হাসি – সৌমিত্র বিশ্বাস
হাসি
মোট চুয়াল্লিশটা সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের মাথায় উঠে হাঁফাচ্ছিল বটে, কিন্তু তারপরেই রিসেপশনের খোলা জানলা দিয়ে ভেতরে এসে প্রকৃতিদেবী ওদের চোখে মায়া কাজল মাখিয়ে দিয়েছিলেন। সামনে আকাশের গায়ে মেঘ এবং দলমা পাহাড়ের সিল্যুয়েট। আর নিচে চোখ ফেরালে দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে সবুজ বনানীতে।
এখান থেকে দেখলে কে বলবে যে পুরুলিয়া নাকি খুব রুক্ষ শুষ্ক একটা জায়গা? আর যে পাহাড়ের মাথায় রিসর্টটা, সেটা হয়তো বা অযোধ্যা পাহাড়েরই একটা শাখা। বিরাট বিরাট পাথরের ফাঁকে যেখানেই খানিকটা সমতল জায়গা পাওয়া গিয়েছে, রিসর্টের মালিক সেখানেই একটা করে কটেজ তুলে দিয়েছেন। ফলে ঘরগুলো পাশাপাশি হলেও মাঝখানে বেশ অনেকটাই ব্যবধান। আর সেই ব্যবধানটুকু অযত্ন লালিত ঝোপ বুনো ফুল আর বড় বড় পাথরে ভর্তি। যত্ন করে বাগান করলে এই বন্য সৌন্দর্য্যটা ফুটত না।
রিসেপশনের ম্যানেজার তিনজনের হাতে তিনটে চাবি দিয়েছিলেন। সেগুলো নিয়ে আবার গোটা পনেরো ধাপ নিচে নেমে এসে ওদের থাকার ব্যবস্থা। ঠিক মাঝখানে বড় কটেজটা পছন্দ হয়েছিল পিনাকীর। ওর বাঁদিকে তটিনী আর ডানদিকের কটেজে বিতান এবং রাজা।
তটিনী, রাজা আর বিতান তিনজনেই পিনাকীর সহকর্মী হলেও যেহেতু বয়েসে ছোট তাই ওরা ‘পিনাকীদা’ বলে ডাকে আর পরিবর্তে পিনাকী ওদের তুইতোকারি করে। ওদের অজস্র আবদার পিনাকীর কাছে আর পিনাকীও হাসিমুখেই সেসব মেটানোর চেষ্টা করে।
সকাল থেকে খুবই ধকল গিয়েছে। কাল রাত্তিরেই খবর এসেছিল যে ফ্যাক্টরি থেকে মাল বের করার পরে পুরুলিয়া আর বলরামপুরের মাঝামাঝি রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে আসল প্যাকেটগুলো নামিয়ে দুনম্বরী প্যাকেট তুলে দেওয়া হবে। সেই নিয়ে ট্রাক চলে যাবে ঝাড়খন্ডের দিকে আর আসল প্যাকেটগুলো চোরাবাজারে বেশি দামে বিক্রী হয়ে যাবে।
হাতে সময় এত কম যে বেশি লোকজন নেওয়া যায়নি। তাছাড়া বেশি লোকজন নিলে খবর ফাঁস হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। কাজেই সামনে কেবল বিতান, রাজা আর তটিনীকে পেয়ে ওদের নিয়েই পিনাকী ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ দুর্গাপুর থেকে বেরিয়ে সাড়ে সাতটার মধ্যে পুরুলিয়া পৌঁছয়। তারপর শুরু হয়েছিল অন্তহীন প্রতীক্ষা।
কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক ইনফর্মার যে ট্রাকের নম্বর ওদের দিয়েছিল সেই ট্রাকটা আসেনি। সম্ভবত কোনওভাবে ওদের আবির্ভাবের খবর পেয়ে গিয়ে হয় দিন পিছিয়ে দিয়েছে, নইলে অন্য কোনও ট্রাক। যদি অন্য ট্রাকের ব্যবস্থা হয়ে থাকে তাহলে ধরার উপায় নেই। কিন্তু যদি দিন পিছিয়ে দিয়ে থাকে তাহলে আগামী কাল বা পরশুর মধ্যেই আসার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। কেননা ওরা তো ধরেই নেবে যে পিনাকীরা ব্যর্থ হয়ে আজই ফিরে যাবে। কাজেই ওদের ধরার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে।
অতএব পিনাকী ঠিক করে নিয়েছিল যে এখানেই কোথাও থেকে যেতে হবে। তবে ওরা যে সরকারি দফতর থেকে আসছে সেটা কোথাও জানানো যাবে না। এমনকী সরকারি গাড়িও আনেনি। একটা সাধারণ গাড়ি ভাড়া করে টুরিষ্ট সেজে এসেছে।
থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে মাঠার একটু ভেতরে পাহাড়ের গায়ে এই রিসর্টটা বেশ পছন্দ হয়েছিল। আর সপ্তাহের মাঝখানে বলে গোটা রিসর্ট মাছি তাড়াচ্ছে। কাজেই অনায়াসেই জায়গা পাওয়া গেল।
তবে কটেজ তিনটে নামেই পাশাপাশি। নইলে একটা থেকে অন্যটায় যেতে গেলে খানিকটা সিঁড়ি নেমে আবার কিছুটা উঠে যেতে হয়। প্রত্যেকটা কটেজেই গ্রীলের গেট খুলে ঢুকলে একটা গ্রীল-লাগানো বারান্দা। তারপরে ঘরের দরজা। ওই বারান্দায় দাঁড়ালেও সেখান থেকে পাশের অন্য দুটো কটেজ দেখা যায় না। হয় মাঝখানে পেল্লায় পাথর, নইলে ঝোপ। আর সামনে খোলা দিগন্ত এবং মেঘনিভ দলমা।
ঘর থেকে বেরিয়ে পাথরে পা রেখে খানিকটা গেলে আবার সেই ওপরে ওঠার কালান্তক সিঁড়ি— রিসেপশন আর ডাইনিং।
‘আরিব্বাস, এটা দারুণ তো। দেখুন দেখুন পিনাকীদা ঠিক ছড়ানো পদ্মের মত’ বলে তটিনী যে পাথরটা দেখাল সেটার নিচে এমনভাবে একটার ওপরে আরেকটা পাথর রাখা যে একটা প্রাকৃতিক সিঁড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছে।
তটিনী তখনই তড়বড় করে তার ওপরে উঠতে চাইছিল কিন্তু সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে সকলের পেটে আগুন জ্বলছে। ফলে এক ধমকে ওকে পাথর থেকে নামিয়ে ডাইনিং-এর দিকে পা বাড়াল পিনাকীরা। কিন্তু ওই বিকেলে ভাত-ডাল খাবার ইচ্ছে কারওরই হয়নি। পরোটা আর তরকারি, তারপরে চা-ই যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক।
জঠরে শান্তি নামলেও ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করছিল পিনাকী। অবশ্য অস্বস্তি না ছটফটানি, সেটা নিজেও ধরতে পারছিল না। কেবলই মনে হচ্ছিল কতক্ষণে ঘরে ফিরে গিয়ে ব্যাগটা খুলে ওটা বের করবে। তখন তো তাড়াহুড়োয় পকেটে ঢোকাতে গিয়ে ভালো করে দেখতে পারেনি। যতক্ষণ না দেখছে ততক্ষণ মনে হয় ছটফটানি কাটবে না।
খাওয়া শেষ করেই বিতান আর রাজা নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়ল। তটিনী ওদের সঙ্গে নিচে নামেনি। ডাইনিং হলের পেছনেই খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে একটা ছোট পার্কের মত করা ছিল। দোলনা আর স্লীপ ছাড়াও বেশ কটা বসার চেয়ার। তটিনী চলে গেল সেখানে। নিজের মনে কিছুক্ষণ এলোপাতাড়ি ঘুরল আর থেকে থেকেই সেলফি। পিনাকীর ইচ্ছে ছিল ঘরে ফিরে আসবে। জিনিসটাকে না দেখা অবধি স্বস্তি পাচ্ছে না।
কিন্তু তটিনী ছাড়ার পাত্রী নয়। বিতান আর রাজা ঘরে গেলে যাক, পিনাকীদাকে ওর সঙ্গে থাকতেই হবে। কাজেই সেই পার্কে গোল বেদীতে বসে পিনাকী যখন খুব মন দিয়ে দলমা পাহাড়ের পেছনে সুর্যকে হারিয়ে যেতে দেখছিল তখন এক ধারে দাঁড়িয়ে তটিনী রিসর্টেরই একজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছিল। তারপর ইশারায় ডাকল পিনাকীকে।
‘নিচে ঠাকুরের থান আছে, দেখতে যাবেন?’
ঠাকুরের থান শুনেই বুকটা ধক করে উঠল পিনাকীর। প্রবলবেগে ঘাড় নেড়ে নিজের অনিচ্ছা প্রকাশ করল।
‘আমি তাহলে দেখে আসি একটু?’ ঘোষণা করল তটিনী।
‘একদম না’ দৃঢ় গলায় বলল পিনাকী, ‘এই অন্ধকারে তুই কোথায় যাবি?’
‘কিচ্ছু হবে না। ওই তো ও নিয়ে যাবে, যাই না!’
‘না, বললাম তো। তাছাড়া তোর আবার দেবদ্বিজে এত ভক্তি হল কবে থেকে?’
মুখটা করুণ করল তটিনী, ‘যাই না! কী হবে গেলে?’
‘না, এই অন্ধকারে বাইরে যাবি না।’
‘দ্যুৎ সবেতেই খালি না না করে’ মুখ ভার করল তটিনী ‘গেলে কী হবে?’
শেষ অবধি পিনাকী আপত্তিটা আঁকড়ে থাকতে পারল না। কেননা সকাল থেকে খুবই মনমরা হয়ে ছিল মেয়েটা। আসলে আজ মাকে ডাক্তার দেখানোর ছিল বলে ও আসতেই চাইছিল না। কিন্তু পিনাকীর কথা অগ্রাহ্যও করতে পারেনি। ফলে মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে একটা চাপা টেনশন রয়ে গিয়েছে ভেতরে। রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে করতেই বারবার ফোন করছিল বাড়িতে।
তারপর একসময়ে মুখটা উদ্ভাসিত দেখে পিনাকী জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী খবর?’
তটিনী ঘাড় নেড়ে বলেছিল, ‘সব ঠিক আছে।’
কাজেই এখন যদি মেয়েটা লাফিয়ে বেড়াতে চায়, তাহলে আটকে রাখাটা অনুচিত। কেবল হুঁশিয়ার থাকলেই হল।
কাজেই বলল, ‘যা খুশি কর গে যা। কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরবি।’
সেই ছেলেটার হাত ধরে টাল সামলাতে সামলাতে তটিনী নেমে গেল ঢাল বেয়ে। আর পিনাকী নেমে এল ঘরে। বুকটা ভীষণই ধুকপুক করছে। কোন ঠাকুরের থানে গেল ওরা? দরজা বন্ধ করে দিয়ে ব্যাগটা খুলল।
ট্রাকের জন্যে অন্তহীন প্রতীক্ষা করতে করতেই শারীরিক প্রয়োজনে ঝোপের পেছনে যেতে হয়েছিল। যেহেতু সঙ্গে তটিনী রয়েছে, তাই যতটা সম্ভব জঙ্গলের গভীরে ঢুকেছিল পিনাকী। আর সেখানেই দেখেছিল গাছের তলাটা পাথর দিয়ে বাঁধানো। খুব সম্ভব কোনও দেবতার থান।
তার ওপরে অনেকগুলো মাটির ছোট ছোট ঘট, হাতি আর ঘোড়া রাখা ছিল। এগুলো আদিবাসীদের গ্রামেগঞ্জে ঘুরলে প্রায়ই চোখে পড়ে। বিশেষ করে পুরুলিয়া বাঁকুড়া অঞ্চলে। কিন্তু ওর সঙ্গেই আরেকটা যে মূর্তি দাঁড় করানো ছিল সেটা দেখে লোভ সামলাতে পারেনি পিনাকী। এমনিতেই ওর ট্রাইবাল আর ফোক আর্ট সংগ্রহের ঝোঁক আছে। চাকরির সুবাদে যেখানে যেমন যোগাড় করতে পারে, নিয়ে আসে। কিন্তু এরকম একটা জিনিস শুধু ওর কেন, চেনাজানা কারওরই সংগ্রহে নেই। উত্তেজনায় পিনাকীর বুক ঢিবঢিব করছিল তখন। চারপাশে জনমানব নেই, কেবল ঝিঁঝির একটানা শব্দ।
ব্যাগ থেকে, রুমালে মোড়া, দেবী দশভূজাকে বের করে টেবলের ওপরে রাখল পিনাকী। এত সুন্দর এবং নিখুঁত যে চোখ সরাতে পারছিল না। ক্রমশ বুঝতে পারল যে এটা মোটেই দুর্গা মূর্তি নয়। প্রথমত দুর্গার গলায় নরমুণ্ডের মালা থাকে না। দ্বিতীয়ত, দশ হাতে যা যা ধরে আছেন, সেগুলোও মিলছে না। ত্রিশূল, ডমরু, খড়্গ, তীর ধনুক, এই কটাই চিনতে পারল। আরেকটা কী অদ্ভুত অস্ত্র রয়েছে, কখনও দেখেনি। তাছাড়াও দড়ি রয়েছে, আঁকশির মত কী একটা। এমনকি দুটো হাতে বই আর জপের মালাও রয়েছে।
মাথায় চুলগুলো উঁচু হয়ে মুকুট আর সেখানে আধখানা চাঁদ। আর তিনি বসে রয়েছেন শিবের ওপরে। এটা শিবই তো, নাকি শবদেহ? বারবার দেখেও কোন দেবী তা পিনাকী ধরতে পারছিল না। অবশ্য আদিবাসীদের তো নানা দেবদেবীই থাকে, তার কতটুকু খবরই বা আমরা রাখি!
