বর্মিমাছি ও একটি নতুন বিষ – বিমল কর
বর্মিমাছি ও একটি নতুন বিষ
এক
চন্দন ঘরে আসতেই কিকিরা বললেন, “এই যে চাঁদু, এস। তোমার কথাই আমরা বলাবলি করছিলাম।”
কিকিরা তাঁর নিজের জায়গায় বসে কোমরে গরম জলের সেঁক দিচ্ছিলেন। এবারে বেশ শীত পড়ছে। তার ওপর দিন দুই হঠাৎ দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। কিকিরা রোগাসোগা মানুষ, হালে ব্যথা-বেদনায় কাবু হয়ে পড়ছেন মাঝেসাজে। চন্দন বলেছে, বাত। স্যারের চৌরঙ্গি বাত হয়েছে। ঠাট্টা করেই বলা। কিকিরা চৌরঙ্গি বাত ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি। বলেছেন, তোমার ডাক্তারি রাখ হে—চৌরঙ্গি বাত! কে বলেছে চৌরঙ্গি! এ হল ফিরিঙ্গি বাত। আমাদের ফ্যামিলিতে তিন রকম বাত হয় ঠাকুরদার ছিল ক্লাসিকাল বাত, বনেদি ব্যাপার। আমার বাবার ছিল, বর্ষা বাত, বর্ষায় কাত করে দিত। আমায় ফিরিঙ্গিতে ধরেছে।
যে বাতই হোক, আজ চার-পাঁচ দিন হল, কিকিরা কোমরের দিকে হাড়ে বেশ ব্যথা নিয়ে বসে আছেন বাড়িতে। ওষুধ খেতে চাইছিলেন না, বলছিলেন, রসুন শুরু করে দিয়েছি, সেরে যাবে। চন্দন জোর করে ওষুধ খাইয়েছে। এখন ব্যাথা অনেকটাই কম । কিকিরা গরমজলের ব্যাগ কোমরে দিয়ে বসে আছেন, আর তারাপদ কাছাকাছি বসে চা খাচ্ছিল।
চন্দন কিকিরাকে দেখল। তারপর তারাপদকে। কিকিরা বলল, “আমার কথা বলাবলি করছিলেন—বেশ করছিলেন। এদিকে আমিও আপনার কথা ভাবতে ভাবতে আসছি।”
“আরে সেই ভদ্রলোককে তো পুলিস নাজেহাল করে ছাড়ছে। হয়তো অ্যারেস্ট করেই নিয়ে যেত, নেহাত ধরাকরার লোক আছে বলে এখনও নেয়নি। তবে নেবে।” কিকিরা বললেন, “সেই কেমিস্ট ভদ্রলোক। পরিমল মুখুজ্যে! কেন, আবার কী হল?”
“কেমন করে জানব বলুন! পুলিস এনকোয়ারি করে কী পাচ্ছে না-পাচ্ছে আমায় জানাবে নাকি!”
তারাপদ বলল, “চাঁদু, তুই এর মধ্যে নাক গলাস না। পুলিস ছুঁলে বিশ ঘা।” “রাখ তোর পুলিস! একজন নিরীহ নিরপরাধ ভদ্র মানুষকে নিয়ে এত ঝামেলা করার কী আছে!”
“নিরীহ নিরপরাধ তুই জানলি কেমন করে?”
“ভদ্রলোককে আমি চিনি। আলাপ ছিল। ডক্টর মুখার্জির মতন নিরীহ মানুষ কখনওই ক্রিমিন্যাল হতে পারেন না। কেনই বা হবেন। ওঁর মোটিভ কী থাকবে যে, নিজের ছোট ভাইকে মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন! ছোট ভাইটা একটা বাঁদর। হিপিমার্কা ড্রেস, কাঁধ পর্যন্ত চুল, রাস্কেল ফিল্মের প্লেব্যাক সিংগার হবে বলে চায়ের দোকানে বসে বসে হিন্দি গান গায়। একেবারে বাজে বকা ছেলে।”
কিকিরা বললেন, “কেমন আছে ছেলেটা?”
“নার্সিং হোমে আছে। ক্রাইসিস কেটে গেছে শুনেছি।”
“কথা বলতে পারছে?”
“না। গলা বন্ধ হয়ে আছে। আওয়াজ বেরুচ্ছে—কিন্তু কথা বলতে পারছে না। হাত-পায়ে সাড় ফিরে পায়নি এখনও।”
“ক’দিন হল?”
“তা দিন তিন-চার।”
“ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার দেখা হয়?”
“আজই হয়েছে। বিকেলেই গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই আসছি।”
“কী বললেন ভদ্রলোক?”
“কী আর বলবেন! একেবারে চুপচাপ। চোখ-মুখ বসে গিয়েছে। মাথার চুল রুক্ষ। চোখের তলায় কালি পড়েছে! কেমন একটা হতভম্ব ভাব। ঘটনায় জোর আঘাত পেয়েছেন।”
তারাপদ বলল, “উনি কিছু বললেন তোকে?”
“না।”
“তবে?”
“বলার অবস্থা ওঁর নেই। বড় করুণ চোখ করে তাকিয়ে থাকেন। ওরই মধ্যে পুলিসের হায়রানির কথা সামান্য বললেন।”
তারাপদ কিকিরার দিকে তাকাল।
কিকিরা কী যেন ভাবছিলেন। চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “চাঁদু, মুখুজ্যে তোমার চেনা লোক বলছ! পাড়ার লোক!”
“হ্যাঁ। আমাদের মেডিক্যাল মেসের গলিতেই থাকেন।” “কতটা তফাতে?”
“সাত-আটটা বাড়ির তফাতে।”
“তোমার সঙ্গে মুখে আলাপ? না, ভালো আলাপ?”
“মোটামুটি আলাপ। একবার ওঁর হাত ভেঙেছিল রাস্তায় পড়ে গিয়ে। আমি ওঁকে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এক্সরে, প্লাস্টার করিয়ে দিই। ভদ্রলোক তখন থেকেই আমাকে একটু খাতির দেখান।”
বগলা এসে চা দিয়ে গেল চন্দনকে।
শীতের দিন। সন্ধে সাতটাও বাজেনি। তবু মনে হচ্ছে, রাত হয়ে এল।
কিকিরা বললেন, “ভদ্রলোক কেমিস্ট বলছিলে না সেদিন?”
“হ্যাঁ। ডক্টর মুখার্জি।”
“উনি কোথায় আছেন?
“পেনফিল্ড রিসার্চ ল্যাবোরেটারি অ্যান্ড কেমিক্যালস-এ।”
“নতুন কোম্পানি?”
“একেবারে নতুন নয়। বছর চারেকের কোম্পানি। মানে, কলকাতায় কাজকর্ম শুরু করেছে এই বছর চারেক। এমনিতে কোম্পানি পুরনো। বিদেশি কোম্পানি। বিলেতি কোম্পানির কোলাবরেশনে ইন্ডিয়ান কোম্পানি। বম্বের দিকে ওদের কাজকর্ম শুরু হয় আট-দশ বছর আগে। সেখানে মস্ত কারখানা খুলে বসেছে। কলকাতায় সবেই শুরু বলতে পারেন।”
“এখানে ওদের কারখানা কোথায়?”
“বেহালার দিকে। ”
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “এসব তো আগেও বলেছে চাঁদু। আবার কেন, কিকিরা?”
“খেয়াল নেই হে। বুড়ো মানুষ। ভুলে যাই। নতুন করে জেনে নিলাম।…দেখো
তারা, এসব কাজে একবার নয় দশবার ব্যাপারটা ঝালাতে হয়। তা চাঁদু, এবার বলো, তোমার ডক্টর মুখার্জি আপাতত কী কাজ করছিলেন?
“বলেছি তো।”
“আবার বলো। আমি ভালো করে শুনব।”
“ডক্টর মুখার্জি হালে একটা মাছিমারা ওষুধ তৈরি করছিলেন।”
তারাপদ হালকা গলায় বলল, “মাছিমারা কেরানি শুনেছি ভাই, এ হল মাছিমারা বিজ্ঞানী।”
চন্দন বিরক্ত হয়ে বলল, “চুপ কর। বোকার মতন কথা বলিস না। জানিস, আসামের চা বাগানে একরকম মাছি দেখা দিয়েছে—ভেরি ডেনজারাস মাছি। লোক মারা যাচ্ছে মাছির দৌরাত্ম্যে। পিকিউলিয়ার সব অসুখ হচ্ছে, যার মধ্যে ভয়ংকর হল ইয়ালো ফিভরের মতন এক ধরনের অসুখ। হলে আর রক্ষা নেই। তাছাড়া মাছির কামড়ে বাচ্চা-কাচ্চার শরীরে ঘা হয়ে যাচ্ছে, সারতে চাইছে না। মারাও যাচ্ছে।”
কিকিরা বললেন, “এ মাছি এল কোথা থেকে?”
“জানি না। এসেছে কোনও ভাবে!”
“নাম কী এই মাছির?”
“নতুন জাতের মাছি, নাম কেমন করে জানা যাবে?’
তারাপদ বলল, “কিকিরা, আমি আপনাদের কথাবার্তার মানে বুঝছি না। মুখার্জির মাছিমারা ওষুধের সঙ্গে তার ভাইয়ের আত্মহত্যা করতে যাওয়ার কী সম্পর্ক?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। কথাটা ঠিকই। গরম জলের ব্যাগটা টেনে নিয়ে কোলে রাখলেন। পরখ করলেন হাত দিয়ে। জল আর গরম নেই। ডাকলেন বগলাকে।
কিকিরা বললেন, “সম্পর্ক কী তা আমিও বুঝছি না। ডক্টর মুখার্জির অপরাধটা কোথায় যে পুলিস তাঁকে জ্বালাতন করবে।”
চন্দন বলল, “ব্যাপারটা তো তাই, কোনও সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু পুলিস বলছে, যে ঘরে ছেলেটা পড়েছিল সেখানে যে রুমাল পাওয়া গিয়েছে—তাতে এরকম গন্ধ ছিল ওষুধের। রুমালটা মুখার্জির।”
“কেমন করে বুঝল রুমালটা মুখার্জির?”
“এক কোণে ইংরিজি ‘পি’ অক্ষরটা ছিল। মুখার্জি রুমাল সম্পর্কে কিছু বলছেন না। পুলিসও অদ্ভুত কারণে চেপে যাচ্ছে। অবশ্য নিয়ে গিয়েছে রুমালটা।”
“বেশ, রুমাল মুখার্জির হল। পুলিস কি বলছে যে, ওই রুমাল দিয়ে মুখার্জি তাঁর ভাইয়ের গলায় ফাঁস লাগিয়েছিলেন? না, ওই রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন? তা হলে সেটা অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেস হয়ে দাঁড়ায়। পুলিস তো তা বলছে না। তুমি বলছ চাঁদু, কেসটাকে ওরা আত্মহত্যা করার চেষ্টা বলছে। হত্যা আর আত্মহত্যার মধ্যে অনেক তফাত। আর যদি মার্ডার চার্জ আনে পুলিস, ধোপে টিকবে না। সাধারণ একটা রুমাল দিয়ে গলায় ফাঁস পরানো যায় বলে আমি শুনিনি। নাক-মুখ চেপে ধরলেও তাতে মানুষ মরে না। রুমাল তো বড় বালিশ নয় যে, শ্বাস নেবার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।”
বগলা এল।
কিকিরা গরম জলের ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন। জল পাল্টে নতুন করে গরম জল ভরে দিতে বললেন।
বগলা চলে গেল।
চন্দন বলল, “কিকিরা, আপনি কাল একবার চলুন। পরিমল মুখার্জির সঙ্গে কথা বলবেন। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাব। আমায় আপনি যতই জিজ্ঞেস করুন, আমি আপনাকে খুঁটিয়ে সব বলতে পারব না। কারণ মুখার্জি চুপচাপ মানুষ, বেশি কথা বলেন না। তার ওপর এখন ভীষণ শকড, ডিস্টার্বড। ভালো হয়, আপনি যদি আমার সঙ্গে যান। নিজে কথা বলেন।”
তারাপদ কিকিরার দিকে তাকাল। মন বোঝার চেষ্টা করল কিকিরার। সে বুঝতে পারছিল, কিকিরা সামান্য ইতস্তত করছেন। পুলিস-টুলিসের ব্যাপার তিনি পছন্দ করেন না। এক করতে গিয়ে আরেক হয়ে পড়লেই বিপদ। তবু চন্দন যখন বলছে, কিকিরা না গিয়েও পারবেন না।
“কিকিরা,” তারাপদ বলল, “চাঁদুর ব্যাপার। চলুন কাল থেকে লেগে পড়া যাক।” কিকিরা তাঁর গরম মোজা, চাদর, মাফলার মায় মাথার টুপি সামলাতে সামলাতে উঠে দাঁড়লেন। বললেন, “কোমরের ব্যাথাটা যে বেকায়দায় ফেলেছে বাপু। হাঁটাহাঁটি করলে আবার বেড়ে যাবে না?”
চন্দন মাথা নাড়ল। “সে আমার ব্যাপার। বাড়লে ইনজেকসান লাগিয়ে দেব।” “সুঁই মারবে? না না, ওতে আমি নেই। বুড়ো মানুষ, এমনিতেই মরছি, তার ওপর সুঁই।”
“চলুন তাহলে।”
“বেশ, যাওয়া যাবে। তবে চাঁদু, নো হাঁটিং। গোয়িং বাই ট্যাক্সি, কামিং বাই ট্যাক্সি। ইউ পেয়িং।”
তারাপদ হেসে ফেলল। “স্যার, আপনি বিজনেস লার্নিং করছেন? বুড়ো বয়েসে আপনার বুদ্ধি দেখা দিয়েছে দেখছি।”
চন্দন বলল, “ঠিক আছে, ট্যাক্সিভাড়া আমিই দেব।” মুখে বলল বটে, তবে ভালো করেই জানত, কিকিরাই বরাবর গাঁটগচ্চা দেন।
দুই
পরিমল মুখার্জি মানুষটিকে সত্যিই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। প্রবল ঝড়ের মধ্যে পড়ে গাছপালা যেমন নুয়ে যায়, ভেঙে পড়ে—অনেকটা সেই রকম। ভদ্রলোকের বয়স বেশি নয়, চল্লিশের সামান্য এপারে হয়তো। লম্বা কালো ছিপছিপে চেহারা। এরই মধ্যে মাথার পাশের কিছু চুল পেকে এসেছে। মুখে সামন্য দাড়ি। চোখে চশমা। উনি কথা বলেন নিচু গলায়, থেমে থেমে। কোনও কথাই প্রায় শেষ করেন না, মাঝখানে থেমে যান। নিরীহ বলেই মনে হয় তাঁকে।
চন্দনের সঙ্গে কিকিরা আর তারাপদকে দেখে ভদ্রলোক প্রথমটায় অস্বস্তি বোধ করছিলেন। হয়ত এই নতুন মানুষগুলোকে বিশ্বাসও করতে পারছিলেন না। তবে চন্দন আগেভাগে বলে রাখায় ভদ্রলোক খানিকটা সহজ হবার চেষ্টা করছিলেন।
বিকেলের দিকেই এসেছিল চন্দনরা। নিচের তলায় একেবারে কোনার ঘরে গিয়ে বসল সকলে।
পরিমল বললেন, “বসুন আপনারা। চায়ের কথা বলে আসি।”
পরিমল চলে যাবার পর কিকিরা বললেন, “বাড়ি তো বেশ পুরনো। ভালো বাড়ি চাঁদু। সামনেও জায়গা আছে খানিকটা।”
বাড়ি পুরনো। তবে খুব পুরনো নয়। দোতলা বাড়ি। বড় নয় তেমন, মাঝারি। আসবাবপত্র পুরনোই। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে কয়েকট সার গাছ, অগোছালো বাগান, প্রায় যেন ঝোপ হয়ে আছে বাগানটা। পরিমল ফিরে এলেন।
সাধারণ পরিচয়ের পর পরিমল কিকিরাকে বললেন, “চন্দনবাবু আপনার কথা ক’দিন ধরেই বলছেন। উনি যখন বললেন তখন—” কথা শেষ করলেন না পরিমল। কিকিরা বললেন, “দেখুন স্যার, আমি গোয়েন্দা নই। ক্রিমিন্যালদের নিয়ে ওকালতি করি না। সাধারণ মানুষ আমি। একসময় ম্যাজিশিয়ান ছিলাম। কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান। এখন সেসব পাট গিয়েছে। নতুন ম্যাজিশিয়ানদের একটু-আধটু হেল্প করি। আর আমার এই দুই সাকরেদ নিয়ে জনসেবা করে বেড়াই।” বলে হাসলেন কিকিরা, “হেল্প দ্যাই নেবারস আর কি ! ”
পরিমল কথা বললেন না। দেখছিলেন কিকিরাকে।
চন্দন বলল, “ডক্টর মুখার্জি, আমাদের কিকিরার ওপর আপনি রিলাই করতে পারেন। উনি আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন বলেই আমি মনে করি।”
পরিমল বললেন, “সাহায্য!… দেখুন যদি পারেন।”
কিকিরা বলেন, “আগে আমি কয়েকটা কথা জেনে নিতে চাই, স্যার।”
“বলুন?”
“এই বাড়ি তো আপনাদের নিজের।”
“হ্যাঁ। পৈতৃক বাড়ি।”
“আপনারা ক’ভাই?”
“তিন।”
“আপনি বড়?”
“আমি বড়। আমার মেজো ভাই সরল। সে জাহাজে কাজ করে। মেরিনের লোক। তার বেশিরভাগ দিনগুলো জাহাজেই কেটে যায়। বছরে এক-আধবার বাড়ি আসে, এখানে জাহাজ ভিড়লে। আবার কখনো পুরো একটা বছর আর এলোই না।”
“আপনার বয়েস কি চল্লিশের বেশি?”
“বিয়াল্লিশ।”
“মেজ ভাই?”
“ছ’বছরের ছোট। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ।”
“ছোট ভাই?”
“বাপি আমাদের চেয়ে অনেকটাই ছোট।”
“বাপি আপনাদের ছোট ভাইয়ের নাম?”
“ডাকনাম। ভালো নাম, চঞ্চল। ওর ভালো নামটা বোধ হয় কম লোকই জানে। বন্ধু-বান্ধবরাও। বাপি বলেই ডাকে সবাই।”
“ওর বয়েস কত হবে! তিরিশ?”
“ওই বয়সই।”
“আপনাদের বাড়িতে আর কে কে আছেন?’
“মা-বাবা তো অনেক আগেই গিয়েছেন। আমার স্ত্রীও নেই। বছর তিনেক আগে দোতলার ব্যালকনির একটা রেলিং ভেঙে গিয়ে তিনি নিচে পড়ে যান। মাথায় ঘাড়ে লেগেছিল। দিন দশ-পনেরো…!”
কিকিরা বুঝতে পারলেন। দশ-পনেরো দিন যমে-মানুষে লড়ালড়ি হয়েছিল। তারপর পরিমলের স্ত্রী মারা যান। দুঃখই হল কিকিরার।তারাপদ হঠাৎ বলল, “ডক্টর মুখার্জি, আপনার মেজ ভাইয়ের স্ত্রী?”
“হ্যাঁ, তার স্ত্রী আছে। তবে সে এবাড়িতে একটানা থাকে না। থাকতে পারে না। মিনতি বাইরে একটা মেয়েদের কলেজে পড়ায়। সেখানেই থাকে। হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট। ছুটি-ছাটায় সে এখানে আসে। থাকে। তার বাপের বাড়ি দুর্গাপুরে। সেখানেও যায়।”
“আপনাদের এ-বাড়ি দেখাশোনা করে কে?”
“এক পিসিমা আছেন। দূর-সম্পর্কের আত্মীয়া। আর কাজকর্ম করার লোক আছে জনা দুয়েক।”
কিকিরা পকেট থেকে তাঁর সরু চুরুট বার করে ধরালেন। অল্পক্ষণ সবাই চুপচাপ। অন্ধকার হয়ে এসেছে বলে বাতি জ্বালিয়ে দিলেন পরিমল।
“ডক্টর মুখার্জি…”
“প্লিজ! ডক্টর বাদ দিন। এমন ডক্টর হাজার কয়েক আছে। আমাকে মুখার্জি বা পরিমলবাবু বলেই ডাকবেন।”
চন্দন হেসে বলল, “তা ঠিকই। পরিমল বলাই ভালো। পরিমলবাবু।”
কিকিরা হাসিমুখে ঘাড় কাত করলেন। বললেন, “আমারও তাই পছন্দ, স্যার। নাম থাকতে লেজুড় ধরে টানাটানি কেন!… তা পরিমলবাবু, এবার আসল কথা হোক। কাজের কথা।”
পরিমল তাকিয়ে থাকলেন।
কিকিরা বললেন, “ঘটনাটা ঠিক কী ঘটেছিল? মানে, আপনার ভাই…”
পরিমল নিজের কপালের কাছটা হাত দিয়ে দেখালেন। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ। তারপর বললেন, “কী বলব বলুন! আমি নিজেই কিছু বঝুতে পারছি না। বাপি আমাকে ক্রিমিন্যাল সাজিয়ে ছাড়ল! ছিঃ ছিঃ। আমি তার বড় ভাই। বাবা চলে যাবার পর থেকে তাকে দেখছি, আজ আমি ক্রিমিন্যাল হয়ে গেলাম!” গলায় ক্ষোভ, দুঃখ, রাগ।
কিকিরা শান্তভাবে বললেন, “নিজেকে আপনি ক্রিমিন্যাল ভাবছেন কেন! আপনার নামে কি কোনও অভিযোগ আছে? পুলিস আপনাকে জ্বালাচ্ছে, হ্যারাস করছে তো কী হয়েছে! এটা তাদের অভ্যেস, পেশা। আপনাকে তো অ্যারেস্ট করেনি। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেনি এখনও।…এসব এখন ভুলে যান। কী হয়েছে, বলুন ? ”
ভেতর থেকে চা এল। একজন মাঝ-বয়েসী লোক ট্রে করে চায়ের কাপ এনেছে সাজিয়ে, প্লেটে কিছু স্ন্যাকস, চা নামিয়ে চলে গেল লোকটি। পরিমল নিজের হাতে চা এগিয়ে দিলেন।
চন্দন পরিমলকে বলল, “আপনি সব কথা খোলাখুলি বলুন কিকিরাকে। ওঁকে বিশ্বাস করে বলুন, আপনার কোনও ভয় নেই।”
পরিমল সঙ্গে সঙ্গে কথা বললেন না। কয়েক চুমুক চা খেলেন। তারপর বললেন, “ব্যাপারটা ঘটেছে গত সোমবার। ফিফটিন্থ ডিসেম্বর। পনেরো তারিখ সন্ধের পর। ধরুন রাত আটটা নাগাদ। আজ হল ঊনিশ তারিখ।”
“কী ঘটেছিল?”
“আমি সেদিন ওই সময় দোতলায় নিজের ঘরে বসে চিঠি লিখছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার ঘরের ফোনটা কেমন কিরকির কিরকির আওয়াজ করছে। মানে, রিং হচ্ছে না, অথচ বোঝা যাচ্ছে বাইরে থেকে কেউ ফোন করার চেষ্টা করছে। এরকম মাঝে মাঝেই হয়। নিচের তলায় আমাদের যে প্যারলাল লাইনটা আছে তার রিসিভার যন্তরটা ঠিক মতন রাখা না থাকলে—এই রকম হয়। ওপরে ঠিক মতন রিং হয় না। ….আমি কেদারকে ডাকলাম। কেদার এ-বাড়ির কাজের লোক। তার কোনও সাড়া পেলাম না। …ওপরের ফোনটা কিরকির শব্দ করতে করতে থেমে গেল। একটু পরে আবার। বার-তিনেক এই রকম হবার পর আমি উঠে পড়লাম। ভাবলাম কোনও আর্জেন্ট ফোন। হয়তো আমাদের অফিসের কোনও কর্তা ফোন করছে।”
পরিমল থেমে গলেন। অসহায়ভাবে তাকালেন কয়েক পলক। নিজের জামার পকেট হাতড়ে সিগারেট আর লাইটার বার করলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট বার করতে গিয়ে কী মনে পড়ে গেল, চন্দনদের দিকে এগিয়ে দিলেন প্যাকেটটা। “নিন, ডাক্তার।”
চন্দন আর তারপদ সিগারেট নিল। কিকিরার হাতে তাঁর চুরুট।
কিকিরা পরিমলকে বললেন, “আপনি তারপর নিচে গেলেন ?” “হ্যাঁ। নিচে গেলাম।”
“বলুন—কী হল বলুন ?”
“নিচে গিয়ে দেখি, যা ভেবেছিলাম তাই। ফোনের রিসিভার ঠিকভাবে রাখা নেই । সেটা ঠিক করে রাখলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন। রিসিভার তুলতেই বাপির কোনও বন্ধুর গলা পেলাম। তাকে ডাকছে। আমি একটু বিরক্তই হয়েছিলাম। বাপিকে কোনও দিন-রাত ন’টা-দশটার আগে বাড়িতে পাওয়া যায় না। ওর বন্ধুকে বললাম, পরে ফোন করতে। বলে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে সিঁড়ির কাছে গিয়েছি, হঠাৎ মনে হল, নিচে আমার পারসোন্যাল ছোট্ট ল্যাবরেটারি ঘরের পাশের ঘর থেকে কেমন একটা শব্দ আসছে।”
“আপনার নিজের ল্যাবরেটারি আছে এ-বাড়িতে?”
“আছে। তবে সেটা খুবই ছোট্ট, সামান্য। আমি বেশিরভাগ সময়ে সেখানে বসে পড়াশোনা বা নিজের টুকটাক কাজ করি। আসল কাজ তো আমাদের অফিসের ল্যাবরেটারিতে। বেহালার কারখানায়।”
“কী দেখলেন আপনি তারপর?”
“পাশের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। ঘর অন্ধকার। একটা গোঙানির আওয়াজ। অন্ধকারে কে যেন পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বাললাম ঘরের। দেখি, একটা ভাঙাচোরা পুরনো সোফার ওপর বাপি পড়ে আছে। তার একটা পা আর হাত মাটিতে ঝুলছে। চোখ বন্ধ। মুখ কুঁচকে গিয়েছে। নিশ্বাসপ্রশ্বাস আছে কি নেই বোঝা যায় না। গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ বেরুচ্ছে, মুখ হাঁ-করা, খানিকটা থুতু জমে আছে ঠোঁটের পাশে।”
“সঙ্গে সঙ্গে আপনি ডাক্তারকে ফোন করলেন?”
“হ্যাঁ। ডাক্তার পালকে। আমাদের পাড়ার ডাক্তার। চন্দনবাবু চেনেন তাঁকে।”
“ডাক্তার পাল এলেন? সঙ্গে সঙ্গেই ?”
“দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে। এসে দেখলেন বাপিকে। ওঁদের নার্সিং হোমে পাঠাতে বললেন ইমিডিয়েটলি।”
“কী বললেন ডাক্তার পাল?”
“বললেন, সাফোকেশান। গলা চোক হয়ে যাওয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে গিয়েছিল?”
“শ্বাসরোধ!”
“তাই বললেন।”
তারাপদ বলল, “এরকম হবার কারণ?” পরিমল মাথা নাড়লেন, “তা বলেন নি?”
“আপনি ভাইকে নার্সিং হোমে পাঠালেন ? ”
“একটুও দেরি করিনি। রাত ন’টা নাগাদ বাপিকে নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হল।” “পুলিসে খবর দিল কে?”
“নার্সিং হোম থেকেই পেয়েছিল।”
“তারা হঠাৎ খবর দিল কেন?”
“দিল বোধ হয় এই জন্যে যে, কেসটা খুব সিরিয়াস তখন। পেশেন্ট মারা যেতেও পারে। স্বাভাবিক অসুস্থতা বলে মনে হয়নি তাদের।… সন্দেহ হয়েছিল।”
“আত্মহত্যার কথাটা উঠল কেন?” কিকিরা বললেন। পরিমল চুপ। বার কয়েক সিগারেটের ধোঁয়া গিললেন। অস্বস্তি, ভয়ভাব। শেষে বলনে, “ওদের তাই মনে হয়েছিল হয়তো। আমারও মনে হয়।”
কিকিরা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন পরিমলের দিকে। “আপনার মনে হল কেন? শুধু শুধু আত্মহত্যার কথা মনে হবে? মনে হওয়ার নিশ্চয় কোনও কারণ আছে?”
চন্দন আর তারাপদ চুপ করেই জেরা শুনছিল কিকিরার।
পরিমল বলল, “আগের দিন বাপিকে আমি খুব বকাবকি করি, এমনিতেই ও আমাদের একটা প্রবলেম হয়ে গিয়েছে। ওকে কিছুতেই শোধরানো গেল না। বাজে বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, অসভ্যতা আর সিনেমায় গান গাইবার শখ নিয়ে বসে আছে, তার ওপর মাস তিনেক আগে, দশ হাজার টাকা দিয়ে এসেছে কোন সিনেমাঅলাকে। সে নাকি বাপিকে গান গাইবার চান্স দেবে।”
“দশ হাজার টাকা! পেল কোথায় এত টাকা?”
“চুরি।” “চুরি!”
“বাড়ি থেকে গয়না চুরি করেছে। আজকাল সোনার যা দাম ভরি দুই-তিন সোনার জিনিস চুরি করতে পারলে হাজার হাজার টাকা হয়ে যায়। বাপি আমার ভাইয়ের স্ত্রীর গয়না চুরি করেছিল তার ঘর থেকে।”
তারাপদ বলল, “আপনার ভাইয়ের স্ত্রী তো এখানে থাকেন না।”
“থাকে না মানে—এখন নেই। আমি আগেই বলেছি মিনতি মাঝে মাঝে ছুটি-ছাটায় আসে। এর আগে সে যখন পুজোর সময় আসে তখন বোধ হয় গয়না-টয়না পরেছিল। ফিরে যাবার সময় আর লকারে রেখে যায়নি। একটা হার বা বালা–কে আর সব সময় লকারে রাখতে ছোটে! নিজের ঘরে আলমারির মধ্যে রেখে গিয়েছিল।”
কিকিরা বললেন, “এই টাকার কথা, চুরির কথা আপনি জানলেন কেমন করে?” “টাকার কথা আমি আচমকাই শুনি। ক’দিন আগে বাপি ফোনে খুব চেঁচামেচি করছিল কার সঙ্গে যেন। গালমন্দ করছিল। তখন আমার কানে যায়—ও বলছে, দশ হাজার টাকা ও মাগনা দেয়নি। সেলামি দিয়েছে এই জন্য যে ও অন্তত দু-দুটো গান গাইবার চান্স পাবে। এখন ওকে যদি চান্স না দেওয়া হয় ও দেখে নেবে… ।”
তারাপদ বলল, “আচ্ছা! তারপর আপনি বাপিকে ধরলেন।”
“ধরতেই হল। এত টাকা ও পেল কোথায়? বাপিকে চেপে ধরতে নিজেই ও গয়না চুরির কথা বলল।”
“আপনি তখন রাগের মাথায়—”
“ভীষণ রাগ হয়ে গিয়েছিল। ওকে যা-তা বলেছি, বকেছি, এমনকী চড়ও মেরেছি—হ্যাঁ, আমি একথাও বলেছিলাম যে—ওকে আমি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব। রাগের মাথায় বলেছিলাম। বাপি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জেনেও এভাবে গালিগালাজ করিনি আগে। সেদিন করেছিলাম।”
“তার পরের দিনই ঘটনাটা ঘটে?”
“হ্যাঁ।”
“আপনার ভাইয়ের স্ত্রীকে গয়না চুরির কথা জানিয়েছেন?”
“না, এখনও জানানো হয়নি। এই সব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম।”
কিকিরা আপাতত আর কিছু বলতে চাইলেন না। মাথায় এল না। বললেন, “আজ আমরা উঠি। কাল-পরশু আবার আসব। কথা হবে। আপনি ভয় পাবেন না।”
তিন
পরের দিন কিকিরা বাড়িতেই ছিলেন।
তারাপদরা যথারীতি সন্ধের আগে আগেই এল। এসে দেখল, কিকিরা চুপ করে বসে আছেন।
“কী স্যার! চুপচাপ যে!” তারাপদ বলল।
“এই বসে আছি। এসো।”
“ব্যথা কেমন?” চন্দন বলল।
“কমছে। আজ খানিকটা এক্সারসাইজ করলাম।”
‘এক্সরসাইজ! কী সর্বনাশ!
“না হে, এ হল লাইট এক্সারসাইজ! ডাইনে-বাঁয়ে হেলে কোমর ছাড়িয়ে নেওয়া। মাসল রিল্যাক্স করা।”
“আবার যদি ফিক লেগে যেত?”
“লাগলে তুমি ছিলে।…যাকগে, খবর বল?”
“খবর তো আপনি বলবেন।”
“তুমি বাপিকে দেখতে গিয়েছিলে নার্সিং হোমে!”
“গিয়েছিলাম। এমনিতে ভালো আছে। তবে গলায় স্বর ফুটছে না। একটা আওয়াজ বেরুচ্ছে।”
“নো ইমপ্রুভমেন্ট?”
“সামান্য।”
“তা, ও তো হাতে লিখে বলতে পারে কী হয়েছিল! অনর্থক তার দাদাকে…” “হাতে লিখতে পারছে না। সাড় নেই এখনও। আঙুল কাঁপছে। তবে ওর মুখ দেখে মনে হয়, দাদার ওপর অভিমান করে দাদাকে জব্দ করতে গিয়েছিল।”
তারাপদ বলল, “পাজি ছেলে, কিকিরা। ওর মাথাটাও দাদারা খেয়েছে। বরাবর প্রশ্রয় পেয়েছে বোধ হয়। জোর করে দাদারা কিছু বলেনি কোনওদিন। আর বলবেই বা কে! এক দাদা বাইরে বাইরে ঘোরে—আরেক দাদা নিজের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। বউদিদের একজন গত হয়েছেন, অন্যজন বাইরে বাইরে থাকেন, মাঝে-সাঝে বাড়ি আসেন। কে আর শাসন করবে বাপিকে !”
কিকিরা বললেন, “চাঁদু, ঘটনাটা সোজাসুজি দেখলে এরকম। বেঁকিয়ে দেখলে খানিকটা ধাঁধা লাগে বইকি। ধরে নেওয়া গেল, এটা আত্মহত্যার ঘটনা। মানে, বাপি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। যদিও আমি বলি, বাপি আত্মহত্যা করার নাটক করেছিল। বড় ভাইকে জব্দ করবে বলে।”
তারাপদ বলল, “নাটক?”
“তা ছাড়া আবার কী! দাদার ওপর রাগ হয়েছে, অভিমান হয়েছে—জব্দ করতে হবে দাদাকে—এই মতলব নিয়ে একটা এমন কিছু করা যাতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। দাদা ভয় পাবে, বেকায়দায় পড়ে যাবে—অথচ ভাই সত্যিই মরবে না। এসব ছেলেমানুষি বুদ্ধি। কেউ খানিকটা কেরোসিন তেল খেল, কেউ ইঁদুরমারা বিষ। খেয়ে নাটক করল। এরকম অনেক দেখা যায়।”
তারাপদ বলল, “কিন্তু স্যার, বাপি কেরোসিন তেল বা ইঁদুরমারা বিষ খায়নি।” চন্দন বলল, “খাওয়ার কথাই ওঠে না। খেলে ধরা যেত।”
কিকিরা বললেন, “সেটাই তো ধাঁধা। কিছু খেল না। বাপি কোনও বিষ-টিষ খেল না মোটেই। রুমালে খানিকটা কী মাখিয়ে নিজের গালে মুখে লাগিয়েই গোঁ গোঁ করতে লাগল। দেখাবার চেষ্টা করছিল সে মারাত্মক বিষ খয়েছে। কিন্তু খায়নি।”
“ব্যাপারটা…”
“ব্যাপারটা এখানেই জটিল হয়ে যাচ্ছে। আমার তো তাই ধারণা চাঁদু। বাপি যদি জানত, যে-জিনিস রুমালে ঢেলে ও মুখে গালে মাখছে সেটা মারাত্মক বিষ—তবে সে ও জিনিস নিয়ে খেলা করত না। ওর জানা ছিল না, ব্যাপারটা আগুন নিয়ে খেলা করার মতন হয়ে যাবে।”
চন্দন মাথা নাড়ল। কথাটা ঠিকই। বলল, “কিকিরা, মুশকিল কী জানেন, ওই ঘরে কোনও বিষ-টিষ পাওয়া যায়নি। শিশি, বোতল, ক্যান, কিছুই নয়। শুধু পরিমলবাবুর রুমাল পাওয়া গেছে। আর তাতে একটা গন্ধ ছিল।”
“তোমার পরিমলবাবু কী বলছেন?”
“তিনি বলছেন, উনি কিছু জানেন না।”
“উনিই তো প্রথমে ওই ঘরটায় ঢুকেছিলেন ?” “হ্যাঁ। ওঁর চোখে পড়েনি কিছু।”
“পরিমলবাবুর আগে কি কেউ ঘরে ঢুকেছিল? যদি ঢুকে থাকে কেন ঢুকেছিল? সে কি তবে কোনও শিশি বোতল সরিয়ে নিয়েছিল? কেন সরাবে!…চাঁদু, আমার মনে হয়, পুলিস একেবরে মিছেমিছি পরিমলবাবুকে জ্বালাতন করছে না। স্বাভাবিক সন্দেহ এসে যায় ব্যাপারটায়। যে বিষ রুমালে ঢেলে গালেমুখে মাখলে এরকম মরাত্মক কাণ্ড হয় সেটা সাধারণ বিষাক্ত জিনিস নয়। কোথায় গেল সেই জিনিসটা? বাপি কেমন করে পেল সেটা? আর কেনই বা পরিমলবাবুর রুমাল পাওয়া যাবে!”
চন্দন চুপ।
তারাপদ মাথা চুলকাতে লাগল। কী ভাবতে ভাবতে বলল, “স্যার, এ যে একেবারে কেঁচো খুঁড়তে সাপ হয়ে যাচ্ছে। সত্যি তো, সেই বিষের শিশি বোতল বা অন্য কোনও রকম পাত্র গেল কোথায়?”
চন্দন কোনও কথা বলল না। সে বুঝতে পারছিল, কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে। হয়তো এই জন্যেই পুলিস আসা-যাওয়া করে পরিমলের কাছে।
কিকিরা বললেন, “চাঁদু, আমি এবার পরিমলবাবুর সঙ্গে একটু মিঠেকড়া কথা বলতে চাই। ভদ্রলোককে ঝাঁকাতে হবে। না হলে ভেতরের কথা জানা যাবে না। চলো, কাল একবার যাওয়া যাক—ও-বাড়িতে।”
চন্দন বলল, “চলুন। আপত্তি কী!”
চার
নিচে কেদারকে দেখা গেল।
চন্দনকে চিনত কেদার। হালে কিকিরাদেরও দেখেছে। চন্দনদের দেখতে পেয়ে ডাকল। “আসুন, বাবু ওপরে আছেন, খবর দিচ্ছি।”
কেদার ওদের তিনজনকে নিয়ে গিয়ে বসার ঘরে বসাল ।
“আলো জ্বেলে দেব?”
“থাক পরে জ্বেলে নেব। তুমি পরিমালবাবুকে খবর দাও।” কেদার চলে গেল।
কিকিরা বসলেন।
নিচের ফোন এই ঘরেই থাক। কিকিরা উঠে গিয়ে ফোনটা দেখলেন। পুরনো ফোন। পরিমল নিচে নেমে এই ফোন ঠিক করে রেখে—ওপরে উঠে যাবার সময় সিঁড়ির পাশের ঘর থেকে শব্দ শুনেছিলেন। তিনি তাই বলছেন। কথাটা কতদূর সত্যি কে জানে! কেদারকে জিজ্ঞেস করলে হতো, ওপর আর নিচের ফোনের মধ্যে কোনো গণ্ডগোল হয় নাকি! অবশ্য হতে পারে। টেলিফোনের ব্যাপার তো!
আজ নিচেটা একবার ভালো করে দেখবেন কিকিরা! কোথায় সিঁড়ি, কোথায় সেই ঘর, বাপি যেখানে আত্মহত্যার নাটক করতে গিয়ে মরে যেতে বসেছিল, আর কোথায় বা পরিমলের নিজস্ব ল্যাবোরেটারি!
কিকিরা ফোনের কাছ থেকে ফিরে আসতেই তারাপদ বলল, “স্যার-কি ফোনের মিস্ত্রি নাকি? কী দেখছিলেন?”
“দেখছিলাম। সব জিনিস দেখতে হয়, তারা।”
“দেখুন তবে—”
“আমাদের কালীবাবুকে চেন?”
“কে কালীবাবু?”
“কালী মজুমদার। টেলিফোন অফিসে কাজ করত। রিটায়ার করেছে বছর খানেক হল। কালীবাবু টেলিফোনের নাড়ি ধরে বলে দিতে পারতেন, ফল্ট কোথায়?”
তারাপদ হেসে ফেলল। “টেলিফোনের নাড়ি! বলেছেন বেশ!
“কালীবাবুকে একবার জিজ্ঞেস কর তো।”
“কী?”
“টেলিফোনের কথাটা, পরিমল যা বলেছেন, সত্যি কিনা?” “আপনি সন্দেহ করছেন!”
“মন খুঁত-খুঁত করছে। দেখা যাক…!”
চন্দন বলল, “কিকিরা, আমার নিজেরই এখন খারাপ লাগছে। আগে এতটা বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম সাদামাটা ব্যাপার, আপনি কেসটা হাতে নিলে সহজে মিটে যাবে।”
“আমি কি ভগবান? না, গোয়েন্দা ম্যাটিসন!”
“ম্যাটিসন, সে আবার কে?” তারাপদ বলল, “এই গোয়েন্দার নাম তো শুনিনি।” “কোথা থেকে শুনবে! ম্যাটিসন সাহেব কি আজকের লোক! পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের মানুষ। খাশ বিলেতি। সাহেবের নাককে লোকে বলত, যেন কুকুরের নাক, গন্ধ শুঁকে ক্রিমিন্যাল ধরতে পারতেন। চোখ একেবারে এক্সরে মেশিন। দারুণ দারুণ গল্প আছে সাহেবের নামে।”
“আপনি কি ম্যাটিসনের চেলা?” ঠাট্টা করে বলল তারাপদ।
“না। চোখেই দেখলাম না তো চেলা! গল্প শুনেছি।”
“তিনি এখন কোথায়?”
“নিজের দেশে চলে গিয়েছিল। বিলেতে। বুড়ো এখনও বেঁচে আছে কিনা কে জানে।”
পায়ের শব্দ পাওয়া গেল বাইরে।
কয়েক মুহূর্ত পরেই পরিমল ঘরে এলেন।
“আপনারা!…ভালোই হয়েছে। ওপরে একাই ছিলাম। ভালো লাগছিল না। কথা বলে সময় কাটানো যাবে।”
প্রায়।”
“ভাইয়ের খবর কী?”
“ইমপ্রুভ করেছে। চোখের ভাবটা আরও নরম্যাল হয়েছে। রেসপিরেশান স্বাভাবিক “কথা বলতে পারছে?”
“না। পারবে। ডাক্তাররা বলছেন, পারবে শীঘ্রি।”
“হাত-পায়ের সাড় ?”
“পা নাড়াতে পারছে। হাত তুলতে পারছে খানিকটা। তবে আঙুলে এখনও কিছু ধরতে পারছে না।”
“তবে তো অবস্থা ভালোর দিকে!”
“বিপদ কাটলেই বাঁচি। আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে চিঠি লিখে দিয়েছি আসতে। হয়তো কালই এসে পড়বে।”
কিকিরা পরিমলকে দেখতে দেখতে হঠাৎ বললেন, “পুলিশ আর আসছে না?” “কালও এসেছিল। আমি বললাম, আপনারা আমায় একটু স্বস্তিতে থাকতে দিন। ভাই তো সেরে উঠছে। আর ক’দিন অপেক্ষা করুন। ভাই আপনাকে সব কথা বলবে।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। ঠিকই তো।
পরিমল কী বলতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ কিকিরা বললেন, “স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
তাকালেন পরিমল। “কী কথা?”
“আপনি কি সেই সিনেমার লোকটি—দশ হাজার টাকা যে নিয়েছিল, তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ?”
“কার সঙ্গে! সিনেমার লোকের সঙ্গে! না। আমি কেন যোগাযোগ করব বলুন ! চিনি না জানি না।”
“এতগুলো টাকা?”
“ও জলে গিয়েছে। এ রকম আরও কত গিয়েছে কে জানে!”
“মানে, বাপির টাকা জলে ফেলার অভ্যেস ছিল?”
তা—তা নষ্ট করত বইকি! আমরা কি আর সব জানতে পারতাম!”
চন্দন বলল, “টাকা পেত কোথায়?”
পরিমল চুপ। ইতস্তত করলেন। পরে বললেন, “আমরাই দিতাম। কখনও আমি, কখনও আমার মেজোভাই সরল। সরল এখানে এসে যখন থাকত তখন বাপি দু-এক হাজার টাকা চেয়ে-চিনতে নিত। আমার কাছ থেকেও সেইভাবে নিয়েছে। তবে পাঁচ-দশ হাজার টাকা কখনও চায়নি। নেয়নি।”
কিকিরা বললেন, “দশ হাজারের ব্যাপারটা এই প্রথম?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি, আপনারা স্যার, ছোট ভাইকে বেশি আদর দিতেন? তাই না?” পরিমল যেন একটু হাসার চেষ্টা করলেন। “কী করব! মা-বাবা নেই। আমরা বড়ভাই।”
আচমকাই যেন কিছু মনে পড়ে গিয়েছে, কিকিরা একটা শব্দ করে বললেন, “ওহো, একটা কথা। টাকার কথায় আমার মনে হল। আপনি কিছু মনে করবেন না। মুখার্জি সাহেব! কথাটা হল এই যে, এই বাড়ি তো আপনাদের তিন ভাইয়ের। তিনজনেই এর মালিক। আমি শুনেছি, কলকাতায় কিছু পাকা ঘরবাড়ির ব্যবসাদার থাকে। তারা অনেক সময় বাড়ির অংশীদারদের টাকা হাওলাত দেয়, তার অংশের এক্সচেঞ্জে। মানে এক ধরনের মর্টগেজ। অংশ গচ্ছিত রেখে টাকা ধার নেওয়া।…এরকম কিছু—।”
পরিমল সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন। “না, বাপির সে সাহস হবে না। এমনিতে ও বোকা। বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা, না, ইমপসিবল।”
তারাপদ বলল, “বোকা যে তা বোঝাই যায়, নয়ত গাইবার চান্স পাবে বলে কেউ সিনেমার লোককে দশ হাজার টাকা দেয়!”
কিকিরা এবার সিগারেট চাইলেন চন্দনের কাছে।
চন্দন সিগারেট দিল।
ধীরেসুস্থে সিগারেট ধরিয়ে কিকিরা পরিমলের দিকে তাকালেন। বললেন, “বাপি সেদিন কি খাওয়ার চেষ্টা করেছিল! বা ধরুন, খাব ভেবেও ভয়ে না খেয়ে—রুমালে মাখিয়ে নিয়েছিল, নিজের নাকে-মুখে মেখেছিল, আপনি বলতে পারেন, স্যার?”
পরিমল কিকিরার চোখে চোখে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক, “না।”
“ওটা নিশ্চয় বিষ! মারাত্মক বিষ!”
“তাই মনে হয়।”
“কী ধরনের বিষ হতে পারে?”
পরিমল তাকিয়ে থাকলেন। অন্ধকার হয়ে এসেছে। উঠে পড়লেন হঠাৎ, আলো জ্বালিয়ে দিলেন ঘরের। বললেন, “আমি বলতে পারব না।”
“আচ্ছা স্যার, আপনি তো বিজ্ঞানী! আপনি কি মনে করেন, বিষ না খেয়েও, শুধু গন্ধ শুঁকে একজন মানুষের এমন হতে পারে?”
পরিমল সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন না, পরে বললেন, “দেখছি তো তাই হয়েছে। একটা কথা কী জানেন! যে-বিষই হোক, সেটার গন্ধও বাপির সহ্য হয়নি। তার শরীরের ভীষণ ক্ষতি করেছে। এক-একজন মানুষের শরীর এক-একভাবে রিঅ্যাক্ট করে। অ্যালার্জিই ধরুন। খাওয়ার দরকার করে না, শুধু গন্ধতেই অনেকের অনেক সময় অ্যালার্জি হয়ে যায়। আমি নিজেই আনারসের গন্ধ পর্যন্ত সহ্য করতে পারি না।”
তারাপদ মাথা নড়ল। “আমি তো মশাই, কাঁকড়া দেখলেই গা চুলকোতে শুরু করি।” “এ-ব্যাপারে ডাক্তারকেই জিজ্ঞেস করুন। তিনি ভালো জানেন।”
চন্দন হাসল। বলল, “অ্যালার্জি ব্যাপারটা সত্যিই মিস্ট্রি। কার কিসে হয় বলা মুশকিল।”
চা এল। কিকিরারা চা নিলেন। কেদার চলে গেল। চা খেতে খেতে কিকিরা বললেন, “পরিমলবাবু, একটা জিনিসের কোনও সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না ৷”
“বলুন?”
“বাপি যে-জিনিসই মাখুক, সেটা যাতে ছিল—বোতল শিশি বা অন্য কোনও রকম পাত্রে—সেই জিনিসটা গেল কোথায়?”
পরিমল চায়ে চুমুক দিয়েছিলেন। তাকালেন। চায়ের ঢোঁক গিললেন। বললেন, “পুলিশও আমায় এই কথা জিজ্ঞেস করেছিল।”
“করারই কথা।”
“আমি কিন্তু কিছু দেখিনি। দেখার মতন মনের অবস্থাও তখন ছিল না। এত আচমকা…’
কিকিরা বাধা দিলেন। “চোখে পড়েনি বলছেন?”
“না, চোখে পড়েনি।”
“অন্য কেউ—মানে বাড়ির কাজের লোকেরা—যারা তখন ছুটে এসেছিল!”
“তারাও খেয়াল করেনি।”
“খেয়াল করলে ভালো হত।…যাকগে, পরে দেখা যাবে।…তা ইয়ে, স্যার। আমরা একবার যদি ওদিকটায় যাই, আপনার আপত্তি আছে?”
“না না, আপত্তি কিসের!”
“ওপাশেই আপনার পার্সোন্যাল ল্যাবরেটারি?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো কথা, চাঁদু বলছিল আপনি নাকি কী একরকম মাছি নিয়ে…”
“চন্দনবাবু জানেন। কথায় কথায় বলেছিলাম একদিন। উনি ডাক্তার মানুষ, ব্যাপারটা ওঁদের এক্তিয়ারে পড়ে।”
চন্দন বলল, “পড়ে খানিকটা। চিকিৎসা হল পরের ব্যাপার। তার আগে অসুখটা কেমন করে হচ্ছে না জানলে তার প্রিভেনশানের ব্যবস্থা করা যায় না। মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া হয় এটা জানা না থাকলে আমরা মানুষকে সাবধান করব কেমন করে? অসুখ হল ওষুধ দিলাম—ভালো কথা। কিন্তু অসুখটা যাতে না হয় সেটার ব্যবস্থা করাই ভালো নয় কি।”
তারাপদ বলল, “প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর।” বলে হাসল।
কিকিরা পরিমলকে বললেন, “মাছির কথা চাঁদুর মুখে শুনেছি সার! কী মাছি!” “ওরা একটা চলতি নাম দিয়েছে, ব্ল্যাক ফ্লাইজ। কুচকুচে কালো বড় বড় মাছি এক ধরনের। সন্দেহ বার্মার জঙ্গল থেকে এসেছে।”
“বার্মায় এই মাছির দরুন খারাপ রোগও হয় তবে?”
“হয়তো হয়েছে। তবে এত মারাত্মক নয়। আসামের চা বাগানে কেমন করে হঠাৎ এই মাছির উপদ্রব হল বলা মুশকিল। অনেকের ধারণা এই মাছি আসলে মাদাগাস্কার থেকে এসেছে। কিন্তু কোথায় আফ্রিকায় মাদাগাস্কার, আর কোথায় বার্মা, কোথায় আসাম! এল কেমন করে! অবশ্য কোনও না কোনও ভাবে আসে! এইভাবেই এক দেশ থেকে আরেক দেশে রোগ আসে। রোগের ভাইরাস। মাছি মশা জীবজন্তুও বয়ে আনে। মানুষও নিয়ে আসতে পারে।”
তারাপদ বলল, “কী একটা ফ্লু এইভাবে আমাদের এখানেও এসেছিল না!” বলে চন্দনের দিকে তাকাল চন্দন একটু হাসল। পরিমলের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওষুধটা—মানে ওই মাছি খাবার ওষুধ কি আপনারা বার করতে পেরেছেন?”
“হ্যাঁ, তা মোটামুটি সাকসেসফুল। ধরুন ষাট-সত্তর ভাগ।”
কিকিরা বললেন, “এই মাছিমারা ওষুধ নিয়েই তো আপনি কাজ করছিলেন?” “করছিলাম।”
“ওষুধটা কি পরখ করার জন্য আপনারা চা বাগানে পাঠিয়াছিলেন?” “পাঠিয়েছি। একটা লট এক্সপেরিমেন্টের জন্য।”
“কাজ হয়েছে?”
“রিপোর্ট যা পেয়েছি তাতে বলছে, দশ-বারো আনা মতন কাজ হয়েছে।” “পুরো হয়নি?”
“না।”
“এখনও আপনি কাজটা করছেন?”
“কাজটার দায়িত্ব আমার!”
“জিনিসটা কেমন, স্যার?…পোকামারা ওষুধের…’
“ওটা তরল পদার্থ। স্প্রে করতে হয়। ক্ষেতে-খামারে ওষুধ স্প্রে করতে দেখেছেন স্প্রে মেশিন নিয়ে? সেইরকম স্প্রে করতে হয়।”
“স্প্রে মেশিন দেখব না কেন! দেখেছি।”
কিকিরা এবার উঠে পড়লেন। বললেন, “চলুন স্যার—একবার ওদিকটা ঘুরে যাই।” পরিমল উঠে দাঁড়ালেন, “চলুন।”
পা বাড়িয়ে কী মনে পড়ে কিকিরার, হেসে বললেন, “ইস, একটা ভুল হয়ে গেছে। স্যার, আপনার এখান থেকে একটা ফোন করতে পারি?”
“সে কী! নিশ্চয় পারেন।”
কিকিরা এগিয়ে গিয়ে ফোন তুলে নিলেন।
তারাপদ বা চন্দন বুঝল না, কিকিরা কাকে ফোন করছেন!
ফোনে লাইন পেলেন কিকিরা।
চেঁচিয়ে কথা বললেন যেন কার সঙ্গে। বোঝা গেল না কার সঙ্গে কথা বলছেন। তবে তাঁর চেঁচামেচি থেকে বোঝা গেল—কোন চেনা লোকের সঙ্গে রেলের টিকিট নিয়ে কথা বলছেন। বেনারসের টিকিট চাই একটা। আরে, তিনি তো জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের চিকিট চাইছেন। এখনও কুড়ি-বাইশ দিন। এত আগে বলেও রির্জাভেশন হবে না !
ফোন রেখে দিলেন কিকিরা।
পাঁচ
পরেরদিন তারাপদ অফিস থেকে বেরিয়ে সোজাসুজি কিকিরার কাছে হাজির। আসতে বলেছিলেন। এসে দেখল, কিকিরা অদ্ভুতভাবে বসে আছেন। চোখে পট্টি বাঁধা, হাতে একটা ছড়ি। ছড়ির মাথার দিকটা বাঁধানো। ঘরে তখনও আলো জ্বালানো হয়নি।
“এ কী, স্যার? চোখে পট্টি বেঁধে বসে আছেন যে!”
“এস।”
“কী হল আপনার? ‘
“জেনকিনস ল!”
“সেটা আবার কী! জেনকিনস ল মানে। নিউটনের ল-এর মতন নাকি!”
“না সার। নিউটন নয়। নিউটন সাহেব নমস্য জন। ইনি হলে জেনকিনস। আমাদের লাইনের লোক।”
“ও! লাইন ম্যাজিসিয়ান?”
“বলতে পার।… দেখো তারা, তোমরা ম্যাজিসিয়ান বললেই ফানিং করো।”
“ফানিং! সেটা আবার কোন ভাষা!”
“রগড়। ফান থেকে ফানিং।”
তারাপদ হো হো করে হেসে উঠল।
কিকিরা চোখের পট্টি খুলতে খুলতে বললেন, “হেসো না হে, হ্যা হ্যা করো না। একটা গল্প বলি শোনো। একবার, তখন আমি ইয়াং ম্যান, ট্রেনে চড়ে এক জায়গায় যাচ্ছি। ওয়েটিংরুমে বসে আছি গাড়ি বদলাব বলে। এক বেঁটে মতন সাহেব, একগাছা জিনিসপত্র পোর্টারের মাথায় চাপিয়ে হাজির। সাহেব বেটা বেজায় ফুর্তিবাজ। মালপত্তর নামানো হয়ে গেলে, আমায় বলল, হ্যালো বয়, তুম কাঁহা জায়েগা? হাউ ফার?…সাহেবের ‘বয়’ ডাক শুনে আঁতে লাগল। কুড়ি-একুশ বছরের ইয়াং ম্যান আমি—বলে কিনা ‘বয়’! একটু ভেবে নিয়ে বললাম, গোয়িং টু মাদারল্যান্ড।”…সাহেব একটু থতমত খেয়ে বলল, মাদারল্যান্ড! এটা তোমার মাদারল্যান্ড নয়? আমি গম্ভীরভাবে বললাম, না সাহেব আমার মাদারল্যান্ড—মানে—মায়ের ফাদারের ল্যান্ড—বাপের বাড়ির দেশ। তুরি খিলানায়। মায়ের বাপের বাড়ি। গোয়িং দেয়ার।…সাহেব হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কি ! বেজায় আমোদ পেয়ে গেল। বলল, “তুম, বহুত মাজাকা ছোকরা। তুমকো ইংলিশমে ফান হ্যায়। আমি বললাম, “ইয়েস ওল্ডি, হাম ফানিং এক্সপার্ট হ্যায়’।”
তারাপদ হাসতে হাসতে বিষম খেল প্রায়। পেট চেপে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে। কিকিরাও হাসছিলেন। বললেন, “যাই বলো, তখন সাহেবদের রসকক্ষ ছিল। তার নিজের কামরায় তুলে নিল সাহেব, তারপর যতক্ষণ ছিলাম—ভর পেট খাওয়াল। আন্ডা, স্যান্ডুইচ, কমলালেবু।”
হাসি থামতে দেরি হল তারাপদর।
“তা সত্যি বলুন তো সার, চোখে পট্টি বেঁধে আপনি কী করছিলেন? হাতে ওই সরু ছড়িটি কেন?”
কিকিরা বললেন, “কনসেনট্রেট করছিলাম। মনঃসংযোগ । এটা একরকম এক্সারসাইজ। ছড়িটা একসময় হাত থেকে পড়ে যেত। পুরোপুরি মনঃসংযোগ হবার পর হাত নিজের থেকেই রিল্যাক্সড হয়ে যায়। এ তুমি বুঝবে না। আমি নিজেও এখন আর পারি না ঠিক।”
“চাঁদু এল না?” “আসবে।”
“আপনার কী মনে হচ্ছে, স্যার?”
কিকিরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “পরিমল মুখার্জি মিথ্যে কথা বলছেন।” তারাপদ যেন চমকে গেল। তাকিয়ে থাকল কিকিরার দিকে।
“আপনি কী বলছেন, স্যার! পরিমলবাবু মিথ্যে কথা বলছেন?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বললেন, “কাল আমরা ও-বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে কী করলাম!”
“কী?”
“আমি একটা ফোন করতে এক ডাক্তারখানায় ঢুকলাম না?”
“হ্যাঁ।”
“সেখান থেকে কাকে ফোন করেছিলাম জান?”
“না, আপনি বলেননি।”
“আমি ডক্টর পরিমল মুখার্জিকেই বাড়িতে ফোন করেছিলাম। উনি ধরেছিলেন। আমি অবশ্য আমার নাম বলিনি। বাপির স্কুটারের মিস্ত্রি হিসেবে কথা বললাম। দু-একটা কথা। বাপির কথা জিজ্ঞেস করলাম, বাপিদা কেমন আছে?”
তারাপদ কিছুই বুঝতে পারছিল না। ফোন, স্কুটার মিস্ত্রি…! ব্যাপার কী?
এমন সময় চন্দন এল।
তারাপদ বলল, “আয় চাঁদু! এত দেরি?”
“এক বন্ধুর পাল্লায় পড়েছিলাম। আমাদের দেশ থেকে এসেছে। ছেলেবেলার বন্ধু। কলকাতায় কাজে এসেছে। দেখা করতে এসেছিল। ওর সঙ্গে আড্ডা মারতে মারতে দেরি হয়ে গেল!”
“এদিকে তো তোর কেস ডুবে যাচ্ছে।”
“ডুবে যাচ্ছে! মানে ? ”
“কিকিরাকে জিজ্ঞেস কর।”
চন্দন কিকিরার দিকে তাকাল।
কিকিরা ফোনর প্রসঙ্গ তুলে বললেন, “ও-বাড়ির বাইরে এসে আমি ইচ্ছে করেই মুখার্জিকে ফোন করি। তোমাদের হয়ত মনে আছে—গতকাল আমরা পরিমলবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলে যখন ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলাম তখন আমি ওখান থেকে একটা ফোন করি। সেই বেনারসের টিকিটের কথা। মনে পড়ছে? টিকিটের কথাটা চালাকি। এক বন্ধুকে ফোন করেছিলাম ঠিকই তবে সেটা অজুহাত। আসলে ফোনটা রাখার সময় আমি ঠিকমতন রাখিনি। একটু তুলে হেলিয়ে রেখেছিলাম।
“কেন?”
“কেন! তোমাদের মাথায় কি গোবর পোরা? পরিমলবাবু কী বলেছেন? বলেছেন, নিচের ঘরে ফোন ঠিকমতন রাখা না থাকলে—ওপরে তাঁর ঘরে ঠিকমতন ফোন বাজে না। কিরকির শব্দ হয়। বলেছেন না?
“হ্যাঁ।”
“এবার তাহলে বাজল কেমন করে?”
ধাঁধায় পড়ে গেল তারাপদ আর চন্দন ।
চন্দন বলল, “পরিমলবাবু ওপরে ফোন ধরেছিলেন কে বলল?”
“আমি বলছি।”
“কেমন করে বলছেন?”
“আমি চালাকি করে জানতে চাইলাম, বাপিদার স্কুটারটা কি নিয়ে যাব? সারাই হয়ে গেছে। জবাবে উনি বললেন, না—এখন উনি ওপরে আছেন। পরে দিনের বেলায় গিয়ে দিয়ে আসতে।”
তারাপদ বলল, “ওটা কথার কথাও তো হতে পারে।”
“পারে।”
চন্দন বলল, “কিংবা ধরুন, আমরা চলে আসার পর অন্য কোনও ফোন এসেছিল। তখন উনি নিচে এসে নিচের ঘরের ফোনটা ঠিকমতন রেখে গিয়েছেন।”
“তাও হতে পারে। তবে আমরা ও-বাড়িতে নিচের বসার ঘরে প্রায় ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তারপর বাইরে এসে বাপিকে যে-ঘরে পাওয়া যায় সেই ঘরে মিনিট দশ-পনেরো ছিলাম। সেখান থেকে গেলাম পরিমলবাবুর নিজের ল্যাবরেটারি দেখতে। ওখানে কতক্ষণ ছিলাম তারাপদ?”
“বেশিক্ষণ নয়, বড় জোর কুড়ি-পঁচিশ মিনিট।”
“ল্যাবরেটারি থেকে বেরিয়ে এসে আমরা বারান্দা দিয়ে নামার সময় একপাশে, দেওয়াল ঘেঁষে কাঠের গড়ানো তক্তা দেখতে পাই। ঢালু হয়ে নিচে মাটিতে নেমে গিয়েছে। ওটা কেন জিজ্ঞেস করায় পরিমলবাবু বলেন, বাপি স্কুটার তুলে বারান্দায় রাখত। মাটি থেকে ঠেলে স্কুটার তোলার জন্যে গড়ানো তক্তাটা রাখা আছে। একথাও বললেন যে, স্কুটারটা খারাপ থাকায় আপাতত মিস্ত্রির কাছে দিয়ে এসেছে বাপি। ঠিক কিনা?”
তারাপদ আর চন্দন মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, ঠিকই। তাদের সামনেই কথাগুলো হয়েছে। শুনেছে তারা।
কিকিরা বললেন, “আমাদের বারান্দার সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে পরিমলবাবু চলে গেলেন। আমি দু-চার পা এগিয়ে এসে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালম। দেখলাম, পরিমলবাবু সোজা সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠে যাচ্ছেন।…ধরে নেওয়া যায়, তিনি দোতলায় চলে গেলেন।… আর আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামান্য হেঁটে বড় রাস্তায়। তারপর ধরো মিনিট পাঁচ-সাত পরে আমি একটা ওষুধের দোকানে ঢুকে তাঁকে ফোন করলাম। এই মিনিট দশেকের মধ্যে তাঁর অন্য ফোন এল, তিনি আবার নিচে নেমে ফোন ঠিক করলেন; আবার ওপরে গেলেন—! তারপর আমার ফোন পেলেন? একটু বেশি বেশি মনে হচ্ছে চন্দন। তবে হতে পারে। ফোন পর পর আসতে পারে, আবার সারা বেলায় একবারও না আসতে পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সেদিনের ফোনের গল্পটায় একটু সাজগোজ আছে। পরিমলবাবু সাজিয়েছেন। তিনি মিথ্যে কথা বলছেন।”
কিকিরা এবার উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ হাঁক পাড়লেন বগলাকে। “কী হে বগলচন্দর, চা-টা দেবে না কি! করছ কী?”
বগলা সাড়া দিল। আসছে।
কিকিরা হাত বাড়ালেন, “দাও চাঁদু, একটা সিগারেট দাও। কথা বলতে বলতে দম ফুরিয়ে যাচ্ছে।”
চন্দন সিগারেট দিল।
সিগারেট ধরানো হয়ে গেলে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিলেন কিকিরা। মাথার লম্বা লম্বা চুলগুলোর মধ্যে আঙুল চালিয়ে যেন কিছু ভাবতে ভাবতে বললেন, “মিথ্যে কথা। অন্তত নাইনটি পার্সেন্ট চান্স।… এছাড়াও একটা কারণ আছে সন্দেহ করার।”
বগলা চা নিয়ে এল। চায়ের সঙ্গে কড়াইশুঁটির কচুরি। কচুরি একেবারে গরম। ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। চা নিতে নিতে তারাপদ বলল, “বগলাদা, আরও দু-একটা পাব তো?”
“খাও আগে। হবে।”
বগলা চলে গেল।
কিকিরা নিজের জায়গায় বসলেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চুমুক দিলেন চায়ে। চন্দন আর তারাপদ দু-জনেই প্রায় একই সঙ্গে বলল, “আর–একটা কারণ কী কিরিরা?”
“বাপির ঘর থেকে—মানে যে-ঘরে বাপিকে পাওয়া গিয়েছিল—সেই ঘর থেকে শিশি বোতল ক্যান—যা হোক কিছু একটা পরিমলই সরিয়ে নিয়েছিলেন।”
“আপনি বুঝলেন কেমন করে?”
“এটা তো সবাই সন্দেহ করবে। পরিমলই প্রথমে ও-ঘরে ঢোকেন বলেছেন। তিনি ঘরে ঢুকলেন, অথচ বাপির কাছাকাছি কী পড়ে আছে দেখলেন না? তাঁর মনে একবারও সন্দেহ হল না, বাপি কী বিষ খেয়েছে একবার দেখি! এ হতে পারে না।” চন্দন বলল, “উনি তো বলছেন তখন যা মনের অবস্থা তাতে উনি খেয়াল করেননি।”
“এটা হয় না, চাঁদু। মানুষের স্বভাব, তার স্বাভাবিক কৌতূহল তুমি বদলাতে পার না। কেউ যদি গলায় দড়ি দেয়—তুমি কি আগেভাগে দেখবে না সে কীভাবে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ল। কেউ যদি বিষ খায়—তুমি কি দেখবে না সে কী খেল?”
চন্দন মাথা নাড়ল। স্বীকার করল যুক্তিটা।
তারাপদ খেতে খেতে বলল, “আপনি স্যার ঠিকই বলছেন। কিন্তু পরিমলবাবু কথাটা কেন লুকোতে চাইছেন?”
কিকিরা এবার নিজের জায়গায় এসে বসলেন। একেবারে চুপচাপ। খানিকক্ষণ পরে বললেন, “পরিমলবাবুর ল্যাবরেটারি তো দেখলে। নিজের ছোট ল্যাবরেটারি। সাজ-সরঞ্জাম অল্প। নিজের লেখাপড়া করারও ব্যবস্থা আছে একপাশে। ল্যাবরেটারির গায়ে হাত কয়েকের প্যাসেজ। তারপর দুধাপ সিঁড়ি। সিঁড়িতে উঠলেই মূল বাড়ির বারান্দা। বারান্দার শুরুতেই একটা বাথরুম। দ্বিতীয় ঘরটাতেই বাপিকে পাওয়া গিয়েছিল। ল্যাবরেটারি থেকে বাপির ঘরে আসতে দেড় দু’মিনিটও লাগে না।”
তারাপদ মাথা নাড়ল।
“এমন হতে পারে, বাপি ল্যাবরেটারি থেকে কোনও বিষ বা ওষুধ রুমালে মাখিয়ে নিয়ে এই ঘরে এসে ঢুকেছিল?”
কিকিরাই বললেন ।
“বলতে পারছি না,” চন্দন বলল, “আন্দাজে সে কী বিষ মাখাবে?”
“কারেক্ট। সেটা সম্ভব নয়। বিষ হোক ওষুধ হোক বাপি তার কনটেইনারটা নিয়েই ঘরে এসেছিল!”
“তাই মনে হয়।”
“মনে হয় কেন! সেটাই ঠিক।”
“পাত্রটা পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ পরিমলবাবুর রুমাল পাওয়া যাচ্ছে ওষুধ-মাখানো। বড় অদ্ভুত তো!”
“অদ্ভুত বইকি! তা ছাড়া বাপির মতন একটা ছেলে কেমন করে জানবে বিষের কথা! বাইরে থেকে কিনবে? কেনবার চেষ্টা করত—যদি সত্যিই তার আত্মহত্যা করার চেষ্টা থাকত। আসলে বাপি তো আত্মহত্যা করতে চায়নি, নাটক করতে চেয়েছিল। চেয়েছিল দাদাকে ভয় দেখিয়ে জব্দ করবে। …হতে পারে সে, দাদার ল্যাবরেটারি ঘরে ঢুকে শিশি বোতলে যা পেয়েছে—নিয়ে চলে এসেছিল।”
“রুমালে মাখিয়েও আনতে পারে।”
“সম্ভাবনা কম।”
“সার, দাদার রুমালটা তার কাছে গেল কেমন করে?” তারাপদ বলল। “আমি বুঝতে পারছি না।” কিকিরা বললেন। খাওয়া শেষ হয়ে এসেছিল।
চা খেতে খেতে চন্দন বলল, “বাপি ভালো না-হওয়া পর্যন্ত আমরা তাহলে কিছুই জানতে পারছি না ।”
“মনে তো সেই রকমই হচ্ছে। পরিমালবাবু কথা চাপছেন বলেই আমার বিশ্বাস।” তারাপদ হঠাৎ বলল, “স্যার, একটা কথা স্ট্রাইক করছে?”
“কী?”
“বিজ্ঞানীমাশাই যে জিনিসটা বার করেছেন ওই মারাত্মক মাছি মারার জন্যে, সেই বিষ কি ভুল করে বাপি…”
তারাপদর কথা শেষ হবার আগেই চন্দন বলল, “আমারও মনে এরকম একটা সন্দেহ হচ্ছিল কিকিরা!”
কিকিরা বললেন, “আমিও সেটা ভেবেছি হে!… আর এটাও ভেবেছি, এবার যখন পরিমলবাবুর বাড়িতে যাব, তখন বলব—আপনার সেই জিনিসটা আনুন, মাছিমারা ওষুধটা। আমি সেটা রুমালে ভিজিয়ে নিজের মুখে চেপে ধরব, দেখি কী হয়!”
তারাপদ আঁতকে উঠে বলল, “আপনি! আপনি মুখে মাখবেন। পাগল নাকি? তারপর?”
কিকিরা হেসে বললেন, “তারপর চাঁদু!”
চন্দন হাত জোড় করে বলল, “সরি স্যার, আমি সামলাতে পারব না। এমন কাজ করবেন না। আমি বারণ করছি।”
কিকিরা হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “তোমরা একেবারে নির্বোধ ! আরে, আমি ম্যাজিসিয়ান, কিকিরা দি গ্রেট! আমার হল ম্যাজিসিয়ানের হাত। রুমালের খেলায় আমি এক নম্বর।”
ছয়
ট্যক্সিতে বসে কিকিরা বললেন, “তারা, চাঁদু ক’টায় যেতে বলেছে?’”
“চার, সাড়ে চার।”
“এখন ক’টা বাজছে?”
“পৌনে চার।”
“চাঁদুকে যে কাজটা সারতে বলেছি সেটা দুপুরেই সেরে ফেলবে। বিকেলে মুখুজ্যের বাড়িতে থাকবে?”
“হ্যাঁ।”
আজ সকাল থেকেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাবার মতন শীত পড়েছে। পড়বারই কথা। ডিসেম্বর মাসের কুড়ি-বাইশ তারিখ হয়ে গেল। কলকাতার শীত তো এ বছরের শেষ আর নতুন বছরের গোড়ার দশ-পনেরোটা দিন। তারপর আর তেমন শীত কোথায় !
কিকিরা আজ ধরাচুড়ো পরে একেবারে যেন লামাদের মতন হয়ে আছেন। মাথায় আবার গরম টুপি।
তারাপদ কিকিরার বেশভূষা দেখছিল আর মজা করছিল।
কিকিরাও মজার গলায় কথা বলছিলেন। বোঝার উপায় নেই যে, তিনি আজ পরিমল মুখার্জির সঙ্গে দারুণ একটা প্যাঁচের খেলা খেলতে যাচ্ছেন। হয় একটা কিছু হবে আজ, না হয় কিকিরা হাত ধুয়ে ফেলবেন বাপির ব্যাপার নিয়ে। তিনি পারবেন না। সব মানুষেরই পেশা থাকে। পেশাগত দক্ষতা। কিকিরা না পুলিস, না গোয়েন্দা। ম্যাজিসিয়ান মানুষ তিনি, এসব জটিল ব্যাপার তাঁর মাথায় আসে না।
তারাপদ বলল, “কিকিরা সার?”
“বলো?”
“এবার বড়দিনে আমাদের প্রোগ্রাম কী ? ”
“সাঁতরাগাছি!”
“সাঁতরাগাছি!” তারাপদ অবাক, “সেখানে কী! ওখানে তো ওল হয়।”
“ধ্যুত, ওল! ওলের বাবা ওলন্দাজ লাহিড়ীবাবু থাকেন সাঁতরাগাছিতে। লাহিড়ীবাবুর বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন। হোলডে প্রোগ্রাম। জোর খাওয়া-দাওয়া হবে। আড্ডা, গল্পগুজব।”
তারাপদ দেখেছে লাহিড়ীবাবুকে। কিকিরার বন্ধু। জমিয়ে গল্পগুজব করতে পারেন। ট্যাক্সিঅলা হঠাৎ দাঁড়াল। রাস্তার মাঝ মধ্যিখানে এক পাগল এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ট্রাফিক পুলিসের মতন হাত নাড়ছে। তার গায়ে ছেঁড়া অলেস্টার, গলায় গাঁদাফুলের মালা, মাথায় বেখাপ্পা টুপি। গাড়ি-ঘোড়া বাধ্য হয়েই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, পাশ কাটাচ্ছে কেউ কেউ, কেউ বা আবার পাগলকে ধমকাচ্ছে।
কিকিরার চোখে পড়ল। গম্ভীর হয়ে বললেন, “তারা, ওই অবস্থা আমারও হবে। যা দিনকাল পড়েছে।”
ট্যাক্সি পাশ কাটাল।
পরিমল মুখার্জির বাড়িতে পা দিয়ে ভদ্রলোককে দেখা গেল। নিচেই ছিলেন। চন্দন তখনও আসেনি।
কিকিরা হাসিখুশি মেজাজে বললেন, “আজ বড় শীত, স্যার।”
পরিমল বললেন, “হ্যাঁ। ক’দিনের মধ্যে আজই বেশ ঠান্ডা পড়েছে।”
“চাঁদু তো আসেনি। ওকে বলেছিলাম—আপনার সঙ্গে দেখা করে যেন জানিয়ে দেয় আমরা আসব।”
“উনি জানিয়ে দিয়েছেন। সকালেই।”
“ভাইয়ের খবর কী?”
“ভালোই। আরও ইমপ্রুভ করেছে।”
“কথা বলতে পারছে?”
“দু-এক দিনের মধ্যে পারবে। হাত-পায়েও সাড় এসেছে।”
“ভালো খবর। চলুন ঘরে গিয়ে বসি।”
ঘরে এসে বসল তিনজনে। তারাপদ খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিল। বুঝতে পারছিল না, আজ কী হবে শেষ পর্যন্ত! কিকিরা কি পারবেন রহস্যের জট ছাড়াতে, না, হেরে যাবেন ?
দু-চারটে এলোমেলো কথার পর বাপিকে নিয়েই কথাবার্তা শুরু হল। পরিমল ছোট ভাইয়ের কথা বলছিলেন, নিজেদের পারিবারিক গল্প।।
চন্দন এল পাক্কা সাড়ে চারটেয়।
চন্দন আসার পরও কিছুক্ষণ বাড়ির গল্প চলল। এরই মধ্যে চা এল।
চা খাওয়া শেষ হলে কিকিরা কাজের কথা পাড়লেন।
“পরিমলবাবু?”
“বলুন।”
“আপনি সার বিজ্ঞানী লোক, কত রকম এক্সপেরিমেন্ট করেন। আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই।”
“আপনি! বলুন—” পরিমল কেমন অবাক হয়ে দেখছিলেন কিকিরাকে।
কিকিরা বললেন, “আপনি একটা বড় কাচের প্লেট, বা বাটি আনতে বলুন।” “কাচের প্লেট!”
“বলুন না, স্যার।” হাসলেন কিকিরা।
পরিমল ঘরের বাইরে গিয়ে ডাকাডাকি করলেন কেদারকে। কাচের বড় প্লেট আনতে বললেন।
ঘরে ফিরে এসে পরিমল কিকিরাকে বললেন, “কী করবেন মশাই কাচের প্লেট?” “আমার পকেটের রুমালটা ভিজিয়ে নেব।” বলতে বলতে তিনি পকেট থেকে রুমাল বার করলেন।
পরিমল কিছুই বুঝলেন না। তাকিয়ে থাকলেন।
“আমার মাথায় আসছে না।” পরিমল বললেন।
কিকিরা একটু হাসলেন। বললেন, “একটা জিনিস আমি পরখ করে দেখতে চাই। আপনি মাছি—মানে ওই মারাত্মক মাছি মারার জন্যে যে ওষুধটা বার করেছেন, সেই ওষুধে রুমালটা ভিজিয়ে নিয়ে আমার মুখে মাখব। নাকের ওপর চেপে ধরব। তারপর দেখব আমার কী দশা হয়! মরি, বাঁচি, না আমার অবস্থা বাপির মতন হয়!”
পরিমল একেবারে হতভম্ব। মুখে কথা আসছিল না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলেন। মনে হল তাঁর গলা যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কথা ফুটছে না।
চন্দন আর তারাপদ পরিমলকে দেখছিল।
নিজেকে সামলে নিতে সময় লাগল পরিমলের। বললেন, “আপনি কী বলছেন! আমার সেই ওষুধ দিয়ে আপনি রুমাল ভিজোবেন, নাকে-মুখে চেপে ধরবেন! কেন?”
“ওটা তো বিষ?”
“তা একরকম বিষই…! সবরকম ইনসেকটিসাইডই বিষ!”
“ফলিডলও তো বিষ, তাই না?” তারাপদ বলল।
পরিমল বললেন, “পোকামাকড় মারার বিষ মাত্রেই মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর। কোনওটা বেশি, কোনওটা কম। বিদেশে এ সব ওষুধ যারা ব্যবহার করে তারা কত প্রিকোশান নেয় জানেন! আমরা নিই কোথায়!”
কিকিরা বললেন, “স্যার, বিষ জেনেই তো চাইছি।”
“না।”
“না, কেন?”
“আপনার পাগলামির প্রশ্রয় আমি দেব না।”
“বাপি কি এই ওষুধই…. ?”
“না।”
“আপনি না বলছেন। কিন্তু সন্দেহ তো এখানে থেকে যাচ্ছে।”
“আমার কাছে ও ওষুধ নেই। কোম্পানির অফিসে আছে।” “বাড়িতে নেই?”
“বাড়িতে থাকবে কেন?”
“এটা আপনি ঠিক বলছেন না, সার। বাড়িতে আছে।’
“না।”
“আমি দেখেছি।”
“কোথায়?”
“আপনার ল্যাবরেটারিতে।…জানলার দিকে যে কাঠের র্যাক আছে, তার মাথার ওপর একটা কাচের জার দেখেছি। মাঝারি জার। ফিকে সবজে রঙের তরল পদার্থ আছে জারে।”
“ওটা অন্য জিনিস।”
“স্যার, জারের গায়ে একটা সাদা সরু কাগজ সাঁটা আছে। তাতে হাতে লেখা আছে ফ্লাইঅন ইংরিজি বড় হরফে FLYON. … আপনাদের ওষুধের নাম তো ফ্লাইঅন তাই নয়?”
“কে বলল?”
কিকিরা চন্দনের দিকে তাকালেন।
চন্দন বলল, “আমাদের কলেজ থেকে, ফারমোকলজির ডিপার্টমেন্ট থেকে আমি ফোন করিয়েছিলাম আপনাদের অফিসে। তাঁরা বলেছেন, প্রোডাক্টের নাম ফ্লাইঅন” পরিমল একেবারে স্তম্ভিত। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
অপেক্ষা করে কিকিরা বললেন, “আপনি কেন আমাদের কাছে অকারণে…’ পরিমল হঠাৎ যেন চটে গেলেন। বললেন, “আমি বলছি—ওই ওষুধের জন্যে নয়।” “নয়? বেশ তো আনুন ওষুধটা, হাতে কলমে পরীক্ষা করে দেখি।”
পরিমল চুপ।
বসে থাকতে থাকতে একসময় মাথা নিচু করে বললেন, “আমি মিথ্যে কথা বলছি না। বিশ্বাস করুন।”
“তা হলে বাপি কোন ওষুধ…’
“শুনবেন!”
পরিমল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টেনে টেনে মৃদু গলায় বলতে লাগলেন, “বাপিকে নিয়ে আমাদের বরাবরই জ্বলেপুড়ে মরতে হয়েছে। মা নেই, বাবা নেই। ওকে আমরা শাসন করতে পারতাম না, কষ্ট হতো। আমার স্ত্রী যতদিন ছিলেন, বাপির তবু একটু ভয়ডর ছিল। বড় বউদিকে সে ভোগাত যেমন, মান্যও করত। তা আমার স্ত্রী তো গত হলেন। মেজো ভাই আমার বাইরে বাইরে থাকে। সে এমনিতে নরম। কিন্তু রেগে গেলেই বিপদ। এখানে যখন থাকে সে বাপিকে বুঝিয়েছে অনেক। দু-একবার ধমকাধমকি করে শাসিয়ে বলেছে যে—তাকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়ে দেবে। মেজো ভাইয়ের স্ত্রী বাপিকে কিছু বলতে সাহস পায় না।… যাই হোক, বাপি নিজের মর্জিতে চলতে চলতে বেয়াদপ হয়ে উঠল। আমিও তাকে বাগে রাখতে পারতাম না। শেষে একদিন বাপি ধরা পড়ল!”
“ধরা পড়ল?”
“হ্যাঁ, সে ধরা পড়ল আমার কাছেই। দেখি, ও নেশা করে।”
“নেশা করে?” কিকিরাও কেমন চমকে গেলেন।
পরিমল বললেন, “এ অন্য নেশা। কারবন টেটরাক্লোরাইড বলে একটা কেমিক্যাল আছে। পোকামকড় মারা যায়। বিটলস এই পদার্থটা রুমালে ভিজিয়ে নিয়ে নাকের কাছে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিলে মাথা ঝিমঝিম করে। দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে, গলা বুজে আসে। তারপর ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়। ওই আচ্ছন্ন অবস্থায় নানা রকম ক্রিয়াকর্ম চলে মনের ভেতর। এই নেশা এখানে কাউকে করতে শুনিনি। বাপির ব্যাপারটা আমি ধরে ফেলার পর—খোঁজখবর করে বইপত্র ঘেঁটে দেখলাম, ফরাসি দেশে দু-চারজন এরকম নেশা করে থাকে। ওষুধ রুমালে মাখিয়ে নাকের কাছে ধরে শুঁকলে ধীরে ধীরে নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়।” চন্দন অবাক হয়ে বলল, “বাপি কত দিন ধরে এই নেশা করছে?” “বছর খানেক।”
তারাপদ বলল, “জিনিসটা পেত কোথায়?”
“জোগাড় করত।’
“কোথা থেকে?”
“আমায় বলত না।”
“আপনার ল্যাবরেটারিতে নেই?”
“না।”
কিকিরা বললেন, “বাপি কি এবারও এই নেশা করেছিল?”
“হ্যাঁ। তবে এবারে কারবন টেটরাক্লোরাইডটায় গোলমাল ছিল। মিশে গিয়েছিল কিছু। কিংবা মেশানো হয়েছিল। যার পরিণামে ও মরতে বসেছিল।”
“ও! আপনি…”
“আসলে যেদিন বাপির ওই অবস্থা হয় সেদিনই ওকে সন্ধেবেলায় আমার ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুব গালমন্দ করছিলাম। ও খুব রেগে যায়। যাবার সময় আমাকে বলে, ও মরবে, সুসাইড করবে। আমিও বলি—যা, করগে যা। তারপর ও চলে যায়। বাপি চলে যাবার পর আমার কেমন মন খুঁতখুঁত করতে থাকে। ভয়ও হয় খানিকটা। সামান্য পরে ওপরে ওকে দেখতে না পেয়ে নিচে নামি। নিচে নেমে খোঁজ করতে করতে যা দেখেছি—আপনারা জানেন।
কিকিরা বললেন, “তা জানি। কিন্তু ওই কেমিক্যালের পাত্রটা কোথায় গেল?” “আমি ফেলে দিয়েছি। একটা বোতল।”
“ফেলে দিলেন কেন ?”
“বাপি যে ওই রকম এক নেশা করে আমি জানাতে চাইনি। তাতে ওর বিপদ হত।” “এমনিতেও তো…।”
“না, জিনিসটায় কিছু মিশে গিয়েছিল বলে বাপির ভোগান্তি হল। নয়তো এত ভোগান্তি হবার কথা নয়। ও যে মরবে না—আমি সিওর ছিলাম। সেরে উঠবে। সময় লাগবে।”
চন্দন বলল, “আপনি কি পুলিসের হাত থেকে ভাইকে বাঁচাবার জন্যে বোতলটা ফেলে দিয়েছিলেন ? ”
“হ্যাঁ। কোনও কোনও নেশা নিষিদ্ধ। অফেন্স। আমি অবশ্য সঠিক জানি না, এই নেশাটা নিষিদ্ধ ছিল কিনা! তবু ভয়…!”
“কিন্তু, আত্মহত্যার চেষ্টাও তো অফেন্স ! ”
“জানি।”
“তা হলে?”
“ওটা পরের ব্যাপার। দেখা যাক, পুলিস কী বলে?”
“পুলিস কি ছেড়ে দেবে?”
“আইন-আদালত হতে পারে। তখন যা হোক ব্যবস্থা করতে হবে।”
কিকিরারা চুপ করে থাকলেন।
শেষে কিকিরা বললেন, “কিন্তু আপনার রুমাল বাপির কাছে পাওয়া গেল কেন?”
পরিমল নিচু স্বরে বললেন, “আমার ল্যাবরেটারি থেকে বার করে নিয়েছিল। ওটা ঠিক রুমাল নয়, ন্যাপকিন ধরনের জিনিস। হাত মোছার জন্যে থাকে ল্যাবরেটারিতে।”
“আপনার নামের গোড়ার অক্ষর তাতে লেখা আছে।”
“না, ভুল কথা। আমার নাম নয়। আমার কোম্পানি পেনফিল্ডের ন্যাপকিন । ন্যাপকিনের কোণায় “পি’ অক্ষরটা আছে। পুলিসকে আমি এসব কথা বলিনি।”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন সামান্য সময়। তারপর বললেন, “ছোট ভাইকে আপনি বাঁচাতে চাইছিলেন মশাই, কিন্তু বাপি কি ভবিষ্যতে শুধরোবে?”
পরিমল ম্লান হাসলেন। “না শুধরোলে আর কী করতে পারি বলুন! আমার কপাল।”
