লটারির টিকিট – বিমল কর
লটারির টিকিট
এক
ভাঙা আয়না, ফাটা কাপ আর শুকনো সজনেডাঁটার মতন এক ব্রাশ সামনে নিয়ে বিজন দাড়ি কামাতে বসেছিল। ব্লেডটাও পুরনো, ভোঁতা মেরে গিয়েছে। বিজনকে বেশ মেহনত করেই দাড়ি কামাতে হচ্ছিল। তিন দিনের জমা দাড়ি তো কম নয়।
দাড়ি কামানোর ব্যাপারে বিজনের যত আলস্য তত বিরক্তি। সে দু-চার বার দাড়ি রাখার চেষ্টা করে দেখেছে গোল মুখে দাড়িটা মোটেই মানাচ্ছে না। বন্ধুরা যা-তা বলছে। অগত্যা দাড়ি রাখার ব্যাপারে সে আর মাথা ঘামায়নি।
বিজনের ধাত হল আয়েসি। ভীষণ অলস। তাকে বিশ্বকুঁড়ে বললে বেশি বলা হয় না। গা-গতর যেটুকু নাড়ালে নয় তার বেশি নাড়াতে চায় না। মজা করে বলে “আমার তো তেলবাদশার নাতি হয়ে জন্মানোর কথা, ভুল করে এখানে জন্মে গিয়েছি।
ভগবান মাঝে মাঝেই আমায় স্বপ্ন দিয়ে বলে দেন, “বৎস বিজু, কিছু মনে কোরো না, আমার কারখানায় তো কম্পিউটার নেই, একটা মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে। কোথায় তুমি আমির-বাদশার ঘরে জন্মাবে—তা না গিয়ে জন্মালে বাঁশবেড়েতে। আসছে-বার আর এ-ভুল হবে না। তোমার এ-জন্মের দুঃখ আসছে-জন্মে শোধ করে দেব সুদে আসলে।”
বিজনের অবশ্য তেমন কোনও দুঃখ আছে বলে মনে হয় না। অক্রুর দত্ত লেনের এক মেসবাড়িতে থাকে, চাকরি করে কলকাতা কর্পোরেশনের টিপসই দপ্তরে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মারে দিনে বারো ঘণ্টা, আর যখন একা থাকে—মেসের বিছানায় শুয়ে বাঁশি বাজায়। এসবের বাইরে যদি কিছু থাকে তবে সেটা হল বিজনের মাছ ধরার শখ। কখনও-সখনও বিজন সঙ্গী জুটিয়ে কলকাতার বাইরে মাছ ধরতে যায়।
আজও দুপুরে বিজনের কলকাতার বাইরে যাবার কথা। দু-তিন বন্ধু মিলে যাবে মধ্যমগ্রাম। সেখান থেকে মাইল-দুই ভেতরের এক গ্রামে রাতটা কাটাবে; কাল সকাল থেকে বসবে মাছ ধরতে, বিকেলে ফিরবে আবার কলকাতা।
দাড়ি কামাতে কামাতে বিজন মধ্যমগ্রামের কথা ভাবছিল। হঠাৎ তার কানে গেল, নীচে একটা বীভৎস কান্নার রোল উঠেছে। ডাক ছেড়ে, আকাশ ফাঁটিয়ে কান্না বললে যেমন বোঝায় অনেকটা সেই রকম। কান্নার সঙ্গে যে-কথাগুলো ভেসে আসছে তা বোঝাই যাচ্ছে না ।
বিজন দাড়ি কামানো বন্ধ করে কান পেতে রাখল। হল কী? কলতলায় আছাড় খেয়ে পড়ে কারও মাথা ফাটল? পেনুঠাকুর গিরিধারীর গলা কুপিয়ে দিল নাকি? না বড়ালবাবুর কিছু হল?
বিজন উঠব কি উঠব না ভাবছিল। দাড়ি কামানোর আর সামান্য বাকি।
বিজনকে উঠতে হল না, হরিদা ঘরে এলেন। হরিদার স্নান শেষ। খিদিরপুরে ছুটতে হয়। দশটায় হাজিরা না দিলেই নয়, অফিস বড় কড়া।
হরিদা বললেন, “আমি কালকেই বলেছিলাম, ও বাবা পেনু, টিকিটটা সাবধানে রাখিস। বরাতে একবারই জুটে গিয়েছে। ছিলি রাখাল, হয়ে গিয়েছিস রাজা। হাতছাড়া করিস না টিকিটটা, করলেই ডুববি, মারা পড়ে যাবি। তাই হল শেষ পর্যন্ত!”
বিজন খানিকটা আঁচ করতে পারল। তাদের মেসের পেনুঠাকুর লটারিতে দেড় লক্ষ টাকা পেয়েছে। এটা কালকের খবর। কাল মেসে হইহই কাণ্ড, পেনুঠাকুর লটারিতে টাকা পেয়েছে। দু-একশো নয়, লাখ-দেড়েক। মেসের সকলে মিলে পেনুকে বাহবা দিচ্ছে, তামাশা করছে তাকে নিয়ে, কেউ কেউ বা পেনুর হস্তরেখা ছক বিচার করছে, কেউ বা পেনুকে উপদেশ দিচ্ছে—টাকাটা হাতে পেলে কীভাবে তার সদ্ব্যবহার করা উচিত।
পেনুকে কাল কেমন থমকে যাওয়ার মতন দেখাচ্ছিল। লটারিতে টাকা পেয়ে একেবারে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে। না পারছে হাসতে, না কাঁদতে; বিশ্বাস করতে পারছে আবার পারছে না; এই একেবারে চুপ, তারপরে বিড়বিড় করছে। পেনুর অবস্থা দেখে চাটুজ্যেদা এক ডোজ হোমিওপ্যাথি গুলি খাইয়ে দিল।
সন্ধের দিকে পেনু খানিকটা ধাতস্থ হয়ে কালীবাড়িতে পুজো দিতে ছুটল। পেনু এই মেসবাড়ির তিন নম্বর গার্জেন। এক নম্বর গার্জেন হলেন বড়ালবাবু, বড়ালবাবু উনিশ-শো ছেচল্লিশ সালে এ মেসবাড়ির পত্তন করেন, বড়ালবাবু আর মানিকদা। পেনু আসে পঞ্চাশ সালে। তার আগে বলরাম না কে যেন ছিল। কাজেই বড়ালবাবু আর মানিকদার পর তিন নম্বর হল পেনু। পেনু যখন বড়ালবাবুর কাছে আসে তখন তার বয়েস ছিল পনেরো বড়জোর। এখন পঞ্চাশ পার করে দিয়েছে। ছোকরা বয়েসে শিয়ালদায় চায়ের দোকানে চাকরি করত পেনু। বড়ালবাবু তাকে ধরে এনে ভাত ডাল মাছের ঝোল করতে শেখায়। চড়-চাপড়ও কম খায়নি পেনু বড়ালবাবুর কাছে। তা এ-সব পুরনো কথা বলে লাভ নেই, আসল কথাটা হল, পেনু হুট করে লটারির টাকা পাওয়ায় বড়ালবাবুর ঘুম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানিকদা আজকাল আর মেসে থাকেন না, কাছাকাছি এক ভাড়াবাড়িতে থাকেন, তবে দিনের মধ্যে ছ-সাত ঘণ্টা মেসে এসেই বসে থাকে। মানিকদা নাকি পেনুকে বলেছিলেন, “আজকাল জাল টিকিটের ছড়াছড়ি চলছে, পেনু। তোরটা জাল না আসল আগে দেখতে হবে। আমাকে দিস—দেখিয়ে নেব।”
বিজন মানিকদাকে কোনও দোষ দিচ্ছে না, কিন্তু টিকিটটা জাল হতে পারে শুনে পেনু যেন কেঁদেই ফেলেছিল। মানুষকে এভাবে কেউ ঘাবড়ে দেয়! অবশ্য মানুষ মানুষই, তার দোষগুণ দুই থাকবে। মেস-বাড়ির ঠাকুর পেনু, লটারিতে দেড় লাখ টাকা পাওয়ায় কার না বুকে কম বেশি লেগেছে। বড়ালবাবু থেকে শুরু করে গজুবাবু পর্যন্ত সকলেরই। এমনকী বিজন, যার চালচুলো নেই, খাই দাই আড্ডা মারি করে দিন কাটাই, তার পর্যন্ত কেমন একটা খিঁচ লেগে গেল।
হরিদার কথায় বিজনের যেন অন্যমনস্কতা কাটল।
“পেনু একটা গাধা। গাধা না হলে কেউ হাতের মুঠো আলগা করে দেড় লাখ টাকা জলে ফেলে দেয়!”
বিজনের দাড়ি কামানো শেষ। এবার সব খেয়াল করতে পারছে। কেন যেন হঠাৎ একটু বেখেয়াল হয়ে গিয়েছিল।
“টিকিট হারাল কেমন করে?” বিজন জিজ্ঞেস করল।
“পেই জানে। এক-একবার এক-এক রকম বলছে। এখন আর পা ছড়িয়ে বসে ডুকরে বুক চাপড়ে কেঁদে কী হবে! তখন তো ভালো কথা কানেই তুলল না।”
বিজন গালের ওপর হাত বোলাতে লাগল। আজকালকার ব্লেডগুলো একেবারে বাজে। দুবার গালে তুললেই তার জান খতম হয়ে গেল। নিজের গাল দেখে বিজনের মনে হল, খুব একটা সাফসুফ হয়নি। চলে যাবে এ পর্যন্ত।
উঠে পড়ল বিজন আয়না ব্রাশ সেফটি রেজার নিয়ে। হরিদার ধুতি গেঞ্জি পরা শেষ, চুল আঁচড়ানোও হয়ে গিয়েছে। এবার খেতে যাবেন।
বিজন বলল, “মানিকদা নীচে নেই?”
“মানিক মিত্তির আর বড়ালবাবু মিলে ঘোঁট পাকাচ্ছে।” “কিসের ঘোঁট?”
“কে জানে! দুটোই তো সমান।…তুমি যাই বলো বিজন, যাদের কানের লতি কাটা হয় তাদের আমি দু’চোখে দেখতে পারি না। মানিক মিত্তিরের কান দেখলেই লোকটাকে পয়লা নম্বরের ধান্ধাবাজ বলে মনে হয়।”
বিজন হেসে ফেলল। হরিদার কথাবার্তাই এইরকম। মনুষ্যচরিত্র বিচারের ব্যাপারে হরিদার এক ধরন আছে। কার কান ছোট, কার কান খাড়া, কার চোখ বেশি লাল, কার কপাল চেটালো, কার নাক উঁচু—এই সব দেখে মানুষের স্বভাব বিচার করেন হরিদা। বিজনকে বলেন, তুমি হলে গবা-গোবিন্দ, তোমার কিছু হবে না।
হরিদা আর দাঁড়ালেন না, নীচে চলে গেলেন।
নীচে তখনও রইরই চলছে। বিজন খানিকটা পরে নীচে নামল। স্নানের জন্যে তৈরি হয়ে।
নীচে নেমে দেখল, তখনও পেনু-পর্ব থামেনি। উঠোনে দাঁড়িয়ে অখিলদারা টিকিট হারানো নিয়ে কথা বলছেন। পেনু বারান্দার একপাশে বসে আছে; খালি গা; চোখমুখ বসে গেছে তার। একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেলে যেমন দেখায় সেইরকম দেখাচ্ছে তাকে।উঠোনে তিনজন। দত্তবাবু, অখিলদা আর মেজোবাবু। দত্তবাবু বড়বাজারের এক বাঙালি ব্যবসাদারের গদিতে কাজ করেন, অখিলদা হলেন বুকিং ক্লার্ক, চৌরঙ্গিপাড়ার এক সিনেমা হাউসে টিকিট বিক্রি করেন, মেজোবাবুর স্টল আছে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে।
দত্তবাবু বলছিলেন, “পেনু, তুমি বরং একটা কাজ কর। মলঙ্গা লেনে একজন আছে বাটি চালতে পারে। তাকে ধরে নিয়ে এসো।”
অখিলদা বললেন, “রাখো তোমার বাটি-চালা। ওসব বুজরুকি গাঁয়ে চলে, কলকাতা শহরে বাটিচালা, চালপোড়া চলে না। কেন তুমি ওকে বাজে ব্যাপারের মধ্যে যেতে বলছ, দত্ত! ধোঁকাবাজিতে কাজ হয় না।”
মেজোবাবু সামান্য তোতলা, তিনি বললেন, “চু-চু চুরি, আর ইয়ে কি-কিনা হা-রানো—এক জিনিস নয়। হা-হারানো জিনিসের খোঁজ কড়িচালায় পাওয়া যায় ।”
“কড়িচালা? সেটা কী?”
“কালীঘাটে একজন আছে। মন-মন্তর পড়ে ক-কড়ি চালে। বত্তি-বত্তিরিশ টাকা নেয়। গুণী লোক।”
“হ্যাত, যত্ত সব রদ্দি ব্যাপার,” অখিলদা বললেন, “কড়িচালা! বত্রিশ টাকা নেয়।
এম.ডি. ডাক্তারের ভিজিট। না পেনু, তুমি একেবারে এসবের মধ্যে যাবে না। অনর্থক ছুটোছুটি, পয়সা খরচা, ফালতু তোমায় নাচাবে।…তুমি আবার সব খুঁজে দেখো ঘরের, তোমার বাক্স-প্যাঁটরা তন্ন তন্ন করে খোঁজো। না পেলে থানায় চলে যাও।”
“থানা….তুমি কি পাগল নাকি অখিল? থানা কি মামার বাড়ি যে যা খুশি আবদার করা যায়!” দত্তবাবু নাক কুঁচকে বললেন।
“কেন, যাবে না কেন! চুরি গেলে লোকে থানায় ডায়রি করাতে যায় না! থালা বাটি টাকা থেকে সোনাদানা হিরে-জহরত পর্যন্ত যে-কোনও জিনিস চুরি গেলেই লোকে থানায় ডায়রি করাতে যায়। চুরি ইজ চুরি। এমন কোনও নিয়ম আছে যে এই এই জিনিসগুলো চুরি গেলে ডায়রি নেওয়া হবে, অন্যগুলো হবে না! এমন কোনও নিয়ম নেই। হরি ঘোষে থাকতে একবার একজনকে আমি কুকুরের বাচ্চা চুরি যাওয়ার জন্যে ডায়রি করতে যেতে দেখেছি।”
দত্তবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমার মাথা দেখেছ। এমন আজগুবি কথা বলো তুমি। পেনু থানায় গিয়ে ডায়রি করাবে—তার লটারির চিকিট চুরি গিয়েছে। মেরে পেনুকে থানা থেকে তাড়িয়ে দেবে, যাক না পেনু!”
বিজনের হাসি পাচ্ছিল। মজাটা জমেছে ভালো। বাটিচালা, চালভাজা-খাওয়া থেকে থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে, এরপর এরা কী করবে?মেজোবাবু বললেন, “থা-থানা এমনি চু-চুরিতেই কিছু ক-করে না তো ল-ল-লটারির টিকিট। চু-চুরি না হা-হারানো তাও ক্লিয়ার নয়।”
অখিলদা বললেন, “হারাবার কেস হলে পেনুর দোষ, কারও কিছু করার নেই। চুরির কেস হলে অন্য ব্যাপার।”
“কী বলছ তুমি?” দত্তবাবু চটে গেলেন, “এতগুলো লোককে তুমি চোর বলছে?” “আমি বলিনি, তোমরাই বলছ! তোমরাই তখন থেকে বলতে শুরু করেছ, কেউ-না-কেউ টিকিটটা হাতিয়েছে।”
“বাজে বোকো না, কথাটা আমি বলিনি, যে বলেছে তাকে বলো।”
দত্তবাবুর কথা শেষ হতে না-হতেই বড়ালবাবু তাঁর গুমখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। বড়ালবাবুর ঘরকে মেসের সবাই আড়ালে গুমখানা বলে।
বড়ালবাবু সোজা কথার মানুষ। এসেই বললেন, “আমি বলেছি, এই আমি বলেছি—” বলে বুকে বুড়ো আঙুল ঠুকলেন। গলা চড়িয়ে দিলেন আরেক ধাপ, “আমি বলেছি, এখনও বলছি, পেনুর টিকিট কেউ-না-কেউ হাতিয়েছে। আমি কারওর নাম বলিনি। এতে যদি অপরাধ হয়ে থাকে, হোক। সত্যি কথা বলতে শিবু বড়ালের মুখে আটকায় না। বড়াল তোমাদের ডোন্ট কেয়ার করে। আমি বলব আমার যা মনে হয়। এতে যার ইচ্ছে হয় মেসে থাকুক, যার মানে লাগবে মেস ছেড়ে দিতে পারে। আমি কচুর কেয়ার করি না।”
পাশেই খাবারঘর। পাত পেড়ে খাওয়ার বদলে এখন লম্বা সরু টেবিল আর বেঞ্চিতে বসে খেতে হয়। দু-চার জন নাকে মুখে গুঁজে নিয়ে উঠে পড়ছিল। তাদের মধ্যে আনন্দ ছিল অতি ফাজিল ছেলে। এঁটো হাতে বেরিয়ে এসে বলল, “বড়ালদা, চালে ভুল হচ্ছে আপনার। মেস ছেড়ে দিলে আপনি চোর ধরবেন কেমন করে! মেস কেউ ছাড়তে পারবে না, সবাইকার তল্লাসি হবে, ঘরদোর, বাক্সে-প্যাঁটরা, মায় পরনের জামাগাপড়। প্রথমে সার্চ, তারপর কথা—তাই না!” বলে আনন্দ মুখ ধুতে কলতলায় চলে গেল।
ততক্ষণে মানিকদা বেরিয়ে এসেছেন বড়ালবাবুর ঘর থেকে। বললেন, “আঃ শিবু, মাথা গরম কোরো না। ঘরে এসো। আমি একটা মতলব বার করেছি।”
বড়ালবাবু আবার তাঁর গুমখানায় ঢুকে গেলেন।
দুই
অফিসে গিয়ে বিজন শুনল, মধ্যমগ্রাম যাওয়া হচ্ছে না। পরিতোষ খবর দিয়ে গিয়েছে বাড়িতে একটা ঝঞ্ঝাট বেধেছে, সে যেতে পারছে না। আসছে শনিবার যাবে।
বিজন মুষড়ে পড়ল। সবে গরম পড়ছে। চৈত্র মাসের শুরু। ভেবেছিল কলকাতার বাইরে গিয়ে একটা দিন আমেজ করে আসা যাবে, তা আর হল না।
বিকেলের দিকে বন্ধু মুকুলের সঙ্গে চা খেতে খেতে বিজন বলল, “পরিতোষ ডুবিয়ে দিল। কোথায় ভাবলাম আমজামের ছায়ায় বসে ঘুঘুর ডাক শুনব আর মাছ ধরব—দিল সব ভেস্তে।”
মুকুল বলল, “ঘুঘুর ডাক শুনতে মধ্যমগ্রাম যেতে হবে না, কলকাতায় কি কম ঘুঘু?”
বিজন প্রথমটায় বুঝতে পারেনি, তারপর বুঝল। বুঝে হেসে উঠল।
“তোকে একটা খবর দিতে ভুলে গেছি।” বিজন বলল।
“কী খবর?”
“আমাদের মেসের পেনুঠাকুর লটারিতে দেড় লাখ টাকা পেয়েছে।”
“অ্যাঁ! …দেড় লাখ! বলিস কী!” মুকুল অবাক হয়ে বিজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। “কোন লটারি? ওয়েসট বেঙ্গল?”
“না।”
“ওয়েস্ট বেঙ্গলেই টাকা কম, আর সব জায়গায় তিন পাঁচ সাত—লাখ লাখ টাকা।”
‘এটা ওয়েস্ট বেঙ্গল নয়। কিসের একটা চ্যারিটির।”
মুকুল হঠাৎ বলল, মজার গলায়, “লটারিতে টাকা পাওয়া লোক আমি একটাও দেখিনি। শুনেই আসছি এ পেয়েছে ও পেয়েছে। এই প্রথম চেনাশোনা একটা লোককে দেখব যে লটারিতে টাকা পেয়েছে। চল, আজ তোর মেসে গিয়ে পেনুঠাকুরকে দেখে আসি।”
“দেখতে যেতে পারিস, তবে মন খারাপ হয়ে যাবে।” বিজন যেন রহস্য করেই বলল।
“কেন? হিংসে হবে বলছিস! না রে ভাই, নো জেলাসি। লটারিতে যে টাকা পায় তার সাত জন্মের পুণ্য থাকে, আমার এক জন্মেরও নেই। চল, একবার পেনুঠাকুরের গা ছুঁয়ে আসি।” মুকুল হাসতে লাগল।
বিজন বলল, “গা ছুঁয়ে লাভ হবে না। পেনু মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে রে! তার দেড় লাখ টাকা সেরেফ পকেটমার হয়ে গেছে! ধর, জলেই পড়ে গেছে।”
“মানে?”
“পের টিকিটটাই হারিয়ে গিয়েছে। লস্ট।”
“হারিয়ে গিয়েছে! এই যে বললি প্রাইজ পেয়েছে।”
বিজন এতক্ষণে একটা সিগারেট ধরাল। বলল, “পেয়েছিল। গত কাল পেয়েছিল। সন্ধে কি রাত পর্যন্ত পেনু দেড় লাখ টাকার মালিক ছিল কাগজে-কলমে। আজ সকালবেলায় তার সব টাকা গঙ্গায় পড়ে গিয়েছে। মানে, পেনুর টিকিটটা হারিয়ে গিয়েছে।”
মুকুল কেমন বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। কথা বলতে পারল না ক’মুহূর্ত। পরে বলল, “টিকিট হারিয়ে গেছে! বলিস কী রে।”
“হ্যাঁ। আবার কেউ কেউ বলছে, চুরি। টিকিটটা কেউ চুরি করেছে।” “চুরি?”
“বলছে তো তাই।”
মুকুল ভাবল সামান্য, বলল, “হতে পারে। যে টিকিটে টাকা উঠেছে, সেই টিকিটটা যদি কেউ হাতে পায় ছেড়ে দেবে! চুরিও হতে পারে। কিন্তু তোদের মেসে এমন কে আছে যে পেনুঠাকুরের টিকিট চুরি করবে!’
“কী জানি! আমি তো ভেবেই পাই না।”
“তবু ভেবে দেখ না একটু! কাকে তোর সন্দেহ হয়?”
বিজন মুকুলের চোখে চোখে তাকাল। “সকলকে।”
“সকলকে?”
“হ্যাঁ। টাকার লোভে যদি চুরি করতে হয়—সকলেই করতে পারে।”
“ও তো কথার কথা,” মুকুল বলল, “সবাই তো আর চোর নয়। কেউ একজন করেছে। কে কে করতে পারে সন্দেহ হলে তবে না চোর ধরার চেষ্টা হতে পারে।” বিজন হাসল। বলল, “দেখ ভাই, যদি প্রয়োজনের কথা ধরিস—আমরা যারা বড়ালবাবুর মেসে থাকি, আমাদের কাছে দেড় লাখ টাকা স্বপ্ন। লোভ সকলেরই আছে। তবে মনে মনে লোভ থাকা আর দেড় লাখ টাকা হাতাবার চেষ্টা এক নয়। এখন যদি তুই বলিস—টাকা হাতাবার মতন ধুরন্ধর কে কে আছে, তা হলে অবশ্য ভাবতে হবে।”
“তাই ভাব।”
“ভেবে লাভ! আমি কি গোয়েন্দা? না আমায় কেউ গোয়েন্দাগিরি কাজটা দিচ্ছে? তা ছাড়া চুরির ব্যাপারটা ফালতু হতে পারে। পেনু হয়তো টিকিটটা হারিয়েছে। অনর্থক চোর খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করব কেন?”
তিন
মেসে ফিরতে ফিরতে বিজনের রাত হল সামান্য, মুকুলের সঙ্গে সিনেমায় গিয়েছিল, সিনেমা-ফেরত মেসে। ঘরে পা দিতে না-দিতেই শুনল, আজ বিকেলের দিকে জবরদস্ত ঝগড়া গলাবাজি হয়ে গিয়েছে। সেই ঝগড়ার জের বড় জোর ঘণ্টাখানেক হল থেমেছে।
ব্যাপার কী?
হরিদা বললেন, তিনি ফিরেছেন সন্ধের মুখে, সবিস্তারে বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তবে তিনি এসে যা শুনেছেন যা দেখেছেন বলতে পারেন। ঝগড়ার শুরু অনাদি চাটুজ্যেকে নিয়ে। অনাদি প্রতি শনিবার বাড়ি যায়, ফেরে সোমবার অফিস-ফেরত। অনাদির বাড়ি ছোটজাগুলিয়া। বাড়ি যাবে বলে অনাদি তৈরি হচ্ছিল। টুকটাক জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছে সে—হঠাৎ বড়ালবাবুর হুকুম হল, মেস ছেড়ে বাড়ি যাওয়া চলবে না।
তার মানে? যাওয়া চলবে না মানে?
মানে, কাল সকালে তালতলা থেকে নবীন সাঁই আসছে। নবীন সাঁই হারানো জিনিস, চুরি যাওয়া জিনিসের হদিস বলে দিতে পারে। আরও অনেক কিছু পারে। লোকটা গুপ্তবিদ্যা জানে। তবে নেশাভাঙ করে করে নিজের গুণ নষ্ট করছে।
অনাদি চটে লাল হয়ে গেল বড়ালবাবুর ওপর। সে সামান্য চাকরি করে, গরিব, দেশে চার-পাঁচজন পুষ্যি বলে বড়ালবাবু তাকে চোর বলে সন্দেহ করবে? এই অবস্থায় সকলেরই আত্মসম্মানে লাগার কথা, অনাদিরও লাগল। ঝগড়া শুরু হয়ে গেল বড়ালবাবু আর অনাদিতে।
সেই ঝগড়াই গড়াতে লাগল, অফিস-ফেরতা নিবারণদা ও আরও কেউ কেউ এসে পড়ায় ঝগড়া জমে গেল। শেষ পর্যন্ত দুটো দল হয়ে গেল বাবুদের মধ্যে। বড়ালবাবু, মানিক মিত্তির, যতীনবাবু—এরা একটা দল, জনা-চারেক হবে বড়ালবাবুর দলে। বাকি ছ’জন অনাদির দলে। জনা-দুয়েক তখনও ফেরেনি, অন্য দু’জন অফিস থেকেই বাড়ি চলে গিয়েছে—বড়ালবাবু তাদের আটকাবার সুযোগই পাননি।
ঝগড়ার শেষ কখনও হয় নাকি? তখনকার মতন চাপা পড়েছিল। বড়ালবাবুর ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাচ্ছিল, মাথা আর মুখ কোনওটাই ঠিক ছিল না বলে ঝগড়াটা তখনকার মতন থেমে গিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে গজরাচ্ছিল দুই পক্ষ।
হরিদা বললেন, “বড়ালবাবুরা মেসটা তৈরি করেছিলেন বলে তার মালিক হয়ে গেছেন—এমন ব্যবহার করেন। জিনিসটা ভালো না। তুমি যদি মালিকানা করবে—এটাকে হোটেল করে ফেল, বিজনেস লাইসেন্স নাও, খাতাপত্তর কর, অফিস কর। কিছুই করব না, বসে বসে মালিকানা করব, তাই কি হয় নাকি?”
