Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    সৌমিত্র বিশ্বাস এক পাতা গল্প257 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বিকরালক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    বিকরালক

    একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিলাম আমি। প্রদীপের আলোয় গোটা ঘর ঝলমল করছে তখন। আর জিতুদা পর্দাটা সরিয়ে দিতেই অমর্ত্য সৌন্দর্য নিয়ে তাঁর যেন আবির্ভাব ঘটল। তাঁর প্রখর রূপ দেখে প্রথমটায় চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও ক্রমশ অদ্ভুত লাগতে থাকল আমার। চেহারায় কোনওরকম নারীসুলভ কমনীয়তা নেই, বরং কেমন একটা কাঠকাঠ ভাব।

    নিজের মনেই বললাম, ‘বাকি শরীরের সঙ্গে মুখটা একদমই মিলছে না!’

    বাস্তবিকই তাই। কেননা শরীরটা একদম স্বাভাবিক মানুষের মত সাবলীল গড়নের অথচ মুখখানা, বোঝাই যাচ্ছে, কাঠের। যে মুখা-নাচ একটু আগে দেখলাম, একদম সেই কাঠের তৈরি মুখোশ।

    জিতুদা আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘জানা কথাই যে সেরকমই হবে।’

    আমার চোখে তখনও একটু আগে দেখা নাচের ঘোর লেগে রয়েছে। অন্যমনস্কভাবে বললাম, ‘তাই? কেন?’

    ‘তাহলে তো ভাইটি বাকিটুকুও শুনতে হবে। আর, এর মধ্যেও কিন্তু শ্যামা জড়িয়ে রয়েছে। অবশ্য জানি না আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন কিনা! সময় আছে?’

    আমি বাইরের দিকে তাকালাম। মেলা তো অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল মাত্র ক’জনই অবশিষ্ট ছিল নাচ দেখার জন্যে। তারাও সকলে এখন গ্রামের পথ ধরেছে। সন্ধেবেলার আনন্দমুখর মাঠখানা এখন কেমন নির্জন, অসহায়। তার মাঝখানে শুধু চড়কগাছের বিশাল খুঁটিটা দাঁড়িয়ে রয়েছে একইরকম নিঃসঙ্গ। আর তাকে ঘিরে মোটা কাপড়ের ঘেরাটোপ। আসলে সেই নাচ তো সর্বসাধারণের দেখার জন্যে নয়, কাজেই আড়ালের ব্যবস্থা। আর এই সমস্ত কিছুর ওপরে বিছিয়ে রয়েছে রাত আড়াইটের অন্ধকার।

    কোনও উত্তর না দিয়ে তাকালাম চিন্টুর দিকে। ওর সঙ্গেই এসেছি মাথাভাঙায়। ও-ই বুঝবে কখন ফিরব!

    ‘কোনও তাড়া নেই দাদা। সঙ্গে গাড়ি আছে তো, আপনি বলুন,’ চিন্টু উত্তর দিল।

    ‘বসুন’ জিতুদা আমার দিকে তাকালেন, ‘এই ঘটনাটা কাউকে বলি না। কিন্তু আপনি নরেনদার বন্ধু, আপনার কথা আলাদা।’

    আমি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম নরেনবাবুকে। সকালে তিনি নিজে থেকে ঘাড়ের ওপরে ঝুঁকে না এলে আজকের এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা হত না।

    উনিই বলেছিলেন, ‘এ আর কী নাচ দেখছেন? মাথাভাঙার ভৈরবনাচ দেখলে জীবনে ভুলবেন না। সম্ভব হলে বিকেলের দিকে একবার ঘুরে আসতে পারেন। ভালো লাগবে।’

    কানের কাছে মুখ এনে বলতে হয়েছিল কারণ খুব জোরে ঢাক বাজছিল। আমরা বসেছিলাম বাচামারিতে চিন্টুদের বাড়ির লাগোয়া রকে এবং সামনের রাস্তা দিয়ে গম্ভীরার শোভাযাত্রা যাচ্ছিল। এটা দেখার জন্যেই আমি কলকাতা থেকে এসেছি।

    অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বয়স্ক লোক কেউই বাদ নেই। পৌরাণিক কাহিনী থেকে সমসাময়িক বিষয় সব কিছুই গম্ভীরায় জায়গা পেয়েছে। অল্পবয়েসী কয়েকজন যেমন নাবালিকা বিয়ের বিরুদ্ধে গান গেয়ে অভিনয় করে দেখাতে দেখাতে এগিয়ে গেল। তার পরেই ভারতমাতাকে ঘিরে জনাকয়েক বয়স্কমানুষ। ভারতমাতাটা একদম সেই অবন ঠাকুরের ক্যানভাস থেকে তুলে আনা। তারপর একদল ঢাকি যেভাবে ঢাক বাজাচ্ছিল যে বুঝতে পারলাম বেশ বড়সড় কিছু আসছে। আমি নড়েচড়ে বসলাম।

    ‘কেমন লাগছে?’ ঘাড়ের ওপরে ভদ্রলোকের মুখ।

    ‘খুব ভালো।’

    আমার চোখ রাস্তায়। ঢাকিদের পেছনে পেছনে সেজেগুজে একজনের পর একজন দেবদেবী বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পেছনে আবার আরেকদল ঢাকি।

    ‘যা বললাম। পারলে বিকেলের দিকে একবার মাথাভাঙা থেকে ঘুরে আসুন, বুঝলেন?

    চলমান দেবদেবীদের দিকে ভালো করে মন দেওয়া হল না। শেষ মুহূর্তে একজনের কাঁধে কাক দেখে বুঝলাম ধূমাবতী। তার মানে এতক্ষণ দশমহাবিদ্যা যাচ্ছিলেন।

    ’ওঃ সে ভৈরবনাচের তুলনা নেই। তার কাছে এ কিছুই না।’

    ভদ্রলোক দেখছি বকতে বেশ ভালোবাসেন। চেনা-অচেনার বালাই নেই, সুযোগ পেলেই বকতে থাকবেন। তবে কাণ্ডজ্ঞান কতটা সে বিষয়ে অবশ্য সন্দেহ থেকেই যায়। কেননা তখন থেকে দিব্যি বলে যাচ্ছেন মাথাভাঙা থেকে ঘুরে আসতে। যেন ওল্ড মালদা থেকে মাথাভাঙা এপাড়া ওপাড়া।

    ‘লক্ষ করেছেন? ওই দশ মহাবিদ্যার মধ্যে একজন নেই? কে নেই বলুন তো?’

    এই রে সেটা তো খেয়াল করিনি। তাছাড়া খেয়াল করবই বা কী করে? সারাক্ষণ তো কানের কাছে বকবক।

    ‘লক্ষ করেননি তো? করলে দেখতেন ওর মধ্যে মা ছিন্নমস্তা নেই। গম্ভীরায় যারা সাজে, তারা সব সাজতে রাজি আছে, কিন্তু কারও সাহস হবে না মা ছিন্নমস্তা সাজতে।’

    ‘কেন?’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

    ‘সে ব্যাপার আছে’ মুখটা ফিরল চিন্টুর দিকে, ‘দাদাকে বিকেলে মাথাভাঙা ঘুরিয়ে আনবে না? ভৈরবনাচটা দেখাও।’

    ‘ভৈরবনাচ হবে কি?’ চিন্টুর গলায় সংশয়, ‘এবারে নাকি হবে না শুনছিলাম।’

    ‘হবে না?’ ভদ্রলোক বেশ অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন?’

    ‘বিকরালক নাকি পাওয়া যায়নি’ চিন্টু বলল।

    ‘বিকরালক পাওয়া যায়নি? সেকী!’ ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকে গেল, ‘তার মানে ভর নামেনি!’

    ‘সেরকমই তো শুনলাম দাদা।’

    ‘আশ্চর্য! এ তো চিন্তার ব্যাপার’ ভদ্রলোক রীতিমত অবাক হয়ে মোবাইল বের করতে করতে বললেন, ‘দাঁড়াও জিতুকে জিজ্ঞেস করে নিচ্ছি।’

    বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরে হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘জিতু ফোন ধরল না। অবশ্য আজ ওর মরার সময় নেই। যাই হোক, আমার মিসড কল দেখলে ও ঘুরে ফোন করবেই। জেনে নিয়ে জানাচ্ছি তোমাকে।’

    চিন্টু ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে দাদা। খোঁজ নিয়ে দেখুন। জানতে পারলে আমাকে জানাবেন দাদা।’

    আমি হাঁ করে একবার এর মুখের দিকে, একবার ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। কিছুই মাথায় ঢুকছিল না।

    ভদ্রলোকের মুখ ফিরল আমার দিকে, ‘যদি ভৈরবনাচ হয়, তাহলে মিস করবেন না। সারা জীবনের একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।’

    আমি এতক্ষণ চুপ করে ওদের কথা শুনছিলাম। একটু ফুরসত পেয়ে চিন্টুর দিকে ফিরে বললাম, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। এই যে মাথাভাঙার কথা বলছ সে তো—‘

    ‘আপনি কুচবিহারের মাথাভাঙা ভাবছেন তো? না দাদা’ আমার কথাটা কেড়ে নিয়ে চিন্টু হাসল, ‘এদিকেও একটা মাথাভাঙা আছে, মাণিকচক যেতে পড়ে।’

    ‘সেখানেই ভৈরবনাচ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    ‘হ্যাঁ,’ চিন্টু ঘাড় নাড়ল।

    ‘ব্যাপারটা কী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    চিন্টু বলল, ‘এই যে মুখা-নাচ দেখছেন ওরকমই মুখা-নাচ। কিন্তু যে খুশি সাজতে পারে না। ভর না হলে সে নাচ নাচা যায় না। অনেক ব্যাপার আছে। বিকেলে যদি যাওয়া হয় তো বলব দাদা।’

    ‘নাচ যদি নাও হয়, তবুও দাদাকে ঘুরিয়ে আনো। গ্রামের নাম কেন মাথাভাঙা হল সেই তত্ত্ব ওখানে বসে শুনলে বেশি ভালো লাগবে’ ভদ্রলোক যে আমাদের কথা শুনছিলেন বুঝিনি। তাকিয়ে দেখি মোবাইলের বোতাম টিপে সম্ভবত সেই জিতুকেই ধরার চেষ্টা করছেন। মুখে দুশ্চিন্তার রেখা।

    আমাদের ছেড়ে একবার পাশে সরে যেতেই চিন্টুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’

    ‘নরেনদা’ চিন্টু হাসল, ‘একটু বেশি কথা বলে, তাই না?’

    আমি হাসলাম।

    চিন্টু বলল, ‘ওটাই দোষ লোকটার, বেশি বকে। নইলে খুব পণ্ডিত। গোটা মালদা জেলায় যেখানে যত পুরোনো মন্দির আছে, সমস্ত চেনে। শুধু চেনেই না, কোনটা কবে তৈরি হয়েছিল, কে তৈরি করেছিল, তৈরি করার পেছনে কী গল্প আছে, সমস্ত ইতিহাস জানে।’

    ‘তুমি দেখেছ ভৈরবনাচ?’

    ‘দুবার দেখেছি’ হাসল চিন্টু, ‘অনেক রাত্তিরে হয় দাদা। তার আগে ঘিরে দেয় জায়গাটা। সব লোকের দেখার জন্যে নয়।’

    ‘আমরা দেখতে পাব?’ আমি ততক্ষণে আকৃষ্ট হতে শুরু করেছি।

    ‘ওখানকার যিনি মেন পুরোহিত, জিতুদা, নরেনদার বন্ধু। ওঁকে বলে দিলেই হবে। কিন্তু নাচটাই আসলে হবে কিনা তো এখনও জানি না। যাক গে আগে তো ওখানে যাই!’

    তারপর পড়ন্ত বিকেলে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম মাথাভাঙা গ্রামে। অনেকটা রাস্তা যেতে হল আমবাগানের ভেতর দিয়ে। মানে, দুপাশে আমবাগান আর মাঝখান দিয়ে সোজা রাস্তা চলে গিয়েছে। তবে গ্রামটাতে পৌঁছে মনে হল জনমানব নেই।

    চিন্টু বলল, ‘সে তো হবেই। সবাই গিয়ে জড়ো হয়েছে নদীর ধারে। বিরাট মেলা বসেছে তো!’

    নদীর ধারে, রাস্তার ওপরে বাইকের মেলা বসে গিয়েছে। সেখানে জায়গামত গাড়ি রেখে ঢালু পথ বেয়ে বেশ অনেকটাই নিচে নামতে হল। মেন রাস্তা থেকে মাঠটা এতটাই নিচুতে যে মনে হয় একটু বেশি বৃষ্টি হলেই পুরোটা জলে ঢেকে যায়। তবে এখন শুকনো খটখট করছে। সেখানেই মেলা। ক্রেতা বিক্রেতাদের সবাইই আশপাশের গ্রাম থেকে এসেছে। আর বেশিরভাগই আদিবাসী। ভিড়ে এগোনোই কঠিন।

    মেলা ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে নদীর দিকে ঘেঁসে দুটো বড় বড় তেঁতুল গাছ। আর তাদের মধ্যিখানে একটু দূরত্ব রেখে দুটো মন্দির। সর্বাঙ্গ জুড়ে প্রাচীনত্ব। দুটোরই গঠনশৈলী প্রায় একরকম। প্রায়, কেননা একটার মাথায় কলস নেই। হয়তো ছিল, ভেঙে যাবার পরে ঢালাই-করা ছাদ।

    দুটো মন্দিরের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় একটা বড় হাড়িকাঠ। হাড়িকাঠের সামনে থেকে সরু পায়ে-চলা পথ এগিয়ে গিয়েছে নদীর দিকে।

    দুটোই বেশ উঁচু। ফলে অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। নিচ থেকেই দেখতে পাচ্ছি যে বন্ধ। সম্ভবত সেইজন্যেই আমরা দুজন ছাড়া আশপাশে একটাও লোক নেই। সব গিয়ে জুটেছে মেলার মাঠে। আমার নিজের মেলায় ঘোরার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। একে তো ভিড়, আর তাছাড়া এই মেলাগুলো বহুদিনই তাদের নিজস্ব গ্রামীণ চরিত্র হারিয়েছে। সব জায়গার মেলাই আমার এখন একইরকম লাগে।

    চিন্টু ওপরে উঠে মন্দির প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল। আমার অত ভক্তি নেই। ফালতু সিঁড়ি ভেঙে কী হবে? আমি এমনিই ঘুরে ফিরে আশপাশটা দেখতে থাকলাম। দেখি দুটো মন্দিরেরই পেছনে একটা করে ছোট ঘর। তারও দরজা বন্ধ, তবে জানলা সামান্য খোলা। কৌতূহলে সেখান দিয়ে উঁকি মারলাম।

    ভেতরে একটা পাথরের মূর্তির মত কিছু রয়েছে চোখে পড়ল। ক্রমশ অন্ধকারে চোখটা সয়ে যেতে দেখি মূর্তি নয়, জ্যান্ত মানুষ। একজন সাধু বসে ধ্যান করছে। আমার দিকে তার পিঠ, ফলে আমি তার পেছনটাই শুধু দেখতে পাচ্ছি। যদ্দুর মনে হল নাগা সাধু।

    ইতিমধ্যে আমায় না দেখতে পেয়ে চিন্টু ডাকাডাকি শুরু করেছে। কাজেই ওর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওদিকে একটা ছোট ঘর রয়েছে। সেখানে মনে হল একজন সাধু ধ্যান করছে!’

    ‘আরে ও-ই তো বিকরালক। ও-ই নাচবে রাত্তিরে। সঙ্গে আরেকজনও আছে, তাকে দেখতে পাননি বোধ হয়?’

    ‘না একজনকেই তো দেখলাম।’

    ‘না দাদা, একটা মেয়েও আছে। গায়ে কাপড়চোপড় নেই বলে আরও ভেতর দিকে ঢুকে বসেছে।’

    ‘মেয়ে?’ আমি একটু অবাকই হলাম, ‘মেয়েরাও নাচে নাকি?’

    ‘এই একটা নাচই নাচে। সেইজন্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না।’

    ‘বিকরালক মানে?’

    চিন্টু মাথা নাড়ল, ‘সে তো জানি না দাদা। ছোট থেকে বিকরালক বলেই শুনে আসছি। মানে তো জানি না। সকালে যেরকম মুখোশ পরে নাচ দেখলেন, ভৈরবনাচও সেরকমই মুখা-নাচ। কিন্তু এই নাচ যে সে করতে পারে না। এরজন্যে অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা ভর নামতে হয়। যার ওপরে ভর নামবে কিনা, তাকে বলে বিকরালক।’

    ‘এই ভর নামার ব্যাপারটা কী বলো তো?’

    ‘ব্যাপার আমিও ভাল জানি না। তবে শুনেছি ভৈরববাবা ভর করেন। আর যে কোনও লোকের ওপরে ভর হতে পারে। কার ওপরে হবে সে তিনিই জানেন’ বলে চিন্টু চুপ করে গেল।

    তারপর আবার বলল, ‘সে এক বিরাট কাহিনী দাদা। আমি অতটা ভালো গুছিয়ে বলতে পারব না। জিতুদার মুখ থেকে শুনলে ভালো হত।’

    ‘এখন তো আর জিতুদাকে পাচ্ছি না। তুমিই বলো,’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা, ওই নরেনবাবু বলে রেখেছেন তো যে আমরা ভৈরবনাচ দেখব?’

    ‘হ্যাঁ বললাম তো আপনাকে। জিতুদা যখন ফোন করে জানিয়েছে যে নাচ হবে, তখনই নরেনদা বলে রেখেছে। সে নিয়ে ভাববেন না।’

    ‘বেশ তাহলে গল্পটা বলো।’

    দাওয়ায় একটা খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে বসল চিন্টু। তারপরে শুরু করল কাহিনী—

    ‘আসলে সবই তো শোনা গল্প। এই যে মন্দিরে আমরা বসে রয়েছি, এটা শিব মন্দির। আর ওই যে মন্দিরটা দেখছেন ওপাশে, সেটা তখন ছিল মা চামুণ্ডার মন্দির। দুটোই নাকি একসঙ্গে তৈরি হয়েছিল, অনেক পুরোনো।

    ‘একজন পুরুত এসে নিয়ম করে দু-বেলা পুজো করত। পুরুতের বাড়ি গ্রামের মধ্যেই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই এই মন্দিরে পড়ে থাকত। এখনও যেমন দেখছেন সেই যুগেও মন্দির ফাঁকাই থাকত। একমাত্র কোনও বিপদে পড়লে বা পার্সোনাল সমস্যা হলে গ্রামের লোক ওঁর কাছে আসত। তখনকার দিনে তো জলপড়া, মাদুলি, তাবিজ এসবের ওপরেই লোকের ভরসা ছিল। পুরুতমশাই সেসব দিতেন। এর বাইরে একমাত্র বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে ভিড় হত। অন্য সময়ে একদম ফাঁকা।

    ‘তো, একবার হল কী, নীল ষষ্ঠীর আগের দিন। সেদিন একটা পুজো হয় জানেন তো? হাজরা পুজো?’

    মাথা নাড়লাম আমি— জানি না।

    চিন্টু বলল, ‘নীলের পুজো জানেন তো?’

    ‘জানি। চড়কের আগের দিন হয়।’

    ‘সেইদিনটা হল নীলকন্ঠ শিব আর নীলাবতী বা নীলচণ্ডিকার বিয়ের দিন। তো যাই হোক, ওইদিন বিয়ে হলে তার আগের দিন তো অধিবাস হবে, নাকি?’

    আমি নিঃশব্দে কেবল ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম।

    ‘সেই অধিবাসের দিনে যে পুজো সেটাকেই বলে হাজরা পুজো। শিবের বিয়ে উপলক্ষ্যে ওইদিন পুরুত সব দেবতাকে নেমন্তন্ন করে। আর শিবের চেলাদের, মানে ভূতপ্রেতদের পোড়া শোলমাছ দিয়ে ভোগ দিতে হয়। এ সবই কিন্তু হয় গভীর রাতে।

    ‘তা হলো কী, পুরুতঠাকুর শালপাতায় পোড়া শোলমাছের ভোগ নিয়ে নদীর ধারে রেখে আবার মন্দিরে ফিরে আসছেন, হাড়িকাঠের পাশ দিয়ে আসার সময়ে পায়ে ভিজে ভিজে কী লাগল। অন্ধকারে ভালো ঠাহর হল না। কিন্তু চলতে গিয়ে বুঝতে পারছেন যে চিটচিট করছে। সিঁড়িতে উঠে প্রদীপের আলোয় দেখেন পা ভর্তি রক্ত।

    খুবই অবাক হয়ে গেলেন তিনি। রক্ত কোত্থেকে লাগবে? হাড়িকাঠের পাশ দিয়ে এলেই বা! এর মধ্যে তো কোনও বলি হয়নি। উনি প্রদীপটা নিয়ে হাড়িকাঠের সামনে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখেন হাড়িকাঠ ভেসে যাচ্ছে রক্তে। ঠিক যেন সদ্য বলি দেওয়া হয়েছে। উনি কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না। তবে বুঝতে না পারলেও শিবমহিমা স্তব পাঠ করতে করতে আবার মন্দিরে উঠে এসে একদম গর্ভগৃহে গিয়ে ঢুকলেন।

    পুজোর আরও যেটুকু বাকি থাকে শেষ করার জন্যে মন্ত্র পড়তে পড়তেই বুঝতে পারছিলেন পেছন থেকে ওঁর সঙ্গে আরও একজন কেউ মন্ত্র পড়ছে, একটা মেয়ের গলা। উনি নিজেও ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। ভয়ডরের লেশ ছিল না। থাকলে এই নির্জন নদীর ধারে, ফাঁকা মাঠের মধ্যে মন্দিরে একলা পড়ে থাকতে পারতেন না। আর পুজোও করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে একাগ্রমনে। কাজেই তিনি ওইদিকে মন না দিয়ে পুজো শেষ করলেন।

    প্রণাম করে উঠে পেছনে ফিরতেই মনে হল সাঁৎ করে কে যেন দরজার পাশে সরে গেল। কৌতূহলী হয়ে উঠে আসতে আসতেই মনে হল তিনজন কারা যেন মন্দির থেকে নেমে যাচ্ছে। দরজার কাছে এসে দেখলেন তিনটে বউ— মাথায় ঘোমটা দেওয়া— নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মায়ের মন্দিরের দিকে যাচ্ছে।

    ওঁর বেশ খটকা লাগল। এত রাতে, চারপাশে জনমনিষ্যি নেই— যে সময়ের কথা বলছি, তখন তো বেশিরভাগই জঙ্গল। তার ওপরে হাজরা পুজো, ভূতপ্রেতের ভয়ে কেউই বাড়ি থেকে বেরোবে না। এর মধ্যে কাদের বাড়ির তিনটে বউ দিব্যি এখানে চলে এসেছে, এখন আবার দিব্যি নির্ভাবনায় ওই মন্দিরের দিকে যাচ্ছে! কারা এরা?

    তিনি চেঁচিয়ে ওদের দাঁড়াতে বলবেন তার আগেই মনে হল গোটা দৃশ্যটার মধ্যে কিছু একটা অসঙ্গতি আছে। কিন্তু সেটা যে কী, একঝলক দেখে, উনি ধরতে পারলেন না। বউ তিনটে এদিকে হাড়িকাঠের সামনে পৌঁছে গিয়েছে। হঠাৎ তিনজনেই থমকে দাঁড়াল, পা তুলে দেখছে। পুরুতমশাই বুঝলেন যে ওদের পায়েও রক্ত লেগেছে বলে থেমে গিয়েছে। তারপরে যেটা ঘটল সেটার জন্যে উনি প্রস্তুত ছিলেন না।

    যে বউটা মাঝখানে ছিল, সে দাঁড়িয়েই রইল। অন্য দুটো দিব্যি নিচু হয়ে হাতে রক্ত মেখে নিয়ে সেই হাত চাটতে থাকল। মাঝরাত্তিরে এরকম দৃশ্য দেখলে যে কেউই ভয় পাবে। পুরুতমশাইয়ের বেজায় সাহস, অথচ সেই তিনিও দৃশ্যটা দেখে নিচে নামতে পারেননি। বাতি ধরে এই মন্দিরের দরজাতেই দাঁড়িয়েছিলেন।

    ওরা এগিয়ে গেল মায়ের মন্দিরের দিকে আর তখন পুরুতমশাই অসঙ্গতিটা বুঝতে পারলেন। হেঁটে গেলেও ওদের কারওরই শরীরে চলার কোনও ছন্দ নেই, কেউই সেই অর্থে ঠিক হাঁটছে না, বরং যেন মাটি ছুঁয়ে ভেসে যাচ্ছে। আপনাকে তো বললামই যে পুরুতমশাই ছিলেন খুব সাহসী, নইলে এই মন্দিরে রাত্তির অবধি থাকতে পারতেন না। তিনি বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঠাকুরের নাম নিয়ে প্রদীপ হাতে ওই মন্দিরের দিকে গেলেন।

    ‘কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার যে মন্দিরের কাছে গিয়ে দেখেন বউ তিনটে নেই। ধরুন এই যে আমরা দুজন বসে রয়েছি, এখান থেকে ওই তো সোজা মন্দির আর তার সিঁড়ি সবই তো দেখা যাচ্ছে। কেউ ওপরে উঠলে, এখানে বসেও তো আমরা দেখতে পাব! ঠিক কিনা?’

    আমি আবার নিঃশব্দে সায় দিলাম।

    ‘আর পুরুতমশাই প্রদীপ নিয়ে ওদের পেছনে যাচ্ছেন, হঠাৎ দেখেন বউ তিনটে নেই। তো খুবই অবাক হয়ে গেলেন। কেননা চলতে চলতেও দেখেছেন যে বউ তিনটে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। একটু অন্যমনস্ক হয়েছেন কী হননি, তার মধ্যে ওরা ওখান থেকে মিলিয়ে গেল? যদিও প্রথমটায় কিছু মনে হয়নি, ভেবেছেন যে নিশ্চয় মন্দির প্রদক্ষিণ করছে, তাই পেছনে চলে গিয়েছে।

    কিন্তু প্রদীপ হাতে ওখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও যখন ওদের কাউকে দেখতে পেলেন না তখন কৌতূহলী হয়ে নিজেই মন্দিরের পেছনে গেলেন। সেদিকেও কেউ নেই। এইবারে কিন্তু তাঁর একটু একটু ভয় শুরু হল। কেননা মাঝরাত্তিরে যদি তিনটে ঘোমটা দেওয়া বউ হঠাৎ উবে যায়, তাহলে অতি বড় সাহসীরও বুক কেঁপে উঠবে। তাও তিনি প্রদীপটা তুলে দেখার চেষ্টা করলেন যে যদি ওরা ওপাশে নেমে থাকে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। তিনি আবার সামনে ফিরে এলেন।

    হঠাৎ মাটির দিকে চোখ পড়তে তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন। মাটিতে দু-জোড়া ছোট্ট ছোট্ট রক্তমাখা পায়ের ছাপ। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে পায়ের ছাপগুলো ঠিক আলপনার মত। মানে, আলপনা দিতে গিয়ে যেভাবে লক্ষ্মীর পা আঁকা হয়, ঠিক সেরকমই। আর সেগুলো নিচের দিকে নেমেছে। মানে, কেউ যেন মন্দির থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে গিয়েছে। অথচ ওপরে আসার চিহ্ন নেই। আর বউ ছিল তিনটে, কিন্তু এখানে দুজোড়া ছাপ। তাহলে আরেকজন কোথায়? আর মন্দিরের ভেতরে যে ঢুকবে, দরজায় তো তালা লাগানো। তাহলে বউ তিনটে কারা? আর কেনই বা হঠাৎ এখানে এসেছে?

    যাই হোক, মন্দিরের দরজা খুলে তো তিনি ভেতরে ঢুকলেন। ঢুকেই সোজা সামনে চোখ পড়ল। বিগ্রহের ঠিক পেছনে দেওয়ালে টাঙানো খাঁড়াটা— যেটা দিয়ে বলি হয়— অবাক হয়ে দেখলেন তার গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। এগিয়ে গিয়ে দেখেন কোনও ভুল নেই। সত্যিই টাটকা রক্ত লেগে রয়েছে তাতে। খুবই অবাক লাগছিল, একটু ভয় ভয় যে করছিল না, তাও নয়। যাই হোক, তিনি ঘুরলেন আর সারা শরীর হিম হয়ে গেল।

    বিগ্রহের দিকে মুখ করে উল্টোদিকে দেওয়ালে হেলান দিয়ে একটা বউ বসে রয়েছে। পরনে সাদা কাপড়, মাথায় ঘোমটা। ওই দৃশ্য দেখেই তো পুরুতের হয়ে গিয়েছে। মুখ থেকে বাক্য সরছে না। একটু পরে সে ঘোমটাটা একটু সরিয়ে ওঁর দিকে তাকাতে পুরুতমশাইয়ের মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। দেখলেন বউ কোথায়? এ তো শ্যামাপদ, কুমোরপাড়ার একটা ছোকরা।

    সাদা ধুতি পরে, মাথায় একটা সাদা চাদর জড়িয়ে রেখেছে বলে এতক্ষণ ঘোমটার মত লাগছিল। কিন্তু পুরুতমশাই তখন ঠকঠক করে কাঁপছেন। বন্ধ তালা ভেদ করে শ্যামা ভেতরে ঢুকল কী করে? তার চেয়েও বড় কথা ওর ঘাড় আর গলা ঘিরে গভীর ক্ষতচিহ্ন। ঠিক যেন মাথাটা কেটে আবার ঘাড়ের ওপরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    ওঁর দিকে তাকিয়ে শ্যামা একবার ফিক করে হাসল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কাল আবার আসব। একটা থাকার জায়গা করে দিও গো। আর—’ চামুণ্ডামায়ের বিগ্রহের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘এই বিগ্রহ পাল্টাতে হবে, বুঝলে?’

    আর বুঝলে? পুরুতমশাই যে পাল্টা কিছু বলবেন বা কোনও কথা জিজ্ঞেস করবেন সেই ক্ষমতা তখন ওঁর নেই। যেভাবে ছিলেন, সেভাবেই দাঁড়িয়ে দেখলেন শ্যামা আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

    খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেলেন শ্যামা নিচে নামল, মাটি ছুঁয়ে রেখেও যেন ভেসে ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে হাড়িকাঠের দিকে। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। আন্দাজ দশ গজ গিয়ে, আরও বেশিই হবে তো কম নয়, দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর পেছন ফিরে ঘোমটা সরিয়ে পুরুতমশাইয়ের দিকে ফিরে—’

    ‘হুঁয়াও হুঁয়াও হুঁয়াও’

    আচমকা শব্দটা শুনে চমকে উঠে আমি চিন্টুর হাত চেপে ধরলাম এবং বুঝতে পারলাম যে চিন্টুও চমকে উঠেছে। তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে ও হাসল, ‘শেয়াল ডাকছে দাদা। নদীর ধারে ওই জঙ্গলে কয়েকটা আছে, তাদেরই একটা।’

    যতই বলুক, আমার বুক ধড়ফড় করছে। একটু পরে ধাতস্থ হয়ে বললাম, ‘তারপর?’

    চিন্টু বলল, ‘শ্যামা পেছন ফিরে পুরুতমশাইয়ের দিকে ফিরে আবার ফিক করে হাসল। আপনি ভাবুন একবার, দশ গজ কী তারও বেশি দূর, তায় অন্ধকার। তবুও পুরুতমশাই দেখতে পেলেন শ্যামা ওঁর দিকেই তাকিয়ে হাসল। ওর সাদা দাঁত ঝকঝক করে উঠল। তারপরে আস্তে আস্তে হাড়িকাঠের কাছে গিয়ে—’

    ‘হুঁয়াও হুঁয়াও হুঁয়াও’

    আবার চমকে উঠেছি, কেননা এবারে শব্দটা এসেছে আমাদের ঠিক পেছন থেকে। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল জ্বেলে আলো ফেলে আমরা এদিক ওদিক দেখলাম। কিন্তু কোত্থাও কিছু নেই। বুঝতে পারছি যে চিন্টুও ঘাবড়ে গিয়েছে।

    হঠাৎ করেই ও উঠে দাঁড়িয়ে বলল— বুঝতে পারছি আমার মত ও নিজেও ভয় পেয়েছে, গলা কেঁপে যাচ্ছে—, ‘চলুন দাদা, মেলার দিকে যাই। শিয়ালটা মনে হচ্ছে আশপাশেই আছে। অন্ধকারে বুঝতে পারব না, দুম করে কামড়ে দিলে আবার চোদ্দটা ইঞ্জেকশনের ঝামেলা।’

    এদিকে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে মনে হচ্ছে শিয়াল নয়, অন্য কিছু। তাছাড়া দ্বিতীয়বার শব্দটা এসেছে মন্দিরের ভেতর থেকে। আমার বুক ঢিবঢিব করছে এবং নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। যদিও মন্দিরের দরজা বন্ধ, তবুও ওর ভেতর থেকেই যে শব্দটা এসেছে তাতে আমার সন্দেহ নেই। কে আছে ওর ভেতরে জানি না। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে যে কোনও মুহূর্তে দরজা ভেদ করে একটা ঘোমটা-দেওয়া বউ বেরিয়ে আসবে।

    কাজেই এখান থেকে মানে মানে সরে পড়াই ভাল।

    মেলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে যখন আলোর বৃত্তের মধ্যে এসেছি, সাহসও ফিরে এসেছে, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর?’

    আমাদের সামনে সেইসময়ে লোক আর লোক। ঠেলে একটু এগোতেই চড়কগাছ। তাকে মাঝখানে রেখে অনেকটা জায়গা ঘিরে বড় বড় বাঁশের খুঁটি পোঁতা রয়েছে। চড়কগাছের নিচে একটা পেল্লায় পেতলের থালার ওপরে দুটো কাঠের মুখোশ, সকালে মুখা নাচের সময়ে যেমন দেখেছিলাম। দুটোই দেবীর মুখ। তাদের সামনে, ওপরে ফুল ছড়ানো। বোঝাই যাচ্ছে যে এগুলো পুজো করা হয়েছে। লোকজন এসে তাদের প্রণাম করে যাচ্ছে।

    ‘ওই মুখা দুটো কী?’

    ‘ওগুলোই তো ভৈরবনাচের মুখা দাদা। ওদের কাছে ভোগ নিবেদন করার পরে ওগুলো পরে নাচ হবে।’

    ‘ও’ বলে আমি বললাম, ‘গল্পটা শেষ করো। তারপরে কী হল?’

    আওয়াজের জন্যে চিন্টু প্রথমটায় শুনতে পায়নি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘কী বলছিলাম?’

    ‘ওই যে শ্যামা ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপরে হাড়িকাঠের কাছে গেল।’

    ‘হুঁ?’ চিন্টু বলল।

    ‘এই অবধিই তো বলেছ। তারপর?’

    ‘আর বলিনি?’

    ‘না, তারপরেই তো শিয়ালটা ডাকল।’

    চিন্টু দাঁড়িয়ে গেল রাস্তায়। বুঝতে পারছি ও ভয় পেয়েছে। যখন কথা শুরু করল তখন দেখি গলা খুবই কাঁপছে। বলল, ‘দাদা, অদ্ভুত ব্যাপার। এই যে শিয়ালটা ডাকল, না? সেদিন পুরুতমশাইও যখন দেখছেন যে শ্যামা হাড়িকাঠের সামনে, সেই সময়েও ঠিক ওঁর পেছন থেকে হঠাৎ শিয়াল ডেকে উঠেছিল। মুহূর্তের জন্যে অন্যমনস্ক হয়েছিলেন, তারপরেই দেখেন শ্যামা নেই।’

    ‘মানে?’ আমি চমকে উঠেছি।

    ‘চিন্টু বলল, ‘ওই হাড়িকাঠের সামনে থেকে শ্যামা মিলিয়ে গিয়েছে।’

    ‘তাপ্পর?’ আমার গলা আটকে গেল।

    ‘ঠিক তার পরের কথা কেউই জানে না। পুরুতমশাই যে বলবেন বাকি রাতে কী হল, তা ওঁর কিছুই মনে পড়েনি। অথবা, হয়ত এমন কিছু ঘটেছিল যা উনি বলতে চাননি।

    যাইহোক পরদিন সকালে ছিল নীলের পুজো। একদম ভোরে একজন ভৈরবসন্ন্যাসী আর তাঁর ভৈরবী এসে হাজির। দুজনেরই মাথায়…’

    আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘বলছি যে ভৈরব সন্ন্যাসী মানে কীরকম?’

    ‘ওই যে বলছি, মাথায় বিশাল জটা, সারা শরীরে ছাই-মাখা, হাতে আর গলায় হাড়ের মালা। আর দুজনেরই পরনে কোনও কাপড় নেই। সবটাই একদম খোলা।’

    ‘তা নয়, বলছি যে ওদের ভৈরব ভৈরবী বলা হচ্ছে কেন? এমনি নাগা সন্ন্যাসীর থেকে কীসে আলাদা?’

    চিন্টু বলল, ‘সে তো আমি জানি না দাদা। এতকাল ধরে সবাই ভৈরব বাবা বলে আসছে, তাই আমিও বললাম।’

    ‘বেশ, তারপর?’

    ‘পুরুতমশাই তো ওদের যত্ন করে বসালেন। প্রসাদের ফল ছিল কেটে দিলেন। ওই যে তেঁতুলগাছ, তার তলাতেই তারা আস্তানা গাড়ল। বলল যে ওই চামুণ্ডা মা খুব জাগ্রত। কাজেই ওরা ক’টাদিন ওখানে নিরিবিলিতে থেকে সাধনভজন করবে।

    ‘কিন্তু নিরিবিলি বললে তো আর নিরিবিলি হয় না। গ্রামের মানুষ তো আসবেই। বিশেষ করে নীলষষ্ঠীর দিন। সন্ধে হলেই তো গ্রামের বউদের ঢল নামবে শিবের মাথায় জল ঢালতে। কাজেই অন্য কোনও ব্যবস্থা করতে হবে। মন্দিরের পেছনে ওই যে ঘর দেখলেন…’

    ‘হ্যাঁ’ কেন জানি না ঘরটার কথা উঠতেই আমার মনে পড়ে গেল ভেতরে সেই ছায়ামূর্তির মত সাধু আর গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল।

    ‘ওই ঘরেই পুরুতমশাই ওদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।’

    ‘আর শ্যামা?’ আমার মুখ দিয়ে নিজে থেকেই প্রশ্নটা বেরিয়ে এল, ‘পুরুত ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি?’

    ‘সে আরেক গল্প। পরে বলছি।’

    ‘ঠিক আছে। তারপর?’

    চিন্টু কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে হঠাৎ হাতটা তুলল, ‘জিতুদা! এই যে এখানে।’

    লাল ধুতি খালি গা, গলায় রুদ্রাক্ষ ঝুলছে, মাথায় পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। চারপাশের বাকি লোকজনের মধ্যে রয়েছেন বলেই হয়ত গায়ের রং-টা যেন জ্বলজ্বল করছে। হাতে একটা তামার ঘট নিয়ে হেঁটে আসছিলেন ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। চিন্টুর ডাক শুনে এদিক ওদিক তাকাতেই আমাদের দেখতে পেলেন। মুখটা উজ্বল হয়ে উঠল।

    কাছে এগিয়ে এসে উদ্ভাসিত হাসিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইনিই সেই কলকাতার নতুন দা’?’

    তারপর আমার দিকে ফিরে একই রকম উদ্ভাসিত ভঙ্গীতে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আপনি একদম নতুন, কলকাতা থেকেই আসছেন আর আমাদের দাদা। সেই হিসেবে তো কলকাতার নতুনদা, নাকি?’

    বললাম, ‘সে তো বটেই। তবে আমি কিন্তু দর্জিপাড়ায় থাকি না আর যমকেও ভয় করি।’

    উনি হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘আপনার সঙ্গে জমবে ভালো।’

    এই দুটো কথাতেই আমাদের মধ্যে থেকে অপরিচয়ের ব্যবধান একদম ঘুচে গেল। মনে হল এঁর সঙ্গে দিব্যি বন্ধুর মত গল্প করা যায়।

    ‘আসুন’ বলে উনি সামনে সামনে এগোতে থাকলেন সেই মন্দিরের দিকেই। এবারে কিন্তু আমার কোনও অস্বস্তি হচ্ছে না। ওঁর উপস্থিতিতেই একটা অদ্ভুত নিরাপত্তার বোধ আমাকে ঘিরে ফেলল। মনে হতে থাকল, এই লোকটার সঙ্গে থাকলে কোনও বিপদ নেই।

    আমরা গিয়ে পড়লাম সেই শিবমন্দিরেই। ওপরে উঠে মন্দিরের দরজা খুলতে খুলতে জিতুদা বললেন, ‘বাবাকে আগে দর্শন করে নিন। সময় হলে পরে মা-কে দর্শন করবেন।’

    একদমই বৈশিষ্ট্যহীন একটা শিবলিঙ্গ। অন্য মন্দিরের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই। জিতুদা আসনে বসে টুকটাক কিছু করছেন। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা দুজনে আবার বেরিয়ে এলাম বাইরে। একটু দূরেই মেলার আলো, লোকজনের গলার আওয়াজ, মাইকের শব্দ। অথচ এই দুটো মন্দির ঘিরে অন্ধকার আর জোনাকি আর ঝিঁঝি। কত পার্থক্য!

    দাওয়ায় সেই পুরোনো জায়গাতে বসে আমি তাকিয়ে রইলাম অন্ধকারের দিকে। আর মাথার ওপর থেকে অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জ তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে।

    খানিকক্ষণ বাদে আমি বললাম ‘বাকি গল্পটা শুনি!’

    চিন্টু বলল, ‘একটু দাঁড়ান দাদা। জিতুদা তো এসে গিয়েছেন, বাকিটা ওঁর মুখেই শুনবেন। ওঁর পূর্বপুরুষেরই তো ঘটনা!’

    ‘ম-মানে….’

    কথা শেষ করার আগে চিন্টু ঘাড় নাড়ল, ‘জিতুদারা বংশ পরম্পরায় পুজো করে আসছে। এই গল্পে যে পুরুতমশাইয়ের কথা বলছি তিনি সম্ভবত জিতুদার দাদুর দাদু।’

    ‘আরও আগে,’ পাশ থেকে শব্দটা আসতে চমকে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং জিতুদা। উনি যে কখন এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি।

    ‘তারও দু-পুরুষ আগে,’ আমাদেরই পাশে আসন নিয়ে বসতে বসতে উনি বললেন, ‘ভৈরব ভৈরবীর কথা হচ্ছে মনে হল!’

    হাসল চিন্টু, ‘হ্যাঁ জিতুদা। দাদাকে বলছিলাম আর কী। আপনি যখন এসে গিয়েছেন তখন আপনিই বলুন।’

    ‘তুমি তো বলছিলে, বলোই না’ খুঁটির সামনে একদম টানটান সোজা হয়ে বসলেন জিতুদা, ‘আমিও শুনি। ভুল হলে বা যেখানে দরকার বলে দেব ’খন।’

    ‘ঠিক আছে’ বলে চিন্টু আবার কাহিনী শুরু করল, ‘ভৈরব আর ভৈরবী ঘরের মধ্যেই সাধনভজন করতে থাকলেন। নীলষষ্ঠী পেরিয়ে গেল, পরদিন চড়ক। সন্ধের পর থেকে সন্ন্যাসীরা চড়কগাছে ঘুরতে শুরু করল। হঠাৎ একটু রাত্তিরের দিকে…’

    ইশারায় চিন্টুকে থামতে বলে এবার কাহিনী বিস্তার শুরু করলেন জিতুদা, ‘সেই আসরে পুরুতমশাইও ছিলেন। যদিও আমার পূর্বপুরুষ, তবু আপনার বোঝার সুবিধের জন্যে আমি পুরুতমশাইই বলছি। তাঁর হঠাৎ মনে হল দূরে কোথাও থেকে যেন ডমরু বেজে উঠেছে। এমনিতে তো চড়কের আসরে ঢাক বাজছিলই, কিন্তু সেই শব্দ ভেদ করেও ডমরুর শব্দ তাঁর কানে এসে লাগল। তিনি এদিক ওদিক তাকাতেই দেখলেন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সেই ভৈরব আর ভৈরবী এগিয়ে আসছেন আসরের দিকে। দুজনেরই মুখে মায়ের মুখা। কোথায় পেয়েছেন কে জানে? হয়ত সঙ্গেই ছিল। কিন্তু তাইই বা কী করে হবে? দুজনের সঙ্গেই তো একটা করে কমন্ডুল ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। সেটা রহস্যই থেকে গেল।

    আসরে এসে তাঁরা দাঁড়াতেই যেন মন্ত্রবলে ঢাকিরা ঢাক বাজানো বন্ধ করে দিল। তখন প্রায় মাঝরাত। লোকজন বেশিরভাগই বাড়ি চলে গিয়েছে। যে কটা তখনও ছিল ওঁদের চেহারা দেখেই সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিল। দুজনে এসে একবার চড়কগাছকে প্রদক্ষিণ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। কতক্ষণ যে দাঁড়িয়েছিলেন তার ঠিক নেই।

    তারপর হঠাৎই দুজনে শুরু করলেন নাচ। সেই নাচ তো আমি দেখিনি, কাজেই তার বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর পারিবারিক গল্পে যা বর্ণনা শুনেছি তাতেও তো উত্তরপুরুষদের মাখানো রঙের প্রলেপ লেগে রয়েছে। কাজেই তার বর্ণনায় যাবার দরকার নেই। তবে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে সেই নাচ দেখা একটা অভিজ্ঞতা। সাক্ষাৎ মহাদেব যেন ভৈরবের অবতার হয়ে নেচে গেলেন।

    সেই অপার্থিব দৃশ্যের ঘোর যখন কাটল, পুরুতমশাই দেখলেন ওঁরা দুজনে নেই। ঘরে ফিরে গেছেন ভেবে মন্দিরে এসে দেখেন ফাঁকা ঘরে কেবল ওঁদের মুখাদুটো পড়ে রয়েছে। কিন্তু তাঁরা নেই। বস্তুত তাঁদের আর দেখতেই পেলেন না। মুখাদুটো যত্ন করে ওই ঘরেই রেখে দিলেন।

    ‘ইতিমধ্যে যে কজন সৌভাগ্যবান ওই নাচ দেখেছিল তাদের মুখ থেকেই গ্রামে ভৈরব ভৈরবীর কথা ছড়িয়ে গিয়েছে। পরদিন পয়লা বৈশাখ, লোকে ভিড় করে এল মন্দিরে। কিন্তু যাদের দেখার জন্যে আসা, তারা তো কেউই নেই। ছেলেছোকরাদের উৎসাহ বেশি, বিশেষ করে যেহেতু শুনেছে যে ভৈরবী যুবতী এবং দিগম্বরী, কাজেই ওঁদের খোঁজে তারা তোলপাড় ফেলে দিল। কিন্তু কোনও সন্ধানই পাওয়া গেল না। আর পরদিন, মানে দোসরা বৈশাখ সকালে উদভ্রান্তভাবে শ্যামা এসে হাজির। ও ছিল কুমোরের ছেলে।’

    বললাম, ‘জানি। চিন্টু বলেছে।’

    ‘তবে তো ঠিকই আছে’ জিতুদা আবার শুরু করলেন, ‘শ্যামা নাকি গত তিন চারদিন ধরে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছে। দেখছে যে কেউ একজন এসে ওকে বলছে চামুণ্ডার বিগ্রহ বদলাতে হবে। আর সেই নতুন বিগ্রহ নাকি শ্যামাকেই গড়ে দিতে হবে। কিন্তু কে যে বলছে ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না। স্বপ্নের মধ্যে মুখ দেখতে পেলেও ঘুম থেকে উঠে মনে করতে পারছে না। একবার মনে হচ্ছে পুরুষমানুষের গলা, আবার মনে হচ্ছে যে একজন মেয়ে আদেশ করছে। সে যাই হোক, চামুণ্ডা মায়ের বিগ্রহ বদলাতে হবে শুনে থেকে তো টেনশনে ওর অবস্থা খারাপ। শেষে পুরুতমশাইয়ের কাছে এসেছে ওষুধ নিতে।

    পুরুতমশাই প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন যে স্বপ্নটা কবে থেকে দেখছে! উত্তরে শ্যামা জানাল যে নীলষষ্ঠীর আগের রাত্তির থেকে। সেদিন হাজরা পুজো ছিল বলে তাড়াতাড়ি রাত্তিরের খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়েছিল। সেইজন্যেই এত ভালো করে মনে আছে।

    খুবই অদ্ভুত লাগছিল পুরুতঠাকুরের। সেইদিন তাহলে শিবমন্দিরের ভেতরে কাকে দেখেছিলেন? শ্যামা স্বপ্নে যা শুনেছে, শ্যামার চেহারা ধরে যে এসেছিল সেও তো একই কথা বলেছিল। সে বলেছিল যে পরদিন আবার আসবে এবং ওখানে থাকবে। সত্যি সত্যিই পরদিন সেই ভৈরব আর ভৈরবী এসে হাজির। কে জানে এর মধ্যে কোন অপার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে!

    কিন্তু স্বপ্নের জন্যে আর কী ওষুধ দেবেন? মা চামুণ্ডার প্রসাদী ফুল দিয়ে মায়ের কাছে ভালো করে প্রার্থনা করতে বললেন। দুদিন পরে শ্যামা জানাল যে আর স্বপ্ন টপ্ন দেখেনি।

    বছর ঘুরে গিয়ে আবার হাজরা পুজো ফিরে এল। আগের বছরের অভিজ্ঞতা পুরুত ভোলেননি। তাই এবারে নদীর ধারে প্রেতভোগ দিতে যাবার সময়ে ইচ্ছে করেই শ্যামা আর তার দুই বন্ধুকে ডেকে পাঠিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। অন্য কারওর কথায় ওরা যেত না, কিন্তু পুরুতঠাকুরের কথা অমান্য করার সাহস গ্রামে কারও নেই। কাজেই পুরুত ঠাকুরের সঙ্গে দুজনে গেল। এবারে কিন্তু আর কিছুই দেখতে পেলেন না।

    পরদিন নীলের পুজো, পুজোর বাসনকোসন বের করতে হবে। ওই যে ঘরে আগেরবারে ভৈরব-ভৈরবীকে থাকতে দিয়েছিলেন, সেখানে ঠাকুরের বাসনকোসন থাকত। সেই ঘরের তালা খুলে ভেতরে পা রেখেই পুরুত চমকে উঠলেন। মেঝেতে খড় পাতা কেন? আর তার ওপরে ওরা দুজন কারা শুয়ে রয়েছে?

    আবছা অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছেন একটা মেয়ে আর তার ওপরে একজন পুরুষ। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তিনি। দুজনেই নিশ্চল। ঠিক যেন পাথরের মূর্তি। আচমকা ওই দৃশ্য দেখে তো পুরুতের যাবতীয় সাহস উবে গিয়েছে। পা ওখানেই আটকে গেল, নড়ার ক্ষমতা নেই। চেঁচিয়ে যে ওদের কিছু বলবেন, মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরোচ্ছে না। সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। হঠাৎই ওই মেয়েটার গলা থেকে একটা অস্পষ্ট গোঙানি বেরিয়ে এল। তারপরে আর কিছু মনে নেই।

    যখন সম্বিত ফেরে, তখন তিনি মন্দিরের সামনে সিঁড়িতে শুয়ে রয়েছেন। মুখ মাথা জলে ভেজা। কিন্তু আশপাশে কেউ নেই। কে যে তাঁকে এখানে নিয়ে এল আর শুশ্রূষা করল ভগবান জানেন। ক্রমশ ধাতস্থ হয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে ঘরে যাদের দেখেছিলেন তাঁরা সেই গতবারের ভৈরব আর ভৈরবী। কিন্তু কখন এসেছেন আর কীভাবেই বা বন্ধ ঘরে গিয়ে ঢুকেছেন তিনি বুঝতে পারলেন না। তাদের খোঁজে গিয়েছিলেন, কিন্তু গিয়ে দেখেন ঘর বন্ধ। ওঁদের ঘাঁটানোর আর সাহস হয়নি।

    চড়কের রাত্তিরে ভৈরব-ভৈরবী আবার আসরে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আবার সেই প্রদক্ষিণ। তবে এবারে আর নাচলেন না। বরং যে কজন সামনে ছিল তাদের আদেশ দিলেন পরের দুদিনও ওই চড়কগাছকে একইভাবে পুজো করার।

    পরদিন গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল মন্দিরের পেছনের ঘরে তাঁদের দেখার জন্যে। কিন্তু ঘর ভেতর থেকে বন্ধ। জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরেও কাউকেই দেখতে পাওয়া গেল না। তাঁরা আগেরবারের মতই মিলিয়ে গিয়েছেন হাওয়ায়।

    তারপর আজকের দিনে, মানে দোসরা বৈশাখ পুরুত আবার সেই ডমরুর শব্দ পেলেন। সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রইল মন্দিরের দিকে। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। আচমকা মাঠের দিকে তাকিয়ে ওরা দেখল সেই ভৈরব আর ভৈরবী, চড়কগাছের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

    ‘খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে কোনও লোকই তাঁদের হেঁটে আসতে দেখেনি বা শূন্য থেকেও নেমে আসতে দেখেনি। অথচ একটা সময়ে সকলেই দেখল দুজনে ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন,’ থেমে গেলেন জিতুদা। এমনভাবে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন যেন ওখানে কাউকে দেখতে পাচ্ছেন।

    আমি থাকতে না পেরে বললাম, ‘তারপর?’

    উনি আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘তারপর তাঁরা নাচ শুরু করলেন। পরদিন ভোরে আবার মিলিয়ে গেলেন। সেই শেষ, আর কোনওদিনও আসেননি। যাকগে ছাড়ুন আজগুবি কথা। আপনার খাওয়া দাওয়া হয়েছে তো, নাকি?’

    আচমকা প্রসঙ্গ পাল্টে যেতে আমি হকচকিয়ে গিয়ে বললাম, ‘না মানে ইয়ে। কোনও অসুবিধে হবে না।’

    ‘অসুবিধে হলেও আমার কিছু করার নেই’ জিতুদা হাসলেন, ‘ভৈরব নাচের সময় হয়ে এসেছে। এবারে তোড়জোড় করতে হবে। আপনারা এখানেই বসুন। সময়মত ডেকে নেব।’

    ওঁকে ওঠার উদ্যোগ করতে দেখে বললাম, ‘বাকি গল্পটা? তারপরে কী হল?’

    ‘কী আর হবে? ওই যে বললাম ওঁরা আর কখনও আসেননি’ জিতুদা চুপ করে রইলেন। তারপর অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘ওঁরা যে আসলে কারা, কেনই বা এসেছিলেন সবটাই রহস্যময়। আসলে প্রকৃতির লীলা কে বুঝতে পারে?’

    ‘ওঁরা আর আসেননি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    চিন্টু বলল, ‘আর একবারই মাত্র এ…’

    ‘আঃ! কথার মাঝখানে কথা বলো কেন?’ প্রায় ধমকেই উঠলেন জিতুদা, ‘ওঁর সঙ্গে কথা কে বলছে? তুমি না আমি?’

    ‘সরি দাদা’ চিন্টু খুবই অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে। আমি তো বুঝতেই পারছি যে ওঁরা আরেকবার এসেছিলেন, কিন্তু তার জন্যে চিন্টুকে ধমকানোর কী হল বুঝলাম না।

    কাজেই প্রসঙ্গ পাল্টে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী একটা ভর হবার কথা শুনছিলাম!’

    উঠতে গিয়েও জিতুদা থেমে গেলেন। তারপরে বললেন, ‘সে আরেক ব্যাপার। ওঁরা দুজনে তো চলে গেলেন। সবাই ভেবেছিল যে পরের বছরেও বুঝি এরকমই ফিরে আসবেন। কিন্তু হাজরা পুজো পেরিয়ে গেল, নীল ষষ্ঠী পেরিয়ে গেল, এমনকী পয়লা বৈশাখও পেরিয়ে গেল। ওঁরা এলেন না। গ্রাম জুড়ে একটা চাপা উত্তেজনা যে দোসরা বৈশাখ কী হয়। বলা তো যায় না, আগেরবারের মতই হয়তো দুজনে সোজা মাঠে চলে আসবেন। সন্ধে থেকে চড়কগাছের নিচে সেই মুখা দুটো রেখে দেওয়া হল।

    ‘শেষ অবধি এলেনও। তবে ওঁরা নন, গ্রামেরই একটা ছেলে আর একটা বউ। বাজনাবাদ্যির মধ্যে কথা নেই বার্তা নেই, দুজনেই হঠাৎ একদম দিগম্বর অবস্থায় লাফিয়ে পড়ল মাঠে। কী হয়েছে বুঝতে না পেরে লোকজন হইহই করে ছুটে এল ওদের সরাতে। গ্রামের সোমত্ত বউ তার এ কী অসভ্যতা?

    কিন্তু কে সরাবে তাদের? অসীম শক্তি জন্মেছে দুজনের। যারা ধরতে এসেছিল, ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল দূরে। ওরা মুখা দুটো গলিয়ে নিয়ে নাচ শুরু করল। সেই নাচ ওদের কে শেখাল কে জানে? কিন্তু পুরুত মশাই বুঝতে পারছিলেন যে ওদের ওপরে সাক্ষাৎ ভৈরবের ভর হয়েছে, নইলে সাধারণ কোনও মানুষের পক্ষে এই নাচ সম্ভব নয়। ভোর হতে দুজনে নেতিয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল ওদের।

    ‘সেই থেকে এই নাচের রীতি চলে আসছে। দোসরা বৈশাখের আগে গ্রামের কারও না কারওর ওপরে ভর হবেই। একজন পুরুষ একজন নারী। তারাই রাত্তিরে এসে মুখা এঁটে ভৈরব নৃত্য করবে। তবে দিন পাল্টাচ্ছে তো। অল্পবয়েসী মেয়ে বউয়ের ওপরে ভর হয়, তারা ভৈরবী হয়ে নাচে। দিনকাল তো ভালো নয়, বুঝতেই পারছেন কত লোক কত ধান্ধায় ঘোরে, তাই ওই নাচ সকলের জন্যে নয়। সবাইকে বের করে দিয়ে চারপাশে ঘিরে তবে নাচ হবে।’

    ‘আর যদি ভর না হয়?’

    ‘সেরকম হলে বিপদ। একবারের কথা মনে আছে, তখন আমি খুব ছোট। সেবারে ভর হয়নি। তারপরে হঠাৎ করেই গ্রামে লাগল মড়ক। অসুখ বিসুখ নেই, কোনও কারণ নেই অথচ লোকজন পটাপট মরতে শুরু করে দিল। শেষে মায়ের কাছে মহামাংস নিবেদন করে ক্ষান্তি।’

    ‘মহামাংস মানে?’

    ‘বৃহৎতন্ত্রসারে ভৈরবতন্ত্রবচন অনুযায়ী মেষ, গো, মহিষ, অশ্ব, বরাহ, মৃগ ইত্যাদি আট রকম মহামাংস আছে। এরই কোনও একটা হবে’ রহস্যময় হেসে জিতুদা উঠে পড়লেন, ‘আপনারা একটু বসুন। ব্যবস্থা হলে ডাকছি।’

    আধঘন্টা পরে একটা ছেলে এসে আমাদের ডেকে নিয়ে গেল মেলার মাঠে।

    সন্ধের উৎসব এখন একদমই স্তিমিত। লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। চড়কগাছের চারপাশে সেই খুঁটিগুলো ধরে এখন কাপড় টাঙিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। অল্প কিছু বয়স্ক মহিলা আর পুরুষ চারপাশে ঘিরে বসে রয়েছেন। তাঁদের হাতে পুজোর ডালি। একটু পরে জিতুদা এসে দাঁড়ালেন সামনে। জোরে জোরে মন্ত্র পড়ছেন।

    তাঁর সঙ্গে অল্পবয়েসী একটা ছেলে আর একটু বড়ো একটা মেয়ে। কারওরই শরীরে সুতো পর্যন্ত নেই। আধ বোজা চোখে দাঁড়িয়ে দুজনেই দুলছে আর বিড়বিড় করে কী বলছে। মাঝে মাঝে হঠাৎ নিজের মনেই খলখল করে হেসে উঠছে। বোঝাই যাচ্ছে যে নিজেদের বশে নেই।

    ‘ওই যে ছেলেটা, ও-ই বিকরালক’ পাশ থেকে চিন্টু বলল, ‘আর ওই মহিলা হলেন বিকরালকের শক্তি।’

    কিছুই বুঝলাম না। পাল্টা প্রশ্ন করলে হত কিন্তু ততক্ষণে জিতুদার মন্ত্রপাঠ শেষ হয়েছে। ওরা দুজনে চড়কগাছের সামনে গিয়ে মুখাদুটো তুলে নিয়ে পরে ফেলল। আর একদম নিরাবরণ শরীরে কেবল ওই রঙিন মুখার জন্যেই বীভৎস দেখাতে লাগল দুজনকে।

    ইতিমধ্যে দুজন লোক একটা মুখঢাকা ঝুড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জিতুদা সেই ঝুড়ির মধ্যে হাত গলিয়ে একটা পায়রা বের করে আনলেন। তারপরে ডান হাতে তাকে ধরে বাঁ হাতে তার মাথাটা টেনে ছিঁড়ে ফেললেন। ফিনকী দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতেই সেটা ওই মুখোশের মুখে ঢেলে দিলেন। তারপরে আরেকটা পায়রা। তারপর আরেকটা।

    হঠাৎ এইরকম হত্যাদৃশ্য দেখে বেশ একটা ধাক্কা লাগলেও ক্রমশ আমি কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। একসময়ে উল্লাস আর জয়ধ্বনিতে সচেতন হয়ে দেখি বলির পরে যখন রক্তটা মুখার মুখে ঢেলে দেওয়া হয়েছে তখন সেটা মুখ থেকেই ফিনকি দিয়ে ওপরে উঠেছে। ঢাকিরা এইবারে তুমুল নিনাদে বাজানো শুরু করল। আর তখন ওরা দুজন নাচ শুরু করল।

    জিতুদা ঠিকই বলেছিলেন, এই নাচের বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। ওই কালনৃত্য দেখতে দেখতে আমার কেবল মনে হচ্ছিল, ‘প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুলখেলা।’

    ক্রমশ যেন সমস্ত চরাচর বিলুপ্ত হয়ে গেল আর আমি ডুবে যেতে থাকলাম নিজের মধ্যে। কোথাও যেন কারও অস্তিত্ব নেই, শব্দও নেই কোনও। কেবল আমার শ্বাসে-প্রশ্বাসে নৃত্যভয়াল নটরাজের পদবিক্ষেপ বেজে উঠছে। কখন সব শেষ হয়েছে খেয়ালও নেই। অদ্ভুত একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে বসেছিলাম আমি। কোনও একসময়ে চিন্টু বলল, ‘চলুন দাদা, মাকে দর্শন করে আসি।’

    সেইভাবেই উঠে গিয়ে মন্দিরে পৌঁছলাম। দরজার সামনে আরও কিছু দর্শনার্থী জড়ো হয়েছে। কিন্তু বিগ্রহ পর্দার আড়ালে। আসনে বসে জিতুদা মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন। চারপাশে প্রদীপ জ্বলছে। জনা চারেক বয়স্কা মহিলা বসে আরও প্রদীপ জ্বালিয়ে দিচ্ছেন। ক্রমশ গোটা গর্ভগৃহ প্রদীপের আলোয় ঝলমল করতে থাকল। জিতুদা উঠে দাঁড়ালেন। ওঁরও মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন অন্য কোনও জগতে রয়েছেন।

    ‘জবাকুসুমসঙ্কাশং রক্তবন্ধুকসন্নিভম/মধ্যে তস্যা মহাদেবীং সূর্যকোটিসমপ্রভং’ উচ্চকন্ঠে বলতে বলতে তিনি পর্দা সরিয়ে দিতেই সত্যিই যেন কোটি সূর্যের সমান দীপ্তি নিয়ে দেবী দৃশ্যমান হলেন। সমবেত ভক্তরা আকুলভাবে ডেকে উঠল, ‘মা মাগো, দয়া করো মা।’

    আর আমি বাকরহিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম দেবীর দিকে। চামুণ্ডা কোথায়? ইনি তো ছিন্নমস্তা। কেবল চেহারার মধ্যে ভীষণ পুরুষালীভাব। তবে পায়ের নিচে রতি ও কামের যে মিথুনমূর্তি, তাদের গড়ন একদম নিখুঁত। আর ওঁর দুপাশে যে ডাকিনী আর বর্ণিনী থাকেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন। অন্যজন নেই। যিনি রয়েছেন তাঁর মুখখানা স্বাভাবিক নারীর এবং শরীরেও নারীত্ব প্রকট।

    ‘অবাক হচ্ছেন তো? মায়ের ধ্যানমন্ত্র অনুযায়ী তিনি ভয়ঙ্করী, মুখ বিকৃত, জিহ্বা উগ্র ও লেলিহান। কিন্তু তার মধ্যেও বলছে ‘পীনোন্নতপয়োধরা দেবী সর্বদা ষোড়শবর্ষীয়া’’ জিতুদা বললেন, ‘মিলছে না তো?’

    রাত আরও বেড়েছে। দর্শনার্থীরা সবাইই বিদায় নিয়েছে। কেবল আমরা তিনজন বসে রয়েছি দাওয়ায়। পর্দা আবার টেনে দিয়ে জিতুদা মন্দির বন্ধ করে দিয়েছেন।

    ‘চিন্টু নিশ্চয় বলেছে যে শ্যামাপদ স্বপ্নে আদেশ পেয়েছিল বিগ্রহ বদলাতে হবে?’

    আমি নিঃশব্দে সায় দিলাম।

    ‘ইতিমধ্যে চার বছর কেটে গিয়েছে। ভৈরবের ভরও হয়েছে এবং নাচও বন্ধ হয়নি। চতুর্থ বছরে পুজোর পর থেকেই শ্যামার মাথায় সেই স্বপ্ন আবার ফিরে আসতে শুরু করল। বিগ্রহ পাল্টাতে হবে। শেষে পুরুতঠাকুর ওকে বুদ্ধি দিলেন নতুন বিগ্রহ গড়ার কাজে হাত দিতে। তারপরে দেখা যাবে। আগেই বলেছি যে ও ছিল কুমোরের ছেলে। কাজেই কাজে হাত দিল। আর তারমধ্যে হঠাৎই মাথায় ঢুকল যে সামনের ভৈরবনাচ ও করবে।

    পুরুতমশাই বোঝালেন যে এটা নিজের ইচ্ছের ব্যাপার নয়, একমাত্র ভর হলে তবেই নাচ করা যায়। অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ও বলল যে ওর নাকি ভর হবেই। ও নাকি আবার স্বপ্নাদেশ পেয়েছে। তারপরেই স্বপ্নে পাওয়া একখানা মন্ত্র বলল।

    পুরুতমশাই খুবই অবাক হলেন। কেননা এই যে ষোড়শাক্ষর ওঁ শ্রীং হ্রীং ঐং এটা সব মন্ত্রের মধ্যেই, বা তান্ত্রিক পরিভাষায় যাকে বিদ্যা বলা হয়, তার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ওই যে ওর সঙ্গে হূঁ হূঁ ফট স্বাহা বলা হচ্ছে এটা তো অতি গুহ্য, ওর জানার কথাই নয়। উনি বারবার বললেন যে ওই বিদ্যা যেমন সিদ্ধি দিতে পারে, তেমনি উচ্চারণে সামান্য ভুল হলেই মৃত্যু অনিবার্য। কী দরকার এসবের?

    কিন্তু শ্যামা শোনার পাত্র নয়। উল্টে দুদিন পরে বলে বেড়াতে শুরু করল যে ওর সঙ্গে নাকি শিবানীরও ভর হবে। শিবানী ছিল গ্রামেরই একটা বউ। ছেলে মেয়ে নেই, আর বরটাও ছিল পাগল। মুড়ি ভেজে আর পুকুর থেকে মাছ ধরে বিক্রী করে দিন চলত। একে অভিভাবকহীন তায় দেখতে সুন্দর বলে অনেক ছেলেছোকরাই শিবানীর পেছনে ঘুরঘুর করত। কিন্তু ওর নামে কোনওদিন কোনও আজেবাজে কথা শোনা যায়নি। তার নাম নিতেই পুরুতমশাই ধরে ফেললেন যে ভর, স্বপ্নাদেশ সমস্ত বাজে কথা, শ্যামার অন্য মতলব আছে।

    আলাদা ডেকে বোঝালেন, ধমকালেন, কিন্তু ওর ওই একটাই কথা, ‘ভর তো কেউ ইচ্ছে করে হওয়ায় না। আপনা থেকেই আমাদের হবে। দেখে নেবেন।’

    ‘সত্যিই ভর হল এবং আরও অদ্ভুত ব্যাপার যে একই সঙ্গে শিবানীরও ভর হল। কাজেই নিয়ম অনুযায়ী দুজনকে পেছনের ওই ঘরে আলাদা রেখে দেওয়া হল। নাচের আসরে আসার আগে অবধি দুজনকে বস্ত্রহীন অবস্থায় একসঙ্গে থেকে ধ্যান আর মন্ত্রজপ করতে হবে। অথচ পরস্পরকে দেখে কোনও বিকার হতে পারবে না। কোনও অনাচার হলেই মৃত্যু।

    যাইহোক ওরা নাচ শুরু করল এবং সকলেই বুঝতে পারল যে একদম আবিষ্ট হয়েই দুজনে নাচছে। এর মধ্যে কোনও ভণ্ডামি নেই। হঠাৎই অনেকেরই মনে হতে থাকল যে ওদের দুজনের ছাড়াও আরও কিছু ছায়া পড়ছে। কিন্তু সবাই নাচ দেখতে ব্যস্ত, সেদিকে কেউ খেয়াল করল না।

    ক্রমশ সেই ছায়া রূপ পরিগ্রহ করল এবং এইবার সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখল সেই ভৈরব-ভৈরবী। দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে তাঁরা ফিরে এসেছেন এবং ওদের নাচের আঙিনাতেই, সকলের চোখের সামনে তাঁরা একে অপরের মধ্যে মিশে রয়েছেন।

    শ্যামা আর শিবানীর সেদিকে হুঁশ নেই। ওরা বিভোর হয়ে নাচছে। নাচতে নাচতে হঠাৎই তাঁদের সামনে গিয়ে থমকে গেল শ্যামা। সঙ্গে শিবানীও। হাঁফাচ্ছে দুজনে। অন্য সময় হলে লোকজন এগিয়ে যেত, মুখোশ খোলায় সাহায্য করত, ঘাম মুছিয়ে দিত, যেমন আজ দেখলেন। কিন্তু তখন ভৈরব-ভৈরবী ছিলেন বলে কেউই এগোতে সাহস পায়নি।

    শ্যামাপদ নিজেই মুখোশটা খুলতে গেল। কিন্তু বেকায়দায় এঁটে বসেছে বলে খুলতে পারছিল না। এদিকে শিবানী ততক্ষণে নিজের মুখোশ খুলে সাবধানে নামিয়ে রেখেছে চড়কগাছের নিচে। এইবারে ও এগিয়ে গেল শ্যামাকে সাহায্য করতে। কিন্তু সেও খুলতে পারল না। কিন্তু টানাটানি করতে গিয়ে কখন যে শ্যামার পা-টা ওঁদের যুগলমূর্তির গায়ে ঠেকে গিয়েছে খেয়াল করেনি।

    ওঁদের গায়ে পা ঠেকতেই শ্যামাপদর মুখ থেকে একটা বিকট আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তারপরেই দেখা গেল যে মুখোশটা এতক্ষণ খুলতে পারছিল না, সেটা খুব সহজেই খুলে এসেছে। আর তারপরেই আর্তনাদ করে উঠলেন পুরুতঠাকুর। কেননা মুখোশের সঙ্গে সঙ্গে শ্যামার নিজের মাথাটাও খুলে এসেছে আর সেখান থেকে রক্তধারা ছিটকে এসে পড়ছে শিবানীর মুখে।

    ‘অ্যাঁ? কী বলছেন আপনি?’ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল বিস্ময়টা।

    মাথা নাড়লনে জিতুদা, ‘এইজন্যেই বলেছিলাম আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না। কাঁধের ওপর থেকে মুখা সমেত আস্ত মাথাটা ওর বাঁ হাতে খুলে এসেছে। কেউ বিশ্বাস করবে?’

    আমার মুখে কোনও কথা জোগাল না, সারা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সামনে তাকাতে পারছি না। কেবলই মনে হচ্ছে যদি কিছু দেখি।

    ‘তারপর?’ কে জানে কখন বলেছিলাম।

    ‘তারপর আর কী? দেখেই তো লোকজন দুদ্দাড় করে সব পালাল। আর তারপরে ভোর থেকে শুরু হল বৃষ্টি। বৃষ্টি মানে সে একেবারে আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি। আর সেই সঙ্গে ঘনঘন বজ্রপাত। একটা বাজ পড়েছিল চামুণ্ডা মন্দিরের মাথায়। ওপরের চুড়ো তখনই ভেঙে যায়। এদিকে নদী ফুলে ফুঁসতে শুরু করে দিল। টানা দুদিন ভাসিয়ে দিয়ে যখন শান্ত হল, লোকে গিয়ে দেখে মাঠের মধ্যে তখনও শ্যামাপদ ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিবানীর মুখে ওর রক্তধারা তখনও পড়ছে। পায়ের নিচে ভৈরবমিথুন। সবাইই জমে পাথর।

    আর বজ্রপাতের ফলে চামুণ্ডা মন্দিরের মাথাই শুধু নয়, বিগ্রহও ভেঙে পড়েছে। চামুণ্ডা মাকে বিসর্জন দিয়ে শ্যামা শিবানীদেরই তুলে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হল।’

    চুপ করলেন জিতুদা। অনেকক্ষন আমরা বসে রইলাম বাক্যহীন। তারপর একসময়ে আমি সন্তর্পনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওকে বিকরালক বলছেন কেন?’

    ‘বিকরালক হলেন মা ছিন্নমস্তার ভৈরব। পুরশ্চর্যার্ণব তন্ত্রে বলছে সর্বকামফলপ্রদা মা ছিন্নমস্তার প্রসাদমাত্র লাভ করলে মানুষ শিব হয়ে যায়। ওই যে ভর নামে, সেও তো তাঁরই অনুগ্রহ। তাই না?’

    আমি কোনও কথা বলতে পারলাম না। একটু পরে তিনি নিজেই আবার বললেন, ‘বিশ্বাস হল না তো? মাঝরাতে কেমন একটা গাঁজাখুরি শুনিয়ে দিলাম?’

    শুনেও চুপ করে থাকলাম। তারপরে আস্তে আস্তে বললাম, ‘কাহিনীটা এমনই অদ্ভুত যে বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনও কিছু দিয়েই তাকে বাঁধা যাবে না। সবটাই কেমন যেন একটা অন্য জগতের কথা। কোথায় যে কী ঘটে আমরা কি আর জানতে পারি?’

    ‘অন্য জগতের কথা তো বটেই। মহাকালসংহিতা বলছে যে ছিন্নমস্তার চেয়ে উগ্রতারা আর কেউ নেই। তিনি হয় সিদ্ধি দেবেন নইলে মৃত্যু। সে কথা তো সত্যিই ফলে গেল!’

    ‘সেই। শ্যামাপদ যদি পুরুতঠাকুরের কথা শুনত, তাহলে এভাবে মরতে হত না’ চিন্টু বলল।

    চিন্টুর দিকে তাকালেন জিতুদা। তাঁর চোখের কোনা চিকচিক করছে, ‘শুধু একটা দিক দেখলেই হবে? শ্যামাপদর বাহ্যিক রূপ নিয়েই থাকে সবাই, ও যে মায়ের অরূপের মধ্যে ডুবে রয়েছে সেটা কেউ ভাবে না। এর চেয়ে বড় সিদ্ধি আর কী হতে পারে?’

    চোখ মুছলেন তিনি। আবার নৈঃশব্দ্য ঘিরে নিল আমাদের। আরও অনেকক্ষণ পরে যখন একটা দুটো পাখি ডাকতে শুরু করেছে, আমাদের গাড়ি ফিরে যেতে থাকল অন্য একটা আলোকময় জগতের দিকে। কিন্তু আমরা কেউই কোনও কথা বলছিলাম না। আমার মাথায় কখনও কাহিনীটা ভেসে উঠছিল, কখনও বা ভৈরবনৃত্য। আর কেবলই মনের মধ্যে বাজছিল, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।’

    একটা কথা বলা বাকি থেকে গেল তবু। বহু পরে আমি জানতে পেরেছিলাম মহামাংস বলে যা যা জিতুদা বলেছিলেন, তার মধ্যে একটা বাদ রেখেছিলেন। হয়তো ইচ্ছে করেই, পাছে আমি কিছু মনে করি। সেটা হল নরমাংস।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিদুর – মিহির সেনগুপ্ত
    Next Article কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }