Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দশটি কিশোর উপন্যাস – বিমল কর

    বিমল কর এক পাতা গল্প342 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    একদিন এক গোলাপবাগানে – বিমল কর

    একদিন এক গোলাপবাগানে

    এক

    সামনে বড়দিন। অফিস থেকে বেরিয়ে অনিল ভাবছিল, একবার নিউ মার্কেটের দিকে যাবে। তার একটা প্যান্ট পড়ে আছে মাসুদ দরজির কাছে। যদি প্যান্টটা পাওয়া যায় ভালো। না পাওয়া গেলেও ক্ষতি নেই, এই বড়দিনের সময় নিউ মার্কেটের চেহারা ফিরে যায়। কী সাজগোজ, কত মানুষজন, খানিকটা সময় বেশ কাটিয়ে দেওয়া যাবে ঘোরাঘুরি করে।

    অনিল পা বাড়াতে যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখল, গোরা আসছে। হন্তদন্ত হয়েই আসছে যেন।

    গোরা কাছে এল। বলল, “বেরিয়ে পড়েছিস? আর একটু হলেই তোর দেখা পেতাম না। আবার বাড়ি ছুটতে হতো। কোথায় যাচ্ছিস? বাড়ি?”

    “না। ভাবছিলাম একবার নিউ মার্কেটের দিকে যাব।”

    “খুব খারাপ খবর আছে।”

    অনিল তাকাল। “খারাপ খবর?”

    “মতিকাকা পাগল হয়ে গিয়েছেন।” অনিল যেন প্রথমটায় খেয়াল করতে পারেনি, পরমুহূর্তে তার খেয়াল হল। বিশ্বাস করতে পারল না। “যাঃ!”

     

     

    গোরা বলল, “খানিকটা আগে আমি খবর পেয়েছি। তোকে জানাতে এলুম।” অনিল তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না। অবাক হয়ে গোরাকে দেখছিল। দুঃসংবাদ মিথ্যে হয় না। তবু অনিল বলল, “তুই ঠিক বলছিস?”

    “জুড়ন কলকাতায় এসেছে। খবরটা দিতেই এসেছে। আমাদের একবার যেতে হবে।” “কোথায়?”

    “মতিকাকার গোলাপবাগানে।”

    “সে তো মধুপুরের কাছে!”

     

     

    “হ্যাঁ। ওখানেই যেতে হবে। মিস্টিরিয়াস ব্যাপার। চল, তোকে সব বলছি।”

    অনিলের অফিস ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে। ধর্মতলার মুখ পর্যন্ত এগিয়ে গেলেই চায়ের দোকান। অনিলের আসা-যাওয়া আছে দোকানে। সামান্য পথ হেঁটে এসে চায়ের দোকানে বসল দু’জনে। অফিস ছুটির ভিড়। নিরিবিলি বসার জায়গা পাওয়া মুশকিল। তবু দোকানের এক ছোকরা পেছন দিকে একটা জায়গায় বসিয়ে দিল দু’জনকে।

    অনিল চায়ের কথা বলল।

     

     

    গোরা জল চাইল এক গ্লাস। তাকে খানিকটা বিচলিত দেখাচ্ছিল।

    অনিল তখনও ধাঁধার মধ্যে রয়েছে। মতিকাকা তার নিজের কাকা নয়, গোরার কাকা। গোরার বাবার খুড়তুতো ভাই। অনিল গোরার বন্ধু। দূর সম্পর্কের আত্মীয়তাও রয়েছে দুই বন্ধুর মধ্যে। নিজের না হলেও মতিকাকাকে বরাবর কাকার মতনই ভক্তিশ্রদ্ধা করেছে অনিল। মানুষটি বড় ভালো। অনিলদের খুবই স্নেহ করেন। সেই মতিকাকা হঠাৎ পাগল হয়ে গিয়েছেন ভাবতে অনিলের খারাপ লাগছিল।

     

     

    গোরা নিজেকে সামলে নিল। জল খেয়ে বড় করে নিশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “জুড়নের কাছে আমি যা শুনলাম, তোকে বলছি।”

    “বল।”

    “তুই তো জানিস, মতিকাকা ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে কাজকর্ম করেন। খাওয়া, শোওয়া, বসা—সবই নিয়মে।”

    অনিল ঘাড় নাড়াল। সে মতিকাকার স্বভাব জানে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যা যা করেন মতিকাকা সব যেন রুটিন-মাফিক। এত নিয়ম মেনে কাজ করলে মানুষকে একটু খেপাটে মনে হয়। তা বলে মতিকাকাকে খেপা বলা যাবে না। বড়জোর বলা যেতে পারে, অনেক ব্যাপারে কাকা খেয়ালি, কোনও-কোনও ব্যাপারে জেদি, আবার দু’চারেটে বিষয়ে অবুঝ। মানুষটা যদি খেয়ালি আর অবুঝ না হবেন—কলকাতার ঘর-বাড়ি, ভালো চাকরি ছেড়ে গোলাপবাগান করতে মধুপুরের দিকে ছুটে যান!

     

     

    গোরা বলল, “ঘটনাটা ঘটেছে দিন তিন-চার আগে। ঠিক-ঠাক বললে, গত মঙ্গলবার—মানে উনিশ তারিখ বিকেলে।”

    “উনিশ!…আজ বাইশ। হ্যাঁ, চার দিনই। ”

    “সকাল বা দুপুরে কাকার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। রোজ যেমন সাতসকালে ঘুম থেকে ওঠেন, তেমনই উঠেছেন। মুখ ধুয়ে চা খেয়ে গরম জামাকাপড় পরে হাঁটতে বেরিয়ে গিয়েছেন। তারপর রোজই পর-পর যেভাবে যা-যা করেন, সবই করেছেন। দুপুরেও কিছু বোঝা যায়নি। বিকেলে মতিকাকা গোবিন্দ মালীর সঙ্গে গোলাপবাগানের দেখাশোনা করছিলেন। দেখাশোনা করার সময় হঠাৎ মতিকাকার কী যেন হয়ে যায়! ভীষণ ভাবে চিৎকার করে ওঠেন কাকা। গোবিন্দ কিছুই বুঝতে পারেনি। সে কাকার চিৎকার শুনে ছুটে আসে। কাকাকে যেন সাপে কামড়েছে এইভাবে ফুলগাছের দিকে তাকিয়ে কাকা কেমন ভয়ে নীল হয়ে যেতে লাগলেন, কাঁপতে লাগলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে বাগানে পড়ে গেলেন।”

     

     

    অনিল অবিশ্বাসের গলা করে বলল, “বলিস কী?”

    “আমি তো চোখে দেখিনি, যা বলেছে জুড়ন, তাই বলছি।”

    “তারপর?”

    “তারপর গোবিন্দর হাঁকডাক শুনে অন্যরা ছুটে আসে। কাকাকে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয়।”

     

     

    “ডাক্তার?”

    “ওই বনবাদাড়ে ডাক্তার কোথায়? খানিকটা তফাতে এক বুড়ো ভদ্রোলোক থাকেন—দেখেছিস তো পুলিনবাবুকে। কবিরাজি হোমিওপ্যাথি—দুই-ই করেন। দেহাতের লোক তাঁর ওষুধ খায়। সেই পুলিনবাবুকে ডেকে আনা হয়। তিনি বললেন, মৃগী। ভয় নেই। বলে কিছু হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিলেন। ওষুধে কাজ কিছুই হল না। পরের দিন সকাল থেকে মতিকাকা পাগলের মতন কথাবার্তা বলতে লাগলেন।”

     

     

    চা-টোস্ট এসেছিল।

    চায়ে চুমুক দিয়ে অনিল বলল, “পাগলের মতন কথাবার্তা মানে?”

    “মানে পাগলরা যেমন বলে, কোনও কথার সঙ্গে পরের কথার মিল নেই।” “যেমন?”