বিজন বলল, “ঠিকই বলেছেন। তবে বড়ালবাবুর তো আর কিছু করার নেই, খোঁড়া মানুষ, একা লোক, খবরদারি করার নেশা ছাড়তে পারেন না।”
হরিদা বললেন, “এবার ছাড়তে হবে হে। দিনকাল পাল্টে যাচ্ছে, বুঝছ না। মাতব্বরি আর সহ্য করবে না কেউ।”
বিজন কিছু বলল না। গা-হাত ধুয়ে বিজন গেল ছাদে একটু পায়চারি করতে। ছোট ছাদ। আলসের অর্ধেকই ভাঙাচোরা। প্রচণ্ড গরম পড়লে মেসের অনেকেই রাত্রে ছাদে মাদুর বিছিয়ে শোয়। সন্ধের দিকেও পায়চারি, গল্পগুজব করে অনেকেই।
ছাদে এখন কেউ ছিল না। বিজল অলসভাবে পায়চারি করতে লাগল। আকাশভরা তারা। আজ কী তিথি কে জানে। মাঝে-মাঝে ফুরফুর হাওয়া দিচ্ছিল। চারদিকের বাড়িগুলো এমন গায়ে গায়ে বাঁকাচোরা ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে যে, ভালো করে হাওয়াও আসে না। বিজনের শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল, মোটামুটি ঠাণ্ডা রয়েছে ছাদে, আরাম লাগছিল।
নোংরা ছাদ। ধুলোময়লায় ভর্তি। বিজনের শোয়া হল না। নীচে নেমে গিয়ে মাদুর শতরঞ্জি আনতেও তার উৎসাহ নেই, অলসভাবে পায়চারি করতে লাগল।
আর হঠাৎ তার মনে হল, পেনুর টিকিট হারানো নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করলে কেমন হয়। মুকুল যা বলছিল, সময় কাটবে, ঘিলু সাফ হবে, চাই কি উত্তেজনাও হতে পারে—তেমন তো হতেই পারে।
বিজনের নিজেরাই হাসি পেল। আবার ভাবল, হাসির কিছু নেই। দেড় লাখ টাকা চুরি সোজা কথা নয়। এখন না-হয় টাকার দাম গোয়ালার দুধের মতন হয়ে গেছে—বিশ-পঁচিশ বছর আগে হলে কী হতো?
বিজন গোয়েন্দা-বই অজস্র পড়েছে। হাতে এলে এখনও পড়ে। একজন গোয়েন্দার মগজ এমন কিছু নয়। বইয়ের গোয়েন্দারা লেখকের বরপুত্র যেন, লেখকরাই তাদের বাঁচায়। লেখকের জন্যেই তারা সব গোয়েন্দা, নয়তো বুদ্ধির খেলা এমন কী রয়েছে তাদের।
বিজন একবার গোয়েন্দা হয়ে দেখতে পারে—ব্যাপারটা কেমন?
এমন সময় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
এ-বাড়ির ছাদের সিঁড়ি কাঠের। খোলা সিঁড়ি। সেকেলে বাড়িতে আকছার যেমন দেখা যায় এদিকে।
পায়ের শব্দ হচ্ছিল।
একটু পরেই আনন্দকে দেখা গেল। বিজনেরই সমবয়েসি। চাকরি করে পোর্টে। পাওয়ার লিগে ফুটবল খেলে। সব ব্যাপারে তুখোড়। ঠোঁটকাটা। দেখতেও ভালো। বিজনকে ‘বিজনদা’ বলে, বয়েসের জন্যে নয়, আদর করেই।
আনন্দ বলল, “হরিদা বললেন, তুমি ছাদে। হাওয়া খাচ্ছ?”
বিজন মাথা নাড়ল গম্ভীরভাবে। মজার ভাবটা প্রকাশ করল না। বলল, “চিন্তা করছিলাম।”
“চিন্তা, কিসের?”
“বলতো কিসের চিন্তা?”
“জানি না। তোমার আবার চিন্তা। …তুমি মেসের কেচ্ছার কথা শুনেছ? এখানে আর থাকা যায় না। ভদ্দরলোকের মেস, না ছোটলোকের?”
বিজন বলল, “সব শুনেছি। নিজের চোখেও তো কিছু কিছু দেখছি। আমি ঠিক এ ব্যাপারটাই ভাবছিলাম আনন্দ। ভাবছিলাম, একবার গোয়েন্দাগিরি করলে কেমন হয়?”
‘গোয়েন্দাগিরি? মানে ?”
“মানে–পেনুর লটারির টিকিট নিয়ে গোয়েন্দাগিরি।”
আনন্দ যেন বিরক্ত হল। “তোমার সব ব্যাপারে তামাশা !’
“না রে! তামাশা নয়। সিরিয়াসলি বলছি।” বলে বিজন আনন্দকে টেনে নিয়ে চলে গেল ছাদের পশ্চিম কোণে। গঙ্গাজলের ট্যাংকের কাছে। নামেই ট্যাংক। কবেকার একটা ট্যাংক, ফুটোফাটা হয়ে পড়ে আছে। আজকাল আর জলও ওঠে না।
ট্যাংকের পাশে সিমেন্টের উঁচুমতন জায়গা খানিকটা, কোনওরকমে বসা যায়। বিজন আনন্দকে টেনে নিয়ে ভাগাভাগি করে বসল। বলল, “আমাদের ইনভেসটিগেশানের কোড নাম হবে অপারেশন পি।” বলে বিজন হো-হো করে হেসে উঠল।
আনন্দও হেসে ফেলল।
হাসি থামলে বিজন বলল, “এবার কাজ শুরু করা যাক। ফাজলামি নয়।…আচ্ছা, প্রথম কথা হল, আমাদের গোড়ায় গলদ করলে চলবে না। প্রথমেই দেখতে হবে, পেনু টিকিট হারিয়ে ফেলেছে কিনা! যদি হারিয়ে ফেলে থাকে—তবে কারও কোথাও দোষ নেই।”
‘কেমন করে বুঝব হারিয়েছে কিনা?”
“পেনুকে খুঁচিয়ে জানতে হবে।”
“পেনু তো এখনও থেকে থেকে ভিরমি খাচ্ছে।”
“যাক টিকিট খুঁজে দেব শুনলে জ্যান্ত হয়ে বসে পড়বে। দেড় লাখ টাকা।” “তা ঠিক। আমরা ধরে নিচ্ছি, অনুমানে, হারায়নি। টিকিটটা চুরি গেছে।” “ধরলাম।’
“তা হলে কে চুরি করল?”
“কেনই বা করবে?”
“ঠিক। যে চুরি করেছে—সে টাকার লোভে করেছে। এই সব লটারির টিকিটে কোনও নাম থাকে না। কেনার সময়ও কেউ নাম লিখিয়ে নেয় না। নম্বরই আসল। তোর জিনিস আমি যদি হাতিয়ে নিই—টাকাটা আমিই পাব।”
“তা পাও। আমার কপালে লটারি নেই। দু-চার বার ওয়েস্ট বেঙ্গল কেটেছি। দশ মাইল তফাত দিয়ে প্রাইজগুলো বেরিয়ে গিয়েছে।” আনন্দ হাসল।
বিজন বলল, “চুরি যদি হয়ে থাকে, মেসের কেউ করেছে।”
“কেন? বাইরের লোক করতে পারে না? পেনু বাইরের কাউকে টিকিট দেখায়নি? পেনুর কাছে বাইরের লোক পান-গুণ্ডি খেতে আসে না? গল্প করতে আসে না? পেনুর ঘরে যে দুপুরবেলা টুয়েন্টি নাইন তাস চলে, সেই তাসের দলও তো টিকিট চুরি করতে পারে।”
“পারেই তো। সেটাও বিবেচনা করতে হবে। …তবু ধরে নেওয়া যাক মেসের কেউ চুরি করেছে। টাকার লোভেই করেছে। এবার কথা হল, আমরা কাকে কাকে বেশি সন্দেহ করব, কাকে কম, কাকে একেবারেই করব না।”
“তুমিও তা হলে সন্দেহের মধ্যে পড়ছ?”
