Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দাবিদার – তারক রায়

    তারক রায় এক পাতা গল্প169 Mins Read0

    দাবিদার – ৩০

    ত্রিশ

    এক সপ্তাহ চলে গেছে।

    এই সাতটা দিন গোপনে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে জন, মানুষ শিকারের উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছে। ওকে আর কেউ খুঁজছে না।

    আবার বার্ট অ্যান্ড্রিউর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সময় হলো!

    ওর প্রথম পদক্ষেপটা হলো তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। সার্কেল ইউ-র একটা লাইন ক্যাম্পের উপর নজর রাখছিল ও। দুই কাউহ্যাণ্ড ওখানে টহল দেয়।

    একদিন কোথায় যেন গেল ওরা।

    বোধ হয় ডিউটি ছিল না।

    সুযোগটা কাজে লাগাল জন। লাইন ক্যাম্পে ঢুকল সে, প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহ করল, তারপর মেঝেতে ঢেলে দিল এক বোতল কেরোসিন। একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ছুঁড়ে দিল তরল দাহ্য পদার্থটার উপরে।

    সঙ্গে সঙ্গে দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। নিমিষে গোটা ক্যাম্প গ্রাস করল আগুনের লেলিহান শিখা।

    ক্যাম্পটা ছিল সার্কেল ইউ-র উত্তরে।

    পরদিন পাহাড়ের ভিতর দিয়ে উপবৃত্তাকারে পথ চলতে লাগল জন।

    রানশের দক্ষিণে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল।

    এই অংশটা খড় রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। শীতে গরুগুলোর যাতে খাদ্যের অভাব না হয়, সেজন্য আগেই বিপুল পরিমাণে খড় কেটে, শুকিয়ে বড়-বড় গাদা করে জমিয়ে রাখা হয়েছে এখানে।

    খড়ের গাদাগুলোয় আগুন ধরিয়ে দিল জন।

    সর্বগ্রাসী শিখা গাদার খড় শেষ করে জনশূন্য ভবনগুলোতেও প্রবেশ করল।

    একজন কাউম্যান হিসেবে কাজটা করতে খারাপই লাগছিল। চমৎকার গাদাগুলো যখন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, দৃশ্যটা মর্মপীড়া দিলেও গোটা শীতের রসদ এভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কী রকম জ্বলবে বার্ট অ্যান্ড্রিউ, ভেবে আমোদ পেল জন।

    গাঁটের পয়সা খরচ করে ওদেরকে আবার রসদ কিনতে হবে।

    জন নিশ্চিত, পোড়া খড়ের গাদার দৃশ্য বার্টকে শারীরিক আঘাতের মতই আহত করবে।

    হয়তো বন্দুকবাজ ভাড়া করে আনবে সে।

    পরোয়া নেই জনের। একাকী কাজ করছে ও, অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে।

    এরকম লোকের সঙ্গে গোটা একটা দল নিয়েও পেরে ওঠা মুশকিল।

    জনের ইচ্ছা, একটু-একটু করে গোটা সার্কেল ইউ-টাই পুড়িয়ে ফেলবে। পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

    আগুনের লকলকে জিভের মৃত্যুচুম্বন থেকে কোনও কিছুর রেহাই নেই।

    তবে গরুগুলো পোড়াতে চায় না ও।

    আর জমিন তো আগুনে পোড়ে না।

    এমন একটা রাত গেল না, যে রাতে সার্কেল ইউ-র কোথাও-না-কোথাও আঁধার অকস্মাৎ আলোকিত হয়ে উঠল না কমলা রঙের অগ্নিশিখায়…

    যে ধ্বংসযজ্ঞ ও শুরু করেছে, অচিরেই তার ফল দেখতে পেল জন।

    পাহাড় ছেয়ে গেল রাইডারে। আবার মানুষ শিকারে হন্যে হয়ে উঠল লোকগুলো।

    বিচলিত হলো না জন।

    ওর আত্মপ্রসাদ এই যে, লোকগুলোর পিছনে পানির মত টাকা খরচ হচ্ছে বার্টের।

    এটাই চায় ও…বার্টকে ও সর্বস্বান্ত করে দেবে।

    বার্টের ভাড়া করা বন্দুকবাজদের নিশানার আওতায় বার দুই পড়ে গিয়েছিল জন।

    প্রথমবার জ্বলন্ত এক লাইন ক্যাম্পের ধারে অসাবধানে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশের পটভূমে ফুটে উঠেছিল ওর শারীরিক কাঠামো। এমন সময় অপ্রত্যাশিত ভাবে অন্ধকারে গর্জে উঠল একটা বন্দুক।

    বুলেট জনের বাম পায়ের চ্যাপসের ডানা দু’টুকরো করে দিয়ে চলে গেল।

    আরেকবার একটা ঝোপের আড়ালে ঘুমিয়ে ছিল। সরেলটার নাক ঝাড়ার শব্দে জেগে গেল ও।

    মোক্ষম সময়েই ভেঙেছিল ঘুমটা

    দেখে, এগিয়ে আসছে দুই ঘোড়সওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে দে ছুট।

    রাইডার দু’জন ধাওয়া করেও ধরতে পারেনি ওকে।

    অল্পের জন্য ঘোড়াটার গায়ে লাগেনি ওদের ছোঁড়া গুলি, পশ্চাদ্দেশ ঘেঁষে চলে গেছে। এক ইঞ্চির ভগ্নাংশ পরিমাণ ভিতরে লাগলেই সাবাড় হয়ে যেত কৰ্ম্ম

    আহত ঘোড়া সহ মাটিতে আছড়ে পড়ত জন, আর ওরা এসে গুলি করে উড়িয়ে দিত খুলি।

    ভাগ্যিস, গুহার গোপন আস্তানার সন্ধান এখনও কেউ পায়নি।

    নীরস, ক্লান্তিকর জীবন যাপন করছে জন। টিকে আছে কেবল প্রবল ঘৃণা পুঁজি করে। যে ঘৃণা শরীরের প্রতিটা রোমকূপ থেকে উৎসারিত হয় বার্টের প্রতি।

    নিজের হিস্যা যদি ভোগ না-ই করতে পারে, বার্টকেও ভোগ করতে দেবে না। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে সব।

    টম ফোর্ড তার কথা রেখেছে দেখে খুশি জন। সে আর তার লোকজন সার্কেল ইউ-র ধারে-কাছেও ঘেঁষেনি। ওদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তায়ই ছিল জন।

    একত্রিশ

    এক বিকেলে গুহায় শুয়ে ঘুমাচ্ছিল জন। এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছে কারবাইন। ঘুমের মধ্যে অস্থির ভাবে নড়াচড়া করছে।

    হতাশার একটা রাত গেছে কালকে।

    এর আগের টার্গেটগুলোতে সহজে আঘাত হানতে পারলেও কাল রাতে তা পারেনি।

    আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে বার্টের লোকজন।

    ওদের জাল ভেদ করে হয়তো অনুপ্রবেশ করতে পারত। কিন্তু তাতে সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য।

    রক্তপাত চায়নি বলেই হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের আস্তানায় ফিরে এসেছে ও।

    এখন—কী কারণে, জানে না-ঘুমটা ভেঙে গেল জনের।

    চকিতে উঠে বসল ও, সতর্ক, কার বা কীসের প্রতি লক্ষ্যস্থির করবে, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই কারবাইনটা তুলে নিল হাতে।

    এক মুহূর্ত কোনও শব্দ শুনতে পেল না জন, শুধু নিজের হৃৎস্পন্দন ছাড়া।

    কানের মধ্যে যেন রক্তের স্রোত আছড়ে পড়ছে। শোঁ-শোঁ আওয়াজ হচ্ছে।

    কারবাইনটা নামিয়ে রাখতে যাচ্ছে, শব্দটা শুনতে পেল ও।

    শুকনো ঝর্নার নীচ থেকে আসছে: ঘোড়ার খুরের খট-খট পাথরের উপর।

    ঠোঁট কামড়ে ধরল জন। কারবাইনটা উপরের দিকে তুলল।

    এরা যদি বার্ট অ্যান্ড্রিউর লোক হয়, আর ওর খোঁজ পেয়ে যায়, ভালই ফাঁদে পড়ে যাবে ও। আত্মরক্ষার জন্য গুলি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

    হয় ওরা মরবে, না হয় সে।

    হামাগুড়ি দিয়ে গুহামুখে চলে এল জন। সাবধানে উঁকি মারল।

    ঝোপের ফাঁক-ফোকর দিয়ে একটা হ্যাটের চূড়া দেখা যাচ্ছে শুধু। হ্যাটটা একবার উঁচু হচ্ছে, আবার নিচু হচ্ছে।

    একটাই হ্যাট-তবে ওই লোকের পিছনে আরও রাইডার থাকতে পারে।

    সরেলটাকে কাছেপিঠেই রেখেছে জন। তবে ওটার পিঠে স্যাডল পরানো নেই। এমনিতে পরিয়েই রাখে স্যাডল, তবে সারাক্ষণ স্যাডল পরানো থাকলে ঘামে ভেজা কম্বলের কারণে ঘা হয়ে যেতে পারে ঘোড়ার পিঠে। তাই প্রয়োজন না পড়লে প্রত্যেক দিন স্যাডলমুক্ত অবস্থায় ঘোড়াটাকে বাতাসের পরশ পাবার সুযোগ দেয় জন।

    ও যতক্ষণে হামাগুড়ি দিয়ে প্রাণীটার কাছে পৌঁছাবে, স্যাডল চাপাবে, তার আগেই রাইডাররা হামলা চালিয়ে বসতে পারে।

    নাহ, অপেক্ষা করবে জন।

    দেখা যাক, কী হয়।

    প্রয়োজনে ফাইট দেবে।

    এগিয়ে আসছে হ্যাট পরা ঘোড়সওয়ার।

    জন অনুমান করল, ঝোপের দেয়াল পেরিয়ে ঝর্নাটার পাথুরে তলা ধরে প্রশস্ত খালি জায়গাটায় উঠে আসবে রাইডার। সেদিকে কারবাইন স্থির করল ও, ট্রিগারে আঙুল।

    যেখানটায় অনুমান করেছিল জন, ঠিক সেই জায়গার কাছাকাছি ঝিলিক দিল হ্যাটধারীর হ্যাট।

    লোকটার জ্যাকেট দেখতে পাচ্ছে জন, ঝোপের ফাঁক দিয়ে এক ঝলক দেখতে পেল বাহনটার গায়ের চামড়া।

    একটা ক্লেব্যাঙ্ক ঘোড়া।

    দুই সেকেণ্ড আর…এখনই খোলা জায়গাটায় চলে আসবে সওয়ারি, চেহারা দেখাবে…

    এক সেকেণ্ড…

    দুই…

    ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আগ্নেয়াস্ত্রটা মাটিতে নামিয়ে রাখল জন। সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল ওর। আরেকটু হলেই দিয়েছিল ট্রিগার টিপে।

    ভাই।

    .৩০-৩০ বুলেটের আঘাতে দুই খণ্ড হয়ে যেত ওর সৎ-

    ‘ড্যাম,’ বিড়বিড় করল জন, ‘পিটার এখানে কেন?’

    ঝর্নার তীরে সতর্ক চোখ বুলাচ্ছে পিটার। স্যাডল হর্নে একটা কারবাইন। কোমরে যথারীতি নিচু করে বাধা দুই পিস্তল সহ গানবেল্ট।

    বাচ্চা বয়স হলেও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বলে বিপজ্জনক লাগছে দেখতে।

    মনে মনে আশা করল জন, পিটার ওর আস্তানার খোঁজ পাবে না।

    গুহামুখটা হালকা ভাবে ঢেকে রেখেছে ঝোপের পর্দা, তার উপর রয়েছে বড়-বড় পাথর আর মাটির স্তূপ। ফলে বাইরে থেকে বোঝা দুষ্কর, এখানে কেউ বাস করে।

    হয়তো চলে যাবে কিছু খেয়াল না করেই। তা আর হলো না।

    পিটারের সাড়া পেয়ে চিঁহিহি করে ডেকে উঠল সরেলটা।

    সঙ্গে সঙ্গে ক্লেব্যাঙ্কের লাগাম টেনে হাতে কারবাইন তুলে নিল পিটার। জমিনের উপর অস্থির ভাবে নড়াচড়া করছে চোখ স্থির হলো গুহামুখের সামনে।

    জন দেখল, আড়ষ্ট হয়ে গেছে ছেলেটা। ঝট করে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল, ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ওটাকে। এখন শুধু পিটারের হ্যাট আর কারবাইনের নল দেখতে পাচ্ছে জন।

    নীরবতা ভঙ্গ করল পিটারের কণ্ঠ। ‘ঠিক আছে, জন! বেরিয়ে এসো ওখান থেকে। নইলে আমি গুলি করব।’

    কারবাইন তুলে নিল জন।

    গুলি করল পিটার।

    বজ্রপাতের শব্দ তুলল রাইফেলের আওয়াজ। একটা পাথরে বাড়ি খেয়ে ছিটকে গেল বুলেটটা।

    জন জানে, ওকে খুন করার উদ্দেশ্যে গুলিটা করেনি পিটার।

    এক মুহূর্ত পাথর হয়ে শুয়ে রইল ও। তারপর উঠে বসল। —ঠিক আছে! গুলি কোরো না! আমি আসছি!’

    গুহার সরু মুখ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় নিজেকে অসহায় মনে হলো ওর।

    পিটার ওকে খুন করতে চাইলে যে-কোনও মুহূর্তেই করতে পারে। পিটারের জন্য ও একটা পারফেক্ট টার্গেট।

    কিন্তু গুলি করল না পিটার।

    গায়ে ময়লা-আবর্জনা মেখে পাহাড় থেকে নেমে এল জন। ঝর্নার তলায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।

    ঘোড়ার ঘাড়ের কাছে আড়াল নিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পিটার। এবারে সিধে হলো। মুখোমুখি দুই সৎ-ভাই। দু’জনেরই হাতে স্যাডল গান। আরেক হাত আলগা ভাবে ঝুলছে সিক্সগানের পাশে।

    ‘তুমি একটা বোকা, পিটার,’ ভর্ৎসনা করল জন। ‘কোন্ আক্কেলে ভাবলে যে, তোমাকে গুলি করব না আমি? আগেই সেটা করতে পারতাম।’

    চাপা উত্তেজনায় অস্থির হয়ে আছে পিটার। বলল, ‘আমিও।’ মুখটা সাদা ওর, ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে রেখেছে পরস্পরের সঙ্গে। দরদর ঘামছে।

    ‘না, করতে না,’ একমত হলো না জন। ‘কারণ, তুমিই আমাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছিলে।’

    ‘ওই একই কারণে তুমিও আমাকে গুলি করতে পারো না,’ বুমেরাং পিটারের।

    বেশ কিছুক্ষণ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। পিটারের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে জনের, আয়না দেখছে যেন ও।

    অবিকল ওর চোখ পেয়েছে পিটার।

    তারপর নীরবতা ভঙ্গ করল। ‘তুমি দেখছি, একাই এসেছ।’

    ‘হ্যাঁ।’ মাথা দোলাল পিটার। ‘বাকিরা জোড়ায় জোড়ায় বেরিয়েছে তোমাকে খুন করার জন্য।’

    ‘কী চাও তুমি?’

    সৎ-ভাইয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল পিটার। ‘এই রেঞ্জ থেকে চলে যাও। পরের বার আমার গুলি কিন্তু ফসকাবে না।’ শীতল একটা জলধারা নেমে গেল জনের পিঠ বেয়ে। পিটারের চাউনি পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, সে যা বলেছে, সময় এলে করবে।

    ‘আমি তোমাকে অস্ত্রটা দিয়েছিলাম,’ বলে চলল পিটার ‘কারণ, চাইনি, ন্যায্য বিচার ছাড়াই খুন হয়ে যাও। অনুরোধ করেছিলাম এ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু তুমি যাওনি। উল্টো সার্কেল ইউ পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলছ।’ ধারাল আর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল পিটারের কণ্ঠ, ‘একটা কথা ভুলে গেছ তুমি। রানশের ব্যাপারে তোমার দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত, আমি জানি না। সেটা নিয়েও প্রশ্নও তুলছি না। তবে সার্কেল ইউ-তে কিন্তু আমারও অধিকার আছে। আমার জন্ম এখানে। এখানেই আমি বড় হয়েছি। কেউ সেটা ধ্বংস করবে, আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব, তা কখনওই হবে না।’

    নিশ্চুপ রইল জন। অন্তর থেকে বুঝতে পারছে, সত্যি সার্কেল ইউ-র অনেক বেশি ক্ষতি করে ফেলেছে সে। শুধু সার্কেল ইউ নয়, নিজেরও।

    পিটার আগে ওর ব্যাপারে একটা অনিশ্চয়তায় ভুগত। হয়তো ওর প্রতি সহানুভূতিও ছিল। কিন্তু জনের ধ্বংসযজ্ঞ তাকে বার্ট অ্যান্ড্রিউর পক্ষে ঠেলে দিয়েছে।

    নিজের সবচেয়ে বড় মিত্রকে হারিয়েছে জন।

    ‘শোনো,’ মরিয়া হয়ে বলল ও। ‘তোমার সাথে আমার কোনও বিরোধ নেই। লড়াইটা তোমার সাথে নয়।’

    ‘যে মুহূর্তে তুমি সার্কেল ইউ-র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ, সে মুহূর্ত থেকে আমার বিরুদ্ধেও লড়ছ। এখন আমিও তোমার শত্রু।’ একটু বিরতি দিল পিটার। ‘সে যাক গে, আর কোনও সুযোগ পাচ্ছ না তুমি। সত্যি বলছি, তোমাকে খুন না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না বার্ট। ইতিমধ্যে সে তোমাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।’

    ‘তোমরা চাইলে আমার ভাগের অংশটা কিনে নিতে পারো,’ বাতলাল জন। ‘তুমি আর বার্ট। তা হলে আর এই হানাহানি, আর্থিক ক্ষতি-এসব কিছুই হবে না।’

    ‘বার্ট কারও কথাই শুনবে না,’ নাকচ করে দিল পিটার। ‘সে কাউকে একবার ঘৃণা করলে তাকে ঘৃণাই করতে থাকে। আমি ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি। প্রচণ্ড ঘৃণা করে ও তোমাকে! তুমি আমাদের ক্ষতি করেছ, জন। রানশ পুড়ে গেছে, শীতের খাবার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে…শীতকালটা আমরা টিকতে পারব কি না, জানি না। পাঁচ শ’ গরু বিক্রি করতে হবে লোকসানে। পয়সা না থাকলে কর্মচারীদের খাওয়াব কী? ওরা তো বিদ্রোহ করবে আমাদের বিরুদ্ধে। …আবারও অনুরোধ করছি তোমাকে, চলে যাও। গরু চুরি আর জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করো। হয়তো তোমার জন্য কিছু একটা করতে পারব আমি। কিন্তু তুমি যদি এসব বন্ধ না করো…খোদাই জানে, কী হবে!’

    কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল জন পিটারের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কারবাইনটা নামিয়ে রেখে বসল একটা পাথরের উপর। পকেট থেকে তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট বানাতে লাগল।

    ‘গরু চুরি এখন বন্ধ,’ বলল ও, ‘কেউ আর গরু চুরি করবে না। এ নিশ্চয়তা দিলাম তোমাকে। আর…ভুলে যেয়ো না, আমি কিন্তু আমার ভাগের গরুই চুরি করেছি।’

    চুপ করে রইল পিটার।

    ‘ওগুলো লুট করেছি,’ বলে চলল জন, ‘যাতে গরু বিক্রির টাকা দিয়ে বার্টের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে পারি কোর্টে। কিন্তু বার্ট এসে পিছনে লাগল আমার। বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝোলানোর ষড়যন্ত্র করল—’

    ‘কারণ, ক্লাইড ব্রেনান মারা গেছে। ক্লাইডকে তেমন একটা পছন্দ করতাম না আমি। সে ছিল বার্টের পোষা কুত্তা। একটুও বিশ্বাস করতাম না ওকে। কিন্তু শত হলেও সার্কেল ইউ-র কর্মচারী ছিল, আর তুমি-’

    ‘ভুল। ওকে বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি আমি। রাসলাররা বলেছিল, ক্লাইডকে ছেড়ে দিচ্ছে। ক্লাইডের জন্য আমি ফাইট করতেও প্রস্তুত ছিলাম। আমি যখন ভাবছি, লোকটা মুক্তি পেয়ে বাড়ি চলে গেছে, ততক্ষণে ওরা লোক পাঠিয়ে ক্লাইডকে মেরে ফেলেছে। তারপর আমি ওদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করি। চাইনি, আর কেউ খুন হয়ে যাক।’ সিগারেটে আগুন ধরাল জন।

    ‘তারপর থেকে অবশ্য আর কোনও গরু চুরি হয়নি,’ স্বীকার করল পিটার। ‘তবে অনেক ক্ষতি করেছ তুমি। তোমার এটা বন্ধ করতেই হবে। নইলে…যা বললাম…’ পিটারের চোখ চকচক করছে।

    আচমকা বুঝতে পারল জন, রানশ পোড়ানোর ব্যাপারটা অপছন্দ করলেও ঘটনাটা পিটারকে একটা ঘোরের মধ্যে রেখেছে। এক ধরনের রোমান্টিসিজমে ভুগছে ও। ভাবছে, কোমরে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা অস্ত্র জোড়া ব্যবহারের এটাই মোক্ষম সময়। যে বুনো স্বপ্ন ওকে বহু দিন ধরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেটা বাস্তবায়নের সুযোগ ও হারাতে চায় না…

    সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দিল জন। বুটের অগ্রভাগ দিয়ে পিষে ফেলল।

    ‘ঠিক আছে,’ বলল ও। ‘যুদ্ধ শেষ।’

    শক্ত হয়ে গেল পিটারের শরীর। ‘সত্যি বলছ?’

    ‘হ্যাঁ।’ সিধে হলো জন। ‘তার মানে এই নয় যে, বার্টের প্রতি ঘৃণা উবে যাচ্ছে আমার। বাবা চাইত, রানশে আমার অংশটুকু বুঝে নিই আমি। এই চাওয়াটার জন্যই এত কিছু। থামলাম, নইলে কখন আবার গুলি খেয়ে মরো তুমি।

    ‘তুমি আমার সাথে লড়াইয়ে পারবে না,’ তেজের সঙ্গে বলল পিটার।

    ‘সেটা কোনও দিনই জানা হবে না,’ তিক্ত কণ্ঠে বলল জন। ক্লান্তিতে ছেয়ে আছে ওর দেহমন। পিটারের চোখে চোখ রাখল। ‘তুমি এখন যাও।’

    ‘তুমি কী করবে?’

    ‘এ দেশটা বিরাট। পৃথিবীটাও। কোথাও নিজের জায়গা খুঁজে নেব।’

    ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল পিটার। ‘যদি এমন হত-ধুত্তুরি—’ কথা শুরু করেও অসম্পূর্ণ রেখে দিল বাক্যটা।

    ঘোড়ার ঘাড়ের নীচে পলকের জন্য ওকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল জন। পরমুহূর্তে স্বচ্ছন্দ লাফে উঠে পড়ল বাহনের পিঠে। জানোয়ারটার লাগাম হাতে নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল। ‘গুড লাক।’

    ‘সেইম টু ইউ।’

    ঘোড়ার পেটে স্পারের গুঁতো দিতেই চলতে শুরু করল ওটা। ধীরে-ধীরে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    ঘুরে দাঁড়াল জন। ফিরে এল গুহায় নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে।

    হ্যাঁ। লড়াই শেষ। আর এ লড়াইতে সে হেরে গেছে। একটি জিনিসের কাছে পরাজয় ঘটেছে ওর, যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারত না-সেই পিটার উইলিয়ামসের শরীরে বইছে ওর বাবার রক্ত।

    হেরে গেছে জন। না পারল বাবাকে একবার দেখতে, না পেল বাবার উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতি জুলিয়াকে হারানো।

    মেয়েটার যদি সত্যি ওর প্রতি কোনও সহানুভূতি বা ভালবাসা থেকে থাকে, সেটাও আজ থেকে আর থাকবে না। ও যখন জানবে, বেত খাওয়া কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে জন, মনে-প্রাণে ঘৃণা করবে ওকে। জুলিয়ার আশা ছিল, জন তার স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেবে।

    জুলিয়াকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যাচ্ছে সে।

    জন না থাকলে তো বার্টের পোয়াবারো। জুলিয়ার জীবনটা সে নরক করে তুলবে।

    বার্টকে বাধা দেয়ার সাহস ফ্লেচার’স হোল-এর কারোরই নেই।

    কিন্তু… পিটারকে যে কথা দিয়েছে ও! চলে যাবে এলাকা ছেড়ে।

    জুলিয়ার সঙ্গে একবার দেখা না করে যেতে সায় দিচ্ছে না মন।

    সিদ্ধান্ত নিল, রাতের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে বেণ্ট’স ক্রসিং- এ প্রবেশ করবে। যতই ঝুঁকিই থাকুক।

    বত্রিশ

    রাত দুটো।

    গোটা শহর ঘুমাচ্ছে।

    শনিবারের রাতগুলো সার্কেল ইউ-র পে-ডে। এদিন কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়। সারা রাত জেগে থাকে শহর।

    কিন্তু আজ সপ্তাহের মাঝামাঝি।

    সব কিছু, এমনকী স্যালুনগুলো পর্যন্ত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে।

    জুলিয়ার স্যালুনের পিছন-গলিতে বেড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে চলে এসেছে জন পিচ-কালো আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে

    কেউ ওকে দেখেনি, শুধু রাস্তার একটা নেড়ী কুকুর ছাড়া।

    কুকুরটা গলির মধ্যে আবর্জনা ঘাঁটতে ব্যস্ত। ওকে একবার মুখ তুলে দেখে নিয়ে আবার খাদ্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করল সে।

    গলি থেকে একটা সার্ভিস স্টেয়ার চলে গেছে জুলিয়ার ঘর বরাবর। তবে সিঁড়িমাথার ঘরটা বন্ধ, জানে জন।

    বন্ধ দরজায় টোকা দিলে শব্দ শুনে জেগে যেতে পারে লোকজন।

    কাজেই ও ঝুঁকিতে যাবে না সে।

    অন্য একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়।

    নীরবে সিঁড়ি বাইল ও। সিঁড়ির মাথার ল্যান্ডিং-এ এসে থেমে দাঁড়াল। তারপর ল্যাণ্ডিং ঘিরে রাখা রেইলিং-এ উঠে পড়ল। সামনে ঝুঁকে খামচে ধরল ল্যাণ্ডিং-এর উপরের ছাতের কিনারা। শরীরের সমস্ত শক্তি খাটিয়ে এক ঝটকায় উঠে পড়ল ছাতে।

    ল্যাণ্ডিং রুফে ওঠার পরে দালানের মূল ছাতে যেতে আর বেগ পেতে হলো না।

    বলরুম ফ্লোরের মত সমান ছাত।

    ছাতের কিনারের ঢালু, কাঠের প্যারাপিটের সামনে এসে উবু হলো জন। ঝুঁকে এল একদম কিনারে।

    জুলিয়ার ঘরের জানালা এখন তার ঠিক নীচে।

    হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে নিল জন। কোমর থেকে খুলল গুলির বেল্ট। বেল্টের জোড়ার দিকটা ধরে নামিয়ে দিল ওটা প্যারাপিটের উপরে।

    বেল্টের মস্ত বাকলটা এখন জানালার কাচের সামনে ঝুলছে।

    বেল্টটা আস্তে দোলাল জন।

    ধাতব বাকল কাচের গায়ে বাড়ি খেল।

    দম বন্ধ করে ফেলল সে। অপেক্ষা করছে। কিন্তু ঘটল না কিছুই।

    আরেকটা বাড়ি মারল জন।

    এবার একটু জোরে।

    নীরব, নিস্তব্ধ রাতে শব্দটা বজ্রপাতের মত শোনাল কানে। জনের ভয় হলো, শহরের অর্ধেক মানুষকেই হয়তো জাগিয়ে ফেলেছে ও। চট করে বেল্টটা টেনে নিল। তারপর চেপে রাখা দম ফেলল, যখন শুনল জানালার একটা শার্সি উপরের দিকে তোলা হচ্ছে।

    একটি নারী কণ্ঠ-জুলিয়ার বিস্মিত গলা ভেসে এল: ‘ক্- কে?’

    ‘জুলিয়া,’ হিসহিসে গলায় ডাকল জন। উঁকি দিতে মেয়েটার ধবধবে ফর্সা কাঁধের ঝলক দেখতে পেল।

    ‘কে ওখানে?’ আবার প্রশ্ন।

    ‘জুলিয়া! আমি।’

    ‘জন!’ ভয়ানক অবাক হয়েছে জুলিয়া। ‘কোথায় তুমি?’

    ‘ছাতের উপর। খিড়কির দরজাটা খোলো। ভিতরে ঢুকব।’

    জুলিয়াকে আঁতকে উঠতে শুনল জন।

    ফিসফিস করে বলল, ‘এখুনি আসছি।’

    ছাত থেকে দ্রুত নেমে এল জন।

    ল্যাণ্ডিং ফ্লোরে পা রেখেছে, একই সঙ্গে দরজাটাও খুলে ফেলল জুলিয়া। পরনে ওর রোব। কালো রেশমি চুলের গোছা এলোমেলো লুটাচ্ছে কাঁধের উপর।

    চট করে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল জন। তারপর যা ঘটল, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

    জুলিয়া ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল, বুকের সঙ্গে সজোরে চেপে ধরল ওর মাথা।

    মেয়েটার চুলের মিষ্টি গন্ধ লাগল জনের নাকে। ‘ওহ, জন! ওহ, ডার্লিং! যা ভয় পেয়েছি…ভেবেছিলাম….’

    ব্যাপারটা প্রথমে অবিশ্বাস্য ঠেকল জনের কাছে। তারপর কী যেন জেগে উঠল ওর ভিতরে, সাড়া দিল সে। দু’হাত দিয়ে দৃঢ় বন্ধনে বাঁধল জুলিয়াকে। যখন মুখ তুলল মেয়েটা, চুম্বন করল ওকে, দীর্ঘস্থায়ী চুমু…

    নিজেকে ছাড়িয়ে নিল জুলিয়া। দরজা বন্ধ করে টেনে দিল শিকল। ‘তোমাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল আমার। প্রায় পাগল হয়ে গেছিলাম। কোনও খবর নেই-ওদিকে লোকগুলো হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তোমাকে…তোমার মাথার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে….

    জুলিয়ার একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল জন।

    নরম আর উষ্ণ।

    এখনও এসবের ব্যাখ্যা পেতে চাইছে মস্তিষ্ক।

    তবে একটা বিষয় ইতোমধ্যে জেনে গেছে ও-একেবারে পরাজয় ঘটেনি ওর। অন্তত এই একটা ব্যাপারে হারতে হারতে জিতে গেছে।

    হলঘর পেরিয়ে লিভিংরুমে চলে এল জুলিয়া ওকে নিয়ে। বাতি জ্বালল। ঘর আলোকিত হয়ে উঠলে আবারও বাঁধা পড়ল জনের বাহুডোরে।

    অনেকক্ষণ ওকে জড়িয়ে ধরে রাখল জন। তারপর শিথিল করল আলিঙ্গন। ‘একটু উইস্কি খাওয়াতে পারবে?’

    ‘নিশ্চয়। খিদে পেয়েছে তোমার? কী খাবে?’

    ‘কিচ্ছু না। শুধু উইস্কি পেলেই চলবে।

    জুলিয়া ড্রিঙ্ক ঢালছে, জিজ্ঞেস করল জন, ‘তা হলে তুমি মিস করছিলে আমাকে, তা-ই না?’

    ফর্সা গালে লাল ছোপ পড়ল। ‘জানি না।’ লজ্জায় তাকাতে পারল না জনের দিকে।

    উইস্কির গ্লাসটা নিয়ে চুমুক দিল জন। অদ্ভুত উষ্ণতা অনুভব করছে শরীরে। তবে জানে, এটা উইস্কির কারণে নয়।

    ‘তোমাকে আর আমার জন্য দুশ্চিন্তা করতে হবে না,’ বলল ও।

    জুলিয়ার পাখির ডানার মত সুন্দর ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো। ‘মানে?’

    ‘মানে হলো, আমি এখন পরাজিত সৈনিক। হাল ছেড়ে দিয়েছি। বার্টের বিরুদ্ধে হয়তো লড়তে পারব, কিন্তু পিটারের বিরুদ্ধে তা সম্ভব নয়। এভাবে চললে ওর সাথে আমার সংঘর্ষ বাধবেই।’ এক ঢোকে গ্লাসের বাকি মদটুকু শেষ করে ফেলল জন। ‘আমি দুঃখিত, জুলি। আমার জন্য অনেক ঝুঁকি নিয়েছ তুমি। কিন্তু তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না।’

    কিছু বলল না জুলিয়া।

    ‘আমি চলে যাব, ঠিক করেছি। এই দেশ ছেড়েই চলে যাব। ফোর্ড যে টাকা দেবে-খুব বেশি নয় অবশ্য, তবে ও দিয়ে কাজ চলে যাবে টাকাটা নিয়ে নিরিবিলি, নিরাপদ কোনও জায়গায় চলে যাব আমরা…মানে…ইয়ে…তুমি যদি আসতে চাও আর কী!’

    ‘যে-কোনও জায়গায়।’ তাড়াতাড়ি বলল জুলিয়া, ‘যে- কোনওখানে। শুধু বার্টের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারলেই হলো। নইলে ও যেভাবে তোমার বাবাকে-’ হঠাৎ ব্রেক কষল মেয়েটা। ‘…আরেকটা ড্রিঙ্ক দিই তোমাকে!’

    সটান দাঁড়িয়ে পড়ল জন। ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও! কী বললে তুমি?’

    ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে বলল জুলিয়া, ‘কই!’ ঢোক গিলল। ‘কিছু না।’

    টেবিল ঘুরে মেয়েটার সামনে চলে এল জন। ‘জুলি, তুমি কিছু জানো, যা আমি জানি না!’

    ডানে-বাঁয়ে প্রবল বেগে মাথা নাড়ল জুলিয়া। ‘না, না, জন। আমি শুধু এখান থেকে চলে যেতে চাই।’

    দু’হাতে জুলিয়ার দুই বাহু চেপে ধরল জন। টান মেরে নিয়ে এল কাছে।

    ওর হাতের নখ ঢুকে গেল জুলিয়ার নরম মাংসে। ব্যথায় কুঁচকে গেল মেয়েটার মুখ।

    ‘বলো!’ হুঙ্কার ছাড়ল জন। ‘যা জানো, সব বলো আমাকে! কিচ্ছু লুকাবে না!’

    জনের শীতল চোখ জোড়ার দিকে তাকাল জুলিয়া। তারপর বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শরীর ঝাঁকি দিয়ে লৌহবন্ধন থেকে মুক্ত করল নিজেকে। কাঁধ জোড়া নুয়ে এল ওর সামনের দিকে।

    ‘ঠিক আছে,’ ফিসফিস করল ও। ‘তবে কথাগুলো স্রেফ মাতালের প্রলাপ ছিল।’

    ‘বলো,’ পাথুরে কণ্ঠ জনের।

    জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিল জুলিয়া। ‘গত রাতে ডাক্তার মিলার এসেছিল আমার এখানে। তোমার বাবার চিকিৎসা করেছিল সে।’

    ‘বলে যাও।’

    ‘ডাক্তার তখন মাতাল ছিল, জন। একটা মাতালের কথা বিশ্বাস না করাই উচিত।’

    ‘সে আমি বুঝব।’

    একটা মুহূর্ত নিশ্চুপ রইল জুলিয়া। আর যে এগোতে চাইছে না, তা ওর হাবভাবে পরিষ্কার।

    কিন্তু জনের হিমশীতল চাউনি কথা বলতে বাধ্য করল ওকে।

    ‘তোমার বাবার শেষ দিনগুলোর কথা বলছিল ডাক্তার। আগেই বলেছিল, মরিস উইলিয়ামস ষাট থেকে নব্বুই দিন পর্যন্ত টিকবে। কিন্তু তার আগেই হার্টফেল করে মারা গেল মিস্টার উইলিয়ামস। কালকে ডাক্তার বলল, তার নাকি হার্টফেল হয়নি। বলল…ব্যথা কমাতে যে মরফিন ইনজেকশন দেয়া হত, সেটার ওভারডোজে…

    জনের গোটা শরীর বেয়ে বরফজলের স্রোত নামতে লাগল।

    প্রস্তরমূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল সে।

    ‘ব্যথানাশক ওষুধটার ওভারডোজে মারা গেছে বাবা?’

    ‘তা-ই তো বলল ডাক্তার।’

    ‘আগে বলেনি কেন এ কথা?’ ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল জন।

    ‘সে জবাবও দিয়েছে ডাক্তার,’ বলল জুলিয়া, ‘তুমি যে মিস্টার উইলিয়ামসের ছেলে, এ কথা সে জানত না। মৃত্যু অনিবার্য ছিল মরিস উইলিয়ামসের, ভীষণ যন্ত্রণা পাচ্ছিল। ডাক্তারের ধারণা, অসহ্য যন্ত্রণা সইতে না পেরে মিস্টার উইলিয়ামস হয়তো নিজেই মরফিনের ওভারডোজ নেয়…

    ‘বাবা ওকাজ করেনি। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।‘

    ‘তা হলে অন্য কেউ তাকে ইনজেকশনটা দিয়েছিল… বার্ট বা পিটার…ডাক্তার এ ঘটনা জনে জনে বলে বেড়ানোর বিষয় বলে মনে করেনি তখন। তাই বলেনি কাউকে।

    ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল জন। দাঁতে দাঁত ঘষল। ‘পিটার অমন কাজ কোনও দিনই করবে না।’ প্রচণ্ড রাগ আর শোক গ্রাস করছে ওকে। ‘বাবা খুন হয়েছে। আমি জানি, কাজটা কে করেছে।’ মুঠো পাকাল ও। ‘পিটার আমাকে বলেছে, মৃত্যুর আগের দিন ফিসফিস করে বার্টকে কী যেন বলেছিল বাবা। নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে কোনও কথা। বার্ট জানত, বুড়ো মানুষটা বেঁচে থাকতে থাকতে আমি যদি বাড়ি চলে আসি, তা হলে সার্কেল ইউ-র ভাগ দিতে হবে আমাকে। তার মানে…বুঝতে পারছ না তুমি? বার্টই…’ জনের গলার স্বর করুণ শোনাল।

    জনের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল জুলিয়া। ওর হাত তুলে নিল নিজের হাতে। ‘ওহ, ডার্লিং! কী অবিশ্বাস্য কথা!’

    নিষ্ঠুরের মত ধাক্কা মেরে জুলিয়াকে সরিয়ে দিল জন। খাড়া হলো ফের।

    জুলিয়াও সঙ্গে সঙ্গে সিধে হয়েছে। পিছিয়ে এসেছে এক পা। তার মুখ কাগজের মত সাদা।

    ‘না,’ বিড়বিড় করল জন। ‘এখনই নয়।’

    ‘কী বলছ তুমি?’ ফিসফিস করল জুলিয়া।

    কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইল জন। মুষ্টিবদ্ধ হাত। শ্বাপদের মত জ্বলছে চোখ জোড়া। যখন নীরবতা ভঙ্গ করল, আশ্চর্য শান্ত, দৃঢ় আর স্বাভাবিক শোনাল তার কণ্ঠ: ‘আমি এ এলাকা ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।’

    আবার জনের হাত ধরল জুলিয়া। ‘জন, প্লিজ-ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে! বার্টের কারণে ইতিমধ্যে একজনকে হারিয়েছি। আর কাউকে হারাতে চাই না।’

    ‘মরলে মরব!’ গোঁয়ারের মত বলল জন। ‘প্রথম সুযোগেই ওকে আমার খুন করা উচিত ছিল। …ঈশ্বর!’ মুখটা বিকৃত দেখাল ওর। ‘একবারও যদি বুঝতে পারতাম…’

    দরজার দিকে রওনা হলো ও। ঠিক বেরিয়ে যাবার আগমুহূর্তে ঘুরে তাকাল। ‘যদি পারি…যদি সম্ভব হয়…কাজ শেষ হওয়া মাত্র তোমার কাছে ফিরে আসব আমি। আর না হলে…’ দরজার নবে হাত রাখল ও। ‘ভুলে যেয়ো, আমার সাথে তোমার দেখা হয়েছিল কোনও দিন।’

    ‘জন!’

    হাতল ঘোরাতে গিয়েও থেমে গেল জন। ঘুরল। ‘বলো।’

    জুলিয়ার চেহারা এখন শান্ত। এগিয়ে এল জনের কাছে। ‘যাওয়ার আগে আমাকে একবার চুমু খাবে না?’

    ওর চোখে চোখ রাখল জন। মৃদু হাসি ফুটল ঠোঁটে। ‘নিশ্চয়ই।’

    তেত্রিশ

    তবে কাজটা অত সহজ নয়।

    যদিও জন উইলিয়ামসের প্রচণ্ড ক্রোধ সামান্যতমও হ্রাস পায়নি, তবে উত্তেজনা থিতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল।

    যুক্তি দিয়ে কিছু বিষয় চিন্তা করতে লাগল ও। বার্টকে যে ও খুন করবে, তাতে কোনওই সন্দেহ নেই। আর এজন্য নরক পর্যন্ত যেতে রাজি। কাজটা সে করবে সামনাসামনি, বার্ট যাতে জানতে পারে, কে তাকে হত্যা করছে, আর কেন।

    এদিকে ওকে খুন করার তাগিদের পাশাপাশি বেঁচে থাকার একটা ব্যাকুলতাও টের পাচ্ছে জন। সেটা জুলিয়ার জন্য।

    তবে জুলিয়ার চিন্তা ওকে একটুও দুর্বল করতে পারল না। বরং আরও যুক্তিবাদী করে তুলল।

    ভোর হওয়ার অনেক আগে সার্কেল ইউ রানশের উপরের একটা ঢালে ঝোপঝাড়ের মাঝে লুকিয়ে রইল জন।

    এখান থেকে স্পষ্ট নজর রাখা যায় রানশহাউসের উপর। আগে হোক বা পরে, বার্ট ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবেই। তারপর যেখানেই যাক না কেন, পিছু নেবে জন।

    কোনও-না-কোনও সময় সৎ-ভাইকে একলা পাবে সে। আর তখনই হামলা চালাবে।

    এখন শুধুই অপেক্ষা। হিমের মতো শীতল ধৈর্য। ভোরের আলো ফুটল আকাশে।

    জেগে উঠল সার্কেল ইউ।

    পাঞ্চাররা বাঙ্কহাউস থেকে বেরিয়ে আসছে, যাচ্ছে সদ্য নির্মিত রান্নাঘরের দিকে।

    আগেরটা পুড়িয়ে দিয়েছে জন।

    তড়িঘড়ি যেমন-তেমন একটা কাঠামো দাঁড় করিয়েছে ওরা রান্নার কাজ চালাতে।

    রানশহাউস থেকে বেরিয়ে এল পিটার। পাঞ্চারদের সঙ্গে যোগ দিল। কোমরে যথারীতি দুটো গানবেল্ট আর দুটো পিস্তল। জন ভাবল, তার সৎ-ভাইটা কোমরে অস্ত্র গুঁজে ঘুমায় কি না!

    বার্ট অ্যান্ড্রিউর কোনও পাত্তা নেই।

    নাশতা শেষে কোরাল থেকে ঘোড়া বের করে আনল কয়েকজন পাঞ্চার, যে যার ঘোড়ায় স্যাডল পরিয়ে রাইড করার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল।

    হোম রানশে যে পরিমাণ হ্যাণ্ড থাকা দরকার, এখানে তেমনটা নেই বলেই মনে হলো জনের। এর কারণও অবশ্য রয়েছে।

    সম্ভবত বেশির ভাগই রেঞ্জে গেছে গরুগুলো জড়ো করতে। জনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে তারা এখন বাধ্য হচ্ছে. কাজটা করতে।

    ওখানেও থাকতে পারে বার্ট।

    আরও কিছুক্ষণ নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিল জন।

    সূর্য এখন পূর্ণ রূপ নিয়ে প্রকাশিত।

    এক টুকরো শুকনো মাংস চিবিয়ে ক্যান্টিন খুলে কয়েক ঢোক পানি পান করল সে।

    হোম রানশের চারপাশে কয়েকজন গার্ড পাহারা দিচ্ছে, রাইফেল হাতে তিন-চারজন মানুষ।

    সময় যত গেল, জনের মনে ততই এ ধারণা বদ্ধমূল হলো যে, রানশহাউসে নেই বার্ট। থাকলে, সকাল দশটা বাজার পরও ওর টিকি দেখতে না পাবার কোনও কারণ নেই।

    সূর্যের অবস্থান যখন মধ্যাহ্ন নির্দেশ করছে, জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ল জন। এখন ও পুরোপুরি নিশ্চিত, বার্ট এখানে নেই।

    হয়তো গরুর ওখানে আছে, কিংবা অন্য কোথাও গেছে। খানিক চিন্তা করে একটা সিদ্ধান্তে চলে এল ও; ঢালের ধারে, পাইন গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা সরেলটার কাছে এল।

    সকালের নাশতার পরে একজন র‍্যাংলারকে ঘোড়ার পাল নিয়ে রিজের ধারে যেতে দেখেছে জন। সঙ্গে একজন সশস্ত্র গার্ডও ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, বার্ট কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না।

    হোম রানশ থেকে রিজটা দেখা যায় না।

    সাবধানে, চওড়া একটা বৃত্ত নিয়ে ওদিকে রওনা হয়ে গেল জন।

    জায়গা মত যেতে আধ ঘণ্টা লাগল।

    ঘোড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটেই রওনা হলো সে। ঘোড়ার পাল যাতে সরেলটার উপস্থিতি টের না পায়, সেজন্য এ ব্যবস্থা। টের পেলেই ওদের মধ্যে চাঞ্চল্য পড়ে যাবে। ফলে জনের আগমন টের পেয়ে যাবে র‍্যাংলার।

    জনের চলাফেরা ইণ্ডিয়ানদের মতই দ্রুত আর সতর্ক। সুযোগ পেলেই আড়াল নিচ্ছে। শীঘ্রি পাইন বনের সীমানার শেষ প্রান্তে এসে পড়ল ও। তাকাল নীচে

    সূর্যতাপে পোড়া বাদামি ঘাসের পাশে সবুজ ঘাসে মোড়া নিচু জমিন যেন স্বর্গোদ্যান।

    ওখানে মহানন্দে ঘাস খাচ্ছে ঘোড়ার দল।

    যেমনটা ভেবেছিল জন, র‍্যাংলার আর গার্ড পাহারায় ঢিলে দিয়ে আয়েশ করছে। ঘোড়া থেকে নেমে পাইন বনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে পাশাপাশি বসে রয়েছে দু’জনে। গার্ডের কোলে রাইফেল থাকলেও তার মনোযোগ এখন র‍্যাংলারের হাতের টমেটো ক্যানের দিকে। ছুরি দিয়ে মাত্রই টমেটো-রসের দুটো ক্যানের মুখ খুলেছে র‍্যাংলার।

    ওদের এই আলস্য জনের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনল।

    লম্বা ঘাসের মধ্যে নেমে পড়ল সে, দ্রুত ও নিঃশব্দে এগোতে শুরু করল ঢাল বেয়ে।

    গার্ড আর র‍্যাংলারের বেশ কাছে চলে এল জন। ওদের কথা শুনতে পাচ্ছে এখন।

    গার্ড বলছে: ‘চেইনিতে একটা ঘটনার কথা আমার মনে আছে। এক লোক আমাকে একটা বারের মধ্যে চেপে ধরেছিল…’ টমেটোর ক্যানে চুমুক দেয়ায় তার কথাগুলো আর শোনা গেল না।

    আড়াল থেকে বেরিয়ে এল জন, হাতে সিক্সগান বাগিয়ে এগিয়ে গেল তিন কদম। ঠিক পিছনে এসে থামল ওদের।

    দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল ওর ক্রুদ্ধ, কর্কশ কণ্ঠে: ‘ফ্রিজ! দু’জনেই! নইলে মারা পড়বে।’

    লাফিয়ে উঠল র‍্যাংলার।

    তবে গার্ড অভিজ্ঞ লোক। নড়ল না সে, এমনকী মুখ ঘুরিয়ে তাকানোর চেষ্টা পর্যন্ত করল না। কোলে রাইফেল নিয়ে যেমন ছিল, তেমনই বসে রইল।

    র‍্যাংলারের বয়স খুবই কম। পিটারের সমবয়সী হবে। ঘটনার আকস্মিকতায় বড়-বড় হয়ে গেছে তার চোখ। চিনতে পারল জনকে। ‘এ তো জন উইলিয়ামস!’

    শুকনো গলায় বলল গার্ড, ‘সে আমি আগেই বুঝতে পেরেছি। …কেউ বন্দুক বাগিয়ে ধরলে অমন করে লাফিয়ে উঠতে নেই।’

    ‘সুপরামর্শ,’ মন্তব্য করল জন, বন্দুকটা তাক করে রেখে ওদের সামনে চলে এল। ‘এখন আস্তে করে রাইফেলটা ছুঁড়ে দাও।’

    হাসল গার্ড। ‘বন্দুকধারীর সাথে কখনও তর্ক করি না আমি।’ সাবধানে বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সে।

    ‘এবার পিস্তল আর ছুরি। দু’জনেরটাই।’

    ‘যা বলছে, করো,’ র‍্যাংলারকে সাবধান করল গার্ড।

    দু’জনে পুরোপুরি নিরস্ত্র হওয়ার পর শীতল গলায় বলল জন, ‘এক মিনিট সময় দিলাম তোমাদের। বলো, বার্ট অ্যান্ড্রিউ কোথায়?’

    প্রথমবারের মত চোখের পাতা ফেলল গার্ড। ‘বার্ট অ্যান্ড্রিউ কোথায়, আমি তার কী জানি? আমি স্রেফ এখানে কাজ করতে এসেছি। সে লোক কোথায় যায়-না-যায়, আমাকে কখনও বলে যায় না।’

    ‘মোটেই ঠিক করে না কাজটা,’ নির্বিকার ভাবে বলল জন।

    ঘন দাড়ির নীচে গার্ডের মুখ ফ্যাকাস হয়ে গেল।

    ভয়ে কাঁপছে র‍্যাংলার। ‘দাঁড়াও,’ বলল সে। ‘আমি বলছি। আজ সকালে পিটার উইলিয়ামস বলছিল, মিস্টার অ্যান্ড্রিউ নাকি গতকাল গ্র্যাণ্ড রিভার সিটিতে গেছে আরও গানহ্যাণ্ড ভাড়া করতে।’

    ‘কখন ফিরবে?’

    ‘তা তো ঠিক জানি না। হয়তো আজই। নতুন হ্যাণ্ডদের নিয়ে গরুর পালের কাছে বসার কথা তার। পিটার উইলিয়ামসও থাকবে সাথে।’

    নিষ্ঠুর হাসল জন। ‘পালটা কোথায়?’

    ‘উত্তর রেঞ্জে। রক ক্রিকের কাছে, সমতল ভূমিতে।’

    দ্রুত চিন্তা করছে জন।

    এ দু’জনকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আবার ছেড়ে দেয়ার ঝুঁকিও নিতে পারবে না বার্টকে সাবধান করে দেবে বলে।

    বন্দুকের নল বাগিয়ে ধরে গার্ডকে হুকুম দিল সে, ‘এই যে, তুমি। স্যাডল থেকে রশি খুলে নিয়ে এসে ওর হাত বেঁধে ফেলো।’

    সাবধানে এবং মন্থর ভাবে সিধে হলো গার্ড। নিজের ঘোড়ার কাছে গিয়ে রশি খুলে নিয়ে এল।

    লোকটাকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছে জন। কোনও বদ মতলব আছে কি না, বোঝার চেষ্টা করছে।

    মনে হচ্ছে, নেই।

    রানশের সামান্য বেতনের চেয়ে পৈতৃক প্রাণটা তার কাছে অনেক প্রিয়। উল্টোপাল্টা কিছু করার কথা চিন্তাই করছে না।

    বাধ্যগতের মত র‍্যাংলারের সামনে এসে দাঁড়াল লোকটা ‘পিছমোড়া করে বাঁধব?’ জানতে চাইল জনের কাছে।

    ‘হুঁ।’

    ‘ঠিক আছে। …জেল, ঘোরো।’

    ওদের আরও সামনে চলে এল জন।

    ভয়ে মুখ সাদা হয়ে আসা ছেলেটার হাত বাঁধতে শুরু করেছে গার্ড।

    শেষ গিঠুটা দেয়ার পর মুচকি হাসল জন। ‘গুড জব।’ তারপর গার্ড কিছু বুঝে ওঠার আগেই দড়াম করে মেরে বসল লোকটার মাথায়।

    বন্দুকের কুঁদোর আঘাত।

    হাঁটু ভেঙে, হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। অজ্ঞান।

    বাকি রশিটুকু কেটে নিয়ে তা দিয়ে ঝটপট অচেতন গার্ডের হাত-পা বেঁধে ফেলল জন। টাইট করে বেঁধেছে। র‍্যাংলারের বাঁধন পরীক্ষা করল একবার। না, ঠিকই আছে।

    ‘একটু কষ্ট পাবে,’ ভয়ে আধ মরা ছেলেটাকে বলল জন। ‘তবে প্রাণে মরবে না। রাত হওয়ার পরেও ফিরছ না দেখে কেউ-না-কেউ নিশ্চয় তোমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়বে।’

    আগ্নেয়াস্ত্র আর ছুরিগুলো দূরের ঝোপে ছুঁড়ে ফেলল ও। তারপর ঢাল বেয়ে দ্রুত ফিরে চলল নিজের ঘোড়ার কাছে।

    চৌত্রিশ

    বার্ট অ্যান্ড্রিউর খোঁজ মিললেও সে রানশহাউসে নেই, তথ্যটা হতাশ করেছে জনকে। কারণ, বার্ট যখন ফিরবে, একা থাকবে না সে। তাকে ঘিরে থাকবে কয়েকজন বন্দুকবাজ।

    কিন্তু যত বাধাই আসুক, নিজের প্রতিজ্ঞা পালনে এখনও দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ জন। উত্তর রেঞ্জ অভিমুখে ঘোড়া দাবড়ে চলল সে।

    দুপুর নাগাদ সমতল ভূমির উপর, ঘন পাইন বনে চলে এল জন।

    খুব বেশি নিরাপদ জায়গা বলা যাবে না এটাকে। কারণ, রেঞ্জে কাজ করবে রাইডাররা, নানান জিনিস জড়ো করবে। গরু আর মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে রেঞ্জ।

    কাজেই, এক মুহূর্তের জন্যও ঢিল দেয়া যাবে না হুঁশিয়ারিতে।

    গত চব্বিশ ঘণ্টায় মুহূর্তের জন্যও চোখ বোজার সময় পায়নি জন, বার্টের প্রতি প্রবল ঘৃণা ঘুমাতে দেয়নি ওকে। লোকটাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ঘুম আসবে না ওর।

    বিকেল গড়িয়ে আসছে।

    এখনও দেখা নেই বার্টের।

    সূর্য পশ্চিম দিকে গড়াচ্ছে।

    রাইডাররা একের পর এক আসছে রেঞ্জে। পালে গরু রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ওয়্যাগনের দিকে। ওখানে রান্নায় ব্যস্ত রাঁধুনি।

    সাধারণত রাউণ্ড-আপে বেরোনোর সময় সঙ্গে খাবারদাবার নেয় না পাঞ্চাররা। সকালে নাশতা খাওয়ার পর থেকে পেটে কিছু জোটেনি ওদের। রাঁধুনি ওদের জন্য অপেক্ষা করছে ঠাণ্ডা বিস্কিট আর গরম কফি নিয়ে।

    শেষ রাউণ্ডের রাইডাররা যখন গরু নিয়ে এল, ততক্ষণে মাটিতে ওদের ছায়াগুলো লম্বা হতে শুরু করেছে। ঘনিয়ে আসছে সাঁঝের আঁধার।

    গরুর পালের পাহারায় রয়েছে কঙ্কালসার এক গার্ড, বাকিরা খেতে গেছে ওয়্যাগনে। খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত রাঁধুনি।

    আগুনের আভায় পাতলা, ছিপছিপে, কোমরে পিস্তল ঝোলানো একজনকে ঠাহর করতে পারল জন। পিটার। বয়স কম হলে কী হবে, এখনই রেঞ্জ বস হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব আর ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।

    সৎ-ভাইয়ের জন্য গর্ব অনুভব করল জন।

    পিটারের ভাবনা এখন থাক। বার্ট হারামজাদা আসছে না কেন?

    একটা গর্তের মধ্যে শুয়ে রাইডারদের উপর নজর রাখছিল জন। শুয়ে থাকতে থাকতে শরীরে খিঁচ ধরে গেছে। নড়ে উঠল ও। আর তখনই, ওর পিছনে, পাইন বনের ভিতর থেকে ভেসে এল একটা শব্দ। মৃদু।

    গাছের দুটো ডালে ঘষা খাওয়ার মত আওয়াজ।

    কিন্তু বাতাস তো নেই।

    তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল শব্দটা জনের মধ্যে। ঘাড়ের পিছনের খাটো চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল সরসর করে। বরফের মত জমে গেল সে। মাথাটা নামিয়ে রেখেছে।

    ঠিক নিশ্চিত নয়, আবারও মনে হলো, শুনেছে শব্দটা।

    ধীরে, অতি ধীরে আর খুব সাবধানে গর্তের মধ্যে শরীর ঘোরাল ও, শুধু মাথাটা উঁচিয়ে উঁকি দিল।

    পাইনের জঙ্গল অন্ধকারে ঢেকে আছে, মাত্রই উঠেছে বাতাস, মৃদু গোঙানির শব্দ তুলে গাছপালার ভিতর দিয়ে বইতে শুরু করল।

    জনের ইন্দ্রিয় সতর্ক করে দিয়েছে ওকে। কিছু একটা আছে ওখানে। কেউ হয়তো ওর সরেলটাকে দেখে ফেলেছে।

    একবার মনে হলো, পাইনের ছায়ার ভিতরে নড়ে উঠল যেন একটা ছায়া।

    গাছের ছায়া তো ওভাবে নড়ে না!

    আড়ষ্ট হয়ে গেল জন। যে ঝোপটার আড়ালে ও লুকিয়েছে, তার ফাঁক দিয়ে বের করল বন্দুকের নল।

    নাহ, কাউকে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। আবার ‘স্থির’ হয়ে আছে কালো-কালো গাছগুলো।

    বৃক্ষশাখার তৈরি চাঁদোয়া ভেদ করতে পারছে না ম্লান চাঁদের আলো।

    কে ওখানে-বার্ট?

    সে কি জনকে দেখে ফেলেছে?

    তা হলে গুলি করল না কেন?

    নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল জনের। মাইনকার চিপায় পড়ার দশা। ঢালে একটা নড়াচড়া লক্ষ করেছে ও। হামাগুড়ি দিয়ে, পেটের উপর ভর করে, সাপের মত এঁকেবেঁকে নেমে আসছে কেউ ঢাল বেয়ে, ওরই দিকে।

    কোল্টের হ্যামার কক করল জন।

    লোকটা আর দশ গজ দূরে, জনের উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন।

    মাটির একটা ঢিবির কাছে এসে পকেট থেকে টেলিস্কোপ বের করল সে। যন্ত্রটা খুলে, চোখে লাগিয়ে তাকাল গরুর পালের দিকে।

    অবিশ্বাস নিয়ে মাটির উপর লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা ঢ্যাঙা শরীরটার দিকে তাকিয়ে রইল জন।

    রহস্যময় আগন্তুক আর কেউ নয়, টম ফোর্ড!

    যা দেখার দেখে নিয়ে দুরবিন বন্ধ করল ফোর্ড। ঘুরল। হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে চলল যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে। নিঃশব্দে পৌছে গেল পাইন বনের সীমান্তে।

    ছায়াঘন আঁধারে আরও কতগুলো ছায়ামূর্তি নড়ে উঠল।

    জন বুঝল, ফোর্ড আর তার লোকেরা পাইনের জঙ্গলে জড়ো হয়েছে।

    ওকে দেখতে পায়নি ওরা। পাহাড়ে লুকানো ঘোড়াটাও সম্ভবত নজর এড়িয়ে গেছে।

    এই মুহূর্তে ওদের সমস্ত মনোযোগ গরুর পালের দিকে। কী ঘটতে চলেছে, বুঝে ফেলল জন।

    ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে টম ফোর্ড। সার্কেল ইউ- তে আর হাত দেবে না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, স্রেফ কথার কথা ছিল ওটা।

    রাগে ঠোঁট কামড়াল জন। তিক্ততায় ছেয়ে গেছে মন। পশ্চিমাকাশে অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকাল।

    সন্ধ্যার সময় রাউণ্ড-আপ ক্যাম্পে একটা ঢিলেঢালা ভাব চলে আসে। লোকজন থাকে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত।

    চতুর ফোর্ড মোক্ষম সময়টাই বেছে নিয়েছে। শীঘ্রিই সে তার দলবল নিয়ে তীর বেগে ঢাল বেয়ে নেমে আসবে, আকস্মিক হামলায় দিশেহারা করে তুলবে সবাইকে।

    অন্যদের কথা ভাবছে না জন। কিন্তু পিটার…বুদ্ধির চেয়ে আবেগ যার কাছে বেশি প্রাধান্য পায়…বন্দুক চালানোর দক্ষতা নিয়ে যার গর্বের শেষ নেই; পাল্টা হামলা চালাবে, সন্দেহ নেই।

    যদি খুন হয়ে যায়?

    বিড়বিড় করে একটা খিস্তি করল জন।

    পাইনের বনে নড়তে শুরু করেছে ছায়াগুলো।

    আর চিন্তা করার সময় নেই। যেভাবেই হোক, সতর্ক করে দিতে হবে সার্কেল ইউ-কে।

    কোল্টটা বাগিয়ে ধরল ও। তারপর পাইন বন লক্ষ্য করে পর-পর তিনটে গুলি করল। এত দ্রুত ট্রিগার টিপেছে যে, মনে হলো, একটাই গুলি করেছে।

    নিস্তব্ধতার মাঝে শব্দটা শোনাল বজ্রপাতের মত।

    ‘নীচের ক্যাম্পের প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ না হলেও ঢালের লোকগুলোর মাঝে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করল ‘জন। জানত, গোধূলির আলোয় পিস্তলের মাযল-ফ্ল্যাশ দেখে ফোর্ডের লোকেরা সহজেই ওর অবস্থান শনাক্ত করতে পারবে। তাই গুলি করেই গড়ান দিয়ে সরে গেছে গর্ত থেকে।

    বনের ভিতর গর্জে উঠল বন্দুক।

    জন যেখানে শুয়ে ছিল, সেখানকার মাটি খাবলা মেরে তুলে নিল এক পশলা গুলি।

    সরে না গেলে এতক্ষণে লাশে পরিণত হত ও।

    আরও এক পশলা গুলি বাতাসে শিস কেটে চলে গেল জনের মাথার উপর দিয়ে।

    পাইনের বন থেকে ভেসে এল চিৎকার: ‘চলো সবাই!’

    অ্যাকশনে নামতে যাচ্ছে ফোর্ডের লোকজন, ঢাল বেয়ে বিদ্যুদ্গাতিতে নামতে লাগল, সাঁই-সাঁই বেত মারছে ঘোড়ার পিঠে, ক্যাম্পে না নামা পর্যন্ত তাদের অস্ত্র আগুন ঝরাবে না।

    জন যেখানে শুয়ে আছে, সে রাস্তা ধরে ছুটে আসছে ফোর্ডের দল। মুখোশপরা এক রাইডার ঘোড়া নিয়ে সোজা ছুটে আসছিল ওর দিকে। না সরলে মরবে জন।

    এক লাফে খাড়া হলো সে, হাতে উদ্যত অস্ত্র।

    যেন নিজে থেকেই বিস্ফোরিত হলো পিস্তল।

    মুখোশের ওপাশে রাইডারের চোখ জোড়ায় নিখাদ বিস্ময় ফুটে উঠতে দেখল জন এক লহমার জন্য।

    পরক্ষণে উল্টে পড়ে গেল লোকটা ঘোড়ার পিঠ থেকে।

    জনের পিস্তল বুক ফুটো করে দিয়েছে তার।

    ঘোড়াটা ঝড়ের বেগে ছুটে যাচ্ছিল পাশ দিয়ে, ওটার লাগাম ধরার জন্য হাত বাড়াল জন।

    ধরতে পারলেও ছুটন্ত ঘোড়াটা অন্তত দশ হাত রাস্তা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল ওকে পিঠে চড়ার সুযোগ না দিয়ে।

    রেকাবে পা পর্যন্ত ঢোকাল না জন। লাফ মেরে উঠে পড়ল স্যাডলে।

    ততক্ষণে গুলি করতে করতে ঢাল বেয়ে নেমে গেছে অন্যরা।

    ওদের মধ্যে একজন, সঙ্গীকে দেখেছে ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে, নিজের বাহনের মুখ ঘুরিয়ে নিল, বন্দুক তাক করল জনের দিকে।

    কোল্টে গুলি আছে মাত্র দুটো, অন্ধের মত গুলি চালাল জন, সহজাত প্রবৃত্তির বশে স্ন্যাপশট, তবে দুটো গুলিই রাসলারের বুক বিদীর্ণ করল।

    স্যাডল থেকে উড়ে মাটিতে গিয়ে পড়ল লোকটা।

    নীচে কী ঘটছে, এই প্রথম দেখার সুযোগ পেল জন।

    সার্কেল ইউ-র লোকজনকে সতর্ক করার জন্য ছোঁড়া গুলি কাজে লেগেছে।

    গুলির আওয়াজে সাবধান হয়ে গিয়েছিল তারা; ফোর্ডের লোকেরা গুলিবর্ষণ করতে করতে নামছে, ততক্ষণে সার্কেল ইউ-র কয়েকজন রাইডার ঘোড়ার পিঠে উঠে গেছে। অন্যরা আশ্রয় নিয়েছে ওয়্যাগনের পিছনে, হাতে প্রস্তুত কারবাইন।

    মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজের সঙ্গে সাঁঝবেলার আবছা আলোয় থেকে থেকে জ্বলে উঠছে মাযল-ফ্ল্যাশ।

    তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেছে দু’পক্ষে।

    ঘোড়া নিয়ে চলে যেতে পারত জন, কিন্তু পিটারকে দেখে আর পারল না।

    কভারের তোয়াক্কা না করে খোলা জায়গায় চলে এসেছে ছেলেটা, পারফেক্ট টার্গেট, ওর দুই হাতের পিস্তল সমানে ওগরাচ্ছে তপ্ত সীসা।

    ‘আহাম্মক!’ গর্জে উঠল জন। বেল্ট থেকে খুলে নিল গুলি। ঘোড়ার পেটে মারল স্পারের গুঁতো। ওটা যখন সবেগে ঢাল বেয়ে নামছে, তখন রিলোড করছে সে।

    রীতিমত নরক গুলজার নীচে।

    আকস্মিক হামলায় সার্কেল ইউ-কে চমকে দিতে চেয়েছিল ফোর্ড।

    কিন্তু জনের কারণে সেই পরিকল্পনা বানচাল।

    এখন ঢালের নীচে এসে ওদের অবস্থা খুবই করুণ।

    সার্কেল ইউ-র লোকজন ছত্রভঙ্গ করে ফেলেছে ওদের। পিছনের দু’পায়ে ভর করে লাফিয়ে উঠছে ঘোড়াগুলো। পাগলের মত ছোটাছুটি আর চিৎকার করছে জানোয়ার ও মানুষ। গুলির শব্দের পুরো এলাকা প্রকম্পিত।

    অলৌকিকই বলা যায়; এখনও পায়ের উপর খাড়া রয়েছে পিটার। ঘোড়া নিয়ে জন বিশৃঙ্খল দৃশ্যপটে পৌঁছানোর আগেই শেষ রাউণ্ডের গুলি ছুঁড়ে খালি করে ফেলল পিটার পিস্তলটা।

    পিটারকে লক্ষ্য করে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল জন।

    কিন্তু ছেলেটা ততক্ষণে আড়াল নিয়েছে ওয়্যাগনের পিছনে।

    জন দেখল, মুখোশধারী এক লোক পিস্তল তাক করেছে ভাইয়ের দিকে। অত কাছ থেকে গুলি মিস হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

    রাসলারকে গুলি করার চেষ্টা করল না জন। করল ওর ঘোড়াটাকে। ওটার পাছার মাংস উড়িয়ে দিল বুলেট।

    ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল প্রকাণ্ডদেহী অশ্ব, সামনের দু’পা তুলে দিল শূন্যে, পরক্ষণে আরোহীকে নিয়ে উল্টে পড়ে গেল মাটিতে।

    কয়েক মন ওজনের নীচে চাপা পড়ার আগে মুখোশধারীর হাতের অস্ত্র গর্জে উঠেছিল। কিন্তু ভারসাম্যহীন বুলেট রাতের আকাশে হারিয়ে গেল।

    কানের পাশে বন্দুকের বিকট আওয়াজে প্রায় কালা হয়ে গেল জন। ঘুরে দেখল, আরেক অশ্বারোহী গুলি ছুঁড়ছে ওয়্যাগন লক্ষ্য করে। এক গুলিতে সাবাড় করল জন লোকটাকে। ঠিক তখন প্রচণ্ড এক ঘুসি খেল যেন; জমিন সাঁৎ করে উঠে এসে থাবড়া মারল ওর মুখে, ক্যাম্পফায়ারের পাশে চিৎ হয়ে পড়ে গেল জন। কলারবোনের ঠিক নীচে বিদ্ধ হওয়া গুলির আঘাতে শরীরের বাম পাশটা পুরো অবশ হয়ে গেছে।

    বনবন ঘুরছে মাথাটা, শুনতে পাচ্ছে ওর চারপাশে অশ্বখুরের শব্দ। বেশির ভাগ খুরে চামড়ার ব্যাগ পরানো।

    অলৌকিকই বলতে হবে, কোনও ঘোড়া ওর গায়ের উপর উঠে এল না।

    দু’এক সেকেণ্ড পরে মাথার চক্করটা একটু কমে আসতে জন বুঝতে পারল, পিস্তলটা এখনও ডান হাতে ধরে রেখেছে সে। টেনে তোলার চেষ্টা করল শরীরটা। কিন্তু এমন বোঁ করে ঘুরে উঠল মাথা, চিৎ হয়ে পড়ে গেল আবার।

    তারপর, ঘোরের মধ্যেই যেন দেখতে পেল, ঘোড়ার পিঠ থেকে একটা মুখ ঝুঁকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে

    মুখোশটা খুলে ফেলেছে সে। হিংস্র, খিঁচানো মুখে বেরিয়ে পড়েছে দাঁত। লম্বা, ভয়ঙ্কর একটা চেহারা। রাগ আর খুনের নেশায় ভাঁটার মত জ্বলছে চোখ দুটো।

    টম ফোর্ড। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল, ‘জন!’ ওর দিকে তাক করল বন্দুক।

    সমস্ত হই-হট্টগোল যেন থেমে গেল অকস্মাৎ।

    সেকেণ্ডেরও কম সময়ে পিস্তলটা তুলল জন, এবং গুলি করল।

    ফোর্ডের মুখটা পলকে পরিণত হলো রক্তাক্ত একটা মুখোশে, লাল কুয়াশার পর্দার মধ্যে যেন অদৃশ্য হয়ে গেল সে।

    ওর ছোঁড়া বুলেট মাটি ওড়াল জনের পাশে।

    গুলির শব্দে চমকে উঠে ছুটতে শুরু করল ক্লেব্যাঙ্ক। আরোহী পিঠ থেকে পড়ে গেছে, রেকাবে পা ঢোকানো থাকায় ছিটকে পড়েনি মাটিতে।

    জমিনে বাড়ি খেতে খেতে ঘোড়ার সঙ্গে চলল টম ফোর্ড। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মাথা থেকে রক্ত আর মগজ ছিটকে পড়তে লাগল রাস্তায়।

    গা গোলানো দৃশ্যটা এক পলক দেখল জন। তারপর নিঃসীম ক্লান্তি নেমে এল শরীরে।

    হাত থেকে পিস্তল নামিয়ে রাখল ও। আশপাশের যাবতীয় ঘটনা মনে হলো অনেক দূরে ঘটছে। কালো একটা পর্দা নেমে এল ওর দু’চোখে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleলজ্জা – তসলিমা নাসরিন
    Next Article তৃতীয় পুরুষ – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.