ললিতা – সৌমিত্র বিশ্বাস
ললিতা
পার্থই প্রথম খেয়াল করল যে সুজিত ফিরে আসেনি। রাত পৌনে বারোটা। গঙ্গায় ভাসমান রেস্তোঁরার ডেকে আমরা বন্ধুরা পানাহারে ব্যস্ত। নিচে গঙ্গা-লাগোয়া লনে খোলা আকাশের নিচে তখন নিউ-ইয়ার্স ইভের উদ্দাম নাচ আর গান।
আমাদের সকলেরই অবস্থা ক্রমশ তুরীয় হচ্ছিল। এর মধ্যে আধঘন্টা আগে হঠাৎই ওয়াশরুমে যাবার নাম করে সুজিত উঠে গিয়েছে। এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়! কী হল ওর? সামনেই ওর ছেড়ে যাওয়া গ্লাসে এখনও সিকিটাক ব্ল্যাকডগ টলটল করছে। এটা বোধ হয় পাঁচ কিম্বা ছয় পেগ। ক্রমশ নিজস্ব সংযমের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
‘দাঁড়া দেখে আসি’ বলে অনীক উঠে গেল এবং মিনিট দশেকের মধ্যেই চিন্তিতমুখে ফিরে এসে জানালো যে ওয়াশরুমের ধারেপাশে কোত্থাও সুজিত নেই।
‘ওদিকের ডেকটা দেখেছিস?’ অমিতের গলা থেকে উদ্বেগ বেরিয়ে এল।
‘দেখেছি। পুরো ফাঁকা, কেউ নেই। বহুত টেনশন হচ্ছে মাইরি,’ বলতে বলতে অনীক আরেকটা পেগ ঢালল।
কিন্তু আমাদের মুখ সাদা হয়ে গেল। কেননা এদিকের ডেকে আসার বদলে যদি সুজিত ভুল করে ওইদিকের ডেকে চলে গিয়ে থাকে? যা কিছু অনুষ্ঠান সবই তো এদিকে। ওদিকের ডেক নির্জন এবং ঠিক নিচেই অন্ধকার গঙ্গা। আর সুজিত যে ক্রমশ সেন্স হারাচ্ছে সেটা কিছুক্ষণ ধরেই আমরা বুঝতে পারছিলাম।
এমনকি অমিত একবার বারণও করেছিল, ‘সুজিত, স্টপ নাউ। আর একদম খাবি না। এরপরে বাড়ি ফিরতে পারবি না।’
‘এত অল্পে সুজিত ঘোষের নেশা হয় না’ জড়ানো গলায় বলে সুজিত আবার গ্লাসে চুমুক দিয়েছিল, ‘আর হলে হবে। আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট এনিবডি, অ্যান্ড নোবডি কেয়ারস ফর মী। কী হবে? রোড অ্যাক্সিডেন্ট? এমন চাঁদের আলো মরি সেও ভালো সে মরণ… সে মরণ… শ্যাম সমান।’
হেঁড়ে বেসুরো গলায় সঠিক শব্দগুলোকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল যদিও মেঘে ঢাকা আকাশে চাঁদের কোনও চিহ্নই ছিল না। আর তখনই নিচের লনে মুক্তো ঝরানো কণ্ঠে কেউ গেয়ে উঠেছিল— ‘ইউ ক্যান সী সো মাচ ইন মী দ্যাট’স নিউ/ আই নেভার ফেল্ট আনটিল আই লুকড অ্যাট ইউ।’
এদিকে সেদিকে লাগানো লাউডস্পীকারগুলো অমনি সেই গানটাকে তুলে এনে একদম আমাদের বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।
‘কে রে মেয়েটা গাইছে?’ আপন মনেই পার্থ বলেছিল, ‘গলাটা ব্যাপক তো!’
শুভ খিকখিক হেসে ইশারায় সুজিতকে দেখিয়েছিল। সোজা হয়ে বসে চোখ বন্ধ রেখে, একদম স্থির, নিশ্চলভাবে গান শুনছে—
‘দ্য লাভ আই নো ইউ নীড ইন মী। দ্য ফ্যান্টাসি ইউ হ্যাভ ফ্রীড ইন মী/ অনলি ফর ইউ, অনলি ফর ইউ।’
‘গলাটা একদম ললিতার মত। যেন ও-ই গাইছে’ চোখের কোণে টলটলে জল ধরে রেখে সুজিত বিড়বিড় করছিল।
‘ললিতা?’ খিকখিক করে হেসে অনীক ফুট কেটেছিল, ‘দিব্যি আছো গুরু! বিয়ে ফিয়ে করোনি, বউয়ের চাপ নেই। কাল জয়িতা, আজ ললিতা। ওঃ, মস্তিই মস্তি!’
‘চোপ শালা’ হিংস্র ভঙ্গিতে সুজিত উঠে দাঁড়িয়েছিল, ‘ললিতাকে নিয়ে একটা বাজে কথা বললে মুখ ভেঙে দেব শালা।’
মারমুখী ভঙ্গি দেখে প্রথমটায় অনীক ঘাবড়ে গিয়েছিল। তারপরে সেও তেড়ে উঠল, ‘চলে আয় শালা।’
কিন্তু আর বেশি এগোনোর আগেই আমি অনীককে টেনে বসিয়ে দিলাম, ‘ছাড় না, দেখছিস তো মালটা সেন্সে নেই।’
সেটা শুনে বাকিরা এমনভাবে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল, যেন মস্ত একটা রসিকতা। আসলে সকলেই অল্পস্বল্প টালমাটাল। স্বাভাবিক, বে-লাগাম না হবার তো কিছু নেই।
গান শেষে একটু বিরতি। তারপর মেয়েটা আবার শুরু করল— ‘এভরি নাইট ইন মাই ড্রীমস/ আই সী ইউ, আই ফীল ইউ/ দ্যাট’স হাউ আই নো ইউ গো অন।’
আমাদের মধ্যে কথা, ঠাট্টা-ইয়ার্কি থেমে গেল। প্রত্যেকেই যেন নিজেদের হারানো অতীত দেখতে দেখতে কাঁদছিলাম।
‘লাভ ওয়জ হোয়েন আই লাভড ইউ/ ওয়ান ট্রু টাইম আই হোল্ড টু/ ইন মাই লাইফ উই’ল আলওয়েজ গো অন…’
হঠাৎই সুজিতের মুখ থেকে ফোঁপানিটা ছিটকে আসে। যে অনীকের মুখ ভেঙে দিতে চেয়েছিল, সেই অনীকই ওর হাতে আলতো চাপড় মারতে মারতে বলেছিল, ‘কুল বাডি কুল।’
‘তোরা আমাকে নিয়ে যা-তা খোরাক করিস, আমি কিছু বলি না। কিন্তু আমারও তো ইচ্ছে করে তোদের মত ঘরসংসার করি। তুরুক তুরুক’ ফোঁপাতে ফোঁপাতে সুজিত সিগারেটের ছাই ঝাড়ল, ‘ওকে আমি পাগলের মত ভালোবাসতাম। শালা ভালোবাসা! নিজে দিব্যি হাসতে হাসতে ফ্রেমের ভেতরে ঢুকে গেল! আর আমার লাইফটা শেষ!’
তারপরেই টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোথায় যাচ্ছিস আবার? বোস এখানে।’
ইশারায় কড়ে আঙুল দেখিয়ে সুজিত বেরিয়ে যায় আধঘন্টা আগে। তারপর কী হয়েছে, আমরা আর জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রত্যেকের নেশা কেটে গিয়েছে। মুখ থমথমে। গান ছাপিয়েও হৃৎপিন্ডের ধুকপুকুনি শোনা যাচ্ছে। এবার কী করব আমরা? সুজিতও যদি ছবির মধ্যে ঢুকে গিয়ে থাকে, তাহলে তো আমাদেরও লাইফ শেষ।
‘এদের তো জানাতে হবে’ সুকান্ত মিউমিউ করল।
‘এখন কাকে পাবি?’ আমি বললাম, ‘তার চেয়ে চ’ নিচে গিয়ে দেখি। ললিতা ললিতা করতে গিয়ে যদি নেমে গিয়ে থাকে।’
লনের ঠিক মাঝখানে স্টেজে দাঁড়িয়ে সর্বাঙ্গে সাইকোডিলিক আলো মেখে মেয়েটা গান গাইছে। সুবেশী স্ত্রী-পুরুষেরা হাতে গ্লাস নিয়ে উৎসবে মগ্ন। কিন্তু আমাদের কোনও খেয়াল নেই। কম্পিত আলো-আঁধারির মধ্যে পাগলের মত সুজিতকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
কতক্ষণ কেটে গিয়েছে খেয়াল নেই, হঠাৎই চরাচর মাতিয়ে বাজি ফাটতে শুরু করল, আকাশ ভরে উঠল রঙবেরঙ আল্পনায়। কিন্তু নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উপায় ছিল না আমাদের। মরীয়া হয়ে সুজিতকে খুঁজছিলাম। কিন্তু কোথাওই ওকে দেখতে পেলাম না। নিচে তো আর ঠাসাঠাসি ভিড় নয়, কাজেই এখানে থাকলে ওকে খুঁজে পাওয়া যাবেই। কিন্তু সুজিতকে আমরা কোথাওই দেখতে পাচ্ছিলাম না আর, আমাদের অন্তর্লীন হাহাকার শুনেও পাশ দিয়ে নিঃশব্দে নীরবে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছিল। কে জানে এতক্ষণে ওকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে!
হঠাৎই কৌশিক চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওপাশে বেদীর নিচে ওটা একটা কে পড়ে রয়েছে না?’
জীবনকে বাজি রেখে আমরা দৌড়লাম। পার্কিং-লটে একটা গোড়া-বাঁধানো অ্যাকাসিয়া গাছের নিচে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে সুজিত। দুর্জয় রাগে অনীক লাথি চালাল— শালা তুমি মাতলামি করার জায়গা পাও না।
আর তখনই মেয়েটা গেয়ে উঠল, ‘ওয়েল দেয়ার ওয়জ নো রীজন টু বীলিভ শী’ড আলওয়েজ বী দেয়ার/ বাট ইফ ইউ ডোণ্ট পুট ফেথ ইন হোয়াট ইউ বীলিভ ইন/ ইট’স গেটিং ইউ নো হোয়্যার।’
‘ছাড়, বেকায়দায় লেগে গেলে বিপদ হবে’ বলে পাশে বসতেই সুজিত হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল, ‘ও আর কোনওদিন ফিরবে না। আমারই ভুল, ছবির মধ্যে ঢুকে গেলে কেউ কি আর বেরিয়ে আসতে পারে?’
এ তো দেখি যে কোনও হুঁশই নেই। কিন্তু মেয়েটা কে? এতদিনের বন্ধুত্ব অথচ কোনওদিনই তো টের পাইনি যে বুকের মধ্যে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে।
‘ডোন্ট লুক ডাউন, জাস্ট লুক আপ/ ‘কজ শী ইজ আলওয়েজ দেয়ার বিহাইন্ড ইউ, জাস্ট টু রিমাইন্ড ইউ/ টু হার্টস বিলীভিং ইন জাস্ট ওয়ান মাইন্ড,’ শুনতে শুনতে আমারও বুক টনটন করে উঠছিল।
যাইহোক সুজিতকে টেনে হিঁচড়ে তোলা হলেও যে আড্ডাটা জমে উঠেছিল, সেটা তো আর ফিরবে না। কাজেই সুজিতের ওপরে ক্ষোভ ওগরাতে ওগরাতে যে যার গাড়ি বের করলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি যে আমাদের কোনও কথাই সুজিতকে স্পর্শ করছে না। ওর সমস্ত চেতনা জুড়ে রয়েছে ওই সুরেলা শব্দগুলো, ‘দেয়ার ইজ সো মাচ লাভ ইউ’ল নেভার নো/ শী ক্যান রীচ ইউ নো ম্যাটার হাউ ফার/ হোয়েরেভার ইউ আর।’
এই অবস্থায় হতভাগাটাকে ড্রাইভ করতে দেবার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদেরই পৌঁছে দিতে হবে। যেহেতু আমার আর সুজিতের বাড়ি একই দিকে, তাই বেঁড়ে ব্যাটাকেই ধর। ওর গাড়িটা পড়ে রইল, থাকুক। কাল পরশু যখন পারবে এসে গুচ্ছের পার্কিং দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। গাঁটগচ্ছাটাই হতভাগার শাস্তি।
নিঃশব্দে ড্রাইভ করছি আমি। গঙ্গার ধার ধরে এসে যখন রবীন্দ্র-সদনের সামনে, আপনমনেই সুজিত বলল, ‘কী যে একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়ে গেল না!’
‘সহ্য করতে পারিস না, খাস কেন?’ গাড়ি চালাতে চালাতে কড়া গলায় বললাম।
‘আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না যে ললিতা নেই। মনে হয় যেকোনও সময়ে ফিরে এসে জড়িয়ে ধরবে আমাকে,’ তারপরেই শুরু হল ফোঁসর ফোঁসর কান্না, ‘আর পারছি না আমি। গুরু আমাকে বাঁচা!’
আমার বিরক্তই লাগছিল। নতুন বছরে আচ্ছা মাতালের পাল্লায় পড়া গেল তো। কোনওরকমে ভালোয় ভালোয় চক্রবেড়িয়ায় ওর ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিতে পারলে বেঁচে যাই।
লিফটে চেপে পাঁচতলায় উঠে ফ্ল্যাটের দরজা খোলার পর সুজিত বলল, ‘ভেতরে আসবি? কিছু কথা বলতাম তোকে। আয় না।’
কী যে ছিল ওর আহ্বানে কে জানে, ভেতরে ঢুকলাম। একা থাকতে থাকতে ঘরটাকে তো দেখি একদম নরক করে রেখেছে। চারপাশে জামাকাপড় ছড়ানো, অ্যাশ-ট্রে উপছে পড়ছে। দেওয়ালে ঝুল। বাড়িতে কোনও মহিলা না থাকলে ঘরদোরের যতটা দৈন্যদশা হতে পারে, ঠিক সেরকম। কিন্তু তাহলে মেয়েদের ওই দুটো অন্তর্বাস আলনায় ঝুলছে কেন? কেউ কি আসে ওর কাছে?
‘ঘরটার যা অবস্থা, কোনও ভদ্রলোকে থাকতে পারে না। কেউ এলে যে কোথায় বসাই’ বিড়বিড় করতে করতে মাতালটা চেয়ারে ডাঁই করে রাখা খবরকাগজগুলো তুলে কোণের দিকে আরেকটা চেয়ারে রেখে এসে বলল, ‘বোস।’
‘ঘরটার এরকম অবস্থা করেছিস কেন যে ভদ্রলোকে থাকতে পারে না?’
‘আমি কি ইচ্ছে করে এইভাবে রেখেছি? আমাকে দেখে মনে হয় যে আমি এরকম করতে পারি?’ সুজিত ব্যথিতভাবে বলল।
‘তুই করিসনি তো কে করেছে?’ আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম।
‘তাহলে তো বস, অনেক কথা বলতে হয়। শুনে হজম করতে পারবি তো?’
‘যা বলবি তাড়াতাড়ি বল। আমি এবার কাটব। তোকে পৌঁছে দিয়েছি, দায়িত্ব শেষ,’ বিরক্তি নিয়েই বললাম।
‘গুরু তোর দায়িত্ববোধের প্রশংসা করতে হয়। আমাকে যত্ন করে বাড়ি পৌঁছে দিলি’ সুজিত খ্যাকখ্যাক করে হাসল, ‘আর আমি ভাবছি মালটা এত ঘুরছে, নির্ঘাৎ রাস্তা হারিয়েছে। ঠিকঠাক বাড়ি ফিরতে পারলে হয়!’
মাথাটা ধাঁ করে গরম হয়ে গেল। ওর মাথায় চাঁটি মেরে বললাম, ‘হারামজাদা! তাও যদি সেন্সে থাকতিস!’
‘জাস্ট দু-মিনিট, আসছি’ হেসে সুজিত বাথরুমের দিকে চলে গেল। আমি ঘরের দৈন্যদশাটা আরেকবার প্রত্যক্ষ করলাম। একগাদা পলিপ্যাক ছড়িয়ে রয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা মে মাসের পরে আর ওল্টানো হয়নি। আর তার পাশেই একটা অদ্ভুত ছবি ঝুলছে। ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ক্যালেন্ডারে আবার চোখ চলে গেল। যাবেই, কেননা ১৬ই মে-র তারিখে গোল দাগ দিয়ে লেখা ‘কিস ডে’। মাথাটা একদমই গেছে হতভাগার।
ছবিটার দিকে তাকালাম। একটা নিখুঁত গোল ছড়ানো পদ্মফুল। তার মধ্যে সোজা আর উল্টো কতগুলো ত্রিভূজ পরস্পরকে ছেদ করে রয়েছে। আর ত্রিভূজগুলোর কেন্দ্রে ছোট্ট ছোট্ট দুটো চোখ। মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু ওইদিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছিল। মনের সমস্ত অস্থিরতা যেন ক্রমশ থেমে যাচ্ছে। সর্বাঙ্গ জুড়ে একটা অপরূপ স্নিগ্ধতা।
‘একদম চান করে নিলাম। চা খাবি তো? ধর!’
চমকে তাকিয়ে দেখি সুজিত, দু-হাতে দুটো কাপ। খুবই অবাক লাগল। এর মধ্যে চান সেরে চা-ও বানিয়ে ফেলল, অথচ টেরই পেলাম না? আশ্চর্য তো! নেশাটা চড়ে গেল নাকি?
‘খুব অকওয়ার্ড অবস্থায় ফেলে দিয়েছিলাম, না?’ সুজিত চায়ে চুমুক দিল।
স্নিগ্ধতা সরে গিয়ে মাথাটা আবার গরম হয়ে গেল, ‘যাক, অন্তত সেটুকু বুঝেছিস!’
‘তোরা ভেবেছিলি আমি মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম?’ সুজিত বিষন্নভাবে মাথা নাড়ল, ‘দুর ওইটুকুতে আমার কিচ্ছু হয় না। গণ্ডগোল তো অন্য জায়গায়।’
‘কোথায়?’ আমার গলা চড়ে গেল।
‘এইখানে?’ সুজিত নিজের বুক দেখাল।
আমি ভাবলাম, খেয়েছে! মালটার হার্টের ব্যামো ফ্যামো আছে নাকি আবার!
‘ছবিটা দেখেছিস?’ ইতিমধ্যে দেওয়ালের দিকে আঙুল তুলল সুজিত, ‘ওটার দিকে তাকিয়ে থাকলে কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যায়, হুঁশ থাকে না।’
মেজাজ দেখাতে গিয়েও আমি থেমে গেলাম। সত্যি তো! এইজন্যে কখন যে সুজিত চান করেছে চা বানিয়েছে টের পাইনি। কী আছে ছবিটার মধ্যে?
‘ওর মধ্যেই থাকে। ওখান থেকেই বেরিয়ে আসে?’ সুজিতের মাতলামি আবার চড়ছে।
‘কে?’
‘ওই যে, ওগুলো যার!’ সুজিতের আঙুল ঘুরে গেল আলনার দিকেই। আর আমি দেখলাম শুধু অন্তর্বাস নয়, একটা টপ আর একটা স্কার্টও ঝুলছে সেখানে। আশ্চর্য তো! এ দুটো এতক্ষণ চোখে পড়েনি?
‘ওই যে গান গাইছিল মেয়েটা— সব গুবলেট করে দিল। গলাটা কী বলব তোকে, একদম ললিতা বসানো,’ সুজিত উত্তেজিত হয়ে বলছে, ‘এমনকি—বিশ্বাস করবি— যে গানগুলো গাইছিল, ঠিক সেইগুলোই একদিন, যেখানে আমরা বসেছিলাম সেই ডেকে বসেই আমাকে শুনিয়েছিল?
‘মাথা ঠিক থাকে বল? বেনারস আর কলকাতা— কত স্মৃতি! কেবল ওই রেস্তোঁরাতেই কতবার যে ওকে নিয়ে এসেছি ভাবতে পারবি না। এমনকি একবার ওর জন্মদিনে ওখানেই রুম ভাড়া করে সকাল থেকে রাত। সেদিন ওর জন্মদিন ছিল।
সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। ওয়াশরুমে ঢুকে খুব কাঁদছিলাম। কিন্তু কিছুতেই মন মানছিল না রে। কেবলই ভাবছিলাম ও যে বলেছিল কোনওদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না! তাহলে করল ওটা? দুম করে কেবলই ছবি? শুধু পটে লিখা? ওই যে সুদূর নীহারিকা যারা করে আছে ভিড়…’
‘তারপর?’ সুজিতকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে হল। নইলে হয়তো গোটা কবিতাটাই শুনিয়ে ছাড়ত। এটা ঠিক যে মালটা আবৃত্তিটা হেব্বি করে। কিন্তু এই মাঝরাত্তিরে সেসব কে শুনবে?
‘তারপরে আর সহ্য করতে না পেরে নিচে নেমে গিয়েছিলাম। দেখি সে আমার জন্যে আবার ফিরে এল কিনা? কিন্তু আমারই ভুল। ছবির ভেতর থেকে ফিরবে কী করে?’ সুজিত হাতে মুখ ঢাকল।
শুনতে শুনতে আমার মায়া লাগছিল। ওর হাতে চাপড় মেরে বললাম, ‘মনখারাপ করিস না। স্মৃতি আঁকড়ে তো সারাজীবন কাটে না। তোকে উঠতেও হবে, মাথা তুলে দাঁড়াতেও হবে। নিজের জন্যেই বাঁচতেও হবে।’
সুজিত ফট করে আমার কলার চেপে ধরে খিঁচিয়ে উঠল, ‘আবে অ্যাই, ফালতু জ্ঞান দিবি না। সন্ধে থেকে বহুত হেজিয়েছিস! কে বলল যে আমি বেঁচে নেই? বেঁচে নেই তো কি মরে গিয়েছি?’
‘কলারটা ছাড়’ কড়া গলায় বললাম, ‘ভদ্রভাবে কথা বল। কলারটা ছাড়।’
ছেড়েও দিল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফুঁপিয়ে উঠল, ‘পারছি না। কোথাও শান্তি পাচ্ছি না। কেন যে মরতে বেনারসে গেলাম? সেখানে না গেলে তো লাবণ্যর সঙ্গে দেখা হত না আর এভাবে কষ্টও পেতে হত না।’
একটু অবাক হয়ে বললাম, ‘লাবণ্য? না। ললিতা?’
‘লাবণ্য’ মাথাটা বুকে ঝুঁকিয়ে বিড়বিড় করল সুজিত, ‘বেনারসে ললিতা ঘাটে লাবণ্যর সঙ্গে দেখা না হলে এইভাবে জ্বলতে হত না।’
এই রে! লাবণ্য ললিতা গঙ্গার ঘাট সব ঘেঁটে ফেলেছে।
‘সেটা কবে?’ জানতে চাইলাম।
‘বারো বছর আগে,’ সুজিত বিড়বিড় করল, ‘হ্যাঁ, বারো বছর। দুহাজার ছয়।’
‘লাবণ্যকে দেখে প্রথম ক্রাশ খেয়েছিলাম কলেজে। কপাল মন্দ, তাই ওকে পেলাম না। একটা বছর আমাদের সঙ্গে কাটিয়েই পরের বছরে চলে গেল গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজে। কলেজ শেষ করে আমি যখন লাথ খেয়ে বেড়াচ্ছি ও তখন আর্ট নিয়ে পড়তে প্যারিস চলে গেল। সেখানেই জন টেলরের সঙ্গে আলাপ। পরে তাকেই বিয়ে করল।’
সুজিত লাবণ্যর জীবনী আউড়ে যাচ্ছে আর নিজের নির্বুদ্ধিতা দেখে আমার নিজেরই ওপরে রাগ হচ্ছে। এ শালা তো পুরো আউট। সারা সন্ধে ললিতা ললিতা করে হেদিয়ে মরে এখন সেটা লাবণ্যতে এসে দাঁড়িয়েছে। রাতদুপুরে বন্ধুকৃত্য করতে গিয়ে পুরো ফেঁসে গেলাম দেখছি।
‘মাতালের ভাট শুনছি। সন্ধেবেলার ললিতা এখন লাবণ্য হয়েছে,’ টুকটুক করে হোয়াটসঅ্যাপ করলাম।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা স্মাইলি নিয়ে কৌশিকের উত্তর এসে গেল, ‘এবার মাথায় ঢুকিয়ে দে যে লাবণ্য নয়, সুভদ্রা। সেটা নিয়ে যখন হ্যাজাবে তখন সেটাকে সূর্পনখায় কনভার্ট করে কেটে পড়। ও শালা সারারাত নাক কান কেটে মরুক।’
হাসি পেয়ে গেলেও চেপে রেখে ফিরতি স্মাইলি পাঠালাম।
‘কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে, কীরে কবে এলি?’
সুজিতের গলা শুনে সম্বিত ফিরে এল। এতক্ষণ যে কী বলে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। তবুও যেন খুব মন দিয়ে শুনছি এইভাবে বললাম, ‘কে?’
‘তুই কি শুনছিস না?’ খুব ব্যথিত গলায় সুজিত বলল, ‘বললাম না, যে ললিতা ঘাটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গঙ্গার শোভা দেখছিলাম? পেছন থেকে লাবণ্যই দেখতে পেয়ে ডেকেছিল আমাকে।’
‘হ্যাঁ, সেইজন্যেই তো বলছি’ আমি ম্যানেজ দেবার চেষ্টা করলাম, ‘মানে কে কাকে জিজ্ঞেস করল?’
‘অবভিয়াসলি আমি জিজ্ঞেস করলাম। কারণ লাবণ্যই তো ফিরে এসেছে। বলল যে এডওয়ার্ডের সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।’
জন যে কখন এডওয়ার্ড হয়ে গিয়েছে টের পাইনি।
‘প্যারিস থেকে ফিরে এসে কিছুদিন মুম্বইতে। তারপর কলকাতাতেই, জেনেক্স ভ্যালি। বেনারসে এসেছিল ছবি আঁকতে। মন্দিরগুলো সব ঘুরে ঘুরে দেখছে। ওর বরাবরের প্যাশন দশমহাবিদ্যা। দশমহাবিদ্যা জানিস তো?’
মাথা নাড়লাম— জানি।
‘ঘ্যাম নিবি না। বামুনের ছেলে, না জানলে জুতোপেটা করতাম’ বলেই হঠাৎ চোখ বন্ধ করে শুরু করল, ‘কালীরূপং মহেশানি সাক্ষাৎ কৈবল্যদায়িনী/ তারকত্বাৎ সদাতারা তারিণী চ প্রকীর্তিতা/ শ্রীদাত্রী চ সদা বিদ্যা ষোড়শী পরিকীর্তিতা…’
‘তারপর কী হল?’ রেলগাড়ি থামানোর জন্যে বললাম, ‘ছবি আঁকল?’
‘হ্যাঁ। ফাইন আর্টস-এ একজিবিশনও হয়েছিল। প্রথমদিনই সবকটা বিক্রী হয়ে গেল। ছবি এঁকে ভালো ইনকাম করত।
যাক গে সে সব পরের কথা। ললিতা ঘাটে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গল্প করার পরে ও টেনে নিয়ে গেল কাছেই রাজরাজেশ্বরী মন্দিরে, দেখেছিস মন্দিরটা? গেছিস বেনারসে?’
মাথা নাড়লাম— যাইনি।
‘বেঁচে গেছিস’ সুজিত হঠাৎ দুলতে শুরু করল, ‘খুব বেঁচে গেছিস। তবে কখনও গেলেও খবরদার ওই মন্দিরটায় যাস না। মারা পড়ে যাবি। আমি তো জানতাম না। লাবণ্যর সঙ্গে রোজ ওখানে সময় কাটিয়েছি। সেই করতে গিয়ে এমন অবস্থা যে নিজের ফেরার টিকিট ক্যানসেল করে দিলাম।’
‘কেন?’
‘যদ্দিন ওর সঙ্গে থাকা যায়, বুঝলি না?’ হাসল সুজিত, ‘দু-সপ্তাহ কাটিয়ে ওর সঙ্গেই ফিরলাম। আর সেটাই হল কাল।’
আমি উসখুস করছি যে এবার কাটতে হবে। সুজিত বলতে শুরু করল, ‘ওই মন্দির নিয়ে একটা মিথ আছে বুঝলি। দেবীর দর্শন করার সময়ে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করবি। দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকবি তো, দেখবি যে চোখ ফেরাতে পারছিস না। এমনই আকর্ষণী ক্ষমতা যে ওই মন্দিরে কেউ রাত কাটাতে পারে না।’
‘তাই? হাই চাপতে চাপতে বললাম।
‘হ্যাঁ। এমনকি মন্দিরের পুরোহিতেরাও বেশিদিন কাজ করতে চায় না। নাকি এমন টান যে মানুষ পাগল হয়ে যাবে। প্রথমে ভেবেছিলাম মিথ। পরে বুঝেছি যে না, হাড়ে হাড়ে সত্যি। ওই মন্দির আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে।’
‘রোজ সকালে উঠে চান সেরেই মন্দিরে। নাটমন্দিরে বসে লাবণ্য স্কেচ করত। আর আমি মেয়েটাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।’
‘মেয়েটা মানে?’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
‘মহারাজ্ঞী, বললাম যে— লাবণ্যর মেয়ে। এগারো বছর।’
‘মহারাজ্ঞী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মানে কী?
‘বামুনের ছেলে শালা, মহারাজ্ঞী জানো না?’ সুজিত খেঁকিয়ে উঠল, ‘থুতু ফেলে তাতে ডুবে মর। মহারাজ্ঞী টেল—বাপের টেলর পদবী ছেঁটে নিজের পদবী করেছিল টেল। আমি মজা করে বলতাম আ টেল অফ থ্রী সিটিজ— প্যারিস, মুম্বাই, কলকাতা।
এদিকে লাবণ্যর দশমহাবিদ্যার চর্চা যে আস্তে আস্তে আমাকেও কোন ফাঁকে গ্রাস করে ফেলেছে তখন তো বুঝিনি। বরং ওকে ইমপ্রেস করার জন্যে তখন ওই নিয়ে প্রচুর পড়াশুনো শুরু করেছি। সেখান থেকে শিখে একদিন মহারাজ্ঞীকে বললাম, ‘তুই হচ্ছিস ত্রিপুরসুন্দরী।’
‘সে আবার কী?’ ভুরু দুটো একটু তুলে জিজ্ঞেস করল।
‘মনে আছে বেনারসে সেই রাজরাজেশ্বরী দেবী?’
‘হুঁউউউউ!’
‘তাঁরই আরেকটা নাম ত্রিপুরসুন্দরী। যিনি তিনটে পুর, মানে তিনটে নগরীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী, তিনিই ত্রিপুরসুন্দরী।’
‘ভুলভাল বলিস না’ আমি প্রতিবাদ করলাম, ‘ত্রিপুরসুন্দরীর এই ব্যাখ্যা তোকে কে দিয়েছে?’
সুজিত খেঁকিয়ে উঠল, ‘তোর বাপ বলেছে শালা। জ্ঞান কপচাবি, না কথাটা শুনবি?’
‘সরি। ক্যারি অন,’ কেন যে বললাম! বরং বাবা তুলেছে এই অজুহাতে একটা ঝগড়া বাধিয়ে দিব্যি কেটে পড়া যেত।
‘টেল অফ থ্রী সিটিজ আর ত্রিপুরসুন্দরী। একজন স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল কাঁপিয়ে দিচ্ছেন, আরেকজন প্যারিস-মুম্বাই-কলকাতা!’
‘ধ্যাৎ! মামাটার না খালি বাজে কথা’ মহারাজ্ঞী মুখে লজ্জা দেখালেও বোঝা যাচ্ছিল যে ওর ভালো লেগেছে। নিজের প্রশংসা শুনতে কোন মেয়ে না ভালোবাসে?
‘এই যে মাথায় ঢোকালি,’ লাবণ্য হেসে উঠেছিল, ‘এবার কী হবে বল তো? লেখাপড়া ছেড়ে সারাদিন আয়নার সামনে বসে থাকবে।’
‘সমস্ত মনে আছে, কিচ্ছু ভুলতে পারিনি,’ আর্তস্বরে বলে সুজিত আবার চুপ করে গেল।
‘ভেবে কী করবি বল?’ হাই তুলে বললাম, ‘উঠি রে। এরপর তো ভোর হয়ে যাবে।’
সঙ্গে সঙ্গে সুজিতের মুখচোখ কেমন বদলে গেল। অনুনয় করে বলল, ‘যাস না রে। প্লীজ যাস না। ও আসবে।’
খুবই আশ্চর্য লাগল শুনে, ‘কে আসবে?’
‘ললিতা। ওই গানটা গাইছিল মানে আছে—’
সুজিত কর্কশ হেঁড়ে গলায় ধরল, ‘ডোন্ট লুক ডাউন, জাস্ট লুক আপ/ ‘কজ শী ইজ আলওয়েজ দেয়ার টু বিহাইন্ড ইউ, জাস্ট টু রিমাইন্ড ইউ…’
সুরের কোনও মা-বাপ নেই। কানে আঙুল দিতে হবে এমন অবস্থা।
‘বীটিং টুগেদার টিল দ্য এন্ড অফ টাইম/ ইউ নো উই আর টু হার্টস বিলীভিং ইন জাস্ট ওয়ান মাইন্ড/ টুগেদার ফরএভার টিল দ্য এন্ড অফ টাইম,’
আর আমার সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল। কে গাইছে? কার গলা ওটা? সুজিতের গলা থেকে ওরকম মেয়েলি স্বর আসছে কী করে? ঘন্টা দেড়েক আগেই তো এই গলাটা শুনে এসেছি।
মাথার ওপরে আলো জ্বলছে। সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ। বাইরে এখনও বাজির শব্দ। গোটা ফ্ল্যাটে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। তাহলে? সুজিত ওভাবে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিয়েছে কেন? ওর চুলগুলো যে সরে সরে যাচ্ছে সে কী ফ্যানের হাওয়ায় নাকি কেউ বিলি কেটে দিচ্ছে? আমার হাত-পা কাঁপছিল। সমস্ত রোমকূপ খাড়া হয়ে গিয়েছে। সুজিত এখন চুপ, কিন্তু গানটা খুব অস্পষ্টভাবে হয়েই চলেছে আমাদের চারপাশে। একটা মৃদু পারফিউমের গন্ধ ভাসতে থাকল হাওয়ায়।
আমি যে উঠে পালিয়ে যাব, সেই সাহসও নেই। মনে হচ্ছে নির্জন সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলে যদি দেখি একটা মেয়ে উঠে আসছে? সারা শরীর শিরশির করছে। বুঝতে পারছি যে এই রাত্তিরে মাতাল সুজিতই আমার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা।
আর সেই সুজিতই হঠাৎ আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বিড়বিড় করে কীসব বলতে শুরু করতেই গানটা থেমে গেল। কিন্তু ও যে কী বলল, কিছুই শুনতে পেলাম না। আবার সব চুপচাপ। সুজিত মাথা হেলিয়ে দিয়ে আদর খাচ্ছে।
আচমকা ও বলে উঠল, ‘নো। আমি বলছি, নো-ও।’
তারপরেই সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘না-আ-আ-আ, প্লীজ। প্লীজ না-আ-আ।’
এরপর সব চুপচাপ। ও বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার দিকে। আর আমি ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
একসময়ে বলল, ‘চলে গেছে। এইরকম হঠাৎ হঠাৎ আসে আর চলে যায়। আর কোনও গন্ধ পাচ্ছিস?’
সত্যিই তো সেই গন্ধটা আর নেই।
‘তুই এরকম করছিস কেন?’ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
‘কী করছি বল?’ সুজিত করুণ হাসল, ‘ও নিজে আসবেও না, অথচ কাউকে আমার কাছে ঘেঁষতেও দেবে না। এভাবে বাঁচা যায়?’
সেই থমথমে ঘরে কথাগুলো আমার হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিল।
‘বোর হচ্ছিস, না? ভাবছিস মালের ঘোরে ভুলভাল বকছি! কিন্তু বিশ্বাস কর, এই নিয়ে থাকতে থাকতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। সব বলতে চাই, স-অব। কেউ একজন শুনুক।’
‘বল’— শব্দটা উচ্চারণ করতে চাইলেও পারিনি, কেবল ঠোঁট নড়েছিল।
‘ক্রমশ এমন অবস্থা হল যে ওকে না দেখে থাকতে পারি না। আর বুঝতে পারলাম যে আমার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে ওরও আগ্রহ কম নয়। ব্যস প্রেম শুরু হয়ে গেল— উদ্দাম প্রেম।’
‘তারপর?’
‘আমাদের কপাল খারাপ’ সুজিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘যতই লুকিয়ে দেখা করি, আর একদম অচেনা জায়গায় ঘুরতে যাই, একদিন ঠিকই ধরা পড়ে গেলাম।’
‘মেয়ের কাছে?’ বলেই বুঝলাম বোকার মত প্রশ্ন। তাই বললাম, ‘কিন্তু মহারাজ্ঞীর তো তোকে মেনে নিতে অসুবিধে হবার কথা নয়।’
‘মহারাজ্ঞীর বয়স তখন ঠিক ষোলো’ সুজিত তাকাল আমার চোখে।
‘হলেই বা। তোর সঙ্গে তো, যা বললি, খুবই ভাব ছিল। তাহলে মানতে পারবে না কেন?’
কোনও উত্তর নেই। কী ভাবছে কে জানে? তারপর বলল, ‘একদিন— সেদিন মহারাজ্ঞী বাড়ি ছিল না— লাবণ্য আমাকে বাড়িতেই ডেকে পাঠাল। নিজের স্টুডিওতে বসেছিল চুপ করে, চোখদুটো লাল। দেখেই বুঝেছিলাম যে খুব কেঁদেছে। সামনের ক্যানভাসে একটা অদ্ভুত ছবি। ওইরকম ত্রিভূজ দিয়ে তৈরি একটা শরীর আর মুখটা একটা মেয়ের। ওই ত্রিভূজের ছবিটা— মানে জানিস?’
ঘাড় নাড়লাম—জানি না।
‘একটা তান্ত্রিক যন্ত্র। ত্রিপুরসুন্দরী দেবীকে আরাধনা করার যন্ত্র’ আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তারপরে বলল, ‘আমাকে দেখেই কোনও ভনিতা না করে লাবণ্য বলল, সুজিত তুই আমার কলেজের বন্ধু। কিন্তু এটা তুই কী শুরু করেছিস?’
না বোঝার ভান করে বললাম, ‘বুঝতে পারছি না। কী শুরু করেছি?’
‘ও বুঝিসনি যে কী শুরু করেছিস?’ কাটা কাটা গলায় লাবণ্য বলল, ‘প্রেম। আচ্ছা, মহারাজ্ঞীর না হয় বোধবুদ্ধি হয়নি, কিন্তু তোর তো যথেষ্ট বয়স হয়েছে। একবারও মনে হল না যে মহারাজ্ঞী তোর মেয়ের বয়সী? এই সম্পর্কটা কখনও দাঁড়ায়?’’
এবার আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম,‘মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?’
ম্লান হেসে মাথা নাড়ল সুজিত, ‘প্রেমটা মায়ের সঙ্গে নয়, মেয়ের সঙ্গেই হয়েছিল। মহারাজ্ঞীকে আমি চাইতাম। নবোকভ থেকে আদর করে ডাকতাম ললিতা। সেও চাইত আমাকে। আমরা স্বামী-স্ত্রীর মত করেই দিন কাটাতাম। অথচ ও বলত যে সবাইকার মত করে আমরা নিজেদের পাব না। অন্যরকমভাবে পাব। তখন ওর কথার মানে বুঝিনি।’
আমার গা-টা কেমন রি রি করছিল। কিচ্ছু শুনতে ইচ্ছে করছিল না। শেষে বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে? হতভাগা আর কত নিচে নামবে? কিন্তু সুজিতকে তখন স্মৃতিচারণায় পেয়েছে।
‘লাবণ্যর কথার কোনও উত্তর দিতে পারিনি। কেননা বলতে গেলে বলতে হয় যে মহারাজ্ঞীর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখব না। সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। হতে পারে লাবণ্য আমার কলেজের বন্ধু, হতে পারে আমার প্রথম ক্রাশ। কিন্তু এতদিন পরে ওকে নিজের শ্বাশুড়ি ভাবতে আমার তো অসুবিধে হচ্ছে না!’
সুজিতের নোংরা প্রলাপ শুনে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। কিন্তু ওকে থামিয়ে দেব যে সেই ক্ষমতাও আমার নেই তখন। হাঁ করে গিলছি কথাগুলো।
সুজিত বলতে থাকল, ‘লাবণ্যকে ওই অবস্থায় স্টুডিও-তে ছেড়ে রেখে নেমে আসছি সিঁড়ি দিয়ে, দেখি নিজের ঘরের সামনে মহারাজ্ঞী দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাকে দেখে অদ্ভুতভাবে হাসল, ‘বলেছিলাম না সাধারণ লোকের মত করে আমাদের হবে না? একবার ভেতর এসো।’
পেছন থেকে গর্জন ভেসে এল, ‘না।’
কখন যে লাবণ্যও নেমে এসেছে লক্ষ্য করিনি। মহারাজ্ঞী পাত্তাই দিল না।
বলল, ‘আঃ। একটা ছবি এঁকেছি। সেটা দেব বলে ডাকছি।’
‘ছবি? নাকি ঘরে ঢুকে অসভ্যতা করবি?’ লাবণ্য চিৎকার করে উঠল।
অবশ্য ওকে দোষ দিই না। ওর জায়গায় থাকলে আমিও একই কাজ করতাম। যাই হোক মহারাজ্ঞী ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা কাগজের মোড়ক দেখিয়ে বলল, ‘এটা রেখে দিও। যখন আমার জন্যে মন কেমন করবে, এই দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি আসব তোমার কাছে।’
‘দেখি কী এঁকেছিস? বাপের বয়েসী দামড়া কুকুরের সঙ্গে খুব প্রেম, না? বদমাইস মেয়ে!’ লাবণ্য চিৎকার করে উঠে আমার দিকে ফিরল, ‘জানোয়ার! বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে।’
ললিতা ততক্ষণে মোড়কটা খুলে ফেলেছে। কার্ডবোর্ডে একটা ছবি আঁকা। দেখেই পাল্টে গেল লাবণ্যর চোখমুখ।
ভীষণ মমতামাখা অথচ ভয়-পাওয়া একটা গলায় বলল, ‘ও মামণি তুই এ কী এঁকেছিস? ছবিতে এত প্রাণ তুই দিলি কী করে? এই ছবিটা কেন আঁকলি তুই?’
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল মাটিতে।
আমিও ছবিটা দেখলাম, ওই যে দেওয়ালে যেটা দেখছিস— ত্রিপুরসুন্দরী দেবীর যন্ত্র।
‘ছবিটা মাটিতে রেখে মহারাজ্ঞী ওটার ওপরে পা রেখে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?’
‘কী বলব তোকে’ সুজিত স্বপ্নের ঘোরে বলল, ‘অত সুন্দর হাসি কোনও মানুষ হাসতে পারে না। আমার রাজরাজেশ্বরী মন্দিরের কথা মনে পড়ে গেল। সেই অনিন্দ্যসুন্দর দেবীপ্রতিমা, সেই অমর্ত্যসুন্দর হাসি।
লাবণ্য তখনও কাঁদছিল। একমুহূর্ত ওর দিকে চোখ পড়েছিল। তারপরেই ফিরে দেখি মহারাজ্ঞী, আমার আদরের ললিতা, নেই।’
‘নেই মানে?’ প্রবল বিস্ময়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘নেই মানে কী?’
বিষণ্ণ হাসল সুজিত, ‘নেই মানে নেই। জাস্ট মিলিয়ে গিয়েছে। ওই ছবির মধ্যেই যেন মিলিয়ে গিয়েছে। আর মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে দুটো চোখ। চোখদুটো আগে ছিল না।’
‘কী বলছিস তুই? ইজ ইট পসিবল?’ আমি আবার চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘আর ওর মা?’
সুজিত দেওয়ালের দিকে আঙুল তুলল, ‘ওই যে আবার আসছে।’
সঙ্গে সঙ্গে একটা হালকা ধুপধুপ শব্দ। চমকে তাকিয়ে দেখি কোণের সেই চেয়ারটা থেকে খবরকাগজগুলো মেঝেতে পড়ে গেল। কিন্তু ছড়িয়ে যাবার বদলে একটার ওপরে একটা। ঠিক যেন বান্ডিলটা ধরে যত্ন করে নামিয়ে রাখল কেউ। তারপর আমার চোখের সামনে চেয়ারটার গদিতে একটা ছোট্ট খাঁজ জেগে উঠল, কেউ বসলে যেমন হয়। ঘর ভরে গেল মৃদু পারফিউমে।
একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সোজা হল সুজিত, ‘এসেছ?’
তারপরেই সেই হেঁড়ে গলায় ধরল, ‘আই’ল নেভার ফরগেট ইউ/ ‘কজ ওয়ানস আপন আ টাইম ইউ ওয়ার মাই এভরিথিং।’
ক্রমশ ওর গলা ঢেকে দিল একটা মেয়ে, ‘ইট’স ক্লিয়ার টু সী দ্যাট টাইম হ্যাজন’ট চেঞ্জড আ থিং/ ফ্রম দ্য ডে দ্যাট আই মেট ইউ/ আইনিউ দ্যাট আই উড লাভ ইউ টিল দ্য ডে আই ডাই।’
কোণের চেয়ারটা দুলে উঠল। একটা অস্পষ্ট পায়ের শব্দ। সুজিত আবার মাথা হেলিয়ে দিয়েছে পেছনে। আর তখনই আমি আবছা দেখতে পেলাম তাকে। ধোঁয়ার মত একটা কিশোরী মেয়ে পেছন থেকে দুহাতে সুজিতের গলাটা জড়িয়ে রেখেছে। আমি বুঝতে পারলাম যে পড়ে যাচ্ছি।
অনেক পরে একসময়ে মুখে রোদ লাগতে দেখি মাটিতে শুয়ে আছি। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। পাশেই সুজিত মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু জানলাটা তো রাত্তিরে বন্ধ ছিল! কে খুলল? মোবাইলে দেখি পৌনে আটটা। ইসসস, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। একলাফে উঠে চোখমুখে জল দিয়ে রেডি হয়ে নিলাম। বেরিয়ে যাব এবারে। হতভাগাটাকে ডাকার দরকার নেই, ঘুমোচ্ছে, ঘুমোক। উঠলেই তো বাজে বকবে।
এত সকালে অন্য কেউ নেই সিঁড়িতে। লিফটের বোতাম টিপছি, কোনও সাড়া নেই। হয় যান্ত্রিক গোলযোগ, নইলে দরজা ঠিকমত বন্ধ হয়নি। হেঁটেই নামতে হবে। দিনের বেলা বলেই এখন আমার সাহস ফিরে এসেছে। কিন্তু আবার যে চমক অপেক্ষা করছিল বুঝিনি।
তিনটে তলা নেমে ল্যান্ডিংটা ঘুরেছি আর হঠাৎই সিঁড়ি ফুঁড়ে একটা কিশোরী মেয়ে, বেরিয়ে এল। বছর পনেরো ষোলো হবে, ভারি সুন্দর দেখতে। এতটাই সামনে যে আরেকটু হলেই ধাক্কা লাগত। কানের দুলদুটো মিষ্টি মুখের সৌন্দর্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আচমকা ওকে দেখে আমার বুক ধড়ফড় করছিল কিন্তু তবুও ওর ওপর থেকে যেন চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। খুব বেশি হলে পনেরো কী কুড়ি সেকেন্ড, কিন্তু আমার মনে হল যেন অনন্তকাল ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছি আমি।
‘হ্যাপি নিউ ইয়ার আঙ্কল!’ রিনরিনে গলায় শুভেচ্ছা এল।
আমার বুকটা এমনই ধড়াস ধড়াস করছে যে শুভেচ্ছার প্রত্যুত্তরই দিতে পারলাম না। তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে মেয়েটা উঠে গেল ওপরে।
আড্ডায় গল্পটা ছাড়তে বন্ধুরা হ্যা-হ্যা করে হাসল। হাসাটাই স্বাভাবিক। কেননা মাতাল সুজিতের বুকনি যেমন ভুলভাল, তেমনি আমার দেখাটাও। ওদের কথা শুনে শুনে ক্রমশ একটা সময়ে আমিও ভাবতে শুরু করলাম যে কে জানে আমি হয়ত ভুলই দেখেছি। কিন্তু তাইই বা কী করে হবে? সুজিত নেশার ঘোরে উষ্টুমধুষ্টুম গল্প বানিয়ে থাকতেই পারে। কিন্তু আমি তো নেশা করিনি। সেই রাত্তিরে সুজিতের ঘরে একটা কারও আবির্ভাব তো সত্যিই আমি অনুভব করেছি। সুজিতের হেঁড়ে গলা থেকে সুরেলা মেয়েলি স্বর তো আমি শুনেছি।
যাইহোক অন্য কথা এসে সেটাকে চেপে দিল এবং আমিও ওটা নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি। প্রায় সাত-আট মাস পরে সেই স্মৃতি আবার ফিরে এল।
একদিন গোলপার্কের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছি। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর একটায় দশমহাবিদ্যার ওপরে একটা বই। কৌতূহলী হয়ে তুলে নিলাম। উল্টেপাল্টে দেখি গাদা গাদা সংস্কৃত মন্ত্র আর তার অন্বয়। তারই মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল যে দেবী ত্রিপুরসুন্দরীর অনেক নামের মধ্যে দুটো হল মহারাজ্ঞী আর ললিতা এবং আরেকটা হল ষোড়শী, কেননা তিনি নাকি ষোলো বছরের কিশোরীর রূপ ধরে থাকেন।
মুহূর্তে আমার চারপাশ বনবন করে ঘুরতে শুরু করল আর আমি কেমন একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঢুকে যেতে থাকলাম। মনে হল, কোন কিশোরী? যাকে আবছায়ার মধ্যে সুজিতের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, নাকি যে সিঁড়ি থেকে উঠে এসেছিল আমার মুখোমুখি?
বইটা রেখে দিয়ে আমি ঘোরের মধ্যেই হাঁটতে শুরু করলাম। দোকানদার হয়ত ভেবেছিল আমি বইটা নেব। কিন্তু ওটা নিয়ে তো আমার কোনও কাজ নেই। কেবল একটাই কথা মনের গভীর থেকে উঠে আসছিল আমার। সেই তো দেখা হল, ঘরে একবার, সিঁড়িতে একবার। তখন কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে?
