অবগাহন – সৌমিত্র বিশ্বাস
অবগাহন
এসি টু টায়ারের কামরায় বসে চোরা চোখে পিয়ালিকে দেখছিল রক্তিম। এইভাবে দেখাটা ঠিক হচ্ছে না বুঝেও নিজেকে সামলে রাখতে পারছিল না। ও যে শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বউ তাইই নয়, মেয়েটাকে চেনে ক্লাস টেন থেকে, যখন থেকে শাশ্বতর সঙ্গে ওর প্রেম। কিন্তু ওর দিকে না তাকিয়ে উপায় ছিল না। অন্যদিকে মন দিতে গেলেই দুপুরের দৃশ্যটা ভেসে উঠছিল— কচুরীপানা সরিয়ে অলোক পাগলের মত সাঁতার দিয়ে ফেরার চেষ্টা করছে আর মাঝে মাঝে গলা থেকে যেটা বেরিয়ে আসছে সেটা মরণ আর্তনাদ। রক্তিম কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
‘আমি তো ভেবেছিলাম এসে পৌঁছতেই পারব না,’ উত্তীয় বলল, ‘জিন্দেগীতে এরকম জ্যাম দেখিনি।’
‘একজ্যাক্টলি। আমি তো ঠিকই করে ফেলেছিলাম আর কিছুক্ষণ দেখে হাঁটা লাগাব’ শাশ্বত বলল।
‘সে তুই পারতিস! আমার হত না। অ্যাতো মালপত্র নিয়ে পুরো ব্রীজ হাঁটা’ উত্তীয় হাসল।
‘সত্যি গুরু চারদিনের জন্যে তুমি মালপত্র এনেছ বটে’ শাশ্বতও খ্যাক খ্যাক করে হাসল।
‘আমাকে কেন? যে এনেছে তাকে জিজ্ঞেস কর’ উত্তীয় ইশারায় বউকে দেখাল।
রুমা পাত্তাও দিল না। হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘চলো এবার শুয়ে পড়া যাক। কাল ভোরে উঠতে হবে!’
গুমগুম শব্দ করে ট্রেনটা কোনও ছোটখাটো খাল পেরিয়ে যাচ্ছিল আর শব্দটা রক্তিমের কানে আছড়ে পড়ে গাঁইতির শব্দ হয়ে গেল। একশো লিটারের ড্রামটাকে কাটবে বলে কৃষ্ণ গাইঁতিটা তুলেছিল আর তখনই মেয়েটা ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটাকে বাঁচানোর জন্যে।
কেউ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ও মেয়ে সরে যাও, সরে যাও, লেগে যাবে।’
শুনে আপনা থেকেই রক্তিমের চোখ বুজে যায়। দড়াম করে একটা শব্দ, ড্রাম ফেটে গলগল করে খানিকটা গুড় জল বেরিয়ে এল। কোমর-ছাপানো চুলে লাল ফুল সেইসময়ে জলের ধারে হেলে-থাকা শিরীষ গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে দুলে দুলে হাসছে। হাসির মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যাতে গা ছমছম করে ওঠে। মুখটা চেনা চেনা লাগছিল। আগে কি ওকে দেখেছে নাকি কারও হালকা আদল রয়েছে যেটা ধরতে পারছে না।
টু-টায়ার এসির বন্ধ দরজা জানলা ভেদ করে একটা বুনো গন্ধ ভেসে আসছিল। গোটা কামরা জুড়ে এখন ঘন অন্ধকার আর নিঃঝুম ঘুম। কিন্তু বুনো গন্ধটা কোথা থেকে আসছে? মেয়েটা কে?
গন্ধটার ঘ্রাণ নিতে নিতে রক্তিমের মনে হচ্ছিল ও যেন অনন্ত সময়ধারার মাঝখানে একটা অদ্ভুত বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। যদি সব ঠিকঠাক থাকে— না থাকার কোনও কারণ নেই, তবুও কি নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায়? বারবার খালি সেই মেয়েটার খিলখিল হাসি মনে পড়ছে আর গা ছমছম করে উঠছে। কার মত দেখতে ওকে? খুব চেনা একটা মুখ। অথচ মনেই পড়ছে না।
যদি সব ঠিকঠাক থাকে তাহলে বারো ঘন্টা পরে দুই বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর সঙ্গে সমুদ্রে দাপাবে। শুধুই কি দাপাবে? পিয়ালির কথা মনে হতেই ওর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। মেয়েটা দিন দিন বড্ড বেশি সুন্দরী হচ্ছে। মেয়েরা তো নাকি পুরুষের চাউনি দেখলে মনোভাব বুঝে ফেলে। তা, ও কি কিচ্ছু বোঝে না? নাকি রক্তিমকে খেলাচ্ছে? বারো ঘন্টা পরে ও পিয়ালিকে ভেজা পোশাকে দেখতে পাবে।
আর ঠিক বারো ঘন্টা আগে ও মাতঙ্গীপুরের সরু আল দিয়ে যাচ্ছিল। দুপাশে ধানখেত রেখে এগিয়ে মাঠ ছাড়িয়ে গ্রামে উঠতেই বাঁশবাগান। রোগা চিমসে ক্যাঁকলাসের মত দেখতে লোকটা গত সপ্তাহেই খবরটা দিয়েছিল। মাতঙ্গীপুরে নাকি রমরমিয়ে চোলাই মদের কারবার চলছে।
যেখানে পাকুড় গাছের গায়ে রাস্তা ধাক্কা খেয়েছে সেটাই প্রথম চিহ্ন। সেখান থেকে ডানদিকে মোটামুটি একশো ফুট গেলেই পুকুরের এক পাশে বাঁশবন। তার ভেতরেই কারবার চলে।
পাকুড়গাছের কাছে পৌঁছতেই একঝাঁক টিয়াপাখি ডাকতে ডাকতে মাথার ওপরে চক্রাকারে কিছুক্ষণ ঘুরে তারপর ঝাঁক বেঁধে বসল পেয়ারা গাছের মাথায়। তুমুল স্বরে ডাকাডাকি। আর তখনই সেই মেয়েটা পেয়ারা গাছ থেকে এমনভাবে সড়াৎ করে নেমে এসেছিল, যেন ওই পাখিগুলোই ওকে সচেতন করে দিয়েছে। পেয়ারা গাছ থেকে নেমে সোজা দৌড় মেরেছিল মেয়েটা। পেছন পেছন টিয়াপাখিগুলো উড়ে যাচ্ছিল ডাকতে ডাকতে। আর অশোকবাবু চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, ‘এই রে! মেয়েটা খবর দিয়ে দেবে। শীগগির চলো।’
বয়স কত হবে? ষোল সতেরোর বেশি নয়। জংলা ডুরে শাড়িটা হাঁটুর ওপরে তোলা আর খালি গায়ে আঁচলটা ভালো করে জড়ানো। মুখটা মনে পড়তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল রক্তিমের। কালোর ওপরে একটু অদ্ভুত ধরণের সুন্দরী। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মধ্যে এমন কিছু ছিল যা পুরুষকে সরে থাকতে বাধ্য করে।
বন্ধ কামরায় সেই বুনো গন্ধটা ক্রমশ আরও তীব্র হয়ে ওর নাকে লাগতে শুরু করল আর সেই সঙ্গে টিয়া পাখির ডাক। খুব অস্বস্তি নিয়ে চোখ খুলল রক্তিম আর বুঝতে পারল যে টিয়া নয়, ইঞ্জিনের হুইশল। কিন্তু এসি কামরার মধ্যে কি হুইশলের শব্দ শোনা যায়? শরীরটা আনচান করছে, ঢক ঢক করে জল খেল রক্তিম। তাও ঘুম আসছে না।
পাশ ফিরল তাও অস্বস্তি কাটছে না। বুনো গন্ধটা বড্ড নাকে লাগছে। সাইড আপার থেকে নামল, টয়লেট যাবে। গায়ে লাগোয়া চারজনের খোপ থেকে তখন বন্ধুদের ঘুমন্ত নিঃশ্বাস। একদম নিচে পিয়ালি শুয়েছে। একটু দাঁড়াল রক্তিম। পিয়ালিকে একবার স্পর্শ করার ইচ্ছেটাকে প্রবল শক্তিতে দমন করে অন্ধকার প্যাসেজ ধরে টালমাটাল পায়ে গিয়ে কাচের দরজা ধরে টানল। সেই বুনো গন্ধটা আরো তীব্র এবং পরমুহূর্তে রক্তিমকে চমকে দিয়ে দরজার ফ্রেমে পিয়ালি। এতই আচম্বিতে যে রক্তিমের গলা দিয়ে একটা অস্ফুট আতঙ্ক ধ্বনি বেরিয়ে এল।
পিয়ালি একটা অদ্ভুত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল? পায়ে লাগল?’
ওর গা দিয়েই কি বুনো গন্ধটা আসছে? গলার স্বরটা কেমন যেন একটা। শুনলেই গা শিউরে ওঠে।
‘না ঠিক আছে’ কাষ্ঠ হাসল রক্তিম।
পিয়ালিও হাসল এবং রক্তিম ফিরে এসে আবার বাঙ্কে উঠল। ওর ঘুম আসছিল না আর খালি মনে হচ্ছিল পিয়ালিও ঘুমোয়নি এবং অন্ধকারেও ওর চোখ জ্বলছে। ও যেন রক্তিমের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। ক্রমশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রক্তিম ফিরে যেতে থাকল মাতঙ্গীপুরে।
ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ওরা বাঁশবনে ঢুকেছিল। আর তখনই প্রথম বুনো গন্ধটা এসে নাকে লাগে। লুকোনো ভেজাল মদের সন্ধানে রক্তিম বাঁশবাগানের যত ভেতরে ঢুকছিল তত বুনো গন্ধটা ঘন হয়ে আসছিল আর সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে আর কে আসছে তাও দেখেনি। আচমকা একটা ঝোপের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ হাসি ভেসে এসেছিল। এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল যে ওই মেয়েটা সাবধানে মুখ বাড়িয়ে দেখছে। চোখাচোখি হতেই ঝট করে লুকিয়ে পড়ল ঝোপের ভেতরে আর সেই দেখে রক্তিম নিশ্চিত হয়ে গেল যে ওখানে ডেফিনিটলি মদ লুকোনো আছে। নইলে মেয়েটা উঁকি মেরে ওদের দেখেই লুকিয়ে পড়ল কেন?
হামিদকে পেছনে আসতে বলে রক্তিম ঢুকে গেল ঝোপের ভেতরে। কিন্তু কোথায় কী? মদের তো চিহ্ন নেইই, মেয়েটাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। আরও দু-পা এগোলো রক্তিম।
‘স্যার আর যাবেন না, জায়গাটা মনে হচ্ছে ভালো না’ হামিদের অস্পষ্ট গলা শুনতে পেলেও রক্তিম ভ্রুক্ষেপ করল না। অন্ধের মত কেবলই এগিয়ে যেতে থাকল।
একসময়ে মনে হল কে যেন পেছন থেকে ডেকে উঠল, ‘রক্তিম, রক্তিম!’
কে ডাকল? অশোকবাবু কি? নাকি বিকাশদা? পেছন ফিরতে গিয়ে কাঁটার খোঁচা খেল গালে। বুনো ঝোপগুলো ওকে এমনভাবে আটকে ফেলেছিল যে কিছুতেই মাথা ঘোরাতে পারছিল না। ওর যেন দম আটকে আসছিল। পেছনটায় বড্ড কাঁটা, সামনে দিয়ে ঘুরে বেরোতে হবে। কিন্তু ওই কাঁটাঝোপ ভেদ করে ও সামনে এল কী করে সেটাই বুঝতে পারছিল না। হামিদই বা কোথায়?
কোনও দিকে না তাকিয়ে এলোপাথারি পা ফেলে সামনের ঝোপ ভেদ করে পা ফেলতেই যেন শূন্য থেকে ভেসে উঠল একটা মুখ।
প্রচণ্ড চমকে উঠেছে ও। সেই মেয়েটা। এখন আর গায়ে শাড়ি নেই। এলো চুলে নিজেকে ঢেকে রেখেছে। রক্তিমকে চমকে উঠতে দেখে তীক্ষ্ণস্বরে হেসে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে মাথার ওপরে টিয়াপাখির ডাক। নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল রক্তিম আর তখনই কেউ আবার ডেকে উঠল, ‘রক্তিম! আমরা এদিকে।’
ডাকটা শুনে একটু অন্যমনস্ক হতেই মেয়েটা দু-হাত দিয়ে দুম করে গলা টিপে ধরল। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে রক্তিম বুঝতে পারছিল ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে।
মেয়েটা বলে উঠল, ‘তোর রক্ত খাব শালা।’
সেই সময়ে পেছন থেকে খুব জোরে কেউ যেন টানল ওকে। আর মেয়েটাও গলা ছেড়ে দিয়ে বিচ্ছিরিভাবে হেসে উঠল। কেউ খুব জোরে ধাক্কা দিতে যেন দুঃস্বপ্নের মধ্যে থেকে জেগে উঠল রক্তিম।
সামনে একটা আবছা চেনা মুখ। কুয়াশা কেটে যাবার মত করে ঘোরটা কেটে যেতে রক্তিম দেখল মুখটা শাশ্বতর।
ওকে ঠেলে ঠেলে ডাকছে, ‘কী রে ওঠ, এসে গেলাম তো।’
ট্রেন থেমে রয়েছে। লোকজন মালপত্র নিয়ে নামতে শুরু করে দিয়েছে। বাইরে থেকে কুলি আর পাণ্ডার হাঁকডাক। উত্তীয়র কী একটা রসিকতায় পিয়ালি হেসে উঠল খিলখিল করে আর রক্তিম চমকে উঠল।
অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়ানো ছিটোনো রিসর্টটা মোহনার দিকে ঘেঁসা। শহরের কেন্দ্র থেকে বেশ দূরে বলেই বীচটাও একদম ফাঁকা। রিসর্টে ওদের বাদ দিয়ে জনা পনেরো লোক। রেজিস্টারে নাম ঠিকানা লেখার সময়ে রুমার কী একটা কথায় পিয়ালি জোরেই হেসে উঠল আর অমনি রক্তিমের গা ছমছম করে উঠল। ও এরকমভাবে হাসে কেন? গজদাঁতের জন্যে লোকে পিয়ালিকে সুন্দরী বলবে, কিন্তু রক্তিম সেদিকে তাকাতে পারছে না।
মালপত্র রেখে সকলেই দৌড়োল সমুদ্রে। গা ম্যাজম্যাজ করছে বলে রক্তিম যেতে চাইল না। সকলেই অবাক। এখানে এসে যে সমুদ্রে না গিয়ে ঘুমোতে চায়, এরকম প্রাণী ওরা জীবনে প্রথম দেখল। কিন্তু কেন ঘুমোতে চাইছে সেটা বলা যাবে না। ভোরে ট্রেনের স্বপ্নের মধ্যে সেই মেয়েটাকে নয়, রক্তিম দেখেছিল পিয়ালিকে। পিয়ালির গায়ে কোনও আবরণ ছিল না এবং রক্তিমের বুকে এসে পড়েছিল। রক্তিম চাইছিল স্বপ্নটাকে ফিরিয়ে আনতে।
কিন্তু ঘুমের বদলে আলিস্যিটা আরও চেপে বসল। ফলে ও ঠিক করে ফেলল সমুদ্রে যাবে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে সুইমিং পুল এবং তার পাশে গাছের ছায়ায় কাঠের হ্যামক দেখে আর লোভ সামলাতে পারল না। আরামে চোখটা বুজল আর অমনি না চাইতেই টুকরো টুকরো ছবি জেগে উঠল মাথায়।
পাগলের মত সাঁতার দিয়ে ফিরছিল অলোক। ওপরে উঠেও কথা বলতে পারছিল না। তার আগে বাঁশবাগান খুঁজে দুই জার চোলাই বের করেছিল। তারপর আরো খুঁজতে খুঁজতে ওরা গ্রামের অনেকটাই ভেতরে একটা পুকুরের ধারে এসে পৌঁছয়।
হেলে পড়া শিরীষ গাছের তলায় একটা ছোট ইঁটের পাঁজা। তার গা দিয়ে লতাপাতা উঠেছে। ওপরে একটা ওল্টানো খড়ের মূর্তি। কোন ঠাকুর ছিল কে জানে। আর চারপাশে স্তূপাকার এঁটোকাঁটা, রক্তমাখা ন্যাকড়া, মদের বোতল, শুকনো মালা। বেশ কটা সিঁদুর-মাখা ঘট ওল্টানো। বোঝাই যাচ্ছে যে এটা গ্রামের আঁস্তাকুড়। আর মেয়েটা ওই নোংরা থেকে শালপাতা তুলে চেটে চেটে কী খাচ্ছে। অসুখবিসুখও করে না এদের?
দল ছেড়ে কখন যে সম্মোহিতের মত মেয়েটার দিকেই এগিয়ে গিয়েছিল রক্তিম খেয়াল ছিল না। ওর দিকে চোখ পড়তেই একটা অপার্থিব হাসি খেলে গিয়েছিল মুখে, তারপর আঙুল তুলে মেয়েটা তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিল—
‘একলা একলা ভূতের মত কী করছ?’
চমকে উঠেছে রক্তিম। তারপর দেখল পিয়ালি। ভিজে সালোয়ার কামিজ লেপ্টে রয়েছে গায়ে। ভিজে চুল মুখে এসে পড়েছে। আর সেইদিকে তাকিয়ে রক্তিমের বুক কেঁপে উঠল।
‘এই তো’ কাষ্ঠ হাসল রক্তিম, ‘চান হয়ে গেল?’
‘কই আর হল?’ আদুরে গলায় বলল পিয়ালি, ‘সবাই মিলে না নামলে মজা হয়? চলো তো তুমি?’
হাত ধরে টানল রক্তিমের, ‘ওঠো না!’
বালির ওপরে বিরাট ছাতা টাঙানো। তার নিচে একটা চেয়ারে ডাঁই করে ওদের জামাকাপড়। রুমা আর উত্তীয় ঢেউয়ের সঙ্গে লাফাচ্ছে। শাশ্বত বালিতে পা ছড়িয়ে বসে। পিয়ালি দৌড়ে নেমে গেল জলে। জোর করে চিন্তাটা সরিয়ে দিয়ে রক্তিম এসে দাঁড়াল শাশ্বতর পাশে। তারপর কখন যে অন্যমনস্কভাবে জামা ছেড়ে জলে নেমে পড়েছে খেয়াল নেই। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পাড়ে। ছাতার নিচে উত্তীয়, শাশ্বত আর রুমা। তারপরেই ছাতাটা পাল্টে গিয়ে বাঁশের ছাউনি হয়ে গেল।
চারটে বাঁশের খুঁটির ওপরে পলিথিনের ছাউনি। তার নিচে পোড়া উনুন, এখনও গরম। তার মানে একটু আগেও কাজ হচ্ছিল। একটা টিনের ড্রাম ভর্তি গেঁজে যাওয়া জল মেশানো গুড়, সঙ্গে রবারের সরু পাইপ। চোলাই তৈরির স্পষ্ট প্রমাণ। অথচ এখন ত্রিসীমানায় কেউ নেই। সম্ভবত মেয়েটা এসে খবর দিয়েছে বলেই আসল জিনিসটা সরিয়ে ফেলার সময় পেয়েছে। কৃষ্ণ গাঁইতি তুলেছিল ড্রামটা কেটে দেবে বলে। আর সেইসময়েই মেয়েটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রামটা দু হাতে ঢেকে।
আর কেউ তখন চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘ও মেয়ে সরে যাও, সরে যাও, লেগে যাবে।’
নিজে থেকেই রক্তিমের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। যখন খুলল তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটা গালাগালির বন্যা ছোটাচ্ছে আর কাটা ড্রাম থেকে হুড় হুড় করে স্রোতের মত বেরিয়ে আসছে গেঁজে যাওয়া গুড়।
ঢেউয়ের ধাক্কায় পিয়ালি এসে পড়ল রক্তিমের গায়ে। কিন্তু সরে যাওয়ার আগেই পরের ঢেউটা ঝাঁপ দিল ওদের লক্ষ করে এবং রক্তিম জড়িয়ে নিল পিয়ালিকে। কয়েক মুহূর্তের জন্যে হাতের তালুতে একটা অলৌকিক কোমল অনুভূতি।
তারপরেই পিয়ালি ছিটকে গেল ওর কাছ থেকে, জলের দিকে ফিরতে থাকা ঢেউ ভেঙে গিয়ে বসে পড়ল বালিতে। রক্তিমের বুক ভালো-লাগায় এবং টেনশনেও ধড়াস ধড়াস করছে। যদি পিয়ালি শাশ্বতকে বলে দেয়! কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে করিনি। ঢেউয়ের ধাক্কায় ওই তো প্রথম গায়ে পড়েছিল! পরের ঢেউটা রক্তিমকে মাটিতে শুইয়ে দিল।
কান থেকে বালি বের করতে করতে ও উঠে এল পিয়ালির কাছে।
এই অবধি জল পৌঁছয়নি। ভিজে বালির ওপরে পিয়ালি একদম চুপ করে বসে আছে। রক্তিমকে দেখে একবার চোখ তুলে তাকাল। কী ছিল সেই চোখে, রক্তিম পড়তে পারল না।
একটু পরে পিয়ালি খুব কাটা কাটা গলায় বলল, ‘এবার একটা বিয়ে করো, বুঝলে। বামুনের ঘরের এঁড়ে হয়ে কদিন কাটাবে?’
লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল রক্তিম। বিড়বিড় করে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে। শাশ্বতকে প্লীজ কিছু বোলো না।’
পিয়ালি কোনও উত্তর দিল না। আর একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে রক্তিম মাথা নিচু করে বসে রইল ওর সামনে। একটু আগের ভালো লাগার পাশাপাশি একটা গ্লানিও আচ্ছন্ন করছিল ওকে।
‘বামুনের ঘরের এঁড়ে হয়ে কদিন কাটাবে? বামুনের ঘরের এঁড়ে?’ বলার সময়ে ধিক্কার মিশেছিল পিয়ালির কণ্ঠে। অথচ এই পিয়ালিই আগে বলত, ‘রক্তিমদার তাকানোটা খুব সুন্দর, খুব পবিত্র।’
আর মেয়েটা আঙুল তুলে রক্তিমকে বলেছিল ‘চোখ গেলে দেব। তোর রক্ত খাব শালা।’
তারপর সেই হেলানো শিরীষ গাছটা থেকে যে খোঁচা-মত ডালটা বেরিয়ে এসেছিল, তার ওপরে লাফ মেরে বসে পড়েছিল। পা তুলে দিয়েছিল আরেকটা ডালে। সেটা গুটলি পাকিয়ে ঠিক একটা মানুষের মুখের আদল। গাছটা ভর্তি টিয়াপাখি।
ছাতার নিচ থেকে রুমা হাত তুলে ডাকল। এবার উঠতে হয়। প্রত্যেকেরই পেটে আগুন জ্বলছে। খাওয়ার টেবলে বাকি চারজন হাসিঠাট্টা শুরু করলেও রক্তিম একদম চুপ মেরে গেছে। যতবার চোখ তুলেছে পিয়ালির সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে এবং পিয়ালির ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি জেগে থেকেছে। যেটা দেখে রক্তিমের ভয় করছিল। ও তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে এদের সঙ্গে আর কোথাও যাবে না।
খাবার পরে এড়িয়ে গড়িয়ে শেষ অবধি যখন ওরা বীচে এসে পৌঁছল ততক্ষণে সূর্য ডুবে গিয়েছে। কেবল সামান্য লালচে হলদেটে একটা আভা। তবে সামনেই পূর্ণিমা বলে একটু পরেই প্রত্যেকটা ঢেউয়ের মাথায় চাঁদ জেগে উঠল।
‘জায়গাটা হেব্বী নামিয়েছিস। খোঁজ পেলি কী করে?’
‘খবর রাখতে হয় ওস্তাদ! স্বর্গদ্বারে থাকলে তুই এই রকম ফাঁকা বীচ পেতিস?’ উত্তীয় হাসল।
‘উত্তীয়দা, পৃথিবীতে যদি স্বর্গ থেকে থাকে তবে তাহা এইখানে এইখানে এইখানে’ পিয়ালি বলে উঠল।
‘হুঁ এটাকে স্বর্গ হতেই হবে। এর একটু আগেই তো স্বর্গদ্বার’ রক্তিম হাসল।
ঝিরিঝিরি হাসি বয়ে গেল। তারপর শাশ্বত বলল, ‘না রে স্বর্গ নয়, এটাই আসলে স্বর্গদ্বার।’
‘কেন? তীক্ষ্ণ গলায় পিয়ালি জিজ্ঞেস করতেই রক্তিমের গায়ে কাঁটা দিল।
‘স্বর্গ হবে কী করে? আসল জিনিস নেই তো’ উত্তীয়ের দিকে ফিরে শাশ্বত হাত দিয়ে ইঙ্গিত করল, ‘এনেছ? সোমরস।’
অপ্রতিভভাবে উত্তীয় মাথা নাড়ল— আনা হয়নি।
‘ধুস!’
শাশ্বতর মুখ দিয়ে হতাশাটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সকলকে চমকে দিয়ে একটা অশুভ খ্যানখেনে গলায় পিয়ালি বলে উঠল, ‘তিনটে দামড়া ব্যাটাছেলে সোমরস যোগাড় করতে পারছ না?’
প্রত্যেকের কানে কথাটা খুবই অদ্ভুত শোনাল। কেননা কালেভদ্রে কোনও অকেশনে রুমা ঠোঁটে ঠেকালেও পিয়ালি একদমই ছোঁয় না। আর বেড়াতে বেরিয়ে তো ওটা খাওয়ার ঘোরতর বিরোধী। শুধুমাত্র ওর কারণেই আনা হয়নি।
উত্তীয় অবাক হয়ে বলল, ‘একী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!’
পিয়ালি কেমন ঘোর লাগা ভঙ্গিতে হাসল, ‘স্বর্গদ্বারের কাছে দোকান আছে তো! আসার সময়ে দ্যাখোনি?’
‘আমি আর শাশ্বতই বোধ হয় সরকারকে সবচেয়ে বেশি আবগারী রেভেনিউ দিই, সেই আমাদেরই চোখে পড়ল না, আর তুমি দেখতে পেয়ে গেলে? মাগো মা, পায়ের ধুলো দাও’ বলে উত্তীয় ওর পায়ের সামনে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
পিয়ালি পা সরাল না। চোখ তুলে একবার তাকাল রক্তিমের দিকে। ওর পায়ের সামনে উত্তীয়র মাথা দেখেই রক্তিম আবার দৃশ্যটা দেখতে পেল। গাছের ডালে মেয়েটা বসে রয়েছে, পায়ের নিচে অন্য ডালটা ঠিক যেন মানুষের মাথা।
‘আমরা কি এই চারদিন এখানেই কাটাব? না কোথাও যাব? কিছু ভেবেছ?’ শাশ্বত জিজ্ঞেস করল।
‘কাল তো মন্দিরে যাব’ পিয়ালি বলল। গলায় অন্য রকম কোনও স্বর নেই তো এখন। তাহলে কি আমিই ভুল শুনছি? ভাবল রক্তিম, এই ট্রমা থেকে বেরোতেই হবে।
জোর করে মনটাকে এইদিকে ফিরিয়ে এনে বলল, ‘সেই কোণারক আর উদয়গিরি-খণ্ডগিরি, সাক্ষীগোপাল? তার চেয়ে এখানেই রেস্ট আর আড্ডা, খারাপ কীসে?’
‘আমি একটা সাজেশন দিতে পারি। কাছেই রঘুনাথপুর বলে একটা জায়গা আছে। অসাধারণ পট—’
উত্তীয় কথা শেষ করার আগেই রুমা লাফ মেরে উঠে পড়ল, ‘দুর সমুদ্রে এসে কেউ পাড়ে বসে থাকে নাকি?’
পায়ে পায়ে উত্তীয় আর শাশ্বত গিয়ে দাঁড়াল জলের কাছে। ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। পাড়ে শুধু পিয়ালি আর রক্তিম। পিয়ালি উঠে দাঁড়াল। হাস্কি একটা গলায় বলল, ‘যাবে না?’
ওই অলৌকিক জ্যোৎস্না, আছড়ে পড়া ঢেউ আর পিয়ালির গলা সব মিলিয়ে রক্তিমের তখন ভীষণ ভয় করছিল। কোনও কথা না বলে কেবল মাথা নাড়ল। পূর্ণিমা বলেই হয়ত ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস একটু বেশিই মনে হচ্ছে।
সেটা দেখেই পিয়ালি চেঁচিয়ে বলল, ‘অ্যাই কেউ জলে নামবে না।’
বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যাতে রক্তিমের হাড় হিম হয়ে গেল। কেননা মেয়েটাও একটা কাঁচা গালাগাল দিয়ে লাফ মেরে নেমে অশোকবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘শুয়োরের বাচ্ছা আমার পুকুরে নামবি না।’
তার আগে গাঁইতি চালিয়ে ওরা অস্থায়ী কারখানাটা ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু চারপাশে খুঁজেও একফোঁটা চোলাই বা চিটে গুড়ের চিহ্ন না দেখে অশোকবাবু বলেছিলেন, ‘অলোক, মহাদেব, পুকুরটা দেখে নেবে নাকি?’
‘তোমার পুকুরে আমরা কিচ্ছু করব না। কেবল দেখব কিছু লুকোনো আছে কি না,’ চোখ জ্বলে উঠলেও অশোকবাবু ঠান্ডা গলায় উত্তর দিয়েছিলেন।
‘আমার পুকুরে ওসব নেই, চল, ফোট এখান থেকে,’ মেয়েটা আরেকটা গালাগাল দিল।
সঙ্গে সঙ্গে অশোকবাবুকে আড়াল করে অলোক এসে দাঁড়াল, ‘মুখ খারাপ করছ কেন?’
মেয়েটা আবার গাল দিতেই অলোক পাল্টা গালাগাল দিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছিল। আর বিপদের গন্ধ পেয়েছিল রক্তিম।
মেয়েটা ফুঁসে উঠে সমানে অবৈধ ইঙ্গিতবাহী গালাগাল দিতে থাকল। রাগে উত্তেজনায় নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, আঁচল কিছুটা সরে গিয়ে যৌবন দীপ্যমান। রক্তিম চোরা চোখে তাকাচ্ছিল সেদিকে। অলোকও লুব্ধ দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে আবার নোংরা ইঙ্গিত করতেই অশোকবাবু প্রচণ্ড ধমক দিয়েছিলেন ওকে। মেয়েটা তেড়ে এসেছিল ওর দিকে আর হ্যা হ্যা করে হেসে অলোক জলে ডুব দিল জার খোঁজার জন্যে।
সাধারণত চোলাই কারবারীরা জালা বা কলসীতে গুড় ভরে মুখটা বেঁধে জলে ডুবিয়ে রাখে। এমনকি পলিথিনের জারিকেনে চোলাই ভরেও জলের নিচে লুকিয়ে রাখে। ওপর থেকে দেখে কেউ টের পায় না। কিন্তু অলোক আর মহাদেব তুখোড় সুইপার, বহুদিন আবগারীতে কাজ করছে। যেখানেই লুকোনো থাক, ওদের কাছে ধরা পড়বেই।
কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছিল না আর ওদের রোখ চেপে যাচ্ছিল। সেইসময়ে ধীর পায়ে মেয়েটা জলে নেমে সাঁতরে এগিয়ে চলল মাঝপুকুরে যেখানে কচুরীপানার জঙ্গল সেইদিকে।
পাড়ের কাছে খোঁজাখুঁজি করতে করতে অলোক তেরচা চোখে সেটা দেখল এবং বলল, ‘মেয়েটা ওদিকে গেল কেন? মনে হচ্ছে ওইখানেই লুকিয়ে রেখেছে। দেখে আসি।’
অশোকবাবু ধমকের সুরে বললেন, ‘অলোক কোনও অসভ্যতা করবি না কিন্তু।’
দাঁত বের করে হেসে অলোক ভেসে গেল জলে।
বাকিদের সঙ্গে রক্তিমও দেখল যে অলোক গভীর জলে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওর বুক তখন ধুকপুক করছে। কেননা মেয়েটা কিছুটা সাঁতরে গিয়ে ডুব দিয়েছে। আর দিয়েছে তো দিয়েছেই। রক্তিম দেখছিল ঘড়ির কাঁটা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু মেয়েটার ওঠার নাম নেই।
‘শীগগিরই উঠে এসো, ও বাবারা, ও পুকুরে নামতে নেই’ প্রাকৃতিক কাজ সারতে এসে একটা বুড়ো লোক ওদের দেখে কেমন ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠেছিল।
‘কেন কী হয়েছে?’ হামিদ তেড়ে উঠেছিল, ‘তুমি নিজের কাজে যাচ্ছো যাও।’
‘আমি কি কোনও খারাপ কথা বললুম? অই পুকুর উচ্ছুগ্য করা আছে। নামতে নেই।’
‘এই চল তো এখান থেকে। মেরে না মালাইচাকি ভেঙে দেব’ সঞ্জিত হাতের লাঠি উঁচিয়ে ধরতে লোকটা টলমল পায়ে ঝোপের আড়ালে চলে গেল। তখনও শোনা যাচ্ছে ওর গলা যে ওই পুকুরে ঠাকুর আছে, নামতে নেই।
আর সেইসময়ই অলোকের গলা ফেড়ে একটা মারণ চিৎকার।
চমকে উঠে ওরা দেখল অলোকের মাথাটা জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে। তারপর কোনওরকমে হাঁচোড়পাঁচোড় করে পাড়ের দিকে সাঁতরাতে থাকল। একটু এগোতেই ওর মাথা আবার ডুবে গেল। আবার অলোক মাথা ভাসিয়ে তুলল। কোনওরকমে ডাঙায় উঠে থরথর করে কাঁপছিল। কথা বলতে পারছিল না। রক্তিম তাকাল জলের দিকে। মেয়েটা এখনও ওঠেনি।
অলোককে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটু দম পাবার পর ওর কথা শুনে তো উপস্থিত সকলেরই মাথা ঘুলিয়ে গেল। এরকম আবার হয় নাকি? ইতিমধ্যে মেয়েটা যে কখন জল থেকে উঠে এসেছে কেউ দেখেনি। জ্যালজেলে শাড়িটা জলে ভিজে গায়ে এমনভাবেই লেপ্টে রয়েছে যে থাকা না থাকা সমান। আচমকাই একদম সামনে দাঁড়িয়ে অপার্থিব ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল, ‘কী রে শালা আমাকে খাবার খুব শখ, না? আয় খাবি।’
‘যাও মেয়ে যাও’ অশোকবাবু হাতজোড় করেই বলেছিলেন।
মেয়েটা রক্তিমের দিকে আঙুল তুলে বলেছিল, ‘তোর রক্ত খাব শালা।’
‘যাও মা যাও’ অশোকবাবু আবার হাতজোড় করেছিলেন।
অলোক এত ভয় পেয়েছিল যে অফিসে এসে নেতিয়ে পড়ল। গল্পটা শুনে সকলেই বলছে নেশার ঘোরে কী দেখেছে তার ঠিক আছে? এরকম আবার হয় নাকি?
অলোক জোর গলায় বলছে যে ও মদ খেয়ে নামেনি। নেশার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ও যেটা বলছে সেটা হওয়া সম্ভব নয়। অথচ ওর মুখচোখে তো আতঙ্ক আঁকা ছিল, মৃত্যুভয় না পেলে ওভাবে লোকে চেঁচাতে পারে না। তাহলে? মানতেও পারছে না, উড়িয়েও দিতে পারছে না। রক্তিমের গা হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিল। কেননা মেয়েটা ওকেও বলেছে ‘তোর রক্ত খাব’।
‘তোমার কী হয়েছে বল তো? থেকে থেকেই কীরকম হারিয়ে যাচ্ছ?’ পরের দিন শেষ দুপুরে রুমা জিজ্ঞেস করল।
সকালে জগন্নাথ দর্শন করে ওরা বেরিয়েছিল রঘুনাথপুরের দিকে। রঘুনাথপুর ঘুরে বেশ কিছু পট কিনে তখন ওরা ফিরছে। যাওয়-আসার পথে অন্যরা নিজেদের মধ্যে গল্প খুনসুটি করলেও রক্তিম আগাগোড়াই চুপ। একে তো অলোকের ভয়ার্ত চিৎকার আর অবিশ্বাস্য কাহিনী কানে লেগে রয়েছে আর সেই সঙ্গে কিছুতেই মনে পড়ছে না যে মেয়েটাকে কার মত দেখতে। খুব চেনা একটা আদল, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না। কেন যেন মনে হচ্ছে মেয়েটাকে পিয়ালির মতই দেখতে। ওই কালো গায়ের রং, ধারালো মুখচোখ এবং ভয়াল দুটো গজদন্ত। কিন্তু সমুদ্রের ঘটনাটার পর থেকে পিয়ালির দিকেও আর তাকাতে পারছে না। সব মিলিয়ে একটা ট্রমা।
রুমার প্রশ্ন শুনে হাসার চেষ্টা করল, ‘কই? কিছু হয়নি তো?’
‘ভয় করছে কোনও কারণে?’ পিয়ালি প্রশ্নটা করলেও রক্তিমের মনে হল যেন সেই মেয়েটাই জানতে চাইছে। সেই একই রকমের কথা বলার ভঙ্গি।
‘ভয়? ভয় কেন?’ রক্তিম আমতা আমতা করল ।
‘সে তুমিই জানো,’ পিয়ালির গলা তীক্ষ্ণ, গজদাঁতদুটো হিংস্রভাবে বেরিয়ে এসেছে। এবার বুঝি রক্তপান করবে।
‘রঘুরাজপুরের এত বিখ্যাত পট, তাও ভালো করে দেখলে না। অথচ তুমি নাকি শিল্পরসিক। ব্যাপারটা কী?’
বাইরে ধানক্ষেতের ওপরে দুপুরের রোদ ঠিকরে যাচ্ছে। রক্তিম কী উত্তর দেবে? সত্যিই যে ওর ভয় করছে সেটা তো আর বলা যায় না।
‘সামনেই একটা ছোট গাঁও আছে, বিরহা গাঁও। সেঠিকু কী যিবো?’ ওড়িয়া বাংলা মিশিয়ে ড্রাইভার প্রশ্ন করল।
‘কী আছে ওখানে?’
‘মন্দিরঅ অছি, অনেক পুরুনা। দ্বাপরঅ যুগের মন্দিরঅ। যিবো?’
‘দ্বাপর যুগের মন্দির? তাহলে তো দেখবই।’
‘কীসের মন্দির?’
‘মাতঙ্গী মাতা।’
‘কে রে?’ শাশ্বত ফিসফিস করল।
উত্তীয় মাথা নাড়ল— জানে না।
রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ঢুকে মন্দিরটা। বাইরে থেকে বোঝা যায় না যে ভেতরটা এত বড়। ওদের দেখে পাণ্ডা যেভাবে দৌড়ে এল তাতে বোঝাই যায় বাইরের লোকজন বিশেষ আসে না।
মন্দিরে পা দিয়েই রক্তিমের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। যদিও কোনও কারণ নেই, তবু ওর মনে হচ্ছিল এই রকম কোনও জায়গায় যেন ও আগেও এসেছে। অস্পষ্ট কিছুর একটা আভাস পাচ্ছিল, কিন্তু কী, সেটা বুঝতে পারছিল না। এই বিরহা গাঁও-এর কথা তো ড্রাইভার না বললে জানতেই পারত না। তাহলে এরকম মনে হচ্ছে কেন?
সামনেই যে বাঁধানো পুকুর, সেটা নাকি শিব আর পার্বতীর ঘাম থেকে সৃষ্টি হয়েছে, সেই যখন ওঁরা চণ্ডাল-চণ্ডালিনী রূপ ধরে মৈথুন করছিলেন। পার্বতীর সেই চণ্ডালিনী রূপেরই নাকি পুজো হয় এখানে। সেই রূপেরই নাম মাতঙ্গী— দশ মহাবিদ্যার একজন। ওই পুকুরে নামা নিষেধ। রক্তিম একদৃষ্টে তাকিয়েছিল জলের দিকে।
‘কী হল? আসো।’ পাণ্ডার ডাকে সম্বিত ফিরে পেয়ে ও দেখল বন্ধুরা এগিয়ে যাচ্ছে মূল মন্দিরের দিকে। এগোতে যাবে, সাপের মত কী একটা পা জড়িয়ে ধরল। চমকে লাফিয়ে উঠেছে রক্তিম। তারপরে দেখল সাপ নয়, একখানা ছেঁড়া রক্তমাখা ন্যাকড়া। মাটিতে পড়ে ছিল, চলতে গিয়ে পায়ে জড়িয়ে রয়েছে। পা ঝাড়লেও গেল না বরং আরো জড়িয়ে গেল। কোনওরকমে দু-আঙুলে তুলে পাশে ফেলে দিল। বড্ড ঘেন্না করছে, আঙুল ভর্তি অস্বস্তি। একই রকম আরও রক্তমাখা কাপড় পাশে রেলিং এ ঝুলছে।
‘ঘ্রুনা করিবঅ নহি, ঠাকুরানি তমকু দেখা দেবে’ রক্তিমের মুখ দেখে পাণ্ডা বলল। আরো বলল যে এই সব কাপড় নাকি ঋতুমতী মেয়েরা মানতের জন্যে দিয়ে গিয়েছে। এতে দেবী প্রীত হন।
শুনে পিয়ালির কোনও ভাবান্তর না হলেও রুমা মুচকি হেসে মুখটা নিয়ে এসেছিল ওর কানের কাছে। কী বলেছিল রক্তিম শুনতে পায়নি, কিন্তু তারপরেই পিয়ালির গজদন্তে ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, ‘তাহলে কিছু একটা মানত কর।’
হাসতে হাসতে রুমা চাপড় মেরেছিল ওর গায়ে।
দুই সখীর হাসাহাসি দেখতে দেখতে পুরোহিত তখন মাতঙ্গী দেবীর এই বিশেষ রূপের আবির্ভাবের গল্প শুরু করেছিল।
এক সময়ে নাকি শিব আর পার্বতী খেতে বসেছিলেন। হঠাৎ এক ষোড়শী কন্যা মাটি ভেদ করে উঠে এসে মেঝেতে যত এঁটোকাঁটা পড়েছিল সেগুলো সব খেতে চাইলেন। খেয়ে সব পরিষ্কার করার পর শিব নাকি বর দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আমাদের উচ্ছিষ্ট খেয়েছ তাই তোমার নাম উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গী। যে তোমার পুজো করবে সে সব কিছুতেই সফল হবে।’
কিন্তু এঁর পুজো করতে গেলে নাকি দুনিয়ার এঁটোকাঁটা আর ওই সব কাপড় দিয়ে পুজো করতে হয়।
দর্শনার্থীরা যাতে মাথা নিচু করতে বাধ্য হয় তাই বোধ হয় গর্ভগৃহের দরজাটা খাটো রাখা হয়েছে। ভেতরে দুটো টিমটিমে প্রদীপ, দেওয়াল ভর্তি ভুসো কালি। চারপাশটা নোংরা, চিটচিটে। ভ্যাপসা গুমোট।
একটা চৌকো পাথরের ওপরে সিংহাসনে পদ্মাসনে দেবী বসে রয়েছেন। অন্ধকারে ভালো করে মুখই দেখা যাচ্ছে না। বেদীতে প্রচুর রজোবস্ত্র আর খাবার ছড়ানো। গোটা ঘর মদের গন্ধে ভরপুর, মদ নাকি পুজোর প্রধান উপাদান। রক্তিমের গা ঘিনঘিন করছিল, দম আটকে আসছিল। একটু হাওয়া চাই। অলোকেরও কি এরকমই কষ্ট হচ্ছিল?
পিয়ালি অন্যমনস্কের মত বলল, ‘ওই পুকুরে একটা কিছু হয়েছিল না?’
চমকে উঠল রক্তিম। কাকে বলছে কথাটা? ও জানল কী করে? পাণ্ডা খুব উৎসাহের সঙ্গে সেই ঘুপচি ঘরে দাঁড়িয়েই বলতে শুরু করল যে দেবী নাকি ওই পুকুরে চান করতে নেমেছিলেন। সেই অবস্থায় তাঁকে দেখে এক অসুর কামমোহিত হয়ে তাঁকে ধরবে বলে জলে নেমেছিল। দেবী তখন অসুরকে জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলেন।
‘খরাব চিন্তা করি জলে নামা মনা।’
আর তখনই রক্তিমের মনে হল ও যেন ঢেউয়ে ভাসছে। দূর থেকে কারা যেন কথা বলছে। কী বলছে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও একটা তীক্ষ্ণ গলা চিনতে ওর ভুল হয়নি। ছিটকে পড়ে যাবার আগেই উত্তীয় ওকে জড়িয়ে ধরল। তারপর শাশ্বত আর উত্তীয় ওকে ধরে বাইরে নিয়ে এল।
‘কী রে কী হল?’ ওদের গলায় উদ্বেগ।
রক্তিম ফ্যাকাশে হাসল, ‘কিছু না। হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল। চল ঠিক আছে।’
‘না না। তুই চাতালে একটু শুয়ে থাক। তাড়ার তো কিছু নেই।’
‘তমে এইঠি শুই রহ, সবঅ ঠিক হই যিব। ঠাকুরানি তমরঅ ভলঅ করিবেন,’ বলে পাণ্ডা রক্তিমকে চাতালে শুয়ে পড়তে ইশারা করল। রক্তিম রাজি হচ্ছিল না, কিন্তু বন্ধুরাও জোর করে ওকে শুইয়ে দিল।
পাণ্ডা বলল, ‘তমরা উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গীর ফটো দেখিবঅ আসঅ।’
পুরো সময়টা পিয়ালি একটাও কথা বলেনি, সামান্য উদ্বেগও ওর চেহারায় ছিল না। ওকে শুয়ে থাকতে দেখে শাশ্বতদের দিকে ফিরে বলল। ‘ওকে একা রেখে সবাই চলে গেলে কী করে হবে? আমি থাকছি ওর সঙ্গে।’
রক্তিম প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ‘না না কাউকে থাকতে হবে না। আমাকে একটু একলা থাকতে দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
পিয়ালি অদ্ভুত চোখে তাকাল ওর দিকে, ‘শিয়র? আমার কিন্তু কোনও অসুবিধে হত না।’
‘না না’ রক্তিম পাগলের মত মাথা নাড়ল।
পিয়ালি টেরা চোখে ওকে দেখল। তারপর কিছু না বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গী দেবীর ছবি দেখতে। চেঁচানোটা হয়ত ঠিক হয়নি, কিন্তু রক্তিমের কিছু করার নেই। কেননা পিয়ালির ঠোঁটের কোণে ও একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠতে দেখেছে।
ঠিক সেরকম হাসি আবার ফুটে উঠল সন্ধেবেলা, ট্যাব থেকে রক্তিমকে উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গীর ছবি দেখানোর সময়ে।
তার আগে রুমা বলছিল, ‘যাই বলো মন্দিরটা বহুৎ নোংরা।’
যেন তাতে সায় দিয়েই একটা ঢেউ ওদের সামনে একগাদা হীরের কুচি ছড়িয়ে দিল। আজকেও চাঁদটা খুব সুন্দর বলেই হয়তো একটার পর একটা ঢেউ সেটাকে মাথায় করে ওদের পায়ের কাছে রেখে যেতে শুরু করল।
‘ওই দেবী তো নাকি ওইভাবেই থাকতে পছন্দ করে’ শাশ্বত বলল।
‘কিন্তু ঠাকুরদেবতাকে ওরকম নোংরার মধ্যে রাখাটা’ রুমা আবার মাথা নাড়ল, ‘জাস্ট যায় না।’
‘দেবীর যদি ইচ্ছে হয় ওইভাবে থাকতে তোমার আমার কী?’
‘প্রচুর টিয়াপাখি কিন্তু মন্দিরে।’
‘উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গীর বাহন তো টিয়াপাখি। পাণ্ডা বলল শুনলে না!’
এই সব কথার মধ্যেই হঠাৎই মনে পড়তে রক্তিম বলেছিল, ‘আচ্ছা শোন, পাণ্ডাটা তখন উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গীর ছবি দেখাবে বলল। দেখেছিস তোরা?’
‘হ্যাঁ।’ খ্যাক খ্যাক করে হাসল উত্তীয়, ‘একটা অসুর আছে, তার মুখটা না, কিছু মনে করিস না মামা, একদম তোর মত।’
শাশ্বত হো হো করে হেসে উঠল, ‘হ্যাঁ মাইরি। দেখে হেসে বাঁচি না।’
‘আহা! আর দেবীর মুখটা নিজের বউয়ের মত’ রুমা বলল, ‘সেটা বলো। নইলে রক্তিমদা ভাববে আমরা ওকে নিয়ে মজা করছি।’
‘কী ভুলভাল বকছিস’ গলায় হালকা ঝাঁঝ থাকলেও রক্তিমের বুক ধুকধুক করছে। মনে হচ্ছে ছবিটা না দেখাই ভালো। এমন কিছু দেখবে যেটা ওর সহ্য হবে না।
ট্যাবটা বাড়িয়ে দিতে দিতে পিয়ালি বলল, ‘তোমরা হাসছ। কিন্তু সত্যিই ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডটা আমার ভীষণ চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি।’
নেবার সময়ে রক্তিমের আঙুলের সঙ্গে পিয়ালির আঙুলের ছোঁয়া লাগল এবং রক্তিম আক্ষরিক অর্থেই শক খেল। ওর হাত এরকম অস্বাভাবিক গরম কেন? আর ছবিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে রক্তিমের হৃৎপিন্ডটা ধড়াস করে উঠল।
জলাশয়ের ধারে হেলে-পড়া একটা গাছের ডালে মাতঙ্গী দেবী বসে আছেন। শাড়িটা হাঁটুর ওপরে তোলা। পায়ের নিচে নরকরোটি। গাছ ভর্তি টিয়াপাখি। চারপাশে নোংরা ছড়ানো। আর পুকুরে একটা ডুবন্ত লোক।
‘ডুবন্ত লোকটাই অসুর,’ যেন বহু বহুদূর থেকে পিয়ালির কন্ঠস্বর ভেসে এল।
কিন্তু রক্তিমের কানে কোনও কথা ঢুকল না। একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ছবিটার দিকে। দেবী আর অসুর দুজনের মুখই ওর চেনা। একটা অবিশ্বাস্য গল্প শুনিয়েছিল অসুর।
‘দম নিয়ে আবার ডুব দেব ভেবে যেই উঠতে গিয়েছি অমনি মনে হল কে যেন আমার মাথাটা জলের নিচে চেপে ধরছে। ছাড়াতে পারছিলাম না। কোনওরকমে ছাড়িয়ে ভেসে উঠেছি, অমনি পা ধরে টানতে শুরু করল। ধাক্কা যে মারব, কাকে মারব? কেবল চুড়ি পরা দুটো হাত। ধড় মাথা কিছু নেই। কেবল হাত!’
এইবারে ও বুঝতে পারছে মেয়েটাকে কেন চেনা ঠেকছিল। কার আদল ছিল ওর মুখে। বন্ধুরা বলছে অসুরকে নাকি ওর মত দেখতে! তাহলে কি কোথাও অলোক আর ও নিজে এক হয়ে যাচ্ছে? পাণ্ডার কথাটা স্মৃতিতে আচমকা ঘা দিল, ‘খরাব চিন্তা করি জলে নামা মনা।’
অলোকের মত ও নিজেও তো কাল সমুদ্রে—। আর ভাবতে পারল না রক্তিম। আর সেই সময়ে পিয়ালি হঠাৎই উঠে দাঁড়াল, ‘পাড়ে বসে থাকতে ভাল্লাগছে না। চলো জলের কাছে যাই।’
কেউই উঠল না দেখে ও রক্তিমের হাত ধরে টানল, ‘এসো না! আমি একলা যাব নাকি?’
রক্তিম কোনও প্রতিরোধ করতে পারল না। বুঝতে পারছে যে ওর চেতনা আবার লুপ্ত হয়ে আসছে। কিন্তু পিয়ালির অমোঘ ডাককে উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই। সম্মোহিতের মত উঠে দাঁড়াল রক্তিম।
পিয়ালি ওকে টেনে নিয়ে গেল জলের দিকে। পেছন থেকে বাকি তিনজন কোনও কথায় হাসিতে ভেঙে পড়ল তখন। পিয়ালি যে ওকে কোথায় নিয়ে যেতে চলেছে, সেদিকে কারও লক্ষ্যই নেই। রক্তিম কোনওরকমে চোখ তুলে তাকাল পিয়ালির দিকে এবং সেও তাকিয়েছিল বলেই চোখাচোখি হল। জ্যোৎস্নালোকেও বোঝা যাচ্ছে মুখে একটা দুর্জ্ঞেয় অপার্থিব হাসি।
‘নিজেকে চিনতে পারলে?’ কেমন দুর্বোধ্য ভঙ্গিতে বলল পিয়ালি।
‘ক্ষমা করো’ বিড়বিড় করল রক্তিম, ‘আমাকে কিছু কোরো না, প্লীজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।’
শুনেছে কিনা বোঝা গেল না। টেনে নিয়ে গেল জলের কাছে। কিন্তু পায়ে ঢেউয়ের স্পর্শ পেতেই পিয়ালি দাঁড়িয়ে গেল। তারপরে বলল, ‘দুর জলটা বড্ড ঠান্ডা। আর যাব না। চলো ফিরে যাই।’
ঢেউয়ের মাথায় তখন চাঁদ উল্লাসে ভেঙে যাচ্ছিল। হাওয়ায় ভাসছিল উচ্ছ্বাস। আর সিন্ধুতীরে বসে পাঁচ যুবক যুবতী ডুবে যেতে থাকল আলাপে প্রলাপে।
