শব্দ – সৌমিত্র বিশ্বাস
শব্দ
‘সুবীর ওই দ্যাখ!’ বলে পার্থ যখন হাত চেপে ধরল তখন ওর নিজের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছে। সামনেই প্রবহমান কোপাইয়ের ওপরে সন্ধে তখন তার ছায়া বিছিয়ে দিতে শুরু করেছে। বন্ধুর কথা শুনে সুবীর আর দিব্য তাকাল সামনে এবং অনুভব করল যে ওদের শিরদাঁড়া বরাবর খুব ঠান্ডা একটা কিছু নেমে যাচ্ছে। ওরা নড়াচড়া করতেও ভুলে গেছে। মনে হচ্ছে এখানেই আটকে থাকতে হবে আজীবন।
অথচ এতটা ভয় করত না, যদি না আজ সকালেই, এই সাড়ে আটটা পৌনে নটা নাগাদ তার সঙ্গে দেখা হত মন্দিরের কাছে। রোদ তখনও চড়া হয়নি। নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা আর টিকাটিপ্পনী কাটতে কাটতে তিন বন্ধু ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
মন্দিরের বাউন্ডারি থেকে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ ফুট দূরে একটা গাছের নিচে এবড়োখেবড়ো মাটিতেই খানিকটা সমতল জায়গা পেয়ে সেখানে তিনি পদ্মাসনে স্থির হয়ে বসে কী বিড়বিড় করছিলেন। নিজে মাটিতে বসে থাকলেও সামনে পাপড়ি-খোলা পদ্মফুল আঁকা একটা আসন পাতা ছিল। কেন কে জানে? নিজেই তো তার ওপরে বসতে পারত!
প্রথমে দূর থেকে ওঁকে ক্যামেরাবন্দী করেছিল দিব্য। ও ফ্রী-ল্যান্স ফোটোগ্রাফার। পরশুদিন ছিল বসন্তোৎসব। ও এসেছিল তারই ছবি তুলতে। সঙ্গে দুই স্কুলের বন্ধু সুবীর আর পার্থ। দুজনেরই দিনরাত কেটে যায় নিজস্ব ব্যবসা নিয়ে। কাজেই দিব্য বসন্তোৎসবে যাচ্ছে এবং মূলকেন্দ্র থেকে দূরে একটা রিসর্টে উঠবে শুনে দুজনেই জুটে পড়েছে। ঘোরা আর নিশ্চিন্তে পানভোজনে কটা দিন কাটিয়ে শরীর মন ঝরঝরে করে নেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল।
ছবি তুলতে তুলতে ওঁর কাছাকাছি আসার পরে ওদের কানে এসেছিল একটা অদ্ভুত গুনগুন শব্দ। প্রথমে ভেবেছিল বুঝি ঝিঁঝিঁপোকা। তারপরে পার্থই প্রথম শব্দের ভেতরে লুকোনো অক্ষরগুলো ধরতে পারল, তাও খুব স্পষ্ট করে নয়। কেবল আং আর কং এই দুটো অক্ষর। বুঝতে পারল মুখ বন্ধ থাকলেও উনিই উচ্চারণ করছেন শব্দগুলো। অনেকটা হরবোলাদের মত আর কী।
বন্ধুদের ডেকে হাসতে হাসতে পার্থ বলল, ‘লক্ষ কর, মালটা কিন্তু ঠিকঠাক কোনও মন্ত্র পড়ছে না। পাতি স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের গায়ে অনুস্বার মেরে দিয়েছে।’
দিব্য বলল, ‘মন্ত্র মানেই তো তাই। একটা বাক্যে সবকটা শব্দের শেষে অনুস্বার দিয়ে দিলেই মন্ত্র হয়ে গেল। যত ঢপবাজি।’
‘এইজন্যেই শালাদের দেখলেই আমার ক্যালাতে ইচ্ছে করে’ ওঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে সুবীর বলেছিল, ‘কপালে সিঁদুরের ফোঁটা আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা চড়িয়ে অনুস্বার বিসর্গ মেরে গ্রামের সরল লোকগুলোকে মুরগী করে। এদের কেলিয়ে চন্দ্রবিন্দু করে দেওয়া দরকার।’
কথাটা শুনে বাকী দুজন জোরেই হেসে উঠল।
তাইতে উৎসাহ পেয়ে সুবীর একদম সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনি কোথা থেকে আসছেন? মানে কোন আশ্রমের সাধু?’
উনি কোনও উত্তর দেননি। কিন্তু ফ্যালফেলে দৃষ্টি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বাংলা জানেন না।
‘আপ কাঁহাসে আয়া হ্যায়?’
একদম অবোধ শিশুর মত মুখে তিনি বললেন, ‘মুঝে পতা নহি।’
‘গিরি, পুরী, অরণ্য কোন সম্প্রদায়কা সাধু হোতা হ্যায় আপ?’
বাংলা হিন্দি মেশানো ভাষায় প্রশ্ন তিনি ধরতে পেরেছেন কিনা বোঝা গেল না। তিনি আবার ওই সরল হেসে বললেন, ‘মুঝে পতা নহি।’
‘ন্যাকামি করছ শালা? কানগোড়ায় দুটো দিলেই সব কিছু পতা হয়ে যাবে’ বাংলাতেই বলে সুবীর আবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বলছি লোকজনকে টুপি পরানেকে বাদ আপ কোন চুলো মে যায়গা?’
আবার সেই সরল হাসি, ‘মুঝে পতা নহি।’
সেইসময়ে ওদের চোখে পড়ল পেছনের রাস্তা দিয়ে আঁকশি আর দড়ি হাতে একজন গ্রাম্য মেয়ে এগিয়ে আসছে। মিষ্টি মুখখানা দেখে মনে হয় বয়স সতেরো আঠেরোর বেশি নয়। খুবই কমদামী জ্যালজেলে একটা শাড়ি পরে থাকলেও গায়ে কোনও জামা নেই। চুলগুলো মাথায় চুড়ো করে খোঁপা বেঁধেছে। একটু পিছিয়ে গিয়ে শাটার টিপেছিল দিব্য। পার্থ আর সুবীরের দৃষ্টি তার মুখ আর বুকের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল।
মেয়েটা কাছে এসে একবার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ওদের দেখল। আর ওকে দেখেই পার্থ বলল, ‘এই যে একটা মুরগী।’
দিব্য খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, ‘এই কচি মুরগীটাকে আমরা তুলে নিয়ে গিয়ে খেতে পারি না?’
সুবীর অন্যমনস্কের মত বলল, ‘মেয়েটাকে কোথায় দেখেছি বল তো।’
‘তোর বুকের মধ্যে’ পার্থ বলতেই তিনজনে আবার হাসতে শুরু করল।
‘ইস বাচ্ছা লড়কী কো মুরগী বানাকে আপকা কেয়া লাভ হোতা হ্যায়?’ এবার পার্থ খুঁচিয়েছিল।
উত্তরে কেবল একটা সরল হাসি।
সেইসময়ে ওই মেয়েটা মুখ ফিরিয়েছিল ওদের দিকে এবং তার সৌন্দর্য দেখে তিনজনেই কথা বলতে ভুলে যায়।
সে একটু কড়া গলাতেই বলল, ‘কী চাই এখানে?’
‘কিছু না’ মেয়েটার ব্যক্তিত্বের সামনে অপ্রতিভ হয়ে শুকনো স্বরে তিনজনেই মাথা নেড়েছিল, ‘এমনি দেখতে এসেছি।’
‘দেখা হয়ে গেছে তো! এই যে প্রসাদ নাও’ বলে তিনজনের হাতে তিনটে আপেল দিয়ে বলল, ‘এবার তাহলে তোমরা এসো এখান থেকে। ওঁকে একটু নিজের মত থাকতে দাও।’
‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’ পার্থ গান ধরতেই মেয়েটা ওর দিকে তাকাল কটমট করে।
আর সেই দৃষ্টির সামনে কেমন যেন কুঁকড়ে গিয়ে পার্থ পায়ে পায়ে সরে এসেছিল পেছনে। দেখাদেখি বাকি দুজনেও। কিন্তু একটু নিরাপদ দূরত্বে আসতেই হঠাৎ ওদের ক্ষাত্রতেজ জেগে উঠেছিল।
ফলে দূর থেকেই সুবীর চেঁচিয়ে বলল, ‘ও খুকি, আমরা একটা করে আপেল পেলাম। আর সাধুবাবার জন্যে দুটো আপেল?’
মেয়েটার কানে কথাটা ঢুকেছে কিনা বোঝা গেল না। উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা সে মুখটাও ফেরাল না।
‘আপেল দুটো কত বড়? সাইজটা একটু দেখা যাবে?’ পার্থ চেঁচালেও ওইদিকে কোনও নড়াচড়া নেই।
প্রতিক্রিয়া না দেখালে তো পেছনে লেগে লাভ নেই। কাজেই ওরা ওখান থেকে সরে গিয়ে ভাড়া করা অটোতে উঠে পড়ে। আরও দু’চারটে জায়গায় ঘোরার কথা ছিল, কিন্তু ওদের আর ইচ্ছে করছিল না।
এমনকী দিব্য, যে একটু আগে অবধি রাস্তাঘাটে নিজের পছন্দমত সাবজেক্ট খুঁজে নিয়ে ক্যামেরার শাটার টিপছিল, সে অবধি ক্যামেরা আর বের করেনি।
‘দুর! কোথায় ঘুরব? চ’ ঘরে গিয়ে আড্ডা মারি,’ সুবীর বলতেই বাকিরা লুফে নিয়েছিল প্রস্তাবটা।
রিসর্টে নিজেদের ঘরে ফিরে আসার পরে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল পানীয়। তারপর শুরু হল গুলতানি। আড্ডা মারতে মারতেই দিব্য ল্যাপটপে ছবিগুলো ট্রান্সফার করছিল। হঠাৎই ওর মুখের চেহারা বদলে গেল। স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে স্ক্রীণের দিকে।
‘কী রে কী হল?’
দিব্য একটু চিন্তিতভাবে বলল, ‘আচ্ছা মেয়েটা আসার পরে আমি ওর ছবি তুলেছিলাম কিনা তোদের মনে আছে?’
‘হ্যাঁ তুলছিলি তো’ পার্থ বলল।
‘যখন ও সামনে একটু ঝুঁকে হেঁটে আসছিল, তখন তুলেছি দুটো ছবি। গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে সারা শরীরে আল্পনা এঁকে দিয়েছিল, সেই ছবি। কিন্তু এটা কখন তুললাম?’
‘কোনটা?’ সুবীর জিজ্ঞেস করতেই দিব্য ল্যাপটপটা ওর দিকে ঘুরিয়ে দিল।
মেয়েটার একটা পা সেই ফাঁকা আসনে, অন্য পা-টা একটু তোলা। হাঁটার ছন্দে আঁকশি আর দড়িদুটো দুলছে। যদিও ছবিটা দেখে অবাক হবার মত কিছু ওরা খুঁজে পেল না।
‘দেখলি?’
‘হ্যাঁ’ সুবীর বলল, ‘বুক দুটো দেখেছিস!’
‘বাজে বকছিস কেন শালা? পুরো ছবিটা ভালো করে দ্যাখ’ দিব্য খিঁচিয়ে উঠল।
‘দেখেছি’ সুবীর হাসল, ‘বললাম তো ভালো হয়েছে তো। কিন্তু এটা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কী আছে?’
‘কারণ ছবিটা আমি তুলিনি’ দিব্য বলল।
শুনেই বাকি দুজন হেসে গড়িয়ে পড়ল, ‘তুই তুলিসনি তো কি ভূতে তুলেছে?’
‘সেটাই তো ভাবছি’ দিব্য আবার বলল, ‘আমি শিয়োর যে এই ছবিটা আমি তুলিনি।’
‘না তুললে কীভাবে আসবে?’ পার্থ বলল, ‘নিশ্চয় বেখেয়ালে তুলেছিস বা অজান্তে শাটারে চাপ লেগে গিয়েছে।’
‘সেটাই তো ভাবছি’ খুবই চিন্তিতভাবে দিব্য বলল, ‘ছবিতে একটা অ্যাবনর্মালিটি রয়েছে, তোরা খেয়াল করলি না?’
‘কী? আবার দেখি?’
কিন্তু দেখেও কিছু ধরতে পারল না।
দিব্য তখন বলল, ‘মেয়েটার চুলে এই যে বাঁ দিক থেকে আসা আলোটা, এটা কোত্থেকে এল?’
‘যাস্শালা, এটা তো সূর্য!’
‘সূর্য? আর ইউ শিয়োর?’ চ্যালেঞ্জ করার ভঙ্গিতে বলে দিব্য আগের ছবিটা বের করল, ‘তাহলে সাধুর বাঁ দিকে এই আলোটা কীসের? মেয়েটার বাঁ দিকে সূর্যের আলো থাকলে সেটা সাধুর ডানদিকে থাকার কথা। তাহলে ওর বাঁদিকে এই আলোটা কীসের?’
‘হ্যাঁ তাই তো! আশ্চর্য!’ পার্থ বলল।
তখন সুবীর বলল, ‘আরও একটা জিনিস আমরা খেয়াল করিনি। ওই মেয়েটার সঙ্গে কোনও ব্যাগ ট্যাগ ছিল না।’
‘হ্যাঁ। তো কী হয়েছে?’
‘তাহলে ও আপেল তিনটে বের করল কোত্থেকে?’
‘আরে তাই তো। এটা তো ভেবে দেখিনি’ বলে দিব্য আবার তাকাল ক্যামেরার স্ক্রীণে। ছবি ভুল বলল না।
‘আপেলে কিছু মেশানো ছিল কিনা কে জানে!’ সুবীর আবার বলল, ‘তোরা খেয়াল করেছিস যে ওটা খাবার পর থেকেই আমরা এমন ল্যাদ খেয়ে গেলাম যে কোথাও আর গেলাম না? আমার শরীরে কীরকম একটা…’
‘কীরে দিব্য কী হল তোর?’ সুবীরের কথার মধ্যেই চেঁচিয়ে উঠেছে পার্থ। কেননা দিব্য সেইসময়ে গড়িয়ে পড়েছে খাটে।
সুবীর আর পার্থ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল দিব্যর দিকে। তারপর পার্থ কোনওরকমে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কী রে মালটা মরে গেল নাকি?’
আর সেইসঙ্গে ওর নিজের চোখেই নেমে এল চেতনা-রহিতকারী অন্ধকার।
অনেক অনেক পরে চোখ খুলে সুবীর দেখল জানলার কাচে অদ্ভুত একটা আলোছায়া। পাশে যখন মোবাইল হাতড়াচ্ছে কটা বাজে দেখার জন্যে তখন পাশ থেকে পার্থর গলা কানে এল, ‘একী রে! সাড়ে পাঁচটা! কী ঘুম ঘুমিয়েছি আমরা! অ্যাই দিব্য, ওঠ না বে!’
শুয়ে শুয়েই তিনজনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পরস্পরের দিকে। এমনই এক মায়াঘুম ওদের জড়িয়ে ধরে শিরা উপশিরা অবসাদে ভরে দিয়েছিল যে চান খাওয়ার কোনও হুঁশই ছিল না। এর আগেও তো তিনজনে একসঙ্গে বহু জায়গায় বেড়াতে গিয়েছে। কিন্তু এরকম অবস্থায় তো কক্ষনো পড়েনি। তাহলে কি ওই আপেলে সত্যি সত্যিই ড্রাগ ফ্রাগ কিছু মেশানো ছিল? নইলে এত ঘুম পাবে কেন? সেইসময়ে দরজায় টুকটুক টুকটুক।
উঠে দরজা খুলেই দিব্য আঁতকে উঠল। সকালের সেই মেয়েটা। এখন পরণে ধোপদুরস্ত স্কার্ট আর বুকের কাছে রিসর্টের এমব্লেম দেওয়া ব্লাউজ। এমনভাবে তাকিয়ে রয়েছে যেন ওদের কোনওদিন দেখেনি।
‘চা আনব?’ রিনরিনে গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
‘না না’ কেমন আতঙ্কিত গলায় দিব্য বলল।
মেয়েটা মুচকি হাসল ওর রকমসকম দেখে। তারপর বলল, ‘আপনাদের ডাকছে।’
‘কে?’ পার্থ জিজ্ঞেস করল, মেয়েটাকে দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে। যদি বুঝতে পারত যে মেয়েটা এই রিসর্টেরই স্টাফ, তাহলে ওর উদ্দেশ্যে এইসব মন্তব্য করত না।
‘মালিক’ মেয়েটা হাসল।
পার্থ আর দিব্যর পেছন থেকে উঁকি মেরে সুবীর তখন ওর জামার এমব্লেমের দিকে তাকিয়েছিল। গত তিনদিন ধরে এখানে থাকা সত্ত্বেও এমব্লেমটা খেয়াল করেনি। একটা দড়ির ফাঁস আর তার ভেতর দিয়ে আঁকশি।
‘ঠিক আছে, আসছি।’
বাইরে এসে, যেন খুব দরকারি কাজ এমন ভঙ্গিতে তিনজনে ছুটে চলল মালিকের সঙ্গে দেখা করতে। দরজা বন্ধ করার কথাও মনে নেই কারও। এমনভাবে যাচ্ছে যেন এর ওপরেই ওদের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে।
গাছপালার মাথায় সন্ধেটা তখন গুছিয়ে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হু হু করে উত্তাল হাওয়া দিচ্ছিল, হালকা ঝড়ের মত। আর তখন ওরা খেয়াল করল যে রিসর্টের একদম পেছনে ওরা চলে এসেছে। সেখানে একটা ছোট্ট গেট। কাছাকাছি আসতেই হাওয়ার ধাক্কায় সেটা এমনভাবে খুলে গেল যেন অদৃশ্য কোনও প্রহরী ওদের দেখতে পেয়ে গেট খুলে দিয়েছে। পরপর বেরিয়ে আসতেই হাওয়ার ধাক্কাতেই গেটটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ওরা তিনজনে তখন হাঁফাচ্ছে।
তারপর দিব্য বলল, ‘আমরা এখানে এলাম কেন? আমাদের তো মালিকের কাছে যাবার কথা!’
‘তুই ওরকম ছুটতে ছুটতে এলি কেন?’
‘জানি না’ দিব্য মাথা নাড়ল, ‘হঠাৎ মনে হল কেউ যেন হেঁচকা টানে আমাকে দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। কীরকম বলব? তোরা কি একটা ইয়ের মত আওয়াজ পাচ্ছিস? আমার কিন্তু ব্যাপারটা সুবিধের লাগছে না। এখানে মন্ত্র পড়ছে কে?’
সুবীর আর পার্থ হাঁ করে তাকিয়ে রইল, কেননা ওই একই রকম হেঁচকা টান তো ওরাও টের পেয়েছে। মন্ত্রপাঠের শব্দটা এখন বেশ প্রকট। মনে হচ্ছে নদীর দিক থেকে আসছে। শব্দটা কানে ধরে রেখে একটু এগোতেই চোখে পড়ল।
জলের একদম ধারে একটা বটগাছ। তার বাঁধানো গোড়ায় বসে অস্তায়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে উদাত্ত কন্ঠে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন তিনি। আর সূর্যটা এমনভাবে স্থির হয়ে রয়েছে, যেন মন্ত্র থামলেই ডুব দেবে জলে। পাখিরা ডানা ছড়িয়ে দিয়েছে সাঁঝ আকাশে।
প্রথম ঝটকায় ওঁকে দেখে ঘাবড়ে গেলেও সুবীরের হঠাৎ কী হল কে জানে, ওঁকে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘তুম শালা পুরো ঢপবাজ হ্যায়। হামকো পয়জনাস অ্যাপেল খিলাকে আভি মন্ত্র পড়তা হ্যায়? শালা চোট্টা!’
আর তখনই প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরণটা হল, ‘পেছনে লাথি মেরে বের করে দিতে হয় বাঁদরের বাচ্চাদের। এইসব নুইসেন্সগুলো যে কোত্থেকে আসে? বাপ-মা ঠিকমত শিক্ষাও দেয়নি?’
আচমকা চিৎকার শুনে তিনজনেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল আর পার্থ বিড়বিড় করল,
‘এই মেরেছে। মালটা তো বাংলা জানে! আমাদের সব কথা বুঝতে পেরেছিল তখন!’
চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে গেল দিব্য কিন্তু ওর মারমুখী ভঙ্গি দেখেও উনি কোনও কথা বললেন না। কেবল স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টি দেখেই হোক অথবা পেছন থেকে পার্থ টেনে ধরার জন্যেই হোক, দিব্য থমকে গেল।
যুযুধান দুই পক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি। তারপরে উনি ইশারায় ওদের ওই বেদীতেই বসতে বললেন। অদ্ভুতভাবে একটাও প্রতিবাদ না করে ওঁকে মাঝখানে রেখে ওরা নিঃশব্দে বসে পড়ল। উনি কোনও কথা বললেন না, বুঝতে পারছেন যে ওরা উসখুশ করছে, কিন্তু তাও তিনি চুপ করে বসে রইলেন।
তারপর দিব্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার ডানদিকে এসে বোসো, আর তুমি…’ আঙুল উঠল পার্থর দিকে, ‘তুমি এপাশে এসো।’
ওরা নিঃশব্দে আজ্ঞা পালন করল।
তারপরে সামান্য হেসে উনি সুবীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবা, একটা কথা বলি, আমি তোমাদের বাঁদরের বাচ্চা, বাপ-মা শিক্ষা দেয়নি, এইসব বললাম বলে এত রেগে গেলে কেন? সত্যিই তো আর তোমরা বাঁদরের বাচ্চা নও, বা শিক্ষাদীক্ষারও কোনও খামতি নেই। তাহলে?’
ওরা চুপ করেই রইল।
আবার হাসলেন তিনি, ‘তার মানে শুধু কতগুলো শব্দ প্রয়োগ করে আমি তোমাদের মধ্যে একটা পরিবর্তন আনতে পেরেছিলাম। অর্থাৎ ওই কথাগুলোর ক্ষমতা আছে তোমাদের আচরণে পরিবর্তন আনার। তাই না?’
কোনও কথা ভেসে এল না। কেবল নিঃশব্দে তিনটে মাথা নড়ে উঠে সায় দিল।
‘এই যে আমি আমার ইচ্ছেমত জায়গায় তোমাদের বসতে বললাম, এও তো কতগুলো শব্দ। তোমরা আমাকে চেনোও না। তাও তো শব্দ শুনে কাজ করলে।
‘তাহলে মন্ত্রের জোর নেই কীভাবে বলছ? যে শব্দগুলো যুগ যুগ ধরে উচ্চারণ করা হয়েছে এবং মানুষকে ফল দিয়ে এসেছে, তার কোনও ক্ষমতা নেই?’ স্মিত মুখে তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে। সময় ঝরে যেতে লাগল মাঝখানে।
এভাবে কিছুক্ষণ কাটার পরে উনি নিজেই বললেন, ‘এখনও বিশ্বাস করতে পারছ না, তাই না? তাহলে একটা ঘটনা বলি। আমার নিজের কথা।’
‘প্রথমেই বলে নিই, আমি সাধুসন্ন্যাসী কিছুই নই। গৃহী মানুষ, মাকে ডাকতে ভালো লাগে, তাই ডাকি, এইটুকুই। আমি কাউকেই কোনও ওষুধ দিই না, কোনও ভবিষ্যতবাণীও করি না। কাউকেই টুপি পরাই না বা মুরগীও করি না। কারও কাছ থেকে কোনও সাহায্য চাইও না, নিইও না। কলকাতায় থাকি আর একটা কলেজে পড়াই। মাসমাইনেতেই আমার কুলিয়ে যায়।’
শুনতে শুনতে ওরা তিনজন লজ্জায় মিশে যাচ্ছিল মাটিতে। সেটা দেখে উনি মজা পাচ্ছিলেন।
তারপরে বললেন, ‘আমি নিজেকে এখনও চিনিনি। তবে এইটুকু বুঝি যে এই শরীরটা আমি নই। কিন্তু তাহলে আমি যে আসলে কে, কোথা থেকেই বা এসেছি, আর কোথায়ই বা যাব— এসব কিছুই জানি না, তাই বলেছিলাম যে পতা নহি।’
সুবীরের মাথা বুকে এসে ঠেকেছে। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘মা-ই হয়ত তোমাদের আবার টেনে এনেছেন আমার সামনে। নইলে আমরা এইভাবে বসে থাকব কেন? কাজেই তোমাদের কাছে বলতে অসুবিধে নেই।
‘প্রায় পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছর আগে। ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছি ঠিক এই জায়গাটাতেই। এই গাছটার নিচে তখনও বাঁধানো ছিল। এই যে আমি বসে রয়েছি, তিনিও সেরকম বসেছিলেন। মাথায় জটাভার আর একটা কমণ্ডলু ছাড়া আর কিচ্ছু নেই সঙ্গে। কিচ্ছু নেই মানে কিচ্ছুই নেই, একদম নিরাবরণ, নগ্ন। কিন্তু সর্বাঙ্গ থেকে যেন জ্যোতি বেরোচ্ছে।’
একটু থামলেন তিনি। ওদের দিকে একবার তাকালেন। আবার হেসে বলতে থাকলেন, ‘আমাকে দেখে ইশারায় কাছে ডাকল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আর আমার মনে হচ্ছিল যেন খুব স্নিগ্ধ কোনও ধারা আমার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
তারপর বলল, ‘তোর জীবনে একটা বড় বিপদ আসতে চলেছে। খুব সাবধানে কাটাতে হবে একটা বছর।’
‘আজ দেখে পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের জায়গাটাকে কল্পনা করতে পারবে না। গোটা জায়গাটা একদম নির্জন খাঁ খাঁ করছে। ইতস্তত কিছু পোড়া কাঠ পড়ে রয়েছে কেবল। আর চারপাশে জঙ্গল, সেখান থেকে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির ডাক। প্রাণী বলতে কেবল ওই সন্ন্যাসী আর আমি মুখোমুখি। হঠাৎ ওঁর মুখে বিপদের কথাটা শুনে আমার গা কেঁপে উঠল।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বিপদ? তা থেকে বাঁচব কী করে?’
সাধু বলল, ‘তোর স্ত্রীর থেকে বিপদ। হয় তার নইলে তোর, কারও একজনের প্রাণসংশয় হতে পারে। আবার পরিস্থিতি খুব কঠিন হলে দুজনেরই প্রাণসংশয় হতে পারে।’
‘আমার বুকের ভেতরটা গুরগুর করে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রাণসংশয় মানে কী? কোনও অসুখবিসুখ বা কিছু?’
মাথা নাড়ল সাধু, ‘সেসব কিছু নয়। সেরকম হলে তো চিকিৎসা করালেই সেরে যাবে। তোর আর তোর বউয়ের মাঝখানে হঠাৎই যদি চতুর্থ কেউ এসে পড়ে তাহলে তার থেকেই বিপদ আসবে।’
এটা শুনে যদিও একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলাম কেননা সাবধান আর সচেতন থাকলেই এক্ষেত্রে বিপদটা এড়ানো যাবে, তবুও চতুর্থ কেউ আসবে শুনে বেশ অবাকই লাগল। তাহলে তৃতীয়জন? তার কী হবে? সাধুকে জিজ্ঞেসও করলাম তার কথা।
সাধু উত্তরে বলল, ‘যা নিচে গিয়ে জলে একটা ডুব দিয়ে আয়।’
এখন যে কোপাই দেখছ, শুকিয়ে এসেছে। কিন্তু সেইসময়ে জলে টইটম্বুর। নিচে নেমে জলে ডুব দিয়ে ওপরে উঠে আসতে উনি পাশে বসতে বললেন। বসলাম, ঠিক যেভাবে তোমরা বসে রয়েছ।’
সুবীর, পার্থ আর দিব্যর গা ছমছম করছিল। দূরে যেখানে কোপাই বাঁক নিয়েছে, সেখানটাতেই সূর্য ওকে এখনও স্পর্শ করে রয়েছে। হয়তো কথা শেষ হলেই ডুব দেবে।
উনি বললেন, ‘সাধুর পাশে বসে রয়েছি আর সে তখন ধ্যানে ডুবে। হঠাৎই চোখ খুলে বলল, ‘তোকে কানে কানে একটা মন্ত্র দেব। খুব মন দিয়ে শুনবি, কেননা একবারের বেশি বলা যাবে না। ছোট মন্ত্র, একবার শুনলেই মনে থাকা উচিত। সেটা রোজ জপ করবি। দেখা যাক তৃতীয় আর চতুর্থজনকে কাটানো যায় কিনা! বাকিটা মায়ের ইচ্ছে।’
‘তারপর আমার মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে মন্ত্রটা বলল। ছোট্ট মন্ত্র, সত্যিই ভুলে যাবার কথা নয়। জিজ্ঞেস করলাম, কতবার করব?’
সাধু বলল, ‘প্রত্যেকদিন অন্তত হাজারবার। তার বেশি হলে আরও ভালো।’
মন্ত্রটা এত ছোট যে হাজার জপ করা কিছুই কঠিন নয়।’
‘মন্ত্রটা কী ছিল?’ উত্তেজিত হয়ে সুবীর জিজ্ঞেস করল।
উনি হাসলেন, ‘সবে প্রথম ধাপে পা রেখেছ। এখনও তো একশো সাতটা সিঁড়ি বাকি আছে, তাই না?’
কিছুই বুঝল না ওরা। তবে আর কথাও বলল না। পার্থ কেবল বলল, ‘তারপর?’
‘জপ করতে করতে তো হোটেলে ফিরলাম। মুশকিল হল পরদিন। ঘুম থেকে উঠে দেখি মন্ত্রটা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। কেবল একটা অক্ষর মনে আছে— হ্রীং। ব্যস, আগে পিছে আর কিচ্ছু মনে নেই। এবার কী হবে?
সঙ্গে সঙ্গে পড়ি কী মরি করে দৌড়লাম সাধুর কাছে। এখানে এসে দেখি এই গাছের তলা বেবাক ফাঁকা। কেউ কোত্থাও নেই। কেবল একটা শ্যাওলা-ধরা খুলি পড়ে রয়েছে, যেটা আগের দিন ছিল না। এই তুমি যেখানে বসে রয়েছ, ঠিক সেখানেই পড়েছিল। আমায় দেখে খুলিটা যেন হা-হা করে হেসে উঠল। মনে হল যেন সেই হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’
দিব্য চমকে সরে বসল।
‘সাধুকে দেখতে না পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেল। প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করলাম মন্ত্রটা কী ছিল, কিন্তু কী আশ্চর্য, ওই একটা অক্ষর ছাড়া কিছুতেই বাদ বাকিটা মনে পড়ল না। যাই হোক নিজের বাড়িতে তো ফিরলাম।
‘ফিরেই দেখি শান্তা, মানে আমার বউয়ের নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আগেরদিন নাকি রাত জেগে যাত্রা দেখেছে, তারই এফেক্ট আর কী। আমি ফিরেছি দেখে হাসল। কী বলব তোমাদের, ওর হাসি দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। কেননা হাসিটা বড্ড নিষ্প্রাণ, ক্লান্ত। যেন, পৃথিবীর প্রতি সমস্ত টান হারিয়ে ফেলেছে।
পরদিন থেকে পড়ল জ্বরে। জ্বর মানে ধুম জ্বর। ডাক্তার এসে তো প্রথমে মৃদু তারপরে কড়া ওষুধ দিয়ে গেল, সঙ্গে একগাদা টেস্ট।
মজা হল ওষুধ দেবার পরে যতক্ষণ তার এফেক্ট থাকে, ততক্ষণ জ্বর কমতে কমতে নর্মাল টেম্পারেচারে এসে দাঁড়ায়। তার স্থায়ীত্ব খুব বেশি হলে দশ মিনিট। তারপরেই আবার টেম্পারেচার বাড়তে শুরু করে। আর ১০৩ অবধি উঠে গেলে ওষুধ দেওয়া ছাড়া তো অন্য কোনও উপায় থাকে না। দিনের পর দিন এইভাবেই চলতে থাকল।
এদিকে বাড়িতে প্রাণী বলতে শুধু আমরা দুজন। অথচ ওর কাছে তো সারাক্ষণ থাকা সম্ভব নয়। কেননা আমাকে তো কলেজে যেতেই হবে। সব মিলিয়ে সে এক নাজেহাল অবস্থা। চল্লিশ বছর আগে তো আর এখনকার মত আয়া সেন্টার, নার্স সেন্টার এসব ছিল না। সেই সময়ে একমাত্র উদ্ধারকর্ত্রী হয়ে দেখা দিল পরী, মানে আমার বাড়ির কাজের মেয়েটা। সে সকাল থেকে শুরু করে আমি কলেজ থেকে না ফেরা অবধি শান্তার কাছে থাকত, সেবাশুশ্রূষা করত।
পরী অল্পবয়েসী আর চেহারাতেও বেশ একটা চটক ছিল। ফলে যেটা হল যে শান্তার মাথায় ওকে আর আমাকে নিয়ে সন্দেহের বীজ মাথাচাড়া দিতে শুরু করল। সারাক্ষণই তার মেজাজ খারাপ। অন্য কেউ হলে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যেত। কিন্তু পরী মুখ বুজে পড়ে থাকল। মাঝে মাঝে আমার নিজেরই সন্দেহ হত যে পরী কি আমার প্রেমে পড়েছে নাকি? বুঝতে পারছি যে আমার আর শান্তার মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তি এসে গিয়েছে। অথচ তাকে ঝেড়ে ফেলারও উপায় নেই। কেননা একদিনের মধ্যে অন্য কাজের লোক আমি পাব কোথায়?
সেইসময়ে একদিন কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গিয়েছি কালীঘাটে। মায়ের কাছে বউয়ের নামে পুজো দেব। তারপরে যা হয় হবে। কিন্তু মুশকিল হল পুজো দেবার সময়ে কিছুতেই মন দিয়ে মাকে ডাকতে পারলাম না। খালি পরীর মুখ মনে পড়তে থাকল। যত তাকে সরাতে চেষ্টা করি, তত সে হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এমনকি বিগ্রহের দিকে চোখ তুলেও দেখছি পরী। আর অদ্ভুত ব্যাপার যে ওর কথা ভাবতে বেশ ভালো লাগছিল।
ওখান থেকে বেরিয়ে নকুলেশ্বর তলায় যাচ্ছি, হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ডাকল। দেখি টকটকে লাল পোশাক পরে সেই সাধু। কাছে যেতেই অবশ্য ভুল ভাঙল। সে নয়, আরেকজন। কিন্তু এ আমায় ডাকল কেন?
বলল, ‘তোর বড়ো বিপদ, না?’
আমার তখন এমন অবস্থা যে কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরি। কাজেই সব খুলে বললাম, মায় বীজমন্ত্র হারানো অবধি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, ‘যিনি তোকে জপমন্ত্র দিয়েছিলেন তিনিই তোর গুরু। গুরুর দেওয়া মন্ত্র অন্য কেউ দিতে পারে না। আমি কী করব বল?’
কিন্তু সে কথা শুনলে তো আমার চলবে না। যে করেই হোক সেই মন্ত্র উদ্ধার করতে হবে। কাজেই নাছোড়োবান্দা হয়ে লেগে রইলাম তার সঙ্গে। শেষ অবধি সেই সাধু পরের অংশটা বলে দিল। মনে মনে জপতে জপতে তো বাড়ি ফিরলাম আর ফিরেই একখানা খাতায় লিখে ফেললাম সেটা। আবার ভুলে গেলেই হয়েছে আর কী।
সাধু কতগুলো নিয়ম বলে দিয়েছিল। সেইমত বাড়ি ফেরার পথে সাদা ফুল, গুগগুল সব কিনে নিয়ে গেলাম। তারপর সেই রাত থেকেই লেগে গেলাম জপ করতে। কিন্তু দেখি যে সুস্থ হবার বদলে শান্তা যেন আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ইতিমধ্যে সমস্ত রকম রক্তপরীক্ষা হয়েছে, কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। ইঞ্জেকশন, কড়া কড়া ওষুধ, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আগে তবু ওষুধ পড়লে জ্বরটা কমতে থাকত, এখন তো জ্বর কমতেই চায় না। বুঝতে পারছি যে ভগবান আমায় কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন। কেননা সাধু বলেই দিয়েছিল যে একমাস জপ করতেই হবে। দেবী দেখবেন যে সাধক দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কিনা! তারপরে তিনি অভীষ্ট বর দেবেন।
সাধু বলেছিল যে মাস শেষ হলে সন্ধেবেলা ওর সঙ্গে আবার গিয়ে দেখা করতে। ও নকুলেশ্বরতলাতেই থাকবে। কেবল একটা নতুন গামছা আর নতুন ধুতি নিয়ে যেতে হবে। আর শান্তার একটা ব্যবহার করা শাড়ি।
আমাকে দেখেই চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। বলল, ‘এসেছ! ভেবেছিলাম তুমি আসবে না।’
‘আসব না কেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
‘না, তাই বলছি। যাক গে চলো অনেকগুলো কাজ আছে। এখানে করলে হবে না। আমার সঙ্গে এসো।’
তারপর আমাকে টেনে নিয়ে গেল ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশানে। তোমরা যদি ওখানে গিয়েও থাকো, গিয়েছ প্রিয়জনকে অন্তিম বিদায় দিতে। যেখানে ইলেকট্রিক চুল্লী আছে, সেইটুকুই তোমাদের গতিবিধি। কিন্তু তোমরা যেটা জানো না যে সেখানে কৃষ্ণকালীর একটা মন্দির আছে, নীলকন্ঠ মহারাজের সমাধি আছে। প্রত্যেকটাই খুব জাগ্রত স্থান। সেরকমই একটা একদম ফাঁকা জায়গায় আমাকে নিয়ে গেল। ঝোপঝাড় দিয়ে ঘেরা জায়গাটা। পাশেই আদি গঙ্গা। একখানা পাথরের ওপরে বসলাম দুজনে। কে জানে পাথরটা কোত্থেকে এসেছে! আগে থেকেই ছিল না কী ও এনে রেখেছে তাও জানি না। মাথায় গঙ্গা জলের ছিটে দিয়ে বলল, নতুন ধুতিটা পরে খালি গায়ে গামছাটা জড়িয়ে নিতে। নিয়ে বসলাম।
এরপর শান্তার ব্যবহার করা শাড়িটা সামনে রেখে তার ওপরে দুটো শ্বেতকরবীর মালা রাখল। তারপরে অনেক কিছুই বলে গেল, এতদিন পরে সেসব কিচ্ছু মনে নেই। কেন জানি না সেদিন ওর কথাবার্তাগুলো আমার খুবই অসংলগ্ন বোধ হচ্ছিল। চোখদুটো যেন জ্বলছিল।
ঝোলা থেকে একটা মড়ার খুলি বের করে তাতে ঘি ঢেলে সলতে গুঁজে দিয়ে আমাকে বলল জ্বালিয়ে দিতে। তারপর ওর কথামত একটা পাত্রে ধুনো আর গুগগুল রেখে ধুপকাঠির সাহায্যে সেই দীপ থেকে আগুন এনে ধরালাম।
সাধু জিজ্ঞেস করল ‘বউয়ের বয়স কত?’
বললাম ‘আঠাশ।’
‘চার সাত্তে আঠাশ, বাঃ!’ বলে সাধু আঠাশটা পান নিয়ে শাড়ির ওপরে রেখে একদম আমার গা ঘেঁসে বসল। ওর হাঁটু আর আমার হাঁটু ছুঁয়ে রয়েছে। তারপর আমার ডান হাতটা ওর বাঁ কাঁধে রেখে বলল সেই মন্ত্রজপ করে যেতে। যাইই ঘটুক না কেন কোনও অবস্থাতেই যেন ওর কাঁধ থেকে হাত না সরাই।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। জপ করতে করতে হঠাৎ মনে হল যেন আমার হাতের মধ্যে কিছু একটা নড়ছে। যেন সাধুর কাঁধে কিছু একটা জীবন্ত প্রাণী ছিল, যাকে আমি চেপে ধরে রেখেছি। সে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমনই জোর তার ধাক্কা যে আমার হাত যেন ছিটকে সরিয়ে দিয়ে সে বেরিয়ে আসবে। বেশ কিছুক্ষণ এরকম চলার পরে সেই ধাক্কা যেমন থেমে গেল, তেমনি আমার বাঁ হাতটা সুড়সুড় করতে থাকল। পরিষ্কার বুঝতে পারছি তালুর চামড়া ফাঁক করে কিছু একটা যেন শরীরে ঢুকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার শরীর ভারি হয়ে উঠছে। আমি প্রাণপণে মন্ত্রজপ করে যাচ্ছি।
অনেক পরে সাধুর কথায় আমার চমক ভাঙল। সে বলল, ‘তোমার কাজ শেষ। তুমি ইচ্ছে করলে থাকতে পারো, আর চলে যেতে চাইলে যেতে পারো। তবে আশা করছি আজ রাত্তির থেকেই ফল বুঝতে পারবে।’
বাড়ির সামনে এসে মনে হল দরজায় হেলান দিয়ে কেউ যেন বসে রয়েছে। দেখি একটা অল্পবয়সী মেয়ে। আমাকে দেখে উঠে এমনভাবে সরে দাঁড়াল যেন দরজা খুললেই সেও ভেতরে আসবে।
কলিং বেলটা টিপে, বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাউকে খুঁজছেন?’
একটা অদ্ভুত ভ্রু-ভঙ্গি করে বলল, ‘না তো। কাকে আবার খুঁজব?’
কথা বলার সুরটা এমন যেন ও আমার কাছেই এসেছে আর আমি যেন জেনেবুঝেই অজ্ঞ সাজছি।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে? কী ব্যাপার বলুন তো?’
সেইসময়ে পরী দরজা খুলে দিল। আমি মেয়েটাকে বললাম, ‘আপনি ঠিক কার কাছে এসেছেন?’
পরী উঁকি মেরে বলল, ‘কার সঙ্গে কথা বলছেন দাদা?’
‘এই যে মেয়েটা! একে চিনিস?’
পরী ওকে দেখেই বলল, ‘ও তো ঘন্টাখানেক আগেও এসেছিল। আপনার খোঁজ করছিল। জিজ্ঞেস করল যে দাদা কখন ফেরে, বাড়িতে বৌদি ছাড়া আর কেউ আছে কিনা। এইসব। তুমি কে বলো তো? বাড়ি কোথায়?’
মেয়েটা আমতা আমতা করে সরে গেল।
ভেতরে ঢোকার পরে পরী বলল, ‘মেয়েটার কোনও বদ মতলব আছে দাদা। জানে বাড়িতে আপনি নেই, বৌদি অসুস্থ, আমি একা। খোঁজখবর নিয়েই এসেছিল। আপনি সাবধানে থাকবেন।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ওর কথা উড়িয়ে দিলাম, ‘বৌদি কেমন আছে এখন?’
‘ভালো’ পরী হাসিমুখেই বলল, ‘আজ একবারও জ্বর আসেনি।’
আমার শরীর কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললাম, মা। ওকে সুস্থ করে দাও, সুস্থ করে দাও। পরের দিনও ওর জ্বর এলো না। তার পরের দিনও না।’
উনি কাহিনী থামিয়ে চুপ করলেন। সুবীর আর পার্থ চুপ করে থাকলেও দিব্য একটু উত্তেজিতভাবেই বলল, ‘তার মানে মন্ত্রের জোরে উনি সেরে উঠলেন? ডাক্তার আর ওষুধে কোনও কাজ হয়নি? ওগুলো ফালতু?’
‘বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না?’ উনি মৃদু হাসলেন, ‘তাহলে বাকিটাও বলি—
জ্বর আসেনি ঠিকই, কিন্তু খুবই দুর্বল। আর সেই প্রথম রাত্তিরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। শান্তা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি টুকটাক কাজকর্ম মিটিয়ে একটা বই পড়ছি। কখন চোখ লেগে গিয়েছে জানি না। হঠাৎ মনে হল বারান্দায় কারও পায়ের শব্দ। তারপরে সেখানকার দরজায় মৃদু খুটখুট। যদি চোরছ্যাঁচোর হয়, সে খুটখুট করে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে কেন?
উঠে বারান্দার দরজা খুলতেই দেখি সে দাঁড়িয়ে রয়েছে।’
‘কে?’ সুবীরের মুখ দিয়ে ছিটকে বেরোলো প্রশ্নটা।
‘যাকে ভেবেছ, সেইই’ উনি বললেন, ‘আমাকে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, পরী ছিল বলে বুঝি চিনতেই চাইলে না? নাকি আমাকে পছন্দ নয়?’
আমি হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছি ওর দিকে। ও আবার ঠোঁট ফুলিয়েই বলল, ‘কত কষ্ট করে দোতলার বারান্দায় উঠেছি, শুধু তোমার জন্যে। আর তুমি এরকম করছ আমার সঙ্গে!’
শান্তা দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে। আমি ওর সেবায় জ্ঞানত ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু আমারও তো তখন কম বয়স। আসঙ্গলিপ্সা তো রয়েছেই। কোনও কথা না বলে মেয়েটাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে এলাম।
ইচ্ছেটা পূরণ হবার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ ‘কী গো শুতে যাবে না?’
চমকে তাকিয়ে দেখি সামনে শান্তা দাঁড়িয়ে। আমার পাশে খোলা বই। ইজিচেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ওই রকম একটা ইন্দ্রিয়ঘন স্বপ্ন চটকে যাবার জন্যে প্রথমেই রাগ হল শান্তার ওপরে। স্বপ্ন হলেই বা, এরকম মুহূর্তে কেউ ডাকে? তারপরে মনে হল, ওই বা জানবে কী করে!
যাইহোক চরম অতৃপ্তি নিয়ে মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লাম। একটু পরেই সে আবার চোখের পাতায় নেমে এল এবং আমার অতৃপ্তিকে ভরিয়ে তুলতে থাকল ঘুমের মধ্যেই। পরের দিনও তাকে স্বপ্নে দেখলাম এবং তার পরের দিনও। ক্রমে এমন হল যে রোজ সন্ধে হলেই আমার আর তর সইত না। খালি মনে হত, কতক্ষণে ঘুমোতে যাব আর সে আসবে? ক্রমশ তার নেশা আমাকে অপ্রকৃতস্থ করে দিতে থাকল।
আগে অনেক রাত অবধি পড়াশুনো করতাম, পেপার তৈরি করতাম। এখন সে সমস্ত গেল। কেবলই মনে হয় কখন রাত্তির নামবে, কত তাড়াতাড়ি শুতে যাব আর ও আসবে আমার চোখের পাতায়, আমার সর্বাঙ্গে। আমার কোনও অপরাধবোধ ছিল না। একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে শান্তাকে ঠকাচ্ছি। কেননা ও তো আসে স্বপ্নের মধ্যে, আর স্বপ্ন দেখাটা তো আর আমার ইচ্ছাধীন নয়। আমার ওকে ভালো লাগে, আমি নিবিড় দাম্পত্যের স্বাদ পাই, সবই ঠিক। কিন্তু সবটাই তো স্বপ্নে।
এইভাবে চলতে চলতে একদিন সে বলল, এইভাবে আমার আর ভালো লাগছে না।
বললাম, ‘তাহলে কী করতে চাও?’
‘যা করতে বলব, পারবে?’
আমার তখন এমন অবস্থা যে বললাম, ‘তুমি যা বলবে আমি করতে পারব। তোমাকে অদেয় কিছুই নেই।’
সবই কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে।
ও মুখ টিপে হাসল। বলল, ‘আজ নয়, কাল সকালে বলে দেব।’
পরদিন কলেজে যাচ্ছি। আমার বাড়ি থেকে একটু হেঁটে গেলেই বাস ডিপো। রোজই সেখান থেকে বাসে উঠি। সেদিনও উঠে পছন্দমত জায়গা নিয়ে বসেই চোখ বুজে ফেললাম। ও এসে কী বলে দেখা যাক। কিন্তু এল না। তিরিক্ষি মেজাজে কলেজে ঢুকলাম। পড়ানোয় মন বসল না। কেবলই মনে হচ্ছে ও কথা রাখল না। সন্ধেবেলা অভিমানের পাহাড় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। সামান্য কী কারণে শান্তার সঙ্গে ঝগড়াও হয়ে গেল।
সেই রাত্তিরে বললাম, ‘তুমি সকালে কী বলবে বলেছিলে! কই বললে না তো! তোমার জন্যে অপেক্ষা করে রইলাম, একবার এলেও না!’
ও ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘আর আমি বুঝি বসে থাকিনি? গোটা রাস্তা পাশে বসে রইলাম, উনি ঘুমোতে ঘুমোতে গেলেন। একবারও চোখ খুলে দেখলই না যে পাশে কে বসেছে। স্টপেজ এল কোনওদিকে না তাকিয়ে নেমে পড়ল! একবারও ব্যাগ খুলে দেখার সময় নেই যে কেউ কিছু দিল কিনা।’
‘মানে?’ তিনবন্ধুই একসঙ্গে চমকে উঠেছে।
উনি মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ। কল্পনা নয়, সে পুরোপুরিই মানবী। কিন্তু এইবারে আমার ভয় করতে শুরু করল যে এ কে? রোজ আমার স্বপ্নে আসে অথচ তার রক্তমাংসের অস্তিত্ব রয়েছে! রোজই একই মেয়েকে স্বপ্নে দেখতে থাকলে সেটা তো আর নিছক স্বপ্ন থাকে না। কিন্তু তাহলে কী থাকে, জানি না। খুবই অস্বস্তির মধ্যে বাকি রাতটা কাটল।
পরদিন সকালে কলেজে বেরোনোর আগে ব্যাগ খুলে দেখি খবর কাগজের একটা ছেঁড়া টুকরো। কখন ঢুকেছে, কীভাবে ঢুকেছে, কে জানে। হয়তো বা ওই মেয়েটাই গুঁজে দিয়েছে। নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে দেখি একটা অসম্পূর্ণ খবর। কোন একটা লোক প্রেমিকাকে বিয়ে করবে বলে নিজের বউকে—। তারপরের অংশটা ছেঁড়া। তবে কী ছিল আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না। গা-টা রীতিমত ছমছম করে উঠল। সেদিন কলেজ যাবার সময়ে গোটা রাস্তাটা জেগে রইলাম। কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না। সে এল রাত্তিরে, যেমন রোজ আসে।
এসেই বলল, ‘কী ঠিক করলে?’
‘কীসের?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘খবরের বাকি অংশটা ছেঁড়া ছিল বলে বুঝতে পারোনি? লোকটাকে কেউ ধরতে পারেনি। দিব্যি দ্বিতীয় বউকে নিয়ে সুখে আছে। ভয় কী তোমার?’
ঘুমের মধ্যেই হাতজোড় করে বললাম, ‘তোমায় ভালোবাসি। আমাকে নিয়ে যা খুশি করো—কিন্তু…’
কথা শেষ করতে দিল না। বলল, ‘পুলিশের ভয় পাচ্ছ? মানসম্মানের ভয় পাচ্ছ? ভয় কীসের? তোমার বউয়ের আবার যদি অসুখ করে? পরীকে ছাড়িয়ে দাও। আমি নিজেই সেবা করতে আসব, ভাবছ কেন? তখন তো তোমাকে একদম নিজের করে পাব।’
সেইদিন প্রথম প্রেমের কথা শুনেও আমার আনন্দ হল না। আর হয়তো কাকতালীয় অথবা হয়তো কপালের লেখন— পরদিনই শান্তা আবার জ্বরে পড়ল। আমি বুঝতে পারছি যে ওই মেয়েটার হাত থেকে আমার মুক্তি নেই। সমস্ত মন দিয়ে সেই মন্ত্রজপ করতে থাকলাম। কেননা ডাক্তার বদ্যির যে সাধ্য নেই শান্তাকে সারানোর, সেটা তো বুঝেই গিয়েছি।
একটু বেলার দিকে কলিং বেল বাজল। পরীই দেখতে গেল বারান্দা দিয়ে। তারপরে এসে বলল, ‘দাদা সেই মেয়েটা এসেছিল। সেই যে একদিন তুমি অফিস থেকে ফিরলে, বাইরে বসে ছিল, মনে আছে?’
মনে তো আছে বটেই, আমার গা হাত-পা তখন রীতিমত কাঁপতে শুরু করেছে। বললাম, ‘হ্যাঁ, কেন এসেছিল?’
পরী বলল, ‘বলল তুমি নাকি রাতদিনের আয়া খুঁজছ? ও কাজ করবে!’
আমি আর্তনাদ করে বলে উঠলাম, ‘না না, আমি কোনও আয়া টায়া খুঁজছি না। তুমি তো আছ। তুমিই থাকো।’
আমার রকম দেখে পরী একটু অবাক হয়েই তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আমি তাড়িয়ে দিয়েছি ওকে। মেয়েটা ভালো নয়।’
তখনকার মত সমস্যা তো মিটল। কিন্তু দিনটা যত গড়াতে থাকল, আমার মনে আতঙ্ক চেপে বসতে থাকল। আবার তো রাত্তির হবে, আর সে আসবে। ঠিক করলাম যে রাত্তিরে ঘুমোবো না। বই পড়লে ঘুম পাবে ভেবে, বই রেখে টিভি দেখতে শুরু করলাম। ফ্লাস্কে কফি নিয়ে বসেছি। ঘুম এলেই কফি খাচ্ছি আর উঠে পায়চারি করছি। আর ঘুম যেন আমার সঙ্গে লড়াই করতে নেমেছে। চেয়ারে বসলেই চোখ জড়িয়ে ধরতে চাইছে।
হঠাৎ দেখি শান্তা উঠে এসেছে টলোমলো পায়ে, ‘কী গো শুতে যাবে না?’
বললাম, ‘যাচ্ছি, তুমি শোও।’
‘তুমি এসো, আমার একলা খুব ভয় করছে। বারান্দায় কে যেন হাঁটছে। দরজায় টুকটুক করছে।’
আমি প্রচণ্ড আতঙ্কে নড়াচড়া করতেও ভুলে গেলাম। তারপর ওকে বললাম, ‘বেড়াল ফেড়াল হবে। তুমি শোবে চলো।’
‘না গো বেড়াল নয়। ফিসফিস করে যেন কী বলছে।’
আমি যে ভয় পেয়েছি শান্তাকে বুঝতে দিলাম না। ওকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে গিয়ে দেখি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। থার্মোমিটার দিলাম— ১০৩ এর ওপরে। এবারে তো ভুল বকতে শুরু করবে। আর বারান্দার দরজায় সেই খুটখুট শব্দ। খুলে দিলেই সে ঢুকে আসবে, কিন্তু আর স্বপ্নে নয়, রক্তমাংসের শরীর নিয়ে। আমার হাত-পা শিথিল হয়ে যাচ্ছে। তবুও বসে বসে শান্তার কপালে জলপট্টি দিচ্ছি আর প্রাণপণে মন্ত্রজপ করে চলেছি।
ক্রমশ আমার মনে হতে শুরু করল যে মন্ত্রজপে কোনও কাজই হয় না। নইলে রোজ নিয়ম করে জপ, নিয়মমাফিক শ্মশানে গিয়ে পুজো দেওয়া— তারপরেও বিপদ কাটছে না কেন? তার মানে মন্ত্রতন্ত্র সব মিথ্যে, কোনও কিছুতেই কোনও কাজ হয় না। মনে হতেই জপ বন্ধ করে দিলাম।
পরের দিন পরী ঘরের কাজ করছে। আমি শান্তার মাথার কাছে বসে রয়েছি। আগেরদিন রাত জাগার ফলে চোখ জড়িয়ে আসছে। কিন্তু ভয়ে ঘুমোতে পারছি না। এটাও বুঝতে পারছি যে এইভাবে বেশিদিন চলবে না। না ঘুমিয়ে কদিন কাটাব? খুব বেশি হলে আরেকটা দিন। তারপরে তো আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ব। সেই সাধু ঠিকই বলেছিল যে হয় আমাদের দুজনেরই নইলে যে কোনও একজনের প্রাণসংশয় হবে। আবার কলিং বেল বেজে উঠল। আমি কাঠ হয়ে বসে রইলাম। কে এসেছে তো জানি!
পরী একটু পরে এসে বলল, ‘কোন ধর্মীয় সংগঠন থেকে সাহায্য চাইতে এসেছিল। পরী আমাকে আর ডাকেনি, নিজেই দশ টাকা দিয়ে দিয়েছে। ওরা তার বদলে একটা কোন ঠাকুরের ছবি দিয়ে গিয়েছে। পরী ছবিটা যত্ন করে শান্তার মাথার কাছে রেখে দিল। একজন ত্রিনেত্রা দেবী প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপরে বসে রয়েছেন। চারটে হাতের একটা অভয় দিচ্ছে, আরেকটায় বর। অন্য দুই হাতে পাশ আর অঙ্কুশ।’
‘কোন দেবী?’ দিব্য জিজ্ঞেস করল।
ওঁর মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, ‘দেবী ভুবনেশ্বরী। তন্ত্রমতে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকারিনী এবং পালনকারিনী।’
‘পাশ আর অঙ্কুশ কী?’ সুবীর জিজ্ঞেস করল।
‘দমনের অস্ত্র। তিনি বাইরের এবং ভেতরের যাবতীয় বাধা আর অশুভশক্তিকে বিনাশ করেন বলে হাতে অঙ্কুশ। আর, অন্নময়, প্রাণময়, মনোময় এরকম পাঁচটা কোশ আমাদের অন্তস্থিত আত্মাকে ঢেকে রেখেছে। ওই পাশ হল তারই প্রতীক। তাছাড়া, ওই পাশের সাহায্যে তিনি প্রাণবায়ুকে বেঁধে রাখেন শরীরে।’
‘তারপর?’ পার্থ জানতে চাইল।
‘ছবিটা দেখেই আমার বুকের মধ্যে কীরকম যেন করে উঠল। সেই কোপাইয়ের ধার, সেই বাঁধানো বটতলা সব মনে পড়ে গেল। সেই সাধু মন্ত্র দিয়ে যে যে ধ্যানমূর্তির বর্ণনা দিয়েছিল তাতে তো এই রূপেরই বর্ণনা ছিল—
বরাঙ্কুশৌ পাশমভীতিমুদ্রাং করৈর্বহন্তীং কমলাসনস্থাম/বালার্ককোটিপ্রতিমাং ত্রিনেত্রাং ভজেহহমাদ্যাং ভুবনেশ্বরীং ত্বাম।
ছবিটা হাতে নিলাম দেখব বলে। দেখি নিচে সেই বীজমন্ত্র লেখা রয়েছে, যেটা আমাকে সাধু দিয়েছিলেন। আমার বুক ঠেলে তখন কান্না আসছে। এই মন্ত্রের বদলে আমি কিনা এতদিন ধরে অন্য মন্ত্রে অন্য কোনও দেবীর আরাধনা করে গিয়েছি!’
‘মন্ত্রটা কী ছিল?’ পার্থ উত্তেজিতভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘আং হ্রীং ক্রোং। তার বদলে আমি বলে গিয়েছি ওং হ্রীং ইত্যাদি ইত্যাদি’ তিনি হেসে পার্থর দিকে তাকালেন, ‘কামধেনুতন্ত্রের মতে ভুবনেশ্বরী মা হচ্ছেন বর্ণরূপা। মানে প্রত্যেক স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণই আসলে তাঁর রূপ। সেই বর্ণাত্মক রূপ থেকেই সমস্ত দেবতার জন্ম হয়েছে। ফলে প্রতিটি বর্ণই বীজমন্ত্র হতে পারে। যদিও মনে হবে পাতি স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের গায়ে অনুস্বার মেরে দেওয়া হয়েছে।’
পার্থ লজ্জায় মুখ তুলতে পারছে না। উনি আবার হাসলেন, ‘বাক্যের সব কটা শব্দের শেষে অনুস্বার দিলেও কিন্তু মন্ত্র হবে না। বর্ণের শেষে কখন অনুস্বার আর কখন বিসর্গ বসবে সেটা জানা চাই।’
সূর্য কখন মিলিয়ে গিয়েছে কেউ খেয়াল করেনি। এখন ওদের ঘিরে শুধুই অন্ধকার। কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না। কেবল কণ্ঠনির্গত কথাগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে।
দিব্য বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব।’
‘নিশ্চয়। বলো?’
‘ওই মেয়েটা, যাকে আপনি স্বপ্নে দেখতে পেতেন, তিনি কে?’
তখন তো কিছুই বুঝিনি। অনেক পরে জেনেছি যে উনি হলেন রতিসুন্দরী দেবী। তাঁর বীজমন্ত্র জপ করলে তিনি ভার্যা হিসেবে সাধকের কাছে এসে সমস্ত রাত স্ত্রী হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন করেন। তার বদলে সাধককে অতি অবশ্যই নিজের স্ত্রীকে ত্যাগ করতে হয়। না করলে স্ত্রীর অথবা সাধকের প্রাণসংশয় হয়। আর শান্তার অসুস্থতার সময়ে আমি ভুল করে তাঁকেই ডেকে গিয়েছি।
এখন বুঝি যে প্রথম সাধু এই জন্যেই আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। আর, আমার আর শান্তার মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এসেছিল ওই দ্বিতীয় সাধু। সে না এলে আমি ভুল মন্ত্র জপ করতাম না। আমি বুঝতে ভুল করেছিলাম।’
‘আচ্ছা ওই যে শ্মশানে কীসব করা হল? আপনার হাতে কী যেন ঢুকে গেল?’
উনি বললেন, ‘সেটা আমার কাছেও রহস্যময়। তবে মনে হয় খুব সম্ভব ওই দ্বিতীয় সাধুকে তিনি গ্রাস করেছিলেন। তাঁর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যে সাধু নিজের ঘাড় থেকে তাঁকে নামিয়ে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল। কেননা শরীরের বাঁ-দিকটা নারী, ডানদিক পুরুষ। আমি ডান হাত দিয়ে তার বাঁ কাঁধ ধরে রেখেছিলাম। আর আমার বাঁ হাত দিয়ে কিছু ভেতরে ঢুকেছিল।’
আবার সব চুপচাপ। তারপরে একটা সময়ে নীরবতা ভেঙে আপনমনেই তিনি বললেন, ‘মায়ের অহৈতুকী কৃপা না হলে আমার জীবনটা ছারখার হয়ে যেত। তিনি যে কখন কীভাবে কৃপা করবেন, কে জানে!’
হঠাৎই কোপাইয়ের বুকে কেমন একটা আলোড়ন জাগল। যদিও অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। কিন্তু উনি একটু অস্থির হয়েই বললেন, ‘এবার তোমরা চলে যাও, আর থেকো না এখানে।’
ওঁর বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে তিনজনেই ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল। উনি আবার বললেন, ‘তাড়াতাড়ি চলে যাও। যাবার সময়ে পেছনে ফিরে তাকিও না।’
ঝোড়ো হাওয়া আবার সেই গেট খুলে দিল। কিন্তু বারণ করলেও তো কৌতূহল থেকেই যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে ওরা দেখল নদীর বুক থেকে ছায়া ছায়া কারা যেন উঠে আসছে।
ঘরের কাছাকাছি এসে নৈঃশব্দ ভেঙে পার্থ বলল, ‘কী বুঝলি?’
দিব্য বলল, ‘আমি ডেফিনিট যে মালটা অ্যান্টি সোশ্যাল কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। সেইজন্যেই আমাদের সরিয়ে দিল। নইলে নদীর ওখানে কারা কারা ঘুরঘুর করছিল?’
সুবীর বলল, ‘গল্পটা ভালো কিন্তু পুরোটাই ঢপ। একই মেয়েকে কেউ রোজ স্বপ্নে দেখতে পারে না। এত কথা আর প্রেমপীরিতও হতে পারে না। তাছাড়া লোকটা পুরো পিএইচডি। একবার পরীকে ভালো লাগছে, একবার ওই মেয়েটাকে ভালো লাগছে। দেবীর নামটাও খেয়াল করেছিস? রতিসুন্দরী! নামটার মধ্যেই তো আঁশটে গন্ধ। মাঝখান থেকে সন্ধেটা ফালতু নষ্ট হল।’
‘ওই রতিসুন্দরীর মন্ত্রটা জেনে নিলে হত। আজ থেকেই জপ করতাম। একমাস পরে একটা ঘ্যামা বউ পাওয়া যেত।’
পার্থর কথায় উচ্চহাসি ছড়িয়ে পড়ল হাওয়ায়।
সুবীর আবার বলল, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছিস? রতিসুন্দরী ওর বউকে মেরে নিজে বউ হতে চাইছে, অথচ শ্মশানে কীসব করার পরে বউ কিন্তু সুস্থ হয়ে গেল। যদি মেরেই দিতে চাইবে, তাহলে সুস্থ হল কেন? পুরো ঢপের চপ।’
‘ওহো মালটাকে জিজ্ঞেস করা হল না তো যে ওর বউ এখন কোথায়?’
‘সুস্থ শরীরে ঘরকন্না করছে নিশ্চয়,’ দরজার তালা খুলতে খুলতে দিব্য বলল, ‘নইলে আর মন্ত্রের মাহাত্ম্য কোথায়?’
পরদিন হাওড়াগামী শতাব্দীর কামরায় বসে আবার আগের সন্ধের কথা উঠতে দিব্য বলল, ‘লোকটাকে তোরা ঢপবাজ মনে করছিস, না?’
‘কেন তোর সন্দেহ আছে?’
‘কী জানি, বুঝতে পারছি না,’ দিব্য বলল।
‘হঠাৎ এরকম মনে হচ্ছে কেন?’
‘কেন?’ চুপ করে রইল দিব্য। তারপরে বলল, ‘প্রথম কথা, কাল ওর কাছে যাবার সময়ে দরজা বন্ধ করার কথা আমাদের কারওরই খেয়াল ছিল না। অথচ এসে আমি তালা খুললাম মনে আছে? তালাই বা মারল কে, আর আমার পকেটে চাবিই বা এল কী করে?’
নিশ্চয় অভ্যেসে পকেটে চাবি রেখেছিলি’ পার্থ বলল, ‘আর দরজা খোলা দেখে রিসর্টের কেউ তালা মেরে দিয়েছে। এর মধ্যে আর অলৌকিক কিছু খুঁজিস না বস।’
‘যদি রিসর্টের কেউ চাবি মেরে দিয়ে থাকে, তাহলে সে আমাদের কাছে চাবি দিল না কেন?’
‘ভেবেছে আমাদের কাছেই চাবি আছে!’
দিব্য মাথা নাড়ল, ‘না রে অত সোজা নয়। একটা অদ্ভুত কথা বলছি, জানি না তোরা বিশ্বাস করবি কিনা! ওই যে মন্ত্রটা—আং হ্রীং ক্রোং—কাল থেকে আমার মাথায় একদম চেপে রয়েছে। আমি কিছুই করছি না, কিন্তু কানের মধ্যে সমানে বাজছে, নিঃশ্বাস নিচ্ছি তাতেও সেই ছন্দ।
সকালে মোবাইলটা খুলেছি। দেখি এই ছবিটা। তোরা তো জানিস আমি সবসময়ে ক্যামেরায় ছবি তুলি। কিন্তু মোবাইলে এই ছবিটা কী করে এল? কে তুলল এটা? আর কোনসময়েই বা তুলল?’
ওরা তাকিয়ে দেখল আগের দিন সকালের সেই দৃশ্য। উনি বসে রয়েছেন। সামনে সেই আসন পাতা। কিন্তু এখন তার ওপরে সেই মেয়েটা বসে রয়েছে। হাতে সেই আঁকশি আর দড়ি। পেছনে একটা গাছের ডাল এমনভাবে কোণাকুণি রয়েছে যে মনে হচ্ছে যেন মেয়েটারই আরও দুটো হাত। একটা ওপরে তোলা, অন্যটা নিচে নামানো।
চমকে গিয়ে ওরা পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে রইল। কেউই কোনও কথা বলতে পারছিল না।
অনেক পরে ট্রেন তখন হাওড়ার কাছাকাছি, দিব্য নিজের মনেই বলেছিল, ‘উনি অঙ্কুশ আর পাশ নিয়ে কী সমস্ত বলছিলেন, মনে আছে?’
‘না, তবে’ মোবাইল দেখতে দেখতে পার্থ বলল, ‘অঙ্কুশের একটা মানে হল আঁকশি আর পাশ মানে দড়ি। এই যে ডিকশনারিতে দেখলাম।’
ওরা চমকে এ ওর মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কেউই কোনও কথা বলল না। কেননা ওদের কারওর কাছেই আর কোনও উত্তর বা যুক্তি ছিল না।
