Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দারোগার দপ্তর ২ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় এক পাতা গল্প1887 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ঘুসখোরি বুদ্ধি

    (অর্থাৎ জনৈক সেকেলে পুলিস-কর্ম্মচারীর ঘুস লইবার অদ্ভুত উপায়! )

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    বোধহয়, এখন একমাসও অতীত হয় নাই, আমি আমার আফিসে বসিয়া সরকারী কার্যে লিপ্ত আছি। এইরূপ সময়ে একটি ভদ্রলোক আমার আফিসের ভিতর প্রবেশ করিয়াই, আমার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি আমার নাম প্রথমে বলিয়া পরিশেষে তাঁহাকে কহিলাম, “মহাশয়! আপনি কাহার অনুসন্ধান করিতেছেন।”

    ভদ্রলোক। আমি আপনার নিকটেই আসিয়াছি।

    আমি। আমার নিকট, কি প্রয়োজন, তাহা জিজ্ঞাসা করিতে পারি কি?

    ভদ্রলোক। আমি আপনার জীবন চরিত লইবার মানসে আসিয়াছি।

    আমি। কেন মহাশয়! আপনি কি আমার জীবন চরিত লিখিতে চাহেন?

    ভদ্রলোক। না আপনি আপনার নিজের জীবন চরিত যাহা লিখিয়া থাকেন, আমি তাহাই খরিদ করিতে আসিয়াছি।

    আমি। আমি আমার জীবন চরিত ত লিখি নাই, আর আমার জীবনে এরূপ কি আছে যে, আমার জীবন চরিত বাহির হইবে?

    ভদ্রলোক। কেন মহাশয়! আপনি মাসে মাসে যে পুস্তক লিখিয়া থাকেন, তাহাই ত আপনার জীবন চরিত।

    আমি। কি, দারোগার দপ্তর?

    ভদ্রলোক। হাঁ।

    আমি। তাহাই বলুন না কেন, আপনি দারোগার দপ্তরের একজন গ্রাহক হইতে আসিয়াছেন?

    ভদ্রলোক। তাহাই।

    আমি। আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক দারোগার দপ্তরের আফিসে গমন করুন, সেই স্থানে কার্য্যাধ্যক্ষ আছেন, এবং কর্ম্মচারিগণও আছেন, সেই স্থানে গমন করিলেই আপনার অভিলাষ পূর্ণ করিতে পারিবেন।

    আমার কথা শুনিয়া তিনি দারোগার দপ্তর আফিসে গমন করিলেন। পরে কার্য্যাধ্যক্ষের নিকট হইতে অবগত হইতে পারিয়াছিলাম যে, তিনি যে কেবলমাত্র বর্তমান সালের গ্রাহক হইয়া গিয়াছেন, তাহা নহে; প্রথম হইতে যত “দপ্তর’ এ পর্যন্ত বাহির হইয়াছে, তিনি তাহার সমস্তই নগদ মূল্যে খরিদ করিয়া লইয়া গিয়াছেন।

    এখন পাঠকগণ আমাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, দারোগার দপ্তরের একজন গ্রাহক হইলেন তাহার সমাচার এই স্থানে প্রদান করিবার অর্থ কি?

    উত্তরে আমি এইমাত্র বলিতে পারি, পাঠকগণের মধ্যে যদি কাহারও পূর্ব্ববর্ণিত গ্রাহকের ন্যায় বিশ্বাস থাকে, তাহা হইলে তিনি ইহা যেন মনে না করেন যে, এই প্রবন্ধ লিখিত ঘটনাও আমার জীবনের একটি অংশ।

    আমি যে দারোগার চরিত্রের বিষয় নিম্নে লিপিবদ্ধ করিলাম, তিনি যে একবারে সেকেলে দারোগা তাহা নহে, অথচ নিতান্ত একেলে দারোগাও নহেন। ত্রিশ বৎসরকাল সরকারী কার্য্য করিয়া কেবলমাত্র তিন চারি বৎসর অতীত হইল, পেন্‌স গ্রহণ করিয়াছেন, এবং এখনও পেন্‌সন্ লব্ধ অর্থ দ্বারা জীবন ধারণ করিতেছেন।

    কার্য্যসূত্রেই ইঁহার সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়। যে সময় ইহার সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়, সেই সময় ইনি মফঃস্বলের কোন একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। যে ঘটনাটি আমি এই স্থানে পাঠক পাঠিকাগণের নিকট বর্ণন করিতেছি, সেই ঘটনার অব্যবহিত পরেই আমাকে তাঁহার থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে হয়। সুতরাং সমস্ত বিষয় আমি অনায়াসেই অবগত হইতে সমর্থ হই।

    পাঠক-পাঠিকাগণের মধ্যে অনেকেই অবগত আছেন যে, মফঃস্বলে জমিদারগণের মধ্যে কোন জমি লইয়া বিবাদ উপস্থিত হইলে সেই জমি সহজেই কেহ পরিত্যাগ করিতে চাহেন না। অথচ সেই সামান্য জমির নিমিত্ত সময় সময় উভয় পক্ষের মধ্যে এরূপ ভয়ানক বিবাদ ও দাঙ্গা উপস্থিত হয় যে, তাহাতে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায়ই খুন জখম হইয়া থাকে, এবং মামলা মোকদ্দমা করিতে উভয় পক্ষেরই সহস্র সহস্র মুদ্রা ব্যয় হইয়া যায়।

    যে বিষয়টি নিম্নে বিবৃত হইতেছে, ইহাও ঠিক সেই প্রকারের ঘটনা। একখণ্ড সামান্য জমি লইয়া উভয় জমিদারের মধ্যে ভয়ানক বিবাদ উপস্থিত হইল, এবং উভয় জমিদারের মধ্যে ভয়ানক জিদ হইল যে, তাঁহারা সেই জমি জোরপূর্ব্বক দখল করিয়া লন। দখল করিতে হইলে উভয় পক্ষেরই বিশেষ বলের প্রয়োজন। সুতরাং সেই বল, অর্থাৎ উপযুক্ত পরিমিত লাঠিয়াল, সংগ্রহ হইতে আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে উভয় পক্ষেই দাঙ্গার নিমিত্ত প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ দাঙ্গাবাজ লাঠিয়াল ও সড়কিওয়ালা সকল উভয় পক্ষেই আসিয়া উপস্থিত হইল।

    উভয় জমিদারের মধ্যে একখণ্ড জমি লইয়া ভয়ানক দাঙ্গা হইবে, এই সংবাদ সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীর কর্ণগোচর হইবামাত্র তিনি উভয় জমিদারকে সংবাদ প্রদান করিলেন যে, যে জমি লইয়া আপনারা দাঙ্গা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, সেই জমিতে আমি কোন প্রকারেই দাঙ্গা হইতে দিব না। আমি আমার লোকজনের সহিত সেই স্থানে গিয়া অবস্থিতি করিতেছি, আপনারা দাঙ্গা করিবার নিমিত্ত সেই স্থানে গমন করিলেই আমি আপনাদিগকে ধৃত করিব।

    এই সংবাদ পাইয়া একজন জমিদার দারোগাবাবুর নিকট তাঁহার একজন বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীকে প্রেরণ করিলেন। তিনি আসিয়া দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, এবং তাঁহাকে কহিলেন, “আপনি আমাদিগের দাঙ্গা পূর্ব্ব হইতে রহিত করিবার ইচ্ছা করিতেছেন কেন? দাঙ্গা হইয়া গেলে, আপনি আপনার কর্তব্য কার্য্য অনায়াসেই করিতে পারেন।”

    দারোগা। দাঙ্গা হইয়া গেলে, আসামিগণকে ধরিয়া তাহাদিগের নামে মোকদ্দমা চালান অপেক্ষা যাহাতে দাঙ্গা হইতে না পারে, তাহার দিকে দৃষ্টি রাখা আমার প্রধান কর্ত্তব্য কর্ম্ম, তাহা কি আপনি অবগত নহেন?

    কর্ম্মচারী। তাহা আমি জানি, কিন্তু আমরা যদি দাঙ্গা করাই স্থির করিয়া থাকি, তাহা হইলে আপনি কি কোনরূপে উহা নিবারণ করিতে পারেন।

    দারোগা। না পারিব কেন?

    কর্ম্মচারী। কিছুতেই পারেন না।

    দারোগা। কেন?

    কর্ম্মচারী। আপনি কিরূপে রক্ষা করিতে পারিবেন?

    দারোগা। কেন, আমার কি লোকজন নাই?

    কর্ম্মচারী। আছে, কিন্তু আমাদিগের লোকজনের অপেক্ষা আপনার লোকজনের সংখ্যা নিতান্ত সামান্য।

    দারোগা। তাহা আমি জানি, জানিয়াও যে আমি দাঙ্গা স্থগিত রাখিতে পারিব, সে বিশ্বাস আমার আছে।

    কর্ম্মচারী। কিরূপে আপনি নিবৃত্ত রাখিবেন?

    দারোগা। কেন, যেস্থানে দাঙ্গা হইবে, সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া।

    কৰ্ম্মচারী। কোন স্থানে দাঙ্গা হইবে, তাহা আপনি কিরূপে জানিতে পারিবেন?

    দারোগা। তাহা আমি জানিতে পারিব।

    কর্ম্মচারী। আর যদি আপনি জানিতেই পারেন, তাহা হইলে যখন আমাদিগের উভয় পক্ষে দাঙ্গা আরম্ভ হইবে, তখন আপনি সেই স্থানে গমন করিলেই বা কি করিতে পারেন, সেই সময় আপনাকে মানিবেই বা কে? আর আপনি কাহাকেই বা ধরিতে পারিবেন? দাঙ্গা শেষ হইয়া গেলে, আপনারা অনুসন্ধান করিয়া আসামিগণকে ধরিতে পারেন সত্য; কিন্তু তাহাতে আমাদিগের কিছুমাত্র ক্ষতি নাই। দাঙ্গা করিয়া যদি জমি দখল করিয়া লইতে পারি, তাহা হইলে মোকদ্দমার নিমিত্ত আমরা কিছুমাত্র ভীত নহি। মোকদ্দমায় লিপ্ত থাকা জমিদারদিগের একরূপ নিত্যকার্য্য।

    দারোগা। আচ্ছা, আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, আপনি তাহার যথার্থ উত্তর প্রদান করিবেন কি?

    কর্ম্মচারী। প্রকৃত উত্তর প্রদান না করিব কেন?

    দারোগা। আপনারা অপর জমিদারের সহিত দাঙ্গা করিতে প্রস্তুত আছেন।

    কর্ম্মচারী। তাহা না থাকিলে, আমি আর আপনার নিকট আসিব কেন?

    দারোগা। তাহা হইলে আপনারা আমাদিগের সহিত দাঙ্গা করিতে প্রস্তুত আছেন?

    কর্ম্মচারী। এ কথার অর্থ আমি ঠিক বুঝিতে পারিলাম না।

    দারোগা। এক পক্ষে আপনারা, এবং অপর পক্ষে অপর জমিদারের লোক। এই উভয় পক্ষের মধ্যে যেমন আপনারা দাঙ্গা করিতে প্রস্তুত আছেন, সেইরূপ একপক্ষে আপনার লোকজন, ও অপর পক্ষে আমরা; অর্থাৎ সরকারী লোক দাঁড়াইলে তাঁহাদের সহিত সেইরূপ দাঙ্গা করিতে প্রস্তুত আছেন কি?

    কর্ম্মচারী। না, তাহাতে আমরা প্রস্তুত নহি।

    দারোগা। কেন?

    কর্ম্মচারী। আপনারা বা আপনার লোকজনের সহিত দাঙ্গা করা ও ভারতেশ্বরীর বিপক্ষে দণ্ডায়মান হওয়া এক কথা। বিশেষ ইহাতে আপনাদিগের সহিত দাঙ্গা হইবার কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই। কারণ, গবর্ণমেন্টের পক্ষ হইতে আপনারা কিছু সেই বিবাদী জমির দাওয়া করিতেছেন না।

    দারোগা। আর যদি তাহাই করি?

    কৰ্ম্মচারী। তাহা হইলে আমরা আপনাদিগের সহিত দাঙ্গা করিব না, আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করিব।

    দারোগা। জমিদারের সহিত তবে তোমরা দাঙ্গা করিতে প্রবৃত্ত হইতেছ কেন, তাহার সহিতও কোন বিচারালয়ে গমন কর না?

    কৰ্ম্মচারী। তাহা যাইব কেন? সমানে সমানে যে কাৰ্য্য হয়, তাহার নিমিত্ত কেন আমরা আদালতে যাইব। সরকারের সহিত দাঙ্গায় প্রবৃত্ত হইলে, আমাদিগকে রাজবিদ্রোহীরূপে পরিগণিত হইতে হইবে। সুতরাং আমরা সে কার্য্য না করিয়া, রাজারই শরণাপন্ন হইব, তাঁহারই বিচারালয়ে গিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে নালিশ করিব। তিনিই ইহার সত্যাসত্য বিচার করিয়া যাহা আইনসঙ্গত হয়, তাহাই করিবেন।

    দারোগা। তাহা হইলে আপনি এখন বেশ বুঝিতে পারিতেছেন যে, আমি কিরূপে দাঙ্গা নিবারণ করিতে সমর্থ হইতে পারি?

    কৰ্ম্মচারী। না, তাহা আমি ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

    দারোগা। যে জমি লইয়া বিবাদ, তাহা এখন কাহার দখলে আছে?

    কর্ম্মচারী। আমাদিগের বিপক্ষ জমিদারের।

    দারোগা। এখন আপনাদিগের বিপক্ষ পক্ষের হস্ত হইতে সেই জমি গ্রহণ করিতে হইলে, দাঙ্গা করিবার প্রয়োজন; কিন্তু সেই দাঙ্গা কোথায় হইবার সম্ভাবনা?

    কর্ম্মচারী। দাঙ্গা যে কোন্ স্থানে হইবে, তাহা আমি এখন আপনাকে বলিব কেন?

    দারোগা। তাহা আপনাকে বলিতে হইবে না, সামান্য মূর্খও বুঝিতে পারে, এই দাঙ্গা কোথায় হইবে।

    কর্ম্মচারী। কোথায় হইবে?

    দারোগা। যে জমি লইয়া বিবাদ, সেই জমির উপর বা সেই জমির পার্শ্বে সেই দাঙ্গা হইবে।

    কর্ম্মচারী। সেই স্থানেই যে দাঙ্গা হইবে, তাহা আপনি কিরূপে অনুমান করিতেছেন?

    দারোগা। অনুমান কেন, সেই স্থানে যে দাঙ্গা করিতে হইবে সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

    কর্ম্মচারী। আপনি কিরূপে জানিলেন?

    দারোগা। কিরূপে জানিলাম তাহা আপনি জানিতে চাহেন?

    কৰ্ম্মচারী। যদি বলেন।

    দারোগা। সেই জমিতে এখন ধান্য আছে না?

    কর্ম্মচারী। হ্যাঁ, এখন উহাতে ধান্য আছে।

    দারোগা। সেই ধান্য এখন প্রায় পাকিয়া আসিল। কেমন একথা সত্য কি না?

    কর্ম্মচারী। সত্য।

    দারোগা। সেই ধান্য যখন রোপিত হইয়াছিল, তখন আপনাদিগের কর্তৃক হয় নাই।

    কর্ম্মচারী। তবে কাহারা রোপণ করিয়াছিল?

    দারোগা। যাহাদিগের সহিত এখন আপনারা দাঙ্গা করিতে প্রস্তুত, তাহারাই সেই ধান্য সেই জমিতে রোপণ করিয়াছিলেন।

    কর্ম্মচারী। একথা আপনাকে কে বলিল?

    দারোগা। একথা অপরকে আর বলিতে হইবে কেন। যদি আপনাদিগের কর্তৃক ধান্য রোপিত হইত, তাহা হইলে সেই জমি দখল করিবার নিমিত্ত এই দাঙ্গার প্রয়োজন হইবে কেন? আপনাদিগের উহা দখলে নাই বলিয়াই, জোর পূর্ব্বক উহা দখল করিতে প্রস্তুত হইয়াছেন। নিজের দখলে থাকিলে কি কেহ কখনও বিবাদে প্রবৃত্ত হয়?

    কৰ্ম্মচারী। আচ্ছা তাহাই যেন হইল, তাহাতে আপনি কিরূপে অবগত হইতে পারিবেন, কোন্ স্থানে আমাদিগের দাঙ্গা হইবে।

    দারোগা। সেই জমি দখল করিতে হইলে আপনাদিগকে সেই জমির ধান্য কাটিয়া লইতে হইবে। তাহা না হইলে সেই জমি আপনাদিগের দখলীভূত হইবে কিরূপে? সুতরাং ধান্য কাটিতে হইলে আপনাদিগকে সেই জমিতেই গমন করিতে হইবে, এবং আপনাদিগের বিপক্ষ পক্ষদিগকেও সেই স্থানে আসিয়া আপনাদিগের কার্য্যের প্রতিবন্ধক হইতে হইবে, তাহা হইলে দাঙ্গা আর কোন্ স্থানে হইবার সম্ভাবনা?

    কর্ম্মচারী। ভাল, দাঙ্গা যেস্থানে হইবে, তাহা যেন আপনি অনুমান করিয়া লইলেন; কিন্তু আপনার সামান্য লোক লইয়া দাঙ্গা নিবারণ করিতে সমর্থ হইবেন কি প্রকারে?

    দারোগা। সামান্য লোক লইয়া দাঙ্গা নিবারণ করিবার ক্ষমতা আমার নাই সত্য; কিন্তু আমি যাহার কর্ম্মচারীরূপে এইস্থানে নিযুক্ত আছি, তাঁহার সেই ক্ষমতা না থাকিলে এই বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষা হইত কি প্রকারে? জানিবেন, আমি তাঁহারই বলে বলীয়ান বলিয়া, এই সামান্য দাঙ্গা অনায়াসেই নিবৃত্ত করিতে সমর্থ হইব।

    কর্ম্মচারী। আপনি যাঁহার কথা বলিতেছেন, তিনি এখানে নাই, বা তাঁহার সৈন্য সামন্তও এখানে নাই, তখন আপনি কিরূপে আমাদিগের দাঙ্গা নিবৃত্ত করিতে সমর্থ হইবেন?

    দারোগা। ফরাসডাঙ্গা, ফরাসী শাসনের অন্তর্গত একটি নিতান্ত ক্ষুদ্র স্থান, উহা ইংরাজ রাজত্বের মধ্যস্থলে, অথচ ইংরাজের প্রতিকূলে দণ্ডায়মান হইয়া সেই স্থান রক্ষা করিতে পারেন, এরূপ সৈন্যসামন্ত প্রভৃতি কোন বলই ফরাসীদিগের তথায় নাই। কিন্তু ব্রিটিশ সিংহ সেইস্থানটি কি কাড়িয়া লইতে পারেন? কখনই না; আপনিও ঠিক সেইরূপ ভাবিয়া দেখুন না কেন? আমার অর্থাৎ সরকারী কার্য্যের সময় তাঁহার কর্ম্মচারীর বিরুদ্ধে যদি আপনারা দণ্ডায়মান হন, এবং তাঁহাদিগের সহিত আপনারা দাঙ্গা করিতে প্রবৃত্ত হন, তাহা হইলে তখন হয়ত আপনাদিগের জয়লাভ হইতে পারে, কিন্তু তাহার ভবিষ্যতফল কি হয়, তাহা একবার ভাবিয়া আনিতে পারেন কি?

    কর্ম্মচারী। তাহা পারি, কিন্তু আমরা আপনাদিগের সঙ্গে দাঙ্গা করিব কেন, আমরা দাঙ্গা করিব অপর আর একজন জমিদারের সঙ্গে।

    দারোগা। আমি যদি মনে করি যে, আপনাদিগের মধ্যে কোনরূপেই দাঙ্গা হইতে দিব না, তাহা হইলে দাঙ্গা করিবার নিমিত্ত অপর জমিদারকে আপনি পাইবেন কোথায়?

    কর্ম্মচারী। তাহা হইলে আমাদিগের আরও সুবিধা হইবে। যদি অপর জমিদারকে সেই স্থানে না পাই, তাহা হইলে বিনাদাঙ্গাতেই ত আমরা সেই জমি দখল করিয়া লইতে সমর্থ হইব, ইহা অপেক্ষা আর সুবিধা কি হইতে পারে?

    দারোগা। তাহা মনে করিবেন না, আমরা যদি মধ্যস্থ হই, তাহা হইলে সে সুযোগ কাহারও ঘটিবে না।

    কৰ্ম্মচারী। কেন?

    দারোগা। কেন, তাহা যদি জানিতে চাহেন, তাহা আমি আপনাকে বলিতেছি। আমার যে কয়েকজন লোক আছে, তাহাদিগকে লইয়া আমি সেই বিবাদি স্থানে গিয়া পূৰ্ব্বেই উপস্থিত হইব, এবং সেইস্থানেই দিবারাত্রি অতিবাহিত করিব। আপনাদিগের কোন পক্ষকেই আমরা সেইস্থানে গমন করিতে দিব না, জমির ধান্য যেরূপ অবস্থায় আছে, সেইরূপ অবস্থায় রাখিয়া দিব; কাহাকেও কাটিতে দিব না। যদি বুঝিতে পারি, ফসল নষ্ট হইয়া যাইতেছে, তাহা হইলে সরকারী খরচে ধান কাটাই ও মাড়াই করিয়া রাখিয়া দিব; বিচারালয়ে সেই জমির গোলযোগ মিটিয়া গেলে, সেই জমি যিনি পাইবেন, সেই আমানতি ধান্যও তাঁহার হইবে। আপনাদিগের মধ্যে কোন পক্ষ, ধান্য ক্রোক করিবার নিমিত্ত সেই স্থানে গমন করিলে, আমরা প্রথমতঃ তাঁহাকে সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার নিমিত্ত আদেশ প্রদান করিব। ইহাতে যদি তিনি আমাদিগের কথায় কর্ণপাত না করিয়া, ধান্য কর্তন করিতে প্রবৃত্ত হন, তাহা হইলে আমরা তাঁহার বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইব, তাহাতেও যদি তিনি আমাদিগের আদেশ লঙ্ঘন করিয়া আমাদিগের সহিত দাঙ্গা করিতে আরম্ভ করেন, তাহা হইলে তিনি রাজবিদ্রোহীরূপে পরিগণিত হইবেন। পরিশেষে তাঁহার অবস্থা যাহা হইবে, তাহা স্বচক্ষেই দেখিতে পাইবেন।

    কৰ্ম্মচারী। তাহা হইলে আপনারা কোন পক্ষকেও সেই ধান্য কাটিতে দিবেন না?

    দারোগা। না। তাহা ত আমি পূৰ্ব্বেই আপনাকে বলিয়াছি।

    কর্ম্মচারী। এরূপ বন্দোবস্ত করিলে চলিবে না, ইহাতে আমাদিগের বিশেষরূপ ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা। দাঙ্গার পূর্ব্বে আপনি কোনরূপ প্রতিবন্ধকতাচরণ করিবেন না, দাঙ্গা হইয়া যাউক, তাহার পরে আপনাদিগের আইন- অনুযায়ী যে কোন অনুসন্ধানের প্রয়োজন হইবে, তাহা করিবেন। যাহাতে ধৃত করা বিবেচনা করেন, ধরিবেন, বা যাহার উপর মোকদ্দমা চালাইবার প্রয়োজন হয়, চালাইবেন, তাহাতে আমাদিগের কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু দাঙ্গার পূর্ব্বে কোনরূপ গোলযোগ করিবেন না।

    দারোগা। দাঙ্গা হইয়া গেলে, তাহার অনুসন্ধানাদি করা আমাদিগের বিশেষ কষ্টকর হইয়া পড়ে। তদ্ব্যতীত কোনরূপ অপরাধ সংঘটিত হইবার পূর্ব্বে যাহাতে সেই অপরাধ ঘটিতে না পারে, সেই বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখা আমাদিগের প্রধান কাৰ্য্য।

    কৰ্ম্মচারী। তাহা হইলে আমাদিগের কার্য্য কিরূপে সম্পন্ন হইতে পারে?

    দারোগা। আপনাদিগের কি কার্য্য?

    কর্ম্মচারী। জমি দখল করিয়া লওয়া।

    দারোগা। যে জমি অপরের দখলে আছে, সেই জমি আমি আপনাকে দখল করাইয়া দিব কিরূপে?

    কর্ম্মচারী। আপনাকে জমি দখল করাইয়া দিতে হইবে না। সে বিষয়ে আপনি একটু সহায় থাকিলে, তাহা আমরা অনায়াসেই করিয়া লইতে পারিব।

    দারোগা। এ কার্য্যে আমি কিরূপে আপনাদিগের সহায়তা করিতে সমর্থ হইব?

    কর্ম্মচারী। তাহার উপায় আছে, আপনি মনে করিলে, আমাদিগকে সম্পূর্ণরূপে সাহায্য করিতে পারিবেন, আপনাকে সরকারী কার্য্যের কোনরূপ ত্রুটিও করিতে হইবে না। অধিকন্তু আপনার কিছু লাভ হইবারও বিশেষ

    সম্ভাবনা আছে।

    দারোগা। সরকারী কার্য্য বজায় রাখিয়া আপনারা আমার নিকট হইতে কিরূপ সাহায্য প্রার্থনা করেন?

    কর্ম্মচারী। দাঙ্গা বা আমাদিগের জমি দখল করিয়া লইবার পূর্ব্বে আপনি কোনরূপ প্রতিবন্ধকতাচরণ করিবেন না। কাৰ্য্য শেষ হইয়া গেলে, আমাদিগকে আইন-অনুযায়ী যেরূপ দোষে দোষী বিবেচনা করেন, আমাদিগের উপর সেইরূপ মোকদ্দমা চালাইবেন।

    দারোগা। আপনাদিগের উদ্দেশ্য আমি বেশ বুঝিতে পারিতেছি, আপনাদিগের ইচ্ছা, দাঙ্গা হইয়া যাউক, তাহার পর যা হয় হইবে। কেমন নয়?

    কর্ম্মচারী। যে কোন প্রকারে আমাদের দখল করা প্রয়োজন।

    দারোগা। এ প্রকার কার্য্য প্রায় বিনা দাঙ্গায় সম্পন্ন হয় না।

    কর্ম্মচারী। না, তাহা হইলে আমাদিগের সুবিধা হয় না।

    দারোগা। আপনাদিগের সুবিধায় আমার লাভ?

    কৰ্ম্মচারী। লাভ বিলক্ষণ আছে।

    দারোগা। কিরূপ বিলক্ষণ লাভ আছে?

    কর্ম্মচারী। আপনি আমাদিগের দাঙ্গা বন্ধ করিয়া দিবেন না, আমরা আপনাকে পাঁচশত টাকা প্রদান করিব।

    দারোগা। এ কার্য্য পাঁচশত টাকায় হইবার সম্ভাবনা নাই।

    কর্ম্মচারী। কত টাকায় হইবার সম্ভাবনা?

    দারোগা। সহস্র মুদ্রার কম নহে।

    কর্ম্মচারী। আচ্ছা আমি আমার মনিবকে একবার জিজ্ঞাসা করিয়া দেখি, যদি তিনি অত অর্থ প্রদানে সম্মত হন, তাহা হইলে আমার আর আপত্তি কি? আপনি তাহাই পাইবেন।

    দারোগা। কেবলমাত্র আমাকে অর্থ প্রদান করিলেই যে চলিবে তাহা নহে। আমি আপনাদিগকে যেরূপ ভাবে কার্য্য করিতে বলিব, তাহাই আপনাদিগকে করিতে হইবে।

    কর্ম্মচারী। তাহা ত নিশ্চয়, আপনার কথার অবাধ্য হইয়া আমরা কিরূপে চলিতে পারি। আমাদিগকে কিরূপে চলিতে হইবে, তাহা বলিয়া দিন, আমরা সেইরূপ ভাবে কার্য্য করিতে আরম্ভ করি।

    দারোগা। আপনি অগ্রে আপনার মনিবের সহিত বন্দোবস্ত করিয়া এদিকের বিষয়টা ঠিক করিয়া আসুন, তাহার পর যাহা করিতে হয়, তাহা আপনাকে বলিয়া দিব।

    কর্ম্মচারী। এদিকের বিষয় একরূপ স্থিরই জানিবেন, মনিবকে আমি যাহা কহিব, তাহাতেই তাঁহাকে অভিমত প্রদান করিতে হইবে। আচ্ছা, আমি এখন চলিলাম, কল্য আসিয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব।

    এই বলিয়া কাচারী মহাশয়, সেইদিবস সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন, ও পরদিবস প্রত্যূষে পুনরায় আগমন করিয়া, দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ-পূর্ব্বক তাঁহার হস্তে একবারে পাঁচশত টাকার নোট প্রদান করিয়া কহিলেন, “আমি আমার মনিবকে বলিয়া সমস্তই স্থির করিয়া আসিয়াছি, তিনি আপনার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছেন। আপাততঃ পাঁচশত টাকা প্রেরণ করিয়াছেন, অবশিষ্ট পাঁচশত টাকা যেদিবস দাঙ্গা হইবে, সেইদিবস প্রদান করিবেন।” এখন আমাদিগকে কি করিতে করিতে হইবে, তাহা বলিয়া দিন।

    দারোগা। কি যে করিতে হইবে, তাহা এখন আপনাদিগকে বলিবার প্রয়োজন নাই। আর আমি যাহা করিব, তাহার দিকেও আপনারা কোনরূপ লক্ষ্য করিবেন না। আপনারা কেবলমাত্র এই করিবেন যে, আপনাদিগের লোকজন সমস্তই ঠিক রাখিবেন, আমি যে সময় স্থির করিয়া দিব, ঠিক সেই সময়ে আপনারা দাঙ্গা আরম্ভ করিবেন। আমাকর্তৃক নির্ধারিত সময়ের যেন কিছুমাত্র ইতরবিশেষ না হয়।

    কর্ম্মচারী। তাহা হইবে না।

    এই বলিয়া কৰ্ম্মচারী মহাশয় সেদিবস সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, “কল্য আসিয়া আপনি যেরূপ অনুমতি করেন, তাহা জানিয়া যাইব।”

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    কর্ম্মচারী মহাশয় গমন করিবার পর দারোগা বাবু মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, টাকা পাঁচশত ত হস্তগত করিলাম, অবশিষ্ট আরও পাঁচশত টাকা হস্তগত হইতে পারিবে, এরূপ আশাও হইল। কিন্তু কিরূপে এখন কাৰ্যনিৰ্ব্বাহ করিতে সমর্থ হই? দাঙ্গা হইবার পূর্ব্বে সংবাদ, আমি অবগত হইতে পারি নাই; সুতরাং দাঙ্গা বন্ধ করিতে পারি নাই, একথা উপরিতন কর্মচারীগণ কি সহজে বিশ্বাস করিবেন? তাহা ত আমার বোধ হয় না। অথচ আমাকে বিলক্ষণ জবাবদিহিতে পড়িতে হইবে। এমন কি, আমি আমার কর্ম হইতে বিচ্যুত হইলেও হইতে পারি। অথচ একবারে সহস্র মুদ্রার লোভই বা পরিত্যাগ করি কি প্রকারে? স্থিরভাবে বসিয়া দারোগাবাবু এইরূপ ভাবিতেছেন, এরূপ সময়ে অপর আর একজন লোক আসিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। তাঁহাকে দেখিয়া দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কাহার অনুসন্ধান করিতেছেন?’

    আগন্তুক। আমি আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত এই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি।

    দারোগা। আমার নিকট আসিয়াছেন?

    আগন্তুক। হাঁ মহাশয়!

    দারোগা। প্রয়োজন?

    আগন্তুক। একটু বিশেষ প্রয়োজন আছে।

    দারোগা। কি প্রয়োজন, তাহা আপনি অনায়াসেই বলিতে পারেন?

    আগন্তুক। আমাদিগের একখণ্ড জমি লইয়া অপর একজন জমিদারের সহিত বিবাদ উপস্থিত হইয়াছে, তাহা আপনি অবগত আছেন, আমি তাহারই নিমিত্ত আপনার নিকট আসিয়াছি।

    দারোগা। আপনাদিগের জমিদারে জমিদারে বিবাদ, তাহাতে আমি কি করিতে পারি?

    আগন্তুক। আপনি মনে করিলে সবই করিতে পারেন।

    দারোগা। সেই জমিখানি কাহার?

    আগন্তুক। আমাদিগের।

    দারোগা। আপনাদিগের সত্য; কিন্তু উহা এখন কাহার দখলে আছে?

    আগন্তুক। আমাদিগের দখলেই আছে।

    দারোগা। আপনারা কিরূপে উহা দখল করিয়া রাখিয়াছেন?

    আগন্তুক। উহাতে আমাদিগের রোপিত ধান্য আছে।

    দারোগা। ধান্য ত প্রায় পাকিয়া উঠিল, সেই জমির ধান্য কাটিয়া লইলেই ত সকল গোলযোগ মিটিয়া যাইবে।

    আগন্তুক। আপনি যাহা বলিতেছেন তাহা সত্য, এবং আমাদিগের ধান্য যে আমরা কাটিয়া লইব, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু শুনিতে পাইতেছি, ধান্যগুলি সুপক্ক হইবার পূর্ব্বেই অপর জমিদার উহা জোর করিয়া কাটিয়া লইবেন।

    দারোগা। আপনারা তাহা কাটিয়া লইতে দিবেন কেন?

    আগন্তুক। তাহা ত আমরা সহজে দিব না। সুতরাং উভয়ের মধ্যে সেই ধান্য কাটা লইয়া একটি বিবাদ বাধিবার সম্ভাবনা।

    দারোগা। তাহা ত নিশ্চয়; কিন্তু যখন আমি পূর্ব্বে এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছি, তখন সেই ধান্য লইয়া যাহাতে বিবাদ না হয় তাহার বিশেষ চেষ্টা করিব।

    আগন্তুক। আমিও সেই নিমিত্ত আপনার নিকট আসিয়াছি, যাহাতে ধান্য কাটিবার সময় কোনরূপ বিবাদ না ঘটে, অথচ আমরা অনায়াসে ধান্যগুলি কাটিয়া লইয়া যাইতে পারি, আপনাকে তাহার বন্দোবস্ত করিতে হইবে।

    দারোগা। ইহা আমাদ্বারা কখনই হইতে পারে না। আমার কর্তব্য কাৰ্য্য, যাহাতে উভয়ের মধ্যে কোনরূপ দাঙ্গা না হয়, তাহার দিকে বিশেষরূপ লক্ষ্য রাখা। দাঙ্গা রক্ষা করিতে হইলে, সেই ধান্যক্ষেত্রে আমাকে থাকিতে হইবে, ধান্য যেরূপ অবস্থায় আছে, সেইরূপ অবস্থায় আমাকে রাখিতে হইবে। আপনিও সেই ধান্য কাটিতে পারিবেন না, তিনিও সেই ধান্যের দিকে লক্ষ্য করিতে পারিবেন না, সে স্থানের ধান্য সেই স্থানেই থাকিবে।

    আগন্তুক। ইহা ত দেখিতেছি মন্দ কথা নহে, আমাদিগের ধান্য আমরা কাটিয়া লইতে পারিব না, যেস্থানের ধান্য সেই স্থানেই থাকিবে?

    দারোগা। কাযেই, নতুবা দাঙ্গা স্থগিত রাখিব কিরূপে?

    আগন্তুক। আপনাকে দাঙ্গা বন্ধ রাখিতে হইবে না, আপনি ওদিকে দৃষ্টি করিবে না, আমাদিগের মধ্যে যাঁহার শক্তি অধিক তিনিই সেই জমির অধিকারী হইবেন। দাঙ্গা হইয়া যাইবার পর আপনাদিগের যাহা কর্তব্য হয়, তাহা করিবেন।

    দারোগা। ইহা হইতে পারে, আচ্ছা ইহাতে আমার স্বার্থ কি?

    আগন্তুক। স্বার্থের যদি কোনরূপ বন্দোবস্ত করিতে পারি।

    দারোগা। তাহা হইলে ক্ষতি নাই!

    আগন্তুক। আপনি ওদিকে তাকাইবেন না। আপনাকে দুইশত টাকা আমরা প্রদান করিব।

    দারোগা। ইহা দুইশত টাকায় কোনরূপে হইতে পারে না।

    আগন্তুক। কত হইলে হইতে পারে?

    দারোগা। অভাব পক্ষে পাঁচশত টাকা।

    আগন্তুক। আচ্ছা তাহাই হইবে, কিন্তু আপনি সেই দিকে একবারে লক্ষ্য রাখিতে পারিবেন না।

    দারোগা। লক্ষ্য আমাকে রাখিতে হইবে, লক্ষ্য রাখিতে না পারিলে আমার চাকরি থাকা দায় হইয়া পড়িবে। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে আমি একটি সময় স্থির করিয়া দিব, সেই সময়ে আপনারা গিয়া ধান্যচ্ছেদন করিয়া লইবেন। যে সময় নির্দ্ধারিত থাকিবে, তাহার যদি আপনারা ব্যতিক্রম করিবার চেষ্টা করেন, তাহাতে কোনরূপে কৃতকার্য্য হইতে পারিবেন না, অধিকন্তু বিশেষ বিপদগ্রস্ত হইবেন।

    আগন্তুক। আচ্ছা তাহাই হইবে, আমি এখন গমন করিতেছি। আপনাকে যাহা প্রদান করিতে সম্মত হইলাম, তাহা সংগ্রহ করিয়া পুনরায় আসিয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব।

    এই বলিয়া, সেই আগন্তুক সেই সময়, সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। বলা বাহুল্য সময় মত তিনিও আসিয়া দারোগা বাবুকে পাঁচ শত টাকা দিয়া গেলেন।

    এখন কোন পথ অবলম্বন করিলে দারোগাবাবু সকল দিক বজায় রাখিতে পারেন, তাহার চিন্তাতেই নিযুক্ত হইলেন এবং ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহার একটি উপায়ও স্থির করিলেন।

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    দারোগাবাবু সেই দিবসেই একটি রিপোর্ট লিখিলেন, তাহার নকল এক খণ্ড জেলার মাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট প্রেরণ করিলেন, অপর আর একখানি ডিস্ট্রিক্ট সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবের নামে প্রেরণ করিলেন। সেই রিপোর্টের ফল অর্থ এইরূপ :

    এক খণ্ড জমির ধান কাটা উপলক্ষে দুইজন জমিদারের মধ্যে ভয়ানক বিবাদ উপস্থিত হইয়াছে, উভয় পক্ষে দাঙ্গাবাজ লাঠিয়াল প্রভৃতি বিস্তর লোক সংগৃহীত হইতেছে। সেই জমি লইয়া উভয় জমিদারের মধ্যে যে একটি ভয়ানক দাঙ্গা হইবে, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই, এবং দাঙ্গা হইতেও আর কিছুমাত্র বিলম্ব নাই। এই সংবাদ প্রাপ্তি মাত্র হুজুরে এই রিপোর্ট করিয়া, আমি আমার লোকজন সমভিব্যাহারে ঘটনাস্থলে রওনা হইলাম এবং আপনাদিগের দ্বিতীয় আদেশ পৰ্য্যন্ত আমি সেই স্থানেই অবস্থিতি করিব। যাহাতে কোনরূপ দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, তদ্বিষয়ে বিশেষরূপ চেষ্টা করিব।

    এইরূপ ভাবে রিপোর্ট করিয়া দারোগাবাবু আপনার সমস্ত জবাবদিহি কাটাইবার রাস্তা করিলেন, তিন চারিজন কনষ্টেবলের সহিত সেই বিবাদি জমিতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। এবং উপরিতন কর্ম্মচারীর আদর্শ প্রার্থী হইয়া সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতে লাগিলেন, মধ্যে মধ্যে এক একটি সংবাদ প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণের নিকট প্রেরণ করিতে লাগিলেন।

    এই রূপে ক্রমে দিন গত হইতে লাগিল, দুই এক দিবস করিয়া ক্রমে সপ্তাহ অতীত হইয়া গেল। জমিদারদ্বয় ক্রমে আসিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে লাগিলেন এবং কহিতে লাগিলেন “আপনি বলিলেন কি, কিন্তু করিতেছেন কি?” আমাদিগের জমি দখল করিয়া লইবার পূর্ব্বে আপনি এ দিকে দৃষ্টিপাত করিবেন না; কিন্তু এখন দেখিতেছি, আপনি তাহার বিপরীত কার্য্য করিতে বসিয়াছেন।

    দারোগা। না, আমি বিপরীত কার্য্য করিতেছি না; কিন্তু আপাততঃ যে কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছি, তাহাতে যে আমি বিপরীত কার্য্য করিতেছি, ইহা আপনারা সহজেই অনুমান করিতে পারেন; কিন্তু ফলে দেখিবেন, আমি যাহা বলিয়াছি, কাৰ্য্যেও ঠিক তাহাই করিব।

    জমিদার। তবে এখন এরূপ ভাবে চলিতেছেন কেন?

    দারোগা। কিরূপ ভাবে।

    জমিদার। বিবাদি জমিতে বসিয়া আছেন।

    দারোগা। তাহার দুইটি কারণ আছে। বিনা কারণে এরূপ ভাবে থাকিব কেন?

    জমিদার। কারণ দুইটি আমরা জানিতে পারি না কি?

    দারোগা। কেন পারিবেন না। একটি কারণ, আমার প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণের চক্ষুতে ধূলিমুষ্টি নিক্ষেপ করিয়া স্বকৃত অপরাধ সকল হইতে পরিত্রাণ লাভ করা; আর অপর কারণটি এই যে, যাহাতে আপনাদিগের কার্য্য, বিনা গোলযোগে সম্পন্ন হইতে পারে, তাহার রাস্তা পরিসর করা।

    জমিদার। আমরা আপনার কথায় বিশ্বাস করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে অবতরণ করিয়াছি, এখন যাহা আপনি ভাল বিবেচনা করেন, তাহাই করুন।

    দারোগা। আপনারা এখন গিয়া স্থিরভাবে বসিয়া থাকুন, কিন্তু যোগাড়যন্ত্র যেন ঠিক প্রস্তুত থাকে, আমার নিকট হইতে আদেশ পাইবামাত্রই কাৰ্য্য যেন শেষ হইয়া যায়।

    জমিদার। কেবলমাত্র আদেশ পাইবার সাপেক্ষ, আদেশ পাইবামাত্রই সকল কাৰ্য্য নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করিয়া ফেলিব।

    দারোগা। আদেশও শীঘ্র প্রাপ্ত হইবেন, বোধ হয়, দশ বার দিবসের মধ্যেই আপনাদিগের সকল কার্য্য শেষ হইয়া যাইবে।

    জমিদার। যতশীঘ্র আমরা কার্য্য শেষ করিয়া লইতে পারি, তাহার দিকে একটু দৃষ্টি রাখিবেন।

    এই বলিয়া তাঁহারা সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

    দারোগাবাবু তাঁহার উপরিতন কর্মচারীবর্গের নিকট সংবাদ প্রেরণ করিয়া ঘটনাস্থলে দুই তিনদিবস অতিবাহিত করিবার পর, একদিবস দুইজন ইংরাজ কর্মচারী সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাদিগকে দেখিবামাত্রই দারোগাবাবু চিনিতে পারিলেন যে, তাঁহারা উভয়েই তাহার উপরিতন

    কর্ম্মচারী। ইংরাজ কৰ্ম্মচারীদ্বয় অশ্বারোহণে আসিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অনেকগুলি লোকও রহিয়াছে। সেই সকল লোকদিগকে দেখিয়া আমি বেশ চিনিতে পারিলাম যে, উহার অধিকাংশই জমিদারগণের লোক। তাহাদিগের নিকট হইতে আমি জানিতে পারিলাম, যে দুইজন জমিদারের মধ্যে দাঙ্গা হইবে বলিয়া আমি রিপোর্ট করিয়াছিলাম, সাহেব কৰ্ম্মচারীদ্বয় সৰ্ব্ব প্রথমে সেই জমিদারদ্বয়ের বাটীতে গমন করেন। পরিশেষে যেস্থানে দাঙ্গা হইবার সম্ভাবনা বলিয়া আমি উপস্থিত ছিলাম, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হন।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারীদ্বয় দারোগাবাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দারোগা! তুমি কতদিবস এই স্থানে রহিয়াছ?”

    দারোগা। তিনদিবস।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। এই তিনদিবসকাল থানা ছাড়িয়া এখানে আসিয়া মিথ্যা কষ্ট পাইতেছে, এখানে তোমার থাকিবার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমরা অনুসন্ধানে জানিলাম, তোমার রিপোর্ট ঠিক নহে।

    দারোগা। কেন?

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। দাঙ্গা হইবার কোনরূপ সম্ভাবনা নাই, তুমি একটা মিথ্যা সংবাদ দিয়া আমাদিগকে নিরর্থক কষ্ট দিলে।

    দারোগা। আমি যে সংবাদ দিয়াছি, তাহা মিথ্যা, একথা আপনাদিগকে কে বলিল?

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। আমরা গ্রামের ভিতর গিয়া, বিশেষরূপ অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছি, তোমার সংবাদ সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা।

    দারোগা। আপনারা নিজে অনুসন্ধান করিয়া, যদি অবগত হইয়া থাকেন যে, আমার প্রদত্ত সংবাদ মিথ্যা, তাহা হইলে তাহাই ঠিক, আমার সংবাদই মিথ্যা।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। এ সংবাদ তুমি কোথা হইতে পাইলে, কে তোমাকে এ মিথ্যা সংবাদ প্রদান করিল?

    দারোগা। আমিও গ্রামের লোকের নিকট হইতে এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছিলাম।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। যাহারা তোমাকে এই মিথ্যা সংবাদ প্রদান করিয়াছে, তাহাদিগের নামে সরকারী কর্ম্মচারীর নিকট মিথ্যা সংবাদ প্রদান করার অভিযোগ আনা কৰ্ত্তব্য।

    দারোগা। আচ্ছা তাহাই হইবে, যাহারা আমাকে এই মিথ্যা সংবাদ প্রদান করিয়াছে, তাহাদিগের নামে আমি এই মোকদ্দমা রুজু করিব যে, কি নিমিত্ত তাহারা পুলিসকে বৃথা কষ্ট দিবার জন্য এই অমূলক সংবাদ প্রদান করিয়াছে।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। আর তুমি নিতান্ত মূর্খের ন্যায় সেই মিথ্যা সংবাদের উপর বিশ্বাস করিয়া আমাদিগকে যে কষ্ট প্রদান করিয়াছ তাহার নিমিত্ত তোমাকেও দণ্ডগ্রহণ করিতে হইবে।

    দারোগা। যাহা আপনাদিগের অভিরুচি হয়, তাহাই করিবেন। আপনারা যাহা করিবেন, তাহার উপর আমার কোনরূপ কথা কহিবার ক্ষমতা নাই।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। এখানে তোমার কয়জন লোক আছে?

    দারোগা। নিতান্ত সামান্য, চারি পাঁচজনের অধিক হইবে না।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী তাহাদিগের আর এখানে থাকিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই, তাহারা এখনই আপন থানায় চলিয়া যাউক।

    দারোগো। আমি এখনই তাহাদিগকে এখান হইতে বিদায় করিয়া দিতেছি।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। আর তুমি?

    দারোগা। আমার উপর যেরূপ আদেশ হইবে, আমি তাহাই করিব।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। তোমারও আর এখানে থাকিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই।

    দারোগা। আপনাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ আমিও এখনই এই স্থান হইতে প্রস্থান করিতেছি।

    ইংরাজ কৰ্ম্মচারী। এখানে আর কিছুমাত্র বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই, তুমি এখনই আপনার থানায় গমন করিয়া আপন কর্তব্য কর্ম্মে নিযুক্ত হও, এরূপ ভাবে এক মিথ্যা সংবাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই।

    দারোগাবাবুকে এইরূপ আদেশ প্রদান করিয়া ইংরাজ কর্মচারীদ্বয় আপন আপন অশ্বে কশাঘাত পূৰ্ব্বক সেইস্থান হইতে দ্রুতবেগে প্রস্থান করিলেন।

    দারোগাবাবুও তাঁহার সমভিব্যাহারী লোকজনকে সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিবার আদেশ দিয়া আপনার অশ্বও সজ্জিত করিবার আদেশ প্রদান করিলেন।

    গ্রামের যে সকল লোকজন সাহেবদ্বয়ের সহিত সেইস্থানে আগমন করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্যে দুই একজনের সহিত দারোগাবাবুর পরিচয় ছিল। তাঁহাদিগকে ডাকিয়া দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন। ইঁহারা কোন্ সময় গিয়া আপনাদিগের গ্রামে উপস্থিত হইয়াছিলেন।

    পরিচিত ব্যক্তি। অতি প্রত্যূষে উহারা আমাদিগের গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হন।

    দারোগা। গ্রামে গিয়া উঁহারা কি করেন?

    পরিচিত ব্যক্তি। গ্রামে প্রবেশ করিবামাত্রই সর্ব্বপ্রথমে আমার সহিত সাক্ষাৎ হয়।

    দারোগা। উঁহারা গ্রাম চিনিলেন কি প্রকারে?

    পরিচিত ব্যক্তি। উহাদিগের সহিত একজন কনষ্টেবল ও দুই তিনজন চৌকিদার ছিল, তাহারাই উহাদিগকে সঙ্গে করিয়া গ্রামের ভিতর লইয়া আইসে।

    দারোগা। কনষ্টেবলটি কে?

    পরিচিত ব্যক্তি। তাহাকে ইতিপূর্ব্বে আর কখন কোথাও দেখি নাই। সে আপনার থানার কনষ্টেবল নহে, অপর কোন স্থান হইতে উহারা তাহাকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলেন।

    দারোগা। সে এখন কোথায়?

    পরিচিত ব্যক্তি। আমাদিগের গ্রাম হইতেই উঁহারা তাহাকে বিদায় করিয়া দিয়াছেন।

    দারোগা। চৌকিদার কয়জন কোন গ্রামের?

    পরিচিত ব্যক্তি। তাহারও আমাদিগের গ্রামের চৌকিদার নহে, আমি তাহাদিগকে চিনি, তাহারা পার্শ্ববর্তী গ্রামের চৌকিদার।

    দারোগা। তাহারা কোথায় গেল?

    পরিচিত ব্যক্তি। তাহারা যে কোথায় গেল, তাহা আমি জানি না; কিন্তু সাহেবদ্বয় তাহাদিগকে সহস্ৰ সহস্ৰ গালি দিয়া সেই স্থান হইতে বিদায় করিয়া দিয়াছেন।

    দারোগা। তাহাদিগকে গালি দিলেন কেন?

    পরিচিত ব্যক্তি। কেন যে তাহাদিগকে ওরূপ ভাবে গালি প্রদান করিলেন, তাহা প্রথমতঃ কিছু বুঝিয়া উঠিতে পারিয়াছিলাম না। কিন্তু পরে জানিতে পারিয়াছিলাম, প্রথমতঃ যখন সাহেবদ্বয় উহাদিগকে দাঙ্গার বিষয় জিজ্ঞাসা করেন, তখন উহারা বলিয়াছিল, জমিদারদ্বয় দাঙ্গা করিবার বিশেষরূপ বন্দোবস্ত করিতেছেন, দারোগাবাবু বিবাদি জমির উপর বসিয়া আছেন বলিয়া, দাঙ্গা হইতে পারিতেছে না, নতুবা এতদিন খুব দাঙ্গা বাধিত।

    দারোগা। এ কথায় চৌকিদারগণের অপরাধ কি যে, সহস্ৰ সহস্ৰ গালি দিয়া তাহাদিগকে সেইস্থান হইতে বিদায় করিয়া দিলেন?

    পরিচিত ব্যক্তি। আমাদিগের গ্রামে আসিয়া যখন তাঁহারা অবগত হইলেন যে, দাঙ্গা হইবার কোনরূপ সম্ভাবনা নাই, লোকজন কাহারও সংগৃহীত হয় নাই, দাঙ্গা হইবে বলিয়া পুলিস মিথ্যা গোলযোগ করিয়া বেড়াইতেছে, তখন তাঁহারা চৌকিদারদিগকে গালি দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন।

    দারোগা। আপনারা উহাদিগকে কিরূপ বুঝাইয়া দিয়াছিলেন।

    পরিচিত ব্যক্তি। প্রথমেই ত আমি আপনাকে বলিয়াছি যে, সাহেবদ্বয় গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিবার কালীন সৰ্ব্বপ্রথমেই আমাকে দেখিতে পান। আমাকে দেখিয়াই উঁহারা জিজ্ঞাসা করেন, “তোমাদিগের গ্রামের জমিদার লোকজন সংগ্রহ করিতেছে কেন?”

    আমি। আমাদিগের গ্রামের কোন ব্যক্তি এ পর্যন্ত কোন লোকজন সংগ্রহ করে নাই, বা একথা আমরা কিছু শুনিও নাই।

    সাহেব। লোকজন সংগ্রহ না করিয়া জমিদারগণ দাঙ্গা করিবে কিরূপে?

    আমি। দাঙ্গা, আজকাল ইংরাজের রাজত্বে দাঙ্গা করিবার ক্ষমতা কার আছে। দাঙ্গা করিলে জেলে যাইতে হইবে, একথা কে না জানে।

    সাহেব। তবে জমি লইয়া বিবাদ হইতেছে কেন?

    আমি। কোন জমি লইয়া কাহারও কোনরূপ বিবাদ নাই।

    সাহেব। আমরা শুনিয়াছি, শীঘ্ৰ দাঙ্গা হইবে।

    আমি। একথা আমরাও আজকাল শুনিতে পাইতেছি, আপনাদিগের পুলিসের মুখ হইতেই কেবল একথা শুনিতেছি। কিন্তু তাঁহারা কোথা হইতে যে একথা প্রাপ্ত হইলেন, তাহা কিন্তু আমরা কিছুই ভাবিয়া পাইতেছি না।

    সাহেব। তাহা হইলে দাঙ্গা হইবার যে জনরব উঠিয়াছে, তাহা কি মিথ্যা?

    আমি। সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা।

    আমার এই কথা শুনিয়া সাহেবদ্বয় গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিলেন, আমিও তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলাম। সাহেবদ্বয় গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাহাকে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, দাঙ্গা হইবে কোথায়। পাড়াগাঁয়ের লোক, অনেকে হয় ত এ পর্য্যন্ত সাহেব দেখেন নাই। সুতরাং তাঁহাদিগকে দেখিয়া অনেকে পলায়ন করিতে লাগিল। কেহবা দূরে গিয়ো দাঁড়াইল, ও সেই স্থান হইতে দেখিতে লাগিল, সাহেবদ্বয় কি করেন। কেহবা দূরে থাকিয়া তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল। যাঁহার। একটু সাহসী বা যাঁহারা ইতিপূর্ব্বে দুই একজন সাহেব দেখিয়াছেন, তাঁহারা সাহেবদ্বয়ের নিকট আসিলেন সত্য, কিন্তু সাহেবদ্বয় তাঁহাদিগকে যে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, তাহার কোন কথাই তাঁহারা বুঝিয়া উঠিতে না পারিয়া তাঁহাদিগের মুখের দিকে এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন। যে দুই এক ব্যক্তি তাঁহাদের কথা বুঝিতে পারিলেন, তাঁহারা কহিলেন, কে বলিল সাহেব, আমাদিগের গ্রামে দাঙ্গা হইবে, ও কোন কাযের কথা নহে, সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা কথা। এই স্থানে বলা বাহুল্য যে, যে সকল লোক সাহেবের নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন, বা যাঁহারা সাহেবের কথার উত্তর প্রদান করিলেন, তাঁহারা সকলেই জমিদারের লোক। যাঁহারা জমিদার সরকারে কার্য্য করেন, তাঁহাদিগকে সদাসর্বদা প্রায়ই মামলা-মোকদ্দমা করিয়া বেড়াইতে হয়। সুতরাং তাঁহারা প্রায়ই একটু চালাক চতুর হইয়া পড়েন, এবং অনেক সময় “সাহেব ঘেঁসা” হইবার চেষ্টাও করিয়া থাকেন। সেই সকল ব্যক্তিই ক্রমে সাহেবদ্বয়ের নিকটবর্ত্তী হইতে লাগিলেন, এবং তাঁহারাই আমার কথার সম্পূর্ণরূপে পোষকতা করিয়া সাহেবদ্বয়কে উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিলেন যে, দাঙ্গা হইবার যে জনরব উঠিয়াছে, তাহা সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা।

    সাহেবদ্বয় এইরূপ ভাবে অনুসন্ধান শেষ করিয়া গ্রাম হইতে বহির্গত হইবার সময় পুনরায় আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই থানার দারোগাকে চিন?”

    আমি। চিনি।

    সাহেব। এই গ্রামের মধ্যে তিনি কোথায় আছেন বলিতে পার?

    আমি। তিনি ত গ্রামের ভিতর নাই।

    সাহেব। তাহা হইলে, তিনি এখানে আইসেন নাই?

    আমি। আসিয়াছেন।

    সাহেব। যদি এখানে আসিয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি কোথায় গমন করিলেন?

    আমি। তিনি গ্রামের বাহিরে আছেন।

    সাহেব। গ্রামের বাহিরে কোথায় আছেন?

    আমি। মাঠের মধ্যে।

    সাহেব। ময়দানের ভিতর কি করিতেছেন?

    আমি। সেই স্থানে তিনি তাঁহার লোকজন লইয়া বসিয়া আছেন। কিন্তু সেই স্থানে যে কেন তিনি বসিয়া আছেন, তাহা আমরা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

    সাহেব। আপনি সে স্থান চিনেন কি?

    আমি। চিনি।

    সাহেব। তাহা হইলে আপনি একবার অনুগ্রহ পূর্ব্বক আমাদিগের সঙ্গে আসিয়া, দারোগা কোথায় আছেন, তাহা আমাদিগকে দেখাইয়া দিতে পারেন কি?

    আমি। কেন না পারিব। আপনারা রাজা, আপনাদিগের আদেশ কি আমরা লঙ্ঘন করিতে পারি। আপনারা আমার সহিত আসুন, আমি এখনই গিয়া দারোগাবাবু কোথায় আছেন, তাহা আপনাদিগকে দেখাইয়া দিতেছি।

    এই বলিয়া আমি সাহেবদ্বয়ের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে লাগিলাম, ও পরিশেষে এই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলাম, এবং আপনাকে দেখাইয়া দিয়া কহিলাম, ওই দারোগাবাবু বসিয়া রহিয়াছেন। ইহার পর সাহেবদ্বয় আপনার নিকট আগমন করিলেন, তাহার পর যাহা যাহা ঘটিয়াছে, তাহা আপনি স্বচক্ষে দেখিয়াছেন।

    তাঁহার সেই কথা শুনিয়া দারোগাবাবু ভাবিলেন, “এখন আমি বেশ বুঝিতে পারিতেছি, সাহেবদ্বয় আমার উপর কেন এরূপ আদেশ প্রদান করিয়া এখনই লোকজনের সহিত এই স্থান হইতে প্রস্থান করিতে কহিলেন। সাহেবদ্বয় প্রকৃত অবস্থা অবগত হইতে না পারিয়া, আমার উপর যে আদেশ প্রদান করিয়া প্রস্থান করিলেন, ইহা অপেক্ষা আমার পক্ষে সুবিধাজনক আদেশ আর কি হইতে পারে? বিনা-জবাবদিহিতে এখন আমি অনায়াসেই দেড় হাজার টাকা হস্তগত করিতে সমর্থ হইব।”

    এইরূপ ভাবিয়া দারোগাবাবু তখনই তাঁহার লোকজনকে সেই স্থান হইতে বিদায় করিয়া দিলেন। কেবলমাত্র তাঁহার একটি বিশ্বাসী লোককে তাঁহার সঙ্গে লইয়া তিনি সেই গ্রামের মধ্যে গমন করিলেন। যে জমিদারের কর্মচারীর সহিত তাহার এক সহস্র মুদ্রা বন্দোবস্ত হইয়াছিল, তাঁহার সহিত নির্জ্জনে সাক্ষাৎ করিয়া বলিয়া দিলেন, আর বিলম্ব করিবেন না, এখন আমার উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। এখন আপনারা দাঙ্গা করিয়া জমি দখল করিয়া লইতে পারেন।

    কর্ম্মচারী। আমাদিগের সমস্তই প্রস্তুত আছে, তাহা হইলে আমরা কেন এখনই গিয়া আপন কার্য্য উদ্ধার করিয়া লই না?

    দারোগা। না, এখন নহে।

    কর্ম্মচারী। কেন?

    দারোগা। দাঙ্গার ঠিক সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই।

    কর্ম্মচারী। সে সময় আবার কখন হইবে?

    দারোগা। আমি এখন এই স্থানে উপস্থিত আছি, এখন এই স্থানে কোনরূপ দাঙ্গা উপস্থিত হইলে আমাকে কোন না কোন রূপে তাহা নিবারণ করিতে হইবে।

    কর্ম্মচারী। তাহা হইলে কোন্ সময় আমরা আমাদিগের কার্য্য উদ্ধার করিয়া লইব।

    দারোগা। আমি আমার থানায় গিয়া উপস্থিত হইবার পর, আপনারা আপনাদিগের কার্য্য উদ্ধার করিয়া লইবেন।

    কৰ্ম্মচারী। কোন্ সময় আপনি গিয়া আপনার থানায় উপস্থিত হইবেন, তাহা আমরা কিরূপে অবগত হইতে পারিব?

    দারোগা। আমি একটি সময় স্থির করিয়া দিয়া যাইতেছি, সেই সময় আপনারা কার্য্য শেষ করিয়া লইবেন।

    কর্ম্মচারী। কোন্ সময়?

    দারোগা। আমি এখনই এখান হইতে প্রস্থান করিতেছি, ও আমার লোকজনকে আমি এই স্থান হইতে প্রতিগমন করিবার আদেশও প্রদান করিয়াছি, তাহারা সকলে কোন্ সময়ে গিয়া থানায় উপস্থিত হইবে, তাহা আমি এখন বলিতে পারি না; কিন্তু সমস্ত দিবসের মধ্যে তাহারা যে থানায় প্রতিগমন করিবে, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। অদ্য আর আপনারা কোনরূপ গোলযোগ করিবেন না; কিন্তু অদ্য রজনী যেমন অতিবাহিত হইবে, অর্থাৎ কল্য নিতান্ত প্রত্যূষে আপনারা আপনাদিগের কার্য্য উদ্ধার করিয়া লইবেন।

    কর্ম্মচারী। আচ্ছা তাহাই করিব। আপনি যেরূপ বলিতেছেন, আমরা তাহাই করিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু অপর পক্ষে যদি অদ্যই সেই জমির ধান্য কাটিয়া লয়?

    দারোগা। যাহাতে অপর পক্ষে সেই জমির ধান্য অদ্য কাটিয়া লইতে না পারেন, আমি তাহার বন্দোবস্ত করিব। কিন্তু একান্তই যদি তাঁহারা আমার আদেশ প্রতিপালন না করিয়া ধান্য কাটিয়া লইতে প্রবৃত্ত হন, তাহা হইলে আপনারা তাহার প্রতিবন্ধকতা জন্মাইয়া আপন কার্য্য উদ্ধার করিয়া লইবেন, তাহাতে আমার কিছুমাত্র নিষেধ নাই। কিন্তু উঁহারা যদি অদ্য সেই কার্য্যে হস্তক্ষেপ না করেন, তাহা হইলে আপনারা অদ্য কিছু করিবার চেষ্টা করিবেন না, অথচ রাত্রি প্রভাত হইতে না হইতেই আপনাদিগের কার্য্য শেষ করিতে বাকি রাখিবেন না

    কর্ম্মচারী। আচ্ছা তাহাই করিব। আপনি যেরূপ পরামর্শ দিতেছেন, ঠিক সেইরূপ ভাবেই কাৰ্য্য শেষ করিয়া লইব।

    দারোগা। আমার অবশিষ্ট টাকা?

    কর্ম্মচারী। টাকার নিমিত্ত আপনার কোনরূপ চিন্তা নাই।

    দারোগা। চিন্তা নাই, তাহা আমি বেশ অবগত আছি, কিন্তু উহা আমাকে কখন প্রদান করা হইবে, তাহাই আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।

    কর্ম্মচারী। দাঙ্গার গোলোযোগের সময় আমি সেই টাকা লইয়া গিয়া যে আপনাকে দিয়া আসিব, সে সময়, আমার থাকিবে না। দাঙ্গা শেষ হইয়া যাইবার পরই সুযোগমত আমি গিয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব, এবং সেই সময় সেই টাকা আপনাকে দিয়া আসিব।

    দারোগা। আর যদি সেই দাঙ্গায় আপনারা পরাজিত হন, তাহা হইলে কি হইবে। দেখিবেন, যেন আমার প্রাপ্য বিষয়ে পরে কোনরূপ আপত্তি না ঘটে।

    কর্ম্মচারী। তাহা হইলেও আপনার টাকা কোন স্থানে যাইবে না, আমাদিগের জয়ই হউক বা পরাজয়ই হউক, দাঙ্গা হইয়া যাইবার পরই আমি আপনার নিকট গমন করিয়া অবশিষ্ট টাকা প্রদান করিয়া আসিব।

    দারোগা। দাঙ্গার পর আপনি ত আমাকে থানায় দেখিতে পাইবেন না।

    কর্ম্মচারী। কেন?

    দারোগা। এই দাঙ্গার মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আমাকে দাঙ্গার স্থানে আসিতে হইবে।

    কৰ্ম্মচারী। তাহা হইলে ত আরও ভাল হইবে। আমাকে অতদূর আর গমন করিতে হইবে না। এই স্থানেই আপনার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইবে, এবং সুযোগমত টাকা আপনাকে প্রদান করিব। সেই টাকা ত আপনাকে প্রদান করিব, তদ্ব্যতীত দাঙ্গার মোকদ্দমার অনুসন্ধান উপলক্ষে আপনাদিগের সহিত আরও কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে হইবে, তাহা এখন কিছু বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। সে বন্দোবস্ত উপস্থিত মত দেখা যাইবে।

    দারোগা। আচ্ছা তাহাই হইবে, আপনি সেই সময়েই প্রদান করিবেন। কিন্তু দাঙ্গার মোকদ্দমার অনুসন্ধান-সময় আমাব্যতীত আরও অনেক কৰ্ম্মচারী থাকিতে পারেন, তাঁহাদের সম্মুখে যেন সেই টাকা আমাকে প্রদান করিবেন না।

    কর্ম্মচারী। তাহা আর আমাকে বলিতে হইবে না।

    উভয়ের মধ্যে এইরূপ বন্দোবস্ত হইবার পর, কর্ম্মচারী ও দারোগাবাবু উভয়েই আপন আপন স্থানে প্রস্থান করিলেন। বলা বাহুল্য প্রস্থান করিবার পূর্ব্বে ইহাই স্থিরীকৃত হইল যে, রাত্র প্রভাত হইবার সঙ্গে সঙ্গে যিনি পারিবেন, বিবাদি জমি দখল করিয়া লইবেন।

    দারোগাবাবু সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিয়া যে প্রথমেই থানায় নিয়া উপস্থিত হইলেন, তাহা নহে; অপর জমিদারকে সংবাদ প্রদান করিলেন যে, তিনি বা তাহার কোন বিশ্বস্ত কর্মচারী আসিয়া যতশীঘ্র হয়, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন। সংবাদ পাইবামাত্রই অপর জমিদার নিজে আসিয়া দারোগাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও তাঁহাকে কহিলেন, “আমাকে আপনি ডাকিয়াছেন কেন?”

    দারোগা। যে কার্য্যের নিমিত্ত ডাকাইয়াছি, তাহা কি আপনি এখনও বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই?

    জমিদার। কতক পারিয়াছি। সকল বিষয় জানিতে পারি নাই।

    দারোগা। আর কোন বিষয় জানিবার প্রয়োজন নাই। আপনার সমস্ত প্রস্তুত আছে ত?

    জমিদার। সমস্তই ঠিক আছে, আদেশের প্রার্থনা, অর্থাৎ আদেশ পাইবামাত্রই আমি আমার জমির ধান্য কাটিয়া লই।

    দারোগা। আদেশ পাইতেছেন, এখন আপনি আপনার ইচ্ছানুণায়ী কার্য্য করিতে পারেন।

    জমিদার। এখনই আমি আমার কার্য্য উদ্ধার করিয়া লইব।

    দারোগা। না, এখন নহে।

    জমিদার। তবে কখন?

    দারোগা। রাত্রি প্রভাত হইবার সঙ্গে সঙ্গে।

    জমিদার। বিলম্বে প্রয়োজন?

    দারোগা। প্রয়োজন না থাকিলে, সময় স্থির করিয়া দিব কেন?

    জমিদার। আচ্ছা তাহাই হইবে, এখন আমি বিদায় হইলাম। কারণ এই সংবাদ এখনই আমার কর্ম্মচারিগণকে বলিতে হইবে।

    এই বলিয়া জমিদার মহাশয় সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    যেস্থানে সাহেব কৰ্ম্মচারিগণ অবস্থান করেন, সেই স্থান দারোগাবাবুর থানা হইতে প্রায় দশক্রোশ ব্যবধান, অশ্বারোহী দ্বারা সংবাদ পাঠাইতে হইলেও, অনেক সময়ে প্রায় তিনঘণ্টা অতিবাহিত হইয়া যায়।

    জমিদার মহাশয়কে বিদায় দিয়া দারোগাবাবু আর সে দিবস থানা ছাড়িয়া অপর কোন কার্য্যোপলক্ষে গমন করিলেন না, ক্রমে রাত্রি আসিয়া উপস্থিত হইল। রাত্রি বারটার সময় দারোগাবাবু মনে করিলেন, এখন যদি কোন ব্যক্তিকে অশ্বারোহণে সাহেবদিগের নিকট প্রেরণ করিয়া দাঙ্গার সংবাদ দেওয়া যায়, তাহা হইলে তাঁহারা কোনরূপেই দাঙ্গার পূর্বে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইতে পারিবেন না। দাঙ্গা হইয়া যাইলে, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে। অথচ আমার উপর কোনরূপ সন্দেহ হইবে না।

    মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া, দারোগাবাবু তাঁহার প্রধান কর্মচারীগণের নিকট এইরূপ মর্ম্মে একখানি পত্র লিখিলেন। “আপনাদিগের আদেশ প্রতিপালন করিয়া, আমি আমার সমস্ত লোকজনের সহিত বিবাদি জমি হইতে থানায় আসিয়া উপস্থিত হই, এবং সমস্ত দিবস থানাতেই থাকি, রাত্রি দশটার পর সেই গ্রামের কোন একজন লোক আসিয়া আমাকে সংবাদ প্রদান করেন যে, যে বিবাদি জমি লইয়া দাঙ্গা হইবার প্রস্তাবনা চলিতেছিল, সেই প্রস্তাব এখন কায্যে পরিণত হইতে বসিয়াছে। উভয় জমিদারের বিস্তর লোক সংগ্রহ করিয়া বিবাদি জমির সন্নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। উভয় পক্ষে ভয়ানক দাঙ্গা হইবার আর কিছুমাত্র বিলম্ব নাই। এইরূপ সংবাদ পাইয়া, সংবাদদাতার কথায় আমি প্রথমে বিশ্বাস করিতে সাহসী হইলাম না। কারণ, হুজুর নিজে যে বিষয় অনুসন্ধান করিয়া সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা বলিয়া স্থির করিয়াছেন, সেই বিষয়ে আমি সহজে বিশ্বাস করি কিরূপে? এই সংবাদ প্রকৃত বলিয়া যদিও আমি উহাতে বিশ্বাস করিতে সাহসী হইলাম না। তথাপি কথাটা যে কী, তাহা জানিবার নিমিত্ত আমি নিজেই পুনরায় আর একবার গুপ্তবেশে সেইস্থানে গিয়া, প্রকৃতই লোকজন সমবেত হইয়াছে কিনা, তাহা জানিবার নিমিত্ত প্রস্তুত হইলাম। রাত্রি দশটার পরই আমি আমার অশ্বে আরোহণ করিয়া, এবং সংবাদ দাতাকে আর একটি অশ্বে উঠাইয়া লইয়া, সেইস্থানে গমন করিলাম। দেখিলাম, সংবাদ দাতা আমাকে যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা প্রকৃত : দুই পক্ষে অনুমান চারি পাঁচ শত লোক, সেই বিবাদি জমির সন্নিকটে অবস্থান করিতেছে। এই অবস্থা দেখিয়া সেই সময় তাহাদিগকে কোন কথা বলিতে আমার সাহস হইল না। কারণ, পুলিশ কর্মচারীর মধ্যে একে আমি একাকী, তাহার উপর আমি পুলিসের বিনা পোষাকে গুপ্ত ভাবে সেইস্থানে গমন করিয়াছি।

    “এই অবস্থা দেখিয়া আমি দ্রুতগতি আপনার থানায় ফিরিয়া আসিয়া এই সংবাদ আপনার নিকট প্রেরণ করিতেছি: সংবাদবাহী অশ্বারোহণে গমন করিয়া যত শীঘ্র পারে আপনার নিকট উপস্থিত হইবে। আমিও উপস্থিতমত কনষ্টেবল, চৌকিদার ও অপরাপর যাহাদিগকে সংগ্রহ করিতে পারি। তাহাদিগকে লইয়া সেইস্থানে গমন করিলাম। দাঙ্গা যাহাতে নিবারণ করিতে পারি, তদ্বিষয়ে বিধিমত চেষ্টা করিব, কিন্তু সামান্য লোক লইয়া, যে সেই দাঙ্গা রক্ষা করিতে পারিব, তাহা আমার অনুমান হয় না। কারণ, যেরূপ আমি দেখিয়া আসিয়াছি, তাহাতে দাঙ্গা অপরিহার্য্য। যদি এই দাঙ্গা বাধিয়া যায়, তাহা হইতে উহাতে বিস্তর লোকজন যে হত ও আহত হইবে, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। দস্তুরমত লোকজন সমভিব্যাহারে যদি দাঙ্গার পূর্বেই আপনারা দাঙ্গাস্থলে উপনীত হইতে পারেন, তাহা হইলেই মঙ্গল। অধিক কথা আমি আর এইস্থানে লিখিতে পারিলাম না, রাত্রি বারটার সময় এই সংবাদ আপনার নিকট প্রেরণ করিয়া আমিও লোকজন লইয়া সেইস্থানে গমন করিলাম।”

    এইরূপভাবে পত্র লিখিয়া দারোগাবাবু উহা একজন অশ্বারোহীর সমাভিব্যাহারে প্রেরণ করিলেন। থানায় যে কয়েকজন লোক উপস্থিত ছিল, তাহাদিগকে থানায় উপস্থিত রাখিয়া গ্রামের যে কয়েকজন চৌকিদার ছিল, তাহাদিগকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন। তাহারা আসিয়া একত্র হইতে হইতেই রাত্রি দুইটা বাজিয়া গেল।

    রাত্রি তিনটার সময় দারোগাবাবু এইরূপ সংগৃহীত লোকজনের সহিত থানা হইতে বহির্গত হইয়া বিবাদি জমির উপলক্ষে ধীরে ধীরে প্রস্থান করিলেন। যখন তাঁহারা তাহার নিকটবর্তি একটি স্থানে উপস্থিত হইলেন, তখন ভোর হইয়া গিয়াছে।

    বিবাদি জমির যুদ্ধরত একটি বাগানের ভিতর তাঁহার সমভিব্যাহারী লোকজনকে রাখিয়া তিনি একাকী সেই বিবাদি জমির দিকে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দূর গমন করিয়া যেস্থানে তিনি উপস্থিত হইলেন, সেইস্থান হইতে বিবাদি জমি বেশ দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি সেইস্থান হইতে দেখিলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে দাঙ্গা উপস্থিত না হইলেও উভয় পক্ষের লোকজন বিস্তর সেইস্থানে সমবেত হইয়াছে। দাঙ্গা আরম্ভ হইবার আর কিছুমাত্র বিলম্ব নাই। এই অবস্থা দেখিয়া দারোগাবাবু আর একপদও অগ্রগামী হইলেন না, সেই স্থানে দাঁড়াইয়া, কি হয়, দেখিতে লাগিলেন।

    এইরূপে অর্ধঘণ্টাকাল অতিবাহিত হইতে না হইতেই দেখিলেন, এক পক্ষীয় লোক সেই জমির ধান্য কাটিবার নিমিত্ত যেমন অগ্রগামী হইল, অমনি অপর পক্ষীয় লোক আসিয়া তাহার প্রতিবন্ধক জন্মাইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে উভয় পক্ষের মধ্যে লাঠি ও সড়কি চলিতে লাগিল। সেই সময় সেইস্থানে গমন করা দূরে থাকুক, তাহার দূরবর্তী স্থানে দণ্ডায়মান থাকিতেও শঙ্কা হইতে লাগিল।

    যাঁহারা এইরূপ দাঙ্গা কখন স্বচক্ষে দর্শন করিয়াছেন, তাঁহারাই ইহার কতক অনুভব করিতে পারিবেন, নতুবা সেই ভয়ানক কাণ্ড যে কি, তাহা কেহ সহজে অনুমান করিয়া উঠিতে পারিবেন না।

    ইহা দেখিয়া দারোগাবাবু আর সেইস্থানে ক্ষণমাত্রও অবস্থান করিলেন না। যেস্থানে তাঁহার লোকজন ছিল, তথায় উপস্থিত হইয়া, সকলকে কহিলেন, যেরূপ ভয়ানক দাঙ্গা উপস্থিত হইয়াছে, তাহা নিবারণ করিতে তথায় গমন করা দূরে থাকুক, আমাদিগের এই স্থানে অবস্থিতিও কৰ্ত্তব্য নহে।

    এই বলিয়া দারোগাবাবু সেইস্থান হইতে আরও পশ্চাদপদ হইয়া এরূপ একটি উপস্থানের উপর গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন যে, সেইস্থান হইতে উত্তমরূপে সেই দাঙ্গা দেখিতে পাওয়া যায়।

    তাঁহারা সেইস্থানে গিয়া দণ্ডায়মান হইয়া, সেই ভয়ানক দাঙ্গা দর্শন করিতেছেন, এরূপ সময় দেখিতে পাইলেন, দুইটি দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করিয়া দুইজন ইংরাজ সেইদিকে আসিতেছেন।

    উহাদিগকে দেখিয়াই দারোগাবাবু বুঝিতে পারিলেন, উহার পূর্ব্বে বর্ণিত সেই ইংরাজ কৰ্ম্মচারীদ্বয়।

    তাহাদিগকে আসিতে দেখিয়া দারোগাবাবু আপন অশ্বে আরোহণ করিয়া তাঁহাদিগের দিকে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহাকে দেখিয়াই সাহেবদ্বয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি সংবাদ?”

    দারোগা। ভয়ানক দাঙ্গা হইতেছে, কত লোক যে হত বা আহত হইতেছে, তাহা কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

    সাহেব। দাঙ্গা এখনও হইতেছে?

    দারোগা। খুব হইতেছে, আর একটু অগ্রগামী হইলেই স্বচক্ষে দেখিতে পাইবেন।

    সাহেব। যদি দাঙ্গা হইতেছে তাহা হইলে দাঙ্গাস্থল হইতে তুমি এতদূরে কি করিতেছ? আর তোমার সমভিব্যাহারী লোকজন সকল কোথায় আছে?

    দারোগা। আমরা যেরূপ বিপদে পড়িয়াছিলাম, তাহাতে কোনরূপে জীবনরক্ষা হইবার উপায় ছিল না, তবে কোনরূপে জীবন বাঁচাইয়াছি মাত্র। সামান্য লোকদ্বারা এ দাঙ্গা কোনরূপেই এখন আর নিবারণ করা যায় না।

    সাহেব। দুই পক্ষে কত লোক হইবে অনুমান করিতেছ?

    দারোগা। অনুমান সহস্ৰাধিক হইবে।

    সাহেব। এত লোক?

    দারোগা। এইরূপই ত অনুমান করিতেছি।

    সাহেব। আমাদিগের সঙ্গে আইস, দেখ এই দাঙ্গা বন্ধ করিতে কয়জন লোকের প্রয়োজন হয়। আমরা দুইজনেই সমস্ত লোককে এখনই তাড়াইয়া দিতেছি।

    দারোগা। আপনারা ইংরাজ, আপনাদিগের সকলই সম্ভব। চলুন, মরিতে হইবে দেখিতেছি, চাকরী, চলুন। এইরূপ বলিয়া দারোগাবাবু তাঁহার অশ্বারোহণে আস্তে আস্তে সাহেবদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন।

    সাহেব। তুমি অত পিছে পড়িতেছ কেন?

    দারোগা। আমার এই মরা দেশী ঘোড়া আপনাদিগের ওই ঘোড়ার সঙ্গে চলিতে পারিবে কেন?

    দারোগাবাবু যাহা বলিলেন, তাহা কিন্তু প্রকৃত নহে; তাঁহার ঘোড়া দেশী বটে; কিন্তু ক্ষীণজীবী ঘোড়া নহে। সাহেবদিগের ঘোড়া অপেক্ষা বরং তাঁহার ঘোড়া দ্রুতগামী। মনে করিলে তিনি সাহেবদিগের ঘোড়ার অনেক অগ্রে অগ্রে যাইতে সমর্থ। কিন্তু এখন তিনি তাঁহাদিগের অগ্রে গমন করিতে প্রস্তুত নহেন; সহজে দাঙ্গার মধ্যে প্রাণ হারাইতে কে যাইবে।

    কর্মচারীদ্বয় ইংরাজ, তাঁহারা তাহা বুঝিবেন কেন? দাঙ্গা রক্ষা করিতে পারেন, এরূপ লোকজন তাঁহাদিগের সঙ্গে নাই। দাঙ্গাকারীগণ তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিলে, নিজের জীবন রক্ষা করিবার কোনরূপ উপায় নাই। তথাপি জাতীয় গৌরবে মত্ত হইয়া তাঁহারা দ্রুতবেগে সেই দাঙ্গার স্থানে গমন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

    দাঙ্গাকারীগণ দেখিল, এই সময় হইতেই সাহেবদ্বয়কে একটু শিক্ষা দেওয়া কর্তব্য। এই ভাবিয়া তাহারা কয়েকখানি সড়কি উপর্যুপরি সাহেবদ্বয়ের ঘোড়ার উপর নিক্ষেপ করিল। সড়কি খাইয়া উভয় ঘোড়াই বিশেষরূপে জখম হইল ও সেইস্থানে পড়িয়া গেল। সাহেবদ্বয় আপন আপন ঘোড়া সেইস্থানে পরিত্যাগ করিয়া আস্তে আস্তে পদব্ৰজে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দাঙ্গাকারীগণের উদ্দেশ্য ছিল না যে, সাহেবদিগের উপর কোনরূপ হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু তাঁহাদিগের প্রতিরোধ করিবার নিমিত্ত, বাধ্য হইয়া ঘোড়া দুইটিকে বিশেষরূপে জখম করিতে হইল।

    সাহেবদিগের এই অবস্থা দেখিয়া দারোগাবাবু মনে মনে একটু হাসিলেন। ও আপনার ঘোড়া হইতে অবতরণ করিয়া সাহেবদিগের সমভিব্যাহারে সেই স্থান হইতে দূরে গমন করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন, এবং সেইস্থানে দণ্ডায়মান হইয়া দাঙ্গা দেখিতে লাগিলেন। যেস্থানে দাঁড়াইয়া তাঁহারা দাঙ্গা দেখিতে লাগিলেন, দাঙ্গার স্থান হইতে সেইস্থান বোধহয়, এক মাইলের কম নহে।

    সাহেবদ্বয় সেইস্থানে উপস্থিত হইবার পরেও, দশ পনর মিনিট পর্যন্ত দাঙ্গা হইল, তাহার পরে সকলে সেইস্থান পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে প্রস্থান করিল।

    দাঙ্গাকারীগণ সেইস্থান হইতে প্রস্থান করিবার পর, সাহেবদ্বয় ও দারোগাবাবু সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, বিবাদি জমিতে যে ধান্য জমিয়াছিল, তাহার সমস্তই ছেদন করিয়া লইয়া গিয়াছে। আরও দেখিলেন, সেই বিবাদি জমির সন্নিকটে একটি মস্তকবিহীন মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, সেই দেহটি একটি বলবান পুরুষের দেহ। উহা যে কাহার দেহ, তাহার কিছুমাত্র স্থিরতা হইল না। সেই ময়দানের ভিতর সমস্ত স্থানেই উত্তমরূপে অনুসন্ধান করা হইল। কিন্তু সেই মস্তকের কোনরূপ সন্ধান পাওয়া গেল না। দেহটি উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখা গেল যে, উহার বক্ষস্থলের মধ্য দিয়া একখানি সড়কি এফোঁড় ওফোঁড় হইয়া চলিয়া গিয়াছে। ইহাই তাহার মৃত্যুর যথেষ্ট কারণ। কিন্তু মস্তক যে দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া লওয়া হইয়াছে; তাহার কারণ, এই অনুমান হয় যে, মস্তক না পাইলে মৃতদেহ যে কাহার, তাহার কিছুমাত্র স্থিরতা হইবে না। সুতরাং মোকদ্দমার সময় কোন ব্যক্তি হত হইয়াছে, তাহা প্রমাণিতও হইবে না।

    দাঙ্গাকালীন একজনমাত্রও দাঙ্গাকারী ধৃত হইল না। কিন্তু দাঙ্গার পর দারোগাবাবু ব্যতীত আরও কয়েকজন বড় বড় দারোগা এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইলেন। সকলেই প্রাণপণে জানিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন যে, সেই ভয়ানক দাঙ্গায় কোন্ কোন্ ব্যক্তি সংলিপ্ত ছিল? এবং যাহার মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, সেই বা কে? ও তাহার বাসস্থানই বা কোথায়? কিন্তু অনুসন্ধানে তাহার বিশেষ কিছুই পাওয়া গেল না। জমিদারদ্বয়কে এই মোকদ্দমার আসামী শ্রেণীভুক্ত করিবার চেষ্টা করা হইল, কিন্তু তাঁহারা দাঙ্গার সময় দাঙ্গার স্থলে উপস্থিত ছিলেন না, ইহা তাঁহারা এরূপ উত্তমরূপে প্রমাণ করাইলেন যে, দারোগাগণ বাধ্য হইয়া তাঁহাদিগকে পরিত্যাগ করিলেন। ইহার পর পুলিশের দ্বিতীয় চেষ্টা, জমিদারদিগের প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণকে এই মোকদ্দমার আসামী করা; কিন্তু কার্য্যে তাহাও ঘটিল না। যাঁহারা কেবলমাত্র দাঙ্গা করিবার অনুমতি লইবার নিমিত্ত হাজার দেড়হাজার টাকা অনায়াসে ব্যয় করিতে পারেন, তাঁহারা আপন আপন প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণকে বাঁচাইবার নিমিত্ত যে কত টাকা ব্যয় করিতে সমর্থ, তাহা পাঠক পাঠিকাগণ অনায়াসেই অনুমান করিতে পারেন। সুতরাং অর্থের বিনিময়ে প্রধান প্রধান কৰ্ম্মচারীগণও বাধিয়া গেলেন।

    পুলিস কর্ম্মচারীগণের অনুসন্ধান শেষ হইয়া গেলে দেখা গেল, উভয় জমিদারের পক্ষ হইতে কেবলমাত্র উনিশ কুড়িজন লোক ধৃত হইয়াছে। এবং তাহাদিগের উপর এই দাঙ্গার মোকদ্দমা রুজু হইয়াছে। যে সকল লোক ধৃত হইয়াছে, তাহারা প্রায় সকলেই দাঙ্গাবাজ নামজাদা লাঠিয়াল, জেলের মধ্যে তাহারা সময় সময় প্রায়ই বাস করিয়া থাকে।

    যে সকল লোকের উপর মোকদ্দমা রুজু হইল, তাহারা কপর্দকশূন্য হইলেও, তাহাদিগের মোকদ্দমায় বিস্তর অর্থ ব্যয় হইতে লাগিল। ভাল ভাল উকীল, কৌন্সলিগণ তাহাদিগকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত বিশেষরূপ চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

    পাঠক পাঠিকাগণের মধ্যে বোধ হয়, অনেকেরই বিশ্বাস যে, ভাল ভাল উকীল কৌশলিগণ যদি মনে করেন, আসামিগণকে কোন না কোনরূপে জেল হইতে বাঁচাইবেন, তাহা তাঁহারা করিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে কূটবুদ্ধিরা কূট-প্রশ্ন উত্থিত করিয়া, কখন বা কৌশলক্রমে সাক্ষিগণের সাক্ষ্যের মধ্যে নানারূপ অনৈক্য দেখাইয়া বিচারকগণের চক্ষে ধূলি মুষ্টি নিক্ষেপ করিয়া আপন আপন উদ্দেশ্য সাধন করিয়া লন।

    এই মোকদ্দমায়ও যে তাঁহারা সেই পন্থা অবলম্বন করিলেন না, তাহা নহে। নিম্ন আদালতের বিচারে আসামিগণ উচ্চ আদালতে বিচারার্থ প্রেরিত হইল। কিন্তু সেইস্থান হইতে উকীল কৌন্সলিগণ অনেককেই জেল হইতে মুক্ত করিয়া লইলেন। উভয়পক্ষীয় লোকজনের মধ্যে কেবল চারি পাঁচজন লোক জেলে গমন করিল।

    দারোগাবাবু এইরূপ উপায়ে আপন মনোবাঞ্ছ, পূর্ণ করিয়া যে, কেবলমাত্র দেড় হাজার টাকা বিনাকষ্টে হস্তগত করিলেন, তাহা নহে। দাঙ্গার মোকদ্দমার অনুসন্ধানকালীনও কম-বেশ আরও সহস্র মুদ্রা তাঁহার হস্তগত হইল।

    এই দাঙ্গা মোকদ্দমার আনুপূর্ব্বিক বিবরণ গবর্ণমেন্টের নিকট প্রেরিত হইলে, ইংরাজ কর্মচারীদ্বয় গবর্ণমেন্ট হইতে বিশেষরূপ তিরস্কৃত হইলেন। তাঁহাদিগের দোষেই যে এই ভয়ানক দাঙ্গা হইয়াছে, এই বিষয় স্পষ্টরূপ ব্যক্ত করিয়া গবর্ণমেন্টের একটি মন্তব্য প্রকাশিত হইল। এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে দারোগাবাবুর কার্য্যের বিশেষ প্ৰশংসা ঘোষিত হইল। তিনি দাঙ্গার পূর্ব্বে এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া সাধ্যানুসারে উহা নিবারণের চেষ্টা করিয়াছিলেন বলিয়া, কেবল যে তিনি গবর্ণমেণ্ট হইতে ধন্যবাদ প্রাপ্ত হইলেন, তাহা নহে, বেতনবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার পদেরও কিছু উন্নতি হইল।

    পাঠকগণ এখন বিবেচনা করিয়া দেখুন, ঘুসখোর পুলিস-কর্ম্মচারীর ঘুস পাইবার উপায়ই বা কিরূপ এবং তাঁহার বুদ্ধির দৌড়ই বা কতদূর।

    [অগ্রহায়ণ, ১৩০৬]

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদারোগার দপ্তর ৩ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    Next Article দারোগার দপ্তর ১ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    Related Articles

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    দারোগার দপ্তর ১ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    September 24, 2025
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    দারোগার দপ্তর ৩ – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

    September 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }