কেঁচো খুঁড়তে সাপ – বিমল কর
কেঁচো খুঁড়তে সাপ
এক
আমার নাম জীবনলাল; জীবনলাল দত্তগুপ্ত। ওটা আমার আসল নাম। একটা নকল নামাও রয়েছে। লালা দত্ত। আমার আসল নাম যত লোক জানে, নকল নামটা তার চেয়েও বোধ হয় বেশি লোক জানে। হয়তো আপনিও জানেন, বা শুনেছেন। না শুনলেও ক্ষতি নেই। আমি মোটেই কেষ্ট-বিষ্টু গোছের লোক নই। একেবারে সাধারণ, চুনোপুঁটি। তবু যে বলছি শুনলেও শুনে থাকতে পারেন নামটা, তার কারণ আমি একজন গোয়েন্দাগল্পের লেখক। লালা দত্ত এই নামে ‘শিহরণ’ সিরিজের গোয়েন্দা বই লিখি। না না করেও আমার বইয়ের সংখ্যা প্রায় কুড়ি।
নিজের কথা এখানে সামান্য বলে নেওয়া দরকার। গোয়েন্দাগল্প লেখাটা আমার পেশা নয়, শখ। আমার পেশা কেরানিগিরি। ট্রাম কম্পানিতে চাকরি করি। থাকি মেসে। আমাদের মেসবাড়িকে কোলে বাজারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। হট্টখানা। ওরই মধ্যে কোনও রকমে থাকা খাওয়া—এই আর কি!
আমার বাবা নেই। মা থাকেন দেশের বাড়িতে। ছোট ভাই—সেও দেশের বাড়িতে থাকে, প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। নিজের ঘরবাড়ির কথা বেশি বলে লাভ নেই। একসময় একরকম ভালোই কেটে যাচ্ছিল, বাবা মারা যাবার পর বড় কষ্টে পড়েছিলাম। তখন আমি কলেজে পড়তাম। আট-দশ বছর লড়ালড়ি করে এখন খানিকটা থিতু হয়েছি। আমার বয়েস হয়েছে তিরিশ।
গোয়েন্দা গল্প লেখার শখ আমার আগে ছিল না। তবে হ্যাঁ—দেদার গোয়েন্দাগল্প পড়তাম। আমার বন্ধু পশুপতি আমার চেয়েও গোয়েন্দাগল্পের পোকা ছিল। একবার সে একটা গল্প লিখতে শুরু করে আর শেষ করতে পারল না। আমাকে দিয়ে শেষ করাল লেখাটা। সেই লেখাটা “কালসর্প” নামে ছাপা হল পানুবাবুর প্রেস থেকে। কিছু বিক্রিও হল।
তখন থেকেই আমার শখ চাপল গোয়েন্দাগল্প লেখার। পশুপতি আমায়, যাকে বলে মদত, তাই দিতে লাগল। আমি ধীরে ধীরে গোয়েন্দাগল্পের লেখক হয়ে উঠলাম।
পশুপতির কথা এখানে একটু বলতে হয়। পশুপতি আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমরা বর্ধমানের লোক। কাছাকাছি গ্রামের ছেলে। আমরা দু’জনে একসঙ্গে কলেজেও পড়েছি। পশুপতির বরাবর সাধ ছিল সে উকিল হবে। গ্রহের ফেরে তার উকিল হওয়া হল না। তার মামা, আমরা যাঁকে বলি সদানন্দমামা, পশুপতিকে হোটেলের ব্যবসায় ঢুকিয়ে নিজে চলে গেলেন মনসা আসে আশ্রম খুলতে। মামার নিজের বলতে এক পশুপতিই ছিল। আমার তো মনে হয়, এতে শাপে বর হয়েছে। পশুপতির যে-ধরনের মাথাগরম ধাত, তাতে তার উকিল হওয়া চলত না।
শিয়ালদা-হ্যারিসন রোডের কাছাকাছি যত হোটেল আছে তত হোটেল আর কোথায় আছে আমি জানি না। পশুপতি হল দয়াময়ী হোটেলের ম্যানেজার। মালিকও বলা যায়। খাতায় পত্রে মামা এখনও মালিক, কিন্তু মামার অবর্তমানে পশুপতিই মালিক হবে।
আগেই বলেছি, আমি যে মেসে থাকি সেটা একটা জঘন্য জায়গা। হইচই, গলাবাজি, লাঠালাঠি লেগেই থাকে। একটু নিশ্চিন্তে শোওয়া-বসার উপায় নেই। দু’দণ্ড আপনমনে থাকব—তার জো নেই ।
এইসব কারণে আমি একটা অভ্যেস করে নিয়েছিলাম। যখন কোনও লেখা শুরু করতাম, তখন আর মেসে থাকতাম না, পশুপতির হোটেলে এসে ডেরা বাঁধতাম। সাত দিন আট দিন, এমনকী দিন দশেকও একটানা হোটেলে থেকে লেখা শেষ করে, বেশিরভাগ প্রুফটা দেখে দিয়ে তবে হোটেল ছাড়তাম। এ-ব্যাপারে পশুপতির ঢালাও হুকুম ছিল, আমি যখনই আসব পুব দিকের ছোট ঘরটা পাব হোটেলের, দোতলার ঘর। আমার খাওয়া-দাওয়া, ফাইফরমাস খাটা, চা পান সিগারেটের ব্যবস্থা করে দেবার যেন কোনও ত্রুটি না হয়।
পশুপতি এই রকমই। আমায় যতটা ভালোবাসে, ততটাই তার দাপট দেখানোর পাত্র করে তুলছে। ওর কথা না মেনে আমার উপায় নেই। আমার কাছে টাকা-পয়সা নেবে না। এ নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়াও হয়েছে খুব। আমি ওর সঙ্গে ঝগড়ায় হেরে গিয়েছি। তবে হ্যাঁ, আমি এক জায়গায় জিতেছি। ও আমাকে মেস ছাড়িয়ে তার হোটেলে এনে রাখতে পারেনি।
ব্যাপারটা এই রকম দাঁড়িয়েছিল আমি দু-তিন মাস অন্তর একবার করে পশুপতির হোটেলে এসে উঠতাম। আট দশ দিন থাকতাম একটানা। একটা বই লিখে, তার প্রুফ দেখে আবার ফিরে যেতাম আমার মেসে। তার মানে এই নয় যে, পশুপতির কাছে আমি অন্য সময়ে আসতাম না। তা আসতাম। হপ্তায় বার দুই এসে তার খোঁজখবর করে যেতাম। পশুপতিই আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু—তার কাছে না এসে থাকব কেমন করে?
আর মাত্র দুটো কথা বলে আমার গল্প শুরু করব।
আমি সাত-আট দিনে একটা বই লিখতে পারি ভেবে আপনারা হয়তো অবাক হচ্ছেন। এতে অবাক হবার বেশি কিছু নেই। প্রথমত, আমি যা লিখব, মানে গল্পটা, মনে মনে আগেই সাজিয়ে নিতাম। দু’-তিন মাস ধরে এটা চলত। তারপর ঝপ করে একদিন কাগজ কলম নিয়ে বসতাম। চলে আসতাম পশুপতির হোটেলে। আমি তাড়াতাড়ি লিখতে পারি। তা ছাড়া, বসতাম যখন ঘাড় গুঁজে, টানা লিখে যেতাম সকাল দুপুর। আমি শখের গোয়েন্দাগল্পের লেখক—আমার হুড় হুড় করে লিখতে আটকাবে কেন! আর লেখা তো বড়জোর সোয়া শ’পাতা। ছাপা হলে দাঁড়াবে নব্বই ছিয়ানব্বই। পানুবাবু তাকে শ’খানেক পাতায় দাঁড় করাতেন। পানুবাবু আমাদের পুরনো চেনাজানা লোক। তাঁর প্রেসেই আমার বইয়ের কাজ হতো বরাবর। তিনি অন্য কাজ সরিয়ে আমার কাজটা করে দিতেন। কখনও অন্যথা করেননি।
গত চার-পাঁচ বছর এইভাবেই আমার বই লেখা চলছিল। লালা দত্ত এই নামে ‘শিহরণ’ সিরিজের পনেরো-কুড়িটা বইও লিখলাম। প্রতি বই পিছু সাতশো টাকা পাই এখন। আগে পাঁচশো পেতাম। আমার এতে দুঃখ ছিল না। কিছু তো পাই। তারিণী লাইব্রেরি’র মহিমবাবুর যতই বদনাম থাক, আমার সঙ্গে কেনও গোলমাল করেননি। উনিই ‘শিহরণ সিরিজ’-এর প্রকাশক।
শেষ পর্যন্ত কিন্তু একটা অঘটন ঘটল। সেটাই বলি।
দুই
দিনটা ছিল শনিবার।
সেই সকাল আটটায় কলম নিয়ে বসেছিলাম। উঠলাম যখন তখন দুপুর দেড়টা। লেখা শেষ। নিশ্চিন্ত।
স্নান খাওয়া শেষ করে যখন পান মুখে বিছানায় শুতে এলাম, তখন আড়াইটে বেজে গিয়েছে।
সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে লেখার শেষটা মনে মনে ভাবছিলাম। মনে হল, মন্দ হয়নি। গত রবিবার লেখা শুরু করেছিলাম। ঠিক সাত দিনে শেষ হল। অবশ্য এই লেখাটা একটু ছোট। আশি পঁচাশি পাতা হতে পারে। গত সোমবার থেকেই আমি পানুবাবুকে কপি দিচ্ছি। মঙ্গলবার থেকেই প্রুফ পাচ্ছি। মঙ্গলবারে পেয়েছি সামান্য। বুধবারে খানিকটা। শেষ বারো-চোদ্দো পাতা বাকি ছিল লেখার। আজ শেষ করলাম। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে আমি কোনও প্রুফ পাইনি। গতকাল হোটেলের বলাইকে দিয়ে পানুবাবুর প্রেসে কপি পাঠিয়েছি। পানুবাবুর প্রেস থেকে নিধু বলে এক ছোকরা সন্ধের মুখে কালিঝুলি মাখা, ভিজে স্যাঁতসেঁতে এক বাণ্ডিল প্রুফ আমায় দিয়ে যায়। সে বৃহস্পতিবার আসেনি, গতকালও নয়। ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। পানুবাবুর প্রেসে কি কম্পোজ হচ্ছে না? নাকি নিধুর অসুখ-বিসুখ হল? বলাইকে বলেছিলাম খোঁজ আনতে! সে হোটেলে কাজ করে, প্রেসের ব্যাপার বোঝে না। ফিরে এসে কিছুই বলতে পারল না।
ভাবলাম, আজ সন্ধেবেলায় নিধু আসবে। প্রুফ আনবে। তার হাতেই শেষ কপিটা দিয়ে দেব। কাল অবশ্য রবিবার। প্রেস বন্ধ। দেখা যাক নিধু কী বলে!
সন্ধেবেলায় পশুপতির সঙ্গে আড্ডা মারতে মারতে আটটা বেজে গেল। নিধু এল না।
পশুপতি বলল, “পুজোর পর তো! পানুবাবুর হাতে স্কুলের বইয়ের কাজ। বোধ হয় আটকে গেছেন। সোমবার নিশ্চয় পাঠাবেন।”
“সোমবার আমি থাকব না। কাল বিকেলেই মেসে ফিরে যাব।”
“সোমবার সন্ধেবেলায় এসে খোঁজ করে যাস।”
এ-রকম হামেশাই হয়। আমি মেসে ফিরে যাবার পর পশুপতির কাছে পানুবাবু প্রুফ পাঠিয়ে দেন। আমি পশুপতির হোটেলে এসে প্রুফটা দেখে দিয়ে যাই। মেসে বসে এ-সব কাজ করি না আমি। মেসের দু’একজন ছাড়া কেউ জানেই না আমি শখের লেখক।
পশুপতির অফিস ঘরে বসেই গল্পগুজব হচ্ছিল। পানুবাবুর কথা তুলে রেখে আমরা অন্য কথাবার্তা বলতে লাগলাম। পশুপতি তেতলায় একটা ঘর বাড়াবার কথা ভাবছে। তার হোটেলটা দোতলা। নীচে রান্নাবান্না, ঠাকুর-চাকর, খাবার ঘর—এই সব। দোতলায় ছোট আর মাঝারি মিলিয়ে গোটা বারো ঘর। হোটেলের ঘর বলতে যা বোঝায়। তেতলায় একটা মাত্র ঘর। সেই ঘরে পশুপতি নিজে থাকে। আর একটা ঘর না বাড়ালে চলছে না। হোটেলের স্টোর রুমটা সে তেতলায় করবে।
ন’টা বেজে গেল। পশুপতি বলল, “চল, ওপরে যাই। গজলের একটা নতুন রেকর্ড কিনেছি—তোকে শোনাব।”
পশুপতির আবার গানবাজনার ওপর খানিকটা টান আছে।
আমরা উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখি পানুবাবু। কলকাতায় ঠাণ্ডা পড়েনি, তবু পানুবাবুর গায়ে একটা সুতির চাদর। ঘরে এলেন এমন ভঙ্গিতে মনে হল যেন অসুস্থ।
মুখ থমথমে।
আমি ভাবলাম পানুবাবু বুঝি নিজেই প্রুফের তাড়া বয়ে এনেছেন।
“আসুন পানুবাবু! বসুন। বৃহস্পতিবার থেকে আমি প্রুফ পাচ্ছি না! কী ব্যাপার?” পানুবাবু চেয়ারে বসলেন। বললেন, “আর প্রুফ? আপনারা কিছু শোনেননি?” আমরা মাথা নাড়ালাম। কিছুই শুনিনি।
পানুবাবু বললেন, “মহিমবাবু আর নেই।”
আমরা চমকে উঠলাম। মহিমবাবু মারা গিয়েছেন। সে কী! তাঁর তো বেশি বয়েস হয়নি। কোনও অসুখ-বিসুখ তাঁর ছিল বলে জানি না। শুধু চোখের ব্যাপারে তাঁর একটা অসুখ ছিল। কম দেখতেন। সন্ধের দিকে একরকম রাতকানাই হয়ে যেতেন।
পশুপতি বলল, “মারা গিয়েছেন? কবে?”
‘কাল,’ পানুবাবু বললেন, “শুক্রবারে। কাল মহিমবাবু রোজকার মতন তাঁর দোকানে এসেছিলেন। কাজকর্মও করেছেন। স্কুল সিজনের কাজ চলছে বলে দোকান থেকে উঠতে উঠতে আটটা বজে যায়। কর্মচারীরা দোকান বন্ধ করার পর মহিমবাবু রোজকার মতনই তাঁর চেনা এক রিকশাঅলাকে ডেকে রিকশায় ওঠেন। চেনা রিকশাঅলাদের কিছুই বলতে হতো না। তারা মহিমবাবুকে বাড়ি পৌঁছে দিত। হাত ধরে নামিয়ে সদর পর্যন্ত এগিয়ে দিত। কাল যে রিকশাঅলা মহিমবাবুকে নিয়ে গিয়েছিল সে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যখন মহিমবাবুকে নামাতে গেল, দেখল রিকশার একদিকে গা-মাথা হেলিয়ে তিনি পড়ে আছেন। কোনও সাড়া-শব্দ দিচ্ছেন না।”
আমি আঁতকে উঠে বললাম, “সে কী? রিকশাতেই?”
“হ্যাঁ। লোকজন, ডাক্তারবদ্যি সবই এল। কিন্তু সব শেষ। বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করা গেল না।…আগেই মারা গেছেন।”
পশুপতি যেন হায় হায় করে উঠল। এভাবে মানুষ মারা যায়? হার্টফেল?”
“মহিমবাবুর হার্টের কোনও অসুখ ছিল বলে শুনিনি। উনি তো আমার অনেক পুরনো খদ্দের। বছর পনেরো ওঁর সঙ্গে কারবার করছি। বন্ধুর মতন হয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের কথাও বলতেন। ওঁর দোষের মধ্যে দেখেছি একটু তিরিক্ষে ধরনের, ঠোঁটকাটা, আর খানিকটা কৃপণ। এ-ছাড়া ওঁর কোনও দোষ দেখিনি। বিয়ে-থা করেননি, ভাইপো ভাগ্নেদের মানুষ করেছেন।”
আমার ভালো লাগছিল না। পানুবাবুর কথা মন দিয়ে শুনছিলাম না সব। মহিমবাবুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ভালোই ছিল।
পানুবাবু বললেন, “সবচেয়ে বড় কথা হল, মহিমবাবুর ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি। ডাক্তার দিতে রাজি হয়নি। ফলে…।”
কথাটা আর শেষ করতে হল না পানুবাবুকে, পশুপতি আর আমি দুজনেই আঁতকে উঠে বললাম, “পোস্ট মর্টেম?”
“হ্যাঁ। আজ বডি দেয়নি। কাল রবিবার, কাল যদি দেয়। কী জানি!”
“গোলমেলে কেস নাকি?” পশুপতি বলল।
“কেমন করে বলব?” পানুবাবু বললেন, “সুস্থ লোক, রিকশায় করে বাড়ি ফিরছে। রাস্তার মধ্যে হুট করে মারা যাবে, কে ভাবতে পারে। ডাক্তারও পারেনি। শুনলাম ডাক্তার নাকি বলেছেন, তিনি যখন পেশেন্টকে দেখেছেন তখন পেশেন্ট ডেড। কাজেই তিনি কোনও সার্টিফিকেট দিতে পারেন না।”
আমরা কোনও কথা বললাম না। আবহাওয়াটা কেমন পালটে গেল পানুবাবুর মুখে দুঃসংবাদ শোনার পর থেকেই। মহিমবাবুর মুখ মনে পড়ছিল। তাঁর সেই সাদামাটা পোশাক, খদ্দরের পাঞ্জাবি আর মিলের ধুতি। চশমা পরতেন সাবেকি ধরনের।
পানুবাবু বললেন, “আজ সারাটা দিনই ঝঞ্ঝাটে ছিলাম। বাড়ি ফেরার পথে ভাবলাম, আপনারা হয়তো খবরটা জানেন না। খারাপ খবর, তবু জানিয়ে যাই।”
পশুপতি বলল, “ভালো করেছেন। আমরা কিছুই জানতাম না। জানলে মহিমবাবুর বাড়িতে যেতাম। কাল একবার যাব!”
পানুবাবু খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর এক গ্লাস জল খেতে চাইলেন। পশুপতি জল আর চায়ের জন্যে হাঁক মারল।
মাথা নাড়লেন পানুবাবু, “না, চা আর খাব না। অনেকবার খাওয়া হয়ে গিয়েছে।” বলে উনি আমার দিকে তাকালেন। “আপনার কাজকর্ম এখন বন্ধ রাখব কি না বুঝতে পারছি না। এই অবস্থায় বইটা শেষ করে দিয়ে লাভ হবে বলে মনে হয় না। আবার ভাবছি, সামান্য দুটো ফর্মা আটকে রেখেই বা কী হবে! শেষ হয়ে গেলে তবু অন্তত ছাপা ফর্মাগুলো থাকবে। আপনি কী বলেন জীবনবাবু?”
আমি বললাম, “লেখা আমি আজ শেষ করে দিয়েছি। ভাবছিলাম নিধু এলে তার হাতে শেষ কপিটা দিয়ে দেব।”
“নিধু? কোথায় সে?” পানুবাবু বললেন, “সে তো আসছে না ক’দিন?” “বুধবার এসেছিল। আমি তাকে বসিয়ে রেখে খানিকটা প্রুফ দেখে দিয়েছিলাম। কপিও দিয়েছিলাম পাতা-কুড়ি।”
“সে কী! সেই প্রুফ তো সে ফেরত দেয়নি। কপিও না।” পানুবাবু কপাল চুলকোলেন। “আপনাকে প্রেস থেকে বোধ হয় বারো-চোদ্দ গেলি প্রুফ পাঠানো হয়েছিল দ্বিতীয় বারে। সে প্রুফ আমরা ফেরত পাইনি।”
জল এসেছিল।
পানুবাবু জল খেলেন।
“আমি তা হলে উঠি পশুপতিবাবু।” পানুবাবু উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “মনে মনে একটা ভয় হয়ে গেছে, মশাই। কে জানে এই হয়তো শেষ জল খাওয়া! না না, অবাক হবেন না। এইরকম হয়। মহিমবাবু রিকশায় উঠে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন খাবেন বলে! সিগারেটটা আর খেতে পারেননি। মুখ থেকে পড়ে গিয়েছিল কোলে। শুনলাম জামাটা সামান্য পুড়ে গিয়েছিল। এই তো মানুষের জীবন। এক মুহূর্ত আগে আছে, পরের মুহূর্তে নেই।”
হঠাৎ যেন আমার বুকের ওপর বিরাট কোনও ঘা লাগল। মাথার মধ্যে কী যেন হয়ে গেল। গলা বন্ধ-বন্ধ হয়ে আসছিল। “কী বললেন? কোলের ওপর সিগারেট? পোড়া সিগারেট?”
“হ্যাঁ। শুনেছি প্রায় গোটা সিগারেট।”
আমি যেন ভূত দেখার মতন চোখ করে পানুবাবুকে দেখতে লাগলাম। পানুবাবু আর দাঁড়ালেন না, চলে গেলেন ।
তিন
পানুবাবু চলে গেলে আমি বেহুঁশের মতন বসে থাকলাম। সবই কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। এমনকী হয় নাকি? গল্পের ঘটনার সঙ্গে জীবনের ঘটনা মিলে যায়? আশ্চর্য!
“পশুপতি?”
“বল?”
“এ কেমন করে হল?…আমি যে বইটা সবে শেষ করলাম, তাতে একেবারে এই জিনিস?”
পশুপতি কিছুই বুঝতে পারল না। আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
“অদ্ভুত ব্যাপার! স্ট্রেঞ্জ! আমি ভাবতেই পারছি না। একেবারে এক ধরনের মার্ডার।” আমার গলার স্বর নিজেরই কানে লাগল। ভয় পেয়েছি, না উত্তেজিত হয়ে উঠেছি! চোখ-কান জ্বালা করে উঠছিল।
পশুপতি বলল, “কী বলছিস পাগলের মতন! একই ধরনের মার্ডার মানে! “একই ধরনের। সেম…তুই…তোকে আমি বলছি, বিশ্বাস কর। আমার এই শেষ বইটায় আমি একটা খুনের কথা লিখেছিলাম। একটা সত্তর বছরের বুড়ো, অগাধ তার সম্পত্তি, হাড়কেপ্পন। তাকে তার ভাইপো এইভাবে খুন করবে। সিগারেটের পাতার মধ্যে বিষ মেশােেনা থাকবে। বুড়ো দুটো-তিনটে টান মারার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ।”
পশুপতি আমার দিকে বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। “বুঝলাম না!” পশুপতি বলল, “তোর গল্পের বুড়ো যেমন ভাবেই মরুক—তার সঙ্গে মহিমবাবুর সম্পর্ক কী!”
“তুই বুঝতে পারছিস না! তুই কী রে! মহিমবাবুকেও তো একইভাবে মারা হয়েছে।” পশুপতি হেসে উঠল। “তোর মাথা। কোথায় তোর বইয়ের গল্প আর কোথায় রিয়েল ব্যাপার!”
“তুই বিশ্বাস করছিস না! আমি সত্যি বলছি, আমার গল্পে আমি একটা নতুন ধরনের মার্ডার ঢুকিয়েছিলাম। মানে, এমনভাবে খুন করা হবে যাতে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যাবে না। মনে হবে, হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেল। তুই ভেবে দ্যাখ, এখানেও তাই করা হয়েছে। মহিমবাবু সুস্থ অবস্থায় রিকশায় উঠে বাড়ি ফিরছিলেন। দোষের মধ্যে তিনি একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। দু’চারটে টানও দিতে পেরেছিলেন কিনা কে জানে! হাত থেকে সিগারেট গড়িয়ে পড়ল, তিনিও ঢলে পড়লেন রিকশায়।”
পশুপতির এতক্ষণে যেন মাথায় গেল আমি কী বোঝাতে চাইছি। আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তোর এই নতুন বইটায় এরকম ছিল!”
“হ্যাঁ।”
“তুই কি বলতে চাইছিস তোর বইয়ের গল্পের সঙ্গে মহিমবাবুর মারা যাবার সম্পর্ক আছে?”
“তা জানি না, ভাই। তবে বড় অদ্ভুত লাগছে। আমার লেখার প্রুফ আজ তিন দিন ধরে পাচ্ছি না। নিধু বেপাত্তা। অথচ এই রকম একটা কাণ্ড হয়ে গেল।”
পশুপতি হাত তুলে আমায় চুপ করতে বলল। বলে কী যেন ভাবতে লাগল। খানিকক্ষণ পরে বলল, “দাঁড়া, ব্যাপারটা বুঝতে দে। তুই কি বলতে চাস তোর গল্পের খুন দেখে, বা ধর পড়ে, কেউ একজন মহিমবাবুকে খুন করেছে?”
“তাই তো দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা।”
“দাঁড়াচ্ছে বললেই হবে নাকি? যুক্তি কোথায়?”
আমি বললাম, “তুই ভেবে দেখ না!… পানুবাবুর মুখেই শুনলি—আমার দেখে দেওয়া প্রুফ তাঁর প্রেসে পৌঁছয়নি। নিধু পৌঁছে দেয়নি। সে প্রেসে যাচ্ছে না।”
“এ-থেকে কিছুই প্রামাণ হয় না। তোর কাছে যে কপি আর প্রুফ এসেছিল, তুই দেখে দিয়েছিস বলছিস, সেটাতে কী ছিল?”
“এইরকম খুনের কথা ।
“একেবারে গোড়াতেই ছিল?”
“হ্যাঁ। গোড়ার দিকেই।”
“তুই কি লেখায় বিষের নাম দিয়েছিলি?” “হ্যাঁ।”
“পুরো নামটা আমার নোট বইয়ে লেখা আছে। এক ধরনের শ্যাওলার মতন জিনিস। দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও কোথাও পাওয়া যায়। সমুদ্রের কাছে সাধারণত। এখানে এ বিষ পাওয়া যাবে কেমন করে। একটা ইংরেজি বইতে ব্যাপারটা দেখেছিলাম। দেখে নোটখাতায় টুকে নিয়েছিলাম।”
‘এই বিষে কাজ হয়?”
“তার আমি কী জানি! বইয়ে পড়েছিলাম, টুকে নিয়েছিলাম। হাতে কলমে তো পরীক্ষা করে দেখিনি। এছাড়া গল্পের বইয়ে লেখা বিষ নিয়ে কে আর মাথা ঘামায় !”
পশুপতি মাথার চুল ঘাঁটতে লাগল। কী ভাবছিল কে জানে। সিগারেট ধরাল। তারপর বলল, “তোর খানিকটা বাড়াবাড়ি হচ্ছে জীবন। আমার মনে হয় না, তোর গল্পের বই থেকে কেউ খুন করার ব্যাপারটা শিখে নিয়েছে। এ-রকম কখনও শুনিনি। তাই যদি হত তবে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে গোয়েন্দা বই যা বেরোয় বাজারে—তার থেকে লোকে খুনখারাপি শিখে নিত। গল্পের গোরু গাছে ওঠে, সত্যিকারের গোরু কি আর গেছো হয়!”
পশুপতি যা বলছিল তা আমিও বুঝি। গোয়েন্দা বই পড়ে কেউ খুন শেখে না। কিন্তু এই ব্যাপারটায় এমন আশ্চর্য মিল ঘটে গেল বলেই আমার আতঙ্ক হচ্ছিল।
পশুপতি বলল, “শোন, কতকগুলো সহজ যুক্তি সাজিয়ে নে। প্রথম যুক্তি হল, মহিমবাবু আচমকা মারা গিয়েছেন এটা ঠিকই, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ কি বলেছে তাঁকে খুন করা হয়েছে? হুট করে মানুষ মরতেই পারে। মহিমবাবুর হয়তো হার্টের রোগ ছিল, বা হয়েছিল, তিনি জানতেন না, আমরাও জানতাম না।”
“ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দেয়নি।”
“না দেওয়াই স্বাভাবিক। না জেনে কোন ডাক্তার সার্টিফিকেট দেয়!” “পোষ্ট মর্টেম হচ্ছে—শুনলি তো?”
“অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে সেটা হয় বলেই শুনেছি। তুই একটা দিন অপেক্ষা কর না। কালকেই হয়তো জানতে পারবি। রিপোর্ট পেলেই সব শোনা যাবে।”
“অপেক্ষা তো করতেই হবে। কিন্তু আমার কেমন মনে হচ্ছে, পশুপতি। ভালো লাগছে না। দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”
“মিছিমিছি দুশ্চিন্তা করছিস! যা ঘটেছে সেটা কাকতালীয়। তুই নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাক।”
হয়তো পশুপতির কথা ঠিক। যা ঘটেছে সেটা কাকতালীয়। এমনও হতে পারে, আমি যা ভাবছি ব্যাপারটা মোটই তা নয়। মহিমবাবু হার্টের রোগেই মারা গিয়েছেন। এ-রকম হামেশাই হয় আজকাল, অফিসে কাজ করতে করতে মানুষ মারা যায়, খবরের কাগজ পড়তে পড়তে লুটিয়ে পড়ে, চায়ের কাপ মুখে তোলার অবসর পায় না, চিরকালের মতন চোখ বোজে। হ্যাঁ, এ-রকম হয়। তবু আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে কেন?
পশুপতি বলল, কথা ঘোরাবার জন্যেই, “তোর গল্পে কী ছিল রে?”
“গল্পে?”
“হ্যাঁ।”
“বললাম তো! একটা বুড়োকে তার ভাইপো খুন করবে।”
“একটু ছড়িয়ে বল। কেমন করে করবে, মানে কীভাবে?”
“বুড়োকে বিষ মেশানো সিগারেট দেবে খেতে। বুড়ো বুঝতে পারবে না। আসলে একটা প্ল্যান করা হয়েছিল বুড়োকে মারার জন্যে। বুড়ো সব ব্যাপারেই খুব সাবধানী ছিল, সন্দেহও করত এক ভাইপোকে। কিন্তু যখন সে খুন হয়—তার কিছু ভুল হয়েছিল।”
“কী ভুল হয়েছিল?”
“প্রথম ভুল, সে ধরতেই পারেনি—তার চশমাজোড়া যে ভেঙে ফেলল—মানে তার চাকর ভেঙে ফেলেছিল সেটার একটা উদ্দেশ্য ছিল। তার ভাইপো বুড়োর চাকরকে দিয়ে এটা করেছিল। চশমা না থাকায় বুড়ো বুঝতে পারেনি, কখন তার সিগারেটের প্যাকেট বদল করে অন্য প্যাকেট রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ভুল, বুড়ো হাড়কিপ্টে বলে বাড়ির বারান্দায় প্রায় অন্ধকারেই বসে ছিল। আলো জ্বালেনি। রাস্তার আলোতেই বসে বসে আরাম করছিল।”
পশুপতি বলল, “মহিমবাবুর চশমা কিন্তু কেউ ভাঙেনি।”
“হ্যাঁ। তবে মহিমবাবুর চোখের দোষ ছিল বড় রকমের। তিনি এক রকম রাতকানা ছিলেন।”
“তা অবশ্য ঠিক। তবে তাঁকে তো দোকানের কর্মচারীরাই সিগারেট কিনে এনে দিত। তারা সকলেই পুরনো কর্মচারী। বিশ্বস্ত।”
“বিশ্বস্ত লোক কি অবিশ্বাসের কাজ করে না?”
“টাকাপয়সা খেয়ে করতে পারে।”
“অনায়াসে পারে। তাছাড়া, মহিমবাবুর দোকানের কর্মচারীরা সবাই ধর্মপুত্তুর একথা কে বলল? আমরা তাদের কতটুকু জানি।”
পশুপতি অস্বীকার করল না।
বাস্তবিক পক্ষে আমরা মহিমবাবুর দোকানের খবর বেশি জানতাম না। তাঁর দোকানে মাঝে মাঝে গিয়েছি, চা খেয়েছি, কথাবার্তা বলেছি সামান্য। ভদ্রলোক যে খারাপ ছিলেন তা নয়, তবে সদালাপী ছিলেন না। বসে বসে গল্প করার মতন মানুষও নন। কাজের কাজটুকু সেরে তিনি আমাদের বিদায় জানাতেন।
মহিমবাবুর দোকানে চার-পাঁচজন কর্মচারী দেখেছি। মুখে সকলকেই চিনি। কারও নাম জানি, কারও শুধু পদবীটা। কর্মচারীদের মধ্যে গৌরাঙ্গবাবু সবচেয়ে পুরনো। তিনি বয়স্ক লোক। বিক্রিবাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন গৌরাঙ্গবাবু আর রায় বলে এক ছোকরা। অন্য দু’জনের মধ্যে ছিল কানু বলে এক লম্বা সিড়িঙে আধবয়েসী লোক, আর মল্লিক নামের এক জোয়ান ছেলে। মাঝে-সাঝে দাশু বলে একজনকে দেখেছি।
এদের কারও সঙ্গে আমাদের পরিচয় তেমন গভীর ছিল না। গৌরাঙ্গবাবু অবশ্য সজ্জন মানুষ।
আমি বললাম, “খারাপ না হলেই ভালো। তবু বলছি, নিধুর ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না। সে বেপাত্তা হবে কেন?”
“খোঁজ করবি?”
“ভাবছি।”
“বেশ, কর। আমি তোর সঙ্গে থাকব।”
চার
সকালের দিকেই পশুপতির ঝামেলা বেশি থাকে। বাজার-হাট, মুদিখানা, কয়লা-ঘুঁটে, কে এল কে গেল—টাকা পয়সার হিসেব, আদায়পত্র, এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে বেলা পর্যন্ত। আমার তর সইছে না দেখে পশুপতি বারো আনা কাজ দশটা নাগাদ মিটিয়ে দিয়ে বলল, “নে চল। আমি তৈরি।”
রাস্তায় বেরিয়ে পশুপতি বলল, “তোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে রাত্তিরে ঘুমোতে পারিসনি?”
সত্যিই রাত্রে ঘুমোতে পারিনি। মাথার মধ্যে ওই একই চিন্তা জট পাকিয়ে গিয়েছিল! মহিমবাবুর মুখ বার বার মনে পড়েছে। বেচারি! পানুবাবু, প্রেস, নিধু,–প্রত্যেকের কথাই ভেবেছি কাল।
পানুবাবুর প্রেস বিবেকানন্দ রোডের দিকে। বড় রাস্তায় নয়, গলির মধ্যে। আমরা দু’জনে হাঁটতে লাগলাম। কলেজ স্ট্রিটের মুখে এসে ট্রাম ধরব। পশুপতি বলল, “তুই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিস যেন!”
“না।” মিথ্যে কথাই বললাম পশুপতিকে। আসলে আমায় ভয়ে ধরেছিল।
“তোর মুখ বলছে তুই ভয় পেয়েছিস,” পশুপতি বলল, “তোর ভয়, পুলিশ তোকে ধরবে! বলবে, জীবনলালবাবু, আপনি মশাই মহিমবাবুকে খুন করার পথটা দেখিয়েছেন। আপনাকে ছাড়া হবে না।…সত্যি তুই জীবন একটা গাধা। পুলিশের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তোকে ধরতে আসবে।” পশুপতি হাসতে লাগল।
আমি বললাম, “বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। পুলিশ যদি ছোঁয়—আমায় নাজেহাল করে ছাড়বে। আমি ভাই পুলিশকে ভয় পাই।”
“তাহলে আর ডিটেকটিভ বই লিখিস না। ভুতের গল্প লেখ।”
কথা বলতে বলতে আমরা মোড়ে এসে পড়েছিলাম। ট্রাম আসছিল।
রবিবার। প্রেস বন্ধ। আমরা ভেবেছিলাম, এখন কাজের চাপ চলছে— হয়তো খোলা থাকতে পারে।
দারোয়ান রামলাল বলল, গত রবিবার কাজ হয়েছে। এ-রবিবার কেউ আর কাজে করতে চায়নি, তাই ছুটি।
পশুপতি বলল, “নিধুর ঠিকানাটা জেনে নে, জীবন!”
দারোয়ান আমাদের চেনে। আমাকে হামেশাই দেখে প্রেসে আসতে। “রামলাল, ওই নিধু কোথায় থাকে? ঠিকানা জানো?”
রামলাল একটু ভাবল। মাথা নড়ল। বলল, “পাত্তা আমি জানি না, বাবু। মগর ও মেটিয়া কলিজের পাস থাকে।”
“গলির নাম?”
“মালুম নেহি।”
পশুপতি আমার দিকে তাকাল। বলল, “কাল পানুবাবুকে জিজ্ঞেস করে নিলেই হতো।”
“তখন আমার এত কথা মনেও আসেনি। …তাছাড়া, এখনও পানুবাবুকে ব্যাপারটা না বলা ভালো। আগে থাকতে রটিয়ে লাভ কী! দেখা যাক—কী হয়!”
রামলাল নিজেই বলল, “আপলোগ দাশুবাবুসে পুছে লিন, দাশুবাবু জানেন।” “কোথায় থাকেন দাশুবাবু!”
“নাগিচ, এহি গলিসে চলে যান। বাঁয়া মোড় লেবেন। সাত নম্বর।” “আচ্ছা!”
আমরা আর দাঁড়ালাম না, দাশুবাবুর খোঁজ চললাম।
যেতে যেতে পশুপতি বলল, “তুই দাশুবাবুকে চিনিস!”
“হ্যাঁ, হেড কম্পোজিটার।”
“চল—দেখি।”
বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হল না, দাশুবাবুকে খুঁজে পেতেই দেরি হল। সেকেলে এক বৃহৎ বাড়ি, তারই খোপে খোপে অজস্র ভাড়াটে।
দাশুবাবু বললেন, “মেডিকেল কলেজের মেন গেটের উলটো দিকে যে গলিটা—ওই গলি দিয়ে ঢুকে যাবেন। শ্রীগোপাল মল্লিক লেন। বাড়ির নম্বর মনে পড়ছে না। জানি না। বছরখানেক আগে একবার গিয়েছিলাম। একটা মুদির দোকান দেখবেন। জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে।” বলে দাশুবাবু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, “নিধুর নাকি কোন মাসি মারা গিয়েছে। খবর পাঠিয়েছিল। ওর মা-মাসি কেউ আছে বলে আমি জানি না। কামাই করার অজুহাত। ছেলেটা দিন দিন বদ হয়ে যাচ্ছে, জীবনবাবু। নেশাভাঙ করে বেড়ায় শুনেছি।”
আমি আসল কথাটা ভাঙলাম না। বললাম, “যাই একবার খোঁজ করে দেখি গে। পানুবাবু কাল গিয়েছিলেন। বললেন, আমার প্রুফ আটকে পড়ে আছে। প্রুফ তো আমার কাছে নেই, নিধুর কাছে। সে যে কী করল, কাগজপত্র হারাল না বাড়িতেই ফেলে রেখেছে—একবার খোঁজ নেওয়া দরকার।”
দাশুবাবু বললেন, “গিয়ে দেখুন কী করল প্রুফগুলোর! দায়িত্ব বলে কিছু নেই ওর। ওদের দিয়ে কাজ হয় না। কী বলব বলুন! বাবু ভালো মানুষ। চাকরিটা তে খাবেন না। আশকারা পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠেছে। …মহিমবাবুর কথা শুনেছেন?”
“শুনেছি। পানুবাবুই বলেছেন।”
“নিয়তি। কার কপালে কী আছে কে জানে!”
আমরা আর দাঁড়ালাম না।
ফিরে এসে আবার ট্রাম ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, পশুপতি বলল, “নিধু ছেলেটা কেমন রে? তুই তো বেশি দেখেছিস!”
“ছেলেটাকে তো খারাপ দেখিনি, তবে চেহারাটা কেমন চোয়াড়ের মতন হয়ে গেছে আজকাল।”
“নেশাটেশা করে বলল!”
আমি কোনও জবাব দিলাম না।
ট্রাম এল। বেশ ফাঁকা।
আমরা পাশাপাশি বসলাম। ট্রাম চলতে শুরু করলে আমি বললাম, “তুই মহিমবাবুর ফ্যামিলির খবর রাখিস?”
“না। ওপর ওপর যা শুনেছি।”
“আমি ভাবছি, মহিমবাবুকে খুন করলে কার কী লাভ হতে পারে! কার স্বার্থ?” পশুপতি বলল, “আমার কিন্তু একবারও মনে হচ্ছে না, এটা খুনের ব্যাপার। ভদ্রলোক হার্টের রোগেই মারা গেছেন।”
“তোর কথা সত্যি হলেই ভালো।” বলে আমি রাস্তার দিকে মুখ ফেরাতেই দেখলাম, আমাদের মেসের বিজনদা, রিকশায় চেপে কোথায় যেন যাচ্ছেন। আজই আমার মেসে ফেরার কথা ছিল।
নিধুকে পাওয়া গেল না। সে নাকি সকালের দিকে বেরিয়ে গিয়েছে। কখন ফিরবে কেউ জানে না।
নিধু যে বাড়িটায় থাকে তাকে বাড়ি বলা যায় না। দপ্তরিখানা বললেই ঠিক বলা হয়। ছোট ছোট দুখানা ঘর, সামান্য বারান্দা। কাগজ-ছাঁটাই মেশিন, রাজ্যের ছাঁট কাগজ, পেস্ট-বোর্ড, কাঠের ডেস্ক, দুর্গন্ধে ভরা লেই—আরও কত কী পড়ে আছে।
দুটো লোক কাজ করছিল। বলল, তারা কিছু জানে না।
মুদির দোকানের লোকটাকেই ধরতে হল আবার। বলল, “রাত আটটা নাগাদ আসুন। ওই সময় দেখা পেতে পারেন।”
“ও কি বাড়িতে থাকে?”
“থাকে। তবে আজ ক’দিন দেখছি রাত করে ফেরে।”
“বাঁধাইখানাটা কার?”
“মণ্ডলবাবুর।”
পশুপতি আমার হাত ধরে টানল। বলল, “চল এখন। পরে দেখা যাবে।”
পাঁচ
সকালটা বৃথা গেল।
দুপুরটাও।পশুপতি বলেছিল, চল, বিকেলে একবার মহিমবাবুর বাড়ি থেকে দেখা করে আসি।
আমি রাজি হইনি। কেমন একটা ভয় করছিল। ও-বাড়িতে গিয়ে কী দেখব, কী শুনব কে জানে! যদি পোস্টমর্টেম হয়ে গিয়ে থাকে—তাহলে মন্দ খবরও তো শুনতে পারি। আমি বললাম, আগে নিধুকে ধরি, দেখি ব্যাপারটা কী, তারপর যাব।
বিকেল শেষ হল। আজকাল তাড়াতাড়ি বিকেল ফুরোচ্ছে। ছ’টা নাগাদ একেবারেই অন্ধকার হয়ে গেল।
এক একসময় মনে হচ্ছিল, আমি পাগলামি করছি। মহিমবাবুর মারা যাবার সঙ্গে প্রেসের এক সাধারণ কর্মচারী নিধুর কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না। আমি অকারণ এক অসম্ভবের সঙ্গে নিধুকে জড়াতে চাইছি।
আবার মনে হচ্ছিল, যতই অসম্ভব হোক—একবার নিধুর খোঁজ নিতে আপত্তি কোথায়? নিধুর আচরণে সন্দেহ করার মতন বিশেষ কিছু নেই হয়তো, তবু দু’একটা জিনিস থেকে সামান্য সন্দেহ হয়। নিধু কেন ক’দিন প্রেসে যাচ্ছে না? কেন সে মিথ্যে কথা বলে কামাই করছে? আজ ক’দিন সকালের দিকে সে বেরিয়ে যাচ্ছে কেন? কী জন্যে রাত করে ফিরছে? সে কবে থেকে নেশা-ভাঙ শিখল?
খুঁটিয়ে ভাবলে সন্দেহটা বাড়ে বই কমে না। আবার অন্যদিক থেকে বিচার করলে, প্রেসের নিধুর সঙ্গে বইয়ের দোকানের মালিক মহিমবাবুর কোনও সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায় না।
আটটা বাজার খানিক আগেই পশুপতি আর আমি বেরিয়ে পড়লাম।
পশুপতি বলল, “মহিমবাবুদের বাড়িতে একটা ফোন করলে হতো। তুই নম্বর জানিস?”
“না। আমি দোকানের নম্বর জানি।”
“টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে পেয়ে যেতাম। …ফিরে গিয়ে করব।”
আমরা হাঁটতে হাঁটতে শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের কাছাকাছি পৌঁছলাম যখন, তখন আটটা বেজে গিয়েছে।
মুদির দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। দপ্তরিখানার দরজাও।
আমি কড়া নাড়লাম।
কোনও সাড়াশব্দ নেই। ভেতরে আলো জ্বলছে বোঝা যাচ্ছিল।
আবার কড়া নাড়তে ভেতর থেকে সাড়া এল। “কে?”
গলার স্বরটা নিধুর বলে মনে হল না।
পশুপতি নিচু গলায় বলল, “আমার নাম বল।”
কারও নাম বলতে হল না, দরজা খুলে গেল।
জায়গাটা অন্ধকার মতন, তবু যে দরজা খুলল—তাকে চিনতে পারলাম না। লোকটার বয়েস বেশি নয়। মনে হল, আমাদের বয়সী। লোকটা আমাদের দেখল। বলল, “কী চাই?” ওর গলার স্বর রুক্ষ।
“নিধু আছে?”
“কে? কে নিধু?”
পশুপতি আমার গায়ের পাশে গা দিয়ে দাঁড়াল। বলল, “এ-বাড়িতে নিধু বলে কেউ থাকে না?”
“না। আমি জানি না।”
“নিধু এ-বাড়িতেই থাকে। আমরা প্রেস থেকে ঠিকানা নিয়ে ও-বেলা দেখা করতে এসেছিলাম।”
“প্রেস! …ও আপনারা নিমাইসাধনের কথা বলছেন! সে তো আজ ক’দিন হল দেশে চলে গিয়েছে।”
পশুপতি আমার দিকে তাকাল। আমি পশুপতিকে দেখলাম।
লোকটা মিথ্যে কথা বলছে। ডাহা মিথ্যে।
পশুপতি বলল, “ক’দিন মানে! সকালে এসে শুনলাম, নিধু ভোর-ভোর বেরিয়ে গেছে আর আপনি বলছেন সে নেই?”
“হ্যাঁ, নেই। যান, ঝামেলা পাকাবেন না।”
“আপনি এ-বাড়িতে থাকেন?”
“না।” লোকটা বিরক্ত হল। তার চেহারাটা যণ্ডামার্কা। মাথা-ভর্তি চুল। গায়ে স্পোর্টস গেঞ্জি।
পশুপতি একসময় মারকুটে ছেলে ছিল। রাস্তাঘাটে চড়চাপড় ঘুষি চলাত। আজকাল তার ওসব দোষ নেই। লোকটার বেয়াড়াপনা, তাচ্ছিল্যের ভাব, মস্তানি দেখে পশুপতি ভেতরে ভেতরে চটছিল। সে যে চটছিল, আমি বুঝিনি। বুঝলাম—পশুপতি যখন দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে আচমকা দরজা ঠেলে নিজের শরীরের অর্ধেকটা ঢুকিয়ে দিল।
লোকটা এ-রকম আশা করেনি, থতমত খেয়ে গিয়েছিল।
পশুপতি ভেতর দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “নিধু, আমি আর জীবনবাবু তোমার কাছে এসেছি। দরকারি কথা আছে। তুমি যদি না বেরিয়ে এসে দেখা করো, আমরা কিন্তু সোজা থানায় যাব। মহিমবাবু মারা গেছেন।”
লোকটা আচমকা পশুপতিকে ধাক্কা মারল। পশুপতি সামলাতে পারল না। পড়ে গেল। আমি দরজার পাশে, তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পশুপতিকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েই লোকটা ছুটল। পালাল।
এত দ্রুত এবং সহসা সব কিছু ঘটে গেল যে, আমরা কিছু বুঝতে পারলাম না, করতেও পারলাম না।
পশুপতি উঠে দাঁড়াল।
“লোকটা পালিয়ে গেল,” আমি বললাম, “লেগেছে তোর?”
“না। তুই বেটাকে ধরতে পারলি না?”
“বুঝতেই পারিনি।”
“যাক গে।” পশুপতি ছোট্ট উঠোনটুকু পেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “দরজা বন্ধ করে দে। ভেতরে আয়।”
দরজা বন্ধ। দপ্তরিখানার মেশিন-পত্র যেমন ছিল পড়ে আছে বারান্দায়। সকালের তুলনায় সামান্য সাফসুফ।
পশুপতি আবার ডাকল, “নিধু বাইরে এসো।”
কোনো সাড়া নেই ।
দুটো ঘরের একটা বন্ধ ছিল বাইরে থেকে, আন্যটা ভেতর থেকে। দুটো ঘরই অন্ধকার।
এবার আমি নিধুকে ডাকলাম। ধাক্কা দিলাম দরজায়। তবু কোনও সাড়াশব্দ দিল না নিধু।
শেষে পশুপতি বলল, “তোমাকে এই শেষবার বলছি নিধু। বাইরে এসো। যদি না বেরিয়ে আসো, আমরা কিন্তু এবার সোজা থানায় যাব। তুমি ভেবো না, আমরা দুজনেই একসঙ্গে থানায় যাব। আমি এখানে তোমাকে আটকাব। জীবনবাবু থানায় যাবেন।”
আমরা সামান্য অপেক্ষা করতেই ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ এল। তারপর নিধু বেরিয়ে এল। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছিল তার চেহারা, পোশাক সবই যেন কেমন নোংরা বিশ্রী দেখাচ্ছে।
নিধু বাইরে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। কথা বলল না।
পশুপতি বলল, “তুমি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে ছিলে কেন? আমরা ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিলে না?”
কোনও জবাব দিল না নিধু।
আমি বললাম, “তোমার কাছে আমরা কেন এসেছি জানো?”
মাথা নাড়ল নিধু। জানে না।
“মিথ্যে বোলো না, তুমি জানো?”
“না বাবু।”
“তুমি আবার মিথ্যে কথা বলছ। তুমি জানো, মহিমবাবু মারা গেছেন?” “শুনেছি।”
“কে বলছে?
“ফুলুবাবু।”
“ফুলুবাবু কে?”
“ওই যে পালিয়ে গেলেন।”
“ও কে? কী করে? কোথায় থাকে?”
নিধুর যে ভয় ধরে গিয়েছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। নিধু বলল, “ফুলুবাবু এই দপ্তরিখানার মালিকের বন্ধু। মালিক হলেন মণ্ডলবাবু। এই দপ্তরিখানায় মহিমবাবুর দোকানের তিন-চারটে বই বাঁধাই হয়। আমি এখানে থাকি। মণ্ডলবাবু আমায় থাকতে দিয়েছেন। রাতে দপ্তরিখানা পাহারা দিই।”
“ফুলুবাবু কী করে?”
“জানি না বাবু, শুনেছি ফুলুবাবু ট্যাক্সি কিনেছে। …ফুলুবাবু মাঝেমাঝেই এখানে আসেন। মণ্ডলবাবুর সঙ্গে গল্পগুজব করেন।”
পশুপতি বলল, “ও! …তা তোমায় একটি কথা জিজ্ঞেস করি। তুমি কাজ করো পানুবাবুর প্রেসে। ফুলুবাবু ট্যাক্সির মালিক। তোমাদের মধ্যে বইয়ের দোকানের মালিক মহিমবাবুকে নিয়ে কথা হবে কেন হে? ও কেন তোমাকে মহিমবাবুর মারা যাবার খবর শোনাবে?”
নিধু চুপ। জবাব দিতে পারছিল না।
আমি হঠাৎ বললাম, “নিধু, তুমি কথা লুকোচ্ছ। সত্যি করে সব কথা বলো। নয়তো তোমার বিপদ হবে।”
নিধু প্রথমে চুপচাপ। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবু, ফুলুবাবু মহিমবাবুর নিজের লোক। বড় বোনের ছেলে। ভাগ্নে। ফুলবাবু আগে তাঁর মামার দোকানে বসতেন। দোকানের টাকা পয়সা চুরি করার জন্যে মামা ফুলুবাবুকে একদিন নাকি জুতোপেটা করে দোকান থেকে বার করে দেন। সেই থেকে ফুলুবাবু মামার ওপর খাপ্পা।”
পশুপতি আমার দিকে তাকাল। বলল, “ব্যাপারটা একটু ধরা যাচ্ছে যেন রে! কিন্তু মহিমবাবুর ভাইপো ভাগ্নে শুনেছি বেশ কয়েকজন। মামা মরলে ফুলুর লাভ কী?”
কী লাভ তা আমিও জানি না। মামার অবর্তমানে কী পাবে ফুলু?
আমি নিধুকে বললাম, “ফুলুবাবুর কথা থাক। এবার তুমি অন্য কথার জবাব দাও। বলে আমি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকটা দেখলাম। “তুমি ক’দিন কাজে কামাই করছ কেন ? ”
নিধু জবাব না দিয়ে চোখ মুছতে লাগল ।
“তুমি নাকি বলে পাঠিয়েছ, তোমার মাসি মারা গেছে। দাশুবাবু বললেন, তোমার মা-মাসির কথা উনি শোনেননি। তুমি মিথ্যে কথা বলেছ।”
নিধুর আবার কান্না এসে গেল। বলল, “হ্যাঁ বাবু।”
“কেন?”
“ফুলুবাবু আমাকে দিয়ে একটি কাজ করাচ্ছিলেন!”
“কী কাজ!”
“আমাকে তিনি একটা চাবি দিয়ে দিতেন। আর বলতেন রাজাবাজরে অমুক জায়গায় যাবে, খিদিরপুরে তমুক জায়গায় যাবে। আমি রোজ ফুলুবাবুর কথামত রাজাবাজার, খিদিরপুর, ট্যাংরা, চেতলা, যাদবপুর যেতাম। উনি আমায় পঞ্চাশটা করে টাকা দিতেন।”
পশুপতি বলল, “চাবি দিতেন কেন? তুমি কাদের কাছে যেতে?”
“যাদের কাছে যেতাম বাবু, তারা ভালো লোক নয়। তারা খারাপ খারাপ নেশা বিক্রি করে লুকিয়ে। অচেনা লোককে তারা কিছু দেয় না, কথাও বলে না। চাবি দেখলে তারা বুঝতে পারত, কোনও চেনা খদ্দের লোক পাঠিয়েছে। তবু তারা সন্দেহ করত। ঘোরাত।”
“তুমি কি কোনও বিষ এনেছিলে? না ফুলুবাবুর নেশা আনতে?”
নিধু চুপ। তারপর ডুকরে উঠল। বলল, “আমায় কেউ কিছু দিত না। সন্দেহ করত। একটা লোক শুধু হোমিওপ্যাথির ছোট্ট শিশিতে কী একটা জিনিস দিয়েছিল। বলেছিল সাবধানে রাখতে। প্রথমদিন দেয়নি। বলেছিল, দুশো টাকা নিয়ে যেতে। ফুলুবাবু টাকা দিলে আমি পরের দিন গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।”
“সেটা কী?”
“জানি না, বাবু।”
“কেমন দেখতে?”
“কালচে মতন। গুঁড়ো।”
“ফুলবাবু সেটা নিয়ে কী করেছিল?”
“আমি জানি না।”
“তুমি কবে ওটা এনেছিলে?”
“শুক্রবার দুপুরে।”
“ফুলুবাবুকে কখন দিলে?”
“ফুলবাবু কলেজ স্ট্রিটে বাজারের ভেতর চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। আমায় বলে দিয়েছিলেন যেতে। আমি গিয়ে তাঁকে জিনিসটা দিয়ে দিই।”
“তারপর?”
“আমি আর কিছু জানি না বাবু।”
“তুমি কাল কেন প্রেসে যাওনি?”
“ফুলুবাবু আমায় যেতে বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, তুমি এখন প্রেসে যাবে না। দপ্তরিখানাতেও দিনের বেলায় থাকবে না। তোমায় অন্য একটা ভালো কাজ যোগাড় করে দেব।”
পশুপতি আমার গা টিপল।
আমি বললাম, “নিধু, তুমি আমার দেখা প্রুফ আর তার সঙ্গে যে কপি ছিল তা প্রেসে ফেরত দাওনি। কেন?”
“আমি তো প্রেসে যাইনি, বাবু।”
“সেগুলো কোথায়?”
“আমার কাছেই আছে?”
“ওগুলো কেউ দেখেছিল? পড়েছিল?”
“না, না বাবু,” মাথা নাড়ল নিধু। “আমি যেভাবে এনেছিলাম সেইভাবেই রেখে দিয়েছি। বাণ্ডিলটা এখনও ঘরে পড়ে আছে।”
পশুপতি আর আমি একই সঙ্গে বললাম, “তুমি ঠিক বলছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। …আপনারা ঘরে আসুন—আমি দেখাচ্ছি।”
নিধু আমাদের নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি জ্বেলে দিল। চতুর্দিকে বাঁধাইখানার নোংরা। তারই মধ্যে থাকে নিধু। একটা কুলুঙ্গির মধ্যে থেকে সত্যিই নিধু প্রুফের বাণ্ডিল বার করে দিল।
আমি একবার দেখলাম।
তাহলে?
পশুপতিও ভাবছিল, তাহলে?
আমি আবার বললাম, “নিধু, তুমি ঠিক জানো, এই প্রুফ কেউ পড়েনি?” “হ্যাঁ বাবু, কেউ পড়েনি।”
“তা হলে মহিমবাবুকে কেমন করে মারা হল?”
নিধু চুপ করে থাকল। আমরাও ভেবে পাচ্ছিলাম না ব্যাপারটা কী হল?
নিধুই হঠাৎ বলল, “বাবু, আমি একটা কথা শুনেছি। আমার কানে গিয়েছিল। মহিমবাবু বাড়ি ফেরার আগে জল আর এক কাপ পাতলা চা খেতেন। জল দোকানেই থাকত। চা আসত দোকান থেকে। কী যেন নাম দোকানটার। ফুলুবাবুর ওই দোকানে আসা-যাওয়া ছিল। চায়ের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলেন কি না ফুলুবাবু বলতে পারব না।”
আমরা যেন চমকে উঠলাম। মনে হল, এটা হতে পারে। একেবারেই অসম্ভব নয়। মহিমবাবু বিষ-মেশানো চা খেয়েই রিকশায় উঠেছিলেন। হয়তো দশ-বিশ মিনিট সময় গিয়েছে বিষের ক্রিয়া হতে। তারপর তিনি জানতেও পারেননি কেমনভাবে মৃত্যু এসে তাঁকে এ-জীবনের মতন ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেল।
আমি বললাম, “পশুপতি! নিধুই ঠিক বলেছে বোধ হয়।” পশুপতি মাথা নাড়ল।
