে হইবে।

    এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে আমি পথ চলিতে লাগিলাম। কিছুদূরে গিয়াছি, এমন সময়ে দেখিলাম যে, ষ্টেশনের দিক হইতে একখানি একা আসিতেছে। রসময়বাবুর বাসা হইতে ষ্টেশন প্রায় তিন মাইল পথ। আমাকে দেখিয়া এক্কাওয়ালা জিজ্ঞাসা করিল,–বাবু, ভাড়া হবে?

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,অমি হারাণবাবুর বাড়ী যাইব, সে স্থান হইতে পুনরায় রসময়বাবুর বাটীতে ফিরিয়া আসিব। কত নিবি?

    ভাড়া চুক্তি হইল। আমি এক্কার উপর উঠিলাম। ঘোড়া ফিরাইয়া এক্কাওয়ালা আমাকে বলিল যে, এইমাত্র সে একজন বাঙ্গালী স্ত্রীলোককে ষ্টেশনে রাখিয়া আসিয়াছে।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–কি?

    একাওয়ালা উত্তর করিল,–কিছুক্ষণ পূর্বে একজন বাঙ্গালী ফ্রলোক আমার এক ভাড়া করিয়াছিলেন। আমি তাহাকে ষ্টেশনে লইয়া যাইলাম। সে স্থানে উপস্থিত হইয়া, তিনি আমাকে লাহোরের টিকিট কিনিয়া দিতে বলিলেন। প্রাতঃকালে পাঁচটার সময় গাড়ী যায়। টিকিটবাবু আমাকে টিকিট দিলেন না। ষ্টেশনের নিকট যে সরাই আছে, স্ত্রীলোকটিকে আমি সেই স্থানে রাখিয়া আসিলাম। ভেটিয়ারাকে বলিয়া আসিয়াছি, পাঁচটার সময় সে তাহাকে টিকিট কিনিয়া দিবে।

    স্ত্রীলোকটি কিরূপ, তাহার বয়স কত, সেইসব কথা আমি এক্কাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। যেরূপ বিবরণ সে আমাকে দিল, তাহাতে আমি নিশ্চয় বুঝিলাম যে, সে স্ত্রীলোকটি কুসীর মাসী ব্যতীত অন্য কেহ নয়। হারাণবাবুর বাটী না গিয়া এক্কাওয়ালাকে আমি ষ্টেশনের নিকট সেই সরাইয়ে যাইতে বলিলাম। পুরস্কারের লোভে এক্কাওয়ালা দ্রুত এক্কা হাঁকাইয়া দিল।

    আমি পুনরায় এই কথা সকলকে বলিয়া রাখি যে, যে স্থানে এই সমুদয় ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার প্রকৃত নাম আমি দিই নাই। স্থান সম্বন্ধে আমার কেহ কোনরূপ ভুল ধরিবেন না।

    ষ্টেশনের নিকট সেই পান্থশালায় গিয়া আমি উপস্থিত হইলাম। পানিবাসের প্রাঙ্গণে একটি খাটিয়ার উপর গালে হাত দিয়া বসিয়া কুসীর মাসী ভাবিতেছিলেন। একা দাঁড়াইয়া রহিল। আমি সেই খাটিয়ার একপার্শ্বে গিয়া উপবেশন করিলাম। মাসী আমাকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন।

    আমি তাঁহাকে বলিলাম,–এ কি আপনি ভাল কাজ করিয়াছেন? এখন বাড়ী চলুন।

    মাসী উত্তর করিলেন,—আমি এ পোড়া-মুখ আর কাহাকেও দেখাইব না। আমি কাশী চলিয়া যাইব। সে স্থানে ভিক্ষা মাগিয়া খাইব।

    আমি বলিলাম,–কাশী যাইতে হইবে কেন? হইয়াছে কি? আপনার সে কথা তো প্রকাশ হয় নাই। তবে আপনার ভাবনা কি?

    আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া মাসী আমাকে বলিলেন,—প্রকাশ হয় নাই। তুমি পাগল না কি!

    আমি উত্তর করিলাম,–না, আমি পাগল নই। পাগলের লক্ষণ আমাতে আপনি কি দেখিলেন? আমি সত্য বলিতেছি, আপনার সে কথা প্রকাশ হয় নাই। অন্ততঃ আমি কাহাকেও কোন কথা বলি নাই। তাহার পর, আপনি যে কাজ করিতেছিলেন, তাহা স্থগিত হইয়া গিয়াছে। দিগম্বরবাবুর সহিত কুসীর বিবাহ হইবে না। তবে আর আপনার ভয় কি? বাড়ী চলুন।

    মাসী উত্তর করিলেন,–তুমি পাগল।

    কুসুমের মাসী এরূপ কথা বলিলেন কেন, ইহার অর্থ আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। কুসুমের যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, আমি ব্যতীত উপস্থিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আর কেহ কি সে কথা অবগত আছে? পাছে সে প্রকাশ করে, সেই ভয়ে কি মাসী বাটী হইতে পলায়ন করিয়াছেন? কিন্তু যখন বিবাহ হইল না, তখন আর বিশেষ ভয়ের কারণ কি? কুসুমের পূর্ব-বিবাহ গোপন করিয়া মাসী এই কাণ্ড করিয়াছেন; সে কথা শুনিলে রসময়বাবু যে রাগ করিবেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু দৈবঘটনায় যখন বিবাহ বন্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। রসময়বাবুকে আমি বুঝাইয়া ঠাণ্ডা করিতে পারিব। এই মনে করিয়া বাটী যাইবার নিমিত্ত আমি কুসুমের মাসীকে বার বার অনুরোধ করিলাম। কিন্তু তিনি কিছুতেই সম্মত হইলেন না। অবশেষে আমি বুঝিলাম যে, ইহার মন হইতে ভয় দূর করিতে একটু সময় লাগবে। সেজন্য এখনকার কথা চাপা দিয়া, পুনরায় আমি সেই পূর্ব কথার উল্লেখ করিলাম।

    আমি বলিলাম,—আচ্ছা! ভাল। আপনি যদি একান্তই কাশী যাইবেন, আর আমি যদি একান্তই উচিত বিবেচনা করি, তাহা হইলে টিকিট কিনিয়া আমিই না হয় আপনাকে গাড়ীতে বসাইয়া দিব। কিন্তু গাড়ীর এখনও অনেক বিলম্ব আছে। গাড়ী সকালবেলা পাঁচটার সময় ছাড়িবে। এখনও বোধ হয় রাত্রি দুই প্রহর হয় নাই সেদিন কথা বলিতে বলিতে রসময়বাবু আসিয়া পড়িলেন। কথা শেষ হয় নাই। তাহার পর কি হইল?

    আমি তাহাকে কাশী পাঠাইয়া দিব, এই কথা শুনিয়া মাসী কিছু স্থির হইলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,সেদিন তুমি কোন পর্যন্ত শুনিয়াছিলে?

    আমি উত্তর করিলাম,–লোচন ঘোষ নামক এক ব্যক্তি হীরালালের মৃত্যুসংবাদ দিয়া আপনাকে চিঠি লিখিয়াছিল। সেই চিঠির সঙ্গে একখানি খবরের কাগজও আসিয়াছিল। সেই চিঠি ও সেই কাগজ পড়িয়া কুসী অজ্ঞান হইয়া পড়িল। সেদিন আমি এই পর্যন্ত শুনিয়াছিলাম। তাহার পর কি হইল?

    তাহার পর হইতে মাসী পূর্ব বৃত্তান্ত আমাকে বলিতে লাগিলেন। কিন্তু সে সমুদয় কথা মাসী আমাকে যেভাবে বলিয়াছেন, আমি সেভাবে বলিব না। আমি আমার নিজের ভাষায় সে বিবরণ প্রদান করিব।

     

    সপ্তম পরিচ্ছেদ – ঘোরা-বিকার

    এখন আমামিদগকে সেই পুনরায় মেসোমহাশয়ের গ্রামে যাইতে হবে। দুই বৎসর পূর্বে সেই স্থানে যাহা ঘটিয়াছিল, এখন তাহাই আমি বলিব। লোচন ঘোষ যে চিঠি লিখিয়াছিল, কুসী তাহা ভালরূপে পাঠ করিল। তাহার সহিত যে সংবাদপত্র আসিয়াছিল, তাহাও সে ভালরূপে পাঠ করিল। চিঠি ও সংবাদপত্র পাঠ করিয়া এবার কুসীর যে মূৰ্ছা হইল, সে মূর্চ্ছা আর সহজে ভাঙ্গিল না। সমস্ত রাত্রি কুসী অচেতন অবস্থায় রহিল। শেষ রাত্রিতে অতিশয় জ্বর হইল, চক্ষু দুইটি রক্তবর্ণ হইল, কপালে হাত দিয়া সে কাতরতাসূচক শব্দ করিতে লাগিল, এ-পাশে ও-পাশে সে মস্তক চালনা করিতে লাগিল। মাসী একদৃষ্টে তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন, একটু ছিয়বস্ত্র জলে ভিজাইয়া মাঝে মাঝে তাহার ওষ্ঠ ও চয় মুছাইতে লাগিলেন। মাসী নিজেও একপ্রকার জ্ঞানহত হইয়াছিলেন। অশ্রুজলে ক্রমাগত তাহার পরিধেয় বস্ত্র ভিজিয়া যাইতেছিল।

    প্রাতঃকাল হইলে তিনি একজন প্রবীণ প্রতিবাসীকে ডাকিয়া আনিলেন। ইনি ভালরূপ নাড়ী পরীক্ষা করিতে জানিতেন। হাত, দেখিয়া ইনি বলিলেন যে, কুসীর ঘোর জ্বর-বিকার হইয়াছে। সত্বর ডাক্তার আনয়ন করা আবশ্যক।

    মাসী পূর্বদিন দুইশত টাকা পাইয়াছিলেন। হীরালালের বন্ধু লোচন ঘোষ তাহা প্রেরণ করিয়াছিল। একজন প্রতিবেশীকে তিনি ডাক্তার আনিতে পাঠাইলেন।

    ডাক্তার আসিয়াই কুসীর মস্তক মুণ্ডনের আদেশ করিলেন। নাপিত আসিল, কুসীকে নেড়া করিবার নিমিত্ত সমুদয় আয়োজন হইল। কিন্তু কুসী এরূপ অস্থির অবস্থায় ছিল, এরূপ উঠিতে বসিতেছিল ও মাথা নাড়িতেছিল যে, নাপিত ক্ষুর চালনা করিতে সাহস করিল না। মস্তক মুণ্ডন না করিবার আর একটি কারণ ছিল। কুসীর অলৌকিক রূপ দেখিয়া চুল কাটিয়া ফেলিতে দুইজনেরই মায়া হইল! সেই সময় দুই-তিনজন প্রতিবেশিনীও আসিয়া বলিলেন,–তা কি কখন হয়! আইবুড়ো মেয়ে! সহজেই ইহার বিবাহ হইতেছে না। তাহার উপর নেড়া-বেচা করিলে, আর কি ইহার বিবাহ হইবে?

    কুসীর সেই কটিদেশ-লম্বিত ঘোর কৃষ্ণবর্ণের উজ্জ্বল কেশরাশি এইরূপে বাঁচিয়া গেল। সেই চুলের উপরেই ছিন্নবস্ত্র রাখিয়া ডাক্তার জলসিঞ্চন করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতেও কুসীর জ্ঞান হইল না।

    সেই দিন বৈকালবেলা কয়েকজন প্রতিবেশিনী কুসীকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। মাসী কুসীর নিকট বসিয়া কাঁদিতেছিলেন।

    একজন প্রতিবেশিনী বলিলেন,–আহা! কাদিবে না গা! ছয় দিনের মেয়ে মানুষ করিয়াছে। সংসারে ওর আর আছে কে, তা বল?

    আর একজন বলিলেন,—আর শুনিয়াছ। সেই যে রামপদর সঙ্গে আমাদের গ্রামে একটি ছেলে আসিত, যাহার নাম মাণিকলাল না কি ছিল,আহা! সে ছেলেটি মারা পড়িয়াছে। হঠাৎ নৌকাড়ুবি হইয়া মারা পড়িয়াছে। কর্তা খবরের কাগজে দেখিয়াছেন।

    আর একজন বলিল,–তাহার নাম হীরালাল ছিল। ছেলেটি বড় ভাল ছিল। আহা! তার বাপমায়ের মন যে কি হইতেছে।

    অজ্ঞান অবস্থাতেই কুসী চীৎকার করিয় উঠিল,–হীরালাল! বাবু! কোথায়! ইস! বাবু! তোমার কাপড়ে কি রক্ত! চাদর ফুটিয়া বাহির হইতেছে। যাই আমি ডাক্তার আনি।

    তৃতীয় প্রতিবেশিনী বলিলেন,—তোমাদের বিবেচনা নাই। বিকারের রোগীর কাছে মৃত্যুসংবাদ দিতে নাই। তোমরা হীরালালের গল্প করিলে, আর কুসীও দেখ সেই কথা বকিতে লাগিল।

    ইহার পূর্বে প্রলাপের সহিত কুসী আরও অনেকবার বাবুর নাম করিতেছিল। প্রতিবেশিনীদিগের কথায় কুসীর মাসী কোন উত্তর করিলেন না।

    কুসী প্রায় কুড়িদিন এইরূপ অজ্ঞান অবস্থায় রহিল। তাহার পর ক্রমে বিকার কাটিয়া গেল। ক্রমে ক্রমে সে স্থির হইল। ক্রমে কুসী আরোগ্যলাভ করিতে লাগিল।

    এ যাত্ৰা কুসীর প্রাণরক্ষা হইল বটে, কিন্তু তাহার শরীর একেবারে ভগ্ন হইয়া গেল। সে গোল গড়ন ঘুচিয়া তাহার হস্ত পদ অস্থি-চর্ম সার হইল। সে উজ্জ্বল ফুট ফুটে গৌরবর্ণ ঘুচিয়া একপ্রকার রক্তহীন পাণ্ডবর্ণে তাহার মুখশ্রী আচ্ছাদিত হইল। তাহার ভাসা ভাসা ও চক্ষু দুইটি বসিয়া গেল। চক্ষুর কোলে কালি মারিয়া দিল। যে চক্ষুর বর্ণ আমি সূৰ্য্যকিরণমিশ্রিত নীল সমুদ্রজলের সহিত তুলনা করিয়াছিলাম, কিরূপ ঘোলা হইয়া সে চক্ষু এখন বিবর্ণ হইয়া গেল। তাহার মনও বিকৃত হইয়াছিল। ঠিক উন্মাদ নয়। কোনরূপ উপদ্রব সে করিত না। কিন্তু সে কাহারও সহিত কথা কহিত না। একস্থানে চুপ করিয়া বসিয়া সর্বদাই সে কি ভাবিত। তাহার সহিত কোন কথা কহিলে সে উত্তর দিত না। সর্বদাই এরূপ অন্যমনস্ক ভাবে সে বসিয়া থাকিতে যে, কাহারও কথা সে শুনিতে পাইত কিনা সন্দেহ। কাছে দাঁড়াইয়া তিন চারিবার তাহাকে ডাকিলে, তবে তাহার চমক হইত। চমক হইয়া লোকের মুখপানে সে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া থাকিত। তাহার পর তো কেবল অ্যা এই কথাটি বলিয়া পুনরায় অন্যমনস্ক হইয়া যাইত। রোগ হইতে উঠিয়া প্রথম প্রথম কুসীর শরীর ও মনের অবস্থা এইরূপ হইয়াছিল। তারপর ক্রমে ক্রমে সে একটু যেন ভাল হইয়াছিল। তাহার সৌন্দর্য পুনরায় কিছু কিছু ফুটিয়াছিল, পূর্বাপেক্ষা তাহার মনে জ্ঞানের সঞ্চার হইয়াছিল। সকলের কথা সে বুঝিতে পারিত, দুই একটি কথার উত্তর ও প্রদান করিত। কিন্তু যতই হউক, কাশীতে আমি যে কুসী দেখিয়াছিলাম, সে কুসীর আর কিছুই ছিল না।

    লোচন ঘোষ যে দুইশত টাকা প্রেরণ করিয়াছিল, তাহার অধিকাংশ কুসীর চিকিৎসায় খরচ হইয়া গেল। কুসীর মাসীর বড় চিন্তা হইল। হীরালাল নাই। তাহার নিজের যাহা হউক, কুসীকে এখন কে প্রতিপালন করিবে? তিনি অকুল পাথার দেখিতে লাগিলেন। ভাবিয়াচিন্তিয়া আর কোন উপায় ঠিক করিতে না পারিয়া, তিনি কুসীর পিতাকে একখানি পত্র লিখিলেন। কুসীর মেসো-মহাশয়ের কাল হইয়াছে, তাহারা নিঃসহায় হইয়া পড়িয়াছেন, চিঠিতে কেবল সেই কথা লিখিলেন। কুসীর যে বিবাহ হইয়াছিল, তাহার পর কুসী যে বিধবা হইয়াছে, ভগিনীপতিকে সে সকল কথা তিনি কিছু লিখিলেন না। তিনি ভাবিলেন যে, এখনও কন্যা অবিবাহিতা আছে, এই কথা মনে করিয়া তিনি চিন্তিত হইবেন ও সত্বর পত্রের উত্তর প্রদান করিবেন। যে কারণেই হউক, তিনি কুসীর বিবাহের কথা চিঠিতে উল্লেখ করে নাই।

    সৌভাগ্যক্রমে সেই বর্মাণীর মৃত্যু হইয়াছিল। রসময়বাবুর চক্ষু উন্মুক্ত হইয়াছিল। অনেক কষ্টে পানদোষ হইতে তিনি নিষ্কৃতি পাইয়াছিলেন। শালীর পত্র পাইয়া তাহার মনে অতিশয় অনুতাপ হইল। কন্যার প্রতি তিনি যে অতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছেন, তখন তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন। পত্রের উত্তরে তিনি কুসীর মাসীর নিকট টাকা পাঠাইলেন ও কুলীর বিবাহের নিমিত্ত একটি সুপাত্রের অনুসন্ধান করিতে বলিলেন। এই সম্বন্ধে তিনি লিখিলেন,–ছুটীর জন্য আমি দরখাস্ত করিয়াছিলাম; কিন্তু ছুটী পাইলাম না। মনে করিয়াছিলাম যে, আমি নিজে দেশে গিয়া একটি পাত্র অনুসন্ধান করিয়া কুসুমের বিবাহ দিব; কিন্তু তাহা হইল না। তোমরাই একটি সুপাত্র অনুসন্ধান করিয়া আমাকে লিখিবে। আমি বিবাহের খরচ পাঠাইয়া দিব।

    এই পত্র পাইয়া কুসুমের মাসী চুপ করিয়া রহিলেন। পাত্রের আর কি অনুসন্ধান করিবেন। তাহা কিছু করিলেন না, কুসীর যে বিবাহ হইয়াছিল, ভগিনীপতিকে তাহাও তিনি লিখিলেন না। তাহার পর, প্রতি পত্রে রসময়বাবুর কন্যার বিবাহের কথা লিখিতেন কিন্তু কুসুমের মাসী সে বিষয়ের কোন উত্তর দিতেন না। কুসীর পুনরায় যে তিনি বিবাহ দিবেন, সে চিন্তা এখনও তাহার মনে উদয় হয় নাই, স্বপ্নেও তিনি তাহা ভাবেন নাই।

     

    অষ্টম পরিচ্ছেদ – মাসীর চিন্তা

    ইহার অল্পদিন পরে, কুসুমের মাসী আর একখানি পত্র পাইলেন। তাহাতে রসময়বাবু লিখিয়াছিলেন,—আমি পঞ্জাবে বদলি হইয়াছি। আমি ভাবিয়াছিলাম যে, পঞ্জাবে যাইবার সময় কলিকাতায় কিছুদিন অবস্থিতি করিতে অনুমতি পাইব, আর সেই অবসরে কন্যার বিবাহ দিতে পারি, কিন্তু তাহা হইল না। আমাকে সোজা পঞ্জাবে যাইতে হইবে। একদিনও আমি কলিকাতায় থাকিতে পাইব না। অতএব তুমি একটি সুপাত্র ঠিক করিয়া রাখিবে। সব ঠিক করিয়া রাখিবে। সব ঠিক হইলে, পনের যোল দিনের ছুটী লইয়া আমি পঞ্জাব হইতে কলিকাতায় আসিব, আসিয়া কুসুমের বিবাহ দিব।

    এ পত্র পাইয়াও কুসুমের মাসী চুপ করিয়া রহিলেন। হীরালালের সহিত কুসুমের বিবাহের কথা তিনি ভগিনীপতিকে জানাইলেন না। কিন্তু পুনরায় যে কুসীর বিবাহ দিবেন, এখনও সে চিন্তা তাহার মনে উদয় হয় নাই, এখনও সে কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নাই।

    কিছুদিন পরে পঞ্জাব হইতে রসময়বাবু পত্র লিখিলেন। অন্যান্য কথার পর তিনি লিখিলেন,–কুসুমের পাত্র ঠিক করিবার নিমিত্ত আমি তোমাকে বার বার লিখিতেছি। মনে করিয়া দেখ, কন্যা কত বড় হইয়াছে। সে আমার দোষ বটে। কিন্তু যা হইবার তাহা হইয়াছে। এখন আর নিশ্চিত থাকা উচিত নহে। এ সম্বন্ধে তুমি কতদূর কি করিলে, শীঘ্র তুমি তাহা আমাকে লিখিবে।

    এই পত্র পাইয়া কুসীর মাসী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। কিন্তু কুসীর যে বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে কথা তিনি এখনও ভগিনীপতিকে লিখিলেন না।

    তিনি মনে করিলেন যে, সাক্ষাৎহইলে আদ্যোপান্ত সে সমুদয় বৃতান্ত তিনি কুসীর পিতাকে বলিবেন। আপাততঃ তিনি এই কথা লিখিলেন,—আমি শ্রীলোক। কি করিয়া আমি পাত্রের অনুসন্ধান করিব? ঘটক কোথায় থাকে, তাহাও আমি জানি না। তুমি নিজে যাহহয় করিবে। এতদিন যখন গিয়াছে, তখন আর কিছুদিন বিলম্ব হইলে বিশেষ কোন ক্ষতি নাই।

    এইপত্র পাইয়া রসময়বাবুপুনরায় ছুটির জন্য আবেদন করিলেন, কিন্তু তিনি ছুটি পাইলেন না। ইহার কিছুদিন পূর্বে পঞ্জাবেই দিগম্বরবাবুর সহিত তাহার আলাপ হইয়াছিল। তাহার স্ত্রীবিয়োগ হইয়াছে, পুনরায় বিবাহ করিতে তাহার ইচ্ছা আছে, তাহার অনেক গহণা আছে, কোম্পানীর কাগজ আছে, সে সমুদয় কাগজ তিনি নূতন বন্ধুর নামে লিখিয়া দিবেন, দেশে তাহার অনেক সম্পত্তি আছে, এইরূপ কথা সকলের নিকট তিনি সর্বদাই প্রকাশ করিতেন। শালী পাত্রের অনুসন্ধান করিতে পারিলেন না। তাহাকে নিজে গিয়া সেকাজ করিতে হইলে অধিক দিনের ছুটী আবশ্যক সে ছুটী তিনি পাইলেন না। সাহেব কেবল পনের দিনের নিমিত্ত তাহাকে ছাড়িয়া দিতে সম্মত হইলেন। পথে তাহার সাত আট দিন কাটিয়া যাইবে। অবশিষ্ট কয়দিনে পাত্র অনুসন্ধান ও বিবাহ শেষ হইতে পারে না। তিনি হিসাব করিয়া দেখিলেন যে কন্যার বয়স যোল বৎসর হইয়াছে।

    রসময়বাবু ভাবিলেন যে,–কন্যার বিবাহ আমাকে দিতেই হইবে। আর আমি তাহাকে অবিবাহিতা রাখিতে পারি না।

    নিরুপায় হইয়া দিগম্বরবাবুর সহিত তিনি সম্বন্ধ স্থির করিলেন। দিগম্বরবাবুর সহিত বিবাহের কথা যখন রসময়বাবু আমাকে প্রথম বলিয়াছিলেন, তখন তাহার পূর্ব-আচার-ব্যবহার স্মরণ করিয়া তাঁহার প্রতি আমার বড়ই অভক্তি হইয়াছিল। কিন্তু মাসীর মুখে এখন সবিশেষ বৃত্তান্ত শুনিয়া অনেকটা তাহাকে নির্দোষ বলিয়া আমার প্রতীতি হইল। দিগম্বরবাবুর সহিত বিবাহ স্থির করিয়া তিনি শালীকে পত্র লিখিলেন—রসময়-বাবু লিখিলেন—আমি কুসুমের জন্য এস্থানে একটি পাত্র স্থির করিয়াছি। তিনি দেশে গিয়া বিবাহ করিতে পারিবেন না। এইস্থানে কুসুমকে আনিয়া বিবাহ দিতে হইবে। তুমিও কুসুম ঠিক থাকিবে। পনের দিনের ছুটী লইয়া আমি দেশে যাইতেছি। শীঘ্রই দেশে গিয়া তোমাদিগকে এইস্থানে লইয়া আসিব।

    এই পত্র পাইয়া কুসুমের মাসীর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। তিনি ভাবিলেন,—আমি মনে করিয়াছিলাম যে, যখন সে পাত্র অনুসন্ধান করিতে দেশে আসিবে, তখন আমি সকল কথা তাহাকে খুলিয়া বলিব। খোট্টার দেশে যে আবার পাত্র মিলিবে, তাহা আমি কেমন করিয়া জানিব? এখন আমি করি কি? পাত্র ঠিক করিয়া মেয়ে লইতে সে দেশে আসিতেছে। এখন আমি তাহাকে কি করিয়া বলি যে, তোমার মেয়ের বিবাহ হইয়া গিয়াছে, তোমার মেয়ে বিধবা হইয়াছে। কুসুমের মাসী অতিশয় চিন্তিত হইলেন।

    এই সময় তাঁহাকে গ্রামে এক দো-পড়া মেয়ে লইয়া দলাদলি হইয়াছিল। সে কন্যাটির পিতামাতা প্রথম একস্থানে মেয়েটিকে বিক্রয় করে, অর্থাৎ টাকা লইয়া একজনকে কন্যাটি সম্প্রদান করে। কিছুদিন পরে, তাহার মাতামহের বাড়ীতে পাঠাইয়া, তাহাকে আর একটি লোকের নিকট বিক্রয় করে। সেই বিষয় লইয়া এখন মোক মামলা ও দলাদলি চলিতেছিল। কন্যার দুই পতিতে পতিতে মোকর্দমা, শ্বশুর-জামাতার মোকর্দমা আর গ্রামের দুইপক্ষে দলাদলি।কুসুমের মাসী বাল্যকাল হইতে যতগুলি দো-পড়া মেয়ের কথা শুনিয়াছিলেন, তাহা স্মরণ করিয়া দেখিলেন। মনে মনে তিনি বলিলেন,—ঐ দেখ রঘুর মা! ওর দুইবার বিবাহ হইয়াছিল, এখন কেমন তাহার সুখ-ঐশ্বৰ্য্য হইয়াছে। আমি যদি চুপ করিয়া থাকি, আর একাজ যদি হইয়া যায়, তাহা হইলে দো-পড়ার মত ততটা দোষের কথা হয় না। হীরালাল নাই সেজন্য ততটা দোষের কথাহয় না। হীরালালকে তার মনে পড়িয়া গেল। একটি দীর্ঘনিবাস তিনি পরিত্যাগ করিলেন, তাহার চক্ষুতে জল আসিয়া গেল।

    ইহার মধ্যে একটা একাদশী পড়িল। একদশী করিতে মাসী,–কুসীকে বার বার মানা করিতেন; কিন্তু কুসী তাহা শুনিত না। সে নিরন্থ উপবাস করিত। গ্রীষ্মকাল পড়িয়াছে, এই একাদশীর দিন সূর্যের বড়ই উত্তাপ হইল। জল-পিপাসায় তাহার বুকের ছাতি ফাটিয়া যাইতে লাগিল।সমস্তদিন কুসী মাথায় ও গায়ে জল ঢালিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া মাসীর মনোদুঃখের আর সীমা-পরিসীমা রহিল না। দো-পড়া মেয়ের কথা এখন হইতে সর্বদাই তাহার মনে জাগিতে লাগিল।। তা যদি হয়, তবে এ বা নয় কেন? তিনি এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, কি করা কর্তব্য, এখনও মাসী তাহস্ত্রির করিতে পরিলেন না। কিন্তু পঞ্জাবে যাইবার নিমিত্ত তিনি জিনিষপত্র গুছাইতে গুছাইতে ভাঙ্গা বাক্স হইতে লোচন ঘোষের চিঠি ও সেই খবরের কাগজ বাহির হইল। পোড়াইবার নিমিত্ত সেই দুইখানি কাগজ মাসী রান্নাঘরে লইয়া গেলেন। উনানে ফেলিয়া দিবার পূর্বে তিনি চিঠিখানি একবার পড়িয়া দেখিলেন। তাহার পর খবরের কাগজের সেই স্থানটিও পাঠ করিলেন। সেই লাল চিহ্নিত স্থানটি পাঠ করিয়া, তিনি কাগজখানি এদিক ওদিক দেখিতে লাগিলেন। সহসা আর একটি স্থানে তাহার দৃষ্টি পড়িল। আর একটি সংবাদের প্রারম্ভে বড় বড় অক্ষরে বিধবা-বিবাহ এই দুইটি কথা ছিল। কোন স্থানে এক বিধবা-বিবাহ হইয়াছিল। সংবাদরূপে সেই বিবরণ খবরের কাগজে প্রকাশিত হইয়াছিল। চিঠি ও খবরের কাগজ মাসী আর পোডাইলেন না, কাগজ দুইখানি পুনরায় তুলিয়া বাখিলেন।

    মাসী ভাবিতে লাগিলেন, তবে বিধবা-বিবাহ হয়। বিদ্যাসাগরের কথা তিনি শুনিয়াছিলেন।

    আমার মুখপানে চাহিয়া কুসুমের মাসী বলিলেন,–দেখ ডাক্তারবাবু। কুসীকে আমি প্রতিপালন করিয়াছিলাম। তাহার অবস্থা দেখিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছিল; আমি ভাবিলাম যে, ইহাতে যদি কোন পাপ থাকে তো সে পাপ আমার হউক, কুসীর যদি পুনরায় বিবাহ হয় তো হউক, তাহাকে আমি প্রতিবন্ধক হইব না। কিন্তু আমি তখন এই বলিয়া মনকে প্রবোধ দিলাম যে, ইহাতে কোন পাপ নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় পণ্ডিত, ধার্মিক, দয়াবান, পরপোকারী লোক ছিলেন। ইহাতে যদি পাপ থাকিত, তাহা হইলে কখনই তিনি বিধান দিতেন না।

    আমি বলিলাম,–যে সকল বালিকা অতি অল্পবয়সে বিধবা হয়, স্বামীর সহিত যাহাদের কখন সাক্ষাৎ হয় নাই, সংসার-ধর্মের বিষয়ে যাহারা কিছুই জানে না, এইরূপ বিধবা বালিকাদিগের পুনরায় বিবাহ নিমিত্ত বিদ্যাসাগর-মহাশয় বিধান দিয়াছিলেন।

    মাসী উত্তর করিলেন,–অতশত আমি বুঝি নাই। কুসীর পুনরায় বিবাহ হইলে যে কোন পাপ হইবে না, তাহাই ভাবিয়া সে সময় আমি মনকে প্রবোধ দিলাম। আমি ভাবিলাম যে, আমি নিজে উদ্যোগ করিয়া এ কাজ করিব না। তবে হয় হউক তাহাতে আমি আপত্তি করিব না। এইরূপ ভাবিলাম বটে, কিন্তু হীরালালের জন্য আমার মনে যে কি শোক উথলিয়া উঠিল, তাহা আর তোমাকে আমি কি বলিব! যাহা হউক, আমি পঞ্জাবে আসিবার জন্য ব্যস্ত হইতে লাগিলাম, আর কুসীর নিকট এ কথা কি করিয়া বলিব, তাহাকে কি করিয়া সম্মত করিব, তাহাই ভাবিতে লাগিলাম।

     

    নবম পরিচ্ছেদ — তিন সত্য

    পাঁচ ছয় দিনের পরে রসময়বাবুর নিকট হইতে মাসী আর একখানি পত্র পাইলেন। সে পত্রখানি তিনি কলিকাতা হইতে লিখিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি বলিয়াছিলেন, আমি কলিকাতায় পৌঁছিয়াছি। এ স্থানে আসিয়া আর একটি বিশেষ কাৰ্যে আমি ব্যস্ত আছি। সেজন্য তোমাদিগকে আনিতে আমি নিজে যাইতে পারিব না। গ্রামের কোন লোককে সঙ্গে লইয়া তোমরা কলিকাতায় আসিবে।

    কলিকাতায় আসিয়া রসময়বাবু কি এমন বিশেষ কার্যে ব্যস্ত হইয়াছেন? পঞ্জাবে থাকিতেই তাহার বিবাহের কথা হইয়াছিল। সে-কন্যা দেশে ছিল। কলিকাতা আসিয়া সেই কথা পাকাপাকি হইল। তিনি কন্যা দেখিলেন। কন্যা বয়ঃস্থা ছিল, দেখিতে শুনিতে নিতান্ত মন্দ নয়। বর্মণীর মৃত্যুর পর হইতে তাহার মন নিতান্ত উদাস ছিল। পুনরায় বিবাহ করিতে তাহার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নিজের নিকট নিজে তিনি সে ইচ্ছা গোপন করিতে লাগিলেন। আপনার মনকে আপনি তিনি এই বলিয়া বুঝাইলেন, আমার বয়স হইয়াছে, এ বয়সে পুনরায় আর বিবাহ না করাই ভাল। কিন্তু, আমি যদি কেবল শালী ও কন্যাকে লইয়া পঞ্জাবে যাই, তাহা হইলে লোকে বলিবে, মেয়ে ঘাড়ে করিয়া আনিয়া বিবাহ দিল। তাহার চেয়ে যদি আমি বিবাহ করিয়া পরিবার লইয়া পঞ্জাবে যাই, আর সেইসঙ্গে আমার কন্যা ও অভিভাবক-স্বরূপ বৃদ্ধা শালীকে যদি লইয়া যাই, তাহা হইলে কেহ আর সে কথা বলিতে পারিবে না। এইরূপ তর্ক বিতর্ক করিয়া রসময়বাবু আপনার মনকে বুঝাইলেন, মনকে বুঝাইয়া তিনি নিজের বিবাহের কার্যে ব্যস্ত হইলেন। বিবাহের পর পঞ্জাবে যাইবার কেবল দুই দিন পূর্বে যাহাতে কুসুম ও তাহার মাসী কলিকাতা আসিয়া উপস্থিত হয়, রসময়বাবু সেইরূপ দিন ধার্য্য করিয়া তাহাদিগকে পত্র লিখিয়াছিলেন। কলিকাতায় আসিয়া রসময়বাবু এক বন্ধুর বাটীতে অবস্থিতি করিতেছিলেন। সেই স্থান হইতেই তাঁহার বিবাহ হইবে, এইরূপ স্থির হইয়াছিল। কুসুম ও তাহার মাসীকে কলিকাতায় সেই ঠিকানায় আসিতে লিখিয়াছিলেন।

    কলিকাতায় এদিকে রসময়বাবুর বিবাহ হইয়া গেল, গ্রামে ওদিকে কুসুম ও তাহার মাসীর যাত্ৰা করিবার সময় উপস্থিত হইল। কলিকাতা যাইবার পূর্বদিন রাত্রিতে বিছানায় শয়ন করিয়া মাসী বলিলেন,–কুসুম! মা আমার!

    কুসী উত্তর করিল,—কি, মাসী! মাসী বলিলেন,–আমি তোমাকে একটা কথা বলি?

    কুসী জিজ্ঞাসা করিল,–কি মাসী?

    মাসী বলিলেন,—তুমি বল, আমি যাহা বলিব, তাহা করিবে?

    কুসী কাহারও সহিত অধিক কথা কহিত না। সকল কথা তাহার কর্ণগোচর হইত কি না, তাহাও সন্দেহ-সর্বদাই সে অন্যমনস্কভাবে থাকিত। হাঁ কি না এই দুইটি কথার অধিক সে বলিত না। কুসী জিজ্ঞাসা করিল,–কি মাসী?

    মাসী উত্তর করিলেন,—আগে তুমি তিন সত্য করিয়া স্বীকার কর যে, আমি যাহা বলিব, তাই তুমি করিবে, তবে আমি বলিব। কুসী বলিল,–হাঁ মাসী।

    মাসী বলিলেন,–তুমি আমার গায়ে হাত দিয়া বল।

    কুসী ইহার মর্ম কিছুই বুঝিতে পারে নাই। মাসীর সকল কথা সে শুনিয়াছিল কি না, তাহও সন্দেহ। মাসীর গায়ে হাত দিয়া সে বলি,–হাঁ মাসী?

    মাসী বলিল,–দেখ কুসী। তোমার যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, কলিকাতা গিয়া সে কথা তুমি তোমার বাপকে কি কাহাকেও বলিতে পারিবে না। কেমন, বলিবে না বল?

    অন্যমনস্কভাবে কুসী বলিল,–না, মাসী।

    মাসী বলিলেন,–আমার মাথা খাও, তুমি সে কথা কাহাকেও বলিবে না। যদি কেহ জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি একবেলা ভাত খাও কেন, তুমি মাছ খাও না কেন, একাদশীর দিন উপবাস কর কেন, আমি সকলকে বলিব যে, কবিরাজ এইরূপ করিতে বলিয়াছে। তুমি যেন আর কিছু বলিয়া ফেলিও না। পুনরায় অন্যমনস্কভাবে কুসী বলিল,–না মাসী!

    কুসী কাহারও সহিত কথা কহে না, বুদ্ধিশুদ্ধি-হীন একপ্রকার জড়ের মত সে হইয়া আছে। সে যে কাহাকেও কোন কথা বলিবে না, সে বিষয়ে মাসী একরূপ নিশ্চিত হইলেন। কিন্তু পুনরায় তাহার বিবাহ হইবে, এই কথা শুনিলে সে কি করিবে, সে কি বলিবে, সে সম্বন্ধে মাসী নিশ্চিত হইতে পারিলেন না। যাহা হউক, সে রাত্রিতে এই পর্যন্ত কথাবার্তা হইল। পুনরায় যে তাহার বিবাহ হইবে, সে রাত্রিতে মাসী তাহাকে বলিল না।

    কুসীকে লইয়া মাসী কলিকাতায় উপস্থিত হইলেন। কুসী পিতাকে গিয়া প্রণাম করিল। হয়দিনের কন্যাকে চকিতের ন্যায় একবার তিনি দেখিয়াছিলেন। তাহার পর আজ পুনরায় তাহাকে দেখিলেন। পিতা তাহাকে নানারূপ কথা জিজ্ঞাসা করিলেন; কিন্তু কুসী ঘাড় হেঁট করিয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিল, কেবল হাঁ কি না বলিয়া দুই একটি প্রশ্নের উত্তর দিল। রসময়বাবু দেখিলেন যে, তাহার কন্যা পীড়িতা; তাহার মনের অবস্থা বিষয়েও তাঁহার সন্দেহ জন্মিল। তাহার জ্বর-বিকারের কথা মাসী তাহাকে পূর্বেই বলিয়াছিলেন। বাত-শ্লেষ্ম বিকারের পর কাহারও কাহারও এইরূপ হয়, তিনি তাহা শুনিয়াছিলেন। তিনি মনে করিলেন যে, বায়ু-পরিবর্তন করিলে, ভালরূপ আহার পাইলে, তাহার পর বিবাহ হইলে, রোগ ভাল হইয়া যাইবে। এই সময় কুসীর বামগালে সেই কালো দাগটির প্রতি রসময়বাবুর দৃষ্টি পড়িল। সেই দাগটিকে ঠিক আঁচিল বলিতে পারা যায় না। আঁচিলের ন্যায় ইহা তত স্থূল নহে, তিলের মত ইহা তত ক্ষুদ্র নহে, ইহাকে সচরাচর লোকে জরুল না কি বলে।

    রসময়বাবু যে পুনরায় বিবাহ করিয়াছেন, কলিকাতায় আসিয়া মাসী তাহা জানিতে পারিলেন। নব-মাতার সহিত কুসুমের সাক্ষাৎ হইল। তিনি নূতন বধু, এক হাত ঘোমটা দিয়া থাকেন। কুসীর মনের তো ঐ অবস্থা। দুইজনে কথা বড় কিছু হইল না। কুসীর যে পুনরায় বিবাহ হইবে, কলিকাতায় থাকিতে কুসী তাহা জানিতে পারে নাই। নববধু হয় তো সে কথা জানিতেন না। তিনি সে বিষয়ে কুসুমকে কিছু বলেন নাই, মাসীও কিছু বলেন নাই।

    পরদিন ফটোগ্রাফ গ্রহণের ধূম পড়িয়া গেল। পঞ্জাব হইতে আসিবার সময় রসময়বাবুকে দিগম্বরবাবু পৈ-পৈ করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন যে, কন্যার যেন ফটোগ্রাফ গৃহীত হয়। রসময়বাবু নিজের নববিবাহিতা পত্নীর ও কুসীর ফটোগ্রাফ লইলেন। কুসী কোনও কথাতেই নাই। তোমরা যা কর; কোন বিষয়ে, আপত্তি করিবার তাহার শক্তি নাই। কিন্তু নববধূর ছবি বড় সহজে হয় নাই। মুখ খুলিতে তিনি কিছুতেই সম্মত হন নাই। অনেক সাধ্য-সাধনায়, অবশেষে কিছু তিরস্কারের পর তবে এ কাজ হইয়াছিল।

    রসময়বাবু সপরিবারে পঞ্জাব আসিবার নিমিত্ত যাত্রা করিলেন। পথে লাহোরে আমার সহিত সাক্ষাৎ হইল। উজিরগড়ে উপস্থিত হইয়া, বিবাহের কথা ক্রমে ক্রমে কুসীর কানে উঠিল। সহজেই কুসী স্তম্ভিত হইল। স্তম্ভিত সামান্য কথা, চলিত কথায় যেমন বলে, আক্কেল গুড়ুম, কুসীর তাহাই হইল।

    রাত্রিতেই মাসীর নিকট কুসী শয়ন করিত। সেই রাত্রিতেই সে মাসীকে বলিল,–মাসী এ কি কথা শুনিতে পাই।

    মাসী জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি কথা? কুসী উত্তর করিল,—আবার বে।

    মাসী বলিলেন,—হাঁ, আমি তোমার পুনরায় বিবাহ দিব।

    কুসী বলিল,–ছি মাসী! ও কথা মুখে আনিও না।

    মাসী বলিলেন,–কুসী! তুমি আমার কাছে তিন সত্য করিয়াছ; আমার গায়ে হাত দিয়া বলিয়াছ যে, আর একবার তোমার যে বিবাহ হইয়াছিল, সে কথা তুমি কাহাকেও বলিবে না।

    কুসী বলিল,–কিন্তু আবার বে করিব, এ কথা তো বলি নাই।

    মাসী বলিলেন,–তা বল আর নাই বল, আমরা তোমার পুনরায় বিবাহ দিব।

    কুসী বলিল,–মাসী! এ কাজ কিছুতেই হইবে না।

    মাসী বলিলেন,–দেখ কুসী! ছয় দিনের মেয়ে আমার হাতে দিয়া তোমার মা চলিয়া গেল। সেই অবধি আমি তোমাকে প্রতিপালন করিয়াছি। প্রাণের অপেক্ষা তোমাকে আমি ভালবাসি। আজ দুই বৎসর তোমার মুখপানে চাহিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। তোমার এ অবস্থা আমি আর দেখিতে পারি না। তোমার ভালর জন্য আমি এ কাজ করিতেছি।

    কুসী পুনরায় বলিল,–না মাসী। এ কাজ কিছুতেই হইবে না।

    মাসী বলিলেন,—পূর্বের কথা কিছুতেই প্রকাশ হইবে না। রামপদ নাই, সে কথা আর কেহ জানে না। তোমার যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, তোমার বাপ তাহা জানে না। তাহাকে আমি সে কথা বলি নাই। তোমাকে আইবুড়ো মনে করিয়া, সে এই বিবাহের আয়োজন করিয়াছে। ভাল বর ঠিক হইয়াছে। সে তোমাকে ভাল ভাল কাপড় দিবে, ভাল ভাল গহনা দিবে, তোমার নামে কোম্পানীর কাগজ লিখিয়া দিবে।

    কুসী বলিল,–না মাসী! এ কাজ কিছুতেই হইবে না।

    মাসী বলিলেন, এখন আর কি করিয়া বন্ধ হইবে? এখন যদি আমি গিয়া তোমার বাপকে বলি যে, কুসীর আর একবার বিবাহ হইয়াছিল, তাহা হইলে সে কি মনে করিবে। তাহাকে না বলিয়া পূর্বে তোমার বিবাহ দিয়াছি তাহার পর সে বিবাহ আমি এতদিন গোপন করিয়াছি, এজন্য তোমার বাপ চাই কি আমাকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিতে পারে। এ বৃদ্ধবয়সে তাহা হইলে আমি কোথায় যাইব! তোমার কি ইচ্ছা যে, আমি দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া বেড়াই?

    কুসী চুপ করিয়া রহিল।

    মাসী পুনরায় বলিলেন,–দেখ কুসী! এখন আর উপায় নাই। এ কাজ আর বন্ধ হয়। এখন যদি তুমি তোমার বাপকে বলিয়া দাও, তাহা হইলে এ মুখ আর আমি কাহাকেও দেখাইতে পারিব না। আমি তাহা হইলে গলায় দড়ি দিয়া মরিব।

    কুসী চুপ করিয়া রহিল। অনেকক্ষণ চুপ থাকিয়া কুসী বলিল,–মাসী! তুমি যাহা বলিলে, আমি তাহা শুনিলাম। এখন আমি যাহা বলি, তুমি শুন! এ বিবাহ কিছুতেই হইবে না। এ কাল-বিবাহ হইবার পূর্বেই আমি মরিয়া যাইব।

    মাসীর সহিত এতক্ষণ কুসী যেভাবে কথা কহিল, তাহাতে তাহার মনের যে কিছু বৈলক্ষণ্য ঘটিয়াছিল, তাহা বোধ হয় না। কুসী পাগল হয় নাই, বায়ুগ্রস্ত হয় নাই, এই দুই বৎসর সে দুঃখ-সাগরে নিমগ্ন ছিল। দুঃখের ভারে তাহার হৃদয় একেবারে ভগ্ন হইয়া গিয়াছিল। সে অবস্থায় পৃথিবীর কোন বিষয়ে সে আর কি করিয়া লিপ্ত হয়! কি করিয়া সে আর লোকের সহিত কথা কয়! তাহার চক্ষু, তাহার কর্ণ, তাহার বাকশক্তি, তাহার মন, তাহার প্রাণ সর্বদা সেইখানে ছিল,—সেই যেখানে হীরালাল।

    যদি সন্নাসীঠাকুর না আসতেন, তাহা হইলে আমার বোধ হয়, কুসী আজ রাত্রিতেই মারা পড়িত।

    আমি অমুক দিন মারা পড়িব এইরূপ ভাবিয়া অনেক লোক মারা পড়িয়াছে। কিম্বা তুমি অমুক দিন মারা পড়িবে এইরূপ শুনিয়াও অনেক লোক মারা পড়িয়াছে। একপ্রকার বিদ্যা আছে তাহাকে হিপনটিসম (Hypnotism) বলে; তাহাতে মানুষের মনের অবস্থা পরিবর্তিত করিতে পারা যায়। তাহার মনের অবস্থা পরিবর্তন করিয়া, তাহাকে তুমি যেরূপ চিন্তা করিতে বলিবে, যে কাজ করিতে বলিবে, সে তাহা করিবে। এইরূপ মনের অবস্থা কোন কোন লোকের নিজে নিজেই হয়। তখন সে যেরূপ চিন্তা করে কাৰ্য্যে তাহা পরিণত হয়। ইহাকে স্বতঃপ্রবৃত্তি (Selfsuggestion) বলে। কুসীরও বোধ হয়, তাহাই ঘটিয়াছিল। যেদিন হইতে সে বিবাহের কথা শুনিয়াছিল, সেইদিন হইতে সে আরও শীর্ণ, আরও বিবর্ণ হইতে লাগিল।

    বিবাহের আয়োজন হইতে লাগিল বটে, কিন্তু তাহার জন্য সে ভীত হইল না। আর একবার যে তাহার বিবাহ হইয়াছিল সে প্রকাশ করিল না। সে নিশ্চয় বুঝিয়াছিল যে, এ বিবাহের পূর্বেই সে মরিয়া যাইবে। পিতার মিছামিছি টাকা খরচ হইতেছে সেজন্য সে সর্বদা বলিত,এ সব কেন! আমি পূর্বেই মরিয়া যাইব। সাহস করিয়া একদিন তাহার পিতার নিকটে গিয়াও সে এই কথা বলিয়াছিল। কিন্তু তাহার কথা কেহই শুনিলেন না। সে বায়ুগ্রস্ত হইয়াছে, বিবাহ হইলেই সব ভুলিয়া যাইবে, এই কথা বলিয়া পিতা ও মাসী তাহার কথা উড়াইয়া দিলেন। এই অবস্থায় আমি রসময়বাবুর বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম।

    মাসীর বিবরণ সমাপ্ত হইল! পুনরায় বলি যে মাসীর এই পূর্ব বিবরণ আমি আমার নিজের ভাষায় প্রদান করিলাম। এই বিবরণ সম্বন্ধে আমি নিজে যাহা দেখিয়াছি ও ইহার পবে অন্যান্য লোকের মুখ হইতে যাহা অবগত হইয়াছি, তাহাও যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়াছি।

     

    দশম পরিচ্ছেদ – ভগবান রক্ষা করিয়াছেন

    মাসীর কথা সমাপ্ত হইলে, আমি তাঁহাকে বলিলাম যে,—তবে এখন বাড়ী চলুন!

    মাসী উত্তর করিলেন,—বাড়ী! রায়মহাশয়ের বাড়ীতে আর আমি যাইব না। এ পোড়া মুখ আর সেখানে আমি দেখাইব না।

    আমি বলিলাম,–কুসীর একবার বিবাহ হইয়া গিয়াছে শুনিলে রসময়বাবু রাগ করিবেন বটে, কিন্তু আপনি কুসীর ভালর জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। যাহা হউক, কুসীর আজ যখন বিবাহ হইয়া যায় নাই, তখন বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। সেজন্য আমি তাঁহাকে সান্ত্বনা করিতে পারি। আমি নিশ্চয় বলিতেছি যে, তিনি আপনাকে একটি কথাও বলিবেন না। আর একটি কথা, কুসীর যে একবার বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে কথা এখন তাহাকে বলিবার বা আবশ্যক কি? পুনরায় যখন তিনি পাত্রের অনুসন্ধান করিবেন, সেই সময় তাহাকে বলিলেই চলিবে।।

    মাসী বলিলেন,–তোমার কথা আমি বুঝিতে পারি না। তুমি বলিতেছ যে, কুসীর পূর্ব-বিবাহের কথা প্রকাশ হয় নাই। তবে দিগম্বরবাবুর সহিত তাহার বিবাহ বন্ধ হইল কি করিয়া?

    আমি উত্তর করিলাম,—আপনি তা জানেন না? না, তখন আপনি সে স্থানে ছিলেন না। আপনি বাড়ীর ভিতর চলিয়া গিয়াছিলেন। দিগম্বরবাবুর স্ত্রী আছেন। তাহার গৃহ শূন্য হয় নাই, সে মিথ্যা কথা। ফাকি দিয়া তিনি এই বিবাহ করিতেছিলেন। তাঁহার সেই স্ত্রী আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। বাপ! এমন মেয়েমানুষ কখন দেখি নাই। তাহার পর সঙ্গে যে দাসীটি আনিয়াছেন, সে-ও এক ধনুর্ধর। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। আমি মনে করিলাম সভার মধ্যেই বা দিগম্বরবাবুকে তিনি ঝাটা পেটা করেন। যাহা হউক, সেইজন্য বিবাহ বন্ধ হইয়া গিয়াছে।

    মাসী জিজ্ঞাসা করিলেন, আর-সন্ন্যাসী?

    আমি উত্তর করিলাম,—তিনি কুসীর চিকিৎসা করিতেছেন। কুসীকে তিনি অনেকটা ভাল করিয়াছেন। এখন আপনি বাড়ী চলুন। পূর্ব কথা প্রকাশ পায় নাই, কুসীর আজ পুনরায় বিবাহ হয় নাই, বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। মনে করিয়া দেখুন আপনার কত পূণ্যবল! ভগবান রক্ষা করিয়াছেন!

    মাসী উত্তর করিলেন,—ভগবান রক্ষা করিয়াছেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। প্রথম লগ্নে যদি বিবাহ হইয়া যাইত, তাহা হইলে যে কি হইত। ভগবান রক্ষা করিয়াছেন। কিন্তু রায়মহাশয়ের বাটীতে আমি আর যাইব না। তুমি পাগল, তাই আমাকে যাইতে বলিতেছ। তুমি বাটী ফিরিয়া যাও। আমি কাশী যাইব! তোমায় টিকিট কিনিয়া দিতে হইবে না। আমি কিনিতে পারিব।

    এখন আমি একটু প্রতারণা করিলাম। জানিয়া শুনিয়া আমি কখনও মিথ্যাকথা বলি, কি কাহারও সহিত প্রতারণা করি না। কিন্তু আজ আমি তাহা করিয়া ফেলিলাম। যদি ভালর জন্য আমি সে কাজ করিলাম, তথাপি সে কথা মনে হইলে এখনও আমার লজ্জা হয়।

    আমি বলিলাম—তা কি কখন হয়। আপনি স্ত্রীলোক, এ বিদেশ, ভয়ঙ্কর দেশ। এই রাত্রিকালে এ স্থানে আপনাকে একেলা ছাড়িয়া যাইতে পারি না। একা দাঁড়াইয়া আছে; চলুন স্টেশনে যাই, সেই স্থানে গিয়া চলুন বসিয়া থাকি। তাহার পর গাড়ীর সময় হইলে টিকিট কিনিয়া আপনাকে আমি গাড়ীতে বসাইয়া দিব।

    মাসী বলিলেন,–এখনও অনেক বিলম্ব আছে। এত আগে থাকিতে গিয়া কি হইবে?

    আমি বলিলাম,–এ স্থানে বসিয়া থাকিলেই বা কি হইবে? তাহা অপেক্ষা চলুন স্টেশনে গিয়া বসিয়া থাকি।

    মাসী সে কথায় সম্মত হইলেন। একাওয়ালাকে আমি প্রস্তুত হইতে বলিলাম। সেই সময় তাহাকে গোপনভাবেও কিছু উপদেশ দিলাম। মাসী এক্কার উপরে উঠিলেন। আমিও উঠিয়া তাহার একপার্শ্বে বসিলাম। এক্কাওয়ালা এক্কা হাঁকাইয়া দিল। একা দ্বিগুণ বেগে দৌড়িতে লাগিল।

    কিছুক্ষণ পরে মাসী বলিলেন,–ষ্টেশন যে অতি নিকটে? সে স্থানে পৌঁছিতে এত বিলম্ব হইতেছে কেন?

    আমি কোন উত্তর করিলাম না।

    এক্কা দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। অল্পক্ষণ পরে মাসী পুনরায় বলিলেন,—আমি বুঝিতে পারিয়াছি, ফাকি দিয়া তুমি আমাকে বাড়ী লইয়া যাইতেছ। কিছুতেই আমি বাড়ী যাইব না। গাড়ীওয়ালা! গাড়ীওয়ালা! দাঁড়া! আমি নামিয়া যাই।

    আমি একাওয়ালার গা টিপিলাম। মাসীর কথা সে শুনিল না। একা দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। আমি তাঁহাকে বলিলাম,–দেখুন। রসময়বাবুর আপনি অনেক ঘাড় হেঁট করিয়াছেন, আজ এই বিবাহসভায় যে কাণ্ড হইয়াছে, ভদ্রলোকের ঘরে সেরূপ কখনও হয় না। রসময়বাবু পূর্বে যে পাপ করিয়াছেন, মেয়ের যে এতদিন খোঁজখবর তিনি লন নাই, সেই সকল পাপের ফল আজ বিলক্ষণ ভোগ করিয়াছেন। আর কেলেঙ্কারি করিবেন না, আর তাহার মাথা কাটিবেন না।

    মাসী উত্তর করিলেন,–তুমি জান না, তাই এমন কথা বলিতেছ। সে স্থানে আর আমি কিছুতেই যাইব না।

    এই কথা বলিয়া মাসী পাগলিনীর মত হইয়া একা হইতে লাফাইয়া পড়িবার উপক্রম করিলেন। আমি বড়ই বিপদে পড়িলাম। আমি তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারি না।

     

    একাদশ পরিচ্ছেদ – হিপ্‌ হিপ্‌ হুরে

    এই সময় যে স্থানে একা গিয়া উপস্থিত হইল, সে স্থানে এক অপূর্ব দৃশ্য আমাদের নয়নগোচর হইল। সেই দৃশ্য দেখিয়া মাসী এক্কাতে স্থির হইয়া বসিলেন। একাওয়ালাকে আমি একা থামাইতে বলিলাম। যে দৃশ্যটি আমাদের নয়নগোচর হইল, তাহা এই,–আমরা দেখিলাম যে, একদল বাঙ্গালী ষ্টেশন অভিমুখে আসিতেছেন। এক্কা যখন স্থির হইয়া দাঁড়াইল, তখন দেখিলাম যে, তাহারা সেই বরযাত্রীদল। সেই দলের আগে আগে বিরসবদনে সভয় মনে দিগম্বরবাবু চলিয়াছেন। তাঁহার মুখ ঈষৎ হাঁ হইয়া গিয়াছে, বেশ আলুথালু হইয়াছে, আঁকাবাঁকা পা ফেলিতে ফেলিতে দুলিতে দুলিতে ন্যাল-পাগলার মত তিনি চলিয়াছেন। তাহার ঠিক পশ্চাতে একধারে বিন্দী ও অন্যধারে গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী। বিন্দীর হাতে একটি ছাতি, দিগম্বরীর হাতে একগাছি ঝাটা। ঝাটাগাছটা তিনি বোধ হয় সঙ্গে করিয়া আনেন নাই, রসময়বাবুর বাটী হইতে সংগ্রহ করিয়া থাকিবেন। লোকে ঠিক যেমন মহিষকে তাড়াইয়া লইয়া যায়, বিন্দী ও তিনি সেইরূপ দিগম্বরবাবুকে তাড়াইয়া লইয়া যাইতেছেন। বিন্দী ও দিগম্বরীর এক ধারে ছোটটু সিং অনাধারে কিষ্ট। ছোষ্ট্রর হাতে গহনার বাক্স, আর কিঁষ্টার হাতে দিগম্বরবাবুর পোক রাখিবার কার্পেটের ব্যাগ। ইহাদের পশ্চাতে বরযাত্রীগণ। বরযাত্রীগণের মধ্যে কেহ কেহ উলু দিতেছিলেন, কেহ কেহ পোঁ পোঁ করিয়া মুখে শঙ্খ বাজাইতেছিলেন, কেহ কেহ বা ইংরাজী ধরণের হিপ হিপ হুরে! হিন্ হি হুরে! জয়ধ্বনি করিতেছিলেন। সকলের পশ্চাতে জনকতক লোক চেঙ্গারি মাথায় করিয়া আসিতেছিল।

    ইহাদের সঙ্গে একজন সিপাহী ছিল। বাবুদিগকে সে বার বার চুপ করিতে অনুরোধ করিতেছিল। সে বলিতেছিল,—বাবুসাহেব। আপনোক আসা গোলমাল ন কিজিয়ে। ইয়ে ছাইনি হায়। বড়ি খারাপ জায়গা। রসময়বাবু সাহেবসে হুকুম লিয়া সচ, মগর আসা গোলমাল করনেসে কুছ বখেড়া উঠেগো।

    আমি পুনরায় বলিয়া রাখি, যে স্থানে এই সমুদয় ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার প্রকৃত নাম আমি প্রদান করি নাই। স্থান সম্বন্ধে কেহ আমার ভুল ধরিবেন না।

    এই ব্যাপার দেখিয়া আমি আশ্চর্য হইলাম। দিগম্বরবাবু ও তাহার পরিচালিকাগণ একটু অগ্রসর হইলে আমি একজন বরযাত্রীকে ডাকিলাম। পাছে মাসী পলায়ন করেন, সেই ভয়ে আমি একা হইতে নামিতে সাহস করিলাম না। কতকগুলি বরযাত্রী আসিয়া আমার একা ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। রাত্রি দুই প্রহরের সময় বিদেশে, এরূপ কঠোর স্থানে পথের মাঝে গোল করিতে আমি তাহাদিগকে প্রথম নিষেধ করিলাম। তাহার পর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—আপনারা ইহার মধ্যে চলিয়া আসিলেন কেন? আহারাদি করিয়া তাহার পর আসিলে ভাল হইত না? গাড়ীর এখন অনেক বিলম্ব আছে!

    একজন বরযাত্রী উত্তর করিলেন,–আজ যে অভিনয় দেখিয়াছি, তাহাতে পেট ভরিয়া গিয়াছে, আহারাদির আর আবশ্যক নাই।

    আর একজন বলিলেন,—না মহাশয়! আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। ঐ সকল ঘটনার পর সে স্থানে আর থাকা আমরা উচিত বোধ করিলাম না। বিশেষতঃ পাছে গলাভাঙ্গা ঠাকুরাণী কোনরূপ একটা ঢলাঢলি করিয়া বসেন, সেই ভয়ে আরও আমরা চলিয়া আসিলাম। তিনি না করিতে পারেন এমন কাজ নাই। সঙ্গে আবার বিন্দী আছে। সে-ও একজন নামজাদা সেপাই। আমরা বরযাত্রী আসিয়াছিল, সেই অপরাধে আমাদিগকেও হয় তো দিগম্বরী প্রহার করিতে পারেন। আহারাদির বিষয়ে আপনার কোন চিন্তা নাই, রসময়বাবু প্রচুর খাদ্য সামগ্রী আমাদিগকে দিয়াছেন। চেঙ্গারি করিয়া ঐ দেখুন, লোকে তাহা লইয়া যাইতেছে। ষ্টেশনের নিকট গাছতলায় বসিয়া আমরা সকলে আহার করিব। তাহার পর প্রাতঃকালের গাড়ীতে চলিয়া যাইব।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—রসময়বাবুর কন্যা এখন কেমন আছে?

    বরযাত্রী উত্তর করিলেন—কন্যা এখন বেশ আছে। একবার সন্ন্যাসী তাহার কানে কানে কি বলিলেন, তাহাতে তাহার মুখে একটু হাসিও দেখিয়াছিলাম। রসময়বাবু তাহাকে এখন বাটীর ভিতর লইয়া গিয়াছেন। সন্ন্যাসীও বাটীর ভিতর গিয়াছিলেন। শুনিলাম যে, কন্যা শুড়-বুড় করিয়া তাহার সহিত অনেক কথোপকথনও করিয়াছিল। সন্ন্যাসীর ক্ষমতা আছে বলিতে হইবে।

    আর একজন বরযাত্রী বলিলেন,–কন্যার রোগও হয় নাই, মূর্চ্ছাও হয় নাই, সব ঠাট। বরের রূপ-গুণের কথা শুনিয়া সে এইরূপ ঠাট করিয়া পড়িয়াছিল। তাহার পর নবীন তপস্বীকে পাইয়া, নবীন তপস্বিনী হইবার সাধে তাহার রোগ ভাল হইয়া গিয়াছে, হাসি দেখা দিয়াছে, কথা ফুটিয়াছে। দিগম্বরী নম্বর টু হইতে তাহার ইচ্ছা নাই।

    সে কথায় আর আমি কোন উত্তর করিলাম না। একাওয়ালাকে পুনরায় এক্কা হাঁকাইতে বলিলাম। যাইতে যাইতে আমি মাসীকে বলিলাম,—শুনিলেন তো! কুসী ভাল আছে। আপনাকে কেহ কিছু বলিবে না, সে ভয় আপনি করিবেন না, সে ভার আমার রহিল।

    মাসী কোন উত্তর করিলেন না। আমি দেখিলাম যে, তিনি কাঁদিতেছেন। আমি তাঁহাকে আর কিছু বলিলাম না!

    রসময়বাবুর বাটিতে একা আসিয়া উপস্থিত হইল। দেখিলাম যে, তিনি দ্বার বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। দ্বার ঠেলিয়া আমি ডাকিতে লাগিলাম। তাঁহার পঞ্জাবী চাকর আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। একাওয়ালাকে তাহার ভাড়া দিয়া, মাসীকে সঙ্গে লইয়া, আমি বাটীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। বাটীতে দেখিলাম যে, জনপ্রাণী নাই। কিছুক্ষণ পূর্বে যে স্থান লোকের কলরবে পূর্ণ ছিল, এখন সেই স্থান নির্জন ও নিস্তব্ধ হইয়াছিল। খিড়কি-দ্বার দিয়া আমরা দুইজনে একেবারে ভিতর বাড়ীতে যাইলাম। মাসী একটি ঘরে প্রবেশ করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিতে উদ্যত হইলেন। বোধ হয় সে ঘরটি তাহার। বাহির হইতে আমি দ্বার ঠেলিয়া ধরিলাম।

    আমি বলিলাম,–দ্বারে খিল দিতেছেন কেন?

    মাসী উত্তর করিলেন,—তোমার সে ভয় নাই। আমি আত্মহত্যা করিব না। অনেক পাপ করিয়াছি। সে পাপ আর করিব না।

    আমি দ্বার ছাড়িয়া দিলাম। মাসী দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ পুনরায় ঈষৎ একটু খুলিয়া আমাকে তিনি ডাকিলেন। আমি তাহার নিকট ফিরিয়া যাইলাম।

    মাসী বলিলেন,–একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করি।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–কি কথা?

    মাসী উত্তর করিলেন,—তুমি কুসীর বাবুকে দেখিয়াছিলে?

    আমি উত্তর করিলাম,—হাঁ! কাশীতে আমি তাহাকে দেখিয়াছিলাম।

    মাসী বলিলেন,–সন্ন্যাসীকে গিয়া একবার ভাল করিয়া দেখ।

     

    দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – ওটা ঠাওর হয় নাই

    এই বলিয়া মাসী ঝনাৎ করিয়া কপাট বন্ধ করিয়া দিলেন। আমি এমনি বোকা যে, তবুও মাসীর কথা বুঝিতে পারিলাম না। সন্ন্যাসী ও রসময়বাবু বৈঠকখানায় আছেন শুনিয়া, আমি সেইস্থানে গমন করিলাম। সে স্থানে গিয়া দেখিলাম যে, কেবল তাহারাই দুইজনে আছেন, অন্যকোন লোক নাই। তাহাদের দুইজনে কথোপকথন হইতেছিল। বৈঠকখানায় গিয়া আমি যাই পদার্পণ করিয়াছি, আর সন্ন্যাসীঠাকুর শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন, তাহার পর আমার নিকটে আসিয়া আমাকে প্রণাম করিয়া আমার পদধূলি গ্রহণ করিলেন।।

    আমি বলিলাম,–ও কি করেন! ও কি করেন! ছোট হইলে কি হয়, আপনি সন্ন্যাসী আপনি নারায়ণ? সন্ন্যাসী হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন,– আপনি যে আমাকে চিনিতে পারেন নাই, প্রথমেই তাহা আমি বুঝিয়াছিলাম।

    এইবার আমি ভালরূপে সন্ন্যাসীকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলাম। ভালরূপে তাহাকে দেখিয়া বিস্ময়ে ও আনন্দে আমার হৃদয় পূর্ণ হইয়া গেল! আশ্চৰ্য্য হইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–কে ও, বাবু।

    হাঁ, আমি সেই কাশীর বাবু, এই কথা বলিয়া সন্ন্যাসী পুনরায় আমাকে প্রণাম করিল ও পুনরায় আমার পদধূলি লইল। কুসুমের মাসী বাড়ী ফিরিতে কেন এত আপত্তি করিতেছিলেন, কেন আমাকে বার বার পাগল বলিতেছিলেন, তাহার অর্থ এখন আমি বুঝিতে পারিলাম। সন্ন্যাসীবেশে হীরালাল উপস্থিত হইবামাত্র তিনি তাহাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন। সেজন্য বিবাহসভা হইতে তিনি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া গিয়া রসময়বাবুর স্ত্রীর নিকট হইতে টাকা লইয়া বাড়ী হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন। হীরালালকে কি করিয়া পুনরায় তিনি মুখ দেখাইবেন, সেই ভয়ে তিনি এত কাতর হইয়াছিলেন।

    কুসুমও যে হীরালালকে চিনিতে পারিয়াছিল, তাহাও আমি এখন বুঝিতে পারিলাম বাবুর কণ্ঠস্বর তাহার পক্ষে মহৌষধ স্বরূপ হইয়াছিল। সেই ঔষধের বলেই তাহার উৎপাদিত হইয়াছিল। চৈতন হইয়া সহজে তাহার মনে প্রতীতি হয় নাই যে, মৃতমানুষ পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে। সেজন্য বারবার নিরীক্ষণ করিয়াছিল ও চক্ষু মুদ্রিত করিয়া চিন্তা করিয়াছিল। অবশেষে যখন তাহার মনে প্রতীতি হইল যে, এই সন্ন্যাসী সত্য সত্যই তাহার বাবু তখন সে আপনার হাতটি তাহার গলায় দিল, আপনার মস্তকটি তাহার বক্ষস্থলে রাখিল, যেন এ জীবনে আর তাহা হইতে সে বিচ্ছিন্ন হইবে না।

    আমি যে বাবুকেচিনিতে পারি নাই, তাহার কারণ এই যে, কাশীতে অল্পক্ষণের নিমিত্ত আমি কেবল দুই তিন বার তাহাতে দেখিয়াছিলাম। তাহার পর, তখন তাহার গোঁপ-দাড়ি উঠেনাই। এখন নবীন শ্ম দ্বারা তাহার মুখমণ্ডলের অধধাদেশ আবৃত হইয়াছিল। পথশ্রমে তাহার সে উজ্জ্বল কান্তিও অনেকটা মলিন হইয়া গিয়াছিল।

    রসময়বাবু আমাকে বলিলেন,–জামাইবাবু আমাকে সকল কথা বলিয়াছেন। এরূপ ঘটনা উপন্যাসে দেখিতে পাই না। এত অপমান এত লাঞ্ছনার পর আমার যে আবার সুখ হইবে, তাহা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। এখন কুসুমের মাসী বাড়ী আসিলেই হয়, তাহা হইলে আমার সকল চিন্তা দূর হয়! তাহাকে আপনি খুঁজিয়া পান নাই?

    আমি উত্তর করিলাম,–হাঁ। তাহাকে আমি বাড়ী আনিয়াছি। বাবু! তুমি গিয়া তাহাকে প্রবোধ দাও। আমাদের কথায় হইবে না। তোমাকে কি করিয়া তিনি মুখ দেখাইবেন, সেই লজ্জায় তিনি অভিভূত হইয়া আছেন। দ্বার বন্ধ করিয়া ঘরের ভিতর তিনি পড়িয়া আছেন। চল বাবু! তাহাকে তুমি সান্ত্বনা করিবে চল। রসময়বাবু! আপনি আসিবেন না?

    বাবু আমার সহিত চলিল। দ্বারে ধাক্কা মারিয়া কুসুমের মাসীকে আমি ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম,—বিশেষ একটা কথা আছে দ্বার একবার খুলিয়া দিন।

    আমার কণ্ঠস্বর শুনিয়া তিনি দ্বার খুলিয়া দিলেন। তিনি দ্বার খুলিলেন, আর বাবু গিয়া তাহার পায়ে পড়িল। মাসী পূর্ব হইতেই রোদন করিতেছিলেন, এখন আরও কাঁদিতে লাগিলেন। তাহার কালা দেখিয়া বাবু ও কাঁদিয়া ফেলিল।

    কিছুক্ষণ পরে বাবু বলিল,–মাসী-মা! আর কদিও না। আমি যে পুনরায় বাঁচিয়া আসিয়াছি, সেজন্য এখন আহ্লাদ করিবার সময়, এখন কাঁদিবার সময় নয়।

    কাঁদিতে দিতে মাসী বলিলেন,–এ পোড়ামুখ আমি তোমাকে কি করিয়া দেখাইব। আমার মরণ কেন হইল না। বাবু বলিল,–কেন মাসী মা। হইয়াছে কি! এ সমুদয় আমার দোষ। আমি যদি না মিথ্যা সংবাদ দিতাম, তাহা হইলে তো আর এরূপ হইত না। যাহা হউক, কুসী যে মারা যায় নাই, তাহাই আমার সৌভাগ্য! মাসী কোন উত্তর করিলেন না। নীরবে কাঁদিতে লাগিলেন।

    বাবু পুনরায় বলিল,–কুসীকে আপনি বড় ভালবাসেন। কুসীর ভালর জন্য আপনি এ কাজ করিতে গিয়াছিলেন। আমি হইলে, আমিও বোধ হয় ঐরূপ করিতাম। তাহাতে আর কান্না কি? সমুদয় আমার দোষ। সে যাহা হউক, এখন আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে। সন্ন্যাসীর বেশে আজ দুই বৎসর মাঠে-ঘাটে বেড়াইতেছি। চল মাসী-মা! আমাকে খাবার দিবে চল। তুমি নিজে আমাকে খাবার দিবে, তুমি আমার কাছে বসিয়া থাকিবে, তবে আমি আহার করিব, তা না হইলে আমি আহার করিব না। আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, মাসীমা। না খাইতে পাইয়া, এই দেখ আমি কত রোগা হইয়া গিয়াছি।

    পথ-শ্রান্তিতে হীরালাল নিতান্ত শ্রান্ত আছে, না খাইতে পাইয়া তাহার শরীর কৃশ হইয়া গিয়াছে, এখন তাহার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, এরূপ কথা শুনিয়া মাসী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। চক্ষু মুছিতে মুছিতে তৎক্ষণাৎ তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন, আহারীয় সামগ্রী আয়োজন করিয়া কাছে বসিয়া হীরালালকে তিনি আহার করাইলেন। সেই আহারের সময় নানারূপ কথা হইল।

    পরদিন আমি হীরালালকে বলিলাম,–তুমি তো বড় Naughty boy (বদ ছোকরা) দেখিতে পাই। আচ্ছা কীৰ্ত্তি তুমি করিয়াছ। কোন বিবেচনায় তুমি এরূপ মৃত্যুসংবাদ দিলে? দৈববলে কেবল কুসী বাঁচিয়া গিয়াছে। সে যদি মরিয়া যাইত, তাহা হইলে কি হইত?

    হীরালাল উত্তর করিল,–আমি যে বড় মন্দ কাজ করিয়াছি, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। এতদূর যে হইবে, তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই। হাতে সূতা বাঁধা সম্বন্ধে কাল রাত্রিতে দিগম্বরবাবু যাহা বলিয়াছেন, এ বিষয়ে আমারও সেই কথা,—ওটা আমার ঠাওর হয় নাই।

    দিগম্বরবাবুর ঠাওর স্মরণ করিয়া আমি হাসিয়া ফেলিলাম। আমি বলিলাম,–বাবু। তুমি যে কাজ করিয়াছ, তাহার উপযুক্ত দণ্ড কিছু হয় নাই। দিগম্বরবাবু কুসীকে বিবাহ করিয়া লইয়া যাইতেন, তাহা হইলে ঠিক হইত। আগে যদি জানিতাম যে, তুমি এই কীর্তি করিয়াছ, তাহা হইলে আমি নিজেই উদ্যোগী হইয়া তাহার সহিত কুণীর বিবাহ দিতাম। যাই হউক, এখন কুলী ভাল হইলে হয়। তাহার শরীরের যেরূপ অবস্থা, তাহাতে আমার বড়ই ভয় আছে।

    হীরালাল উত্তর করিল, কুসীর নিমিত্ত আর চিন্তা নাই। আজ যদি তাহাকে দেখিতেন তাহা হইলে এ কথা আপনি বলিতেন না। দাঁড়ান। আমি তাহাকে আপনার নিকট আনিতেছি।

    এই কথা বলিয়া বাবু দৌড়িয়া বাটীর ভিতর গমন করিল। সে সময় রসময়বাবু বাটীতে ছিলেন না। অল্পক্ষণ পরেই কুসীকে লইয়া বাবু বৈঠকখানায় প্রত্যাগমন করিল। কুসী কিছুতেই আসিবে না, বাবু-ও কিছুতেই ছাড়িবে না। কুসীকে সে টানিয়া আনিতে লাগিল। কুসী বৈঠকখানার দ্বারটি ধরিল। সেই দ্বার ছাড়াইতে বাবুকে বল প্রকাশ করিতে হইল। তাহাতেই আমি বুঝিলাম যে, কুসীর জন্য আর কোন ভাবনা নাই বটে। যে লোকের শরীর কাল অসাড়, অবশ, মৃতপ্রায় হইয়াছিল, আজ সে সবলে দ্বার ধরিতে পারিল। এই একদিনেই কুসীর মুখশ্রী অনেক পরিবর্তিত হইয়াছিল। কুসীর চক্ষুদ্বয়ে পুনরায় জ্যোতির সঞ্চার হইয়াছিল। বৈঠকখানায় আসিয়া কুন্সী আমার পশ্চাদিকে লুকায়িত হইল। আমি কুসীর হাতটি ধরিয়া একটু হাসিলাম; ঘাড় হেঁট করিয়া কুসীও একটু হাসিল। সেই কাশীর হাসি।।

    হীরালালকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,বাবু! সে লোচন ঘোষ কে? বাবু উত্তর করিল,–লোচন ঘোষ! সে আবার কে?

    আমি বলিলাম,–সেই যে, কুসীর মাসীকে পত্র লিখিয়াছিল?

    বাবু হাসিয়া বলিল,–ওঃ! লোচন ঘোষ কেহ নাই। কলিকাতায় যাহারা রসিদ, বিল, দরখাস্ত প্রভৃতি লিখিয়া জীবিকানির্বাহ করে, তাহাদের একজনকে দুই আনা পয়সা দিয়া আমি সেই চিঠি লেখা সমাপ্ত হইলে স্বাক্ষরের সময় সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,নাম? আমি তখন আর নাম খুঁজিয়া পাই না; তাই যা মনে আসিল, বলিয়া ফেলিলাম। আমি বলিলাম,–লেখ, লোচন ঘোষ। চিঠি ও খবরের কাগজ মাসী-মায়ের নিকট আমিই প্রেরণ করিয়াছিলাম।

     

    ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – অজ্ঞাতবাসের বিবরণ

    বাবুকে আমি পূর্বকথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। অন্যান্য কথা জিজ্ঞাসা করিয়া আমি বলিলাম,বাবু। তোমার নৌকা কি সত্য ড়ুবিয়া গিয়াছিল?

    বাবু উত্তর করিল,–ওরে বাপ রে! সে যে কি আশ্চর্য্য বাঁচিয়াছিলাম, তাহা আর আপনাকে কি বলিব। বৈশাখ মাস ঠিক দুই বৎসর আগে আর কি! আমরা গোয়ালন্দ আসিতেছিলাম। সন্ধ্যার ঠিক পরেই পশ্চিম-উত্তর দিকে ভয়ানক মেঘ উঠিল। নিবিড় অন্ধকারে পৃথিবী ঢাকিয়া গেল। আরোহিগণ নৌকা কিনারায় লাগাইতে বলিল; কিন্তু তৎক্ষণাৎ প্রবল ঝড় উঠিল; এক ঝাপটে নৌকাখানি উল্টাইয়া পড়িল। আমি অতিকষ্টে তাহার ভিতর হইতে বাহির হইলাম। একজন আমাকে জড়াইয়া ধরিল। তাহার হাত হইতে আপনাকে ছাড়াইবার নিমিত্ত আমি চেষ্টা করিতে লাগিলাম। সেই সময় নৌকার বাশ হউক কি কিছু হউক আমার মাথায় লাগিয়া গেল। এই দেখুন, এখনও আমার মাথায় তাহার দাগ রহিয়াছে। অনেক কষ্টে আমি সে লোকের হাত হইতে আপনাকে ছাড়াইলাম। তাহার পর অনেক কষ্টে কিনারায় আসিয়া উঠিলাম। সে অন্ধকারে কে কোথায় গেল, তাহার কিছুই আমি জানিতে পারিলাম না। কিনারায় উঠিয়া একটি মাঠ পার হইয়া একখানি গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই গ্রামে একজনের বাড়ীতে আশ্রয় লইলাম। রাত্রির শেষভাগে আমার ভয়ানক জুর হইল।

    আমি একখানি চেয়ারে বসিয়াছিলাম। আমার পশ্চাতে দাঁড়াইয়া আমার বামস্কন্ধের উপর তাহার বামহাত রাখিয়া কুসী এমনে নৌকাড়ুবির বিবরণ শুনিতেছিল। এই পর্যন্ত শুনিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল, তাহার চক্ষু দিয়া টপ টপ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। এই সময় হীরালালের দৃষ্টি কুসীর উপর পড়িল।

    হীরালাল বলিল,–কুসী! তুমি কাঁদিতেছ। এখন আবার কান্না কিসের? ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করিয়াছেন, তাই আমি বাঁচিয়াছি! চুপ কর।

    আমিও কুসীর দিকে ফিরিয়া দেখিলাম। আমিও তাহাকে বলিলাম,কুসী! আহ্বাদের সময়, কান্নার সময় নয়। কাঁদিয়া পুনরায় কি রোগ করিবে? চুপ কর।

    হীরালাল পুনরায় বলিল,–আট দিন আমি অজ্ঞান অভিভূত হইয়া পড়িয়া রহিলাম। যাহাদের বাড়ী আমি আশ্রয় লইয়াছিলাম, তাহারা আমার অনেক উপকার করিয়াছে, মেয়ে-পুরুষে তাহারা আমার সেবা-শুশ্রুষা করিয়াছে। বাড়ী হইতে চলিয়া আসিবার সময় মা আমাকে অনেকগুলি টাকা দিয়াছিলেন। নোটগুলি মানিব্যাগের ভিতর রাখিয়া সর্বদা আমার কোমরে বাঁধিয়া রাখিতাম। টাকাগুলি সেইজন্য বাঁচিয়া গিয়াছিল। ভিজিয়াও নোট নষ্ট হয় নাই। সজ্জনের বাটীতে আশ্রয় লইয়াছিলাম, সেজন্য আমার জ্বরের সময় সেগুলি চুরি যায় নাই।

    আটদিনের পর আমার জ্বর ছাড়িয়া গেল। ক্রমে আমি আরোগ্য লাভ করিলাম। শরীরে যখন একটু বল হইল, তখন আমি গোয়ালন্দ আসিলাম। কলিকাতায় আসিবার নিমিত্ত রেলগাড়ীতে চড়িলাম। গাড়ীতে এক ব্যক্তির নিকট একখানি বাঙ্গালা খবরের কাগজ ছিল। পড়িবার নিমিত্ত সেই খবরের কাগজখানি আমি একবার চাহিয়া লইলাম। সেই খবরের কাগজে আমি আমার মৃত্যুসংবাদ দেখিলাম, তাহা দেখিয়া আমি আশ্চৰ্য্যাখিত হইলাম না। নৌকা যেভাবে উলটিয়া পড়িয়াছিল, তাহাতে জন-প্রাণীর বাঁচিবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু সেই সংবাদপত্র পাঠ করিয়া আমি অবগত হইলাম যে, দুইজন মাঝির প্রাণরক্ষা হইয়াছে।

    আমার মৃত্যুসংবাদ খবরের কাগজে প্রকাশিত হইয়াছে দেখিয়া আমি ভাবিতে লাগিলাম। ভাবিয়া চিত্তিয়া আমি স্থির করিলাম যে, কিছুদিনের নিমিত্ত আমি এ সংবাদে প্রতিবাদ করিব না। পিতা কর্তৃক সেই ঘোরতর অপমানের কথা তখনও আমার মনে জাগরিত ছিল। আমি ভাবিলাম যে, আমাকে যেরূপ তিনি দুঃখ দিয়াছেন, সেইগ তিনিও দিনকত পুত্ৰশোক ভোগ করুন।

    তাহার পর কুসীর ভাবনা মনে উদয় হইল। আমি যে জীবিত আছি, এ কথা কুলীকে জানাইব কিনা, অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই চিন্তা করিতে লাগিলাম। আমি ভাবিলাম যে, যদি কুণীকে বলি যে, জীবিত আছি, তাহা হইলে কলিকাতার আমার বন্ধু-বান্ধবও সে কথা জানিতে পারিবে, আমার দেশের লোকও জানিবে। সেজন্য কুসীর নিকটও গোপন করিব, এইরূপ আমি স্থির করিলাম। কিন্তু তাহাতে যে এরূপ বিপদ ঘটিবে, তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই।

    তাহার পর আমি ভাবিলাম যে, সংসার খরচের নিমিত্ত মাসীমায়ের নিকট কিছু টাকা পাঠাইতে হইবে। সেইজন্য আমি নিজেই নিজের মৃত্যুসংবাদ দিতে বাধ্য হইলাম। লোচন ঘোষের নামে সেই পত্রখানি লিখিয়া পাঠাইলাম, আর আমার মৃত্যুসংবাদ সম্বলিত একখানি সংবাদপত্রও প্রেরণ করিলাম।

    কিন্তু এত অধিক দিন যে আমাকে অজ্ঞাতবাসে থাকিতে হইবে, তখন তাহা আমি ভাবি নাই। আমি মনে করিয়াছিলাম যে, আপাততঃ আমাকে একটি চাকরীর যোগাড় করিতে হইবে। চাকরী হইলেই আমি কুসীকে আপনার নিকট আনিব। গেরুয়া-বস্ত্র ধারণ করিলে অল্প খরচে নানা স্থান ভ্রমণ করিতে পারি, সেজন্য সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিলাম। কিন্তু এরূপ বেশ ধারণ করিয়া আমি ভাল কাজ করি নাই। পাছে লোকে আমাকে ভণ্ড মনে করে, সেজন্য অনেক স্থানে চাকরীর চেষ্টা করিতে পারি নাই। সত্য কথা বলিতে কি, আমি চাকরীর চেষ্টা ভাল করিয়া করিও নাই। মনে করিলাম যে, কুসীর নিকট আমি দুইশত টাকা প্রেরণ করিয়াছি। তাহাতে দুই বৎসর পল্লীগ্রামে একরূপ চলিয়া যাইবে। এই মনে করিয়া ভারতবর্ষের নানা স্থানে আমি ভ্রমণ করিতে লাগিলাম।

    আজ প্রায় একমাস হইল, কুসীর জন্য আমার প্রাণ বড়ই কাতর হইল। আমি তখন মহীশূর অঞ্চলে ভ্রমণ করিতেছিলাম। তৎক্ষণাৎ আমি কলিকাতায় আসিলাম। কলিকাতা হইতে কুণীদের গ্রামে গমন করিলাম। সে স্থানে শুনিলাম যে, কুসীকে লইয়া মাসী-মা কুসীর পিতার নিকট গমন করিয়াছেন। কুসীর পিতা এখন কোথায় আছেন, সে কথা আর আমি কাহাকেও জিজ্ঞাসা করিলাম না। কুসীর পিতা যে ব্রহ্মদেশে থাকিতেন, তাহা আমি জানিতাম। আমি মনে করিলাম যে এখনও তিনি সেই ব্রহ্মদেশে আছেন। আমি কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলাম। কলিকাতা হইতে ব্রহ্মদেশে গমন করিলাম। ব্রহ্মদেশে গিয়া আমি জানিতে পারিলাম যে, তিনি পঞ্জাবে বদলি হইয়াছেন। তখন আমার বড় ভয় হইল। আমি ভাবিলাম,–কোন বিপদ ঘটিবে না কি? তা না হইলে এরূপ বিড়ম্বনা হয় কেন? যাহা হউক, তাড়াতাড়ি আমি কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলাম। কলিকাতায় কালবিলম্ব না করিয়া পঞ্জাৰে আসিলাম। শ্বশুরমহাশয় প্রথম যে বড় ছাউনিতে বদলি হইয়াছিলেন, গতকল্য সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে এই বিবাহের কথা শুনিলাম। প্রথমে মনে করিলাম যে শ্বশুরমহাশয়ের অন্য কোন কন্যা আছে। কিন্তু দুই বৎসর পূর্বে আমি শুনিয়াছিলাম যে, তিনি বিবাহ করেন নাই, এক কুসী ভিন তাহার অন্য সন্তান-সন্ততি নাই। ঘোরতর বিস্মিত হইয়া আমি সেই বড় ছাউনি হইতে রওনা হইলাম। পথে কত কি যে ভাবিতে লাগিলাম, তাহা আপনাকে আর কি বলিব। আমি যে গাড়ীতে আসিলাম, সেই গাড়ীতে দিগম্বরবাবুর স্ত্রীও আসিয়াছিলেন। ফলকথা, আমিই তাঁহাকে ও বিন্দীকে টিকিট কিনিয়া দিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি যে আমার স্ত্রীর বরের স্ত্রী, আর এই অভিনয়ে তিনি যে একজন প্রধান Actress (নায়িকা), তখন তাহা আমি জানিতে পারি নাই। তাহার পর কি হইল, আপনি জানেন।

     

    চতুর্দশ পরিদ – ফয়ে ওকার দিয়া যাহা হয়

    একমনে কুসী এই বিবরণ শ্রবণ করিতেছিল। তাহার দিকে ফিরিয়া আমি বলিলাম,–কুসী! শুনিলে তো তোমার বাবুর বিদ্যা।

    বাবু বলিল,–হাঁ কুসী! আমি বড় অন্যায় কাজ করিয়াছি। আমি বুঝিতে পারি নাই যে এতদূর হইবে। সে যাহা হউক, কুসী, তুমি যাদববাবুকে দেখিয়া লজ্জা করিতে পারিবে না। ইনি আমাদের অনেক উপকার করিয়াছেন। ইহার সাক্ষাতে কাশীতে যেরূপ আমার সহিত হাসিতে, কথা কহিতে, এখনও তাহাই করিতে হইবে। মনে নাই, কাশীতে তুমি ইহাকে বাপ বলিয়াছিলে।?

    কুসীর আধ-ঘোমটা ছিল। বাবু উঠিয়া তাহার সে ঘোষ্টাটুকুও খুলিয়া দিল। কুসী আপত্তি করিল, হাত দিয়া কাপড় টানিয়া ধরিল, কিন্তু বাবু তাহা শুনিল না। এখন কেবল তাহার মাথায় কাপড় রহিল। এই গোলমালের পর কুসী আমার কানে কানে বলিল,– আপনাকে আমি জ্যেঠা-মহাশয় বলিব।

    বাবা না বলিয়া কেন সে আমাকে জ্যেঠা-মহাশয় বলিবে, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। আমি বলিলাম,–বেশ! অতঃপর কুসী বাটীর ভিতর চলিয়া গেল।

    মাসীর লজ্জা ভাঙ্গা হইয়া গেল। তিনি যে কাজ করিয়াছিলেন, সে সম্পর্কে কোন কথা আর কেহ উত্থাপন করিল না। রূপে-গুণে বিভূষিত জামাতা পাইয়া রসময়বাবুর মনে আর আনন্দ ধরে না। কুসীর স্বাস্থ্যের দিন দিন উন্নতি হইতে লাগিল। কুসীর সেই উজ্জ্বল গৌরবর্ণ পুনরায় পূর্বের ন্যায় ফুটিয়া উঠিল। তাহার গণ্ডদেশ পূরস্ত হইয়া পূর্বের ন্যায় তাহাতে টোল খাইতে লাগিল। তাহার চকু পুনরায় ভাসিয়া উঠিল। তারা দুইটি সূৰ্য্যালোক মিশ্রিত নীল সমুদ্রজল-সাদৃশ বর্ণে রঞ্জিত হইয়া ঢুলু ঢুলু করিতে লাগিল। কাশীর সেই সরল ভাব, সেই মধুর হাসি পুনরায় কুসীর মুখে দেখা দিল। বয়সের গুণে তাহার কথাবার্তায় কেবল পূর্বাপেক্ষা একটু গাম্ভীর্যের লক্ষণ প্রতীয়মান হইল। তা না হইলে আর সকল বিষয়ে ঠিক সেই কাশীর কুশী হইল। মাঝে মাঝে সে আমার নিকট আসিয়া আমার পাকা চুল তুলিয়া দিত। সেই সময় সে আমাকে কত কথা বলিত।

    একদিন আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম,–কুলী! যখন দিগম্বরবাবুর সহিত তোমার বিবাহের কথা হইয়াছিল, তখন আমি মনে করিয়াছিলাম যে, সে বিবাহ নিবারণ করিবার নিমিত্ত তুমি আমাকে চেষ্টা করিতে বলিবে। তাহা কর নাই কেন?

    কুসী উত্তর করিল,পাছে মাসী আত্মহত্যা করেন, আমি সেই ভয় করিয়াছিলাম। কিন্তু আমি নিশ্চয় বুঝিয়াছিলাম যে, এ বিবাহ হইবে না, বিবাহের পূর্বে আমি মরিয়া যাইব। তবে আর মিছামিছি গোলমাল করিবার আবশ্যক কি? আর দেখুন, জ্যেঠা-মহাশয়! এই দুই বৎসর আমি মানুষ ছিলাম না। আমি যে কি ছিলাম, তাহা আমি বলিতে পারি না। আমার যেন জ্ঞান গোচর কিছুই ছিল না। যেন ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছি, এ দুই বৎসর আর ঠিক তাহাই বলিয়া মনে হয়!

    চারি পাঁচ দিন পর আমি হীরালালকে জিজ্ঞাসা করিলাম,বাবু তোমার পিতাকে তুমি পত্র লিখিয়াছ? বাবু উত্তর করিল,—না জ্যেঠা-মহাশয়! তাহাকে এখনও পত্র লিখি নাই। তাহারা জানেন যে, আমি মরিয়া গিয়াছি। দুই বৎসর অতীত হইয়া গেল। তাহারা হয় তো আমাকে ভুলিয়া গিয়াছেন। চিঠি লিখিতে আমার লজ্জা করিতেছে।

    বাবুর নিকট হইতে আমি তাহার পিতার ঠিকানা জানিয়া লইলাম। আমি নিজেই তাহাকে পত্র লিখিলাম। প্রত্যুত্তর আসিবার সময় অতীত হইল, তথাপি আমি আমার পত্রের উত্তর পাইলাম না। আমার ভয় হইল। তিনি কি এখনও বাবুকে ক্ষমা করেন নাই? অথবা সে স্থানে কি কোনরূপ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে?

    চারিদিন পরে আমার চিন্তা দূর হইল। হীরালালের পিতা নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হীরালালের মাতা ও এক ভ্রাতাও তাহার সঙ্গে আসিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে, পুত্র জীবিত আছে শুনিয়া পিতা-মাতা যেন স্বর্গ হাত বাড়াইয়া পাইলেন। আমার পত্র পাইয়া হীরালালের মাতা পুত্রকে সত্বর দেখিবার নিমিত্ত কাঁদিয়া-কাটিয়া ধূম করিয়াছিলেন। সেজন্য চিঠি না লিখিয়া তাহারা নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

    ভাগ্যে রসময়বাবুর বাড়ীটি বড় ছিল, সেজন্য সকলের তাহাতে স্থান হইল। পিতা-পুত্রে কিরূপে সাক্ষাৎ হইল, কুসীকে তাহারা কত আদর করিলেন, কত বসনভূষণে তাহাকে তাহারা ভূষিত করিলেন, রসময়বাবু ও মাসীর সহিত তাঁহাদের কিরূপ পরিচয় হইল, আমার সহিত তাহাদের কিরূপ সদ্ভাব জন্মিল সে সব কথা লিখিয়া পুস্তকের কলেবর আর বৃদ্ধি করিব না; ফলকথা এই যে সকলের সহিত সকলের বিশেষরূপে সদ্ভাব হইল। পুত্রকে জীবিত পাইয়া, কুসী হেন পুত্রবধূ পাইয়া, হীরালালের পিতা-মাতা পরম সুখী হইলেন। হীরালাল যেন জামাতা পাইয়া, তাহার পিতা-মাতার ন্যায় সমৃদ্ধিশালী সদাশয় কুটুম্ব পাইয়া রসময়বাবু ও কুসুমের মাসী পরম আনন্দিত হইলেন। সকলের আনন্দে আমিও আনন্দিত হইলাম।

    কিছুদিন সেই স্থানে বাস করিয়া হীরালালের পিতা-মাতা পুত্র ও পুত্রবধূ লইয়া দেশে প্রত্যাগমন করিতে ইচ্ছা করিলেন। কুসুমের মাসীকে সঙ্গে লইয়া যাইবার নিমিত্ত তাহারা বিশেষরূপে অনুরোধ করিলেন, কিন্তু রসময়বাবুর সংসারে অন্য কোন অভিভাবক ছিলেন, সেজন্য তখন তিনি যাইতে পারিলেন না। কিন্তু ইহার কিছুদিন পরে রসময়বাবু শ্বশুরবাড়ী সম্পর্কীয়া একজন বয়স্কা স্ত্রীলোক অভিভাবকস্বরূপ পাইলেন। মাসী এখন কুসুমের নিকটে আছেন।

    আমাকেও সঙ্গে লইয়া যাইবার নিমিত্ত হীরালাল নিজে ও তাহার পিতা অনেক অনুরোধ করিলেন। সে প্রস্তাবে প্রথম আমি সম্মত হইতে পারি নাই। কিন্তু কুসী এক কাণ্ড করিয়া বসিল। দেশে প্রত্যাগমন করিবার দুইদিন পূর্বে একদিন দুই প্রহরের সময় আমি বৈঠকখানায় শয়ন করিয়া আছি। কুসী আস্তে আস্তে আমার শিয়রে আসিয়া বসিল। শিয়রে বসিয়া আমার পাকা চুল তুলিতে লাগিল। পাকা চুল আর কি ছাই তুলিবে, আমার অধিকাংশ চুল পাকিয়া গিয়াছিল, অই কাচা ছিল। আর সে মাথা খুঁটিতে লাগিল।

    মাথা খুঁটিতে খুঁটিতে কুসী বলিল,—জ্যেঠা-মহাশয়! আপনি আমাদের সঙ্গে সেই পূর্বদেশে যাইবেন কি না, তাহা বলুন।

    আমি উত্তর করিলাম,—আমি কোথায় যাইব? তুমি যাইবে শ্বশুরবাড়ী, সে স্থানে আমি কিজন্য যাইব? যেই আমি এই কথা বলিয়াছি, আর কুসী আমার মাথার অনেকগুলি চুল একসঙ্গে ধরিয়া একটু টান মারিল। যত লাগুক, না লাগুক আমি কিন্তু বলিয়া উঠিলাম, উঃ! লাগে, ছাড়িয়া দাও! কুসী বলিল,–কখনই না। যতক্ষণ না বলিবেন যে, আমি যাব, ততক্ষণ আমি ছাড়িব না।

    কাজেই আমাকে বলিতে হইল যে, আমি যাব। কাজেই আমাকে যাইতে হইল। কাজেই কুসীর শ্বশুরবাড়ীতে আমাকে কিছুদিন বাস করিতে হইল। কাজেই সে স্থান হইতে পুনরায় বিদায় গ্রহণের সময় কুসীর কান্না দেখিয়া আমাকেও কাঁদিয়া ফেলিতে হইল।

    সে স্থান হইতে আমি স্বগ্রামে প্রত্যাগমন করিলাম। কাৰ্য্যোপলক্ষ্যে কলিকাতায় আমাকে সর্বদা গমন করিতে হয়। কলিকাতার পথে একদিন সহসা বিন্দীর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। তাহার সহিত প্রায় একশত স্ত্রীলোক আর দুই-একজন পুরুষ-মানুষ ছিল। আমি কোন কথা বলিতে না বলিতে, বিন্দী আসিয়া আমায় ধরিল। বিন্দী বলিল,—কেও ডাক্তারবাবু, আমাকে চিনিতে পারেন?

    আমি উত্তর করিলাম—তোমাকে আমি বিলক্ষণ চিনিতে পারি, কিন্তু তুমি আমাকে চিনিলে কি করিয়া?

    বিন্দী বলিল,–আমি। আমিসকলকেই চিনিতে পারি। সেই যে উজিরগড়ের চলাচলতে আপনি ছিলেন! আপনি কে, সে কথা আমি জমাদারকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—দিগম্বরবাবু আর তাহার স্ত্রী, এখন কোথায়?

    বিন্দী উত্তর করিল,–নাতিনীর বিবাহ দিতে তিনি দেশে আসিয়াছেন; আমিও সেই সঙ্গে দেশে আসিয়াছি। আমি কি সে দেশে থাকতে পারি। আমি সেখোগিরি করি, তাহাতে বেশ দু-পয়সা পাওনা আছে, এই দেখুন কতগুলি লোককে কালীঘাট লইয়া যাইতেছি। আমি কি সেই খোটার দেশে বসিয়া থাকিতে পারি। তাহার পর আমার গিমীমায়ের তেজ দেখিয়া আমি নুতন একটি ফন বাহির করিয়াছি। উদ্ধব দা ঠাকুর আর আমি দুইজনে ভাগে সেই কাজ করি। পাওনা-থোওনা যা হয়, দুইজনে আমরা ভাগ করিয়া লই। উদ্ধব দা-ঠাকুর হইয়াছেন পুরোহিত, আমি হইয়াছি মাইজী স্বামী। সেকাজের জন্য আমার রং করা আলখেল্লা আছে।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—সে আবার কি ফন?

    বিলী উত্তর করিল,—এই কলিকাতায় মাইজী স্বামী হইয়া আমি টিকিদার বাবুদের বাড়ী যাই। বাবু আর বাবুয়ানীরা আমার খুব আদর করেন। সকলেই বলেন,–মাইজী স্বামী আসিয়াছেন। তাহার পর বাবুরা আফিস চলিয়া গেলে আমি গৃহিণীদের বলি—গিন্নীবাবু! সাবিত্রীব্রত ঘুচিয়া এখন এক নূতন ব্রত উঠিয়াছে, তাহাকরিবেন?গিন্নীবাবুজিজ্ঞাসা করেন, কিত? আমি বলি, ইহার নাম দিগম্বরী-ব্রত। গিন্নীবাবু জিজ্ঞাসা করেন, সে ব্রত করিলে কি হয়? আমি বলি,—সে ব্রত করিলে স্বামী চিরকাল পদানত হইয়া থাকে। অনেকেই এখন সেই ব্ৰত করিতেছেন। লেখাপড়া শিখিয়া যাঁহাদের মেজাজ গরম হইয়া গিয়াছে, সংসারে কাজকর্ম যাঁহারা কিছুমাত্র করেন না, পঙ্গর মত কেবল বসিয়া থাকেন, আর রং-বেরঙের পোষাক কিনিয়া স্বামীকে যাঁহারা ফতুর করেন, সেইসব মেয়েদের মধ্যে এই দিগম্বরী-ব্রতটি বিলক্ষণ চলন হইয়াছে। লোকের বাড়ী বাড়ী গিয়া আমি গিন্নীবাবুর যোগাড় করি, উদ্ধব দা-ঠাকুর পূজা করেন, আর মন্ত্র পড়ান। এখন হইতে সাবিত্রী-ব্রত আর কাহাকেও করিতে হইবে না, এইনূতন দিগম্বরী-ব্রত করিলেই চলিবে। এই নূতন ব্রতের কথা আপনিও পাঁচজনকে বলিবেন।

    আমি উত্তর করিলাম—সেই উজিরগড়ের ঘটনা সম্বন্ধে আমি একখানি বই লিখিতেছি। সেই পুস্তকে এই নূতন ব্রতের কথা লিখিব।

    এই সময় উদ্ধব দা-ঠাকুর আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি বলিলেন, দিগম্বরী-ব্রতের ফলের কথাটা ভাল করিয়া লিখিবেন। যে কুলকামিনী এ ব্রত করেন, তাহার জীবন সার্থক হয়। এ জনমে পতি তাহার পদানত হইয়া থাকে। গলাভাঙ্গা দিগম্বরীর মত তাহার রূপ হয়, গুণ হয় ও পতিভক্তি হয়, আর ফোক্‌লা দিগম্বরের মত রূপবান্ গুণবান্ স্ত্রীপরায়ণ স্বামী তিনি লাভ করেন।

    এই কথা বলিয়া যাত্রী লইয়া বিন্দীর সহিত উদ্ধব দা-ঠাকুর প্রস্থান করিলেন। কলিকাতা হইতে স্বগ্রামে আসিয়া আমি এই পুস্তকখানি লিখিলাম।

    পুস্তকখানি লিখিয়া ইহার নাম কি দিব, তাহা ভাবিতেছি, এমন সময় পশ্চাল্লিখিত পত্রখানি আমি পাইলাম।

    পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত বাবু যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী, ডাক্তার মহাশয় বরাবরেষু। মহাশয়। বিন্দীর মুখে শুনিলাম যে, উজিরগড়ের ঘটনা সম্বন্ধে আপনি একখানি পুস্তক লিখিতেছেন। আমার নাম ইতিপূর্বে কখনও ছাপা হয় নাই। আপনার পুস্তকে আমার নাম ছাপা হইলে, জগতে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিব। সেজন্য আমি বড়ই আনন্দিত হইয়াছি, আর সেজন্য আপনাকে আমি শত শত ধন্যবাদ করি। কিন্তু আপনার নিকট আমার দুইটি নিবেদন আছে। প্রথমত এই যে, আমার নামটি আপনি ভাল স্থানে বড় বড় অক্ষরে ছাপিকেন। তাই যদি করেন, তাহা হইলে আপনাকে আমি ভিজিট দিব। দ্বিতীয়ত এই যে, আমার নাম লইয়া লোকের যাহাতে ভ্রম না হয়, সে বিষয়ে সাবধান হইবেন। কারণ, এ অঞ্চলে অনেকগুলি দিগম্বর আছেন। একজন দীর্ঘ ও স্থল, সেজন্য সকলে তাহাকে বেড়ে দিগম্বর বলে। একজন খর্ব ও কৃশ, সেজন্য সকলে তাহাকে মর্কট দিগম্বর বলে। একজনের সম্মুখেরদত কিছুউচ্চ, সেজন্য সকলে তাহাকে দাঁতাল দিগম্বর বলে। আর উর্ধকেরদাতুযুক্ত আমার এই যৌবনকালেই দাঁত পড়িয়া গিয়াছে, সেজন্য সকলে আমাকে দন্তহীন দিগম্বর বলে। কথাটি কিন্তু দন্তহীন নয়। প্রকাশ করিয়া না বলিলে লোকে আমাকে চিনিতে পারিবে না, লোকে মনে করিবে এ অন্য দিগম্বর। সেজন্য আপনি প্রকাশ করিয়া ছাপিনে, তাহাতে আমি রাগ করিব না। আসল কথাটি কি, তাহা বোধ হয় আপনার মনে আছে?—সেই ফয়ে ওকার!

    ইতি— আপনার বংশবদ-– শ্রীদিগম্বর শর্ম্মা

    এবার আমি আর ভিজিটের লোভ ছাড়িতে পারিলাম না। সেজন্য পুস্তকখানির নাম এইরূপ হইল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleনিতু বলছি – তৌহিদুর রহমান
    Next Article ছেড়ে আসা গ্রাম – দক্ষিণারঞ্জন বসু
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }