নাস্তিক – সৌমিত্র বিশ্বাস
নাস্তিক
জয়দীপের পিসেমশায়ের নাকি অলৌকিক ক্ষমতা জন্মেছে। যাকে যা বলছেন সব মিলে যাচ্ছে।
প্রথমে ভেবেছিলুম জয়দীপ ইয়ার্কি মারছে। তারপরে বিস্তারিত শুনে আমি থ! শেষপর্যন্ত ওর পিসেমশাই? ফিজিক্সের দিকপাল অধ্যাপক!
পিসিমা চলে যাবার পর নাকি উনি চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিয়ে কোন এক অঘোরীবাবা না কার কাছে তন্ত্রসাধনা শুরু করেছিলেন। অঘোরী কাদের বলে? ভেবেছিলুম বড়ো জেঠুকে জিজ্ঞেস করব। উনি এসব ব্যাপারে অথরিটি। তারপর ভুলে গেছি।
যাই হোক, পিসেমশাই নাকি এক অতি অলৌকিক শক্তিকে নামিয়ে এনেছেন আর তার সাহায্যে যা খুশি তাই করতে পারছেন। অন্তত লোকের যা মত।
প্রবল কৌতূহলে ওঁকে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। জয়দীপ কিছুতেই ভিতরে ঢুকল না।
‘পাশের বাড়িতে থেকে আমরা দিনরাতই ওর ওই পাগলামি দেখছি। তুই যা।’
‘গিয়ে কী বলব?’
‘তোকে কিচ্ছু বলতে হবে না। পাগলা নিজেই বকবক শুরু করবে দেখবি।’
ভেতরে ঢুকতেই পিসেমশাই আধবোজা চোখ করে বলেছিলেন, ‘তোমার জীবনে একটা অভিনব ঘটনা ঘটতে চলেছে।’ স্পষ্টতই প্রথম থেকেই ভড়কি মেরে ইমপ্রেস করার বহুচর্চিত প্রচেষ্টা। শেষে আমাকেও?
ওঁর বড়ো বড়ো জটা, টকটকে লাল আলখাল্লা, একমুখ দাড়ি, রুদ্রাক্ষ আর কীসের সব হাড়ের মালাকে পাত্তা না দিয়ে বলেছিলুম, ‘সে ঘটুক গে। ঘটনা তো ঘটেই থাকে।’
‘কিন্তু তোমার যেটা ঘটতে চলেছে, তা খুবই দুর্লভ।’ ইমপ্রেস করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা।
আসনের পাশে একখানা খুলি, উলটো করে রাখা ক-টা মদের বোতল। বাঃ, কোনো গুণেরই কমতি নেই দেখি। মড়ার খুলি বাড়িতে রাখা বেআইনি না? ভাবতেই পারছি না যে, ছাত্রমহলে অসম্ভব জনপ্রিয় এই লোকটা এক সময়ে আমাদের আদর্শ ছিলেন।
বন্ধুর পিসেমশাই বলে আগেই চিনতুম, কিন্তু পরে কলেজে ঢুকে ওঁর সান্নিধ্যে এসে আরও বহু ছাত্রের মতো আমিও ফ্যান হয়ে পড়লুম। সে এক দিন গেছে। ক্লাসের শেষে উনি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে চলেছেন, ফিজিক্স ছাড়াও অন্য বহু বিষয়েই ওঁর ঈর্ষণীয় পাণ্ডিত্য শুনতে শুনতে আমরা ভাবছি এটাই শেষ কথা। আর কিছু বলার থাকতেই পারে না। সেই মানুষটা আজ সস্তা ভড়কি মেরে আমাকে ইমপ্রেস করতে চাইছেন!
সেই যা দেখা। যদিও বহুদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না, তবু কেন জানি না, আজ দুপুরে ওঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে উপেক্ষা করতে পারলুম না। মনে হল এক বার শেষবারের মতো দেখেই আসি। কতক্ষণই বা লাগবে! শোকতাড়িত না হয়েও চলে এলুম। কেন, কে জানে?
শ্মশানে পৌঁছে দেখি আমরা চার নম্বরে। আরও দুটো বডি অলরেডি চুল্লিতে রয়েছে। জয়দীপ, ওর বাবা আর এক কাকা বডির সঙ্গে এসেছেন। আমি আর শান্তনু ভাস্করের গাড়িতে। বাড়ি থেকে এখনও অবধি আর কেউ এসে পৌঁছয়নি, বা আসেনি। কেউই বোধ হয় শোকাহত হয়নি। আসলে তো উনি নিজেই কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি, তাই আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে তেড়ে বৃষ্টি। মাঝে মঝে একটু ধরলেও থামার কোনো লক্ষণ নেই। কাজেই আর ক-জন আসবে বা কেউ আসবে কি না সন্দেহ থেকে যায়।
জয়দীপের মুখে একরাশ বিরক্তি। স্বাভাবিক, এই বৃষ্টিতে আর কার ইচ্ছে করে আসতে? কিন্তু যেহেতু পিসেমশাই নিঃসন্তান এবং ওঁর নিজের দিকে আর কোনো আত্মীয় নেই, তাই সম্পর্কটা আলগা হলেও বাধ্য হয়েই ওকে মুখাগ্নি করতে হবে।
‘দীপু আর ভাস্কর জয়ের সঙ্গে থাক, আমরা ফর্মালিটিগুলো সেরে আসি’, বলে বাবা আর কাকা শান্তনুকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বৃষ্টিটা আপাতত একটু ধরেছে। আমরা খাটের পাশে বসে পড়লুম। আগে আরও যে তিনটে ডেডবডি তাদের সামনেও খুব বেশি লোকজন নেই। দু-একজন করে বসে রয়েছে। সিমেন্টের বেঞ্চিগুলো সবকটা ভিজে। কোণের দিকে পরিত্যক্ত দুটো গদির ওপরে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা পাঁশুটে বেড়াল। তিন-চারটে ডোমেদের শিশুসন্তান ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। মৃত্যু দেখে দেখে ওরা অভ্যস্ত।
‘আপনি এগুলো কী শুরু করেছেন? এককালে না আপনিই এসবের ঘোর বিপক্ষে ছিলেন?’ আমার প্রশ্নের উত্তরে সেদিন উনি মুচকি হেসে চুপ করে বসেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘দৈব যাহারে সহসা বুঝায় সে ছাড়া যে কেহ বুঝে না কভু!’
দৈব? এই লোকটা বলছে? এর বাকবিস্তারেই না মোহিত হয়ে আমি এবং আরও অনেকেই নিরীশ্বরবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ি। এর কাছেই না আমাদের মার্কসিয় দর্শনে হাতেখড়ি! সেই বাকপটুত্ব কোথায়? যত সস্তা ভাঁওতাবাজি!
‘ওঃ যা বৃষ্টি, কাল ভোগাবে মনে হচ্ছে। আবার শালা জল জমবে,’ বলতে বলতে ভাস্কর উঠে দরজার কাছে দাঁড়াল। বাইরের দিকে ঘাড় বের করে কী দেখল, তারপর ইশারা করতে জয়দীপটাও উঠে গিয়ে দাঁড়াল ওর পাশে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দু-জনে কী গুজগুজ করল, তারপরে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে দেখে আমাকে বলল, ‘দীপু তুই বোস, আমরা দু-মিনিটের মধ্যে আসছি।’ কিছু বলার আগেই দুই মক্কেল বেরিয়ে গেল।
আমি তাকালুম পিসেমশাইয়ের দিকে। আমার সঙ্গে শেষ কথোপকথনটা খুব তিক্তভাবে শেষ হয়েছিল। দোষটা অবশ্য এক হিসেবে আমার। বার বার ওই ভাঁওতাবাজি শুনতে শুনতে বোর হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলুম, ‘আপনি যে অলৌকিক শক্তিকে এনেছেন বলছেন, তিনি কি ভগবান?’
উত্তরে চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ‘ভগবান বলতে চাইলে বলতে পার, ক্ষতি নেই।’
বাঃ! অসাধারণ! এই লোকটাই না বলেছিল যে, বিজ্ঞানে যা প্রমাণিত নয়, তা কখনো ঘটতে পারে না। একটু উষ্মার সঙ্গেই বললুম, ‘তার মানে তিনি ভগবানও হতে পারে আবার জাম্বুবানও হতে পারেন?’ ভদ্রলোক প্রচণ্ড খেপে গিয়ে, ‘শুয়োরের বাচ্চা দেখবি তোর কি করি?’ বলে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই রক্তাম্বরশোভিত উগ্র মূর্তির সামনে থেকে আমি তখন পালাতে পারলে বাঁচি। দরজার সামনে হোঁচট খেয়েছিলুম মনে আছে।
পিছন থেকে অকথ্য গালাগাল আর অভিশাপ উড়ে আসছিল। জয়দীপ হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘যেমন বোর করতে গিয়েছিলি! দিব্যি নিজের মনে ছিল। এ আর কী? খিস্তির স্টক শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যায়।’
সেই শেষ। তবে কিছু আকর্ষণ ওঁর নিশ্চয় ছিল। নইলে এর পরেও তো মাঝে মাঝেই আমি জয়দীপের কাছে ওঁর খোঁজ করেছি। জয়দীপ বলত, ‘আছে নিজের মনে নিজের পাগলামি নিয়ে। রাত জেগে বসে থাকে, মাঝে মাঝে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়।’
‘হাওয়া হয়ে যায় মানে? কোথায় যায়?’
‘কে জানে কোথায় যায়? ওই অঘোরীবাবার সঙ্গে ভাগে। তোর এত ইন্টারেস্ট কেন? খিস্তি খাবার ইচ্ছে হয়েছে?’
আজকেও দুপুরে যেমন। যখন জয়দীপের এসএমএস-টা পেলুম যে উনি নেই, তখন তো আমি চিফ এডিটরের চেম্বারে। মিটিং চলছে। ক-দিন পরেই আমাদের চ্যানেলের বর্ষপূর্তি, সেইজন্যেই নানা প্রোগ্রাম নেওয়া হচ্ছে, প্রচুর চাপ। কিন্তু তবু আলোচনার মধ্যেই বার বার মনে হচ্ছিল যে, একবার ঘুরে আসা উচিত। অবশ্যই ঘুরে আসা উচিত। শেষপর্যন্ত চিফ এডিটরকে বলে বেরিয়ে এলুম এই বৃষ্টি মাথায় করে। কীসের আকর্ষণ কে জানে। ঠান্ডাটা না লাগলে বাঁচি। তবু বাঁচোয়া যে, কাল রোববার। বেলা অবধি ঘুমনো যাবে!
নাস্তিক, যুক্তিবাদী, আমার একদা শিক্ষাগুরু এবং শেষ অবধি সত্যভ্রষ্ট মানুষটা সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে অসীম প্রশান্তি নিয়ে শুয়ে আছেন। আর বড়ো জোর দু-ঘণ্টা। তারপরে কোথায় ওঁর গুণমুগ্ধ ছাত্ররা আর কোথায় অতি অলৌকিক শক্তি! পরম মমতায় আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলুম। সেই ফাঁকে বুড়িটা কখন ঢুকল টের পাইনি। হঠাৎই একটা চড়া মদের গন্ধে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি ও আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল।
সাদাটে তামাটে মেশানো দড়ি দড়ি মতো চুল, খাড়া বেঁকানো নাক, গায়ের রংটা অদ্ভুত। কালোর দিকে ঘেঁষা, কিন্তু তার মধ্যে একটা নীলচে মতো আভাস রয়েছে। জীর্ণ ময়লা শাড়ি পরনে। ডান হাতে তেমনই নোংরা একটা ঝোলা। ভালো করে দাঁড়াতে পারছে না, সে বয়সের জন্যেই হোক আর মদেই হোক। সবচেয়ে অদ্ভুত লাগল ওর কাঁধের দিকে তাকিয়ে। কাক যে কেউ পোষে, তাইই আমার ধারণা ছিল না। তার ওপরে আবার একটা সাদা। সত্যি কত রকম পাবলিক যে আছে! কে এটা? হয় পাগল, নয় ওই ডোমেদের কেউ। বাচ্চাগুলোকে ডাকতে এসেছে। কী চায় পাগলিটা?
ও সোজা প্রথম খাটটার দিকে এগিয়ে গেল। এক জনই বসে আছে পাশে, চেহারায় একেবারে নিম্নবিত্ত ছাপ। ওর সঙ্গীসাথীরা এদিক-ওদিক কোথাও নিশ্চয়ই আছে। বুড়ি এক বার তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখল বডিটা, তারপরে হঠাৎ নিজের ঝোলা থেকে একটা কী বের করে ছড়িয়ে দিল ওটার ওপরে। তারপরে কথা নেই বার্তা নেই খাটটা ঘিরে ঘুরতে শুরু করল। আমার এমনিতেই পাগল দেখলে খুব অস্বস্তি হয়, আমি তাই অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলুম। কিন্তু তবুও বার বার ওর দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। ও পাক খাচ্ছে, বিড়বিড় করে কী বকছে, কিন্তু পাশে বসে থাকা লোকটা কিছুই বলছে না। নির্বিকার। হতে পারে ও হয়তো ওদের বাড়িরই কেউ হবে। কিন্তু আমিই বা ওই পাগলিকে নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছি কেন? দৃশ্যটার মধ্যে একটা কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, আমি ধরতে পারছি না।
কেন যে এলুম এখানে? একগাদা কাজ পড়ে রয়েছে। মিটিং ছেড়ে চলে এসেছি, শেষ অবধি কী ঠিক হল জানতে হবে। কী কী যেন কাজ ছিল? কোথায় একটা যাবার ছিল না? কোথায়? কিছুতেই খেয়াল পড়ছে না। ইতিমধ্যে একটা ছোট্ট শোরগোল।
একটা দাহ শেষ হতে তার লোকজন সব এসে পাশের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। প্রথমটা এবার ঢুকবে। তার লোকজনও এসে গেছে, শেষ বারের মতো বিদায়, কান্নাকাটি, চুল্লি খুলে গেল, ভেতরে গনগন করছে লাল আগুন। এইসব তালেগোলে পাগলিটা কোথায় সটকাল খেয়াল করলুম না। তবে সেয়ানা মাল। দ্বিতীয় বডিটাকে ঘিরেও ঘুরছিল। কিন্তু যেই ওর লোকজন সব এসে গেছে অমনি সটকেছে। এটাও চুল্লিতে ঢুকে গেল। লোকজন সব বেরিয়ে যেতে ঘরটা আবার ফাঁকা আর আরও বেশি শব্দহীন হয়ে গেল। এবার পিসেমশাই দু-নম্বর। এক নম্বরে একটা চিমসে বুড়ো। তার পাশে একটা অল্পবয়েসি ছেলে আর একটা মেয়ে। মেয়েটার মুখে একটা চটক আছে। ছোকরাটাকে ওর পাশে মানাচ্ছে না।
হঠাৎ একটা তীব্র আর্তনাদ। ওই যে বেড়ালটা ঘুমোচ্ছিল সেটাই আর্তনাদ করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। যেন কোনো কারণে খুব ভয় পেয়েছে।
পাগলিটা আবার উদয় হয়েছে। এত আকস্মিকভাবে যে, মনে হল যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। এইবারে আমার একটু একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ঘরের ভেতরে দুটো মড়া। আমার সঙ্গে জীবিত বলতে তো ওই চিমসের পাশে বসে থাকা ছেলে-মেয়ে দুটো। তাদের তো কোনো হুঁশ নেই, গল্পই করে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটা পাগলি, কী করবে না-করবে ঠিক আছে! জয়দীপ বা ভাস্করের দেখা নেই।
পাগলিটা আমার দিকে তাকালই না। এগিয়ে এসে চিমসের গায়ে গুঁড়ো ছড়িয়ে বিড়বিড় করে বকবক করতে করতে পাক খেতে শুরু করল। ছেলেটা আর মেয়েটা এতই মশগুল যে, কোনো বিকার নেই। মেয়েটার সেল বেজে উঠতে কাক দুটো ডানা ঝটপট করে উঠল। ফাঁকা ঘরের মধ্যে ডানার আওয়াজটা খুব কানে লাগে। পাগলি ওদের এক বার ছুঁয়ে দিতে আবার ঝিমোতে থাকল। ও সেই ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি চমকে উঠেছি ওর হাসি দেখে। কী বিচ্ছিরি হাসি। ও কি সত্যিই পাগল? কী জ্বলজ্বলে চোখ ওর। কে ও? যেন গোপনতম সব কিছু দেখে নিচ্ছে। এই বয়সেও ঠোঁট দুটো টকটকে লাল, তার পাশ দিয়ে দুটো গজদন্ত বেরিয়ে এসেছে। ডাইনিদের মতো লাগছে। আমার বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। হে ভগবান, এদিকে যেন না আসে। ভয়ানক রাগ হচ্ছে জয়দীপের ওপর। আমাকে বসিয়ে দিব্যি কেটে পড়লি। আর বাড়ির লোকদেরই বা কী আক্কেল। আমার ঘাড়ে মড়া ফেলে রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেলফোনটা বের করলুম, শান্তনুটাই বা কী করছে। এই সময়েই সিগনালটা গেল? ধুত!
বুড়িটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে হাসল। বুক হিম হয়ে যায় সেই হাসি দেখে। আমি সরে গেলুম খাটের পাশ থেকে, ও যা খুশি করে করুক। আমার বাধা দেবার ইচ্ছে বা ক্ষমতা দুটোর কোনোটাই নেই। ওর লাল লাল দুটো চোখ আমার বুক ভেদ করে একদম গভীরে ঢুকছে। আমাকে সরে যেতে দেখেই ও খুব আমোদ পেয়ে বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে দুলে দুলে খলখল করে হাসতে শুরু করল। কাক দুটোও ওর কাঁধের ওপর থেকে কুতকুতে চোখে আমাকে দেখছে। ও যে ঘুরছে আর শব্দ করে হাসছে তাতেও ওই ছেলেটা আর মেয়েটার কোনো বিকার নেই, এতই প্রেম! বুড়ি ততক্ষণে যথানিয়মে পাক খেতে শুরু করেছে। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে আমার মনে হতে লাগল এই বুঝি একটা কিছু ঘটতে চলেছে। অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে চলেছে। পিসেমশাইয়ের দিকে তাকাতে পারছি না। যদি দেখি যে মড়াটা নড়ছে! ঘোরা শেষ করে আমার দিকে ফিরে বুড়ি লম্বা সরু মতো আঙুলটা তুলে বলল, ‘কী রে তোকে একা বসিয়ে রেখে ও দুটো ফুটে গেছে?’ চমকে উঠেছি।
তারপর দেখি শান্তনু। দরজার কাছে জয়দীপের বাবা আর কাকা, সঙ্গে আরও ক-জন।
‘তোদের এত দেরি?’
‘আর বলিস না, এখানে যে লোকটা রেজিস্ট্রি করে সে নেই। বসে আছি তো আছিই। মাল এল দেরি করে। হেভি দেখতে তো!’
শেষ কথাটা ওই মেয়েটাকে লক্ষ করে। মেয়েটা শুনতে পেয়েছে বোধ হয়। আমিও ঘাড় ফেরালুম আর হৃৎপিণ্ড থেমে গেল। মেয়েটা চোখ তুলে আমাদের, বিশেষ করে শান্তনুকে দেখছে। কিন্তু বুড়িটা নেই, ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে গেছে। কীভাবে গেল? আমি আগাগোড়া দরজার দিকে তাকিয়ে কথা বলেছি, এর ফাঁকে বেরিয়ে গেল? টেরই পেলুম না? বুকের ভেতরটা কীরকম করছে।
সব শেষ করে যখন ভাস্করের গাড়িতে ফিরছি ফোনটা বেজে উঠল, ব্রজেনদা।
‘কোথায় থাকিস নট রিচেবল হয়ে? যাক গে শোন, পরশু সকাল সাড়ে পাঁচটায় প্রিয়া সিনেমার সামনে রেডি থাকিস। সারাদিনের প্রোগ্রাম। অতনুকে বলে দিস।’
অতনু আমাদের ফোটোগ্রাফার, আর ব্রজেনদা রাজ্য সরকারের আমলা। ডায়মন্ড হারবারে পোস্টেড। আমার ভীষণ ঘনিষ্ঠ হওয়ার দরুন আমাদের চ্যানেল প্রচুর স্কুপ করতে পারে।
‘সাড়ে পাঁচটার সময়ে দাঁড়াব মানে? কোথায় যাব?’
‘অত কথায় তোর দরকার কী? এক্সক্লুসিভ খবর করার ইচ্ছে থাকলে আসবি। ছাড়ছি, বাই।’
বাড়ি ফিরলুম। বুকের ভেতরটা কীরকম ভার হয়ে রয়েছে। কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না। বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কম্পিউটার নিয়ে বসা দরকার। তাও ভালো লাগছে না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লুম কিন্তু ঘুম আসতে চাইছে না। বুড়িটার চলে যাওয়াটা কীরকম অদ্ভুত। আমার দিকে আঙুল তুলেই বা কী করতে চাইছিল? তারপর ওই খাটগুলোকে ঘিরে ওর পাক খাওয়াটার মধ্যে একটা কী যেন অসঙ্গতি ছিল। কী সেটা? ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা কখন জুড়ে গেছে।
কোনো এক সময়ে রাস্তার কুকুরগুলো আচমকাই খুব জোরে আর্তনাদ করে উঠল আর আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। বাথরুমে যাব বলে উঠে বসলুম আর তক্ষুনি মনে হল প্রথম খাটটার পাশে যে বসেছিল সে একটা হাত দিয়ে খাটটা ছুঁয়েছিল, না?
বুড়ি যত বার পাক খেয়েছে, তত বার ওর বাড়ানো হাতের ওপর দিয়ে ডিঙিয়ে গেছে। ওকে এক বারও ছোঁয়নি। হাতের ওপর দিয়ে টপকে টপকে বুড়ি যাতায়াত করছে আর লোকটা নির্বিকার বসেছিল। এ আবার হয় নাকি? আর ওই প্রেমিকা যুগল তো খাট থেকে খুব বেশি হলে এক ফুট দূরে ছিল। ওই ফাঁক দিয়ে বুড়ি যাতায়াত করেছে আর ওরা বোঝেনি? হয় ওরা সবাই একসঙ্গে কানা, নইলে…, আমার কপাল ঘেমে উঠল। আলোটা যে জ্বালাব সে সাহসও নেই। আলো জ্বাললেই যদি দেখি যে বুড়িটা বসে আছে ঘরের মধ্যে! আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি যে ওকে ওরা কেউই দেখেনি। সারা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। এরকম কি হতে পারে কখনো? একটা আস্ত মানুষকে শুধু আমিই দেখতে পাচ্ছি? অসম্ভব জলতেষ্টা পেয়েছে তবু বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইলুম।
দিনের আলোয় ভয়টা কেটে গেল। কাল বুড়ি মোটেই মিলিয়ে যায়নি। নিশ্চয়ই ওপাশের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গিয়েছিল। ছেলেটা মেয়েটা তো প্রেম নিয়ে ব্যস্ত আর অন্য লোকটা জাস্ট ক্যালাস। মাঝে পড়ে আমি দুম করে ভয়টয় পেয়ে একসা। ভাগ্যিস ভাস্কর আর শান্তনুকে বলিনি। শুনলে তো আওয়াজের চোটে টিকতে দেবে না। মুখটুখ ধুয়ে চা নিয়ে, কাগজ ওলটাচ্ছি, শ্যামশ্রীর ফোন, ‘কোথায় ছিলে তুমি কাল সারা দিন? ফোন করলেই বলছিল নট রিচেবল।’
‘আমি শ্মশানে ছিলাম। আমার বন্ধু আছে না জয়দীপ? ওরই পিসেমশাই। একদম হঠাৎ। জানো তো উনি তান্ত্রিক ছিলেন।’
একটু চুপ করে থেকে শ্যামশ্রী বলল, ‘ওঁর কথা তো আগে কোনোদিন শুনিনি।’
‘বলা হয়ে ওঠেনি আর কী। আসলে আমার সঙ্গেই তো বহু বছর যোগাযোগ ছিল না।’
‘তাই? অথচ তাতেও তুমি শ্মশানে চলে গেলে! আমার সঙ্গে কোথাও যাবার কথা ছিল না তোমার?’
বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ে গেল। এই রে, কেলো হয়েছে! কাল তো ওর মামাতো বোন তৃণার জন্মদিন ছিল! গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে শ্যামশ্রী দাঁড়াবে, আমরা দু-জনে একসঙ্গে যাব, কথা ছিল। দেখেছ কাণ্ড, বেমালুম ভুলে গেছি।
‘সরি, ভেরি সরি। আসলে কাল এমন আটকে গেলুম যে—’
‘যে তুমি আমাকে জানাবার দরকার বোধ করলে না? তান্ত্রিক নিয়ে এতই ব্যস্ত!’
‘না, মানে করতুম, কিন্তু প্রথমে সিগন্যাল ছিল না, পরে চার্জ ছিল না। এনি ওয়ে…।’
ও ফোন কেটে দিয়েছে। গুম হয়ে বসে থেকে তারপর আমি নিজেই ফোন করলুম। খুব বাজে হয়ে গেছে ব্যাপারটা।
‘হ্যালো, বলছি যে আমি ভেরি সরি। আজ সন্ধেবেলা যাব? তৃণাকে সরি বলে আসব?’
‘তুমি কি এটা তামাশা পেয়েছ?’ বলে ও ফোন কেটে দিল।
আর তারপর থেকে ফোন করলেও ধরছে না। শেষে কেবলই বলছে সুইচড অফ। তৃণাকে ফোন করলুম। সে-ও ধরছে না। নির্ঘাত শ্যামশ্রী শিখিয়ে দিয়েছে। যা-তা হয়ে গেল ব্যাপারটা। কী আর করব?
পরদিন পৌনে ছ-টা নাগাদ ব্রজেনদা তুলে নিল। রাসবিহারী হয়ে তারাতলা দিয়ে ডায়মন্ড হারবার। সেখান থেকে আরও কিছু লোকজন নিয়ে, পুলিশ ফোর্স নিয়ে কুলপি থেকে বাঁ-দিকে বেঁকে সোজা রায়দিঘি। দীর্ঘ রাস্তা। শেষ হয়েছে রায়দিঘি নদীর ধারে। রাস্তায় আসতে আসতেই টের পাচ্ছিলুম যে শরীরটা ঠিক জুতে নেই। চোখ জড়িয়ে আসছে আর সেইসঙ্গে গলা জ্বালা করছে। পরশু রাতেই ঠান্ডাটা লেগেছে।
রায়দিঘিতে থামা হল। আমরা যাব ওপারে, কঙ্কণদিঘিতে চোলাই মদ অভিযান। ব্রজেনদারা নৌকো ঠিক করছে। শেষ মুহূর্তে আলোচনা করে নিচ্ছে কীভাবে কী করা হবে। আমরা দু-জনে এই ফাঁকে জায়গাটা ঘুরে দেখে নিচ্ছি। এই যে মাছের নৌকো এসে লাগছে, এই যে ছোট্ট ছোট্ট হাঙর উঠছে জালে, এসব নিয়েও তো একটা স্টোরি করা যেতে পারে।
ওপারে পৌঁছে বেশ কিছুটা হেঁটে গ্রামের ভেতরে একটা খোলা জায়গায় সার সার ভাটি জ্বালিয়ে গুড় জ্বাল দিয়ে চোলাই মদ তৈরি হচ্ছিল। ব্রজেনদার লোকজনেরা সেসব ধ্বংস করতে শুরু করল। আমাদের আসতে দেখে আসামিরা ভেগেছে। গুড় জমে সমুদ্র থইথই। আমাদের ঘিরে লোকের ভিড় উপচে পড়ছে। সব মজা দেখতে এসেছে। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রজেনদার বাইট নিলুম, আশপাশের দু-চার জন লোকের বাইট নিলুম। কিন্তু মাথায় ফট করে এত যন্ত্রণা হচ্ছে কেন? অসম্ভব যন্ত্রণা। ভালো লাগছে না। শেষ হলে বাঁচি।
ফিরতি পথে ব্রজেনদার এক অনুচর একটা বাড়ি দেখাল।
‘ওই যে স্যার সাধুবাবার আখড়া। আগের বার ওইখান থেকে প্রচুর মাল পাওয়া গিয়েছিল। এক বার দেখে নিলে হয়।’
‘এখন আর ওখানে কেউ থাকে নে কো। সাধুবাবা চলে গেছে, এখন ভাঙা বাড়ি ছ্যার। কিছুই পাবেননি’, স্থানীয় একজন।
‘সাধুবাবা থাকেন না আর?’ এক অনুচরের আক্ষেপ, ‘ওঃ সে কী চেহারা! মাথা ভরতি জটা, লাল রঙের গেরুয়া পরা। গলায় কত রকমের মালা। দেখতে পেলে আপনারা ফাইন ফোটো পেতেন!’ এটা আমাদের উদ্দেশে।
‘অনেকদিন হল আর দেখচিনি ওঁকে। তবে জায়গাটা তো ভালো নয়। সন্ধে হয়ে আসছে, না যাওয়াই ভালো,’ আর এক স্থানীয় বাসিন্দা।
তাতে কান না-দিয়ে ‘চলো চলো’ বলে প্রবল উল্লাসে ব্রজেনদা আল ধরে এগিয়ে গেল, পিছন পিছন আমরাও। এখানে কিন্তু মজা দেখতে কেউ পিছন পিছন এল না। সব মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। সাধুবাবার চেহারাটা শুনে থেকে আমার মনের মধ্যে খচ খচ করছে।
ধানক্ষেতের শেষে তিনটে ডুমুর গাছ ত্রিভুজের মতো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার ঠিক মাঝখানে খোড়ো ভাঙা বাড়িটা দেখেই বোঝা যায় যে, এখানে কেউ থাকে না। ভাঙা বেড়ার গায়ে আটকানো ঝুলে পড়া গেট খুলে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। প্রথমে ব্রজেনদা, আর দু-তিন জনে দিব্যি ঢুকে গেল, যেই আমি ঢুকতে গেলুম, অমনি কাঃ করে ডেকে বেড়ার পাশ থেকে এক এক করে তিনটে কাক উড়ে গিয়ে আমাদের মাথার ওপরে চক্কর কেটে ডাকতে শুরু করল। ভেতরে ঢুকে একটা উঠোন, পাশে একটু দাওয়া। ভেতরে ভাঙা দরজার পিছনে ঘর। ব্রজেনদারা ঝটপট উঠোন আর ঘরের ভেতরে দেখে নিয়ে আশপাশ খুঁজতে শুরু করল। মাথার যন্ত্রণাটা খুব বেড়েছে।
‘তোমরা দেখ। আমার মাথাটা খুব যন্ত্রণা করছে, আমি একটু বসছি’, বলে দাওয়াতে বসে পড়লুম।
‘তুই তাহলে এখানেই থাকিস, আমরা ওপাশটা দেখে আসছি।’
আমাকে বসিয়ে রেখে ওরা এগিয়ে গেল। আর সঙ্গেসঙ্গে এক অলুক্ষুণে নৈঃশব্দ্য চরাচর ভরে দিল।
বাড়িটাও তেমনি। উঠোন ভরতি জঙ্গল। একপাশে দুটো ভাঙা মালসা আর পোড়া ছাই। মাঝখানে একটা বোজা পাতকুয়ো, তার মধ্যে থেকে মানকচুর গাছ উঠেছে। কীসের একগাদা পালক ছড়ানো। ওদিকে খড়ের স্তূপ ডাঁই হয়ে রয়েছে। শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদে দাঁড়িয়ে আমার বোধ হল একা একা এখানে বসে না-থেকে ওদের সঙ্গে গেলেই উচিত হত। পরিবেশটা ভালো না।
আমি একলা বসে আছি, চারপাশ হঠাৎই কীরকম নিঃঝুম হয়ে পড়েছে, কাকগুলোও আর ডাকছে না। কেমন মনে হল দাওয়ার ওপরে ভাঙা দরজার পিছনে ওই যে ঘরখানা রয়েছে, সেখান থেকে যেন একটা কোনো বউ আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে আর হাসি চাপবার চেষ্টা করছে। অবিকল সেরকম শব্দ। আমি মাথা ঘোরালুম আর স্পষ্ট বুঝতে পারলুম যে সে স্যাঁৎ করে মাথাটা দরজার আড়ালে টেনে নিল। কে রে ভাই! একলা এখানে বসে আছি পিছন থেকে মেরেফেরে না দেয়।
‘কে? কে ওখানে? ব্রজেনদা এখানে কেউ লুকিয়ে আছে’, বলতে বলতে আমি উঠে দরজার কাছে গেলুম। আমারই মনের ভুল। কারো পক্ষে ওখানে থাকা সম্ভব নয়। মাকড়সার ঝুল জমে দরজার মুখটা আটকে রয়েছে, আর তারই ভেতর দিয়ে দেখলুম যে ওপাশে দেওয়াল পড়ে গিয়ে শূন্যতা হা-হা করছে। গাছপালা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে এসে আবার বসলুম আর মনে হল এই এক মিনিটের মধ্যেই উঠোনটার মধ্যে যেন কী একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে।
উঠোনের ওপাশে ভাঙা মালসা দুটোর পাশে একটা পোড়া হাঁড়ি এল কোত্থেকে? গেটের মুখে দুটো পুরোনো ঝাঁটা পড়ে রয়েছে, এ দুটো এতক্ষণ দেখিনি তো! ছিল কোথায়? দাওয়ায় ওঠার সিঁড়িটার মুখটা এত ভিজে কেন? যে বাড়িতে কেউ থাকে না, সেখানে এত ভেজে কীভাবে? একী ভূতুড়ে ব্যাপার রে বাবা! সেইসঙ্গে মনে হতে লাগল ওই যে সাধুর কথা বলছিল তিনি জয়দীপের পিসেমশাই নন তো! এক্ষুনি যদি ওই ভাঙা ঘরটা থেকে লাল আলখাল্লা পরে বেরিয়ে আসেন একমাথা জটা নিয়ে! আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। ব্রজেনদারা এত দেরি করছে কেন? আমি এখানে আর বসতে পারব না। ভয়ের চোটে উঠে দাঁড়ালুম আর স্পষ্ট বুঝতে পারলুম সেই বউটা আবার তার মুখখানা দরজার আড়ালে টেনে নিল।
সিঁড়ির নীচটা ভিজে ছিল খেয়াল নেই, তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা-টা গেল হড়কে আর বুকপকেট থেকে মোবাইলটা ছিটকে গিয়ে পড়ল পাতকুয়োর পাশে। এগিয়ে ওটাকে তুলে গেট দিয়ে বেরোতে গিয়ে এমনিই চোখ পড়ল ফাটা দাওয়াটার দিকে। এগোব কী, নিদারুণ ভয়ে আমার পা দুটো মাটিতে গেঁথে গেছে।
এতক্ষণ আমি যেখানে বসেছিলুম, ঠিক তার পাশেই এখন দেখতে পাচ্ছি একটা কালো সুতো বাঁধা ছেঁড়া মাদুলি, দুটো রুদ্রাক্ষ আর কয়েক টুকরো ভাঙা শাঁখা। কোত্থেকে এল? কে বারবার আমাকে উঁকি মেরে দেখছে? সারা গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার শব্দ, পা দুটো বেজায় ভারী হয়ে পড়েছে।
সেইসময়ে লোকজনের গলার আওয়াজ কানে এল। অতনু ডেকে বলল, ‘দীপু এদিকে আমরা। দেখে যা।’ মনে জোর ফিরে পেয়ে প্রায় দৌড়েই বাইরে এলুম। কিন্তু কোথায় অতনু? এই যে লোকজনের আওয়াজ পেলুম, তারা সব কই? এক বার শব্দ হওয়ার পরেই সব চুপ। চেঁচিয়ে ডাকলুম, ‘অতনু, কোন দিকে তোরা?’ অতনু কোনো সাড়া দিল না, কিন্তু বাড়িটার পিছন দিক থেকে এবার স্পষ্ট গলার আওয়াজ আসছে। আমাকে ডেকে ওরা এগিয়ে গেছে। আমি পাশ দিয়ে ঘুরে বাড়িটার পিছনে গেলুম।
কিন্তু ব্যাপার কী? কোথায় ওরা? এখানেও তো সব ফাঁকা! কেউ কোথাও নেই! শব্দহীন চরাচর, ধু-ধু ভূমি। কী একটা পোকা ডাকছে। আর আশ্চর্য, বাড়িটার পিছনের দেওয়ালটা তো দিব্যি আস্তই রয়েছে। অথচ এই তো খানিক আগেই ভেতর থেকে দেখে এলুম যে, দেওয়াল একদম ভাঙা। বাইরের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। এই তো এই বাবলা গাছ দুটোকেই দেখতে পেয়েছিলুম ভেতর থেকে। কী দেখলুম তাহলে? অতনুরাই বা কোথায়? এ কি দিনদুপুরে নিশি ডাকল নাকি আমাকে? এখান থেকে এক্ষুনি পালাতে হবে। আসবার সময়ে লোকটা ঠিকই বলেছিল যে, জায়গাটা ভালো নয়। ওর বারণটা শুনলেই হত। ব্রজেনদার ফালতু গোঁয়ারতুমি!
হনহন করে রাস্তাটা ধরে বেরোতে গিয়ে দেখি অন্য দিক দিয়ে আবার সেই বাড়িটার মধ্যে এসে ঢুকেছি। এদিকটা তখন লক্ষ করিনি। কিন্তু উঠোন জুড়ে এত হাড়গোড় ছড়ানো কেন? আমি যতক্ষণ বসেছিলুম ততক্ষণ ছিল না তো! পাতকুয়োটার পাশে এত মদের বোতলই বা কোত্থেকে এল? ঠিক যেন ওই দাওয়া থেকে ছুড়ে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। পাতকুয়োর ওপরে এগুলিই বা কখন এসে জুটল? তিনটে কালো আর তাদের মুখোমুখি তিনটে সাদা কাক।
আর ওদিকে ওটা কী দেখছি আমি? দাওয়ায় যেখানে আমি বসেছিলুম সেখানে খুঁটিতে হেলান দিয়ে পাশ ফিরে বুড়ি মতো কে একটা বসে রয়েছে না? খাড়া বেঁকানো নাক! ওকে তো পরশু দিন সন্ধেবেলা শ্মশানে দেখেছি। ওই যে ওর ঝোলাটা নীচে পড়ে রয়েছে। ঠোঁট দুটো এত লাল? রক্ত খেয়েছে নাকি? আমার সারা শরীরে ঘাম দিচ্ছে। মাথার ভেতরটা হঠাৎ খুব হালকা হয়ে গেছে। তারপর কী হয়েছিল বুঝতে পারিনি, শুধু মনে হয়েছিল আমি বুঝি পড়ে যাচ্ছি।
বাড়ি ফিরলুম ধুম জ্বর নিয়ে। কোনো হুঁশ ছিল না। ঘোর জ্বরের মধ্যেও এক বার আমার চোখের পাতায় সেই শ্মশানের দৃশ্যটা ভেসে উঠেছিল, আর এক বার কঙ্কণদিঘির ছবি। দু-বারই আমি আর্তনাদ করে খাটে উঠে বসেছিলুম। পরে শুনেছি সে-দিন নাকি ব্রজেনদারা এসে দেখেছিল যে খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আমি ফ্যাল ফ্যাল করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছি আর গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। শরীরটা এত ভারী হয়েছিল যে বয়ে আনতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল।
সেরে উঠলেও খুব দুর্বল। বাইরে যাবার অনুমতি এখনও নেই। শ্যামশ্রীকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। আমার জ্বরের খবর শুনলে ও এক বার আসবেই। ওর নম্বরটা ডায়াল করলুম। ও খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ফোন করলে কেন?’
‘তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তুমি একটু আসবে প্লিজ?’
‘আসব মানে? কোথায় আসব?’
‘আমাদের বাড়িতেই এসো। আমার ক-দিন খুব জ্বর হয়েছিল, তারপরে…’
কথা শেষ করতে না-দিয়ে ও বলল, ‘জ্বর হয়ে থাকলে শুয়ে থাকাটাই ভালো, অন্যদের বিরক্ত করার চেয়ে।’
‘তুমি কি বিরক্ত হচ্ছ?’
‘শোনো আমি রাখছি। তোমার অখণ্ড অবসর থাকতে পারে, আমার নেই।’
এর থেকে দু-চার কথা বেড়ে যেতে ‘প্লিজ লিভ মি অ্যালোন’ বলে ও দড়াম করে ফোন কেটে দিল। সামান্য ব্যাপারে ঝগড়ার কোনো মানে হয়? আমার চোখে জল এসে গেল। ও আমার সঙ্গে এরকম করছে কেন?
প্রবল অভিমানে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইলুম। ধুর আমিও আর ফোন করব না। ফোন করা মানেই তো ঝগড়া। ও কিছু বুঝতেই কেন চাইল না?
আরও দু-দিন পরে সুস্থ হয়ে বেরোতে পারলুম। শরীর এখনও দুর্বল, তবু অফিসে জয়েন করতে হল। গতানুগতিকভাবেই সব চলতে থাকল।
আরও মাসখানেক পরে একদিন রাতে ঘুমোচ্ছি। মনটা ক-দিন ধরেই বিক্ষিপ্ত ছিল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আমাদের চ্যানেলের জন্মদিনের বিশেষ প্রোগ্রামে যেহেতু আমি যেতে পারিনি, তাই নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। জ্বরটা কোনো এক্সকিউজ নয় বলেই দেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে আমাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টও দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে একটা সর্বভারতীয় প্রকাশনা সংস্থায় আমাকে ডেকেছিল, ইন্টারভিউটাও খুবই ভালো হয়েছিল, তবু কে জানে কেন সেটা হল না। শ্যামশ্রীর সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে মনটা ভালো নেই।
নানান ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে ঘুমিয়ে পড়েছি। আচমকা কীরকম একটা শব্দ হতে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। কোথাও অনেক লোক একসঙ্গে কিছু পাঠ করছে। একটানা মন্ত্রের মতো গুনগুন শব্দ। আমার এই ঘরের মধ্যেই যেন মন্ত্রপাঠ হচ্ছে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি রাত আড়াইটে। চরাচর শব্দহীন, নিদ্রামগ্ন। বাইরে তীক্ষ্ন স্বরে পেঁচা ডেকে গেল। তারপর আবার সব স্তব্ধ। সেই নিঃশব্দ বহমান রাত্তিরে বিভ্রমের মধ্যে আচমকা আমার মনে পড়ল ছোটোবেলায় কালীঘাট পার্কের কাছে সেই বাড়িটার কথা। কালী পুজো ছিল। যে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল তার কী নাম ছিল বেশ? আমাদের পুরোনো বাড়িতেই কাজ করত, অনেক বয়স হয়েছিল। নামটা খেয়াল পড়ছে না। তার সঙ্গে এক বারই গেছি, ভুলেও গিয়েছিলুম। কিন্তু এখন অবচেতন থেকে ক্রমশ ছবির মতো সব ভেসে উঠতে লাগল। এও কি সম্ভব? ওই চেহারা তো আমি ভুল করিনি। করতেই পারি না। কিন্তু এটাও তো অবিশ্বাস্য!
সত্য আর স্বপ্নের মাঝখানে যে আলো-আঁধারি তার মধ্যে মনটা দুলতে শুরু করল। কালকেই ও-বাড়িতে গিয়ে জেঠুর সঙ্গে বসে ব্যাপারটা ফয়সালা করতে হবে। এক আশ্চর্য অনুভূতিতে রাতটা কাটল।
একটু বেলা হতেই দৌড়লুম জেঠুর কাছে। টেবিলে বসে কী লিখছিল, পাশে একগাদা বই ছড়ানো। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মনে হল আমি যে তাকে দু-দু-বার নিজের চোখে দেখেছি সেটা আপাতত না বলা ভালো। বিশ্বাস করবে না। আমি নিজেই তো বিশ্বাস করতে পারছি না। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা জানতে হবে। কিছুক্ষণ এটা-সেটা বকবক করে তারপরে খুব ক্যাসুয়ালি চেহারার বর্ণনা দিলুম। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডের লাফানি শুনতে পাচ্ছি।
জেঠু আমার কথা শুনতে শুনতেই বই ওলটাচ্ছিল, আন্ডারলাইন করছিল। উঠে গিয়ে আলমারিতে একটা বই খুঁজতে খুঁজতে বলল, ‘এর কথা তোকে কে বলল?’
‘জাস্ট কৌতূহল। বললুম না ছোটোবেলায় দেখেছিলুম, সেটাই হঠাৎ মনে পড়ল।’
‘তুই দেখেছিলি? তোর তো দেখার কথা নয়!’
‘তোমাদের ওই নন্দর মা-ই তো নিয়ে গিয়েছিল। জায়গাটা খুব ভালো মনে নেই, তবে সম্ভবত কালীঘাট পার্কের কাছে একটা বাড়িতে। যেটুকু মনে আছে।’ যত সময় যাচ্ছিল আমার ধুকপুকুনি তত বাড়ছিল।
‘কালীঘাট পার্কের কাছে একটা বাড়িতে তো? তুই তার মানে অঘোরীবাবার আশ্রমে গিয়েছিলি।’
‘তা তো জানি না।’
‘ওখানে এক অঘোরী সন্ন্যাসী থাকতেন। উনি কালীর এক-শো আট রূপের পূজা করতেন। দক্ষিণাকালী বাদে সবকটাই ভয়ংকর রূপ। ওঁর মতো শক্তিশালী সাধক ছাড়া সাধারণ মানুষ সাহসই করবে না ওইসব দেবীর পুজো করতে।’ জেঠু বলে যাচ্ছে।
পণ্ডিত লোকদের এই মুশকিল, একটা প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। আমার ছটফটানি বাড়ছে।
‘তবে কী জানিস, ওই ভয়ংকরেরও একটা আকর্ষণ আছে।’ জেঠু নিজের মনে বলে চলল, ‘ধর ছিন্নমস্তা। দশমহাবিদ্যার একজন। নিজের মাথাটা কেটে হাতে ধরে নিজেরই রক্ত খাচ্ছে! ভাবতে পারিস?’
উঃ, জেঠু বড্ড বেশি প্রসঙ্গ পালটাচ্ছে। ওই সব দেব-দেবীর গল্প আমার কোনোকালেই ভালো লাগে না। আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দিলেই হয়। আমি কাষ্ঠ হেসে চুপ করে রইলুম।
‘অথবা ধর ধূমাবতী।’ এই রে আবার শুরু হল। আমি ঘড়ি দেখলুম, এখান থেকেই সোজা অফিস চলে যাব। জেঠু বলে চলেছে, ‘ঘোর অমঙ্গলের দেবী। লোকের মধ্যে ঝগড়া বাধায়, সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়, আরও নানা ক্ষতি করে। সাধ করে তার পুজো কে করবে বল? করবে যাঁরা ভীষণকে ভীষণ বলেই ভালোবাসে। যেমন ওই অঘোরী করত।’
ধুত্তোর! অঘোরীর নিকুচি করেছে। আসল কথাটা বলে না কেন? আমাকে কথা বলার কোনও সুযোগ না দিয়ে জেঠু বলেই চলল, ‘আমি নিজের চোখে দেখেছি, এক ফিজিক্সের প্রফেসর— লোকটা যেমন কট্টর মার্কসবাদী, তেমনি পণ্ডিত। কিন্তু চাকরি-বাকরি সব ছেড়ে দিয়ে ওই অঘোরীবাবার কাছে পড়ে রয়েছে। ঘরে টিকতে পারেনি, ভাবতে পারিস?’
শুনেই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল, ‘সেই প্রফেসর এখন কোথায়?’
‘জানি না। আমার সঙ্গে পরিচয়ও ছিল না। আমি ওই অঘোরীর আশ্রমে গেছি এক বার দু-বার। তখনই দেখেছি লোকটাকে। তবে ওখানে তোকে নিয়ে যাওয়া একদম উচিত হয়নি। কোত্থেকে কি ক্ষতি হয় বলা যায়?’
‘ছাড়ো! আমি যার কথা বলছি সে কে বলো না!’
‘এত ছটফট করছিস কেন? ভালো ভালো কথা বলছি পছন্দ হচ্ছে না? কী হয়েছিস তোরা। বইটা ধর!’
বিনা বাক্যব্যায়ে নিলাম। পেটের কাছটা গুড়গুড় করছে।
‘এই যে দশমহাবিদ্যার চ্যাপটারটা, এর শেষ দিকটা দেখ। এক্ষুনি ধূমাবতীর কথা বললুম না, শেষ দিকে ধ্যানমন্ত্রের মধ্যে রূপবর্ণনা আছে। পড়!’
মূল সংস্কৃতের নীচে বাংলা অনুবাদ, তার সঙ্গে দুটো ফুটনোটও রয়েছে। এক নিশ্বাসে পড়ে গেলুম— ‘কুরূপা, ধূম্রবর্ণা, খড়গ-নাসা ও মলিন শববস্ত্র শোভিতা, দেবী ধূমাবতীর ধ্যান করি।’ আমার বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। রুদ্ধশ্বাসে পড়ে চললাম— ‘যা দেবী রক্তনেত্রা, তীক্ষ্নদন্তী, কর্মফল-পেটিকা যাঁর দক্ষিণ করের শোভা বর্ধন করে, যিনি মধ্যে ও মাংসপ্রিয়, শুক্ল ও কৃষ্ণ বায়সবাহিত রথে অরূঢ়া, শবপূর্ণ ভূমি বা পরিত্যক্ত গৃহ যাঁর প্রিয় আবাস, যিনি অমঙ্গল সাধনে তৎপর সেই কলহ-বিচ্ছেদ পটীয়সী জরতী মূর্তিধারিণী দেবী ধূমাবতীর ধ্যান করি, যাতে তিনি আমার অশুভ বিধান না করেন।’
প্রথম ফুটনোটে রয়েছে, পেটিকায় বীজাকারে সংরক্ষিত কর্মফল তিনি মানুষের মৃত্যুকালে রোপন করেন। দ্বিতীয়টায়, সাদা ও কালো কাক, দিন ও রাতের প্রতীক।
‘পড়লি?’ জেঠু জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ পড়লুম তো’, আমার গলায় আওয়াজ আটকে গেছে।
‘তোর উত্তর পেলি?’
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ আমি ঘাড় নাড়লুম।
‘তোর মেমরির প্রশংসা করতে হয়! কোন ছোটোবেলায় অঘোরীবাবার আশ্রমে এক বার তাঁর মূর্তি দেখেছিলি, এত বছর পরেও চেহারাটার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিস। মনে হয় যেন সদ্য দেখে এলি। ভেরি গুড।’
আমার মাথায় কোনো কথাই ঢুকছিল না। কীরকম থম মেরে গেছি।
‘অঘোরী সন্ন্যাসী কারা জানিস তো’, জেঠু সে সম্বন্ধেও বলে যাচ্ছিল। আমি কিচ্ছু শুনছিলুম না। ছটফট করছি কতক্ষণে শ্যামশ্রীকে ঘটনাটা বলব। ও শুনলে চমকে যাবে।
বাইরে বেরিয়েই ওকে ফোন করলুম। রিং হয়ে গেল, ধরল না। দ্বিতীয় বারও রিং হয়ে গেল, ধরল না। তৃতীয় বারে ধরে খুব নিস্পৃহ গলায় বলল, ‘বার বার ফোন করে বিরক্ত করছ কেন?’
খারাপ লাগলেও আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বললুম, ‘বিরক্ত আবার কী? কী সংঘাতিক ব্যাপার জানো?’
ওপাশে কোনো শব্দ নেই। আমি বললুম, ‘গ্রেট এক্সপিরিয়েন্স। সব বলব। কখন আসতে পারবে?’
‘প্লিজ! আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।’
‘মানে?’
‘মানেটা খুব পরিষ্কার। আমাকে বিরক্ত না করলে আমি বাধিত হব। আন্ডারস্ট্যান্ড?’
যা বাব্বা, ফোন রেখে দিল? অহেতুক ঝগড়া করার কোনো মানে হয়? ও সম্পর্কটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে?
ঠিক আছে, যত কষ্টই হোক, আমিও আর ফোন করব না। দেখি, কলহ-বিচ্ছেদ-পটীয়সী আমাকে আর কত কষ্ট দিতে পারে।