    “আমি অত বলতে পারব না। নিজেরা গিয়ে দেখলে-শুনলে বুঝতে পারব। তবে জুড়নের কথা থেকে মনে হল, মতিকাকা হ্যালুসিনেশান দেখছেন।”

     

     

    “হ্যালুসিনেশান?” অনিল কেমন থতমত খাবার মতন করে বলল। “হ্যাঁ আমরা বাংলায় কী বলব হ্যালুসিনেশানকে? ভ্রম, না, মতিভ্ৰম?” “কী জানি। শুনেছি, হ্যালুসিনেশনে লোকে উদ্ভট জিনিস ভাবে আর দেখে।” গোরা বলল, “কাকাও শুনলাম উদ্ভট কথাবার্তা বলছেন।”

    অনিল চা খেতে লাগল। কৌতূহল কম হচ্ছিল না তার। বলল, “দু-একটা শুনি। জুড়ন বলেনি?”

    মাথা হেলাল গোরা। বলল, “বলেছে। গোলাপবাগান তছনছ করে দিতে বলছেন কাকা। কখনও বলছেন, বাগানে আগুন লাগিয়ে দাও; কখনও বলছেন, গাছগুলো উপড়ে মাটি খুঁড়ে ফেলো; কখনও আবার বলছেন, বাগানে কেউ যেও না, ওই বাগান মরণ-ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

     

     

    অনিল বলল, “পাগলামি!”

    “পুরো। কিন্তু কেন ? একজন সুস্থ-সবল মানুষ—আচমকা পাগল হবেন কেন ? কী আছে বাগানে ? ”

    “বাগানে কিছু নেই। কাকা আজ সাত-আট বছর ধরে ওই বাগান নিয়ে আছেন। এতকাল যদি বাগানে ভয়ের কিছু না থেকে থাকে—হঠাৎ সেই বাগানে ভয়ের ব্যাপার কী ঘটতে পারে?”

    গোরা ঘাড় দোলাল। “আমারও তাই মনে হয়।…তা নিজেরা একবার ওখানে না গেলে বুঝতে পারছি না। কাকাকে দেখা দরকার। তুই কাল যেতে পারবি না? আমার সঙ্গে চল আমি কালকেই যাব ভাবছি। তোর কাছে এসেছি তোকে সঙ্গে নিয়ে যাব বলে।”

     

     

    অনিল একটু ভাবল। বলল, “অসুবিধে নেই। কালই যেতে পারব। অফিসে বলে নেব একবার। ক্রিসমাসের ছুটি আছে দু’একদিন। ওরই সঙ্গে আরও দু’চার দিন জুড়ে নেব।”

    “বাঁচালি ভাই। একলা যেতে ভয় করছিল।”

    দুই

    রাত দশটার গাড়ি। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ভিড় ভয়ংকর না হোক, ভালোই বলতে হবে। শীতও পড়েছে জাঁকিয়ে।

    অনিলরা ভাগ্যবান। এমন একটা কামরায় উঠল, যে-কামরায় শোবার জায়গা পাওয়া গেল। আসলে কামরাটায় একটিমাত্র আলো জ্বলছে, বাকি আলো খারাপ। অন্ধকার কামরায় অনেকেই উঠতে রাজি হয়নি। প্যাসেঞ্জার ট্রেনে এমনিতেই চুরিচামারি বেশি হয়; পায়ে-পায়ে গাড়ি থামে, যাত্রী ওঠানামা করে, কে কখন কার জিনিস নিয়ে নেমে পড়বে, খেয়াল রাখা যায় না। এরপর যদি অন্ধকার কামরা হয়, চোরদের আরও সুবিধে।

    অনিলদের লটবহর নেই, চুরি যাবার মতনও কিছু ছিল না তাদের কাছে। মামুলি দুটো কিটব্যাগ, আর একটা করে কম্বল। কিটব্যাগ মাথায় দিয়ে জুতোজোড়া মাথার কাছে রেখে দুই বন্ধু বাংকের ওপর শুয়ে পড়ল।

    ট্রেন ছাড়ার খানিকটা পরেই বোঝা গেল শীত কাকে বলে। ডিসেম্বরের শেষ প্রায়, লিলুয়া পেরুতেই পৌষের দাপটটা বোঝা যাচ্ছিল।

    গোরা বলল, “দুটো মাংকি ক্যাপ নিয়ে এলে হতো রে, অনিল। কানের মধ্যে দিয়ে শীত ঢুকে যাচ্ছে।”

    অনিল বলল, “মাফলার জড়িয়ে নে মাথায়।”

    “তুই নিয়েছিস?”

    “হ্যাঁ।”

    কিছুক্ষণ দুই বন্ধু কথাবার্তা বলল, সাধারণ কথা। কামরায় লোক কম। গাড়ি ছাড়ার পর খানিকক্ষণ প্রায় সবাই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। তারপর ধীরে ধীরে চুপ করে গেল। প্রত্যেকটি স্টেশনে গাড়ি থামলেও যাত্রীদের ওঠানামা তেমন নেই। অন্ধকার কামরা বলেই বোধহয় ওঠার যাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না।

    দেখতে-দেখতে রাত বাড়ল। গাড়ি শ্রীরামপুর ছাড়িয়ে গিয়েছে।

    গোরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অনিল ঘুমোয়নি। ট্রেনে সহজে তার ঘুম আসতে চায় না।

    অনিল চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে মতিকাকার কথা ভাবছিল। গতকাল থেকেই ভাবছে অবশ্য, কিছুই বুঝতে পারছে না ।

    মতিকাকার ষোলো আনা কথা অনিল হয়তো জানে না, তবে আট-দশ আনা জানে বইকী। মতিকাকার পুরো নাম মতিলাল দত্ত। লোকে ছোট করে বলে মতি দত্ত । মতিকাকাদের বাড়ি বরানগরে। দুই পুরুষের বাড়ি। বনেদি পরিবার। মতিকাকারা দুই ভাই। বাড়ির দুই অংশ। এক অংশ মতিকাকার, অন্য অংশ মতিকাকার দাদার। ভাইয়ে-ভাইয়ে অমিল ছিল না। তবু মতিকাকা একদিন হুট করে তাঁর অংশ বেচে দিয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন।

    এক-একজন মানুষ থাকে, যারা বড় খামখেয়ালি হয়। মতিকাকাকে বোধহয় সেই দলে ফেলা চলে। নামকরা কম্পানির কেমিস্টের ভালো চাকরি আর বরানগরের বাড়ি বেচে দিয়ে কোন বুদ্ধিমান মধুপুরের দিকে চলে যায়! মতিকাকার দাদা নাকি বলেন, বিয়ে-থা করেনি, কোনও দায়-দায়িত্ব নেই, সংসার নেই—তাই মতি এ-সব খামখেয়ালি কাণ্ড করল। একদিন বুঝতে পারবে। আরও বয়েস হোক, তখন বুঝবে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা কাকে বলে।

    মতিকাকার বয়েস এখন মোটামুটি সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ। তা প্রায় বছর ছয়-সাত হবে মতিকাকা কলকাতা-ছাড়া। বছরে এক-আধবার কলকাতায় আসেন অবশ্য, দাদার কাছেই ওঠেন, তবে হপ্তাখানেকের বেশি থাকেন না।

    কেন যে একটা মানুষ সব ছেড়েছুড়ে বাইরে গিয়ে গোলাপবাগান নিয়ে মাতলেন, তা এমনিতেই রহস্যময়। তবে সাদামাটা ভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, মতিকাকা এক ধরনের হাঁপানিতে ভুগছিলেন। সাধারণ হাঁপানির সঙ্গে এর খানিকটা তফাত আছে। অনিলরা অন্তত তেমনই শুনেছে। শুনেছে, জন্মকাল থেকেই কাকার কেমন একটা খুঁত রয়েছে বুকে, তার ফলে অনেক জিনিসই তাঁর সহ্য হয় না, বুকের এবং শ্বাসপ্রশাসের কষ্ট হয়। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, ধুলো-ধোঁয়া, ভিড়, উত্তেজনা, উদ্বেগ—আরও অনেক কিছু থেকে তাঁকে এড়িয়ে থাকতে বলা হয়েছিল। মতিকাকা নাকি সেইজন্যই কলকাতা ছেড়ে চলে গেছেন।

    অনিল অতশত বোঝে না, তবে এটুকু বলতে পারে, নিজের মনোমতন জায়গা বেছে নিয়ে, সেখানে এক মস্ত গোলাপবাগান করে মতিকাকা ভালোই আছেন।

    মাঝেসাঝে অনিলরা মতিকাকার কাছে বেড়াতে যায়। এই তো গরমে গিয়েছিল একবার। দিন তিনেক ছিল। অনিলদেরও জায়গাটা বেশ পছন্দ। বিঘে দু’আড়াই জমি, চারদিকে কম্পাউণ্ড ওয়াল, বিঘে দেড়েকের মতন জায়গা নিয়ে গোলাপবাগান। অবশ্য গোলাপবাগান বলতে শুধু গোলাপই নয়, অন্য ফুলের গাছও আছে, তবে গোলাপই বেশি। এই বাগানের দেখাশোনা করে মালী আর মতিকাকারা ক’জন। দু’দুটো কুয়ো আছে বাগানে। গরমকালে জলের খানিকটা টানাটানি থাকে বলে দুটো কুয়োর ব্যবস্থা। কাকা থাকেন বাগানের লাগোয়া কটেজে। কটেজের গাঁথুনি ইট আর চুনসুরকির, মাথার ছাদ খাপরার। কটেজের চেহারাটা ছোট স্কুল কিংবা মফস্বলের হাসপাতাল-বাড়ির মতন। গোটা তিনেক ঘর। বড় ঘরে থাকেন কাকা। অন্য ঘরে জুড়ন আর অমর। একটা ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। রান্নাঘর ভাঁড়ারঘর আলাদা। কেশব ঠাকুর রান্নাবান্না করে। মালীর থাকার ব্যবস্থা নার্সারিঘরের পাশে।

    মতিকাকার গোলাপবাগানের ব্যবসা সামলায় অমর। জুড়ন করে ছোটাছুটি। কাকার গোলাপের চাহিদা আছে। কাছাকাছি শহরে যত না চালান যায় গোলাপ, তার চেয়ে বেশি যায় পাটনায়। কলকাতাতেও চালান আসে। নিউ মার্কেটের পিয়ারিলাল কাকার গোলাপ নেয়।

    সত্যি বলতে কী, গোলাপবাগানের আয়ে মতিকাকার অতগুলো পুষ্যির খাওয়া-পরা চলে না। ধানের জমিও কাকাকে খানিকটা রাখতে হয়েছে। তবে সাদামাটা খাওয়া-দাওয়া, বাড়তি খরচ বলে কিছু নেই, যা আয় হয়, তাতে চলে যাবারই কথা।

    গোলাপবাগান আগলে আর নিরিবিলিতে জীবন কাটাবেন স্থির করে নিয়ে কাকা তো ভালোই কাটাচ্ছিলেন দিনগুলো, হঠাৎ পাগল হয়ে গেলেন কেন?

    তিন

    মধুপুরের আগেই নামতে হয়। গাড়ি পৌঁছল আটটা নাগাদ। রোদে টলটল করছে শীতের সকাল।

    স্টেশনের বাইরে এসে অনিল বলল, “জুড়নকে তুই বলিসনি আমরা কখন আসব?” “আসব বলেছিলাম। কবে কখন, বলিনি। ঠিক ছিল না।”

    “তা হলে চল হাঁটি। মাইলটাক পথ। রোদে আরাম লাগবে।”

    গোলাপবাগানের একটা সাইকেল-রিকশা আছে। নিজেদের কাজেকর্মে সেটা চালানো হয়। গোবিন্দ মালী চালায়। এ-ছাড়া সাইকেলও আছে একটা। জুড়নের জানা ছিল না গোরারা কখন আসছে, সাইকেল-রিকশা পাঠায়নি।

    দুই বন্ধু হাঁটতে লাগল। কাঁধে কম্বল, হাতে কিট-ব্যাগ। এই জমজমাট শীতে চারদিক বড় সুন্দর দেখাচ্ছিল। রাস্তা কাঁচা, মেঠো পথই বলা যায়। রাস্তার দু’পাশেই মাঠ, গাছপালা, পরপর কত দেবদারু গাছ, কুল আর আতাঝোপেরও অভাব নেই। ছোট-ছোট খেতি দু’পাঁচটা। কপি কড়াইশুঁটি টমাটোর সবজিবাগান।

    হাঁটতে-হাঁটতে গোরা বলল, “আমার বড় ভয় করছে রে!”

    ভয় না হোক, কেমন এক অস্বস্তি অনিলেরও করছিল। গোলাপবাগানে গিয়ে মতিকাকাকে কেমন দেখবে কে জানে! অনিল বলল, “ভয় করে আর কী হবে! চল দেখি—অবস্থা কেমন ? ”

    গোরা বলল, “কাল গাড়িতে ঘুমোতেও পারিনি। একবার করে ঘুম আসছে আর অদ্ভুত-অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছি। ভয়ের স্বপ্ন।”

    অনিল ঠাট্টা করে বলল, “বাজে বকিস না। টেনে ঘুম মারলি সারা রাত।” গোরা প্রতিবাদ করে বলল, “চুপ করে শুয়ে থাকলেই ঘুম হয়!

    অনিল কিছু বলল না।

    খানিকটা পরে গোরা আবার বলল, “আমি ভাবছি, কাকার যদি বাড়াবাড়ি অবস্থা দেখি, তা হলে কী করব? কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে ট্রিটমেন্টের জন্যে। এখানে ফেলে রাখার কোনও মানেই হয় না ।

    “তুই কী বলিস?”

    অনিল বলল, “মতিকাকার দাদাকে খবর দেওয়া হয়নি?”

    “জুড়ন দিয়েছিল। ওদের বাড়িতে অসুখ-বিসুখ চলছে। কী বলেছে আমি জানি না।”

    “ঠিক আছে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হব।”

    আরও খানিকটা এগিয়ে দূরে গোলাপবাগান দেখা গেল। গোরা বলল, “ওই যে! আমার ভাই বুক-ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে।”

    “তুই বড় নার্ভাস।”

    গোলাপবাগানের ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে অনিলেরও যেন ভয়-ভয় লাগল। সুস্থ সবল প্রাণখোলা একটা মানুষকে কেমন দেখবে কে জানে।

    ফটক খুলে পা বাড়াতেই মালীকে চোখে পড়ল। কুয়োতলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। গোবিন্দ মালী তাদের দেখতে পেল।

    বাগানের রাস্তা দিয়ে দু’জনে যেন অস্বস্তির সঙ্গে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। একেবারে চুপচাপ সব। পাখির ডাক ছাড়া কোনও শব্দ নেই। মতিকাকার গোলাপবাগান এত নিঝুম থাকে না।

    আরও কয়েক পা এগুতেই মতিকাকাকে চোখে পড়ল। বাড়ির বারান্দায় রোদের মধ্যে বসে আছেন।

    গোরা বলল, “ওই তো কাকা বসে আছেন।”

    অনিল বলল, “আমাদের দেখতে পেয়েছেন।”

    অস্বস্তি আর ভয়ের সঙ্গে এগিয়ে গেল দু’জনে। বারান্দার গায়ে এসে দাঁড়াল। মতিলাল দু’জনকে দেখলেন। “তোমরা?”

    অনিলরা মতিকাকাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দাড়ি কামানো হয়নি, মাথার চুল উশকো-খুশকো, কপালটা কালো দেখাচ্ছিল। অসুস্থ মানুষকে যেমন দেখায়, সেই রকমই দেখাচ্ছিল কাকাকে, পাগল বলে মনে হচ্ছিল না।

    গোরা বলল, “বড়দিনের ছুটি আছে তিন-চার দিন। চলে এলাম।”

    “এসো” মুখে বললেন মতিলাল, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি সন্দিগ্ধ অনিল আর গোরা লক্ষ করল, অন্য সময় যখনই তারা এসেছে মতিকাকার কাছে, তাঁর অভ্যর্থনার ধরনই ছিল আলাদা। চেঁচিয়ে হেসে দু’হাতে টেনে নিয়ে হইচই করে তিনি তাদের অভ্যর্থনা করতেন। আর আজ যেন একেবারে ঠাণ্ডাভাবে “এসো” বললেন।

    গোরা বলল, “জুড়ন কলকাতায় গিয়েছিল।”

    “জানি,” মতিলাল কথা শেষ করতে দিলেন না অনিলকে। জুড়ন তোমাকে খবর দিয়ে এসেছে। বরানগরেও গিয়েছিল।”

    গোরা চুপ।

    “তোমরা আমায় দেখতে এসেছ,” মতিলাল বললেন, “আমি জানতাম তোমরা আসবে।” বলে অনিলের দিকে তাকালেন, তারপর আচমকা বললেন, “কেমন দেখছ আমাকে?”

    অনিল বোবা। কী বলবে সে?

    মতিলাল সামান্য অপেক্ষা করলেন, “কী হে অনিল? কথা বলছ না?”

    অনিল ঢোঁক গিলে বলল, “না, মানে… এমনিতে ঠিকই দেখাচ্ছে। তবে মনে

    হচ্ছে আপনার শরীরটা ভালো নয়।”

    “ভালো নেই। …তা আমাকে কী পাগল মনে হচ্ছে?”

    অনিল মাথা নাড়ল। পাগলের কোনও লক্ষণ সে দেখছে না।

    “এরা আমায় পাগল ভাবছে,” মতিলাল বললেন, “আমার সামনে চুপ করে থাকলেও ওদের কথাবার্তা কাজ দেখে আমি বুঝতে পারছি—আমার পোষ্যরা আমায় পাগল ভাবছে।”

    গোরা মাথা নাড়ল। “আপনার নাকি দিন-কয়েক আগে বাগানে কাজ করতে করতে হঠৎ শরীর খারাপ হয়ে পড়ে?”

    মতিলাল ঘাড় নাড়লেন। “হ্যাঁ। কথাটা ঠিকই। কিন্তু কী হয়েছিল তা তোমরা জানো না। এরাও ভালো করে জানে না। …যাক সে-কথা পরে শুনো। আগে হাতমুখ ধুয়ে কিছু খাও, চা খাও—তারপর বলব। …একটা কথা শুধু বলি—আমার এই সাধের গোলাপবাগান এখন আর সেফ নয়।”

    চার

    অনিলরা ট্রেনের জামাপ্যান্ট বদলে হাতমুখ ধুয়ে নিল। চা-জলখাবার শেষ করে মতিাকাকার কাছে গিয়ে বসল। ভাবল, কাকার মুখে সব শোনা যাবে। জুড়ন কী বলেছে না বলেছে তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই ।

    মতিলাল কিন্তু নিজের কথা বলছিলেন না। কলকাতার খবরাখবর নিলেন দু’চার কথায়, অন্য পাঁচটা কথা বললেন, নিজের ব্যাপারে কথাই তুললেন না।

    অনিল বুঝতে পারছিল না, মতিকাকা এমন চুপচাপ, বিমর্ষ হয়ে কী ভাবছেন! কেন তিনি আসল কথা তুলছেন না।

    গোরার সঙ্গে চোখে-চোখে কথা হল। শেষে অনিল বলল, “আপনার কী হয়েছিল?” মতিলাল কথাটা শুনলেন, কোনও জবাব দিলেন না।

    গোরা বলল, “আপনি বাগানে কাজ করতে-করতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন?” মতিলাল গোরার দিকে তাকালেন। বললেন, “তোমরা আর কী শুনেছ?” অপ্রস্তুত হল গোরা। মতিকাকা কখনও এমন গম্ভীর থাকেন না; কথাও বলেন না এ-ভাবে। উনি যেন অসন্তুষ্ট।

    মাথা চুলকে গোরা বলল, “জুড়ন যা বলেছে, আমরা তাই শুনেছি, অনিল শুধু শুনেছে আপনার শরীর খারাপ।”

    “জুড়ন কী বলেছে?”

    গোরা ইতস্তত করে বলল, “জুড়ন বলছিল, আপনি বিকেলের দিকে বাগানে কাজ করতে-করতে হঠাৎ ভীষণভাবে চেঁচিয়ে ওঠেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে যান। ওরা আপনাকে ধরাধরি করে ঘরে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। পুলিনবাবু আপনাকে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, মৃগী রোগ।”

    “মৃগী রোগ আমার কস্মিনকালেও ছিল না। এই বয়সে হঠাৎ মৃগী রোগ হবে? পুলিনবাবু কিছু জানেন না।”

    অনিল বলল, “আমরা ভেবেছিলাম, হার্ট বা মাথা, মানে ব্লাডপ্রেশার থেকে কিছু হতে পারে।”

    “না, না,” মতিলাল মাথা নাড়লেন, “আমার ব্লাডপ্রেশার নেই। আর ঠিক সে-ভাবে হার্টের কোনও অসুখও নেই। যেটা ছিল তাকে লাংস-এর অসুখ বলা যায়। এখন সেটা তো নেই। বুঝতে পারি না অন্তত। এক-আধবার অ্যালার্জি-মতন হয়, নিশ্বাসের কষ্ট থাকে এক-আধ দিন। তারপর যেমন-কে তেমন। …যাকগে, জুড়ন আর কী বলেছে?” গোরা চট করে কিছু বলল না। ভেবেচিন্তে আমতা-আমতা করে বলল, “ও বলছিল, আপনি অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা বলেন, মানে মনে-মনে অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখেন…।”

    মতিলাল গোরার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কথা শুনছিলেন। গোরা চুপ করে যাবার পর কিছুক্ষণ কোনও কথা বললেন না উনি। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, আমি দেখি । মানে দেখেছি। অদ্ভুত দৃশ্যই দেখেছি। কিন্তু তোমরা যা ভাবছ, মনে-মনে দেখছি—তা নয়, আমি চোখের সামনেই দেখেছি।”

    “কী দেখেছেন?” অনিল জিজ্ঞেস করল।

    “এখন বলব না। বললে তোমরা ভাববে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। বিকেল হোক। হয়তো সেই পাগলামি এখনও রয়েছে। বিকেলে তোমাদের বলব। তোমরা বুঝতে পারবে, আমি কী দেখেছি।”

    অনিলরা আর কিছু বলল না। বুঝতেই পারল, মতিকাকা এখন কিছু বলবেন না। উঠে পড়ল দুজনে বাগানে ঘোরাঘুরি করল সামান্য। এবার শীতে গোলাপের বাহার মাঝারি। হয়তো আরও সামান্য পরে বাগান ভরে উঠবে। গোবিন্দ মালী কাছাকাছি নেই, থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেত। জুড়নও বাড়িতে নেই। সে সাতসকালে কোথায় বেরিয়ে গিয়েছে সাইকেলে চেপে, ফিরতে বেলা হবে।

    অনিলরা বাগানের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে অমরকে ধরল।

    অমর তার নার্সারি-ঘরে বসে চিঠিপত্র লিখছিল। ফুল বিক্রির হিসেব, টাকার তাগাদা। গোলাপাচারার জন্যেও চিঠি আসে নানান জায়গা থেকে, তার জবাবও লিখতে হয় অমরকে।

    অনিলরা বাইরেই বসল। বাইরে বেঞ্চি পাতা রয়েছে।

    অমর বাইরে এল। বলল, “একটা বিড়ি খেয়ে নিই। তোমরা এসেছ শুনেছি।” বিড়ি ধরিয়ে নিল অমর। “বাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে?”

    “হয়েছে। বাবু যেন কেমন বদলে গিয়েছে, অমরদা।”

    “তাও তো প্রথম দিকে দেখোনি,” অমর রোদে দাঁড়িয়ে হাই তুলে জড়তা ভাঙল। বলল, “প্রথম দু’দিন আমরা বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বাবুকে এখানে রাখাই যাবে না। জুড়নকে আমিই কলকাতায় পাঠিয়েছিলাম। এখানে আমরা কতটুকু কী করতে পারি, বলো। না ডাক্তার, না হাসপাতাল! ভগবানের দয়ায় বাবুর সেই অবস্থাটা কেটে গেল। পরশু থেকে ওঁকে খানিকটা ভালো দেখছি।”

    অনিল বলল, “কী হয়েছিল, ঠিক করে বলো তো?”

    “কী হয়েছিল, তা তো বলা মুশকিল! আমি কাছে ছিলাম না। বাবু বাগানে ছিলেন। গোবিন্দ মালী কাজ করছিল। বিকেল শেষ হয়ে আসছে তখন। মালীর বাগানের কাজও প্রায় শেষ। বাবু—ওই যে পশ্চিম দিকে—যেখানে একটা চৌবাচ্চার মতন করা আছে জল জমিয়ে রাখার জন্যে, দেখেছ তো?”

    দেখেছে অনিলরা চৌবাচ্চা। বাগানে জল দেবার সুবিধের জন্যে এ-রকম চৌবাচ্চা গোটা-দুই আছে। কুয়োতলা থেকে টেনে এনে জল দেবার অসুবিধে বলেই, পুবে পশ্চিমে দুটো বড়-বড় চৌবাচ্চা আছে জল জমিয়ে রাখার জন্যে।

    অমর বলল, “বাবু এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওঁর হাতে একটা বড় কাঁচি ছিল। ডালপালা কাটার জন্যে। হঠাৎ নাকি বাবু ভীষণভাবে চেঁচিয়ে ওঠেন। গোবিন্দ খানিকটা তফাতে ছিল। বাবুর চিৎকার শুনে তাকিয়ে দেখে, বাবু টলছেন। সে ছুটে আসতে-আসতে বাবু বাগানের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অজ্ঞান। ভাগ্যিস কাঁচিটা পড়ে গিয়েছিল হাত থেকে, নয়তো কী যে হতো কে জানে ! ”

    “কাকা মাটিতে পড়েই অজ্ঞান হয়ে যান?”

    “হ্যাঁ। ওঁকে যখন বাড়ির মধ্যে নিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল, তখন ওঁর সমস্ত শরীর কেমন বেঁকে যাচ্ছিল, গায়ের রঙ কালচে হয়ে গিয়েছে। চোখ বোজা, মুখের চেহারাই পালটে গিয়েছে।”

    “মুখে গ্যাঁজলা উঠছিল?” গোরা বলল।

    “না। ঠোঁট, নাক এত নীল হয়ে গিয়েছেল যে, মনে হচ্ছিল পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে।”

    “তারপর?”

    “সারা রাত্তির বাবুর হুঁশ থাকল না। আমরা তাঁকে ঘিরে বসে থাকলাম। সকালের দিকে বাবুর হুঁশ এল। তবে তিনি বিকার বকতে লাগলেন।”

    অনিল বলল, “বিকার? কেমন বিকার?”

    অল্প চুপ করে থেকে অমর বলল, “যা বলছিলেন, তার কোনও মাথামুণ্ডু নেই। একবার বলছেন, গোলাপবাগানের মাথার ওপর আর-একটা গোলাপবাগান; একবার বলছেন—সমস্ত গোলাপবাগান ধোঁয়ায়-কুয়াশায় ভরে গিয়েছে; আবার বলছেন—গোলাপগাছগুলো লম্বায় তালগাছের মতন হয়ে গিয়েছে। এই রকম কত কী যে বলে যাচ্ছিলেন তার ঠিক নেই । ”

    “শুধু বাগান নিয়েই বলছিলেন?” অনিল জিজ্ঞেস করল।

    “তা বলা যায়। বাগান পুড়ে যাচ্ছে, মাটি গলে যাচ্ছে, ছারখার হয়ে গেল সব—এই রকম বলতে—বলতে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন।”

    গোরা অনিলকে বলল, “ব্যাপারটা বাগান নিয়েই মনে হচ্ছে!”

    অনিল মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। …জুড়ন তোকে কী বলেছে?”

    “বাগানের কথাই বলেছে। তবে জুড়ন বলছিল, মতিকাকা নাকি মানুজনও দেখেছেন।” অমর বলল, “বলেছেন হয়তো, তবে সেটা ধতবের মধ্যে নয়। জুড়ন আবার ভিতু গোছের। তার কথা, বাবুকে ভূতে ভর করেছে। ওর কথা বাদ দাও, ও খানিকটা রঙ চড়িয়ে বলেছে তোমাদের কাছে, আমি তোমাদের বলছি, বাবু প্রথম দু’দিন ভুলভাল বলেছেন, বিকার বকেছেন। তাঁর শরীর খুব খারাপ গিয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করেননি, ঘুম ছিল না। বাবু একটা ভয় পেয়েছেন। কিসের ভয়, তা বাবু আমি জানি না। এই দু’দিন উনি অনেকটা ভালো আছেন। তবে বারবার বলছেন, এই বাগান আর রাখবেন না। নষ্ট করে দেবেন।”

    অনিল আর গোরা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

    গোরা বলল, “এই বাগান নষ্ট করার কথা সেই ঘটনার পর মাথায় এল, না, আগেই এসেছে?”

    “আগে? না, একবারও নয়। বরং বাবু মাঝে বলছিলেন, বাগান আরও খানিকটা বাড়াবেন। এবারে গোলাপ-চাষ এখনও পর্যন্ত ভালো হয়নি। পুজোর পর আট-দশ দিন হঠাৎ বৃষ্টি নামল জোরে, মাটি আরও ভিজে গেল, শুকোতে পেল না। বোধ হয় গোলাপের ক্ষতিই হয়েছিল বৃষ্টিতে। তবে এখন রোদে মাটি টানছে। মাঘের দিকে ফুল ভালো হবে।”

    অনিল বলল, “তোমরা বাগানের কোনও অদলবদল দেখেছ?” “অদলবদল? না। যেমন বাগান তেমনই আছে।”

    ওই যে পুলিনবাবু, তোমাদের ডাক্তার, উনি কী বলেছেন?”

    “ওঁর কথা বাদ দাও। একবার বলেন মৃগী, একবার বলেন পক্ষাঘাত, আবার বলেন মাথার গোলমাল।”

    গোরা হাত তুলে প্রসঙ্গটা থামিয়ে দিল। অনিলকে বলল, “চল একবার বাগানে যাই।”

    অনিল পা বাড়াল।

    বাগানের দিকে যেতে-যেতে গোরা বলল, “ব্যাপারটা বাগান নিয়ে। তুই কী বুঝছিস?”

    “কিছুই বুঝছি না ভাই। আমার তো মাথায় আসছে না—মতিকাকা কেমন করে দু’ দুটো বাগান দেখছেন, তাও একটার মাথায় অন্যটা। দ্বিতীয় বাগানটা কি শূন্যে ঝুলছে? আর গোলাপ গাছ বেড়ে তালগাছের মতন লম্বা হয়ে গেছে—এটাই বা উনি কেমন করে দেখেন! চোখের দোষ, মানে চোখের কোনও ব্যাধি হল, না মাথার, কে জানে!” গোরা বলল, “বাগানের ওপর হঠাৎ এত রাগই বা কেন হল কাকার যে, বাগান পুড়িয়ে নষ্ট করে দেবেন বলেছেন?”

    “আমার মাথায় ঢুকছে না।”

    “দেখি, কাকা কী বলেন। তাঁর মুখ থেকে ব্যাপারটা শুনি। যদি কিছু বুঝতে পারি।” অনিল কোনও কথা বলল না।

    পাঁচ

    বিকেলের দিকে মতিলাল নিজেই ডাকলেন গোরাদের। তখনও আলো মরে যায়নি, ফিকে ও নিস্তেজ হয়ে এসেছে।

    অনিলরা স্নান-খাওয়া সেরে সেই যে গায়ে কম্বল চাপিয়ে ঘুম দিয়েছিল, উঠল বিকেল পড়ার মুখে। গা জুড়ে আলস্য, হাই উঠছিল। শীতের দিন বেলা পড়ে যাবার পর যেন ঠাণ্ডা আরও জড়িয়ে ধরে। চোখ-মুখ ধুয়ে দু’জনেই মতিলালের ঘরে হাজির হল।

    মতিলাল বললেন, “চা খেয়েছ?”

    মাথা নাড়ল গোরা।

    “চা আনছে।…বোসো।”

    বসল দু’জনে। মতিলালের ঘরটি বড়। শোওয়া-বসার ব্যবস্থা ছাড়াও নানান ছোটখাটো আসবাবে ঘরটি ঠাসা। জিনিসত্র রয়েছে বিভিন্ন ধরনের। বইয়ের একটা আলমারিও একপাশে। আলমারির ভেতরে, মাথায় গুচ্ছের বই এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।

    মতিলাল বললেন, “তোমরা চা খেয়ে নাও, তোমাদের নিয়ে বাগানে যাব।” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “আমি যা দেখেছি, তোমরা যে আজ সেই দৃশ্য আবার দেখবে, আমার মনে হয় না। আমি গতকালও একবার গিয়েছিলাম, দেখতে পাইনি। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আবার একদিন ওই দৃশ্য দেখব না। কিংবা অমন অদ্ভুত কাণ্ড ঘটবে না।”

    অনিলরা কথা বলল না। মতিকাকার মুখ থেকেই সব শোনা ভালো। যতক্ষণ না শোনা যায়, ততক্ষণ চুপ করে থাকাই ভালো।

    চা নিয়ে এল ঠাকুর।

    মতিলাল তাগাদা দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। বিকেল ফুরিয়ে গেলে চলবে না। যে-সময় ঘটনাটা আমি ঘটতে দেখেছি, সেই সময়ে তোমাদের ওখানে নিয়ে যেতে চাই। আমি কিন্তু তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি, আমার গোলাপবাগান এখন বিপদের ব্যাপার হয়ে রয়েছে। তোমরা যদি না-চাও, যেও না।”

    অনিল বলল, “আমরা যাব। বিপদ আমাদের গিলে ফেলবে না। আপনারা সবাই রয়েছেন এখানে। বিপদ তো আপনাদেরও।”

    “বেশ। তা হলে তাড়াতাড়ি চা খেয়ে নাও।”

    অনিলরা যত তাড়াতাড়ি পারে চা শেষ করল। প্যান্ট শার্ট পুলওভার তারা আগেই পরে নিয়েছে, যা শীত।

    অনিল আর গোরাকে নিয়ে মতিলাল বাগানে চললেন।

    তখন আর বাগানে রোদ বলে কিছু নেই। খুব পাতলা এক আলোর রেশ আকাশের তলায় ছড়িয়ে রয়েছে। গোধূলিবেলার মতন লাগছিল। কনকনে বাতাস দিচ্ছে উত্তর থেকে।

    মতিলাল বাগানের পশ্চিম দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর পাশেই এক জলের চৌবাচ্চা। সামনে গোলাপঝাড়।

    মতিলাল একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “সেদিন মোটামুটি এইরকম সময় আমি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি…ওই যে গোলাপগাছটা দেখছ…ওই যে লাল গোলাপগাছটা …ওই গাছের কয়েকটা ডাল ছেঁটে দেবার জন্যে কাঁচি হাতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, ডালগুলো আজই ছাঁটব, না আরও একটু বাড়লে ছাঁটব। এমন সময় আমার মনে হল, হাওয়ার ঝাপটায় যেন গা কেমন দুলে উঠল। বুঝতেই পারছ, এখন শীতের বাতাস কনকন করে ছোটে। যেমন আজ ছুটছে। কিন্তু এই হাওয়া তো ঝড় নয় যে, আমায় ঠেলে ফেলে দেবে!…আমি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আবার যখন গোলাপগাছটার দিকে তাকিয়েছি…দেখি ওই গাছের মাথার ওপর কেমন এক ফিকে নীলচে আভা। আমি যদিও বলছি ফিকে নীলচে আভা, তবু রঙটা যে ঠিক কেমন তা বোঝাতে পারব না। উনুনের আঁচ ওঠার পর যেমন আগুনের একটা গনগনে ভাব উনুনের ওপর দেখা যায়, প্রায় ওই ধরনের খুব ফিকে এক আভা গোলাপগাছের মাথায়। তারপর দেখি, সেই আভার ওপর একটা গাছ ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অবিকল ওই গোলাপগাছটার মতন। চোখের ভুল ভেবে আমি এপাশ-ওপাশ তাকালাম। তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। এপাশ-ওপাশের গাছগুলো মাথার ওপরেও অবিকল সেই একই রকম দৃশ্য। দেখতে-দেখতে এই বাগানের মাথার ওপর আর-একটা বাগান…ঠিক এইরকম, অবিকল এই রকম বাগান ভাসতে থাকল। গোটা বাগান কি না, তা আমি বলতে পারব না, কেননা তখন আমার এমন অবস্থা যে, চারদিকে তাকিয়ে কী দেখেছি, তা আমার খেয়াল নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, বাগানের অনেকটাই শূন্যে ভাসছিল।” গোরা আর অনিল মতিকাকার কথা শুনছিল অবাক হয়ে। তাদের চোখের পলক পড়ছিল না।

    মতিলাল যেন দম নিলেন সামান্য। তরপর বললেন, “চোখের ভুল ভেবে আমি প্রথমটায় ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্ত তার পরেই দেখি, গোলাপগাছগুলো মাথার দিকে বেড়ে যাচ্ছে, লম্বা হয়ে যাচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি এমন অদ্ভুতভাবে সেগুলো লম্বা হতে লাগল যে, মনে হল এগুলো আকাশের দিকে উঠে যাবে। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আমার শরীরের মধ্যেও কেমন-কেমন করতে লাগল। একরাশ কুয়াশা যেন ভেসে আসতে লাগল চারদিক থেকে। আমি ভয়ে চিৎকার করেছিলাম কিনা মনে নেই। তখনই হয়তো অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাই।”

    মতিলাল থেমে গেলেন।

    অনিলরা কিছুক্ষণ মতিলালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বাগানের দিকে তাকাল। মতিকাকা যা বললেন, তা বিশ্বাস করা যাবে না, তারা কোনও হেরফের দেখছে না বাগানের।

    অনিল বলল, “আপনি এ-রকম ঘটনা আর ঘটতে দেখেছেন? মানে এই বাগানে আর ঘটেছে?”

    মাথা নাড়ালেন মতিলাল। “না। আগে এমন দৃশ্য আমি দেখিনি। শরীরটা সামলে নিয়ে আমি গতকালও একবার এই সময় এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কিছুই চোখে পড়েনি। যা দেখেছি, ওই একদিনই।”

    গোরা বলল, “আপনি সেদিন অসুস্থ ছিলেন না তো?”

    “না। একেবারেই নয়। পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিলাম। বরং তোমাদের বলি, ওই দৃশ্য যখন দেখছিলাম, তখন আমার শরীরের মধ্যে ভীষণ এক কষ্ট হচ্ছিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, শরীরের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে যাবার মতন লাগছিল, মাথা ভার, অবশ হয়ে আসছিল। সোজা কথায় আমার শরীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত কিছু ঘটে যাচ্ছিল।”

    বিকেলের আলো পালিয়ে গেল। ছাঁয়ামেশানো অন্ধকার নামছে। অনিল একবার আকাশের দিকে তাকাল। চোখ নামিয়ে বলল, “আপনার শরীর এখন ভালো?”

    “কাল থেকে অনেকটাই ভালো। তার আগের দু’দিন আমি আমাতে ছিলাম না।” গোরা বলল, “এখন কি আপনি পুরোপুরি সুস্থ?”

    “না। ভেতরে দুর্বলতা রয়েছে। মাঝে-মাঝে হাত-পা কেঁপে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টিটাও থেকে-থেকে ঝাপসা হয়ে আসছে।”

    মতিলাল আর বাগানে দাঁড়াতে চাইলেন না, বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। গোরারাও ওঁর পেছন পেছন চলল।

    “এ-রকম কেন হল, আপনি কিছু বুঝতে পারছেন?” অনিল জিজ্ঞেস করল। মতিলাল মাথা নাড়লেন। “না। বুঝতে পারলে তো স্বস্তি পেতাম। আমি কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। তবে চেষ্টা করছি।”

    “চোখের ভুল বা শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে যাবার জন্যে নয়?”

    “না না, একেবারেই তা নয়। নিতান্ত চোখের ভুল অতক্ষণ থাকতে পারে না। নিমেষের জন্যে চোখের ভুল হয়। আমি যা দেখেছি তা দু’এক পলকের ব্যাপার নয়।”

    “কতক্ষণ দেখেছেন ?”

    “বলতে পারব না। সময়ের হিসেব থাকে না তখন। তবে পাঁচ-সাত মিনিট নিশ্চয়।” “আর কেউ দেখেনি? গোবিন্দমালী তো কাছেই ছিল।”

    “গোবিন্দ একেবারে কাছে ছিল না। সে খানিকটা তফাতেই ছিল। মাটিতে সার মেশাচ্ছিল। তার নজর ছিল না।”

    “গোবিন্দরও কি শরীর খারাপ হয়েছিল?”

    “খানিকটা হয়েছিল। কম। তার মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। বমিও করেছে। পরে সামলে নিয়েছে।”

    অনিলরা আর কিছু বলল না।

    ছয়

    মতিকাকার কাছে দুটো দিন কাটল অনিলদের। এই দু’দিনে নতুন কিছু ঘটেনি। একটা জিনিস তারা লক্ষ করছিল। প্রথম এসে মতিকাকাকে যত বিচলিত দেখেছিল, বা তাঁর শরীর যতটা খারাপ দেখেছিল, এখন যেন তার চেয়ে কম দেখাচ্ছে। বোধহয়, নিজেকে সামলে নিয়েছেন অনেকটা। এমনও হতে পারে অনিলরা কাছে থাকায় তিনি সাহস ও পাচ্ছেন কিছুটা। রোজই বাগান নিয়ে কথা বলেন, আলোচনা করেন, কেন অমন অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল—তা নিয়ে মাথা ঘামান। তবে একটা বিষয় মতিকাকা প্রায় মনঃস্থির করে ফেলেছেন। এই বাগান আর তিনি রাখবেন না। নষ্ট করে ফেলবেন।

    মতিকাকার বাগানের লোকরা বেশ মনমরা হয়ে পড়েছে। বাগান যদি নষ্ট করে ফেলা হয়, তাদের কী গতি হবে! তাদের ধারণা, বাবু যা দেখেছেন, ভুল দেখেছেন । একবার ভুল করে কী দেখেছেন, তার জন্যে এমন বাগান কেউ নষ্ট করে! কত পরিশ্রম করে তৈরি করা হয়েছে এই গোলাপবাগান। অমর বলছিল, “তোমরা বাবুকে বুঝিয়ে বলো, এ একেবারে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা হচ্ছে। আমরা এতগুলো লোক বহাল তবিয়তে আছি, বাবুই শুধু ভয় পাচ্ছেন।”

    সেদিন সন্ধেবেলায় মতিকাকার ঘরে বসে গোরারা কথা বলছিল। কথায়-কথায় অনিল বলল, “আপনি এত তাড়াতাড়ি বাগান নষ্ট করবেন না, কাকাবাবু।”

    মতিলাল তাকালেন, কথা বললেন না।

    অনিল বলল, “যা ঘটেছে, একবারই ঘটেছে। আবার যদি ঘটে তখন না হয়…’ “আবার ঘটবে এমন কথা নেই,” মতিলাল বললেন, “ঘটবে কি না-ঘটবে তা নিয়ে আমি ভাবছি না, আমি ভাবছি—পরিণাম।”

    গোরা আর অনিল মুখ চাওয়া-চওয়ি করল।

    খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মতিলাল বললেন, “আজ ক’দিন আমি অনবরত ভাবছি। ভাবছি আর ভাবছি।” বলে তিনি আঙুল দিয়ে কয়েকটা বইপত্র দেখালেন। বললেন, “তোমরা জানো, আমার নানা ধরনের বই পড়ার অভ্যেস আছে। পেশায় আমি কেমিস্ট ছিলাম। সে পেশা ছেড়েছি অনেক কাল আগে। তবে বইপত্র ঘাঁটি নানা জাতের। আমি যা দেখেছি, তার একটা মাত্র যুক্তি আমি খাড়া করতে পেরেছি। সে-যুক্তি নড়বড়ে, ধোপে টিকবে কিনা জানি না।”

    অনিলরা কৌতূহল অনুভব করল। কাকা যে কোনও যুক্তি খাড়া করতে পেরেছেন, তারা জানত না। উনি কিছু বলেননি।

    গোরা বলল, “কী যুক্তি?”

    মতিলাল বললেন, “কতকগুলো জিনিস আছে, আদি জিনিস, যার ভালোমতন জবাব আজও দেওয়া মুশকিল। ওপর-ওপর তার জবাব আছে, খুঁটিয়ে দেখলে রহস্যময় মনে হয়। যেমন মাধ্যাকর্ষণ বা গ্র্যাভিটি। মাধ্যাকর্ষণের মূল রহস্যটাই আমরা এখনও জানতে পারিনি। এই রকম আর এক রহস্য হল—ম্যাগনেটিক ফিল্ড। এর সম্পর্কে প্রত্যেকটি প্রশ্নের খুঁটিনাটি জবাব হয় বলে অনেকেই মানেন না।”

    অনিল বলল, “এই বাগানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?”

    “বোধহয় আছে। আমার যা মনে হয়েছে, বলছি। আমি কখনও বলব না, আমি যা বলছি তা সত্যি। আমি আমার অনুমানের কথা বলছি।”

    গোরা মাথা হেলাল, “বলুন।”

    “এই বাগানটার কথা এবং যে-সময়ে আমি ওই অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছি তার কথা এবার ভাবো। তখন পড়ন্ত বিকেল, মানে বিকেল শেষ হয়েছে প্রায়, আকাশে ফিকে আলো রয়েছে শীতের। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটা জলভরা বড় চৌবাচ্চার কাছে। আমার সামনে গোলাপগাছের ঝাড়। বুঝতে পারছ?”

    “পারছি।”

    “ধরো, যদি এমন হয়…আমি যখন গোলাপগাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ঠিক তখন ওখানে আচমকা একটা ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয়েছিল। তোমরা কি জানো, ম্যাগনেটিক ফিল্ড ইনটেনসিফায়েড হলে অনেক কিছু হতে পারে।”

    “না,” অনিল মাথা নাড়ল। “ম্যাগনেটিক ফিল্ড জানি। ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ড জানি না।”

    “ব্যাপারটা তো তোমাদের বোঝানো যাবে না। তবু বলি, ম্যাগনেটিক ফিল্ড, বা চৌম্বকক্ষেত্র—যদি সাধারণ বা স্বাভাবিকের বেশি হয়ে ওঠে তাকে ইনটেনস বলতে পারো। অবশ্য এই ইনটেনসেরও মাত্রা আছে। যেমন গরমের থাকে, উনুনের তাত আর চুল্লির তাত ভেবে নাও।”

    “এটা কেমন করে হয়? মানে ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ড?”

    “জানি না। আমি জানি না। বিজ্ঞনীরা কলাকৌশল করে করতে পারেন পড়েছি। আবার প্রকৃতির খেয়ালেও হয়। ম্যাগনেট কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু এই প্রাকৃতিক শক্তিটির অনেক বিষয় আমরা আজও জানি না। এটি একটি রহস্যময় শক্তি।”

    অনিল বলল, “আপনি যা চোখে দেখেছেন, তার সঙ্গে ওই ফিল্ডের সম্পর্ক কী?” “বলছি। তার আগে বলি, তোমরা মরীচিকা বা মিরাজ কেন হয় জানো?” “মরুভূমিতে হয়।?”

    “শুধু মরুভূমিতে নয়, পাহাড়ের মাথা থেকে নীচে তাকালেও দেখা যায়; সমুদ্রেও হয়। কেন হয়?”

    “মরুভূমিতে হয় তেতে ওঠা বালির জন্যে।”

    “হ্যাঁ—তবে সবটা বললে না। মিরাজ বা মরীচিকা হল প্রকৃতির একটা ট্রিক বা চালাকি। আবহাওয়ার মধ্যে কতকগুলো ব্যাপার থাকা দরকার; না থাকলে মিরাজ হয় না। প্রথমেই ধরো, আমরা যা দেখি, যে-কোনও জিনিস, তা দেখা সম্ভব হতো না, যদি না সেই জিনিস থেকে আলোর রশ্মি প্রতিফলিত হতো, হয়ে আমাদের চোখে এসে পৌঁছত। এখন এই আলোর রশ্মি আমাদের চোখে কেমন করে আসে? সাধারণত স্ট্রেট লাইনে।”

    অনিল ঘাড় নাড়ল। “মরুভূমিতে মরীচিকা দেখা যায়—দিনের বেলার উত্তপ্ত বালির জন্যে।”

    “হ্যাঁ, বালি অসম্ভব গরম হয়ে ওঠার জন্যে নীচের দিকে…মানে মাটিই বলো এখানে…বাতাস তপ্ত হয়ে থাকে। এই গরম বাতাসের স্তর একরকম আয়নার মতো কাজ করো। এখন কী হয় জানো? অনেক দূরের…দিগন্তের কোনো অবজেক্টের আলো এসে এই ‘আয়নার’ ওপরে পড়ে…সেই জিনিসটার ছবি প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। আসলে বলতে পারো, গরম বাতাস আয়নার মতন কাজ করছে বলেই এই মিরাজ। আলোর রেখাও কিন্তু গরম বাতাসে বেঁকে যায়।”

    গোরা কেমন অবাক হয়ে মতিকাকাকে দেখছিল। তার মাথায় ঢুকছিল না—কাকা মিরাজের কথা কেন তুলেছেন।

    মতিলাল বললেন, “মরুভূমির কথা থাক। এবার সমুদ্রের কথা বলি। সমুদ্রেও মরীচিকা দেখা যায়; মিরাজ। সমুদ্রের বেলায় অবস্থা পাল্টে যায়। জলের ওপরকার বাতাস ঠাণ্ডা, যত ওপরে ওঠা যাবে—বাতাস তত গরম। দূরের কোনও জাহজের গা থেকে আলোর ঢেউ এসে সেই গরম বাতাসে লাগলে তার যে প্রতিফলিত ছবি আমরা চোখে দেখব, তা কিন্তু জলে দেখব না, দেখব শূন্যে।”

    অনিল বলল, “আপনি কি তাই দেখেছিলেন?”

    মতিলাল যেন হাসবার চেষ্টা করলেন। বললেন, “একটা অদ্ভুত কথা বলি তোমাদের। সিসিলির নাম শুনেছ নিশ্চয়, ইটালি…সিসিলি। সেই সিসিলিতে স্ট্রেট অব মেসিনাতে এইরকম এক জগৎ-বিখ্যাত মিরাজ দেখা যায়। পুরো মেসিনা শহরটাকে আকাশে ঝুলতে দেখা যায়। ইটালিয়ানরা একে বলে Fata Morgana। আগেকার লোকরা ভাবত, মরগান লে ফে বলে একজন অপদেবতা এই কাণ্ডটি করেছিল। অবশ্য আজ সবাই জানে, ওটা অপদেবতার কাজ নয়, প্রকৃতির চালাকি।”

    গোরা বলল, “আপনার বেলাতে একই কাণ্ড ঘটেছে?”

    মতিলাল মাথা দোলালেন। “আমার তাই অনুমান। যুক্তি হিসেবে আমার মাথায় আর কিছু আসছে না।”

    “আপনি যে ম্যাগনেটিক ফিল্ডের কথা বলছিলেন?”

    “হ্যাঁ। ঘটনাটা এইভাবে ঘটেছে বলে আমার ধারণা,” মতিলাল বললেন, “সেদিন, যে-কোনও কারণেই হোক, ওই জায়গায়…আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার আশেপাশে একটা ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয়েছিল। আর ওই একমাত্র কারণে বাতাস অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠেছিল। বাগানের মাটির দিকটা ছিল অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা, ওপরের দিকে যত স্তর ছিল—বায়ুস্তর—সেগুলো ভীষণ গরম হয়ে উঠেছিল। তপ্ত সেই বায়ুস্তর আয়নার মতন কাজ করছিল। যার ফলে আমি একটা মিরাজ দেখেছি। আর বাগানের ছবিটা যে আসল বাগানের মাথার ওপর দেখেছি, তার কারণও ওই, ওপরের দিকেই মিরাজ হয়েছে। অবশ্য যে-মিরাজ আমি দেখেছি, সেটা সোজা ছিল। এ-ক্ষেত্রে হওয়া উচিত ছিল উল্টো সোজা কেন হল, তার জবাব আমার জানা নেই। বোধহয় ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ডের জন্যে।’

    “আপনার শরীর অসুস্থ হল কেন?”

    “আমি সেই ইনটেনস ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মধ্যে ছিলাম। আরও বেশি খারাপ হতে পারত। হয়নি, এ আমার সৌভাগ্য।”

    “গোবিন্দ মালীর বেলায় কিছু হল না কেন?”

    “গোবিন্দ আমার গায়ের কাছে ছিল না। সে খানিকটা তফাতে ছিল। ধরো চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ। মাটিতে বসে-বসে সার মিশিয়ে তৈরি করে রাখছিল। সে মুখ তুলে তখন তাকায়নি। সে ঠাণ্ডার মধ্যে ছিল। পরে যখন সে উঠে আমার কাছে আসে, তখন বোধহয় ম্যাগনেটিক ফিল্ড হালকা হয়ে যাচ্ছিল। তবু তার শরীর খারাপ হয়েছে।”

    গোরা আর অনিল চুপ করে থাকল। তারা বোধহয় তখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি ভালো করে।

    অনিল বলল, “আপনি যা বলছেন, এটাই একমাত্র যুক্তি?”

    “না, না। আমি বারবার বলেছি, আমার বুদ্ধিমতে যতটা পেরেছি, একটা কারণ বার করার চেষ্টা করেছি। আমার যুক্তি ভুল হতে পারে।”

    “তা যদি হয়, মরীচিকাই হয়, আপনি এই বাগান নষ্ট করতে চাইছেন কেন?” “চাইছি একটা মাত্র কারণে।…যে যাই বলুক, এই বাগানের কোথায় কী ঘটে গিয়েছে আমরা জানি না। যদি কোনও ক্ষতি হয় ভবিষ্যতে, আমি তো কিছু করতে পারব না।”

    “তেমন ক্ষতি হতে পারে?”

    “পারে, নাও পারে। কেমন করে বলব?”

    “এরা যে বাগান নষ্ট করতে দিতে চাইছে না?”

    “আমিও কি চাই! আমার নিজের হাতে গড়া গোলাপবাগান। কিন্তু কী করব, বাবা! …দেখি, আরও ক’দিন ভেবে দেখি।”

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleসাম্প্রদায়িকতা – বদরুদ্দীন উমর
    Next Article বিমল কর সাহিত্যের সেরা গল্প

    Related Articles

    বিমল কর

    কাপালিকরা এখনও আছে – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    রাজবাড়ির ছোরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    ঘোড়া সাহেবের কুঠি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    সেই অদৃশ্য লোকটি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ ও কিকিরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    কিকিরা সমগ্র ১ – বিমল কর

    October 30, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }