Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দারোগার দপ্তর ১ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প1955 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বেকুব বৈজ্ঞানিক (অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকের চক্ষুতে অজ্ঞলোকের ধূলিনিক্ষেপের অদ্ভুত রহস্য! )

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    প্রায় দুই বৎসর অতীত হইল, একদিবস নিতাইচাদ বৈরাগীর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। তাহাকে দেখিবামাত্রই আমি চিনিতে পারিলাম, সেও আমাকে চিনিল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “নিতাই! তুমি জেল হইতে কোন্ তারিখে খালাস হইয়াছ?”

    নিতাই। আজই জেল হইতে অব্যাহতি পাইয়াছি। কিন্তু আপনাদিগের হস্ত হইতে এখনও অব্যাহতি পাই নাই। পুলিস প্রহরীরা জেল হইতে আমাকে এইস্থানে আনয়ন করিয়াছে; কিন্তু কি নিমিত্ত যে আনয়ন করিয়াছে, এবং আরও কতক্ষণ পর্যন্ত যে আমাকে এইস্থানে থাকিতে হইবে, তাহার কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না।

    আমি। তুমি যাহা বুঝিতে পারিতেছ না, তাহা আমি তোমাকে বুঝাইয়া দিতেছি। এইস্থানের নিয়ম আছে যে, কোন ব্যক্তির কোন গুরুতর অপরাধে কারাদণ্ড হইলে তাহাকে সেই সময় একবারে জেলে পাঠান হইয়া থাকে। পরিশেষে তাহার মেয়াদের তারিখ পূর্ণ হইলে, তাহাকে পুনরায় এইস্থানে আনয়ন করা হয়, এবং তাহার চেহারা উঠাইয়া লইয়া যে থানা হইতে তাহার মেয়াদ হইয়াছিল, সেই থানায় তাহাকে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। তোমাকেও এই নিমিত্ত এখানে আনা হইয়াছে। এইস্থানে তোমারও চেহারা উঠাইয়া লওয়া হইবে। পরিশেষে যে থানা হইতে তোমার কারাদণ্ড হইয়াছিল, সেই থানায় পাঠাইয়া দেওয়া হইবে। সেইস্থান হইতে তুমি আপন গৃহে গমন করিতে পারিবে।

    নিতাই। আপনাদের এ সকল কার্য্য সম্পন্ন করিতে কত বিলম্ব হইবে?

    আমি। বিলম্ব অধিক হইবারই সম্ভাবনা। কিন্তু মনে করিলে যাহাতে তুমি শীঘ্র নিষ্কৃতিলাভ করিতে পার, আমি তাহার উপায় করিতে পারি।

    নিতাই। তাহা হইলে অনুগ্রহ পূর্ব্বক যাহাতে আমি শীঘ্র নিষ্কৃতিলাভ করিতে পারি, তাহার উপায় করুন।

    আমি। যদি তুমি তোমার পূর্ব্ব প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন কর, তাহা হইলে যাহাতে তুমি শীঘ্র নিষ্কৃতিলাভ করিতে সমর্থ হও, আমিও তাহার উপায় করিতে পারি।

    নিতাই। আমি কি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ আছি, তাহা ত আমার কিছুমাত্র মনে নাই। আমি কোন সময়ে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম?

    আমি। যে সময়ে তুমি ধৃত হইয়াছিলে।

    নিতাই। আমি কি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম?

    আমি। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, কি উপায়ে তুমি হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন কর। উত্তরে তুমি কহিয়াছিলে, “যে উপায়ে আমি এই হত্যা করিয়াছি, তাহা এখন আপনাদিগের নিকট প্রকাশ করিলে আমাকে নিশ্চয়ই ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলিতে হইবে। নতুবা কিছু দিবসের নিমিত্ত আমাকে মেয়াদ খাটিতে হইবে মাত্র। মেয়াদ গত হইলে যখন আমি প্রত্যাগমন করিব, সেই সময় আমি আপনাকে বলিয়া যাইব যে, কিরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া আমি এই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করিয়াছি।” এখন তুমি জেল হইতে প্রত্যাগমন করিয়াছ, সুতরাং এখন তোমার পূর্ব প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করা কর্তব্য।

    নিতাই। যদি আমি আপনার নিকট এরূপ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ থাকি, তাহা হইলে সেই প্রতিজ্ঞা আমি প্রতিপালন করিব। এখন যাহাতে আমার শীঘ্র মুক্তিলাভ হয়, তাহার উপায় করুন।

    নিতাইয়ের এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া কৌতূহলপরবশ হইয়া, সেই সময়ের প্রয়োজনীয় কাৰ্য্য সকল যত শীঘ্র হইবার সম্ভাবনা, সম্পন্ন করিয়া লইয়া, তাহাকে ভবানীপুর থানায় পাঠাইয়া দিলাম।

    এই ঘটনার কিছুদিবস পরে নিতাইয়ের সহিত আমার পুনরায় সাক্ষাৎ হয়। সেই সময়ে সে তাহার প্রতিজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ না করিলেও কতক পরিমাণে রক্ষা করিয়াছিল। সে আমাকে যাহা যাহা বলিয়াছিল, তাহা পাঠকগণের নিকট বর্ণন করিবার পূর্ব্বে, কি অপরাধে ও কিরূপ উপায়ে নিতাই ধৃত হইয়া কারারুদ্ধ হয়, তাহাই বর্ণন করা আমার বোধ হয় সম্যরূপে বিধেয়।

    নিতাইচাদের কথা শ্রবণ করিয়া আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছে যে, আজ পর্য্যন্ত বিজ্ঞানশাস্ত্র সম্পূর্ণরূপে উন্নতি লাভ করিতে পারে নাই। বিশেষতঃ ইংরাজী বিজ্ঞান এখনও অনেক বিষয়ে পশ্চাতে পড়িয়া আছে। কেন যে আমি বৈজ্ঞানিকদিগের উপর এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলাম, এই আখ্যায়িকা অধ্যয়ন করিলেই পাঠকগণ তাহা বুঝিতে পারিবেন।

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    রাত্রি নয়টার সময় ভবানীপুর থানা হইতে টেলিফোন সংবাদ আসিল যে, ভবানীপুরের থানার অধীনস্থ চাউলপট্টি রোডে একটি বারবনিতাকে হত্যা করিয়া কে তাহার যথাসর্বস্ব অপহরণ করিয়া প্রস্থান করিয়াছে।

    এই সংবাদ প্রাপ্ত হইবামাত্র কালবিলম্ব না করিয়া, চাউলপট্টি রোডের যে বাড়ীতে এই হত্যাকাণ্ড সম্পাদিত হইয়াছিল, সেই বাড়ীতে গিয়া উপনীত হইলাম। উহা একখানি খোলার বাড়ী এবং পুলিস থানার সন্নিকটবর্তী। সেই বাড়ীতে কেবল দুইটিমাত্র স্ত্রীলোক ভিন্ন অপর আর কেহই থাকে না। তাহাদিগের মধ্যে একজনের নাম বিন্দু, তাহাকে বাড়ীতেই পাইলাম। অপর স্ত্রীলোকটির নাম মল্লিকা। জানিলাম, সেই মল্লিকাই হত হইয়াছে, এবং তাহার যথাসর্বস্ব অপহৃত হইয়াছে।

    মল্লিকা যে গৃহে থাকিত, প্রথমেই সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, দ্বার খোলা রহিয়াছে, সেই দ্বারের পার্শ্বে অর্থাৎ গৃহের পূর্ব্বদিকে একখানি পালঙ্কের উপর মল্লিকা চিৎ হইয়া শয়ন করিয়া রহিয়াছে। হঠাৎ দেখিলে বোধ হয় না যে, তাহার জীবন বহির্গত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আমরা যখন তাহাকে দেখিলাম, তখন তাহার হাত পা শক্ত, এবং শরীর শীতল হইয়া গিয়াছে। সেই গৃহের ভিতর প্রবিষ্ট হইবার পূর্ব্বে মনে করিয়াছিলাম যে, মল্লিকা হয় ত কোনরূপ অস্ত্রের দ্বারা আহত হইয়া মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার সেই পালঙ্কের নিকট গমন করিয়া তাহার সেইরূপ মৃত্যুর কোন প্রকার চিহ্নও দেখিতে পাইলাম না; না আছে—সেইস্থানে কোনরূপ অস্ত্র, না আছে—রক্তের চিহ্ন।

    কিরূপ আঘাত পাইয়া মল্লিকা হত হইয়াছে, তাহা জানিবার মানসে মল্লিকার গাত্রের বসন খুলিয়া ফেলিলাম, এবং পা হইতে আরম্ভ করিয়া মস্তক পর্য্যন্ত বিশিষ্টরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম, কিন্তু শরীরের কোনস্থানে কোন প্রকার চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। কেবল দেখিলাম, অর্দ্ধ চব্বিত পানের কিয়দংশ তাহার মুখের ভিতর রহিয়াছে। উহার শরীরের কোনস্থানে অলঙ্কারের লেশমাত্র নাই।

    মল্লিকার শরীরের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া কিরূপে সে হত হইয়াছে, তাহার বিষয় কিছুমাত্র অনুমান করিতে না পারিয়া পরিশেষে সেই গৃহের অবস্থার উপর লক্ষ্য করিলাম। দেখিলাম, সেই গৃহের ভিতর আমারি, সিন্ধুক, বাক্স, প্রভৃতি যে সকল দ্রব্যাদি ছিল, তাহার সমস্তই ভগ্নাবস্থায় রহিয়াছে, এবং তাহার অভ্যন্তরস্থ দ্রব্য সকল স্থানচ্যুত হইয়া কতক পালঙ্কের নিম্নে, কতক আলমারির পার্শ্বে পতিত রহিয়াছে। এই সকল অবস্থা দেখিয়া অনুমান হয় যে, এই সকল আমারি প্রভৃতির ভিতর যে সকল বহুমূল্য দ্রব্যাদি ছিল, তাহার সমস্তই অপহৃত হইয়াছে।

    গৃহের এই সকল অবস্থা এবং হত স্ত্রীলোকের অবস্থা দেখিয়া যখন আমরা কিরূপে তাহার মৃত্যু হইয়াছে, তাহার কিছুই অনুমান করিতে পারিলাম না, তখন প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীবর্গের মধ্যে পরামর্শ করিয়া স্থির হইল যে, এই মৃতদেহ যে ডাক্তার সাহেব কর্তৃক পরদিবস ছেদিত ও পরীক্ষিত হইবে, সেই ডাক্তার সাহেবকে এইস্থানে আনয়ন করিয়া যে অবস্থায় এই মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, সেই অবস্থাতেই তাহাকে দেখান হউক। এই লাস আর ডেড্‌হাউসে পাঠাইবার আবশ্যক নাই। শবচ্ছেদ করিতে করিতে যিনি এখন বৃদ্ধ হইয়া আসিতেছেন, সেই বহুদর্শী ডাক্তার সাহেব মল্লিকার অবস্থা দেখিলে বোধ হয় বলিতে পারিবেন, কিরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া ইহাকে হত্যা করা হইয়াছে।

    পরামর্শে যাহা স্থির হইল, কার্য্যে তাহা পরিণত হইল। দ্রুতপদে একখানি গাড়ি পাঠাইয়া দিয়া রাত্রি প্রায় এগারটার সময় বাড়ি হইতে ডাক্তারবাবুকে সেইস্থানে লইয়া যাওয়া হইল। তিনি উপস্থিত হইয়া মল্লিকার মৃতদেহ আপাদমস্তক উত্তমরূপে পরীক্ষা করিলেন। বহুক্ষণ পরীক্ষা করিয়াও বোধ হইল, তিনিও কিছু স্থির করিতে পারিলেন না। কিন্তু তিনি আমাদিগকে কহিলেন, “বোধ হয়, ‘হায়ড্রোসেনিক এসিড নামক বিষ-প্রয়োগ করিয়া ইহাকে হত্যা করা হইয়াছে। কারণ, এক হায়ড্রোসেনিক এসিড ভিন্ন অপর কোন তেজস্কর বিষ এ পর্য্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই, যাহার দ্বারা মুহূর্তের মধ্যে মনুষ্যের জীবন নষ্ট হইতে পারে। এই স্ত্রীলোকটির জীবনও শুনিতেছি, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হইয়াছে।”

    ডাক্তারবাবু আমাদিগকে এইরূপ ভাবে বুঝাইলেন সত্য; কিন্তু বোধ হইল, তাঁহার মনেও সম্পূর্ণরূপে সন্দেহের উদয় হইয়াছে। যে পর্য্যন্ত তিনি প্রত্যাগমন না করেন, সেই পর্যন্ত মৃতদেহ স্থানান্তরিত করা না হয়, আমাদিগকে এই উপদেশ দিয়া তিনি সেইস্থান পরিত্যাগ করিলেন, এবং কিয়ৎক্ষণ পরেই তাঁহার ঊর্দ্ধর্তন কর্মচারি অর্থাৎ সর্ব্বপ্রধান ইংরাজ ডাক্তারকে সঙ্গে করিয়া পুনরায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন সেই প্রধান ডাক্তার সাহেব প্রথমে স্থানীয় অবস্থা উত্তমরূপে শ্রবণ ও দর্শন করিয়া, পরিশেষে একান্ত মনোযোগের সহিত সেই মৃতদেহের আপান-মস্তক উত্তমরূপে দর্শন করিলেন। কিন্তু তাঁহার মতামত সম্বন্ধে আমাদিগকে কিছু না বলিয়া, তাঁহার সমভিব্যাহারীকে কি বলিতে বলিতে সেই বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন। আমরাও তখন আর, অপেক্ষা না করিয়া, সেই মৃতদেহ গৃহ হইতে বাহির করিয়া পরীক্ষার্থ প্রেরণ করিলাম।

    মৃতদেহ গৃহ হইতে বাহির করিলে পর, আমরা পুনরায় সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া উত্তমরূপে অনুসন্ধান আরম্ভ করিলাম। গৃহের প্রত্যেক দ্রব্য এক এক করিয়া বাহিরে আনিয়া সেই গৃহের অভ্যন্তরে উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু এরূপ কোন দ্রব্যই প্রাপ্ত হইলাম না যে, যাহার দ্বারা—কি উপায়ে হত্যা হইয়াছে,—তাহার কারণ নির্ণয় করিতে সমর্থ হই। আমাদিগের সকলেরই পরিশেষে অনুমান হইল যে, কোন না কোনরূপ বিষ-প্রয়োগ করিয়া ইহাকে হত্যা করা হইয়াছে।

    আমাদিগের সকলের মনে এইরূপ সন্দেহ হইল সত্য; কিন্তু অপর কর্তৃক প্রযুক্ত বিষ প্রভাবে হত হইলে, অথবা নিজেই বিষপান করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলে, সেই মৃতব্যক্তির দেহে সচরাচর আমরা সে সকল লক্ষণ বা চিহ্ন দেখিয়া থাকি, ইহাতে সেই প্রকারের একটিমাত্রও চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। তথাপি এই মৃত্যুর কারণ, বিষপ্রয়োগ ভিন্ন অন্য কোনো কিছুই মনে হইল না।

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    যে বাড়ীতে এই হত্যাকাণ্ড সংসাধিত হইয়াছে, সেই বাড়ীতে বিন্দু ব্যতীত এখন আর কেহই নাই। এ সম্বন্ধে বিন্দু যাহা অবগত আছে, তাহা তাহাকে আমরা সকলেই এক এক করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, এবং সে যাহা বলিয়াছিল, তাহাও উত্তমরূপে শ্রবণ করিয়াছিলাম। তাহার সারমর্ম্ম এইরূপ :—

    “প্রায় পাঁচ বৎসর হইতে আমি এই বাড়ীতে বসবাস করিতেছি। মল্লিকাও বোধ হয়, তিন বৎসরের অধিক এই স্থানে ছিল। কেবলমাত্র আমরা দুইজন এই বাড়ীতে বাস করিতাম বলিয়া, আমাদিগের মধ্যে বিলক্ষণ প্রণয় ছিল। রাত্রিকাল ব্যতীত প্রায় সমস্ত সময়ই আমরা একত্র যাপন করিতাম। আমাদিগের মধ্যে কোনরূপ কলহ বিবাদ কি আত্মবিচ্ছেদ কখন ঘটে নাই, এক-কথায় সহোদরা ভগিনীর ন্যায় আমরা উভয়ে এইস্থানে বাস করিয়া আসিতেছিলাম। আমাদিগের মধ্যে কেহই কোন ব্যক্তির রক্ষিতা ছিল না, সুতরাং উদরান্নের সংস্থান করিবার নিমিত্ত সন্ধ্যার পরই আমাদিগের উভয়কেই সদর দ্বারে গিয়া বসিতে হইত। ঈশ্বর আমাদিগের অদৃষ্টে যে দিবস যাহা লিখিতেন, সেইদিবস তাহাই উপার্জ্জন করিয়া আমরা আপন আপন গৃহে আসিয়া শয়ন করিতাম। আমার শরীর সম্পূর্ণরূপ সুস্থ নহে বলিয়া, আমি রাত্রি দশটার পর আর দ্বারে থাকিতাম না; দশটাও বাজিত, আমিও গিয়া আপন গৃহে শয়ন করিতাম। কিন্তু মল্লিকা অল্প উপার্জ্জনে সন্তুষ্ট হইত না, তাহার আশাও সহজে নিবৃত্ত হইত না। সুতরাং সে অধিক উপার্জ্জনের প্রত্যাশায় অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত সদর দ্বারে বসিয়া থাকিত। এমন দিনও ঘটিয়াছে দেখিয়াছি যে, সমস্ত রজনী উক্তরূপে বসিয়া বসিয়া রাত্রি প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গে মল্লিকা সর্বশেষে আপন গৃহে গিয়া শয়ন করিয়াছে।

    “অদ্য সন্ধ্যার সময় নিয়মিতরূপ বেশভূষা করিয়া আমরা উভয়েই সদর দ্বারে গিয়া উপবেশন করিয়াছিলাম। আমার অতি সামান্য যে দুই তিনখানি অলঙ্কার আছে আমার গাত্রে তাহাই ছিল; কিন্তু মল্লিকার গাত্রে অনেকগুলি অলঙ্কার ছিল। সে এই সামান্য উপার্জ্জনের মধ্য হইতে কিছু কিছু সঞ্চিত করিয়া অনেক দিবসে অনেকগুলি অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়াছিল, এবং প্রত্যহ সন্ধ্যার সময় সেই সমস্ত অলঙ্কার পরিধান করিয়া আমার সহিত সদর দ্বারে গিয়া উপবেশন করিত।

    “আমরা উভয়ে সদর দ্বারে গিয়া উপবেশন করিবার অতি অল্প সময় পরে একজন যুবক আসিয়া আমাদিগের সম্মুখে উপস্থিত হইল, এবং মল্লিকাকে ইঙ্গিত করিয়া আমাদিগের বাড়ীতে ভিতর প্রবেশ করিল। তাহারই প্রত্যাশায় সেই যুবক বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল, এই ভাবিয়া মল্লিকাও সেইস্থান হইতে উঠিয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল। সেই যুবকের আপাদ-মস্তক একখানি লালরঙ্গের র‍্যাপার দিয়া আবৃত ছিল, সুতরাং তাহার অবয়ব বা মুখের আকৃতি আমি উত্তমরূপে দেখিতে পাই নাই; অথচ উহাকে ইতিপূর্বে আমি যে কখন দেখিয়াছি, তাহাও আমার বোধ হয় না।

    “যে সময় আমরা উভয়েই সদর দ্বারে বসিয়াছিলাম, সে সময় মল্লিকার গৃহের দ্বার খোলা ছিল, এবং সেই গৃহের ভিতর একটি আলো জ্বলিতেছিল। যে সময় সেই অপরিচিত যুবক বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল, এবং মল্লিকা তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিল, সেই সময় আমি দেখিলাম যে, সেই যুবক মল্লিকাকে কোন কথা না বলিয়া একেবারে মল্লিকার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল। মল্লিকাও উহাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া, তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আপন গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল, এবং গৃহের দ্বার ভিতর হইতে বন্ধ করিয়া দিল। এই অবস্থা দেখিয়া আমার মনে হইল যে, সেই ব্যক্তি মল্লিকার নিকট নিশ্চয়ই উত্তমরূপে পরিচিত। কারণ, পূর্ব্ব হইতে সবিশেষরূপে পরিচিত না হইলে বিনা বাক্যব্যয়ে কেহই কাহারও গৃহের ভিতর প্রবেশ করিতে সাহসী হয় না। এই ভাবিয়া আমি সে দিকে আর কোনরূপ লক্ষ্য না করিয়া, নিজের অন্ন-চেষ্টা নিমিত্ত কিয়ৎক্ষণ সেইস্থানে বসিয়া থাকিলাম। পরিশেষে আমার ধূমপানের ইচ্ছা বলবতী হওয়ায় আমি সদর দ্বার হইতে উঠিয়া আপনার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলাম।

    “আমি আমার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিবার অতি অল্প সময় পরেই মল্লিকার গৃহের দ্বার খোলার শব্দে আমার নয়ন পুনরায় সেইদিকে আকৃষ্ট হইল। দেখিলাম যে, সেই আগন্তুক মল্লিকার গৃহের দ্বার খুলিয়া দ্রুতপদে গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া গেল। লালরঙ্গের র‍্যাপারের দ্বারা যেরূপভাবে তাহার সমস্ত শরীর আবৃত করিয়া সে সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল, গৃহ হইতে বহির্গত হইবার সময় ঠিক সেইরূপ ভাবেই আপন শরীর আচ্ছাদন করিয়া বহির্গত হইয়া গেল। আগন্তুক বহির্গত হইয়া গেল, কিন্তু মল্লিকা তাহার গৃহ হইতে বহির্গত হইল না, ইহাতে আমার মনে কেমন এক প্রকার সন্দেহের উদয় হইল। কারণ, কোন আগন্তুক আমাদিগের গৃহে আসিলে, সে যাহাতে পুনরায় আমাদিগের গৃহে আসে, তাহার নিমিত্ত আমরা তাহাকে বিশিষ্টরূপে যত্ন করিয়া থাকি, এবং পরিশেষে যখন সে গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া যায়, তখন তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রায়ই সদর দ্বার পর্য্যন্ত গমন করিয়া থাকি। সুতরাং মল্লিকাকে যখন তাহার গৃহ হইতেই বহির্গত হইতে দেখিলাম না, তখন আমি আমার গৃহ হইতেই মল্লিকাকে ডাকিলাম। দুই তিন বার ডাকিবার পরও যখন তাহার কোন প্রকার উত্তর পাইলাম না, তখন আমার হস্তস্থিত হুক্কা আমার গৃহে রাখিয়া, দুই এক পদ করিয়া ক্রমে মল্লিকার গৃহের নিকট গমন করিলাম। পুনরায় তাহাকে ডাকিলাম, কিন্তু তাহাতেও কোন উত্তর না পাইয়া আমি তাহার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলাম। আপনারা প্রথমে আসিয়া উহাকে যেরূপ অবস্থায় দেখিয়াছেন, আমিও গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া উহাকে ঠিক সেইরূপ অবস্থায় দেখিতে পাইলাম উহাকে বার বার ডাকিতে লাগিলাম। কিন্তু যখন কোনরূপেই উত্তরপ্রাপ্ত হইলাম না, তখন উহার গাত্রে হস্তার্পণ করিয়া ডাকিলাম, তাহাতেও কোনো উত্তর পাইলাম না। প্রথমে ভাবিয়াছিলাম, মল্লিকা নিদ্রিতা হইয়া পড়িয়াছে; কিন্তু পরক্ষণেই বুঝিলাম যে, সামান্য নিদ্রায় সে অভিভূতা হয় নাই, মহানিদ্রা আসিয়া তাহাকে আশ্রয় করিয়াছে! আরও দেখিলাম যে তাহার শরীরে যে সকল অলঙ্কারাদি ছিল তাঁহার চিহ্নমাত্রও নাই।

    “এই ব্যাপার দেখিয়া,—কি কর্তব্য, হঠাৎ তাহার কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, মল্লিকার গৃহ হইতে দ্রুতপদে বহির্গত হইয়া সদর দ্বারে গিয়া উপস্থিত হইলাম, দেখিলাম যে, নিকটে একজন পুলিস প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে, তাহাকে সমস্ত অবস্থা বলিলাম। আমার কথা শ্রবণ করিয়া সে কহিল, ‘অতি অল্পক্ষণ হইল, একজন লোক তোমাদিগের বাড়ি হইতে বহির্গত হইয়া পশ্চিমদিকে গমন করিয়াছে, উহার গাত্রে একখানি লালরঙ্গের র‍্যাপার আছে বলিয়া বোধ হয়।’ এই বলিয়া প্রহরী সেই ব্যক্তির উদ্দেশে পশ্চিমদিকে দ্রুতপদে গমন করিল, আমিও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিলাম। অনেক দূর পর্যন্ত গমন করিয়া নানাস্থানে তাহার অনুসন্ধান করিয়া দেখিলাম, কিন্তু কোন স্থানে তাহার কিছুমাত্র সন্ধান না পাইয়া, আপন বাড়ীতে প্রত্যাগমন করিলাম। পাহারাওয়ালাও আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আমাদিগের বাড়ীতে প্রবেশ করিল, এবং মল্লিকার অবস্থা স্বচক্ষে দর্শন করিয়া থানায় সংবাদ দিবে বলিয়া, বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গেল। ইহার কিয়ৎক্ষণ পরেই এক এক করিয়া আপনারা ক্রমে আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিলেন। উহার যে অলঙ্কারাদি ছিল, তাহা আমি উত্তমরূপে অবগত আছি, এবং সেই সকল অলঙ্কার পুনরায় দেখিলে আমি চিনিতে পারিব।”

    আমি। যাহাকে তুমি মল্লিকার গৃহে প্রবেশ করিতে এবং গৃহ হইতে বহির্গত হইতে দেখিয়াছ, সে কতক্ষণ পৰ্য্যন্ত মল্লিকার গৃহের ভিতর ছিল?

    বিন্দু। অতি অল্প সময় সে মল্লিকার গৃহের ভিতর ছিল; আমার বোধ হয় কুড়ি পঁচিশ মিনিটের অধিক হইবে না।

    আমি। যখন সেই ব্যক্তি মল্লিকার গৃহের দ্বার খুলিয়া বহির্গত হইয়া যায়, সেই সময় মল্লিকার গৃহ অন্ধকারময় ছিল, কিনা?

    বিন্দু। গৃহ অন্ধকারময় ছিল না, একটি প্রদীপ জ্বলিতেছিল। সেই ব্যক্তি বহির্গত হইয়া যাইবার পর আমি যখন মল্লিকাকে ডাকিতে যাই, সেই সময় সেই প্রদীপের সাহায্যেই আমি জানিতে পারি যে, মল্লিকা মরিয়া গিয়াছে, এবং তাহার অঙ্গের অলঙ্কার সকল অপহৃত হইয়াছে।

    আমি। তুমি এখনই বলিলে যে, প্রায় তিন বৎসর পর্য্যন্ত মল্লিকা তোমার সহিত একত্র বাস করিতেছে। এই তিন বৎসরের মধ্যে উহাকে তুমি কখন পীড়িত দেখিয়াছ? যদি দেখিয়া থাক, তাহা হইলে কি প্রকারের পীড়ার সে আক্রান্ত হইত?

    বিন্দু। আমার বোধ হয় মল্লিকার শরীরে কোনরূপ পীড়া ছিল না। কারণ গত তিন বৎসরের মধ্যে এক দিবসের নিমিত্তও আমি তাহাকে কোন প্রকার পীড়ায় পীড়িত হইতে দেখি নাই।

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    বিন্দু যে সকল কথা বলিল, তাহা কৰ্ম্মচারীমাত্রই সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করিলেন। তখন কোন্ উপায় অবলম্বন করিয়া এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইতে হইবে, সকলে তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। যে বাড়ির ভিতর এই ঘটনা ঘটিয়াছে, একা বিন্দু ব্যতীত অপর কেহই এখন আর সেই বাড়ীতে বাস করে না। সুতরাং জিজ্ঞাসাবাদ করা যাইতে পারে, এরূপ অপর কোন লোককেও পাওয়া গেল না। তথাপি বাড়ির নিকটবর্ত্তী অপরাপর স্ত্রীলোক ও পুরুষদিগকে জিজ্ঞাসা করা হইল; কিন্তু কেহই কোন কথা বলিতে পারিল না। এইরূপেই সমস্ত রাত্রি সেইস্থানে অতিবাহিত হইয়া গেল।

    পরদিবস অতি প্রত্যূষেই পুনরায় সেই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে লিপ্ত হইলাম। নিকটবর্ত্তী স্থান সকল উত্তমরূপে দেখিলাম, নিকটবর্তী লোকদিগকে উত্তমরূপে জিজ্ঞাসাবাদ করিলাম। নিকটবর্তী পরিচিত লোকদিগকে এই বিষয়ে আমাকে সাহায্য করিবার নিমিত্ত একান্ত অনুরোধ করিলাম, তাহারাও প্রাণপণে আমার সাহায্য করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন। এইরূপে সে দিবস অতিবাহিত হইয়া গেল, কিন্তু কাহা-কর্তৃক এই হত্যা সংসাধিত হইয়াছে, তাহার কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না। তাহার পরদিবসও সেই রূপে কাটিয়া গেল; কিন্তু কেহই কোন সংবাদ সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইল না।

    চতুর্থ দিবস প্রাতঃকালে পুনরায় আমি সেই স্থানের সন্নিকটবর্তী পরিচিত লোকদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে বহির্গত হইলাম। ইচ্ছা—যাঁহারা ইতিপূর্বে আমাকে সাধ্যমত সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন, তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিব ও দেখিব যে, এই বিষয়ের কোনরূপ সংবাদ তাঁহাদিগের মধ্যে কেহ কোনরূপ সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছে, কি না।

    মনে মনে এইরূপ নানাপ্রকার চিন্তা করিতে করিতে গমন করিতেই, এরূপ সময়ে অপর আর একজন পরিচিত ব্যক্তির সহিত পথে সাক্ষাৎ হইল। ইঁহার বাসস্থান ঘটনা স্থান হইতে বহুদূরবর্তী হইলেও, নিকটবর্ত্তী এক স্থানে তাঁহার সৰ্ব্বদা যাতায়াত আছে। আমাকে দেখিবামাত্রই তিনি কহিলেন, “কোন সবিশেষ কার্য্যোপলক্ষে আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিবার মনস্থ করিয়াছিলাম। কিন্তু ভালোই হইল যে, হঠাৎ সাক্ষাৎ হইয়া গেল। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করিতেছি, চাউল পট্টীতে যে খুন হইয়াছে, তাহার অনুসন্ধানে আপনি নিযুক্ত আছেন কি?”

    আমি। যে রাত্রিতে মল্লিকা হত্যা হইয়াছে, এবং তাহার যথাসর্ব্বস্ব অপহৃত হইয়াছে, সেই রাত্রি হইতেই আমি অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছি।

    পরিচিত ব্যক্তি। ইহার কোনরূপ সন্ধান করিতে সমর্থ হইয়াছেন কি?

    আমি। সন্ধান করিতে সমর্থ হওয়া ত পরের কথা, এরূপ কোন কথা এ পর্য্যন্ত জানিতে পারি নাই, যাহার উপর নির্ভর করিয়া সন্ধানে নিযুক্ত হইতে পারি।

    পরিচিত। আমি বোধ হয়, এ বিষয়ে আপনাকে কিছু সাহায্য করিতে সমর্থ হইব। কোন প্রয়োজনীয় কাৰ্য্যোপলক্ষে আমি এখন গমন করিতেছি। আপনি সময় মত আমার সহিত একবার সাক্ষাৎ করিবেন, যাহা কিছু আমি অবগত হইতে পারিয়াছি, এবং এই বিষয়ে যাহার উপর আমার সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে, তাহার সমস্ত অবস্থা আপনাকে আমি বলিয়া দিব। যে সময় আপনি আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন, সেই সময় অপহৃত দ্রব্যের একটি তালিকা সঙ্গে করিয়া আনিবেন।

    এই বলিয়া সেই পরিচিত ব্যক্তি তাঁহার কার্য্যোপলক্ষে গমন করিলেন। আমি সেইস্থানে দণ্ডায়মান হইয়া ভাবিতে লাগিলাম,—এখন কি করা যাইতে পারে? কোন্ সময়ে গমন করিলে উহার সহিত সাক্ষাৎ হইবার সম্ভাবনা, তাহা উঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম না। উনিই বা কোন সময়ে তাঁহার বাড়ীতে প্রত্যাগমন করিবেন, আর আমিই বা কোন সময়ে তাঁহার বাড়িতে গমন করিলে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিব, একথা আমার জানিয়া লওয়া উচিত ছিল। যাহা হউক, যখন উঁহার কথার ভাবে অনুমান হইতেছে যে, এ সম্বন্ধে ইনি কোন না কোন সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছে, তখন যেরূপেই হউক বা যে সময়েই হউক, উঁহার সহিত আমাকে সাক্ষাৎ করিতেই হইবে। আমিও যখন এই কার্য্যের নিমিত্ত নিযুক্ত আছি, তখন আর কোনস্থানে গমন না করিয়া উঁহারই বাড়িতে গিয়া বসিয়া থাকি, তাহা হইলে যখনই কেন উনি প্রত্যাগমন করুন না, তখনই আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে।

    মনে মনে এইরূপ সিদ্ধান্তই স্থির করিয়া আমি সেইস্থান হইতে সেই পরিচিত ব্যক্তির বাড়ীতেই গমন করিলাম, এবং যে পর্য্যন্ত তিনি প্রত্যাগমন না করিলেন, সেই পৰ্য্যন্ত সেইস্থানে বসিয়া রহিলাম।

    দিবা প্রায় বারটার সময় তিনি আপন বাড়িতে প্রত্যাগমন করিলেন, এবং সম্মুখেই আমাকে দেখিতে পাইয়া কহিলেন, “আপনি কতক্ষণ হইতে আমার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন?”

    আমি। আপনার সহিত সাক্ষাৎ হইবার পর হইতেই আমি এইস্থানে আগমন করিয়াছি, এবং আপনার প্রত্যাশায় বসিয়া আছি।

    পরিচিত। মৃতা স্ত্রীলোকের যে সকল দ্রব্যাদি অপহৃত হইয়াছে, তাহার মধ্যে সোণার বালা আছে কি?

    আমি। আছে বৈ কি। একজোড়া সোণার বালা, যাহা মল্লিকা হস্তে পরিয়াছিল, তাহা পাওয়া যাইতেছে না।

    পরিচিত। সেই বালা কি প্রকারের?

    আমি। ডায়মণ্ডকাটা বাঘমুখো বালা।

    পরিচিত। ভালো, আপনি চৈতন্যকে চিনেন কি?

    আমি। কোন্ চৈতন্য, চৈতন্য দাস। সে চাউল পট্টীর নিকটেই থাকে, এবং যে চুরি মোকদ্দমায় চারি পাঁচ বার মেয়াদ খাটিয়াছে, সেই চৈতন্য?

    পরিচিত। হাঁ, সেই চৈতন্য।

    আমি। তাহাকে আমি উত্তমরূপে জানি।

    পরিচিত। এই মোকদ্দমা সম্বন্ধে আপনারা তাহাকে উত্তমরূপে দেখিয়াছেন কি?

    আমি। কেন, তাহার উপর এ বিষয়ের সন্দেহ হয় কি?

    পরিচিত। সে বিষয়ে সন্দেহ না হইলে আর আপনাকে বলিতেছি কেন?

    আমি। কি কারণে তাহার উপর আপনার সন্দেহ হইয়াছে?

    পরিচিত। মূল কারণ পরে বলিতেছি। কিন্তু যে ব্যক্তি ঘটনার এত নিকটবর্ত্তী স্থানে বাস করে, এবং চুরি করা অপরাধে যে ব্যক্তি একাদিক্রমে কয়েকবার কারাগারে বাস করিয়া আসিয়াছে, সে যে এ বিষয়ের কিছুমাত্র অবগত নহে, তাহা ত প্রথমতঃই অসম্ভব বোধ হয়।

    আমি। যদি তাহার উপর আপনার নিতান্তই সন্দেহ হইয়া থাকে, তাহা হইলে সে সন্দেহের সহজেই ভঞ্জন করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। চৈতন্য দাস একে নিতান্ত সামান্য লোক, তাহার উপর পুরাতন চোর; এরূপ লোক সম্বন্ধে উত্তমরূপে অনুসন্ধান করা নিতান্ত কঠিন কৰ্ম্ম নহে।

    পরিচিত। আমি নিশ্চয় বলিতে পারি যে, এই কাণ্ড চৈতন্যের দ্বারাই সম্পাদিত হইয়াছে। একথা কি নিমিত্ত বলিতেছি, তাহারও বিশিষ্ট কারণ আছে। শ্রবণ করিলে আপনাকেও আমার মতের পোষকতা করিতে হইবে। আমার একজন বিশ্বাসী বন্ধু কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে জনৈক পোদ্দারের দোকানে বসিয়াছিলেন। সেই সময় চৈতন্য দাস একগাছি ডায়মণ্ডকাটা বাঘমুখো বালা লইয়া সেই পোদ্দারের দোকানে গমন করে, এবং তাহার নিকট সেই বালা বিক্রয় করিয়া আইসে। এই অবস্থা আমার বন্ধু স্বচক্ষে দর্শন করিয়াছেন। আবশ্যক হইলে তাঁহার নামও আমি আপনার নিকট প্রকাশ করিতে প্রস্তুত আছি।

    আমি। চৈতন্যের আজকাল যেরূপ অবস্থা, তাহাতে সে সোণার বালা কোথা পাইবে? আপনি যাহা কহিলেন, তাহা যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে এক কাৰ্য্য চৈতন্য ব্যতীত অপর কাহারও দ্বারা সম্পাদিত হয় নাই। কোন পোদ্দারের নিকট চৈতন্য বালা বিক্রয় করিয়াছে, তাহার নাম ও ঠিকানা যদি আপনি আমাকে বলিয়া দেন, তাহা হইলে এখনই গমন করিয়া আমি সে সম্বন্ধে যাহা কিছু অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, তাহা শেষ করিয়া ফেলিতে পারি। এ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিতে বিলম্ব করা আর কোনরূপেই কর্তব্য নহে। বিশেষতঃ চৈতন্য যে প্রকারের বালা বিক্রয় করিয়াছে বলিতেছেন, মল্লিকার অপহৃত বালাও ঠিক সেই প্রকারের।

    আমার এই কথা শ্রবণ করিয়া পরিচিত ব্যক্তি সেই পোদ্দারের নাম ও ঠিকানা আমাকে গোপনে বলিয়া দিলেন। সুতরাং তাঁহার নাম গোপনে রাখিলাম।

    ইঁহার নিকট হইতে এই সকল ব্যাপার অবগত হইয়া আমার মনে দৃঢ়বিশ্বাস হইল যে, চৈতন্য দাস নিজেই এই অভিনয়ের নেতা, সে স্বহস্তে এই কাৰ্য সম্পাদন না করিলে তাহারই সহায়তায় এই কাৰ্য সম্পাদিত হইয়াছে; নতুবা একগাছি বালা সে কোথায় পাইবে? আরও ভাবিলাম যে, এরূপ অবস্থায় আমার প্রথমে কোন্ দিকে গমন করা উচিত? পোদ্দারের নিকট গিয়া এই বিষয়ের অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, কি অগ্রে চৈতন্যের নিকট গমন করিয়া প্রথমে তাহাকেই জিজ্ঞাসা করা উচিত? এ সম্বন্ধে কিয়ৎক্ষণ চিন্তার পর, ন্যায় হউক বা অন্যায় হউক, মনে মনে স্থির করিলাম, অগ্রে পোদ্দারের নিকট গমন করাই কর্তব্য। কারণ, সে যদি প্রকৃতকথা কহে, এবং তাহার নিকট হইতে যদি সেই সোণার বালা পাওয়া যায়, তাহা হইলে সেই বালা বিক্রয় সম্বন্ধে পরিশেষে চৈতন্য আর কোনরূপেই অস্বীকার করিতে পারিবে না। তখন অনায়াসেই আমরা আমাদিগের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে সমর্থ হইব। এই ভাবিয়া প্রথমে সেই পোদ্দারের দোকান অভিমুখেই গমন করিলাম।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    আমার পরিচিত ব্যক্তি যে পোদ্দারের কথা বলিয়া দিয়াছিলেন, তাহার দোকানে গমন করিয়া দেখিলাম যে, সেই পোদ্দারও আমার নিকট একবারে অপরিচিত নহে। এই ঘটনার কিছুদিবস পূর্ব্বে কোন এক কাৰ্য্যোপলক্ষে সেই পোদ্দারকে আমার নিকট আসিতে হয়। সুতরাং সেই সময় হইতেই আমরা উভয়ে উভয়ের নিকট পরিচিত। যাহা হউক, আমাকে দেখিবামাত্র পোদ্দার কহিল, “কি মহাশয়! কোথায় গমন করিতেছেন?”

    আমি। অন্য কোনস্থানে গমন করিতেছি না, তোমারই নিকট আগমন করিয়াছি।

    পোদ্দার। আমার নিকট, কেন মহাশয়?

    আমি। প্রয়োজন না থাকিলে আর কে কাহার নিকট আগমন করিয়া থাকে? যে সময় তোমার প্রয়োজন হইয়াছিল, সেই সময় তুমি আমার নিকট গমন করিয়াছিলে; এখন আমার প্রয়োজন হইয়াছে, সুতরাং আমাকে তোমার নিকট আসিতে হইয়াছে।

    পোদ্দার। যে কার্য্যের নিমিত্ত আমি আপনার নিকট গমন করিয়াছিলাম, সেই কার্য্য আপনার অনুগ্রহেই সম্পন্ন হয়। সুতরাং যে কার্য্যের নিমিত্ত আপনি আমার নিকট আগমন করিয়াছেন, আমার সাধ্যানুসারী হইলে তাহাও এখনই সম্পাদিত হইবে। এখন আমাকে কি করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।

    আমি। যাহা হউক, এখন আমার জিজ্ঞাস্য এই, তুমি দুই এক দিবসের মধ্যে কোন ব্যক্তির নিকট হইতে কোন অলঙ্কার খরিদ করিয়াছ কি?

    পোদ্দার। অনেকের নিকট হইতে অনেক অলঙ্কার খরিদ করিয়াছি। যদি কোন অলঙ্কার সম্বন্ধে আপনার জানিবার প্রয়োজন থাকে, তাহা আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলুন। আমি যাহা অবগত আছি, তাহা এখনই আমি আপনাকে বলিয়া দিতেছি।

    আমি। স্মরণ করিয়াই হউক বা খাতাপত্র দেখিয়াই হউক, বল দেখি, একগাছি ডায়মণ্ডকাটা বাঘমুখো সোণার বালা তুমি ইহার মধ্যে খরিদ করিয়াছ কি না? যদি খরিদ করিয়া থাক, তাহা হইলেই বা উহা তুমি কাহার নিকট হইতে, এবং কত মূল্যে খরিদ করিয়াছ?

    পোদ্দার। কেন মহাশয়! উহা কি অপহৃত দ্রব্য?

    আমি। সে কথা পরে বলিব। এখন আমার কথার উত্তর অগ্রে প্রদান কর।

    পোদ্দার। আপনি যেরূপ কহিলেন, সেই প্রকারের একগাছি বালা আমি খরিদ করিয়াছি।

    আমি। কাহার নিকট হইতে খরিদ করিয়াছ?

    পোদ্দার। চৈতন্য দাস নামক এক ব্যক্তির নিকট হইতে।

    আমি। সে বালা এখন কোথায়?

    পোদ্দার। দোকানেই আছে।

    আমি। উহা বাহির করিয়া আমাকে দেখাও। দেখিলে আমি বোধ হয়, চিনিতে পারিব। যে বালার নিমিত্ত আমি অনুসন্ধান করিতেছি, ইহা সেই বালা কি না, বুঝিতে পারিব।

    আমার কথা শ্রবণ করিয়া পোদ্দার তাহার বাক্স হইতে একগাছি সোণার বালা বাহির করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিল ও কহিল, “এই বালা আমি খরিদ করিয়াছি।”

    পোদ্দারের হস্ত হইতে বালাগাছাটি গ্রহণ করিয়া আমি উত্তমরূপে দেখিলাম। মল্লিকার হস্তে যে প্রকারের বালা পরিহিত ছিল বলিয়া বিন্দু আমাদিগকে বলিয়াছিল, ইহাও সেই প্রকারের বালা বলিয়া বোধ হইতে লাগিল।

    “কি নিমিত্ত আমি এই বালার অনুসন্ধান করিতেছি, তাহা একটু পরে আসিয়া আমি তোমাকে বলিয়া যাইব, এবং সেই বালা যদি না হয়, তাহা হইলে ইহাও তোমাকে প্রত্যার্পণ করিয়া যাইব। যে পৰ্য্যস্ত আমি প্রত্যাগমন না করিব, তাহার মধ্যে যাহার নিকট হইতে তুমি এই বালা খরিদ করিয়াছ, তাহাকে যদি দেখিতে পাও, তাহা হইলে তাহাকে এইস্থানে বসিয়া রাখিবে।” এই বলিয়া বালাসহ আমি সেইস্থান পরিত্যাগ করিলাম।

    চাউল পট্টীর যে বাড়ীতে মল্লিকা হত ও তাহার দ্রব্যাদি অপহৃত হইয়াছিল, দ্রুতপদে আমি সেই বাড়ীতে গমন করিলাম। বিন্দু তখন বাড়ীতেই ছিল, সেই বালা তাহাকে দেখাইবামাত্র সে বলিয়া উঠিল, “ইহা মল্লিকার বালা। যে দিবস মল্লিকা হত হয়, সেইদিবস সন্ধ্যার সময় এই বালা তাহার হস্তে ছিল।”

    বিন্দুর এই কথা শুনিয়া সেইস্থানে আর তিলার্দ্ধ বিলম্ব করিলাম না। আমি চৈতন্যের বাড়ী চিনিতাম, অপর দুই তিন জন কর্ম্মচারীকে সঙ্গে লইয়া একবারে তাহার বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। চৈতন্য বাড়ীতেই ছিল, সুতরাং তাহাকে পাইতে আর কোনরূপ কষ্টই হইল না। আমি তাহাকে লইয়া সেই পোদ্দারের দোকানে পুনরায় গমন করিলাম, অপরাপর কর্মচারীগণ চৈতন্যের বাড়িতেই বসিয়া রহিলেন।

    পোদ্দারের দোকানে উপস্থিত হইবামাত্র ইহাকে দেখিয়া পোদ্দার একবারে বলিয়া উঠিল, ‘মহাশয়! আমি ইহারই নিকট হইতে এই বালা খরিদ করিয়াছি। ইহারই নাম চৈতন্য দাস।’

    তখন আমি চৈতন্যকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কেমন হে! তুমি এই বালা বিক্রয় করিয়াছ?”

    চৈতন্য। হাঁ মহাশয়! আমি এই বালা বিক্রয় করিয়াছি।

    আমি। একগাছি বিক্রয় করিয়াছ, কি দুই গাছিই বিক্রয় করিয়াছ?

    চৈতন্য। একগাছি বিক্রয় করিয়াছি।

    আমি। অপর আর একগাছি কোথায়?

    চৈতন্য। আমার একগাছি বই ছিল না।

    আমি। এই একগাছি বালা তুমি কোথায় পাইলে?

    চৈতন্য। আমার ভগিনীর নিকট হইতে পাইয়াছি। এই বালা তিনি আমাকে বেঁচিতে দিয়াছিলেন; সুতরাং আমি উহা বিক্রয় করিয়াছি, এবং উহার মূল্য আমি তাঁহাকেই প্রদান করিয়াছি।

    আমি। তোমার ভগিনী কেথায় থাকেন?

    চৈতন্য। তিনি তাঁহার শ্বশুর বাড়ীতে থাকেন।

    আমি। তাহার শ্বশুর বাড়ী কোথায়?

    চৈতন্য। কলিকাতার বহুবাজারে।

    আমি। মিথ্যা কথা। এ বালা কিছুতেই তোমার ভগিনীর হইতে পারে না।

    এই সময় সেই পোদ্দার পুনরায় আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘মহাশয়! এ ব্যক্তি এই বালা কি চুরি করিয়া আনিয়া বিক্রয় করিয়াছে।’

    আমি। এক হিসাবে চুরি বটে। এ চুরি সামান্য নহে।

    পোদ্দার। কি প্রকারের চুরি?

    আমি। চাউলপট্টীতে খুন হইয়াছে শুনিয়াছ?

    পোদ্দার। শুনিয়াছি।

    আমি। হত্যাকারী মল্লিকানাম্নী একজন বারবনিতাকে হত্যা করিয়া তাহার যে সকল দ্রব্য অপহরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে, সেই সকল অপহৃত দ্রব্যের মধ্যস্থিত ইহা একটি দ্রব্য।

    পোদ্দার। কি সর্বনাশ!

    এই বলিয়া পোদ্দার আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিল না, এবং এই বালা যে পুনরায় ফিরিয়া পাইবে, সে আশাও না করিয়া, চৈতন্য দাসকে সহস্র গালি দিতে দিতে আপন দোকানে গিয়া উপবেশন করিল।

    আমি চৈতন্যকে সেইস্থান হইতে পুনরায় তাহার বাড়ীতে লইয়া গেলাম, অপরাপর কর্ম্মচারীগণ আমার প্রত্যাশায় সেইস্থানেই অপেক্ষা করিতেছিলেন। আমার নিকট হইতে আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া তাঁহারও মনে মনে স্থিরসিদ্ধান্ত করিলেন যে, চৈতন্যের দ্বারাই এই হত্যাকাণ্ড সংসাধিত হইয়াছে। চৈতন্যের গৃহ তখন উত্তমরূপে সন্ধান করা হইল; কিন্তু অপর কোন অলঙ্কার তাহার গৃহ হইতে পাওয়া গেল না। এখন সকলের মনে সন্দেহ হইল যে, সমস্ত অলঙ্কারই এ বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছে। এখন যে পোদ্দারের নিকট হইতে বালা পাওয়া গেল, তাহার নিকট আরও কোন দ্রব্য আছে, কি না? আর যদি থাকে, তাহা হইলে সে এখন আর স্বীকার করিবে, কি না? তাহাই ঠিক করিতে হইবে।

    চৈতন্যের বাড়িতে যখন অপর আর কোন অলঙ্কার পাওয়া গেল না, তখন চৈতন্য যাহা বলিয়াছিল, সে সম্বন্ধে একটু সন্ধান করা নিতান্ত আবশ্যক মনে হইল। চৈতন্যকে সঙ্গে লইয়া বহুবাজারে গমন করিলাম। অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিলাম যে, তাহার ভগিনী বাস্তবিকই বহুবাজারে তাহার স্বামীর গৃহে বাস করিয়া থাকে। তাহার স্বামী বড় মানুষ না হইলেও, নিতান্ত সামান্য লোক নহে। যে বাড়ীতে তাহারা বাস করে, সে বাড়ী তাহাদিগের নিজের এবং বাড়ীর অবস্থা দেখিয়া তাহাদিগকে নিতান্ত দরিদ্র বলিয়া বোধ হয় না। যাহা হউক, সেই বালা গাছাটি চৈতন্যের ভগিনীর হস্তে দিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, এই বালা কাহার, তাহা তিনি বলিতে পারেন, কি না? উত্তরে তিনি কহিলেন, এই বালা কাহার, তাহা তিনি অবগত নহেন; ইহার পূর্ব্বে এই বালা তিনি কখন দর্শন করেন নাই। তাহার নিকট হইতে এই অবস্থা অবগত হইয়া বুঝিতে পারিলাম যে, চৈতন্য দাস মিথ্যা কথা বলিয়া আমাদিগকে বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিল। চৈতন্য যখন তাহার ভগিনীর কথা শুনিল, এবং যখন জানিতে পারিল, মল্লিকাকে হত্যা করা অপরাধে সে ধৃত হইয়াছে, তখন তাহার মুখ শুখাইয়া গেল। সে অতিশয় ভীত হইয়া বার বার বলিতে লাগিল, “আমি চোর সত্য; কিন্তু হত্যাকারী নহি। পূর্ব্বে কয়েকবার চুরি করা অপরাধে দণ্ড পাইয়াছি সত্য; কিন্তু হত্যাকার্য্যে কখন হস্তার্পণ করি নাই। আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, অতঃপর এই বালা সম্বন্ধে আমি প্রকৃতকথা বলিব। অনুসন্ধান করিলেই আপনারা জানিতে পারিবেন যে, আমি প্রকৃতকথা বলিতেছি, কি না, এবং এই হত্যাকাণ্ডের আমি সংসৃষ্ট ছিলাম, কি না।”

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    চৈতন্যের শেষ কথার উত্তরে তাহাকে কহিলাম, “এই বালা সম্বন্ধে তুমি এখন প্রকৃতকথা বলিতে চাহিতেছ, বল। তোমার কথা শুনিলেই বুঝিতে পারিব, তুমি মিথ্যা কথা কহিতেছ, কি না?”

    চৈতন্য। যেরূপ উপায়ে আমি এই বালা প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহার প্রকৃত অবস্থা বলিলে আমাকে পুনরায় জেলে গমন করিতে হইবে, এই নিমিত্ত আমি প্রকৃত কথা গোপন করিয়া এতক্ষণ পৰ্য্যন্ত মিথ্যা কথা কহিতেছিলাম। কিন্তু এখন আমি যে বিষয় জানিতে পারিলাম, তাহাতে আর প্রকৃতকথা গোপন করা কর্ত্তব্য নহে। কারণ, প্রকৃতকথা বলিলে বড়জোর জেলে যাইব, নতুবা হত্যাপরাধে আমাকে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলিতে হইবে।

    আমি। তুমি এখন কিরূপ অবস্থায় পতিত, তাহা যদি আপনা-আপনিই বুঝিতে পারিয়া থাক, তাহা হইলে তুমি প্রকৃতকথা বলিলেও বলিতে পার। ইহা আমরা এখন অনুমান করিতে পারিতেছি।

    চৈতন্য। বিশ্বাস করুন বা না করুন, আমি কিন্তু আর মিথ্যা কথা কহিব না। যে দিবস আমি এই বালা বিক্রয় করিয়াছি, সেইদিবস প্রাতঃকালে আমাদিগের পাড়ার একটি বালকের নিকট এই বালা দেখিতে পাই। সে এই বালা যে কোথা পাইল, তাহা আমি অবগত নহি। কিন্তু একটি ছল অবলম্বন করিয়া আমি এই বালা তাহার নিকট হইতে গ্রহণ করি, এবং পরিশেষে পোদ্দারের দোকানে গমন করিয়া উহা বিক্রয় করিয়া ফেলি। সেই বালকের মাতা পরিশেষে এই অবস্থা জানিতে পারিয়া আমার নিকট আগমন করে, এবং পুলিসে গিয়া আমার নামে নালিস করিবে বলিয়া ভয় প্রদর্শন করে। যাহাতে সে কোনরূপ গোলযোগ না করে, এই নিমিত্ত দশটি টাকা আমি তাহাকে প্রদান কর, সে তাহাতেই সন্তুষ্ট হইয়া চলিয়া যায়।

    আমি। এ অসম্ভব কথা। এই প্রকারে তুমি বালকের হস্ত হইতে কোনরূপেই পাইতে পার না। ইহা বালকের বালা নহে, এ বালা বড় হাতের; সুতরাং বালক এ বালা কিরূপে প্রাপ্ত হইবে? আর, একগাছি সোণার বালার পরিবর্তে তাহার মাতা কেবলমাত্র দশটি টাকা লইয়া যে সন্তুষ্ট হইবে, তাহাও ঠিক মনে ধরে না।

    চৈতন্য। আমি প্রকৃতকথা বলিতেছি। আপনি আমার সঙ্গে চলুন, আমি সেই বালক ও তাহার মাতাকে দেখাইয়া দিব। তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেই জানিতে পারিবেন, আমি এখনও মিথ্যা কথা কহিতেছি, কি না।

    আমি। সেই বালকের বাসস্থান কোথায়?

    চৈতন্য। তাহারা আমাদিগের পাড়াতেই বাস করিয়া থাকে।

    আমি। সেই বালকের বয়ঃক্রম কত হইবে?

    চৈতন্য। বোধ হয়, দশ এগার বৎসর হইবার সম্ভাবনা।

    সত্য হউক আর মিথ্যা হউক, চৈতন্য যাহা কহিল, তাহা একবার দেখা আবশ্যক। এই বিবেচনায় চৈতন্যকে সঙ্গে লইয়া সেই বালকের উদ্দেশে গমন করিলাম, যে পাড়ায় চৈতন্যের বাস, সেই পাড়ার ভিতর প্রবেশ করিবার কালীন একটি বালককে দেখাইয়া দিয়া চৈতন্য কহিল, “এই সেই বালক।” অপরাপর বালকগণের সহিত সেই বালক সেইস্থানে খেলা করিতেছিল। ডাকিবামাত্র সেই আমার নিকট আগমন করিল। তখন চৈতন্যকে দেখাইয়া দিয়া আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “বল দেখি, তুমি এই লোকটিকে চেন?”

    বালক। চিনি, এ চোর আমাদিগের পাড়ায় থাকে।

    আমি। এ চোর, তুমি কি প্রকারে জানিলে?

    বালক। সকলেই বলে চৈতন্য চোর। সে দিবস আমি একগাছি বালা পাইয়াছিলাম, তাহাও সে আমার নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছে।

    আমি। এই বালা তুমি কাহার নিকট পাইয়াছিলে?

    বালক। কাহারও নিকট হইতে পাই নাই, কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম।

    আমি। যে স্থানে কুড়াইয়া পাইয়াছিলে, সেই স্থানটি আমাকে দেখাইয়া দিতে পার?

    বালক। পারি বৈ কি! আমার সঙ্গে আসুন, আমি এখনই সেইস্থান আপনাকে দেখাইয়া দিতেছি।

    এই বলিয়া উক্ত বালক আমাকে সঙ্গে লইয়া একটি বাগানের ভিতর প্রবেশ করিল। কালীঘাটের পার্শ্ব দিয়া যে গঙ্গা প্রবাহিত হইয়াছে, এবং যাহা আদিগঙ্গা বলিয়া সকলের পরিচিত, সেই আদিগঙ্গার পূর্ব পার্শ্বস্থ একটি বাগানের ভিতর উক্ত বালক আমাকে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ করিল, এবং এক স্থানের একটি পুরাতন ও ভগ্ন সোপানাবলী দেখাইয়া দিয়া কহিল, “সেইদিবস প্রাতঃকালে আমি এইস্থানে আগমন করিয়াছিলাম। সেই সময় এই সোপানের নিম্নদেশে একগাছি বালা দেখিতে পাইয়া উহা উঠাইয়া লই। কিন্তু বাড়ী যাইবার সময় রাস্তায় চৈতন্যের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। সে আমার হস্তে বালা দেখিতে পাইয়া আমার নিকট হইতে উহা কাড়িয়া লয়, এবং সেই স্থান হইতে দ্রুতবেগে প্রস্থান করে।”

    বালকের কথা শুনিয়া তখন বিশ্বাস হইল যে, চৈতন্য এ পর্য্যন্ত যে কথা বলিয়াছে, তাহা প্রকৃত। কিন্তু এইস্থানে সেই বালা আসিল কি প্রকারে?

    যে স্থানে সেই বালক বালা পাইয়াছিল, সেইস্থান ও তাহার নিকটবর্ত্তী স্থান সকল উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু সেইস্থানে কিছুই প্রাপ্ত হইলাম না। সেই সোপানাবলীর কিছুদূর অন্তরে কলাগাছের একটি ঝাড় ছিল; তাহার নিকটে যখন গমন করিলাম, তখন একখানি কাপড় সেইস্থানে পড়িয়া আছে দেখিতে পাইলাম। সেই কাপড়খানি উঠাইলাম, এবং উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম। উহার ভিতর একটি সোণার মাড়ি প্রাপ্ত হওয়া গেল। এখন চৈতন্যের ও বালকের কথা আরও বিশ্বাস হইল। সেই মাড়ি এবং কাপড় বিন্দুকে দেখাইলে সে কহিল, ‘এ উভয় দ্রব্যই মল্লিকার।’

    কি প্রকারে সেই সকল দ্রব্য সেইস্থানে গমন করিল, তাহার কোন প্রমাণ প্রাপ্ত হইলাম না; সুতরাং সে বিষয়ের কোনরূপ স্থির-সিদ্ধান্তও করিয়া উঠিতে পারিলাম না। তখন মনকে এই বলিয়া বুঝাইলাম যে, হত্যাকারী অপহৃত দ্রব্যাদি উক্ত কাপড়ে করিয়া সেই নির্জ্জন স্থানে প্রথমে লইয়া যায়, এবং সেইস্থানে বসিয়া অপহৃত দ্রব্য সকল হয় নিজেই গ্রহণ করে, বা তাহার সহিত যদি অপর কোন ব্যক্তি থাকে, তাহা হইলে এইস্থানে বসিয়া অপহৃত দ্রব্য বিভাগ করিয়া লয়। বিভাগের সময় হয় ত এই বালা স্থানচ্যুত হইয়া পড়ে; সুতরাং অন্ধকারে উহারা তাহা দেখিতে পায় নাই। আর যে কাপড় পাওয়া গেল, বোধ হয় সেই কাপড়ে করিয়া উহারা দ্রব্যাদি প্রথমে লইয়া খায়, এবং উক্ত স্থানে গিয়া সেই সকল দ্রব্যাদি গ্রহণ করিয়া কাপড়খানি দূরে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া যায়। মাড়িটা উহারা দেখিতে পায় নাই; সুতরাং উহা কাপড়ের ভিতরই রহিয়া গিয়াছে।

    অনুসন্ধান করিয়া যে পথ পাইয়াছিলাম, তাহা পুনরায় এইস্থানে শেষ হইয়া গেল। চোর হইলেও চৈতন্যকে আর রাখিতে পারিলাম না। বুঝিলাম যে, এ হত্যা তাহাদ্বারা হয় নাই; সুতরাং তাহাকে ছাড়িয়া দিতে হইল।

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    উপস্থিত মোকদ্দমা সম্বন্ধে আমাদিগের মনে মনে যে একটু আশার সঞ্চার হইয়াছিল, চৈতন্যকে ছাড়িয়া দেওয়ার পর হইতেই সে আশা দূরে পলায়ন করিল। এখন কোন্ পন্থা অবলম্বন করিয়া পুনরায় অনুসন্ধানে লিপ্ত হওয়া যায়, মনে মনে তাহারই চিন্তা করিতে লাগিলাম।

    মল্লিকার শব ছেদ করিয়া যে ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছিলেন, সেই সময়ে সেই ডাক্তার সাহেবের পরীক্ষার ফল আমরা জানিতে পারিলাম। তখন বুঝিলাম, মল্লিকার মৃত্যুর কারণ শবচ্ছেদকারী ডাক্তার সাহেব কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই। তাহার উদরের অভ্যন্তরে আহারীয় প্রভৃতি যে সকল দ্রব্যাদি ছিল, তাহার সমস্তই পরীক্ষার নিমিত্ত রাসায়নিক পরীক্ষকের (Chemical Examiner) নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন। কারণ, যদি কোনরূপ বিষপ্রয়োগে মল্লিকার মৃত্যু হইয়া থাকে, তাহা হইলে রাসায়নিক পরীক্ষক তাহা স্থির করিতে পারিবেন। এই কথা ইংরাজী বিজ্ঞান বলিয়া থাকেন।

    চৈতন্যকে ছাড়িয়া দেওয়ার পর আরও দুই তিন দিবস অতীত হইয়া গেল। কিন্তু কোনস্থান হইতে কোনরূপ বিশিষ্ট সন্ধান পাওয়া গেল না। যখন আর কোন পথ পাইলাম না, তখন মনে মনে কেবলমাত্র দুর্ভাবনা হইতে লাগিল। ভাবিলাম, আমাদিগের কর্তৃক এই মোকদ্দমা ধরা পড়িবার আর কোন আশা নাই।

    মনে মনে নিরাশ হইয়া এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান পরিত্যাগ করিয়া, অন্য কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিব, এইরূপ স্থির করিতেছি, এরূপ সময়ে হঠাৎ চৈতন্য আসিয়া একদিবস আমার নিকট উপস্থিত হইল। চৈতন্যকে দেখিয়া আমি কহিলাম, “কিহে চৈতন্য! কোথা হইতে অসময়ে আসিয়া হঠাৎ উপস্থিত হইলে?”

    চৈতন্য। আমাদিগের আর সময় অসময় কি? মনে করিলাম, আপনার সহিত একবার সাক্ষাৎ করিব। তাই আপনার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলাম।

    আমি। কি নিমিত্ত আসিয়াছ? আমার দ্বারা তোমার কোন উপকার হইতে পারে, এমন কোন কার্য্যের নিমিত্ত যদি আসিয়া থাক বল; সাধ্যমত তোমার উপকার করিতে আমি প্রস্তুত আছি।

    চৈতন্য। আমার নিজের কোন কার্য্যের নিমিত্ত আপনার নিকট আগমন করি নাই। আপনি আমাকে ফাঁসী হইতে বাঁচাইয়াছেন; সুতরাং আমি যদি আপনার কোনরূপ উপকার করিতে পারি, এই ভাবিয়া এই কয়েক দিবস অনেক পরিশ্রম করিয়াছি, এবং একটু সামান্য সন্ধানও প্ৰাপ্ত হইয়াছি। কিন্তু তাহার দ্বারা আপনার কোন ফল হইবে কি না, তাহা কিন্তু আমি বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

    আমি। তোমার কথা শুনিয়া আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম। কারণ, প্রথমতঃ আমার দ্বারা তোমার কোনরূপ উপকারই হয় নাই। দ্বিতীয়তঃ কোন চোর কাহারও কর্তৃক কোনরূপ উপকার প্রাপ্ত হইলে প্রত্যুপকার করা দূরে থাকুক, কিসে তাহার অনিষ্ট করিতে পারিবে, তাহারই চেষ্টা দেখিয়া থাকে।

    চৈতন্য। আমি আপনার কর্তৃক কোনরূপ উপকার প্রাপ্ত হই নাই, একথা বলিবেন না। কারণ, যখন কোন পুলিস-কৰ্ম্মচারি কোন খুনি মোকদ্দমার অনুসন্ধানে নিযুক্ত থাকেন, তখন যদি কাহারও উপর সেই হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে সন্দেহ হয়, এবং তাহার বিপক্ষে অতি সামান্য পরিমাণ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা হইলে অধুনাতন পুলিস কর্মচারীর হস্ত হইতে তাহার আর রক্ষা থাকে না। সেই তিল পরিমাণ প্রমাণকে তাল করিয়া তাহারই উপর সমস্ত ভার চাপাইয়া দিয়া, সামান্য যশোলাভের প্রত্যাশায় পুলিস তাহার সর্ব্বনাশ করিয়া থাকেন। কিন্তু আপনার হস্তে আমি যেরূপে পতিত হইয়াছিলাম, যেরূপ অবস্থায় আমার নিকট হইতে অলঙ্কার বাহির হইয়াছিল, তাহাতে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস হইয়াছিল যে, কেহই আমার নির্দোষিতার প্রমাণ স্বরূপ আমার কোন কথাই শুনিবেন না; অধিকন্তু আমার বিপক্ষে আরও একটু আধটু প্রমাণের সংগ্রহ করিয়া লইয়া আমাকে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলাইয়া দিবেন। কারণ, আজকাল পুলিস-কর্ম্মচারীগণের এইরূপই ধৰ্ম্ম দেখিতে পাই। একজনের দোষ অপরের স্কন্ধে চাপাইয়া দিয়া প্রায়ই তাঁহারা মোকদ্দমার সিদ্ধান্ত করিয়া থাকেন। আপনার ব্যবহার কিন্তু তাহার বিপরীত দেখিয়া, আমি যে কতদূর সন্তুষ্ট হইয়াছি, তাহা বলিতে পারি না। এই নিমিত্তই আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া এই কয়েক দিবস আপনার কার্য্যের নিমিত্তই ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। নতুবা আপনার অনিষ্ট করিবার যে চেষ্টা করিতাম, তাহার আর কিছুমাত্র ভুল নাই।

    আমি। বাজে কথা ছাড়িয়া দেও। কি সন্ধান পাইয়াছ, বল দেখি।

    চৈতন্য। আপনি চেতলার কাহাকেও চিনেন কি?

    আমি। চেতলার অনেক লোকের সহিত আমার পরিচয় আছে। সুতরাং অনেককেই আমি চিনি, এবং অনেকে আমাকেও চিনে।

    চৈতন্য। চেতলার হর-বাড়ী ওয়ালীর বাড়ী আপনি কি চিনেন?

    আমি। চিনি বলিয়া আমার বোধ হইতেছে না।

    চৈতন্য। না চিনেন, সেই বাড়ী আমি এখনই আপনাকে দেখাইয়া দিব।

    আমি। কেন, সেই বাড়ীতে কি হইয়াছে?

    চৈতন্য। সেই বাড়ীতে গোলাপনাম্নী একজন বারবনিতা বাস করিয়া থাকে। কালীঘাটের নিতাই বৈরাগী আজকাল তাহাকে রাখিয়াছে। নিতাইয়ের অবস্থা ভাল নহে, সামান্য কার্য্য করিয়া সে জীবন যাপন করে। কিন্তু আজকাল দেখিতেছি, গোলাপের গৃহে সে প্রতিদিনই বিস্তর অর্থ ব্যয় করিতেছে। এমন রাত্রিই নাই, যে রাত্রিতে অভাব পক্ষে তাহার দুই এক বোতল সরাপও ব্যয় না হয়। যে হত্যার অনুসন্ধানে আপনি নিযুক্ত আছেন, নিতাই কর্তৃক সেই হত্যাকাণ্ডসম্পাদিত না হউক, কিন্তু সে যে কোনস্থানে না কোনস্থানে কোনরূপ অকার্য্য করিয়া কিছু অর্থের সংস্থান করিতে পারিয়াছে, তাহার আর কিছুমাত্র ভুল নাই।

    আমি। যে কার্য্যের দ্বারা নিতাই তাহার জীবিকা নির্বাহ করে, সেই কার্য্য করিয়া এরূপ ব্যয় করা নিতাইয়ের পক্ষে কি একবারেই অসম্ভব?

    চৈতন্য। সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। একদিবসে তিন চারি আনার অধিক সে উপার্জ্জন করিতে পারে না।

    আমি। তাহা হইলে সন্দেহের কারণ বটে। সে যে এইরূপ ভাবে খরচ-পত্র করিতেছে, তাহা তুমি জানিলে কি প্রকারে?

    চৈতন্য। প্রথমতঃ এই অবস্থা আমি তাপরের মুখে শুনিতে পাই, তাহার পর স্বচক্ষে দেখিয়াছি।

    আমি। গোলাপনান্নী যে স্ত্রীলোকটির গৃহে নিতাই গমন করে, তাহার অবস্থা কি প্রকার? এই সকল খরচ-পত্রের সাহায্য গোলাপের নিকট ত সে প্রাপ্ত হয় না?

    চৈতন্য। গোলাপকে আমি অনেক দিবস হইতে জানি। কিছুদিবস পূর্ব্বে তাহার অবস্থা অতিশয় শোচনীয় ছিল; নিয়মিতরূপে দুইবেলা আহার জুটিত কি না সন্দেহ। ইতিপূর্ব্বে একখানি ভাল কাপড় পরিতে তাহাকে কখনও দেখি নাই। সম্প্রতি নিতাই তাহাকে অনেকগুলি কাপড় খরিদ করিয়া দিয়াছে, এবং চারিগাছি পুরাতন মলও কোথা হইতে আনিয়া দিয়াছে; আর বলিয়াছে যে, শীঘ্র তাহাকে আরও দুই একখানি সোণার অলঙ্কার প্রস্তুত করাইয়া দিবে।

    আমি। নিতাই যে পুরাতন মল গোলাপকে কোথা হইতে আনিয়া দিয়াছে, সেই চারিগাছি মল তুমি আপনার চক্ষে দেখিয়াছ কি?

    চৈতন্য। না দেখিলে বলিব কেন? আপনি আমার সহিত তাহার বাড়ীতে চলুন, তাহা হইলে আপনিও উহা গোলাপের পায়ে দেখিতে পাইবেন।

    আমি। সেই মল কি প্রকারের?

    চৈতন্য। রূপার পাক দেওয়া মল।

    আমি। কোন সময়ে গোলাপের বাড়ীতে গমন করিলে নিতাই ও গোলাপ উভয়কেই একস্থানে দেখিতে পাইব?

    চৈতন্য। আমি যতদূর অবগত আছি, তাহাতে আজকাল প্রায় সর্ব্বদাই উহারা একত্র থাকিয়া আমোদ-আহ্লাদ করে। আমার বোধ হয়, যখন গমন করিবেন, তখনই তাহাদিগের উভয়কেই একস্থানে দেখিতে পাইবেন। এখনও সেইস্থানে গমন করিলে বোধ হয়, উভয়কেই একত্র দেখিতে পাওয়া যাইবে।

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    চৈতন্যের এই কথা শুনিয়া আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না। অপহৃত দ্রব্যের তালিকা দেখিয়া জানিতে পারিলাম, নিতাই যেরূপ চারিগাছি মল তাহার উপপত্নী গোলাপকে প্রদান করিয়াছে, সেই প্রকারের চারিগাছি মলও মল্লিকার গৃহ হইতে অপহৃত হইয়াছে। সুতরাং আর কালবিলম্ব না করিয়া চৈতন্যকে সঙ্গে লইয়া তৎক্ষণাৎ চেতলায় গমন করিলাম। এখন আর আমি একাকী নহি; চেতলায় গমন করিবার সময় আরও দুই তিন জন কর্মচারীকে সঙ্গে লইয়া গমন করিলাম। সেখানে গিয়া একবারে হর-বাড়ীওয়ালীর বাড়ীতে প্রবেশ না করিয়া প্রথমে চৈতন্যকে পাঠাইয়া দিলাম। আমরা পথে দাঁড়াইয়া রহিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে চৈতন্য প্রত্যাগমন করিল ও কহিল, “নিতাই ও গোলাপ উভয়েই শয়ন করিয়া আছে।”

    এই সংবাদ পাইবামাত্র আমরা হর-বাড়ীওয়ালীর বাড়ীতে প্রবেশ করিলাম, এবং চৈতন্যের নির্দেশ-মতো গোলাপের গৃহের সম্মুখে গিয়া উপনীত হইলাম। সেইস্থান হইতে নিতাইকে ডাকিবামাত্র নিতাই ও গোলাপ উভয়ে বাহিরে আসিল। আমার সঙ্কেত অনুযায়ী একজন কর্মচারী নিতাইকে সঙ্গে লইয়া বাড়ীর বাহিরে গমন করিলেন। আর একজন কর্ম্মচারি বিন্দুকে আনিবার নিমিত্ত দ্রুতপদে সেইস্থান হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন। কারণ, পূর্বে যে চারিগাছি মনের কথা চৈতন্য বলিয়াছিল, গোলাপের পায়ে সেই মল এখন পর্যন্ত বর্তমান ছিল।

    গোলাপকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম যে, তাহার পরিহিত চারিগাছি মল বাস্তবিকই নিতাই প্রদান করিয়াছে, এবং আরও দুই এক খানি অলঙ্কার প্রদান করিবে বলিয়া প্রতিজ্ঞাও করিয়াছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রদান করে নাই। আমরা সেইস্থানে বসিয়া গোলাপকে এবং তাহার বাড়ীওয়ালীকে আবশ্যক-অনুযায়ী বিষয় সকল জিজ্ঞাসা করিতেছি, এমন সময় যে কর্ম্মচারী বিন্দুকে আনিবার নিমিত্ত গমন করিয়াছিলেন, তিনি বিন্দুর সহিত আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গোলাপের পায়ে যে চারিগাছি মল পরিহিত ছিল, তাহা উত্তমরূপে দেখিবার নিমিত্ত বিন্দুকে চুপি চুপি বলিয়া দিলাম। বিন্দু সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া গোলাপের পরিহিত মল চারিগাছি অনেকক্ষণ পর্যন্ত দর্শন করিল, এবং পরিশেষে চুপি চুপি আমাকে কহিল, “আমার বোধ হইতেছে. এই মলই মল্লিকার সেই অপহৃত মল। তথাপি আমি উহা একবার আমার হস্তে লইয়া দেখিতে ইচ্ছা করি।”

    বিন্দুর কথা যুক্তি-সঙ্গত বিবেচনা করিয়া সেই চারিগাছি মল খুলিয়া দিবার নিমিত্ত গোলাপকে কহিলাম। আদেশমাত্র গোলাপ পা হইতে মল খুলিয়া আমার সম্মুখে রাখিয়া দিল। আমি উহা বিন্দুর হস্তে অর্পণ করিলাম। মল হাতে করিবামাত্র বিন্দু বলিয়া উঠিল, “আমি এই মল ঠিক চিনিতে পারিয়াছি। ইহা মল্লিকার মল ব্যতীত অপর কাহারও নহে।”

    বিন্দুর কথা শুনিয়া আমাদিগের মনে পুনরায় আশার সঞ্চার হইল। ভাবিলাম যে, এইবার মোকদ্দমার উদ্ধার হইলেও হইতে পারে। সেই সময় নিতাইকে বাহির হইতে ডাকাইলাম, এবং মনের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। বলিলাম, “তুমি এই মল মল্লিকাকে দিয়াছ?” কিন্তু সেই মল তাহা-কর্তৃক গোলাপকে প্রদত্ত হইয়াছে, একথা প্রথমে সে অস্বীকার করিল। তখন হর ও গোলাপকে ডাকাইয়া তাহার সম্মুখে উক্ত মলের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। উভয়েই তখন নিতাইয়ের কথার প্রতিবাদ করিয়া তাহার সম্মুখে প্রকৃতকথা কহিল। তখন নিতাই উহা স্বীকার করিল ও কহিল, “এই মল চারিগাছি আমি গোলাপকে দিয়াছি সত্য; কিন্তু কোনস্থান হইতে অপহরণ করিয়া আনি নাই। জনৈক পোদ্দারের দোকান হইতে ক্রয় করিয়া আনিয়াছি।”

    নিতাইয়ের এই কথা যদিচ আমরা বিশ্বাস করিলাম না, তথাপি তাহাকে কহিলাম, “কোন্ দোকান হইতে উহা খরিদ করিয়া আনিয়াছ, তাহা আমাদিগকে দেখাইয়া দেও।” নিতাই সেই পোদ্দারের দোকান আমাদিগকে দেখাইয়া দিবে বলিয়া, আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া সেইস্থান হইতে বহির্গত হইল সেইস্থান হইতে বহির্গত হইবার পূর্ব্বে গোলাপের গৃহ আমরা উত্তমরূপে সন্ধান করিয়া দেখিলাম, কিন্তু সন্দেহজনক আর কোন দ্রব্যই পাওয়া গেল না।

    নিতাই আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া একে একে কয়েকখানি পোদ্দারের দোকানে গমন করিল। এক পোদ্দারের নিকট গমন করিলে, সে অস্বীকার করাতে নিতাই বলিল, “তবে বুঝি এ দোকান নয়, অন্য দোকান হইবে।” অন্য দোকানে গেলে সেইরূপে সে পোদ্দারও অস্বীকার করিল, নিতাইও পূর্ব্বের ন্যায় বলিল। এইরূপে কোন পোদ্দারই তাহার নিকট যে মল বিক্রয় করিয়াছে, একথা স্বীকার করিল না। তখন নিতাই বলিল, “আমি দোকান ঠিক করিতে পারিতেছি না। বোধ হয়, যে ব্যক্তি দোকানে থাকিয়া আমার নিকট মল বিক্রয় করিয়াছে, সে ব্যক্তি এখন কোন দোকানে উপস্থিত নাই; অথবা কোনরূপ ভয়ে কেহ প্রকাশ করিতেছে না।” আমরা বলিলাম, “এই দুই দিনে তুমি সেই লোককে বা দোকানকে ভুলিয়া গেলে, এ কি কাজের কথা? তুমি এখানকার সকল পোদ্দারেরই নিকটেই ত জিজ্ঞাসা করিলে। বিক্রয় করিয়া থাকিলে, তাহা তাহাদের বলিতে আপত্তির কারণ কি?” যাহা হউক, আমরা তখন বুঝিলাম, নিতাই কোনস্থান হইতে এই মল ক্রয় করে নাই, মিথ্যা কথায় আমাদিগকে ভুলাইবার চেষ্টা করিতেছে।

    নিতাইয়ের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া মনে করিলাম যে, ইহার গৃহে অনুসন্ধান করিতে আর বিলম্ব করা উচিত নহে। এই ভাবিয়া তখনই তাহার বাড়ীতে গমন করিলাম, এবং উত্তমরূপে তাহার গৃহে অন্বেষণ করিলাম, কিন্তু অলঙ্কারাদি আর কিছুই পাইলাম না, কেবল দুইশত টাকার অধিক নগদ টাকা প্রাপ্ত হওয়া গেল। এত টাকা সে কোথা হইতে প্রাপ্ত হইল, তাহা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। সে কোনরূপ সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করিতে পারিল না। তখন নিশ্চয়ই বুঝিলাম যে, সে অপহৃত অলঙ্কারগুলি হয় বিক্রয় করিয়াছে, না হয় বন্ধক দিয়া এই সকল অর্থের সংস্থান করিয়া রাখিয়াছে।

    সেই সময় নিতাইকে ভয়-মিত্রতা দেখাইয়া নানারূপ বুঝাইতে লাগিলাম, প্রথমে সে কিছুতেই স্বীকার করিল না যে, মল্লিকা তাহা-কর্তৃক হত, বা অলঙ্কার সকল তাহা-কর্তৃক অপহৃত হইয়াছে। কিন্তু পরিশেষে তাহাকে স্বীকার করিতে হইল। তখন সে কহিল, “আমি মল্লিকাকে হত্যা করি নাই, কিন্তু তাহার অলঙ্কার সকল অপহরণ করিয়াছি মাত্র। আমি যখন তাহার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়াছিলাম, সেই সময় মল্লিকা হত অবস্থায় পড়িয়াছিল, এবং তাহার অঙ্গে অলঙ্কার সকল পরিহিত ছিল। এই অবস্থা দেখিয়া আমার মনে হঠাৎ কেমন লোভের উদয় হইল; আমি সেই অলঙ্কারগুলি অপহরণ করিয়া সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। যে সকল অলঙ্কারাদি আমি অপহরণ করিয়া আনিয়াছিলাম, তাহার একখানিও আমি বিক্রয় করি নাই, সমস্ত অপরের নিকট বন্ধক রাখিয়া এই সকল অর্থের সংস্থান করিয়াছি, এবং আজ কয়েক দিবস হইতে উহা অজস্ররূপে ব্যয়ও করিয়া আসিতেছি। যে চারিগাছি মল গোলাপের নিকট পাওয়া গিয়াছে, তাহাও অপহৃত দ্রব্য সকলের মধ্যেরই এক দ্রব্য।”

    নিতাইয়ের নিকট হইতে এই সকল কথা অবগত হইয়াই যে আমরা সন্তুষ্ট হইলাম, তাহা নহে; যে যে ব্যক্তির নিকট সেই সকল অলঙ্কার নিতাই বন্ধক দিয়াছিল, তাহাদের নাম ধাম নিতাইকে জিজ্ঞাসা করিলাম। নিতাই তখন আর কিছু গুপ্ত রাখিল না। সুতরাং নিতাইয়ের নির্দেশমত তাহাদিগের নিকট হইতে সেই সকল অলঙ্কারের উদ্ধার করিলাম। পূর্ব্বে যে একগাছি বালা ও একটি মাকড়ি পাওয়া গিয়াছিল, এইরূপ অনুসন্ধানে এখন তাহার জোড়া বালা ও মাকড়িও পাওয়া গেল।

    এইদিনে আমাদের অনুসন্ধান কাৰ্য্য শেষ হইল। যাহা হউক, এইবারে হত্যা ও চুরি এই উভয় অপরাধে নিতাই আলিপুরের কোর্টে প্রেরিত হইল। তাহার বিপক্ষে যে সকল প্রামাণ্য সাক্ষী সংগ্রহ হইয়াছিল, তাহারা সকলেই সাক্ষ্য প্রদান করিল। যাহারা মল্লিকার অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিল, তাহাদিগের দ্বারা সেই সকল অলঙ্কার সনাক্ত হইল। বিন্দু যে সকল অবস্থা দেখিয়াছিল, তাহা সে বর্ণন করিল। এতদ্ব্যতীত চৈতন্য, হর, গোলাপ এবং যে সকল ব্যক্তির নিকট নিতাই অলঙ্কার বন্ধক দিয়াছিল, তাহারা সকলেই এই মোকদ্দমা সম্বন্ধে যে যেরূপ জানিত, তৎসমস্ত প্রকাশ করিয়া নিতাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করিল। উক্ত সকল প্রমাণ দ্বারা নিতাইয়ের চুরি অপরাধ অবিসম্বাদিতরূপে সাব্যস্ত হইল, কেবল প্রমাণের মধ্যে অবশিষ্ট রহিল—রাসায়নিক পরীক্ষক। ইহার পরীক্ষা হইলেই, কি বিষ প্রয়োগ করা হইয়াছিল, তাহা অবধারিত হইবে, এবং হত্যাপরাধে নিতাই দায়রায় প্রেরিত হইবে।

    সময়-মত রাসায়নিক পরীক্ষকও আসিয়া সাক্ষ্য প্রদান করিলেন; কিন্তু তাঁহার কথা শ্রবণ করিয়া আমরাও একবার অবাক হইয়া গেলাম। তিনি কহিলেন যে, তাহার পরীক্ষায় তিনি কোনরূপ বিষের চিহ্ন প্রাপ্ত হন নাই ইঁহার এই এক-কথাতেই হত্যা-অপরাধ উড়িয়া গেল, কোন সাক্ষীর সাক্ষ্যই টিকিল না। সুতরাং কেবলমাত্র চুরি করা অপরাধে নিতাই দায়রায় প্রেরিত হইল। সেইস্থানে নিতাই কেবলমাত্র চুরি অপরাধ স্বীকার করিয়া লইয়া কয়েক বৎসরের নিমিত্ত জেলে গমন করিল। উপস্থিত দর্শকমাত্রই বেকুব বৈজ্ঞানিকদিগকে সহস্র গালি দিতে দিতে আপন আপন স্থানে প্রস্থান করিল।

    এক্ষণে পাঠকগণ! এই ঘটনার আমূল বৃত্তান্ত অবগত হইলেন; কিন্তু আমাদের ন্যায় আপনারাও বোধ হয়, হত্যার কারণ প্রকৃতরূপে জানিবার নিমিত্ত উৎসুক হইয়াছেন। আমিও পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, সেই ঔৎসুক্যবশতঃ নিতাই চোর জেল হইতে মুক্তি পাইলেই তাহার নিকট উক্ত কারণ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। নিতাই পরে বলিবে বলিয়া আমার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল। এখন পুনরায় আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম, তখন সে আমাকে এই বলিয়া তাহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়াছিল, “আমাদিগের দেশীয় গাছ-গাছড়ার ভিতরে এখন বিষাক্ত গাছ আছে যে, তাহার কণিকামাত্র শিকড় পানের সহিত কাহাকেও খাইতে দিলে, সেই পান খাওয়া শেষ হইবার পূর্বেই তাহার মৃত্যু হয়। কিন্তু বর্তমান বৈজ্ঞানিকদিগের মধ্যে আজ পর্যন্ত এমন কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না যে, উক্ত শিকড় খাইয়া মৃত্যু হইলে যিনি বলিয়া দিতে পারেন, কোন বিষ প্রয়োগ করা হইয়াছে। যে গাছের শিকড় এতদূর বিষাক্ত, সেই গাছ এ দেশে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়! এমন কি প্রত্যেক গৃহস্থের বাড়ীতেই প্রায় সেই গাছ বিদ্যমান আছে, কিন্তু ইহার গুণ অধিকাংশ লোকেই অবগত নহে। সেই গাছের শিকড় পানের সহিত মল্লিকাকে খাওয়াইয়া আমি উহাকে হত্যা করিয়াছিলাম; কিন্তু বেকুব বৈজ্ঞানিকদিগের মূর্খতার নিমিত্তই আমি কয়েক বৎসরমাত্র জেল খাটিয়াই অব্যাহতি পাইয়াছি।”

    যে গাছের শিকড় খাইয়া মল্লিকা উক্তরূপে আশ্চৰ্য্য মৃত্যু হইয়াছিল, নানাকারণে সেই গাছের নামোল্লেখ করিবার প্রয়োজন নাই, এবং বিহিতও নহে। কিন্তু উপস্থিত ঘটনা যে আমাদিগের পরীক্ষায় চাক্ষুষ জ্বলন্ত সত্য, সে বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। অবশ্য চোর বিজ্ঞান শিখিয়া যে সেই গাছের শিকড় আবিষ্কার করিয়াছে, তাহা নহে। লোক—পরম্পরা-গত ব্যবহার ক্রমে সেই অশিক্ষিত চোর সেই শিকড়ের গুণাগুণ অবগত হইয়া থাকিবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের এখনও ততদূর ক্ষমতা জন্মে নাই যে, সেই মূর্খ লোকেরও কার্য্যের কারণ অনুসন্ধানে কৃতকাৰ্য্য হয়!

    [ফাল্গুন, ১৩০২]

    পুলিস-বুদ্ধি (অর্থাৎ সামান্য পুলিস কর্মচারীর বুদ্ধিবলে সেসন জজের রায় পরিবর্তনের আশ্চর্য রহস্য!)

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    এদেশীয় পুলিস-কৰ্ম্মচারীদিগের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তি যেরূপ কৌশল অবলম্বন করিয়া অন্যায়রূপে অর্থ উপার্জ্জন করিয়া থাকেন, তাহার একটি দৃষ্টান্ত আজ পাঠকগণকে দেখাইতে বাসনা করিলাম। পাঠকগণ মনে রাখিবেন, যে দৃষ্টান্ত দেখাইতে আজ আমি প্রবৃত্ত হইয়াছি, তাহা আমার নিজের ঘটনা নহে, বা এই ঘটনার সহিত আমার কোনরূপ সংস্রব নাই। উহা মফঃস্বল পুলিসের জনৈক দারোগার কার্য্য। সেই দারোগা আমার নিকট পরিচিত, এবং এখন পর্যন্ত দারোগাগিরিতে নিযুক্ত; সুতরাং তাঁহার নাম এই স্থানে প্রকাশ করিলাম না। কিন্তু তাঁহার সম্বন্ধে এইমাত্র বলিতে পারি যে, পুলিস বিভাগে এই প্রকৃতির অনেক কর্ম্মচারী আছেন বলিয়া বর্তমান পুলিসের এত দুর্নাম। যে, ঘটনা নিম্নে বিবৃত হইল, তাহা আমার স্বকপোল-কল্পিত ঘটনা নহে। বরং ইহা এত অল্প দিবসের ঘটনা যে নিয়মিতরূপ সংবাদপত্র পাঠকারী এই প্রবন্ধ পাঠ করিয়া কহিবেন যে, এই ঘটনার সময় বোধ হয়, এখনও তিন বৎসর অতীত হয় নাই।

    প্রাতঃকালে দারোগাবাবু তাঁহার থানায় বসিয়া আছেন, এমন সময় একজন গ্রাম্য চৌকিদার আসিয়া থানায় উপস্থিত হইল, এবং দারোগাবাবুর নিকট গমন করিয়া কহিল, “ধর্ম্মাবতার! যে গ্রামে আমি চৌকি দিয়া থাকি, সেই গ্রামে জমীদারে জমীদারে একটি ভয়ানক দাঙ্গা হইয়া গিয়াছে, এবং একটি খুনও হইয়াছে। দাঙ্গার সময় সাহস করিয়া আমরা সেইস্থানে উপস্থিত হইতে পারিয়াছিলাম বলিয়া, দাঙ্গার দলস্থ লোকেরা সেই হতব্যক্তির লাসটি লইয়া যাইতে পারে নাই; ঘটনার স্থলে উহা ফেলিয়া গিয়াছে। কিন্তু উহার মস্তকটি কাটিয়া লইয়া গিয়াছে। আজ একজন চৌকিদারকে সেই লাসের নিকট রাখিয়া আমি থানায় সংবাদ দিতে আসিয়াছি।”

    চৌকিদারের কথা শ্রবণ করিয়া দারোগাবাবু তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোন্ কোন্ জমীদারে এই দাঙ্গা হইয়াছে? তাহাদিগের নাম এবং বাসস্থান কোথায়? আর উক্ত দাঙ্গার কারণই বা কি, বলিতে পার?”

    উত্তরে চৌকিদার কহিল, “একখণ্ড জমীর দখল লইয়া জমীদারদ্বয়ের মধ্যে এই দাঙ্গা উপস্থিত হয়। সেই জমীদারদিগের মধ্যে একজনের নাম পুলিনবাবু। তাঁহার বাসস্থান আমাদিগের গ্রামে। অপর আর একজন জমীদারের নাম যামিনীবাবু। তাঁহার বাসস্থান একটু দূরে, আমাদিগের গ্রাম হইতে প্রায় তিন চারি ক্রোশের ব্যবধান হইবে।”

    চৌকিদারের এই কথা শুনিয়া দারোগাবাবু মনে মনে ভাবিলেন, ‘অনেক দিবস হইতে এমন কোন মোকদ্দমা আইসে নাই যে, যাহাতে কিছু অর্থের সংস্থান করিয়া লইতে পারি। কিন্তু ভাগ্যক্রমে আজ যে মোকদ্দমার সংবাদ পাইলাম, তাহাতে আমার পূর্ব্বক্ষতির পূরণ হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এরূপ সময়ে আমার ঊর্দ্ধতন—কর্মচারীর সহিত আমার মিল নাই, ইহাই একাত্ত দুঃখের বিষয়। যাহা হউক, কালবিলম্ব না করিয়া অগ্রে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া তাগ্রে নিজ বন্দোবস্তের সংগ্রহ করিয়া লই। তাহার পর যাহা হয়, দেখা যাইবে।’

    মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া দারোগাবাবু ‘প্রথমে এতলা’ বহিতে সেই চৌকিদারের প্রদত্ত সংবাদ বিস্তারিতরূপে স্বহস্তে লিখিয়া লইলেন। কোন তারিখে, কোন সময়ে, কোন স্থানে, কোন কোন জমীদারের মধ্যে এই দাঙ্গা হইয়াছে, এবং কিরূপ অবস্থায় লাস পড়িয়া আছে, তাহার বিবরণ চৌকিদারের বর্ণনানুসারে লিখিয়া লইয়া লোকজন সমভিব্যাহারে দ্রুতপদে ঘটনাস্থলে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

    ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইবার পূর্ব্বেই পথিমধ্যে পুলিনবাবুর জনৈক কৰ্ম্মচারীর সহিত দারোগাবাবুর প্রথমে সাক্ষাৎ হইল। কৰ্ম্মচারী দারোগাবাবুকে সঙ্গে লইয়া আপনার মনিবের বাড়ীতে গমন করিলেন। সেইস্থানে পুলিনবাবুর সহিত দারোগাবাবুর সাক্ষাৎ হইল, এবং দারোগাবাবু আপনার মনোভিলাষ পূর্ণ করিয়া যত শীঘ্র পারেন, সেইস্থান হইতে বহির্গত হইলেন।

    দারোগাবাবু অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবার পূর্ব্বে পুলিনবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন, একথা ক্রমে যামিনীবাবুর কর্ণগোচর হইল। যামিনীবাবু ভাবিলেন, ‘এরূপ অবস্থায় দারোগাবাবুর হস্তে অনুসন্ধানের ভার থাকিলে, তাঁহারই সবিশেষ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা।’ এই ভাবিয়া, তিনিও গোপনে দারোগাবাবুর নিকট গমন করিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। সুচতুর দারোগা উভয় পক্ষ হইতেই তাঁহার অভিরুচি মত অর্থ সংগ্রহ করিয়া মূল মোকদ্দমার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন। এদিকে উভয় জমীদারের নিকটই প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, তাঁহাদিগের পক্ষীয় কোন লোককে এই খুনি মোকদ্দমার আসামী করিলেও কাহাকেও দণ্ডিত হইতে দিবেন না।

    এইরূপে উভয় জমীদারের নিকট হইতে বন্দোবস্ত করিয়া দারোগাবাবু ঘটনাস্থলে গিয়া উপস্থিত হইলেন। সেইস্থানে গমন করিয়া তিনি যাহা অবলোকন করিলেন, তাহাতে তাঁহার মস্তক ঘুরিয়া গেল।

    দেখিলেন,—গ্রামের বাহিরে ময়দানের ভিতর একস্থানে উভয় পক্ষীয় ভয়ানক দাঙ্গার চিহ্ন সকল এখন পর্যন্ত বর্তমান রহিয়াছে। সেইস্থানের উদ্ভিদ এবং শস্য সকল একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। কোনস্থানে ভগ্নাবশিষ্ট লাঠি সকল পড়িয়া রহিয়াছে। কোনস্থানে চাকচিক্যময় সড়কির ফলার উপর সূর্যকিরণ পতিত হওয়ায়, দূরস্থিত পথিকের নয়ন সেইদিকে আকর্ষণ করিতেছে। কোনস্থানে নররুধির রঞ্জিত তরবারির অর্দ্ধাংশ পতিত হইয়া দর্শকবৃন্দের মনে ভয়ের সঞ্চার করিয়া দিতেছে। স্থানে স্থানে বা অর্দ্ধ দগ্ধ মশাল পড়িয়া রহিয়াছে। এই সকল দেখিতে দেখিতে দারোগাবাবু সেই সুবিস্তৃত ময়দানের ভিতর প্রবেশ করিলেন। কিয়দ্দূর গমন করিয়া দেখিতে পাইলেন, জনৈক চৌকিদার একটি মৃতদেহের সন্নিকটে দণ্ডায়মান রহিয়াছে।

    দারোগাবাবু উক্ত মৃতদেহের নিকট গমন করিয়া তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকল উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন যে, শরীরের স্থানে স্থানে ভীষণ অস্ত্রের চিহ্ন সকল বর্তমান রহিয়াছে। দেহ মস্তকহীন এবং পরিধানে বস্ত্রাদি কিছুই নাই, উলঙ্গ অবস্থায় সেইস্থানে পড়িয়া রহিয়াছে। সেই প্রকাণ্ড ময়দানের ভিতর, এবং তাহার নিকটবর্ত্তী স্থানে, লোকজনের সাহায্যে দারোগাবাবু সেই মৃতব্যক্তির পরিহিত বস্ত্রের এবং মস্তকের অনেক সন্ধান করিলেন; কিন্তু কোনস্থানেই তাহার কিছুই প্রাপ্ত হইলেন না।

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    পাঠকগণ! পূৰ্ব্বেই অবগত হইয়াছেন, দারোগাবাবুর সহিত তাঁহার ঊর্দ্ধতন-কর্ম্মচারী ইনস্পেক্টারবাবুর সহিত মনোমালিন্য আছে। তথাপি সরকারী কার্য্যের নিয়মানুসারে যখন তিনি এই অনুসন্ধানে আগমন করেন, সেই সময়ে ইনস্পেক্টারবাবুকেও সংবাদ দিয়া আসিতে হয়।

    সেই ময়দানের ভিতর যে সময় দারোগাবাবু মৃতব্যক্তির মস্তক এবং বস্ত্রের অনুসন্ধান করিতেছিলেন, সেই সময় ইনস্পেক্টারবাবু আসিয়া সেইস্থানে উপস্থিত হইলেন। বলা বাহুল্য, তিনি সেইস্থানে আসিবামাত্রই জানিতে পারিয়াছিলেন যে, দারোগাবাবু প্রথমেই দাঙ্গাকারী উভয় পক্ষীয় জমীদারদ্বয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় এই দারোগাবাবুর হস্তে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানের ভার ন্যস্ত থাকিলে, কোনরূপেই সুবিচারের সম্ভাবনা নাই। ইহা ভাবিয়া অনুসন্ধানের কার্য্য তিনি আপন হস্তে লইলেন, এবং দারোগবাবুকে সেইস্থান হইতে বিদায় করিয়া দিলেন।

    ইনস্পেক্টারবাবু দারোগাবাবুর চরিত্রের লোক ছিলেন না, একথা প্রায় সকলেই জানিতেন। সুতরাং কোন পক্ষীয় কোন জমীদার তাঁহার সহিত গোপনে সাক্ষাৎ করিতে সাহসী হইলেন না। ইনস্পেক্টারবাবু নিজে যেরূপ বুঝিলেন, অনুসন্ধানও সেইরূপেই করিতে লাগিলেন। তাঁহার অনুসন্ধানের প্রধান কার্য্য হইল—যাহার মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, সেই ব্যক্তি কে, তাহার বাসস্থান কোথায়, এবং কোন পক্ষীয় জমীদার কর্তৃক সে হত হইয়াছে, তাহার প্রকৃত তত্ত্ব বাহির করা।

    আমাদিগের দেশে একটি প্রবাদ আছে যে, দেবচরিত্র ও নারীচরিত্র বুঝিতে পারা নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। আমি বলি,—এ দেশীয় “জমীদার চরিত্রও” সেই প্রবাদ বাক্যের অন্তর্গত করিয়া দিলে, নিতান্ত অসঙ্গত হইত না। নিম্নের দৃষ্টান্তটি তাহার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ।

    ইনস্পেক্টারবাবু অনুসন্ধানে নিযুক্ত আছেন, সেই সময় পুলিনবাবুর জনৈক কর্ম্মচারী একজন কনষ্টেবলকে চুপি চুপি বলিয়া দিল, “যে ব্যক্তি হত হইয়াছে, তাহার নাম ছমির। এইস্থান হইতে চারি পাঁচ ক্রোশ ব্যবধানে তাহার বাসস্থান।” কনষ্টেবল এই কথা ক্রমে ইনস্পেক্টারবাবুর কর্ণে উঠাইয়া দিল।

    ইনস্পেক্টারবাবু যে সংবাদের নিমিত্ত নিতান্ত লোলুপ ছিলেন, এখন সেই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া যে কি পৰ্য্যন্ত আনন্দিত হইলেন, তাহা বলা যায়। কালবিলম্ব না করিয়া অশ্বারোহণে তিনি ছমিরের গ্রামে গমন করিলেন, অনুসন্ধান করিয়া ছমিরের বাড়ীও পাইলেন। বাড়ীতে গিয়া দেখিলেন, ছমিরের স্ত্রী ভিন্ন সেই বাড়ীতে অপর আর কেহ নাই। তিনি তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমিই কি ছমিরের পত্নী?”

    স্ত্রীলোক। হাঁ মহাশয়! তিনিই আমার স্বামী।

    ইনস্পেক্টার। তোমার স্বামী এখন কোথায়?

    স্ত্রীলোক। তিনি বাবুদিগের বাড়ীতে কর্ম্ম করিতেন সেইস্থানে আছেন কি না, জানি না। কিন্তু অনেকে অনেক কথা বলিতেছে।

    ইনস্পেক্টার। তিনি কোন বাবুর বাড়ীতে কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন?

    স্ত্রীলোক। আমাদিগের জমীদারের বাড়ীতে কর্ম্ম করিয়া থাকেন।

    ইনস্পেক্টার। তোমাদিগের জমীদার কে?

    স্ত্রীলোক। পুলিনবাবু।

    ইনস্পেক্টার। তুমি কহিলে না যে, তোমার স্বামী সম্বন্ধে অনেকে অনেক কথা কহিতেছে?

    স্ত্রীলোক। হাঁ মহাশয়! অনেক কথা শুনিতে পাইতেছি।

    ইনস্পেক্টার। কি প্রকারের কথা শুনিতেছ?

    স্ত্রীলোক। কেহ কেহ বলিতেছে, বাবুর কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে আমার স্বামী স্থানান্তরে গমন করিয়াছিল। সেই স্থানের জমীদার যামিনীবাবুর লোক তাহাকে মারিয়া ফেলিয়াছে।

    ইনস্পেক্টার। হাঁ, একটি লাস পাওয়া গিয়াছে সত্য; কিন্তু সেই লাস দেখিলে তুমি চিনিতে পারিবে যে, সেই মৃতদেহ তোমার স্বামীর কি না?

    স্ত্রীলোক। আমার স্বামীর দেহ দেখিলে আর আমি চিনিতে পারিব না?

    ইনস্পেক্টার। যে লাস পাওয়া গিয়াছে, তাহার দেহ আছে মাত্র; মস্তক পাওয়া যায় নাই। এরূপ অবস্থায় কেবলমাত্র দেহ দেখিয়া তুমি বলিতে পারিবে যে, উহা ছমিরের দেহ কি না?

    স্ত্রীলোক। মস্তক না থাকিলেও আপনার স্বামীর দেহ স্ত্রীলোকমাত্রই চিনিতে পারে। তাহার শরীরের কোন অংশ দেখিলেই আমি চিনিতে পারিব, সেই দেহ আমার স্বামীর কি না।

    এই স্ত্রীলোকের কথা শুনিয়া ইনস্পেক্টারবাবু তাহাকে সঙ্গে লইয়া যে স্থানে সেই মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল, সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং সেই মস্তকহীন দেহটি সেই স্ত্রীলোকটিকে দেখাইলেন। সেই দেহ দেখিবামাত্র স্ত্রীলোকটি উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিল এবং কহিল, “ইহা আমার স্বামীর দেহ।”

    স্ত্রীলোকটির কথা শুনিয়া ইনস্পেক্টারবাবু মনে মনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। ভাবিলেন—যখন মৃতদেহ সনাক্ত হইল, তখন এই মোকদ্দমার উদ্ধার হইতে আর বিলম্ব হইবে না। বিশেষতঃ এইস্থানে উভয় জমীদার—পুলিনবাবু ও যামিনীবাবুর মধ্যে যে দাঙ্গা হইয়াছে, সে সম্বন্ধে প্রমাণের অভাব নাই। এদিকে ছমির পুলিনবাবুর লোক। সেই ছমির যখন হত হইয়াছে, তখন পুলিনবাবুর লোকজন কর্তৃক হত হইবে, তাহা অনুমিত হয় না। অধিকন্তু তাহার বিপক্ষ অর্থাৎ যামিনীবাবুর লোকের দ্বারাই হত হইবার সম্ভাবনা।

    ইনস্পেক্টারবাবু স্থিরচিত্তে বসিয়া মনে মনে এইরূপ ভাবিতেছেন, এবং কোন্ পক্ষীয় কোন্ কোন্ ব্যক্তিকে ধৃত করিতে হইবে, তাহার আন্দোলন করিতেছেন, এরূপ সময়ে একজন লোক জোড়হস্তে তাহার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল।

    এই অপরিচিত লোককে দেখিয়া ইনস্পেক্টারবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে তুমি? কি চাও?”

    অপরিচিত ব্যক্তি। মহাশয়! আমার নাম সেখ সরিফ। এইস্থান হইতে আমার বাসস্থান চারি পাঁচ ক্রোশ হইবে। এরফান নামক আমর একটি ভাই ছিল। আমার ভাই হত হইয়াছে, বাড়ীতে বসিয়াই লোকমুখে এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া আমি দেখিতে আসিয়াছিলাম। যে মৃতদেহ ঐ স্থানে পড়িয়া রহিয়াছে, সেই মৃতদেহ আমি উত্তমরূপে দেখিয়াছি। উহা আমার ভাই এরফানের মৃতদেহ।

    ইনস্পেক্টার। যে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, উহার মস্তক পাওয়া যায় নাই। মস্তকহীন মৃতদেহ দেখিয়া তুমি কি প্রকারে স্থির করিলে যে, উহা তোমার ভ্রাতা এরফানের মৃতদেহ?

    সরিফ। এরফান আমার সহোদর ভ্রাতা। বাল্যকাল হইতে প্রতিনিয়ত তাহাকে দেখিয়া আসিতেছি। তাহার দেহ দেখিলে আমি আর চিনিতে পারিব না? দেহ ত পরের কথা—তাহার ছায়া দেখিলে আমি বলিতে পারি, উহা আমার ভ্রাতার ছায়া কি না।

    ইনস্পেক্টার। তুমি ঠিক চিনিতে পারিয়াছ যে, সেই মৃতদেহই তোমার ভ্রাতা এরফানের মৃতদেহ?

    সরিফ। ঠিক্ চিনিতে না পারিলে কি আর আমি আপনার নিকট আসিতে সাহসী হইতাম।

    ইনস্পেক্টার। এরফান তোমার কিরূপ ভাই?

    সরিফ। ভাই আর কি প্রকার হইয়া থাকে? আমার সহোদর ভাই।

    ইনস্পেক্টার। এরফানের স্ত্রী কোথায়? তাহাকে আনাইয়া তাহার স্বামীর লাস একবার তাহাকে দেখাইতে পার কি?

    সরিফ। তাহার স্ত্রী থাকিলে অবশ্য তাহাকে আনিয়া দেখাইতে পারিতাম। অদ্যাবধি এরফান বিবাহ করে নাই।

    ইনস্পেক্টার। এরফান কি কার্য্য করিত?

    সরিফ। জমীদার সরকারে সে পাইক ছিল।

    ইনস্পেক্টার। কোন্ জমীদারের নিকট সে পাইকের কার্য্য করিত?

    সরিফ। যামিনীবাবুর সরকারে সে পাইক ছিল।

    ইনস্পেক্টার। তুমি ব্যতীত তাহার আত্মীয় আর কে আছে?

    সরিফ। আমি ব্যতীত আত্মীয় বলিবার তাহার আর কেহই নাই।

    ইনস্পেক্টার। এই স্ত্রীলোকটি বলিতেছে, ঐ মৃতদেহ তাহার স্বামী ছমিরের মৃতদেহ। অথচ তুমি বলিতেছ যে, উহা তোমার সহোদর ভ্রাতা এরফানের মৃতদেহ। এরূপ অবস্থায় আমি কাহার কথা বিশ্বাস করিব, এবং কাহাকেই বা মিথ্যাবাদী স্থির করিয়া লইব?

    সরিফ। ধর্মাবতার! আপনি বিচারক, আপনি হাকিম! ইহা অপেক্ষাও গোলযোগের আরও কত মোকদ্দমায় আপনি হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। এখন এই সামান্য মোকদ্দমায় কোন্ ব্যক্তি প্রকৃতকথা বলিতেছে, তাহা আর আপনি জানিতে পারিবেন না? আপনি একটু ভালরূপ অনুসন্ধান করিয়া দেখিলেই জানিতে পারিবেন যে, এই স্ত্রীলোকটি তাহার কোন গূঢ় অভিসন্ধি-সাধন করিবার নিমিত্ত এইরূপ মিথ্যা কথা কহিতেছে। যাহার মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, সে উহার স্বামী ছমির কখনই হইতে পারে না, সে আমার ভ্রাতা এরফান।

    স্ত্রীলোকটিও সেইস্থানে উপস্থিত ছিল। সরিফের কথা শুনিয়া সে কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল, “ধর্ম্মাবতার! এ কখনই উহার ভ্রাতার নহে, এ আমার স্বামীর মৃতদেহ।”

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    সেই স্ত্রীলোকের এবং সরিফের কথা শুনিয়া ইনস্পেক্টারবাবু বড়ই গোলে পড়িলেন। এ মৃতদেহ যে কাহার, তাহা স্থির করা বড়ই কঠিন হইয়া দাঁড়াইল। উভয় গ্রামের ভিতরই অনুসন্ধান করিলেন। একস্থানে জানিতে পারিলেন যে, ছমির নামক এক ব্যক্তি প্রকৃতই তাহার স্ত্রীর সহিত সেই গ্রামে বাস করিত; কিন্তু তিন চারি দিবস হইতে কেহই তাহাকে গ্রামের মধ্যে দেখে নাই। অপর গ্রামের সমস্ত ব্যক্তিই কহিল, সরিফ ও এরফান উভয়ে সহোদর ভ্রাতা। উভয়েরই বিবাহ হয় নাই, এবং গ্রামের কেহই এরফানকে দুই তিন দিবস পর্য্যন্ত দেখিতে পায় নাই।

    এইরূপ গোলযোগে পড়িয়া ইনস্পেক্টারবাবু প্রথমে কোনমতেই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না যে, এই মৃতদেহ কাহার। প্রকৃত তত্ত্ব জানিবার নিমিত্ত লোকজন নিযুক্ত করিয়া নানারূপ চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন; কিন্তু কোন প্রকারেই উপরি-উক্ত জমীদারদ্বয়ের চক্রান্ত ভেদ করিতে পারিলেন না।

    মৃতদেহ পরীক্ষার নিমিত্ত নিয়মিতরূপে জেলায় প্রেরণ করিয়া, ইনস্পেক্টারবাবু আপাততঃ খুনি মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিতে বিরত, এবং দাঙ্গা মোকদ্দমার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন। সাক্ষী-সাবুদ যতদূর পারেন, সংগ্রহ করিয়া উভয় জমীদারের পক্ষ হইতেই কয়েকজন করিয়া লোককে ধৃত করিলেন, এবং পরিশেষে বিচারার্থ মাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট প্রেরণ করিলেন। আপন আপন লোকদিগকে উদ্ধার করিবার নিমিত্ত জমীদারদ্বয়ও প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

    এই ঘটনার তিনি চারি দিবস পরে ইনস্পেক্টারবাবু যখন দেখিলেন, জমীদারদ্বয় মোকদ্দমার উপায়ান্বেষণ করিবার নিমিত্ত ও উকীল মোক্তারদিগের পরামর্শ লইবার নিমিত্ত আপন আপন গ্রাম ছাড়িয়া সবডিবিজানে গমন করিয়াছেন, সেই সময় তিনি প্রকাশ করিলেন, “যে লাস পরীক্ষার্থ জেলায় পাঠান হইয়াছিল, তাহার পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে পরীক্ষায় জানা গিয়াছে যে, যে সময় সেই ব্যক্তির মস্তক কাটিয়া লওয়া হয়, তখন তাহার মৃত্যু নাই, মস্তক কাটিয়া লওয়ার পর তাহার মৃত্যু হইয়াছে। এরূপ অবস্থায় অনুমান হয় যে, দাঙ্গার সময় আহত হইয়া সেই ব্যক্তি পতিত হয়, কিন্তু ইহার মৃত্যু হয় নাই। এইরূপ অবস্থায় সেই ব্যক্তি সেইস্থানে পড়িয়া থাকিলে, সেই ব্যক্তি যে পক্ষীয় লোক, সেই পক্ষীয়দিগের কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই, এই ভাবিয়া জীবিতাবস্থাতেই উহার মস্তক উহার পক্ষীয় লোক কাটিয়া লইয়া গিয়াছে। কারণ উহাদিগের বিশ্বাস যে, মস্তক না থাকিলেই উহা কাহার দেহ, তাহা স্থির করিতে পারা যাইবে না। মৃতদেহ সনাক্ত না হইলে সেই ব্যক্তি কোন্ পক্ষীয় লোক, তাহাও কেহ জানিতে পারিবে না। সুতরাং খুনি মোকদ্দমার প্রকৃত প্রস্তাবে অনুসন্ধান বা অপরাধীদিগের হত্যা-অপরাধে দণ্ড হইবার সম্ভাবনাও থাকিবে না।”

    ইনস্পেক্টারবাবু আরও প্রকাশ করিলেন, “পুলিনবাবুর পক্ষীয় লোকজনের দ্বারা যেরূপ প্রমাণিত হইয়াছে, এবং পুলিনবাবু যেরূপভাবে তাঁহার লোকজনদিগের বিষয় সমর্থন করিয়াছেন, তাহাতে তাঁহার বা তাঁহার কর্ম্মচারীবর্গের আর বলিবার ক্ষমতা নাই যে, যে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, তাহা ছমিরের দেহ নহে, এবং যামিনীবাবুরও বলিবার ক্ষমতা নাই যে, উহা এরফানের দেহ নহে। আরও এক কথা—ইতিপূর্ব্বে বিষমভ্রমে পতিত হইয়া পুলিনবাবু প্রমাণ করিয়াছিলেন, যে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল, তাহা তাঁহার পক্ষীয় লোক ছমিরের দেহ। এইরূপ ভাবে প্রমাণ করিবার তাঁহার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, ছমির যদি তাঁহার পক্ষীয় লোক বলিয়া স্থির-সিদ্ধান্ত হইয়া যায়, তাহা হইলে তাঁহার পক্ষীয় কোন লোক ছমিরকে হত্যা করে নাই; সে বিপক্ষ পক্ষীয় অর্থাৎ যামিনীবাবুর পক্ষীয় লোক কর্তৃক হত হইয়াছে, এইরূপ ভাবে মোকদ্দমা দাঁড়াইবে। পুলিনবাবু যে ভ্রমে পতিত হইয়াছিলেন, যামিনীবাবুও ঠিক সেই ভ্রমে পতিত হইয়া, এরফান যে তাঁহার লোক, তাহা উত্তমরূপে প্রমাণ করিয়া দিয়াছিলেন। তিনিও ভাবিয়াছিলেন, তাঁহার পক্ষীয় লোকের হত্যার নিমিত্ত তাহার বিপক্ষ পক্ষীয় জমীদারবাবুই দায়।”

    মৃতদেহ পরীক্ষা সম্বন্ধে ডাক্তারবাবু যেরূপ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন বলিয়া, ইনস্পেক্টারবাবু সকলকে বুঝাইলেন, তাহাতে সকলেই বুঝিল,—যদি সেই মৃতদেহ প্রকৃতই ছমিরের দেহ হয়, তাহা হইলে জীবিত অবস্থায় উহার মস্তক কাটিয়া লওয়ার নিমিত্ত পুলিনবাবুই এক্ষণে দায়ী। দাঙ্গা মোকদ্দমায় যাহাতে কোন পক্ষীয় লোক বলিয়া কোন মৃতব্যক্তিকেও কেহ সনাক্ত করিতে না পারে, এই ভাবিয়া প্রত্যেকে পক্ষীয় লোকই যখন আপন পক্ষীয় মৃতদেহ লইয়া প্রস্থান করিতে না পারে, তখন সেই মৃত ব্যক্তির মস্তক কাটিয়া লইয়া প্রস্থান করে, এরূপ কথা প্রায়ই শ্রবণ করা যায়। বর্ত্তমান মোকদ্দমায় যে সেইরূপ হয় নাই, তাহার প্রমাণ কি? অধিকন্তু পুলিনবাবু যখন ছমিরের আপনার পক্ষীয় লোক বলিয়া স্বীকার করিয়া লইতেছেন, অথচ জানা যাইতেছে যে, জীবিত অবস্থাতেই ছমিরের মস্তক কাটিয়া লওয়া হইয়াছে, তখন নিশ্চয়ই এই হত্যার জন্য দায়ী হইবেন—পুলিনবাবু।

    আবার পুলিনবাবু যেরূপে দায়ী, যামিনীবাবুও এদিকে ঠিক সেইরূপে এরফানের হত্যার নিমিত্ত দায়ী হইতেছেন। সেই মৃতদেহ যদি এরফানের হয়, তাহা হইলে জীবিত অবস্থাতেই এরফানের মস্তক কাটিয়া লওয়া হইয়াছে, এবং সেই কার্য্য যামিনীবাবুর লোকের দ্বারাই হইয়াছে। সুতরাং উহার হত্যার নিমিত্ত যামিনীবাবু দায়ী হইয়াছেন।

    ইনস্পেক্টারবাবু আরও কহিলেন, কেবল পুলিনবাবু ও যামিনীবাবুই যে ছমির বা এরফানকে হত্যা করিবার নিমিত্ত অপরাধী, তাহা নহে। তাঁহাদিগের প্রধান প্রধান কৰ্ম্মচারীমাত্রকেই সম্যকরূপে দায়ী হইতে হইবে। কারণ, প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীমাত্রই যে এই দাঙ্গার সময় উপস্থিত ছিলেন, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

    ইনস্পেক্টারবাবু উক্ত জমীদারদ্বয় ও তাঁহাদিগের কর্ম্মচারী ব্যতীত ছমিরের স্ত্রীকে, এবং এরফানের ভ্রাতা সরিফকে হত্যার সহায়তা করা অপরাধে প্রথমেই আসামী করিবেন কহিলেন। আরও কহিলেন, “এখন দেখা যাউক, ইহাদের মধ্যে কে এত মিথ্যা কথা বলিয়া আমাকে প্রতারণা করিতে সমর্থ হয়।”

    ইনস্পেক্টারবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া ছমিরের স্ত্রী, এবং সরিফ নিতান্ত ভীত হইয়া পড়িল। তাহারা আইনানুযায়ী ধৃত না ইহলেও বলা বাহুল্য যে, তাহার পুলিসের নজরের উপর রহিল।

    ইনস্পেক্টারবাবু যে অভিপ্রায় প্রকাশ করিয়াছিলেন, দেখিতে দেখিতে লোকমুখে ক্রমে তাহা প্রচার হইয়া পড়িল। ইনস্পেক্টারবাবুর মনে যে অভিসন্ধি ছিল, তাহা পূর্ণ হইয়া গেল। উভয় জমীদারের প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীমাত্রই ভীত হইয়া আর প্রকাশ্যরূপে বাহির হইলেন না। এদিকে ইনস্পেক্টারবাবু সেই সকল কর্ম্মচারীগণকে ডাকিয়া আনিবার নিমিত্ত ক্রমে লোক পাঠাইতে লাগিলেন। প্রেরিত লোকমাত্রই প্রত্যাগমন করিয়া বলিতে লাগিল, “যাহার নিমিত্ত আমি গমন করিয়াছিলাম, অনেক অনুসন্ধান করিয়া তাহার কোনরূপ সন্ধান পাইলাম না। ভাবগতিতে বোধ হইল, সে পলায়ন করিয়াছে।”

    ছমিরের স্ত্রী এবং সরিফ একাদিক্রমে দুই তিন দিবস পুলিসের সবিশেষ নজর-বন্দীতে থাকায় এবং উভয় পক্ষীয় জমীদারদিগের নিকট হইতে বা তাহাদিগের কর্মচারীগণের নিকট হইতে কোনরূপ সাহায্য না পাওয়াতে, ক্রমে তাহার অত্যাধিক ভীত হইয়া পড়িল, এবং তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিবার নিমিত্ত ইনস্পেক্টারবাবুর নিকট বিনীতভাবে মিনতি করিতে লাগিল। ইনস্পেক্টারবাবু তাহাদিগের কথায় কর্ণপাতও করিলেন না। অধিকন্তু কহিলেন, যে পর্য্যন্ত তোমরা প্রকৃতকথা না বলিবে, সেই পর্য্যন্ত আর কিছুতেই তোমাদিগের নিষ্কৃতি নাই, এখন তোমরা আমার নিকট রহিয়াছ, ইহাতে তোমাদিগের সবিশেষ কোনরূপ কষ্ট হইতেছে না। এইরূপভাবে আরও দুই এক দিবস তোমাদিগকে এইস্থানে রাখিব। ইহার মধ্যেও যদি প্রকৃত কথা না বল, তাহা হইলে তোমাদিগকে জেলের হাজতে পাঠাইয়া দিব। সেইস্থানে গমন করিলেই তোমরা প্রকৃতকথা আর গোপন করিয়া রাখিতে পারিবে না।”

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ইনস্পেক্টারবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া উহারা আরও ভীত হইয়া পড়িল, এবং পরিশেষে একদিবস উভয়েই ইনস্পেক্টারবাবুকে কহিল, “মহাশয়! আমরা উত্তমরূপে চিনিতে না পারিয়া, সেই মৃতদেহ সনাক্ত করিয়াছিলাম। এখন বুঝিতে পারিতেছি, আমাদিগের কার্য্য ভাল হয় নাই, আমরা নিতান্ত অন্যায় কার্য্য করিয়াছি।”

    উহাদিগের কথার উত্তরে ইনস্পেক্টারবাবু কহিলেন, “মৃতদেহ সনাক্ত করিয়া তোমরা কিছুই অন্যায় কার্য্য কর নাই, বরং ভালই করিয়াছ, তবে তোমাদের উভয়ের মধ্যে একজন মিথ্যা বলিতেছ, কি উভয়েই মিথ্যা বলিতেছ, তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যাহা হউক, এখনও তোমরা প্রকৃত কথা না বলিলে এক হত্যায় দুই হত্যার কাজ করিয়া লইব,—অর্থাৎ ছমিরকে হত্যা করার সহায়তায় তাহার স্ত্রীকে ফাঁসী যাইতে হইবে। আবার এরফানকে হত্যা করার সহায়তা করিবার নিমিত্ত সরিফকে চরমদণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে। এরূপ অবস্থায় তোমরা এখনও বিবেচনা করিয়া দেখ যে, প্রকৃতকথা বলিয়া তোমরা আপন আপন জীবনরক্ষা করিতে প্রস্তুত আছ কি না।”

    ইনস্পেক্টারবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া উহারা পুনরায় কহিল, “মহাশয়! আমরা এখন প্রকৃতকথা বলিতেছি। আমরা ভালরূপে চিনিতে না পারিয়া, সেই মৃতদেহ সনাক্ত করিয়াছিলাম।”

    ইনস্পেক্টার। এখনও তোমরা মিথ্যা কথা কহিতেছ। কি কারণ তোমরা সেই মৃতদেহ সনাক্ত করিয়াছিলে, তাহার প্রকৃত অবস্থা না বলিলে, আমি কখনই তোমাদিগকে ছাড়িয়া দিব না। আমি তোমাদিগকে এক এক করিয়া গুটি কতক কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি, তাহার উত্তর শুনিলে আমি বুঝিতে পারিব যে, তোমরা মিথ্যা কথা কহিতেছ, কি সত্য কথা বলিতেছ। সরিফ! তুমি এখন প্রকৃতরূপে আমাকে বল দেখি, তুমি যে মৃতদেহ দেখিয়াছিলে, তাহা তোমার ভ্রাতা এরপানে মৃতদেহ কি না।

    সরিফ। না মহাশয়! উহা আমার ভ্রাতার মৃতদেহ নহে, সেই সময় আমি ঠিক চিনিয়া উঠিতে পারি নাই।

    ইনস্পেক্টার। তোমার একথা আমি কি প্রকারে বিশ্বাস করিতে পারি?

    সরিফ। আমি এখন যাহা কহিতেছি, তাহা প্রকৃত কথা। এখন আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করিতে পারেন।

    ইনস্পেক্টার। যদি তুমি চিনিতে না পারিয়া থাক, এবং সেই মৃতদেহ যদি এরফানের মৃতদেহ না হয়, তাহা হইলে তোমার ভাই সেই এরফান কোথায়?

    সরিফ। তিনি যে এখন কোথায় আছেন, তাহা আমি জানি না।

    ইনস্পেক্টার। একথা বলিলে চলিবে না। যে পর্য্যন্ত আমি তোমার ভাই এরফানকে দেখিতে না পাইব, সেই পৰ্য্যন্ত কিছুতেই আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করিতে পারিব না। কারণ, ইহা নিশ্চিত কথা যে, যে ব্যক্তি একবার মিথ্যা কথা বলিতে পারে, সে অনায়াসে সহস্র মিথ্যা কথাও কহিতে পারে।

    সরিফ। আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন আর না করুন, জানিবেন যে, এখন আমি প্রকৃতকথা কহিতেছি। কিন্তু আমি আমার ভ্রাতাকে কোনরূপেই আপনার নিকট আনিতে সমর্থ হইব না।

    ইনস্পেক্টার। তুমি তাহাকে আনিতে না পার; কিন্তু সে কোথায় আছে, তাহা যদি আমাদিগেকে বলিয়া দেও, তাহা হইলে আমরা তাহাকে আনিতে পারিব।

    ইনস্পেক্টারবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া সরিফ কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, এবং পরিশেষে কহিল, “প্রকৃতকথা কি বলিব মহাশয়! আমার কাপল পুড়িয়া গিয়াছে। এখন আমি বেশ বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমার দুষ্কর্ম্মের ফল আমাকে গ্রহণ করিতে হইবে। মিথ্যা বলিলেও আপনার হস্ত হইতে আমার পরিত্রাণের উপায় নাই! সত্য কথা বলিলেও আমার নিষ্কৃতি নাই।”

    ইনস্পেক্টার। আমি প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি, যদি তুমি এখনও সত্য কথা বল, এবং সত্য কথা বলিতেছ বলিয়া আমার প্রতীতি জন্মাইতে পার, তাহা হইলে আমা কর্তৃক তোমার কোনরূপেই অনিষ্ট হইবে না। আর আমি বর্ত্তমান থাকিতে অপর কেহই তোমার কোন অনিষ্ট সাধন করিতে পারিবে না।

    সরিফ। আপনি প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছেন যে, কোন প্রকারে আপনি আমার অনিষ্ট করিবেন না, এবং অপর কোন ব্যক্তি আমার অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিলে, আপনি আমাকে রক্ষা করিবেন?

    ইনস্পেক্টার। একথা আমি পূৰ্ব্বেই তোমাকে বলিয়াছি, এবং এখন কহিতেছি। তুমি প্রকৃতকথা বল; তোমার কোনরূপে অনিষ্ট হইবে না।

    সরিফ। প্রকৃতকথা কহিলে জমীদারদ্বয়ের মধ্যে কেহ আমার অনিষ্ট করিতে পারেন, এরূপ অবস্থায় আপনি আমার উপর লক্ষ্য রাখিবেন?

    ইনস্পেক্টার। তুমি প্রকৃতকথা বল, তোমার কোন ভয় নাই। আমি বর্ত্তমান থাকিতে কোন জমীদার তোমার উপর কোনরূপ অত্যাচার করিতে সমর্থ হইবেন না।

    সরিফ। আমার অদৃষ্ট যাহাই হউক, আমি আর মিথ্যা কথা কহিব না। আমি পূর্ব্বে আপনাকে বলিয়াছি যে, এরফান আমার সহোদর ভ্রাতা এবং জমীদার যামিনীবাবুর সরকারে তিনি কর্ম্ম করেন; ইহা মিথ্যা কথা নহে। যে রাত্রিতে এই দাঙ্গা হইয়া যায়, তাহার পরদিবস একজন লোক পাঠাইয়া যামিনীবাবু আমাকে তাঁহার বাড়ীতে ডাকাইয়া লইয়া যান। ইহার পূর্ব্বে অনেকবার আমি জমীদার মহাশয়ের বাড়ীতে গমন করিয়াছি, কিন্তু সেই দিবস আমাকে যে স্থানে লইয়া যান, সেইস্থান আমি পূর্ব্বে কখনও দেখি নাই। উহা যামিনীবাবুর বাহির বাড়ী নহে, বা অন্দর বাড়ীও নহে, উহা সদর ও অন্দরমহল বাড়ীর মধ্যস্থিত একটি স্থান। সেইস্থানে গমন করিয়া দেখিলাম, আমার ভ্রাতা এরফান সেইস্থানে বসিযা আছে। জমীদারবাবুর একজন প্রধান কৰ্ম্মচারী সেইস্থানে বসিয়া এরফানের সহিত কথা কহিতেছেন। আমি সেইস্থানে গমন করিবামাত্র সেই কৰ্ম্মচারী মহাশয় আমাকে সেইস্থানে বসিতে কহিলেন। আমি সেইস্থানে উপবেশন করিলে কর্ম্মচারী মহাশয় আমার উপস্থিতি সংবাদ যামিনীবাবুর নিকট প্রেরণ করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে যামিনীবাবুও আসিয়া সেইস্থানে উপস্থিত হইলেন। যামিনীবাবু সেই সময় আমাকে কহিলেন, তোমরা দুই ভাই আমার বহুদিবসের অনুগত প্রজা; সুতরাং বিপদ আপদের সময় তোমাদিগের ভরসা আমি সবিশেষরূপে করিয়া থাকি। সম্প্রতি তুমি শুনিয়া থাকিবে যে, পুলিনবাবুর লোকের সহিত আমার পক্ষীয় লোকের একটি ভয়নাক দাঙ্গা হইয়া গিয়াছে, এবং সেই দাঙ্গার সময় একটি খুনও হইয়া পড়িয়াছে। আমি শুনিলাম, ছমিরের স্ত্রী ইনস্পেক্টারবাবুর নিকট প্রকাশ করিয়াছে যে, সেই মৃতব্যক্তিই তাহার স্বামী ছমির। এতদঞ্চলস্থ সকলেই অবগত আছে যে, ছমির পুলিনবাবুর নিকট কর্ম্ম করে। এরূপ অবস্থায় যখন সে হত হইয়াছে, তখন সকলেই স্থির-সিদ্ধান্ত করিয়া বসিবেন, পুলিনবাবুর লোক ছমিরকে, পুলিনবাবুর পক্ষীয় কোন ব্যক্তি হত্যা করে নাই; সে নিশ্চয়ই যামিনীবাবুর লোকের দ্বারা হত হইয়াছে। এরূপ অবস্থায় হত্যার সমস্ত দোষ আমাদিগের উপর পড়িবে; সুতরাং আমরা সবিশেষরূপে বিপদ্‌গ্রস্থ হইব। যাহাতে আমাদিগের উপর এই বিপদ না পড়িতে পারে, আমি তাহার এক উপায় স্থির করিয়াছি। তোমরা দুই ভাই সেই বিষয় আমাকে সাহায্য করিলে, আমাদিগের ভয়ের আর কোন কারণ থাকিবে না।

    “বাবুর কথা শ্রবণ করিয়া আমি তাহাকে কহিলাম, যখন আমরা দুই ভাই আপনার অন্নে প্রতিপালিত, তখন এই সামান্য উপকার আর আমাদিগের দ্বারা ইহবে না? কি করিলে আপনাকে কোনরূপ বিপদে পতিত হইতে না হয়, তাহা আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলুন, আমি তাহাই করিতে প্রস্তুত আছি।”

    “আমার কথার উত্তরে যামিনীবাবু কহিলেন, ‘তোমার ভ্রাতা এরফান আমার নিকট কৰ্ম্ম করে, ইহা সকলেই অবগত আছে। আমি এরফানকে আমার বাড়ীর ভিতর এরূপ গুপ্তভাবে রাখিয়া দিব যে, বাহিরের কোন লোক তাহাকে দেখিতে পাইবে না। আবশ্যক হইলে কেবল তুমি গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিবে। এদিকে এরফান আমার বাড়ীর ভিতর লুক্কায়িত ভাবে অবস্থিতি করুক, ওদিকে তুমি গিয়া সেই মৃতদেহ সনাক্ত করিয়া ইনস্পেক্টারবাবুর নিকট এজাহার দেও যে, যে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, তাহা তোমার ভ্রাতা এরফানের মৃতদেহ। এইরূপ করিলে অনুসন্ধানকারী কর্ম্মচারী কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিবেন না যে, সেই মৃতদেহ কোন ব্যক্তির। কারণ, মস্তক না থাকায় সেই মৃতদেহ অপর কোন ব্যক্তি কর্তৃক সনাক্ত হইবার সম্ভাবনা নাই। লাস সনাক্ত সম্বন্ধে এইরূপ গোলযোগ বাঁধিলে, উভয় পক্ষীয় লোকের মধ্যে কোন ব্যক্তিই হত্যা-অপরাধে ধৃত হইবে না। পরিশেষে গোলযোগ মিটিয়া গেলে, তোমার ভাইকে এই গুপ্তস্থান হইতে বাহির করা যাইবে।

    “জমীদারবাবুর কথা নিতান্ত অসঙ্গত হইলেও আমি দেখিলাম, ইহাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি নাই। সুতরাং আমি এরফানের অনুমতিক্রমে জমীদারবাবুর প্রস্তাবে সম্মত হইলাম। এরফান সেই স্থানেই রহিল। আমি সেইস্থান. হইতে বহির্গত হইয়া যে স্থানে সেই মৃতদেহ পড়িয়াছিল, সেইস্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম, এবং স্বচক্ষে মৃতদেহটি উত্তমরূপে দর্শন করিলাম। পরিশেষে আপনার নিকট উপস্থিত হইয়া যাহা যাহা কহিয়াছিলাম, তাহা আপনি সেই সময়েই লিখিয়া লইয়াছিলেন। মহাশয়! এই ত প্ৰকৃত অবস্থা। এখন আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন বা নাই করুন।”

    ইনস্পেক্টার। তোমার কথায় আমি এখন সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করিতেছি। তুমি যে এখন প্রকৃত কথা বলিয়াছ, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু তোমার ভাই এরফান কোথায় আছে, তাহা বলিতে পার কি?

    সরিফ। প্রথম দিবস যে গৃহের মধ্যে আমি এরফানকে পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছিলাম, তাহার পর যে দিবস আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলাম, সেই দিবসও সেই গৃহের ভিতর তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। আজ তিন দিবস হইতে আপনি আমাকে কোনস্থানে গমন করিতে দেন নাই; সুতরাং এই তিন দিবসের সংবাদ আমি বলিতে পারি না। তবে আমার বোধ হয়, তাহাকে সেইস্থান হইতে স্থানান্তরিত করা হয় নাই কারণ, যামিনীবাবু আজ কয়েক দিবস হইতে বাড়ীতে নাই।

    সরিফের কথা শুনিয়া ইনস্পেক্টারবাবু আর কালবিলম্ব করিতে পারিলেন না। সরিফকে সঙ্গে লইয়া তৎক্ষণাৎ যামিনীবাবুর বাড়িতে গমন করিলেন, এবং যে স্থানে সরিফ তাহার ভ্রাতাকে দেখিয়া আসিয়াছিল, সেই গৃহের ভিতরই এরফানকে প্রাপ্ত হইলেন।

    এরফানকে সঙ্গে লইয়া পুনরায় তিনি তাঁহার অনুসন্ধানের স্থানে গমন করিলেন, এবং ছমিরের স্ত্রীকে ডাকাইয়া কহিলেন, “সরিফ প্রকৃতকথা বলিয়া আমার হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিয়াছে। এখন তুমি প্রকৃতকথা বলিতে চাই, কি মিথ্যা কথা বলিতে চাহ?”

    স্ত্রীলোক। আমি প্রকৃতকথা কহিব।

    ইনস্পেক্টার। প্রকৃতকথা কি বল দেখি।

    স্ত্রীলোক। মৃতদেহ আমি ভালরূপ চিনিতে না পারিয়া ভ্রমক্রমে আমার স্বামীর দেহ বলিয়াছিলাম। এখন বুঝিতে পারিতেছি, সেই মৃতদেহ আমার স্বামীর নহে।

    ইনস্পেক্টার। ইহাই কি তোমার প্রকৃত কথা।

    স্ত্রীলোক। হাঁ মহাশয়।

    ইনস্পেক্টার। ইহাই যদি তোমার প্রকৃত কথা হয়, তাহা হইলে সরিফ যেমন সত্যকথা প্রকাশ করিয়া তাহার ভ্রাতা এরফানকে দেখাইয়া দিয়াছে, তুমিও সেইরূপ তোমার স্বামী ছমিরকে দেখাইয়া দেও, তাহা হইলে আমি তোমাকে নিষ্কৃতি প্রদান করিব।

    ইনস্পেক্টারবাবুর এই কথা শ্রবণ করিয়া ছমিরের স্ত্রী আর কোন উত্তর করিতে পারিল না। ক্রমে তাহার চক্ষু দিয়া জলধারা বহির্গত হইল, এবং পরিশেষে সে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিল।

    ইহার এই অবস্থা দেখিয়া ইনস্পেক্টারবাবু বুঝিতে পারিলেন যে, পূর্ব্বে সে প্রকৃত কথাই বলিয়াছিল, তাহার স্বামী ছমির প্রকৃতই হত হইয়াছে। কিন্তু সরিফ তাহার কথার পরিবর্তন করিয়া যেমন নিষ্কৃতিলাভ করিল, এও সেইরূপে পুলিসের হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিতে চাহে, এবং এই নিমিত্ত সরিফের মত সেও তাহার কথার পরিবর্তন করিতেছে। যাহা হউক, ইনস্পেক্টারবাবু সেই স্ত্রীলোকটিকে সান্ত্বনা করিয়া পুনরায় কহিলেন, “তোমার কোনরূপ ভয় নাই। সরিফ তাহার পূর্ব্ব কথার পরিবর্ত্তন করিল বলিয়াই যে তোমাকেও তাহাই করিতে হইবে, তাহার কোন অর্থ নাই। প্রকৃতকথা যাহা, তাহাই তুমি বল, তোমার কোন ভয় নাই। এখনই আমি তোমাকে ছাড়িয়া দিতেছি।”

    ইনস্পেক্টারবাবুর এই কথা শ্রবণ করিয়া ছমিরের স্ত্রী কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল, “আপনি আমাকে ছাড়িয়া দিন আর নাই দিন, আমি পূর্ব্বে যাহা বলিয়াছিলাম, তাহাই প্রকৃত। সেই মৃতদেহ আমার স্বামীর দেহ ভিন্ন অপর কাহারও নহে। যখন আমার স্বামীই হত হইয়াছে, তখন কিসের নিমিত্ত আর মিথ্যা কথা কহিব? তবে এতক্ষণ যে মিথ্যা কথা কহিতেছিলাম, সে কেবল সরিফের পরামর্শ অনুযায়ী। আমি আর মিথ্যা কথা কহিব না, পূর্ব্বে যাহা বলিয়াছিলাম, তাহাই বলিব। ইহাতে আমার অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহা হইবে।”

    ছমিরের স্ত্রীর এই কথা শুনিয়া ইনস্পেক্টারবাবু তাহাকে বিদায় দিলেন। কিন্তু বলিয়া দিলেন, “যখনই আমার প্রয়োজন হইবে, ডাকিবামাত্র তখনই আমার নিকট আগমন করিবে।” ইনস্পেক্টারবাবুর কথায় ছমিরের স্ত্রী সম্মত হইয়া আপন স্থানে প্রস্থান করিল।

    বোধ হয়, পাঠকগণকে বলিয়া দিতে হইবে না যে, যে উপায় অবলম্বনে ইনস্পেক্টারবাবু লাসের প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হইতে পারিলেন, তাহা ডাক্তারের পরীক্ষার ফল নহে, উহা ইনস্পেক্টারবাবুর স্বকপোল-কল্পিত ঘটনামাত্র। ডাক্তারবাবুর লাস পরীক্ষার রিপোর্টের কোনস্থানে এমন কোন কথা দৃষ্টিগোচর হয় না যে, তিনি বলিয়াছেন,—যে সময়ে সেই দেহের মস্তক ছেদিত হইয়াছিল, সেই সময় সে আহত ছিল মাত্র; কিন্তু মৃত্যুমুখে পতিত হয় নাই, বা মস্তক ছেদন করাই তাহার মৃত্যুর কারণ।

    লাসের সনাক্ত লইয়া ইনস্পেক্টারবাবু যেরূপ গোলযোগে পতিত হইয়াছিলেন, অতঃপর সেই গোলযোগ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া খুন সম্বলিত দাঙ্গা মোকদ্দমার অনুসন্ধান যতদূর সম্ভব, ক্রমে তাহাই করিতে লাগিলেন। ঘটনাস্থলে বসিয়া ক্রমে ক্রমে তিনি যেমন প্রমাণ সংগ্রহ করিতে লাগিলেন, অমনি উভয় জমীদার পক্ষীয় লোকজনকে ধৃত করিয়া মাজিষ্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করিতে লাগিলেন।

    যে সকল আসামী প্রেরিত হইল, বিনাক্লেশে তাহাদিগের বিপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ সংগৃহীত হইয়া গেল। কারণ পুলিনবাবুর লোকজনের বিপক্ষে যামিনীবাবুর লোক সকল সাক্ষ্য প্রদান করিল, এবং যামিনীবাবুর কর্মচারীগণের বিপক্ষে পুলিনবাবুও তাঁহার সাধ্যমত প্রমাণ সংগ্রহ করিয়া দিলেন। জমীদারদ্বয়ের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হইলে বিচক্ষণ পুলিস-কর্মচারীগণকে প্রায় কোন কার্য্যই করিতে হয় না। পরস্পরের লোকের সাহায্যে পরস্পরের লোকদিগকে অনায়াসে জেলে পাঠাইতে সমর্থ হইয়া থাকেন। সুতরাং ইনস্পেক্টারবাবু এক স্থানেই বসিয়া উভয় জমীদারের সাহায্যে উভয় জমীদারেরই সর্ব্বনাশ সাধন পূর্ব্বক অনায়াসেই আপন কার্য্য উদ্ধার করিয়া সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    খুন সংযুক্ত দাঙ্গা করা অপরাধে দশজন লোক আসামী হইল। তাহার মধ্যে পাঁচজন লোক যামিনীবাবুর পক্ষীয় এবং অবশিষ্ট পাঁচজন লোক পুলিনবাবুর পক্ষীয়। দশজনেই একরূপ অভিযোগে অভিযুক্ত হইল। ডেপুটিবাবুর এজলাসে অনেকগুলি সাক্ষীর দ্বারা প্রমাণিত হইল, যে গ্রাম লইয়া বিবাদ, সেই গ্রামের বাহিরে ময়দানের ভিতর অনেক লোকের সমাগম হয়। বিবাদস্থল গ্রাম পূর্ব্বে যাঁহার ছিল, তাঁহার নিকট হইতে যামিনীবাবু এক সময় সেই গ্রাম পত্তনি লইয়াছিলেন, এবং সেই সময় হইতে সেই গ্রাম দখল করিয়া আসিতেছেন। সম্প্রতি খাজনা না দেওয়ার নিমিত্ত সেই গ্রাম বিক্রীত হইয়া যায়, এবং পুলিনবাবু উহা ক্রয় করিয়া লন। নিলামে খরিদ করার পর হইতে পুলিনবাবু কয়েকবার সেই গ্রাম দখল করিতে যান; কিন্তু একবারও কৃতকার্য হইতে পারেন নাই, কয়েকবারই যামিনীবাবুর নিকট পরাভূত হইয়া আসিয়াছিলেন। সম্প্রতি সেই গ্রাম দখল করিবার নিমিত্ত তিনি রীতিমত লোকজন সংগ্রহ করেন। যামিনীবাবুও পুলিনবাবুর অভিসন্ধির বিষয় অবগত হইতে পারিয়া, পূর্ব্ব হইতেই লোকজনের সংগ্রহ করিয়া রাখেন। ইহার পরই একদিবস উভয় পক্ষীয় লোক সকল গ্রামের বাহিরে ময়দানের ভিতর সমবেত হয়, এবং পরিশেষে রাত্রি এক প্রহর হইতে না হইতেই উভয় পক্ষে ভয়ানক দাঙ্গা উপস্থিত হয়; লাঠি, সড়কি, ঢাল, তরবারি প্রভৃতির ত কথাই নাই। সাক্ষীর মুখে আরও প্রকাশ—এই ভয়ানক দাঙ্গায় আগ্নেয় অস্ত্র পর্য্যন্ত ব্যবহৃত হইয়াছিল। কত লোক যে এই দাঙ্গায় আহত হইয়াছে, তাহার স্থিরতা নাই। কিন্তু পুলিস অনুসন্ধান করিয়া আহত লোকদিগের মধ্যে কাহাকেও প্রাপ্ত হন নাই। যে দশজন লোক বিচারার্থে প্রেরিত হইয়াছে, তাহাদিগের মধ্যে কাহারই শরীরে আঘাতের চিহ্ন নাই। এই ভয়ানক দাঙ্গা প্রায় একঘণ্টা কাল হইয়াছিল, ইহার মধ্যে কোন পক্ষীয় লোকই পরাভূত হয় নাই। কিন্তু পরিশেষে যামিনীবাবুর পক্ষ হইতে একটি গুলি গিয়া ছমিরের বক্ষঃস্থলে বিদ্ধ হয়, দেখিতে দেখিতে ছমির সেইস্থানে পতিত হয়, ও ইহজীবন পরিত্যাগ করে। ছমিরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই দাঙ্গাও শেষ হয়। পুলিনবাবুর লোকজন আর গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে নাই, তাহারা সেইস্থান হইতে পশ্চাদগামী হয়। গান করিবার সময় পুলিনবাবুর লোকজন ছমিরের মৃতদেহ লইয়া যাইবার নিমিত্ত অনেক চেষ্টা করিয়াছিল; কিন্তু কোনরূপে কৃতকার্য না হইয়া তাহার মস্তকটি কাটিয় লইয়া প্রস্থান করে। ছমিরের মস্তক যে কোথায় লুক্কায়িত হইয়াছে, পুলিস অনুসন্ধান করিয়া তাহার কিছুই স্থির করিতে পারেন নাই।

    ডেঙ্গুটীবাবার নিকট এই সকল কথা সাক্ষীর দ্বারা প্রমাণিত হইলে, তিনি দশজন আসামীকেই বিচারার্থ দায়রায় প্রেরণ করিলেন!

    এই মোকদ্দমা দায়রায় অর্পিত হইলে, জমীদারদিগের উভয়েরই চেতনা হইল। তখন তাঁহারা মনে মনে ভাবিলেন যে, ‘যে দারোগাবাবু অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত স্বর্ব্বপ্রথম আগমন করিয়াছিলেন, তিনি নিজের অভিসন্ধি পূর্ণ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু যাহা বলিয়া আমাদিগকে বুঝাইয়াছিলেন, কই তাঁহার ত কিছুই করিলেন না। ইহাতে স্পষ্টই অনুমান হয় যে, হয় শঠতা করিয়া তিনি আমাদিগের নিকট হইতে অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন, না হয় ইনস্পেক্টারবাবু তাঁহাকে মোকদ্দমার অনুসন্ধান হইতে বিরত করিয়াছেন বলিয়া, তিনি তাঁহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে সমর্থ হন নাই।’ এই ভাবিয়া জমিদারদ্বয়ই মনের কষ্ট মনেই গোপন করিলেন, সে কথা আর কাহারও নিকট প্রকাশ করিলেন না। ভাবিলেন, বুদ্ধির দোষে এত অর্থ নিরর্থক জলে নিক্ষিপ্ত হইল।

    দায়রায় মোকদ্দমা উঠিবার কেবলমাত্র দুই তিন দিবস বাকি আছে, সেই সময় যামিনীবাবু কথায় কথায় দারোগাবাবুর কথা তাঁহার উকীলের নিকট প্রকাশ করিলেন। উকীলবাবু দারোগাবাবুর আচরণের কথা শুনিয়া মনে মনে অসন্তুষ্ট হইলেন সত্য, কিন্তু যামিনীবাবুকে কহিলেন, “একবার গোপনে সেই দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলে বোধ হয়, সবিশেষ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই। অধিকন্তু কোনরূপ উপকার হইলেও হইতে পারে।”

    উকীলবাবুর পরামর্শ মত যামিনীবাবু এক রাত্রিতে গিয়া দারোগাবাবুর সহিত গোপনে সাক্ষাৎ করিলেন। যামিনীবাবুকে দেখিবামাত্র দারোগাবাবু কহিলেন, “কি মহাশয়! এতদিবস পরে কি মনে করিয়া আপনার আগমন হইয়াছে?”

    যামিনী। আপনার সহিত অনেক দিবস হইতে সাক্ষাৎ হয় নাই, সেই নিমিত্ত আজ একবার সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত আগমন করিয়াছি।

    দারোগা। তাহা নহে। আমি আপনাদিগের মোকদ্দমার অনুসন্ধান করি নাই বলিয়া আপনার প্রদত্ত টাকাগুলি ফেরত লইতে আগমন করিয়াছেন।

    যামিনী। আপনি অনুসন্ধান করুন আর না করুন, যাহা আপনাকে প্রদান করিয়াছি, তাহা পুনরায় পাইবার প্রত্যাশা করি না।

    দারোগা। আপনি প্রত্যাশা করুন আর না করেন, এই মোকদ্দমায় আপনাদিগের লোকজনের যদি দণ্ড হইয়া যায়, তাহা হইলে নিশ্চয় জানিবেন যে, আপনাদিগের প্রদত্ত অর্থ আমি কোনরূপেই গ্রহণ করিব না।

    যামিনী। সে পরের কথা। আপনি এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান না করিয়া ঘটনাস্থল হইতে চলিয়া আসিলেন কেন?

    দারোগা। আপনারা বোধ হয় অবগত আছে যে, ইনস্পেক্টারবাবুর সহিত আমার মনোমালিন্য আছে। কিন্তু কি করি, তিনি আমার ঊর্দ্ধর্তন কর্মচারী; সুতরাং তাঁহার আদেশ আমাকে প্রতিপালন করিতে হয়। এই ঘটনার সংবাদ পাইয়া তিনি ঘটনাস্থলে আসিয়া উপস্থিত হন, এবং স্বহস্তে অনুসন্ধানের ভার গ্রহণ করেন। সুতরাং আমাকে এই অনুসন্ধান কাৰ্য্য হইতে চলিয়া আসিতে হয়। আমি স্বয়ং অনুসন্ধান করি নাই বলিয়া যে আপনাদিগের কোন কাৰ্য্য করি নাই, তাহা নহে। আমার হস্তে অনুসন্ধানের ভার থাকিলে আমি আপনাদিগের নিমিত্ত যাহা করিতাম, স্বয়ং অনুসন্ধান না করিয়াও তাহাই করিয়াছি। আপনি নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া থাকুন, এ মোকদ্দমা হইতে আপনার সমস্ত লোকজন মুক্তিলাভ করিবে।

    যামিনী। কিরূপে মুক্তিলাভ করিবে, তাহার কোন উপায় বলিয়া দিন।

    দারোগা। উপায় নূতন করিয়া আমাকে আর কিছুই বলিতে হইবে না; সমস্ত উপায় কাগজ পত্রের ভিতরই আছে, আপনিই প্রকাশ হইয়া পড়িবে। তবে একটি কথা আপনাকে বলিয়া রাখি, আপনি আপনার উকীলকে কহিবেন, ‘প্রথম এতলার’ কাগজ নথির সামিল হইয়াছে, কি না? যদি না হইয়া থাকে, তাহ হইলে যাহাতে সেই কাগজ নথির সামিল হয়, তাহার যেন চেষ্টা করা হয়।

    যামিনী। আপনি যখন এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান নিজে করেন নাই, তখন কি প্রকারে জানিলেন যে, আসামীগণের মুক্তিলাভের সমস্ত উপায়ই কাগজ পত্রের ভিতর আছে। আপনি কাগজপত্র দেখিয়াছেন কি?

    দারোগা। অনুসন্ধানের কাগজপত্র না দেখিলেও আপনাকে যাহা কহিলাম, তাহা করিবেন। দেখিবেন, আমার কথা কতদূর প্রকৃত। এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান আমা কর্তৃক সমাপ্ত হয় নাই সত্য। কিন্তু সৰ্ব্বপ্রথমে যখন আমি উহা আপন হস্তে গ্রহণ করিয়াছিলাম, তখনই আমি আপনাদিগের বিষয় চিন্তা করিয়া লইয়াছিলাম। সুতরাং সেই সময় হইতে তাহার উপায়ও স্থির করিয়া রাখিয়াছি।

    দারোগাবাবুর নিকট এই সকল কথা অবগত হইয়া যামিনীবাবু তাঁহার সেই উকীলের নিকট পুনরায় গমন করিলেন, এবং তাঁহার সহিত দারোগাবাবুর যে সকল কথাবার্তা হইয়াছিল, তাহার আদ্যোপান্ত বর্ণন করিলেন।

    যামিনীবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া উকীলবাবু কহিলেন, “আমি এই মোকদ্দমার কাগজপত্র সকল ভালরূপে দেখিয়াছি। তিনি যে প্রথম এতলা নথির সামিল করিতে কহিয়াছেন, নিম্ন আদালত হইতে তাহা নথির সামিল হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু ‘প্রথমে এতলার’ ভিতর এমন কোন কথা আমি দেখিতে পাই নাই যে, যাহাতে তাহার দ্বারা আমার কোন প্রকার উপকারের প্রত্যাশা করিতে পারি। আপনার নিকট হইতে যখন তিনি উপকৃত হইয়াছেন, তখন যাহাতে আপনি নিরাশ না হয়েন, তাহারই নিমিত্ত যাহা তাঁহার মনে উদয় হইয়াছে, তাহাই বলিয়া আপনাকে বুঝাইয়া দিয়াছেন। যে ব্যক্তি নিজে কোনরূপ অনসুন্ধান করিতে পান নাই, তিনি ইচ্ছা করিলেও কোন পক্ষের কোনরূপ উপকার করিতে সমর্থ হইবেন না।”

    উকীলবাবুর কথাতে যামিনীবাবু বুঝিলেন যে, দারোগাবাবু তাঁহার সহিত প্রতারণা করিয়াছেন।

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    দায়রায় এই মোকদ্দমার বিচার আরম্ভ হইল। পুলিনবাবুর পক্ষীয় যে কয়েকজন লোক আসামী ছিল, তাহাদিগের বিপক্ষে যামিনীবাবুর অনুগত কয়েকজন লোক সাক্ষ্য প্রদান করিল। তাহাদিগের দ্বারা প্রমাণিত হইল—পুলিনবাবুর পক্ষীয় কয়েকজন আসামীই সেই দাঙ্গায় উপস্থিত ছিল, ও তাহারা যামিনীবাবুর পক্ষীয় লোকদিগকে আক্রমণ করিয়াছিল।

    যামিনীবাবুর লোকজনের মধ্যে যে কয়েকজন আসামী হইয়াছিল, তাহাদিগের বিপক্ষেও সাক্ষ্য প্রদান করিল,—পুলিনবাবুর কয়েকজন প্রজা। তাহারা প্রমাণ করিল যে, যামিনীবাবুর লোকেরাই পুলিনবাবুর লোককে নিতান্ত অন্যায়রূপে আক্রমণ করিয়াছে, এবং ছমির নামক একজন লোককে হত্যা করিয়াছে।

    ছমিরের স্ত্রীর কথা শুনিয়া সকলে বুঝিতে পারিলেন যে, যে স্থানে দাঙ্গা হইয়াছিল, সেইস্থানে প্রাপ্ত লাসকে ছমিরের স্ত্রী দর্শন করিয়াছিল, এবং উহা তাহার স্বামীর মৃতদেহ বলিয়া চিনিতেও পারিয়াছিল।

    এইরূপে নানা সাক্ষী দ্বারা নানা বিষয় প্রমাণিত হইলে জজসাহেব সরকারী উকীলকে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয় জিজ্ঞসা করিলেন। জজসাহেব যাহা জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা পূর্ব্বে সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছিল; তথাপি সরকারী উকীল জজসাহেবকে সেই সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করিলেন।

    জজসাহেব। যখন দেখা যাইতেছে যে, জমীদার পুলিনবাবু ও যামিনীবাবুর মধ্যে এই ভয়ানক দাঙ্গা ও হত্যা হইয়া গিয়াছে, তখন উভয় জমীদারকে এই দাঙ্গা মোকদ্দমায় আসামী করা হয় নাই কেন?

    সরকারী উকীল। পুলিসের রিপোর্টে প্রকাশ যে, যে সময় এই দাঙ্গা উপস্থিত হয়, সেই সময় উভয়েই সেই দাঙ্গা হইবার স্থানে অনুপস্থিত ছিলেন। সেই সময়ে তাঁহারা যে যে স্থানে ছিলেন, সেই সেই স্থানের মান্য গণ্য লোকদিগের দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, জমীদারদিগের কথা প্রকৃত। পরন্তু তাঁহাদিগের বিপক্ষে কোনরূপ প্রমাণ সংগৃহীত হয় নাই বলিয়া, তাঁহাদিগকে এই মোকদ্দমায় আসামী করা হয় নাই। কিন্তু আমাদিগের ইচ্ছা আছে, বর্তমান মোকদ্দমার বিচার শেষ হইয়া গেলে, উভয় জমীদারকে মুচলেকায় আবদ্ধ করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করা যাইবে।

    জজসাহেব। অধিকাংশ সাক্ষীর মুখে প্রকাশ যে, এই দাঙ্গায় সড়কি, লাঠি, তরবারী এবং বন্দুক পৰ্য্যন্ত ব্যবহৃত হইয়াছিল। ইহা যদি প্রকৃত হয়, তাহ হইলে নিশ্চয়ই অনেক লোক আহত হইয়াছে; কিন্তু আসামীগণের মধ্যে কোন ব্যক্তিরই কোনরূপ আঘাতের চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হইতেছে না, ইহারই বা কারণ কি?

    সরকারী উকীল। জমীদারে জমীদারে দাঙ্গা হইলে, আহত লোকদিগকে প্রাপ্ত হওয়া নিতান্ত সামান্য ব্যাপার নহে। কারণ, জমীদারগণ ভালরূপে অবগত আছেন যে, যদি আহত লোকদিগকে পুলিস অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিতে পারে, তাহা হইলে মোকদ্দমা উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়া যায়। সুতরাং যাহাতে আহত লোকদিগকে পুলিস কোন প্রকারেই প্রাপ্ত না হইতে পারে, তাহার নিমিত্ত জমীদারগণ বিশেষরূপে যত্ন করিয়া থাকেন। এই নিমিত্তই আহত লোকদিগকে পুলিস ধৃত করিতে পারে নাই।

    জজসাহেব। সাক্ষীদিগের দ্বারা যদিও উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, আসামীগণের মধ্যে সকলেই সেই দাঙ্গায় উপস্থিত ছিল। তথাপি আপনার নিকট হইতে আমি জানিতে ইচ্ছা করি যে, রাত্রিকালের দাঙ্গায় সাক্ষীগণের ভুল হইবার সম্ভাবনা আছে কি না, ভুল করিয়া একের পরিবর্তে অপরকে সনাক্ত করিতে পারে কি না?

    সরকারী উকীল। জগতের সকলেই যে অভ্রান্ত, তাহা আমি বলিতে পারি না। কারণ, যাহার ভুল না হয়, এমন মনুষ্যই নাই। কিন্তু বৰ্ত্তমান মোকদ্দমায় সাক্ষীগণের ভুল হইবার সম্ভাবনা নিতান্ত অল্প! কারণ, যে ময়দানের ভিতর এই দাঙ্গা হইয়াছে, সেই ময়দান অতি পরিষ্কার, এবং তাহার মধ্যে দৃষ্টিগোচর হইতে পারে, এমন একটি বৃক্ষ পৰ্য্যন্তও নাই। এই দাঙ্গা রাত্রি এক প্রহরের মধ্যেই শেষ হইয়া যায়, একথা সাক্ষীমাত্রেরই মুখে প্রকাশ। যে রাত্রিতে এই দাঙ্গা হয়, সেই রাত্রিতে প্রায় দেড় প্রহর পর্যন্ত পরিষ্কার জ্যোৎস্নার আলোকে সৰ্ব্বস্থান আলোকিত ছিল; সুতরাং সেই সুবিস্তৃত পরিষ্কার ময়দানের ভিতর পূর্ব্ব পরিচিত লোকদিগকে দেখিতে প্রায় কাহারই ভুল হইবার সম্ভাবনা নাই।

    জজসাহেব। আপনার বিবেচনায় সাক্ষীগণ আসামীগণকে পরিষ্কার জ্যোৎস্নালোকে দেখিয়াছে; সুতরাং সনাক্ত সম্বন্ধে তাহাদিগের কোনরূপ ভুল হইবার সম্ভাবনা নাই।

    সরকারী উকীল। আমার এই প্রকারই বিবেচনা হয়।

    জজসাহেব। এই আসামীগণের মধ্যে ছমির কাহাদ্বারা হত হইয়াছে?

    সরকারী উকীল। সে সম্বন্ধে কোনরূপ প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।

    সরকারী উকীলকে এই কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করিবার পর জজসাহেব উভয় পক্ষীয় উকীলদিগের বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া, পরিশেষে জুরিদিগকে কহিলেন, “এই মোকদ্দমায় অভিমত প্রকাশ করিবার পূর্বে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয় আপনাদিগের একটু চিন্তা করিয়া দেখা নিতান্ত আবশ্যক।—

    ১ম। দাঙ্গা হইয়াছিল কি না।

    ২য়। যদি দাঙ্গা হইয়া থাকে, তাহা হইলে কিসের নিমিত্তই বা দাঙ্গা হয়।

    ৩য়। যামিনীবাবু ও পুলিনবাবুর মধ্যে যে গ্রাম লইয়া বিবাদ, সেই গ্রাম উপলক্ষে যদি এই দাঙ্গা হইয়া থাকে, তাহ হইলে এই দাঙ্গায় কোন্ কোন্ জমীদারের স্বার্থ আছে।

    ৪র্থ। এই দাঙ্গায় যদি যামিনীবাবু ও পুলিনবাবুর স্বার্থ থাকে, তাহা হইলে তাঁহাদিগের বশীভূত, আশ্রিত, এবং বেতনভুক্ত লোকদিগের দ্বারা এই দাঙ্গা ও হত্যার সম্ভাবনা কি না।

    ৫ম। এই মোকদ্দমায় যে সকল লোক অভিযুক্ত হইয়াছে, তাহারা পূর্ব্বকথিত জমীদারদ্বয়ের লোক কি না। ৬ষ্ঠ। যে সময় এই দাঙ্গা হইয়াছে, সেই সময় প্রকৃত জ্যোৎস্না ছিল কি না। আর থাকিলেই সেই জ্যোৎস্নার আলোকে সাক্ষীগণের আসামীদিগকে উত্তমরূপে চিনিবার সম্ভাবনা কি না।”

    জুরিগণ এই মোকদ্দমার অবস্থা আদ্যোপান্ত উত্তমরূপে অবগত হইয়াছিলেন, এবং সাক্ষীগণের এজাহারও উত্তমরূপে শ্রবণ করিয়াছিলেন। তথাপি জজসাহেবের উপদেশ মত পূৰ্ব্ববর্ণিত প্রশ্ন ছয়টি সম্বন্ধে উত্তমরূপে বিবেচনা করিয়া সকলেই একবাক্যে কহিলেন, “ছমিরকে হত্যাকরা অপরাধে আসামীগণের বিপক্ষে কোনরূপ প্রমাণ নাই; সুতরাং হত্যা-অপরাধে ইহারা সকলেই নির্দোষ। কিন্তু দাঙ্গায় মিলিত হওয়া ও দাঙ্গা করা অপরাধে সকলেই দোষী।”

    জজসাহেবও জুরিগণের মতের পোষকতা করিলেন এবং প্রত্যেক আসামীকেই দশ দশ বৎসরের নিমিত্ত কারাগারে প্রেরণ করিলেন।

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ইতিপূর্ব্বে যামিনীবাবুর সহিত দারোগাবাবুর যে কথাবার্তা হইয়াছিল, তাহা যামিনীবাবুর উকীল ব্যতীত আর কেহ অবগত ছিলেন না। যামিনীবাবু ও উকীলের বিবেচনায় পরিশেষে ইহাই সাব্যস্ত হইল যে, দারোগাবাবু অনর্থক কতকগুলি অর্থ হস্তগত করিয়াছেন; একথা আর কাহারও নিকট প্রকাশ করা উচিত নহে। এই ভাবিয়া যামিনীবাবু আপনার বুদ্ধির নিন্দা করিয়া পরিশেষে চুপ করিয়াই রহিলেন।

    এই ঘটনার কিছুদিবস পরে হঠাৎ একদিবস পুলিনবাবুর সহিত সেই দারোগাবাবুর সাক্ষাৎ হইল। অন্যান্য কথার পর একটু ব্যঙ্গ করিয়া তিনি দারোগাবাবুকে কহিলেন, “কই মহাশয়! আসামীদিগের একজনকেও ত খালাস করিতে পারিলেন না?”

    দারোগা। আজ যে আপনার সে কথা মনে পড়িয়াছে, ইহাই মঙ্গল। মোকদ্দমার পূর্ব্বে যদি এই কথা আপনার মনে পড়িত, তাহ হইলে আসামীগুলিকে জেলে গমন করিতে হইতে না।

    পুলিন। উহাদিগকে বাঁচাইবার তবে কি উপায় ছিল?

    দারোগা। উপায় ভালই ছিল। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, সে দিকে কাহারও নয়ন আকৃষ্ট হইল না।

    পুলিন। কি উপায় ছিল?

    দারোগা। তাহা আর এখন বলিয়া লাভ কি? যদি আপীল করিবার ইচ্ছা থাকে, তাহা হইলে আমার নিকট আসিবেন, তখন আমি তাহার উপায় বলিয়া দিব।

    পুলিন। আপীল করিতে সকলেই নিষেধ করিতেছে ও কহিতেছে যে, আপীলে কিছু হইবে না।

    দারোগা। আমি বলিতেছি, আপীলে আপনারা নিশ্চয় ফল পাইবেন। আপনারা আপীল করুন, কিন্তু কোন বিচক্ষণ লোকের হস্তে যেন আপীলের ভার অর্পিত হয়।

    পুলিন। আপনার বিবেচনায় আপীল করাই কৰ্ত্তব্য?

    দারোগা। খুব আবশ্যক। পূর্বে যদি আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন, তাহা হইলে আপনাদিগকে আপীল আদালত পর্য্যন্ত গমন করিতে হইত না। যদি আপীল করা আপনাদিগের স্থির-সিদ্ধান্তই হয়, তাহা হইলে পুনরায় আর একবার আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। সেই সময় আমার এ মোকদ্দমা সম্বন্ধে যাহা যাহা বক্তব্য আছে, তাহ আপনাদিগকে বলিয়া দিব।

    দারোগাবাবুর কথায় সম্মত হইয়া পুলিনবাবু সেই দিবস সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং সমস্ত কাগজ পত্রের নকল সহ আপীলের বন্দোবস্ত করিতে প্রবৃত্ত হইয়া কলিকাতায় গমন করিলেন। কলিকাতার একজন সুপ্রসিদ্ধ দেশীয় কৌন্সলীর সহিত এ সম্বন্ধে পরামর্শ করিয়া কাগজপত্র তাঁহাকে দেখিতে দিলেন। সেই সময় পুলিনবাবু অবকাশ মতে দেশে গমন করিয়া দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন এবং কহিলেন “আপনার উপদেশ মত আপীলের সমস্ত বন্দোবস্ত শেষ হইয়া গিয়াছে। এখন আপনি কি উপদেশে প্রদান করেন, তাহাই অবগত হইবার নিমিত্ত আপনার নিকট আগমন করিয়াছি।”

    উত্তরে দারোগাবাবু কহিলেন, “যদি উপযুক্ত লোকের হস্তে আপনি এই মোকদ্দমা অর্পণ করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমার কোন উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নাই। তাঁহাকে কেবল এইমাত্র কহিবেন যে, কাগজপত্রগুলি যেন তিনি উত্তমরূপে পাঠ করেন।” এই কথা শ্রবণ করিয়া পুলিনবাবু একটু অসন্তুষ্ট হইয়া সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং মনে মনে কহিলেন, দারোগা বাবু নূতন কথা আর কি কহিলেন? কাগজপত্র উত্তমরূপে না দেখিয়া কোন উকীল কৌন্সলী মোকদ্দমা করিতে কি প্রবৃত্ত হন?’

    পুলিনবাৰু দ্বিতীয়বার কলিকাতায় আগমন করিয়া যখন তাঁহার কৌন্সলীর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, তখন তাঁহার কৌন্সলী তাঁহাকে কহিলেন, “এই মোকদ্দমার কাগজপত্র আমি দেখিয়াছি। কিন্তু আমার বোধ হয় না যে, আপীলে আমাদিগের সবিশেষ উপকার হইবে।”

    কৌন্সলীর কথা শ্রবণ করিয়া পুলিনবাবু কহিলেন, আমারও ইচ্ছা ছিল যে, আমি এই মোকদ্দমার আপীল করিতে আর কোনরূপ চেষ্টা করিব না। কিন্তু যে দারোগা সর্ব্বপ্রথমে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে গমন করিয়াছিলেন, কেবল তাঁহারই অনুরোধে আমি এই আপীল করিতে প্রবৃত্ত হই। তিনি আমাকে কেবলমাত্র হই। বলিয়া দেন যে, ভাল লোকের হস্তে এই মোকদ্দমার কাগজপত্র অর্পণ করিবেন, আর তাঁহাকে বলিয়া দিবেন যে, তিনি যেন ভালরূপে কাগজপত্রগুলি একবার পাঠ করিয়া দেখেন। তাহা হইলেই তিনি বেশ বুঝিতে পারিবেন যে, আপীলে আসামীগণ অব্যাহতি পাইবেন, কি না।”

    যে কৌন্সলীর হস্তে পুলিনবাবু এই মোকদ্দমার কাগজ পত্র অর্পণ করিয়াছিলেন, তিনি অতিশয় বিচক্ষণ লোক। পুলিনবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া তিনি কহিলেন, “দারোগাবাবু যখন এরূপ বলিয়াছেন, তখন কাগজপত্রের ভিতর নিশ্চয়ই কিছু না কিছু উপায় আছে, যাহা সহজে আমাদিগের চক্ষে পতিত হইতেছে না। সুতরাং আপনি সেই দারোগাবাবুর সহিত পুনরায় সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহাকে কেবলমাত্র এই কথাটি জিজ্ঞাসা করুন যে, নথির ভিতরস্থিত কোন কাগজখানি সবিশেষ মনোযোগের সহিত পাঠ করা আবশ্যক।

    কৌন্সলীর কথা শ্রবণ করিয়া অনিচ্ছা হইলেও পুলিনবাবু পুনরায় দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন এবং কৌন্সলীর আদেশানুযায়ী তাঁহাকে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে দারোগাবাবু কহিলেন, “নথির সমস্ত কাগজ পত্রই উত্তমরূপে পাঠ করা আবশ্যক। তাহার মধ্যে এইরূপ মোকদ্দমায় প্রথম এতলার দিকে বিশেষরূপে দৃষ্টি রাখা বুদ্ধিমান উকীল কৌন্সলীর প্রধান কাৰ্য্য।”

    দারোগাবাবু যেরূপ কহিলেন, পুলিনবাবুও সেইরূপ ঠিক্ তাঁহার কৌন্সলীকে কহিলেন। পুলিনবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া তিনি বুঝিলেন যে, প্রথম এতলাখানি ভাল করিয়া দেখা উচিত। এই বলিয়া নথির ভিতর হইতে প্রথম এতলার কাগজখানি সন্ধান করিয়া বাহির করিলেন, এবং সবিশেষ মনোযোগের সহিত এক এক বার করিয়া, ক্রমে দুই তিনি বার পাঠ করিলেন। উহাতে অতি সামান্য কথাই লেখা ছিল।

    এই দারোগার দপ্তরের যে সকল পাঠক পুলিস-কৰ্ম্মচারী নহেন, তাঁহাদিগকে বোধ হয় প্রথম এতলা কি, এ কথাটির অর্থ একটু বলিয়া দেওয়া আবশ্যক।

    পুলিস ষ্টেশন মাত্রেই একে প্রকারের পুস্তক আছে,—তাহার নাম “প্রথম এতলা বহি” (First Infromation Report)। যে ব্যক্তি থানায় গিয়া সৰ্ব্বপ্রথম কোন অপরাধের সংবাদ প্রদান করে, তাহার বিবরণ তৎক্ষণাৎ এই পুস্তকে লিপিবদ্ধ করিতে হয়—ইহাই নিয়ম। এইরূপ লিপিবদ্ধ করিবার উদ্দেশ্য এই যে, প্রথম অবস্থায় যে ব্যক্তি সংবাদ প্রদান করে, সে প্রায়ই প্রকৃতকথা বলিয়া থাকে। ভাবিয়া চিন্তিয়া বা ষড়যন্ত্র করিয়া সংবাদ প্রদান করিবার অবকাশ প্রায়ই সেই সময়ে ঘটে না। এই নিমিত্ত পুলিসের পরবর্তী রিপোর্ট অপেক্ষা প্রথম এতলাকে বিচারকগণ অধিক পরিমাণে বিশ্বাস করিয়া থাকেন। বিশেষতঃ এই এতলা প্রথমে একরূপ লিখিয়া পরে তাহার পরিবর্ত্তন করিবার উপায় নাই। কারণ, প্রথম অবস্থাতেই উহা একবারে তিন প্রস্থ লিখিতে হয়। এক প্রস্থ থানায় থাকে, দ্বিতীয় প্রস্থ ইনস্পেক্টার বা সুপারিন্টেন্ডেন্টের নিকট প্রেরিত হয়, তৃতীয় প্রস্থ মাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট গমন করে। সুতরাং এক প্রস্থে যদ্যপি কিছু পরিবর্তিত হয়, অপর প্রস্থের সহিত মিলাইয়া দেখিলে, তখনই তাহা জানিতে পারা যায় বলিয়া, কোন পুলিস কর্মচারীই প্রথম এতলার পরিবর্ত্তন করিতে সাহসী হন না।

    এই দাঙ্গা মোকদ্দমার সংবাদ প্রথমে একজন চৌকিদার প্রদান করে, এবং দারোগাবাবু তাহা স্বহস্তে লিখিয়া লন, একথা পাঠকগণ পূৰ্ব্ব হইতেই অবগত আছে।

    কৌন্সলী সাহেব যখন প্রথম এতলাখানি বাহির করিয়া দুই তিন বার পাঠ করিলেন, তখন সেইস্থানে যে যে ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, তাহারা উহা শ্রবণ করিলেন। উহাতে লিখিত ছিল :—

    “আমার নাম গদাধর ডোম; যে গ্রামে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, আমি সেই গ্রামের চৌকিদার। গত রাত্রিতে গ্রামের বাহিরে লোকজনের চীৎকার শুনিয়া আমি সেই দিকে গমন করি। আমার বোধ হয় যে, রাত্রি প্রায় এক প্রহর থাকিতে এই দাঙ্গা হইয়াছিল। আমি গ্রামের বাহিরে গমন করিয়া দেখিলাম, জমীদার পুলিনবাবু ও যামিনীবাবুর লোকদিগের মধ্যে ভয়ানক দাঙ্গা উপস্থিত হইয়াছে। আমি একাকী, সুতরাং সেই দাঙ্গা নিবারণ করিতে পারিলাম না। কিছুক্ষণ দাঙ্গা হইবার পর উভয় দল উভয় দিকে প্রস্থান করিল। সেই সময় আমি দাঙ্গার স্থলে গমন করিয়া দেখিলাম যে, সেউ সুবিস্তৃত ময়দানের ভিতর একটি মৃতদেহ উলঙ্গ অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে; কিন্তু কে উহার মস্তক কাটিয়া লইয়া গিয়াছে। এই ব্যাপার দেখিয়া নিকটবর্তী গ্রামের অপর একজন চৌকিদারকে সেইস্থানে রাখিয়া, আমি থানায় সংবাদ দিতে আগমন করিয়াছি।”

    প্রথম এতলার লিখিত বিবরণ শ্রবণ করিয়া পুলিনবাবু কহিলেন, “ইহার ভিতর এমন আর কি কথা আছে যে, যাহাতে আমরা এই মোকদ্দমায় জয়লাভ করিতে পারিব? যে সকল বিষয় পরে সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে, ইহাতে তাহারই সারাংশ আছে মাত্র।”

    পুলিনবাবুর সহিত সেই সময় সেইস্থানে অপরাপর যে সকল লোক ছিল, তাহারাও পুলিন বাবুর মতে মত দিল, এবং দারোগাকে সকলেই মিথ্যাবাদী বলিয়া গালি প্রদান করিতে লাগিল।

    ইহাদিগের কথা শ্রবণ করিয়া কৌন্সলী সাহেব কহিলেন, “আপনারা এত ব্যস্ত হইতেছেন কেন? দারোগাবাবু যাহা বলিয়াছেন তাহা প্রকৃত। এই মোকদ্দমার আপীল করিতেই হইবে। কারণ, এই প্রথম এতলা আমাদিগের পক্ষে বিশেষ উপকারী। এই প্রথম এতলার বলে আমরা নিশ্চয়ই এই মোকদ্দমায় জয়লাভ করিব।

    কৌন্সলী সাহেবের এই কথা শ্রবণ করিয়া কোন ব্যক্তি আর কোন কথা কহিলেন না; অধিকন্তু এই মোকদ্দমার আপীল করাই একান্ত কর্তব্য, ইহা অবধারিত হইলে, সকলে সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    সময়-মত এই মোকদ্দমার আপীল হইল, ও আপীলের দিনও স্থির হইল। ক্রমে এই সংবাদ যামিনীবাবুর কর্ণগোচর হইল। তিনি জানিতে পারিলেন, এই মোকদ্দমার আপীলের কোনরূপ উপায় ছিল না; কিন্তু দারোগাবাবু কি এক পন্থা উদ্ভাবন করিয়া দিয়াছেন যে, যাহাতে জজ সাহেব পুলিনবাবুর পক্ষীয় আসামীগণের আপীল মঞ্জুর করিয়াছেন। এই কথা শ্রবণ করিয়া যামিনীবাবু দারোগার নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, “শুনিয়াছি, আপনি পুলিনবাবুর পক্ষীয় আসামীগণের পক্ষ অবলম্বন করিয়া কি এক উপায় বাহির করিয়া দিয়াছেন, যাহাতে তাহাদিগের আপীল মঞ্জুর হইয়াছে। এই নিমিত্ত আমিও আপনার নিকট আগমন করিয়াছি। আমার পক্ষীয় আসামীগণকে উদ্ধার করিবার যদি কোনরূপ উপায় থাকে, তাহা আমাকে বলিয়া দিন। আমিও আমার অনুগত লোকদিগকে উদ্ধার করিবার চেষ্টা দেখি।

    যামিনীবাবুর কথার উত্তরে দারোগাবাবু কহিলেন, ‘এই মোক্কদমায় কোন নূতন উপায় বাহির হয় নাই, এবং পুলিনবাবুকে আমি সবিশেষ কোন পরামর্শও দেই নাই। আপনি যেমন একদিবস আমার নিকট আসিয়াছিলেন, তিনিও সেইরূপে একদিবস আমার নিকট আগমন করেন। আপনাকে আমি যেরূপ দুই চারিটি কথা বলিয়া দিয়াছিলাম, তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রকারের দুই চারিটি কথা বলিয়া দিয়াছি। কিন্তু প্রভেদের মধ্যে এই ছিল, আপনি বিচারের পূর্ব্বে আমার নিকট আগমন করিয়াছিলেন, আর পুলিন বাবু আগমন করিয়াছিলেন, আসামীগণের মেয়াদ হইবার পর। আমি শুনিয়াছি যে, আমি তাঁহাকে প্রথম এতলাখানি ভাল করিয়া দেখিতে বলিয়া দেওয়ার পর তাঁহার কৌন্সলী উহা উত্তমরূপে পাঠ করেন, এবং তিনিই উহার মধ্য হইতে কি এক কথা বাহির করিয়াছেন, যাহাতে উচ্চ আদালতের জজসাহেবও আসামীগণের আপীল মঞ্জুর করিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় প্রথমেই যদি আপনার উকীল একটু বুদ্ধি ও বিবেচনার সহিত কার্য্য করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয় যে, আসামীগণের মধ্যে কেহই জেলে গমন করিত না।”

    দারোগাবাবুর কথা শ্রবণ করিয়া পুলিনবাবু সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং পরিশেষে পূর্ব্বকথিত সেই জেলা কোর্টের উকীলের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া দারোগাবাবুর কথিত সমস্ত কথাই কহিলেন। এই মোকদ্দমার অন্যান্য কাগজপত্রের সহিত প্রথম এতলার নকল উকীলবাবুর নিকট ছিল। তৎক্ষণাৎ তিনি তাহা বাহির করিয়া ভালরূপে পাঠ করিলেন। কিন্তু তাহার ভিতর এমন কোন কথাই পাইলেন না যে, যাহাতে তাঁহারা বিশেষভাবে উপকৃত হইতে পারেন। উকীলবাবুর পরামর্শমত পরিশেষে ইহাই সাব্যস্ত হইল যে, “যামিনীবাবুর পক্ষীয় আসামীগণের আপীল যখন মঞ্জুর হইয়াছে, তখন সেই আপীলের ফল কি হয়, তাহা প্রথমে দেখা যাউক। কারণ উহারা কি উপায় অবলম্বন করিয়াছে, তাহা সেই সময় জানিতে পারা যাইবে। যদি ভাল বিবেচনা হয় তাহা হইলে সেই সময় যাহা কর্তব্য হয় করা যাইবে।

    এদিকে নির্ধারিত দিবসে হাইকোর্টের দুইজন মান্যবর জজ সাহেব একত্র এই মোকদ্দমার বিচার করিতে বসিলেন। তাঁহার আসামীগণের পক্ষীয় কৌন্সলীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “এই মোকদ্দমায় আসামীগণের পক্ষে আপনাদের কি বলিবার আছে, তাহা এখন বলিতে পারেন।” মান্যবার জজদিগের কথার উত্তরে কৌন্সলী সাহেবের যাহা কিছু বলিবার ছিল, তাহা তিনি মান্যবর জজদিগকে উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিলেন, এবং তাঁহার স্বমত পোষক যে সকল কাগজ পত্র জজসাহেবকে দেখাইবার নিমিত্ত ইচ্ছা করিয়াছিলেন, তাহাও তন্ন তন্ন করিয়া দেখাইয়া দিলেন। কৌন্সলীর কথা শেষ হইয়া গেলে, আসামীগণের বিপক্ষ পক্ষীয় সরকারী কৌন্সলীও দুই চারি কথা বলিয়া তাহার প্রতিবাদ করিলেন। পরিশেষে মান্যবর জজ সাহেবদ্বয় উভয়ে একমত হইয়া এই মোকদ্দমা সম্বন্ধে নিম্নলিখিত মতটি প্রকাশ করিলেন।

    “এই মোকদ্দমার কাগজপত্র অমরা সবিশেষ মনোযোগের সহিত পাঠ করিয়াছি। সাক্ষীগণ যেরূপ সাক্ষ্য দিয়াছে, তাহাতে কোন বিচারকই আসামীগণকে মুক্তি প্রদান করিতে পারেন নাই, সুতরাং নিম্ন আদালতের বিচারকগণ এই মোকদ্দমায় বিষম ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। কারণ, সাক্ষীগণ যখন একরূপ এজাহার দিয়াছে, এবং প্রথম এতলায় অনরূপ লিখিত আছে, তখন তাহাদিগের পক্ষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া এ বিষয়ের সত্যসত্য নির্ণয় করা উচিত ছিল। এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান প্রণালী প্রথম হইতেই অদ্ভুত বলিয়া বোধ হয়। গদাধর ডোম নামক জনৈক চৌকিদার থানায় আগমন করিয়া সর্ব্বপ্রথমে এই ঘটনার সংবাদ থানার দারোগার নিকট প্রদান করে। আইন অনুযায়ী দারোগা তাহারই কথা প্রথম এতলায় লিখিয় লইয়া অনুসন্ধানের নিমিত্ত ঘটাস্থলে গমন করেন। কিন্তু তাহার পর দেখিতে পাওয়া যায় যে, দারোগা এই অনুসন্ধান হইতে অপসারিত এবং ইনস্পেক্টারবাবু এই অনুসন্ধানে নিযুক্ত হন। কর্মচারীদ্বয়ের মধ্যে কেন যে হঠাৎ এইরূপ অবস্থা উপস্থিত হয়, তাহার কোন নিদর্শন কাগজ পত্রের মধ্যে পাওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে আসামীগণের কৌন্সলী সাহেব যে আভাষ প্রদান করেন, মহারাণীর পক্ষীয় কৌশলী সাহেব সন্তোষ-জনকরূপে তাহার প্রতিবাদ করিতে সমর্থ হন নাই। আসামীগণের কৌন্সলী সাহেব কহেন, “দারোগা বাবু প্রকৃত অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছিলেন বলিয়া ইনস্পেক্টারবাবু তাঁহাকে সেই স্থান হইতে বিদায় করিয়া দেন। কারণ, তিনি বিলক্ষণ বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, প্রকৃত আসামী ধৃত না হইলে যাহার তাহার স্কন্ধে এই মোকদ্দমা সংক্রান্ত দোষের ভার চাপাইতে এই দারোগাবাবু সম্পূর্ণরূপে অসম্মত। সুতরাং তিনি স্বহস্তে এই মোকদ্দমার ভার গ্রহণ করিয়া কতকগুলি নির্দোষ লোকের উপর এই গুরুভার চাপাইয়া দিয়াছেন।”

    “এই মোকদ্দমার প্রথম এতলা লিখিত হইবার সময় ঘটনাস্থলের অবস্থা কোন কর্মচারীই অবগত ছিলেন না। সুতরাং কিরূপভাবে প্রথম এতলা লিখিলে ভবিষ্যতে আসামীগণের বিপক্ষে উহা প্রমাণিত করিতে পারে, তাহাও ভাবিবার ক্ষমতা সেই সময় কাহারও হইতে পারে না। এরূপ অবস্থায় চৌকিদার গদাধর ডোম মিথ্যা কথা বলিয়াছে, বা দারোগাবাবু মিথ্যা কথা লিখিয়াছেন, তাহা অনুমান করা যাইতে পারে না। আমাদিগের বিবেচনায় প্রথম এতলায় যে সকল কথা লিখিত আছে, তাহা সম্পূর্ণরূপে সত্য।

    “যদি প্রথম এতলার কথা প্রকৃত বলিয়া লওয়া যায়, তাহা হইলে এই দাঙ্গা ঘটিবার সময় কর্মচারী বা সাক্ষীগণের নির্দেশমত এক প্রহর রাত্রি নহে, অর্থাৎ রাত্রির প্রথম অংশে এই ঘটনা ঘটে নাই। উহা এক প্রহর রাত্রি থাকিতে অর্থাৎ রাত্রির শেষ অংশে ঘটিয়াছে।

    “এখন দেখা আবশ্যক যে, যখন প্রকৃত দাঙ্গা ঘটিয়াছে, তখন এরূপ সময় পরিবর্তনের প্রয়োজন কি? এই প্রশ্নের উত্তর অতি সহজ যে দিবস এই ঘটনা ঘটে, সেই দিবস শুক্লপক্ষের পঞ্চমী। সুতরাং রাত্রির প্রথম দশ খণ্ড পৰ্য্যন্ত জ্যোৎস্না ছিল, তাহার পরই অন্ধকার। সেই দিবস রাত্রি এক প্রহর থাকিতে যদি দাঙ্গা হইয়া থাকে তাহা হইলে অন্ধকারের ভিতর এক পক্ষীয় লোক অপর পক্ষীয় লোকদিগকে কখনই চিনিয়া উঠিতে পারে নাই। সুতরাং যে সকল আসামী দাঙ্গায় আহত হয় নাই, তাহার কোন প্রকারে সনাক্ত হইতে পারে না। কিন্তু রাত্রি এক প্রহর হইলে অর্থাৎ জ্যোৎস্নার সময় এই ঘটনা ঘটিলে আসামীগণের বিপক্ষে প্রমাণ করিবার বিলক্ষণ সুবিধা হয়। এই নিমিত্ত বোধ হয় যে, ইন্‌পেক্টারবাবু ঘটনার সময় ‘এক প্রহর থাকিতে’ এই কথার পরিবর্তে ‘এক প্রহর হইতে’ করিয়া আসামীগণের বিপক্ষে এই মোকদ্দমার দোষ প্রমাণিত করিবার সবিশেষ সুবিধা করিয়া লইয়াছেন। বিশেষতঃ যে সেকল আসামী এই দাঙ্গায় নিযুক্ত হইয়াছিল, তাহাদিগের শরীরে একবারে কোনরূপ চিহ্ন বা আঘাত না থাকাও একবারে অসম্ভব।

    যাহা হউক, উপরি-উক্ত কারণে আমাদিগের বিবেচনায় এই দাঙ্গা এক প্রহর রাত্রি থাকিতে অর্থাৎ অন্ধকারের সময় ঘটিয়াছিল। সেই সময়, বর্তমান আসামীগণ উপস্থিত ছিল কিনা, তাহা বলা নিতান্ত কঠিন। সুতরাং আসামীগণকে আমরা বিনা শাস্তিতে অব্যাহতি প্রদান করিলাম।”

    ইহাকেই বলে পুলিসবুদ্ধি!

    যাহা হউক পুরাতন কৰ্ম্মচারী হইয়াও ইনস্পেক্টারবাবু এই মোকদ্দমায় যথাসাধ্য সৎ পথ অবলম্বন করিলেও মিথ্যা মোকদ্দমা সাজাইবার অপরাধে দণ্ডিত হইলেন ও তাঁহার বেতন কমিয়া গেল। পরিশেষে অনেক কষ্টে বহু চেষ্টায় পদ পরিত্যাগে পেন্সন গ্রহণ করিলেন।

    এদিকে দারোগাবাবু ইনস্পেক্টারের অবস্থা দেখিয়া মনে মনে রুষ্ট হইলেন। মিথ্যা করিয়া মোকদ্দমা উল্টাইয়া দিলেও এ মোকদ্দমায় তাঁহার কোনরূপ শাস্তি হইল না। কিন্তু সৰ্ব্বনিয়ত্তা জগদীশ্বরের কি অখণ্ডনীয় নিয়ম! এই ঘটনার কিছু দিবস পরে একটি সামান্য মোকদ্দমায় এই দারোগাবাবু সৎ পথে থাকিয়া যথার্থ অনুসন্ধান করিলেও বিনাদোষে অপরাধী হইলেন। এবং নিম্ন পদে অধনীত হইলেন, বেতন কমিয়া গেল! এই নিমিত্তই বলি, অসৎ কর্ম্মের ফল ইহজন্মেই ভোগ করিতে হয়।

    [ চৈত্র, ১৩০২]

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদারোগার দপ্তর ২ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    Next Article বাংলা উপন্যাসে গণিকা – প্রীতিলতা রায়

    Related Articles

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    দারোগার দপ্তর ২ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    September 24, 2025
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    দারোগার দপ্তর ৩ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    September 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }