১২. ভালোরা সফল হয়
অধ্যায় ১২ : ভালোরা সফল হয়
নাইস গাইস ফিনিশ লাস্ট (ভালো মানুষদের অসফল হবার প্রবণতা আছে) প্রবাদ বাক্যটি মনে হয় উদ্ভব হয়েছে বেসবল খেলার জগতে, যদিও কিছু কতৃপক্ষ এর একটি বিকল্প অর্থের অগ্রাধিকার দাবী করে আসছেন। আমেরিকার জীববিজ্ঞানী গ্যারেট হারডিন এটি ব্যবহার করেছিলেন সেই বিষয়টির সারাংশ হিসাবে প্রকাশ করতে, যে বিষয়টির শিরোনাম দেয়া যেতে পারে ‘সোসিওবায়োলজী অথবা ‘সেলফিশ জিনেরী। এই যথার্থতা খুব সহজেই দেখা যেতে পারে। যদি ‘নাইস গাই’ শব্দটির চলিত কথ্য ভাষার অর্থটি ডারউইনীয় সমার্থক শব্দার্থে অনুবাদ করি, একজন ‘নাইস’ গাই হচ্ছে সেই সদস্য, যে নিজে মূল্য পরিশোধ করার বিনিময়ে প্রজাতির অন্যান্য সদস্যদেরকে তাদের জিন পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত করতে সহায়তা করে। তাহলে নাইস গাইস বা এই সব ভালো সদস্যদের সংখ্যা প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে কমে যেতে বাধ্য: এই পরোপকারীতা একটি ডারউইনীয় মৃত্যুর শিকার হয়। কিন্তু কথ্য ‘নাইস’ শব্দটির আরো একটি কারিগরী ব্যাখ্যা আছে। আমরা যদি সেই সংজ্ঞাটিকে গ্রহন করে নেই, যা শব্দটির কথ্য রুপের অর্থ থেকে খুব বেশী দূরে নয়, ‘নাইস গাইস ক্যান ফিনিস ফার্স্ট’ বা ভালো সদস্যরা সফল হতে পারে। এই আরো বেশী আশাবাদী উপসংহারটি হচ্ছে এই অধ্যায়ের মূল বিষয়।
অধ্যায় ১০ এ উল্লেখিত ‘গ্রাজারদের কথা মনে করুন। এরা ছিল পাখি, যারা সাধারণত একে অপরকে সাহায্য করে আপাতদৃষ্টিতে একটি পরার্থবাদী উপায়ে, কিন্তু তারা সাহায্য করতে অস্বীকার করে– গ্রাজ কিংবা ক্ষোভ ধারণ করে তাদের বিরুদ্ধে– সেই সব সদস্যদের যারা এর আগে তাদেরকে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছে। গ্রাজাররা জনগোষ্ঠীতে প্রাধান্য বিস্তার করে কারণ তারা যেকোনো ‘সাকার’ (যারা নির্বিচারে সবাইকে সাহায্য করে, এবং সেকারণে সবাই নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহার করতে পারে) অথবা “চিটদের’ (যারা সবাইকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে নিষ্ঠুরভাবে চেষ্টা করে, পরিণতিতে পরস্পরের ক্ষতি করে) তুলনায় অনেক বেশী জিন তাদের পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে সফল হয়। গ্রাজারদের কাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ মূলনীতিকে ব্যাখ্যা করে, রবার্ট ট্রিভার্স যার নাম দিয়েছিলেন ‘রেসিপ্রকোল আলট্রইজম’ বা পারস্পরিক পরার্থবাদিতা। আমরা যেমন ক্লিনার ফিশদের উদাহরণে দেখেছিলাম ( মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২৪৩-৪), পারস্পরিক পরার্থবাদীতা শুধুমাত্র একটি প্রজাতির সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সব ধরনের সম্পর্কেই কাজ করে, যাদের বলা হয় সিমবায়োটিক (মিথোজীবি)– যেমন, পিপড়াদের তাদের এফিড ‘গবাদী’ থেকে দুধ সংগ্রহ করার আচরণ (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২৩৫-৬)। অধ্যায় ১০ লেখা শেষ করার পরে, আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট অ্যাক্সেলরড (যিনি ডাবলিউ, ডি, হ্যামিলটনের সাথে কাজ করেছিলেন, যার নাম এই বইয়ের বহু পাতায় আমরা দেখতে পাবো) এই রেসিপ্রোকাল অ্যালট্রইজিমের ধারণাটিকে একটি উত্তেজনাময় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এবং অ্যাক্সেলরডই প্রথম ব্যাক্তি যিনি ‘নাইস’ শব্দটির একটি কারিগরী অর্থ প্রস্তাব করেছিলেন, আমি শুরুর অনুচ্ছেদে যে অর্থটির প্রতি তথ্য-নির্দেশ করেছি।
