ভূতের খোঁজে – বিমল কর
ভূতের খোঁজে
এক
শশিকান্ত হাজরা নামের কাউকে কোনও দিন আমি চিনতাম না। জীবন হাজরা বলে আমাদের এক বন্ধু ছিল কলেজে। সে এখন ডাক্তার হয়ে বিলেতেই থেকে গিয়েছে শুনেছি। অন্যকোনও হাজরার সঙ্গে আমার আলাপ আছে বলে মনে পড়ল না।
অথচ চিঠিটা লিখেছে শশিকান্ত হাজরা। মানুষটির বয়েস কত, বুড়ো না ছোকরা, প্রবীণ না জোয়ান কিছুই বোঝার উপায় নেই। চিঠি পড়ে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, খড়গপুর থেকে চিঠিটা এসেছে। পরে দেখি, খড়গপুর নয়, খড়গচুর। খড়গচুর বলে কোনও জায়গা আছে ভূ-ভারতে, জানতাম না।
চিঠিটা একপাশে রেখে আরও দু-চারজন হাজরাকে মনে-মনে খুঁজছি, এমন সময় মানিক এল। ঘরে পা দিয়েই সে বলল, কাল মাঝরাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে সে।
বললুম, “কী অদ্ভুত স্বপ্ন।”
মানিক বলল, “ভাই, বিরাট একটা গাছের মাথায় আমি বসে আছি, আর গাছটা আকাশ দিয়ে শোঁশোঁ করে উড়ে যাচ্ছে। ভেরি ডেঞ্জারাস ব্যাপার। আমি প্রাণপণে গাছের ডাল ধরে উবু হয়ে বসে আছি চোখ বন্ধ করে। বুঝতেই পারছি, অবধারিত পতন ও মৃত্যু।”
হেসে ফেলে আমি বললাম, “সকালে উঠে দেখলি মরিসনি !”
“কই আর মরলাম।”
“তোর যদি মরার বাসনা থাকে, একবার শশিকান্ত হাজরার সঙ্গে দেখা করতে পারিস।”
মানিক অবাক হয়ে আমার মুখ দেখতে দেখতে বলল, “শশিকান্ত হাজরা? হু ইজ হি? ডেভিল?”
“খড়গচুরে থাকে।”
“খড়গপুর? আরে খড়গপুরে তো আমার বড়দির বাড়ি।”
“খড়গপুর নয় ব্রাদার। খড়গচুর।”
মানিক আরও অবাক হয়ে বলল, “খড়গচুর। কোথায় সেটা? এমন নাম লাইফে শুনিনি।”
“তাতে কিছু আসে যায় না। গোটা দেশে কত জায়গা আছে, নাম রয়েছে লাখ-লাখ, তুই জানবি কেমন করে?”
“জায়গাটা কোথায়?”
“উড়িষ্যা বর্ডারে।”
মানিক হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে আধশোয়া হয়ে বসে বলল, “চা আনতে বল। পেট খালি। শুধু একটা সেদ্ধ-ডিম খাব। ওয়ান পিস রুটি, ব্রেড উইথ বাটার।”
“দাঁড়া কৈলাসানন্দ আসুক।”
“কোথায় সে?”
“দোকানে গিয়েছে। আসবে এক্ষুনি।”
“ও কে। …কী বললি জায়গাটার নাম? খড়গচুর?”
“হ্যাঁ। পুর নয় চুর।”
মানিক একটু কী ভাবল। তারপর বলল, “ডু ইউ নো স্যার, খড়গ যুদ্ধে পয়লা নম্বর কে ছিল?”
“অমিতাভ বচ্চন।” বলে আমি জোরে হেসে উঠলাম।
“রাবিশ। …তুই অমর, মহাভারত-টহাভারত একেবারেই পড়িসনি। তোর কোনও ট্রাডিশন নেই। শুনে রাখ, খড়গ-যুদ্ধে নকুল ছিল পয়লা নম্বর। পঞ্চপাণ্ডবের ফোর্থ পাণ্ডব।”
“তাই নাকি?”
“মহাভারত খুলে পড়িস বাবা। পেয়ে যাবি। …ভীষ্ম যখন মহাপ্রয়াণ করেননি, তখন একের-পর-এক লোক গিয়ে তাঁকে বিরক্ত করত। লোক মানে ওই যুধিষ্ঠিররা। একদিন খড়গ-চ্যাম্পিয়ান নকুল গিয়ে বলল, “পিতামহ আমি তো মনে করি খড়গই শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।” আপনি কী মনে করেন? ভীষ্ম নকুলের ভেতরের মতলব বুঝে মনে মনে হাসলেন। তারপর পিতামহ তাকে বোঝালেন, “বাছা, খড়গ নিশ্চয়ই ভালো, তবে ধনুক এবং অসিও সমান ভালো।”
আমি হেসে বললাম, “আমিও ভালো, তুমিও ভালো…।”
“রাইট। ভীষ্ম কারও মনরাখা কথা বলার লোক নয়। …তা তুই বলছিস, খড়গচুর হল জায়গাটার নাম। তার মানে হয় সেখানে কোনও সেকেলে রাজা-রাজড়ার খড়গ চুর চুর হয়েছিল, না হয়…”
“প্লিজ। তোকে নামের ইতিহাস খুঁজতে হবে না।”
“তো কী হবে বল?”
‘এই চিঠিটা দেখ। শশিকান্ত হাজরার চিঠি।” বলে আমি চিঠি তুলে মানিকের দিকে এগিয়ে দিলাম।
মানিক চিঠিটা নিল। খামের ওপর ঠিকানা পড়ল। তারপর চিঠিটা বার করতে করতে বলল, “খুব বনেদি খাম রে! একটা খামের দামই এক টাকা। দারুণ কাগজ কোন সময়ের খাম ভাই? এসব কাগজ এখনও পাওয়া যায়?”
“বাজে বকিস না। চিঠিটা পড়।”
মানিক চিঠি পড়তে শুরু করেছিল।
কথাটা খুব মিথ্যে বলেনি মানিক। চিঠির খাম এবং চিঠির কাগজ দুই-ই উঁচুদরের। আজকাল সাধারণত এ-সব কাগজের লেটার প্যাড কিংবা খাম দেখা যায় না। তা ছাড়া, চিঠি লেখার কাগজ এবং খামের যা চেহারা হয়েছে, পুরনো, ময়লাধরা, বাসী-বাসী রং, তাতে মনে হয় এ সব লেখার কাগজ এবং খাম বেশ পুরনো আমলের। ডাকটিকিটটাই যা হালের।
চিঠি পড়া শেষ করে মানিক বলল, “লোকটা পাগল নাকি রে?”
“পাগল! কেন?”
“না হলে এমন চিঠি কেউ লেখে?”
“আমিও বুঝতে পারছি না।”
“বোঝার কী আছে। একেবারে পাগল। বদ্ধ উন্মাদ।”
কৈলাস বাজার থেকে ফিরে এল।
আমার এ ঘরবাড়ি, থাকা-খাওয়া, জামা-প্যান্টের একমাত্র কেয়ারটেকার হল কৈলাস। তার বয়েস বেশি নয়। কিন্তু সব ব্যাপারেই তৎপর। বাড়িঅলাকে দিয়ে কল সারাতে তার মাত্র একদিন লাগে, মাংসের স্টু করতে মিনিট পনেরো। দু’হাত টুয়েন্টি নাইন খেলে পাড়ার জগাই-মাধাইদের কাছ থেকে পান-বিড়ি আদায় করতে তার জুড়ি নেই। কৈলাসকে দেখলে মনে হবে, কালীপুজোয় পাঁঠা বলি দেওয়াই তার কাজ। অথচ মানুষটার মন খুব নরম। দোষের মধ্যে পান-জরদার পোকা।
কৈলাস বাজার থেকে কী এনেছিল, আমার দেখার দরকার করে না। সে দেখায়ও না কখনও। খুচরো পয়সা ফেরত দেওয়াটাও তার ধাতে নেই। আবার তার মতন বিশ্বাসীও পাওয়া মুশকিল।
মানিককে দেখে কৈলাস বলল, “নবাব হয়ে গেছ নাকি মানিকদা? ট্যাক্সি থেকে নামলে?”
মানিক অবাক। কৈলাসকে দেখতে-দেখতে বলল, “ট্যাক্সি থেকে! কই না।” “দেখলাম যে।”
“আরে না, আমি কেন ট্যাক্সি থেকে নামব। একজন ট্যাক্সি থামিয়ে আমায় ঠিকানা জিজ্ঞেস করছিল।”
“ও। আমি ভাবলাম, তুমি নামলে।”
“না। …চা খাওয়াও। চা, ডিমসেদ্ধ, এক পিস রুটি।”
কৈলাস আমার সামনে সিগারেটের প্যাকেট নামিয়ে রেখে ভেতরে চলে গেল । মানিক বলল, “তুই গোয়েন্দাগিরি করলে পারতিস। কৈলাস তোর অ্যাসিসট্যান্ট হতো। কী চোখ রে বাবা।”
আমি হেসে বললাম, “চোখ-কান দুই খুব সাফ কৈলাসের।”
মানিক হাসল। সে ভালো করেই কৈলাসকে জানে।
আমি বললাম, “বাজে কথা ছাড়। …চিঠিটা পড়ে তুই কিছুই বুঝলি না?” “না।”
“আমি একটু-আধটু বুঝেছি।”
“কী বুঝেছিস?”
“চিঠিটা পড়। জোরে-জোর।”
মানিক, শশিকান্ত হাজরার চিঠিটা চেঁচিয়ে পড়তে লাগল।
শ্রীঅমরেশ গুহ
মাননীয় মহাশয়।
মহাশয়,
কয়েকদিন আগে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখিয়া জানিলাম যে, আপনি একটি ভুতুড়ে বাড়ির অনুসন্ধান করিতেছেন। জানিয়া বড়ই আশার সঞ্চার হইল। আমার হাতে একটি দুই শত বৎসরের পুরাতন ভুতুড়ে বাড়ি আছে। আড়াই শত বৎসরের পুরাতন হইলেও হইতে পারে। আমি বাড়ির দালাল নই; বাড়ির মালিক। বাড়িটি আমি বিক্রয় করিতে চাহি। নামমাত্র মূল্যে?
আমি জানি না, আপনি ভূতের ওঝা কি না। আমার সামান্য পরিচয় হিসাবে বলি, ভৌতিক বিষয় লইয়া আমার কিছু চর্চা আছে। ১৯৭১ সালে বিলাতে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ‘গেজেটিয়ার অব ব্রিটিশ ঘোস্টস’। এই মূল্যবান গ্রন্থটিতে আমার নাম ও দুই-চারটি মন্তব্য আছে। আমি কখনও বিলাত যাই না। খাঁটি সাহেব ভূত দেখি নাই। তথাপি আমার নাম এবং মন্তব্য রহিয়াছে। কারণ আমি কয়েকটি ইঙ্গ-ভারতীয় ভূতের আলোচনা আমাদের জার্নালে করিয়া ছিলাম।
আপনি যদি ভূতের ওঝা হন, অথবা ভূতসিদ্ধ—তাহা হইলে আমার সহিত যোগাযোগ করিতে পারেন। যোগাযোগ করিলে এমন বাড়ি আপনার হস্তগত হইতে পারে যেখানে ছ’-সাত প্রকার ভূত অনায়াসে দেখিতে পাইবেন।
আমার সহিত সাক্ষাতে আসিয়া যোগাযোগ করিলেও অসুবিধা নাই। নমস্কার জানিবেন।
ইতি, শশিকান্ত হাজরা।
চিঠি পড়া শেষ করে মানিক আমার মুখের দিকে তাকাল। পরে হেসে বলল, “হাজরামশাই শুধু পাগলা নয়, রসিকও। তোর সঙ্গে তামাশাও করেছেন।”
আমি সিগারেটের প্যাকেট তুলে ওপরের কাগজটা ছিঁড়তে-ছিঁড়তে বললাম, “হতে পারে তামাশা। আবার সবটা তামাশা নাও হতে পারে।”
“মানে?”
“গেজেটিয়ার অব ব্রিটিশ ঘোস্টস বলে একটা বই সত্যিই আছে। পাবলিকেশান ডেট আমার মনে নেই। তবে বইটা আমি দেখেছি।”
“বলিস কী?”
“বেনারসে দীপসাহেবের লাইব্রেরিতে বইটা আমি দেখেছি। দীপসাহেব অকাল্ট মানে ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে পড়াশোনা করতেন। ওই এক নেশা ছিল তাঁর।”
“তোর মতন—।” মানিক হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিল।
আমি হেসে বললাম, “আমি ভূত নিয়ে চর্চা করি না; অদ্ভুত নিয়ে করি। তবে দুটোর বর্ডারলাইন বোঝা খুবই কঠিন।”
সিগারেট ধরিয়ে মানিক বলল, “তুই কি সত্যি সত্যি ভুতুড়ে বাড়ির জন্যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলি?”
ঘাড় নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কম পয়সায় বাড়ি কেনা যাবে, প্লাস কিছু ভূত দেখা যাবে।” বলে আমি হাসলাম। “এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতলব।”
“তোরও মাথা খারাপ।”
খানিকটা চুপচাপ থাকল মানিক। হাই তুলল।
আমি বললাম, “শশিকান্ত হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই।”
“চিঠি লেখ।”
“শুধু চিঠি লিখে হবে না, যেতে হবে।”
“যেতে হবে। সেই খড়গচুর…।”
“হয়েছেটা কী। খড়গচুর কী সাউথ পোলে? তুই এমন করে আঁতকে উঠলি।” “তুমি যাও।”
“তুইও যাবি।”
“আমার ছুটি নেই ভাই। শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না।”
“ছুটি নিয়ে নে। হপ্তাখানেকের ছুটি নে। তাতে হয়ে যাবে।”
মানিক মাথা নেড়ে বলল, “অসম্ভব।”
আমি কিছু বললাম না। হাসলাম। মুখে মানিক যাই বলুক, শেষ পর্যন্ত সে যাবে। আমরা যখনই কোথাও বেড়াতে যাই, জোড় বেঁধেই যাই সাধারণত। কখনও-কখনও জোড় ভাঙে। উপায় কী।
কৈলাস চা নিয়ে এল। চায়ের সঙ্গে ডিমসেদ্ধ আর রুটি-মাখন।
মানিক সকালে কিছু খায়নি। খিদে ছিল তার। ডিমের প্লেটটা টেনে নিল। খেতে-খেতে মানিক বলল, “তোর মতলবটা কী, খুলে বল তো?”
আমি বললাম, “বাড়ি কেনার মতলব আমার ততটা নেই। তবে ভূত দেখার ষোলো আনা ইচ্ছে আছে।
“তোর এ ব্যাপারটা আমি বুঝি না।”
“ইন্টারেস্ট নে, বুঝতে পারবি।”
“জগতে আর জিনিস নেই ইন্টারেস্ট নেবার, ভূত নিয়ে ইন্টারেস্ট।”
আমি বললাম, “এই তো তোদের দোষ। ভূত শুনেই হেলাফেলা করতে শুরু করলি। এখন যদি তোকে দশটা বড়-বড় সাহেবের নাম বলি, যারা ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে গবেষণা করছে, কেতাব লিখেছে মোটা-মোটা, সঙ্গে-সঙ্গে তোদের মনে হবে সাবজেক্টটা চর্চা করার মতন।”
“বাজে বকিস না।”
“বাজে বকছি না। সত্যি কথা বলছি। আজ তিন-চারশো বছর ধরে বিদেশে কত কী লেখাপত্র হল ভৌতিক, অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নিয়ে তার কোনও ধারণাই তোর নেই। আমরা আগে থেকেই ধ্যুত বলে সব জিনিস উড়িয়ে দিই। ওরা উড়িয়ে দেবার আগে নাড়িনক্ষত্র খোঁজ করে। তারপর হয় বলে, ব্যাপারটা বাজে, না হয় বলে…আমি বাপু বুঝলাম না…পারলে তুমি বোঝো।”
মানিক বলল, “সোজা কথাটা সোজা করে বল। তুই হাজরার কাছে যাচ্ছিস?”
মাথা নেড়ে আমি বললাম, “যাচ্ছি।”
দুই
যাব বললেই যাওয়া যায় না। ব্যবস্থা কিছু করতেই হয়।
শশিকান্ত হাজরাকে চিঠির জবাব দিলাম। লিখলাম, আমি স্বচক্ষে একবার বাড়িটাকে দেখতে চাই। পারলে থাকতেও চাই দু-চার দিন। তারপর পছন্দ হলে বাড়ি কেনার কথা।
শশিকান্ত যেমন রসিক, আমিও যে তার চেয়ে কিছু কম রসিক নয়, সেটা বোঝাতে আরও লিখলাম কয়েকটা কথা। লিখলাম, কলকাতা শহর এবং তার আশেপাশে জমি আর বাড়ির দর বেশি। আনুপাতিকভাবে সেখানকার ভূতের এবং ভূতুড়ে বাড়ির দাম বেশি দিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু অতটা দূরে খড়গচুরে বাড়ির দাম বেশি হতে পারে না। এমনকী, সেখানকার ভূতের দামও। হাজরামশাই যদি গোড়াতেই এটা মনে রেখে যোগাযোগ করতে চান, করতে পারেন।
দ্বিতীয় কথা হল, আমি ভাত-মাছ খাওয়া সাধারণ বাঙালি। আমি এমন ভূত চাই যারা আমাদের ক্লাসের। অবশ্য বাঙালি হবে এমন কোনও কথা নেই, অবাঙালি ও হতে পারে।
আমার তৃতীয় কথা হল, আমি যদি খড়গচুরে যাই, একা যাব না। সঙ্গে লোক থাকবে। আমরা কেমন করে যাব, কোথায় গিয়ে উঠব, এ-সম্পর্কেও যেন হাজরামশাই বিস্তারিত জানান।
চিঠির জবাব পেতে দিন-সাতেক লাগল। শশিকান্ত লিখেছেন, আপাতত তিনি নিজেই খড়গচুরে রয়েছেন। আমরা তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করলে তিনি খুশি হবেন।
বাড়ির দাম নিয়ে তিনি এখনই কোনও কথা বলতে চান না। তবে হ্যাঁ, শহরের জমি-বাড়ির সঙ্গে যে ধাপধাড়া গোবিন্দুপরের বাড়ির দাম অনেক কম হবে তিনি জানেন। অবশ্য ভাত-মাছ বা রুটি-চাটনি খাওয়া মামুলি ক্লাসের ভূত পাবার আশা কম। তাঁর তো মনে হয় ক্ল্যাসিক্যাল ভূতই দেখার জিনিস। আমার যদি বাড়ি পছন্দ হয়, তখন এ-বিষয়ে দরাদরি করা যাবে।
চিঠি পেয়ে মানিককে বললাম, “চল, তা হলে বেরিয়ে পড়ি।”
মানিক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তুই দেখছি সিরিয়াস? আমি ভেবেছিলাম…’
“গাঁটের টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম, সিরিয়াস না হলে পয়সা নষ্ট করব কেন?”
“সে তুই হামেশাই করিস। তোর হল খেয়াল।”
“না, এটা খেয়াল নয়।… যাকগে, কবে যাবি বল!”
“কবে যাব!…আমাকে যেতেই হবে?”
“শিওর। যাবি না মানে!”
মানিক একটা ভেবেচিন্তে, বলল, “তা হলে গুড ফ্রাইডের ছুটিতে চল। অফিসে ম্যানেজ করে আরও দু-তিনটে দিন বাড়িয়ে নেব ছুটি। দিন পাঁচ-ছয় হলেই তো হয়ে যাবে।”
“দেখা যাক”
মানিক বলল, “যাবি কিসে?”
“হাজরামশাই রাত্রের ট্রেনে যেতে বলেছেন। হাওড়া থেকে রাত্রে উঠব। সাউথ ইস্টার্ন। ন’টা নাগাদ চড়ব। সকালে ট্রেন থেকে নামব। সেখান থেকে উনি নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবেন। তাঁর গেস্ট হয়ে থাকব। আশা করি খাওয়া-দাওয়া ভালোই হবে।” বলে আমি হাসলাম।
মানিকও হাসল।
কলকাতায় তখনও গরম পড়েনি। পড়ব-পড়ব করছে। মার্চ মাসের প্রায় শেষ। আমি আর মানিক যথারীতি হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলাম। তারিখটা একুশে মার্চ। বৃহস্পতিবার।
মোটঘাট বলতে আমাদের বিশেষ কিছু ছিল না। দু’জনের দুটো সুটকেস। একটা হোল্ডঅল। আর কাঁধে-ঝোলানো ব্যাগ। মানিক যেখানেই যায় তার ক্যামেরাটা সঙ্গে নিয়ে যায়। ভালোই ছবি তোলে। মানিক তার ক্যামেরাটাও নিয়ে নিয়েছিল।
গাড়িতে সামান্য ভিড় ছিল। তাতে আমাদের কোনও অসুবিধে হল না।
রেলগাড়িতে চাপলে কেউ-কেউ দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারে। কেউ-বা একেবারেই পারে না। আমাদের মানিক হল প্রথম গ্রোত্রের। কোনওরকমে একটু বসার জায়গা করে নিতে পারলেই সে ধীরে-ধীরে আধ-শোয়ার মতন জায়গা করে নিয়ে ঘুমোতে শুরু করে। তবে তার নাক ডাকে না।
ট্রেনে আমার ঘুম আসতে চায় না। যাও বা আসে, ছেঁড়া-ছেঁড়া ঘুম।
খড়গপুরে পৌঁছবার কথা প্রায় এগারোটায়। মানিক দেখি তার আগে ঘুমের ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
খড়গপুর থেকে গাড়ি ছাড়ার পর আমাদের কামরাটা বেশ চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ ঢুলছে, কেউ-বা চোখ বন্ধ করে মাথা ঠেস দিয়ে বসে আছে।
আমি একটা বই জোগাড় করে এনেছিলাম বাড়ি থেকে। সেটাই পড়ছিলাম। একটানা নয়। মাঝে-মাঝে পড়ছিলাম। কোলের ওপর বই ফেলে রেখে ভাবছিলাম, যতই বলি না কেন সাহেবরা… সব ব্যাপারেই হুজুগে, কিন্তু এটা ঠিকই যে, ওদের কৌতুহল এবং অনুসন্ধানটা বেশি। বড়-বড় ব্যাপারে কথা বাদই দিলাম, এইসব ভূত-টুত নিয়ে ওরা কি কম মাথা ঘামিয়েছে। মানিককে আমি মিথ্যে বলিনি। গেজেটিয়ার অব ব্রিটিশ ঘোস্টস বলে সত্যি-সত্যি একটা বই আছে। শুধু গেজেটিয়ার কেন, গল্পগাছার সঙ্গে সম্পর্ক নেই, গবেষণা ধরনের কিংবা তথ্য খোঁজার মতন করে লেখা বইও কম নেই।
যে-বইটা আমি বাড়ি থেকে জোগাড় করে এনেছিলাম, সেটা নতুন নয়। পুরনো। আগেও আমি পড়েছি। খুব যে ভালো লেগেছিল, তা নয়। তবু আজ বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বইটা নিয়ে নিলাম দুটো কারণে। এক, সময় কাটাবার জন্যে; দুই, বইটার মধ্যে একটা ভূতুড়ে বাড়ির নানা কাহিনি ছিল। সময় কাটাবার জন্যে মন্দ কী!
বইটার দু-চার পাতা পড়ি আর আধবোজা চোখ করে যা ভাবি তার মধ্যে বিশেষ কোনও সম্পর্ক থাকছিল না। আমি শশিকান্ত হাজরার কথা ভাবছিলাম। ভদ্রলোক কি আমাদের সঙ্গে নিতান্ত রসিকতা করতে চান? কেনই বা তা করবেন? আর যদি রসিকতা না করে বাস্তবিকই আমাদের ভূতুড়ে বাড়ি দেখিয়ে সেটা বিক্রি করতে চান, তাতে বা তাঁর এখন, কী লাভ? ওঁর চিঠি পড়ে আমার ধারণা হয়েছে, মানুষটি রসিক। হয়তো আমার বিজ্ঞাপন পড়ে কৌতূহল বোধ করেছেন। নিজেও ভূতচর্চা করেছেন কিছু-কিছু নয়তো তাঁর নাম বিদেশী গেজেটিয়ারে থাকত না।
তা শশিকান্ত আমাদের কী ধরনের ভূতুড়ে বাড়ি দেখাবেন? বিদেশে কেল্লাঅলা ভূতুড়ে বাড়ির সংখ্যাই বেশি। আমাদের দেশে কেল্লা কই? আর ক’টাই বা কেল্লা! দিল্লি, আগ্রা, বেনারস, লখনউ-এর দিকে হলে না হয় মুসলমান রাজাদের তৈরি করা ভাঙা কেল্লা দু-চারটে পাওয়া যেত। আমাদের এদিকে তেমন আর কোথায়? নামমাত্র।
কেল্লার ভূত বাদ দিলে এক ধরনের অভিজাত ভূতের খবর পাওয়া যায় রাজপ্রাসাদে। এরা হল রাজারাজড়া ভূত। কেউ রাজকুমার, কেউ রাজকুমারী, কেউ-বা অভিশপ্ত কোনও রাজপুরুষ। ইতালি, ফ্রান্সে এদের সংখ্যা বেশি। ব্রিটেনে একটু কম। শুনেছি স্কটল্যাণ্ডে বেশি।
আমাদের দেশে রাজ-পরিবারের ভূত অতটা দেখা যায় না। গেলেও উত্তর ভারতে দেখা যেতে পারে, পূর্ব ভারতে বোধহয় নয়।
রাজ-ভূত না থাকুক, আমাদের এদিকে প্রাচীন জমিদার-বাড়ি, যেগুলো ভেঙেচুরে ইটের স্তূপ আর সাপের আড্ডা হয়ে গিয়েছে, সেখানে দু-দশটা জমিদার-ভূত পাওয়া যায়। অন্য যা পাওয়া যায় তা হল পাতি-ভূত। এ-সবের ভূতের কোনও আভিজত্য নেই। মাঠেঘাটে, পুকুরে, গাছের ডালে থাকে। রদ্দি-ভূত এরা।
মনে মনে আমি এ-সব ভাবছিলাম খানিকটা মজার মেজাজে। তা বলে সব সময় মজা পাচ্ছিলাম না। গম্ভীরভাবে ভাবতে গেলে মনে হচ্ছিল, শশিকান্ত হয় আমাদের নিয়ে রসিকতা করে ছেড়ে দেবেন, হয়তো এমন কিছু দেখাবেন যে, ঘাবড়েও যেতে পারি।
আমি নিজে ঘাবড়ে যাওয়া পছন্দ করি না। আমার ভূতচর্চার একটা উদ্দেশ্য হল ভূত নিয়ে মজা করা। অর্থাৎ প্রমাণ করা, ভূত নেই। তবে অদ্ভুত জিনিস অনেক আছে পৃথিবীতে। ব্যাখ্যা খুঁজলে সে-সব অদ্ভুত ঘটনার কোনও কারণ দেখানো যাবে না। আর যদি যায়, তবে থার্ড একজিসটেন্স বা তৃতীয় অস্তিত্ব বলে যে মতবাদটা চালু হবার চেষ্টায় আছে—সেই অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হয়। যা আশা করি না।
পাঁচ রকম ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি গাড়িটা থেমে আসছে। খানিক পরেই গাড়ি থেমে গেল। একেবারে মাঠের মধ্যে। অন্ধকার ছাড়া মাঠের এপারে-ওপারে কিছুই দেখা যায় না।
ভোরের মুখে গাড়ি যে-স্টেশনে দাঁড়াল, সেখানেই আমাদের নামার কথা। মানিক আগেই উঠে পড়েছিল। সারা রাত ঘুমিয়েছে।প্ল্যাটফর্মে নামতেই মনে হল এ জায়গাটার নাম হওয়া উচিত ছিল মহুয়াবাগান। কিংবা শালভূম। ছোট স্টেশন, মোরম-ছড়ানো প্ল্যাটফর্ম। স্টেশনের গা ছুঁয়েই মহুয়াগাছের সারি। ডান দিকে। আর বাঁ পাশে শালবন।
মানুষজন অল্প কিছু নামল গাড়ি থেকে, কিছু উঠল।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি হাজরামশাইয়ের লোক আশেপাশেই কোথাও হয়তো আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় দেখি এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
ভদ্রলোকের চেহারাটি দেখার মতন। ভীষণ লম্বা। ছ’ফুটের ওপর ইঞ্চি-দুই বেশি বই কম নয়। রোগা গড়ন। রোগা বলে আরও বেশি লম্বা দেখাচ্ছে। ওঁর পরনে ধুতি। গায়ে খদ্দরের কিংবা তাঁত-কাপড়ের সাদা পাঞ্জাবি। গলার কাছে একটা চাদর ঝোলানো। হাতে ছড়ি। পায়ে মোটা চপ্পল।
ভদ্রলোক কাছে এসে নমস্কার করে বললেন, “আমি শশিকান্ত হাজরা।” বলে হাসিমুখ করলেন।
আমরা নমস্কার জানিয়ে হাসিমুখেই বললাম, “আপনি নিজে এসেছেন?’
“গাড়ি নিয়ে আসতে হয়েছে। যোগেন, মানে আমার গাড়ির ড্রাইভার হাত ভেঙে পড়ে আছে।…আসুন। আপনাদের কোনও অসুবিধে হয়নি তো?”
“না, না, অসুবিধে কিসের!”
আমরা আগে খেয়াল করিনি। শশিকান্তর সঙ্গে একজন ছোকরামতন লোক ছিল। উনি যখন আমাদের সঙ্গে পরিচয় সেরে নিচ্ছেন, ছোকরা কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে ছিল। শশিকান্ত আমাদের মালপত্র নজর করে বললেন, “এই আপনাদের লাগেজ। বেডিংও এনেছেন দেখছি। কোনও দরকার ছিল না।” বলে ছোকরার দিকে তাকালেন। “নে, মালগুলো তুলে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে রাখ অনাদি।”
অনাদি আমাদের স্যুটকেস আর হোল্ডঅল তুলতে লাগল। পা বাড়ালেন শশিকান্ত, “আসুন।”
মানিকের সঙ্গে শশিকান্তর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। চিঠিতে অবশ্য জানিয়েছিলাম সঙ্গে একজন বন্ধু থাকবেন। পরিচয়টা করিয়ে দিলাম।
ততক্ষণে ট্রেন আবার ছেড়ে দিয়েছে। প্লাটফর্ম ফাঁকা হয়ে এল। চোখে দেখতে স্টেশনটা ভালোই লাগে। ছোট রেল অফিস, মোরম-ছড়ানো প্ল্যাটফর্ম, সাজানো গাছপালা, প্ল্যাটফর্মে দু-তিনটি সিমেন্টের বেঞ্চি।
শশিকান্ত নিজেই বললেন, এখান থেকে আমার বাড়ি বাইশ মাইল। গাড়ি ছাড়া যাবার উপায় নেই। আগে ছিল গোরুর গাড়ি। এখন হয়েছে টেমপো। গোটা-দুয়েক ঝরঝরে টেমপো চলে। তাতেই লোকজন যায়-আসে।”
মানিক বলল, “যায় কোথায় এরা?”
“নিজেদের গ্রামে।”
“এদিকে কোনও কলকারখানা নেই বোধহয়?”
“না। চাষবাসই ভরসা। অল্পস্বল্প জমিজায়গা সকলেরই আছে। ডাল আর শাক-সবজি এখানে ভালোই ফলে।”
“ধান-চাষ?”
“হয়। তবে সব বছর ভালো হয় না।”
কথা বলতে-বলতে আমরা রেল-অফিসের কাছে এলাম। পাশেই ছোট গেট। টিকিটবাবু আমাদের দিকে তাকাল। শশিকান্তকে বলল, “এরাই আপনার গেস্ট হাজরামশাই?”
শশিকান্ত হেসে বললেন, “মহামান্য অতিথি। জ্ঞানীগুণী লোক।”
কথাটার মধ্যে খোঁচা ছিল কি না বোঝা গেল না। হয়তো ছিল না। নিতান্ত কৌতুক ছিল।
স্টেশনের বাইরে এসে দেখি, একটা বদখত টেমপোর ওপর জনা বারো-চোদ্দো লোক বসে আছে। পুঁটলি-পাটলাসমেত। টেমপোঅলা চা খাচ্ছে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে, তার শাকরেদ আরও লোক ডাকছে।
স্টেশনের বাইরেটা সাদামাটা। তবে হ্যাঁ, মহুয়াগাছের জঙ্গল যেন সরু হয়ে গিয়েছে রেল কোয়ার্টারের গা ছুঁয়েই।
শশিকান্তর গাড়ি বলতে একটা জিপ। তার চেহারা দেখলে উঠতে ভয় করে। কোনওরকমে চারটে চাকা যেন লাগানো। মাথার ক্যাম্বিস নেই। খাকিমতন খানিকটা রং, জিপের এখানে-ওখানে, বাকিটা লাল-লাল রং লাগানো।
মানিক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলল, “এ কেমন গাড়ি রে?” জিনিসপত্র তোলা হয়ে গিয়েছিল অনাদির। দাঁড়িয়ে ছিল।
শশিকান্ত বললেন, “উঠে পড়ুন। গাড়ির চেহারা দেখে ঘাবড়াবেন না। ইঞ্জিন এখনও এক নম্বর। নিন, বসে পড়ুন।”
আমরা উঠে পড়লাম। মানিক আর অনাদি বসল পেছনে। আমি সামনে, শশিকান্তর পাশে।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে শশিকান্ত বললেন, “এটা আমার পঁচিশ বছরের জিপ। দিশি নয় মশাই, বিদেশী। ডিসপোজ্যাল থেকে কিনেছিলাম। আর্মি জিপ। যা সার্ভিস দিল বলা যায় না!”
আমি বললাম, “কিছু মনে করবেন না স্যার। আপনার বয়েস?”
“কত মনে হয়?”
“পঞ্চাশের তলায়।”
শশিকান্ত হেসে ফেললেন, “মনরাখা কথা বললেন নাকি? আমার বয়েস পঞ্চান্ন বছর তিন মাস।”
“বলেন কী!”
“শশিকান্ত হাজরা মিথ্যে বলে না।…আমি আপনাদের মামা-কাকার বয়েসী।” বলে হাসতে লাগলেন।
গাড়ি চলতে শুরু করে দিল। আমি বললাম, “আপনি বয়েসে অনেক বড়। আমাদের আর খাতির করে আপনি বলবেন না। তুমি বলবেন।”
তিন
শশিকান্ত আমাদের যে-বাড়িতে নিয়ে এলেন সেই বাড়ি দেখে আমরা অবাক। এমন বাড়ি আমি অন্তত দেখিনি। বড়-জোর এই ধরনের কাছাকাছি বাড়ি দেখেছি। এ-বাড়ির ধাঁচই আলাদা। পাথর দিয়ে তৈরি বাড়ি আমি আগে অনেক দেখেছি। কোলিয়ারিতে, রেল কলোনিতে। ইটের বদলে পাথর দিয়ে দেওয়াল গাঁথা নতুন কিছু নয়। কিন্তু শশিকান্তর সঙ্গে যে-বাড়িতে এলাম, সেটা পাথর দিয়ে তৈরি হলেও তার গড়ন, কারুকর্ম অন্যরকম। দেখলে মনে হয়, কোনও এক সময়ে এই বাড়ি ছিল গড়। পাথরে গাঁথা বিরাট পাঁচিল। সিমেন্ট-সুরকির কোনও চিহ্ন নেই। একরকম মাটি দিয়ে গাঁথা। পাথরগুলোও এক ধরনের নয়, এবড়ো-খেবড়ো, ছোট-বড়। বিহারের দু-এক জায়গায় জমিদারদের কাছারি-বাড়ি এইরকম হয় দেখিছি।
শশিকান্তর এই বাড়ি বিশাল। অন্তত এলাকা। গড়ের মতন দেখতে বাইরের দিকের বারো আনাই পাঁচিল। ভেঙেচুরে গিয়েছে বহু জায়গা। পাথরের স্তূপ হয়ে আছে কোথাও, কোথাও-বা গাছপালা, আগাছা বেরিয়েছে। সাপখোপের অভাব আছে বলে আমার মনে হল না।
বাইরের পাঁচিল পেরিয়ে ভেতরে পা বাড়ালে দেখা যায় অনেকখানি জমি। অবশ্য ফাঁকা বলা যাবে না। নানা ধরনের গাছ, আম-জাম-কাঁঠাল। আরও পাঁচ রকম ঝোপঝাড় । মাঠ জুড়ে আগাছা আর কাঁটাবন। মাঝ-মধ্যিখানে পাথরের আড়াইতলা বাড়ি। তার কোনও নির্দিষ্ট আকার নেই। খানিকটা বাঁকা, চাঁদের কলার মতন, আবার একপাশে একটানা লম্বা হয়ে পেছনে চলে গেছে। গম্বুজ দু-একটা চোখে পড়ছিল। ভাঙা।
শশিকান্ত আমাদের বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাবার পর দেখলাম, ঘরের ভেতরের দিকটায় বেশিরভাগই পলস্তরা নেই। পাথর বেরিয়ে আছে। পলস্তরা যেখানে যেখানে আছে, সেখানটাও এবড়ো-খেবড়ো। মনে হল বালি-কাদা আর চুন মিশিয়ে প্লাস্টার করা। জানলাগুলো মানুষসমান, দরজাও বিরাট, সিঁড়িগুলো পাথরের।
এই বাড়িতে কতগুলো ঘর রেয়েছে, বোঝা গেল না।
শশিকান্ত আমাদের নিয়ে দোতলার একটা ঘরে এলেন। বললেন, “এই আপনাদের ঘর। বাইরে ছাদ।…আপনাদের কোনও অসুবিধে হবে না। তবে হ্যাঁ, আপনারা কলকাতার লোক, ইলেকট্রিক আলোতে মানুষ। এখানে ইলেকট্রিক নেই। কেরোসিনের বাতি। একটা পেট্রম্যাক্স ব্যবস্থা করে রেখেছি।” বলে ভদ্রলোক আমাদের বাইরে ডেকে এনে কাছের একটা ঘর দেখালেন। “ওটা স্নানঘর। জল থাকবে।”
মানিক বলল, “এ তো বিশাল বাড়ি মশাই ৷ ”
শশিকান্ত বললেন, “এখন আর বিশাল নেই। দশ আনা ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ব্যবহার করা যায় না। বাকি যা আছে তার মধ্যে কোনওরকমে আমরা থাকি।”
“আপনারা কে কে থাকেন?”
“আমি, আমার মা আর বাড়ির কাজের লোকজন।”
“আপনি এখানেই থাকেন?”
“বেশিরভাগ সময়ে। মাঝে-মাঝে পুরী যাই। সেখানে আমার একটা ব্যবসা আছে।” “আপনার মায়ের সঙ্গে দেখা হবে না?”
“নিশ্চয় হবে। মায়ের বয়েস প্রায় পঁচাত্তর। এখনও শক্ত-সমর্থ। তবে রাতকানা হয়ে পড়েছে।…নিন, আপনারা বিশ্রাম করে হাতমুখ ধুয়ে নিন। চা-খাবার খান, তারপর কথা হবে।”
শশিকান্ত চলে গেলেন।
আমি ফাঁকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বললাম, “মানিক ওটা খাল, না নদী?”
মানিক দেখল কিছুক্ষণ। বলল, “বুঝতে পারছি না।”
“মনে হচ্ছে কোনও ছোট নদী। গরমের মুখ, জল নেই।”
মানিক বলল, “বাড়িটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোর? ভুত আছে না নেই?”
আমি হেসে বললম, “থাকতে পারে। ভূতের পছন্দসই বাড়ি।”
আতিথ্য নয়, যেন জামাই-আদর। শশিকান্তর এক বেলার আতিথ্যেই আমরা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম। আসার পর থেকে যেমন আদর-যত্ন শুরু হল, মনে হচ্ছিল, একটা হপ্তা এখানে কাটানো মুশকিল। খাওয়া-দাওয়ার কথা বাদ দিলাম, শুতে-বসতে এমন খাতির আমরা ভাবতে পারি না।
মানিক হল ভোজনবিলাসী। দুপুরবেলা খাবার পরই সে সোজাসুজি বলে দিল, “ভাই, এ দেখছি রাজারাজড়ার খাওয়া। তবে লোভ সামলাতে পারব না, খেয়ে ফেলব। তারপর পেট ফেটে মরব হারাধনের ছেলের মতন। আপঘাত মৃত্যু হলে কী হতে পারে, তা বুঝতেই পারিস।”
কথাটা মিথ্যে নয়। রাজসিক আহার বলতে যা বোঝায়, আমাদের ভাগ্যে তাই জুটেছিল। আর সত্যি বলতে কী, কলকাতার খাবারদাবার, যার না আছে স্বাদ না গন্ধ, যা শুধু ভেজাল-খাদ্য, খেয়ে খেয়ে মুখ-জিভ যেন জানতই না, অন্ন-ব্যঞ্জন কত সুস্বাদু হয়।দুপুরে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
বিকেল ঘুম ভাঙতে দেরি হল।
শশিকান্ত এসে বললেন, “চলুন, চা খেয়ে খানিক বেড়িয়ে আসি।”
চা খেয়ে আমরা যখন বেড়াতে বেরোলাম, বিকেল শেষ হয়ে আসছিল। বেড়াতে-বেড়াতে আমি এক-সময় শশিকান্তকে বললাম “আপনাদের এই বাড়ি কত দিনের?”
“শুনেছি দুশো বছরের কাছাকাছি।”
“আপনার কোনও পূর্বপুরুষ বাড়িটা করেছিলেন? জানেন কিছু।”
“আমার পিতা-পিতামহের সঙ্গে এ-বাড়ির নাড়ির সম্পর্ক নেই তাঁরা কেউ এ-বাড়ি করেননি। অথিকার-সূত্রে পেয়েছেন। পেয়ে খানিক রদবদল, যোগবিয়োগ করেছেন। আমার দিদিমা এই বাড়ি পান। তাঁর বাবার কোনও পুত্র-সন্তান ছিল না। তিনিই একমাত্র সন্তান ছিলেন। দিদিমারও একটি সন্তান, আমার মা। এই বাড়ি জমি-জায়গা আমার দিদিমার সূত্রে পেয়েছি।”
“বাড়িটার সম্পর্কে আর কিছু জানেন না?”
শশিকান্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন, “সব শোনা গল্প। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে কি না জানি না মশাই, তবে পুরনো বাড়ির গল্পটল্প ডালপালা ছড়িয়ে বেড়ে যায়, এটা বলতে পারি।”
আমরা হেসে ফেললাম। শশিকান্তর কথা বলার মধ্যে একটা মজার ভাব থাকে। আমাদের সঙ্গে তামাশা করে কথা বলেন বলে কৌতুক, নাকি তাঁর স্বভাবের মধ্যেই কৌতুক আছে বুঝতে পারি না মনে হয় স্বভাবের মধ্যে। নয়তো অমন করে কেউ চিঠি লিখতে পারে !
বেড়াতে-বেড়াতে শশিকান্ত তাঁদের বাড়ির গল্প শোনাতে লাগলেন। তিনি যা বললেন, তা বিশ্বাস করতে হলে আর-এক অরণ্যদেবকেও বিশ্বাস করতে হয়। মানে আর কিছু না হোক, অরণ্যদেব যত রকম অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটাতে পারে শশিকান্তর সেই দিদিমার বাবা দুর্জন সিংহ নাকি অবিশ্বাস্যরকম ঘটনা ঘটাতে পারতেন। ভদ্রলোক প্রথমে ছিলেন কোনও রাজা-মহারাজার ঘোড়সওয়ার, তাঁর কাজ ছিল গোপন চিঠিপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া। রাজার রাজ্য যখন যায় যায়, দুর্জন নিজের পথ বেছে নিলেন। হলেন ডাকাত। উঁচু ধরনের দস্যুবৃত্তির তখন আভিজাত্য ছিল। দুর্জন সিংহ দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে জমিদার বা ছোট এক রাজা হয়ে উঠলেন। শেষে বুড়ো বয়েসে ডাকাতি ছেড়ে কালীসাধক।
ডাকাত হিসেবে দুর্জনের বিরাট খ্যাতি হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়ে দলের লোক নিয়ে ডাকাতি করতে যেতেন, গলা কাটতে পারেতন। …বন্দুক চালাতে তাঁর জুড়ি ছিল না। দুর্জন ডাকাতি করলেও মানুষ খুন করতেন না, যদিও তাদের হাত-পা ভেঙে, মাথা ফাটিয়ে রেখে আসতেন। বুড়ো মানুষ, বাচ্চা আর মেয়েদের গায়ে আঁচড় বসাতে দিতেন না দলের লোকদের। বর্গি ধরনের একদল লুঠেরা বার-কয়েক তাঁর কাছে উচিত শিক্ষা পেয়ে ওই তল্লাট আর মাড়াত না।
দুর্জনের আমলেই বাড়িটা তৈরি হতে শুরু করে। বাড়িটাকে তিনি প্রায় গড় করে গড়ে তোলেন। তাঁর শত্রু ছিল। মাঝে-মাঝে শত্রুরা যে দুর্জনকে শিক্ষা দেবার চেষ্টা না করেছে, তা নয়। সুবিধে করতে পারেনি।
দুর্জন মারা যাবার পর হরিবিষ্ণু এ বাড়ির মালিক হন। তিনি ডাকাতি করতেন না। দুর্জনের ঘরজামাই হয়েও ভদ্রলোক জামিদারি করতেন। মানুষটি ছিলেন শৌখিন ধরনের। এই বাড়ির মধ্যে তখনকার দিনের নানান শৌখিন জিনিস এনে জড়ো করেন। তবে হরিবিষ্ণুর খ্যাতি ছিল সাপের ওঝা হিসবে। সাপ যেন তাঁর কাছে কেঁচোর মতন তুচ্ছ ব্যাপার ছিল । আর-একটা ব্যাপারে হরিবিষ্ণুর যশ ছিল প্রচুর। তিনি স্বভাবে শান্ত ধরনের হলেও অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে সাজিয়ে রাখতে পছন্দ করেতেন। দু-ফলা খাঁড়া, পাটি বল্লম, সড়কি, তরোয়াল, গা-জালি, এসব সেকালের অস্ত্র তাঁর সংগ্রহে ছিল।
শশিকান্ত বললেন, “অন্য যিনি এ-বাড়ির কর্তা হয়েছেন, তিনি সাধারণ মানুষ। জমি-জায়গা, চাষবাস, পান-তামাক, পুজোআর্চা নিয়ে দিন কাটিয়েছেন। এঁর সম্পর্কে বলার কিছু নেই তেমন। তবে দুর্জন আর হরিবিষ্ণুকে নিয়ে নানান গল্প আছে। সে-সব পরে না হয় দু-চারটে বলা যাবে।”
সন্ধে হয়ে আসার মতন হচ্ছিল। গরম কাল। বিকেল সহজে যায় না। এতক্ষণে বিকেলের আলো মরে আবছা অন্ধকার হয়ে এল।আমি বললাম, “হাজরামশাই, আপনি কী করেন?”
“কিছুই নয়,” শশিকান্ত হালকা ভাবে বললেন, “কাজের কাজ কিছুই করি না। আমাদের কিছু জামি-জায়গা আছে, সেগুলো দেখতে হয়। আর আমার একটা ট্রান্সপোর্টে বিজনেস আছে পুরীতে। সেটা দেখি।”
“আপনি তো ভূতচর্চাও করেন?”
“করেছি অল্পস্বল্প।”
“আপনার এই বাড়িতে বসে?”
“সবটা নয়। কিন্তু ।”
“এ-বাড়িতে কেমন ধরনের ভূত আছে ?”
শশিকান্ত হাসলেন। বললেন, “সেটা আপনারা নিজের চোখে দেখবেন। পরের মুখে ঝাল খাবেন কেন?”
মানিক বলল, “মশাই, ঘাড় মটকাবার মতন ভূত নেই তো?”
আমি হেসে উঠলাম।
শশিকান্ত মজার গলায় বললেন, “বাইরের লোকের ঘাড় মটাকাবে কি না বলতে পারছি না?”
আমরা হেসে উঠলাম। হাসি থামলে বললাম, “হাজরামশাই আগেও বলেছি, আবার বলছি—এবার থেকে আপনি আমাদের তুমি বলে কথা বললেন।”
চার
প্রথম রাতটা আমাদের নিশ্চিন্তে কাটল। ভেবেছিলাম, ভূতের পায়ের সাড়া অন্তত পাওয়া যাবে। কোনও সাড়াই পেলাম না।
পরের দিন সামান্য বেলায় শশিকান্তবাবুর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। অন্দরমহলে থাকেন তিনি। ওঁর দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরানো যায় না। পঁচাত্তর বছর বয়েসের বৃদ্ধা, কিন্তু কী সুন্দর দেখতে। ঘাড় পর্যন্ত চুল। একেবারে সাদা। ছিপছিপে গড়ন। রং যেন সোনার মতন। বয়েসে চামড়া কুঁচকেছে, গাল বসে গিয়েছে, হাত-পায়ের জোরও কমেছে, কিন্তু নিজের হাতে কত কী করেন। উনি রাতকানা আগেই শুনেছিলাম।
দেখলাম, চোখে কান-জড়ানো ফ্রেমের চশমা রয়েছে।
আমরা ওঁকে প্রণাম করতেই বললেন, তোমরা বেশিদিন থাকবে না বাবা? কেন থাকেব না! এসেছ যখন তখন থেকে যাও না মাসখানেক। আমরা একপাশে পড়ে আছি, কেউ তো আসে না।”
বড় আদর-যত্ন করলেন উনি। আর কী আন্তরিক কথাবার্তা। ওঁর কাছে বসেই জলখাবার খেতে হল।
বাইরে এসে শশিকান্ত বললেন, “আমার মা পটছবি আঁকতে পারে। চমৎকার হাত।…মায়ের হাতে তৈরি মুখোশও পয়লা নম্বরের।”
অবাক হয়ে আমি বললাম, “তাই নাকি! আগে তো বলেননি। ওঁর আঁকা পট দেখব।”
শশিকান্ত হেসে বললেন, “দেখবেন। তাড়াতাড়ির কিছু নেই। তার আগে…”
বাধা দিয়ে মানিক বলল, “হাজরামশাই, আপনি কথা রাখছেন না। অতবার বলার পরও আমাদের আপনি-আজ্ঞে করছেন।”
হেসে ফেললেন শশিকান্ত। বললেন, “কলকাতার লোক দেখলে গেঁয়ো মানুষদের জিভ আটকে যায়। ঠিক আছে, এবার আমাদের বাড়ির অন্য ঘরটর কিছু দেখানো যাক।”
শশিকান্ত আমাদের নিয়ে অন্দরমহলের বাইরে চলে গেলেন।
গুছিয়ে এই বাড়ির বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে মুশকিল। তবু বলি, এই বিশাল বাড়ির তিন মহল। বাইরের, অন্দরের, এই দুই মহল বাদে রয়েছে আর এক মহল, যাকে বলা যায় গোপনমহল। বাইরের মহলের বারো আনাই ভাঙাচোরা। বাকি চার আনায় শশিকান্ত হাজরাদের বাড়ির কাজকর্মের লোকজন থাকে। তারা বেশিরভাগই জমিজায়গা, বাগানের কাজ করে। অন্দরমহলেরও দু-চারটি ঘর মাত্র ব্যবহার করা হয়। বাদবাকি বসবাসের অযোগ্য। হাজরামশাইয়ের মা থাকেন অন্দরমহলে। তাঁর সঙ্গে থাকে দুটি বয়স্কা মেয়ে, সংসারের কাজকর্ম করে। শশিকান্ত থাকেন একপাশে।
গোপন-মহলটা হল বাড়ির শেষ প্রান্তে। এই মহলটি একতলা। বাড়ির সঙ্গে যোগ প্রায় নেই। খানিকটা তফাতে। দেখতে অনেকটা কাছারিবাড়ির মতন। গোপন-মহলের অবস্থা এখন গুদামখানার মতন।
মানিক বলল, “এই মহলে কী হতো?”
শশিকান্ত বললেন, “ডাকাতির পরামর্শ হতো। লুঠের মাল লুকনো থাকত। কখনও-কখনও দু-একজনকে ধরে এনে আটকে রাখা হতো।”
“মানে টর্চার করা হত?”
“তাই মনে হয়।”
“দুর্জন কি নরহত্যা করতেন?
“না। আগেই সে-কথা বলেছি তোমাদের। তবে এক-আধজনকে হয়তো শেষ পর্যন্ত খুন করতে হয়েছে। আমি ঠিক জানি না। দুর্জন সামনাসমনি লড়াই করতে গিয়ে যদি কাউকে খুন করে থাকেন, করেছেন। সেটা যুদ্ধের নিয়মের মধ্যে পড়ে। শত্রু-নিধন যুদ্ধের অঙ্গ। দুর্জনকে দোষ দেওয়া যাবে না।”
“কিন্তু আপনি যে বললেন, আটক রাখা মানুষকেও খুন করেছেন?”
“না, আমি তা বলিনি। আমি বলেছি, শেষ পর্যন্ত এক-আধজনকে হয়তো খুন করতে হয়েছে। দুর্জন নিজে নাও করতে পারেন, তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা করেছে।”
“একই হল। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।
শশিকান্ত কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন, “নিজের দলের কেউ যদি বেইমানি করে, লোভে পড়ে দুর্জন আর তাঁর দলকে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করে, তেমন লোককে আর কী করা যেতে পারে? তোমরা ভুলে যেও না, দুর্জন প্রায় দুশো বছর আগের মানুষ। তখনকার রীতিনীতি মেনেই তিনি চলতেন। আজও সেই রীতির বদল হয়েছে বলে শুনিনি।”
আমি বললাম, “থাকগে ও-কথা। অন্য একটা কথা বলুন। হরিবিষ্ণুর শখ ছিল সেকালের অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে সাজিয়ে রাখা। সেই ঘরটা কোথায়।”
শশিকান্ত আঙুল দিয়ে গোপন-মহলটাই দেখালেন। বললেন, “এখানে। ওই যে ঘরটা দেখা যাচ্ছে, নিমগাছের গায়ে ওই ঘরের পেছন দিকে।”
“দেখা যায় না?”
শশিকান্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে কী যেন লক্ষ করলেন। বললেন, “উপায় নেই । লোহার দরজা এমনভাবে আটকে গিয়েছে যে, খোলা যায় না। তার ওপর তিনটে সেকেলে তালা। তার চাবি কোথায় কে জানে!”
মানিক বলল, “সে কী! আপনারা কেউ খোলার চেষ্টা করেননি?”
“আমি করিনি। বাবার আমলে মাঝে-মাঝে খোলা হতো। তখন আমি দেখেছি। বাবা মারা যাবার পর থেকে ও-ঘরের তালার চাবি পাওয়া যায়নি। আমার নিজেরও আগ্রহ হয়নি ঘরটা খোলার।”
মানিক আর আমি শশিকান্তকে খুঁটিয়ে দেখলাম। উনি সত্যি কথা বলছেন, না, আমাদের এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছেন বুঝলাম না।শশিকান্ত বললেন, “চলো, এবার ফেরা যাক।”
আমরা ফিরতে লাগলাম।
সামান্য এগিয়ে এসে আমি হালকা গলায় বললাম, “হাজরামাশাই, আমরা এখানে এসেছি চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত কিন্তু কোনও ভুতের সঙ্গে পরিচয় হল না।” বলে হেসে ফেললাম।
শশিকান্ত হাসিমুখেই বললাম, “ব্যস্ত হোয়ো না। ভূত তোমার-আমার চাকর নয় যে, হুকুম করলেই হাজির হবে। নিজের মর্জিতে আসে-যায়। তোমরা নতুন এসেছ। এ-বাড়িতে অতিথি। হয়তো তাই প্রথমটায় বিরক্ত করতে চাইছে না। পরে করবে।”
শশিকান্ত হেসে উঠলেন। আমরাও হাসলাম।
আমি ঠাট্টা করে বললাম, “ভূতদেরও স্যার সৌজন্যজ্ঞান আছে কী বলেন?” শশিকান্ত বললেন, “মানুষের চেয়ে কম নয়।” বলে কিন্তু আর হাসলেন না। সকালে বুঝিনি, সন্ধেবেলায় বুঝলাম, শশিকান্ত হাজরা আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেননি।
ঘটনাটা এই ভাবে শুরু হল।
আমি আর মানিক গিয়েছিলাম ঘোরাফেরা করতে বিকেলের দিকে। শশিকান্ত সঙ্গে ছিলেন না। আমরা আশপাশে ঘুরে-ঘুরে যখন ক্লান্ত হয়ে নদীর দিকে এসে বসেছি, তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গোধূলি ধরেছে আকাশে। নদীতে জল নেই, শুধু বালি আর গোধূলির আলো ভাসছে শূন্যে। সেই আলোর আভা বালিতে পড়ে কোথাও-কোথাও খানিকটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। একরাশ পাখি উড়ে গিয়ে নদীতীরের গাছগাছালির মাথায় বসছিল, আবার উড়ে যাচ্ছিল।
গোধূলির আলো যখন মরো-মরো, হঠাৎ নজরে পড়ল নদীর ওপারে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শ্বেতশুভ্র বসন। মনে হল আমরা খেয়াল করিনি আগে, খেয়াল করলে হয়তো দেখত পেতাম মানুষটি কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছে।
মনিক বলল, “কে রে?”
আমি লক্ষ করছিলাম। এতটা দূর থেকে বোঝা যায় না, দেখাও যায় না স্পষ্ট করে। তবু মনে হল, আলখাল্লার মতন একটা সাদা জামা গায়ে দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে নদীর ওপারে।
“হাজরামশাইদের কেউ হবে।” আমি বললাম।
লোকটি দাঁড়িয়েই থাকল। একইভাবে। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। অনুমান করা যাচ্ছিল।
নদীর ওপারে কোনও জনবসতি নেই। মাঠ আর জঙ্গলই শুধু চোখে পড়ে। ওপারে যে দাঁড়িয়ে আছে সে এপারে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষটি দাঁড়িয়ে ছিল, এপারে আসছিল না। ও যেই হোক ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? হয় এ-পারে আসবে, না হয় ও-পারে হাঁটাচলা করবে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার কী অর্থ?
মানিক বলল, “ডাকব নাকি?”
“ডাক।”
হাঁক মেরে ডাকল, “এই যে এদিকে।” হাত তুলে দেখাল নিজেকে।
বাতাসে তার ডাক ভেসে গেল কি না কে জানে, কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। গলা ছেড়ে আবার ডাকল মানিক শেষে আমিও তার সঙ্গে চেঁচাতে লাগলাম। আশ্চর্য! লোকটা কালা না অন্ধ। না পাচ্ছে শুনতে, না পাচ্ছে আমাদের দেখতে। নদী এমন কিছু চওড়া নয়। খালের মতই।
বালি পেরিয়ে ওপারে যাব কি না ভাবছি, অন্ধকার হয়ে এল। তখনও দলছুট দু-চারটে পাখি মাথার ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে সঙ্গীদের খোঁজে।
হঠাৎ দেখি যাকে অত ডাকাডাকি করছিলাম, সে আর নেই। আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে।
মানিক বলল, “আরে! অদ্ভুত তো! গেল কোথায়?”
আমিও অবাক হয়েছিলাম। দু-মুহূর্ত আগেও যাকে চোখে দেখছিলাম, সে কোথায় হারিয়ে গেল!
“কী ব্যাপার বলতো?” মানিক বলল।
আমি বললাম, “ব্যাপার বুঝছি না। তবে অন্ধকার হয়ে এসেছে, লোকটা হয়তো কোথাও গা ঢাকা দিল।” “ভূত?”
“মানুষও হতে পারে। একবার দেখে কি বোঝা যায়! নে চল, কাল আবার দেখা যাবে।”
আমরা ফিরতে লাগলাম। গরমের দিন। ঝোপঝাপ, এবড়ো-খেবড়ো জমিতে সাপখোপের অভাব হবে না। টর্চ আনা হয়নি। ভুল হয়েছে। কাল থেকে পকেট টর্চ নিয়ে বেরোতে হবে। আজ যদি টর্চ সঙ্গে থাকত, আলো ফেলে দেখা যেত লোকটা কোথায় পালাল।আমাদের ফেরার পথেই চাঁদ উঠল আকাশে।
সন্ধেবেলায় আমাদের ঘরের সামনে লম্বা বারান্দায় বসে-বসে দুজনে গল্পগাছা করছিলাম। বসন্তের বাতাস দিচ্ছিল। চাঁদের আলো এতক্ষণে থিতিয়ে গিয়েছে। অনেকটা তফাতে জোনাকি উড়ছিল। ঝিঁঝিঁ ডাকছে।
শশিকান্তকে দুপুর বা বিকেলে আমরা দেখিনি। তিনি কোথায় তা জানি না। অনাদিকে আমাদের দেখাশোনার কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন শশিকান্ত, সে আমাদের খোঁজখবর করে যায় প্রায়ই, কিন্তু অনাদিও বলতে পারল না বাবু কোথায় গিয়েছেন। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছেন, এইমাত্র সে জানে।
সন্ধের শেষাশেষি শব্দ পাওয়া গেল গাড়ির। শশিকান্ত বোধহয় ফিরলেন এতক্ষণে । চাঁদের আলোয়, ফুরফুরে বাতাসে বসে থাকতে-থাকতে আমাদের যখন আলস্যবশে তন্দ্রার মতো এসেছে, শশিকান্ত এসে হাজির।
বলালাম, “কোথায় গিয়েছিলেন? আপনার দেখা না পেয়ে ফাঁকা-ফাঁকা লাগছিল।”
শশিকান্ত বসতে-বসতে বললেন, “যোগেন, আমাদের ড্রাইভার ছোকরাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। এখানে ডাক্তারবদ্যি নেই। ছ-সাত মাইল ছুটতে হয়। সরকারি হাসপাতাল। নামেই হাসপাতাল। ডাক্তার নিজের ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়। যোগেনের হাত ভেঙেছিল। প্লাস্টার কাটিয়ে নিয়ে এলাম।
“ও! ভালো আছে?”
“ওই আছে। হাড় ঠিকমতন সেট হল কি না কে জানে! দেখা যাক। এখন ক্রেপ ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।”
“অনাদিকে জিজ্ঞেস করলাম, ও বলতে পারল না!”
“জানত না।…তোমাদের আজ সঙ্গ দিতে পারলাম না। ভেরি সরি।” বলে শশিকান্ত হাসলেন।
মানিক বলল, “স্যার, আজ একটা জিনিস দেখলাম। নদীর ওপারে। গোধূলিবেলায়। বুঝতে পারলাম না।”
আমরা কী দেখেছিলাম মানিক তার বর্ণনা দিল।
শশিকান্ত চুপচাপ শুনলেন।
উনি কী বলেন শোনার জন্যে আমরা ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অনেকক্ষণ পরে শশিকান্ত বললেন, “ওঁকে মাঝে-মাঝে দেখা যায়।”
“কে উনি?”
“আমাদের এক আত্মীয়।…আমি ওঁকে অল্প বয়েসে দেখেছি। এখন আমার কিছু মনে পড়ে না ভালো করে। ওঁকে কুষ্ঠরোগে ধরে। রোগে পড়ার পর উনি আর আমাদের বাড়িতে থাকতে চাননি। নদীর ওপরে গিয়ে থাকতেন। ওঁর জন্যে একটা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। একদিন দেখা গেল, উনি নেই, ঘর ফাঁকা।”
আমি বললাম, “এটা কত দিনের কথা?”
“হিসেব করে বলা মুশকিল। ধরো, বছর-তিরিশেরও বেশি। আমার ছেলেবেলায় যখন দেখেছি ওঁকে, তখন উনি গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরি নিয়ে কাজ করতেন। থাকতেন কটকে। মাঝে-মাঝে আমাদের কাছে এসে থাকতেন। পরে ওঁর কী হয় সব ছেড়েছুড়ে আমাদের কাছেই বছর দুই-তিন ছিলেন। তারপর কুষ্ঠরোগ দেখা দিল, এ-বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।”
আমি বললাম, “উনি কি মারা গিয়েছেন?”
“কেমন করে বলব! ওঁকে ওঁর ঘরে দেখা যায়নি। মনে হয়, উনি আমাদের চোখের আড়ালে কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। অবশ্য তার কোনও প্রমাণ নেই।”
“বেঁচে থাকলে আজ ওঁর বয়েস কত হতো?”
“বয়েস!…তা অনেক। সত্তরের ওপর।”
“আপনাদের কেমন আত্মীয়?’
“দূর সম্পর্কের কাকা।”
মানিক বলল, “আমরা যাঁকে দেখলাম, তিনি কি ওঁরই…?”
শশিকান্ত কোনও জবাব দিলেন না।
আমরা সিগারেট ধরালাম। শশিকান্ত সিগারেট খান না। তাঁর নিজস্ব চুরুট বার করে ধরিয়ে নিলেন।
নিজেই শেষে বললেন, “কাকা শুনেছি সন্ন্যাসীর মতন থাকতেন। বিয়ে-থা করেননি। আমিষ খেতেন না। বড় ভালো মানুষ ছিলেন।” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “দ্যাখো, ভূত-প্রেত এ-সব কথার কী মানে, আমি জানি না, আমি জানি, আমাদের চোখের বাইরেও একটা জগৎ আছে। কখনও-কখনও তার কিছু চোখে পড়ে যায়।…যাকগে এ-সব কথা। আজ যা দেখছ তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। পরে যা দেখবে, সেগুলো হয়তো বাইরে নয়, এ-বাড়িতেই।”
শশিকান্তর সঙ্গে আমি তর্ক জুড়তে পারতাম, জুড়লাম না। উনি যে খুব অজ্ঞ, তা আমার মনে হয় না। আগে থেকে তর্ক করে লাভ কী! শশিকান্ত আরও খানিকটা বসে উঠে গেলেন। মানিক বলল, “নে, ঘরে চল। এবার একটু গা শিরশির করছে।”
তখন কত রাত বলতে পারব না। ঘর অন্ধকার। একটা বড় জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে মেঝেতে। দরজা বন্ধ। লোহার স্প্রিং-দেওয়া খাটে ছোবড়ার মোটা গদি-দেওয়া বিছানায় আমরা শুয়ে আছি। মানিক অঘোরে ঘুমোচ্ছিল।
আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অদ্ভুত এক শব্দ শুনে।
কান পেতে শব্দটা বোঝার চেষ্টা করলাম। দরজার শব্দ বলে মনে হল। ভারী কোনও দরজা যেন খোলা হচ্ছে। কব্জায় জং পড়ে থাকলে যেমন দরজা খোলার সময় শব্দ হয়, অনেকটা সেইরকম।
প্রথমে মনে হল, আমাদের ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করছে কেউ। কিন্তু তা কেমন করে হবে। আমাদের ঘরের দরজাও বন্ধ। তা ছাড়া ঘরের দরজা যথেষ্ট ভারী হলেও পাল্লা খোলার সময় কোনও বাজে শব্দ হয় না।
তবে কি আমাদের পাশের ঘরের দরজা খুলছে কেউ? এতটা রাত্রে কেন? হাত বাড়িয়ে মানিকের বিছানার নাগাল পেলাম। মশারি টাঙানো রয়েছে।
“মানিক?” মানিকের গা ছোঁয়া গেল না।
অগত্যা উঠে বসে মানিকের গায়ে ধাক্কা দিলাম আস্তে করে। মানিক উঠে বসল ধড়মড়িয়ে।
বললাম, “একটা শব্দ হচ্ছে শুনতে পাচ্ছিস?”
ঘুমভাঙা অবস্থায় সামান্য বসে থেকে মানিক যেন শব্দটা শুনল, বলল, “পাচ্ছি।” “কিসের শব্দ?”
“বুঝতে পারছি না।”
“দরজা খোলার মতন নয়? মরচে-ধরা কব্জার শব্দ বলে মনে হচ্ছে।”
মানিক ক’মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “হতে পারে। আমাদের ঘরে হচ্ছে না।” “চল, দেখি।”
বিছানার মাথার দিকে টর্চ রেখেছিলাম। চার ব্যাটারির টর্চ। টর্চ নিয়ে উঠে পড়লাম। দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখি জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। ছাদ-জোড়া ফাঁকা বারান্দা। কেউ কোথাও নেই।
আমাদের পাশের ঘর বন্ধ। এই ঘরটা আমাদের খাবার ঘর হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। শ্বেতপাথর বসানো গোল একটা খাবার টেবিল আর তিন-চারটে চেয়ার ছাড়া ও-ঘরে কিছু নেই। আর আছে সেকেলে এক দেওয়াল-আলমারি।
তারপরে ঘরটা বন্ধই পড়ে আছে। তালা ঝোলানো। কী আছে ওই ঘরে আমরা জানি না। ঘরটার পাশ দিয়ে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচের। সিঁড়ির রাস্তার ওপাশে ডান দিক ঘেঁষে আমাদের স্নানঘর।
ফাঁকা বারান্দায় আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। চাঁদের আলো পুরো বারান্দাটাই স্পষ্ট, তবু একবার টর্চের আলো ফেলে চরপাশ দেখে নিলাম।
মানিক বলল, “কই, কোথাও কিছু দেখছি না।”
শব্দটা আর শোনা যাচ্ছিল না। ব্যাপারটা কেমন যেন! নিজের কানে আমি শব্দ শুনেছি। মানিকও শুনেছে। এই শব্দ কোথা থেকে আসছিল, কে এসেছিল ওপরে? কেনই বা?
চোর আসার আশঙ্কা এ-বাড়িতে নেই। এখানে যারা থাকে সকলেই একরকম বাড়ির লোক। কাজকর্ম করে, চাষবাস, বাগান বাড়ির। এখানেই থাকে। কেউ কেউ বউ-বাচ্চা নিয়ে। এরা চোর হতে পারে না। তা ছাড়া বার-মহলের কীই-বা চুরি করতে আসবে। আমাদের কাছ থেকেও নেবার মতন জিনিস কিছু নেই ।
নীচে আগাছাভরা মাঠ, দূরে ঝোপঝাড়, জঙ্গল। অকারণ কিছুক্ষণ টর্চ ফেলে দেখলাম। কিছুই চোখে পড়ল না।
মানিক বলল, “কী রে, কানে ভুল শুনলাম?”
“না।”
“তা হলে?”
“বুঝতে পারছি না।”
আর কিছু করার ছিল না। মানিককে বললাম, “চল, শুয়ে পড়া যাক। কাল দেখা যাবে।”
আমরা ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ মনে হল কী একটা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ভেসে গেল। কালোমতন। বেশ বড়।দু’জনেই চমকে উঠেছিলাম।
কালোমতন জিনিসটা ফাঁকা খোলা বারান্দা দিয়ে উড়ে পশ্চিম দিকে চলে গেল। আর দেখা গেল না। আড়াল পড়ে গেল।
মানিক বলল, “কী রে বাদুড় নাকি?”
বাদুড় বলে আমার মনে হল না। এত বড় বাদুড় হয় বলেও আমি জানি না। কোনও শব্দই হল না উড়ে যাবার সময়। পাখাও নড়ল না ৷
“বাদুড়?” মানিক আবার বলল।
“না। বাদুড় বলে মনে হচ্ছে না।” “তবে?”
“কী জানি।”
মানিক বলল, “বাইরে দাঁড়িয়ে আর দরকার নেই। চল ঘরে যাই।” আমরা নিজেদের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করলাম।
পাঁচ
পরের দিন সকালে শশিকান্তর সঙ্গে দেখা। আমাদের চা খাওয়া শেষ হয়েছে, সিগারেট ধরিয়েছি, শশিকান্ত এলেন। পরনে পাজামা, গায়ে পাঞ্জাবি। এসে বললেন, “আমি একবার বেরোচ্ছি। শহরে যাব। উকিলের কাছে। ফিরতে দুপুর হবে। তোমাদের যদি কিছু দরকার থাকে বলো।”
আমি বললাম, “দরকার আর কী! কিছু সিগারেট!” বলে মানিককে ইশারা করলাম উঠে গিয়ে টাকা এনে দিতে।
শশিকান্ত ইশারা বুঝতে পেরেছিলেন। হাত নেড়ে বললেন, “থাক দিতে হবে না।” আমরা যতই বলি, তা কেমন করে হয়, টাকাটা আপনি নিন, উনি ততই মাথা নাড়েন। টাকা উনি নেবেন না।
শেষে আমি হেসে বললাম, “কাল রাত্তিরে বোধহয় আমাদের জন্যে আপনি দু’একজন ভূত পাঠিয়েছিলেন! বা অদ্ভুতকে!”
শশিকান্ত তাকিয়ে থাকলেন। “কী হয়েছে?”
মানিক রাত্রের ঘটনার বিবরণ দিল।
মন দিয়ে শুনলেন শশিকান্ত। বললেন, “এতেই ঘাবড়ে যাচ্ছ নাকি?”
মানিক বলল, “আমি মশাই ভীতু টাইপ। ঘাবড়ে যেতেই পারি।”
আমি বললাম, “ব্যাপারটা কী বলুন তো? ভূত দরজা খোলার চেষ্টা করবে কেন? তার তো সর্বত্র গতি।… আর ওটাই বা কী? মাথার ওপর দিয়ে ভেসে গেল !”
শশিকান্ত মজার মুখ করে হাসলেন, “কোনওটাই কিছু নয় হয়তো। কিংবা দুটোই অদ্ভুত কিছু। আমি কেমন করে বলব! তোমরা খুঁজে দেখো, কোনটা কী?” বলে উনি আর দাঁড়ালেন না, চলে গেলেন।
শশিকান্ত চলে যাবার পর মানিক বলল, “অমর, হাজরামশাই রগড় করে গেলেন যে! পাত্তাই দিলেন না।”
আমি বললাম, “রগড় তো করবেনই। আমরা ভূতের খোঁজে এসেছি। ভুতুড়ে বাড়ি কিনব। উনি আমাদের বহর দেখছেন।”
“তুই তো আর সত্যি বাড়ি কিনছিস না! আর হাজরামশাইও এ-বাড়ি বেচবেন না। এটা বাড়ি নয় রে, দুর্গ। ভাঙাচোরা দূর্গ।”
আমি বললাম, “হাজরামশাই যে এ-বাড়ি বেচবেন না সেটা আমি গোড়া থেকেই জানি। উনি আমার সঙ্গে রসিকতা করেছিলেন। তবে পুরোপুরি রসিকতাও নয়। হয়তো কৌতুহল হয়েছিল, আমার সম্পর্কে।”
“কিসের কৌতুহল?”
“এত জিনিস থাকতে একটা লোক ভূতের খোঁজ করে বেড়াচ্ছে কেন?” বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। “চল, আমাদের এই অতিথিশালার ঘর-দোর, নীচেটা একবার ভালো করে দেখি।”
মানিক হাই তুলে উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বলল, “কালকের বিকেলের ব্যাপারটাও স্ট্রেঞ্জ। আজ একবার নদীর ওপারে যাবি?
“যাব। …তোকে সত্যি বলছি মানিক, আমার স্পেশ্যাল ইন্টারেস্ট- শশিকান্তবাবুদের গোপন-মহল। ওটা একবার দেখতেই হবে।”
“কেমন করে দেখবি? তালা ঝুলছে। কবেকার তালা। তার চাবি হাজরামশাইয়ের কাছে নেই।”
“আমার তা মনে হয় না। চাবি নিশ্চয়ই আছে। উনি আমাদের দিতে চান না।”
“একই হল।”
“দেখা যাক।”
অনেকটা বেলা পর্যন্ত আমরা ঘোরাঘুরি করলাম। অতিথিশালা বা বার-মহলের আশেপাশে এমন কিছু দেখতে পেলাম না। যাতে সন্দেহ করা যায়। আমরা দোতলায় একটা ঘরে থাকি, একটা ঘরে খাওয়া-দাওয়া করি, বাড়ির ভেতর থেকে খাবার আসে। এই দুটো ঘর বাদ দিলে আর-একটা ঘর অবশ্য রয়েছে। কিন্তু বাইরে থেকে তালাবন্ধ। ঘরের জানলাও বন্ধ ভেতর থেকে। আর ঘরের দরজাটা যেন মান্ধাতা আমলের। চট করে বোঝার উপায় নেই কাঠের না লোহার, এমন রং হয়েছে। কাঠেরই দরজা অবশ্য। কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় ভীষণ ভারী।
মানিককে নিয়ে গোপন-মহলের কাছাকাছিও খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। এই জায়গাটা একরকম পরিত্যক্ত। পায়ে-চলা পথ, আগাছা আর ঝোপঝাড় ছাড়া কিছু নজর করার নেই। মহলের পেছন দিকে গাছ রয়েছে বড়-বড়। একরাশ পাথর। কালচে রং ধরে গিয়েছে পাথরগুলোয়। মহলের সীমানা, গাছগাছালির পর ভাঙা পাঁচিল। প্রায় সবটাই ভেঙে পড়েছে। পাঁচিলের ওপারে এবড়ো-খেবড়ো জমি—তারপর নদী। নদীটা যেন এই বাড়িটাকে একপাশে বেড় দিয়ে রেখেছে। জল না থাকায় নদীর বদলে শুধু বালিই চোখে পড়ে।
আমি অনেকক্ষণ ধরে হরিবিষ্ণুর শখের ঘরটার কাছাকাছি ঘুরে বেড়ালাম। ঘরটা সরাসরি দেখার উপায় নেই। নিমগাছের গা-লাগানো এক ঘর, তার পেছন দিকে সেই হরিবিষ্ণুর মিউজিয়াম, যেখানে তিনি পুরনো দিনের অস্ত্র শস্ত্র মজুত করেছিলেন।
মানিক বলল, “নে চল, অনেক হয়েছে।”
ফেরার সময় আমি বললাম, “ওই ঘরটা কেমন করে দেখা যায় বল তো?”
মানিক বলল, “উপায় নেই।”
“উপায় একটা করা যায় না?”
“কেমন করে?”
“জানি না। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে, শশিকান্ত ঘরটা আমাদের দেখতে দিতে চান না।”
“কেন?”
“সেটাই ভাবছি। কেন? সত্যিই কি ওই ঘরের চাবি নেই? না, চাবি আছে, শশিকান্তর ইচ্ছে নেই ৷ ”
মানিক বলল, “হাজরামশাই ভালো লোক, তুই ওঁকে সন্দেহ করছিস?”
“উনি খারাপ লোক আমি একবারও বলিনি।” মানিক কিছু বলল না!
বিকেলে আমরা বালি পেরিয়ে নদীর ওপারে গেলাম। সন্দেহ করার কিছুই চোখে পড়ছিল না। বালি, বড়-বড় কয়েকটা পাথর, নদীর পাড় ঘেঁষে যেমন থাকে সচরাচর তার বেশি আর কিছু নয়। হ্যাঁ, পাড়ের গা ধরে ঝোপঝাড়, তার পর গাছপালা, তফাতে ধুধু মাঠ। বসতির কোনও চিহ্ন ওপারে নেই। বালিতে গোরু-মোষের পায়ের ছাপ পড়েছে সামান্য।
অনেক খুঁজেপেতে আমরা যা পেলাম তার কোনও মানেই হয় না। ভাঙা কড়াইয়ের একটা টুকরো।
ফিরে আসার সময় মানিক বলল, “কালকের লোকটা মিস্ট্রি হয়ে হইল।”
আমি কোনও জবাব দিলাম না।
মানিক আবার বলল, “হাজরামশাই যে কাকার কথা বললেন তাঁর স্পিরিট নাকি?”
“তোর মাথা। কাকার আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, বিকেলে হাওয়া খেতে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে?”
“তবে?”
“তবেটাই ধরতে পারছি না। দেখি আর কী-কী হয়!”
সন্ধেবেলাটা ভালোই কাটল! হাজরামাশাই শহর থেকে ফিরে এসেছিলেন আগেই। সন্ধের দিকে আমাদের কাছে এলেন। গল্পগুজব হল। একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করলাম, উনি নিজের থেকে একবারও গতকালের ঘটনা নিয়ে কথাবার্তা বলছিলেন না। আমরা যতবার কথাটা তুললাম, শশিকান্ত হেসে এড়িয়ে গেলেন। বা এমন কিছু বললেন, যার কোনও মানেই হয় না।
শশিকান্ত চলে যাবার পর আমি মানিককে বললাম, “আজ ঘুমোলে চলবে না। ব্যাপারটা দেখতে হবে।”
মানিক বলল, “মাঝরাত পর্যন্ত জাগতে রাজি আছি, তারপর ভাই পারব না।”
“দেখা যাবে। …নে একটু তাস খেলা যাক। খাবার দেরি আছে।”
মানিক জানে, তাস খেলাটা আমার ছুতো। অনেক সময় তাস খেলার নাম করে আমি আমার বুদ্ধি এবং যুক্তিকে শানিয়ে নিই।
তাস আমাদের কাছেই ছিল। মানিক উঠে গিয়ে তাসের প্যাকেট নিয়ে এল।
বিছানার ওপর তাস সাজিয়ে বসলাম আমরা। ঘরে একটা কেরোসিনের টেবল ল্যাম্প জ্বলছে। বড় ঘর। আলো সারা ঘরময় ছড়াতে পারছে না। বাইরে জ্যোৎস্না। ঘরের জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না আসছে। যত রাত বাড়বে, চাঁদের আলো আরও যেন ছড়িয়ে যাবে জানলা দিয়ে।
হাত কয়েক তাস খেলার পর অনাদি এল। এসে বলল, “আপনাদের খাবার এনেছি। আসুন।” বলে চলে গেল। মানিক বলল, “অনাদি, রাত্তিরে তুমি কোথায় থাকো?”
“আজ্ঞে, ও-বাড়িতে।”
“এ-বাড়ির নীচে কে-কে থাকে?”
“বসনদা আর তুলসীকাকা।”
“কী করে ওরা?”
“দু’জনাই খেত-খামারের কাজ দেখে।”
আমরা খাওয়া শুরু করতেই অনাদি ঘরের বাইরে চলে গেল। খাওয়ার সময় সে কাছে দাঁড়িয়ে থাকে না।
আমি বললাম, “নীচে যারা থাকে, তারা এই বাড়ির পিছন দিকটায় থাকে। আমরা আছি সামনে। তুই হাজার ডাকলেও ওরা শুনতে পাবে না।”
মানিক বলল, “না, আমি ভাবছিলাম, ভূত যদি আসেই আমাদের দিকে আসবে কেন?” বলে হাসল।
আমি বললাম, “পোষা ভূত। বাড়ির লোকদের কিছু বলে না। দুজনে হেসে উঠলাম। আমরা দু’জনেই জেগে ছিলাম। যে-যার বিছানায় চুপ করে শুয়ে। ঘর অন্ধকার। আমার বালিশের পাশে টর্চ।
ঠিক যে কত রাত বুঝতে পারছি না। বারোটা হবে। আমাদের ঘড়িগুলো টেবিলে পড়ে আছে। হাতে ঘড়ি বেঁধে শুয়ে থাকা আমার পোষায় না। মানিকেরও নয়।
রাত আরও বাড়ল। ঘরের জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না ঢুকে ঘর যেন সামান্য স্পষ্ট করে রেখেছে। বাইরের ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসছিল।
হঠাৎ, একেবারে হঠাৎই মনে হল, বারান্দায় কিসের শব্দ হচ্ছে। শব্দটা বোঝার জন্যে কান পেতে থাকলাম। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পায়ের শব্দ নয়। অথচ অনেকটা যেন পায়ের শব্দ। খড়ম পরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, সেইরকম। তবে খড়মের শব্দ আরও ছড়ানো হয়, এই শব্দ একটু অন্যরকম। খটখট শব্দ হচ্ছিল।
বিছানা ছেড়ে উঠে মানিককে ঠেলা মারলাম। মানিকও উঠে পড়েছিল।
টর্চ হতে দরজার কাছে আসতেই অদ্ভুত কাণ্ড। দরজাটা কাঁপতে লাগল। অত ভারী মজবুত দরজা এ-ভাবে কাঁপতে শুরু করল কেন বোঝার আগেই আমি টর্চ জ্বেলে ফেললাম।
দরজার আলো পড়ার পর স্পষ্টই দেখলাম, দরজাটা কাঁপছে থরথর করে। ক্রমশই বাড়তে লাগল, শব্দও বেড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেন কেউ ভীষণ জোরে দরজাটাতে ধাক্কা মারছে।
মানিক বলল, “ভূমিকম্প?’
ভূমিকম্প! দেওয়ালে আলো ফেলালম। একেবারে স্থির। দরজার পাল্লাই শুধু কেঁপে যাচ্ছে ভীষণভাবে। যেন ভেঙে পড়বে। ভূমিকম্প নয়। ভূমিকম্প হলে দেওয়াল স্থির থাকত না। দুলে উঠত।
কেমন একটা ঝোঁকের মাথায় দরজা খুলে ফেললাম। শব্দ করে পাল্লা দুটো দু’পাশে ছিটকে গেল।
বারান্দা ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই।
মানিক আর আমি বারান্দার একপাশ থেকে অন্যপাশ ছোটাছুটি করলাম। আলো ফেললাম সিঁড়িতে। নীচেটাও আলো ফেলে-ফেলে দেখলাম। চুপচাপ, শান্ত। কোনও কিছুই চোখে পড়ল না।
অদ্ভুত কাণ্ড। আমি নিজের কানে শব্দ শুনেছি বারান্দায়। কিসের শব্দ? কে এসেছিল? মানিক বোধহয় ভয় পেয়েছিল। বলল, “ঘরে চল।”
ঘরে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। নীচে নেমে মাঠে ছুটে বেড়িয়েও কোনও লাভ হতো না আর। যদি কেউ এসেই থাকে এই ভাঙাচোরা ভুতুড়ে বাড়িতে কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে কে বলবে।
সামান্য দাঁড়িয়ে থাকলাম বারান্দায়। চারদিক চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। নদীর বালিতে জ্যোৎস্নার আলো পড়ে মনে হচ্ছিল যেন জলস্রোত বয়ে চলেছে।
চারদিক এত শান্ত, স্তব্ধ, সুন্দর যে এর মধ্যে কোনও ভুতুড়ে ঘটনা ঘটতে পরে ভাবা যায় না।
আমরা ঘরে এলাম। দরমা হাট করে খোলা। এখন আর কিছুই কাঁপছে না। যেন কখনও কাঁপেনি।
খানিক দরজা বন্ধ করল।
বিছানার কাছে ফিরে আসছিলাম আমি, আসতে-আসতে কেমন গন্ধ পেলাম। বিশ্রী গন্ধ।
“কিসের গন্ধ বেরোচ্ছে রে?”
টর্চ ফেলে-ফেলে ঘরের চারপাশ দেখলাম। গন্ধ পাবার মতন কী থাকতে পারে? নজরে পড়ল, কলাপাতায় মোড়া কী একটা রয়েছে গোল-মতন ।
বোঁটকা গন্ধ, “মানিক বলল, “জন্তু-জানোয়ারের গায়ের গন্ধ…’ “জন্তু-জানোয়ার এখানে কোথায় পাবি?…ওই দ্যাখ!”
মানিক দেখল। নাক সিঁটকে বলল, “চামিচিকে মরে গিয়ে পচেছে কি!”
“ওটা এল কোথা থেকে? কী ওটা, সারাদিন ছিল না, হঠাৎ এখানে…’
“দরজাটা খুলে দে।”
দরজা না খুলে উপায় ছিল না।
মানিক বমি তোলার আওয়াজ করল। বমি করল না।
আমরা আবার ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
অনেকক্ষণ পরে যখন ঘরে গেলাম আবার, গন্ধটা আর নাকে লাগছিল না।
ছয়
সকালে যেমন আসেন শশিকান্ত আমাদের কাছে হাসি-হাসি মুখ করে হাজির হলেন। এসে বললেন, “মায়ের তরফ থেকে তোমাদের নেমন্তন্ন জানাতে এলাম। আজ দুপুরে তোমরা মায়ের কাছে বসে খাবে।”
আমি শশিকান্তকে দেখছিলাম। ওপর থেকে মানুষটিকে যতটা সরল, রসিক, ভালো মানুষ মনে হয়, উনি কি সত্যিই তাই? না, ওঁর মধ্যে কোনও চাতুরি আছে? কী চাতুরি, তা আমার জানা নেই। এখন এক-একবার সন্দেহ হয়, নিজের বাড়িতে অতিথি হিসেবে ডেকে এনে উনি আমাদের বীরত্বের দৌড় দেখছেন। হয়তো আমাদের নিয়ে খেলা করছেন। ওঁর বাড়ি, এ-বাড়ির সব আটঘাট ওঁর জানা। কোথায় কোন কৌশল করে রেখেছেন, আমরা ধরতে পারছি না। না পেরে বোকা বনে যাচ্ছি।
মানিক কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “মা’কে বলবেন, আমরা ঠিক সময়ে হাজির হয়ে যাব।” বলে একটু হেসে শশিকান্তকে কয়েক পলক দেখলাম।
“হাজরামশাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“বলো।”
‘এই বাড়ি নিশ্চয় আপনি বিক্রি করবেন না?”
শশিকান্ত জোরে হেসে উঠলেন। “দরে পোষালে বিক্রি করতেও পারি।”
“দরে পোষাবে না। আপনি বিক্রিও করবেন না। আপনি অযথা আমায় চিঠি লিখেছিলেন কেন ? ”
শশিকান্ত সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিলেন না কথার। চুরুট ধরালেন ধীরে-সুস্থে। তারপর বললেন, “তুমিও বা অযথা কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে গিয়েছিলে কেন? তুমি তো বাড়ি কিনতে না।”
আমি বললাম, “বাড়ি হয়তো কিনতাম না। কিন্তু আমার একটা উদ্দেশ্য ছিল।” “ভুতুড়ে বাড়ি কেনার নাম করে কিছু মালমশলা জোগাড় করা !”
“হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। তবে কলকাতার মধ্যে বা কাছাকাছি হলে হয়তো কেনবার চেষ্টা করতাম। সেটা ভূতের জন্যে নয়, নিজের জন্যে। আমার ঘরবাড়ি নেই, বাবার রেখে যাওয়া একটা টাকা আমার হাতে এসেছে অল্পদিন হল। ভেবেছিলাম, তেমন বাড়ি পেলে কম দামে কিনে সারিয়ে সুরিয়ে নেব। নিয়ে ওপরতলায় নিজে থাকব, নীচে একটা লাইব্রেরি করব। বেনারসের দীপসাহেবের লাইব্রেরি দেখার পর থেকে আমার ওই এক শখ হয়েছে। লাইব্রেরিতে অকাল্ট-সাবজেক্ট সম্পর্কে নানান বই থাকবে।
নাম-করা বই।”
শশিকান্ত আমার কথা শুনতে-শুনতে সামান্য মাথা নাড়লেন। বললেন, “আমারও ওইরকম একটা আন্দাজ হয়েছিল।…তা এ-বাড়ি না হয় না কিনলে, ভূতটুত কিছু পেলে?” বলে হাসলেন।
মানিক বলল, “পেলাম, কিন্তু পেলাম না।”
“মানে?”
“চোখে দেখতে পেলাম না, আসা-যাওয়াটা বুঝতে পারলাম।” বলে গতকালকের ঘটনাগুলো বলল।
শশিকান্ত শুনলেন। হেসে বললেন, “তা যাই বলো, ভদ্র ভূত। বাড়াবাড়ি কিছু করেনি বাপু। এ-বাড়ির ভূতরা কারও ক্ষতি করেছে বলে জানি না। তোমরা ঘাবড়ে যেও না। আরও দু-একদিন দেখো—নতুন যদি কিছু পাও।…আচ্ছা, আমি চলি। বাড়িতেই আছি আজ। বাড়ি-জমির কাগজপত্র, হিসেব নিয়ে বসব এখন।”
শশিকান্ত চলে গেলেন।
মানিক বসে থাকতে থাকতে একটা সিগারেট ধরাল। বলল, “অমর, হাজরামশাইয়ের কাছে আমরা জব্দই হয়ে গেলাম।”
আমি কিছু বললাম না।
বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে-বেড়াতে মানিক বলল, “নে চল, আর কত রোদে-রোদে ঘুরবি?”
রোদ নয়, আমরা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। বললাম, “চল, ওদিকটা একবার ঘুরে আসি!”
“রোজ-রোজ তুই ওদিকে কী দেখতে যাস?”
“ও দিকটা আমায় টানে।” বলে আমি গোপন মহলের দিকে পা বাড়ালাম। ছায়ায়-ছায়ায় এগিয়ে যেতে-যেতে আমি বললাম, “শশিকান্ত আমাদের সঙ্গে চালাকি করছেন! কী চালাকি আমি বুঝতে পারছি না।”
“চালাকি করে ওঁর কী লাভ হচ্ছে?”
“কিছুই না। মজা করছেন আমাদের সঙ্গে। আমায় একটু জব্দ করছেন।” “আমরা যা দেখছি…”
“দেখছি কোথায়! শুনছি। দেখার মধ্যে দুটো জিনিস দেখেছি। এক, নদীর ওপরে একটা মানুষ। লোকটা কখন মিলিয়ে গেল ধরতে পারলাম না। আর দেখেছি, সেদিন রাত্তির বেলায় একটা কী যেন মাথার ওপর দিয়ে ভেসে গেল। ওটা বাদুড় নয়। অন্য কিছু হবে। কিন্তু কী?”
মানিক কোনও জবাব ছিল না।
গোপন-মহলের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা। ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। সত্যি বলতে কী, গোপন-মহলের দিকে তাকালে মনে হয়, ওটা কোনও সময়ে হয় আস্তাবল না হয় গুদোমখানা ছিল। কোনও ছাঁদছিরি নেই বাড়িটার। এখন তো ভাঙাচোরা পোড়ো ঘর বললেই চলে।
নিমতলায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বাড়িটা দেখছি, হঠাৎ চোখে পড়ল, বাড়ির আড়াল থেকে কে যেন আসছে।
লোকটাকে দেখে আমরা অবাক। একেবারে বামনের মতন চেহারা। মাথায় বোধহয় সোয়া তিন কি সাড়ে তিন ফুট। মুখে দাড়ি। মাথার চুলগুলো রুক্ষ। গায়ে জামা নেই। পরনে ধুতি।
“বামন?” মানিক বলল। “হ্যাঁ, তাই মনে হচ্ছে।”
“একে কোনওদিন দেখিনি আগে।”
“ডাক।”
হাত নেড়ে মানিক ডাকল।
লোকটা কাছে এল।
আমরা তাকে ভালো করে দেখছিলাম। সত্যিই বামন। তবে স্বাস্থ্য চমৎকার। পেটানো লোহায় গড়া যেন। মুখটাও সরল, নিরীহ গোছের। বোকাসোকা মনে হয়। গলায় কণ্ঠি ।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এখানেই থাকো? কী নাম তোমার?”
ও কোনও কথা বলল না। আমাদের দেখছিল।
বারকয়েক জিজ্ঞেস করার পর লোকটা অদ্ভুত শব্দ করল। গোঙার মতন। তারপর মুখ হাঁ করে ভেতরটা দেখাল।
মানিক অবাক হয়ে বলল, “জিভ কাটা! ইশ”
লোকটা মাথা নেড়ে জানাল, হ্যাঁ, তার জিভ কাটা।
আমি বললাম, “তুমি এখানেই থাকো?”
মাথা নেড়ে লোকটা হ্যাঁ বলল।
দু-চারটে অন্য কথার পর আমি বললাম, “আচ্ছা ভাই, তোমাদের এই বাড়িটায় ঢোকার রাস্তা কোনটা?”
গোঙানির শব্দ করতে-করতে লোকটা বাড়ির পেছন দিকটা দেখিয়ে দিল। দিয়ে নিজের দু’হাত দিয়ে গুণ-চিহ্নের মতন করে কি বোঝাল। তারপর মাথা হেলিয়ে যেন আমাদের এগিয়ে যেতে বলল। নিজের মতন অন্য দিকে চলে গেল।
আমি মানিককে বললাম, “চল তো, বাড়ির পেছনটা দেখি।
মানিক বলল, “দূর, ওর কথা বিশ্বাস করলি? কী শুনল কী বুঝল, কে জানে। বাড়ির পেছন দিকটা আমরা রোজই দেখছি। কিছু পাবি না।”
“চল না, দেখি।”
গোপন-মহলের পেছনের দিকটা আমরা আগেও দেখেছি। আবার নতুন করে দেখতে গিয়ে প্রথমটায় বুঝতে পারছিলাম না, বাড়িতে ঢোকার পথ কোনটা। পেছনের সব দরজা বন্ধ। জানলা মাত্র গোটা-দুই। তাও বন্ধ। ঘরের মাথায় গোল-গোল ঘুলঘুলি, সেগুলো নানান আবর্জনায় বোধ হয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর বাড়ির পেছন দিকটা আগছায় ভর্তি।
মানিক বলল, “নে চল, অনেক হয়েছে। আর খুঁজতে হবে না।
চলেই আসছিলাম, হঠাৎ আমার নজরে পড়ল, করবীগাছের ঝোপ, একরাশ বড়-বড় পাথরের আড়ালে কী যেন দেখা যাচ্ছে। সাবধানে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি, একটা ভাঙা কাঠের দরজা দিয়ে কেউ যেন কোনও ঢোকার মুখ বন্ধ করে রেখেছে।
“মানিক, হাত লাগা।”
হাত লাগাবার মতন ভারী নয় দরজাটা। ওটা অন্য কোনও জায়গা থেকে তুলে এনে আলগা করে রেখে দেওয়া হয়েছে।
দরজাটা আমরা সরিয়ে রাখতেই দেখতে পেলাম, ভেতরে যাবার পথ। সরু, সুড়ঙ্গ-মতন। ভেতরে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার এই দিনদুপুরে।
মানিক বলল, “যাবি?”
“না, এখন নয়। আলো পাব না ভেতরে। তা ছাড়া লোকটা এই মাত্র ওদিকে গেল। তাড়াহুড়োর দরকার নেই। পথ চিনে গেলাম। সন্ধেবেলায় আসব।”
“সন্ধেবেলায়!”
“দেখা যাবে। এখন চল। দরজাটা ঠেস দিয়ে যাই।”
ভাঙা আলগা দরজাটা জায়গা-মতন ঠেস দিয়ে রেখে আমরা চলে এলাম। হাজরামাশাইয়ের মা আমাদের আদর-যত্ন করে খাওয়ালেন দুপুরে। তাঁর কথাবার্তা এত আন্তরিক মনেই হয় না আমরা তাঁর অতিথি।
“বাইরে এসে শশিকান্ত বললেন, “বিকেলে বেড়াতে যাচ্ছ নাকি?”
“হ্যাঁ। এই ধারে-কাছে।”
“সন্ধেবেলায়?”
মানিক আমাকে আড়চোখে দেখছিল। আমি বললাম, “তাসটাস খেলব! কেন, আপনি?”
“না, না তাস দাবা আমি খেলি না। নিজের কিছু কাজকর্ম আছে সেরে রাখব ভাবছি।” আমি যেন নিশ্চিন্ত হলাম।
সাত
সন্ধেবেলায় আমি আর মানিক গা-ঢাকা দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। অবশ্য কেনও কারণ ছিল না গা-ঢাকা দেবার। আমাদের কাছে কেউ আসেনি। অনাদিও এখন ও-বাড়িতে গোপন-মহলের পেছনে এসে দাঁড়ালাম যখন, তখন জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। বাতাসে গাছের পাতার যেটুকু শব্দ হচ্ছে, অন্য কোনও শব্দ নেই। না, ঝিঁঝির শব্দ ছিল।
আলগা দরজাটা সরিয়ে রেখে আমরা পা পাড়ালাম ভেতরে। আমার হাতে টর্চ। মানিক আমার পেছনে।
আলোয় পথ দেখে কয়েক পা এগোতে আমার মনে হল, সরু সুড়ঙ্গ ধরনের পথ। প্রথম দিকে সিঁড়ি ছিল না। পরে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। পাথরের। আলো-বাতাস না ঢোকার দরুন যতটা বদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, এই জায়গায় ততটা বদ্ধ মনে হচ্ছিল না। না হবার কারণ বোধহয় মাথার ওপর গোল ঘুলঘুলি। ঘুলঘুলি দিয়ে অবশ্য চাঁদের আলো আসছিল না। ওগুলো দেওয়ালের পাশে।
বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে ঢুকে মনে হচ্ছিল, গোপন-মহলের ছাদটা যেন সিনেমায় দেখা কংসের কারাগার। সিঁড়ি, বাঁক, আবার সিঁড়ি, সুড়ঙ্গের মতন নেমে গিয়েছে মাঝে-মাঝে (গা ঢাকা দিয়ে) দাঁড়াবার মতন গুমটি।
যাওয়ার সময়ে দুটি ঘর চোখে পড়ল। গরাদ-দেওয়া দরজা। বন্ধ জেলখানার তালা ঝুলছে যেন।
ধীরে-ধীরে গন্ধ লাগতে শুরু করেছিল নাকে। বদ্ধ ঘরের গন্ধ। ধুলো-ময়লার। ডান-বাঁ করে কোথাও পাঁচ ধাপ, কোথাও আট ধাপ সিঁড়ি ভেঙে আমরা একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাকড়সার জাল ঝুলছে চারপাশে। ইঁদুর-ছুঁচোর রাজত্ব। ঝুল যেন দেওয়ালের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছে।
মানিক নাক চাপা দিল রুমালে। বলল, “নরক। মরে যাবি।”
“ঘরটা একবার দেখি।”
“দরজা বন্ধ।”
দরজাটা বন্ধর মতন দেখাচ্ছিল বার-কয়েক ধাক্কা দিতে খুলে গেল।
টর্চের আলোয় কিছু দেখার আগেই মনে হল, আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ক’টা চামচিকে উড়ে গেল। নাকি বাদুড়? পায়ের তলায় সাপ, বিছে সবই থাকতে পারে।
মানিক ভয়ে লাফ মেরে পাশের দিকে সরে গেল।
“কোথায়?” মানিক বলল, “পালিয়ে চল।”
“দাঁড়া।”
টর্চের আলো ফেলতেই বুঝতে পারলাম, এটা সেই ঘর, যে-ঘরে হরিবিষ্ণু শখ করে প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে রাখতেন। পাথরের দেওয়াল, লোহার আংটা, মাঝে-মাঝে গর্ত, আর এখানে-ওখানে বল্লম, টাঙি, বর্শা, খাঁড়া, হাত-বর্মা, আরও কত কী! তবে মনে হচ্ছিল, ঘর অনেক ফাঁকা। যা এক-সময় ছিল, তা আর নেই। সমস্ত অস্ত্রই মরচে পড়ে গিয়েছে। ফলাগুলো কালো দেখাচ্ছিল।
মানিক অবাক হয়ে দেখছিল। আমিও কম অবাক নয়। হরিবিষ্ণু যা সংগ্রহ করেছিলেন, তার সিকি ভাগ অস্ত্রও যদি এগুলো হয়, তবে কম কী! এ-সব অস্ত্র আমরা দেখিনি, অনুমান করতে পারি। নামও জানি না কত অস্ত্রের। লোহার নল-বন্দুকও রয়েছে। হাতল নেই ।
টর্চের আলো চারদিকে ছড়ায় না। আমরা পুরো ঘর দেখতে পাচ্ছিলাম না। আলো ফেলে ফেলে দেখছিলাম।
তবে ভালো করে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। চামচিকের পাল যেন ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছিল। আর মাকড়সার জাল ঝুলছিল চারপাশে। দম বন্ধ হয়ে আসার মতন বাতাস।
হঠাৎ মানিক বলল, “ওটা কী?”
মানিকের কথা শুনে আমি টর্চের আলো ফেললাম খানিকটা দূরে। ফেলেই আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে এল।
লোহার একটা খাট তক্তার মতো সরু। কে একজন সেখানে চিত হয়ে শুয়ে রয়েছেন, মাথাটা একপাশে হেলানো। গায়ের ওপর চাদর।
টর্চের আলোয় যাকে দেখলাম সেই মানুষটি শশিকান্ত হাজরা। বিশ্বাস হবার কথা নয়, কিন্তু নিজের চোখকে কেমন করে অবিশ্বাস করি! শশিকান্ত এখানে? এই ভাবে? দুঃস্বপ্ন দেখছি না তো?
মানিকও ভয়ে আঁতকে ওঠার শব্দ করল। “হাজরামশাই!” বলেই সে আমার হাত চেপে ধরল। তার মুখে আর কথা নেই। থরথর করে কাঁপছে। অনেক কষ্টে কোনওরকমে বলল, “রক্ত!”
রক্ত! গায়ে কোথায় রক্ত? ভালো করে নজর করতেই চোখে পড়ল, শশিকান্তর গায়ের চাদরে রক্ত। লোহার খাটের তলায় একটা ছোড়া পড়ে আছে, হাতখানেক লম্বা। মেঝেতেও রক্তের দাগ ।
শশিকান্তকে কেউ খুন করে গেল? নাকি তিনি নিজেই…
হঠাৎ শব্দ হল পেছনে। সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালাম। ঘরের দরজা কেউ বন্ধ করে দিচ্ছে।
সর্বনাশ! দরজা বন্ধ করে দিলে আমরা মারা যাব। এই ভয়ংকর জায়গায় মানুষ কতক্ষণ বাঁচতে পারে! ঘরে আলো-বাতাস নেই, শশিকান্ত খুন হয়ে পড়ে আছেন। ঘরের মধ্যে অজস্র চামচিকে আর মাকড়সা। হয়তো সাপখোপও আছে।
আমরা লাফ মেরে দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছতে না-পৌঁছতে-দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কে দরজা বন্ধ করছিল জানি না। দু’জনে কোনওরকমে দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসতেই সামনে যাকে দেখলাম তাকে ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলে দিয়ে দৌড়তে লাগলাম। আমাদের আর হুঁশ বলে কিছু ছিল না। কোনওরকমে বাড়িটার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলে বাঁচি।
কখন যে বাইরে এসে দাঁড়ালাম জানি না। হাত-পা কাঁপছে থরথর করে, বুক ধড়ফড় করছিল। নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে ফেটে যাচ্ছিল বুক। বাইরে এসেও যেন হুঁশ হচ্ছিল না। ধীরে-ধীরে হুঁশ হল। দেখলাম জ্যোৎস্নায় আশপাশ ডুবে আছে। ঝিঁঝিঁ ডাকছে।
নিজেদের ঘরে ফিরে আসার সময় আমাদের বোধহয় বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। কিছুই খেয়াল করতে পারছিলাম না। কাকে ডাকব! কাকেই বা বলব শশিকান্তর কথা। টলতে-টলতে নিজেদের জায়গায় ফিরতেই দেখি সিঁড়ির মুখে শশিকান্ত হাজরা দাঁড়িয়ে।
আমরা যেন ভূত দেখছি। পা পাথর হয়ে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
শশিকান্ত আমাদের দেখলেন। বললেন, “কাজটা ভালো করোনি।”
আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সামান্য আগে এই মানুষটাকে দেখে এলাম গোপন-মহলের একটা ঘরে লোহার খাটে পড়ে আছেন। রক্তমাখা চাদর। আর এখন দেখছি, আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন! সাফসুফ জামাকাপড়।
মানিক বলল, “আপনি! আপনাকে…।”
“আমাকে রক্ত মেখে লোহার খাটে পড়ে থাকতে দেখেছ, তো?” বলে শশিকান্ত আমাদের ডাকলেন। ‘এসো।’ আমাদের নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলেন।
ফাঁকা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।
শশিকান্ত বললেন, “তোমরা নিজেরাই মরতে। আমি মরতাম। খুব অন্যায় কাজ করেছ আমাকে না বলে ওইভাবে ওখানে গিয়ে। কেন গিয়েছিলে ওখানে? দেখতে গিয়েছিলে আমি চোর-ডাকাত না? ওখানে কী আছে, জানো?”
আমরা চুপ করে থাকলাম। অপ্রস্তুত লাগছিল।
“ড্রেসমোডাস্ রোটানডাস্—শশিকান্ত বললেন, একবার দু’বার বললেন কথাটা; তারপর জিজ্ঞেস করলেন, শব্দগুলো শুনেছ কখনও?”
‘না,’ আমি বললাম।
একশোটা ভুতের চেয়েও ভয়ংকর। ডেস-রোটা হল এক ধরনের ভ্যামপায়ার ব্যাট, রক্তচোষা বাদুড়। ড্রেসমোটাস্ রোটানডাস ওদের লাতিন নাম। এদের তিনটে ক্লাস আছে। এরা অন্ধকারে রাত্রে শিকার ধরে। কেমন করে ধরে জানো? তুমি প্রথমে জানতেই পারবে হঠাৎ মনে হবে গায়ের চামড়ায় কী যেন কামড়ে ধরেছে। তারপর বুঝবে কী কামড়েছে, তোমার সাধ্য হবে না তার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচাবার। এদের বিষ ভয়ংকর। রক্তের সঙ্গে মিশে গেলে বাঁচা অসম্ভব।”
আমরা পাথরের মতন দাঁড়িয়ে থাকলাম।
শশিকান্ত বললেন, “ওই মহলটায় এ-রকম জীব দু-চারটে এখনও আছে। বংশ-পরম্পরায়। কেমন করে আমরা জানি না। আমরা ওখানে যাই না ।
“যান না। তা হলে সকালে যাকে দেখলাম!”
“নিতাইকে দেখলে। ওকে তোমরা দেখেছ আমি জানি। ও কোনওদিন ভেতরে যায় না।”
“কোথায় যায়?”
“মাঝে-মাঝে ওষুধ ছড়াতে যায়। ভেতরে ঢোকে না।”
“কিসের ওষুধ?”
“বাদুড়গুলো যেন বেরিয়ে আসতে না পারে। ওই জায়গাটা ভালো নয়।” “আমরা যে আপনাকে দেখলাম।”
শশিকান্ত একটু হাসলেন, “আমাকে দেখোনি। যা দেখেছ সেটা একটা সাজানো ব্যাপার। তোমাদের ভয় দেখানোর জন্যে রাখা ছিল।”
“আমরা যে আপনাকেই দেখেছি। রক্ত ছিল চাদরে।”
শশিকান্ত এবার জোরে হেসে উঠলেন। হাসি আর থামতে চায় না। শেষে বললেন, “রক্ত! লাল রং হলেই সেটা রক্ত হয়! তোমরা দেখেছ, রক্ত দেখোনি।”
“কিন্তু আপনি?’
“আমি?…আমার মায়ের কথা তোমরা ভুলে গিয়েছ। আমি তোমাদের কী বলেছিলাম। বলেছিলাম না, আমার মা খুব ভালো পট আঁকতে পারে, মুখোশ তৈরি করতে পারে। ….যা দেখেছ সেটা মুখোশ। আমার মুখের নকল মুখোশ। আমাকে তোমরা দেখোনি। জামা-কাপড় পরিয়ে মুখোশ এঁটে একটা ডামি সাজিয়ে রাখা ছিল।’
“ডামি?”
“নকল। তোমরা ভালো করে নজর করোনি। করলেই বুঝতে পারতে চাদর চাপা দিয়ে একটা পাশবালিশ রাখা আছে। …আমি সবসময় তোমাদের নজরে রাখতাম। তোমরা যে ওই বাড়িটায় যাবে, আমার সন্দেহ হয়েছিল।…নিতাই এসে যখন তোমাদের কথা বলল…
“ও তো কথা বলতে পারে না।”
“না। ইশারায় সব বোঝাতে পারে। তোমরা ওই ইশারা যতটুকু বুঝবে আমরা তার একশো গুণ বেশি বুঝব। সে আমাদের এখানেই মানুষ।”
মানিক বলল, “আপনি আমাদের আগেই বারণ করলেন না কেন?”
শশিকান্ত আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।” তোমরা শুনতে না। কারণ বারণ আমি প্রথমেই করেছি। বলেছি, চাবি নেই, হারিয়ে গিয়েছে। তোমরা ভাবলে, আমি কোনও মতলব নিয়ে বাড়িটা তোমাদের দেখাচ্ছি না। তোমাদের খানিকটা শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল। আশা করি সেটা হয়েছে।”
শশিকান্ত হাসলেন।
আমি বললাম, “আপনি কী বলতে চাইছেন…এসে পর্যন্ত আমরা যা দেখছি, শুনছি সবই মিথ্যে।”
“সেটা তোমরা ধরতে পারোনি? আশ্চর্য!…এতটা বোকা তোমরা, আমি বুঝতে পারিনি। তোমরা কী দেখেছ? দেখেছ, নদীর ওপারে একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে মিলিয়ে গেল।”
“হ্যাঁ। তাই দেখেছি।”
“তা না-মেলাবার কারণ কী?…তোমরা লোকটাকে দেখেছ একেবারে পড়ন্ত বিকেলে। তখন আবছা হয়ে আসছে চারপাশ। লোকটা যদি একসময় হঠাৎ পাথরের আড়ালে লুকিয়ে যায়, অতটা দুর থেকে তোমরা কি ধরতে পারবে? খালি চোখে দূরের জিনিস এক নাগাড়ে লক্ষ করা যায় না, এটাই সাধারণ নিয়ম।”
“আপনি যে এক কাকার কথা বলেছিলেন।”
“সেটা গল্প—!” শশিকান্ত হেসে ফেললেন, “গল্প বিনা ভূত গড়া যায় না। খড় না দিয়ে তুমি ঠাকুর গড়তে পারো? গল্প ছাড়া ভূত হয় না।”
মানিক বলল, “আমরা যে-সব শব্দ শুনেছি সেগুলো…’
“কিছু না। ভয় দেখানোর জন্যে মাথা খাটিয়ে বার করেছি হে! দরজার ক্যাঁচ-ক্যাঁচ, বারান্দায় খড়মের শব্দ এগুলো করা কি কঠিন কাজ?”
আমি বললাম, “আপনি কি ভূতের খেলা দেখিয়ে বেড়ান?’
“তোমাদের মতন অ্যামেচার হলে দেখাই।”
“কিন্তু স্যার, দরজাটা ও-ভাবে নাড়ছিল কে? ঘরে এমন বাজে গন্ধই বা কেমন করে হল?”
শশিকান্ত হাসতে-হাসতে চুরুট ধরালেন, বললেন, “ডাকাতের বংশধর আমি। দরজা ভেঙে ফেলতেও পারতাম হে!…আর গন্ধ? তোমরা কি জানো, একসময় ডাকাতরা একরকম গন্ধ ছড়িয়ে ‘ঘরবন্ধ’ করত। এটা এক ধরনের সংস্কার ছিল তাদের। তোমাদের ঘরের খোলা জানলা দিয়ে গন্ধের জিনিসটা ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল।”
আমি বললাম, “বেশ করেছিলেন।…কিন্তু স্যার, আমি বরাবরই সন্দেহ করেছি, আপনি এইরকম একটা কিছু করছেন। এই ঘরবাড়ি আপনাদের। আপনি আমাদের ঘাবড়ে দেবার জন্যে ভেলকি দেখাচ্ছেন।”
শশিকান্ত বললেন, “তবু তোমরা ভয় পেয়েছ। অন্তত বোকা বনেছ। ভূত মানেই তো তাই, মানুষ বোকা বনে, ভয় পায়, বিশ্বাস করতে চায় না, অথচ করে।”
মানিক হেসে বলল, “তবু ভূত থাকে…।”
শশিকান্ত বললেন, “ভূত থাকে, থাকবে। ভূত না থাকলে মজা কোথায় হে! শুধু মানুষ থাকলে সংসারটা অচল হয়ে যাবে।”
উনি হেসে উঠলেন। আমরাও হেসে ফেললাম।
হঠাৎ শশিকান্ত বললেন, “তোমাদের জন্যে আজ আমাকে ওই ভয়ংকর ঘরে ঢুকতে হয়েছিল। ঢুকে সব সাজিয়ে রাখতে হল। আমি গায়ে ওষুধ মেখে, আগাগোড়া গা ঢেকে ঘরে ঢুকেছিলাম। তবু নিজেকে বাঁচাতে পারিনি। একটা ডেস-রোটারের আঁচড় গায়ে লেগেছে। দেখা যাক, কী হয়! আশা করি মরব না। তোমাদের কিছু হলেই আমার আফসোস হত।…যাও, এবার ঘরে যাও।”
আমরা অবাক হয়ে শশিকান্তকে দেখছিলাম।
