লালজি চকলুস কোম্পানি – বিমল কর
লালজি চকলুস কোম্পানি
এক
গণেশ স্বপ্ন দেখছিল। মস্ত একটা চৌবাচ্চা, চৌবাচ্চার পাশে রেল-ইস্টিশানের মাল-ঠেলা গাড়ির মতন একটা ছোট ঠেলাগাড়ি। গাড়ির ওপর বিরাট-বিরাট বরফের চাঁই। পালোয়ান গোছের একজন বরফের চাঁইগুলোকে ওয়েট লিফটারের মতন তুলে নিচ্ছে, আর চৌবাচ্চায় ফেলছে। বাহাদুর লোক বটে! আর কী তার ফুর্তি! এক-একটা চাঁই ফেলছে, ফেলেই একবার করে ডন মেরে নিয়ে গান গাওয়ার মতন করে আওড়াচ্ছে, “রাম রে ভাইয়া রাম, রামকে ভাইয়া শ্যাম, কাউয়া বোলে কা—কা, চুয়া ভাগে বিল্লি হাসে হা—হা। তিন চার পাঁচ ছো, গনশুবাবু আ যো…।”
পালোয়ান-মতো লোকটা বিরাট বিরাট ছ’টা বরফের লম্বাটে চাঁই চৌবাচ্চায় ফেলে দিয়ে গণেশকে আদর করে ডাকছে, “আ যা!” ওই বরফের চৌবাচ্চার মধ্যে গণেশকে নামতে হবে নাকি! পাগল! একে এখন পৌষ মাস তায় বাঘ-মারা শীত। এই হাড়-জমানো শীতে ওই বরফের চৌবাচ্চার কাছে গেলেই তো গণেশ মরে যাবে।
গণেশ পালাবার জন্য দু’পা পিছু হটল।
পালোয়ানটা গণেশের চেয়ে চালাক। গণেশ যেই-না পিছু হটেছে, পালোয়ানজি খপ করে হাত ধরে ফেলল গণেশের। তারপর হেসে হেসে আদর করে বলল, “এ গনশু, কাঁহা ভাগালবা রে! আ যা!”
গণেশকে প্রায় বেড়ালছানার মতন তুলে ধরে পালোয়ানজি বরফের চৌবাচ্চায় ফেলে দিল।
গণেশের মনে হল, তার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সঙ্গে-সঙ্গে জমে বরফ হয়ে গেল। বরফ হবার সময় চোখের পাতা যখন বুজে আসছে, তখন মুহূর্তের জন্যে গণেশের মনে হল, পালোয়ানের মুখ যেন একেবারে তাদের বিজয়-স্যারের মতন। বিজয়-স্যার গণেশের ক্লাস-টিচার।
গণেশ যখন ঠাণ্ডায় মরে যাচ্ছে, আর বোধহয় পাঁচ-সাতবার নিশ্বাস নিতে পারবে বড়-জোর, ঠিক তখন তার ঘুম ভেঙে গেল।
ঘুম ভেঙে যাবার পর গণেশ প্রথমটায় ঠাওর করতে পারেনি। পরে বুঝল সে, আগাগোড়া লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। না, বরফের চৌবাচ্চায় নয়, তার বিছানায়।
ধড়ে যেন প্রাণ এল গণেশের। কী বিচ্ছিরি স্বপ্ন রে বাবা !
সকাল হয়ে গিয়েছে। মা কখন ঘরে এসে জানলা খুলে দিয়েছে কে জানে! বাইরে রোদ দেখা যাচ্ছিল।
গণেশ বিছানায় উঠে বসল। গায়ে লেপ জড়ানো। ঠাণ্ডাও ভীষণ আজ। তা যতই ঠাণ্ডা হোক বরফের চৌবাচ্চার মতন নয়।
এ-সব বাজে বিদঘুটে স্বপ্নের কোনও মানে হয়? এই তো মাত্র পাঁচ দিন আগে অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হল। পরীক্ষার পড়া পড়তে পড়তে আর অ্যালজেবরার অঙ্ক কষতে কষতে গণেশের পিঠ কুঁজো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির লোকদেরও বলিহারি। বাবা, মা, কাকা, দিদি, কেউ ছেড়ে কথা বলে না। খালি পড়, পড়। বাবা তো সোজাসুজি মাকে বলে দিয়েছিলেন, ছেলেকে বলে দাও, ফেল করলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব। বাজারে গিয়ে বাদামভাজা, ছোলাভাজার দোকান করতে হবে ওকে। সারাটা বছর শুধু খেলে আর আড্ডা মেরে কাটাল। খেলেই ওর জীবন কাটবে!
বাড়ির লোকের দোষ দিয়ে কী হবে! স্কুলে বিজয়-স্যার তো একদিন গণেশকে বলেই ফেললেন, “গণেশ, তোমার মাথাটা সত্যি সত্যি কী বাপ? হাতির তো নয় হে। গাধার হতে পারে।…এমন একখানা মগজ তুমি পেলে কেমন করে! তা আমি তোমায় বলে দিচ্ছি, পরীক্ষায় যদি সব সাবজেক্টে পাশ করতে না পারো, নো গ্রেস, নো কনসিডারেশন। তোমায় আমি প্রমোশান দিতে দেব না।”
গণেশ এই দু’তিনটে মাস—পুজোর পর থেকে—বাড়িতে আর স্কুলে যেভাবে কাটিয়েছে তাতে বলা যেতে পারে মর মর হয়ে, ভয়ে ভাবনায়।
আর পরীক্ষাটা তার কাছে জীবন-মরণ সমস্যা ছিল। সত্যিই যেন তাকে কেউ বরফের চৌবাচ্চায় ফেলে দিয়েছিল।
তা যাকগে, পরীক্ষাটা তো হয়ে গিয়েছে। বাঁচা গেছে। যে যাই বলুক, গণেশ ক্লাস এইটের বেড়াটা ঠিকই টপকে যাবে। শিওর, পাস।”
তখন বেলা হয়ে গিয়েছে। শীতের রোদ ঘন হয়ে এসেছিল। বাতাস আর তেমন কনকনে নেই।
পুরনো বরফ কলের সামনে ঘোষসাহেবের ছোট্ট বাংলোর বেড়ার ধারে গণেশেরা বসেছিল। গণেশ, জিতু, মেওয়া, পাপিয়া আর টুকলু। খানিকটা তফাতে পাপিয়ার ‘বিউটি’ লেজ তুলে খেলা করছিল।
মেওয়া আর টুকলু মার্বেল খেলছিল।
পাপিয়ার সর্দি হয়েছে। পিসি কয়েকটা গোলমরিচ এক টুকরো পাতলা কাপড়ে বেঁধে দিয়েছে, বলেছে, নাকের কাছে নিয়ে টানবি, কাঁচা সর্দি শুকিয়ে যাবে। পাপিয়া ঘন ঘন গোলমরিচের গন্ধ শুঁকছে। তার গায়ে ঘণ্টা নীল রঙের জাম্পার, কলারটা সাদা, নীচের দিকটাও সাদা।
জিতু বলল, “গনশু, আজ কী হবে?”
গণেশ ফেন্সিংয়ের ঝুলে পড়া তারে বসে দোল খাচ্ছিল। তার চোখ রাস্তার দিকে। শিমুলগাছের শুকনো পাতা ঝরে কার্তিককাকার মাথায় পড়ল। কার্তিককাকা কোথাও যাচ্ছিলেন। একবার মাথা তুলে গাছটা দেখলেন।
গণেশ বলল, “চাঁদমারির দিকে যাবি?”
জিতু চাঁদমারির দিকটা পছন্দ করে না। বড় ন্যাড়া জায়গা। মাঠ আর মাঠ। একটা বালিয়াড়ি, বেশ খানিকটা উঁচু, সেটাই চাঁদমারি। কবে যে সেখানে বন্দুক চালানো প্র্যাকটিস করা হতো কে জানে, এখন ওখানে গোরুও চরতে যায় না।
চাঁদমারির কাছাকাছি রেলের জোড়া ফটক। একটা গোশালা।
জিতু বলল, “না, চাঁদমারি নয়। কিচ্ছু নেই। ”
গণেশ বলল, “চল না। রাজহাঁসের ডিম ভেজে ওমলেট খাব।”
“রাজহাঁস! রাজহাঁসের ডিম পাবি কোথায়?”
গণেশ ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে তার নাকের ডগা টিপে ধরল। এটা তার মুদ্রাদোষ। বলল, “হ্যাজ…!” বলে চোখের রহস্যময় ভঙ্গি করল।
পাপিয়া শুনতে পেয়েছিল কথাটা। নাক টানতে টানতে বলল, “রাজহাঁসের ডিম খেলে কুষ্ঠ হয়।” তার নাকের যা অবস্থা তাতে হাঁস বলতে পারল না।
গণেশ বলল, “তোর মাথা হয়। কুমিরের ডিম খেলে হতে পারে। হাঁস আর কুমির এক হল?”
জিতু বলল, “রাজহাঁসের ডিম পাবি কোথায়?”
গণেশ হাসল। রহস্যময় হাসি। মেওয়াকে ডাকল, “মেওয়া, কাম হিয়ার।”
মেওয়ার পুরো নাম মেওয়ালাল ভার্মা। সবাই তাকে মেওয়া বলে। ওরা দু’পুরুষ এখানে, মানে হিরাবাদে। ওর মুখে বাংলা-বুলি আটকায় না। বন্ধুরা সবাই বাঙালি। পড়াশোনাও ওদের সঙ্গে, একই স্কুলে।
মেওয়ার চেহারাটি খাসা। টকটক করছে গায়ের রং। মুখটি গোল, চেহারাটিও গোল। মাথার চুল খোঁচা-খোঁচা।
মেওয়া গণেশের অত্যন্ত অনুগত। পয়লা নম্বর চেলা। ডান হাত।
মেওয়া মার্বেল খেলা বন্ধ রেখে কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, “ইয়েস—!” গণেশ বলল, “জিতু জিজ্ঞেস করছে রাজহাঁসের ডিম কোথায় পাব? বলে দে জিতুকে, কোথায় পাব?”
মেওয়া বলল, “কালা ডাগতারের বাড়িতে।” মেওয়া ডাক্তারকে বরাবর ডাগতার বলে। ওষুধকে বলে, দাওয়াই।
জিতু বলল, “খোঁড়া ডাক্তারের বাড়ির রাজহাঁস। বাগানে চরে বেড়ায়। তোদের মাথা খারাপ। বাগানে ঢুকলে মালি মেরে তক্তা করে দেবে।”
গণেশ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “যা-যা, কে কাকে তক্তা করে। পেহ্লাদ মালির মতন মালি আমি অনেক দেখেছি। ও আমাদের তক্তা করার আগে আমরা ওকে মেরে বাঁশ করে দেব! কী বল, মেওয়া?”
মেওয়া বলল, “পেহ্লাদ বাঁটু আছে, লম্বা হয়ে যাবে।”
গণেশ হেসে উঠল হিহি করে।
ততক্ষণে টুকলুও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে একমুঠো কাচের মার্বেল। টুকলুকে দেখলে বড় নিরীহ মনে হয়। রোগা-প্যাংলা চেহারা, চোখের পাতার পাশগুলো এমনভাবে জোড়া যে চোখ দুটো ছোট-ছোট দেখায়। নাক বসা-মতন। সামনের একটা দাঁত ভাঙা। টুকলু কিন্তু মোটেই নিরীহ নয়। যতরকম বদ মতলব তার মাথায় চট করে চলে আসে। গুলতি চালাতে সে ওস্তাদ, ছুটতে পারে পনপন করে। আবার এই টুকলু তাদের সেভেন ক্লাসের সেকেন্ড বয়।
মেওয়া বলল, “টুকলু, কালা—ডাগতারের বাগান থেকে রাজহানসের ডিম চুরি করতে হবে।”
“রাজহানস?”
“কিং ডাক..” মেওয়া গাল ফুলিয়ে হাসল। “তুই একটা গাধা। জেন্ডার গুজ জানিস না?”
“জানি রে জানি। তুই আমায় গুজ শেখাস না।”
গণেশ বলল, “টুকলে, আজ দুপুরে চাঁদমারির দিকে গিয়ে একটা নুন-পিকনিক করলে কেমন হয় রে!”
“নুন-পিকনিক! শুধু নুন খাবি?”
“তোর যা বুদ্ধি! নুন খাব কেন! নুন মানে দুপুর। দুপুর পিকনিক। রাজহাঁসের ডিম ভেজে ওমলেট খাব। বানরুটি খাব। আর…আর চা।”
টুকলু বলল, “ওমলেট ভাজবি কেমন করে?”
“শুকনো পাতা, কাঠিমাঠি জ্বালিয়ে।”
“কেরোসিন তেল নিয়ে যেতে হবে। সসপ্যান, কেটলি, চা, চিনি, দুধ, জল… আরেব্বাস কত জিনিস…।”
গণেশ অরণ্যদেবের মতন করে হাত তুলে বলল, “ভাবিস না। সব নিয়ে যাব! এই পাপিয়া, তুই বাড়ি থেকে সসপ্যান, একটু ঘি, নুন, একটা খুন্তি নিয়ে নিবি।”
পাপিয়া বার চার-পাঁচ ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে হাঁচল। বলল, “সসপ্যানে ওমলেট ভাজে নাকি! তুই একেবারে হাঁদা গনশুদা!”
গণেশের মানে লাগল। ধমক মেরে বলল, “তো কিসে ভাজে?”
“ফ্রায়িং প্যানে। সসপ্যানে….”
‘লেকচার মারিস না। যাতে ডিম ভাজা যায় তাই নিবি। প্যান মানে প্যান…তা যেমনই হোক!”
পাপিয়া বলল, “মা যদি জানতে পারে?”
“জানবে কেন!…মাসিমা দুপুরে ঘুমোবে। তুই যা নেবার সরিয়ে নিবি।”
পাপিয়া মাথা নাড়ল। “মা দুপুরে ঘুমোয় না আজকাল। উল বোনে আর নভেল পড়ে। ডাক্তারজেঠা মাকে দুপুরে ঘুমোতে বারণ করেছে। বলেছে ভাত খেয়ে শীতের দিন দুপুরে ঘুমোলে আরও মোটা হয়ে যাবে। বাবা মাকে বলেছে, বই পড়তে।”
জিতু দুষ্টুমি করে বলল, “তুইও ঘুমোস না পপি, ঘুমোলে লুচি হয়ে যাবি।” পাপিয়া হাত ছুঁড়ে জিব বের করে ভেঙচি কেটে বলল, “যাব তো যাব, তোর মতন বেগুনভাজা হয়ে থাকব নাকি।”
গণেশ তার রাজসিংহাসন থেকে ধমক মেরে বলল, “বাজে কথা বলিস কেন রে? কাজের সময় বাজে কথা ভালো লাগে না।… পাপিয়া প্যান, খুন্তি, নুন, ঘি—সব জোগাড় করবে। মাসিমা জেগে থাকলেও পরোয়া নেই। পাপিয়া পারবে। জিতু, তুই আধ-বোতল কেরোসিন তেল আর দেশলাই নিবি। জল নিবি।”
“জল কেমন করে নেব?”
“হাঁড়ি করে!”
মেওয়ারা হেসে উঠল।
জিতু বলল, “হাঁড়ি মাথায় করে পিকনিকে যেতে হবে! আমি পারব না।” গণেশ বলল, “দ্যাখ জিতে, এইজন্যেই বগলাবাবু রচনা লেখান, শ্রমের মর্যাদা। ঠিক আছে, তুই যদি অত লাটসাহেব হোস আমি আর মেওয়া জল নিয়ে যাব। আমাদের বাড়িতে কাকার ওয়াটার কেরিয়ার আছে। ট্রেনে যাবার সময় জল না রাখলে চলে না।”
জিতু বলল, “বাঃ। আমার বেলায় হাঁড়ি, তোর বেলায় কাঁধে ঝোলানো ওয়াটার কেরিয়ার!”
মেওয়া বলল, “ঝগড়া মাচাস না। আমার বাড়িতে ঘটির মাফিক জল নেবার জিনিস আছে। আমিও নিয়ে যাব।”
গণেশ এবার নীচে নেমে দাঁড়াল। বলল, “চা, চিনি, দুধ আমি হাতিয়ে নেব। কিন্তু ডিম?”
টুকলু বলল, “গনশা, চা-চিনির ভার আমি নিচ্ছি। রাজহাঁসের ডিম তুই জোগাড় কর।”
“কেন তুই?”
“ক্ষমা করো মহারাজ!” টুকলু যাত্রা-দলের সেনাপতির মতন মাথা নুইয়ে বলল। টুকলু গত বছর স্কুলের জুনিয়র ক্লাসের ছেলেদের যে নাটক হয়েছিল তাতে সহদেবের পার্ট করেছিল। পাঁচ-সাত লাইনের পার্ট। তবে পঞ্চ পাণ্ডবের দলে ছিল বলে অনেকবার স্টেজে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হয়েছিল। মাঝে-মাঝে সেই নাটকের সংলাপ তার মুখে চলে আসে। অবশ্য ‘ধর্মরাজ’ শব্দটা সে পালটে মহারাজ করে নেয়।
গণেশ ভীষণ বিরক্ত হল। এদের নিয়ে কি কিছুই করা যায় না। যত্ত সব ভিতুর দল। গণেশ বলল, “কেন, কী হয়েছে?”
টুকলু বলল, “সত্যি কথা বলছি, গনশা! কালা ডাক্তারবাবু মানুষটি ভীষণ কড়া। ওঁর বাগানের মালি পেহ্লাদটা পয়লা নম্বরের বদ। বিচ্ছু। তার ওপর রাজহাঁস পাখি হিসেবেই বলো আর হাঁস হিসেবেই বলো, বজ্জাতের ধাড়ি। একবার যদি কামড়ায় নাম ভুলিয়ে দেবে।”
গণেশ হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “রাজহাঁস কামড়ায় নাকি? হাঁস কি বাঘ, না ভাল্লুক! টুকলু, তুই…তুই এক্কেবারে গোট…রাজহাঁসের দাঁত আছে? কী বলছিস তুই?”
পাপিয়া বলল, “টুকলু ঠিক বলেছে। একবার—একবার ওই হাঁস আমার ফ্রক কামড়ে ধরেছিল। উরে বাবা, আমি ছাড়াতে পারি না। ভয়ে মরছি। প্রহ্লাদ এসে ছাড়িয়ে দিল।” গণেশ বলল, “আজ তুই প্যান্ট পরবি। শীতের দিন। তোর তো সেই জিবেগজা-প্যান্ট আছে। ওটাই পরিস।”
পাপিয়া চটে গেল। “জিবেগজা-প্যান্ট মানে কী? বাবা, একটা গরম ডাংরি এনে দিয়েছে খাস কলকাতা থেকে। কী সুন্দর ডাংরি!
মেওয়া বলল, “গনশু, তুই আর আমি আন্ডা নেব। টুকলুরা পারবে না।”
জিতু বলল, “রাজহাঁসের ডিম কত বড় হয়?”
গণেশ বলল, “বড় বড়!” বলে হাত দিয়ে ডিমের মাপ দেখাল।
“যাঃ, অতবড় ডিম সারস পাখির হয় !”
“বাজে বকিস না! আমি বলছি হয়!”
“তা হলে ওমলেট কত বড় হবে?”
“বিগ, বিগ হবে।”
“ওই ওমলেট খেয়ে যদি পেটের অসুখ হয়?”
“অমন পেট ফেলে দে। ডিম খেয়ে পেটের অসুখ। তোরা এত বাজে কথা বলিস!” গণেশ আর কথা বাড়াল না। হুকুমের গলায় বলল, “আর কথা নয়। বেলা একটা-দেড়টার মধ্যেই আমরা বেরিয়ে যাব। তোরা সকলে রেডি হয়ে এখানে আসবি। নো লেট নো কিচ্ছু। সোলজারস, এখন যে যার বাড়ি। দেড়টার সময় সবাই এসে যাবে।”
পাপিয়া ঘাড়-মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি যাব না।”
গণেশ বলল, “যাবি না মানে! তোর ঘাড় যাবে। না গেলে গাঁট্টা মেরে তোর মাথা ফাটিয়ে দেব। তুই যাবি, তোর ওই নেড়িকুত্তাও যাবে।”
পাপিয়া চিৎকার করে বলল, “ও নেড়িকুত্তা নয়। ওর নাম বিউটি। ও ভুটিয়া কুকুর।”
দুই
বেলা একটা নাগাদ গণেশরা কাঠ-চাঁপা গাছের কাছে একে একে জড়ো হল। প্রথমে এসেছিল মেওয়া, তারপর হাজির হল টুকলু। দেখতে দেখতে গণেশ, জিতু, পাপিয়া আর তার নেড়িকুত্তা বিউটি এসে হাজির।
শীতের দিন। ডিসেম্বরের একেবারে শেষাশেষি। এমনিতেই হাড়-কাঁপানো শীত, তারপর দুপুর ফুরোতে-না-ফুরোতে রোদের তাত মরে এমন শনশনে উত্তুরে হাওয়া দেবে যে হাত, পা অসাড় হয়ে যেতে শুরু করবে। তা ছাড়া চাঁদমারি তো কাছে নয়, কম করেও মাইলখানেক পথ। সাহেবদের পুরনো কবরখানার পাশে। ওদিকটা একেবারে ফাঁকা, মাঠের পর মাঠ, একটু ঝোপ-জঙ্গলও রয়েছে।
গণেশরা সকলেই শীতের সাজগোজ সেরে এসেছিল। প্যান্ট, শার্ট, সোয়েটার, মাফলার, জুতো, মোজা। পাপিয়াও তার ডাংরি পরে নিয়েছিল। গায়ে পুরো-হাতা সোয়েটার, মাথায় স্কার্ফ। পাপিয়ার বিউটির একটা জামা আছে। গরম কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানানো। বিউটির পিঠে সেটা জড়িয়ে দিয়েছে পাপিয়া গণেশদের প্রত্যেকের হাতে, পিঠে কিছু-না-কিছু জিনিসপত্র। স্কুলে যাবার সময় যে-পিঠঝোলায় বই নিয়ে যায় গণেশ, সেই ঝোলায় করে চা-চিনি বানরুটি নিয়েছে। মেওয়ার এক কাঁধে ওয়াটার কেরিয়ার, হাতে জলের একটা পাত্র, লোটার মতন দেখতে। টুকলু, জিতুও খালি হাতে নেই। পাপিয়ার আনা জিনিসগুলো টুকলু নিয়েছে। পাপিয়ার হাতে নাক-মোছা রুমাল ছাড়া অন্য কিছু নেই।
মাঝদুপুরের রোদটা ভালোই লাগছিল। রাস্তার পাশে দেবদারু আর কলকে ফুলের গাছগুলো রোদে ডুবে আছে, বটগাছের মাথার ওপর কাক উড়ছিল। মাঝে-মাঝে ধুলো উড়ছে বাতাসে।
গণেশ বলল, “স্টার্ট! আর দেরি করলে চলবে না। পাঁচটার আগেই অন্ধকার হয়ে যায়।”
যাব।”
মেওয়া বলল, “রাজহানসের ডিম?”
“ডাক্তারের বাগান হয়ে যাব। দশ-পনেরো মিনিটের ব্যাপার। যাবার সময় নিয়ে ওরা আর দেরি করল না, বেরিয়ে পড়ল।
এই পাড়াটার নাম শিমুলপাড়া। কেন যে শিমুলপাড়া নাম হয়েছিল কেউ জানে না। বোধহয় বাজার থেকে যে রাস্তাটা সোজা এসে এই পাড়ার মুখে পড়েছে, সেখানে পেল্লায়-পেল্লায় তিনটে শিমুলগাছ দাঁড়িয়ে আছে বলে। দুটো গাছ পাশাপাশি, একটা সামান্য তফাতে। গরমকালের দিন ওই গাছতলায় মিছরিলাল তার জলসত্র খুলে বসে। জল আর একটা করে বাতাসা দেয়। আগে দিত ভেজানো ছোলা। ব্যবস্থাটা মাড়োয়ারি ধর্মশালার।
শিমুলপাড়া খুব একটা বড় পাড়া নয়। মাঝারি। দেখতেও মোটামুটি মন্দ নয়। গাছপালা, কলের জল, বাঁধানো নালা সবই আছে। আর আছে শিমুলপাড়ার একপাশে গোটা-দুই ছোট বাংলো বাড়ি। রেলের বাংলো-বাড়ি। রেলের জমিতেই।শিমুলপাড়ার একেবারে শেষপ্রান্তে কালা-ডাক্তারের বাগান। কালা ডাক্তারের নাম বিষ্ণুচরণ মালিক। দু’পুরুষ এই শহরে ডাক্তারি করছেন মালিকরা। বিষ্টু মালিকের বয়েস এখন প্রায় সত্তর। ভদ্রলোক অনেকদিন থেকেই কানে খাটো। এখন একেবারে বদ্ধ কালা। কান-যন্ত্র লাগিয়েও ভালো শুনতে পান না। কেউ যদি বলে, “ডাক্তারবাবু, আমার পেট ব্যাথা করছে কাল থেকে, ভীষণ ব্যথা।” ডাক্তারবাবু একটা কানে হাত রেখে ঘাড় বেঁকিয়ে বলবেন, “বাত। একাদশী পূর্ণিমায় বাতের ব্যথা বাড়ে। মালিশ লিখে দিচ্ছি। গরম জলের সেঁক আর মালিশ। রাত্রে আধ আউন্স ক্যাস্টর অয়েল। পেট পরিষ্কার থাকা দরকার হে।”
এ-হেন বিষ্টু ডাক্তারের বাগানটি বেশ বড়। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা থেকে লাউ, ঝিঙে, কুমড়ো, বেগুন—সবরকম গাছ আছে। আছে মস্ত ইঁদারা। আছে প্রহ্লাদ মালি আর তার চেলা ফটিক। আর রয়েছে হাঁস, খরগোশ, একটা ময়ূর। রাজহাঁসও আছে দু’জোড়া।
গণেশরা অনেক আশা নিয়েই বিষ্টু মালিকের বাগানের কাছে এসেছিল, এসে কিন্তু এেেকারে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।বাগানের ফটকের সামনে দু’দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে। একটা মোটর গাড়ি। অন্যটা টমটম। মোটর গাড়িটার চেহারা কুম্ভকর্ণের মতন। বিষ্টু-ডাক্তারের বাবার আমলের গাড়ি। ষাঁড়ের মতন মুখ। মাথায় হুড। পতপত করছে ক্যাম্বিস। গায়ের রং কালো না খয়েরি, না ম্যাজেন্টা বোঝা যায় না। হেডলাইট একটামাত্র টিকে আছে। চাকাগুলোর যা চেহারা!
টমটম গাড়িটা অল রাইট। অবশ্য এক ঘোড়ার গাড়ি।
বাগানের ভেতর থেকে হই-হল্লা, গান, চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। গণেশ, মেওয়া, জিতু—সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
গণেশ বলল, “কী ব্যাপার রে?”
জিতু বলল, “কালা-ডাক্তারের গাড়ি। বাগানে লোকজন এসেছে।” “অদ্ভুত! বাগানে লোকজন আসবে কেন?”
টুকলু বলল, “টমটম রয়েছে। ডাক্তারবাবুও এসেছেন।”
মেওয়া বলল, “গুপচুপ হয়ে গেল!” কোনও কিছু ভন্ডুল হওয়াকে মেওয়া বলে—গুপচুপ হওয়া।
গণেশ হতাশ। বিরক্ত হয়ে টুকলুকে বলল, “এই একবার যা তো! দেখে আয় বাগানে কী হচ্ছে!
টুকলু এসব কাজে বিশেষ পারদর্শী। সে দেখতে গেল বাগানে কী হচ্ছে!
পাপিয়া তার বিউটিকে টক করে কোলে তুলে নিল। কিচ্ছু বলা যায় না, বিউটি হয়তো ঘোড়া দেখে তার সঙ্গে ঝগড়া করতে যাবে—তারপর একটা লাথি খাবে ঘোড়ার। ঘোড়ার লাথি কি বিউটি হজম করতে পারে? গিরগিটি, টিকটিকি মাটিতে পড়লে বিউটি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে, লেজ তুলে দৌড় মারে—আর এ তো ঘোড়া।
গণেশ বলল, “বড়দিন কবে রে?”
জিতু বলল, “পরশু।”
“ওরা কি বড়দিন করতে এসেছে?”
জিতু মাথা হেলিয়ে বলল, “আসতেই পারে।”
গণেশদেরও চড়ুইভাতি করতে যাবার কথা। অবশ্য সেটা বড়দের ব্যাপার, ছোটরা সেখানে লেজুড় হয়ে সঙ্গে যায়। অমন চড়ুইভাতিতে আরাম নেই।
গাছতলায় সামান্য আড়ালে দাঁড়িয়ে কালা-ডাক্তারের বাগান দেখতে দেখতে মেওয়া হঠাৎ বলল, “আরে গনশু, ওই দ্যাখ..” বলে একটা দিকে আঙুল দেখাল।
মেওয়ার কথামতন গণেশ বাগানের দিকে তাকাল। দেখল পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে পেহ্লাদ কলাপাতা কাটছে।
এরপর আর বুঝতে বাকি কী থাকে? আজ কালা-ডাক্তারের বাগানে ফ্যামিলি- পিকনিক। তা ডাক্তারবাবুদের ফ্যামিলি কম নয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যারা আছে— একত্র করলে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ তো হবেই।
গণেশ বিরক্ত হয়ে বলল, “পিকনিক করার আর দিন পেল না! যত্ত সব!” টুকলুকে দেখা গেল, ফিরে আসছে।
ফিরে এসে টুকলু বলল, “ঘি-ভাতের গন্ধ বেরোচ্ছে।” বলে নাক ঘষল, “দারুণ গন্ধ।”
“মানে পিকনিক করছে।”
“জোর পিকনিক।”
গণেশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “তা হলে আর কী। চল, আমরা যাই।” “কোথায় যাবি?”
“চল না। যেখানে হোক গেলেই হল। বানরুটি আর চা তো রয়েছে।”
অকারণ দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। গণেশরা এগোতে লাগল।
কালা ডাক্তারের বাগান ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলে ধোপাপাড়া। নামেই ধোপাপাড়া। চার-পাঁচ ঘর ধোপা ছাড়া অন্য যারা থাকে তারা এ-পাড়ায় জল তোলা বাসন মাজার কাজ করে, কেউ-কেউ বাজারে সবজি বিক্রি করে।
ধোপাপাড়ার পর মাঠ। ঢালু হয়ে নেমে গেছে। মাঠের একপাশে কাঁঠালগাছের ভিড়। তার তলায় ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তা মেরামতির রোলার একটা। আলকাতরার ড্রাম।
গণেশরা হাঁটতে লাগল। রাজহাঁসের ডিমের জন্যে মনটা খারাপ। কপালে না থাকলে এই রকমই হয়। এমন জানলে রাজহাঁসের বদলে পাতিহাঁসের কয়েকটা ডিম আনতে পারত তারা। ওমলেট খাওয়া কপালে নেই, কী আর করা যাবে।
মাঠ পেরিয়ে আসতে-আসতেই বাড়িটা চোখে পড়ে গেল। অবশ্য ওটা ঠিক বাড়ি নয়। ফ্যাক্টরি, মানে কারখানা।
অনেকটা জায়গা ঘিরে কম্পাউন্ড ওয়াল। এখনও ইটের লালচে ভাব ঘোচেনি। নতুন নতুন চেহারা। মস্ত একটা লোহার ফটক। ফটকের একটা পাল্লা একেবারে পাকাপোক্তভাবে বন্ধ। অন্য পাল্লার ওপর দিকটা বন্ধ থাকলেও, তলার দিকটায় খোলা-বন্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে। মানে ওই ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে ঢুকতে হবে ভেতরে।
কম্পাউন্ড ওয়ালের ওপারে মস্ত একটা শেডের মাথা চোখে পড়ে। আর উঁচুমতন টালির বাড়ি। একটা লোহার চোঙা তালগাছের মতন মাথা তুলে যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তো প্রথমেই নজরে পড়ার কথা ।
ফটকের মাথার ওপর বিশাল এক সাইনবোর্ড। তাতে লেখা ‘লালজি চলুস’। লালজি চকলুস যে একটা চকোলেট ফ্যাক্টরি গণেশরা তা জানে! তবে ঠিক, জানে না ‘চকলুস’ মানেটা কী!
গণেশরা প্রায় চকোলেট ফ্যাক্টরির কাছাকাছি এসে পড়েছিল। হঠাৎ টুকলু বলল, “গণশা, পেয়ে গেছি।”
গণেশ কিছু বুঝল না। “পেয়ে গিয়েছিস?”
“চাঁদমারি যেতে হবে না। চল, ওই লালা চকোলেট ফ্যাক্টরিতে যাই।” গণেশ বলল, “ওখানে গিয়ে কী করবি?”
টুকলু বলল, “ফ্যাক্টরির ভেতরটা খুব সুন্দর। আমি একদিন গিয়েছিলাম। দেখেছি। মোরামের রাস্তা, কৃষ্ণচূড়া গাছ, পাতকুয়ো, টিউবওয়েল সব আছে।”
জিতু বলল, “একেবারে নতুন হয়েছে। আমিও শুনেছি ভেতরটা খুব সুন্দর।” গণেশ বলল, “মা’র কাছে মামার বাড়ির গল্প করিস না। আমি সব জানি। তোদের চেয়েও ভালো জানি।”
পাপিয়া ঠোঁট উলটে বলল, “মামা না জামা!”
গণেশ ধমক মেরে বলল, “ইয়ার্কি মারবি না। গাঁট্টা খাবি।”
জিতু বলল, “কী জানিস তুই?”
“লালুজ্যাঠার চকোলেট কোম্পানি চালু হবার মুখে গন্ডগোল হয়েছে। বারো-চোদ্দো দিন ধরে সব বন্ধ। লালুজ্যাঠা কলকাতায় গিয়েছেন মিস্ত্রি ধরে আনতে।”
মেওয়া বলল, “লালুবাবু পাগলা।”
টুকলু বলল, “হ্যাঁরে পাগলা! লালুবাবু পাগলা হলে তুই ছাগলা। কী জানিস তুই লালুবাবুর। কিচ্ছু জানিস না। লালুবাবুর বাবা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন। গোরখপুরে তাঁর স্বদেশী ঘি, আচার, দেশলাইয়ের কাঠি, ধূপ, মোরব্বার কারখানা ছিল। জানিস?”
পাপিয়া ফিক করে হেসে বলল, “স্বদেশী ঘি কাকে বলে টুকলু?”
“তোর মাথাকে।”
মেওয়া বলল, “আরে, বাপ আর বেটা কি এক।”
টুকলু বলল, “বাবা আর নেই। লালুবাবু নিজে এই কোম্পানি করেছেন।” গণেশ মাথা নেড়ে বলল, “লালুজ্যাঠা কত কী জানেন। এক্সপার্ট লোক। অনেক
জায়গায় ঘুরেছেন। পন্ডিচেরি, আন্দামান, নেপাল, জয়পুর….।”
মেওয়া বলল, “আরে, পাগলা বললে কি লোক খারাপ হয়! তোরা বাত বুঝছিস না। লালুবাবু বাড়িতে খাটিয়াটাকে দোলনা বানিয়ে শুয়ে থাকেন—দেখেছিস? গাইয়ের দুধ দিয়ে ভিন্ডি পাকান। দাড়িতে দহি লাগান।”
পাপিয়া হি হি করে হেসে উঠল। তার বিউটি কোল থেকে লাফ মেরে মাঠে পড়ে চকোলেট কারখানার দিকে ছুটতে লাগল।
পাপিয়া দৌড়ে গেল পিছু-পিছু।
গণেশ বলল, “তা হলে চল, চকোলেট কারখানাতেই যাই, ওখানে বসেই পিকনিক করা যাবে।”
জিতু বলল, “ঢুকব কেমন করে?”
“ছোট ফটকটা খোলা আছে মনে হচ্ছে!”
“দারোয়ান আছে টুকলু।”
গণেশ বলল, “চল না দেখা যাক।”
তিন
ফটকের কাছে এসে গণেশরা দাঁড়াল।
ভেতর থেকে সাড়া-শব্দ আসছে না। গলা পাওয়া যাচ্ছে না কারও। মাঝে-মাঝে পাখির ডাক ভেসে আসছে।
গণেশ ভালো করে দেখল। ফটকের একপাশে সেই কাটা-দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে। মানে, খোলাই আছে।
গণেশের কেমন সন্দেহ হল। আসা-যাওয়ার পথ এ-ভাবে খোলা থাকবে কেন ? তবে কি দারোয়ানটা আশেপাশেই রয়েছে? লালুবাবুর এই দারোয়ানটা ভালো লোক নয়। ভাগলপুর থেকে এসেছে। লোকটা নাকি পালোয়ান। কেমন করে যে পালোয়ান হয় ওই বিরাট ভুঁড়িওয়ালা লোকটা, কে জানে। ওঁর ভুঁড়ির ওজন কম-সে-কম আধ মন। মাথার ওজন, সের-পাঁচেক। হাত পা জড়ো করলে ওজন দাঁড়াবে মনখানেক । মোট কথা, মন-তিনেক ওজনের একটা মাংসের পুঁটলি পালোয়ান হতে পারে না। তা না পারুক, তবে মোটালোকের বদমাশ হতে বাধা কোথায় ?”
গণেশ বলল, “মেওয়া, দু’একটা ঢিল ছোঁড় তো ভেতরে। মটকু কাছাকাছি থাকলে ছুটে আসবে।”
মেওয়া যেন হুকুমের অপেক্ষায় ছিল। মাটি থেকে তিন সাইজের তিনটা ইটের টুকরো কুড়িয়ে নিল। নিয়ে ফটকের মাথা টপকে ছুঁড়ল।
না, কোনও সাড়া-শব্দ নেই।
পাপিয়ার কোল থেকে নেমে পড়েছিল বিউটি। কুকুরটা পনপন করে ছুটে গেল খানিকটা, আবার ফিরে এল। বারকয়েক ডাকল। কুকুরের ডাক বলে মনে হল না, যেন বেড়াল ডাকছে। বিউটির গলার স্বর ওইরকমই। পাপিয়া বলে, বিউটি যখন এক মাসের বাচ্চা তখন সে না জেনেই একটা ভুটানি কাঁকড়াবিছে খেয়ে ফেলেছিল। ফলে তার গলা নষ্ট হয়ে গেছে।
গণেশরা এই নিয়ে ঠাট্টা করে পাপিয়াকে। বলে, “ইশ, তুই যদি বিছে খেতিস কাজের কাজ হতো। তোর যা গলা, কাকের গলাকেও হার মানাস।”
পাপিয়াও ছেড়ে দেবার মেয়ে নয়। সেও লড়ে যায় গণেশের সঙ্গে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত পারে না।
কোনওরকম সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না দেখে মেওয়া বলল, “কোই নেই। নো মটকু !”
টুকলু বলল, “চল ঢুকে পড়ি।”
জিতু বলল, “আমার মনে হয় মটকু নেই।”
“কোথায় যাবে মটকু ?”
“বাজারের মাঠে আজ ভেড়ার লড়াই হচ্ছে। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। মটকু
বোধহয় ভেড়ার লড়াই দেখতে গেছে।”
মেওয়া বলল, “আরে মটকু তো জজ বনবে। পালোয়ানজি হ্যায় না!”
সকলে হেসে উঠল।
গণেশ বলল, “নে চল।”
হঠাৎ পাপিয়া হাত তুলে আঙুল দিয়ে একটা নোটিস দেখাল।
ফটকের পাশে থামে একটা কালো টিনের ওপর সাদা অক্ষরে লেখা রয়েছে নো অ্যাডমিশন। তার তলায় ছোট-ছোট অক্ষরে লেখা আছে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করিলে মাগনায় খাটিতে হইবে।
গণেশরা আগেই বোধহয় নোটিসটা দেখেছিল। পাত্তা দিল না। বলল, “আমাদের কি আর মাগনায় খাটাবে রে! কারখানাই বন্ধ। পপি, তোকে ধরতে পারলে ঘর ঝাঁট দিতে বলবে!”
জিতুরা হেসে উঠল হো-হো করে।
পাপিয়া চটেমটে বলল, “আমি তোদের সঙ্গে যাব না। তোরা অসভ্য। আমি বাড়ি চলে যাব।”
“যা, সাবধানে যাবি। সাহেবদের কবরখানা থেকে দুপুরবেলায় ইংলিশ ভূতরা বেরিয়ে পড়ে। একটু পায়চারি করে আর কি! রোদ পোহায়।”
পাপিয়ার ভীষণ ভূতের ভয়। একবার মেজদা’র ঝাঁঝার বাড়িতে সে একটা ইংলিশ ভূত দেখেছিল।
বাধ্য হয়েই পাপিয়াকে চুপ করে যেতে হল। মনে মনে অবশ্য চটেই থাকল! গণেশই আগে কাটা-ফটকের দরজা খুলল। খুলে মুখ বাড়াল।
“আয়, কাছাকাছি কেউ নেই।”
গণেশ ভেতরে ঢুকে গেল।
গণেশের পর একে একে জিতুরা পিঠ কোমর বেঁকিয়ে, মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকল। পাপিয়াও।
ভেতরটা সত্যিই ছবির মতন।
লালজি চকোলেট কোম্পানির এই কারখানা যখন তৈরি হচ্ছিল—গণেশরা মাঝে-মাঝে বেড়াতে আসত, দেখে যেত কী হচ্ছে! ইট, বালি, সিমেন্ট, মিস্ত্রি-মজুর, টিন, কাঠ, ছুতোর-মিস্ত্রি দেখতে দেখতে তাদের চোখ পচে গেল। তারপর আর আসত না। জিতু, টুকলু–হয়তো আরও এক-আধবার এসেছে কিন্তু আজ তারা যে-দৃশ্য দেখল, আগে দ্যাখেনি ।
মোরামের লাল রাস্তা, কৃষ্ণচূড়া আর দেবদারু গাছ। দু’একটা গাছ বাদে সবই কচি। মস্ত একটা শিরীষ গাছ রয়েছে। এটা পুরনো। মস্ত ইঁদারা। ঢাকা-লাগানো টিউবকল। ফুলের বাগান হয়েছে একপাশে। লতাপাতাও কম নয়।
একটা বাড়ি আধ পাকা। দোতলা। আর-একটা মস্ত শেড ফটকের কাছেই দারোয়ানের ঘর।
দারোয়ানের ঘরে তালা দেওয়া। মানে মটকু নেই। সে যে কোথায় কে জানে ! সত্যিই কি ভেড়ার লড়াই দেখতে গিয়েছে বাজারের মাঠে!
গণেশরা একটু সরে গিয়ে ছায়া খুঁজে বসল। জলতেষ্টা পেয়েছে। জল খেল ওয়াটার কেরিয়ার থেকে।
গণেশ বলল, “এখন চা খাবি, না ঘুরে ঘুরে দেখবি আগে?”
টুকলু বলল, “আগে চল, দেখি।”
জিতু বলল, “লালুবাবু কী করেছেন রে? কাজের লোক।”
মেওয়া বলল, “পয়সা আছে ভাই।”
পাপিয়া বলল, “বাবা বলে, টাকা থাকলেই মানুষ বড় হয় না। কাজে বড় হয়।” গণেশ বলল, “তোর ওই কুকুরটাকে সামলা পপি। ইঁদারার দিকে যাচ্ছে।” পাপিয়া তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল তার বিউটিকে ধরে আনতে।
টুকলু বলল, “গনশা, চল, আজ আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখব। আমাদের শহরে এত বড় একটা জিনিস হচ্ছে, আমরা দেখব না! আমাদের গর্ব হওয়া উচিত।”
জিতু বলল, “লালুজ্যাঠাকে নিয়ে প্রসেশন বার করা উচিত আমাদের। ঠিক কি না বল!”
গণেশ আর মেওয়া মাথা দোলাল।
লালুবাবু মানুষটির কথা এবার একটু বলতে হয়।
ভদ্রলোকের পুরো নাম লালবিহারী সিংহ। সিংহ হয়েছে সিনহা। আদি বাস মুঙ্গের। দু’পুরুষের বেশি অবশ্য এখানে হিরাবাদে। লালবিহারীকে কেউ বলে লালুবাবু, কেউ-বা বলে লালাবাবু। মানুষটি এই হিরাবাদ শহরে খুবই বিখ্যাত। আশেপাশেও তাঁর নাম বললে লোকে চিনতে পারে। অবশ্য বয়স্করা তাঁর নাম দিয়েছেন “খ্যাপা লালু”।
মফস্বল শহর হিরাবাদ তবে ছোট্ট নামমাত্র শহর নয়। এই শহরের নাম আছে। না থাকবে কেন! এখানের রেলওয়ে স্টেশনকে জংশন স্টেশন বলে। মস্ত বড় রেলইয়ার্ড। মেল গাড়ি হিরাবাদ এক্সপ্রেস গাড়ি থামে। অফিস আছে রেলের। এই শহরে দু’দুটো হাইস্কুল; একটা রয়েছে মেয়েদের স্কুল। শহরের মাঝ-মধ্যিখানে বড়সড় বাজার ছাড়াও দু’দিকে দুই ছোটবাজার। ছোট হাসপাতাল। সিনেমা হাউস একটা। খেলার মাঠ, জলট্যাঙ্কি সবই আছে। আছে টানাগাড়ি, মোটরগাড়ি, বাস। আরও তো কত কী আছে!
কাজেই কেউ যদি মনে করে, একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে লালাবাবুকে চেনা এমনকী কঠিন কাজ—তবে ভুল করবে। শহর বড়, অন্তত মাঝারি। লালাবাবু বা লালুবাবু তার চেয়েও বড়।
লালুবাবুরা এই শহরে দু’পুরুষের বাসিন্দা। ওঁর বাবার অনেক খ্যাতি ছিল। লালুবাবুর খ্যাতি তার চেয়েও বেশি। কেন না, লালুবাবু এই শহরে অনেক কিছু করেছেন। স্কুলে চাঁদা দিয়েছেন বিস্তর। একটা আধা-পাকা বাড়িও তৈরি করে দিয়েছেন। প্রথম যে জলের ট্যাঙ্ক—লালুবাবুর উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল। সে-ট্যাঙ্ক অবশ্য আর নেই। লালুবাবু ডায়নামো লাগিয়ে ইলেকট্রিক দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন, ব্যবসাটা চালাতে পারেননি। তিনি একটা সোডা লেমোনেড কারখানা খুলেছিলেন, বছর-দুই চলার পর বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে ঘরে এত বেশিরকম পেটের অসুখ হতে লাগল যে, লালুবাবু নিজেই কারখানা বন্ধ করে দিলেন।
বলতে গেলে মহাভারত হবে। অত বলার কী দরকার। মানুষটি ভালো, তাঁর কাজ-কর্ম করার ঝোঁক আছে। নয়তো আজ বছর-পঞ্চাশ বয়েসে কেউ চকোলেট তৈরির কারখানা করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে! হ্যাঁ, লালুবাবুর টাকা আছে। মুঙ্গের, কাশী, ভাগলপুরে কিছু বিষয়-সম্পত্তি আছে তিন পুরুষের। সেখান থেকে টাকা-পয়সা আসে। হিরাবাদে রয়েছে লালুবাবুর সাইকেল বিক্রির দোকান আর এজেন্সি। বেশ ভালোই চলে দোকানটা। বাড়িতে তিনি একা। বিয়ে-থা করেননি। লোকজন আছে বাড়িতে, তারাই ঘরদোর দেখাশোনা করে। তাদের হাতেই খাওয়া-দাওয়া। তবে লালুবাবু মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ খান না। ভাত, ডাল, রুটি, সবজি, দুধ এই তাঁর খাদ্য। পাঁপড় আর আচার খেতে ভালোবাসেন। সবচেয়ে ভালোবাসেন রসগোল্লা খেতে।
একবার লালুবাবুর সাধ হয়েছিল রসগোল্লার কারখানা করবেন। করে বাইরে চালান দেবেন। ত্রিবেন্দ্রাম থেকে নেপাল পর্যন্ত। সব ঠিকঠাক হয়েও শেষ পর্যন্ত কারখানা হল না। কেন না, রসগোল্লা তৈরির যন্ত্রটা তিনি বানাতে পারলেন না। যে-জিনিস যন্ত্র দিয়ে বানানো যাবে না—সে জিনিস তিনি করতে নারাজ।
রসগোল্লা করা গেল না—এই দুঃখ তাঁর মনে মনে থেকে গেল। সেই দুঃখ বছর-দুই চেপে রাখার পর লালুবাবু চকোলেট কারখানা করতে নেমে পড়লেন। তবে বাজারের চলতি চকোলেট আর লালুবাবুর তৈরি চকোলেট একরকম হবে না। তিনি চকোলেট জিনিসটাকে ঠিক শক্ত করতে নারাজ। সেটা চকোলেটও হবে—, আবার জুসও হবে। অনেকটা জেলি গোছের। বোধহয় তাই নাম দিয়েছেন চকলুস।
একটা কারখানা করা চাট্টিখানি কথা নয়। তার ওপর লালুবাবুর মতন মানুষের পক্ষে তো হুট করে কিছু করা সম্ভব নয়। উনি যা করবেন, নিজের হাতে করবেন, যন্ত্রপাতি আঁকবেন, লোক দিয়ে তৈরি করাবেন, সেটা চালু করা হবে—তবে না!
হবে, হচ্ছে করতে করতে বছরখানেক গড়িয়ে গেল। লালুবাবু একে একে সবই করলেন নিজের হাতে। তারপর চকোলেট কারখানা চালু করতে গিয়ে দেখলেন, যন্ত্রপাতির কিছু গোলমাল হয়েছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল লালুবাবুর। কিন্তু দমলেন না। কলকাতায় ছুটলেন মিস্ত্রি জোগাড় করতে। কলকাতাতে ভালো মিস্ত্রি পাওয়া যায়। একজনকে ধরে আনবেন। তারপরই চালু হয়ে যাবে তাঁর চকলুস কারখানা।
চার
গণেশ বলল, “রাজহাঁসের ডিম পেলে এখানেই পিকনিক সেরে নেওয়া যেতে পারত, কী বল জিতে?”
জিতু রাজহাঁস অনেক দেখেছে। খেয়াল করে কখনও রাজহাঁসের ডিম দ্যাখেনি। সেই ডিমের ওমলেটের কেমন চেহারা হবে—তাও জানে না। তা আজ যদি চেহারাটা দেখা যেত–মন্দ হতো না! জিতু বলল, “পয়লা জানুয়ারি আবার পিকনিক হবে। তখন খাব।”
টুকলু বলল, “চল। একবার ঘুরে বেড়িয়ে সব দেখি। লালুজ্যাঠা নিজের হাতে সব করেছেন।
গণেশ বলল, “চল।”
ওরা আর-একবার বাগানটা ভালো করে দেখে নিল। কেউ কোথাও নেই। সব চুপচাপ। পাখি ডাকছে। দুপুরের রোদ যেন গাছপালা, মাঠের গায়ে গরম শাল জড়িয়ে দিয়েছে। আকাশ কী সুন্দর নীল। দু’তিনটে চিল উড়ছে আকাশে।
বড়সড় শেডটার দিকেই ওরা এগিয়ে চলল।
পাপিয়ার কোল থেকে তার বিউটি নেমে পড়েছে। সে লেজ তুলে ছুটতে ছুটতে যাচ্ছিল। মাঝে-মাঝেই ডাকছে। তবে তার গলার স্বর বেড়ালের মতন বলে কেউ আপত্তি করছে না। সত্যি সত্যি কুকুরের ডাক হলে হয়তো আপত্তি করত। কিছুই তে বলা যায় না, কেউ যদি এই কারখানার কোথাও থেকে থাকে, কুকুরের ডাক শুনলে ছুটে আসতে পারে।
মোরামের রাস্তা দিয়ে শেডের কাছাকাছি আসতেই একটা জিনিস গণেশের চোখে পড়ল।
রাস্তায় যেমন কাঠ বা টিনের ফলক থাকে, লেখা থাকে কোন রাস্তা কোন দিকে গিয়েছে, সেই রকম এক কাঠের ফলক। ফলকের একটা দিক শেডের দিকে, অন্য দিকটা আধ-পাকা দোতলা বাড়ির দিকটায়।
শেডের দিকের কাঠের ফলকে লেখা আছে—স্টোর্স।
গণেশদের বুঝতে অসুবিধে হল না। শেডটা তা হলে গুদোমখানা ।
মেওয়া বলল, “গনশা, স্টোর্সে কী আছে রে?”
গণেশ বলল, “চল না দেখি।”
জিতু বলল, “দরজা বন্ধ।”
সামান্য দূর থেকে মনে হয়েছিল, দরজা বন্ধ। কাছে এসে দেখা গেল, দরজা বন্ধ নয়। ঢাকা-লাগানো টিনের দরজা। ঠেললে হড়হড় করে একপাশে সরে যায়। তালা নেই দরজায়। মাথার দিকে খানিকটা ফাঁক। সেখানে জালি বসানো।
টুকলু বলল, “ভেন্টিলেশন। গুদোমে বাতাস ঢোকার জন্যে জালি লাগানো হয়েছে।” পাপিয়া বলল, “গনশুদা, ওই দ্যাখো।”
পাপিয়া খানিকটা আগে রেগে গিয়েছিল। এখন ভুলে গিয়েছে।
গণেশরা দেখল, দরজার পাশে দেওয়ালে একটা ছোট ব্ল্যাকবোর্ড আটকানো রয়েছে। তাতে লেখা আছে— চিনি ও গুঁড়া দুধ।
জিতু বলল, “ভেরি ক্লিয়ার। এই ঘরটার মধ্যে চিনি আর পাউডার মিল্ক আছে।” গণেশ বলল, “মেওয়া, ওপেন দি ডোর।”
মেওয়া আর টুকলু দরজা ঠেলতেই ঘরের ভেতরটা চোখে পড়ল। বিউটি সঙ্গে-সঙ্গে ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে।
গণেশরাও ভেতরে ঢুকল। ঢুকে অবাক। আরেব্বাস! বস্তার পর বস্তা সাজানো। কম করে পনেরো-বিশ বস্তা।
জিতু এগিয়ে গিয়ে বস্তার মুখে ঝোলানো টিকিট দেখল। খোলা দরজা দিয়ে আলো আসছিল খানিকটা।
জিতু বলল, “এটা চিনির বস্তা। টিকিট ঝোলানো আছে।”
টুকলু ততক্ষণে দুধের বস্তা খুঁজে পেয়েছ, বলল, “এখানে দুধের বস্তা।” পাপিয়া বলল, “চকোলেট করতে কী-কী লাগে রে?”
গণেশ বলল, “তুই করবি? বেগুন ভাজতে জানিস না, চকোলেট করবি?” পাপিয়া চটেমটে বলল, “জানি না তো জানি না, কী হয়েছে? তুমি জানো?” কথার কোনও জবাব দিল না গণেশ।
মেওয়া ঘুরতে ঘুরতে একটা বস্তা পেল, মুখের দিকটা আলগা। হাত ঢুকিয়ে একমুঠো চিনি নিয়ে মুখে দিল।
মেওয়ার দেখাদেখি টুকলুও অল্প একটু চিনি তুলে মুখে ফেলল। চেখে নিল যেন। তারপর বলল, “এটা কোথাকার চিনি বল তো, মেওয়া।”
মেওয়া কথাটা ভালো বুঝল না। বলল, “বিরাশির দোকানের।”
“ধ্যুত, তোকে আমি কোন দোকানের চিনি জিজ্ঞেস করেছি? বলছি, কোথাকার চিনি, কোত্থেকে এসেছে?”
মেওয়া বলল, “মালুম নেই।”
টুকলু বলল, “জাপানি চিনি।”
“জাপানি চিনি?”
“জাপানি চিনি না হলে এরকম মিহি ধুলোর মতন চিনি হয়! কেমন সাদা দেখছিস না। জাপানিদের সব ফাইন-ফাইন জিনিস।”
জিতু বলল, “বাজে বকিস না! লালুজ্যাঠা জাপানি চিনি দিয়ে চকোলেট করবে! কক্ষনো করবে না। দেশের জিনিস ছাড়া বাইরের জিনিস দিয়ে লালুজ্যাঠা কিছু করে না।”
গণেশ বলল, “কী চিনি-চিনি করছিস। চল, পাশের ঘরে যাই।”
এক নম্বর স্টোর থেকে বেরিয়ে এল। পাপিয়া আসছে না। তার বিউটি কোন বস্তার ফাঁকে ঢুকে বসে আছে কে জানে! পাপিয়া তার কুকুরকে ডাকছিল।
গণেশ ধমকে উঠে বলল, “এই হল তোর দোষ। যেখানে যাবি, তোর ওই নেড়িটাকে নিয়ে যাবি !”
টুকলু তামাশা করে বলল, “যুধিষ্টির কুকুর নিয়ে স্বর্গে গিয়েছিল।”
“যাকগে। ও কি যুধিষ্ঠির নাকি! ওই কুকুর নিয়ে ওকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে।” পাপিয়া রেগেমেগে চেঁচিয়ে উঠল। “অসভ্য কথা বলবি না গনশুদা।” গণেশ বলল, “যা যা, বলব না। তোর ওই নেড়ি যদি বস্তার ফাঁকে বসে কিছু করে দেয়। কুকুরের যা নোংরা হ্যাবিট…।”
মেওয়ারা একসঙ্গে হেসে উঠল।
গণেশ বলল, “আমরা পাশের ঘরে চললাম। তুই তোর নেড়িকে খুঁজে নিয়ে আয়।” পাপিয়া ভয় পেয়ে গেল। এই গুদোমঘরে একা থাকা যায় নাকি? তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এসে কুকুরটাকে ডাকতে লাগল।
ততক্ষণে গণেশরা পাশের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। একই রকম ঠেলা-দরজা। ঘরের পাশে দেওয়ালে বোর্ড ঝুলছে— স্টোর। দু’নম্বর। তলায় লেখা আছে, কোকো, বাদাম।
দরজা ভেজানো ছিল। মেওয়া আর জিতু দরজা ঠেলতেই হড়হড় করে খুলে গেল। কোকোর গন্ধ এল নাকে।
জিতু বলল, “আরেব্বাস, কত বস্তা!”
পাপিয়া ততক্ষণে তার কুকুর নিয়ে এসে পড়েছে। এবারে আর ছেড়ে দেয়নি, বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। আবার যদি পালিয়ে যায়। এত ছটফটে হয়ে উঠেছে বিউটি। সত্যি, ওকে নিয়ে আর বেরনো যায় না। এবার থেকে পাপিয়া আর যেখানে সেখানে বিউটিকে নিয়ে যাবে না!
প্রথম ঘরে যেমন দেখা গিয়েছিল, এখানেও অনেকটা সেইরকম। পরপর কোকোর বস্তা। বস্তাগুলো চটের নয়, মোটা পলিথিনের।
এক নম্বর ঘরে দুধের বস্তাগুলো ছিল পলিথিনের।
গণেশ বলল, “জিতে, বাদাম কোথায় ?”
জিতু খুঁজে খুঁজে বাদামের টিন বার করল। এগুলো আর বস্তায় নেই। বিস্কুটের বড় বড় টিনের মধ্যে রাখা।
“কী বাদাম রে?” গণেশ বলল।
“একটায় চিনে বাদাম। আর ওটায় কাঠবাদাম।”
“ছাড়ানো, না খোলাসুদ্ধু ?”
“ছাড়ানো।”
“দে, দুটো খাই।”
জিতুকে আর দিতে হল না, সকলেই টিনের মধ্যে হাত ডুবিয়ে মুঠো করে বাদাম তুলে নিল। পাপিয়া ও বাদাম চিবোতে চিবোতে মেওয়া বলল, “বাদাম দিয়ে কোন কিসিমের চকোলেট হবে রে?”
পাপিয়া বলল, “নাটস চকোলেট!”
“বাদামতক্তি!”
“বাদামতক্তি আর নাটস চকোলেট! কিসে আর কিসে!”
মেওয়া বলল, “একই জিনিস। গজুয়ার হাতের বাদামতক্তি—তোর ফালতু চকোলেট সে ভি আচ্ছা!”
গণেশ কয়েক-মুঠো বাদাম পকেটে পুরে নিল। টুকলুও।
জিতু বলল, “যাঃ, তোরা কী করছিস! অত বাদাম নিয়ে নিচ্ছিস! লালুজ্যাঠা বুঝতে পারবে।”
গণেশ বলল, “আমরা নিয়েছি প্রমাণ কী? ওই দারোয়ান মটকু পালোয়ান রোজ বাদাম বেটে শরবত খায় না—তার কোনও প্রমাণ আছে! নে, চল।”
পাপিয়া দুটো বাদামের টুকরো দিয়েছিল বিউটিকে। বিউটির পছন্দ হল না। ফেলে দিল।
দু’নম্বর ঘরের পাশে তিন নম্বর ঘর। এটা ছোট। দরজা ভেজানো। ঘরটার মধ্যে কিছু ছিল না। মানে খাবার জিনিস। কয়েকটা শিশি ছিল তাকের ওপর।
জিতু বলল, “এগুলো বোধহয় ফ্লেভার।”
“মানে?”
“গন্ধ টন্ধ হবার জিনিস।”
গণেশরা বাইরে বেরিয়ে এল। দরজাগুলো তারা হাট করে খুলে রাখছিল না। ভেজিয়ে দিচ্ছিল। চার নম্বর ঘরের তালা অবশ্য বন্ধ। ঘরের পাশে বড় বড় করে লেখা আছে; সাবধান। তেল-ঘর। লেখার পাশে মাথার খুলির ছবি।
“তেল-ঘর’ ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না প্রথমে। জিতুই বলল, “এই ঘরটায় আছে। কেরোসিন, ডিজেল।”
“কী করে রে তেল দিয়ে?”
“বাঃ! মেশিন চালায়!”
গণেশরা বাদাম চিবোতে চিবোতে সামান্য এগিয়ে গেল। শেডের দশ-বিশ হাত তফাতেই দোতলা-মতন বাড়ি। বাড়ির মুখেই তিন চার ধাপ সিঁড়ি। সিঁড়ির পাশে থাম। লেখা আছে— ‘কারখানা’।
ব্যাপারটা খুবই সহজ। গুদোমঘর আর কারখানা কাছাকাছি না থাকলে কী চলে! লালুবাবু একেবারে হিসেব করে ব্যবস্থা করেছেন। কারখানার নীচের তলায় চওড়া বারান্দা। বারান্দার গায়ে মস্ত একটা ঘর। ঘরটা কিসের বোঝা যায় না। একটিমাত্র দরজা।
গণেশরা কয়েক পা এগিয়ে গেল। এই দরজাটা কিন্তু খোলা নয়। তালা বন্ধ। জিতু আর মেওয়া ধাক্কা ধাক্কি করল, তালা খুলল না।
জিতু বলল, “এটা বোধহয় মেশিন ঘর।”
“মেশিনঘর!”
“যন্ত্রপাতি আছে। ওইজন্যে তালা বন্ধ । ”
“কেমন দেখতে রে যন্ত্রপাতিগুলো?”
“কী জানি!” জিতু মাথা নাড়ল। “দেখিনি। তবে সব যন্ত্রই লালুজ্যাঠার নিজের হাতের নকশা করে তৈরি।”
টুকলু বলল, “ওপরে চল। ওপরটা দেখা যাক।”
বিশ-ত্রিশ পা এগুলেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়িতে ধুলো জমেছে। গণেশরা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল।
মেওয়া বলল, “লালুবাবুর কারখানায় আমি দারোয়ান হলে ঠিক হতো।”
“কেন?” জিতু বলল, “তুই এমনিতেই গোল! আরও গোল হয়ে যেতিস খেয়ে খেয়ে?”
“তো হতাম! আরাম সে খাও, আর নিদ যাও।”
“তুই খালি খেতে জানিস।”
“মেওয়া?” টুকলু বলল।
“কী?”
“বদ্যিনাথ-স্যার তোকে কী বলে রে?”
মেওয়া একটু হাসল। তারপর মুখ ছুঁচলো করে সরু গলায় বলল, “মেওয়ালাল, ইউ আর এ কোলা ফ্রুগ! গমনং থথয়তি, ভোজনং দিবারাত্রি।”
বন্ধুরা গলা ছেড়ে হেসে উঠল। বদ্যিনাথ-স্যার ইতিহাস পড়ান। মজার মানুষ। মাই ডিয়ার স্যার। তিনি ফ্রগ বলতে ফ্রুগ বলেন মজা করেই। কোলা ফ্রুগ মানে কোলাব্যাঙ ! দোতলায় এসে গণেশরা একটু ঝামেলায় পড়ে গেল। পরপর দুটো ঘর। ঘরের তলার দিকে কাঠ, ওপরের দিকে কাচ। দরজাগুলো তালা বন্ধ। প্রত্যেক ঘরের পাশে লেখা আছে প্রবেশ নিষেধ। প্রবেশ নিষেধের তলায় আরও কত কী ছোট ছোট করে লেখা। “জুতা পরিয়া ঘরে প্রবেশ করিবে না। হাত-পা সাবান দিয়া ধুইয়া লইবে। এই ঘরে মূল্যবান যন্ত্রপাতি আছে।”
টুকলু বলল, “গনশা, দরজাগুলো সব বন্ধ যে!”
গণেশ কাচের ওপর চোখ রেখে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছিল। শীতের দুপুর ফুরিয়ে আসছে। রোদ এখন উত্তর দিকে হেলে পড়েছে। ঘরের জানলাগুলো কাচের বলে আলো ঢুকছিল।
গণেশ দেখল, ঘরের মধ্যে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। লম্বা, বেঁটে, মোটা, সরু; কোনওটা চাকা লাগানো, কোনওটায় হ্যান্ডেল লাগানো, এক-একটায় আবার টিউবকলের হাতলের মতন হাতল।
গণেশ বলল, “জিতু দ্যাখ!”
জিতু, মেওয়া, টুকলু—সবাই দেখল এক-একবার। পাপিয়া লম্বা নয়। সে দেখতে পাচ্ছিল না। তার দেখার সাধ খুব। কাঁদুনে-গলা করে বলল, “তোরা আমায় দেখাবি না? বা রে।”
অগত্যা মেওয়া মাটিতে ঘোড়া হয়ে বসল। পাপিয়া মেওয়ার পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে ভেতরটা দেখে নিল।
গণেশ বলল, “দ্যাখ পপি, তুই দিনে দুশো স্কিপিং কর। আর পাঁচটা করে বেলপাতা সেদ্ধ করে খা। লম্বা হয়ে যাবি।”
নেমে পড়েছিল পাপিয়া, বলল, “স্কিপিং করলে আমার পা ব্যাথা করে।” “অমন পা ফেলে দে, কী আমার রাজকুমারী!”
পাপিয়া জিভ বার করে ভেংচি কাটল। “তুই কর না দুশো করে স্কিপিং।” রেগে গেলে পাপিয়া গণেশকেও তুই-তোকারি করে, আবার নরম থাকলে গণেশকে বলে গনশুদা। তুমি করে কথা বলে।
বিউটির আর কোল পছন্দ হচ্ছে না। পাপিয়ার কোমরের কাছে ঝুলে পড়েছে। ডাকছে মাঝে-মাঝে।
জিতু বলল, “গনশু, ভেতরে একবার যাব না?”
টুকলু বলল, “যাব কেমন করে, তালা ভাঙব?” সঙ্গে সঙ্গে জিতু আঁতকে উঠল, উঠে বলল, “খবরদার তালা ভাঙলে ধরা পড়ে যাব!
“কে ধরবে?”
“যে ধরুক, ধরে ফেলবে!”
মেওয়া বারান্দায় এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। একপাশে একটা কল। হাত-চারেক জায়গা বাঁধানো। হাত-পা ধোবার জায়গা। কল খুলতেই সুতোর মতো জল পড়ল সামান্য। তারপর বন্ধ হয়ে গেল। কলের পাশে কুলুঙ্গির মতন খোপ। খোপের মধ্যে সাবানের কৌটো। সাবানও রয়েছে।
মেওয়া কলের জায়গা থেকে সরে বারান্দা ধরে ঘুরতে ঘুরতে ডানদিকে চলে গেল। ডানদিক ঘেঁষে সরু করিডর। পাশে রেলিং। কারখানা ঘরের ছোট দুটো দরজা এদিকে। এই দরজার কাচ নেই। কাঠ।
মেওয়া প্রথম দরজাটায় ধাক্কা মারল। ভেতর থেকে বন্ধ।
দ্বিতীয় দরজাটায় ধাক্কা মারতে দরজাটা খুলে গেল।
মেওয়া যেন ভাবতেও পারেনি এমনভাবে একটা দরজা খোলা যাবে। দু’মুহূর্ত দেখল ঘরের ভেতরটা। তারপর লাফ মেরে বাইরে এসে করিডর ধরে ছুটতে লাগল।
“চিচিংফাঁক।” নাচতে নাচতে এসে মেওয়া বলল।
গণেশরা বুঝতে পারল না। তাকিয়ে থাকল।
মেওয়া বলল, “ওদিকে একটা দরবাজা খোলা। “যাঃ।”
“আয়। আমি খোলা রেখে এসেছি।”
গণেশরা মেওয়ার পেছন থেকে করিডরে এল। দেখল, একটা দরজা প্রায় আধখোলা। টুকলু বলল, “খোলাই তো! সত্যি! থ্রি চিয়ার্স ফর মেওয়া!’
গণেশ এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারল। হ্যাঁ, কারখানা-ঘর। মেওয়া কাজের কাজ করেছে। গণেশ ঢুকতে যাচ্ছিল, জিতু বলল, “এই, জুতো পায়ে ঢুকবি। বারণ করা আছে।” গণেশ বলল, “সে তো কারখানায় যখন কাজ হবে। এখন কারখানায় কাজ হচ্ছে না। বন্ধ!”
জিতু খুঁতখুতে গলায় বলল, “না, তবু—বারণ আছে যখন!”
মেওয়া বলল, “জুতো খুলবি বেকার। হাত-মুখ সাফ করতে পারবি না। নো ওয়াটার।”
টুকলু বলল, “আমরা কি চকোলেট করতে যাচ্ছি! দেখতে যাচ্ছি ভেতরটা। জুতো পরে গেলে কোনও ক্ষতি হবে না।”
জিতু আর কিছু বলতে পারল না।
টুকলু হঠাৎ পাপিয়াকে বলল, “তুই কুকুর নিয়ে ঢুকছিস। এই ঘরে কুকুর, বেড়াল,
ইঁদুর, ছুঁচো—কোনও কিছু ঢোকা বারণ—তা জানিস?”
পাপিয়া ঘাড়ের চুল দুলিয়ে বলল, “বাইরে লেখা আছে?”
“ওটা লেখার দরকার করে না।”
“তুই থাম। ঢুকছিস তো চুরি করে।”
গণেশরা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
উত্তর-পশ্চিমের কাচের জানলা দিয়ে আলো আসছে। ঘরের মধ্যেটা মোটামুটি ভালই দেখা যাচ্ছিল।
গণেশরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল।
পাঁচ
তাকিয়ে থাকতে থাকতে গণেশ বলল, “আরেব্বাস! কত রকম যন্তর রে!”
মেওয়া বলল, “লালুবাবু স্বদেশী কল বানিয়েছে।”
টুকলু বলল, “কত মাথা খাটাতে হয়েছে বল? চকোলেট খেতে পাঁচ মিনিট, এই কল বানাতে পাঁচ বছর!”
জিতুর মামা কোলিয়ারিতে কাজ করেন। সে কয়লা তোলার কায়দাকানুন দেখেছে। খাদ, টবগাড়ি, ডুলি। এমনকী রোপওয়ে পর্যন্ত। কিন্তু এখন যা দেখছে এমনটি আর আগে দ্যাখেনি।
পাপিয়া বিপদে পড়ে গিয়েছিল। এতরকম অদ্ভুত যন্ত্রপাতি দেখে তার বিউটি ভয় পেয়ে যেন তাকে আঁচড়ে ধরেছে। অনবরত আঁচড়াচ্ছে।
গণেশ বলল, “চল দেখি, ওদিকে কী আছে।”
পা-পা করে সবাই এগোতে লাগল। কোন যন্ত্রটা কী—তারা বুঝতে পারছে না। একদিকে আটা-পেষাই যন্ত্রের মতন একটা যন্ত্র, মস্ত-মস্ত ঢাকা, বড়-বড় অ্যালুমিনিয়াম ড্রাম, গোটা-দুই কপিকল, বকের মতন গলা উঁচু করে কিসের সিগন্যালের মতন একটা সিগন্যাল, তাতে অবশ্য লাল-সবুজ কাচ নেই। সাইকেলের প্যাডেলের মতন গোটা-চারেক প্যাডেল। ছোট ট্রলি গাড়ি।
চকোলেট বানাবার যন্ত্র যে এমন অদ্ভুত আর বিচিত্র হয়, গণেশরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
লালুবাবুর মাথা আছে। কত মাথা খাটিয়ে, খেটেখুটে তবে এমন সব যন্ত্র তিনি বানিয়েছেন।
এ-যন্ত্র সে-যন্ত্রের ফাঁক দিয়ে, পাশ কাটিয়ে গণেশরা একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল। যন্ত্রগুলো স্থির। ঘরে কোনও শব্দ নেই। খানিকটা যেন ভুতুড়ে দেখাচ্ছে ঘরটা।
জিতু বলল, “বস্তাটা কিসের রে?”
মেওয়া বলল, “দুধের। পলিথিনের বস্তা।”
“আর ওটা?”
টুকলু এগিয়ে গিয়ে দেখল। “চিনির বস্তা!”
দুটো বস্তাই আধাআধি খালি।
কোকোর বস্তাও চোখে পড়ল গণেশদের।
টুকলুর চোখ খুব পরিষ্কার। সে খুঁজে-খুঁজে একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করল। হাত-দশেক তফাতে জালি দিয়ে ঢাকা একটা গর্ত। ঠিক গর্ত না বলে বলা উচিত কুয়ার মতন সুড়ঙ্গ, একেবারে যেন গুহা। অবশ্য বড় নয়, ছোট। হাত-আড়াই হবে। গতটাকে সুড়ঙ্গ বলা যায়। জালি দিয়ে মুখটা ঢাকা। তার কাছাকছি জায়গায় দুটো বড়-বড় বালতি, বালতির সঙ্গে আখমাড়াই কলের মতন একটা কল। হাতল ঘোরালে বালতি দুটো উঠে যায়।
মেওয়া আর গণেশকে ডাকল টুকলু।
“এটা কী বল তো?”
গণেশ বলল, “জালতিটা খোলা যায়। আংটা দিয়ে আটকানো আছে।”
জিতু আর পাপিয়া কাছে এসে দাঁড়াল।
টুকলু গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বলল, “চকোলেটের মতন গন্ধ বেরোচ্ছে।” জিতুরও মনে হল এখানকার গন্ধটা চকোলেটের মতন।
“মেওয়া জালিটা খুলতে পারবি?” গণেশ বলল।
মেওয়া জালির পাশে বসে পড়ে সামান্য মেহনত করতেই জালিটা খুলে গেল। আংটা দিয়ে আটকানো ছিল এক জায়গায়। উঠিয়ে নিল জালির মুখটা।
সুড়ঙ্গের মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ল গণেশরা। নীচের দিকটা অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না।
টুকলু ভেবে-চিন্তে বলল, “দাঁড়া, দেখি!” বলে বালতি লাগানো কলটা ঠেলেঠুলে একেবারে গর্তের মুখের কাছে নিয়ে এল। এনে চাকা ঘোরাতে লাগল। দুটো বালতিই কেমন নাগরদোলার মতন দুলতে দুলতে ওপরে উঠে, আবার নীচে নেমে এল।
গণেশ বলল, “এই বালতি করে নিশ্চয় চিনি, দুধ ঢালে ওই গর্তে!”
জিতু বলল, “ভেরি সিমপল। এবার বুঝতে পারছি। চিনি, দুধ, কোকো সব ওই বালতি করে গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।”
পাপিয়া গর্তের মুখটা দেখতে দেখতে বলল, “ভেতরে গিয়ে কী হয় রে?”
কী হয় সেটা অবশ্য কারও জানা ছিল না। তবে গণেশের মনে হল, দুধ, চিনি, কোকো সব ওই গোল মতন গর্তে ফেলে দেবার পর নিশ্চয় কোনও যন্ত্র দিয়ে গুলে দেওয়া হয়। তা না হয় হল, কিন্তু জল ছাড়া গুলবে কেমন করে?
টুকলু এ-পাশ ও-পাশ ঘুরঘুর করতে লাগল। এ-যন্ত্র দেখছে, সে-যন্ত্রের হাতল টিপছে। মেওয়া অকারণে আখমাড়াই কলের মতন যন্ত্রটার বিরাট চাকাটা ঘোরাতে লাগল। জিতু বলল, “কী করবি গনশু? চল ফিরে যাই। মটকু-দারোয়ান যদি ফিরে আসে ধরা পড়ে যাব।”
গণেশ বলল, “দাঁড়া।” বলে টুকলুকে; ডাকল। “টুকলু?” টুকলু আড়াল থেকে বলল, “কী বলছিস?”
“এদিকে আয়।”
“যাচ্ছি!”
টুকলু একটা স্লেটের মতন জিনিস নিয়ে এগিয়ে এল। বলল, “এতে সব লেখা আছে।”
জিতুরা ঝুঁকে পড়ল দেখতে।
স্লেটের মতন দেখতে একটা পেস্ট-বোর্ড। তাতে পরপর এক দুই করে লেখা আছে
ক।। যন্ত্রপাতি সাবধানে নাড়াচাড়া করিবে।
খ।। চিনি, কোকো, দুধে হাত লাগাইবে না।
গ।। সব কাজে মাপ করা হাতা, বালতি ব্যবহার করিবে।
ঘ।। দুই এক তিন, তিন এক দুই মাপে জিনিস ঢালিবে। প্রথম মাপে দুধ দুই, এক চিনি, তিন কোকো; দ্বিতীয় মাপে দুধ তিন, চিনি এক, কোকো দুই। ইহা প্রথমে বালতিতে ঢালিবে। বালতি এক ও বালতি দুই নম্বরে।
ঙ।। দুইটি বালতি পূর্ণ হইলে পরপর গোল ডাব্বায় ঢালিবে।
চ।। প্রতি বালতি পাঁচ-পাঁচ হিসাবে ঢালিয়া চার নম্বর গিয়ার টানিবে।
ছ।। দশ মিনিট অপেক্ষা করিয়া সাত নম্বর গিয়ার নীচে নামাইবে। নয় নম্বর
ঠাণ্ডি যন্ত্র। হাত দিবে না।
জ।। তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করিবে।
টুকলু জোরে জোরে লেখাগুলো পড়ল। মন দিয়ে শুনল গণেশরা।
পড়া শেষ হলে মেওয়া দু’হাত তুলে নাচতে-নাচতে বলল, “জয় কালীমাতা কি জয়! টুকলু তুই বাহাদুর।”
গণেশ পার্টি লিডার। সে টুকলুর হাত থেকে লেখাটা নিয়ে নিল। বলল, “আমি বলছি, তোরা লেগে যা। জিতু আর মেওয়া দুধ, চিনি, কোকো ঢালবে। টুকলু তুই বালতির মাপ দেখবি। পাপিয়া তুই হাতা দিবি আর হাতার মাপ গুনবি।”
পাপিয়া বলল, “আমার সর্দি হয়েছে না!”
“হোক। সর্দি কুকুর-বেড়ালেরও হয়।”
“আমি কুকুর-বেড়াল?”
“তুই খুকু। যা বলছি কর নয়তো গাঁট্টা খাবি। সবাই কাজ করবে আর তুই দাঁড়িয়ে থাকবি। কী সেলফিশ রে!”
“তুই কী করবি?” পাপিয়া চটেমটে বলল।
“আমি হুকুম করব।”
ততক্ষণে মেওয়া, জিতু, বস্তাগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়েছে। পাপিয়া আর ঝগড়া করল না। করে লাভ নেই।
টুকলু বালতির মাপ করছিল, পাপিয়া এক হাতে তার বিউটিকে আগলাচ্ছে, অন্য হাতে এগিয়ে দিচ্ছে।
এক-একটা বালতি ভরতি হচ্ছে আর আখমাড়াই কলের মতন যন্ত্র দিয়ে বালতির জিনিসগুলো গর্তে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ বালতি তো নয়, পাঁচ বালতি এক নম্বরের, পাঁচ বালতি দু’নম্বরের। মোট দশ বালতি। বালতিগুলোও কম নয়। হাত ব্যথা হয়ে গেল মেওয়া আর জিতুর।
বালতির কাজ শেষ হলে, গণেশ বলল, “টুকলু চার নম্বর গিয়ার।”
টুকলু খুঁজে খুঁজে একটা হাতলঅলা যন্ত্র বার করল। লেখা আছে চার নম্বর। হাতলটা উঁচুতে ছিল, নীচের দিকে নামাতে হবে। কী শক্ত রে বাবা! টুকলু প্রায় হাতল ধরে ঝুলে পড়ল।
একটু পরেই কেমন এক শব্দ শোনা যেতে লাগল গর্তের মধ্যে থেকে। গণেশরা ছুটে গিয়ে গর্তের সামনে ঝুঁকে পড়ল।
মেওয়া বলল, “জল সাপ্লাই হচ্ছে!”
“জল?”
মেওয়া নিজেও কম অবাক হয়নি। খানিকটা আগে সে এই ঘরের বাইরে যে কল দেখেছিল তাতে একটু জল পড়ল সুতোর মতন, তারপর বন্ধ হয়ে গেল। এ-জল কোথা থেকে আসছে?
“আজব বাত রে।” মেওয়া বলল, “কাঁহা সে জল পড়ছে।”
জিতু বলল, “ভেতরে পাইপ আছে কলের। জল পড়ছে।”
গণেশ বলল, “জিনিসগুলো ভিজছে, বুঝছিস না? সুরকি মেশাইয়ের মতন হবে।”
টুকলু বলল, “কত মিনিট জল পড়বে?”
গণেশ লেখা দেখে বলল, “দশ মিনিট।”
হাতে ঘড়ি নেই। আন্দাজে দশ মিনিট কাটাতে হল।
“টুকলু, চার নম্বর বন্ধ করে দে। দিয়ে সাত নম্বর টানবি।”
মেওয়া বলল, “সাত নম্বর কোনটা? লম্বা ডান্ডাঅলা ? ”
টুকলু সাত নম্বর গিয়ার খুঁজতে গেল।
খুঁজে খুঁজে যেটা বার করল সেটা একেবারে রেলের পয়েন্টেস ম্যানদের লাইন বদলাবার মতন লম্বা হাতলঅলা যন্ত্র। যন্ত্রটা একা তার পক্ষে টানা সম্ভব হল না।
মেওয়া গেল হাত লাগাতে।
হাত লাগালে কী হবে! ডান্ডাটা নড়ে না, চড়ে না।
টুকলু আর মেওয়ার কপালে শীতের দিনেও ঘাম জমে গেল।
টুকলু বলল, “গনশা, জিতু, এদিকে আয়। হাত লাগা। আমরা পারছি না।”
গণেশ আর জিতু এগিয়ে গেল।
চারজনে টান মেরেও যে ডান্ডাটা টানা যাচ্ছে না! কী শক্ত রে বাবা!
মেওয়া বলল, “দাঁড়া! একসঙ্গে জোর লাগাবি! রেডি।…নে, মারো জোয়ান হেঁইসা, টানো জোয়ান হেঁইসা, লাগো জোয়ান হেঁইসা, আর থোড়া হেঁইসা…।”
ডান্ডাটার সঙ্গে যেন স্প্রিং দেওয়া ছিল, হঠাৎ ছিটকে উঠে ওপরে চলে এল। গণেশরা পড়ে গেল মেঝেতে। আর সঙ্গে-সঙ্গে কী যে হল, অদ্ভুত এক শব্দ হতে লাগল, কাঁপতে লাগল মেঝে, ভূমিকম্প নাকি?
ভূমিকম্প, না ভূমিকম্প নয় বোঝাবার আগেই ওদিকে এক কান্ড হল। বিউটি ভয় পেয়ে পাপিয়ার কোল থেকে পালাতে যাচ্ছিল। পালাতে গিয়ে একেবারে গর্তের মধ্যে। পাপিয়া চিৎকার করে উঠল। বোধহয় বিউটিকে ধরতে গিয়েছিল, চোখের পলকে সেও গর্তের মধ্যে চলে গেল। অদৃশ্য।
গণেশরা ভালো করে কিছু বোঝবার আগেই দেখল, পাপিয়া নেই, তার কুকুরও নেই। মেঝের তলায় গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে, কাঁপছে সব।
কোনওরকমে একটু হুঁশ হতেই গণেশ আর জিতু ছুটে গেল গতটার দিকে। ঝুঁকে পড়ল। কিছুই দেখা যায় না। অন্ধকার। শুধু একটা শব্দ হচ্ছে গুড়গুড়।
গণেশ চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “পাপিয়া, পপি, পাপিয়া!”
কোনও সাড়া নেই পাপিয়ার।
و
গণেশের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল! সর্বনাশ! এ কী হল।
জিতুর খেয়াল হল, নীচে মেশিনটা চলছে। সে চিৎকার করে টুলুদের বলল, “শিগগির বন্ধ কর। পাপিয়া নীচে পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ওটা তুলে দে…।”
ব্যাপারটা টুকলুরাও দেখেছিল। মেওয়া লাফ মেরে উঠে ডান্ডা ধরল। জিতু গিয়ে হাত লাগাল। প্রাণপণে টানতে লাগল। ডান্ডা উঠে গেল। শব্দটাও আস্তে-আস্তে কমে এল। বন্ধ হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। আর শব্দ নেই, কাঁপুনি নেই ।
গণেশের মুখ শুকিয়ে আমসি। বুক ধড়ফড় করছে। কী হবে পাপিয়ার? কোথায় চলে গেল সে?
টুকলু, জিতু, মেওয়াও ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাদেরও বুক কাঁপছে। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে।
গণেশ কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, “শিগগির চল, নীচে দেখি। পাপিয়ার কিছু হলে আমাদের গায়ের ছাল থাকবে না ।”
ছাল থাকা তো সামান্য কথা পাপিয়াকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরে যেতে না পারলে আজ যে কী হবে, কে জানে!
চারজনে ছুটতে ছুটতে ঘরের বাইরে এল। করিডর ধরে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে একেবারে নীচে।
শীতের দুপুর ফুরিয়ে বিকেল হয়ে আসছে। আলো মরে যাচ্ছিল। উত্তরে বাতাস বাড়ছে।
জিতু বলল, “ওদিকে চল। ওপাশটা আগে দেখি।”
ছুটতে ছুটতে চারজনে ঘরের বাঁ পাশটা দেখতে ছুটল।
একেবারে ভোঁভা। কিচ্ছু নেই। টুকলু পাপিয়াকে ডাকতে লাগল। কোনও সাড়া পাওয়া গেল না ।
মেওয়া বলল, “তাজ্জব বাত! যাবে কোথায়?”
জিতু বলল, “গতটার একটা মুখ থাকবে তো, বাইরে আসতে হবে। চল ওদিকটায় দেখি!”
গণেশের মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠতে লাগল। সে লিডার। তার দলের একজনের কিছু হলে গলায় দড়ি দিতে হবে। পাপিয়াটার হল কী? গেল কোথায় সে?
ছয়
একবার এ-দিক একবার ও-দিক ছোটাছুটি করতে করতে গণেশের মনে হল, ওই যে যন্ত্রটা বিচ্ছিরি শব্দ করে চলছিল, ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, ওই যন্ত্রটা কি পাপিয়াকে পিষে ফেলেছে? গম পেষাই যন্ত্র গণেশরা দেখেছে। এক মুখে গমের দানা দাও, অন্য মুখ থেকে পেষাই আটা হয়ে বেরিয়ে আসে। পাপিয়ার কি সেই অবস্থা…!
কথাটা আর ভাবতে পারল না গণেশ, ভয়ে বুক-হাত-পা বরফ হয়ে গেল। আর কেঁদে ফেলল বেচারি !
জিতু বলল, “কাঁদছিস কেন?”
গণেশ কথা বলবে কি কেঁদেই মরছে। গলা দিয়ে আর পরিষ্কার শব্দ বেরোচ্ছে না। ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, “পাপিয়া পেষাই হয়ে গেছে।”
পেষাই হয়ে গেছে? জিতুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, কাঁপতে লগল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কে—কেমন করে জানলি?”
“গম পেষাই…।”
টুকলু বলল, “এটা কি আটাকল?…তোরা বোকার মতন কথা বলিস না। ওদিকে চল, দেখি।”
নীচের ব্যাপার যেন গোলক ধাঁধা। সাফসুফ জায়গা কম, নয়তো এখানে-ওখানে ছোট-ছোট পাঁচিল, বড়-বড় জালতির খাঁচা, গোল মতন কাঠের টব। একপাশে একটা মোটাসোটা পাইপ নালায় গিয়ে পড়েছে।
মেওয়া বলল, “খাড়া হয়ে থাকলে কী হবে, চল” আবার চারজনে ছুটতে লাগল।
আলো দেখতে দেখতে মরে আসছে। আর একটু পরেই ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসবে। মটকু-দরোয়ান ফিরে আসবে কারখানায়। সন্ধেবেলায় তো ভেড়ার লড়াই হয় না। মটকু ফিরে এসে ওদের দেখতে পেলে যে কী হবে কে জানে !
গণেশ যেন শেষবারের মতন চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, “পাপিয়া পাপিয়া—পপি…!”
উত্তর-দক্ষিণ, পুব-পশ্চিম সব দিকই তো খোঁজা হয়ে গেল, কোথায় পাপিয়া? গণেশের চোখে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে উঠল অস্পষ্টভাবে। মামিমা–পাপিয়ার মা, মামাবাবু, গণেশের বাবা, কাকা, পাড়ার লোকজন, হাতে টর্চ, লণ্ঠন, কোদাল শাবল, সব যেন এখানে এসে ভিড় করেছে। গিজগিজ করছে লোক। সেপাই পর্যন্ত এসে গেছে। মামিমা, মামাবাবু কাঁদছেন।
কাকা গণেশের চুলের মুঠি ধরে ফটাফট থাপ্পড় কষাচ্ছেন, “রাস্কেল, উল্লুক! কেন, এসেছিলি কেন? কোথায় গেছে পাপিয়া—বার কর।”
গণেশের মাথা টলতে লাগল। আজ তার নিস্তার নেই। তা না থাকুক, মার খেতে সে রাজি। কিন্তু পাপিয়া ফিরে আসুক। হে ভগবান, হে মা কালী, মা দুর্গা, পাপিয়াকে পাইয়ে দাও!
এমন সময় মেওয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “ভুতুয়া রে, ভুতুয়া! ওই দ্যাখ—!” জিতু টুকলু সকলেই তাকাল। দেখল, একটা জালের খাঁচার মধ্যে কী একটা পড়ে আছে—বড় মতন—বেশ বড়।
জিতুরা ছুটতে ছুটতে খাঁচার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বেশ ঝাপসা হয়ে এসেছে। ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। জিনিসটা দেখে তাদের ভয় হয়ে গেল।
টুকলুর সাহস আছে। আরও কাছে গিয়ে উঁকি মারল। দেখল। তারপর চিৎকার করে বলল, “পাপিয়া !”
“পাপিয়া!” জিতু, মেওয়া, গণেশ ঝাঁপিয়ে পড়ল খাঁচার পাশে।
হ্যাঁ, পাপিয়া! কিন্তু এ-কেমন পাপিয়া? পাপিয়াকে দেখাই যাচ্ছে না। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালচে, খয়েরি। ঠিক একটা বরফের চাঙড়ের মতন চাঙড় যেন। হাত-পা আলাদা নেই, সব গায়ের সঙ্গে এঁটে আছে। মাথা-মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু নাকের ফুটো আর চোখ দেখা যাচ্ছে।
হ্যাঁ, পাপিয়া! সাইজটা পাপিয়ার মতনই। বেঁচে আছে, না, মরে গেছে কে জানে! টুকলু ডাকল, “পাপিয়া, এই পাপিয়া!”
কোনও সাড়া নেই। কেমন করে থাকবে। মুখ কোথায় যে কথা বলবে পাপিয়া? জিতু বলল, “মেওয়া, খাঁচার দরজা আছে! খোল শিগগির।”
গণেশ এগিয়ে গিয়ে কব্জা-লাগানো তারের খাঁচার সামনের দিকটা খুলে ফেলল।
টুকলুরা টানতে টানতে বার করল পাপিয়াকে। মাটিতেই ফেলে রাখতে হল।
জিতু অবাক হয়ে বলল, “এ তো চকোলেট হয়ে গেছে রে!” বলে হাত চাটল। পাপিয়াকে টানার সময় পেছল হয়ে গেছে হাত। হাত চাটতেই চকোলেট-চকোলেট লাগল!
গণেশ বলল, “বলিস কী! পাপিয়া চকোলেট হয়ে বেরিয়ে এসেছে! বেঁচে আছে তো?”
টুকলু আর মেওয়া ততক্ষণে দু’হাতে খামচা-খামচা করে পাপিয়ার মুখ পরিষ্কার করতে লাগল।
চোখ, গাল, নাক, মুখ থেকে চকোলেটের নরম আবরণটা তুলে ফেলতেই পাপিয়ার মুখ দেখা গেল।
গণেশ বলল, “তুই বেঁচে আছিস?”
হাঁপাতে হাঁপাতে মিনমিনে গলায় পাপিয়া বলল, “আছি।” বলে কাঁদতে লাগল। টুকলু বলল, “জিতে, গনশা ও বসতে-দাঁড়াতে পারবে না। সলিড হয়ে গেছে রে! চকোলেটের পুরু কোটিংটা পরিষ্কার করতে হবে। হাত লাগা!”
হাত লাগল। কিন্তু কত আর পরিষ্কার করা যায়!
গরম জামা, প্যান্ট, চুল ঘাড় সবই ভর্তি থিকথিকে চকোলেটে। খানিকটা পরিষ্কার হল।
টেনেটুনে ওরা দাঁড় করাল পাপিয়াকে। হাত পিছলে যাচ্ছে। মঝে-মাঝে গণেশরা হাত চোট নিচ্ছিল। আর খানিকটা পড়ে থাকলে পাপিয়া চকোলেট হয়ে জমে যেতে পারত, শক্ত হয়ে যেত। এখন খানিকটা নরম হয়ে আছে।
পাপিয়া কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, “আমার বিউটি?”
“নিকুচি করেছে তোর বিউটির!…তুই যা করলি আমাদের! আমরা ভাবলাম তুই মরে গিয়েছিস!”
পাপিয়া বলল, “আমার বিউটিকে খুঁজে দে। বিউটিকে না নিয়ে আমি বাড়ি যাব না !”
গণেশ খেপে গিয়ে বলল, “বাড়ি যাবি কী! তোকে এখন ওই টিউবয়লেলের কাছে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে মাথায় জল ঢালব! এ-ভাবে তুই বাড়ি যাবি! তারপর আমরা মরি!” পাপিয়া কাঁদতে লাগল। বিউটিকে না নিয়ে সে যাবে না বাড়িতে। আর এই শীতে তার মাথায়-গায়ে জল ঢাললে সে নির্ঘাত মরে যাবে। তার অত সর্দি, তার ওপর এই অবেলায় জল ঘাঁটলে সে বাঁচবে!
জিতু বলল, “তোর বিউটিকে আমরা দেখছি! তোর মতন ধেড়েকে যখন পাওয়া গেছে—ওই নেড়িটাকেও পাওয়া যাবে। তুই যা! ভূতের মতন চেহারা নিয়ে বাড়ি গেলে মার খেয়ে মরে যাবি। একটু পরিষ্কার হয়ে নিগে যা ! ”
গণেশ টান মেরে নিয়ে চলল পাপিয়াকে। টুকলুও চলল।
জিতু আর মেওয়া বিউটিকে খুঁজতে লাগল ।
টিউবওয়েলের সামনে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপতে-কাঁপতে পাপিয়া যখন চোখ-মুখ, মাথার চুল পরিষ্কার করছে। গণেশরা জল তুলে দিচ্ছে হ্যান্ডেল মেরে, কোত্থেকে মটকু-দরোয়ান এসে হাজির। হাতে গামছা গণেশদের মুখ শুকিয়ে গেল।
মটকু-দরোয়ান কাছে এসে দেখল ওদের, “কী হল রে, খুকি?”
খুকি তখন হিহি করে কাঁপছে। তার সোয়েটার, প্যান্ট ভিজে গেছে, মাথার চুল গিয়েছে ভিজে। উত্তুরে বাতাস দিচ্ছে হুহু করে।
গণেশ ভয়ে ভয়ে বলল, “দরোয়ানজি, আমরা কারখানা দেখতে এসেছিলাম!” “হ্যাঁ-হ্যাঁ! উ তো আমি জানি।”
“এই খোকি পড়ে গিয়েছিল।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওভি আমি জানি।…এ খোকি, গামছা লে—মুছ লে! বহুত জাড়া। তোর নিমনি হবে রে খোকি! ঘর গিয়ে গরম দুধ খাবি। গরম তেল লাগাবি হাতমে, পা-মে।”
পাপিয়া গামছাটা নিল। শুকনো গামছা ।
মটকু-দরোয়ান বলল, “তোরা যব এসেছিস, হামি দেখেছি। তোরা মিশিন-ঘরমে গিয়েছিস—হামি জানি। তোরা মিশিন চালু করেছিস—উভি জানি।…এ গনশু, মিশিন ঠিক আছে না?”
ঢোঁক গিলে গণেশ বলল, “ঠিক আছে।”
“এক গলতি আছে,” মটকু বলল, আভি মিশিন থেকে ছোটা-ছোটা মাল আসছে না। ডাব্বা কাম করছে না। ডাব্বা কাম করলে বাজারের মাফিক ছোটা-ছোটা চলুস পাবি। লালাবাবু কলকাত্তা গিয়েছে, ডাব্বা মিস্ত্রি আনতে।”
টুকলু বলল, “গণশা, ডাব্বা মিস্ত্রি এলে পাপিয়া কাটিং হয়ে যেত। খুব বেঁচে গিয়েছি রে।”
মটকু বলল, “তু কী বললি রে?”
টুকলু বলল, “না দরোয়ানজি, বললাম, চকলুস বড় হলেই ভালো !”
“তুই গাধা আছিস! চকলুস বড়া হলে কোই খায় রে! কুলফি খাস তুই?” “হ্যাঁ।”
“তো বাস! ওই মাফ-মতন চকলুস হবে।”
এমন সময় জিতু আর মেওয়ার গলা শোনা গেল। ওরা কাছে এল না। মটকুকে দেখতে পেয়েছিল। দুর থেকেই তারা বলল, “আমরা যাচ্ছি, তোরা আয়। নেড়িকে পেয়েছি।” বলে দুজনেই ফটকের দিকে ছুটতে লাগল।
মটকু ওদের দেখল। তারপর পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই খোকি! ঘর যা!…তোর বোখার হবে।…আর শুন রে খোকি, লালাবাবু মিশিন ঠিক করলে চলে আসবি তোরা। আচ্ছা চকলুস খাবি। আব যা।”
শীতে কাঁপতে-কাঁপতে, কাঁদতে-কাঁদতে পাপিয়ারা যখন বাড়ি ফিরছে, গণেশ বলল, “তুই আর আমাদের সঙ্গে আসবি না, পপি! কেঁদে-কেঁদেই মরে গেলি!”
জিতু বলল, “তুই কত বড় চকলুস হয়েছিলি, পাপিয়া! ভেবে দ্যাখ এত বড় চকলুস দেখেছিস জীবনে?”
পাপিয়ার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল। বলল, “মা আমায় মেরে ফেলবে। আমার জ্বর হবে। জ্বর হলে আমি মরে যাব।”
গণেশ বলল, “মরেই যা আর বেঁচেই থাক আর তোকে আমাদের সঙ্গে আনব না। তোর জন্যে আমরাই মরে যাচ্ছিলাম।”
পাপিয়া ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এদের সঙ্গে সেও আর আসবে না। বয়ে গেছে আসতে। যদি সে সত্যিই চকলুস হয়ে যেত—কী হতো তা হলে।
সমাপ্ত\