অ্যাক্সেলরড, আরো অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ এবং গণিতজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীর মত একটি সরল জুয়া খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যা পরিচিত ‘প্রিজনার’স ডাইলেমা’ নামে। এটি এত সরল যে, আমি দেখেছি বুদ্ধিমান মানুষরা এটি পুরোপুরিভাবে ভুল বোঝেন, তারা ভাবেন নিশ্চয়ই এর মধ্যে আরো কিছু আছে। কিন্তু এর সরলতাই চোখকে আসলে ফাঁকি দেয়। এই ধাঁধা লাগানো খেলার নানা ধরনের বিশ্লেষণে নিবেদিত বই লাইব্রেরীর পুরো তাক জুড়ে দেখা যায়। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করেন এর মধ্যেই আছে কৌশলগত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের এটি ভালো করে পড়া উচিৎ। জীববিজ্ঞানী হিসাবে, আমি অ্যাক্সেলরড এবং হ্যামিলটনের সাথে একমত যে, বহু বন্য প্রাণী এবং উদ্ভিদ ‘প্রিজনার’স ডাইলেমা’র অন্তহীন খেলাগুলো নিয়েই নিরন্তরভাবেই ব্যস্ত, বিবর্তনীয় সময়ের প্রেক্ষাপটে যা তারা খেলে যাচ্ছে।
মানব সংশ্লিষ্ট এর মূল সংস্করণে, এই খেলাটি যেভাবে খেলা হয়ে থাকে সেটি হচ্ছে একরম: একজন ‘ব্যাঙ্কার’ আছেন, যিনি বিচার করে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন ও দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে খেলার অর্জিত লভ্যাংশ ভাগ করে দেন। মনে করুন, আমি আপনার বিরুদ্ধে খেলছি। (যদিও, আমরা পরে দেখবো, ‘বিরুদ্ধে’ হচ্ছে ঠিক সেই অবস্থান যে অবস্থানে আমাদের থাকার কোনো প্রয়োজন নেই)। আমাদের প্রত্যেকের হাতে কেবল দুটি কার্ড আছে, যেগুলো হচ্ছে– ‘কোঅপারেট’ বা সহযোগিতা এবং ‘ডিফেক্ট’ বা অসহযোগিতা বা বিশ্বাসঘাতকতা। খেলার জন্য, প্রত্যেককেই আমাদের হাতের এই দুটি কার্ডের থেকে যেকোনো একটি কার্ডকে বেছে নিতে হবে এবং সেটিকে উপুড় করে রাখতে হবে টেবিলের উপর। উপুড় করে কারণ, আমরা কেউ দেখবো না কার্ডটি কি, আমাদের দুজনের কেউই অন্যদের খেলা দ্বারা প্রভাবিত হবে না। কার্যত যা হচ্ছে আমরা যুগপৎভাবে এই দানটি খেলবো। এরপর আমরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করবো ব্যাঙ্কার যখন কার্ডটি সোজা করে দেখবেন। এই টানটান উত্তেজনার কারণ আমাদের লভ্যাংশ নির্ভর করবে শুধুমাত্র কোন কার্ড আমরা খেলেছি (যা আমরা দুজনেই পৃথকভাবেই জানি) তার উপরেই, বরং অন্য খেলোয়াড় কোন কার্ডটি খেললেন তার উপরেও ( সেটা আমরা জানিনা যতক্ষণ না ব্যাঙ্কার সেটি আমাদের সামনে তুলে ধরছেন)।
যেহেতু ২ x ২ সংখ্যক কার্ড আছে, এখানে মোট চারটি সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে। প্রতিটি ফলাফলের জন্য, আমাদের লাভ হচ্ছে এরকম: (উত্তর আমেরিকায় খেলাটি আবিষ্কার হয়েছে, সেই কথা বিবেচনা করে ডলার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে):
আউটকাম ১: আমরা দুজনেই ‘কো-অপারেট’ কার্ড টি খেলেছি। ব্যাঙ্কার আমাদের দুজনকেই ৩০০ ডলার করে দেবে। এই সম্মানজনক পরিমান টাকাকে বলা হচ্ছে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য পুরষ্কার।
আউটকাম ২: আমরা দুজনেই ‘ডিফেক্ট’ কার্ডটি খেলেছি। ব্যাঙ্কার আমাদের দুজনকে ১০ ডলার করে জরিমানা করে। এই পরিমান টাকাকে বলা হচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতা বা অসহযোগিতার বা ডিফেক্টশনের জন্য শাস্তি।
আউটকাম ৩: যদি আপনি কো-অপারেট’ কার্ডটি খেলেন এবং আমি ‘ডিফেক্ট’ কার্ডটি খেলে থাকি। ব্যাঙ্কার আমাকে ৫০০ ডলার দেবে (অসহযোগিতার করার প্রলোভন সাড়া দেবার জন্যে) এবং আপনাকে জরিমানা করে (সাকার’) ১০০ ডলার।
আউটকাম ৪: যদি আপনি ‘ডিফেক্ট’ কার্ডটি খেলেন এবং আমি ‘কো-অপারেটিভ কার্ডটি খেলে থাকি। ব্যাঙ্কার আপনাকে ৫০০ ডলার দেবে (অসহযোগিতার করার প্রলোভনে সাড়া দেবার জন্যে। এবং আমাকে জরিমানা করা হবে (“সাকার’) ১০০ ডলার।
আউটকাম ৩ ও ৪ অবশ্যই এক দৃশ্যের আয়না-প্রতিবিম্ব: একজন খেলোয়াড় খুবই ভালো করে, অন্যজন খুব খারাপ।
আউটকাম ১ ও ২ এ আমরা দুজনেরই অর্জন সমপরিমান {১ এ মাথাপিছু ৩০০ ডলার, আর ২ এ মাথাপিছু ক্ষতি ১০ ডলার), কিন্তু আউটকাম ২ অপেক্ষা আউটকাম ১ আমাদের দুজনের জন্যই অপেক্ষাকৃত অনেক ভালো। সত্যিকার টাকার পরিমান এখানে আলোচ্য কিছু নয়, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ নয় তাদের মধ্যে কয়টি পজিটিভ (টাকা পরিশোধ) এবং তাদের মধ্যে কয়টি নেগেটিভ (জরিমানা)। এই খেলাটিকে একটি সত্যিকারের প্রিজনার’স ডাইলেমা হিসাবে যোগ্য হবার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে তাদের র্যাঙ্ক অর্ডার বা আউটকামগুলোর ক্রমানুসরতা। পারস্পরিক সহযোগিতার করার মাধ্যমে অর্জিত পুরস্কারের তুলনায় অসহযোগিতা বা বিশ্বাসঘাতকতা করার প্রলোভন অবশ্যই উত্তম, যা অবশ্যই উত্তম পারস্পরিক অসহযোগিতা থেকে, যা অবশ্যই উত্তম সাকাররা যে পরিমান টাকা পায় তার চেয়েও (কঠোরভাবে বললে, এই খেলার আরো একটি শর্ত আছে, যা এটিকে সত্যিকার প্রিজনার’স ডাইলেমা হিসাবে যোগ্য করে তোলে: প্রলোভন এবং সাকারদের পরিশোধিত মূল্যের গড় অবশ্যই পুরস্কারের চেয়ে বেশী যেন না হয়। এই বাড়তি শর্তের কারণ পরবর্তীতে স্পষ্ট হবে।) চারটি ফলাফল বা আউটকামের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আমরা নিচের ছবি ১ এ কে কত টাকা পেল সেই পে-অফ ম্যাট্রিক্সে দেখতে পাবো:
কিন্তু, ডাইলেমা বা উভয়সংকট’ কেন? এটি দেখতে হলে, উপরের পে-অফ ম্যাট্রিক্স বা লাভ-ক্ষতির ছকটি লক্ষ করুন এবং কল্পনা করুন সেই সব চিন্তাগুলো যা আমার মাথায় এসেছিল, যখন আমি আপনার বিরুদ্ধে খেলছিলাম। আমি জানি খেলার জন্য মাত্র দুটি কার্ড আছে, ‘কোঅপারেট’ এবং ‘ডিফেক্ট’। এবার তাদের পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা যাক। আপনি যদি ডিফেক্ট অসহযোগিতা কার্ড খেলে থাকেন (এর অর্থ হচ্ছে আমাদের উপরের ডানদিকের কলামটা লক্ষ করতে হবে)।
সবচেয়ে ভালো যে কার্ডটা আমি খেলতে পারি সেটিও ডিফেক্ট অসহযোগিতা। স্বীকার করছি যে, আমি পারস্পরিক অসহযোগিতার কারণে প্রাপ্ত শাস্তির ভুক্তভোগী, কিন্তু যদি আমি সহযোগিতা করি আমি তাহলে ‘সাকার’ এর বিনিময় মূল্য পাবো যা কিনা আরো খারাপ (১০০ ডলার জরিমানা)। এবার তাহলে দেখুন আর কি আপনি করতে পারেন (বাম-দিকে কলামের দিকে তাকান), সহযোগিতার কার্ডটি খেলতে পারেন। আবারও ‘ডিফেক্ট’ বা অসহযোগিতা আমার জন্য সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ। যদি আমি সহযোগিতা করি, তাহলে আমরা দুজনেই বেশ বড় মাপের টাকা, মাথাপিছু ৩০০ ডলার করে পেতাম, কিন্তু আমি যদি অসহযোগিতা করি তাহলে আমি পাবো আরো বেশী :৫০০ ডলার। এর উপসংহার হচ্ছে, আপনি যে কার্ডটি খেলুন না কেন, আমার সেরা চালটি হবে ‘সবসময়ই অসহযোগিতা করা।
সুতরাং আমি একটি নির্ভুল যুক্তি বের করেছি যে, আপনি যাই করুন কেন আমি অবশ্যই অসহযোগিতা করবো। এবং আপনিও কোনো অংশেই কম নির্ভুল নয় এমন যুক্তি দিয়ে ঠিক একই সিদ্ধান্ত নেবেন। সুতরাং যখন দুটি যুক্তিসম্পন্ন মানুষ মিলিত হয়, তারা দুজনেই অসহযোগিতার কার্ড খেলে, তারা দুজনেই হয় জরিমানার শাস্তি পায় অথবা কম পরিমান টাকা পায়। তারপরও দুজনেই খুব ভালো করে জানেন যে, যদি তারা দুজনে সহযোগিতা কার্ডটি খেলে থাকেন, তারা দুজনেই বেশ ভালো পরিমানে পুরষ্কার আদায় করতে পারতেন পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য (আমাদের উদাহরণে, ৩০০ ডলার); একারণে এই খেলাটিকে বলে একটি ডাইলেমা বা উভয় সংকট, কেন এটি এত বেশী পাগল করে দেবার মত ধাঁধা সৃষ্টি করে এবং কেন এমনকি প্রস্তাব করা হয়েছে এর বিরুদ্ধে একটি আইন থাকা উচিৎ।
‘প্রিজনার’ শব্দটি এসেছে আরো একটি বিশেষ কাল্পনিক উদাহরণ থেকে। এখানে বিনিময় হচ্ছে টাকা নয় বরং জেলে থাকার শাস্তির পরিমান। দুইজন ব্যক্তি– তাদের নাম যেমন ধরুন, পিটারসন এবং মরিয়ার্টি– বর্তমানে কারাগারে আটক, পুলিশের সন্দেহ সহযোগীরূপে তারা দুইজন একটি অপরাধ সংঘটন করেছে। দুইজন অবস্থান করছে কারাগারের পৃথক দুটি কক্ষে, এবং পৃথকভাবেই তারা দুইজন পুলিশের জেরার মুখোমুখি হয়, দুইজনকেই আলাদা করে অপরাধের অপর সহযোগীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (ডিফেক্ট) করতে, এবং রাজসাক্ষী হবার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। যা ঘটে তা নির্ভর করবে এই দুইজন বন্দী কি করবে তার উপর, এবং কেউ জানেনা অন্যজন কি করেছে। যদি পিটারসন সব দোষ মরিয়ার্টির উপর চাপিয়ে দেয় এবং মরিয়ার্টি সেই কাহিনীটিকে সত্য হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় চুপ থাকার মাধ্যমে (তার একসময়কার বন্ধু এবং যে কিনা দেখা গেল বিশ্বাসঘাতক বন্ধু)। মরিয়ার্টি দীর্ঘ মেয়াদী শাস্তি পায়, অন্যদিকে পিটারসন কোন শাস্তি ছাড়াই জেল থেকে মুক্তি পায়, যে “ডিফেক্ট’ বা অসহযোগিতা আর বিশ্বাসঘাতকতা করার প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করে। যদি তারা দুজনেই দুজনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতো, দুজনেই অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হতো, কিন্তু আরেকজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার মাধ্যমে অপরাধের কিছু প্রমাণ দেবার কারণে খানিকটা ছাড় পেতো, এবং যদিও কঠোর, তবে খানিকটা হ্রাসকৃত সাজায় দণ্ডিত হতো, পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি। যদি দুইজনই সহযোগিতা করতে ( একে অপরের সাথে, কর্তৃপক্ষের সাথে না), দুইজনের কেউ কোনো কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে, তাহলে তাদের মূল সেই অপরাধের জন্য সাজা দেবার জন্য কতৃপক্ষের হাতে যথেষ্ট পরিমান প্রমাণ ছিলনা। তারা বরং এর বদলে অপেক্ষাকৃত ছোট কোনো অপরাধের জন্য অল্প খানিকটা সাজা পেত, পারস্পরিক সহযোগিতার করার জন্য পুরষ্কার। যদিও, জেলখানার কোনো শাস্তিকে পুরষ্কার হিসাবে চিহ্নিত করা মনে হতে পারে বেশ অদ্ভুত একটি বিষয়, কিন্তু ঠিক সেভাবেই তারা সেটি দেখতো, যদি কারাগারে আরো দীর্ঘতর সময় আটক থাকা এর বিকল্প হতো। আপনি হয়তো লক্ষ করবেন, যদিও পে-অফ এখানে ডলারে হচ্ছে। না বরং কারাগারে বন্দী থাকার শাস্তি, কিন্তু খেলার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলো সংরক্ষিত থাকে (পছন্দের ক্রমানুসারে চারটি আউটকাম বা ফলাফলের তালিকাটি লক্ষ করুন)। যদি আপনি আপনাকে প্রতিটি বন্দীর জায়গায় কল্পনা করেন, মনে করে নেন যে উভয়েই যৌক্তিক আত্মস্বার্থ রক্ষার জন্য প্ররোচিত হবে এবং যেহেতু জোট বাধার জন্য তারা পরস্পরের সাথে আগে কথা বলতে পারবে না, আমরা দেখবো অন্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা ছাড়া কারোই কোনো উপায় নেই, যার ফলে দুজনেই কঠোর শাস্তি পাবে।
এই উভয় সংকট থেকে মুক্তি পাবার কি কোনো উপায় আছে? দুজন খেলোয়াড়ই জানেন যে তাদের প্রতিপক্ষ যাই করুক না কেন, তারা নিজেরা বিশ্বাসঘাতকতা বা অসহযোগিতা করার চেয়ে ভালো কিছু করতে পারবেন না। তারপরও দুজনের আরো যে বিষয়টি জানা আছে সেটি হচ্ছে, যদি তারা দুজনই পরস্পরকে সহযোগিতা করে, প্রত্যেকেই সুবিধাজনক একটি ফলাফল পাবে, শুধুমাত্র যদি, শুধুমাত্র যদি তারা সেটি করে .. শুধুমাত্র যদি তারা কোনো না কোনোভাবে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারতো, কোনো না কোনোভাবে দুজনই যদি একে অপরকে আশ্বস্ত করতে পারতো, তাদের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বার্থপরের মত ভালো পুরস্কারটি কেড়ে নেবে না, এবং কোনোভাবে যদি এই চুক্তির উপর নজরদারী করা তারা নিশ্চিৎ করতে পারতো।
প্রিজনার বা বন্দীদের এই উভয় সংকটের সরল খেলায়, এই পারস্পরিক বিশ্বাসকে নিশ্চিৎ করার কোনো উপায় নেই। যদি না কোনো একজন খেলোয়াড় সত্যিকারভাবে সাধুসদৃশ্য ‘সাকার’, যারা এই পৃথিবীর জন্য অতিরিক্ত ভালো, পুরো খেলাটা শেষ হবার সম্ভাবনা আছে পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকার মাধ্যমে, যা ফলাফল কাঙ্খিত ফলাফলের বিপরীত, দুজনের জন্য যা খারাপ পরিণতির কারণ হবে। কিন্তু এই খেলাটার আরো একটি সংস্করণ আছে। এটিকে বলে ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া বন্দীদের উভয়সংকট বা আইটিরেটেড অথবা রিপিটেড প্রিজনার’স ডাইলেমা। পুনরাবৃত্তি হওয়া খেলাটি আরো বেশী জটিল এবং এই জটিলতার মধ্যেই আছে আশা।
এই ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া খেলাটি খুবই সাধারণ সেই একই খেলার মত, শুধুমাত্র যেটি একই খেলোয়াড়দের নিয়ে অনির্দিষ্টবারের জন্য পুনরাবৃত্তি হয়। আরো একবার আমি এবং আপনি মুখোমুখি হই, আমাদের মাঝে বসে থাকেন মিমাংসাকারী ব্যাঙ্কার। আবারো আমাদের হাতে দুটো করে কার্ড থাকে, একটি সহযোগিতা, আর আরেকটি অসহযোগিতা/বিশ্বাসঘাতকতা বা কোঅপারেট এবং ডিফেক্ট। আবারো খেলার দানে আমাদের দুজন এই দুটি কার্ডের যেকোনো একটি খেলবো, এবং উপরে বর্ণিত সেই খেলার নিয়মানুযায়ী ব্যাঙ্কার হয় টাকা দেবে, নয়তো জরিমানার শাস্তি প্রদান করবে। কিন্তু এখন, সেই খেলাটি একবার শেষ হবার বদলে, আমরা আবারও কার্ড হাতে তুলে নিয়ে নতুন খেলার দান শুরু করি। এভাবে একের পর এক খেলার চক্র আমাদের সুযোগ দেয় বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্য, একে অপরের কাজের প্রতিদান অথবা তোষণ বা ক্ষমা বা প্রতিশোধ নেয়ার। একটি অনির্দিষ্ট সময়ব্যাপী চলমান দীর্ঘ খেলায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারটি হচ্ছে, আমরা দুজনেই জিততে পারি ব্যাঙ্কারকে বোকা বানিয়ে, নিজেদের কোনো ক্ষতি না করে।
এভাবে এই খেলার দশ রাউন্ড পর, তাত্ত্বিকভাবে আমি প্রায় ৫০০০ ডলার জয় করতে পারি, কিন্তু শুধুমাত্র যদি আপনি খুব বড় মাপের বোকা হয়ে থাকেন (বা মহাপুরুষ সাধুসুলভ হন) এবং সবসময়ই সহযোগিতার কার্ডটি খেলে থাকেন, এমনকি যখন আমি সবসময়ই অসহযোগিতার কার্ডটি খেলে যাচ্ছি। আরো বাস্তবসম্মতভাবে, আমাদের দুজনের জন্যই খুব সহজ হবে ব্যাঙ্কারের ৩০০০ ডলার হাতিয়ে নেয়া এই খেলার দশটির রাউন্ডের প্রতিটিতে দুজনেই সহযোগিতার কার্ডটি খেলে। এর জন্য আমাদের বিশেষভাবে সাধুসুলভ হতে হবে না, কারণ আমরা দুজনেই দেখতে পাচ্ছি, একে অপরের অতীতের দান থেকে, পরস্পরকে আমরা বিশ্বাস করতে পারবো। আমরা কার্যত একে অপরের আচরণের উপর নজরদারী করতে পারবো। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এমনও সম্ভাবনা আছে। আমাদের কেউ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারবো না। আমরা দুজনেই ডিফেক্ট অসহযোগিতার কার্ডটি খেলছি পুরো দশ রাউন্ড জুড়ে এবং ব্যাঙ্কার আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ ডলার জরিমানা আদায় করে নেবেন। খুব সম্ভবত যেটা হবে আমরা একে অপরকে আংশিকভাবে বিশ্বাস করবো, এবং আমরা দুজনেই সহযোগিতা আর অসহযোগিতার একটি মিশ্র’ কৌশল ধারাবাহিকভাবে খেলে যাবো, মোটামুটি মাঝারী পরিমান টাকা আদায় করা সম্ভব হবে।
অধ্যায় ১০ এর পাখিরা যারা একে অপরের মাথার উপরের পালক থেকে ছোট কীট বা টিক অপসারণ করতে সাহায্য করে তারাও একধরনের বহুবার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা বা উভয়সঙ্কট খেলাটি খেলে। কিভাবে তারা সেটি খেলে? আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে কোনো একটি পাখির পক্ষে তার নিজের পালক থেকে টিক অপসারণ করাটা জরুরী একটি ব্যাপার, কিন্তু সে তার নিজের মাথার উপরের জায়গাটি নিজে ঠোঁট দিয়ে খুটে পরিষ্কার করতে পারেনা, তার তখন অন্য সঙ্গীর দরকার হয়, যে সেই কাজটি তার হয়ে করে দেয়। এখানে স্পষ্টতই মনে হতে পারে খুব স্বাভাবিক ব্যপারটি হবে, সে পরে তার সঙ্গীর করা এই উপকারটির অবশ্যই প্রতিদান দেবে। কিন্তু এই প্রতিদান দিতে হলে পাখি হিসাবে তার সময় ও শক্তির খরচ হবে, যদিও খুব বেশী নয়। যদি কোনো পাখি, প্রতিদান না দিয়ে বা প্রতারণা করে পার পেয়ে যেতে পারে– মানে তার নিজের মাথার টিক পরিষ্কার করার পর, প্রতিদান দিতে অস্বীকার করে– সে মূল্য পরিশোধ না করেই লাভবান আউটকাম বা পরিণতিগুলোকে যদি আপনি পর্যায়ক্রমে সাজান এবং আপনি দেখবেন সত্যিকারের একটি প্রিজনার’স ডাইলেমা গেমই এখানে খেলা হচ্ছে। উভয়পক্ষই যেখানে সহযোগিতা করছে (একে অপরের মাথাকে টিক তুলে দেয়া) সেখানে পরিস্থিতি বেশ ভালো, কিন্তু তারপরও কোনো প্রতিদান ছাড়াই বা কোনো মূল্য পরিশোধ না। করেই উপকার নেবার মাধ্যমে আরো বেশী লাভ করার প্রলোভনও আছে।
দুজনেই অসহযোগিতা করলে (একে অপরের মাথা থেকে টিক পরিষ্কার করতে অস্বীকার করলে) পরিস্থিতি দুজনের জন্যেই বেশ খারাপ হয়। কিন্তু এতটা খারাপ হয় না যেমন হতে পারে যখন কষ্ট করে কারো মাথা থেকে টিক পরিষ্কার করার পরেও নিজের শরীর টিক দ্বারা আক্রান্ত থেকে যায়। লাভ-ক্ষতির হিসাবের ছকটি আমরা দেখতে পারে ছবি ২ তে।
কিন্তু এটি শুধুমাত্র একটি উদাহরণ। আপনি বিষয়টি নিয়ে যত ভাববেন, তত বেশী আপনি অনুধাবন করতে পারবেন জীবন পূর্ণ হয়ে আছে বহুবার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা খেলায়, শুধু মানুষের জীবন না বরং প্রাণী এবং উদ্ভিদের জীবনেও। উদ্ভিদের জীবন? হ্যাঁ, কেন নয়? মনে রাখবেন আমরা সচেতনতার স্তরে নেয়া হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলছি না (যদিও মাঝে মাঝে আমরা সেটা করতে পারি), এই কৌশলগুলো আসলেই ‘মেনার্ড স্মিথের প্রস্তাবিত অর্থে’, সেই সব কৌশল জিনরা হয়তো যা আগে থেকেই প্রোগ্রাম করতে পারে। পরে আমরা কিছু উদ্ভিদ দেখবো, বেশ কিছু প্রাণী এবং এমনকি ব্যাকটেরিয়া, সবাই এই পুনরাবৃত্তি হতে থাকা প্রিজনার’স ডাইলেমা খেলাটি খেলছে। এখন তাহলে আসুন এই পুনরাবৃত্তি হবার বিষয়টি আসলেই কেন এত বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেটি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি।
সাধারণ খেলার চেয়ে, যেখানে বরং আগে থেকেই ধারণা করা যেতে পারে, ‘অসহযোগিতা হচ্ছে একমাত্র ‘যৌক্তিক’ কৌশল। এই পুনরাবৃত্তি হওয়া সংস্করণটি খেলোয়াড়দের বহু সংখ্যক কৌশল ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। সাধারণ খেলায় শুধুমাত্র দুটি সম্ভাব্য কৌশল আছে: “সহযোগিতা এবং অসহযোগিতা। তবে পুনরাবৃত্তি, যদিও বহু সংখ্যক সম্ভাব্য কৌশলের সুযোগ করে দেয়, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে সেরা কোনোভাবেই সেটি সুস্পষ্ট নয়। নীচে, যেমন, হাজারটি কৌশলের একটি: ‘বেশীরভাগ সময় সহযোগিতা করো, কিন্তু ১০ শতাংশ সময় র্যানডোমভাবে বিশ্বাসঘাতকতার খেলা খেল; অথবা কৌশল হতে পারে খেলার অতীত ইতিহাসের উপর শর্তাধীন। আমার গ্রাজার’ হচ্ছে এই ধরনের একটি উদাহরণ, কে কেমন এ বিষয়ে তাদের খুব ভালো স্মৃতি আছে এবং যদিও মৌলিকভাবে তারা পরস্পরের সহযোগিতা করে, তবে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, যদি অন্য খেলোয়াড় এর আগে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে। অন্য কোনো কৌশল হয়তো আরো বেশী ক্ষমাশীল হবে, অপেক্ষাকৃত স্বল্প মেয়াদী স্মৃতির জন্য।
স্পষ্টতই পুনরাবৃত্তির খেলায় অনেক কৌশল আছে, শুধুমাত্র আমাদের উদ্ভাবনপটুতাই যার সীমাবদ্ধতা। আমরা কীভাবে কোনটি সবচেয়ে সেরা, সেটি চিহ্নিত করতে পারি? অ্যাক্সেলরড নিজেই এই কাজটি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করার মত বেশ চমকপ্রদ একটি ধারণা হয়েছিল তার, তিনি ‘গেম-থিওরী’ বিশেষজ্ঞদের কাছে তাদের সেরা কৌশলগুলো জমা দেবার জন্যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কৌশল, এই অর্থে, কোনো কাজ করার পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম করা নিয়মকানুন, সুতরাং প্রতিযোগীদের জন্যে প্রযোজ্য ছিল যে, তাদের কৌশলগুলো কম্পিউটার প্রোগ্রামের ভাষায় জমা দিতে হবে। মোট চৌদ্দটি কৌশল জমা পড়েছিল, অ্যাক্সেলরড এর সাথে পনেরোতমটি যোগ করেন, যার নাম দেন ‘র্যানডোম’, যা এলোমেলোভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনেই শুধুমাত্র সহযোগিতা’ আর ‘অসহযোগিতা কার্ডটি খেলে যায় এবং এটাকে ধরে নেয়া হয়েছে এক ধরনের বেস লাইন বা শুরুর ‘নন-স্ট্র্যাটেজী’ হিসাবে, যদি কোনো কৌশল এই ‘র্যানডোম’ কৌশলের চেয়ে ভালো না করে, এটি অবশ্যই যথেষ্ট খারাপ একটি কৌশল।
অ্যাক্সেলরড ১৫ টি কৌশলকেই অনুবাদ করেছিলেন একটি সাধারণ প্রোগ্রামিং-এর ভাষায় এবং এরপর এটিকে একটি বড় কম্পিউটারে ‘পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রিজনার’স ডাইলেমা’ খেলার মাধ্যমে পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন (তার নিজের একটি কপির সাথেও)। যেহেতু ১৫ টি কৌশল ছিল, সুতরাং ১৫x১৫ বা ২২৫টি ভিন্ন ভিন্ন খেলা কম্পিউটারে চলেছিল। যখন প্রতিটি জোড়া খেলা মোট ২০০টি দান অতিক্রম করেছিল, মোট লভ্যাংশ যোগ করে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল।
একটি বিশেষ প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধে কোন কৌশলটি জয়লাভ করেছে তা নিয়ে আমরা আদৌ চিন্তিত নই। যা আমাদের চিন্তার বিষয় সেটি হচ্ছে কোন কৌশলটি সবচেয়ে বেশী পরিমান টাকা সঞ্চয় করতে পারে, যদি পনেরো জোড়ার সব কৌশল আমরা যোগ করি। টাকা মানে এখানে শুধু পয়েন্টস বা নম্বর যা বরাদ্দ করা হয়েছে। এভাবে: পরস্পর সহযোগিতা, ৩ পয়েন্ট, অসহযোগিতা করার প্রলোভন, ৫ পয়েন্ট, পারস্পরিক অসহযোগিতার জন্য ১ পয়েন্ট ( যা আগের খেলার মৃদু জরিমানার সমান), সাকারদের মূল্য পরিশোধ, ০ পয়েন্ট (যা আমাদের আগের খেলার বেশী পরিমান জরিমানার সমতুল্য)।



 100vw, 394px” /></picture></a><figcaption>ছবি ৪: ভ্যাম্পায়ার বাদুড়দের রক্ত দান করার ছক, এবং বিভিন্ন পরিণতিতে আমার দেয়া বিনিময়মূল্য।</figcaption></figure>
</div>
<p>বিশেষ করে, এই সব বাদুড়গুলো কি একে অপরকে আলাদা বাদুড় হিসাবে চিনতে পারে? উইলকিনসন একটি পরীক্ষা করেছিলেন বন্দী বাদুড়দের নিয়ে, প্রমাণ করেছিলেন তারা সেটি করতে পারে। মূল ধারণাটি ছিল এক রাতের জন্য একটি বাদুড়কে সরিয়ে ফেলা হয়, তাকে না খাইয়ে রাখা হয় যখন বাকী সবাই খাবে। এই দুর্ভাগা ক্ষুধার্ত বাদুড়টিকে এরপর তার বিশ্রাম করার স্থানে রেখে আসা হয়। এবং উইলকিনসন লক্ষ রাখেন, কে, যদি কেউ, একে খাদ্য দান করে। এই পরীক্ষাটি যদি বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, প্রতিটি বাদুড় পালাক্রমে অভুক্ত শিকার হিসাবে তাদের দ্বায়িত্ব পালন করে। মূল বিষয়টি হচ্ছে এই বন্দী বাদুড়দের জনগোষ্ঠী দুটি পৃথক গ্রুপের মিশ্রণ। যাদেরকে এমন গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে যার মধ্যে দুরত্ব বহু মাইলের। যদি ভ্যাম্পায়াররা সক্ষম হয় তাদের বন্ধুদের শনাক্ত করতে, তাহলে পরীক্ষামূলকভাবে অভুক্ত রাখা বাদুড়গুলোকে দেখতে পাওয়া উচিৎ শুধুমাত্র খাওয়া পাচ্ছে তাদের মূল গুহায় বাসকারী সদস্যদের দ্বারা।</p>
<p>মোটামুটি যা ঘটে তাহচ্ছে, মোট তেরটি দান করার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়, এবং তেরোটির মধ্যে বারোটি, দাতা বাদুড়টি ছিল অভুক্ত বাদুড়টির পুরোনো বন্ধু, যাদের একই গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তেরটি দৃষ্টান্তের শুধুমাত্র একটিতে আমরা দেখি অভুক্ত বাদুড়কে খাওয়াচ্ছে নতুন বন্ধু, এবং তাদের একই গুহা থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। অবশ্যই বিষয়টি কাকতালীয় কোনো ব্যপার হতে হবে, কিন্তু আমরা এমন কিছু ঘটার বিরুদ্ধে সম্ভাবনাটা পরিমাপ করতে পারি। সেই সম্ভাবনার পরিমান প্রতি ৫০০ বারে একবার। সুতরাং যথেষ্ট নিরাপদ এমন কোনো উপসংহারে পৌঁছানো বাদুড়রা আসলেই পক্ষপাতদুষ্ট তাদের পুরোনো বন্ধুদের খাওয়ানোর ব্যপারে, যখন তারা অন্য গুহা থেকে আসা অপরিচিত আর প্রাকপরিচিত বাদুড়ের মধ্যে কাকে খাদ্য দান করবে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।</p>
<p>ভ্যাম্পায়াররা দারুণ দক্ষ নানা কল্পকাহিনীর জন্ম দেবার জন্য। ভিক্টোরীয় গথিক ভাবনার অনুসারীদের কাছে তারা হচ্ছে সেই অন্ধকারের শক্তি যারা রাতকে সন্ত্রস্ত করে রাখে, জীবনের প্রাণশক্তিকে শুষে খায়, নিরপরাধ মানুষকে বিসর্জন দেয় শুধুমাত্র তার তৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য। এটাকে যুক্ত করুন ভিক্টোরীয় যুগের আরেকটি কল্পকাহিনীর সাথে, দাতে ও নখরে সজ্জিত হিংস্র প্রকৃতি এবং ভ্যাম্পায়াররা স্বার্থপর জিনের এই পৃথিবীর সম্বন্ধে আমাদের গভীরতম ভয়েরই পুনরুজ্জীবিত রুপ নয় কি? আমার ক্ষেত্রে, আমি সব পুরাণ কাহিনীর ব্যাপারেই সন্দিহান। যদি আমরা তাদের জানাতে চাই সত্য কোথায় অবস্থান করছে সুনির্দিষ্ট উদাহরণগুলোতে, আমাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। ডারউইনীয় ব্যাখ্যার বিশাল ভাণ্ডার আমাদের যা দিচ্ছে সেটি কোনো একটি নির্দিষ্ট জীব সম্বন্ধে আমাদের বিস্তারিত প্রত্যাশা নয়। এটি আমাদের আরো সূক্ষ্মতর কিছু প্রদান করে এবং আরো মূল্যবান– একটি মূলনীতিকে বোঝার ক্ষমতা। কিন্তু যদি পুরাণ কাহিনীকে এক্ষেত্রে আমাদের অনুভব করতেই হয়, ভ্যাম্পায়ারদের সম্বন্ধে সত্যিকার তথ্য একটি ভিন্ন নীতিকথা আমাদের শেখাতে পারে। বাদুড়দের নিজেদের ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র রক্তই পানির চেয়ে ভারী নয়, তারা আত্মীয়তার বন্ধনকে অতিক্রম করতে পারে, তাদের নিজস্ব অনুগত রক্ত-নির্ভর ভাতৃত্বের গোত্র গড়ে তুলতে পারে। একটি স্বস্তিকর নতুন পুরাণের ভ্যানগার্ড হতে পারে ভ্যাম্পায়াররা, ভাগাভাগি করে নেবার পুরাণ, পারস্পরিক সহযোগিতার একটি সম্পর্ক, তারাই সূচনা করতে পারে প্রসন্ন আর কল্যাণময় সেই ধারণাটি, এমনকি যখন স্বার্থপর জিনের হাতে রাশ ধরা থাকে, ভালোরা সফল হতে পারে।</p>
</div>
<div class=)