“তুই আমি—সবাই। একমাত্র বাদ যাচ্ছেন দাশদা, কেননা দাশদা গত পাঁচ দিন থেকে মেসে নেই। ও. কে.?”
মাথা নাড়ল আনন্দ ।
বিজন বলল, “এবার আমাদের মেসের ডিটেলটা একটু দেখা যাক। বাড়িটা আড়াইতলা। আড়াইতলাও নয়—পৌনে-দু’তলা। বাসিন্দে জনা-পনেরো।”
“নাম বলব বাসিন্দেদের?”
“বল”
“বড়াল দি গ্রেট, মেজোবাবু, দত্তবাবু, হরিদা, চাটুজ্যেদা, অখিলদা, দাশদা, নিবারণদা, জ্যোৎস্নাবাবু, গানের মাস্টার, তুমি, আমি, করালীবাবু আর যতীনবাবু। সব নামই বললাম তো?”
“বলেছিস বোধহয়। …এর মধ্যে মানিকদা নেই, তাঁকেও ধরতে হবে। তাঁর দশ-আনা এখানে; ছ-আনা বাড়িতে।”
“লোকটাও জাঁহাবাজ।”
“মানিকদার মতন জাঁহাবাজ, ধূর্ত, চারদিকে নজর রাখে, লোভী আর কে কে আছে?”
আনন্দ সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পারল না। ভাবছিল। শেষে বলল, “জ্যোৎস্নবাবু লোকটাও সুবিধের নয়। শুনেছি ওর বিস্তর ধার দেনা, জুয়াটুয়াও খেলে, মারদাঙ্গা টাইপের।”
“গানের মাস্টারকেও তুই সাসপেক্ট হিসেবে ধরতে পারিস। আমি ওকে রিজেন্ট সিনেমার কাছে রেস্টুরেন্টে ফেকলু সিনেমা পার্টির ছোঁড়াদের সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারতে দেখেছি। কিসের একটা সিনেমা করবে বলে বোলচাল দিচ্ছিল। গানের মাস্টার ধারে ডুবে আছে। বড়ালবাবু প্রায়ই বলেন, ওকে আর মেসে রাখা যাবে না। মেসের প্রত্যেকের কাছে ওর বিশ পঁচিশ পঞ্চাশ টাকা ধার।” বলে একটু থেমে আবার বলল, “অথচ বড়ালবাবু গানের মাস্টারকে তাড়ায় না।”
“কাল আবার মাথা ফাটিয়ে বসল মাস্টার।”
“শুনলাম। লেগেছে জোর?”
“না, মারাত্মক কিছু নয়? ….মাঝরাত্তিরে বাতি না জ্বেলে কেউ ওই কলতলা দিয়ে বাথরুমে যায়? বুদ্ধিখানা কী!”
বিজনের হঠাৎ যেন মাথায় কী এসে গেল। হাত তুলে বলল, “দাঁড়া দাঁড়া, এটা তো ভেবে দেখিনি। …হ্যাঁ, হতে পারে, হতে পারে। গানের মাস্টাররা থাকে নীচের তলায়। গানের মাস্টার, বড়ালবাবু, দাশদা, মেজোবাবুর দল। আমাদের পেনু আর গিরিধারীর ঘরও কাছাকাছি। গানের মাস্টার অন্ধকারে বাথরুমে যেতে গিয়ে কলতলায় পা পিছলে পড়েছে, না, দু নম্বর চোর তাকে অন্ধকারে দেখতে পেয়ে মাথায় মেরেছে?”
আনন্দ বোকার মতন বিজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। গল্পের গোরু গাছে ওঠে, গোয়েন্দাদের মাথা যেমন সাফ তাতে গোরুকে পাহাড়েও চড়িয়ে দিতে পারে। আনন্দ বলল, “তুমি আবার দু’নম্বরও পেয়ে গেলে!’
বিজন বলল, “আমি যদি গোয়েন্দা হই, চারজনকে অন্তত সাসপেক্ট করব। মানিকদা এক নম্বর, দু নম্বর গানের মাস্টার, তিন নম্বর জ্যোৎস্নবাবু, চার নম্বর পেনুর মনিব বড়ালবাবু।”
আনন্দ আঁতকে উঠে বলল, “সর্বনাশ বিজনদা, তুমি বড়ালবাবুর নামও মুখে এনো না, মেস থেকে ঘাড় ধরে বার করে দেবে।”
“অত সস্তা! দিক না বার করে! কর্পোরেশনের ময়লা-ফেলা গাড়ি করে বড়ালচাঁদকে তুলে নিয়ে ধাপায় জমা করে দেব।”
আনন্দ জোরে হেসে উঠল। বিজনের মতন নিরীহ, সাদামাটা, শান্ত লোক যখন বিক্রম দেখাবার কথা বলে তখন না হেসে পারা যায় না।
বিজন নিজেও হাসছিল।
হাসাহাসি শেষ হলে বিজন বলল, “তুই একটা সোজা কথা বল তো! ওই বড়ালবাবু আর তার শাকরেদ মানিকদা—দুজনে মিলে গুমখানায় বসে কিসের ফন্দি আঁটছে সারাদিন? আমি দুটোকেই ঘোরতর সন্দেহ করি।”
আনন্দ বলল, “ওঁরাই আবার মাতব্বরি বেশি করছেন।”
“তা তো করবেনই। পেনুর গার্জেন যে।”
“তা হলে নবীন সাঁই? বড়ালবাবু যে নবীন সাঁইকে আনছেন কাল ?”
“বোগাস। নবীন সাঁই কী করবে! সে বেটা বড়ালবাবুদের পয়সা-খাওয়া লোকও হতে পারে। পুরো ব্যাপারটা অন্য দিকে চালিয়ে দেবে। ওটা ধাপ্পাও হতে পারে। …যাকগে, আমাদের কাজ আজ থেকেই শুরু করা যাক। তুই পেনুকে ধর। ডিটেল জেনে নে। আমি অন্যদের ওপর চোখ রাখছি।”
চার
বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, তালতলার নবীন সাঁই এল না। মেসের মধ্যে একটা চাপা গুমোট অবস্থা চলেছে। বড়ালবাবুর ওপর রাগে গজরাচ্ছিল অনেকেই। বড়ালবাবুর হুকুম ছিল, নবীন না আসা পর্যন্ত কেউ যেন মেসবাড়ি ছেড়ে না যায়। অবশ্য এমনিতে মেসবাড়ির বাসিন্দেরা রবিবারের সকালটা যে যার নিজের কাজকর্মের জন্যে রাখে। সারা সপ্তাহের জমানো কাজ—চুলকাটা, জুতো সাফ থেকে জামাকাপড় চাদর গেঞ্জি কাচা পর্যন্ত—যার যা জমে আছে সেরে ফেলে। তবে নিজের মর্জিতে মেসে থাকা আর হুকুম মেনে মেসে বসে থাকার মধ্যে অনেক তফাত।
বড়ালবাবুর হুকুম মানতে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত অকারণ অশান্তি বাড়াল না কেউ। মনে মনে খেপে থাকল। বড়ালবাবুকে দেখে নেব-গোছের এক ভাব নিয়ে সকালটা কাটিয়ে দিল।
আনন্দ আর বিজন নিজেদের মতন করে গোয়েন্দাগিরি শুরু করল। ওদের ভাবভঙ্গি থেকে বোঝার উপায় ছিল না—কোনও মতলব এঁটে নেমেছে দুজনে।
বিকেলের দিকে দুজনে গেল গলিতে চায়ের দোকানে চা খেতে। কথাবার্তা সেখানেই হবে।
দোকানে বসে আনন্দ বলল, “বিজুদা, পেনুর টিকিট নিয়েই তো গোলমাল আছে।” বিজন অবাক হয়ে বলল, “সে কী! জাল টিকিট নাকি?”
“সাচ্চা ঝুটা জানি না। ব্যাপারটা বলি তোমায়—শোনো।”
আনন্দ যা বলল তার থেকে ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়ায়। পেনু হল ঝাড়গ্রামের লোক। বাড়ি কাছে বলে প্রায়ই তার আত্মীয়স্বজনরা পেনুর কাছে আসে এক-আধবেলা থাকতে, খোঁজখবর নিতে। পেনুর নিজের কোনও সংসার নেই, বিয়ে-থা করেনি। তার গ্রামতুতো ভাইপো-ভাগ্নের সংখ্যাই বেশি, নিজেরও দু-চারজন আছে। এক ভাগ্নে এসেছিল ক’দিন আগে। সে কলেজ স্ট্রিট থেকে একটা টিকিট কিনে এনে দিয়েছিল পেনুকে। কেন দিয়েছিল তাও পেনু জানে না। ভাগ্নে বলেছিল, দোকানের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, তমলুকের লোক, গপ্পটপ্প হচ্ছিল—তা একটা টিকিট কেটে নিলুম। তুমি রেখে দাও, মামা।
এই দোকানটা পেনু জানে না, চোখেও দেখেনি। কলেজ স্ট্রিটের তামাম এলাকায় লটারির দোকান কি কম!…তা টিকিটের কথাও পেনু ভুলে গিয়েছিল। কথাটা জানত গিরিধারী, পেনুর অ্যাসিসটেন্ট। মানে মেসবাড়ির রান্না, মসলাবাটা, খেতে দেবার সময় থালা গ্লাস এগিয়ে দেওয়ায় পেনুর ডানহাত। গিরিধারী মেজোবাবুদের ঘরে গিয়েছিল চা দিতে সকালবেলায়, টাটকা খবরের কাগজ হাতে করে মেজোবাবুরা পাতা ওলটাতে ওলটাতে কী কথায় যেন লটারির টিকিটের কথা বলছিলেন। গিরিধারীর মনে পড়ে গেল, পেনুর কাছে একটা টিকিট আছে। সে অতশত বোঝে না। এসে পেনুকে বলল।
পেনু তার টিকিট নিয়ে গেল বড়ালবাবুর কাছে। এই মেসে তিনটে বাংলা কাগজ আসে। একটা কাগজ কেনেন বড়ালবাবু, একটা কেনেন মেজোবাবু আর অন্য কাগজটা যায় হরিবাবুর কাছে। তিনটে বাংলা হলেও তিন নামের কাগজ। অন্য বাসিন্দরা কাগজ কেনে না, চেয়েচিন্তে দেখে নেয়।
বড়ালবাবু পেনুর টিকিট মেলাবার পর নিজে থেকে কিছু বলেননি, চুপ করে ছিলেন। বড়ালবাবুর সামনে ছিল অনাদি, সে হঠাৎ টিকিটটা টেনে নিয়ে কাগজ দেখে মিলিয়ে নিল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, “পেনু, এ যে তোমার টিকিটের নম্বর। ফার্স্ট প্রাইজ।” বড়ালবাবু ভীষণ চটে গিয়েছিলেন অনাদির চেঁচামেচিতে। এইভাবে চেঁচিয়ে টাকার ব্যাপার বলতে হয়!
তা পেনুর লটারিতে ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়ার খবরটা তারপরই মেসের মধ্যে রটতে থাকে। মুখে মুখে সেটা বাইরেও সামান্য রটেছিল কিনা কে জানে।
বিজন মন দিয়ে সব শুনছিল। চা খেতে খেতে বলল, “বড়ালবাবুর এত সাবধান হবার কারণ অতগুলো টাকা একজন মেসের বামুনঠাকুর পেয়েছে—এটা চট করে রটিয়ে দিতে চাননি ?”
“উল্টোটাও হতে পারে,” আনন্দ বলল, “পেনুঠাকুর লেখাপড়া জানে না। তার টিকিটে টাকা উঠেছে—এটা যদি তাকে না জানিয়ে সরিয়ে ফেলা যায়, তবে লুকিয়ে লুকিয়ে টাকাটা নিজে হজম করা চলে।”
“তাতে খানিকটা রিস্ক আছে।…পেনু যদি টিকিটটা ফেরত নিয়ে অন্য কাউকে দেখায়।”
“তাই কি কেউ দেখায়! একবার দেখলাম—নম্বর মেলালাম, হল না—ফুরিয়ে গেল। সেই টিকিট নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় না। আরে আমরাও তো এক-আধবার কেটেছি। যেই দেখেছি ফক্কা, টিকিটটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। পেনু, যে বেচারি টিকিটের ‘ট’ বোঝে না, তার কাছে একটুকরো ছাপা কাগজের কী দাম!” বলে আনন্দ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করল।বিজন বলল, “তার মানে তুই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে চাইছস বড়ালবাবুর তাল ছিল পেনুকে মিথ্যে কথা বলে টিকিটটা হাতানো?”
আনন্দ মাথা হেলিয়ে বলল, “হতে পারে।”
বিজন আনন্দের দেওয়া সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া টানল জোরে জোরে, বলল, “ব্যাপারটা তা হলে এইভাবে দাঁড় করানো যাক।”
বাধা দিল আনন্দ। বলল, “তুমি কি জান, মানিকদা পেনুকে বলেছিলেন, টিকিটটা তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখতে—তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন ! ”
“পেনু বলল?”
“হ্যাঁ, পেনু বলল, মনিকবাবু তাকে আড়ালে ডেকে চুপিচুপি টিকিটটা তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখতে বলেছিলেন। পেনু রাজি হয়নি।”
“ও!…এখন তা হলে দুই বন্ধু–বড়ালবাবু আর মানিকদা গুমখানায় বসে কিসের পরামর্শ করছেন?”
“কী জানি!”
বিজন সামান্য চুপচাপ থেকে বলল, “এবার তা হলে একটা সিম্পল ম্যাথামেটিক্স করে এগুনো যাক আনন্দ। পয়েন্টগুলো হল, আমরা বড়ালবাবু আর মানিকদা দুজনকেই সন্দেহ করছি। বড়ালবাবুকে করছি—কারণ—বড়ালবাবু পেনুর টাকা পাবার খবর পেনুকে বলতে চাননি প্রথমে। আর মানিকদাকে করছি—কারণ, তিনি চুপিচুপি আড়ালে পেনুকে বলেছিলেন টিকিটটা তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখতে। তবে এই সন্দেহ নিছকই সন্দেহ, ধোপে টিকবে কি না বলা মুখকিল।”
“কেন?”
“বড়ালবাবুর কথা ধর। বড়ালবাবু বলবেন, পেনুর মতন মানুষকে ঝপ করে দেড় লাখ টাকার খবর দিলে মানুষটার মাথার গোলমাল হয়ে যেতে পারে বলে ঝট করে খবরটা দিতে চাননি। রইয়ে-সইয়ে দিতেন। তা ছাড়া, খবরটা বেশি জানাজানি হয়ে গেলে টিকিট চুরির ভয় ছিল—যা শেষ পর্যন্ত সত্যিই চুরি গেল।”
“পেনুও বলছে, টিকিট চুরি গিয়েছে। আমি তাকে নানা কায়দা করে জিজ্ঞেস করেছি। প্রতিবারেই এক কথা। টিকিটটা সে তার ঘরে কাঠের বাক্সের মধ্যে রেখেছিল।”
আনন্দ বলল।
কথাটা কানে তুলল না যেন বিজন, বলল, “মানিকদাকে আমরা সন্দেহ করছি। কিন্তু মানিকদাও বলতে পারেন–বাপু, দেড় লাখ টাকার টিকিট, কোথায় হারিয়ে ফেলবে পেনু—তাই আমার কাছে রাখতে বলেছিলুম। রাখতে বলেছি বলেই আমি চোর!”
আনন্দ বলল, “কেউ যদি চোর নয় তা হলে চোর কে ?”
“আমাদের অন্য দুজন সাসপেক্ট ছিল গানের মাস্টার আর জ্যোৎস্নাবাবু। এর মধ্যে গানের মাস্টার কাল মাঝরাতে মাথা ফাটিয়েছে। বলছে—কলতলায় পড়ে গিয়েছিল। তা সে যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, পেনুর ঘরের দিকে যে-চোর পাহারা দিয়ে বসে ছিল সে গানের মাস্টারকে জখম করেছে। গানের মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেছিস?”
“না, তেমন কথা কিছু নয়। এই এমনি দু-চারটে কথা। মাস্টারের জখম বেশি নয়। ব্যথা রয়েছে। জ্বর-জ্বর ভাব।”
“ওকে দেখে কী মনে হল?”
“বুঝতে পারিনি।”
“হুঁ! আর আমাদের জ্যোৎস্নাবাবু?”
আনন্দ দু-চারটে টান মারল সিগারেটে। ভাবল কিছু? বলল, “জ্যোৎস্নাবাবু গভীর জলের মাছ। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা গেল না।”
বিজন চায়ের কাপ অনেক আগে শেষ করেছিল, আবার দু’কাপ চায়ের হুকুম করল। তারপর আনন্দর দিকে তাকিয়ে বলল, “চোর কে তা ধরা না গেলেও একটা ভড়কি দেওয়া যায়।”
“কেমন ভড়কি?”
“বিকেলে আমরা একটা মিটিং ডেকে ফেলি।”
“মিটিং?”
“আরে শোন না, মিটিং মানে কি সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের জনসভা!…ধর, আজ সন্ধেবেলায় মেসের ছাদে সবাইকে আসতে বলা হল। পেনুর লটারির টিকিট চুরি যাবার ব্যাপারে আমরা একটা ব্যবস্থা নিতে চাই বলে সবাইকে জমায়েত হতে বলছি। মিটিংয়ে আমরা সবাই বলব, আমাদের মেসের ঠাকুর পেনুর লটারিতে টাকা পাবার ঘটনাটা আমরা কাগজে ছাপাতে চাই। সেই সঙ্গে একটা উকিলের নোটিশ। তাতে লেখা থাকবে, পেনু ঠাকুরের প্রাইজ পওয়া টিকিট, কে বা কারা চুরি করেছে। এ টিকিট যদি কেউ লটারিঅলাদের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখায়, টাকার দাবি তোলে—তা হলে যেন পেনু এবং পেনুর উকিলকে না জানিয়ে টাকা দেওয়া না হয়।”
আনন্দ মাথা নেড়ে বলল, “মামার বাড়ি? আমি বললাম, আমার টিকিট চুরি গেছে আর লটারিঅলারা তা মেনে নিল।”
“মানতে কে বলছে।! মানবে কি মানবে না—সেটা তাদের ব্যাপার। তুই আমার মতলবটা বুঝতে পারছিস না। আমি বলতে চাইছি, আমরা যদি বলি—কাগজে উকিলের নোটিশ ছাপিয়ে জানাব, পেনুর চুরি-যাওয়া টিকিট জমা দিয়ে টাকা হাতানো বন্ধ করব—তাতে কাজ হবে। চান্স আছে হবার।”
পাঁচ
পরের দিন সন্ধেবেলায়, সামান্য রাত হয়েছে হয়তো, এক ছোকরা গোছের লোক মেসে এসে হাজির। এসেই বিজনের নাম করে চেঁচাতে লাগল।
বিজন মনে মনে এরই অপেক্ষা করছিল। নীচে নেমে গেল। “আরে, আপনি দাশুবাবু! আসুন! কী খবর?”
“খবর তো আপনার কাছেই—আসতে বলেছিলেন।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন!” বলে বিজন বড়ালবাবুর গুমখানার দিকে এগুতে লাগল। আনন্দ যেন কাছকাছি কোথাও ওত পেতে ছিল। হাজির হয়ে ন্যাকার মতন বিজনকে বলল, “বিজুদা, পাতিলেবুর শরবত খাবে নাকি?”
“শরবত পরে হবে, আয় এদিকে। এই ভদ্রলোককে নিয়ে বড়ালবাবুর ঘরে যাচ্ছি। আয়। সেই টিকিটের ব্যাপার…।”
আনন্দ বলল, “তাই নাকি! চলো, চলো।”
বড়ালবাবুর ঘরে এসে ঢুকল তিনজনে। বড়ালবাবু আর মানিক মিত্তির কথা বলছিলেন।
বিজন ঘরে ঢুকেই বলল, “বড়ালদা, আরে মানিকদা এখনও আছেন, ভালোই হল। বড়ালদা, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দি। এঁর নাম দাশুবাবু। ইনি ওই সুরেন্দ্রনাথ কলেজের কাছে একটা ছোট্ট স্টলে বসে টিকিট বেচেন লটারির। অনেক খুঁজে খুঁজে এঁকে পেয়েছি। পেনুর টিকিট এঁর দোকান থেকে কেনা!”
বড়ালবাবু আর মানিক মিত্তির দুজনেই যেন কেমন থ মেরে গিয়েছিলেন। দেখছিলেন দাশুকে।
দাশু বলল, “হ্যাঁ স্যার! আমার দোকানের কপাল খুলে গিয়েছে। কাল যেই না দোকানের সামনে লাল সালু কিনে খবরটা লিখে ঝুলিয়ে দিলাম সঙ্গে সঙ্গে ভিড় লেগে গেল। আজ স্যার পাক্কা একশো চল্লিশ টাকার টিকিট বেচেছি। দোকানের কপালে এত টাকার টিকিট বেচা এই প্রথম।”
“কাল না রবিবার ছিল?” মানিক মিত্তির বললেন।
“লটারির টিকিট বেচার আবার শনি-রবি আছে নাকি?”
“আনন্দ, পেনুকে ডাক—” বিজন আনন্দকে বলল চোখের ইশারা করে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে দাশুকে বলল, “আপনার কাছ থেকে যে টিকিট কেটেছিল তাকে মনে আছে?” “হ্যাঁ স্যার! আমরা মুখে অনেককে চিনে রাখি। রেগুলার কাস্টমার থাকে অনেকেই। শিয়ালদা লাইনের ডেলি প্যাসেঞ্জার।”
“এ তো রেগুলার কাস্টমার নয় !”
“না। আমার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটি। রোগা-রোগা দেখতে, কালো, সামনের দাঁত উঁচু। পাজামা ছিল পরনে। ঝাড়গ্রামে বাড়ি।”
“কেন দাঁড়িয়েছিল?”
“ধুলোর ঝড় বাঁচাতে।”
ততক্ষণে পেনু এসে পড়েছে। আনন্দ আরও জুটিয়ে আনছে দু-চারজনকে। বিজন বলল, “পেনু, তোমার ভাগ্নে এ ভদ্রলোকের দোকান থেকে টিকিট কিনেছিল। অনেক খুঁজে খুঁজে এঁকে বাপু বার করেছি।”
দাশু পকেট থেকে বিড়ি বার করছিল। হেসে বলল, “সালু না টাঙালে বার করতে অসুবিধে হতো। অবশ্য আপনি স্যার—আশপাশের দোকানে খোঁজ করে ভালোই করেছিলেন। আমার দোকান থেকে ফার্স্ট প্রাইজ উঠেছে তো—সবাই চিনে গিয়েছে। এমনিতেই চেনাশোনা অনেকেই। তবে এবার জোর টেক্কা দিলাম।”
বড়ালবাবু বললেন, “আপনি কেমন করে জানলেন আপনার দোকানের টিকিট ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে?”
“বা বা, এ আবার কী বলছেন দাদু! আমার দোকানের টিকিট আমি জানব না? টিকিটের টিকিগুলো যে আমার হাতে বাঁধা দাদু। কাগজ দেখলেই জানা যায়, আমার হাতে কারও শিকে ছিঁড়ল কি না! তারপর আমাদের প্রাইজ আছে না! এজেন্টের প্রাইজ।”
আনন্দ বলল, “কিন্তু মশাই, আপনি এখন পেনুকে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?” “পারি।”
“পারেন?”
“চেষ্টা করতে পারি। উনি—” বলে দাশু বিজনের দিকে আঙুল দেখাল, “উনি বলছিলেন, টিকিটটা হারিয়ে গিয়েছে। হারানো টিকিটে প্রাইজ হয় না। তবে আমি সাক্ষী হতে পারি, আপনারও সাক্ষী হবেন। সবাই মিলে উকিলের চিঠি দিয়ে জানাব, টিকিটের আসল মালিক টিকিট হারিয়ে ফেলেছে, নকল মালিককে যেন প্রাইজের টাকা দেওয়া না হয়। পারি কিনা বলুন স্যার আপনারা?”
হরিদা বললেন, “চিঠি নিশ্চয় দেওয়া যেতে পারে, তবে টাকা আটকে রাখা না-রাখার মালিক অথরিটি।”
বিজন বলল, “অলরাইট। অথরিটি তাদের নিয়ম মেনে কাজ করুক আপত্তি নেই, আমরাও আমাদের কর্তব্য করব, কী বলেন বড়ালদা! আমরা চেষ্টা করব পের টিকিট হাতিয়ে কেউ যেন মজাসে টাকাটা না পকেটে পোরে!”
আনন্দ মাথা নাড়ল। “আমি কিন্তু একটা কথা বলব?”
“বল”
“তোমরা যা করতে চাইছ তাতে আমার একটা অসুবিধে হবে।” “কেন?”
আনন্দ কিছু মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তাকাল, দেখল সবাইকে। বলল, “ব্যাপারটা তা হলে বলেই ফেলি। শনিবার দিন অফিসে গিয়ে আমি পেনুর কথা বন্ধুবান্ধব কোলিগদের বলেছিলাম। সবাই পেনুর ব্যাড লাক-এর জন্যে দুঃখ করতে লাগল। কিন্তু আজ প্রলয় সেন বলে আমাদের এক সিনিয়ার কোলিগ আমায় বললেন, তিনি একটা ব্যবস্থা করতে পেরেছেন মোটামুটি।”
আনন্দ আর বিজন চোখে চোখে তাকাল। অন্যরা আনন্দর দিকে তাকিয়ে।
আনন্দ বলল, “এই লটারিটা তো একটা ট্রাস্ট থেকে করছে—চ্যারিটেবল ট্রাস্ট। সেই ট্রাস্টের এক কর্মকর্তা হলেন প্রলয়দার মামা, মানে আমার কোলিগ প্রলয় সেনের মামা। প্রলয়দা আমাকে বললেন, তিনি মামার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাকে একবার নিয়ে যাবেন কাল তাঁর অফিসে। নিজে মুখে গিয়ে বুঝিয়ে সব বলতে হবে তাঁকে। এর মধ্যে তিনি হুকুম করে দিয়েছেন, টাকা কেউ তুলতে পারবে না, মানে ফার্স্ট প্রাইজ!”
বিজন বলল, “আমরাও তো তাই চাই। তা হলে আর…”
“না না,” আনন্দ বলল, “তোমরা যদি উকিল-আদালত কর তা হলে মুশকিল হবে—চোর আর ধরা পড়বে না।”
“কেন?”
“সে পিছিয়ে যাবে।…কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি যে-পথে এগুচ্ছিলাম সেই পথে এগুলে চোর হাতেনাতে ধরা পড়ত।”
“কেমন করে?”
“আরে সে ব্যবস্থাই তো হচ্ছিল। প্রলয়দার মামা চাইছেন, হাতেনাতে চোর ধরা পড়ুক। অফিসে তাঁর হুকুম ছিল, যে-লোকই ফার্স্ট প্রাইজের জন্যে টিকিট দেখাতে আসেন—সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরো।”
“ধরো?”
“হ্যাঁ, ধরে রাখো। খবর দাও প্রলয়দার মামাকে। এরপর যা করার তাঁরাই করবেন। তবে তোমার মেসের অনেকের সাক্ষী লাগবে। পেনুর তো অবশ্যই। চাই কি আমরা দাশুবাবুকেও কাজে লাগাতে পারি।”
বিজন তারিফ করে বলল, “তুই যা করেছিস আনন্দ, ভালোই করেছিস। আমরা তা হল উকিলের কাছে যাব না এখন।”
“দরকার নেই। টাকা হাতানো বন্ধ করাই আসল কাজ। সেটা যখন হয়ে যাচ্ছে…’ হরিবাবু বললেন, “ঠিক, ঠিক কথা। চোর যদি টাকাই না পেল তবে তার চুরি করাই বৃথা হল।”
মানিকবাবু এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন, এবার হালকা গলায় বললেন, “পেনুর ভাগ্যটাই খারাপ, হাতে পেয়েও দেড় লাখ টাকা হারাল।”
বড়ালবাবু কথা বললেন না।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিজন খোলা ছাদে পায়চারি করতে উঠেছিল। রোজই সে এ-সময় খানিকক্ষণ পায়চারি করে। তার অভ্যেস।
বিজন ছাদে উঠতেই দেখল, গানের মাস্টার। গানের মাস্টার জলের ট্যাংকের সামনে থেকে সরে এল। দেখল বিজনকে তারপর তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে যাবার জন্যে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে এল।
বিজনের মনে হল, গানের মাস্টার যেন রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছে, পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে সামনে থেকে।
বিজন সিঁড়ি আটকে দাঁড়াল। “কী ব্যাপার? আপনি?”
“এমনি,” গানের মাস্টার বলল।
“হাওয়া খেতে?” বিজন ঠাট্টা করে বলল।
“হ্যাঁ। আপনিও তো হাওয়া খেতে আসছেন।”
বিজন বুঝতে পারল, মাস্টার তাকে ঠুকল। মেসের ছাদ, যার খুশি আসতে পারে, পায়চারি করতে পারে।
গানের মাস্টার পাশ কাটিয়ে নেমে গেল।
বিজন দাঁড়িয়ে থাকল সামান্য। বুঝতে পারছিল না ব্যাপারটা। তার সন্দেহ হচ্ছিল। গানের মাস্টার এ-সময় ছাদে উঠে আসবে কেন? ছাদে পায়চারি করা তার অভ্যেস নয়। কী করছিল ও গঙ্গাজলের পুরনো ট্যংকের কাছে?
বিজন কেমন সন্দিগ্ধ হয়ে গঙ্গাজলের ভাঙাচোরা ট্যাংকের কাছে এসে দাঁড়াল। দেখতে লাগল চারপাশ। কিছুই নেই। তবে?
হঠাৎ নজরে পড়ল ট্যাংকের ওপর একপাশে কাগজের ছোট্ট একটা টুকরো। হাত বাড়িয়ে টেনে নিল টুকরোটা। কুচিয়ে একেবারে টুকরো টুকরো করা কাগজের একটা অংশ। বোঝা মুশকিল। অন্ধকারে কিছুই ঠাওর করা যায় না। পকেট থেকে দেশলাই বার করে বিজন ট্যাংকের আড়ালে বসল। বাতাসে দেশলাইকাঠি নিবে না যায় যেন। কাগজের টুকরোটা দেখল। টিকিটেরই টুকরো।
গানের মাস্টার তাহলে কি টিকিট ছিঁড়তে ছাদে এসে উঠেছিল? কিন্তু এত জায়গা থাকতে ছাদ কেন? টিকিট তো যেখানে-সেখানে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া যেত!
বিজনের মাথায় কিছু ঢুকছিল না।
পুরোন ভাঙাচোরা জলের ট্যাংকের দিকে তাকিয়ে বিজন যেন কোনও ধাঁধার জবাব খোঁজবার চেষ্টা করছিল। আরও ঝুঁকে পড়ল ট্যাংকের ওপর। হাত বোলাতে লাগল ধীরে ধীরে। আর হঠাৎ তার আঙুলে কিসের যেন ছোঁয়া লাগল। কী? আঙুল টানতেই সুতোর মতন কী একটা উঠে আসতে লাগল। তার পরই বিজন তাজ্জব।
অদ্ভুত ব্যাপার তো! একটা হাত দেড়-দুই লম্বা টোন সুতোর মাথার দিকটা জলের ট্যাংকের ফাটাফুটির সঙ্গে একজায়গায় বাঁধা আর সুতোর তলার দিকে অন্য কী যেন বাঁধা। ট্যাংকের মুখের গর্তের মধ্যে সুতোটা ঝুলছিল।
ছাদে বেশ অন্ধকার। ভালো করে দেখা বা বোঝা যায় না। বিজন সুতোসমেত জিনিসটা টেনে নিয়ে নীচে নেমে গেল।
হরিবাবু তখনও শুয়ে পড়েননি, শোবার তোড়জোড় করছিলেন।
বিজন হাতের বস্তুটা আলোয় ভালো করে দেখল। একেবারে ছেলেমানুষি ব্যাপার। টোন সুতোর যে দিকটা ট্যাংকের মধ্যে ঝুলছিল সেই দিকটায় একটা দেশলাইয়ের খাপ প্লাসটিকের টুকরো দিয়ে জড়ানো। সুতোয় সেটা বাঁধা ছিল। মানে কেউ সুতোয় দেশলাইয়ের খাপটা বেঁধে ট্যাংকের গর্তের মধ্যে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
“হরিদা?”
“বলো!”
এই দেখুন। এটা ছাদের ওপর জলের ট্যাংকের মধ্যে ছিল। ঝুলিয়ে রেখেছিল কেউ।”
হরিবাবু দেখলেন। বললেন, “দেশলাইয়ের বাক্সটা তো খালি। অথচ অত যত্ন করে রাখা…।”
“আমি বুঝতে পেরে গিয়েছি,” বিজন বলল, “ওই দেশলাইয়ের খাপের মধ্যে পেনুর লটারির টিকিটটা কেউ রেখেছিল। পাছে নিজের কাছে কোথাও রাখলে চুরি যায়, বা সার্চ হলে ধরা পড়ে যায়—তাই জলের শুকনো ট্যাংকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে এসেছিল।”
হরিবাবু বললেন, “বলো কী? পাকা চোর তো!…তা টিকিটটা কোথায়?” “টিকিটটা আজই ছিঁড়ে ফেলেছে। খানিকটা আগে।”
“কেন, কেন?”
“ধরা পড়ার ভয়ে। ওই যে আমরা বললাম, টিকিটটা দেখিয়ে টাকা চাইতে গেলেই ধরা পড়ে যাবে চোর—সেই ভয়ে টিকিটটা নষ্ট করে ফেলেছে।”
“সে কী! দেড় লাখ টাকা এইভাবে নষ্ট করল। পেনু বেচারির কপালে টাকাটা সইল না বিজন!”
“হ্যাঁ। যে চুরি করেছিল সে দেখল, টাকাটা আর সে পাবে না; আবার পেনুকেও এখন ফেরত দিতে যাওয়া মুশকিল—ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই নষ্ট করে ফেলল।”
“চোরটা কে?”
“গানের মাস্টার। তবে গানের মাস্টারের সঙ্গে বোধহয় বড়ালবাবুর সাঁট ছিল।”
‘কেমন করে বুঝলে?”
“দেশলাই দেখে,” বিজন হাসল, “এই দেশলাইটা দেখুন। বড়ালবাবু ছাড়া এই দেশলাই কেউ ব্যবহার করে না। এ হল খাদি-দেশলাই । একেবারে আলাদা দেখতে। বড়ালবাবু এই দেশলাই মাগনা পান, তাঁকে দিয়ে যায় তাঁর এক পুরনো দোস্ত। খাদিতে কাজ করেন।”
হরিবাবু বোকার মতন বললেন, “তা হলে?”
“তা হলে আর কী! চোর ধরা পড়েও বেঁচে গেল। টিকিটই যখন নেই, তখন আর মামলা চালিয়ে লাভ হবে না।”
হরিবাবু বড় করে নিশ্বাস ফেললেন। বললেন, “বড়াল যে পেনুর টাকা মারার চেষ্টা করবে—ভাবিনি। মানুষটার এত লোভ! ছিঃ ছিঃ!”
বিজন বলল, “আমার কিন্তু বড়ালবাবুকে কোনওদিনই সাধু-পুরুষ মনে হয়নি। লোকটা বেশ বাজে।”
বিজন আনন্দকে ডাকতে গেল। খবরটা দেওয়া দরকার।