দেখতে দেখতেই অনুভব করল পিনাকী যে একই সঙ্গে দেবীও ওকে দেখছেন এবং সেই দৃষ্টি ওর চামড়া মাংস ফুঁড়ে একদম অন্তস্থলে পৌঁছে যাচ্ছে। ঠোঁটটা কী রকম যেন ব্যাঁকা, ফলে হাসির মধ্যে একটা ব্যঙ্গ মিশে রয়েছে।
সেই দৃষ্টির দিকে তাকাতে পারছিল না বলে পিনাকী মূর্তিটার গা থেকে ময়লা পরিষ্কার করতে শুরু করল। নরমুণ্ডগুলোর ভেতরে কালো কালো কী যেন লেগে রয়েছে। আঙুল ঢুকিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করল এবং সামান্য চিটচিটে অনুভূতি।
পোড়া মাটির মূর্তি তো, কাজেই জলে ধুলে কিছু ক্ষতি হবে না। অতএব বাথরুমের বেসিনে কলের নিচে রেখে পরিষ্কার করল তাকে। নরমুণ্ডগুলোর গায়ে জল লাগিয়ে আঙুল ঘসতে শুরু করল পিনাকী এবং অতীব বিস্ময়ে আবিষ্কার করল যে কালো চিটচিটে জিনিসটা আসলে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। গা ঘিন ঘিন করে উঠল।
ঘরে ফিরে এসে, টেবিলে যে পুরোনো খবরকাগজটা পাতা ছিল, সেটার একটা অংশ ছিঁড়ে মূর্তির গা থেকে জল মুছে নিল। তারপর কাগজ ঘসল নরমুণ্ডগুলোর ওপরে এবং সেগুলো লাল হয়ে উঠতেই গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল।
ঘরে এসে পিনাকী মূর্তিটা টেবলে আলোর নিচে রেখে পটাপট কতগুলো ছবি তুলে নিল। তারপর ভালো করে খবরকাগজের বাকি টুকরোটা জড়িয়ে প্যাক করে নিজের একটা গেঞ্জী দিয়ে মুড়ে ঢুকিয়ে দিল ব্যাগে জামাকাপড়ের মধ্যে। চাপ লেগে ভেঙে যাবার আর সম্ভাবনা নেই। ছবিটা হোয়াটস অ্যাপ করে পাঠিয়ে দিল বউকে। নিচে লিখল ‘নতুন সংগ্রহ’।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা হাসিমুখ এবং চিয়ার্সের স্মাইলি ভেসে আসতেই ওর মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল।
শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে সারাদিনের ক্লান্তিটা ধুয়ে সাফ করে নিয়ে, খাটে শুয়ে শুয়ে বাড়িতে ফোন এবং বেশ কিছুক্ষণ বউ ছেলের সঙ্গে গল্প। কিন্তু কিছুতেই বলল না যে মূর্তিটা কীভাবে হস্তগত হয়েছে। কেবল বলল ‘পেয়ে গেলাম আর কী!’
সব কথা শেষ করার পরে মূর্তিটা আরেকবার দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, তাই আবার বের করল তাকে। সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইল দেবীর দিকে। ক্রমশ দেবীর মুখ পাল্টে যেতে যেতে তটিনী এসে দাঁড়াল সামনে আর তখনই পিনাকীর প্রবল ইচ্ছে জেগে উঠল ওকে কাছে পাবার।
ভাবনাটা বেশ বিপজ্জনক, কেননা তটিনী ওর সহকর্মিনী। একটা কমপ্লেন ঠুকে দিলে চাকরির বারোটা বেজে যাবে। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে ও তো কোনও জোর করতে যাচ্ছে না। অফিস কলীগের মধ্যে কি প্রেম হয় না? কোনওভাবে তটিনীকে রাজি করাতে পারলেই অপরূপ এক রাত নেমে আসবে। অবৈধ এক কল্পনায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল পিনাকী।
তারপর সারা শরীরে অস্বস্তির আগুন নিয়ে উঠে টেবল থেকে জগ নিয়ে ঢকঢক করে জল খেল। ঘড়ি দেখল— মোটে সাড়ে ছটা। রাত সাড়ে নটার আগে ডিনার দেবে না। এই তিনটে ঘন্টা পিনাকীর একদম নিজস্ব, আর এখনই মেয়েটাকে দরকার।
মোবাইলটা একবার বাজতেই তটিনী ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁ পিনাকীদা বলুন!’
নিজের ইচ্ছেটাকে লুকিয়ে রেখে সাবধানে জিজ্ঞেস করল, ‘খুব ব্যস্ত?’
‘না না এমনিই বসে আছি। বলুন?’
‘তেমন কিছু না। আসলে সময় কাটছে না তাই ফোন করলাম তোকে। ঘরে চলে আয় না, আড্ডা মারা যাক!’ উত্তেজনা জাগছিল শরীরে।
‘না-আ-আ, ঘরে নয়’ আদুরে শোনাল তটিনীর গলা, ‘বাইরে আসুন না। আমি সেই পাথরটার ওপরে বসে আছি। দারুণ লাগছে।’
একটু হতাশ হলেও পিনাকী ভাবল কিছুক্ষণ বসে দুচারটে কথা বলেই ওকে ঘরে ডেকে আনবে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে একটু এগোতেই প্রচণ্ড ধাক্কা খেল পিনাকী। যে পাথরটার কথা তটিনী বলল, সেটা এখান থেকে একটু দূরে হলেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার ওপরে তটিনী ওভাবে দাঁড়িয়ে কেন? মনে হচ্ছে পরণে কিচ্ছু নেই, একদম নিরাবরণা। অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বুক দুটো লাল। আর— আর হাতে ওটা কী? পিনাকীর সারা শরীর দিয়ে একটা আতঙ্কের প্রবাহ বয়ে গেল। হাতে একটা ত্রিশূল কেন?
‘এই যে পিনাকীদা, আমি এখানে’ ওই জনমানবহীন পরিবেশে চাঁদের আলোয় তটিনীর কণ্ঠস্বর কেমন অপার্থিব শোনাল।
কয়েক মুহূর্তের জন্যে পিনাকী নড়তে পারছিল না। তারপর দেখল দাঁড়িয়ে নেই তো, তটিনী তো বসেই রয়েছে এবং সরে গিয়ে ওকে জায়গা করে দিচ্ছে। তাহলে ওরকম মনে হল কেন? পাশের বড়ো গাছগুলোর ছায়ার জন্যে কি? নাকি ও আগে দাঁড়িয়েই ছিল, পিনাকীকে দেখে বসে পড়েছে?
নিচের পাথরে পা রেখে ওঠার অছিলায় পিনাকী হাত বাড়িয়ে দিল এবং প্রয়োজনের বেশি সময়েই তটিনীর হাত ধরে থাকল। তটিনী ছাড়ানোর চেষ্টা করল না দেখে সাহস বাড়ল পিনাকীর। একদম গায়ে গা ঠেকিয়ে বসল এবং সুযোগমত স্পর্শ করতে থাকল।
‘জায়গাটা দারুণ না? আমার খালি মনে হচ্ছিল আপনাকে ডাকি। তারপরেই দেখি আপনি নিজেই এদিকে আসছেন,’ তটিনী কলকল করে বলল আর তখনই পিনাকীর মনে হল যে একটা কোনও গণ্ডগোল রয়েছে। ওর কথাগুলোর মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যেটা ভয়ঙ্কর। কিন্তু সেটা কিছুতেই ধরতে পারছিল না।
হঠাৎ কী একটা কথায় তটিনী ওর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভঙ্গিতে হাসল আর পিনাকীর বুকটা কেঁপে উঠল। সেইসঙ্গে আচমকাই ওর মনে হল, আচ্ছা এই মেয়েটা সত্যিই তটিনী তো? নাকি অন্য কেউ? তটিনী হলে ওর গলার আওয়াজ এত অন্যরকম লাগছে কেন? যদি একদম পাশেই বসে না থাকত, তাহলে কিন্তু কিছুতেই গলা শুনে চিনতে পারত না।
‘তোর গলা ভাঙল কী করে?’ থাকতে না পেরে পিনাকী জিজ্ঞেস করেই বসল।
‘কই না তো’ অবাক হয়ে বলল তটিনী, ‘ঠিকই তো আছে। কেন?’
এবং তখন পিনাকী দেখল যে হ্যাঁ ঠিকই তো। স্বাভাবিক গলাতেই তো কথা বলছে। তাহলে ওরকম শোনাচ্ছিল কেন? সারা শরীর কেঁপে উঠল ওর। হঠাৎই প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগছে, ঠিক যেন একটা বিরাট বরফের চাঁইয়ের পাশে ওকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
‘ওম্মা দেখুন দেখুন আপনার ওপাশে কত জোনাকি!’ বাচ্চাদের মত উচ্ছ্বাস তটিনীর গলায়।
পিনাকী যেদিকে বসেছিল সেদিকে নিচের ঝোপে জোনাকি জ্বলছিল। সেটা দেখার জন্যে তটিনী ঝুঁকে পড়ল পিনাকীর প্রায় কোলের ওপর দিয়েই এবং সেই সুযোগে পিনাকীর আঙুলে কাঙ্ক্ষিত স্পর্শ। কিন্তু প্রচণ্ড ছ্যাঁকা লাগল আঙুলে। এরকম বরফের মত ঠান্ডা কেন ওর শরীর?
এইবারে কিন্তু পৌরুষকে দাবিয়ে দিয়ে ভয় গ্রাস করল পিনাকীকে। কেন যেন কেবলই মনে হচ্ছে এই মেয়েটা তটিনী নয়, অন্য কেউ। আসল তটিনী ঘরে ঘুমোচ্ছে। এই প্রথম পিনাকীর মনে হল দেবীমূর্তিটা তুলে এনে অন্যায় করেছে। যেখানকার বিগ্রহ তাকে সেখানেই থাকতে দেওয়া উচিত।
ও লক্ষ করল যে দুজনের কেউই একবারও সেই ঠাকুরের থান দেখতে যাওয়া নিয়ে কোনও কথা বলছে না।
হঠাৎই তটিনী বলল, ‘আচ্ছা পিনাকীদা একটা কথা জিজ্ঞেস করব, রাগ করবেন না তো?’
‘না না বল!’
‘আচ্ছা, আমাদের ডিপার্টমেন্টে তো কাঁচা পয়সা উড়ে বেড়াচ্ছে। নিতে চাইলেই নেওয়া যায়। এর মধ্যে আপনার মত কয়েকজন আছেন যাঁরা সৎ।’
‘মূল কথাটা কী?’
‘বলছি যে মানুষের সততা কি শুধু অনৈতিকভাবে পয়সা নেওয়া না নেওয়ার ওপরে নির্ভর করে? সৎ মানুষের সংজ্ঞা কি ওই একটাই?’
পিনাকীর মনে হল তটিনী যেন ওর মুখের ওপরে সপাটে চাবুক চালিয়েছে। আমতা আমতা করে বলল, ‘সৎ মানে কোনও অধর্মের কাজ না করা। যেহেতু অবৈধভাবে পয়সা নেওয়াটা দৃষ্টিকটু ভাবে অধর্ম, তাই সেটা যারা করে না তাদের সৎ বলা হয়।’
‘দেবী চৌধুরাণী, রঘু ডাকাত বা রবিন হুডকে আপনি কী বলবেন?’
‘কঠিন প্রশ্ন।’
‘ধরুন একজন পয়সা বা অন্য সুযোগসুবিধে কিছুই নেয় না। লোকে তাকে বলবে সৎ। কিন্তু এটুকুর বাইরে সে আর কোনও নীতিই মেনে চলে না। অথচ লোকে সেটা না জেনেই তাকে মহানের আসনে বসিয়েছে এবং সে নিজেও সেই অবস্থানটা উপভোগ করে, তাহলে কি এটা ভণ্ডামি নয়? আর ভণ্ডামি মানেই তো অসততা।’
দ্বিতীয় চাবুকটা ওর বুক কেটে বসে গেল। বুঝতে পারছে অন্ধকারের মধ্যে থেকে দুটো চোখ ওকে খনন করছে। পৌঁছে যাচ্ছে একদম গোপন অন্তর অবধি, যেখানে আসল পিনাকীর অবস্থান।
‘ধরুন নির্মলদা। পয়সাকড়ি খায় না, সকলের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। সকলেই বলবে সৎমানুষ। কিন্তু মেয়ে দেখলেই ছোঁকছোঁক করে। তাহলে তাকে কী বলা হবে?’
মেয়েটা এত নির্মমভাবে চিরে ফেলছে যে পিনাকীর মনে হল, আর নয়, এইবারে ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু কোথায় ফিরবে? ঘরে ঢুকে পড়লেও তো এই একই কশাঘাতের সামনে দাঁড়াতে হবে।
প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে পিনাকী বলল, ‘কটা বাজল?’
‘জানি না। ঘড়ি পরিনি। আর সেলফোনটাও ফেলে এসেছি,’ তটিনী বলল।
পিনাকীর কানে কথাগুলো গেল না। ও ততক্ষণে সময় দেখার জন্যে মোবাইল বের করেছে। কিন্তু স্ক্রীণের দিকে তাকিয়েই চমকে গেল। সাতটা মিসড কল। প্রত্যেকটাই তটিনীর।
‘ফোন করেছিলি তুই?’ কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল এবং বুঝতে পারল ভুল করেছে। কেননা কলগুলো এসেছে গত দশ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ কলটা এসেছে কয়েক সেকেন্ড আগে, যখন পিনাকী পকেট থেকে মোবাইলটা বের করছিল সময় দেখার জন্যে।
‘না তো’ তটিনী অবাক হয়ে বলল, ‘বললাম না, মোবাইলটা ফেলে এসেছি? এখানে আসার পরে মনে হচ্ছিল যে আপনাকে ফোন করে এখানে চলে আসতে বলি। কিন্তু ওই জন্যেই তো করতে পারিনি। আর এমনই টেলিপ্যাথি যে আপনি নিজেই চলে এলেন।’
পিনাকীর মনে হচ্ছিল সারা শরীর টলছে। কেননা, তটিনী ওর ফোন ধরেছে এবং তখনই বলেছে যে ও এই পাথরে বসে আছে। ওর সঙ্গে ফোনে কথা হবার পরেই তো পিনাকী বেরিয়েছে ঘর থেকে। তাহলে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে কেন? এক হতে পারে এটা ওর কোনও প্র্যাকটিকাল রসিকতা।
জোর করে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করল পিনাকী। খানিকক্ষণ একদম নির্বাক হয়ে বসে রইল দুজনে। অজস্র ঝিঁঝি ডাকছিল তখন ঝোপেঝাড়ে। ওদের ঘিরে উড়ছিল জোনাকি। আর হাওয়ায় কেমন একটা অদ্ভুত অচেনা গন্ধ ভাসছিল।
‘চল এবার ওঠা যাক।’
‘কী করব ঘরে গিয়ে? এখানেই ভালো। আপনার ফোনটা দিন তো সেলফি তুলি।’
‘এই অন্ধকারে?’
‘দেখুনই না।’
তটিনীর গা থেকে একটা কেমন ঝিম-ধরানো গন্ধ আসছে। ও হাত তুলে সেলফি তোলার তোড়জোড় করছে আর পিনাকীর খালি মনে হচ্ছে যেন তলোয়ার। ওর বুক ঢিবঢিব করছিল। ফ্ল্যাশ পড়ল চোখের ওপরে।
তারপরে তটিনী বলল, ‘আপনি বলছিলেন হবে না। এই যে দেখুন!’
সেলফোনটা ফেরৎ নিয়ে আবার ধাক্কা খেল পিনাকী। ফ্ল্যাশে তুললেও কি এত উজ্বল হতে পারে? দেখে তো মনে হচ্ছে যেন তটিনীর গা দিয়েই আলো বেরিয়ে আসছে। আর এমন একটা অ্যাঙ্গেল থেকে তুলেছে যে চাঁদটা ওর চুড়ো-করে বাঁধা চুলে আটকে রয়েছে।
পিনাকীর মনে হল জঙ্গলের ভেতরে দেবতার থান থেকে মূর্তিটা তুলে এনে ও যে অন্যায় করেছে তার জন্যে সাঙ্ঘাতিক কোনও শাস্তি যেন অপেক্ষা করে আছে। ভেতর থেকে কে যেন বলতে থাকল, এখনও সময় আছে, ফিরিয়ে দিয়ে এসো। ফিরিয়ে দিয়ে এসো। কিন্তু কোথায় দিয়ে আসবে? জায়গাটা তো আর চিনতেই পারবে না।
তটিনী ঘরে ফিরতে চাইছিল না। ফলে ওকে পাথরে অধিষ্ঠিতা রেখে পিনাকী ফিরে আসছিল, কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল এক্ষুনি বুঝি উল্টোদিক থেকে তটিনীকে হেঁটে আসতে দেখবে। এমনকি ঘরে ফিরে এসে তালা খুলতেও সাহস পাচ্ছিল না। যদি দেখে ভেতরে তটিনী বসে আছে, হাতে ওই মূর্তিটা!
আর তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে কেউ গেয়ে উঠল, ‘আমার সাধ না পুরিল।’
প্রচণ্ড চমকে গিয়েছে পিনাকী। তারপর বুঝল ওর নিজেরই মোবাইল বাজছে। কিন্তু এটা তো ওর রিং-টোন ছিল না! বদলে গেল কী করে? সেলফি তোলার সময়ে মেয়েটা পাল্টে দিয়েছে?
ভাবতে ভাবতেই ফোন কানে দিল আর শুনল বিতান হাঁফাচ্ছে, ‘পিনাকীদা একবার আমাদের ঘরে আসবেন!’
‘কেন রে?’
‘একটা ব্যাপার হয়েছে। একটু আসুন না প্লীজ।’
‘যাচ্ছি’ বলে ফোনটা কেটে পিনাকী দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। বিতানদের ঘরে যাওয়া মানে বেরিয়ে তটিনী যেদিকে রয়েছে তার উল্টোদিকে যাওয়া। কেননা পিনাকীর ঘরটাই মাঝখানে।
‘কী হল দাঁড়িয়ে কেন, চলুন!’
কানের কাছে মুখ রেখে কেমন একটা ফ্যাসফেসে গলায় বলল তটিনী। আচমকা ওরকম একটা গলা শুনে চমকে গিয়ে পেছন ফিরল পিনাকী। তারপরে দেখল কেউই তো নেই। তাহলে কথাটা কে বলল? একটা খচমচ শব্দ এল ছাত থেকে। কেউ যেন হেঁটে যাচ্ছে। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পিনাকী শুনতে থাকল শব্দটা এসে দাঁড়াল কার্নিশের সামনে। তারপর ঠিক ওর মাথার ওপরে শব্দ হল টুকটুক টুকটুক।
পিনাকী বারান্দা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। কেননা বেরোলেই কার্নিশে যে আছে সে ডান হাতের ত্রিশূল স্পর্শ করাবে ওর গায়ে।
আবার ফোন বেজে উঠল। ‘পিনাকীদা আসছেন তো?’ বিতানের গলা কাঁপছে।
‘এই তো আসছি’ কানে ফোনটা ধরে রেখেই পিনাকীও বেরিয়ে এল বারান্দা ছেড়ে। মানুষের গলার আওয়াজও সময় বিশেষে বিরাট স্বস্তি দেয়। পাথুরে পথে পা দিল আর পাশের বিরাট গাছে হালকা আলোড়ন উঠল। ঠিক যেন কেউ ছাত থেকে ওই গাছে লাফ দিয়েছে। বাঁদর বা হনুমান হতে পারে, কিন্তু তারা কি রাতবিরেতে লাফালাফি করে? সেদিকে না তাকিয়েও পিনাকী বুঝতে পারছে একটা মেয়ে গাছের ডালে বসে আছে।
অন্ধকারে রাস্তা ঠাহর করতে করতে পিনাকী জিজ্ঞেস করল, ‘কী এমন হয়েছে তোদের?’
‘আমি আর রাজা শুয়ে শুয়ে গল্প করছিলাম,’ বিতানের কন্ঠস্বর সাহস যোগাচ্ছিল পিনাকীকে, ‘হঠাৎই দরজায় কেউ ধাক্কা দিল। রাজা উঠে খুলে দেখতে গেল। গিয়ে দেখে কেউ নেই।’
পিনাকীর মনে হল মাথার মধ্যে দিয়ে যেন বিদ্যুতের মত কিছু একটা ছুটে গেল। বিতান আরও কিছু বলছিল ফোনে কিন্তু তার আগেই ফোনে আছড়ে পড়ল রাজার গলা, ‘পিনাকীদা ওটা কে? আপনার পেছনে ওটা কে? কে আসছে ওটা?’
কিছু না বুঝেই পিনাকী পেছন ফিরল আর মনে হল যেন ঠিক পেছনেই একটা কোনও মেয়ে ছিল, ওকে ফিরতে দেখেই সাঁৎ করে পাশের ঝোপে লুকিয়ে পড়ল। শেষমুহূর্তে তার হাতে ধরা খড়্গটা দেখতে পেয়েছে পিনাকী। কিন্তু ঝোপের কাছে গিয়ে দেখার সাহস বা ইচ্ছে কোনওটাই ওর ছিল না। কীভাবে যে হনহনিয়ে বিতানদের ঘরে গিয়ে পৌঁছল, নিজেই জানে না।
কিন্তু তারপরে যা শুনল তাতে সাহস জোগাবে কী, নিজেরই ভয়ে দম বন্ধ হয়ে এল। বিতানের সঙ্গে যখন ফোনে কথা বলছিল তখন রাজা নাকি মোটেই চেঁচিয়ে কিছু বলেনি। আর তাছাড়া পিনাকীর পেছনে কেউ আছে কিনা ঘরে বসে সেটা রাজা জানবেই বা কী করে? কিন্তু তাহলে রাজার গলায় কে চেঁচিয়ে ওকে পেছনে তাকাতে বলেছিল? ঝোপের আড়ালে কে লুকিয়ে পড়েছিল?
তারপর পিনাকীকে শিহরণের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে বিতান মূল ঘটনাটা বলতে শুরু করল।
রাজা দরজা খুলে দেখেছিল কেউ নেই। ও এসে আবার শুয়ে পড়েছিল বিতানের পাশে। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার দরজা ঠেলার শব্দ। এবারেও খুলে দেখে কেউ নেই। আশপাশে টর্চ মেরেও কাউকে দেখতে পায়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা ওরা একদম বাইরের সেই গ্রীলের দরজায় তো তালা মেরে রেখেছিল। তাহলে কেউ এসে দরজা ঠেলবে কী করে? তখন দুজনে খুবই ভয় পেয়ে গিয়ে ঠিক করল যে এরপরে দরজা ঠেললেও খুলবে না।
‘আর সেইসময়ে টিউব লাইটটা হঠাৎ নিজে নিজেই নিভে গেল’ বলতে গিয়ে বিতানের গলা আটকে যাচ্ছে।
‘সে তো চোকে কিছু হলে আলো নিভে যায়’ পিনাকী সাহস দেবার চেষ্টা করল।
‘হ্যাঁ পিনাকীদা’ যায়, কিন্তু তারপরেই যে টেবিল ল্যাম্পটা হঠাৎ নিজেই জ্বলে উঠল। সেটা কী করে হবে?’ রাজা বলল, ‘আর টিউব লাইট খারাপ হলে নিজে নিজে নিভে যায়, কিন্তু সুইচ তো বন্ধ হয়ে যায় না?’
‘মানে?’ চমকে উঠেছে পিনাকী।
‘হ্যাঁ দাদা, সুইচ অফ করে টিউবটা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
‘ক্কি-কিন্তু টিউবটা এখন জ্বলছে তো’ তোতলাল পিনাকী।
‘আপনি যখন এলেন তখনই এমনভাবে আলোটা জ্বলে উঠল যেন কেউ জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর ওই ছোট আলোটা দেখুন নিভে গিয়েছে। আপনাকে আধঘন্টা ধরে ফোন করার চেষ্টা করছি দুজনে, কিন্তু কিছুতেই করতে পারছি না।’
‘এই দেখুন পিনাকীদা’ বলে বিতান মোবাইলটা বাড়িয়ে দিল।
অবাক হয়ে পিনাকী দেখল স্ক্রীনের আইকনগুলো একদম উল্টো দিকে ঘুরে রয়েছে, মানে রোটেট করলে যেরকম হয়। কিন্তু স্ক্রীনে তো রোটেট করা যায় না।
‘আর সেইসঙ্গে রিং-টোনটা নিজেই পাল্টে আমার সাধ না পুরিল হয়ে গিয়েছে’ বিতানের কথাটা কানে ঢুকলেও পিনাকী কিছু বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
বিতান বলল, ‘তারপর আপনাকে যে আবার ফোন করলাম সেটা কিছুতেই কাটা যাচ্ছে না। ওপাশ থেকে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে।’
‘মানে?’
‘দেখুন কোনও কল নেই তো’ বিতান ফোনটা বাড়িয়ে দিতে পিনাকী দেখল একদম পরিষ্কার স্ক্রীন।
‘কানে দিন!’
পিনাকী বলল, ‘হ্যালো।’
সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলায় খলখল করে হাসি আছড়ে পড়ল ওর কানের পর্দায়।
‘হসখফ্রেঁহসকল্রীঁ—’ অর্থহীন কতগুলো শব্দ বেরিয়ে এল পিনাকীর মুখ দিয়ে। অবশ হাত থেকে খসে গেল ফোন। ওর দাঁতে দাঁতে ঠুকে কটকট শব্দ হল একবার।
আর তার সঙ্গে তাল দিয়েই যেন দরজায় শব্দ হল খটখট খটখট। রাজা, বিতান আর পিনাকী পরস্পরের দিকে তাকিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। দরজাটা খোলার সাহস কারও নেই। আবার শব্দ হল খটখট।
‘কে?’ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে গেল বিতান কিন্তু কোনও স্বর ফুটল না। রাজা কোনওরকমে প্রশ্নটা করতেই ওপাশ থেকে একটা পরিচিত স্বর ভেসে এল, ‘আমি। দরজাটা খুলবে তো!’
দরজা খোলার পরে তটিনীকে দেখেই পিনাকীর মনে হল এবার অজ্ঞান হয়ে যাবে। ঠোঁটদুটো টকটক করছে লাল। দুটো শ্বদন্ত বেরিয়ে রয়েছে দুপাশে। গলায় নরমুণ্ডের মালা। আর শরীরে একটা সুতোও নেই। উঁচু করে বাঁধা চুল থেকে একঝলক আলো এসে লাগল পিনাকীর চোখে। তারপরে কেবল অন্ধকার। কতক্ষণ ওইভাবে কেটেছে ও জানেও না।
একসময়ে মনে হল বহুদূর থেকে যেন কেউ বলছে ‘পিনাকীদা শরীর খারাপ লাগছে? পিনাকীদা ও পিনাকীদা!’
আস্তে আস্তে বিভ্রম কেটে গেল পিনাকীর। তটিনীর দিকে ভালো করে চেয়ে দেখল খুব বড় বড় বীডের মালা পরে রয়েছে, যেটাকে নরমুণ্ড বলে মনে হয়েছিল। আর স্কীন-কালারের টাইট ফিটিং ভেস্ট আর স্কীন-কালারেরই স্ল্যাক এমনভাবে পায়ে সেঁটে রয়েছে যে ঠিক ওই মূর্তিটার মত লাগছিল। কিন্তু এগুলো কখন পরল? পাথরে তো এই পোশাক ছিল না।
আর চুড়ো করে বাঁধা চুলে ওই সাদা ক্লিপটাই বা কখন লাগাল?
খুবই উদ্বিগ্ন স্বরে তটিনী ঝুঁকে প্রশ্ন করল, ‘পিনাকীদা’ শরীর খারাপ লাগছে?’
তখনই ওর দাঁতে রক্তের ছিটে লেগে থাকতে দেখল পিনাকী।
কোনওরকমে মুখটা সরিয়ে ‘না না ঠিক আছে,’ বলে কাষ্ঠ হাসল পিনাকী। বুক এখনও ধড়ফড় করছে।
সেইসময়ে খুব হালকা একটা খুট করে শব্দ হয়ে টিউবটা নিভে গেল। ঠিক মনে হল যেন ওদের অন্যমনস্কতার সুযোগে কেউ আলো নিভিয়ে দিল।
অমনি ‘মাগো’ বলে চেঁচিয়ে উঠে তটিনী পিনাকীকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। অন্ধকারে স্পষ্ট শোনা গেল একটা খসখস শব্দ সুইচ বোর্ডের কাছ থেকে দেওয়ালের দিকে ভেসে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কেমন একটা পচা ক্ষতের গন্ধ ঘরময়।
তারপরেই হঠাৎ ছোট টেবল ল্যাম্পটা জ্বলে উঠল আপনা হতেই। পিনাকী বুঝতে পারছে ওকে আঁকড়ে রেখে তটিনী থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু তাও কোনও চাহিদা ছিল না পিনাকীর।
তটিনী বলল, ‘পিনাকীদা চলুন আমরা চলে যাই এখান থেকে। জায়গাটা ভাল নয়।’
কাঁপা গলায় বিতানও বলল, ‘হ্যাঁ জায়গাটা ভালো নয়।’
‘যে ছেলেটার সঙ্গে তখন বেরিয়েছিলাম সেই বলেছে যে রিসর্টটা ভালো হলেও জায়গাটা ভালো নয়,’ তটিনীর গলা বসে গিয়ে একটা অপার্থিব ফ্যাসফেসে স্বর বেরিয়ে আসছে, ‘এটা নাকি মা ভৈরবীর থান ছিল আগে। খুব জাগ্রত দেবী নাকি। কিন্তু কোনও কারণে অসন্তুষ্ট হলে কাউকে টিকতে দেন না। আগেও নাকি অনেকেই এখানে থাকবে বলে এসেও ফিরে গিয়েছে, রাত কাটাতে পারেনি।’
হঠাৎই কেমন খলখল করে হেসে উঠল তটিনী। খাটের অন্য পাশে রাজা আর বিতান বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রয়েছে। পিনাকীর কোনও বোধই কাজ করছে না। কেবল স্বপ্নাবিষ্টের মত তাকিয়ে রয়েছে ওর ঠোঁটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসা তীক্ষ্ণ দাঁত দুটোর দিকে।
পিনাকীর গলা টিপে ধরে অপার্থিব স্বরে চেঁচিয়ে উঠল তটিনী, ‘আমাকে কেন নিয়ে এলে এখানে? কেন? কেন? আমাকে এক্ষুণি ফিরিয়ে নিয়ে চলো। আমি এখানে থাকব না-আ-আ।’
‘হসখফ্রেঁহসকল্রীঁহসৌঃ’ পিনাকীর মুখ দিয়ে আবার অর্থহীন শব্দ বেরিয়ে এল।
সেটা শুনেই তটিনী আবার খলখল করে হেসে উঠল। আর গলায় চাপ বাড়তে শুরু করল।
‘ভেবেছিস ওইসব বললেই আমি ভুলে যাব? এখানে আমাকে কেন এনেছিস? আমি তো আসতে চাইনি!’
পিনাকীর মুখ থেকে একটাই বাক্য বেরিয়ে এল— ‘ভুল হয়ে গিয়েছে মা। আর কখনও করব না। এবারের মত ছেড়ে দাও আমাকে। কালই ফিরিয়ে দিয়ে আসব।’
তারপরে কোনওরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা তটিনীর পা জড়িয়ে ধরল পিনাকী। মুখ দিয়ে সমানে বেরিয়ে আসছে অর্থহীন বর্ণমালা। রাজা আর বিতান কীংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল এই দৃশ্যের দিকে।
সেইসময়ে আবার শব্দ হল দরজায় খটখট খটখট। অমনি কেউ যেন ছোট আলোটাও নিভিয়ে দিল। আর সেই অন্ধকারে বাইরে থেকে স্পষ্ট তটিনীর গলা ভেসে এল, ‘পিনাকীদা ডিনার রেডি। বিতানরা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। চলুন।’
নিজের অজান্তেই পিনাকী ঢলে পড়ল খাটে। শুনতে পেল তটিনী সেই অপার্থিব গলায় হিহি করে হাসছে। কিন্তু সেটা ছাপিয়ে একটানা একটা খটখট শব্দ আর ‘পিনাকীদা ও পিনাকীদা’ বলে একটা ডাক ওকে ভাসিয়ে রেখেছিল চেতন অচেতনের প্রান্তরেখায়।
* * *
মূল মূর্তিটা তো পরদিনই, যেখানে নেমেছিল অনেক খুঁজে সেই জায়গাটা বের করে, সেই গাছের তলায় রেখে দিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ক্ষমা চেয়েছিল। সেইজন্যে ওর একটা ছবি বাঁধিয়ে নিজের সংগ্রহে রেখেছে পিনাকী। সেই যে আগের দিন সন্ধেবেলা ছবি তুলে বউকে পাঠিয়েছিল, তারই একটা।
ছবিটা নেটে দিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়ায় প্রচুর অবান্তর এবং অদরকারী কমেন্ট পড়ল। কেবল একজন জানালেন যে ওটা দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী, ভৈরবীর মূর্তি। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে রুদ্রভৈরবী। জ্ঞানার্ণব তন্ত্র অনুসারে তাঁর বীজমন্ত্র, হ-স-খ-ফ্রেঁ-হ-স-ক-ল্রীঁ-হ-সৌঃ।
আপাতদৃষ্টিতে ধ্বংসের দেবী মনে হলেও তিনি আসলে মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে নাশ করেন।
তবে পিনাকী এখনও বুঝে উঠতে পারে না যে রিসর্টের অভিজ্ঞতাটা কি সত্যিই ঘটেছিল নাকি কোনও ভয়ঙ্কর স্বপ্ন! কেননা এর পরেও তো ও বাকি তিনজনের সঙ্গে ডিনার করতে পেরেছিল এবং শুনেছিল যে ও নাকি নিজের ঘরে এমন বেহুঁশ হয়ে ঘুমোচ্ছিল যে ডাকতে গিয়ে দরজা প্রায় ভেঙে ফেলার উপক্রম।
মূর্তিটা সরানোটা যে অন্যায় হয়েছিল সেই বোধটা ওর অবচেতনে ছিলই আর তার সঙ্গে তটিনীর প্রশ্নগুলো জড়িয়ে গিয়ে ওরকম একটা স্বপ্ন সৃষ্টি করে থাকতে পারে। কিন্তু তটিনীর কথা মনে হলেই সব গুলিয়ে যায়। কেননা পিনাকী তো ঘরে ঘুমিয়েছিল, তাহলে প্রশ্ন করবে কী করে তটিনী? তার মানে কী, ওর নিজেরই অবচেতনের পাপবোধ ওইভাবে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল!
তাছাড়া ভৈরবীদেবীকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে লেক কালীবাড়ির এক বৃদ্ধ পুরোহিতের মুখ থেকে একটা অদ্ভুত কথা জানতে পেরেছিল পিনাকী। কোনও কিছুর প্রতি অবৈধ বাসনা জন্মালে, সে সম্পত্তিই হোক বা নারী, দেবী সেই নারীরই রূপ ধরে এসে যাবতীয় তৃষ্ণা ধ্বংস করে দেন।
আসলে যে ঠিক কী হয়েছিল জানে না পিনাকী। দেবীর বীজমন্ত্রই বা কী করে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল সেও এক রহস্য! তবে যখন ওই ছবিটার দিকে চোখ পড়ে তখন সমস্ত ঘটনাগুলো এক এক করে ফিরে এসে ওকে নেশাগ্রস্থ করে ফেলে। ও তাকিয়ে থাকে ভৈরবীদেবীর দিকে সম্মোহিতের মত। কানে জেগে ওঠে তটিনীর সেই ভয়ঙ্কর খলখল হাসি আর সেই চিৎকার, ‘আমাকে এখানে কেন নিয়ে এলি? কেন নিয়ে এলি? কেন?’
এতদিন পরেও হাত-পা শ্লথ হয়ে যায়, চিন্তাভাবনা সব থেমে যায় আর একটা পংক্তি তখন মাথায় ঘুরতে থাকে কেবল— বিজন বিপুল ভবনে রমণী হাসিতে লাগিল হাসি।
