Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    সৌমিত্র বিশ্বাস এক পাতা গল্প257 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    উড়োজাহাজ – সৌমিত্র বিশ্বাস

    উড়োজাহাজ

    ঘরে ঢুকে সেন্টার টেবিলের ওপরে চোখ পড়তেই অন্যমনস্ক হয়ে গেল ভাস্কর। কতদিন হল? নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকলেও মাথার মধ্যে নিজে থেকেই হিসেব হয়ে চলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে আজ জুলাইয়ের শেষ। তার মানে প্রায় পাঁচ মাস। অথচ মনে হচ্ছে যেন গত সপ্তাহের ঘটনা।

    পাঁচ মাস পার হয়ে জীবন চলে যাবার পরে ভাস্কর আজ আবার ফিরে এসেছে নিজের কর্মস্থলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই কাজ করেছে। নির্মলের কাছ থেকে সিগারেট নিয়েও খেয়েছে। কলীগরা বলছিল কলকাতায় ফিরে যেতে। অন্তত এই বাড়িতে না আসতে। কিন্তু ভাস্কর বুঝতে পারছিল আজ না এলে আর কোনওদিনই আসতে পারবে না। বাড়িতে না ঢুকলে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতেও পারবে না। শুধুই কি নিজের মুখোমুখি? অমৃতারও নয়?

    অমৃতা এখানে এসেছিল ২৪শে ফেব্রুয়ারি। মানে ভাস্করকে ছেড়ে চলে যাবার ঠিক বারো দিন আগে। চলে গেছে কেননা ওদের দুজনের নাকি একসঙ্গে থাকা সম্ভব ছিল না। যাকগে, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?

    পাঁচ মাসে যেভাবে ধুলোর আস্তরণ পড়ে থাকার কথা, ওর ড্রাইভার মজিদের দৌলতে সেসব কিচ্ছু নেই। আসলে মজিদের কাছে বরাবরই একটা চাবি দেওয়া থাকত। ছুটিছাটায় বা সপ্তাহান্তে ভাস্কর যখন বাড়ি ফিরে যেত, তখন যাতে ও এসে ঘর পরিষ্কার করিয়ে রাখতে পারে।

    কলকাতা থেকে আসানসোল তো ঘন্টা চারেকের বেশি নয়। ট্রেন তো বটেই, বাসও প্রচুর। মানে চাইলেই ডেলি প্যাসেঞ্জারি করা যেতে পারত। ওদের অফিসে যাদের বাড়ি কলকাতা বা হাওড়া তারা তো সকলেই যাতায়াত করত। কিন্তু রোজ অফিস করার পর রাত দশটা সাড়ে দশটায় কলকাতায় ঢুকে পরদিন সাতসকালে আবার হাওড়া থেকে ট্রেন ধরা ভাস্করের পোষাত না। সেইজন্যে ও একটা বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল।

    এদিকে অমৃতার কলেজ কলকাতায়। সেইজন্যে অমৃতা মজা করে বলত, ‘আমাদের উইক এন্ড দাম্পত্য।’

    যদিও অনেক উইক এন্ডেই অমৃতা ডুবে থেকেছে নিজের গবেষণায়। একটা নতুন স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো ছাড়াও একটা বিদেশি এন-জিওর সঙ্গে জড়িয়ে দারিদ্র্য দুরীকরণ নিয়ে গবেষণা করছিল। তার জন্যে প্রায়ই ফিল্ড স্টাডিতে যেতে হত। আর তার বেশির ভাগটাই শনি বা রবিবারে। নইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা সামলে যাওয়াটাই তো কঠিন।

    তবে এটাও ঠিক যে অনেক উইক এন্ডই যেমন ব্যস্ততার মধ্যে কাটত, তেমনি আবার সামান্য সুযোগ পেলেই অমৃতা চলে আসত আসানসোলে। ২৪ তারিখেও সেরকমই এসেছিল। অথচ ভাস্কর কোনওরকম আঁচ পায়নি যে ঠিক বারোদিন পরে কী হতে চলেছে।

    বুড়োটা কি এটারই আভাস দিয়েছিল? আসলে ওই বুড়োই যত নষ্টের গোড়া! অমৃতাকে দেখে ‘মা-লক্ষ্মী মা-লক্ষ্মী’ করে সে কী আদিখ্যেতা! কিম্বা এসবই হয়ত ভাস্করের ভুল! অমৃতা কারও সঙ্গেই থাকে না, সে একা। হতভাগা বুড়ো ওই কথাগুলো মাথায় না ঢোকালে আজ হয়তো সব আগের মতই থাকত।

    অবশ্য ভালোভাবে দেখলে বুড়োরই বা দোষ কোথায়? সে তো বারবার সাবধান করে দিচ্ছিল, বারণ করেছিল, ‘মা লক্ষ্মী, ওগুলো নিয়েন না। ও ভালো জিনিস নয়। ওতে ফল ভালো হবে না।’

    কে শোনে সে কথা? দুজনেই তখন নাছোড়বান্দা, বিশেষ করে অমৃতা।

    ভাস্করের চোখ আবার গিয়ে পড়ল সেন্টার টেবিলে। অমৃতার হাতের শেষ স্পর্শটুকু নিয়ে চারটে পোড়ামাটির হাতি শুঁড়ের আগায় একটা করে ঘট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর মাঝখানে একটা পদ্মফুল— সুপুরি কুঁদে কুঁদে করা। অমৃতাই ওভাবে সাজিয়েছিল।

    এমনিতে তো বাঁকুড়ার হস্তশিল্প বলতে সকলে কান-উঁচু ঘোড়াটাকেই বোঝে। তবে রসিকজনেরা জানেন যে হাতিও গঠনশৈলীর দিক দিয়ে অনন্য। তার মধ্যেও আবার গড়ন এবং অলঙ্করণে বাঁকুড়া ঘরানার ছাপ নিয়েও, টেবিলের এই চারটে হাতি একদমই আলাদা। আর সেইজন্যেই অমৃতা একেবারে ক্ষেপে উঠেছিল ওগুলো কেনার জন্যে।

    বুড়ো একদৃষ্টে ওর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল। তারপরে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মা লক্ষ্মী যদি কিছু না মনে করেন, আপনার নামটা বলবেন?’

    অমৃতা নিজের নাম বলতেই বুড়ো কেমন চমকে গিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। মাথা নিচু, কেবল চুলের মধ্যে আঙুল চলছে।

    তারপর বলেছিল, ‘মা লক্ষ্মীর নামে আপনার নাম। তাই বলছি মাগো এদের ঘরে তোলেন না। আপনাদের ভালো হবে না।’

    হুঁঃ! মা লক্ষ্মী! অমৃতা যদি লক্ষ্মীর আরেক নাম হয়, তাহলে ভাস্করও তো বিষ্ণুর আরেক নাম। তাহলে ভাস্করকে ছেড়ে চলে গেল কেন?

    অন্য একটা কথা মনে আসতেই ও পাথর হয়ে গেল। শুধুই কি ভাস্কর? প্রদ্যুম্নও তো বিষ্ণুর আরেক নাম। ওই এন.জি.ও-তেই একসঙ্গে কাজ করত। আরও তো অনেকেই ছিল তবু প্রদ্যুম্নর কথাই বেশি বলত অমৃতা, আর বলার সময়ে চোখ উজ্বল হয়ে উঠত। এমনকি নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার সময়ে দুচারবার প্রদ্যুম্নের সঙ্গে তুলনাও করেছিল। কে জানে বারোদিন পরে ওর পাশে হয়ত প্রদ্যুম্নই ছিল!

    ‘ভালো হবে না মানে? খারাপটা কী হবে?’ কিন্তু বুড়োর কথা শুনে সেদিন অমৃতা খিলখিল করে হেসেছিল।

    ‘আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে এরা?’ ভবিষ্যত বলার মত করে বলেছিল বুড়ো, ‘অন্য কোথাও টেনে নিয়ে যাবে!’

    ‘গেলে যাবে’ হি হি করে হেসেছিল অমৃতা, ‘ওই চারটে হাতি আমি নেবই।’

    ‘উনি যখন বারণ করছেন, ছেড়ে দাও না’ ভাস্কর একবার বলার চেষ্টা করেছিল। কেননা বুড়োর কথাগুলো ওর ভালো লাগছিল না। বলার ভঙ্গি দেখে কেমন একটা আনক্যানি অনুভূতি হচ্ছিল। যদিও এখন আর ওসবে কিচ্ছু আসে যায় না। এমনকি সেই বুড়োটাও যদি এখন ঘরের মধ্যে হঠাৎ—

    বাইরের গেটটা কেউ খুলছে মনে হচ্ছে, না? কিন্তু এই সন্ধে সাড়ে ছটায়, যখন দিবাকর বিদায় নিতে চলেছেন, তখন কে আসবে? অফিস কলীগদের বাইরে অন্য কাউকেই তো ও চেনে না। আর, সকাল থেকে যেহেতু কলীগদের সঙ্গেই ছিল কাজেই ওরাও কেউ এখন আসবে না। তাহলে কে এল? মজিদ নাকি? ইতিমধ্যে চটির শব্দ বারান্দা ছাড়িয়ে ওর ড্রইং রুমের দরজায় এসে থেমেছে।

    আগে হলে ওইটুকু শব্দেই ভাস্কর উঠে যেত দরজা খুলতে। কিন্তু এখন অলস বসে রইল। যে এসেছে আসুক, বেলটা দিক, তারপরে ও উঠবে। কিন্তু কেউই বেল দিল না, তার বদলে ক্যাঁ-অ্যা-অ্যাচ। দরজাটা আপনা থেকেই খুলে গেল। চমকে তাকাল ভাস্কর, কিন্তু দরজার সামনে কাউকেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল না। বাতাস বুঝি হবে।

    তারপরেই ভাস্কর অনুভব করল একটা মৃদু সুগন্ধে ভরে উঠছে ঘরটা। ধূপ বা ধুনোর মত সময় নিয়ে আস্তে আস্তে নয়, বরং সুগন্ধী মেখে কেউ ঘরে এলে যেমন হঠাৎ করেই বাতাস ভরে ওঠে সৌরভে, সেরকমভাবে গন্ধটা জেগে উঠল। কেউ যেন খুব সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে ওর পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছে। তাকে চোখে দেখতে না পেলেও প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে ভাস্কর তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটা রোম খাড়া হয়ে গেল ওর। যেমন ছিল, তেমনই দাঁড়িয়ে রইল ভাস্কর।

    এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কাটল, কিন্তু ভেতরে তো বটেই বাইরেও আর কোনও শব্দ নেই। আসলে দীর্ঘদিন পরে এই বাড়িতে এসেছে, তায় এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনও অমৃতার ঘ্রাণ মনটাকে এমনিই বিষণ্ণ করে দিয়েছে, তার ওপরে বাড়িও একদমই ফাঁকা। কাজেই নিজের কল্পনাই নিজেকে ভয় দেখাচ্ছে। অস্বস্তি কাটানোর জন্যে ও উঠে একবার চারপাশ দেখল।

    স্বাভাবিকভাবেই কোথাও জনমানব নেই। আসানসোল এমনিতে খুব ঘিঞ্জি জায়গা হলেও একটু ভেতর দিকে যেখানে ও বাড়িটা পেয়েছে, সেটা অনেকটাই শান্ত, ফাঁকা ফাঁকা। বাড়ির সঙ্গে একফালি জমিও রয়েছে পেছনে। তার পরে পাঁচিল। পাঁচিলের ওপারে আবার অন্য বাড়ি। কিন্তু তারও বাড়ির লাগোয়া জমি এইদিকেই। ফলে দুটো বাড়ির মধ্যে ব্যবধান যথেষ্ট।

    এই ফাঁকা জমিতে বেশ কিছু গাছ লাগিয়ে অমৃতা বাগান সাজিয়েছিল। ভাস্করের দায়িত্ব ছিল পরিচর্যা করার। গত পাঁচমাসে সেই বাগান আগাছায় ঢেকে গিয়েছে। পেঁপেগাছের শুকনো কঙ্কালটা দাঁড়িয়ে রয়েছে কেবল। আর পেয়ারা গাছের নিচে একগাদা পালকে ঢাকা কী একটা পাখির কাঠামো। বেড়াল টেড়ালে খেয়েছে বোধ হয়।

    ও মনে মনে নিজেকে ঝাঁকুনি দিয়ে ফিরিয়ে আনল বাস্তবে। সারাক্ষণ অমৃতাকে আঁকড়ে থাকলে তো কোনও কাজই করা যাবে না। অমৃতা এখন আর ওর জীবনের অংশ নয়।

    দুপুরে অফিস ক্যান্টিনেই খেয়েছে। আসার সময়ে সেখান থেকে ডাল আর আলুভাজা নিয়ে এসেছে। আর কিছু ছিল না। যাই হোক, ভাতটা করে নিলেই হবে। ফ্রীজ খুলে দেখল ঘি-এর কৌটোতে এখনও ঘি রয়েছে, তবে একদম জমাট। শিশি বের করে টেবিলে রাখল। পরে গলিয়ে নেবে ’খন।

    রান্নাঘরে এসে কৌটোগুলো নেড়ে নেড়ে দেখে চাল খুঁজল। এতদিনের অব্যবহারে চালে পোকা ধরে গিয়েছে। আর আলু পেঁয়াজগুলো বাইরে পড়েছিল, সেগুলো সব গেছে। সেসব ডাস্টবীনে ফেলে, মাপমত চাল নিয়ে বারবার ধুয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে ইনডাকশন কুকারে টাইমার দিয়ে চান করতে চলে গেল।

    কিন্তু ঠান্ডা জল গায়ে পড়তেই অন্যমনস্কভাবেই ফিরে গেল মার্চ মাসে। দুটো ইন্টারন্যাশানাল সেমিনার ছিল অমৃতার, একটা কুয়ালালামপুরে, অন্যটা বেজিং। অবাঞ্ছিত অতিথির মত পুরোনো স্মৃতি ওকে সব মনে করিয়ে দিচ্ছিল। অমৃতা কিছু না বললেও ও জেনে গিয়েছিল যে প্রদ্যুম্নও যাচ্ছে পেপার নিয়ে।

    একই এন-জি-ওর সঙ্গে জড়িত দুজনে, কাজেই প্রদ্যুম্নেরও সেমিনারে না যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু সেটা অমৃতা ওকে জানাল না কেন? অজান্তেই ওর মাথায় দৃশ্য জন্ম নিল। ফ্লাইটে অমৃতা আর প্রদ্যুম্ন পাশাপাশি। অমৃতার চোখ বুজে আসছে ক্লান্তিতে। ক্রমশ মাথাটা হেলিয়ে দিল প্রদ্যুম্নের কাঁধে। প্রদ্যুম্নেরও হাত কি বেষ্টন করে নিচ্ছে ওকে? অমৃতা একবার তাকাল প্রদ্যুম্নের দিকে। দুজনেরই চাউনিতে কি আমন্ত্রণ ছিল? রুম শেয়ার করত দুজনে? নইলে ভাস্করকে ছেড়ে যাবার কী কারণ থাকতে পারে?

    কতক্ষণ শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে বহিঃধারা আর অন্তঃধারায় ভিজে যাচ্ছিল ভাস্কর খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরল বাথরুমের দরজায় টুকটুক শব্দে।

    ‘কীগো কত দেরি হবে?’

    ‘আসছি’ বলে সাড়া দিয়েই ভাস্কর চমকে উঠল।

    কে ডাকল? কাকে সাড়া দিল ও? কোনওরকমে টাওয়েলটা কোমরে জড়িয়ে দরজা খুলে উঁকি মারল। কিন্তু কোথায় কী? খাঁ খাঁ করছে গোটা বাড়ি। সামনেই ডাইনিং স্পেসে আলো জ্বলছে কেবল, বাকি ঘর অন্ধকার। অথচ স্পষ্ট শুনল যেন কেউ ডাকছে! দরজায় টোকাটাও কি মনের ভুল? কিন্তু তাছাড়া আর কীই বা হবে?

    আলনা থেকে পোশাক নিয়ে গায়ে চড়াতে চড়াতে ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল ওর এবং আবারও অবাক হয়ে গেল। সাড়ে সাতটা? মাই গড! কতক্ষণ ধরে চান করেছে ও? যখন চানে ঢুকেছিল, তখনও বাইরে দিনের হালকা আলো। ইতিমধ্যে যে অন্ধকার গাঢ় হয়ে গিয়েছে টেরই পায়নি। কিন্তু ডাইনিং স্পেসে আলোটা জ্বালল কে? নিজেই জ্বেলে ভুলে গিয়েছে? এতখানি ভুল হওয়ার তো কথা নয়। গা ছমছম করছিল যদিও কিন্তু ভাস্কর আমল দিল না। কেননা ফাঁকা বাড়িতে একবার ভয় পেতে থাকলে সেটা আরও চেপে বসবে।

    বেডরুমে ঢুকতেই দেখতে পেল খাটের ওপরে একখানা স্পাইরাল বাউন্ড বইয়ের মত কিছু। তুলে দেখল অমৃতা যে পেপারটা প্রেজেন্ট করতে গিয়েছিল সেটার খসড়া। পেন দিয়ে অজস্র কাটাকুটি করে রেখেছে। পাতা ওল্টাচ্ছিল ভাস্কর শুধুমাত্র অমৃতার হাতের লেখা দেখার জন্যে। আর সেই দেখতে গিয়ে যে চোখের কোণে ইতিমধ্যে জল জমতে শুরু করে দিয়েছে, সেটা খেয়াল না করেই ও পাতা ওল্টাতে থাকল।

    অমৃতার অভ্যেস ছিল সিরিয়াস লেখা লিখতে লিখতেও মার্জিনে বা কোনায় আঁকিবুঁকি করা। সেরকমই লিখে রেখেছে, আমার স্বপ্নস্বরূপ বাহির হয়ে এল, সে যে সঙ্গ পেল আমার স্বপ্নদোসর সাথে… ফাল্গুনে বিকশিত একাদশী রাতে, কৃষ্ণপক্ষে তাকে মহারাত বলে।

    অনেকক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে রইল ভাস্কর। কে ওর স্বপ্নস্বরূপ? স্বপ্নদোসরই বা কে? প্রদ্যুম্ন না অন্য কেউ? একাদশী, মহারাত এইসব তিথি নক্ষত্র কোত্থেকে জানল ও। মহারাত মানে কী? আচমকা ওর মাথায় ঝিলিক দিল, সেই বুড়োটা এই কথাগুলো বলেছিল না? সেই যখন অমৃতা বাইরের দাওয়ায় বসে আর ভাস্কর ভেতরের ঘরে সেই মূর্তিটাকে দেখছে। তখনই বুড়ো পাশ থেকে বকে যাচ্ছিল। সব কথা না শুনলেও এটা কোনওভাবে মাথায় থেকে গিয়েছিল।

    ঠিক, ঠিক। এবার মনে পড়ছে যে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী রাত্তিরকে নাকি বলা হয় মহারাত্রি। সেইদিন যেন কীসব কীসব হয়। ঠিকঠাক মনে পড়ছে না, তবে কারও যেন আবির্ভাব তিথি।

    বুড়োটা বারবার হাতি চারটে নিতে বারণ করছিল, ‘মা লক্ষ্মীর নামে আপনার নাম। তাই আপনি চাইলে আমি ‘না’ বলতে পারব না, কিন্তু আমার কথাটা শোনেন, ও জিনিস নিয়েন না। আপনাদের সংসার থাকবে না।’

    ‘যদি নাই নেব, তাহলে তুমি তৈরি করেছ কেন?’ অমৃতা হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করেছিল।

    ‘অন্য লোককে বেচব বলে’ বুড়োর নিপাট উত্তর, ‘ওটা আপনার জন্যে নয়। ওটা নিলে আপনাদের ক্ষতি হয়ে যাবে।’

    ‘অন্য লোক নিলে তাদের কিছু হবে না বুঝি?’ অমৃতা হাসছিল, ‘তাদের সংসার ঠিক থাকবে?’

    নির্বিকারভাবে মাথা নেড়েছিল সে, ‘অন্য লোকের কিছু হবে না। আসলে সব জিনিস সবাইকার নয়। আপনার যেটা সহ্য হবে, সেটা আবার অন্য লোকের সহ্য হবে না।’

    ‘তার মানে আপনি বেচবেন না? তাই তো?’

    আঁতকে উঠেছিল বুড়ো, ‘মা, আপনাদের কৃপায় এখনও ভাতটা ডালটা জুটে যাচ্ছে। খদ্দেরকে কখনও বলতে পারি, যে বেচব না? আর আপনাকে ফিরিয়ে দিলে তো স্বয়ং মা লক্ষ্মীকেই ফিরিয়ে দেওয়া হল। আপনি চাইলে আমি দিতে বাধ্য। কিন্তু তবুও বলছি, ভেবে দেখেন!’

    প্রথমে অমৃতার মতই জেদ ধরে থাকলেও, ওর হেঁয়ালিমার্কা কথা শুনে শেষে একসময়ে ভাস্করও বলে উঠেছিল— ‘যখন বারণ করছেন, ছেড়েই দাও না।’

    অমৃতা অদ্ভুতভাবে দেখল ভাস্করকে। তারপরে বলল, ‘ডিজাইনটা লক্ষ করেছ? এই যে এতগুলো জায়গা ঘোরা হল, এরকম আর কোথাও চোখে পড়েছে তোমার?’

    সেটা অবশ্য পড়েনি। বাঁকুড়ার টেরাকোটার হাতির গায়ে যে ধরণের অলঙ্করণের কাজ থাকে, একদম সেরকমই কাজ, গড়নটাও সেরকমই। কিন্তু শুঁড়ে উল্টোনো-ঘট ধরা এরকম হাতি এই প্রথম দেখছে।

    ‘তাহলে?’ একটা হাসি দিয়ে অমৃতা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল বুড়োর দিকে, ওটা ওর চাইই। বাড়ি ফিরে এসে টেবিলের মধ্যিখানে পদ্মফুলটা রেখে চারকোণে চারটে হাতি এমনভাবে রেখেছিল যেন ওরা পদ্মটার মাথায় জল ঢালছে।

    নিজের হাতে সাজানো ঘরসংসার ছেড়ে ও তাহলে শেষ অবধি চলেই গেল? একসঙ্গে আর থাকতে পারল না? বাড়ি ছেড়ে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখনও অবধি ভাস্কর কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। বুঝলে তো আটকে রাখতই। অবশ্য…

    অবশ্য পারত কি? সেই বুড়োটা কীসব বলেছিল না? বারবার বুড়োটা ফিরে আসছিল ওর মাথায় এবং ভাস্কর তত ক্ষেপে উঠছিল। যদি দেখা না হত বুড়োটার সঙ্গে? যদি আদৌ না যেত ওর ওখানে? অবশ্য কী হলে কী হতে পারত ভেবে তো লাভ নেই। অমৃতাকে ও আটকে রাখতে পারেনি এটাই সবচেয়ে বড় সত্যি।

    এমনকি নিজেকেও আটকে রাখতে পারেনি। পাগলের মত খোঁজ করে বেরিয়েছে অমৃতার। কিন্তু ‘নো নিউজ’ বলে পুলিশ হাত তুলে নিয়েছে। ভরসা ছিল মিডিয়া। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমে তারা তো পুলিশের চেয়েও বেশি দড়। কিন্তু তারাও কোনও হদিশ দিতে পারেনি। অন্য কোনও জায়গা হলে এদ্দিন ছুটি নিয়ে পড়ে থাকার জন্যে হয়তো চাকরি নিয়েই টানাটানি হত, কিন্তু ওদের ইউনিটে প্রত্যেকে যেভাবে অন্যজনের পাশে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যিনি সর্বময় কর্তা তিনি যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেটা বলার নয়। কাজেই ওর কোনও অসুবিধে হয়নি।

    ভাস্কর সম্মোহিতের মত ফিরে এল ড্রইং রুমে। হাঁটু গেড়ে টেবিলটার সামনে বসে একটা হাতি তুলে নিল হাতে। বহুদিন ধরে এক জায়গায় সেই একইভাবে রয়েছে। ঘরদোর সাফ করলেও মজিদ তো আর এগুলো পরিষ্কার করেনি। ভাগ্যিস! সেইজন্যেই এখনও অমৃতার স্পর্শ লেগে আছে ওতে। চোখ বন্ধ করে হাতিটার গায়ে চুমু খেল ভাস্কর। সেই চুম্বন যেন আকাশের মধ্যে দিয়ে উড়ে গেল অমৃতার ঠোঁটে। আশ্লেষে গালে বোলাল ভাস্কর। সেখানে একটা চিটচিটে অনুভূতি। কী লেগে রয়েছে কে জানে!

    পর্যায়ক্রমে চারটে হাতিকেই আদর করার পরে ভাস্কর তুলে নিল পদ্মফুলটাকে। কেউই বুঝতে পারবে না যে একটা বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে সুপুরি কুঁদে কুঁদে ওটা তৈরি করেছে। পদ্মফুলটা তুলে নিয়েও চুমু খেল। অমনি মুখে একটা মিষ্টি স্বাদ, ঠিক যেন অমৃতার ওষ্ঠ। অনেকক্ষণ সেই মিষ্টি স্বাদটা ধরে রাখল ঠোঁটে আর জিভের ডগায়।

    অদ্ভুত ব্যাপার যে হঠাৎই গোটা ঘর আবার ভরে উঠল সেই মেয়েলি সুগন্ধে। আর ডাইনিং স্পেসের দিক থেকে গন্ধটা এমনভাবেই এসে ভাস্করের নাকে লাগল, যেন সেই মেয়েটা ভেতর থেকে ডাইনিং স্পেস পার হয়ে এই ঘরে ভাস্করের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এতটাই নিশ্চিত তার উপস্থিতি যে আপনা থেকেই চোখ খুলে গেল ভাস্করের।

    আর ওর সামনে ফাঁকা ঘরের সাদা দেওয়াল হা হা করে উঠল। কিন্তু ভাস্করের কপালে রেখা দেখা দিল। দেওয়ালে খুব হালকা একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে, না? মানে, কোনও জিনিসের ওপরে চারপাশ থেকে আলো পড়লে যেরকম হালকা ছায়া পড়ে, একদম সেরকম। ওর নিজের ছায়া নয়, কেননা যে দেওয়ালে ছায়া আলোটা সেই দেওয়ালেই। ওর নিজের ছায়া হলে উল্টোদিকে পড়ার কথা। থাকতে না পেরে ভাস্কর পেছনে ফিরল। কিন্তু ওদিকে তো কেউ নেই এবং…। এবং ভাস্কর অবাক হয়ে দেখল ওর নিজের কোনও ছায়া পেছনের দেওয়ালে নেই।

    অদ্ভুতভাবে একটু পরে গন্ধটা মিলিয়ে গেল, সেইসঙ্গে দেওয়ালের ছায়াটাও।

    ভাস্করের তখন বুক ঢিবঢিব করছে। এতদিন পরে একদম একলা এই বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করাটাই ঠিক হয়নি। পাঁচ মাস ধরে ফাঁকা বাড়িতে কেবল ওই হাতি আর পদ্মফুল। ওগুলো নাকি ভাল নয়, ক্ষতি করে দিতে পারে। অমৃতার সঙ্গে বিচ্ছেদটা বিরাট একটা ক্ষতি তো বটেই। কিন্তু তার বাইরেও এমন কিছু ঘটছে যার ব্যাখ্যা ভাস্করের কাছে নেই।

    ওর অনুভূতি এতটা ভুল করতে পারে না। আরেকজন কেউও যে এই বাড়িতে আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অমৃতার গলা নকল করে বাথরুমের দরজাতেও সে-ই নক করেছিল। বাড়িতে আসার পরে তো বটেই এখনও তার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে ভাস্কর। ওই সুগন্ধের উৎসও সে।

    সুগন্ধটা ক্রমশ ওকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই পাঁচমুড়ো গ্রামে, যেখানে টেরাকোটার জিনিস তৈরি হয়। ফেব্রুয়ারিতে শেষবারের মত দুজনে ঘুরতে গিয়েছিল।

    পাঁচমুড়োয় যতই ঘুরুক না কেন, একটা কিছুও অমৃতার পছন্দ হচ্ছিল না। না পছন্দ হবার মূল কারণ অবশ্য যে ও নিজেই জানে না ঠিক কী খুঁজছে। নিজের জন্যে পোড়ামাটির গয়না নাকি ঘর সাজানোর জন্যে কোনও কিছু।

    গ্রামের যতগুলো বাড়িতে পোড়ামাটির কাজ হয়, তার প্রত্যেকটাই ঘোরা হয়ে গিয়েছে। কলকাতা থেকে এসেছে শুনে তারা যাবতীয় শিল্পসামগ্রী উজাড় করে দিয়েছে। অথচ কানের দুল থেকে গলার হার, ফুলদানি আর কাপ প্লেট, গণেশ বা দুর্গামূর্তি একটাও ওর চোখে ধরেনি।

    ইতিমধ্যে মাথার ওপরে রোদ প্রখর হয়েছে, জলতেষ্টা পাচ্ছে। সময়টা শেষ ফেব্রুয়ারি হলেও গরমটা ভালোমতই লাগছে গায়ে। কাঁহাতক আর এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি ঘুরে ঘুরে বেড়ানো যায়? মনে মনে বিরক্ত হলেও ভাস্কর মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিল না।

    শেষ অবধি বেরিয়ে এসে অমৃতা বলল, ‘দুর চলো। একটাও ভালো লাগছে না। এর চেয়ে বিষ্ণুপুরে খুঁজলে হয়তো কাজ দিত।’

    ব্যাজার মুখে ভাস্কর বলল, ‘লাভ নেই। পাঁচমুড়ার কাজ যখন তোমার পছন্দ নয়, তখন সারা পৃথিবীর কোনও কাজই তোমার ভালো লাগবে না।’

    ওর কথা শুনে অমৃতা হেসে উঠল, ‘আচ্ছা আমি কি একটু বেশিই খুঁতখুঁতে?’

    অমৃতার তাকানো আর বলার ভঙ্গিতে ভাস্করের নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। কোনও কথা না বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করল ড্রাইভারকে ডাকার জন্যে।

    আর সেইসময়ে ঠিক সামনে কেউ বলে উঠল, ‘ও দিদি! সকলের বাড়িতে তো গেলে। আমাদের বাড়ি আসবে না?’

    ওরা চমকে তাকিয়ে দেখল, একটা মিষ্টি দেখতে বাচ্চা ছেলে। কখন ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে কে জানে! চোখদুটো টানা টানা, টুকটুক করছে গায়ের রং। মুখখানা এত মিষ্টি যে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।

    অমৃতা ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘নিশ্চয় যাব তোদের বাড়ি। কী আছে রে সেখানে?’

    ‘পুতুল আছে গো। আমার দাদু বানাইছে,’ মিষ্টি একটা টানে ছেলেটা বলল।

    ‘হ্যাই যা তো এখেন থেকে, জ্বালাইস না’ বাচ্চাটাকে দেখে একটা বউ ঝঙ্কার দিয়ে উঠল।

    বাচ্চাটা কেমন থতমত খেয়ে গেছে। আর ততক্ষণে বউটা অমৃতার দিকে ফিরে বলছে, ‘ওদের বাড়ি যেইও না গো দিদি। ওর দাদুটা ভালো নয়।’

    ‘কেন?’ অমৃতা প্রতিবাদের ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘এরকমভাবে বলছ কেন?’

    ‘ওর দাদু ক্ষতি করে গো’ আরেকটা বউ বলল।

    কয়েক মুহূর্তের জন্যে বর্তমানে ফিরে আসতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভাস্করের বুক থেকে। সেদিন ওই বউদুটোর কথায় কান দেয়নি। ভেবে নিয়েছিল যে প্রফেশনাল জেলাসি। যেহেতু ওদের কাছ থেকে কিছু কেনা হয়নি, তাই বাচ্চাটার বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত করার চেষ্টা।

    অমৃতা তাকিয়েছিল ভাস্করের দিকে, ‘কী করব? যাব ওদের বাড়ি?’

    ‘তোমার যা ইচ্ছে’ উদাসভাবে ভাস্কর উত্তর দিয়েছিল।

    ‘তুমি রাগ করলে যাব না।’

    ভাস্কর উত্তর দেয়নি। কাজেই আবার প্রশ্ন, রাগ করেছ?’

    মাথা নেড়েছিল ভাস্কর, ‘না।’

    ‘তাহলে যাই?’

    ‘চলো’ বলে ভাস্কর এগোতে ইশারা করেছিল এবং সম্ভবত তখনই ওদের বিচ্ছেদের গল্প লেখা শুরু হয়েছিল। কেননা তারপরেই বাচ্চাটার কান বাঁচিয়ে ভাস্কর বলেছিল, ‘অনেক আশা করে নিয়ে যাচ্ছে। পছন্দ হোক না হোক কিছু একটা কিনো কিন্তু। নইলে মানসম্মান থাকবে না।’

    কিছু না বলে অমৃতা মুখ টিপে হাসল কেবল।

    অনেকটা হাঁটতে হল ছেলেটার সঙ্গে। গ্রামের বাইরে ফাঁকা মাঠের মধ্যে গাছপালার আড়ালে বাড়িটা। উঠোনে পা রেখেই ভাস্করের মনে হল জায়গাটা যেন একটু অন্যরকম। উঠোন ভর্তি কাঁচা মাটির পুতুল সাজানো। সবে রোদ্দুরে শুকোচ্ছে, এখনও চুল্লীতে পোড়ানো বাকি। যে কোনও শিল্পীর বাড়ির সঙ্গে তফাৎ নেই। তবুও অন্য একটা কিছু যেন মিশে রয়েছে বাতাসে। ভাস্করের ষষ্ঠেন্দ্রিয় বারবার খোঁচাচ্ছিল, ওখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে।

    সেদিক থেকে মন সরিয়ে ভাস্কর তাকিয়েছিল পুতুলগুলোর দিকে। প্রত্যেকটাই যেন ভীষণ রকমের জীবন্ত। ওই যে ছোট্ট কুকুরটা রোদ্দুরে শুকোচ্ছে, সে যেন যে কোনও মুহূর্তে ভাস্করের সামনে এসে ল্যাজ নাড়বে। ওই যে পায়রাটা, তার ডানার ফরফর শুনতে পাচ্ছিল ভাস্কর। তাকিয়ে দেখল অমৃতার মুখচোখে খুশি উপছে পড়ছে।

    ‘ওয়াও, এরকমই কিছু একটা খুঁজছিলাম’ বলে অমৃতা তাকাল ছেলেটার দিকে, ‘কীরে তোর দাদু কোথায়?’

    ‘আসতিছে’ বলে ছেলেটা দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল।

    উঠোনে শুধু ওরা দুজন। কোনও কারণ নেই তবুও ভাস্করের হঠাৎই গা-টা কেমন যেন ছমছম করছিল। বাড়িটা যেন কেমনধারা! কোথাও কোনও লোকজনের সাড়া শব্দ নেই। সারা বাড়িতে আর কেউ নেই নাকি? বাচ্চাটার মা বাবা-ই বা কোথায়? সারা উঠোন জুড়ে কেবল পুতুল আর পুতুলই সার।

    এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে নজরে এল একটা দেবীমূর্তি। কোন ঠাকুর কে জানে, এখনও শেষ হয়নি। তবে এত সুন্দর যে কাঁচা অবস্থাতেই চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। তাহলে যখন সম্পূর্ণ হবে, তখন কী অপূর্বই না লাগবে! মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল ভাস্কর এবং আচমকা অনুভব করল যে সেই মূর্তিও পাল্টা ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখ থেকে নিজের চোখ সরাতে পারছে না ভাস্কর। ঠিক যেন একজন জীবন্ত মেয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।

    ক্রমশ ভাস্করের মনে হতে থাকল শুধু এই দেবীই নয়, একইরকম ভাবে পেছন থেকেও কেউ যেন ওর ওপরে নজর পেতে রেখেছে। অলক্ষ্য দুটো চোখ যেন সব দৃশ্য ফেলে শুধু ওকেই দেখে যাচ্ছে। ঘাড় না ফিরিয়েও তার জ্বলজ্বলে চোখদুটো স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল ভাস্কর। শেষে অস্বস্তির চোটে পেছনে ঘাড় না ঘুরিয়ে পারল না।

    কিন্তু কোথায় কী? পেছনে কেবল বাড়িটার নিরেট দেওয়ালের একটা অংশ। আর দাওয়া। সেইসঙ্গে লাগোয়া ঘর। দাওয়াতেও খবরকাগজ পেতে তার ওপরে অনেকগুলো হার, কানের দুল এইরকম বেশ কিছু ছোট ছোট সামগ্রী শুকোচ্ছে। আর দাওয়ার একটা ধারে বসে অমৃতা নিরীক্ষণ করে চলেছে সেগুলো।

    কিন্তু বাচ্চাটা কোথায়? ত্রিসীমানায় তো তার চিহ্ন নেই। সে কোথায় দাদুকে ডাকতে গেল? আচমকাই একটা তীব্র সুগন্ধ নাকে এসে লাগল আর পরমুহূর্তে ঘাড়ে কারও গরম নিঃশ্বাস পড়ল। চমকে পেছন ফিরল ভাস্কর এবং শিরদাঁড়া বরাবর খুব ঠান্ডা কিছু একটা নেমে গেল। লোকটা কে?

    একটা জীর্ণ শীর্ণ বুড়ো লোক প্রায় ঘাড়ের ওপরে উঠে এসে ওকে নমস্কার করছে। লোকটা হঠাৎ কোত্থেকে আর কীভাবেই বা উদয় হল?

    ঘরের ভেতর থেকে যে আসেনি, সে বিষয়ে ভাস্কর নিশ্চিত, কেননা সেইদিকে মুখ করেই তো ও দাঁড়িয়েছিল। আর উঠোনটা এত বড় যে ওই প্রান্ত থেকে কেউ এলেও এত তাড়াতাড়ি এবং এত নিঃশব্দে এসে পড়তে পারবে না। ঘরের দিক থেকে উঠোনে চোখ ফেরাতে যতটুকু সময় লাগে, তার মধ্যেই লোকটা একদম ঘাড়ের ওপরে উঠে এল কী করে?

    ভাস্করের চোখে পড়ল বুড়োটার পায়ের কাছে সেই দেবীমূর্তিটা ভেঙে পড়ে রয়েছে। এই তো ওটাকে দেখছিল ভাস্কর। এর মধ্যে ভেঙেই বা গেল কী করে?

    লোকটার হাতে পায়ে যেভাবে মাটি লেগে রয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সে যেন ওই মূর্তিটাকে ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। মনে হতেই ভাস্করের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আর তারপর চোখের সামনে কয়েক মুহূর্তের জন্যে সব অন্ধকার। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়ে দেখল লোকটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবার ওকে নমস্কার করছে।

    ‘আসেন বাবুরা, ভেতরে আসেন, আসেন মা লক্ষ্মী’ খুবই বিনীতভাবে বলছে বটে তবে ওর ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা যেন কেমন অদ্ভুতধরনের। ওভাবে কি কেউ হাসে নাকি?

    অথচ অমৃতার কোনও বিকার নেই। দিব্যি বসে বসেই জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাতি নিয়ে এল। বলল আপনি নাকি খুব সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করেন?’

    ‘দেখুন আজ্ঞে’ বলে বুড়ো ওদের দাওয়ায় খুবই যত্ন করে বসাল। ভেতর থেকে দুটো বড় বড় পোঁটলা নিয়ে এসে খুলতেই পোড়ামাটির গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, হাতি, ঘোড়া সব এক এক করে আত্মপ্রকাশ করতে থাকল।

    এতক্ষণে চোখ ধাঁধিয়ে গেল ওদের দুজনের। অমৃতা উত্তেজনায় বলে উঠল, ‘ওফফ রিয়েলি মা-আ-ইন্ড বগলিং। এরকমই কিছু খুঁজছিলাম এতক্ষণ।’

    ও নেড়েচেড়ে যখন দেখছে তখন লোকটা ভাস্করের দিকে তাকিয়ে সেই অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল, ‘ভেতরের ঘরে আরও আছে। আসেন, দেখেন।’

    উঠোনের সেই দেবীমূর্তির একদম অবিকল একটা প্রতিমূর্তি ভেতরের ঘরেও। সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চোখদুটো ভীষণ জীবন্ত এবং এমনভাবেই তাকিয়ে রয়েছেন যে ভাস্কর থাকতে না পেরে দরজা দিয়ে উঁকি মারল। ওই দেওয়ালটার ঠিক পেছনেই সেই উঠোন যেখানে ও পেছন থেকে কারও দৃষ্টি অনুভব করেছিল। বাড়িতে যখন আর কেউ নেই তাহলে ধরে নিতে হয় ইনিই দেওয়াল ভেদ করে ওকে লক্ষ করছিলেন।

    পাশ থেকে ওই বুড়ো মূর্তিটার সম্বন্ধে অনেককিছু ভ্যাজভ্যাজ করে যাচ্ছিল, ওর কানে ঢোকেনি। শুধু একবার কানে এসেছিল, ‘আসলে মাটি থেকেই তো সব। তিনি যখন —’

    ‘এই শুনছ, দেখবে এসো’ অমৃতা তখনই বাইরে থেকে ডেকেছিল, ‘এই হাতি চারটে দ্যাখো। এটা কিন্তু নিচ্ছি।’

    ‘ওটা নিয়েন না মা’ বুড়োও যে বেরিয়ে এসেছে ওরা লক্ষ করেনি।

    তারপর যখন বুড়োর সঙ্গে হাতি কেনা, না-কেনা নিয়ে তর্ক হচ্ছে, তখনই সেই বাচ্চাটা লাফাতে লাফাতে এসেছিল।

    ‘এই দ্যাখো, আমি বানিয়েছি।’

    সুপুরি কুঁদে কুঁদে তৈরি করা পদ্মফুলটা সঙ্গে সঙ্গে দুজনেরই পছন্দ হয়ে গেল। ভেতরে যেখান থেকে পাপড়িগুলো উঠেছে সেখানে আবার কী একটা লেখা।

    ‘এটা কী লিখেছিস রে?’ অমৃতা হালকা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল।

    ‘মন্ত্র’ বাচ্চাটা বলল, ‘পদ্মের ওপরে তো ঠাকুর থাকে, তাই মন্ত্র লিখে দিয়েছি।’

    ওইটুকু বাচ্চার পক্ষে আগে মন্ত্র লিখে তারপর সেখান থেকে পাপড়ি বের করা সত্যিই কৃতিত্বের কাজ।

    ‘এটা আমাকে দিবি?’

    অমৃতা বলতেই বাচ্চাটা বলেছিল, ‘কুড়ি টাকা।’

    আর ওর দাদু খেঁকিয়ে উঠে ওকে সরিয়ে দিতে চাইল, ‘যা যা। মেলা দিক করিস না তো! মা এসেছেন, কোথায় যত্নআত্তি করবে, তা না একটা কী এনে কুড়ি টাকা দাও, তিরিশ টাকা দাও, চল্লিশ টাকা দাও। যত বায়না!’

    বুড়োটার ব্যবসায়িক সূক্ষ্মতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল অমৃতা। এত চমৎকারভাবে পদ্মফুলের দাম কুড়ি থেকে চল্লিশ টাকায় তুলে দিল যে তারিফ করতেই হয়। ভাস্করের সঙ্গে চোখাচোখি করে সামান্য হেসে ব্যাগ খুলে পঞ্চাশ টাকা বের করে দেয়। কিন্তু তাতেও বুড়োটার ঘোর আপত্তি ছিল। ওই পদ্মফুলেও নাকি বিপদের সঙ্কেত লুকোনো আছে। যদি ওই মন্ত্রটা না লেখা থাকত, তাহলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু ওই মন্ত্র লিখেই বিপদ করেছে ছোঁড়াটা।

    এতক্ষণ ধরে ওই একই ভ্যাজর ভ্যাজর শুনে বিরক্ত লাগছিল ভাস্করের। বাইরে খরখরে রোদ, দাওয়ায় বসে ওরা ঘামছে, বুড়োর কাছ থেকে জল চেয়েও তেষ্টা মেটেনি, এ হেন পরিবেশে ওই আজগুবি বকবক কোনও স্থায়ী দাগই কাটতে পারেনি।

    ফলে ও নিজেই বিরক্ত হয়ে বলেছিল—

    ‘দ্যাখো ভাতটা হয়ে গিয়েছে বোধ হয়!’

    চমকে উঠল ভাস্কর। কে বলল কথাটা? এই ঘরে দরজা বন্ধ, জানলাও খোলা হয়নি, তাহলে অন্য বাড়ি থেকে তো এত স্পষ্ট করে কথাটা ভেসে আসতে পারে না। আর সত্যিই তো ও ভাত বসিয়ে দিয়ে ভুলে গেছে। দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকল। আর ঢুকেই সেই অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ নাকে লাগল।

    সারা শরীর কেঁপে উঠল ভাস্করের। যদিও অটোমেটিক টাইম সেট করা ছিল বলে ইনডাকশন নিজের সময়মত বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ভাতের ডেকচি নামিয়ে পাশে রেখেছে কে? আবার অন্য একটা ডেকচিতে ফ্যানটা জমে রয়েছে, ঠিক যেভাবে অমৃতা ফ্যান ঝরানোর জন্যে ভাত নামিয়ে অন্য ডেকচিতে উপুড় করে বসিয়ে রাখত।

    স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভাস্কর। গোটা ঘরেই এখন সুগন্ধ। বুঝতে পারছে যে ওর পেছনে বেসিনের কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। নইলে ওখান থেকে হালকা জল পড়ার আওয়াজ কেন? পেছন ফিরলেই তাকে দেখতে পাবে ভাস্কর। কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ ভয় হল। অথচ কীসের যে ভয় ও বুঝতে পারল না।

    এমন ভয় যে কিছুতেই ভাস্কর মুখ ঘোরাতে পারল না। পেছন না ফিরলেও ওর বেশ মনে হতে থাকল ঠিক পেছনেই একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে— অমৃতা নয়, অন্য কেউ— কাতর চোখে সে ভাস্করের দিকে চেয়ে রয়েছে। ভাস্কর ওদিকে চাইলেই দেখতে পাবে। কিন্তু ভাস্কর কিছুতেই পেছনে ফিরবে না।

    খানিক বাদে ঠিক ওর পাশ দিয়েই গন্ধটা প্রবাহিত হয়ে মিলিয়ে গেল। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল ওর। কিন্তু গোটা ঘটনাটার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পেল না। কী হল এটা? ও কি নিজেই ভাতটা নামিয়ে ফ্যান ঝেড়ে রেখে ভুলে গিয়েছে? এতটা স্মৃতিভ্রংশ হবার কথা নয়। যদি সেটা হয়ও, তাহলেও ওই সুগন্ধটা কোথা থেকে আসছে? দেখতে না পেলেও আরেকজন কারও অস্তিত্ব ও অনুভব করতে পারছে। সে ওর সঙ্গে সঙ্গেই রয়েছে, ওর ওপরে লক্ষ্য রেখেছে।

    খেতে বসে ঘটল আরেকটা কাণ্ড। ডেকচি থেকে থালায় ভাত নিতে গিয়ে দেখল ভেতর থেকে দুটো সেদ্ধ আলু উঁকি মারছে। ও আবারও চমকে গেল। ভাতের মধ্যে হঠাৎ আলুসেদ্ধ কোত্থেকে এল? ও নিজে দিয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না। তাছাড়া দেবেই বা কী করে, বাইরে পড়ে থেকে থেকে তো আলু আর পেঁয়াজ দুইই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আবছা আবছা মনে হচ্ছে যেন ফ্রিজটা একবার খুলেছিল। তাহলে কি ফ্রিজে আরও আলু রাখা ছিল? যেখান থেকে নিয়ে ও ভাতে দিয়েছে? আর তারপর বেমালুম ভুলে গেছে?

    এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে অবস্থাটা এমনই দাঁড়াল যে ও আর থাকতে না পেরে উঠে আবার ফ্রিজ খুলল। ফ্রিজে একটা পেঁয়াজ আর দুটো টুকরো লেবু ছাড়া কিচ্ছু নেই। ফ্রিজের দরজা ধরে ভাস্কর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এবার? কী হল ব্যাপারটা?

    একটাই মাত্র সম্ভাবনা যে ফ্রিজ খুলে ভেতরে হয়তো মাত্র দুটো আলুই পেয়েছিল এবং অন্যমনস্কভাবেই সেই দুটোকে ভাতের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিল। তাছাড়া কিন্তু আর কোনও ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু সারাদিন অফিসে কিচ্ছুটি ভুলে যায়নি, আর বাড়ি এসেই সব ভুলে যাচ্ছে? ও যে ছিল না, সেই ফাঁকে কি বাড়িতে ভূতের আড্ডা হয়েছে নাকি?

    যাই হোক, ভাতে ঘি ঢেলে আলুসেদ্ধ মেখে মুখে কয়েক গ্রাস তোলার পরেই দ্বিতীয়বার ধাক্কা খেল ভাস্কর। এই যে বাটি থেকে ভাতে ঘি ঢালছে, সেই ঘি পেল কোত্থেকে? ফ্রিজ খুলে তো দেখেছিল যে শিশির ভেতরে ঘি-টা জমে রয়েছে। পরে গলাবে ভেবে শিশিটা বের করে টেবিলে রেখেছিল এই অবধি মনে পড়ছে। শিশিটা তো এখনও টেবিলে সেইভাবেই রাখা রয়েছে। কিন্তু তাহলে বাটিতে ঢেলে কখন গলিয়েছে ও? নাকি পুরোটাই অন্য কেউ করছে? সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল।

    এতটাই যে উঠে বেসিনের কাছে যেতেও ভয় করছিল। আরেকজন কেউ রয়েছে বাড়িতে, নাকি ও নিজে আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছে? আসলে কিচ্ছু নয়। অমৃতার চিন্তাগুলো এমনভাবে মাথায় চেপে বসেছে যে স্বাভাবিক কাজগুলোও করছে বেহুঁশের মত আর তারপরে সেগুলো দেখে ভয় পাচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। নিজের মনে বারবার বলল, ‘অমৃতা আমার কেউ নয়। ও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, কাজেই ও আমার কেউ নয়।

    রাত্তিরে হঠাৎ এক অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল ওর। তারপরেই টের পেল সারা ঘর আবার ম ম করছে সুগন্ধে। সেই রান্নাঘর থেকে মিলিয়ে যাবার পরে সারা বাড়িতে কিন্তু কোনও গন্ধ আর ছিল না। এমনকি শোবার আগে ভাস্কর সচেতনভাবেই কাজকর্মগুলো করেছে এবং কোনও গন্ধ টের পায়নি। তাহলে এখন আবার আসছে কোথা থেকে? ওর সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল।

    চোখ বন্ধ রেখেও আরেকজনের অস্তিত্ব ভালোভাবেই টের পাচ্ছে এখন। সে যেন খাটের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ওর দিকে দেখছে। চোখ খুললেই তাকে দেখতে পাবে ভাস্কর।

    প্রচন্ড জলতেষ্টা পাচ্ছে, একবার বাথরুমেও যাওয়া দরকার। কিন্তু চোখ খুললে কাকে দেখবে, কোন রূপে কী অবস্থায় দেখবে, সেই ভয়ে ভাস্কর উঠতে পারছিল না। বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবে থাকার পরে গন্ধটা মিলিয়ে গেল। আরও খানিক অপেক্ষা করে ভাস্কর চোখ খুলল। ঘরে কেউ নেই।

    এইবারে বাথরুমে যাবার জন্যে উঠল ভাস্কর। শোবার সময়ে নাইট বালব বা অন্য কোনও আলো জ্বালিয়ে রাখার অভ্যেস ওর কোনও কালেই নেই। সেই জন্যে সারা বাড়ি অন্ধকার। যদিও তাতে কিছু এসে যায় না, সব ওর মুখস্ত। তাছাড়া একটু আগের অভিজ্ঞতার জন্যে এখন গোটা শরীর সজাগ হয়ে রয়েছে।

    বেডরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং-এ পা রাখল ভাস্কর। এটা টপকেই বাথরুমে যেতে হবে। পাশেই জানলা খোলা রয়েছে। পোকামাকড়ের উপদ্রব হয় বলে প্রথম থেকেই নেট লাগান। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। কবে যেন সেই মহারাত? ওহো, সে তো ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণা একাদশীর দিন।

    বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর সেই সুগন্ধটা আবার নাকে এল ওর। চোখ তুলে তাকাল ভাস্কর এবং ডাইনিং টেবিলের দিকে নজর পড়তেই সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আতঙ্কে ও কাঠ হয়ে গিয়েছে। নড়াচড়া করতেও ভুলে গিয়েছে ও।

    ওখানে ওটা কে বসে?

    তার মধ্যে দিয়ে নরম জ্যোৎস্না এসে পড়েছে। আর টেবিলের সামনে একটা মেয়ে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তাকে, জানলার ধারে ডাইনিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। মাথাটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকিয়ে রাখা। ভাস্করের থেকে মাত্র ফুট দশেক দূরেই সে রয়েছে। গোটা ডাইনিং জুড়ে সুগন্ধ এবং গন্ধটা খুবই তীব্র এখন।

    ওর পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল, সারা দেহ কেমন অবশ হয়ে আসছে। গন্ধটা ছড়িয়ে রয়েছে সারা ঘরে। আলোটা যে জ্বালবে, সেই সুইচটাও তো অন্য পাশে। ওই অবধি পৌঁছোনোর আগেই হয়ত কিছু একটা ঘটে যাবে। বিদ্যুচ্চমকের মত মনে পড়ে গেল অমৃতা যেদিন ফাইনালি চলে যায়, সেটাও তো ছিল ফাল্গুন মাস। ভয়ের হিমেল স্রোত সারা শরীরে ওঠানামা করছে।

    যা থাকে কপালে ভেবে মরীয়া হয়ে ভাস্কর মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। এই ভয়ানক রহস্যের ভেদ করতেই হবে। কিন্তু সে একটুও নড়ল না, একইভাবে স্থির হয়ে বসে রইল।

    সামনে গিয়ে ভীষণভাবে কেঁপে উঠল ভাস্কর আর তারপরেই একটা স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে এল। উফফ! কী ভয়টাই না পেয়েছিল। সন্ধেবেলা চান করে ভিজে টাওয়েলটা চেয়ারের ওপর দিয়ে মেলে রেখেছিল। আর পাশেই জানলার নেটে তেরচা জ্যোৎস্নার আলো একটা অদ্ভুত শেপ তৈরি করেছে। দুইয়ে মিলে অবিকল একটা মেয়ের অবয়ব। কয়েকবার জোরে জোরে দম নিয়ে নিজেকে সামলে নিল ভাস্কর। সেই গন্ধটাও আর নেই। সত্যি লোকের চোখের কী ভুলই না হয়! নিজের মনেই হেসে ফেলল ভাস্কর। তারপর ফিরে এল বিছানায়।

    কিন্তু ঘুম একবার ভেঙে গেলে তো আর সহজে আসতে চায় না। বিশেষ করে এরকম একটা উত্তেজনার পরে। বরং নানা পুরোনো ছবি আর স্মৃতি ওর সঙ্গে গল্প শুরু করল। বেশ কাটছিল তাদের নিয়ে। এমন সময়ে হঠাৎই গন্ধটা আবার ফিরে এল ঘরে। আর তাতে ভর করেই যেন বুড়োর ঘরের সেই চতুর্ভূজা নারী এসে দাঁড়ালেন চোখের পাতায়।

    ওপরের দুহাতে দুটো পদ্মফুল, এমনকি বসেও রয়েছেন পদ্মেরই ওপরে। নিচের এক হাতে বরমুদ্রা অন্য হাতে অভয়মুদ্রা। চারটে কোণ থেকে চারটে হাতি শুঁড়ে হিরন্ময় ঘট তুলে ধরে তাঁকে অমৃতধারায় স্নান করিয়ে দিচ্ছে। দেবী কমলা।

    তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা কথা মনে হতে চমকে উঠে বসল ভাস্কর। মোবাইলে দেখল ভোর সাড়ে চারটে। বাইরে এখনও অন্ধকার যদিও পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। ভাস্কর কেমন ঘোরের মধ্যে হেঁটে গেল ড্রইং-রুমে।

    পদ্মফুলটা তুলে নিতেই বুঝল সুপুরিটা রসে গিয়েছে। জিভে আলতো করে ছোঁয়াতেই মিষ্টি স্বাদ। একটা হাতি তুলে নিয়ে তার ঘটের মুখে আলতো জিভ ছোঁয়াল— মিষ্টি। এটা কী করে সম্ভব? সমস্ত গুলিয়ে যাচ্ছে এখন। ওই বুড়ো কী একটা বলেছিল না? যে, হাতি নাকি মেঘবর্ষণের প্রতীক? সেইজন্যেই নাকি তারা অমৃতধারায় স্নান করিয়ে দিচ্ছে শষ্যের দেবীকে, যিনি কিনা একই সঙ্গে জ্ঞান বিজ্ঞানেরও বৃদ্ধি ঘটান!

    কিন্তু সেটা তো রূপক। অথচ ড্রইং রুমের পদ্মফুলটা ভিজে যায়, ভরে ওঠে মিষ্টি স্বাদে, কেন? পোড়ামাটির হাতি, তার শুঁড়স্থিত ঘটও মাটির। অথচ তাতেই বা মিষ্টি স্বাদ কেন? থেকে থেকেই ওই অপরূপ গন্ধ কোথা থেকে আসছে? তাহলে সত্যিই কি তিনি এসেছিলেন কাল রাতে? তিনি অন্নের দেবী সেই স্বরূপ মেলে ধরেছিলেন? কিন্তু কেন?

    স্তব্ধ হয়ে কোচে বসে পড়ল ভাস্কর। বসেই রইল— অনেক অনেকক্ষণ।

    চারকোণে চারটে হাতি আর মাঝখানে পদ্ম রেখে সাজিয়েছিল অমৃতা। ভাস্কর এখন বুঝতে পারছে যে ওই পদ্মের ওপরে এতদিন নিভৃতে বিরাজ করছিলেন তিনি। হয়ত এখনও আছেন। সুগন্ধের মধ্যে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে গিয়েছেন তিনি বারবার। দেবী কমলা। নাকি অমৃতা? নাহলে অত যত্ন কে করেছিল?

    ‘দেবী বৈকুণ্ঠবাসিনী হলে তাঁকে বলা হয় কমলা’ বুড়ো বলেছিল, ‘আর পাতালবাসিনী হলে লক্ষ্মী।’

    কিন্তু অমৃতা কোথায় আছে এখন? এম-এইচ-৩৭০ নম্বরের ফ্লাইটে ৮ই মার্চ কুয়ালালামপুর থেকে বেজিং যাচ্ছিল। এতদিন বাদেও ফ্লাইট নম্বরটা মনে আছে ভাস্করের। বেজিং-এসেমিনার ছিল একদিন পরে, মানে ১০ আর ১১।১২ তারিখ গভীর রাতে ফিরে আসবে কলকাতায়। এয়ারপোর্টে আনতে যাবার কথা ছিল বলে ভাস্কর সেদিন ছুটি নেয়।

    ‘মা কমলা বড়ই চঞ্চলা’ বুড়ো বলেছিল, ‘আপনি ভাবছেন দু-হাত দিয়েই ধরে রেখেছেন, কিন্তু তার মধ্যে দিয়ে গলে কখন যে তিনি মিলিয়ে যাবেন, টেরটিও পাবেন না।’

    বুড়োর ছদ্মবেশে লোকটা আসলে কে? নিষ্ঠুরতম সত্যের আভাস দিয়েছিল সেদিন। সে চঞ্চলা ঠিকই, কিন্তু এতটাই চঞ্চলা যে এম-এইচ-৩৭০ নম্বরের ফ্লাইটকে বেজিং যাবার পথে মধ্য আকাশ থেকেই মিলিয়ে যেতে হল? আজও কেউ বলতে পারেনি যে সেটা কোথায়? ভেঙে যে পড়েনি তার প্রমাণ ধ্বংসাবশেষের কোনও চিহ্ন এখনও অবধি পাওয়া যায়নি।

    বাইরে পাখিরা ডাকাডাকির মাত্রা বাড়াল, আলো বেড়ে উঠল। সবজিওয়ালা হাঁক দিয়ে গেল। ভাস্করের কোনও হুঁশ নেই। ও তখন নিজের মধ্যে ডুবে বসে রয়েছে।

    সাত বছর একসঙ্গে থাকার পরে অমৃতা তাহলে তার ভৈরব— বিষ্ণুকে— ছেড়ে চলে গেল! কিন্তু কোথায় গেল? বৈকুন্ঠে না পাতালে? ভারত মহাসাগর তোলপাড় করেও ৩৭০-এর কোনও চিহ্নই পাওয়া যায়নি।

    চোখ দিয়ে গড়িয়ে আসা জল মোছার চেষ্টা না করে ভৈরব তখন তার শক্তিকে খুঁজে ফিরছিল বুকের গভীরে? কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিল না। সেখানে কেবল বোবা অন্ধকারের চোখের জল আর এক অন্তহীন জিজ্ঞাসা—

    অমৃতা কেন চলে গেল? কেন চলে গেল? কেন?

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিদুর – মিহির সেনগুপ্ত
    Next Article কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }