বীররাত্রি – সৌমিত্র বিশ্বাস
বীররাত্রি
অবনীমেসোর কাছ থেকে খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল অজয়ের। কী জানানোর জন্যে ফোন করেছিল, আর তার বদলে কী খবর শুনল! ফোনটা করার আগের মুহূর্ত অবধি রাগে ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যাচ্ছিল। হাতের কাছে লোকটাকে পেলে জিভ ছিঁড়ে নিত। সেই উত্তেজনা থেকেই ফোন করতে চেয়েছিল রূপা মাসীমাকে। ওনার সব জানা দরকার। কিন্তু মাসীমা ছিলেন না। তার বদলে অবনীমেসো যে খবরটা দিলেন সেটা একদমই বিনা মেঘে বজ্রপাত।
মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল অজয় নিজেকে সামলে নেবার জন্যে। কী হয়ে গেল এটা? ওর মনে পড়ে যাচ্ছে দিন পনেরো কুড়ি আগের সন্ধেটা।
পড়া শেষ করে বেরোনোর আগে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খুব লাজুকভাবে স্বর্ণালী বলেছিল, ‘স্যার! একটা কথা বলব, হাসবেন না তো?’
‘না না, বলো,’ চোখে প্রত্যাশা নিয়ে অজয় বলেছিল। আসলে ওকে দেখলেই যে ওর বুকে একটা উথালপাথাল ঝড় ওঠে সেটার আঁচ কি মেয়েটা পেয়েছে? হাবভাব দেখে তো কিছুই বোঝা যায় না।
‘আমি না আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি।’
অজয়ের হৃৎপিন্ডটা মস্ত একটা লাফ দিল। সেটাকে দমিয়ে রেখে মুখে একটা হালকা হাসি ধরে রেখে বলল, ‘তাই? কী দেখলে? পড়া পারোনি বলে খুব বকছি?’
‘ধ্যাৎ’ স্বর্ণালীর মুখ উজ্বল হয়ে উঠল, ‘দেখলাম একটা কোনও অন্ধকার জায়গা থেকে আপনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে আমাকে কোলে করে বাইরে নিয়ে আসছেন। কাউকেই চিনি না। বাইরের আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, আমি চেঁচিয়ে বলছি যে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, ছেড়ে দিন আমাকে। কিন্তু আপনারা কেউ আমার কথা শুনতেই পাচ্ছেন না। স্বপ্নের মধ্যেই আমার খুব রাগ হচ্ছিল কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছিলাম না। তখন…’
আচমকা থেমে গিয়েছিল স্বর্ণালী, ‘যাচ্ছি স্যার!’
‘আরে দাঁড়াও দাঁড়াও’ অজয় বলল, ‘তারপর কী হল? খুব রাগ হচ্ছিল। তখন তুমি কী করলে?’
‘সেটা এখন বলা যাবে না। অন্যদিন বলব। আমি গেলাম স্যার,’ অদ্ভুতভাবে হেসেছিল স্বর্ণালী, ‘দেরি হয়ে গেলে অটো পাব না।’
অজয় হাঁ-হাঁ করে উঠেছিল, ‘গেলাম আবার কী? আমি যাচ্ছি তো তোমার সঙ্গে। বড় রাস্তা অবধি এগিয়ে দিই। ওখান থেকে অটো পেয়ে যাবে।’
‘না-আ-আ-আ’ বাচ্চা মেয়ের মত মাটিতে পা ঠুকেছিল স্বর্ণালী, ‘আমি কি একা যেতে পারব না? রাস্তা হারিয়ে ফেলব?’
‘তা তো বলিনি’ গম্ভীরভাবে অজয় বলল, ‘পর্ণশ্রী থেকে যখন একলা আসতে পেরেছ, তখন যেতেও পারবে। কিন্তু রাত্তির হয়ে গিয়েছে বলেই একলা ছাড়ব না।’
‘ধ্যুৎ’ হাসল স্বর্ণালী, ‘মোটে পৌনে নটা বাজে, এটা আবার রাত্তির নাকি?’
‘হতে পারে জানুয়ারীর শেষেও এটা তোমার কাছে রাত্তির নয়, খরখরে দুপুর। কিন্তু আমার কাছে তো গভীর রাত। এভাবে তোমাকে একলা ছাড়তে পারব না। অন্তত লেক টেরেসের মুখটা পেরোনো অবধি এগিয়ে দেব। আসলে ওখানে কতগুলো বাজে ছেলে…’
স্বর্ণালী কিছুতেই সঙ্গে যেতে দেয়নি। পরদিন সকালে কলেজে বেরোনোর সময়ে অজয় দেখেছিল লেক টেরেস রোডের মুখে দুটো পুলিশের গাড়ি। চারপাশে লোকজনের জটলা। কী হল জানতে গিয়ে যা শুনল তাতে চোখ কপালে উঠে গেল। যে ছেলেগুলো এখানে আড্ডা মারত আর মেয়েদের বিরক্ত করত, তাদের নাকি কাল রাত্তিরে কেউ বা কারা প্রচণ্ড পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। মুখেও এমন চোট লেগেছে যে কথা বলার ক্ষমতা নেই। শুনেই অজয়ের বুক ধুকধুক করে উঠেছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে কিছুতেই স্বর্ণালীর মুখ মনে পড়েনি, তার বদলে ভেসে উঠছিল ঘোমটা-টানা, নোংরা শাড়ি-পরা একটা বিধবা বউয়ের চেহারা।
মোবাইলটা আবার টেনে নিল অজয়। খবরটা তো স্বর্ণালীকে জানানো দরকার। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা জানিয়ে দিল যে ওই প্রান্ত এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বার দুয়েক চেষ্টা করে অজয় একটা এস-এম-এস করে দিল যাতে স্বর্ণালী ওকে অতি অবশ্যই ফোন করে। একই বক্তব্য জানিয়ে দিল হোয়াটসঅ্যাপেও।
কটা বাজল? আবার মোবাইল— সোয়া আটটা। অবনীমেসোর কথা শুনে মনে হল সন্ধের দিকেই ঘটেছে। মানে যে সময়ে ও স্বর্ণালীকে পড়াচ্ছে। ভুল হল। পড়াচ্ছিল না, স্বর্ণালীর কথাগুলো শুনছিল এবং একটা তীব্র রাগ ক্রমশ ওর মন এবং শরীরের দখল নিচ্ছিল।
সন্ধেবেলা মেয়েটা যখন পড়তে এল তখনই ওর মুখ দেখে সন্দেহ হয়েছিল অজয়ের। তাই বলেও ছিল, ‘মুড অফ মনে হচ্ছে! কী হয়েছে তোমার?’
সেও মনে হয় কাউকে বলার জন্যে ছটপট করছিল, তাই সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপি উজাড় করে দিয়েছিল। শুনতে শুনতে হাত নিশপিশ করছিল অজয়ের। ইচ্ছে করছিল লোকটার গলা টিপে ধরে। বদমাইশি করার জায়গা পায়নি। তক্ষুনি ফোনে ধরার চেষ্টা করেছিল বদমাইশটাকে। কিন্তু তার মোবাইল বন্ধ। কাজেই সেই মুহূর্তে অক্ষম রাগে জ্বলা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তবে স্বর্ণালীর মুখখানা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বলতে পেরে অনেকটাই হালকা হয়েছে।
ও চলে যাবার পরে অজয় উঠে এসেছিল ছাদে। খোলা জায়গায় না গেলে মাথাটা ঠান্ডা হবে না। উত্তেজনাটা একটু কমলে বরং রূপা মাসীমাকে ফোন করে সব জানিয়ে দেবে। সেই জানাতে গিয়েই তো ওই খবর। সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকেই পুড়ছে। অজয়ের কোনও হুঁশ নেই।
কেননা ও ততক্ষণে এক ঝটকায় সাতবছর পার হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দুমকা-রামপুরহাট রোডের ওপরে অবনী মেসোমশায়ের বাড়িতে। ওখানেই দোতলায় ভাড়া থাকত অজয়। আর একতলায় অবনী-মেসো, রূপা মাসীমা আর মৃত্যুঞ্জয়দা’, অবনী মেসোর ভাইপো। অজয়ের চেয়ে সামান্য বড়, বিডিও অফিসে চাকরি করত। মেসোমশায়ের নিজের দুই মেয়ে এক ছেলে, তিনজনেই বিদেশে।
অজয় তখন নতুন করে কলেজ সার্ভিস দিয়ে মালদা কলেজ ছেড়েছে। ইন্টারভিউ যেমন হয়েছিল তাতে খুব আশা ছিল যে কলকাতায় হয়তো হয়ে যাবে। সেইমত দু-তিনজনকে বলেও রেখেছিল। কিন্তু ভেতরের পলিটিক্সের জন্যে শেষ অবধি ওর পাওনা হল একরাশ মনখারাপ। সেই সঙ্গে পাঠিয়ে দিল রামপুরহাট। অন্তত মালদার চাইতে তো দূরত্ব কম, অন্তত প্রতি সপ্তাহান্তে তো বাড়ি ফিরে এসে আবার সোমবার ফিরে যাওয়া যাবে এইসব ভেবেই ও চলে আসে।
বাকি পাঁচদিন কলেজ ছুটির পরে আর কিছু করার নেই। স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে মদ, মেয়ে, বাঁ-হাতের পয়সা আর খাওয়াদাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কথাই ছিল না। যদিও মৃত্যুঞ্জয় প্রথম প্রথম ডাকত নিজের বন্ধু সার্কেলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু অজয়ের একদমই পটেনি। ফলে কলেজ থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে রোজই নিচে নেমে এসে মেসোমশাইয়ের সঙ্গে গল্প করত বা টিভি দেখত।
ওদের বাড়ির প্রায় পেছনেই ছিল ভবতারিণী কালী মন্দির। রূপা মাসীমা দিনের বেশির ভাগ সময়ে সেখানেই পড়ে থাকতেন এবং সন্ধে-আরতি শেষে একেবারে ঠাকুরকে শয়ন দেওয়া হয়ে গেলে পরে ফিরতেন। তারপর হয়তো অজয়ের সঙ্গে টুকটাক গল্প।
অজয়কে মনমরা হয়ে থাকতে দেখে উনি নিজেই একদিন ডেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা জানতে চেয়েছিলেন। অজয় সবই বলেছিল। নিজের পড়াশুনো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, লিটল ম্যাগাজিন সব ডকে উঠেছে তখন। কিচ্ছু ভালো লাগে না। একেকবার ভাবে যে আবার কলেজ সার্ভিস কমিশনে অ্যাপ্লাই করবে, যদি কলকাতার দিকে হয়ে যায়। তারপরে আবার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
সব শুনে মাসীমা বলেছিলেন, ‘আসছে রবিবার তোমাকে মদন মহারাজের কাছে নিয়ে যাব। এরকম বাকসিদ্ধ মানুষ আমি আর দেখিনি। যদি একবার নিজে থেকে, মানে একদম স্ব-ইচ্ছেয় কিছু বলেন, তাহলে সেটা ফলবেই ফলবে।’
‘ওনার কাছে নিয়ে যাবে?’ টিভির রিমোট ঘোরাতে ঘোরাতে মেসোমশাই বলেছিলেন, ‘ধরো বলে বসলেন যে অজয় এরপরে কুচবিহার বা দার্জিলিং যাবে। তখন?’
‘বাজে বোকো না তো’ মাসীমার ঝঙ্কারের শব্দ এখনও যেন কানে লেগে আছে অজয়ের।
সেইভাবে মদন মহারাজের সঙ্গে পরিচয় হল। প্রথমদিন খুব একটা কথা না হলেও ওঁর চোখদুটো খুব টেনেছিল। ফলে ও যাতায়াত বাড়িয়ে দিল।
এদিকে অজয় নিজের কথা কিচ্ছু বলছে না দেখে, মাসীমাই একদিন উপযাচক হয়ে মহারাজকে সব জানিয়ে দিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে মাসীমা কথা শেষ করার আগেই মহারাজ বলেছিলেন, ‘কিন্তু ওর তো এখানে থাকার কথা নিজেকে আরও তৈরি করার জন্যে। বাড়ি গেলে কিচ্ছু পড়াশুনো করে না। কেবল বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওকে জিজ্ঞেস করুন। এতে তো আর ইন্টারভিউ ফেস করা যাবে না!’
অজয় লাজুকভাবে মাথা নেড়েছিল।
‘প্রথম যেদিন ও এল, সেইদিন রাত্তিরেই মা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে ও পড়াশুনো না করে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে,’ চোখ টিপে হেসে মহারাজ বলেছিলেন, ‘যার সঙ্গে ঘোরে তার নামের আদ্যক্ষর স। ঠিক বলেছি?’
চোখের পাতায় সঞ্চিতার মুখটা ভেসে উঠতে লজ্জা পেয়েছিল অজয়।
আর মহারাজ মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘স-এর সঙ্গেই শেষ অবধি জড়িয়ে যাবে।’
তারপরে একদিন মহারাজ নিজেই তান্ত্রিক মতে কীসব হোমটোম করে দিয়েছিলেন। ওকে একটা একাক্ষরী বীজমন্ত্রও দিয়েছিলেন। সেটা নিষ্ঠাভরে জপ করে গেলে মায়ের কৃপা পাওয়া যাবে।
‘কী ধরণের কৃপা?’ এইসব মন্ত্রতন্ত্রতে অজয়ের খুব একটা বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু মদন মহারাজের কথা উড়িয়েও দিতে পারছিল না।
‘মায়ের কৃপার কি আর ধরণ আছে?’ মহারাজ অবোধ শিশুকে ভোলানোর মত করে বলেছিলেন, প্রথমেই শত্রুনাশ, আগেরবারের মত কেউ আর পেছন থেকে ছুরি মারতে পারবে না। কাঙ্ক্ষিত ফল লাভও হবে। তাছাড়াও লেগে থাকলে একদিন মায়ের দর্শনও পেয়ে যাবে।’
‘কাঙ্ক্ষিত ফললাভ হবে?’ অজয় উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। মায়ের দর্শন পেলো কী না পেলো সেটা তখন গৌণ। কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেই অজয় মন্ত্রের শক্তি মেনে নেবে।
মৃদু হেসে মহারাজ বলেছিলেন, ‘হবে। মায়ের ওপরে ভরসা রাখো আর সেইসঙ্গে মন্ত্রটা নিয়ম করে নিষ্ঠার সঙ্গে জপ করে যেও।’
সেইসঙ্গে অবশ্য এটাও বলে দিয়েছিলেন যে আগামী দেড় বছরের মধ্যে স্থানচ্যুতি হবে না। আর, আশ্চর্য ঠিক দেড় বছরের মাথাতেই কলকাতার ছেলে কলকাতায় ফিরে এল। ফলে মহারাজের প্রতি বিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হল। ছুটিছাটা পেলেই চলে যেত ওঁর কাছে। যদিও গত দুবছরে মানে স্বর্ণালী ওর কাছে আসতে শুরু করার পর থেকে আর যাওয়া হয়নি। তবে স্বর্ণালী নাকি মা-বাবার সঙ্গে এর মধ্যেই বারকয়েক ঘুরে এসেছে।
মদন মহারাজের আশ্রমে স্বর্ণালীকে প্রথমবার দেখেই মনে হয়েছিল মেয়েটাকে আগে কোথাও দেখেছে। কিন্তু সেটা যে কোথায়, গত দুবছরেও কিছুতেই মনে পড়েনি। শুধু স্বর্ণালীই নয়, সেই বউটার রহস্যও ভেদ করা হয়নি আজও। হয়ত আর কোনওদিন হবেও না।
ঠিক দুবছর আগে। এখনও মনে আছে, মদন মহারাজ নিজেই ফোন করে বলেছিলেন সামনেই বীররাত্রি। মানে মঙ্গলবার, মাঘমাসের শুক্লা চতুর্দশী আর সেইসঙ্গে কূলনক্ষত্রের সহাবস্থান।
আচ্ছা, আজ তো মঙ্গলবার। আর চাঁদের অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে খুব শীগগিরই পূর্ণিমা। আজকেও বীররাত্রি নয় তো? অজয়ের গা শিরশির করে উঠল। ঠিক যেরকম করেছিল সেদিন বউটাকে দেখে। হোমকুণ্ডের সামনে কেমন অদ্ভুতভাবে চুপচাপ বসেছিল।
সেদিন মহারাজ একটা বিশেষ হোম করেছিলেন। অজয়ের পৌঁছতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। মহারাজ সামান্য ভর্ৎসনার সুরে বলেছিলেন, আজও কানে লেগে আছে, ‘টাইম ওয়েস্ট ইজ লাইফ ওয়েস্ট। ঠিক আটটা আঠেরোয় হোম শেষ হয়েছে।’
খুবই সংকুচিতভাবে অজয় বলেছিল, ‘বুঝতে পারছি মহারাজ। আমার কোনও দোষ নেই। ট্রেন একঘন্টার ওপরে বর্ধমানে আটকে। তারপর রামপুরহাটে নেমেছি, কী বৃষ্টি, কী বৃষ্টি! একটাও অটো নেই।’
‘বৃষ্টি হচ্ছে? তাই নাকি? দ্যাখ তো রে মা’ মহারাজ মৃদু হেসে যাকে বললেন, সে কৈশোরের প্রান্তে।
মেয়েটা হাসিমুখে উঠতে যাচ্ছিল বৃষ্টি হচ্ছে কী না দেখবে বলে, তার আগে অজয় নিজেই বলেছিল, ‘এখানে হচ্ছে না। কিন্তু স্টেশনের ওখানে তো রাস্তায় জল জমে গিয়েছে।’
মদন মহারাজ হাঃ-হাঃ করে হেসে উঠেছিলেন, ‘বৃষ্টির ক্ষমতা আছে এখানে ঝরার? যেখানে আমি, তারানন্দ মহারাজের শিষ্য হোম করছি, হাঃ-হাঃ-হাঃ।’
উপস্থিত সকলেই ভক্তিতে কপালে হাত তুলে প্রণাম জানাল। মা-কে অথবা তারানন্দ মহারাজের শিষ্যকে। আর অজয়ের বুকটা ধক করে উঠেছিল। আগে কোথাও যেন দেখেছে মেয়েটাকে! তারপরেই চোখ গিয়ে পড়েছিল হোমকুণ্ডের ঠিক পেছনে।
ময়লা শাড়ি-পরা একটা বিধবা বউ মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে রয়েছে। শাড়িটা এত নোংরা যে দ্বিতীয়বার তাকানো যায় না। তাছাড়াও ওর উপস্থিতির মধ্যে একটা কিছু এমন রয়েছে যে তাকালেই কেমন অস্বস্তি লাগে! যতক্ষণ অজয় ছিল সে একবারও জায়গা ছেড়ে নড়েনি। এমনকি সবাই যখন প্রসাদ নিচ্ছিল তখনও সে ঠায় বসে।
আর প্রসাদের পালা শেষ হতেই মহারাজ আলাদা ডেকে নিয়েছিলেন অজয়কে আর সেই মেয়েটাকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মৃত্যুঞ্জয় চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিল স্বর্ণালীকে। ওকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল অজয়। আগে তো কোনওদিন মহারাজের আশ্রমে আসতে দেখেনি ওকে। তার চেয়েও বড়ো, কোনওদিন মদন মহারাজ সম্বন্ধে একটা কথাও বলেনি। সে আবার এখানে কী করছে?
‘আলাপ করিয়ে দিই। তোর তো সাবজেক্ট ইকো স্ট্যাট ম্যাথস। স্ট্যাটে কার বই দিয়েছে? দত্তচৌধুরী?’ মহারাজ বলেছিলেন।
মেয়েটা স্নিগ্ধ হাসল, ‘হ্যাঁ, দত্তচৌধুরী।’
‘এই যে তিনি’ মহারাজের চোখ ঘুরল অজয়ের দিকে, ‘ডক্টর অজয় দত্তচৌধুরী।’
‘অজ-অ-য় দত্ত-অ-চৌধুরী, ইনি? ওনাকে তো আমি আগে দেখেছি।’
‘আমারও মনে হচ্ছে যে তোমার সঙ্গে আগে কোথাও দেখা হয়েছে’ অজয় হাসল, ‘কোথায় বলো তো!’
ভুরুদুটো অদ্ভুত সুন্দর করে কপালে তুলে একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘মনে পড়ছে না।’
আর অজয়ের মনে হল হৃৎপিন্ড স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। এত সুন্দর করে কেউ তাকাতে পারে? মেয়েটা ততক্ষণে ঢিপ করে ওকে প্রণাম করে ফেলেছে।
মহারাজ বললেন, ‘আর এ হচ্ছে স্বর্ণালী। ইলেভেনে ভর্তি হয়েছে। ভবিষ্যতে স্ট্যাট অনার্স পড়ার ইচ্ছে।’
‘বাঃ ভালো’ অজয় বলল।
‘এবার তোমার দায়িত্ব’ মহারাজ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘দু-বছরে ওকে তৈরি করে দাও। তারপরে অনার্সেরও পুরো দায়িত্ব নিতে হবে। এটাই তোমার কাজ।’
মদন মহারাজের কথায় আপত্তি জানানোর উপায় ছিল না অজয়ের।
শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘বাড়ি কোথায় তোমার?’
‘পর্ণশ্রী’ সুরেলা গলাটা অজয়কে আবার ধ্বংস করে দিয়েছিল।
‘আমি থাকি লেক ভিউ রোডে। অনেকটা দূর হয়ে যাবে না?’ বলার সময় অজয় মনেপ্রাণে চাইছিল মেয়েটা যেন দূরত্বকে আমল না দেয়। চিন্তাটা জাগার সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হল পিঠে যেন কেউ চাপড় মারল। ফলে চমকে ঘুরে তাকাল, কিন্তু আশ্চর্য পেছনে তো কেউই নেই। তাহলে চাপড়টা কে মারল?
খানিকটা দূরে হোমকুণ্ডের সামনে বসে সেই বউটা ঘোমটার ফাঁক দিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। চোখদুটো যেন জ্বলছে।
মুখ সরিয়ে নিতে গিয়ে দেখেছিল মৃত্যুঞ্জয় ড্যাবড্যাব করে স্বর্ণালীকেই দেখছে। অকারণেই মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল অজয়ের। ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল স্বর্ণালীর দিকে এবং দেখল যে মুখে কেমন একটা মোনালিসা মার্কা হাসি নিয়ে সেও ওই বউটাকেই দেখছে। তারপরে অজয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘খুব অসুবিধে হবে, না?’
‘আমি কী করে বলব, বলো তো?’ মৃদু হাসল অজয়, ‘আমি পড়াই সন্ধেবেলা। তোমার তো বাড়ি ফিরতে রাত্তির হয়ে যাবে।’
স্বর্ণালী মিষ্টি হেসে বলল, ‘সে ঠিক ম্যানেজ করে নিতে পারব। কবে থেকে আসব?’
‘সামনের সপ্তাহে এসো’ অজয় তখনও হাতড়ে বেড়াচ্ছে মেয়েটা কে? ওর মা-বাবাই বা কোথায়? পড়তে আসার সিদ্ধান্তটা নিজেই নিয়ে নিল। কিন্তু ফীজ নিয়ে তো কোনও কথাই হল না। দেখা যাক। আগে তো আসুক।
ইতিমধ্যে মহারাজ স্বর্ণালীকে বলছেন, ‘যা সুযোগ পেয়েছিস, নষ্ট করবি না। তোর মোবাইল নম্বর তো রইলই, আমি মাঝে মাঝে ফোন করে খবর নেব কী রকম চলছে।’
মৃত্যুঞ্জয় ছোঁকছোঁক করছিল স্বর্ণালীর সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্যে। কিন্তু তার গাম্ভীর্যের বেষ্টনী ভেদ করে এগোতে পারেনি। অবশ্য ওইটুকু মেয়ের যা ব্যক্তিত্ব, মহারাজ পরিচয় করিয়ে না দিলে অজয় নিজেও এগোতে পারত না।
ফেরার সময়ে মৃত্যুঞ্জয় হঠাৎ ডেকেছিল, ‘একটু শুনে যাবে বস!’
‘কী?’
কাঁধে হাত রেখেছিল মৃত্যুঞ্জয়, ‘কনগ্র্যাটস।’
‘কেন?’
‘ন্যাকা সাজছ বস?’ মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে হাসিটা চওড়া হয়েছিল, ‘প্রথম সুযোগেই ওরকম একটা সুন্দরী মেয়েকে তুলে ফেললে। ক্ষমতা আছে গুরু! যাক গে ফোন করব, কীরকম প্রোগ্রেস হল ডিটেলস জানিও।’
অজয় উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি।
প্রথম দেখাতে স্বর্ণালীকে যতটা ভালো লেগেছিল সেটা দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরো বেড়েছে। কিন্তু ‘সুচেতনা তুমি এক দূরতর দ্বীপ’ কাজেই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। একেকসময়ে মনে হয় যে স্বর্ণালী নিশ্চয় বুঝতে পারে। কিন্তু বুঝেও কোনও লাভ আছে কি? দুজনের বয়সের পার্থক্যের জন্যেই অজয় কোনওদিনই নিজের মনটাকে ওর সামনে মেলে ধরতে পারবে না। নিশ্চিত কোনো পরিণতি পাবে না জেনেও কেন যে স্বর্ণ মরীচিকার পেছনে ও দৌড়চ্ছে কে জানে?
অজয়ের ভাবনায় ছেদ পড়ল। পেছনে কারা কথা বলছে না? দুজন মহিলার গলা। মা কি ছাদে এসেছে? কিন্তু তাহলে অন্য মহিলাটা কে? কী বলছে বোঝা না গেলেও একটা গুনগুন ধ্বনি কানে আসছে। ছাদের এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরেও কাউকে দেখতে পেল না অজয়।
তারপরেই মনে হল কথা বলার মত তো নয়, এটা অনেকটা মন্ত্র পড়ার মত শব্দ। অন্য কারও বাড়িতে পুজো অর্চনা হলে যেমন খানিকটা স্পষ্ট, খানিক অস্পষ্ট, অথচ বেশ একটা একটানা সুরের ঢেউ এসে কানে পৌঁছয়, এও অনেকটা সেরকম। কিন্তু আশপাশের বাড়ির জানলা দরজা তো সবই বন্ধ। তাহলে শব্দটা আসে কোত্থেকে? আবার গোটা ছাদ ঘোরার পরে ওর মনে হল যেন জলের ট্যাঙ্কের দিক থেকে শব্দটা আসছে।
ওদের ছাদেও দুটো ঘর আছে। তাদের একসঙ্গে জুড়ে মাথার ওপরে যে ছাদটা সেখানেই জলের ট্যাঙ্ক। পাশেই লোহার সিঁড়ি। কৌতূহলী হয়ে অজয় উঠে গেল। কিন্তু ওপরের ছাদে পা রাখতেই চরাচরনিস্তব্ধ। গোটা ছাত শব্দহীন, থমথমে। তাহলে কথা বলছিল কারা? শব্দটা আসছিল কোথা থেকে?
ট্যাঙ্কের সামনে ছোট্ট একটা বেদী করা। তার ওপরে বসে পড়ে আবার মোবাইলে স্বর্ণালীকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু এখনও নট রিচেবল। এমনকি হোয়াটস অ্যাপের মেসেজটাও দেখেনি। মেয়েটা কোথায়? কী হল ওর যে সেই থেকে নট রীচেবল? অজয় অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল নিরুদ্দেশের দিকে। কী যে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটে গেল! এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
‘মন্ত্রজপ ঠিকমত হচ্ছে?’ দিনদশেক আগেই মহারাজ ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ‘ওটাকে কখনও ছেড়ো না কিন্তু।’
মন্ত্রের সত্যি অলৌকিক ক্ষমতা আছে কী না অজয় এখনও জানে না। তবে ওটা জপ করাটা কেমন একটা নেশার মত হয়ে গিয়েছে। ভোরে উঠে যখন জপ করে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায়, হুঁশ থাকে না। সমস্ত শরীর মন জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। গোটা দিন ধরেই তার রেশ থাকে। ও লক্ষ্য করেছে এখন আর অল্পতে মাথা গরম বা টেনশন কোনওটাই হয় না। যে কোনও পরিস্থিতির সঙ্গে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারে।
সেইজন্যেই গতবছর যখন সঞ্চিতা ওকে ছেড়ে আরেকজনের হাত ধরে বিদেশ চলে গেল, অজয়ের কিচ্ছু মনে হয়নি। কেননা তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ও বুঝতে পারছিল যে সম্পর্কটা শেষ অবধি টিকবে না। কিন্তু এখন এই শীতের রাত্রে অন্ধকার ছাদে বসে অজয় বুঝতে পারল যে সঞ্চিতা ওকে ছেড়ে যাবার অনেক আগে ও নিজেই আসলে ওকে ছেড়ে এসেছিল। এমনিতেই মহারাজ বলেছিলেন যার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে তার নামের আদ্যক্ষর ‘স’। আর সেইসময়ে অজয়ের মনপ্রাণ জুড়ে শুধু স্বর্ণালী আর স্বর্ণালী। অথচ সে এখনও নট রীচেবল।
খুব বিরক্ত লাগছিল, ইচ্ছে করছিল মোবাইলটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে। স্বর্ণালী কোথায়? কেন এখনও নট রীচেবল? ছটফট করতে করতে ও ল্যান্ডলাইনে ফোন করে শুনল রিং হয়ে যাচ্ছে, হয়েই যাচ্ছে। কেউ ধরল না। মাথার মধ্যে একঝলক মৃত্যুঞ্জয়ের মুখ ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল।
বহুদিন পরে রাগ আর বিরক্তি আর টেনশন ওর দখল নিচ্ছিল। এমনিতেই সন্ধেবেলা স্বর্ণালীর কাছ থেকে ঘটনাটা শুনে ওর মেজাজ গরম হয়ে গিয়েছিল। লোকটাকে তখন সামনে পেলে গলা টিপে খুন করে ফেলত অজয়। এতবড় সাহস যে স্বর্ণালীকে এইরকম একটা নোংরা প্রস্তাব দেয়! কিন্তু এত দূর থেকে কীই বা করার আছে?
স্বর্ণালীকে দেশপ্রিয় পার্ক অবধি এগিয়ে দিয়েছিল এবং এই প্রথম সে কোনও আপত্তি করেনি। খুব ইচ্ছে করছিল ওর হাতটা ধরার। সাহসে কুলোয়নি। তাছাড়া সদ্য একটা নোংরা প্রস্তাবের ধাক্কা সামলে উঠেছে। এর মধ্যেই যদি অজয় কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই ওর হাত ধরে, সেটা নিতে পারবে? তাছাড়াও ওর নিজের দিক থেকেও একটা সংকোচ ছিল। ভবিষ্যতে কোনওদিন সত্যিই কি ওর হাত ধরতে পারবে? স্বর্ণালীর চেয়ে অজয় একটু বেশিই বড়ো নয় কি?
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাটাও বাড়ছে। এতক্ষণ কনকনে হাওয়াটাকে পাত্তা দেয়নি। গায়ের পাতলা শাল ভেদ করে এবার শীতটা গায়ে বসে যাচ্ছে। লোহার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল অজয়। আরেকবার চেষ্টা করল স্বর্ণালীকে এবং ভাগ্য ভালো যে ওই প্রান্তে রিং হবার শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু শেষ অবধি ফোনটা ধরলই না। কী হল মেয়েটার? ঠিকঠাক অটো পেল কিনা, বাড়ি পৌঁছল কিনা কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না।
নিচে নামার জন্যে সিঁড়ির দিকে যেতেই অজয়ের সারা দেহে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আচমকা ভয়ে ওর সর্বশরীর কাঠ হয়ে গেল।
সিঁড়ির ঠিক মুখে কে ওটা বসে?
দরজার সামনে সিঁড়ির প্রথম ধাপটার ওপরে বীররাত্রির জ্যোৎস্নার আধো অন্ধকারে এক অদ্ভুত মূর্তি। কুঁজো মত একটা বউ, পরণে সাদা শাড়ি, মাথা ঘোমটা টানা বলে মুখ দেখা যাচ্ছে না। অথচ সে যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অজয়কেই লক্ষ্য করছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। জ্যোৎস্না ঠিকরে গিয়ে তার সাদা-শাড়ি চিকচিক করছে। অজয়ের সারা শরীর ডোল দিয়ে উঠল ভয়ে বিস্ময়ে। কিন্তু ওই পথ দিয়েই তো নিচে নামতে হবে! মরীয়া হয়ে অজয় এক পা এগিয়ে গেল। বউটা একটুও নড়ল না, যেন নিশ্চল পাথরের মূর্তি।
অজয়ের পা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকল। হাঁটুতে কোনও জোর নেই। যে কোনও মুহূর্তে হয়তো পড়ে যেত কিন্তু তার আগেই পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বউটা নড়ে উঠল। তারপরেই ঝটপট ঝটপট।
অজয় অবাক চোখে দেখল বউটার বদলে দুটো বড় বড় সাদা বক দরজার সামনে থেকে বেরিয়ে এসে উড়ে গেল। ওই দুটোই এমন ভাবে বসেছিল যে অজয় বউ বলে ভুল করেছিল।
কিন্তু অত রাত্তিরে শহরের বুকে, ওর ছাদের মাথায় বক কোথা থেকে আসবে, আর তারা এসে সিঁড়ির মুখেই বা বসে থাকবে কেন এইসব চিন্তা ওর মাথাতেই এল না। কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল ধবধবে পাখিদুটো উড়তে উড়তে জ্যোৎস্নার মধ্যে মিলিয়ে গেল। ফোনটা পকেটে বেজেই চলেছে।
স্ক্রীণে নামটা দেখল এবং মুহূর্তে সমস্ত ভয় আর অস্বস্তি হাওয়া। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কখন থেকে তোমাকে ফোন করছি, একে তো লাইন ঢুকছে না, তার ওপরে যাও বা পেলাম তুমি ধরলে না।’
‘কিন্তু স্যার আপনার কোনও মিসড কল নেই তো। যাই হোক একটা কথা বলার জন্যে ফোন করলাম।’
‘এদিকে তো বিরাট ঘটনা হয়ে গিয়েছে। আমি তারাপীঠে …’
‘বলছিলাম যে একটু দেখবেন আমার একটা বই বোধ হয় ফেলে এসেছি আপনার ঘরে। খবর কাগজের মলাট দেওয়া, প্রি-হিস্টরিক ইন্ডিয়া। ব্যাগে ছিল, কখন পড়ে গিয়েছে টের পাইনি। ওটা না আসলে আমার বাবার বই। হারিয়ে গেলে মুশকিল হবে। পেলে আপনি রেখে দেবেন। সামনের দিন নিয়ে নেব।’
‘ঠিক আছে দেখব। যেটা বলছিলাম, আমি ওখানে ফোন করেছিলাম, হ্যালো হ্যালো। তুমি শুনতে পাচ্ছ আমার গলা? হ্যালো, হ্যালো। ধ্যাত্তেরি।’
আবার ডায়াল করল অজয় এবং সেই চিরাচরিত নট রীচেবল। খুব বিরক্ত লাগছিল ওর। মেয়েটা কোথায়, যে যখনই করছি তখনই নট রীচেবল? সেই বিরক্তি নিয়েই নিজের ঘরে ঢুকল অজয়।
গোটা ঘরে একটা অদ্ভুত গন্ধ। ঠিক যে কীসের গন্ধ সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ধূপ, ধুনো, ফুল, ফল আর প্রদীপের ধোঁয়ার গন্ধ মিলেমিশে এক হয়ে রয়েছে। এরকম একটা গন্ধ ওর ঘরে কী করে এল মাথায় ঢুকল না অজয়ের। চুপ করে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করল যে কী হচ্ছে এসব। তারপরে চেঁচিয়ে মা-কে ডাকল, ‘কেউ এসেছিল আমার ঘরে?’
মা জানালেন যে কেউই আসেনি। খুব অবাক লাগছিল অজয়ের। সন্ধেবেলা যখন স্বর্ণালীকে পড়ানো শেষ করে বেরিয়েছে, তখনও এরকম কোনও গন্ধ নেই। বেরোনোর সময়ে নিজের হাতেই দরজা বন্ধ করেছে। ওকে এগিয়ে দিয়ে এসে আর ঘরে ঢোকেইনি। সটান ছাদে উঠে গিয়েছিল। তারপর তো এই-ই নামছে। এর মধ্যে ঘরে ওরকম একটা গন্ধ? কী করে হয়? দরজার মুখে বকই বা এল কোথা থেকে? আর কেনই বা এল?
চেয়ারে স্বর্ণালী যেখানে বসেছিল তার পাশেই মাটিতে পড়েছিল বইটা— খবর কাগজের মলাট দেওয়া। কিন্তু মলাটের ছবিটা দেখে একদমই হতভম্ব হয়ে গেল। এটা তো অনেকদিন আগেকার ছবি। যখন ও মালদা কলেজে ছিল তখনকার। সেই ছবি এই বইয়ের মলাটে? অজয়ের মাথা গুলিয়ে গেল।
আবার তাকিয়ে দেখল ছবিটা। এটা যেদিন তোলা হয়েছিল, সেদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল।
হবিবপুরে চাষ করতে গিয়ে একজন হঠাৎই একটা পাথরের দেবীমূর্তি পায়। খবর পেয়ে মালদা মিউজিয়ামের কিউরেটর স্বাধীনবাবু ওটাকে নিয়ে আসেন। স্বাধীনবাবুর সঙ্গে অজয়ের খুব ভালো হৃদ্যতা ছিল ফলে ও নিজেও গিয়েছিল সঙ্গে। স্থানীয় কাগজ গৌড়বঙ্গবার্তাতে বেরিয়েছিল ছবিটা। এই তো অজয়কেও চেনা যাচ্ছে। সেই গৌড়বঙ্গবার্তা দিয়েই শেষে স্বর্ণালীর বাবা বইতে মলাট দিলেন? উনি কী করে পেলেন কাগজটা? উনিও কি তাহলে তখন মালদায় ছিলেন? আর তার চেয়েও আশ্চর্য যে এত বছর পরে সেই কাগজের মলাট-দেওয়া বইটাই অজয়ের বাড়িতে স্বর্ণালী ফেলে গেল? খুবই অদ্ভুত ব্যাপার নয় কি?
কিন্তু সত্যিই কি অদ্ভুত ব্যাপার, নাকি কোনও অসীম রহস্যের একটা টুকরো অংশ? ওর ভেতরে ভীষণই খচখচ করছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল মূল ছবিটা একবার দেখা দরকার। সেখানে প্রত্যেকের মুখ স্পষ্ট। গৌড়বঙ্গবার্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বাধীনবাবুই ওকে ছবিটা এনে দিয়েছিলেন।
আলমারি থেকে ফাইল বের করে একটা প্যাকেট খুলে মূল ছবিটা বের করল। প্রায় দশ বছর আগের কথা। একটু লালচে আভা এলেও অজয়কে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পাথরের মূর্তিটা তো ঝকঝক করছে— একজন দেবী শবদেহের ওপরে বসে একহাতে একটা অসুরের জিভ টেনে ধরে রেখেছেন আর অন্য হাতে উদ্যত গদা।
স্বাধীনবাবুই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বগলাদেবীর মূর্তি। ওই যে জিভ টেনে রেখেছেন, তার মানে তিনি বাকশক্তি হরণ করে নিচ্ছেন। বেশিরভাগ সমস্যাই তো তৈরি হয় কথা বা বাক্য থেকে। মিথ্যাচার, পরনিন্দা, অতিরিক্ত কথা বলা, কটুভাষা, সবই তো অতিরিক্ত বাক্যব্যয় থেকেই। তাই বাকসংযম করার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন দেবী। আরেকটা কী কথা বলেছিলেন স্বাধীনবাবু। সর্বশত্রুমুখস্তম্ভন— দশ বছরের বিস্মৃতি ঠেলে শব্দটা জেগে উঠল তখন। শত্রুর বাক বিনাশ করেন তিনি। শুধু শত্রু নয়, মানুষের মনের মধ্যে যা কিছু অন্ধকার দিক আছে, বিনাশ করেন সেই সবই। কিন্তু…! কিন্তু…!
কিন্তু, এটা কী দেখছে অজয়? দেবীর মুখখানা তো একদম স্বর্ণালী। ঠিক যেন ওর মুখ কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইজন্যেই কি দশ বছরের জমাট স্তূপ ভেদ করে অবচেতন জানিয়ে দিত যে ওকে আগে কোথাও দেখেছে, আগে কোথাও দেখেছে?
স্বর্ণালী নিজেও তো নাকি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল অজয়কে নিয়ে। মূর্তিটা খুঁজে পাওয়া এবং সেটা ধরাধরি করে মিউজিয়ামে নিয়ে আসার সঙ্গে কি স্বপ্নটার কোন সম্পর্ক আছে? স্বর্ণালী কেন দেখল স্বপ্নটা? এই শীতেও ঘেমে উঠছিল অজয়। সারা গায়ে রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছিল।
এই যে অসুরের জিভ টেনে রেখেছেন দেবী, বিদ্যুচ্চমকের মত অসুরটার নামটা ভেসে উঠল মনে। স্বাধীনবাবুই বলেছিলেন, মদন।
মদন মহারাজ লোকটা দিনদুয়েক আগে স্বর্ণালীকে ফোন করেছিল। পড়াশুনো নিয়ে একটা দুটো কথার পরেই নাকি বলেছিল, ‘আমি সাধনায় যতটা এগিয়েছি, তাতে তোমাকে ভৈরবী হিসেবে পেলে খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধি পেয়ে যাব!’
‘ভৈরবী ব্যাপারটা বুঝতে পারোনি তো? বাংলা কথা, আমি যদি সাধু না হতাম, তোমাকে এক্ষুনি বিয়ে করতাম।’
‘কেন? সাধু হলে কী হয়?’ হাঁদার মত, একদম গাড়োলের মত, স্বর্ণালী প্রশ্ন করেছিল।
শুনেই রেগে গিয়েছিল অজয়, ‘এই প্রশ্নটা করলে কেন? বোঝোনি যে এতে ও ধরেই নেবে তোমারও ইচ্ছে আছে?’
ধমক খেয়ে মাথানিচু করে বসেছিল স্বর্ণালী।
মদন বদমাইশটা বলেছিল, ‘সে নানা অসুবিধে আছে। সব বোঝানো যাবে না। তবে আমাদের দুজনের একটা সন্তান হতে পারে না কি? তোমার যদি তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায় ভালো হয়। শুধু তুমি আর আমিই জানব সন্তানের গোপন তত্ত্বটা।’
‘ভেবে দেখো। তাহলে তোমার বাড়িতে বলি যে সামনের বীররাত্রিতে তোমাকে পুজো করব, গুপ্ত পুজো। ঘরে শুধু আমরা দুজনেই থাকব। পুজোর কথা বললে তো ছাড়তে আপত্তি করবে না?’
শালা বুড়ো ভাম। হাঁটুর বয়েসী একটা মেয়েকে এইসব বলছে আবার সাধু সেজেছে! ওর মাথাতেই এল না যে ও নিজেও বয়সে অনেকটাই বড় হওয়া সত্ত্বেও এক অমোঘ চোরাবালির টানে তলিয়ে যাচ্ছে নিয়ত। বরং উত্তেজিত হয়ে অজয় প্রথমেই ফোন করেছিল মদন মহারাজকে। কেউই সেই ফোন ধরেনি। তখনই চেয়েছিল রূপা মাসীমাদের কাছে ভন্ডটার মুখোশ খুলে দিতে।
কিন্তু অবনীমেসো ওর ফোনটা ধরলেও ওকে কিছু বলার অবকাশ দেননি। উল্টে জানিয়েছিলেন যে মদন মহারাজের নাকি হঠাৎ স্ট্রোক হয়েছে। মুখ বেঁকে গিয়ে জিভ বেরিয়ে এসেছে। কথা বলা তো দূরস্থান, হাত-পাও নাড়তে পারছেন না।
অজয় আবার তাকাল ছবিটার দিকে। ওকে নিজেকেও যেমন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, দেবীর মুখের মধ্যে স্বর্ণালীও সেরকমই স্পষ্ট ভাবে জেগে রয়েছে। বগলা দেবীর গায়ের রং নাকি তপ্তকাঞ্চনের মত হলুদ। অজয়ের হাত-পা রীতিমত কাঁপছিল। মেয়েটা আসলে কে? ওর নাম স্বর্ণালী কেন? সত্যিই কি ও পর্ণশ্রীতে থাকে? আজ অবধি ওর বাবা-মায়ের বিষয়ে কিচ্ছু বলেনি কেন? মদন সাধুর মুখ বেঁকে গেল কেন? ওই ছেলেগুলোও তো নাকি কথা বলতে পারছিল না।
ক্রমশ ওর মনে পড়তে থাকল স্বাধীনবাবু বলেছিলেন যে বগলা শব্দটা নাকি কেউ বলে বল্গা মানে রাশ টেনে ধরা থেকে এসেছে, কেউ বা বলে বগুলা বা বক থেকে এসেছে।
মানুষের মনের মধ্যে যা কিছু অন্ধকার দিক আছে, সেই সবই এই দেবী বিনাশ করেন, স্বাধীনবাবু বলেছিলেন। অজয় নিজেও তো এতদিন ধরে স্বর্ণালীকে নিয়ে নানা কল্পনা করে এসেছে, মধ্যরাতে ওকে ভেবে পুলকিত হয়েছে। তাহলে কি ওর কপালেও এরকম কিছু অপেক্ষা করে রয়েছে? সেইজন্যেই কি ছাদে হঠাৎ বক এসে বসেছিল।
অজয় পাগলের মত চাইছিল স্বর্ণালীর সঙ্গে অন্তত একবার কথা বলতে। জ্ঞাত অজ্ঞাত সব অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবে ওর কাছে। কিন্তু সে ফোনের ধরাছোঁয়ার বাইরে সেই দূরতর দ্বীপ হয়েই থেকে গেল। ও আর কোনওদিনই অজয়ের কাছে পড়তে আসেনি, বইটাও ফেরৎ নিতে আসেনি। অজয় বইটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে। মলাটটাও পাল্টায়নি।
একেকদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে। চোখের পাতায় তখন ভিড় করে আসে সমস্ত পুরোনো কথা। একাক্ষরী বীজমন্ত্র জপ করলে নাকি দেবী দর্শন দেন, মদনা বলেছিল। কিন্তু মদনা লোকটা তো ভণ্ড! ওর দেওয়া মন্ত্রে কোনও কাজ হতে পারে? কিন্তু এটাও তো অদ্ভুত যে মন্ত্রজপ করার পরেই ওর জীবনে স্বর্ণালী এসেছিল!
বীররাত্রি নাকি বগলাদেবীর আবির্ভাব তিথি! ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে, এক বীররাত্রিতে স্বর্ণালীর সঙ্গে পরিচয় এবং আরেক বীররাত্রির সন্ধেতেই শেষ দেখা। সত্যিই কি একাক্ষরী বীজমন্ত্র জপের ফল? নাকি স্বর্ণালী আসলে রক্তমাংসের নারী নয়, একটা অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন? আর, বীজমন্ত্রের দৌলতে সেই বিধবা বউটাকে কয়েকবার দেখতে পেয়েছিল।
কেননা নারদপঞ্চরাত্র অনুযায়ী বগলাদেবীরই আরেকটা রূপ ধূমাবতীর। তিনি বিধবা এবং নোংরা সাদা শাড়ি পরে ঘোমটা দিয়ে থাকেন।
অথবা, কে জানে, এরকম কোনও কিছুই হয়তো আসলে ঘটেনি, সবটাই একটা স্বপ্নের ভেতরে আরেকটা আশ্চর্য স্বপ্ন।
