Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    দ্য সেভেনথ স্ক্রৌল – উইলবার স্মিথ

    মখদুম আহমেদ এক পাতা গল্প589 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. নিকোলাসের ঘুম ভাঙল

    বিকেলে নিকোলাসের ঘুম ভাঙল বোরিসের চেঁচামেচিতে। আমার বউ! আমার বউ! আপনি জানেন কোথায় গেছে আমার বউ? কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না!

    হাত দিয়ে চোখ রগড়ে বিছানার উপর উঠে বসলো নিকোলাস। তোমার বউ কোথায় আছে তার আমি কি জানি।

    শালী আমার কালা কুত্তাটার সঙ্গে পালিয়েছে! হুংকার ছাড়লো বোরিস। আপনি সব জানেন! বলুন কোথায় গেছে ওরা, তা, না হলে খুনোখুনি কাণ্ড ঘটে যাবে!

    মুখ সামলে কথা বলুন, সাবধান করে দিল নিকোলাস।

    বউ তো নয়, বেশ্যা! মেক নিমুরকে ভালো খদ্দের ভেবে তার সঙ্গে পালিয়েছে! কিন্তু আমার নামও বোরিস ব্রুসিলভ। আমি ইন্টেলিজেন্স চীফ ছিলাম…. কি বলে ফেলছে বুঝতে পেরে থেমে গেল বোরিস।…শালীর পেটে গুলি করব আমি, বেশ্যা মাগীটা তাকে মরতে দেখবে। ছুটে নিকোলাসের কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে গেল সে। গায়ে শার্ট চড়িয়ে তার পিছু নিল নিকোলাস।

    নিজের কুঁড়েতে ফিরে একটা ব্যাগে কয়েকটা জিনিস ভরেছে বোরিস। এ মুহূর্তে হান্টিং রাইফেলে কাট্রিজ ঢোকাচ্ছে।

    গেছে যাকগে, দরজা থেকে বলল নিকোলাস। ওদের পিছু নিলে আপনার বিপদ হতে পারে। মেকের সঙ্গে পঞ্চাশ জন গেরিলা আছে। আপনার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, বোঝা উচিত জোর করে কোনো মেয়েকে ধরে রাখা যায় না।

    কে ধরে রাখতে চায়? বেশ্যাটাকে আমি খুন করতে চাই! চাবির গোছাটা নিকোলাসের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিল বোরিস। সাফারি শেষ হয়ে গেছে, মিস্টার। ল্যান্ড ক্রুজারের চাবি রইল, নিজের চেষ্টায় আদ্দিস আবাবায় ফিরে যাবেন। বড় ট্রাকটা আমার জন্য রেখে যাবেন। আদ্দিসে পৌঁছে আমার ট্র্যাকারকে ল্যান্ড ক্রুজারের চাবি বুঝিয়ে দেবেন। সাফারি বাতিল করায় আপনি কিছু টাকা ফেরত পাবেন, সেটা পরে আমি পাঠিয়ে দেব।

    নিকোলাসের কোনো যুক্তিই মানলো না, কাঁধে ব্যাগ আর হাতে রাইফেল নিয়ে। ক্যাম্প ত্যাগ করলো বোরিস। নিজের কুঁড়েতে ফিরে আসছে নিকোলাস, দেখলো দরজা দিয়ে মাথা বের করে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে রোয়েন। সবই শুনলাম, বলল সে। টিসেকে পেলে সত্যি মেরে ফেলবে। আমাদের কি কিছুই করার নেই?

    না, নেই। আমাদের কোনো সাহায্য ওদের লাগবেও না। যান, আবার শুয়ে পড়ুন।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    Library
    বুক শেল্ফ
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ
    সেবা প্রকাশনীর বই
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    Books
    বাংলা অডিওবুক
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কোর্স
    বিনামূল্যে বই

     

    কাল রাতের পোলারয়েড ছবিগুলো দেখছিলাম। টাইটা আমাদেরকে অঢেল দান করে গেছে। আসুন না, দেখবেন।

    ভেতরে ঢুকে নিকোলাস দেখলো পোলারয়েড আর আর্ট পেপারে তোলা ছাপগুলো ক্যাম্প টেবিলে বিছিয়ে রেখেছে রোয়েন।

    আপনি যখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন, আমি কিছু কিছু কাজ করেছি। চারটে পোলারয়েড পাশাপাশি রাখলো রোয়েন, ওগুলোর উপর টেনে আনল বড় আকারের ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা। ভাঁজ করা পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে জিনিসটা, প্রফেশনাল ল্যান্ড সার্ভেয়ারস মডেল। ওটার নিচে ফটোগ্রাফের প্রতিটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে। টাইটা পাথরের প্রতিটি দিকের নাম রেখেছে-বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ আর শীত। এর মানে কী?

    পৃষ্ঠা সংখ্যা?

    ঠিক আমি যা ভেবেছি, বলল রোয়েন। মিশরীয়রা বিশ্বাস করে বসন্ত হলো সমস্ত নতুন জীবনের সূচনা। প্যানেলগুলো কী নিয়মে পড়তে হবে সে-কথাই এখানে বলে দিচ্ছে টাইটা। এটা বসন্ত, একটা ফটোগ্রাফ দেখালো ও।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    বিনামূল্যে বই
    সেবা প্রকাশনীর বই
    বাংলা লাইব্রেরী
    বইয়ের
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    বাংলা অডিওবুক
    অনলাইন বুক

     

    মৃতের পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে এখানে, বলল রোয়েন। পড়ছি, অনাদি অনন্ত ও অন্ধকার সমুদ্রের উপর মৃদুমন্দ প্রথম বায়ু আমি। আমি প্রথম সূর্যোদয়। আলোর প্রথম আভাস। ভোরের বাতাসে উড়ছি সাদা একটা পালক। আমি রা। সমস্ত বস্তুর শুরু আমি। বেঁচে থাকব চিরকাল। আমার ক্ষয় বা বিনাশ নেই। গ্লাস থেকে চোখ তুলে নিকোলাসের দিকে তাকালো রোয়েন। আপাতত এ-সব থাক, পরে ফিরে আসা যাবে। পরের অংশটুকু পড়া দরকার…এটা পড়ার সময় আমি আপনার দিকে তাকাবো না। টাইটা মাঝে মধ্যে বাজে ভাষা ব্যবহার করে। এ শুরু করছি :

    দেবীর কন্যা তার মায়ের কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো। সিংহীর মতো সগর্জনে মিলিত হবার জন্য ছুটছে সে। পাহাড় থেকে লাফ দিল, দাঁতগুলো সাদা। সমস্ত বিশ্বের বেশ্যা সে। তার জননেন্দ্রিয় থেকে বিপুল স্রোত বেরিয়ে আসে। তার জননেন্দ্রিয় একদল কর্মীকে গ্রাস করেছে। তার শারীরিক ক্ষুধা পাথরমিস্ত্রী আর রাজমিস্ত্রীদের খেয়ে ফেলেছে। তার জননেন্দ্রিয় একটা অক্টোপাস, গিলে ফেলেছে একজন রাজাকে।

    ওরে ব্বাপ! নিকোলাস মুচকি হাসে। দারুণ জিনিস। একি আপনি কি লজ্জা পেলেন নাকি? ওটা কি আমি লালিমা দেখছি আপনার গালে? হতেই পারে না!

     

    আরও দেখুন
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    বাংলা লাইব্রেরী
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
    বাংলা সাহিত্য
    বাংলা কমিকস
    বিনামূল্যে বই
    বাংলা গল্প
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    ই-বই ডাউনলোড
    অনলাইন বই

     

    আপনার স্কটিশ উচ্চারণের মতোই ভুয়া, ঠাণ্ডা স্বরে বলে রোয়েন। এখনো চোখ তুলে দেখছে না নিকি কে।

    কি বুঝলেন?

    মাথা নাড়লো নিকোলাস।

    চলুন আপনাকে একটা জিনিস দেখিয়ে আনি।

    এক ঘণ্টা পর ঝুলন্ত ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ওদেরকে, ডানডেরা নদীর তীব্র স্রোতের অনেক উপরে এদিক ওদিক দোল খাচ্ছে ব্রিজটা।

    নীল নদের দেবী হলো হাপি। তাহলে এ নদী তার কন্যা, মায়ের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে চলেছে, লাফ দিচ্ছে পাহাড় থেকে, গর্জন করছে। সিংহীর মতো, ফেনায় সাদা দেখাচ্ছে তার দাঁত? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।

    শয়তানি হাসিতে নিকোলাসের মুখ ভরে উঠলো। জানি, এরপর কী বলবেন। এ খাজের দিকে তাকিয়ে ওটাই প্রথম আমার মনে এসেছিল! আপনি বলেছিলেন, এ হলো এক সর্বগ্রাসী মুখগহ্বর- আমার কাছে অবশ্য অন্য কিছুর মতো মনে হচ্ছে!

     

    আরও দেখুন
    বুক শেল্ফ
    বইয়ের
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    বই
    বাংলা কবিতা
    বাংলা কমিকস
    বাংলা উপন্যাস
    বাংলা গানের লিরিক্স বই

     

    আমি কেবল এইটাই বলতে পারি- আপনার নিশ্চই অসাধারণ কিছু নারী বন্ধু ছিল! রোয়েন বলে ফেলে মুখ ফসকে। এ হে! টাইটার খপ্পরে পরে আমিও আজে বাজে বকছি।

    নদীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো নিকোলাস, একদল কর্মীকে গ্রাস করেছে। পাথরমিস্ত্রী আর রাজমিস্ত্রীদের খেয়ে ফেলেছে।

    ফারাও মামোস একজন গড বা দেবতা। নদী একজন গডকে গিলে ফেলেছে…পাথুরে খিলানসহ। নিকোলাসের মতোই উত্তেজিত রোয়েন। খাদের ভেতর পাঁচিলে আপনি ওই কুলুঙ্গিগুলো দেখেছেন বলেই সম্পর্কটা ধরতে পেরেছি আমি। নিকোলাস, ওখানে আবার আমাদের যাওয়া দরকার। খোদাই করা ডিজাইনটা দেখতে হবে।

    সেজন্য প্রস্তুতি দরকার, বলল নিকোলাস। রশি কাটতে হবে, একটা পুলি সিস্টেম দরকার হবে। সবার সাহায্যে লাগবে।

    আপনি প্রস্তুতি নিন, সেই ফাঁকে পাথরটার অনুবাদ শেষ করি আমি… হঠাৎ থেমে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালো রোয়েন। শুনুন!

     

    আরও দেখুন
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বইয়ের
    বইয়ের
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    PDF
    বাংলা কমিকস

     

    কান পাতলো নিকোলাস, নদীর কলকল ছলছল ছাপিয়ে জেগে উঠলো রোরের আওয়াজ।

    পেগাসাস দেখছি পিছু ছাড়ে নি! আসুন! রোয়েনের হাত ধরে ছুটলো ও, ব্রিজ থেকে নেমে সৈকতে চলে এলো। ব্রিজের নিচে সাদা বালিতে বসে থাকলো ওরা, বোল্ডারের আড়াল থাকায় আশা করছে হেলিকপ্টার থেকে ওদেরকে দেখা যাবে না।

    লালচে পাহাড় প্রাচীরের ওদিকটায় চক্কর দিল জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার। ওদেরকে পাইলট দেখতে পায় নি, ঘুরে গিয়ে খাদের এদিক থেকে ওদিক টহল দিতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল, কপ্টারের গতি কমে আসছে। পাহাড়ে কোথাও নামছে, ব্রিজের তলা থেকে ক্রল করে বের হবার সময় বলল নিকোলাস। ওদের এ উঁকি-ঝুঁকি মারা আমার ভালো ঠেকছে না।

    খুব একটা চিন্তার কিছু আছে বলে মনে করি না, বলল রোয়েন। ডুরেঈদের খুনীদের সঙ্গে পেগাসাসের যদি কোনো সম্পর্ক থাকে, তার ব্যবস্থা পরে এক সময় করা যাবে। প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছেটা আগের মতোই প্রবল রোয়েনের, তবে হাতের জরুরি কাজগুলো প্রথমে সারতে চাইছে। ওদের চেয়ে এগিয়ে আছি আমরা, তাই না? মঠ বা শিলালিপির তাৎপর্য সম্পর্কে ওদের এখনো কোনো ধারণা নেই।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা সাহিত্য
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন
    অনলাইন বই
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বই
    গ্রন্থাগার সেবা
    বই পড়ুন
    ই-বই ডাউনলোড

     

    চলুন ক্যাম্পে ফিরি, বলল নিকোলাস। আমি চাই না খাদের কাছাকাছি ওরা আমাদেরকে আবার ঘুরঘুর করতে দেখে ফেলে।

    *

    গ্যানট্রি বা মোবাইল একটা ক্রেন তৈরি করলো নিকোলাস, ওকে সাহায্য করলো ট্র্যাকার আর স্কিনাররা। ব্লক আর ট্যাকল নেই, তার বদলে ব্যবহার করা হলো কাঠের পোল। স্লিং শীট তৈরির জন্য কুকিং হাট থেকে কেটে আনল এক টুকরো ক্যানভাস, সেটার চার কোণে চারটি ফুটো করে রশি বাঁধা হলো। প্রস্তুতি শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল, রোয়েন ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো নিকোলাস।

    গ্যানট্রি আর রশির কুণ্ডলী নিয়ে সেই স্পটে পৌঁছল ওরা, পাহাড়ের কিনারা থেকে যেখানে নিচে লাফ দিয়েছিল ডিক-ডিক। ওখান থেকে রওনা হলো ভাটির দিকে, পাহাড়-প্রাচীরের কিনারা ধরে এগুচ্ছে। এদিকে ঝোঁপ খুব ঘন, ম্যাটিট দিয়ে কাটার জন্য মাঝে মধ্যে থামতে হলো। জলপ্রপাতের আওয়াজ পথ দেখালো নিকোলাসকে। ভাটির দিকে যতই এগুলো, ততই বাড়ছে শব্দটা। তারপর একসময় পানির গর্জনে পায়ের নিচে কাঁপতে শুরু করলো পাথর। খানিক পর কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে ঝুঁকল নিকোলাস, জলোচ্ছ্বাসের সাদা ফেনা দেখে কিফকে বলল, এই জায়গাই। তারপর ব্যাখ্যা করলো ঠিক কী চাইছে ও।

     

    আরও দেখুন
    নতুন উপন্যাস
    বাংলা কমিকস
    সাহিত্য পত্রিকা
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা ই-বই
    বাংলা বই
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা ভাষা
    Library
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই

     

    গ্যানট্রি ঠিক কোথায় সেট করা দরকার জানার জন্য ক্যানভাস স্লিং সিটে বসলো নিকোলাস, কিফ বাহিনীকে বলল, কিনারা থেকে বিশ ফুট নিচে নামাও আমাকে। ও জানে, বিশ ফুট নিচ থেকে শুরু হয়েছে ঝুল-পাথর। ওই পয়েন্ট পর্যন্ত নাইলন রশি পাথরে ঘষা খাবে না, তবে ফুলে থাকা পাহাড়-প্রাচীরের গা চারদিকে অনেকটাই দেখতে পাওয়া যাবে।

    দেড়শো ফুট নিচে নদীর পাথুরে গহ্বর, পেছন ফিরে শূন্যে ঝুলছে নিকোলাস, পাথরের গায়ে দুই সারি কুলুঙ্গি প্রায় পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছে। তবে পাঁচিলের গায়ে খোদাই করা ডিজাইন ফুলে থাকা পাথরের আড়ালে থেকে গেল। কিফকে সংকেত দিতে স্লিং সিট ওরে তুলে নিল ওরা।

    গ্যানট্রি আরো নিচের দিকে সেট করতে হবে। জিনিসপত্র তুলে নিয়ে ঝোঁপ ভেঙে আবার এগুলো ওরা, পাহাড়-প্রাচীরের কিনারা ধরে। দাঁড়াও! হঠাৎ চিৎকার করলো নিকোলাস। ঝোঁপগুলো এদিকে খাটো কেন? পরীক্ষা করে দেখার পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। পাহাড়-প্রাচীরের এদিকের কিনারা ক্ষয়ে গেছে, ফলে পাথুরে জমিন পেছনের চেয়ে অনেক বেশি ঢালু। নিকোলাস ধারণা করলো, সম্ভবত এ জায়গা থেকে প্রাচীন মাচা নিচে নামানো হয়েছিল। আর সামনে এগোবার দরকার নেই। এখানেই গ্যানট্রি সেট করব আমরা।

     

    আরও দেখুন
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    সাহিত্য পত্রিকা
    বইয়ের
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    নতুন উপন্যাস
    বাংলা ফন্ট প্যাকেজ
    Library
    বাংলা লাইব্রেরী
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ

     

    ঝোঁপ-ঝাড় কেটে জায়গাটা পরিষ্কার করতে হলো। গ্যানট্রি সেট করার পর হাতে আর সময় থাকলো না, সন্ধ্যে হয়ে আসছে।

    আজকের মতো থাক। এখন চললো, কাল সকালে ফিরে আসব, বলল নিকোলাস।

    *

    পরদিন সকালে আবার সেট করা গ্যানট্রির কাছে পৌঁছল ওরা। চালু জমিন একটা প্লাটফর্মে এসে শেষ হয়েছে, নিরেট পাথুরে প্লাটফর্মের কিনারায় খাদের ঠোঁট। ঘুরে ফিরে দেখে রোয়েন মন্তব্য করলো, নিশ্চয় করে বলা কঠিন, তবে বোধহয় আপার ধারণাই ঠিক-মানুষের তৈরি হতে পারে।

    স্লিং সিটে বসে সংকেত দিল নিকোলাস, কিফ বাহিনী ওকে খাদে নামাতে শুরু করলো। ওর পরনে শর্টস আর টেনিস শূ, গায়ে টিশার্ট। স্লিং সিটে ঝুলছে নিকোলাস, খাদের খাড়া গা থেকে যথেষ্ট দূরে। নামার শুরুতেই দেখতে পেল, কুলুঙ্গি সারি সঙ্গে একই লাইনে রয়েছে ও। পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে তৈরি বৃত্তাকার ডিজাইনটা ওর সামনে অর্থাৎ একই লেভেলে চলে এলো, তবে ওর কাছ থেকে পঞ্চাশ ফুট দূরে ওটা, তার উপর শ্যাওলা পড়ে পাথরের রঙ বদলে গেছে, ফলে ঠিক বোঝা গেল না ডিজাইনটা কৃত্রিম কিনা। কিফ বাহিনী রশি ছাড়ছে, ডিজাইনটাকে উপরে রেখে নিচে নামছে স্লিং সিট।

     

     

    পানির সারফেসে পৌঁছল স্লিং সীট, নদীতে নেমে পড়লো নিকোলাস। এরপর রোয়েন নামবে।

    ডিজাইনটার সঙ্গে একই লেভেলে পৌঁছে রোয়েন সংকেত দিল, স্থির হয়ে গেল স্লিং সীট। বুকে ঝুলে থাকা বাইনোকুলারটা চোখে তুললো ও। মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপরই বাইনোকুলার ছেড়ে নিল, গলা চিরে বেরিয়ে এলো তীক্ষ্ণ উল্লাসধ্বনি। একশো ফুট নিচ থেকে চিৎকারটা স্পষ্ট শুনতে পেল নিকোলাস। উত্তেজনায় পা ছুঁড়ছে রোয়েন, নিকোলাসের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে।

    হেসে উঠলো নিকোলাস, হাতছানি দিয়ে ওকে নিচে নেমে আসতে বলল। সংকেত পেয়ে আবার রশি ছাড়তে শুরু করলো খালিদ বাহিনী।

    কী দেখলেন? মানুষের তৈরি? লিপি? পড়তে পেরেছেন? রোয়েন পানির কাছাকাছি নেমে আসতে রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলো নিকোলাস।

    আপনি ঠিক ধরেছেন! উল্লাসে অধীর রোয়েন। আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর-হা, হা হা, হ্যাঁ! টাইটা এখানেও তার সই রেখে গেছে, ডানা ভাঙা বাজপাখি!।

     

     

    অসাধারণ!

    টাইটা যে এখানে এসেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল নিকোলাস। কুলুঙ্গিগুলো তৈরি করার জন্যে একটা মাচায় দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে। আমাদের প্রথম অনুমানই ঠিক। আপনি যে ফোকরে হাত রেখেছেন, ওটা খাদে নামার জন্য তার মইয়েরই একটা অংশ।

    বুঝলাম, কিন্তু কেন? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। এখানে নামার কি দরকার ছিল তার? খোঁড়াখুঁড়ি বা নির্মাণ কাজের কোনো চিহ্নই তো দেখছি না।

    এক সেকেন্ড চিন্তা করে রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, পানির নিচে ফোকরগুলো আছে কিনা দেখেছেন?

    না। সারফেসের নিচে পাথর কাটা সম্ভব নাকি।

    তবু দেখুন।

     

     

    ফোকরটা থেকে হাত না সরিয়েই পা ও শরীর পানির ভেতর ডোবাল নিকোলাস। পানির নিচে অদৃশ্য হলো মাথা, পা দিয়ে পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে ফোকর খুঁজছে। অকস্মাৎ ঝাঁকি খেয়ে পানির উপর মাথা তুললো, চেহারা দেখে মনে হলো ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।

    সত্যি আছে! পানির নিচে আরেকটা ফোকর আছে!

    একটা? আমি তো বলি, অনেকগুলো! তারপর বিনয়ে বিগলিত হওয়ার ভান করলো রোয়েন। প্লিজ, একবার ডাইভ দিয়ে দেখুন না!

    বড় করে শ্বাস টেনে বাতাসে বুক ভরে নিল নিকোলাস, তারপর ডুব দিল পানিতে। সারফেসের নিচে প্রথম ফোকরটা হাত দিয়ে ছুঁলো, তারপর নেমে এলো আরো নিচে। দ্বিতীয়টা পাওয়া গেল ছফুট দূরে, বাকিগুলোর মতোই। এভাবে যতো নামছে নিকোলাস ততোই একের পর এক ফোকর পাচ্ছে। চারটে ফোকর, তার মানে সারফেস থেকে চব্বিশ ফুট নেমে এসেছেও। ভোঁ-ভোঁ করছে কান দুটো।

    আরো নামছে নিকোলাস। পঞ্চশ ফোকরকে পাশ কাটালো। ফুসফুসের বাতাসে চাপ বাড়ছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে আছে, যদিও. পানি এখানে গাঢ় আর ঘোলা। সরাসরি সামনে পাহাড় প্রাচীরের গা-ই শুধু দেখতে পাচ্ছে। ছনম্বর ফোকরটা চোখে পড়তে ধরে ফেললো কিনারা। ইতস্তত করতে নিকোলাস।

    সারফেস থেকে ছত্রিশ ফুট নেমেছে অথচ এখনো নদীর তলায় পৌঁছতে পারে নি। সিদ্ধান্ত নিল, আরো ছ ফুট নামবে, তারপর উঠে যাবে উপরে। বাতাসের অভাবে ব্যথা শুরু হয়েছে বুকে।

    নামছে, সাত নম্বর ফোকরটা চোখে পড়লো। ভাবল, আশ্চর্য নদীর একেবারে তলা পর্যন্ত আছে এগুলো, কাজটা টাইটা করলো কীভাবে! ওদের তো ডাইভিং ইকুইপমেন্ট ছিল না! শেষ ফোকরটা ধরে চিন্তা করছে নিকোলাস, আরো নিচে নামার ঝুঁকি নিবে কিনা। ফিজিক্যাল লিমিটের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, শরীরের পেশী কাঁপতে শুরু করেছে। ঠিক আছে, আর মাত্র একটা!

    বিপদ সংকেত পেতে শুরু করেছে নিকোলাস। মাথার ভেতরটা হালকা লাগছে। পানির চাপে কুঁচকে যাচ্ছে, ভজ খাচ্ছে চামড়া। এ সময় আঙুল ঠেকল আট নম্বর ফোকর। আর নয়, এবার ওপরে উঠতেই হয়। হঠাৎ নদীর তলায় পা লাগলো। পানিতে পা ছুঁড়ে ওপরে উঠতে চাইছিল, কিছু একটা ধরে ফেললো ওগুলোকে, সজোরে টেনে নিল পাথুরে পাঁচিলের দিকে। ছ্যাঁৎ করে উঠলো বুক। অক্টোপাস! টাইটার অক্টোপাস। একজন রাজাকে গিলে ফেলেছে! আতঙ্কে এ সব চিন্তা করছে নিকোলাস। পা ছুঁড়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। যেনো কোনো জলদানব টেনে রেখেছে পা দুটোকে। নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় লাগলো, শরীরটা সেঁটে আছে পাঁচিলের গায়ে। তারপর ভাবল, অক্সিজেনের অভাবে হ্যাঁলুসিনেশনের শিকার হয়ে পড়েছে ও। আসলে কি ঘটেছে আন্দাজ করতে পারলো এতোক্ষণে।

    অক্টোপাস নয়, ওয়াটার প্রেশার। পাথরের গায়ে সরু একটা ফাটল আছে, আন্ডারওয়াটার টানেলের মুখ। শ্যাফটের ভেতর তীব্র বেগে পানি ঢুকছে, সেই স্রোতে আটকা পড়েছে ওর পা, তবে শরীরের উপরের অংশে এখনও ওই স্রোতের কোনো প্রভাব পড়ে নি। নিকোলাস টের পাচ্ছে ফাটলটার নির্দিষ্ট একটা আকৃতি আছে, রাজমিস্ত্রির তৈরি চৌকো লিনটেল-এর মতো। এ লিনটেলই ওকে ভেতরে টেনে নিতে চাইছে। হাত দুটো উপরের পাঁচিলে মেলে সমস্ত শক্তি দিয়ে টানটা থেকে পা দুটোকে মুক্ত করতে চাইছে নিকোলাস, কিন্তু আঙুলগুলো ধরার মতো কিছু পাচ্ছে না, মসৃণ আর শ্যাওলায় মোড়া পিচ্ছিল পাথরে হড়কে যাচ্ছে হাত। বাঁকা হয়ে উপড়ে আসছে নখগুলো।

    তারপর হঠাৎ সিঙ্কহোলের উপর শেষ ফোকরটার নাগাল পেয়ে গেল নিকোলাস। দু হাত ফোকরের কিনারা ধরে প্রাণপণে চেষ্টা করলো পা দুটোকে

    ফাটল থেকে বের করে আনতে। রিজার্ভ শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে, দুই হাতের পেশী কাঁপছে থরথর করে, মাংসের নিচে থেকে ফুলে উঠলো ঘাড়ের রগগুলো, মনে হলো মাথাটা বিস্ফোরিত হবে। একেবারে লাভ হলো না তা নয়, সিঙ্কহোলের ভেতর শরীরের ঢুকে যাওয়াটা বন্ধ হয়েছে।

    ফুসফুসের সব বাতাস খরচ হয়ে গেছে। বড়জোর আর একবার চেষ্টা করতে পারবে নিকোলাস। গাঢ় মেঘের মতো আকৃতি দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে, নেতিয়ে পড়ে বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছেটা অদম্য হয়ে উঠলো। কোত্থেকে এতো শক্তি পেল বলতে পারবে না, পা দুটোকে টানছে তো টানছেই। মাথার ভেতরটা অন্ধকার ছিল, হঠাৎ বিভিন্ন রঙের বিস্ফোরণ ঘটল সেখানে, চোখ দুটোকে ধাধিয়ে দিল। তবু ঢিল দেয়নি নিকোলাস, টেনে যাচ্ছে। অনুভব করলো পা দুটো বেরিয়ে আসছে সিঙ্কহোল থেকে স্রোতের টান দুর্বল হয়ে পড়েছে। শক্তির উৎস জানা নেই, নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য আরো জোর খাটালো।

    হঠাৎ করেই ছাড়া পেল নিকোলাস, সারফেসের দিকে উঠে আসছে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে, আবার অন্ধকার হয়ে গেল মাথার ভেতরটা, কানে গর্জন করছে জলপ্রপাতের মতো বিকট শব্দ। নিঃশেষ হয়ে গেছে ও। জানে না কোথায় রয়েছে, সারফেসে পৌঁছতে হলে আর কতটুকু উঠতে হবে। একবার মনে হলো উঠছে না, ডুবে যাচ্ছে। শেষ হয়ে গেছে ও।

    পানির উপর ওঠার পরও বুঝতে পারে নি যে উঠেছে। এতো শক্তি নেই যে পানি থেকে মুখ তুলে শ্বাস নেবে। পানিতে মুখ দিয়ে যেনো একটা লাশ ভাসছে। তারপর অনুভব করলো মাথার চুল ধরে টান দিল রোয়েন, ঠাণ্ডা তাজা বাতাসের স্পর্শ পেল মুখে।

    নিকোলাস! শ্বাস নিন! চিৎকার করছে রোয়েন। শ্বস নিন, নিকোলাস, শ্বাস নিন!

    মুখ খুলে পানি ছাড়লো নিকোলাস, তারপর বিষম খেলো।

    আপনি বেঁচে আছেন! ওহ, থ্যাঙ্ক গড! এতো দেরি করছেন দেখে ভাবলাম আপনি ডুবে গেছেন। কেঁদে ফেললো রোয়েন। আর একটু থাকলেই ঠিক ঠিক মরে যেতেন।

    খাদ থেকে প্রথমে নিকোলাসকে তোলা হলো, তারপর রোয়েনকে।

    *

    নিকোলাসের নির্দেশে গ্যানট্রি খুটে ঝোঁপের ভেতর লুকিয়ে রাখা হলো, হেলিকপ্টার থেকে জ্যাক হেলম্ যাতে দেখতে না পায়। কাঁটাঝোঁপের ছায়ায় শুয়ে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিল নিকোলাস, প্রতিটি মুহূর্ত ওর সেবায় ব্যস্ত থাকলো রোয়েন। মাথার ব্যথাটা কোনমতে কমছে না, নিঃশ্বাস ফেলার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করছে ও। এক সময় ওকে ধরে দাঁড় করালো রোয়েন। ক্যাম্পে ফেরার সময়। আড়ষ্ট একজন বুড়োর মতো লাগলো নিকোলাসকে, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যথা। ক্যাম্পে ফিরে ওকে ওর কুঁড়েতে শুইয়ে দিল রোয়েন, মশারি টাঙাল, আগুনের মতো গরম এক মগ চায়ের সঙ্গে দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট খাওয়াল।

    আরো এক মগ চা চাইলো নিকোলাস। সেটা খালি হতে রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, এখন একটু ভালো লাগছে?

    বোধহয় বাঁচব, বলে হাসলো নিকোলাস।

    মুখের রঙ ফিরে এসেছে, বলল রোয়েন, চোখে-মুখে তৃপ্তির ছাপ। যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন না!

    আপনার মনোযোগ কাড়ার আর কোনো উপায় ছিল? এখন যখন জানেন যে বাঁচবেন, বলে ফেলুন কী ঘটেছিল?

    সিঙ্কহোলটার বর্ণনা দিল নিকোলাস। ও থামতে রোয়েন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর বলল, সারফেস থেকে পঞ্চাশ ফুট নিচে ফোকর তৈরি করেছে টাইটা? মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। কীভাবে, নিকোলাস?

    চার হাজার বছর আগে ওয়াটারলেভেল আরো হয়তো নিচে ছিল। হয়তো খরায় শুকিয়ে গিয়েছিল নদীর তলা।

    কিন্তু তাহলে মাচা দরকার হবে কেন? তাছাড়া, শুকনো নদী খাদের অন্য যে . কোনো জায়গার মতোই, তাই না? না, দুর্গম বলেই এ স্পটটা বেছে নিয়েছিল। টাইটা। অন্তত একটা অন্যতম কারণ।

    আপনার সঙ্গে আমি একমত।

    তাহলে সারফেসের নিচে ফোকরগুলো টাইটা তৈরি করলো কীভাবে? হাসলো রোয়েন। জানি একই প্রশ্ন অযথা রিপিট করছি। ঠিক আছে, এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক। এবার সিঙ্কহোলটার কথা বলুন। সাইজটা কী?

    মাথা নাড়লো নিকোলাস। অন্ধকারে মাপার সুযোগ হয় নি। দুই কি তিন ফুট হবে।

    দু সারি ফোকরের ঠিক মাঝখানে ফাটলটা?

    না, একটু একপাশে। তবে নদীর একেবারে তলায়। চৌকো বলে মনে হয়েছে, তবে তা নাও হতে পারে। জান বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলাম, অতশত খেয়াল করি নি।

    মানুষের তৈরি? বিড়বিড় করলো রোয়েন, দরজার দিকে এগুলো। নোট আর ফটোগ্রাফগুলো নিয়ে আসি।

    ফিরে এসে বিছানার পাশে মেঝেতে সুখাসনে বসলো রোয়েন, কাগজপত্র ছড়িয়ে রাখলো নিজের সামনে। মশারি থেকে মাথা বের করে ওর দিকে তাকালো নিকোলাস।

    শিলালিপির বসন্ত পর্বের বাকি অংশটুকু ডিসাইফার করেছি আমি। নোটবুকটা খুলে নিজের হাতের লেখাটুকু দেখালো রোয়েন। এগুলো প্রাথমিক নোট, এখানে সেখানে কিছু প্রশ্ন চিহ্ন আছে। কোথাও অনুবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি নি, কোথাও হয়তো টাইটা নতুন সংকেত ব্যবহার করেছে। এগুলো নিয়ে পরে মাথা ঘামাব। সবুজ কালিতে লেখা এগুলো উদ্ধৃতি, মৃতের পুস্তক থেকে নেওয়া। খানিকটা পড়ি। বিশ্বকে আঁকা হয়েছে বৃত্তাকারে, সূর্য দেবতার চাকতি, আমন রা। মানুষের জীবন একটা বৃত্ত, শুরু জরায়ুতে, শেষ সমাধিতে। রথের চাকার বেড় তার নিচে হত্যা করে একটা সরীসৃপকে।

    হলুদ কালিতে এ যে, লেখাগুলো দেখছেন, এগুলো মৃতের পুস্তক বা অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে বলে মনে হয় নি আমার। এগুলো টাইটারই লেখা বলে আমার ধারণা। বিশেষ করে এ প্যারাগ্রাফটার উপর আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি। পড়ছি-দেবীর কন্যা গর্ভবতী হলো। সে গর্ভবতী হলো এমন একজনের দ্বারা যার কোনো শুক্র নেই। সে তার যমজ বোনকেও নিজের ভেতর ধারণ করছে। তার নিজের জরায়ুতে চিরকালের জন্য কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে ণটা। তার যমজ কোনোদিনই জন্ম নেবে না। আর আলো কোনোদিনই তার দেখা হবে না। চিরকাল অন্ধকাররেই কাটাতে হবে তাকে। বোনের জরায়ুতে বোন, তার বর তাকে চিরকালীন বৈবাহিক সূত্রে বাঁধতে চাইলো। জন্ম না হওয়া যমজ বোন হলো দেবতার কনে, যিনি কিনা একজন মানুষ। ওদের নিয়তি পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ওরা অনন্তকাল বাঁচবে। ওদের বিনাশ নেই।

    নোট বুক থেকে মুখ তুললো রোয়েন। আমরা আগেই একমত হয়েছি, দেবীর কন্যা মানে হলো ডানডেরা নদী। গড বা দেবতা এক সময় মানুষ ছিলেন, তার মানে পরে তিনি ফারাও হন। দেবতা হিসেবে বরণ করে একমাত্র মামোসকেই মিশরের সিংহাসনে তোলা হয়। তার আগে তিনি একজন মানুষ ছিলেন।

    মাথা ঝাঁকালো নিকোলাস। শুক্ৰহীন ব্যক্তি টাইটা নিজেই, বোঝা যায়। সে যে খোঁজা পুরুষ, এ-কথা বারবার বলেছে। তবে রহস্যময় যমজ বোন সম্পর্কে কী ভাবছেন আপনি?

    নদীর যমজ স্বভাবতই একটা শাখা হবে, কিংবা স্রোতের আরেকটা ধারা, তাই না?

    আপনি বলতে চাইছেন সিঙ্কহোল ডানডেরার যমজ বোন। খাদের তলায় ওটা কোনোদিনই রা-র আলো দেখবে না। টাইটা, যার শুক্র নেই, পিতৃত্ব দাবি করছে, তার মানে বলতে চাইছে সে-ই আসলে আর্কিটেক্ট।

    ঠিক তাই। আর নদীর যমজ বোনের সঙ্গে ফারাও মামোসের বিয়ে দিয়েছে, যে বিয়ে অনন্তকাল স্থায়ী হবে। সব মিলিয়ে দেখার পর আমি উপসংহারে পৌঁছেছি, ওই সিঙ্কহোলের ভেতরটা দেখার সুযোগ না পেলে ফারাও মামোসের সমাধির লোকেশন কোনোদিনই আমারা খুঁজে পাব না।

    কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব বলে আপনার ধারণা?

    কাঁধ ঝাঁকালো রোয়েন। আমি ইঞ্জিনিয়ার নই, নিকোলাস। কীভাবে কী করবেন, আপনার উপর ছেড়ে দিলাম। আমি শুধু জানি, টাইটা ওই সিঙ্কহোলে কাজ করেছে। সে পারলে, চার হাজার বছর পর আজ আপনারও পারা উচিত।

    কিন্তু টাইটার সঙ্গে কি আমার তুলনা চলে? টাইটা ছিল একটা প্রতিভা। আমি পণ্ডিত, এ-কথা বারবার বলছে সে। আর আমি? আমি তো সামান্য একজন….

    আপনি যা-ই হোন, আমি জানি আমাকে আপনি হতাশ করবেন না! মুচকি হেসে বলল রোয়েন।

    *

    বোরিস আর টিসে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাবার পর গোপনীয়তা বজায়। রাখার আর কোনো প্রয়োজন থাকলো না, এখন আর রোয়েনের কুঁড়েতে চুপিচুপি ঢুকে ফিসফিস করে কথা বলতে হয় না নিকোলাসকে। যে কুঁড়েতে বসে খাওয়াদাওয়া সারত ওরা সেটাকে বানানো হলো ওদের নতুন হেডকোয়ার্টার। ক্যাম্প স্টাফকে দিয়ে বড় একটা টেবিল তৈরি করালো নিকোলাস, তাতে জড়ো করা হলো স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফসহ অন্যান্য জিনিসপত্র, ইতোমধ্যে ওরা যা সংগ্রহ করতে পেরেছে। কিচেন থেকে নিয়মিত চা যোগান দিয়ে গেল শেফ, কাগজপত্রের উপর হুমড়ি খেয়ে ঘন্টর পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিল ওরা।

    একটা ব্যাপারে একমত হলো দুজনেই, সিঙ্কহোলটা মানুষের অর্থাৎ টাইটার তৈরি কিনা বুঝতে হলে উপযুক্ত ইকুইপমেন্ট নিয়ে আবার নামতে হবে ওখানে। তার মানে স্কুবা দরকার হবে। রোয়েন জানালো, ডুরেঈদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে লোহিত সাগরে অ্যাকুয়াল্যাঙ ব্যবহার করেছে সে, তবে তাকে এক্সপার্ট বলা যাবে না।

    শুধু ইকুইপমেন্টই নয়, এক্সপার্টদের সাহায্যও দরকার হবে। অপারেশনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করার জন্য এ সব নিয়ে ওদেরকে এলাকায় আবার ফিরে আসতে হবে যথাসম্ভব দ্রুত, বর্ষা মরশুম শুরু হয়ে যাবার আগেই।

    ঠিক হলো সিঙ্ক-হোলটা সম্পর্কে আরো খানিক পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার পর রওনা হবে ওরা, ফিরে এসে যাতে সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করা যায়।

    সিঙ্ক-হোল প্রসঙ্গে নিজের ধারণার কথা বলল নারা, যা ঢোকে তা বেরিয়েও আসে, যেমন উপরে কিছু উঠলে সেটা নেমে আসতেও বাধ্য। ফাটলটার ভেতর এতো জোনে পানি ঢুকছে, নিশ্চয়ই কোথাও দিয়ে বের হচ্ছেও সেই পানি, তাই না?

    বলে যান।

    একটা ব্যাপার পরিষ্কার। নদীর তলা থেকে ওই সিঙ্কহোলে ঢাকা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। পানির প্রেশার ওখানে ভয়ঙ্কর। তবে আমরা যদি আউটলেটটা খুঁজে পাই, সেদিক থেকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে দেখতে পারি।

    একটা সম্ভাবনা বটে। চেহারা দেখে মনে হলো নিকোলাসের বক্তব্য প্রভাবিত করেছে রোয়েনকে। একটা স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ টেনে নিল ও। মঠটা চিহ্নিত করে ফটোগ্রাফের উপর একটা বৃত্ত এঁকেছে নিকোলাস। গহ্বরের ভেতর নদীর কোর্সও চিহ্নিত করেছে, যদিও খাদটা এতো সরু আর ঘন ঝোপে এমনভাবে ঢাকা যে ছোট স্কেলের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায় না, হাই-পাওয়ারড ম্যাগনিফাইং লেন্স ব্যবহার করা সত্ত্বেও। এই পয়েন্টে নদীটা গহ্বরে ঢুকছে, আঙুল দিয়ে দেখালো রোয়েন। আর এটা হলো সাইড ভ্যালি, যেটা বেয়ে ট্রেইল ঘুরপথে এগিয়েছে। ঠিক আছে?

    তা আছে, বলল নিকোলাস, কিন্তু আপনি আসলে বলতে চাইছেন কী?

    এখানে আসার পথে আমরা মন্তব্য করেছিলাম এ উপত্যকা সম্ভবত এক সময় ডানডেরা নদীর আদি কোর্স ছিল, পরে নদীটা গহ্বরের ভেতর আলাদা একটা তলা তৈরি করে নেয়।

    হ্যাঁ, মনে আছে।

    এ পয়েন্টের জমিন নীলদের দিকে খুব বেশি ঢালু, তাই না? এবার বলুন, আপনার কী মনে আছে, শুকনো উপত্যকা বেয়ে নামার সময় আরেকটা ছোট প্রবাহ দেখেছিলাম আমরা? মনে হয়েছিল প্রবাহটা উপত্যকার পূর্বদিকের কোথাও থেকে বেরিয়েছে?

    কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি, বলল নিকোলাস। আপনার ধারণা সিঙ্ক হোল দিয়ে ঢুকে ওই পথে বেরিয়েছে স্রোতটা। দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস। সরেজমিনে তদন্ত করে দেখতে অসুবিধে কী?

    ক্যামেরা ব্যাগ আর হালকা ডে-প্যাক নেওয়ার জন্য নিজের কুঁড়েতে চলে গেল নিকোলাস, ফিরে এসে দেখলো রোয়েন যাবার জন্য তৈরি হয়েছে, তবে ইতোমধ্যে ওর একজন সঙ্গী জুটেছে।

    পথে ওদের সামনে থাকলো তামের, এগুচ্ছে নাচতে নাচতে, সরু কাঠির মতো পায়ের চারপাশে আলখেল্লার জুল ফুলে ফুলে উঠছে। নৃত্যের সঙ্গে গীতও গাইছে। ছেলেটা। অ্যামহারিক ভাষায় তার তেমন দখল নেই, তবে যিশু আর সেইন্টদের নিয়ে যত গান আছে তার প্রায় সবই মুখস্থ। কয়েক মিনিট পরপর পেছন ফিরে তাকাচ্ছে সে, দেখে নিচ্ছে রোয়েন ঠিকমতো আসছে কিনা। আগুনের মতো গরম রোদের ভেতর উপত্যকার ঢাল বেয়ে ওঠা অত্যন্ত ক্লান্তিকর, ওরা দু জন ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠলো। কিন্তু তামেরকে যেনো পরিশ্রম বা রোদ স্পর্শই করছে না, আগের মতোই হাসি-খুশি আর অক্লান্ত লাগছে তাকে।

    ঝরনার বা প্রবাহটা উপত্যকার যেখানে বেরিয়েছে সেখানে পৌঁছে কয়েকটা অ্যাকেইশা গাছের ছায়ার বসে পড়লো ওরা। বিশ্রাম নেয়ার সময় চোখে বাইনোকুলার তুলে উপত্যকার পাশটা পরীক্ষা করছে নিকোলাস। ঘন ঝোপে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, খানিক পর মন্তব্য করলো। দুঃখিত, পায়ে হেঁটেই উৎসের সন্ধান করতে হবে।

    আবার হাঁটা শুরু হলো। উপত্যকার পাশ বেয়ে উঠে যাচ্ছে, মাথার উপর সূর্য। জলপ্রবাহের কিনারা ধরে হাঁটছে ওরা। কয়েক জায়গায় জমা হয়েছে ঝরনার পানি, সেখান থেকে খুদে জলপ্রপাত লাফ দিয়েছে নিচের দিকে। ঘন ঝোঁপ, শিকড় যেখানে পানির নাগাল রয়েছে সেখানে ওগুলো তাজা আর গাঢ় সবুজ। পানির উপর কালো আর হলুদ প্রজাপতি মেঘের মতো উড়ছে। সবুজ শ্যাওলা মোড়া পাথরে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে সাদা-কালো একটা খঞ্জনা। ঢালের অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে ছোট একটা জলাশয়ের পাশে বিশ্রাম নিতে বসলো ওরা। বিরক্ত করছে দেখে হ্যাট দিয়ে একটা ফড়িংকে বাড়ি মারল নিকোলাস, ছিটকে সেটা ঝরনার পানিতে পড়লো। দুর্বল ভঙ্গিতে পা ছুঁড়ছে ওটা, স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে নিচের দিকে, এ সময় পানির ভেতর থেকে গাঢ় একটা ছায়া মাথাচাড়া দিল। আলোড়ন উঠলো পানিতে, আয়নার মতো রূপালি পেট ঝিক করে উঠলো, অদৃশ্য হয়ে গেল ফড়িংটা।

    মাছ! কম করেও দশ পাউন্ড! ইস, রডটা আনি নি!

    ঝরনার পাশে নিকোলাসের কাছাকাছি বসে আছে তামের। হঠাৎ একটা হাত তুলে লম্বা করলো সে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রজাপতি উড়ে এসে বসলো তার আঙুলে। হলুদ আর কালো ভেলভেটের মতো ডানা বারবার মেলছে আর গুটাচ্ছে। নিকোলাস আর রোয়েন তাকিয়ে আছে অবাক চোখে, কারণ ওদের মনে হলো তামের ডাক দেয়াতেই তার আঙুলে এসে বসেছে ওটা। খিকখিক করে হেসে উঠে হাতটা আমার দিকে সরিয়ে আনল তামের। দেখাদেখি রোয়েনও ওর হাত তুলে লম্বা করলো। এবং কি আশ্চর্য, প্রজাপতিটা উড়ে চলে এলো ওর আঙুলে।

    খিলখিল করে হেসে উঠলো রোয়েন। ধন্যবাদ, তামের, এতো সুন্দর একটা উপহার দেয়ার জন্য, হাসি থামতে বলল ও। হালকা একটু ফুঁ দিয়ে প্রজাপতিটাকে উড়িয়ে দিল, নিকোলাসের দিকে ফিরে ইংরেজিতে বলল, বুনো পশু-পাখিদের সঙ্গে ওর খুব ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করেছেন? ব্যাপারটা অদ্ভুত না?

    সন্ন্যাসী আর পুরোহিতরা বিনা বাধায় ওকে ঘুরে বেড়াতে দেয়, পশু-পাখিরা সম্ভবত জেনে ফেলেছে ওর দ্বারা তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।

    যেনো ওদের কথা বুঝতে পেরেই হেসে উঠে আবার হাতটা লম্বা করলো তামের। এবারও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রজাপতি এসে বসলো তার আঙুলে।

    আরো পঞ্চাশ ফুট উপরে ওঠার পর ঝরনার উৎসটা দখেতে পেল ওরা। লাল স্যান্ডস্টোনের নিচু একটা পাঁচিল দেখা গেল, পাঁচিলের গায়ে একটা গুহামুখ, সেটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ঝরনার পানি। গুহামুখে ঘন ঝোঁপ, ভেতরটা দেখা যায় না। হাঁটু গেড়ে ঝোঁপ সরাল নিকোলাস, নিচু ফাঁকের ভেতর তাকাতে চেষ্টা করলো। তেমন কিছু দেখার নেই। ভেতরটা অন্ধকার, বলল ও। তবে অনেক লম্বা গুহাটা।

    ওটার তুলনায় আপনি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছেন, বলল রোয়েন। আমাকে ঢুকতে দিন।

    ভেতরে কেউটে থাকতে পারে, সাবধান করলো নিকোলাস। প্রচুর ব্যাঙ দেখতে পাচ্ছি।

    জুতো খুলে ঝরনার পানিতে নেমে পড়লো রোয়েন, নিকোলাসের কথা যেনো শুনতে পায় নি। স্রোত ঠেলে এগুতে কষ্ট হচ্ছে ওর, তবে ডুবেছে মাত্র উরুর অর্ধেকটা। গুহাটা নিচু, ভতরে ঢোকার সময় ঝুঁকে শরীরটাকে প্রায় অর্ধেক করে নিতে হলো। ভেতরে ঢোকার পর বলল, সামনের দিকে আরো নিচু হয়ে এসেছে ছাদ।

    বি কেয়ারফুল, ডিয়ার গার্ল। কোনো ঝুঁকি নেবেন না।

    আমি আপনার ডিয়ার নই। আমি গার্লও নই।

    তাহলে ইয়ং লেডি বলি?

    না, কেন! আমার নাম রোয়েন। কিছুক্ষণ আর কোনো কথা হলো না। তারপর গুহার ভেতর থেকে রোয়েন বলল, আর এগুতে পারছি না। সরু হয়ে গুহাটা একটা শ্যাফটে নেমেছে বলে মনে হচ্ছে।

    শ্যাফট?

    মানে প্রায় চৌকো একটা গর্ত আর কী।

    কৃত্রিম? মানুষের তৈরি?

    বলা সম্ভব নয়। তীরবেগে পানি বের হচ্ছে। পাথরে কোনো টুলসের দাগ দেখছি না। খোঁড়াখুঁড়ির কোনো চিহ্নও নেই। প্রচুর শ্যাওলা।

    পানি তোড় না থাকলে ওই শ্যাফট গলে কোনো মানুষ ঢুকতে পারবে?

    বামুন হলে পারবে।

    কিংবা কোনো বাচ্চা ছেলে?

    হ্যাঁ, বাচ্চা ছেলে হলে পারবে। কিন্তু ওখানে কে একটা বাচ্চাকে নামাবে?

    টাইটার যুগে শিশুশ্রম ব্যবহার করা হতো, বলল নিকোলাস। টাইটাও হয়তো ব্যবহার করেছে।

    গুহা থেকে টানেলটা পরীক্ষা করার কোনো উপায় নেই? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস।

    অসম্ভব, জোর দিয়ে বলল রোয়েন। পানির বেগ ওখানে প্রবল। শ্যাফটের ভেতর হাত গলাতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার শক্তিতে কুলোয় নি।

    ব্যাগ হাতড়ে কালো একটা অ্যানাডাইজড ইন্সটুমেন্ট বের করলো নিকোলাস। অ্যানারয়েড ব্যারোমিটার। প্রত্যেক নেভিগেটরের কাছে একটা থাকা উচিত। কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে রিডিং নোট করলো ও।

    খুলে বলুন।

    আমি জানতে চাই সিঙ্কহোলের মুখ যে লেভেলে রয়েছে, এ ঝরনার তার চেয়ে নিচে কিনা। তা যদি না হয়, সম্ভাবনার তালিকা থেকে এটাকে আমরা বাদ দিতে পারি।

    এখন তাহলে আমরা সিঙ্ক-হোলের লেভেল মাপতে যাব, টাইটার হ্রদে?

    হ্যাঁ।

    *

    ওরা কোথায় যাচ্ছে জানার পর নতুন একটা পথ দেখালো তামের, ঝরনার উৎস থেকে টাইটার হ্রদের উপর পাহাড়-প্রাচীরের মাথায় পৌঁছতে দু ঘণ্টার বেশি লাগলো না। বিশ্রাম নেওয়ার সময় রোয়েন মন্তব্য করলো, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় তো, গেম ট্রেইলের সবগুলো ওর চেনা। গাইড হিসেবে দারুণ।

    বোরিসের চেয়ে ভালো, বলল নিকোলাস। ব্যারোমিটার বের করে আরেকটা রিডিং নিল ও।

    চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব খুশি।

    খুশি হওয়ার সঙ্গত কারণ আছে, বলল নিকোলাস। নদীর সারফেস থেকে খাদের এ পাঁচিলের মাথা একশো আশি ফুট। সারফেস থেকে সিঙ্ক-হোল আরো পঞ্চাশ ফুট। হিসাবে বলছে, রিজের উল্টোদিকে আপনার ঝরনার উৎস সিঙ্ক হোলের চেয়ে একশো ফুটেরও বেশি নিচে।

    অর্থাৎ?

    অর্থাৎ প্রচুর সম্ভাবনা আছে স্রোতটা এক ও অভিন্ন হবার। ইনফ্লো এখানে, টাইটার হ্রদের তলায়; আর আউটফ্লো গুহার ভেতর।

    কিন্তু কাজটা করলো কীভাবে টাইটা? হতভম্ব দেখালো রোয়েনকে। কীভাবে নামলো হ্রদের তলায়?

    কাঁধ ঝাঁকালো নিকোলাস। এ-সব কাজ করার নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি আছে। পানির তলায় বহুকাল আগে থেকে কাজ করছে মানুষ। পানির নিচে ব্রিজের পিলার তৈরি করে না? কিংবা বাঁধের ভিত? ভেবে দেখুন না, পানির প্রবাহ মাপার জন্য টাইটা নীলনদের লেভেলের নিচে শ্যাফট তৈরি করে নি? সে তার হাইড্রোগ্রাফ-এর বর্ণনা দিয়েছে রিভার গড-এ, মনে পড়ে? প্রতিষ্ঠিত টেকনিক হলো একটা কফার ড্যাম তৈরি করা… হঠাৎ থেকে গেল ও। আরে, একটা ড্যাম! টাইটা, বুড়ো ভাম, নদীতে বাঁধ দেয় নি তো?

    কিন্তু তা কি সম্ভব?

    আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, টাইটার পক্ষে সবই সম্ভব। তার হাতে লোকাল ছিল প্রচুর। আসওয়ানের কাছে নীলনদে সে যদি হাইড্রোগ্রাফ তৈরি করতে পারে, তার মানে ধরে নিতে হবে হাইড্রোডাইনামিক্স প্রিন্সিপাল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ছিল তার। হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব।

    আমরা প্রমাণ করব কীভাবে?

    ডানডেরা নদীকে বাধা বিশাল একটা কাজ। কিছু না কিছু প্রমাণ আজও রয়ে গেছে, থাকতে বাধ্য।

    সেই বাঁধ টাইটা কোথায় তৈরি করতে পারে? উত্তেজিত হয়ে উঠেছে রোয়েন। আপনি হলে কোনো জায়গাটা বেছে নিতেন?

    একটা জায়গার কথা বলতে পারি আমি, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল নিকোলাস। ট্রেইল যেখানে নদীর কিনারা ছেড়ে ঘুরপথে উপত্যকা ধরে নেমেছে, আর নদীটা যেখানে গহ্বরে পড়েছে। দু জনেই ওরা একযোগে মাথা ঘুরিয়ে উজানের দিকে তাকালো।

    তাহলে আমরা অপেক্ষা করছি কেন? লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো রোয়েন। চলুন দেখে আসি।

    উত্তেজনাটা সংক্রামক, হাসির ফোয়ারা ছেড়ে নাচতে নাচতে কাঁটাঝোঁপের ভেতর দিয়ে ট্রেইল ধরল তামের, তারপর উপত্যকা বেয়ে উঠে এলো ট্রেইল যেখানে নদীর পাশে ফিরে এসেছে। আবার যখন জলপ্রপাতের ওপরে এসে দাঁড়ালো ওরা, সূর্য তখন অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। ডানডেরা এখানে লাফ দিয়ে পড়েছে গহ্বরের মুখে, তারপর সর্বশেষ দৌড় শুরু করেছে নীলনদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। টাইটা যদি এখানে বাঁধ দিয়ে থাকে- খাদের মুখের দিকটায় হাত তুললাম নিকোলাস,–সাইড ভ্যালির দিকে নদীর দিক বদল সম্ভব।

    আমারও মনে হচ্ছে সম্ভব। হেসে উঠলো রোয়েন। কিছু না বুঝে ওদের সঙ্গে তামেরও হাসছে।

    হাত তুলে চোখে ছায়া ফেললো নিকোলাস, মুখ তুলে জলপ্রপাতের দু দিকে ব্লাফ দুটো দিকে তাকালো। ব্লাফ দুটো লাইমস্টোনের তোরণ বা গেট তৈরি করেছে, মাঝখানে গর্জন করছে নদী ঠোঁট থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ার সময়। ওদিকটায় উঠতে চাই আমি, এলাকার লেআউট বুঝতে হবে। আপনি উঠবেন?

    বাধা দিতে দেখতে পারেন, চ্যালেঞ্জ করলো রোয়েন, ওঠার সময় সে-ই পথ দেখালো। কঠিন চড়াই, কোথাও কোথাও হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে হলো। অনেক জায়গায় আলগা বা ঝুরঝুরে হয়ে আছে লাইমস্টোন, বিপদ ঘটার সমূহ আশঙ্কা। তোরণটার পুব শাখার চূড়ায় উঠতে ঘেমে গোসল হয়ে গেল ওরা। তবে এতো কষ্টের পুরস্কারও জুটল। নিচের দুর্গম এলাকা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছে ওদের সামনে।

    সরাসরি উত্তরে লম্বা সরু শৈলশিরা ও মালভূমি খাড়া পাচিলের মতো মাথাচাড়া দিয়ে আছে, যেনো সছিদ্র দুর্গ-প্রাকার, অসংখ্য ভাঁজ আর খাজ বিশিষ্ট। আরো দূরে ও উপর দিকে অস্পষ্ট পাহাড়শ্রেণী, পর্বতমালার চূড়া, কাছাকাছি উজ্জ্বল নীল আফ্রিকান আকাশের গায়ে স্নান নীল পাখির পালকের মতো।

    প্রকৃতির বিধ্বস্ত রূপ, নিজের চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করলো রোয়েন। টাইটা এ জায়গা কেন বেছে নিয়েছিল, বোঝা যায়। অনুপ্রবেশ এখানে প্রায় অসম্ভব।

    ছবিটা এখন পরিষ্কার, বলল নিকোলাস, হাত লম্বা করে নিচের উপত্যকাটা দেখালো। উপত্যকার বিভক্তিরেখা স্পষ্ট। জমিনের স্বাভাবিক পতনও দেখতে পাচ্ছি। ওদিকে, খাদের ওপার থেকে আমাদের নিচের পয়েন্ট পর্যন্ত সবচেয়ে সরু। সরু গলা বলতে পারি, নদী সংকুচিত হয়ে ওটা দিয়ে বেরিয়েছে-বাঁধ তৈরির জন্য আদর্শ সাইট। শরীরটা মুচড়ে বাম দিকটা দেখালো রোয়েনকে। নদীর পানি উপত্যকায় ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন কাজ ছিল না। গহ্বরের ভেতর নদী শুকিয়ে যাবার পরও সে ওখানে কী করেছে আমরা জানি না। তারপর বাঁধের দেয়াল ভেঙে ফেলে সে, সেটা আরো সহজ কাজ ছিল। ভেঙে ফেলার পর নদী আবার তার স্বাভাবিক কোর্স ফিরে পায়।

    ওদের দু জনের মুখভাব গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করছে তামের, যে যখন কথা বলে তখন তার দিকে তাকায়। কিছুই বুঝছে না, তবু রোয়েনের প্রতিটি হাবভাব ও আচরণ তার উপর বিরাট প্রভাব ফেলছে। রোয়েন মাথা ঝাঁকালে সে-ও আঁকায়। রোয়েন ভুরু কোঁচকালে সে-ও তাই করে। আর রোয়েন যখন হাসে, খিকখিক করে সে-ও হেসে ওঠে।

    নদীটা ছোট নয়, বলল রোয়েন।

    নিশ্চয়ই মাটি দিয়ে বাঁধটা বানায় নি?

    মাথা নাড়ল নিকোলাস। মাটি দিয়ে এ নদীকে বশ মানানো সম্ভব নয়। রক স্ল্যাব বা পাথরের ফলক দিয়ে সম্ভব। পরে বাঁধটা ভেঙে ফেললেও কিছু কিছু আলামত থাকার কথা।

    তাহলে খোঁজ শুরু করতে হয়, বলল রোয়েন। প্রথমে খাদের সরু গলায়। তারপর ভাটির দিকে এগিয়ে যাব।

    ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলো ওরা। রোয়েনের জন্য সহজ পথ অনুসরণ করছে তামের। রোয়েনের হাতছানি দিচ্ছে সে। উপত্যকার গলায় বেরিয়ে এলো ওরা, দাঁড়ালো নদীর পাথুরে পাড়ে, নিজেদের চারদিকে চোখ বুলাচ্ছে।

    বাঁধের পাঁচিল কত উঁচু ছিল? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।

    খুব বেশি উঁচু হওয়ার কথা না। পাঁচিলের পাশ ধরে খানিকটা ওপরে উঠলো নিকোলাস, ওখানে উবু হয়ে বসে সামনে-পেছনে মাথা ঘোরাল, প্রথমে দেখে নিল উপত্যকার নিচের দিকের দৈর্ঘ্য,. তারপর দেখলো গহ্বরের মুখে পতনশীল জলপ্রপাতের ঠোঁট। তিনবার স্থান বদল করলো নিকোলাস, প্রতিবার ঢালের আরেকটু উপর উঠে গেল। যত উঠলো ততই খাড়া হচ্ছে ঢাল। শেষে দেখা গেল ঢালের গায়ে অনেক কষ্টে ঝুলে আছে ও, তবে চেহারা দেখে মনে হলো সন্তুষ্ট। ওখান থেকেই চিৎকার করলো রোয়েনের উদ্দেশে, আমার ধারণা এ পর্যন্ত উঁচু ছিল বাঁধটা। ধরুন, পনেরো ফুট।

    রোয়েন এখনো নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, ওখান থেকে এবার উল্টোদিকের পাড়ে তাকালো, পাড় থেকে খাড়া উঠে যাওয়া হলে একশো ফুট, গলা চড়িয়ে বলল।

    কঠিন কাজ, তবে অসম্ভব নয়, বলল নিকোলাস।

    কাজের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছেন? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। বাধের পাঁচিল পাহাড়ের গায়ে ঠেকাতে হয়েছিল টাইটাকে।

    একই লেভেলে থেকে জায়গা বদল করলো নিকোলাস। এক সময় সরাসরি জলপ্রপাতের উপর চলে এলো, তারপর আর সামনে এগোবার উপায় দেখছে না। নিচে, রোয়েন আর তামেরের পাশে নেমে এসে বলল, প্রায় চার হাজার বছর আগের ঘটনা। কোনো চিহ্ন না থাকাই স্বাভাবিক। রক ব্লক বা পাথরের ফলক পাওয়া যায় কিনা দেখতে হবে। বাঁধ ভেঙে ফেলার পর তীব্র স্রোতে ভেসে গেলেও কত দূর আর যাবে।

    উপত্যকা বেয়ে নামতে শুরু করলো ওরা। খানিক দূর নামার পর একটা পাথরের খণ্ড দেখতে পেল রোয়েন, আশপাশের অন্যান্য পাথরের সঙ্গে যেনো বেমানান। পুরানো আমলের কেবিন ট্রাংকের মতো আকার। শ্যাওলা আর লতাপাতায় অর্ধেকটাই ঢাকা, তবে বেরিয়ে থাকা অংশে ডান দিকে মোচড় খাওয়া একটা কোণ স্পষ্ট। নিকোলাসকে ডেকে দেখালো ও।

    স্ল্যাবটার গায়ে হাত বুলালো নিকোলাস। সম্ভব। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাটালির দাগ পেতে হবে, রাজমিস্ত্রী যেখানে ফাটল ধরাবার চেষ্টা করেছিল। আপনি জানেন, প্রথমে পাথরের গায়ে বাটালি দিয়ে গর্ত করা হতো, তারপর গজাল ঢুকিয়ে চাপ দেওয়া হতো, যতক্ষণ না ফেটে যায়।

    আরো আধ কিলোমিটার পর্যন্ত উপত্যকার মেঝে সার্চ করলো ওরা। বন্যায় সময়ও এতো দূরে কোনো ব্লক ভেসে আসবে না, বলল নিকোলাস। চলুন, দেখি জলপ্রপাত হয়ে গহ্বরের মুখে কিছু পড়েছে কিনা।

    ডানডেরার পাড়ে ফিরে এলো ওরা, ঢাল বেয়ে নামলো জলপ্রপাত পর্যন্ত। উঁকি দিয়ে তাকালো নিকোলাস।

    ভাটির চেয়ে এদিকটায় গভীরতা কম, বলল নিকোলাস। আমার ধারণা একশো ফুটও হবে না।

    ভাবছেন আপনি ওখানে নামতে পারবেন? রোয়েনের চোখে সন্দেহ। নিচ থেকে বিস্ফোরিত হয়ে উঠে আসছে বাষ্পকণা ঘন মেঘের মতো, চোখ-মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। পানির বিরতিহীন পতন বজ্রপাতের মতো আওয়াজ করছে, কথা বলার সময় চিৎকার করছে ওরা।

    রশি, টেনে তোলার লোক থাকলে ভেবে দেখা যেত। কিনারায় শক্ত হয়ে বসলো নিকোলাস, চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে নিচের গামলার দিকে তাকালো। আলগা পাথরের ছোটবড় অনেক প রয়েছে ওখানে-ছোট আকৃতির গোল পাথর, কয়েকটা বেশ বড়। কিছু পাথর কোণ বিশিষ্ট, কল্পনার সাহায্য নিলে কিছু পাথরকে চৌকো বলেও মনে হবে। তবে ওগুলোর সারফেস পানির তোড়ে মসৃণ হয়ে আছে, ভেজা ও চকচকে। বেশিরভাগই আংশিক জলমগ্ন, সচল জলকণায় ঢাকা।

    ওগুলো সে পেল কোত্থেকে? হঠাৎ জানতে চাইলো রোয়েন।

    কে কি পেল? নিকোলাস বিস্মিত।

    আপনি বুঝতে পারছেন না? ভুল দিক থেকে শুরু করেছি। আমরা জানার চেষ্টা করছি ব্লকগুলোর কি গতি হয়েছে। তার বদলে আমাদের খোঁজ করা উচিত নয়, ব্লকগুলো টাইটা পেল কোত্থেকে?

    তাই তো! শেষটা জানার চেষ্টা করছি আমরা, শুরুটা নয়। বাঁধের ভাঙা পাঁচিল নয়, আমাদের খোঁজা উচিত পাথরের খনি।

    কোত্থেকে শুরু করা যায়? রোয়েনের ব্যাকুল প্রশ্ন।

    রোয়েনের প্রশ্ন বুঝতে পারুক বা না পারুক, খিক খিক করে হেসে উঠলো তামের। দু জনেই ওরা একযোগে তার দিক তাকালো। তারপর হাতছানি দিয়ে তামেরকে ডাকলো রোয়েন। পাশে বসিয়ে আরবিতে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বলল তাকে। শোনার পর চোখ বড় বড় করলো তামের, তারপর উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো, জেসাস স্টোন! জেসাস স্টোন! আসুন আমার সঙ্গে, আপনাদের দেখাই! দাঁড়ালো রোয়েন, তামের তাকে টেনে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উপত্যকার ঢাল বেয়ে।

    তামের ছুটছে, তার সঙ্গে রোয়েনকেও ছুটতে হচ্ছে। আনন্দে অ্যামহারিক গীত গাইছে ছেলেটা। ওদের পিছু নিয়ে আস্তে ধীরে হাঁটছে নিকোলাস। উপত্যকার আধ মাইল নিচে মিলিত হলো ওদের সঙ্গে।

    এখানে নিকোলাস তামেরকে দেখলে হাঁচু গেড়ে বসে পাথুরে পাঁচিলে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে। প্রার্থনা করছে সে, চোখ দুটো বন্ধ। তার পাশে রোয়েনও বসে আছে।

    খানিক পর লাফ দিয়ে সোজা হলো তামের, ধুলোর উড়িয়ে নাচল কিছুক্ষণ।

    প্রার্থনা শেষ, এবার আমরা জেসাস স্টোনের কাছে যেতে পারি। রোয়েনের হাত ধরল আবার, পাথরে পাঁচিল ঘেঁষে এগুলো। নিকোলাসের সামনে থেকে ওরা দু জন যেনো চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল, যাকে বলে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো নিকোলাস।

    রোয়েন! ডাকলো ও।কোথায় আপনি? কী ব্যাপার?

    এদিকে, নিকোলাস! এদিকে আসুন!

    সাবধানে পা ফেলে পাথরের পাঁচিলের সামনে চলে এলো নিকোলাস। ওহ, গড! এ তো আমি এক বছর চেষ্টা করলেও খুঁজে পেতাম না!

    পাহাড়-প্রাচীরের গা ভাঁজ খোঁজে, ভেতর দিকে ঢুকে গেছে, তৈরি করেছে গোপন একটা প্রবেশপথ। খাড়া দুই পাশ বেয়ে ওপরে উঠে গেল নিকোলাসের দৃষ্টি, ফাঁকটায় ঢুকে পড়েছে। ত্রিশ কদম পার হতে খোলা একটা অ্যামফিথিয়েটারে ঢুকলো, কম করেও একশো গজ লম্বা হবে, আকাশের দিকটা উন্মুক্ত। দেয়ালগুলো নিরেট পাথর, এক পলক তাকিয়েই নিকোলাস বুঝতে পারলো উপত্যকার মেঝেতে রোয়েনের পাওয়া পাথরটার মতো স্ফটিকতুল্য শিলা বা অভ্র এগুলো।

    লক্ষণ দেখে বোঝা গেল গামলা থেকে পাথর কেটে ফাঁকা করা হয়েছে জায়গাটা, সারি সারি স্তর কাটার দাগ পাচিলের মাথা পর্যন্ত লম্বা। কাটার পর সব ব্লক সরানো হয়নি, অ্যাম্পিথিয়েটারের মেঝেতে স্থপ করা রয়েছে। আবিষ্কারটা হতভম্ব করে তুলেছে নিকোলাসকে, নড়তে বা কথা বলতে পারছে না। একেবারে নিখুঁত চারকোনা পাথরও পড়ে আছে মেঝেতে, প্রয়োজন না পড়ায় বের করা হয় নি। রোয়েনকে নিয়ে সেটার সামনে দাঁড়িয়েছে তামের।

    রোয়েনের হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে তামের। জেসাস স্টোন। জেসাস আমাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসেন। প্রথম যেদিন এলাম, দেখি এ পাথরে উপর দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। লম্বা সাদা দাড়ি ছিল, চোখ দুটো মায়া ভরা, দয়ালু, কিন্তু বিষণ্ণ। গান শুরু করে বুকে ক্রস চিহ্ন আঁকল সে, গানের তালে তালে দুলছে।

    এগিয়ে এসে নিকোলাস দেখলো পাথরটার উপর শুকনো ফুল, মাটির পাত্র, তেজ ফ্লাস্ক ইত্যাদি পড়ে রয়েছে। তার মানে নিয়মিতই এখানে আসে তামের, জেসাস স্টোন তার ব্যক্তিগত বেদি, যিশুকে খুশি করার জন্য নৈবেদ্য দিয়ে যায়।

    প্রাচীন বেদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করছে রোয়েন, দেখা দেখি তামেরও। প্রার্থনা শেষ হতে নিকোলাসের পাশে চলে এলো রোয়েন, দু জন ঘুরেফিরে দেখছে পাথরখনির মেঝেটা। এতো নিচু গলায় কথা বলছে ওরা, জায়গাটা যেনো পবিত্র কোনো ধর্মীয় স্থান।

    ঘুরেফিরে দেখার পর পাথরখনির প্রবেশমুখে থামলো ওরা, ইতোমধ্যে সূর্য ডুবে গেছে, দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। একটা সাইজ করা চৌকো পাথরের উপর বসলো ওরা, তামের বসলো ওদের পায়ের কাছে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে; মুখ তুলে রোয়েনের দিকে তাকিয়ে আছে।

    নিকি তামেরের দিকে তাকালো। তামের, তোমার উপর আমরা খুব খুশি।

    তুমি খুব ভালো ছেলে।

    ওর প্রশংসা পরে করলেও চলবে, বলল রোয়েন। চলুন, ফিরে যাই।

    ফেরাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, বলল নিকোলাস। আজ চাঁদ উঠবে না, অন্ধকারে পা ভাঙব।

    এখানে ঘুমানোর প্ল্যান করছেন? রোয়েন অবাক।

    অসুবিধে কি? বললেই আগুন জালতে পারি। সঙ্গে সারভাইভাল রেশন আছে। আর আপনার সঙ্গে তো প্রহরী আছেই, কাজেই আপনার সম্ভ্রম হুমকির সম্মুখীন হবে। না।

    সত্যিই তো, অসুবিধে কী!

    আগুন জ্বালার জন্য শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করতে যাবে নিকোলাস, হঠাৎ স্থির হয়ে কান পাতলো। শব্দটা রোয়েনও শুনতে পাচ্ছে। আবার সেই পেগাসাস হেলিকপ্টার, বলল নিকোলাস। এই অসময়ে কি খুঁজছে ওরা?

    মাথার উপর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো ওরা, এক হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে গেল কপ্টারটা, লাল আর সবুজ নেভিগেশন্যাল আলো মিটমিট করতে দেখা গেল। মঠের দিকে যাচ্ছে ওটা।

    *

    প্রস্তরখনির মুখের কাছে একটা আগুন প্রস্তুত করলো নিকোলাস। সবার মধ্যে খাবার বিলি-বণ্টন করে দিল। দারুণ তৃপ্তি নিয়ে খেলো রোয়েন।

    প্ৰস্তুরখনির দেয়ালে আগুনের কারণে ওদের ভূতুড়ে ছায়া পড়েছে। আচমকা একটা নাইটজার ডেকে উঠতে ভয় পেয়ে নিকোলাসের একটু কাছে এসে বসলো রোয়েন।

    কী জানি, টাইটা হয়তো এখন আমাদের নিয়ে তামাশা করছে, সে বলে, মনে হয়, এতোক্ষণে তার তো ভয় পাওয়ার কথা। প্রথম অংশের ধাঁধারা সমাধান আমরা করেই ফেলেছি।

    পরের ধাপটাই যে কঠিন। ওই হ্রদের নিচে নেমে দেখতে হবে। কি মনে হয়, কি পাবো ওকানে? নিকোলাস জানতে চায়।

    কী জানি, অস্বস্তিভরে বলল রোয়েন। কিছু অনুমান করতে ভয় হয়।

    আমি মোটেও ভয় পাই না। ঠিক আছে, আপনার হয়ে আমি বলে দেই? রোয়েন হেসে সায় দিতে ও বলে চলে, ওখানে আমরা ফারাও মামোস-এর সমাধির প্রবেশ পথ খুঁজে পাবো। একদম আসল সমাধি! গোজামিল নয়!

    কিন্তু অতো নিচে নামবেন কেমন করে? অ্যাকুয়ালাঙ তো নেই।

    এখনো জানি না, নিকি স্বীকার যায়। তবে হয়তো পুরোদস্তুর ডুবুরির পোশাকে নামতে হবে।

    নিস্তদ্ধতা জেঁকে বসে। অবশেষ নীরবতা ভেঙে একহাত দিয়ে রোয়েনের কাঁধে জড়িয়ে ধরে নিকি। চিয়ার আপ। একটা ব্যাপার পরিষ্কার–যদি আমরা না পাই, তবে আর কেউ মামোসের সমাধি খুঁজে পাবে না।

    যদি সত্যিই হ্রদের নিচে সমাধির প্রবেশপথ থেকে থাকে, তবে সপ্তম ফ্রোলের অনেক কথাই ভুয়া। মানে যে তথ্য আমরা টাইটা, ডুরেঈদ এবং সবশেষে উইলবার স্মিথের মাধ্যমে পেয়েছি।

    আরো কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎই উল্লসিত হয়ে উঠে রোয়েন।

    ওহ নিকি! কী অসাধারণ একটা খেলায় আমরা নেমেছি। কিন্তু সত্যি পিরবো তো? সত্যি কোনো উপায় কি আছে?

    দেখা যাক।

    কখন দেখা যাবে?

    সময় হলে। এখনো জানি না, তবে প্রচুর প্ল্যানিং আর পরিশ্রম পড়বে কাজটা শেষ করতে হলে।

    তো, আপনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এ ব্যাপারে? রোয়েন জানতে চায়।

    মুচকি হাসে নিকোলাস। সত্যি বলছি–জীবনেও ভাবি নি টাইটা এ পর্যন্ত নিয়ে আসবে আমাদের। আবার এমনও ভাবছি না, স্রেফ দরজা ভেঙে লুট করে আনবো মামোসের সম্পদ। হাওয়ার্ড কার্টার কতো কষ্ট করে তুতেনখামেনের সমাধি পেয়েছেন, জানেন না? তবে, সত্যি, রোমাঞ্চ পেয়ে বসেছে আমাকে। আমি এর শেষ দেখবো!

    একসময় নিকোলাসের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো রোয়েন। ও ঘুমিয়েছে, নিশ্চিত হওয়ার পরই একটা চুমো খেলো নিকোলাস, ফর্সা কপালটায়।

    আপনমনেই হাসলো একটু মেয়েটা।

    *

    ঘুমটা কোনো ভাঙল বুঝতে পারেনি নিকোলাস। কোথায় রয়েছে মনে পরল, দেখলো পাথরখনির ভেতর ওর কাছাকাছি শুকনো ঘাসের উপর শুয়ে রয়েছে রোয়েন। আকাশে চাঁদ নেই, তবে তারাগুলো যেনো মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে, একেকটা পাকা আঙুরের মতো বড়। আগুনটা নিভে এসেছে, ওধারে শুয়ে নাক ডাকছে তামের। ব্লাডার খালি করার জন্য উঠতে হলো নিকোলাসকে।

    আগুনটাকে পাশ কাটিয়ে ফিরে আসছে, যে শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে সেটা আবার ভেসে এলো দূর থেকে অস্পষ্ট, পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে আসছে, ফলে বোঝা যায় না উৎসটা ঠিক কোনো দিকে। এ আওয়াজ আগেও অনেকবার শুনেছে ও। অটোমেটিক গানফায়ারের শব্দ, সম্ভবত একে-ফরটিসেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে বের হচ্ছে। বিরতিহীন নয়, প্রতিবার তিন রাউন্ড করে। প্রফেশনালের কাজ।

    ভোরের দিকে রোয়েনের ঘুম ভাঙালো নিকোলাস। অবশিষ্ট রেশন থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে গোলাগুলির কথাটা জানালো ওকে। বোরিস হতে পারে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।সে হয়তো মেক নিমুর আর টিসেকে ধরে ফেলেছে।

    মনে হয় না। বোরিস কয়েকদিন আগে রওনা হয়েছে, তার গুলির আওয়াজ এতো দূর পৌঁছবে না।

    তাহলে?

    কী জানি। আমার ভালো ঠেকছে না রোয়েন। কেয়ারিটা আরেকবার দেখে ক্যাম্পে ফিরে যাই চলুন।

    আলো জোরালো হতে পাথরখনির কয়েকটা ছবি তুললাম নিকোলাস। কয়েকটা ব্লকের ছবি তোলার সময় ওগুলোর পাশে পোজ নিল রোয়েন, মেরিলিন মনরোর ভঙ্গিতে একটা হাত মাথার পেছনে রেখে।

    উপত্যকার ঢাল বেয়ে ফেরার পথে সন্তুষ্ট দেখালো ওদেরকে, প্রাচীন পাথরখনি আবিষ্কার ওদের অভিযানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর কীভাবে কী করা হবে, সে আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়লো ওরা। গহবরের নিচের অংশ ফ্যাকাসে লাল পাহাড় প্রাচীনের কাছে যখন পৌঁছল, বেলা তখন প্রায় এগারোটা। মঠ থেকে ট্রেইল ধরে উঠে আসা একদল সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা হলো ওখানে।

    রোয়েনের নির্দেশে ব্যাপার কি জানার জন্য সন্ন্যাসীদের দিকে ছুটলো তামের। তামেরকে দেখে কেঁদে ফেললো সন্ন্যাসীরা, চিৎকার করে দুঃখজনক কোনো ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। একটু পরই ছুটে ফিরে এলো তামের।

    আপনাদের ক্যাম্পে লোকজন নেই। একদল শয়তান এসেছিল। চাকরবাকরদের অনেকেই নেই–খুন হয়ে গেছে।

    খপ করে রোয়েনের কব্জি চেপে দরল নিকোলাস। আসুন! ছুটলো ও, দেখি কি হয়েছে!

    *

    শেষ এক মাইল ছুটে ক্যাম্পে পৌঁছল ওরা, কিচেন শেডের সামনে কিছু একটাকে ঘিরে আরো একদল সন্ন্যাসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল। ভিড় ঠেলে সামনে চলে এলো নিকোলাস, পেটে শূন্য একটা অনুভূতি, আতংকে মুখের ঘাম ঠাণ্ডা লাগছে। ঝাঁকে ঝাঁকে ভন ভন করছে নীল মাছি, মাঝখানে পড়ে আছে রক্তে ভাসমান কুক সহ আরো তিনজন ক্যাম্প সার্ভেন্টের লাশ। প্রথমে তাদের হাতগুলো পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে, হাঁটু গাড়তে বাধ্য করা হয়েছে মাটিতে, তারপর খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে মাথার পেছনে।

    রোয়েনকে এগিয়ে আসতে দেখে বাধা দিল নিকোলাস, তাকাবেন না!

    ওর কথায় কান না দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো রোয়েন।ওহ, গড! দু হাতে মুখ ঢাকল।

    এগিয়ে এসে লাশগুলো দেখলো নিকোলাস। কিফ, সালিন আর আলিকে দেখছি না। কোথায় ওরা? আলি, কোথায় তুমি?

    ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো আলি। এখানে, ইফেন্দি! গলাটা কেঁপে গেল তার, মুখ ঝুলে পড়েছে। তার শার্টের সামনে শুকনো রক্ত দেখা গেল।

    কি হয়েছে বলো! আলিকে ধরে সোজা করলো নিকোলাস।

    ওরা ছিল শুফতা, ডাকাত, খুনী! ওরা ছিল হায়েনা, শিয়াল সাপ! রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আসে, এসেই গুলি ছোঁড়ে কুঁড়ে লক্ষ্য করে। কতজন ছিল বলতে পারব না, কেন এভাবে খুন করলো তাও বলতে পারব না! ফোঁপাতে লাগলো আলি।

    খানিক পর জানা গেল রোয়েনের ঘর তছনছ করা হয়েছে। ক্যানভাস ফোল্ডারের প্রচুর ফটোগ্রাফ আর কাগজপত্র ছিল, খালি করে নিয়ে গেছে সব। ওদের হেডকোয়ার্টারও তছনছ করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফ আর ম্যাপ, পাথর ফলকের রাবিং, পোলারয়েড-কিছুই নেই।

    নিজের কুঁড়ে থেকে ছুটে রোয়েনের কুঁড়েতে চলে এলো নিকোলাস। একই অবস্থা আমার ঘরেরও। সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে গেছে, রাইফেলটাও। পাসপোর্ট আর ট্রাভেলার্স চেক ডে-প্যাকে ছিল বলে রক্ষা পেয়েছে!

    নিঃশব্দে কাঁদছে রোয়েন। আমাদের গবেষণার সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে গেছে ওরা, এমনকি পোলারয়েডগুলোও বাদ দেয়নি। ওহ, নিকোলাস, মিশরে আমাদের মরুভূমির বাসাতে যা ঘটেছিল, এখানে আবার ঠিক তাই ঘটলো। ওদের হাত থেকে এখানেও আমরা নিরাপদ নই। কাল রাতে আমরা ক্যাম্পে থাকলে কি ঘটত? ছুটে এসে নিকোলাসের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওই রোদের মধ্যে আমরাও মরে পড়ে থাকতাম!

    ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতদের সঙ্গে কথা হয়েছে নিকোলাসের। ওঁদের ধারণা, আক্রমণটা ওকে আর রোয়েনকে খুন করার জন্যই করা হয়। বলছেন, এখান থেকে এখুনি ওদের চলে যাওয়া উচিত, কারণ আবার হামলা হতে পারে।

    কিফ, সালিন আর আলিকে রওনা হবার প্রস্তুতি নিতে বলেছে নিকোলাস। ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা কথা দিয়েছেন, যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি কর্তৃপক্ষকে ঘটনার কথা জানাবেন তাঁরা।

    একঘণ্টার মধ্যে রওনা হবার জন্য তৈরি হয়ে গেল ওরা। সমস্ত ক্যাম্পিং ইকুইপমেন্ট আর বোরিসের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র প্রধান পুরোহিত জালি হোরার দায়িত্বে রেখে যাওয়া হচ্ছে। খচ্চরগুলোর পিঠে হালকা বোঝা চাপানো হলো।

    প্রধান পুরোহিত এসকর্ট হিসেবে একদল সন্ন্যাসীকে পাঠালেন, ওদেরকে পাহাড় চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। স্কিনিং শেডে ডোরাকাটা ডিক-ডিকের ছাল আর খুলিটা পেল নিকোলাস, গুটিয়ে একটা বাণ্ডিল রবানাল, স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকে দিল একটা খচ্চরের বোঝার উপর।

    এসকর্ট পার্টির সঙ্গে তামেরও রয়েছে। সারাক্ষণ রোয়েনের কাছাকাছি থাকলো সে। ট্রেইল ধরে রওনা হলো ওরা, প্রথম এক মাইল ওদের সঙ্গে আসছেন সন্ন্যাসীদের বড় একটা মিছিল।

    দুপুর পার হয়ে গেল টাইটার ড্যাম সাইটে পৌঁছতে। নদীর পানিতে মাথা ধোয়ার কয়েক মিনিট এখানে থামলো ওরা। জলপ্রপাতের উপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলো, দু জনের মনই বিষণ্ণ ও কাতর হয়ে আছে।

    কবে নাগাদ আবার ফিরব আমরা? ফিসফিস করে জানতে চাইলো রোয়েন।

    বর্ষা শুরু হতে আর দেরি নেই, বলল নিকোলাস। হায়েনারাও গন্ধ পেয়ে কাছে চলে আসছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, রোয়েন।

    গহ্বরের ভেতর তাকিয়ে বিড়বিড় করলো রোয়েন, এখনো তুমি জেতেনি, টাইটা। খেলায় আবার আমরা ফিরে আসব।

    সন্ধে হয়ে এলেও নদীর পাশে স্থায়ী ক্যাম্পসাইটে থামলো না ওরা, অন্ধকারে পথ চলা অসম্ভব না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাইল এগুলো। তাঁবু ফেলে আরাম করার কথা ভাবল না কেই, সন্ন্যাসীদের দেওয়া রুটি আর ছাগলের দুধ খেয়ে পাথুরে জমিনের উপর বেডরোল খুলে শোয়ে পড়লো। ক্লান্ত শরীর, সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এসে গেল।

    *

    পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে খচ্চরের পিঠে মালপত্র তোলা হলো, কড়া কফি খেয়ে ট্রেইল ধরলো ওরা। সদ্য ওঠা সূর্য ঢালের খাড়া পাঁচিল আলোকিত করে তোলায় এতো কাছে মনে হলো যেনো ছোঁয়া যাবে। রোয়েনের পাশে চলে এসে নিকোলাস বলল, এভাবে হাঁটলে আশা করা যায় বিকেলের দিকে ঢালের গোড়ায় পৌঁছে যাব। জলপ্রপাতের পেছনের গুহায় রাত কাটানো সম্ভব হতে পারে।

    তারমানে কাল কোনো এক সময় ট্রাকের কাছে পৌঁছব, বলল রোয়েন। নিকোলাস, অনেকক্ষণ ধরে একটা কথা ভাবছি আমি। ধরুন, আমাদের পোলারয়েড আর রাবিংগুলো পেগাসাসের কারো হাতে পড়েছে, যে ওগুলোর অর্থ করতে পারবে। আমরা কতদূর এগিয়েছি এটা বোঝার পর তার প্রতিক্রিয়া কি হবে?

    ও-সব কথা পরে ভাবা যাবে, রোয়েন, জবাব দিল নিকোলাস। সঙ্গে রিগবি রাইফেলটা পর্যন্ত নেই, কাজেই খুব অসহায় বোধ করছি। আগে প্রাণে বাঁচি, তারপর অন্য কিছু।

    কিফ, খচ্চরচালক, আর সন্ন্যাসীরাও তাই ভাবছে, কারণ দেখা গেল তাদের হাঁটার গতি মুহূর্তের জন্যও মন্থর হচ্ছে না। দুপুরের দিকে অল্প সময়ের জন্য থামার নির্দেশ দিল নিকোলাস, নিজেরা কফি খাবে, খচ্চরগুলোকে পানি খাওয়াবে। কিফ আগুন জ্বালছে। বাইনোকুলার নিয়ে পাথুরে ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো নিকোলাস। খুব বেশি দূর ওঠেনি, ঘাড় ফেরাতে দেখতে পেল পিছু নিয়ে উঠে

    আসছে রোয়েনও। কাছে এসে বলল, দেখতে এলাম কী করছেন আপনি।

    সামান্য রেকি। সামনে স্কাউট রাখা দরকার ছিল, এভাবে অন্ধের মতো ট্রেইল ধরে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। যত দূর মনে পড়ে, ঠিক সামনেই পড়বে অত্যন্ত কঠিন পথ। খোদা জানে কিসের মধ্যে গিয়ে পড়ব।

    আরো ওপরে উঠলো ওরা, তবে চূড়ায় ওঠা সম্ভব হলো না বিশাল এক পাহাড় প্রাচীর পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকায়। বাধাটার ঠিক নিচে ভালো একটা জায়গা বেছে নিয়ে উপত্যকার দুটো ঢালই বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে পরীক্ষা করলো নিকোলাস। এ এলাকার কথা মনে আছে ওর। খাড়া ঢাল ওয়াল-এর গোড়ায় পৌঁছতে যাচ্ছে ওরা, জমিন এ দিকে অসম্ভব এবড়োখেবড়ো আর রুক্ষ-কঠিন, খোলা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, অনুভবে ডাঙার অস্তিত্ব টের পেয়ে তীরে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার আগে সাজ সাজ রব তুলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা। ট্রেইল খুব কাছ থেকে অনুসরণ করেছে নদীটাকে। নদীর পাড় বলতে সরু আল, তার উপর ঝুলে আছে পাহাড়-প্রাচীন-রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-বরফ নির্যাতনের স্টীমরোলার চালিয়ে অদ্ভুত, ভীতিকর আকৃতি দিয়েছে, ডিজনির কার্টুনে দেখা দুষ্ট ডাইনীর সচ্ছিদ্র দুর্গ যেন। এক জায়গায় ট্রেইলের উপর জ্বলে আছে লাল স্যান্ডস্টোনের বিশাল এক পাথুরে অবলম্বন, বাধ্য হয়ে ওঠাকে ঘুরে এগুতে হয়েছে নদীকে, ওখানে ট্রেইল এত সরু হয়ে গেছে যে বোঝা সহ একটা খচ্চর যেতে চাইলে পাড় থেকে নদীতে পড়ে যাবার ভয় আছে।

    চোখে লেন্স লাগিয়ে উপত্যকার তলাটা সাবধানে দেখে নিল নিকোলাস। বেমানান সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পেল না, কাজেই মাথা তুলে নিজেদের উপর দিকে পাহাড়-প্রাচীরে দৃষ্টি বুলাল।

    এ সময় নিচের উপত্যকা থেকে আলির চিৎকার ভেসে এলো। জলদি, ইফেন্দি! খচ্চরগুলো রওনা হবার জন্য রেডি হয়েছে।

    তাহ ঝাঁকিয়ে তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলল নিকোলাস, তারপর আবার বাইনোকুলার তুলে সামনের জমিনের উপর দৃষ্টি বুলালো। ঝিক করে চোখে লাগলো উজ্জ্বল একটা আলো। ভুরু কুঁচকে পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে সমস্ত মনোযোগ এক করলো নিকোলাস।

    কী ব্যাপার? দূত জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। কী দেখলেন?

    নিশ্চিত নই। বোধহয় কিছু না, চোখ থেকে বাইনোকুলার না নামিয়ে জবাব দিল নিকোলাস। পালিশ করা কোনো ধাতব বস্তুর সারফেসে, অন্য একজোড়া

    বাইনোকুলারের লেন্সে, কিংবা একটা রাইফেলের ব্যারেলে রোদ লেগে থাকতে পারে।

    জলদি, স্যার! খচ্চরচালকরা অপেক্ষা করতে রাজি নয়! আবার আলির চিৎকার ভেসে এলো।

    দাঁড়ালো নিকোলাস।

    কিছু না, চলুন। রোয়েনের হাত ধরে নামতে সাহায্য করছে নিকোলাস। হঠাৎ ঢালের উপর দিক থেকে ভেসে পাথর নড়াচড়ার আওয়াজ। রোয়েনকে ছেড়ে দিয়ে ঠোঁটে আঙুল রাখলো ও। অপেক্ষা করছে ওরা, স্কাইলাইনের উপর চোখ।

    অকস্মাৎ বাঁকা একজোড়া শিং মাথাচাড়া দিল চূড়ার কিনারায়, ওগুলোর নিচে বুড়ো এক পুরুষ হরিণের মাথা। আড়ষ্ট হয়ে আছে কান দুটো, নিঃশ্বাস ফেলছে ঘন ঘন। পাহাড়-প্রচীরের কিনারায় থামলো ওটা, ঠিক ওরা যেখানে গুঁড়ি মেরে বসে আছে তার সরাসরি ওপরে, যদিও ওদেরকে দেখতে পায়নি এখনো। হরিণটা ঘাড় ফেরালো, ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকের চোখটা রোদ লাগায় ঝিক করে উঠলো। দাঁড়ানোর সতর্ক ভঙ্গি, আড়ষ্ট কান আর পেছন ফিরে তাকানোই বলে দেয় কোনো কারণে ভয় পেয়েছে।

    তারপর হঠাৎ যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেল হরিণটার শরীরে। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল রিজের পেছনে, দূরে মিলিয়ে গেল ছুটে পালানোর শব্দ।

    কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে ওটা, ঢালের নিচে তাকিয়ে বলল নিকোলাস। খচ্চর আর সন্ন্যাসীদের কাফেলা এরই মধ্যে রওনা হয়ে গেছে, নদীর উঁচু পাড়ের ট্রেইল ধরে এগুচ্ছে।

    আমাদের এখন তাহলে কী করা উচিত? জানতে চাইলো রোয়েন।

    সামনের পথ রেকি করা দরকার, কিন্তু সেজন্য যে সময় দরকার তা নেই।

    কাফেলা দ্রুত এগুচ্ছে, এখুনি ঢাল বেয়ে নিচে না নামলে পেছনে পড়ে থাকবে ওরা। বিপদের নিরেট কোনো প্রমাণ এখনো পায়নি নিকোলাস, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাও চলে না। আসুন! রোয়েনের হাত ধরলো ও, ছুটে নেমে আসছে ঢাল বেয়ে।

    কাফেলার পেছনে চলে এলো ওরা, নিকোলাস এখনো ওদের মাথার উপর স্কাইলাইন গভীর মনোযোগের সঙ্গে পরীক্ষা করছে। পাহাড়-প্রাচীর কাত হয়ে ঝুলে আছে ওদের উপর, ঢেকে ফেলেছে অর্ধেক আকাশ। ওদের বাম দিকে নদী নিজের শব্দ দিয়ে অন্য সব শব্দ মুছে ফেলছে।

    পাহাড়-প্রাচীরের মাথা থেকে একটা পাতা ঝরে পড়তে দেখছে নিকোলাস। গরম বাতাসে শুকনো পাতাটা ডিগবাজি খেতে খেতে নেমে আসছে। এতো ছোট, কোনো বিপদসংকেত হতে পারে না, তবু অলস কৌতূহলবশত ওটার পতন লক্ষ্য করছে ও। বাদামী পাতাটা অবশেষে ওর মুখ স্পর্শ করলো। হাত তুলে ধরলো নিকোলাস, দু আঙুলের মাঝখানে নিয়ে ঘষা দিল, জানে গুঁড়িয়ে যাবে।

    কিন্তু মসৃণ আর নরম লাগলো জিনিসটা। হাত খুলল নিকোলাস, ভালো করে দেখলো। পাতা নয়, ভেঁড়া এক টুকরো গ্রিজড পেপার। মাথার ভেতর সতর্ক সংকেত বেজে উঠলো। সেমটেক্স আর প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের যুগে সামরিক কাজে ব্লাস্টিং জেলিগনাইট আজকাল খুব কমই ব্যবহার করা হয়, তবে মাইনিং ইন্ড্রাস্ট্রি আর মিনারেল এক্সপ্লোরেশনে এখনো জিনিসটার চাহিদা ব্যাপক। সাধারণত নাইট্রোজেলাটিন স্টিক বাদামি রঙের গ্রিজড পেপারে মোড়া থাকে, স্টিকের মাথায় ডিটোনেটর সেট করার আগে এক্সপ্লোসিভ এক্সপোজ করার সময় কাগুঁজে মোড়কটার একটা প্রান্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়।

    নিকোলাসের মাথার ভেতর ঝড় বইছে। ওরা এপথে আসবে এটা জানার পর কেউ যদি পাহাড়-প্রাচীরে জেলিগনাইট বসিয়ে থাকে, তাহলে আলোর যে প্রতিফলন দেখা গেছে সেটা বিস্ফোরকগুলোর মাঝখানে পড়ে থাকা কপার ওয়ায়্যারিং-এর কয়েল থেকে সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে অপারেটর লোকটা এ মুহূর্তে পেছনের পাহাড়ে কোথাও শুয়ে আছে। বুড়ো হরিণ সম্ভবত তাকে লুকিয়ে তাকতে দেখে ভয় পেয়েছিল।

    কিফ! নিকোলাসের গলার শিরা ফুলে উঠলো। থামাও ওদের। ফিরিয়ে আনো! কাফেলার মাথায় পৌঁছনোর জন্য ছুটলো ও, এ বলছে এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওদের পেছনে পাহাড়ে সত্যি যদি কেউ থাকে, নিকোলাসের প্রতিটি নড়াচড়া পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। কাফেলার মাথায় পৌঁছে খচ্চরগুলোকে সরু ট্রেইলে ঘোরানো, তারপর নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনা, সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ছোটার গতি কমিয়ে আনলো নিকোলাস, তবে এখনো চিৎকার করে ফিরে আসতে বলছে ওদেরকে, সেই সঙ্গে হাতছানি দিয়ে ডাকছে রোয়েনকে।

    ছুটে আসছে রোয়েন, ধৈর্য হারিয়ে নিকোলাসও খানিকটা পিছিয়ে এলো। কী ব্যাপার, নিকোলাস? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলো রোয়েন।

    ট্রাক থেকে সরে যেতে হবে। পরে ব্যাখ্যা করব।

    রোয়েনের হাত ধরে ফেলে আসা পথ ধরে ছুটলো নিকোলাস, আবার আলির নাম ধরে ডাকলো।

    পঞ্চাশ গজও কভার করতে পারে নি, পাহাড়-প্রাচীনের মুখ বিস্ফোরিত হলো। বাতাসের তীব্র আলোড়ন ধাক্কা, মারন, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার অবস্থা হলো ওদের। কান ও মাথার ভেতর ব্যথা করে উঠলো। তারপর বিস্ফোরণের মুল শক্তি ঝাঁকি দিয়ে গেল ওদেরকে-একটামাত্র বিস্ফোরণ নয়, একের পর এক অনেকগুলো, যেনো মাথার উপর বিরতিহীন বজ্রপাত হচ্ছে। দিশেহারা হয়ে উঠলো ওরা, পরস্পরের সঙ্গে জড়িতে গেল। রোয়েনকে আঁকড়ে ধরে পেছন দিকে তাকালো নিকোলাস, দেখলো পাহাড়-প্রাচীরের চূড়ায় পর পর কয়েকটা বিস্ফোরণ ঘটলো। লম্বা, নৃত্যরত পাথর আর ধূলোর ঝরনার একের পর এক উথলে উঠছে।

    আতংকে দিশেহারা, তবু জেলিগনাইট সাজানোর দক্ষতা লক্ষ্য করে নিকোলাসের মনে সমীহ জাগলো। এ একজন মাস্টার বম্বারের কাজ। পাথরখণ্ডের ধস এক সময় থামলো, এখন শুধু স্বচ্ছ নীল আকাশের গায়ে মিহি ধুলো দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো ধ্বংসযজ্ঞের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তারপরই পাহাড়-প্রাচীরের কাঠামো বদলে যেতে শুরু করলো।

    প্রথমে ধীরে ধীরে পাথরের পাঁচিল বাইরের দিকে কাত হলো। পাহাড়ের গায়ে বিশাল ফাটল সৃষ্টি হতে দেখলো নিকোলাস, যেনো রাক্ষসের প্রকাণ্ড মুখ শুলে যাচ্ছে। পাথরের বিরাট পাত ধসে পড়ছে, স্লো মোশনে নেমে আসছে ওদের উপর। ভেঙে পড়ার আওয়াজ শোনে মনে হলো একই সঙ্গে হুংকার ছাড়ছে আর গোঙাচ্ছে শত শত টন পাথর, গোটা পাহাড়-প্রাচীর অনেক নিচের নদীতে পড়ে যাচ্ছে।

    দৃশ্যটা সম্মোহিত করে ফেলেছে নিকোলাসকে, মনে হলো বিস্ফোরণের ফলে ব্রেন অবশ হয়ে গেছে। চিন্তা শক্তি ফিরে পেতে কিংবা তৎপর হতে সময় লাগলো, নিজের উপর জোর খাটাতে হলো। ও দেখলো, বেশিরভাগ বিস্ফোরণ ঘটেছে ট্রেইলের সামনের দিকে, কাফেলার মাথার কাছে। ওদিকে তামের ছিল, আলির পাশে। এক্সপ্লোসিড ট্র্যাপের ভেতরে ওরা দু জনও ঢুকবে, এ আশায় পাহাড় প্রাচীরের মাথায় অপেক্ষা করছিল বহুবার। কিন্তু রোয়েনকে নিয়ে নিকোলাস যখন উল্টোদিকে ছুটতে শুরু করলো, বিস্ফোরণ ঘটাতে বাধ্য হয়েছে সে।

    অসহায় দাঁড়িয়ে থেকে পতনশীল পাথরের বিশাল স্রোতটাকে নেমে আসতে দেখছে নিকোলাস ওর সামনে ট্রেইলের উপর, গ্রাস করছে লোকজন আর খচ্চরগুলোকে, কিনারা থেকে বিরতিহীন জলপ্রপাতের মতো লাফ দিয়ে পড়ছে নদীর তলায় পাথর ধসের কান ফাটানো গর্জনের ভেতর থেকেও লোকজনের আর্তনাদ ভেসে আসছে।

    ধ্বংসযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ, এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ব্যাখ্যা করার সময় নেই, যে কোনো মুহূর্তে টন টন পাথরের নিচে ওরাও চাপা পড়ে যাবে। ঝট করে রোয়েনকে দু হাতে ধরে বুকে তুলে নিল নিকোলাস, লাফ দিয়ে পাড় টপকে নদীর দিকে পড়লো। পাড়ের ঢালে দু জন একসঙ্গে পড়লো ওরা, বারবার গড়িয়ে নেমে এলো ত্রিশ ফুট। এখানে বড় একটা পাথর পড়ে আছে, আকারে একটা বাড়ির মতো হবে। ওই পাথরে লেগে স্থির হলো শরীর দুটো।

    ধীরে ধীরে সোজা হলো নিকোলাস, রোয়েনের হাত ধরে দাঁড় করালো, তারপর ওকে নিয়ে লে এলো পাথরটার উল্টোদিকে। এদিকে, জমিন ঘেঁষে, ভেতর দিকে একটা ভাঁজ খেয়েছে পাথর, সেই ভাঁজের ভেতর ঢুকে পড়লো ওরা।

    যতোটা সম্ভব পিছিয়ে এসে পাথুরে খোলের ভেতর শুয়ে থাকলো দু জন। ধ্বংসযজ্ঞ আরো বিস্তৃত হয়েছে, এতোক্ষণে ওদের উপর নামতে শুরু করলো ধসটা। বিশার রাবার বলের মতো লাফ দিতে দিতে প্রকাণ্ড টুকরোগুলো ছুটে আসছে, প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে গতি, তারপর ওদের শেলটারের সামনের দিকটায় লেগে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। গড়িসে এসে একটা করে টুকরো ভাঙে, অমনি প্রচণ্ড আঁকি খেয়ে কাঁপতে শুরু করে ওদের শেলটার। ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত পাথরের ছোট টুকরোগুলো মিসাইলে পরিণত হলো, বাতাসে শিস খেটে নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীতে বড় বড় ঢেউ জাগলো, আছড়ে পড়ে ভাঙার সময় দুই তীরে ফেনা জমে উঠলো।

    ওদের শেলটারের উপর ইতোমধ্যে কয়েকশো টন পাথর ধসে পড়েছে, তবে এ সবে মাত্র শুরু। এক সময় মনে হলো পাহাড়ের অর্ধেকটাই নেমে আসছে ওদের উপর। ধুলো এখন ঘন মেঘের মতো, দু হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খকখক করে কাশছে দুজনেই। বিশাল বাড়ির মতো শেলটার পাথর ধসে চাপা পড়ে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে রোয়েনের উপর ওঠে এলো নিকোলাস, নিজের শরীর দিয়ে ঢেকে ফেললো ওকে। ছোট্ট একটা পাথর টোকা দিল ওর মাথার পাশে, তাতেই চোখে অন্ধকার দেখলো নিকোলাস। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করলো ও, অনুভব করলো কানের পেছন গরম একটা স্রোত, জ্যান্ত প্রাণীর মতো চিবুকে নেমে আসছে ওটা।

    তারপর ধীরে ধীরে মাটি ও পাথর ধস বন্ধ হলো। এখন আর ওদের শেলটার ঘন ঘন আঁকি খাচ্ছে না। মিহি ধুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে। নিস্তেজ হয়ে পড়ছে পাথরের গর্জন।

    সাবধানে চোখের পাতা থেকে ধুলো পরিষ্কার করলো নিকোলাস। ওর নিচে নড়ে উঠলো রোয়েন। হামাগুড়ি দিয়ে সরে এলো নিকোলাস, রোয়েন যাতে বসতে পারে। বসার পর দু জন দু জনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। শাদা ধুলো মুখোশ পরিয়ে রেখেছে ওদেরকে। মাথার চুলকে মনে হচ্ছে উইগ। আপনার মুখে রক্ত, আতংকে কর্কশ শোনালো রোয়েনের গলা।

    খুলির চামড়া সামান্য একটু কেটে গেছে, বলল নিকোলাস। আপনার খবর কী?

    আমার হাঁটু মজকেছে। সিরিয়াস বলে মনে হয় না, অল্প অল্প ব্যথা করছে।

    তাহলে বলতে হবে অদ্ভুত ভাগ্য আমাদের, বলল নিকোলাস। এ ঘটনার কারুরই বাঁচার ছিল না।

    রোয়েন হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরুতে যাচ্ছে দেখে হাত ধরে বাধা দিল নিকোলাস। না! গোটা ঢার আলগা হয়ে আছে। পুরোপুরি স্থির হতে আরো সময় লাগবে। তাছাড়া….

    তাছাড়া কি?

    ওদেরকে জানতে দেওয়া চলবে না আমরা বেঁচে আছি, বলল নিকোলাস।

    জানলেই শেষ করার জন্য ছুটে আসবে।

    নিকোলাসের কথা শেষ হওয়া মাত্র কপ্টার ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে এলো, কাছাকাছি কোথাও থেকে টেক-অপ করছে। রোয়েনকে ধরে আবার শুইয়ে দিল নিকোলাস, নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়লো।

    মাথার উপর এসে চক্কর নিচ্ছে কপ্টারটা। বোধহয় জীবিত কাউকে খুঁজছে, ভাবল নিকোলাস। রোরের আওয়াজ দূরে সয়ে যাচ্ছে, পাথরের ভাঁজ থেকে মাথা বের করে বাইরে উঁকি দিল নিকোলাস। আধ মাইল উজানের দিকে যান্ত্রিক ফড়িংটাকে দেখা গেল, পেগাসাসের জেট রেঞ্জারই বটে। দূরে সরে যাচ্ছে, ফলে উইন্ডস্ক্রীনের ভেতর ককপিটটা পরিষ্কার দেখা গেল না। তবে ঠিক সেই সময় কপ্টারের গতি কমে এলো, দিক বদলে উত্তর দিকে যাচ্ছে এখন, এবার প্যাসেঞ্জারদের দেখার একটা সুযোগ পাওয়া গেল। পাইলটের পাশেই বসে রয়েছে জ্যাক হেলম্, আর কর্নেল নগু বসেছেন ঠিক ওদের পেছনে। সবাই ওরা তাকিয়ে আছে নিচের নদী ও উপত্যকায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিজের আড়ালে হারিয়ে গেল কপ্টারটা।

    আর কোনো সন্দেহ নেই, বলল নিকোলাস। পেগাসাসের মালিক যে-ই হোক, আপনার ডুরেঈদকে খুন করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত খারাপ যা কিছু ঘটেছে তার জন্য সে-ই দায়ী। হেলম্ আর কর্ণেল নগু তার বেতনভুক্ত চাকর মাত্র।

    কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? রোয়েন মানতে পারছে না। কর্নেল ন ইথিওপিয়ান আর্মির একজন অফিসার।

    এটা আফ্রিকা, রোয়েন, সম্ভাব্য সব কিছু বিক্রি হয়, বলল নিকোলাস। শুনুন, এ সব বিষয়ে পরে চিন্তা-ভাবনা করা যাবে। এখন আমাদের প্রথম কাজ এ খাদ থেকে বেরিয়ে সভ্য জগতে ফিরে যাওয়া। হামাগুড়ি দিয়ে পাথরের ভাজ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো ও, ধীরে ধীরে দাঁড়ালো।

    ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গেল নিকোলাসের দৃষ্টি। ওদের ওপরে ট্রেইলটা পাথর ধসে চাপা পড়ে গেছে। ওর পাশে বেরিয়ে এসে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো রোয়েন, গুঙিয়ে উঠে পড়ে যাবার উপক্রম করলো, নিকোলাস ধরে না ফেললে যেতে পড়ে। হাঁটু! শরীরের ভর ভালো অর্থাৎ ডান পায়ে চাপালো রোয়েন, সাহস করে হাসলো।

    ঠিক হয়ে যাবে।

    ট্রেইল ধরে যাওয়া সম্ভব নয়, বলে রোয়েনকে নিয়ে নদীতে নেমে এলো নিকোলাস, নামার সময় আবার পাথর ধস শুরু হয় কিনা ভেবে ভয়ে ভয়ে থাকলো।

    কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে নিকোলাসের খুলির ক্ষতটা ধুয়ে দিল রোয়েন, নিকোলাসের ডে-প্যাক হাতড়ে অ্যান্টিসেপটিক মলমের একটা টিউব বের করলো। মলম লাগাবার পর নিকোলাসের গলা থেকে ব্যানড্যানা খুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।

    প্রথম কাজ তামেরকে খুঁজে বের করা, নিকোলাসকে মনে করিয়ে দিল।

    নদীর পাড় ঘেঁষে পানি কেটে এগুলো ওরা। নদীর তলা আলগা পাথরে ভর্তি, খুব সাবধানে এগুতে হচ্ছে। প্যাকটা পানির উপর তুলে রেখেছে নিকোলাস। আলগা পাথরের ভেতর দিয়ে ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠা অত্যন্ত কঠিন মনে হলো। খানিক দূর ওঠার পরই দু জন সন্ন্যাসীর থেতলানো লাশ দেখতে পেল ওরা, পাথরের নিচে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। একটা খচ্চরের শুধু একটা পা বেরিয়ে আছে বাইরে। পিঠের বোঝা খুলে গেছে, জিনিসপত্র ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। দেখতে পেয়ে ডিক-ডিকের গুটানো ছালটা তুলে নিল নিকোলাস, আটকে রাখলো ওর ব্যাগের সঙ্গে।

    শেষবার যেখানে তামের আর কিফকে দেখা গেছে সেদিকে ওঠছে ওরা। কিন্তু এক ঘণ্টা সার্চ করার পরও দু জনের একজনকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। ওদের উপর ঢালটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে ঝোঁপ আর গাছপালা। হাঁটুর জখম নিয়ে যতটা সম্ভম ওপরে উঠলো রোয়েন, হাত দিয়ে মুখের সামনে চোঙ তৈরি করে ডাকছে, তামের! তামের! তামের! ওর চিৎকার উপত্যকার পাঁচিলে বাড়ি খেয়ে ফিরে আসছে।

    নিকোলাস বলতে চাইলো, ডেকে কোনো লাভ নেই, সে বেঁচে থাকলে তোর কিন্তু বলল না।

    ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে আছে রোয়েনের, তবু হাল ছাড়তে রাজি নয়। তামের! সাড়া দাও! তামের, কোথায় তুমি?

    রোয়েন কেঁদে ফেলবে, এ বয়ে ওর দিকে তাকাচ্ছে না নিকোলাস।

    আর ঠিক তখন আরো ওপরের ঢাল থেকে অস্পষ্ট একটা কাতর শব্দ ভেসে এলো। গুঙিয়ে উঠে ডার আঁচড়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে রোয়েন। বাধা না দিয়ে পিছু নিল নিকোলাস। খানিক দূর ওঠেই কেঁদে ফেললো রোয়েন। প্যাক ফেলে ওর পাশে চলে এলো নিকোলাস। ইতোমধ্যে ঢালের উপর হাঁটুগেড়েছে রোয়েন।

    পাথর ধসের নিচে চাপা পড়েছে তামেরের শরীর। ছেঁড়া-ফাড়া মুখটা প্রায় চেনাই যায় না, চামড়ার অর্ধেকটাই নেই। মাথাটা কোলে তুলে নিল রোয়েন, শার্টের আস্তিন দিয়ে নাকের ফুটো থেকে ধুলো বের করছে, আরো যাতে ভালো ভাবে শ্বাস নিতে পারে। তামেরের মুখের কোণ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। আবার যখন কাতর আওয়াজ করলো, গলগল করে বেরিয়ে এলো। সেটা মুছতে গিয়ে সারা মুখে লেপ্টে দিল রোয়েন।

    তামেরের শরীরের নিচের অংশ পাথরে চাপা পড়েছে। পাথর সরাতে চেষ্টা করলো নিকোলাস, তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করলো কাজটা সম্ভব নয়। বড় একটা খণ্ডের নিচে রয়েছে তামের, আকারে সেটা বিলিয়ার্ড বোর্ডের দ্বিগুণ হবে। কত টন ওজন হবে পাথরটার আন্দাজ করা কঠিন, বিশ থেকে পঁচিশ টরে কম হবে না। সন্দেহ নেই, শিরদাঁড়া আর পেলভিস চুরমার হয়ে গেছে। সাহায্য ছাড়া একজনের পক্ষে এ পাথর সরানোর প্রশ্নই ওঠে না। সম্ভব যদি হতো, পাথরটার নড়াচড়া চিড়ে চ্যাপ্টা শরীরটাকে আরো শুধু কষ্টই দিত।

    অদ্ভুত এক অভিমান নিয়ে নিকোলাসের দিকে তাকালো রোয়েন। কিছু একটা করুন! প্লিজ, কিছু একটা করুন!

    নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখলো নিকোলাস। নিঃশব্দে মাথা নাড়লো ও। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললো বোয়েন, চোখের জল বৃষ্টির ফোঁটার মতো পড়ছে তামেরের কপালে।

    ও এভাবে মারা যাবে আর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো? নিকোলাসের দিকে করুণ চোখে তাকালো রোয়েন। এ সময় চোখ মেলে ওর দিকে তাকালো তামের।

    ছাল ছাড়ানো রক্ত ভেজা মুখ, অথচ হাসছে তামের। কুৎসিত বীভৎস চেহারা ওই হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আম্মি! ফিসফিস করলো সে। আপনি আমার মা। মা ছাড়া এতো আদর কে করে! আম্মি, তোমাকে আমি ভালোবাসি!

    কথাগুলো আড়ষ্ট, শেষ হতেই শরীরে একটা খিচুনি উঠলো। ব্যথায় বিকৃত হয়ে গেল চেহারা, ককিয়ে উঠলো একবার, তারপর স্থির হয়ে গেল। আড়ষ্ট ভাবটুকু দূর হলো কাঁধ থেকে, মাথাটা কাত হয়ে গেল একদিকে।

    কাঁদছে রোয়েন, মাথাটা কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। তারপর ওর কাঁধ ছুঁয়ে নিকোলাস বলল, ও মারা গেছে, রোয়েন।

    মাথা ঝাঁকালো রোয়েন। জানি। শুধু আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য বেঁচে ছিল ও।

    তামেরের মাথাটা রোয়েনের কোল থেকে তুললাম নিকোলাস, সরে এসে ধীরে ধীরে দাঁড়ালো রোয়েন। তামেরের মাথা নামিয়ে রেখে তার হাত দুটো বুকের উপর ভাঁজ করে দিল নিকোলাস। তারপর আলগা পাথর দিয়ে ঢেকে দিল লাশটা।

    এবার আমাদের যেতে হয়, তামের।

    তামেরের কবরে একটা চুমো খেলো রোয়েন। তারপর নিকোলাসের কাঁধে ভর দিয়ে নেমে এলো নদীতে।

    পানি কেটে উজানের দিকে রওনা হলো ওরা। পাথর ধস নদীর অর্ধেকটাই ভরাট করে ফেলেছে, ফলে অবশিষ্ট ফাঁক গলে পানি খুব দ্রুত ছুটে চলেছে। দুর্গত এলাকা, ছাড়িয়ে এসে নদীর পাড়ে উঠলো ওরা, তারপর খাড়া ঢাল বেয়ে, পৌঁছল ট্রেইলে। এখানে সামান্য বিশ্রাম নিল, তাকালো পেছন দিকে। পাথর ধসের নিচে লালচে-খয়েরি দেখাচ্ছে নদীর পানি। মঠের সন্ন্যাসীরা বিস্ফোরণের আওয়াজ যদি না-ও শোনে থাকে, ঘোলা পানি দেখে চিন্তায় পড়ে যাবে, কী ঘটেছে দেখার জন্য এদিকে আসবে। লাশগুলো তুলে নিয়ে যাবে মর্যাদার সঙ্গে কবর দেয়ার জন্য। চিন্তাটা খানিকটা হলেও সান্ত্বনা এনে দিল নিকোলাসের মনে। রোয়েনকে নিয়ে আবার রওনা হলো ও। এ ট্রেইল ধরে দু দিনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে ওদেরকে।

    রোয়েন এখন খুব বেশি খোঁড়াচ্ছে। কিন্তু নিকোলাস সাহায্য করতে গেলে ঝাঁপটা দিয়ে সরিয়ে দিল ওর হাত। কিছু না, শুধু একটু আড়ষ্ট লাগছে। হাঁটুটা পরীক্ষা করতেও দিল না, জেদ করে নিকোলাসের সামনে থাকলো।

    রাতটা ওরা ঢালের নিচে কাটালো। সামনেই খাড়া পাচিল বেয়ে ওঠে গেছে। পথটা। পথ থেকে রোয়েনকে বেশ খানিকটা সরিয়ে আনলো নিকোলাস, থামলো গাছপালায় ঢাকা একটা নালায়। ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর আগুন জ্বাললো, জানে বাইরে থেকে দেখা যাবে না। এবার হাঁটুটা নিকোলাসকে দেখতে দিল রোয়েন। চামড়া ওঠা জায়গাটা ফুলে আছে, ছুঁতে খুব গরমও লাগলো। মাথা নাড়লো নিকোলাস।

    এ পা নিয়ে আপনার হাঁটা ঠিক হচ্ছে না।

    আর কোনো উপায় আছে? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন। জবাব না দিয়ে বোতলের পানি দিয়ে নিজের ব্যানড্যানাটা ভেজাল ও, তারপর শক্ত করে বেঁধে দিল পায়ে। দুটো পেইনকিলার ট্যাবলেট খেতে দিল।

    সারভাইভালো রেশন সামান্যই অবশিষ্ট আছে, আধপেটা খেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। আগুনের ধারে বসে ফিসফাস করছে দু জন। চূড়ায় ওঠার পর কী ঘটবে? জানতে চাইলো রোয়েন। যেখানে রেখে এসেছি সেখানে কী ট্রাকগুলো পাব? পাহারাদাররা আছে, নাকি কেটে পড়েছে? আর যদি পেগাসাসের লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? তাহলে কী হবে?

    আপনার কোনো প্রশ্নের উত্তরই আমার জানা নেই, স্বীকার করলো নিকোলাস।

    আদ্দিস আবাবায় পৌঁছে এ ম্যাসাকারের ঘটনা পুলিশকে আমি জানাব, বলল রোয়েন। আমি চাই জ্যাক হেলম্ আর তার লোকজন উপযুক্ত শান্তি পাক।

    সেটা বোধহয় উচিত হবে না, বলল নিকোলাস। কারণ আবার আমরা ইথিওপিয়ায় ফিরে আসতে চাই। এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশি হৈ-চৈ করলে গোটা উপত্যকায় ট্রপস আর পুলিশ গিজগিজ করবে। টাইটার ধাঁধার সমাধান পাবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মামোসের সমাধির কথাও ভুলে যেতে হবে।

    ও, হ্যাঁ, এদিকটা আমি ভাবিনি।

    তাছাড়া, অভিযোগ করে লাভ হবে কিনা ভেবে দেখুন। কর্নেল নগু, হেলমের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। পেগাসাস যদি একজন আর্মি কর্নেলকে পকেটে ভরতে পারে, পুলিস অফিসারদের পকেটে ভরা তো আরো সহজ। ওদের হাত কতটা লম্বা কে জানে। হয়তো দেখা যাবে আর্মি চীফকে কিনে রেখেছে। কিংবা কেবিনেট মেম্বারদেরও।

    এ-ও আমি ভাবিনি, স্বীকার করলো রোয়েন।

    এখন থেকে ঠিক আফ্রিকানদের মতো করে ভাবতে হবে। টাইটার স্ক্রোল থেকে শেখার কিছু আছে বৈকি। তার মতোই আমাদের হতে হবে চতুর, ধূর্ত। এর ওর নামে অভিযোগ না করে, যদি কোনোমতে এবার বের হয়ে যেতে পারি ইথিওপিয়া থেকে, সবাই ভাববে আমরা পাথর ধ্বসে মারা গেছি। এতে করে গিরিখাদে ফিরে আসা সহজ হবে।

    বেশ কিছুক্ষণ আগুনের শিখার দিকে চেয়ে রইলো রোয়েন। নিশ্চুপ। শেষমেষ বলল, আপনি বলেছিলেন এরচেয়ে ভালো প্রতিশোধও নাকি আছে?

    ওদের নাকের ডগা থেকে ফারাও মামোসের সমস্ত গুপ্তধন সরিয়ে নেব আমরা।

    সেই নিশৃংস, লম্বা দিনে প্রথমবারের মতো হাসলো রোয়েন, এ কথায়। ঠিক। সব জিনিস আমরা নিয়ে গেলে পেগাসাসের মালিকের উচিত সাজা হবে!

    *

    পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর বসতে গিয়ে গুঙিয়ে উঠলো রোয়েন।

    ব্যান্ড্যানা খুলে হাঁটুটা আবার দেখলো নিকোলাস। ফোলাটা আরো বেড়েছে, আকারে প্রায় দ্বিগুণ দেখাচ্ছে হাঁটু। আবার ওটা বাঁধল ও, শেষ দুটো ট্যাবলেট খাইয়ে দিল। নিকোলাসকে ধরে দাঁড়াতে পারলো রোয়েন, খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঢালের নিচে এস দাঁড়ালো। পাহাড়-প্রাচীর বেয়ে উঠে যাওয়া পথটার দিকে দু জনই ওরা তাকিয়ে থাকলো। আসার পথে কী রকম কষ্ট হয়েছে মনে পড়ে যাচ্ছে। চূড়া থেকে নিচে নামতে পুরো একটা দিন লেগেছিল ওদের।

    শুরু হলো ওঠা। প্রতি পদক্ষেপের পর আরো যেনো খাড়া হয়ে ওঠছে পথটা। রোয়েন কোনো আওয়াজ করছে না, তবে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছে চেহারা, দরদর করে ঘামছে। দুপুর হয়ে গেল, এখনো ওরা জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছতে পারে নি। তবু বিশ্রাম নেয়ার জন্য রোয়েনকে থামতে বলল নিকোলাস। খাবার কিছু নেই, বোতল থেকে ঢক ঢক করে শুধু পানি খেলো রোয়েন। নিকোলাসও খেলো, মাত্র এক ঢোক।

    কিন্তু রওনা হবার সময় দাঁড়াতে গিয়ে পারলো না রোয়েন। ওহ! অসহায়ভাবে তাকার নিকোলাসের দিকে। দাঁড়াব কি, পা তো নাড়তেই পারছি না!

    কিছু আসে যায় না, হেসে উঠে বলল নিকোলাস। বাম-ব্যাগ থেকে অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস চাড়া সব বের করে ফেললো ও, তারপর সেটা কোমরে জড়িয়ে নিল। লাফ দিন, ওঠে পড়ন ঘোড়ার পিঠে।

    নিকোলাসের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো রোয়েন। কী বলছেন? তারপর চোখ তুলে ট্রেইলের দিকে তাকালো, খাড়া একটা মইয়ের মতো ওঠে গেছে। মাথা নাড়লো ও। অসম্ভব!

    এ স্টেশন থেকে এটাই একমাত্র ট্রেন ছাড়ছে, বলে রোয়েনের সামনে পেছন ফিরে বসলো নিকোলাস। খানিক ইতস্তত করার পর ক্রল করে ওর পিঠে ওঠে পড়লো রোয়েন।

    কিছু দূর ওঠতেই হাঁপিয়ে গেল নিকোলাস, রসালাপ থেমে গেছে। ঘামে ওর শার্ট ভিজে গেল, সেই ঘাম রোয়েনের শার্ট ভিজিয়ে দিয়ে চামড়ায় পৌঁছে গেল। উষ্ণ ভেজা ভেজা ভাবটুকু অন্য সময় হলে হয়তো অশ্লীল লাগত, এখন লাগলো না। পুরুষ-পুরুষ গন্ধটাও খারাপ লাগছে না ওর, বরং আরাম আর স্বস্তিদায়ক বলে মনে হচ্ছে।

    প্রতি আধ ঘণ্টা পরপর রোয়েনকে নামিয়ে নামিয়ে বিশ্রাম নিল নিকোলাস, চোখ বন্ধ করে পড়ে তাকালো যতোক্ষণ না আবার নিয়মিত হয় শ্বাস-প্রশ্বাস। বিশ্রাম বলতে ওইটুকু, দম ফিরে পাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার পিঠে বোঝ তুলে নিয়ে খাড়া ট্রেইল ধরে ওঠা। এভাবে সারাটা দিন পেরিয়ে গেল। তারপর একটা বাঁক ঘুরতেই ট্রেইলের সামনে ঝুলে থাকতে দেখা গেল জলপ্রপাতটাকে, লেস লাগানো পর্দার মতো। হোঁচট খেতে খেতে বিপুল জলরাশির পেছনে চলে এলো নিকোলাস, গুহার ভেতর ঢুকে রোয়েনকে মেঝেতে নামালো, তাক হয়ে ঢলে পড়লো একপাশে, লাশের মতো স্থির হয়ে গেল।

    আবার যখন চোখ মেললো নিকোলাস ততক্ষণে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে সন্ন্যাসীদের রেখে যাওয়া স্তূপ থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেছে। রোয়েন, ছোট একটা আগুন ধরিয়েছে। নিকোলাস ওঠে বসতে যাচ্ছে দেখে ঝুঁকলো ও, নিকোলাসের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলল, ওহ নিকোলাস, আজ আপনি আমার জন্য যা করলেন, আমি এর প্রতিদান দিব কীভাবে?

    কৌতুক করে কিছু বলতে গিয়েও বলল না নিকোলাস, আসলে শক্তিতে কুলালো না। রোয়েনের আলিঙ্গনের ভেতর চুপচাপ শুয়ে থাকলো, ভয় লাগছে, এ আরামটুকুর মেয়াদ হঠাৎ না শেষ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে নিকোলাসের মাথাটা নামিয়ে দিল রোয়েন, একটু সরে বসলো। গৃহকর্তাকে স্যামন বা শ্যাম্পেন দিয়ে খুশি করতে পারছি না, বলল ও। নির্ভেজাল ও পুষ্টিকর পাহাড়ী জল পেলে চলবে কি?

    শুধু পানি খেয়ে রাত কাটাব? মাথা নাড়লো নিকোলাস। বাম-ব্যাগ থেকে টর্চ বের করলো, গুহার মেঝে থেকে খুঁজে নিল মুঠো আকৃতির একটা পাথর। টর্চের আলো উপর দিকে তাক করতেই অসংখ পায়রার ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ উঠলো। কার্নিসে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে ওগুলো। লক্ষ্যস্থির করে পাথরটা ছুঁড়লো নিকোলাস। এক ঢিলে তিন-চারটে পায়রা জখম হলো, তাড়াতাড়ি ছুরি বের করে সব কয়টাকে জবাই করলো ও। রোয়েনের দিকে তকিয়ে হাসলো। রোস্ট খেতে কেমন লাগবে গৃহকত্রীর?

    পায়রাগুলোকে আগুনে সেদ্ধ করার সময় রোয়েন জিজ্ঞেস করলো, আমাদের চুরি যাওয়া কাগজপত্র যে পেগাসাসের হাতে পড়েছে তাতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই, তাই না?

    নেই, বলল নিকোলাস। জলপ্রপাতের উপর ওদের বেস ক্যাম্পে অ্যান্টেনা দেখেছি, মনে আছে? আমাদের ফটো আর কাগজপত্র টেলিফ্যাক্স করে জ্যাক তার বসের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

    তার মানে পেগাসাসের মালিক ট্যানাস-এর সমাধিতে পাওয়া ফলক সম্পর্কে সবই জানে এখন। আর সপ্তম স্ক্রোল তো আগেই পেয়েছে। লোকটা যদি নিজে ঈজিপ্টোলজিস্ট না-ও হয়, তেমন একজনকে ভাড়া করতে পারে।

    আমার ধারণা লোকটা হায়ারোগ্লিফিক্স নিজেই পড়তে পারে। আমার আরো ধারণা, নোকটা নিশ্চয়ই একজন কালেক্টর হবে। এদের টাইপ আমার জানা আছে। অবসেশনে ভোগে, ম্যানিয়াক হয়ে ওঠে।

    হ্যাঁ। এদের আমি চিনি। একজন তো আমার নিকটেই বসে এখন!

    নাহ্! নিকোলাস হাসে। এদের তুলনায় আমি কিছুই না। জানি, বাকি দু জনের নাম ডুরেঈদের তালিকায় ছিল।

    পিটার ওয়ালশ আর হের ফন শিলার।

    দু জনই খুনী কালেক্টর, বলল নিকোলাস। ফারাও মামোসের ট্রেজার পাবার চেষ্টায় মানুষ খুন করতে ওদের বাধবে না।

    রোয়েন বলল, কিন্তু আমি ওঁদের সম্পর্কে যত দূর জানি, দু জনেই বিলিওনেয়ার।

    টাকার সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক নেই, বলল নিকোলাস। এই গুপ্তধন ওরা কেউ পেলে ছোট্ট একটা আইটেমও কখনো বিক্রি করবে না। ভল্টে লুকিয়ে রাখবে, দেখতে দেবে না কাউকে। একা একা উপভোগ করবে ব্যাপারটা। অনেকটা স্বমেহনের মতো ব্যাপার।

    কি ধরনের শব্দ চয়ন! রোয়েন প্রতিবাদ জানায়।

    বিশ্বাস করুন। ব্যাপারটা যৌন উত্তেজনার সাথে সম্পর্কিত। অনেকটা সিরিয়াল কিলারদের অনুরূপ।

    যে কোনো মিশরীয় পুরাকীর্তি আমি পছন্দ করি, কিন্তু ওরকম কোনো আকাক্ষা কল্পনাও করতে পারি না।

    বুঝতে হবে–এরা কোনো সাধারণ লোক নয়। সম্পদের জোড়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এরা। যা ইচ্ছে, তাই পেতে পারে। এতেই তারা একটা অপার্থিব আনন্দ পায়।

    এই পেগাসাসের পেছনে যে-ই থাকুক, সে তো তবে পাগল, মন্তব্য করলো রোয়েন।

    পাগলের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক, বলল নিকোলাস। আমরা বিশাল ধনী একটা অসুস্থ ম্যানিয়াকের পাল্লায় পড়েছি।

    *

    পায়রার মাংস দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলো ওরা। তারপর কিছু না বলে গুহার পেছন দিকে চলে গেল রোয়েন, দেখেও না দেখার ভান করলো নিকোলাস। খানিক পর রোয়েন ফিরে আসতে কিছু না বলে নিকোলাসও গেল, রোয়েন ভান করলো লক্ষ্য করছে না। আরো খানিক পর পালা করে কাপড় চোপড় খুলে জলপ্রপাতের পানিতে গোসল করে এলো দু জন।

    গুহাটা থেকে বের হওয়ার আগে পরস্পরের ক্ষত পরীক্ষা করলো ওরা। নিকোলাসের খুলির জখম দ্রুত সেরে উঠছে, কিন্তু রোয়েনের হাঁটুর অবস্থা কালকের মতোই খারাপ। ব্যানড্যানাটা আবার বেঁধে দেওয়া ছাড়া করার মতো কিছু নেই নিকোলাসের।

    বাম-ব্যাগ আর ডিক-ডিকের ছাল এখানে ফেলে রেখে যেতে হচ্ছে, নিকোলাসকে। শরীরের সঞ্চিত শক্তি খরচ হতে শুরু করেছে, অতিরিক্ত এক পাউন্ড বোঝাও কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে, চূড়ায় পৌঁছুনোর আগে ট্রেইলের উপরই ঢলে পড়তে পারে শরীর। ডে-প্যাকে ক্যামেরাসহ তিন রোল ডেভলপ না করা ফিল্ম ছিল, প্রতিটি প্লাস্টিক ক্যাপসুলে ভরা। ডে-প্যাকে ছিল বলেই প্রক্সির খুনীদের হাতে পড়েনি ওগুলো। ট্যানাস সমাধির ফলকে পাওয়া হায়ারোগ্লিফিক্স-এর একমাত্র রেকর্ড এগুলো, হারাবার ঝুঁকি নিকোলাস নিতে পারে না। কাজেই খাকি শার্টের বুক-পকেটে ভরে বোতাম লাগিয়ে দিল। ব্যাগ আর ছাল গুহার পেছন দিকের একটা ফাটলে গুঁজে রাখলো, পরে সুযোগ মতো নিয়ে যাবে।

    প্রস্তুতি নেয়ার পর শুরু হলো ওদের সবচেয়ে কঠিন যাত্রা। ট্রেইলের এ শেষ অংশটুকু অসম্ভব দুর্গম। প্রথম দিকে নিকোলাসের কাঁধে হাত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো রোয়েন। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরই পরাজয় স্বীকার করলো, বলল, আর পারছি না।

    কে বলেছে পারতে হবে? রোয়েনের সামনে পেছন ফিরে বসে পড়লো নিকোলাস।

    আবার রওনা হবার পর দেখা গেল বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘন ঘন থামছে নিকোলাস। ট্রেইল যেখানে ভালো, নিকোলাসের পিঠ থেকে নেমে এক পায়ে হাঁটলো রোয়েন, নিকোলাস এক হাতে জড়িয়ে ধরে রাখলো ওকে। তারপর এক সময় ঢলে পড়লো রোয়েন, ওকে আরার নিজের পিঠে তুলে নিতে হলো নিকোলাসের।

    যাত্রাটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে। দু জনেই সময়ের হিসাব ভুলে গেল। অসহ্য যন্ত্রণার ভেতর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। এক সময় দেখা গেল ট্রেইলের উপর পাশাপাশি পড়ে আছে ওরা, অসুস্থ, বমি করছে, ক্ষুদা-পিপাসায় কাতর, ব্যথায় গোঙাচ্ছে।

    নিকোলাস, আপনি যান…আমাকে রেখে আপনি উঠে যান।

    সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো নিকোলাস।

    পালগ নাকি! চোখ রাঙালো ও।

    চূড়া আর বেশি দূরে নয়, জিদ ধরলো রোয়েন। বোরিসের লোকজনকে ডেকে আনবেন, ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে।

    ওরা ওখানে না-ও থাকতে পারে। প্রক্সির লোকজন আপনাকে পেয়ে যেতে পারে। টলতে টলতে সোজা হলো নিকোলাস। উঠুন! ধমক দিল ও। হাত ধরে সাহায্য করলে দাঁড়াতে।

    নিকোলাস পা ফেলছে, রোয়েন গুনছে। নিকোলাসেরই নির্দেশ। একশো পর্যন্ত গোনা শেষ হলেই থেমে বিশ্রাম নিচ্ছে ও। দম ফিরে পেলেই আবার শুরু করছে যাত্রা। নিকোলাসের গলাটা দু হাতে জড়িয়ে রেখেছে রোয়েন, গুনছে ওর কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে। গোটা বিশ্ব যেনো কুঁকড়ে ওদের সামনে সরু ট্রেইলে পরিণত হয়েছে। ট্রেইলের একপাশে যে পাহাড়-প্রাচীর মাথাচাড়া দিয়েছে বা অন্য পাশে রয়েছে গভীর খাদ, সে-সম্পর্কে দু জনের কেউই সচেতন নয়। নিকোলাস হোঁচট খেলে বা ঝাঁকি দিয়ে পিঠের বোঝাটা অ্যাডজাস্ট করতে হাঁটুর ব্যথা ইলেকট্রিক শকের মতো রোয়েনের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করতে ও নিকোলাসকে বুঝতে দিতে চায় না, চোখ বুজে গুনছে।

    এরপর বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাহাড়-প্রাচীরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকে নিকোলাস, জানে শুয়ে পড়লে আর উঠে বসতে পারবে না। তারপর বিশ্রাম নেওয়ার সময় রোয়েনকে পিঠ থেকে নামালো না। কারণ আবার পিঠে তোলা বড় বেশি কষ্টকর।

    প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, নিকোলাসের কানে ফিসফিস করলো রোয়েন। আজ রাতের মতো এখানেই থামুন। আপনি নিজেকে খুন করে ফেলছেন।

    আর একশো কদম, অস্ফুটে বলল নিকোলাস।

    না, নিকোলাস। নামিয়ে দিন আমাকে।

    জবাবে পাথুরে পাঁচিল থেকে কাঁধ সরিয়ে টলমল করতে করতে সোজা হলো_ নিকোলাস, ট্রেইল বেয়ে ওপরে উঠছে। কাউন্ট! নির্দেশ দিল।

    ফিফটি-ওয়ান, ফিফটি-টু, নির্দেশ পালন করলো রোয়েন। হঠাৎ করে পায়ের তলায় বিরাট একটা পরিবর্তন ঘটলো, ফলে পড়ে যাবার অবস্থা হলো নিকোলাসের। মাতালের মতো বিক্ষিপ্ত পা ধাপে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু আর কোনো ধাপ ওখানে নেই, পথটা অকস্মাৎ সমান হয়ে গেছে।

    কোন রকমে ভারসাম্য রক্ষা করলো নিকোলাস। খাদের কিনারায় টলমল করছে শরীরটা, গোধূলির আবছা অন্ধকার সামনে, কি দেখছে ভালো করে বুঝতে পারছে না। অন্ধকারে আলো আছে, তবে ধারণা করলো চোখে ভুল দেখছে ও। তারপর কানে এলো লোকজনের আওয়াজ। মাথাটা ঝাঁকালো নিকোলাস, বাস্তবে ফিরে আসতে চাইছে।

    ওহ, ডিয়ার গড! নিকোলাস, ওহ নিকোলাস! আপনি পেরেছেন! আমরা চুড়ায়! ওই তো আমাদের ভেহিকেল! আপনি জিতেছেন, নিকোলাস!

    কথা বলতে চাইছে নিকোলাস, কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আলোটার দিকে এগুচ্ছে ও, ওর পিঠ থেকে চিৎকার জুড়ে দিল রোয়েন।

    এদিক আসুন, প্লিজ! প্লিজ আমাদেরকে সাহায্য করুন! প্রথমে ইংরেজিতে, তারপর আরবিতে। প্লিজ সাহায্য করুন!

    আঁতকে ওঠার আওয়াজ হলো, তারপরই শোনা গেল লোকজনের ছুটোছুটির শব্দ। ধীরে ধীরে নিচু হলো নিকোলাস, নরম ঘাসে রোয়েনকে শুইয়ে দিল। গাঢ় ছায়ামূর্তিরা ঘিরে ধরল ওদেরকে। তারপর টর্চের আলো পড়লো নিকোলাসের মুখে, বিশুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলে উঠলো পুরানো বন্ধু জিওফ্রে টেনেন্ট। হ্যালো, নিকোলাস? নাইস সারপ্রাইজ। আদ্দিস আবাবা থেকে আমি তোমার লাশের খোঁজে এসেছি। শুনলাম তুমি নাকি মারা গেছ, হাহ?

    হ্যালো, জিওফ্রে! এতো কষ্ট করার জন্য ধন্যবাদ, দোস্ত।

    দুটো ক্যাম্প চেয়ার আনতে বলল জিওফ্রে, যত্ন করে তাতে বসানো হলো নিকোলাস আর রোয়েনকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে দু জনের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো ধূমায়িত কফির মগ। খানিক পর নিকোলাস বলল, কোত্থেকে কী শুনেছ বলো আমাকে, জিওফ্রে। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।

    প্ৰথম খবর পাই সুদান সীমান্তের কাছে নদী থেকে তোমার গাইড বোরিসের লাশ পাওয়া গেছে, বুলেটে ঝাঁঝরা।

    রোয়েনের দিকে তাকালো নিকোলাস, ভুরু কুঁচকে সাবধান করে দিল। তার সম্পর্কে শেষ খবর জানি আমরা, একা একটা স্কাউটিং এক্সপিডিশনে বের হলো। চার রাত আগে আমাদের ক্যাম্প হামলা করে শুফতারা, সে-ও হয়তো তাদের সামনে পড়ে যায়।

    হ্যাঁ, তোমাদের উপর হামলার খবরও পেয়েছি আমরা। কর্ণেল নগু রেডিও মেসেজ পাঠিয়েছিলেন আদ্দিসে।

    লোকজনের ভিড়ে কর্নেল নও রয়েছেন, ভিড় ঠেলে এগিয়ে না আসা পর্যন্ত তাঁকে ওরা দেখতে পেল না। ক্যাম্প লণ্ঠনের আলোয় এসে দাঁড়ালেন তিনি, তাঁর দিকে চোখ পড়তে শিউরে উঠে আড়ষ্ট হয়ে গেল রোয়েন। ও কিছু বলে ফেলবে, এ ভয়ে ওর হাতটা ধরে জোরে চাপ দিল নিকোলাস।

    আপনাকে দেখে বড়ই আনন্দ বোধ করছি, মি. নিকোলাস, কর্নেল নুগু শাদা দাঁত বের করে অমায়িক হাসলেন। আমাদের সবাইকে আপনি ভয়ানক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন!

    সেজন্য ক্ষমা চাই, বিনয়ের অবতার সাজলো নিকোলাসও।

    প্লিজ, স্যার, বললেন কর্নেল, ভুল বুঝবেন না। পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন-এর তরফ থেকে আমরা একটা রিপোর্ট পাই, তাতে বলা হয়েছে একটা ব্লাস্টিং অ্যাক্সিডেন্টের মধ্যে ড়ে যান আপনারা। এক্সপ্লোরেশন কোম্পানির জ্যাক হেলম্ যখন আপনাদেরকে সাবধান করে বলেন যে খাদের ভেতর তারা পাথর বসাচ্ছে, আমি তখন ওখানে উপস্থিত ছিলাম।

    কিন্তু আপনি… রেগে গিয়ে ফোঁস করে ফণা তুললাম রোয়েন, তবে নিকোলাস আবার ওর হাতে জোরে চাপ দিতে থেমে গেল।

    আপনি যেমন বলছেন, যা কিছু ঘটেছে তার জন্য আমাদের অবহেলাই সম্ভবত দায়ী, বলল নিকোলাস। তবে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় নি, ক্ষতি যা হবার ক্যাম্প স্টাফ আর সন্ন্যাসীদের হয়েছে। ওরা বেশ কয়েকজন আমাদের সঙ্গে ছিল, সবাই মারা গেছে। আদ্দিসে পৌঁছে কর্তৃপক্ষের কাছে ফুল স্টেটমেন্ট দেব আমি।

    আশা করি আপনি কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনছেন না?

    কারো বিরুদ্ধেই আমাদের কোনো অভিযোগ নেই, কর্নেল নগু, বলল নিকোলাস। আপনার বিরুদ্ধে তো নয়ই। খাদের ভেতর শুফতারা আছে, এ কথা বলে আপনি আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া, আপনি যেখানে উপস্থিত ছিলেন না, এ সব ঠেকাতেন কীভাবে?

    অসংখ্য ধন্যবাদ, মি. নিকোলাস। কর্নেলকে সন্তুষ্ট দেখালো। এবার বলুন, স্যার, আপনাদের জন্য কি করতে পারি আমি?

    মনে মনে গাল দিল নিকোলাস। তারপর জোর করে হাসলো ও। দেখুন আপনি আমার এ উপকারটা করতে পারেন কিনা। ডানডেরা জলপ্রপাতের নিচের গুহায় আমি আমার ব্যাগ আর হান্টিং ট্রফি ফেলে এসেছি। ব্যাগটায় আমাদের পাসপোর্ট আর ট্যাভেলার্স চেক আছে। একজন লোককে পাঠিয়ে ওগুলো আনিয়ে দিতে পারলে সত্যি কৃতজ্ঞ বোধ করব। হবু আততায়ীকে দিয়ে এতো নগণ্য একটা কাজ করাচ্ছে ভেবে হাসি পেল নিকোলাসের।

    কর্নেল নগু আপাতত সরে গেলেন। জিওফ্রেকে নিকোলাস জিজ্ঞেস করলো, এখানে তুমি পৌঁছতে কীভাবে?

    হালকা প্লেন নিয়ে ডেবরা মারিয়ামে আসি। ওখানে একটা ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং ফিল্ড আছে। কর্নেল গু দেখা করেন, আর্মি জীপে চড়িয়ে এখানে নিয়ে আসেন আমাদেরকে। পাইলট আর প্লেন ডেবরা মারিয়ামে অপেক্ষা করছে।

    ক্যাম্পের একজন সার্ভেন্ট এসে খবর দিল, নিকোলাস আর রোয়েনের গোসলের জন্য গরম পানি দেওয়া হয়েছে।

    সত্যি বলছি তোমাদের দু জনকে জীবিত দেখে ভারী আনন্দ হচ্ছে, বলে রোয়েনের কাঁধ চাপড়ে দিল জিওফ্রে।

    *

    পরদিন সকালে ডেবরা মারিয়াম থেকে প্লেনে চড়ে আদ্দিস আবাবায় ফিরছে ওরা। পাইলটের সঙ্গে সামনে বসেছে জিওফ্রে, রোয়েনকে নিয়ে নিকোলাস পেছনে। কাল রাতে নিভৃতে আলাপ করার সুযোগ হয় নি, প্লেনে বসে সেটা সেরে নিচ্ছে ওরা দু জন। ডিক-ডিকের ছালটা রয়েছে নিকোলাসের সিটের নিচে। কাল রাতেই একজন লোককে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কর্নেল নগু, আজ সকালে ব্যাগ আর ছাল ফিরে পেয়েছে ও।

    হোয়াইট হলো থেকে সেই থেকে একের পর এক ফ্যাক্স আসছে। এখন যখন ওদের খোঁজ পাওয়া গেছে, ইথিওপিয়ার পুলিস কমিশনার বলেছেন তিনি নিজে নিকোলাস ও রোয়েনের সঙ্গে কথা বলবেন। প্লেনে বসে ওরা দু জন সিদ্ধান্ত নিল, বোরিসের মৃত্যুর সঙ্গে মেক নিমুরকে কোণাখানে। জড়ানো চলবে না। আরো সিদ্ধান্ত হলো, পেগাসাসকে তো বটেই, ইথিওপিয়ান কর্তৃপক্ষকেও কোনোভাবে সতর্ক করা হবে না। ওদের প্রতিদ্বন্দ্বি পেগাসাস, এটা ওরা জানে বলে স্বীকার করলে প্রতিপক্ষ ভয়ংকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। আর ইথিওপিয়া কর্তৃপক্ষ যদি বুঝতে পারে মামোসের গুপ্তধন পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, ওদের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে, এমনকি ওদেরকে ইথিওপিয়ায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করাও হতে পারে। অজ্ঞতার ভান করে নিরীহ ভালো মানুষ সাজাই সব দিক থেকে ভালো।

    নিকোলাস আর রোয়েনের ব্যাপারে লন্ডন এতো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে যে, ব্রিটিশ অ্যামব্যাসাডর ওদেরকে নিজের বাড়িতে অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন জিওফ্রের মাধ্যমে। তিনতলায় পাশাপাশি দুটো বেডরুম ছেড়ে দেওয়া হলো ওদেরকে।

    হিজ এক্সিলেন্সির বাড়িতে তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না, জানালো জিওফ্রে।

    *

    ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের বাড়িটা নির্মিত হয়েছিল পুরোনো সম্রাট হাইলে সেলাসির আমলে, ১৯৩০ সালে মুসোলিনি ইথিওপিয়া অধিগ্রহণের আগে। শহরতলীতে চমৎকার কলোনিয়াল ঘরানার স্থাপত্যরীতিতে তৈরি। বড়ো বারান্দা, লন। এতো বছরেও ম্যানশনের কোনো ক্ষতি হয় নি।

    পাশের কামরার সংলগ্ন বাথরুম থেকে রোয়েনের শাওয়ার সারার আওয়াজ শুনলো নিকোলাস নিজের বাথটাবে আধ শোয়া অবস্থায়। খানিক পর বেডরুম থেকে ডাক্তারের গলা ভেসে এলো, রোয়েনের হাঁটু প্রসঙ্গে কথা বলছেন।

    রাষ্ট্রদূত স্যার অলিভার ওদের অপেক্ষাতেই বারান্দায় বসে ছিলেন। লাল-মুখো, সাদা চুলো মানুষ একজন। জিওফ্রে দ্রুত এগিয়ে এসে ওদের পরিচয় করিয়ে দিল, সঙ্গে ওর পত্নী সিলভিয়া টেনেন্ট। এছাড়াও, আরো জনা বারো অতিথি রয়েছে ডিনারে।

    অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বের মধ্যে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে ইথিওপিয়ার পুলিশ কমিশনার জেনারেল ওবেঈদকে।

    অ্যামব্যাসাডর নিজে নিকোলাস ও রোয়েনের সঙ্গে জেনারেলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। জেনারেল ওবেঈদ দীর্ঘদেহী মানুষ, ব্লু মেস ইউনিফর্ম তাঁকে মানিয়েছেও খুব। হ্যান্ডশেক করার সময় রোয়েনের হাতের উপর কপালটা প্রায় ঠেকিয়ে ফেললেন ভদ্রলোক। খুবই রসিক আর হাসিখুশি মানুষ তিনি।

    মনে করিয়ে দেয়ার সুরে বললেন, কাল আপনাদের সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। স্রেফ একটা রুটিন ইন্টারভিউ, আপনাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই।

    হ্যাঁ, অবশ্যই, বলল নিকোলাস। কখন যেতে বলেন, জেনারেল?

    সকাল এগারোটার দিকে আমার ড্রাইভার এসে নিয়ে যাবে।

    খাবারের এক পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী বললেন, তুমি জানো, স্যার নিকোলাস, কুয়েনটন পার্কের মালিক। এরপর নিকোলাসের দিকে ফিরে যোগ করলো, আমার স্বামী আবার ভালো শুটার।

    কুয়েনটন পার্ক, না? আরে, পত্রিকায় পড়েছি তো। ব্রিটেনের সেরা কিছু পাখি আছে ওখানে।

    একটু পর জিওফ্রে ফিসফিস করে বলল, তুমি ভালোই ওর এ জয় করেছ, নিকি!

    ডিনার শেষ হবার পর যে যার নিজের কামরায় ফিরে এলো ওরা। কাপড় ছাড়তে যাচ্ছে রোয়েন, নক হলো দরজায়। কবাট সামান্য একটু ফাঁক করে বাইরে

    তাকালো ও, দেখলো হাতে একটা কাগজ নিয়ে করিডরে দাঁড়িয়ে রয়েছে না।

    এখানে এসেই লন্ডনে একটা ফ্যাক্স পাঠিয়ে ছিলাম, তার উত্তর এসে গেছে-ঘরে ঢুকে দেখি মেঝেতে পড়ে রয়েছে। ভদ্রবেশে আছেন তো?

    এক মিনিট, বলে দরজা বন্ধ করে দিল রোয়েন, খানিক পর আবার খুলল। আসুন।

    ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো নিকোলাস। পেগাসাসের মালিককে এখন আমরা চিনি, রোয়েন।

    কে, বলুন! দুই হাত মুঠো করলো রোয়েন।

    একটা চেয়ার টেনে এনে নিকোলাস বলল, বসুন।

    রোয়েন বসার পর ফ্যাক্স পেপারের ভাঁজ খুলে চোখ বুলালো আরেকবার। পেগাসাসের পঁয়ষট্টি ভাগ শেয়ারের মালিক ভলহালা মাইনিং কোম্পানি, বাকি পঁয়ত্রিশ পার্সেন্টের মালিক অস্ট্রিয়ার অ্যানাকোন্ডা মেটালস। পেগাসাস এক্সপ্লোরেশন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি স্টক এক্সচেঞ্জে রেজিস্ট্রি করা, শেয়ার ক্যাপিটাল বত্রিশ মিলিয়ন…

    এতো ডিটেলস কে শুনতে চায়! আপনি আমাকে লোকটার নাম বলুন।

    ভলহালা আর অ্যানাকেন্ডা, দুটোরই আবার মালিক এইচ এম আই-হ্যামবুর্গ ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ। এইচএমআই-এর সমস্ত শেয়ারের মালিক হের ফন শিলার ফ্যামিলি ট্রাস্ট। দু জন মাত্র ট্রাস্টি হের ফন শিলার আর তাঁর স্ত্রী ইনজেমার।

    হের ফন শিলার! বিড়বিড় করলো রোয়েন, এখনো নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে। সম্ভাব্য স্পনসর হিসেবে ডুরেঈদ তালিকায় তার নাম রেখেছিল। উইলবার স্মিথের বইটা নিশ্চয়ই তিনি পড়েছেন। আমি জানি, জার্মান ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে ওটা। আপনার মতো তিনিও সম্ভবত ডুরেঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

    আমারও তাই ধারণা, বলল নিকোলাস। কায়রো মিউজিয়ামের ভেতর আপনারা ডুরেঈদ কি করছিলেন, এটা জেনে নেওয়া কঠিন কোনো ব্যাপার ছিল না। বাকিটা তো সবাই আমরা জানি।

    কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি তিনি পেগাসাসকে ইথিওপিয়ায় নিয়ে গেলেন কীভাবে?

    জিওফ্রে আমাকে জানিয়েছে, ওখানে তারা একটা কনসেশন পায় পাঁচ বছর আগে। স্ক্রোল হাতে পাবার অনেক আগে থেকে ওখানে রয়েছেন হের ফন শিলার। শুধু বেস ক্যাম্পটা অ্যাবি খাদে সরিয়ে আনতে হয়েছে ওদেরকে। খোঁজ নিলে জানা যাবে জ্যাক হেলম্ ফন শিলারের একজন ম্যাসলম্যান। কর্নেল নগুও ওদের পকেটে।

    সব কিছু মিলে যাচ্ছে, বলল রোয়েন। বসকে হেলই ওখানে আমাদের পৌঁছানোর খবর দেয়। ফন শিলারের নির্দেশেই, শুফতাদের দিয়ে আমাদের ক্যাম্পে হামলা করা হয়।

    যাক, এখন অন্তত আমরা জানি কার সঙ্গে লড়ছি।

    মাথা নাড়লো রোয়েন। এই কাজে হের ফন শিলারকে কেউ সাহায্য করছে। কায়রোর কোনো লোক।

    নিকোলাস জানতে চাইলো, আপনার মিনিস্টারের নামটা যেনো কী?

    আরে না! সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো রোয়েন। আতালান আবু সিন হতে পারেন না! আমি তাকে সারাজীবন ধরে চিনি। অত্যন্ত সৎ মানুষ। সতোর টাওয়ার বলব আমি।

    মোটা টাকা ঘুষ পেলে এ রকম বহু টাওয়ারকে কাত হয়ে যেতে দেখেছি আমি, নরম সুরে বলল নিকোলাস, শুনে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলো রোয়েন।

    *

    পরদিন সকালে পুলিশ কমিশনারের গাড়ি হেডকোয়ার্টারে নিয়ে এলো ওদেরকে। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে অভ্যর্থনা জানালেন জেনারেল ওবেঈদ। বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন তিনি, ইন্সপেক্টর গালা সব লিখে নিলেন। বোরিস ব্রুসিলভ যে কেজিবির অফিসার ছিল, ওরা সেটা জানে কিনা জিজ্ঞেস করা হলো। ইন্টারভিউ শেষ হতে একটা বিবৃতি টাইপ করা হলো, পড়ে দেখার পর সেটায় সই করলো। নিকোলাস। বিদায় দেয়ার সময় জেনারেল বললেন, যে কোনো ধরনের সাহায্য দরকার হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন, স্যার নিকোলাস। এরপর রোয়েনের দিকে তাকালেন তিনি। আমি আশা করব আবার আপনি ইথিওপিয়ায় বেড়াতে আসবেন।

    আসব না মানে! কিছুদিনের মধ্যেই আবার আমাদেরকে দেখতে পাবেন আপনি! হাসছে রোয়েন।

    বাইরে বেরিয়ে এসে নিকোলাসকে বলল ও, সত্যি, এরকম ভালো মানুষ আজকাল দেখা যায় না।

    আমারও তাই ধারণা, বলল নিকোলাস।

    *

    পরদিন সকালে ডাইনিং রুমে ব্রেকফাস্ট করতে নেমে দু জনেই ওরা একটা করে এনভেলাপ পেল, ডাইনিং টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে। ওয়েটারকে কফি দিতে বলে নিজের এনভেলাপটা খুলল নিকোলাস। পড়ার পর অবাক হয়ে তাকালো রোয়েনের দিকে, বলল, জেনারেল ওবেঈদ আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন! আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে দুপুরের আগে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে হাজির হবে। মানে? প্লিজ বা থ্যাঙ্ক ইউ গেল কোথায়?

    আমাকেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বলল রোয়েন। আমিও জানতে চাই, এর মানে কি?

    ওখানে না গেল জানা যাবে না।

    আজ সকালে কিন্তু ওদের কপালে উষ্ণ অভ্যর্থনা জুটলো না। গার্ড ওদেরকে জেনারেল চার্জ অফিসে পাঠিয়ে দিল। ওখানে ডেস্ক অফিসারের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ভুল বোঝাবুঝির ঝামেলা শুরু হলো। লোকটা ইংরেজি প্রায় জানে না বললেই হয়। অবশেষে টেলিফোনে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেনো কথা বলল সে, কথা শেষ করে দেয়াল ঘেঁষে ফেলা কাঠের বেঞ্চ দেখিয়ে বসতে বলল ওদেরকে।

    চল্লিশ মিনিট গরমে সেদ্ধ হলো ওরা। চোর-বদমাশদের ধরে এনে জেরা করা হচ্ছে, এটা ছাড়া উপভোগ করার মতো আর কিছু নেই এখানে। অবশেষে ইন্সপেক্টর গালাকে পার্টিশনের দরজায় দেখা গেল। কালকের মতো হাসলেন না, মুখ হাঁড়ি করে আছেন, হাতছানি দিয়ে ডাকলেন ওদেরকে। এগিয়ে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিল নিকোলাস, ইন্সপেক্টর দেখতে না পাবার ভান করে ওদেরকে পথ দেখিয়ে পেছন দিকের একটা কামরায় নিয়ে এলেন। বসার কোনো অনুরোধ এলো না, নিকোলাসকে বলা হলো, আপনার দখলে একটা আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, সেটা হারিয়ে ফেলার জন্য আপনিই দায়ী।

    হ্যাঁ, আমি আমার স্টেটমেন্টে বলেছি….

    ওকে বাধা দিয়ে ইন্সপেক্টর গালা বললেন, অবহেলা করে আগ্নেয়াস্ত্র হারানো অত্যন্ত সিরিয়াস অফেন্স।

    আমার তরফ থেকে কোনো অবহেলা হয় নি, অস্বীকার করলো নিকোলাস।

    অস্ত্রটার উপর আপনি নজর রাখার ব্যবস্থা করেন নি। স্টীল সেফে ভরে রাখার কোনো চেষ্টা করেন নি।

    অ্যাবি খাদে স্টীল সেফ, ইন্সপেক্টর?

    অবহেলা, বললেন ইন্সপেক্টর। অপরাধতুল্য অবহেলা। আমরা জানব কীভাবে অস্ত্রটা সরকারবিরোধী দুস্কৃতকারীদের হাতে পড়ে নি?

    আপনি বলতে চাইছেন অজ্ঞাত পরিচয় কোনো ব্যক্তি একটা রিগবি দিয়ে সরকারকে উৎখাত করতে পারে?

    নিকোলাসের বিদ্রূপ গ্রাহ্য না করে দেরাজ খুলে দুই প্রস্থ ডকুমেন্ট বের করলেন সালাম। এগুলো আপনাদের বহিষ্কার আদেশ। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ইথিওপিয়া ছেড়ে যেতে হবে।

    আরে, ডক্টর আল সিমা তো জীবনেও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেন নি। তো, তাকে নিষিদ্ধ করার কি মানে?

    অনেক তর্ক-বিতর্ক করেও কোনো লাভ হলো না। অবশেষে নিকোলাস বলল, জেনারেল ওবেঈদর সঙ্গে দেখা করতে চাই আমি।

    তিনি উত্তর সীমান্তে গেছেন, কয়েক সপ্তাহ পর ফিরবেন। প্লিজ, ডকুমেন্টে সই করুন।

    সই করা শেষ হতে ওরা যখন রোলস রয়েসে উঠছে, তখন রোয়েন বলল, কি ঘটলো এটা?

    খুব সহজ। পেগাসাস কেবল নগুকেই হাত করে নি, রাতে তাদের মালিক জেনারেল ওবেঈদের সাথেও কথা বলেছে। হের ফন শিলার সাহেব।

    এর মানে বুঝছেন তো, নিকি? আমরা আর ইথিওপিয়ায় ফিরতে পারবো না। মামোসের সম্পদ চিরকাল অধরা থেকে যাবে।

    যেবার ডুরেঈদ আর আমি লিবিয়া আর ইরাকে ঢুকেছিলাম, সাদ্দাম হোসেন বা গাদ্দাফি কেউ আমাদের স্বাগত জানায় নি–যতদূর মনে পরে।

    মনে হচ্ছে, আইন ভাঙার সম্ভাবনায় একেবারে খুশি আপনি!

    ইথিওপিয়ার আইনের থোরাই পরোয়া করি আমি।

    কিন্তু ধরা পরলে ওই ইথিওপিয়ার জেলেই ওরা পুরবে আপনাকে, অন্তত ওই ব্যাপারটা মাথায় নিন!

    হেসে নিকোলাস বলে, আপনিও মাথায় রাখুন। কেননা, ধরা পরলে আপনারও একই হাল হবে।

    *

    পরদিন ওদেরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার সময় জিওফ্রে বারবার একই কথা বলছে, হিজ এক্সিলেন্সি সাংঘাতিক রেগে গেছেন। আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ তো জানিয়েছেনই, আরো যা যা করার সবই তিনি করবেন….

    এটা নিয়ে এতো হৈ-চৈ করার দরকার কি, বলল নিকোলাস। দু জনের কেউই আমরা এখানে আর ফিরে আসতে ইচ্ছুক নই। কাজেই বলা চলে না যে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে।

    কিন্তু তোমরা দুজনেই ব্রিটিশ নাগরিক….

    সবই ঠিক, তবু এতো গুরুত্ব না দিলেও চলে।

    কেনিয়া এয়ারওয়েজের টিকেট আগেই বুক করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ে প্লেনে চড়ে বসলো ওরা। বিদায়ের সময় জিওফ্রেকে খুব বিষণ্ণ দেখালো। ছুটিছাটায়। লন্ডনে গেলে আমার খোঁজ করো, উৎসাহ দিয়ে হাসলো নিকোলাস।

    প্লেন গড়াতে শুরু করেছে, এয়ারপোর্ট বিল্ডিংকে পাশ কাটিয়ে এলো। হঠাৎ নিকোলাসের পাশের সিটে আড়ষ্ট হয়ে গেল রোয়েন। দেখুন! জানালো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। পেগাসাস!

    এয়ারপোট বিল্ডিঙের দূর প্রান্তে একটা একজিকিউটিভ জেট এইমাত্র স্থির হলো। প্লেনটা সবুজ রঙ করা। ওরা তাকিয়ে আছে, জেটের দরজা খুলে গেল। অভ্যর্থনা জানাবার জন্য ছোট্ট একটা ভিড় তৈরি হয়েছে টারমাকে।

    জেটের দরজায় প্রথমে উদয় হলেন ছোটখাট একজন মানুষ, পরনে ক্রীম ট্রপিক্যাল স্যুট, মাথায় সাদা পানামা হ্যাট। আকার-আকৃতি যা-ই হোক, ভদ্রলোকের হাবভাবে আত্মবিশ্বাস আর কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। মাথা উঁচু করে রাখার ভঙ্গিটা দম্ভ হতে পারে, ঘাড় ফিরিয়ে তাকানোর ধরনটা ক্ষমতার গর্ব হওয়া বিচিত্র নয়। তার চোয়াল কঠিন, যেনো সারাক্ষণ ছেদ ধরে আছেন।

    দেখামাত্র চিনতে পারলো নিকোলাস। সোথবি ও ক্রিস্টি সহ নামকরা দু একটা অকশন ফ্লোরে বেশ কয়েকবারই হের ফন শিলারকে দেখেছে।

    হের ফন শিলার, বিড়বিড় করলো।

    আমার চোখে লাগছে ফণা তোলা গোক্ষরা!

    সিঁড়ি বেয়ে জেট থেকে তরতর করে নেমে আসছেন হের ফন শিলার।

    দেখে বিশ্বাস হয়, ভদ্রলোকের বয়স সত্তর? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। চুল আর ভুরু রঙ করেছেন, তা না হলে এতো কালো দেখাত না।

    সর্বনাশ, এ আমি কাকে দেখছি! হঠাৎ আঁতকে উঠলো রোয়েন।

    ছোট্ট ভিড়টা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন ব্লু ইউনিফর্ম পরা জেনারেল ওবেঈদ। হের ফন শিলারকে স্যালুট করলেন তিনি।

    কি, বলি নি? ফন শিলারের পকেটে আরো কে কে আছে কে বলবে!

    দেখুন, দেখুন! আবার একবার আঁতকে উঠলো রোয়েন, তাকিয়ে আছে জেটের দরজায়। এবার যে আরোহীটিকে ওখানে দেখা গেল তার বয়েস বেশি নয়। সুদর্শন তরুণ, মাথায় ঢেউ খেলানো কালো চুল, মাথায় হ্যাট নেই। ওহ গড, নাহুত গাদ্দাবি!

    নাহুত গাদ্দাবি…কে?

    মিউজিয়ামে জুরেঈদের অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। ডুরেঈদের জায়গায় ওই এখন চাকরি করছে।

    টারমাক ধরে গড়াচ্ছিল ওদের প্লেন, হঠাৎ সেটার গতি বেড়ে গেল। পেগাসাসের জেট দৃষ্টিপথ থেকে সরে গেল। যে যার চেয়ারে হেলান দিল ওরা, বলা উচিত নেতিয়ে পড়লো।

    আর কোনো সংশয় নেই। প্রতিপক্ষ কারা, পরিষ্কার হয়ে গেছে।

    মাথা ঝাঁকালো রোয়েন।

    হের ফন শিলার পাপেট পাপেট-মাস্টার। আর নাহুত তার শিকারী কুকুর। সন্দেহ নেই নাহুতই কায়রোয় খুনীদেরকে ভাড়া করেছিল আমাদেরকে মেরে ফেলার জন্য। ওহ, নিকোলাস, দুরেঈদকে কবর দেয়ার সময় নাহুত কি বলেছিল তা যদি আপনি শুনতেন। ডুরেঈদকে নাকি, পরম বন্ধু মনে করত সে, শ্রদ্ধা করত…।

    জেনারেল ওবেঈদ ইথিপিয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে। ফন শিলার বিদেশি বিনিয়োগকারী–দেশের উন্নয়নের পেছনে অবদান রাখছেন–এমন ধারণা দিয়েছে হয়তো।

    স্বামীর হত্যাকারীদের আসল চেহারা দেখার পর রোয়েনের শোক যেনো উথলে উঠলো। ভিতরে ভিতরে এ আঘাত তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। নিকোলাস ভালো ভাবেই জানে, এ আগুন নেভানোর সাধ্য তার নেই, কেবল মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দিতে পারে সে। নরম স্বরে টাইটার ধাঁধার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে রোয়েনকে সান্ত্বনা দিতে চাইলো ও।

    নাইরোবি পৌঁছে প্লেন বদল করলো ওরা, হিথরোতে পৌঁছল পরদিন সকালে। ইতোমধ্যে ওরা দু জন আলোচনা করে একটা প্ল্যান তৈরি করেছে, অ্যাবি গিরিখাদে ফিরে গিয়ে গহ্বরের ভেতর টাইটার পুল কীভাবে খুঁজে দেখা হবে। অনেকটা সামলে নিয়েছে রোয়েন নিজেকে, ততক্ষণে। তবে নিকোলোস জানে, কেবল উপরে উপরেই ভেতরে জ্বলছে মেয়েটা।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleওয়াইল্ড জাস্টিস – উইলবার স্মিথ
    Next Article রিভার গড – উইলবার স্মিথ

    Related Articles

    মখদুম আহমেদ

    রিভার গড – উইলবার স্মিথ

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    ওয়াইল্ড জাস্টিস – উইলবার স্মিথ

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    ড্রাগন – ক্লাইভ কাসলার

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    ট্রেজার – ক্লাইভ কাসলার

    November 8, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }