দ্য হাউস – ৩
তৃতীয় পৰ্ব
১
লম্বা একটা সময় কথা না বলে একে-অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা। সায়াকাই প্রথমে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“তুমিই এটা। একই নামে অন্য কেউ এখানে আসবে, এটা হতে পারে না।”
সোফা ছেড়ে উঠে ঘরময় পায়চারি শুরু করলো সায়াকা। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে একটু পর পর। বাইরে এখনও বৃষ্টি হচ্ছে জোরে।
“এখানে আগেও এসেছি আমি।”
“সেটাই তো মনে হচ্ছে।”
“তাহলে…” হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে ও। “দেজা ভ্যু নয়, অদ্ভুত অনুভূতিটা এজন্যেই হচ্ছিল।”
“একটু আগে বলছিলে যে কারও সাথে এখানে এসেছ তুমি। সে ওটাই আন্টি-ই হবে।”
কপালে হাত রাখলো সায়াকা। ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করছে কিছু একটা। খানিক বাদে বললো, “তাহলে ইউসুকের ওটাই আন্টিই আমার মা।”
“হ্যাঁ, তোমার মা’র নাম কী যেন?”
“টামিকো।”
“টামিকো, আচ্ছা,” মাথা নাড়লাম আমি। “সবাই নিশ্চয়ই ও-টামি ডাকত তাকে। সেটা উচ্চারণ করতে পারত না দেখে ওটাই করে নিয়েছে ইউসুকে।”
“ওটামি আন্টি…” বিড়বিড় করে বলে সায়াকা, এরপর মাথা তুলে তাকায় আমার দিকে। “তার মানে আমার মা এখানে আসত।”
“সেটাই মনে হচ্ছে। আর ডায়রির লেখাগুলো ইঙ্গিত করছে যে এক সময় এই বাড়িতে কাজও করতো সে।”
ঘাড় কাত করে মোমবাতির দিকে তাকালো সায়াকা। অধরা স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করছে নিশ্চয়ই।
“তোমার মা’কে কি কখনো এরকম কিছু করতে শুনেছ?” জিজ্ঞেস করি। কোনো প্রকার ইতস্তত না করেই মাথা ঝাঁকায় ও।
“নাহ। আসলে তার বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না আমি।” দুর্বল একটা হাসি ফুটলো ওর মুখে।
কিছু না বলে আবারও ডায়রিটার দিকে তাকালাম।
“যাইহোক, তাহলে আমার ধারণাই সম্ভবত ঠিক। ইয়োকোহামায় যাওয়ার আগে এখানে থাকতে তোমরা।”
“কিন্তু বাবা এই বাড়িটার ব্যাপারে আমাকে কখনো কিছু বলেনি কেন? এখন তো মনে হচ্ছে আমার জীবনে এই বাড়িটার গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা আছে।”
“হয়তো ঠিক এই কারণেই বলেনি।”
“হয়তো,” বলে ধীরে ধীরে ডায়রিটা নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল ও। “ওটাই আন্টি…” ফিসফিসিয়ে বলে যে পাতাগুলো পড়া হয়ে গেছে সেগুলো আবারও দেখলো ও। “এই কথাগুলো আমার মা’কে নিয়েই লেখা হয়েছে। তরমুজ ভালো চিনত, ইউসুকের জন্যে মাঝে মাঝে এসে রান্না করে দিয়ে যেত।”
ওর চেহারায় এখন একই সাথে দু’টো অনুভূতির মিশ্রন। ছোটবেলায় হারানো মায়ের ব্যাপারে অজানা কিছু তথ্য যেমন আনন্দের খোরাক হয়ে এসেছে, তেমনি সেই সময়কার কোনো স্মৃতি না মনে করতে পারার বিষয়টা খুব পীড়া দিচ্ছে। এমনকি মায়ের চেহারাটাও মনে করতে পারছে না ও। চুপ করে বসে রইলাম আমি। ওটাই আন্টিকে নিয়ে লেখাগুলো পড়ে চলেছে সায়াকা, সেটাই দেখছি।
প্রথম পাতায় ফেরার পর ডায়রিটা আবারও টেবিলের উপরে নামিয়ে রাখলো ও। দীর্ঘশ্বাস ফেলল নীরবে।
“মনে হচ্ছে মা খুব হাসিখুশি থাকত সবসময়…”
“তোমার স্মৃতি কি অন্য কথা বলছে?”
“আসলে আমি মা’কে বেশিরভাগ সময় অসুস্থই থাকতে দেখেছি তো -”
“ডায়রিতে কিন্তু ওটাই আন্টির অসুস্থতার ব্যাপারে কিছু লেখা নেই।”
“আমিও এটাই ভাবছিলাম,” হাতের উপরে থুতনি রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে বলে সায়াকা।
আবারও ডায়রিটা খুললাম। এবারে, কিছুদূর পরপরই ‘সায়াকা’ নামটা দেখা গেল।
‘২০ মে, মেঘ, বৃষ্টি স্কুল থেকে ফিরে আমাদের বাসায় খেলতে এসেছিল সায়াকা। চামির পেছন পেছন ঘুরে বেড়িয়েছে গোটা বাসায়। চামিও একজন খেলার সাথি পেয়ে খুশি।’
‘১ জুন, বৃষ্টি আমি ঘরে পড়াশোনা করছিলাম, এসময় হঠাৎ নক না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ে সায়াকা। চামিকে খুঁজছিল নাকি। সরিও বলেছে। সায়াকা এলে বাড়িটা গমগম করে।’
“ইউসুকে আর মিকুরিয়া পরিবার তোমাকে পছন্দ করতো, বোঝাই যাচ্ছে,” ডায়রির লেখাগুলো সায়াকাকে দেখালাম।
“আমার পরিবার নিয়ে কিছু লিখেছে?”
“এখন পর্যন্ত তো লেখেনি, আরেকটু পড়ে দেখি।”
কিন্তু সায়াকার পরিবারের ব্যাপারে কিছুই নেই ডায়রিতে। যতই পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে যে ভেতরের লেখাগুলো আবর্তিত হয়েছে কেবল ইউসুকের পরিবারকে ঘিরে। বিশেষ করে ওর বাবার মৃত্যুর পর থেকে অন্য কারো সম্পর্কে খুব বেশি উল্লেখ করেনি ছেলেটা। আর সেটা যে ওই লোকটার উপস্থিতির কারণে, তা আমাদের বলে দিতে হবে না।
‘২৬ জুন, বৃষ্টি
ওই লোকটা আজ সারাদিন মদ গিলেছে। তাই আমি চেষ্টা করেছি প্রয়োজন না পড়লে ঘর থেকে না বেরুতে। ভেতর থেকে ছিটকানি আটকে রেখেছিলাম। সন্ধ্যার একটু পরে বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাতে শুরু করে জানোয়ারটা। ‘খোল্, খোল’ বলে চিৎকার করছিল। যদি খুলতাম, কী করতো কে জানে। সে শান্ত হয়ে আসার পরেও লম্বা একটা সময় বাথরুমেও যাইনি ভয়ে।’
‘১০ জুলাই, মেঘ
রাতের খাবার খাচ্ছি, এসময় মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফেরে লোকটা। ঘরে আসার জন্যে দাঁড়িয়েছি কেবল, অমনি ‘কই পালাচ্ছিস?’ বলে জোরে ধাক্কা দেয় আমাকে। আরেকটু হলেই ব্যথা পেতাম ভীষণ। মা থামানোর চেষ্টা করলে আরো রেগে যায় লোকটা। টেবিলের সবকিছু ছুড়ে ফেলে। মাথায় আসলেই সমস্যা আছে তার।’
লোকটার এরকম খারাপ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ডায়রি জুড়ে সেটারই প্রমাণ।
‘১২ আগস্ট বৃষ্টি
ওই লোকটা মরে না কেন? কী সুন্দর দিন হাসিখুশি দিন কাটাচ্ছিলাম আমরা। এখন সব পণ্ড হয়ে গেছে।’
‘৩১ আগস্ট, রোদ বাঁচলাম! আজ গরমের ছুটি শেষ। স্কুলে গেলে অন্তত হারামিটার চেহারা দেখতে হবে না। সাপ্তাহিক ছুটি না থাকলেই ভালো হতো।’
‘৮ সেপ্টেম্বর, প্রথম বৃষ্টি, এরপর রোদ আজকে আবার ক্ষেপেছিল লোকটা। কেন এভাবে হঠাৎ রেগে গেল জানি না। চিৎকার করছিল পাগলের মত, গ্লাস ভাঙছিল। আমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমার দিকে একটা কাঁচের অ্যাশট্রে ছুড়ে মারলে মাথায় এসে লাগে। প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছি। মাথায় হাত দিয়ে দেখি ফুলে গেছে অনেকটা। রাগ করে তার দিকে তাকালে ছুটে এসে আমার কোমড়ে লাথি মেরেছে। মা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।’
ইউসুকের উপরে চলমান নির্যাতনের কথা পড়তে পড়তে একটা ভাবনা মাথায় এলো। সায়াকার দিকে তাকালাম। “তুমি কখনো এরকম দৃশ্য দেখেছ?”
“দৃশ্য? কীরকম?”
“এই যে ইউসুকে মার খাচ্ছে লোকটার কাছে। তোমার মনে আছে এরকম কোনো দৃশ্যের কথা?”
পর। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করলো সায়াকা। মাথা ঝাঁকাল একটু
“দেখেছি বোধহয়। কিন্তু সেটা টিভিতে কিনা…?”
“তোমার স্মৃতিতে এরকম কোনো দৃশ্যের অভিজ্ঞতা নেই?”
“হুম…” মাথা নেড়ে প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো সায়াকা। “কী ঘুরছে তোমার মাথায়, বলো তো।”
কিছুক্ষণ ইতস্তত করলাম আমি। বলা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছি না। ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম একবার।
“হ্যাঁ, ইউসুকে একদম শিশু নয়, কিন্তু ওকে বাচ্চাই বলা যায়। ওই লোকটা’র দ্বারা শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে ছেলেটা। অন্য দিকে ‘সায়াকা’ মানে তুমি, প্রায়ই এই বাসায় আসতে। তাই এমনটা খুবই সম্ভব যে নিজ চোখে হয়তো ওকে মার খেতে দেখেছ তুমি।”
“যেটা আমার অবচেতন মনে গেঁথে আছে। আর সেই কারণেই নিজের বাচ্চাকে ভালোবাসতে পারি না। আমার ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়েছে ঘটনাটা দ্বারা…” একটানা কথাগুলো বলে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালো সায়াকা। “এটাই বলতে চাইছ?”
“তুমি সরাসরি নিপীড়নের শিকার হওনি যদিও, কিন্তু এরকম একটা দৃশ্য দেখলে সেটার প্রভাব পড়বেই তোমার উপরে।”
আমার কথাগুলো শুনে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল সায়াকা। বেশ কয়েক মিনিট কিছু বললো না। আমিও বসে থাকলাম ওভাবেই। বজ্রপাতের শব্দ ভেসে এলো বাইরে থেকে।
“নাহ, মনে নেই,” মাথা নিচু করে খসখসে কণ্ঠে বললো ও। “আরো জানতে হবে আগে, এরপর হয়তো বলতে পারব।”
“ঠিক বলেছ। আমি কিন্তু জোর করে তোমার উপরে কিছু চাপিয়ে দিতে চাচ্ছি না। একটা সম্ভাবনার কথা বললাম আর কি।”
“বুঝতে পেরেছি,” বলে ডায়রিটা তুলে নিল ও। “আর খুব বেশি বাকি নেই।”
“আশা করি এটুকু থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্র খুঁজে পাব।”
পরবর্তী এন্ট্রিগুলোতে ইউসুকে ‘ওই লোকটা’র হাতে উপর্যুপরি মার খাবার ঘটনা লিখে গেছে টানা। তার প্রতি ঘৃণা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে ছেলেটার। বছরের শেষ দিকে একটা সিদ্ধান্ত নিল সে।
‘১০ ডিসেম্বর, মেঘ আর নিতে পারছি না আমি। এই বাড়িতে থাকা সম্ভব না। পালাবো ঠিক করেছি। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? যে কোনো এক জায়গায় গেলেই হলো। কিন্তু এখানে থাকব না। যা জমানো টাকা আছে, সব নিয়ে ট্রেনে করে যত দূরে যাওয়া সম্ভব, যাব। কোনো কাজ খুঁজে নিব। এই নরক থেকে বের হতে হবে আমার।’
কিন্তু পরের লেখাগুলো পড়ে বোঝা গেল, কাজটা করেনি সে। কেন করেনি, তা পরিষ্কার লেখা নেই অবশ্য। কিন্তু পরিকল্পনাটা মাথা থেকে একেবারে ঝেরেও ফেলেনি। আরো বেশ কয়েকবার পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
‘৩০ ডিসেম্বর, রোদ
বছর শেষ হবার আর এক দিন বাকি। আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ বছর ছিল এটা। আগামী বছরটাও এভাবে যাবে ভাবলেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও চলে যেতে চাই, যেখানে কেউ খুঁজে পাবে না। কোনো খামারে যেতে পারলে ভালো হতো। গরু-ঘোড়া পালব নাহয়। কিন্তু আমি চলে গেলে সবাই মন খারাপ করবে। স্বার্থপরের মতন হয়ে যাবে কাজটা।
কী করবো?’
‘১ জানুয়ারি, বৃষ্টি
নববর্ষ উদযাপনের জন্যে নিজের সব আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করেছিল লোকটা। তার জন্যে সব উৎসবই মদ খাওয়ার উপলক্ষ মাত্র। সব ওয়াইন আর হুইস্কি নিজেই গিলেছে শেষ পর্যন্ত। তবে মাথা গরম করেনি এবারে। এত বেশি ভালো মেজাজে ছিল যে অস্বস্তিই হচ্ছিল আমার। এমনকি আমাকে এক হাজার ইয়েনের একটা নোটও দিয়েছে উপহার হিসেবে। পালানোর সময় কাজে আসবে টাকাটা। যত ভালো ব্যবহারই করুক না কেন আমার সাথে, লাভ হবে না।’
‘৩ জানুয়ারি, রোদ
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে আজকে। বাইরে যাওয়ার সময় মা’র বোনা নীল গ্লোভসটা হাতে দিয়ে গিয়েছিলাম। ভালোই গরম ওগুলো। লোকটা গত দুই দিন ধরে শান্ত ছিল। আজ আত্মীয়-স্বজন সবাই চলে যাওয়ার পর হঠাৎ চড়াও হয় আমাদের উপরে। আমরা নাকি তাকে খাটো করেছি সবার সামনে। আমার মাথায় মেরেছে জোরে, মা ‘কেও মেরেছে। এখান থেকে পালাতে হবে আমাকে। কিন্তু একা তো যাওয়া সম্ভব না।’
মা’কে রেখে যাওয়া সম্ভব না বলেই পালায়নি ইউসুকে, এটা মোটামুটি পরিষ্কার। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারছি আমি। কিন্তু ভদ্রমহিলার আচরণ কেমন যেন দুর্বোধ্য ঠেকছে। লোকটাকে থামাচ্ছে না কেন সে? যদি থামানো সম্ভব না হয়, তাহলে ছেলেকে নিয়ে চলে গেল না কেন?
এখান থেকে ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ অবধি ঘুরে ফিরে সেই একই কথা লিখেছে ইউসুকে। পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পালাতে পারছে না ইউসুকে।
শুধু একটা এন্ট্রিই একটু অন্যরকম লাগলো। সেখানে লেখা-
‘২৯ জানুয়ারি, রোদ কাল যা দেখেছি, আজ সারাদিন কিছু করতে পারিনি সেজন্যে। খুব বেশি অস্বস্তিকর একটা দৃশ্য। আজ রাতেও কি একই ঘটনা ঘটবে? প্রতিদিনই ঘটে? গতকাল রাতে বাথরুমে যাওয়ার জন্যে উঠে শব্দটা শুনতে পাই হঠাৎ। সাধারণত এই সময়ে উঠি না আমি, এজন্যেই হয়তো আগে খেয়াল করিনি। যদি এরকম জঘন্য একটা ব্যাপার আসলেও প্রতিদিন ঘটে থাকে! ভাবলেই বমি আসছে আমার। আজ স্কুল থেকে ফিরে দেখি বাগানে দাঁড়িয়ে আছে ও। দ্রুত চলে এসেছি ঘরে। কালকে কী করে ওর মুখোমুখি হবো, কে জানে।’
এর আগের দিন নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু ঘটেছে। কিন্তু পাতা উল্টে দেখলাম ২৮ তারিখ কিছু লেখেনি ইউসুকে।
“কী ঘটতে পারে? এমন কী দেখেছে ছেলেটা?” সায়াকা’কে জিজ্ঞেস করলাম।
“কিসের যেন শব্দ শুনতে পেয়েছে। গভীর রাতে। এরকম সময়ে অদ্ভুত শব্দ কানে এলে ভয় লাগারই কথা।”
“কিন্তু ইউসুকে লিখেছে অস্বস্তিকর একটা দৃশ্য।”
“যদি এরকম জঘন্য একটা ব্যাপার আসলেও প্রতিদিন ঘটে থাকে! ভাবলেই বমি আসছে আমার।’- এটা লিখেছে ইউসুকে।”
“সেক্ষেত্রে…”
“হ্যাঁ,” বলে আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা নামিয়ে নিল সায়াকা।
লম্বা শ্বাস ফেললাম আমি। ইউসুকে হয়তো ওর মা আর লোকটার ঘনিষ্ঠ হবার দৃশ্য দেখে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে লোকটা ওর সৎ বাবা না হয়ে পারে না।
শেষ পাতার লেখাগুলো পড়ে ডায়রিটা বন্ধ করে দিলাম। ছেলেটার সমস্ত আবেগ আমাকেও বিদ্ধ করেছে একই ভাবে।
“তো…” বললাম আমি। “এখন কী করবো আমরা? ডায়রিটা তো শেষ।”
“হ্যাঁ,” বলে বন্ধ ডায়রিটার দিকে তাকালো সায়াকা। “কিন্তু এখানেই শেষ করলো কেন? এখনও অনেক পাতা খালি।”
“হয়তো পালিয়ে যায় ও।”
“মানে ঘর ছেড়ে চলে গেছে?”
“ওই তো, একই কথা।”
“সেক্ষেত্রে একটু হঠাৎই হয়ে গেল না বিষয়টা? হ্যাঁ, এর আগেও বেশ কয়েকবার পালানোর কথা বলেছে ও, কিন্তু প্রতিবারই দোটানায় ভুগে থেকে গিয়েছে শেষ পর্যন্ত।”
“হয়তো এবারে এমন কিছু ঘটেছিল, যে কারণে এমনটা করতে বাধ্য হয়েছে ইউসুকে।”
“সেক্ষেত্রে ডায়রিতে অন্তত উল্লেখ থাকবে সেই ঘটনার। আর বাড়ি থেকে পালালে, ডায়রিটা সাথে করে নিয়ে যেত নতুবা পুড়িয়ে দিত।”
“আসলে…” বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। যুক্তি আছে সায়াকার কথায়। তর্কের খাতিরেও বলার মতন কিছু পাচ্ছি না।
“কিন্তু কিছু একটা ঘটেছিল সেই সময়, এটা নিশ্চিত,” নিজেকে শোনানোর জন্যেই যেন বলে সায়াকা। “কারণ ইউসুকের ঘরটা দেখে মনে হবে ষষ্ঠ গ্রেডের এক শিক্ষার্থীর ঘরে সময় থমকে গেছে আচমকা। ডায়রির লেখাও সেই সময়েই শেষ হয়েছে।”
“চলো, ওর ঘরে যাই। আরেকটা ডায়রি পাওয়া যেতে পারে।”
“হ্যাঁ, সেটাই করি,” বলে টর্চ হাতে উঠে দাঁড়াল সায়াকা।
ইউসুকের ঘরে প্রবেশ করে একটা মোম জ্বেলে খুঁজতে শুরু করলাম আমরা। বুকশেলফের বইগুলো একটা একটা করে নামিয়ে দেখলাম প্রথমে। এরপর টেবিলে খুঁজলাম, কিন্তু ডায়রি নেই কোথাও। ছোট আলমারিটাও খুলে দেখলাম। ভেতরে কেবল অব্যবহৃত অন্তর্বাস, মোজা-এসব। “কিছু নেই।”
“তাই তো মনে হচ্ছে,” নিচু চেয়ারটায় বসে বললাম। সায়াকা ও বিছানার উপরে পা ভাঁজ করে বসলো। “এখন কী করবো আমরা? এই ঘরে আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। এখন বাদ কেবল ওর বাবা-মা’র ঘরটা। ওই বাক্সটাও খুলতে হবে আমাদের।”
“আমার আর মা’র ব্যাপারে আরো কিছু তথ্য পেলে ভালো হতো,” কিছুক্ষণ পর বললো ও।
“ছোট্ট সায়াকা আর ওটাই আন্টি।”
ইউসুকের ডায়রি পড়ে যা বুঝেছি, সায়াকা আর ওর মা মিকুরিয়া পরিবারের বাইরের মানুষ ছিল। তাহলে কি সায়াকার স্মৃতিভ্রমের কারণ অন্য কিছু?
লম্বা শ্বাস ছেড়ে আঙুল দিয়ে দুই চোখ চেপে ধরলো সায়াকা।
“তুমি নিশ্চয়ই ভীষণ ক্লান্ত,” ওকে বলি। “এই অন্ধকারে ডায়রিটা পড়তে কষ্টই হয়েছে, তাই না?”
“হ্যাঁ, ক্লান্ত,” দুর্বল হেসে বলে সায়াকা। পরক্ষণেই আবারো আগের গাম্ভীর্য ফিরে আসে চেহারায়। “তুমি একটু আগে বোধহয় ঠিকই বলেছিলে।”
“কখন?”
“বলেছিলে আমার এরকম অস্বাভাবিক আচরণের কারণ ইউসুকে’কে ওভাবে নিপীড়িত হতে দেখা।”
কপালে ভাঁজ পড়লো আমার।
“অস্বাভাবিক আচরণের কথা একবারও বলিনি আমি, বলেছি ঘটনাটা দ্বারা প্রভাবিত হলেও হতে পারো।”
“উহু, ওই কারণেই আজকে আমার এই অবস্থা। তুমিও টের পেয়েছ নিশ্চয়ই।”
“একদমই না,” বলি। “তোমার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুই নেই, যদি নিজ থেকে আমাকে ঘটনাটার ব্যাপারে না বলতে…”
“আসলেই?”
“হ্যাঁ। বুঝলে প্রেম করতাম?”
চুলে একবার হাত বুলিয়ে হাতের টর্চটা জ্বালাতে-নিভাতে শুরু করলো ও। প্রতিবার যখন টর্চ জ্বলে উঠছে ওর স্কার্ট ভেদ করে ভেতরের অবয়ব দেখতে পাচ্ছি খানিকটা।
হঠাৎই হাসি ফুটলো সায়াকার মুখে। “তাহলে আমি বোধহয় একটু বেশি বেশি ভেবে ফেলেছি।”
“কীরকম?”
“ভাবতাম, আমাদের যখন সম্পর্ক ছিল, তখনই আমার মধ্যে অস্বাভাবিক এই বিষয়গুলো খেয়াল করেছ তুমি। তবুও আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছ। এর আগে কেউ কখনও অমনটা করেনি। এজন্যেই তোমার প্রেমে পড়েছিলাম।”
অপ্রস্তুত হাসি ফুটলো আমার মুখে।
“আমাকে বোধহয় একটু বেশিই দাম দিয়ে ফেলেছ তুমি। অবশ্য ওই বয়সের প্রেম-ভালোবাসায় এমনটাই হয়।”
“সেটা বলিনি আমি। কীভাবে যে বোঝাব…” রক্তিম হয়ে উঠেছে সায়াকার চেহারা। একবার কাঁধ নাচাল ও। “আসলেও বোকা আমি। এখন এসব বলে লাভ কী। সরি, কিছু মনে করো না।”
“আরে, ব্যাপার না,” অজান্তেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো আমার।
২
হাইস্কুলের দ্বিতীয় বর্ষে সায়াকা আর আমাকে একই শাখায় দেয়া হয়। পরিচয় শুরুটা সেখান থেকেই। এর আগে ওকে চিনতাম না। একদমই সাধারণ একটা মেয়ে। আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতন কিছু ছিল না ওর মধ্যে; আমার অন্তত সেটাই মনে হতো। কিন্তু পাশাপাশি বসে কিছুদিন ক্লাস করার পর ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়।
সমবয়সি অন্য মেয়েদের মত বাড়তি কোনো আদিখ্যেতা নেই, অনর্থক আহ্লাদ নেই। ভিড়ের পেছন দিকে থেকে বোঝার চেষ্টা করে সবকিছু। প্রথমে ভেবেছিলাম অন্তর্মুখী স্বভাবের মেয়েটা, সেজন্যেই সবসময় এমন আচরণ। তবে সেই ভুলও ভেঙ্গে যায় কিছুদিন বাদে।
ওকে দেখে প্রায়ই মনে হতো যেন হাইস্কুলের দ্বিতীয় বর্ষ শিরোনামে কোনো মঞ্চনাটক দেখছে। তবে নিজে কখনো সেই নাটকে অংশ নিবে না। চেহারায় শিশুসুলভ একটা কমনীয়তা থাকলেও, ব্যক্তিত্ব তার পুরো বিপরীত।
এই সায়াকা’কে একদমই অন্যরকম একটা মেয়ে মনে হয় আমার কাছে। ওর সাথে কথা বলতেও ভালো লাগতো। সেই সময়ে আমি নিজের রেজাল্ট নিয়ে খুব গর্বিত ছিলাম। ভেতরে ভেতরে নিজেকে বলতাম আশপাশের সবার তুলনায় অনেক এগিয়ে আমি।
“কুরাহাশি, তুমি দেখি একাই থাকো সবসময়,” একদিন সায়াকা’কে বলি আমি। “নিজেকে অন্যদের চেয়ে একটু উপরেই ভাবো বোধহয়।” জবাবে কিছু বলে না ও। কিছুক্ষণ পর পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমার দিকে।
“তোমার হাবভাবেও তো সেটাই মনে হয়।”
“আমি? হ্যাঁ, আমিও অনেকটা ওরকমই।”
আমার জবাব শুনে অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে হেসে মাথা নাড়ে সায়াকা। “একা থাকতেই ভালো লাগে আমার। ওদের সাথে মিশতে পারি না। কিন্তু কিছু করার নেই আসলে।”
“কেন?”
“কারণ…” কাঁধ ঝাঁকায় ও। “ওরা আমাদের সমবয়সি হলেও মানসিকতা এক রকম নয়। এটা মেনে নিতেই হবে। “
ওর জবাব শুনে থ বনে যাই।
একবার আমাদের স্কুলের কাছের একটা কালচারাল সেন্টারে ‘আন্তর্জাতিক সমাজের মুখোমুখি হবার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের করণীয় বিষয়ে একটা সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সায়াকা’কেও আমার সাথে যেতে বলি।
“একাও যাওয়া যায়, কিন্তু কারো সাথে গেলে পরে এই বিষয়ে আলাপ করা যাবে। তাছাড়া আমার সহপাঠীদের মধ্যে তুমিই একমাত্র যে ঘুমিয়ে পড়বে না ওখানে গেলে। অন্যরা হয়তো ‘সেমিনার’ অর্থও জানে না।”
কথাটা শোনার পর মৃদু হাসি ফুটলো ওর মুখে। “আমারও সেটাই ধারণা,” বলে সেমিনারে যেতে রাজি হয়ে যায় সায়াকা।
এরপর আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। প্রায়ই বিভিন্ন ক্যাফেতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করতাম। এক সময় আরো গভীর হয় সম্পর্ক। তখন ছুটির দিনগুলোও একসাথে কাটাতে শুরু করি আমরা। কথা বলার বিষয়ের অভাব ছিল না; তবে অর্থহীন কোনো বিষয়ে অযথা তর্ক করে সময় নষ্ট করতাম না।
“এভাবে কথা বলার মত একজন মানুষ খুঁজছিলাম এতদিন,” বলি আমি।
“আমিও,” সায়াকা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়।
এর কিছুদিন পরেই ওর বাড়ির কাছে একটা জায়গায় সন্ধ্যাবেলা চুমু খাই আমরা। তারও এক বছর পর একদিন ওর বেডরুমে মিলিত হই দু’জনে। বিপরীত লিঙ্গের শরীরের ব্যাপারে দু’জনেরই জ্ঞান তখন পর্যন্ত বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ।
“আসলে এটা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর কিছু নেই,” ওকে বলি। “সবাই করে। অনেকটা খাবার খাওয়া, কাপড় পরার মতন বিষয়টা।”
সায়াকাও একমত হয় আমার সাথে। “কেবল একসাথে শুয়েছে বলেই একে অপরকে সেটা নিয়ে কথা শোনানোর কোনো মানে হয় না। শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক টেকে না।”
জানি না সেদিন কে কাকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমরা। শুধু এটুকু জানি যে ওর মত একজন সঙ্গীর খোঁজেই ছিলাম সারাজীবন।
* * *
“ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?”
কন্ঠস্বরটা কানে আসতেই চোখ খুলি। সায়াকা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে
“না, চোখ লেগে এসেছিল একটু।”
“উল্টো দিকের ওই ঘরটা দেখতে চাই আমি।”
“আমিও যাব সাথে, চলো,” বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই।
বিছানা থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙছে সায়াকা, সেই সময় খেয়াল করলাম দাবার ছকের মতন সাদা-কালো নকশার কম্বলের নিচ থেকে কিছু একটা বের হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে কাগজ।
“এটা কী?”
কম্বলের এক কোনা ধরে উঠালাম আমি। বালিশেরপাশেই একটা কাগজ। সেটা উঠিয়ে দেখলাম গুটি গুটি অক্ষরে অনেক কিছু লেখা। একজন নয়, অনেকে লিখেছে কাগজটায়। ভালো করে দেখার জন্যে টর্চের সামনে আনলাম ওটা।
হঠাৎ একটা বাক্য দেখে জমে গেলাম ওখানেই।
“কী হলো?” পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে সায়াকা।
ধীরে ধীরে ওর হাতে কাগজটা দিয়ে লেখাটার দিকে ইঙ্গিত করলাম।
সায়াকারও আমার মতনই দশা হলো।
‘তোমার আত্মা শান্তি পাক, ইসুকে মিকুরিয়া।’ –
এই কথাটাই লেখা সেখানে।
৩
এই সম্ভাবনাটা যে আমার মাথায় উঁকি দেয়নি, তা নয়। ইউসুকের এই ঘরটা যেন নির্দিষ্ট একটা সময়েই থমকে আছে। ডায়রির লেখা হুট করে থেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিন্তাটা মাথায় এসেছিল ক্ষণিকের জন্যে হলেও। কিন্তু ভাবনাটা এত বেশি হৃদয় বিদারক যে মুখে আনিনি।
কাগজটা সায়াকার হাত থেকে নিয়ে আবারও চেয়ারটায় বসে প্রতিটা শব্দ সময় নিয়ে পড়লাম।
‘মিকুরিয়া, স্বর্গে ভালো থেকো।’- হিরোমি ইয়ামামোতো ‘বিদায়। তোমার জিরো ফাইটার প্লেন মডেলটা যত্ন করে রেখে দিব আমি।’- ইয়োচি ফুজিমোতো ‘আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। খুব বেশি খারাপ লাগছে। আবারও তোমার সাথে খেলতে চাই।’- হিরোশি ওনো
ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন রঙের মার্কার দিয়ে সহপাঠীর জন্যে বিদায়বার্তা লিখেছে কাগজটায়। এরপর নিশ্চয়ই শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে কাগজটা তুলে দেয়া হয় ইউসুকের পরিবারের কাছে। এই লেখাগুলো যে ছেলেটার পরিবারের মানুষদের, বিশেষ করে ওর মা’র মন ছুঁয়ে গেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দু’টো বার্তা আলাদাভাবে নজর কাড়ল আমার।
‘আর কিছুদিন পরেই প্রাইমারি স্কুল পাশ করে যেতাম আমরা, এই সময়ে তোমাকে হারালাম। প্রচণ্ড খারাপ লাগছে।’- ইয়াসুকো ওটা ‘প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ ইউসুকে মিকুরিয়ার কথা মনে হবে আমার।’- ওসামু তোদোকোরো
প্রাইমারি স্কুল শেষ হওয়ার কথা বলেছে ইয়াসুকো ওটা নামের ছেলেটা, অর্থাৎ ষষ্ঠ গ্রেডে পড়াকালীন সময়েই মারা গেছে ইউসুকে। ডায়রিতে শেষবারের মতন লিখেছিল ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে, এই হিসেবও মিলে যাচ্ছে। ইউসুকে ডায়রি লেখা থামায়নি, তার জীবনটাই থমকে গেছে।
“কী মনে হচ্ছে তোমার?” কাগজটা সায়াকার হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“কোন ব্যাপারে?”
“ইউসুকের মৃত্যুর কারণ। এভাবে হঠাৎ মারা গেল কেন? ডায়রি পড়ে তো মনে হয়নি যে কোনো অসুখে ভুগছে।”
“দুর্ঘটনা হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা।”
“এই সম্ভাবনাই প্রথমে মাথায় আসে, তাই না? স্কুলের কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলেই আমরা সড়ক দুর্ঘটনার কথা ভেবে নিই।”
“তোমার কি ধারণা ওর অন্য কিছু হয়েছিল?” মাথা একদিকে কাত করে জানতে চায় সায়াকা।
“এই ব্যাপারে তো নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা সম্ভব না এখন। কিন্তু আমার মন বলছে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি ইউসুকের। ও কিন্তু ডায়রিতে ‘ওই লোকটা’র মৃত্যুও কামনা করেছে শেষদিকে। এর পরপরই মারা গেল। এটাকে কি কাকতালীয় হিসেবে মেনে নেয়া যায়?”
আমার কথা শুনে শক্ত হয়ে গেল সায়াকার চেহারা। “কী বলতে চাইছ?”
“যেমনটা বললাম, এখনই নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাবে না। শুধু সন্দেহ হচ্ছে আর কি।”
“তোমার গলা শুনে তো মনে হচ্ছে আগে থেকেই ধারণা করেছিলে এমন কিছু হবে।”
“দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ কিন্তু পাইনি আমরা, পেয়েছি?”
“দুর্ঘটনা না হলে কীভাবে মারা গেল? ইউসুকে’কে কেউ খুন করেছে?” আমার দিকে তাকিয়ে বলে সায়াকা। রাগের ছাপ চোখে মুখে। একটু অবাকই হলাম। ইউসুকের জন্যে বোধহয় বেশিই খারাপ লাগছে ওর। ডায়রির লেখাগুলো পড়তে পড়তে ছেলেটার উপর মায়া জন্মে গেছিল।
“শুধু খুনই না…”
“তাহলে?”
“আত্মহত্যাও হতে পারে,” দ্বিধা ঝেরে বলেই ফেললাম। অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো সায়াকার মুখ দিয়ে। ওর অভিব্যক্তি খেয়াল করে পরের কথাগুলো বললাম। “ওই লোকটা’ আসলে কে, এটা জানি না আমরা। কিন্তু ইউসুকে তাকে পছন্দ করতো না, সেটা নিশ্চিত। এমনটাও হতে পারে যে শেষ পর্যন্ত অত্যাচার সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।”
“কিন্তু ওকে তো দুর্বল চিত্তের মনে হয়নি।”
এবারে নিশ্চিত হলাম ইউসুকের প্রতি আসলেও অনুরক্ত হয়ে পড়েছে সায়াকা।
“আত্মহত্যা যারা করে, তারা যে দুর্বল চিত্তের, এই ধারণাটা ভুল। কিন্তু যেমনটা বললাম একটু আগে, নিশ্চিত হবার কোনো উপায় নেই। একটা সম্ভাবনার কথা বলেছি।”
সায়াকা মুখে কিছু বললো না, কিন্তু আমার কথার সাথে একমত বলেও মনে হচ্ছে না।
“যাইহোক, চলো ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরটা থেকে ঘুরে আসি আগে” চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলি।
হাতের কাগজটা বালিশের উপর রেখে কম্বলটা আগের মত করে দিল সায়াকা।
ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরে ঢুকে প্রথমেই কাজ ভাগ করে নিলাম আমরা। কোথাও খোঁজা বাদ রাখলাম না। সায়াকার ধারণা ইউসুকের বাবা যেহেতু ছেলেকে ডায়রি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তার নিজেরও হয়তো ডায়রি লেখার অভ্যাস ছিল। এটা খুবই সম্ভব।
তবে ইউসুকের বাবার ডায়রি পাওয়া গেলেও সেটা আমাদের কোনো কাজে আসবে কিনা সন্দেহ, ইউসুকের মৃত্যুর অনেক আগেই লোকান্তরিত হয়েছিল সে।
আলমারির সামনে এসে দাঁড়ালাম। সিন্দুকের মতন বাক্সটা খুলতে হবে। বেশ পুরোনো, খোলা সহজ হবে না।
এসবই ভাবছি, এমন সময় সায়াকা বললো, “এটা কী?”
ওর দিকে তাকালাম। হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে টেবিলের নিচে হাত ঢুকিয়ে বাদামি একটা ব্যাগ বের করে আনলো।
“দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে ভেতরে,” বলি আমি।
ভেতরে উকি দিল ও। “চিঠির মতন লাগছে।”
“বের করে আনো।”
আশপাশে তাকিয়ে অবশেষে বিছানার উপরে ওগুলো ছড়িয়ে রাখলো সায়াকা। দশ বারোটার মতন ভাঁজ করা কাগজ। দেখে মনে হচ্ছে খাম থেকে বের করা হয়েছে সদ্য। কিন্তু খাম দেখলাম না। একটা চিঠি হাতে নিলাম। একপাশে কেমন আঠার মত হাতে ঠেকল। নিশ্চয়ই অতীতে কোনো এক সময়ে ব্যান্ড দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
প্রথম যে চিঠিটা হাতে নিয়েছি, সেটাই প্রায় তিন পাতার মতন লম্বা। মূল লেখা পড়ার আগে একদম শেষে উঁকি দিলাম একবার, জানতে চাই চিঠিটার প্রেরক আর প্রাপক কে।
চিঠির একদম শেষে সুন্দর নীল কালি দিয়ে লেখা-
“৩০ আগস্ট, কেইচিরো মিকুরিয়া
মাসাতসুগু নাকানো বরাবর।”
অবাকই হলাম দেখে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম চিঠিগুলোর প্রাপক হবে মিকুরিয়া পরিবার প্রধান। কিন্তু এখন দেখছি উল্টো। সায়াকা’কে বললাম কথাটা।
“আমিও সেটাই ভেবেছিলাম,” অন্য চিঠিগুলো দেখে বললো ও। সবগুলোই মাসাতসুগু নাকানোর উদ্দেশ্যে কেইচিরো মিকুরিয়ার লেখা চিঠি।”
“কেইচিরো মিকুরিয়া তো বোধহয় ইউসুকের বাবা। কিন্তু এই মাসাতসুগু নাকানোটা কে?”
“আমি কেবলই নামটা কোথায় যেন দেখলাম। কই গেল…” বলে বইয়ের তাকটার দিকে এগোলো সায়াকা।
আমার হাতের চিঠিটার দিকে তাকালাম। নিয়ম রক্ষার কিছু কুশল বার্তার উপরে চোখ বুলিয়ে মূল লেখাটুকু পড়তে শুরু করলাম জোরে-
‘আমাদের বড় ছেলেকে দেখেশুনে রাখার জন্যে আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। স্কুল থেকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে ওরা ওকে নিতে রাজি। ওর ভবিষ্যত নিয়ে বড্ড দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি; অলস বসে থাকবে না, অসৎ সঙ্গেও জড়াবে না। সত্যি বলতে অনেক দিন পর একটু ভারমুক্ত অনুভব করছি। ভেবেছিলাম ওকে আরো ভাল করে চেষ্টা করতে বলবো। কিন্তু একটা গ্লাসে এক গ্লাস পানিই আটবে; এর বেশি নয়। এখন আর আগের মতন উচ্চাশা করছি না। আপনাকে ঝামেলায় ফেলার জন্য মাফ করবেন।’
কী চলছে কিছুই বুঝছি না। এখানে বড় ছেলে বলতে যাকে বোঝানো হয়েছে, সে নিশ্চয়ই ইউসুকে মিকুরিয়া। কিন্তু, ওর সাথে বাকি বর্ণনাটুকু ঠিক খাপ খায় না। আর এই ভর্তির ব্যাপারটা কী?
“এই যে, পেয়েছি,” সায়াকার হাতে পেল্লায় একটা বই। পাতাগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বেশ পুরোনো। বইটার নাম ‘আইন ব্যবস্থা’, যেখানে সম্পাদকদের মাঝে একজন হচ্ছে মাসাতসুগু নাকানো।
বইটায় ভদ্রলোকের ব্যাপারে কিছু লেখা আছে কিনা জানার জন্যে প্রথম দিকের পাতাগুলো ওল্টালাম। শুরুতে কিছু নেই, কিন্তু একদম শেষ দিকে তার সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পেলাম। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক।
“কেইচিরো মিকুরিয়া খুব সম্ভবত মাসাতসুগু নাকানোর ছাত্র বা ইউনিভার্সিটির জুনিয়র।” সদ্য পড়া চিঠিটা সায়াকা’কে দেখালাম। ওকেও বিভ্রান্ত দেখাল ওটা পড়ার পর।
“বড় ছেলে বলতে কাকে বোঝাচ্ছে? ইউসুকে?”
“সেক্ষেত্রে হিসেব তো মেলে না,” বলে বইটা কবে প্রকাশিত হয়েছে, সেটা খুঁজতে লাগলাম। প্রায় ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু আমি অবাক হলাম পাশের লেখাটা পড়ে। “আরে…”
“কী হলো?”
“দেখো, এটাও সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের দোকান থেকে কেনা হয়েছে।”
প্রিন্টার্স লাইন5 পাতাটা দেখালাম। ওখানে ছোট্ট করে পেন্সিল দিয়ে মূল্য লেখা। কপালে ভাঁজ পড়লো সায়াকার।
“অদ্ভুত! লোকটা কেইচিরো মিকুরিয়ার শিক্ষক হোক বা সিনিয়র; তাই বলে সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের দোকান থেকে তার বই কিনবে?”
সায়াকা একবার আমার দিকে, আবার বইটার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।
“বাদ দাও, বাকি চিঠিগুলো পড়ি চলো।”
প্রতিটি চিঠিতে তারিখ লেখা থাকলেও বছর লেখা নেই। তাই সেগুলো সময়ক্রম অনুযায়ী পড়ছি কিনা আমরা, তা বলতে পারব না। বিছানায় পাশাপাশি বসে দু’জনেই টর্চের আলোতে চিঠি পড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বাইরে মুহুর্মুহু বজ্রপাত থেমেছে, বৃষ্টিও ধরে এসেছে, কিন্তু ঝড়ো বাতাস বইছে এখনো।
‘উপহারগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞতা জানবেন। আমার স্ত্রী’র ভীষণ পছন্দের জিনিস, আমার চেয়ে ও-ই বেশি খুশি। আপনার মূল্যবান পরামর্শ সত্ত্বেও এই বছরের প্রবেশিকা পরীক্ষায় আবারও অকৃতকার্য হয়েছে আমার ছেলে। ওর আচার আচরণ দেখে তো মনে হয় এই প্রজন্মের সবার একই অবস্থা; প্রচণ্ড অলস। ওকে দেখামাত্র মাথা ধরে যায় আমার। আরো এক বছর এভাবে যাবে, ভাবতেই খারাপ লাগছে। তা-ও নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না যে আগামী বছরেও ও সফল হবে কিনা। ভবিষ্যতে কপালে কী খারাবী অপেক্ষা করছে কে জানে।
এভাবে অভিযোগ জানানোর জন্যে দুঃখিত। আপনার স্বাস্থ্য ঠিক আছে শুনে ভালো লাগছে। এই বছর ঠাণ্ডা বেশি পড়বে, নিজের খেয়াল রাখবেন।’
চিঠিটা লেখা হয়েছে ডিসেম্বরের ২০ তারিখে। পড়ে যতদূর বুঝলাম এর আগেই কেইচিরো মিকুরিয়া ভালো কিছু উপহার পেয়েছে মাসাতসুগু নাকানোর তরফ থেকে। সিনিয়র কেউ আগে উপহার দেয় না সাধারণত, হয়তো কেইচিরো মিকুরিয়াই প্রথমে কিছু পাঠিয়েছিল। সেটার বিনিময়ে পাল্টা উপহার দিয়েছে মাসাতসুগু নাকানো।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে কোনো এক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে মিকুরিয়ার ছেলে। পরীক্ষাটা সম্ভবত প্রতি বছরেই অনুষ্ঠিত হয়।
“অ্যাই, এটা দেখো,” আমি গভীর ভাবনায় মগ্ন, এমন সময় বলে সায়াকা। “ইউসুকের নাম আছে এখানে।”
ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম।
‘আপনি প্রথম উপহার পাঠালেন। আমরা তো নিশ্চিতও ছিলাম না যে ছেলে হবে নাকি মেয়ে। পরে যখন দেখলাম ছেলে, খুশি না হয়ে পারিনি। আপনার কাছে বোধহয় হাস্যকর শোনাচ্ছে কথাটা।
ওর নাম রেখেছি ইউসুকে। পুরো রাত ধরে ভেবেছি কী নাম দেয়া যায়। আশা করি ও অন্তত নামের মর্যাদা রক্ষার জন্যে হলেও কিছু একটা হবে।
ইউসুকে একটু বড় হলে পুরো পরিবার নিয়ে আপনার সাথে দেখা করে যাব। অসংখ্য ধন্যবাদ।’
দু’বার পড়লাম চিঠিটা। “আশা করি ও অন্তত নামের মর্যাদা রক্ষার জন্যে হলেও কিছু একটা হবে। এই কথাটা…”
“আমারও খটকা লেগেছে এখানটায়,” সায়াকা বলে। “যেন ইউসুকের জন্মের আগে কেউ হতাশ করেছে তাকে।”
একটু আগে পড়া চিঠিটা আবারও হাতে নিলাম।
“ইউসুকে তার বড় ছেলে নয়। এখানে যার কথা বলা হয়েছে, সে-ই মনে হচ্ছে প্রথম সন্তান। মিকুরিয়া দম্পতির আসলে দুই ছেলে ছিল।”
“তাহলে কি চারজনের পরিবার?
“সেটাই মনে হচ্ছে এখন।”
“দু’জনের মধ্যে বয়সের পার্থক্য অনেক বেশি।”
“একটু আগে কী আলোচনা করেছিলাম আমরা, মনে আছে? ইউসুকে বাবা-মা’র বাড়তি বয়সের সন্তান। অর্থাৎ অ্যালবামে আমরা যে বয়স্ক মহিলাকে দেখেছি, তিনিই ইউসুকের মা।”
“আচ্ছা…” বলে মাথা নাড়ে সায়াকা। আমার হাতের চিঠিটার দিকে মাথা নুইয়ে তাকায়। “কোন পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে এখানে?”
“এটা নিয়েই ভাবছি এতক্ষণ ধরে। আমার ধারণা সহকারী জজ পদে নিয়োগের জন্যে যে পরীক্ষা নেয়া হয়, সেটার কথা বলা হয়েছে। জুডিসিয়াল সার্ভিস এক্সাম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা না। নাহলে ছেলেটার বাবা এভাবে বলবে কেন?”
“মিস্টার মিকুরিয়া আইনজীবি ছিলেন। হয়তো ছেলেকে উত্তরসূরী বানাতে চেয়েছেন।”
“কোনো সন্দেহ নেই সেই ব্যাপারে। কিন্তু বড় ছেলে কয়েকবার পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারেনি। তাই তাকে জজ না বানিয়ে শিক্ষক বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।”
“শিক্ষক?”
“এই যে এখানেই আছে,” প্রথম চিঠিটা দেখাই ওকে। “স্কুল ওকে নিতে রাজি হয়েছে, এটাই তো লিখেছেন উনি, তাই না? এখানে আসলে স্কুলে চাকরির সুযোগ মিলেছে বুঝিয়েছেন মিস্টার মিকুরিয়া।”
“একটা গ্লাসে কেবল এক গ্লাস পানিই আটে…” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে সায়াকা। “তাহলে দ্বিতীয় সন্তানের উপরেই ভরসা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।”
“হ্যাঁ। কিন্তু ইউসুকে’কে সফল হতে দেখার আগেই তার মৃত্যুর ব্যাপারটা দুঃখজনক। বেঁচে থাকলে অবশ্য সন্তানের মৃত্যুর সাক্ষী হতে হতো, সুতরাং এক দিক দিয়ে চিন্তা করলে ভালোই হয়েছে।”
“হুম…” ভাবছে সায়াকা। হঠাৎই ভ্রু-জোড়া কপালে উঠে গেল ওর কিছু একটা ধরতে পেরেছে নিশ্চয়ই। যদি ইউসুকের উপরেই বাজি ধরার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তিনি, তাহলে বড় ছেলের মনের অবস্থা কী হবে চিন্তা করো।”
“আমরা বোধহয় একই কথা ভাবছি,” বলি আমি।
বিস্ফারিত নয়নে আমার দিকে তাকালো সায়াকা। “তুমিও কি এটাই ভাবছ? ডায়রির ‘ওই লোকটা’ আসলে ইউসুকের বড় ভাই?”
“আমারও সেটাই মনে হচ্ছে। ডায়রিটা যখন লিখতে শুরু করে ইউসুকে, তখন বড় ছেলে মিকুরিয়াদের সাথে থাকত না। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সে সুযোগ বুঝে ফিরে আসে।”
“এসেই টর্চার করতে শুরু করে ইউসুকে’কে।”
“হ্যাঁ।”
দাঁতে দাঁত চেপে আমার দিকে তাকালো সায়াকা।
“বাকি চিঠিগুলো পড়ে ফেলি। তাহলে পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে।”
“হ্যাঁ,” বলে আবারও চিঠিগুলো হাতে নিল ও।
আমাদের আন্দাজ বোধহয় ভুল না। চিঠিগুলোতে যা লেখা, সেখান থেকে মিকুরিয়া পরিবারের সেই সময়কার অবস্থা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারলাম।”
‘আপনার চিঠির জন্যে ধন্যবাদ। ইউনো খুব শিঘ্রই ফিরবে নাকি? ওর ভালো ফলাফলের কথা শুনে আমরা সবাই খুব খুশি। ও ফিরলে দেখা করবো অবশ্যই। আপনি যে দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে এত দ্রুত জানতে পেরেছেন, এটা শুনে অবাক হয়েছি। আসলে আমরা কাউকেই বলিনি তখন। মাফ করবেন সেজন্যে। যেহেতু এর আগে ছেলে হয়েছে, তাই এবারে ছেলে হোক বা মেয়ে, আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’
এই চিঠিটা নিশ্চয়ই ইউসুকের জন্মের আগের। কেইচিরো চিঠিতে বলেছেন ঠিকই যে ছেলে হোক বা মেয়ে, আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কিন্তু ইউসুকের জন্মের পরে ঠিকই খুশি হয়েছিলেন।
আর তার বড় ছেলে শিক্ষকতার পেশায় প্রবেশের পরপরই বিয়ে করে ফেলে। নাকানো মাসাতসুগুও নিমন্ত্রিত ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানে। চিঠিটা এরকম-
‘বড় ছেলের বিয়ের পর অবশেষে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি। ব্যস্ততার কারণে সেদিন আপনার সাথে খুব বেশি কথা হয়নি, মাফ করবেন। আমার ছেলে আর ছেলের বউ মধুচন্দ্রিমা থেকে ফিরে আমাদের সাথে দেখা করে গেছে। বিয়ে হয়েছে ওর, আশা করি এবারে একটু হলেও দায়িত্ববানের মত আচরণ করবে। সেদিন অতিথিদের সামনে কনের পরিচয় পর্ব একটু তাড়াহুড়ো করেই শেষ করা হয়েছিল বোধহয়। এখানে বিস্তারিত বলছি। মেয়ে আসলে আমার স্ত্রী’র পরিবারের দূর সম্পর্কের আত্মীয়, হোলসেল ফুডের ব্যবসা ওদের। দুই বোনের মধ্যে ও ছোট, পড়াশোনা শেষে পারিবারিক ব্যবসায় সাহায্য করেছে কিছুদিন। এমনি মেয়ে খুব ভাল, কিন্তু শরীর-স্বাস্থ্য বেশ দুর্বল, এজন্যে চিন্তা হয়। কিন্তু আমার ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, এটাই অনেক।
ভবিষ্যতেও আপনার পরামর্শের দরকার হবে আমার, আশা করি তখন সময় দিতে পারবেন। আবহাওয়া এই ভালো তো এই খারাপ, নিজের যত্ন নেবেন।’
কেইচিরো মিকুরিয়া ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করা থামাতে পারেননি, এই চিঠিতেও সেটা স্পষ্ট। আর তার এই চিন্তা যে যুক্তিসঙ্গত তা পরবর্তী দুটো চিঠি থেকে আরো ভালো করে বোঝা যায়।
‘মাফ করবেন, আপনাকে কথাটা আরো আগে জানানো হয়নি, আমার ছেলে আবারও বিয়ে করেছে। ওর বর্তমান স্ত্রী একজন পিয়ানো বাদক, বাবা-মা নেই। আর পিয়ানো সে কোনো শিল্পী গোষ্ঠীর সাথে বাজায় না, বাজায় নাইটক্লাবে। সেখানেই আমার ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছে তার। আপনি তো জানেন, আমার আগের পুত্রবধূ বিয়ের দুই বছরের মাথায় মারা যায়। এরপরে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, কিন্তু আমি মানা করে দিয়েছি। কারণ আমার ছেলে এখনও পরিবারের দায়িত্ব নিতে অক্ষম। মেয়েটা খুব সম্ভবত আমার ছেলের অত্যাচারেই মারা গেছে, ওর কারণেই স্বাস্থ্য বেশি ভেঙ্গে পড়েছিল। এই চিন্তাটা মাথায় আসলেই বুক ফেটে কান্না পায়। জানি না কবে আমার ছেলের একটু দায়িত্বজ্ঞান হবে।’
তাহলে কেইচিরো মিকুরিয়ার বড় ছেলের প্রথম স্ত্রী মারা গেছে। আগের চিঠিতেই অবশ্য তিনি লিখেছিলেন যে মেয়েটা শারীরিকভাবে দুর্বল। কোনো অসুখ ছিল বোধহয়।
দ্বিতীয় বিয়েটাও টেকেনি।
‘আপনাকে এত ঝামেলায় ফেলার জন্যে দুঃখিত। টাকাপয়সার দিকটা আমি সামলে নিয়েছি। স্কুলের তরফ থেকে বলেছে ও স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিলে আর কোনো সমস্যা হবে না।
আসলে এই বিষয়ে কথা বলতে গেলেই লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে আসে। আর নিতে পারছি না এই বয়সে। কিছুদিন আগে আমার আত্মীয়-স্বজনেরা বাসায় বসেছিল ওর ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলার জন্যে। এরকম জঘন্য একটা কাজ যে করতে পারে, তার জন্যে আমার কোনো মায়া নেই। একজন শিক্ষক যদি জুয়ার মত ঘৃণ্য ব্যাপারে জড়িত থাকে, তাহলে মানুষ তো রাগবেই। অনেকে নানারকম কথা শুনিয়েছে। অসংখ্য পাওনাদার আছে এখনো। কিন্তু ওর মধ্যে অনুতাপের ছিটেফোঁটাও দেখিনি। মানসিক সমস্যা আছে বোধহয়। ওকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর কথাও বলেছে অনেকে। দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না আমার।
এখন আপাতত আমার নজরদারিতেই আছে। চাই, নতুন করে আবার শুরু করুক সবকিছু। আমারও বয়স হয়েছে। কিন্তু এখন যদি হাল ছেড়ে দেই, ইউসুকের জন্যে সেটা একটা খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। আসলে আমি ইউসুকের ভবিষ্যত নিয়েই বেশি চিন্তিত। ভাগ্য ভাল যে ছেলেটা কারো সাতে পাঁচে নেই।
ওর দ্বিতীয় স্ত্রী-ও চলে গেছে। সামনের দিনগুলোতে কী করবে, তা আমার জানা নেই। যাইহোক, চোখে চোখে রাখতে হবে, একেবারে ছেড়ে দিলে চলবে না। নিজেকে শোধরাতে পারছে কিনা, সেই খেয়াল রাখাটা আমার কর্তব্য।
আপনার শরীর কেমন আছে? একজন ভালো ডাক্তারকে চিনি আমি। যদি আপনি চান, তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি। জানাবেন দয়া করে।’
যেহেতু চিঠিটায় বছরের উল্লেখ নেই, কেইচিরো মিকুরিয়ার বড় ছেলের দ্বিতীয় বিয়ে কতদিন টিকেছিল, তা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন তার এই হাল হলো, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
“ইউসুকের বড় ভাই একদম বখাটে ধরনের ছিল তাহলে,” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মন্তব্য করে সায়াকা।
“ধীরে ধীরে বিষয়গুলো পরিষ্কার হচ্ছে। ‘ওই লোকটা’ আসলে মিকুরিয়াদের বড় ছেলে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইউসুকে মারা গেল কীভাবে?”
“হ্যাঁ,” বিচলিত দৃষ্টিতে আশপাশে তাকিয়ে বলে সায়াকা। “এই প্রশ্নের উত্তর পেলে স্মৃতিগুলোও ফিরে পাব হয়তো।”
“সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। হয়তো তুমি এখানে কেবল খেলাধুলা করতে আসতে,” সরাসরিই বললাম কথাটা।
“তাই?” সন্দিহান ভঙ্গিতে একদিকে মাথা কাত করলো সায়াকা। “চিঠিগুলো পড়া শেষ?”
“আরো একটা আছে,” বলে শেষ চিঠিটার ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করলাম। এখানে মূলত কেইচিরো মিকুরিয়ায় কাজ সংক্রান্ত আলাপই বেশি। ইউসুকে এবং তার বড় ভাইয়ের কোনো উল্লেখ নেই। চিঠিটা যে আমাদের কোনো কাজে লাগবে না, এটা কেবলই সায়াকা’কে বলবো, এমন সময় শেষ অনুচ্ছেদটা চোখে পড়লো। না চমকিয়ে পারলাম না।
“কী হয়েছে?”
কিছু না বলে সায়াকার দিকে চিঠিটা বাড়িয়ে ধরলাম। পড়তে পড়তে চেহারা গম্ভীর হয়ে উঠলো ওর। যখন চিঠিটা নামিয়ে রাখল, দু’চোখ একদম লাল।
“এখানে কি বাবার কথা বলা হয়েছে?”
“তাই তো মনে হচ্ছে,” মাথা নেড়ে বলি।
চিঠির শেষে লেখা-
‘আমাদের বাসায় যে মেয়েটা কাজ করতো তার সাথে কিছুদিন আগে আমাদের ড্রাইভারের বিয়ে হয়েছে। এই ড্রাইভার ছেলেটাই কিন্তু চুরি করতে ঢুকেছিল আমাদের বাড়িতে, আপনাকে আগে বলেছিলাম বোধহয়। ওর এই পরিবর্তন দেখে এত ভালো লাগে। আমরা খুব দ্রুত মানুষকে বিচার করে ফেলি।’
কম্পমান হাতে চিঠিটা আবারও দেখলো সায়াকা।
“বাবা তাহলে আসলেও এসেছিল এখানে। এখানেই থাকতো।”
“একটু চিন্তা করে দেখো, ওনাদের যদি বাসায় পরিচারিকা রাখার সক্ষমতা থাকে, তাহলে ড্রাইভার রাখাও কোনো ব্যাপার না। এটা আরো আগে ভাবা উচিত ছিল আমার।”
“কিন্তু বাবা চুরি করার জন্যে ঢুকেছিল এখানে…”
“শোনো, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অনেক কিছুই করতে হয় মানুষকে এটা নিয়ে বেশি ভেবো না। আর চিঠিটা পড়ে মনে হচ্ছে, কেবল চুরির চেষ্টা করেছিল সে। মিকুরিয়া পরিবারও পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেনি।”
“এরপর তাকে ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ দেয়।”
“হ্যাঁ, কেইচিরো মিকুরিয়াও বুঝতে পেরেছিলেন যে বাধ্য হয়েই চুরি করতে ঢুকেছিলেন আংকেল।”
“তাহলে বাবার ভাগ্য ভালো বলতে হচ্ছে।”
“হ্যাঁ,” জবাবে বলি।
চিঠি হাতে বিছানা থেকে উঠে ঘরের ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করলো সায়াকা।
“কেইচিরো মিকুরিয়া বাবার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। টাকা পয়সা দিয়েও সাহায্য করেছেন নিশ্চয়ই।”
“অসম্ভব কিছু না।”
“সেক্ষেত্রে,” আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “যে বয়স্ক মহিলার ছবি আমরা অ্যালবামে দেখেছি, যাকে আমি দাদি বলতাম, তিনিই মিসেস মিকুরিয়া। বাবা সবসময় বলতো যে উনি আমাদের অনেক উপকার করেছেন।”
একমত না হয়ে পারলাম না।
“কিন্তু,” আবার আঁধার ঘনালো ওর চেহারায়। “বাবা আমাকে এই ব্যাপারে কিছু বলেনি কেন? বললেই তো ভালো হতো।”
“কোনো বাবা-মাই চায় না অতীতের ভুল ত্রুটি সম্পর্কে তার সন্তান কিছু জানুক।”
মাথা একদিকে কাত করে কিছুক্ষণ ভাবে সায়াকা, এরপর আমার উদ্দেশ্যে চিঠিটা নেড়ে জিজ্ঞেস করে, “আমার কি এটা নেয়া উচিত হবে?”
“অবশ্যই। এটা তোমারই প্রাপ্য।”
মৃদু হেসে চিঠিটা সুন্দরমত ভাঁজ করে স্কার্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো সায়াকা।
উঠে দাঁড়ালাম আমি। “বাইরে যাই একটু।”
“কোথায়?”
“দেখি গাড়িতে কী যন্ত্রপাতি আছে। ওটা খোলার চেষ্টা করবো,” সিন্দুকের মতন বাক্সটার দিকে দেখিয়ে বলি। “ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকলেও থাকতে পারে।”
“পারবে খুলতে?”
“দেখা যাক।” ঘরটা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমি।
বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। চারপাশের গাছপালা সব বিলীন হয়ে গেছে অন্ধকারে। গাড়ির কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে আমার জুতো কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল।
এরকম একটা জায়গায় বাড়ি বানানোর মানে কী? ছুটি কাটানোর জায়গা হলে তা-ও মানা যেত, কিন্তু একজন বিচারকের পরিবার এখানে থাকবে কেন?
অনেক কিছুই অদ্ভুত ঠেকছে এখনও।
আমার গাড়িতে যন্ত্রপাতি বলতে কাঠের কিছু যন্ত্রপাতি। ছুটির দিনগুলোতে শখের বশে কাঠ দিয়ে এটাসেটা করি আমি। এগুলো আদৌ কোনো কাজে আসবে কিনা কে জানে।
ভেতরে ফিরে দেখি সায়াকা বিছানায় কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। সারাদিন যেরকম মানসিক আর শারীরিক ধকল গেছে বেচারির উপর দিয়ে, ঘুম আসাটাই স্বাভাবিক। আমি কোনো শব্দ না করে যন্ত্রপাতির বাক্সটা নামিয়ে পাশের রকিং চেয়ারটায় বসলাম। পুরোনো চেয়ারটা আমার ভার সইতে না পেরে মৃদু ক্যাচ শব্দ করে উঠলো একবার, তবে সায়াকার ঘুম ভাঙল না তাতে।
ইউসুকের ডায়রি আর চিঠিগুলোর ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে ঘরময় চোখ বুলালাম একবার। মোটামুটি একটা চিত্র দাঁড় করিয়ে ফেললাম কিছুক্ষণের মধ্যে।
প্রথমে, এই বাড়িটার মূল বাসিন্দা ছিল তিনজন। কেইচিরো মিকুরিয়া, তার স্ত্রী এবং বড় ছেলে। এছাড়াও তখন বাড়িতে কাজ করতো ‘ওটাই ‘আন্টি’, যার আসল নাম তামিকো কুরাহাশি। মাঝে সন্তান লালন পালনের জন্যে কিছুদিনের বিরতি নেয় তামিকো।
বাড়ির প্রধান, কেইচিরো চেয়েছিলেন বড় ছেলে তার মতই বিচারক হবে, কিন্তু তার আশায় পানি ঢেলে দেয় ছেলেটা।
দ্বিতীয় সন্তান হলে, তাকে নিয়ে প্রত্যাশার জাল বুনতে শুরু করেন তিনি। ততদিনে বড় ছেলে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেয়ার পর বিয়েও করে ফেলেছে। দু’বছরের মাথায় মারা যায় তার প্রথম স্ত্রী। এরপর এক পিয়ানোবাদিকাকে বিয়ে করে সে। তবে সেটা যে কতদিন পরের কথা, তা চিঠিতে উল্লেখ নেই।
একসময় জুয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে ইউসুকের বড় ভাই। প্রচুর টাকা ধার করে এর-ওর কাছ থেকে। এই কথা জানাজানি হবার পর শিক্ষকতার চাকরিও ছাড়তে হয় তাকে।
ইউসুকে যখন প্রাইমারি স্কুলের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন কেইচিরো মিকুরিয়া পরলোকগমন করেন। খুব সম্ভবত ব্রেইন টিউমর হয়েছিল তার। এই সুযোগে বড় ছেলে ফিরে আসে বাসায়।
এরপর প্রায় এক বছর বড় ভাইয়ের হাতে নির্যাতনের শিকার হয় ইউসুকে। এক পর্যায়ে ডায়রিতে তার মৃত্যু কামনা করে ছেলেটা, নির্যাতনের মাত্রা এতই বেশি ছিল।
ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে মারা যায় ইউসুকে।
এই বাড়িটার এরকম বিমর্ষ হাল কেন, তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি এখন। বিজ্ঞানকে হিসেবের আওতার বাইরে রেখে বললে, বাড়িটা অভিশপ্ত। সেই অভিশাপের কারণেই সায়াকার স্মৃতিবিভ্রাট হয়েছে কিনা, তা জানতে হবে।
এসবই ভাবছি, এমন সময় ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করে উঠলো সায়াকা। সাথে সাথে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
বিছানায় গোঙাচ্ছে ও। সাপের মত মোচড় খাচ্ছে পুরো শরীর। সামনে এগিয়ে ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে লাগলাম।
“কী হয়েছে! ওঠো! ওঠো।”
ওর গালে কয়েকবার চাপড় দিলাম ধীরে।
অল্প চোখ খুলে এদিক-ওদিক তাকালো সায়াকা, যেন কিছু একটা খুঁজছে। এরপর আমাকে দেখতে পেল সামনে। কাঁধজোড়া এখনও কাঁপছে মৃদু।
“কী হয়েছে? স্বপ্ন দেখছিলে?”
ফ্যাকাসে হয়ে আসা গালে দুই হাত রেখে আবারো চারপাশে নজর বুলালো ও।
“কালো ফুলদানি, সবুজ পর্দা…” ঘোরলাগা কণ্ঠে বললো একটু পর।
“কী?”
“হ্যাঁ, ছিল তো! লম্বা কালো ফুলদানি, সবুজ পর্দা। ওই ঘরে! আমি যেখানে গিয়েছিলাম। “
“কোন ঘর?”
“ওই যে ওখানে,” বলে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল সায়াকা। আমিও টর্চ হাতে গেলাম পেছন পেছন।
নিচতলায় চলে এলো ও। লিভিং রুম পার হয়ে ডাইনিং রুমের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে ছোট্ট করিডোরটার একদম মাঝে দাঁড়িয়ে পড়লো।
“কী হলো?”
দেয়ালের দিকে ইশারা করলো ও। “এই যে এখানে।”
“এখানে? কী এখানে?”
“দরজা।”
“দরজা?”
“এখানে একটা দরজা ছিল, আমি ভেতরে গিয়েছিলাম। ঘরটায় কালো ফুলদানি আর সবুজ পর্দা। ওখানে, আমি…”
এটুকু বলে মেঝেতে ঢলে পড়লো সায়াকা।
8
পিয়ানোর উপরে রাখা পুতুলটা তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। সায়াকা’কে একটা সোফার উপরে নিয়ে শুইয়ে দিলাম। কিন্তু ওর জ্ঞান আছে কিনা, তা বুঝতে পারছি না। চোখ খোলা হলেও শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিলিং বরাবর।
“সায়াকা!” জোরে ডাক দিলাম একবার। ওর মণিগুলো ধীরে ধীরে ঘুরে গেলো আমার দিকে। চোখ পিটপিট করলো কয়েকবার।
“সরি,” ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বললো একটু পর।
“তুমি ঠিক আছো?”
“হ্যাঁ। এখন ঠিক আছি।” উঠে বসলো ঠিকই, কিন্তু হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না যে ঠিক আছে। চোখ বন্ধ করে ওভাবেই রইলো টানা কিছুক্ষণ।
“তুমি হঠাৎ ওভাবে পড়ে যাওয়ায় চমকে গেছি।”
“তাই?” দুর্বল হেসে বলে সায়াকা। “প্রথমবার হলো এমনটা। হঠাৎই গা গুলিয়ে উঠলো একবার, এরপর সবকিছু ঘুরতে শুরু করলো বনবন করে, আর কিছু জানি না।”
“কোথাও ব্যথা করছে?”
“না, সব ঠিকই আছে মনে হচ্ছে।”
ওর পাশে গিয়ে বসলাম।
“অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে অদ্ভুত কীসব যেন বলছিলে।”
বাম হাত দিয়ে ডান হাতের কব্জি কয়েকবার ঘষলো ও। “হ্যাঁ, আসলেও অদ্ভুত।”
“স্বপ্ন দেখছিলে?”
“বলা যায়। কিন্তু ঠিক স্বপ্নও না। আসলেও মনে হচ্ছিল যে কিছু একটা দেখেছি।”
“ওখানে?”
“হ্যাঁ, ভেতরে একটা কালো ফুলদানি আর সবুজ পর্দা।”
উঠে দাঁড়িয়ে কম্পমান পায়ে যেখানটায় জ্ঞান হারিয়েছিল, সেদিকে এগিয়ে গেল সায়াকা। আমিও পিছে পিছে গেলাম।
“এখানে একটা দরজা ছিল, যেটা দিয়ে ভেতরে ঢুকতাম,” করিডোরের দেয়ালের দিকে ইঙ্গিত করে আবারও সেই একই কথা বললো ও।
“কিন্তু এখানে তো কোনো দরজা নেই,” আমি ওকে বলি। “আর ওরকম কোনো ঘরও নেই, কারণ দেয়ালের ওপাশে তাতামি ঘরটা। “
“হ্যাঁ,” বলে দুই হাতে কপাল চেপে ধরে সায়াকা। “কিন্তু আমার পরিষ্কার মনে আছে এখানে একটা দরজা ছিল। সেই দরজা দিয়েই রুমটার ভেতরে ঢুকতাম। আসলেও অদ্ভুত। দরজাটা নেই কেন এখানে?” অনিশ্চিত ভঙ্গিতে হাসলো ও। “আমি একটা গর্দভ। যেহেতু দেখাই যাচ্ছে যে এখানে দরজা নেই, তাহলে তো আসলেও নেই। কিছু বলা অর্থহীন।”
“অন্য কোনো ঘরের সাথে গুলিয়ে ফেলোনি তো?”
সম্ভবত ওর মনে ধরলো কথাটা। গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। কিন্তু খানিক বাদেই মাথা ঝাঁকিয়ে মানা করে দিল। চেহারায় আত্মবিশ্বাস প্রকট হচ্ছে ক্রমশ।
“নাহ, সন্দেহ নেই। এখানেই ছিল। দরজাটা খুললে সেখান থেকে রান্নাঘর দেখা যেত।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টর্চ ফেললাম দেয়ালে। কিন্তু সেখানে পুরোনো কোনো দরজার চিহ্নমাত্র নেই। বরং আমার নজর কাড়লো পাশের পিলারটা।
“আরে, এটা কী?”
সামনের দেয়ালে আমার চোখের সমান্তরালে তিন সেন্টিমিটারের মতন লম্বা একটা বলপয়েন্ট কলমের দাগ।
“নিচেও আছে দেখো,” সায়াকা বললো।
ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখি আমি যে দাগটা দেখেছি তার কিছুটা নিচে আরো একটা দাগ। সেটার নিচেও একই রকম দাগ বেশ কয়েকটা।
“উচ্চতার তুলনা করছিল বোধহয়। তখন দাগ দিয়েছে, নাকি?”
“উচ্চতার তুলনা?”
“কেন, নার্সারির ছড়া-গানটা মনে নেই? ওটা গাওয়ার সময়েই তো পিলারে দাগ দেয় বাচ্চারা।”
“ওহ, ওইটা।”
আমি নিজে আসলে কখনো এরকম কিছু করিনি। গানটা অবশ্য জানি। লোকে যে আসলেও ওটা গাওয়ার সময় পিলারে দাগ দেয়, তা জানতাম না।
পিলারটা টর্চের আলোয় দেখতে লাগলাম। সবচেয়ে নিচের দাগটা মেঝে থেকে আশি সেন্টিমিটার উপরে। সেখানে দাগের পাশাপাশি কিছু একটা লেখাও আছে।
ঝাপসা হয়ে আসা হাতের লেখাটা পড়লাম। “৫ মে, ইউসুকের তিন বছর।”
“হ্যাঁ, কোন বয়সে কতটুকু লম্বা ছিল, সেটা বোঝানোর জন্যেই দেয়া হয়েছে দাগগুলো,” মাথা নেড়ে বলে সায়াকা। “এটা ইউসুকের নানান বয়সের উচ্চতার রেকর্ড বলতে পার।”
“কিন্তু সেটা তোমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগছে না?”
“কেন?”
“সবচেয়ে উপরের দাগটা দেখ, প্রায় ছয় ফিট।”
“তো কী…” বলতে গিয়েও থেমে গেল সায়াকা। পরক্ষণে চোখ বড় বড় করে বললো, “ইউসুকে তো প্রাইমারি স্কুলের ষষ্ঠ গ্রেডে থাকতে মারা গেছে।”
“তাহলে, হিসেব অনুযায়ী তার বয়স তখন ছিল এগারো কি বারো। যদি বয়সের তুলনায় তাড়াতাড়িও লম্বা হয়, তবুও এখানে পৌঁছানোর কথা না।” “তাহলে এটা কার উচ্চতা?”
“ইউসুকের যদি না হয়, তাহলে ওর ভাইয়ের।” আবারও পিলারে টর্চের আলো ফেললাম। হয়তো তার নামও এখানে লেখা আছে কোথাও।
“হতে পারে…”
নিশ্চিত কোনো জবাব না পেয়ে চুপ করে রইলাম আমরা।
“আচ্ছা, আমরা দরজাটা নিয়ে ভাবি বরং,” সায়াকার উদ্দেশ্যে বললাম। “তোমার এটা মনে আছে যে এখানে একটা দরজা ছিল, যেটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে?”
নীরবে মাথা ঝাঁকাল ও।
“ফুলদানি আর পর্দা বাদে অন্য কোনো কিছুর কথা কি মনে আছে?”
“অন্য কোনোকিছু…” ওর নিষ্প্রাণ চোখ দু’টো আশপাশের অন্ধকার কোণে ঘুরে বেড়াতে লাগলো, যেখানে টর্চের আলো পৌঁছাতে পারছে না। “অনেক বেশি অন্ধকার ছিল… অনেক বেশি।”
“ঘরটায় কী করছিলে তুমি, মনে আছে? কিছু ঘটেছিল ?”
“কী জানি! ভুলে গেছি আসলে।” হাতে মাথা রেখে আমার দিকে তাকালো সায়াকা। দৃষ্টিতে ভয়।
“কী হলো?”
“মনে করতে পারছি না, কিন্তু ভয় লাগছে খুব।”
“ভয় লাগছে?”
“হ্যাঁ। যখনই রুমটার কথা মনে হয়, অস্বস্তি চেপে বসে মনে। আমারই অন্য এক সত্ত্বা যেন বারবার সতর্ক করছে আর কিছু না জানার চেষ্টা করতে। সেজন্যেই স্মৃতিগুলো ফিরে আসতে গিয়েও আসছে না…” দেয়ালে ঠেস দিয়ে কথাগুলো বললো সায়াকা, যেন দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। “মাথা ব্যথা করছে।”
“কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই চলো।”
আবারও লিভিং রুমের সোফায় নিয়ে বসালাম ওকে। সামনে ঝুঁকে দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজলো। পিঠ কেঁপে উঠছে বারবার। ওর এই হাল প্রমাণ করছে যে আসলেও ঘরটায় খারাপ কোনো অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিল ও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সামনে কোনো দরজাই নেই, ঘর তো দূরের কথা। এর ব্যাখা কী? সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত জবাব হতে পারে, ওর কোনো ভুল হচ্ছে। কিন্তু এমন একটা ভুল কেন হবে?
এই প্রশ্নের জবাব এত সহজে মিলবে বলে মনে হয় না। বাড়িটায় আসার পর থেকে রহস্য বাড়ছে তো বাড়ছেই। কিন্তু যুতসই কোনো জবাব পাচ্ছি না।
যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে একটা হাতুড়ি আর মোটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরে গেলাম সিন্দুকটা খোলার জন্যে।
বেশ পুরোনো হলেও পোক্ত সিন্দুক। উপরের ঢাকনাটা শক্ত হয়ে এঁটে আছে। স্ক্রু ড্রাইভারের মাথাটা ঢুকিয়ে চাড় দেয়ার চেষ্টা করলাম। একবার ক্যাচ করে শব্দ হলো, কিন্তু ঢাকনা নড়লো না একচুল। আবার অন্য জায়গায় স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে একই কাজ করলাম, এবারেও লাভ হলো না কোনো। বরং, আরেকটু হলেই স্ক্রু ড্রাইভারই ভাঙতে বসেছিল। এভাবে আধঘণ্টা চেষ্টার পর হাতের জিনিসগুলো ছুড়ে ফেলে রকিং চেয়ারটায় গিয়ে বসলাম হতাশ মনোরথে।
এভাবে চেষ্টা করার চেয়ে কম্বিনেশন মিলিয়ে খোলাই সহজ হবে বোধহয়। মালিক নিশ্চয়ই কোথাও লিখে লুকিয়ে রেখেছে।
উঠে দাঁড়িয়ে কেইচিরো মিকুরিয়ার ডেস্কের দিকে এগোলাম। সায়াকা অবশ্য আগে একবার তল্লাশি চালিয়েছে এখানে। কাজে আসতে পারে এমন কিছু পায়নি বলেছিল। ওর কথাই ঠিক। পড়ার টেবিলে বই খাতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, ওরকম কিছু নেই। কেবল মাত্র আনকোরা নতুন একটা নোটবুক চোখে পড়লো। ভেতরের পাতাগুলো খালি।
টেবিলটা ছেড়ে ঘরের প্রতিটা কোনায় কোনায় টর্চের আলো ফেললাম। কোথাও হয়তো লেখা থাকবে সিন্দুকের কম্বিনেশন। কিন্তু বাড়ির মালিক আমার মত করে না-ও ভাবতে পারে।
এসময় হঠাৎই জানালার সামনে রাখা টেলিস্কোপটার দিকে নজর গেল। ওটার পাশেই একটা কেসে টেলিস্কোপের বিভিন্ন অংশ রাখা। কেসটা খুললাম। ভেতরে বাড়তি একটা লেন্স আর কাপড়ে মোড়ানো ফিল্টার। সেই সাথে একটা রেকর্ড পেপার, যেখানে কালো কালিতে লেখা ‘জুলাইয়ের ২৫ তারিখ, আজ বুধ গ্রহ দেখেছি।’ চিঠির হাতের লেখার সাথে মিলে গেল এই লেখা। অর্থাৎ, কেইচিরো মিকুরিয়াই লিখেছে এটা।
কাগজটা আমাদের কোনো কাজে আসবে না। সবকিছু আগের মত গুছিয়ে রেখে আবারও হাতুড়ি আর স্ক্রু ড্রাইভার তুলে নিলাম হাতে। সর্বশক্তিতে ঝাপিয়ে পড়লাম সিন্দুকটার উপরে। হাতুরি দিয়ে স্ক্রু ড্রাইভারের উপরে বাড়ি বসিয়েছে দশবার, এমন সময় টের পেলাম পেছনের দরজাটা খুলে গেল। তাকিয়ে দেখি সায়াকা ঢুকছে ঘরে।
“শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেছে?” জিজ্ঞেস করি।
“না, ঘুম আসছে না। অস্থির লাগছে।” “লাগারই কথা।”
বিছানায় বসলো ও।
“বাবার কথা ভাবছিলাম। এই বাড়িটার কথা বা মিকুরিয়াদের উপকারের কথা কেন আমাকে বলেনি, কে জানে!”
“কারণ, সেক্ষেত্রে অতীতের ভুলগুলোর ব্যাপারেও বলতে হতো।”
“এজন্যেই কি? চাইলে তো ওটুকু বাদও দিতে পারত।”
“তোমার কাছে কী কারণ মনে হচ্ছে?”
“জানি না, হয়তো আমার ভালোর জন্যেই।”
“তোমার ভালোর জন্যে? মানে?”
“বাবা নিশ্চয়ই ভেবেছে অতীত সম্পর্কে জানার পর যদি এই বাড়িতে ফিরে আসি তাহলে হয়তো সবকিছু আবারো মনে পড়ে যাবে। এজন্যেই বলেনি।”
স্ক্রু ড্রাইভার আর হাতুড়ি হাত বদল করলাম।
“তাহলে আমরা এখানে এসে যা করছি, সেটা করা উচিত হচ্ছে না।” মাথা ঝাঁকায় সায়াকা, যেন ও নিজেও বুঝতে পারছে না যে কাজটা উচিত হচ্ছে কিনা। বিছানায় একপাশে রাখা চিঠিগুলো তুলে নিল এসময়।
“এগুলো এখানে কেন, বলো তো। এমন যদি হতো যে কেইচিরো মিকুরিয়া চিঠিগুলোর প্রাপক, তাও বুঝতাম। কিন্তু, যে প্রেরক, তার কাছেই চিঠিগুলো থেকে যাওয়াটা একটু অদ্ভুতই।”
“আচ্ছা, এমনটা কি হতে পারে যে নাকানো মাসাতসুগু কোনো কারণে চিঠিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ধরো, মিস্টার মিকুরিয়ার মৃত্যুর পর? শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে?”
“চিঠিগুলোর গুরুত্ব যদি এতই বেশি হয়ে থাকে, তাহলে এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় নিয়ে গেল না কেন? ইউসুকের ডায়রির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।”
গুঙিয়ে উঠলাম। এই পরিবারের সবাই একই সাথে কোথায় যে উধাও হলো, সেই ব্যাপারে কিছুই জানি না আমরা।
“আরেকটা ব্যাপার,” সায়াকা বলে। “চিঠিগুলোর খাম কোথায়?”
“ফেলে দিয়েছে বোধহয়।”
“কেন?”
“কে জানে,” ওর এই প্রশ্ন শুনে বিভ্রান্ত না হয়ে পারলাম না। “কী বোঝাতে চাইছ?”
“কিছু বোঝাতে চাইছি না…” চিঠিগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগল ও। “এই বাড়িটার ঠিকানা কিন্তু এখন পর্যন্ত জানতে পারিনি আমরা, এটা খেয়াল করেছ?”
“ঠিকানা?”
“হ্যাঁ।”
“জানব না কেন? নাগানো প্রিফেকচার, কৌমি…”
আমি কথা শেষ করার আগে মাথা ঝাঁকায় সায়াকা। “উঁহু, সেটা বলছি না। সাধারণত, প্রতি বাসাতেই কিন্তু অন্তত একটা কিছু থাকে, যেটায় ঠিকানার উল্লেখ আছে, তাই না? এই ধরো বিজনেস কার্ড, পোস্টকার্ডএরকম। এখানে কিন্তু ওরকম কিছু নেই।”
“আসলেই তো, ঠিক বলেছ।” কোমরে দুই হাত রেখে আশপাশে তাকালাম। “তোমার মতে এটা ইচ্ছাকৃত?”
“সেটাই তো মনে হচ্ছে। নতুবা, কিছু থাকবে না কেন? কিন্তু এরকমটা করার কারণ কী…”
এক মুহূর্ত চুপ থাকলাম দু’জনই। এই প্রশ্নেরও কোনো জবাব নেই আপাতত। সিন্দুকটার দিকে ফিরে লকের পাশে ইঞ্চিখানেক ফাঁকা জায়গায় স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিতে শুরু করলাম।
“এটা কি আদৌ খুলবে?” উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করে সায়াকা। “বোঝা যাচ্ছে না। একটু ফাঁকা হয়েছে আগের তুলনায়।” “সিন্দুক সহজে খুলতে পারার কথাও না।”
হয়তো ঠাট্টাচ্ছলে বলেনি সায়াকা, কিন্তু ওর এই কথায় হালকা হলো পরিবেশ।
“তা ঠিক,” হাসতে হাসতে বললাম।
স্ক্রু ড্রাইভারটা যখন ভাঙল, তখনও ‘আমার মুখে হাসি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফলাটা ছিটকে এসে বাম কব্জির একদম মাঝে গেঁথে গেল। রক্ত বের হচ্ছে চুইয়ে চুইয়ে।
“আহহা!”
“বেশি ব্যথা পাইনি।” পকেট থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করলাম। “দাঁড়াও, আমি গিয়ে ফাস্ট এইড কিটটা নিয়ে আসছি,” সায়াকা বলে।
“ফার্স্ট এইড কিট?”
“হ্যাঁ, রান্নাঘরে আছে।”
দুই কি তিন মিনিট পর একটা ছোট বাদামি বাক্স নিয়ে ফিরে এলো সায়াকা। সামনের দিকে একটা লাল রঙের ক্রস আঁকা।
“রান্নাঘরে ছিল এটা?” জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ, নিচের দুই পাল্লার কাবার্ডটার ভেতরে।”
ফাস্ট এইড কিটটার ভেতরে মূলত মাথাব্যথার ঔষধ, গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ, বার্ন ক্রিম আর কিছু ব্যান্ডেজ। কোনোটাই খোলা হয়নি।
“ক্ষতস্থানে লাগানোর ঔষধও আছে,” বলে চিকন একটা ওয়েনমেন্টের টিউব বের করলো সায়াকা।
“এটা যে কতদিন ধরে এখানে আছে, কে জানে। ব্যবহার করা কি ঠিক হবে?”
“দশ বছর আগের,” বাক্সটার গায়ের লেখা দেখে বললো সায়াকা।
“তাহলে বাদ দাও।”
“আচ্ছা, ব্যান্ডেজ করে দেই অন্তত।”
দক্ষ হাতে গজ কাপড় কেটে সেটা ক্ষতের উপর দিয়ে পেঁচিয়ে দিল সায়াকা।
“তুমি দেখি ভালোই পার এই কাজ।”
“মিহারু’কে ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে অভ্যাস হয়ে গেছে।”
“ছোট্ট মিহারু কি প্রায়ই ব্যথা পায় নাকি?”
“হ্যাঁ, আমিই ব্যথা দেই।”
মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললাম কিছুক্ষণের জন্যে। উজবুকের মতন একটা প্রশ্ন করে ফেলেছি।
কাঁধ ঝাঁকাল সায়াকা। “ওকে নিজেই ব্যথা দিয়ে আবার ব্যান্ডেজ করে দেই। সমস্যাটা আমারই, তাই না?”
কিছু না বলে ব্যান্ডেজটায় ছুঁয়ে দেখলাম একবার, কথার বিষয়বস্তু পাল্টাতে চাইছি যত দ্রুত সম্ভব, তাই ফাস্ট এইড কিটটার দিকে তাকালাম।
ঢাকনাটার উল্টো পিঠে একটা পকেট আছে। যেখানে টেস্ট রিপোর্ট আর হেলথ ইন্স্যুরেন্স ইন্স্যুরেন্স কার্ড রাখা হয় সাধারণত। ভেতরে হাত দিলাম। একটাই কার্ড সেখানে। তবে সেটা কোনো টেস্ট রিপোর্ট বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স কার্ড নয়।
ইংরেজিতে ‘ফ্যামিলি হেলথ কার্ড’ লেখা উপরে। ডাক্তারের নাম, পরিবারের সদস্যদের নাম আর প্রতিদিনকার ঔষধের তালিকা লেখার ঘর দেখতে পেলাম। বেশিরভাগ ঘরই খালি, শুধু পরিবারের সদস্যদের নাম লেখা। কেইচিরো মিকুরিয়া, ফুজিকো আর ইউসুকে নাম তিনটা পরপর লিখেছে কেউ। ফুজিকো নিশ্চয়ই ইউসুকের মা, যাকে সায়াকা ‘দাদি’ বলে ডাকত।
রক্তের গ্রুপ লেখার জায়গায় কেবল কেইচিরো মিকুরিয়ারটা লেখা। বাকিগুলো খালি। ‘ও’ রক্তের গ্রুপ ছিল ভদ্রলোকের।
“ইউসুকের বাবার রক্তের গ্রুপ ও,” বলে কার্ডটা সায়াকার দিকে এগিয়ে দেই।
“ও?” কার্ডটার দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল ও। “কোথাও একটা সমস্যা আছে।”
“কী সমস্যা?” জিজ্ঞেস করি।
ইউসুকের ডায়রিতে কিন্তু এক জায়গায় রক্তের গ্রুপের কথা লেখা ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে…” আমার হাত থেকে টর্চ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ও। আমিও অনুসরণ করলাম ওকে।
লিভিং রুমে আসার পর কফি টেবিল থেকে ডায়রিটা তুলে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো সায়াকা। চেহারা গম্ভীর।
“পেয়েছি, এই যে এখানে,” আমাকে দেখাল ও।
এর আগে লেখাটায় কেবল চোখ বুলিয়ে গিয়েছিলাম। স্কুলের রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা লিখেছিল ইউসুকে।
‘১১ মে, রোদ
আজ স্কুলে আমাদের সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। আমি আগের তুলনায় লম্বা হয়েছি। কিন্তু ওজন খুব একটা বাড়েনি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের জন্যে রক্তও নিয়েছিল। সাধারণত চার ধরনের রক্তের গ্রুপ আছে। এ, বি, এবি আর ও। সেই সাথে যোগ হয় আরএইচ পজিটিভ আর নেগেটিভ। সাধারণত হাজারে একজনের আরএইচ নেগেটিভ থাকে। আমার ব্লাড গ্রুপ এবি। আর-এইচ ফ্যাক্টর পজিটিভ। সুতরাং এবি পজিটিভ। কোনদোর কাছে একটা বই আছে যেখানে রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ণয় করা যায়। কিন্তু ওটা একদমই কাজের না। বাসায় ফিরে মা’র ব্লাড গ্রুপ কি, তা জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু মা জানে না। আগেকার মানুষেরা বোধহয় এসব ব্যাপারে খুব বেশি কিছু পড়েনি। বাবাকেও জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অফিসে বাড়তি চাপের জন্যে আজকে সে বাসায় ফিরবে না।’
সায়াকার দিকে তাকালাম। “ইউসুকের রক্তের গ্রুপ এবি?” নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিল ও।
“তাহলে তো বিষয়টা আসলেও অদ্ভুত। কারো বাবার রক্তের গ্রুপ যদি ‘ও’ হয়, তখন মা’র রক্তের গ্রুপ ‘এ’ বা ‘বি’ যা-ই হোক না কেন, সন্তানের রক্তের গ্রুপ ‘এবি’ হবে না কখনোই।”
৫
“তোমার গাড়ির চাবিটা আমাকে একটু দিবে?” হঠাৎই জিজ্ঞেস করলো সায়াকা। আমার মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে একসাথে, তাই বুঝতে একটু সময় লাগলো।
“চাবি? নিশ্চয়ই,” বলে পকেট থেকে চাবি বের করে দিলাম ওকে। “কী করবে?”
চাবিটা নিয়ে একবার ভ্রু নাচাল ও। “একটু ঘুরে আসছি।”
“ঘুরে আসবে? এই সময়ে?”
“কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো।”
“এখন কি ঘুরতে-” বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। নিশ্চয়ই বাথরুমে যেতে হবে ওকে। নিজের বোকামিতে নিজের উপরেই বিরক্ত হলাম। “চলো, আমিও যাব তোমার সাথে। একা যাওয়াটা নিরাপদ না-ও হতে পারে।”
“আরে, চিন্তার কিছু নেই।”
“আমারও যেতে হবে আসলে।”
মুখ বাঁকিয়ে চাবিটা ফেরত দিল ও।
“আচ্ছা, রক্তের গ্রুপের ব্যাপারটা…” গাড়ি বেশ কিছুদূর আসার পর বলে সায়াকা। “কী মনে হচ্ছে তোমার?”
“যদি ইউসুকে আর কেইচিরো মিকুরিয়ার রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে কোনো ভুল না হয়ে থাকে,” স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে গাড়ির চাকা কাদা থেকে উঠিয়ে বললাম। “তাহলে তারা বাবা-ছেলে নয়।”
“আমিও এটাই ভাবছিলাম…” শ্বাস চেপে বলে সায়াকা। “ওকে কি তাহলে দত্তক নিয়েছিলেন উনারা?”
“না, আমার সেটা মনে হয় না। চিঠিতে তো ইউসুকের জন্মের ব্যাপারে খুশি মনেই মিস্টার মাসাতসুগুকে জানাতে দেখেছি কেইচিরো মিকুরিয়াকে।”
“তা ঠিক। কিন্তু দত্তক যদি না নিয়ে থাকে… আর সে যদি কেইচিরো মিকুরিয়ার নিজের ছেলে না হয়, তাহলে-” সায়াকা যেন দ্বিধায় ভুগছে পরের কথাটা বলবে কিনা। আমি আঁচ করতে পারছি ওর মনে কী ঘুরছে।
“এমনটা হতে পারে যে মিসেস মিকুরিয়ার অন্য কারো সাথে সম্পর্ক ছিল, ইউসুকে তার ছেলে।”
“নাহ, এটা একটু বেশি বেশি বলে ফেললে। ডায়রি পড়ে এমনটা মনে হয়নি।”
“আমারও সেটাই মনে হচ্ছে।”
“কেন?”
“স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিনে মা’কে নিজের রক্তের গ্রুপ বলেছিল ইউসুকে। সে যদি মিসেস মিকুরিয়া এবং অন্য কারো সন্তান হতো, তাহলে কথাটা শোনার পর চিন্তায় পড়ে যাওয়ার কথা মহিলার। কিন্তু, ডায়রিতে সেরকম কিছু লেখেনি ইউসুকে।”
“ঠিক বলেছ। তাহলে কেইচিরো মিকুরিয়া জানতেন যে ইউসুকে তার ছেলে নয়, তবুও মন থেকে ভালোবাসতেন ওকে…” গালে হাত রাখে সায়াকা। “নাহ, ভজকট পাকিয়ে যাচ্ছে সব।”
“ইউসুকের আসল বাবার পরিচয় জানা নেই আমাদের, এটাই সমস্যা।” কিছুক্ষণ পর পাকা রাস্তায় উঠে এলো গাড়ি। বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমেছে, তবে উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার বন্ধ করার মত অবস্থায় আসেনি। কোনো পথবাতি নেই দুই পাশে। আঁকাবাঁকা রাস্তা। দেখতে কিছুটা সমস্যাই হচ্ছে। তবে এই সময়ে উল্টো দিক থেকে গাড়ি আসার ভয় নেই। ড্যাশবোর্ডের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত দু’টো।
মাতসুবারা লেকের পাবলিক পার্কিং লটে গাড়ি ঢুকিয়ে দিলাম একটু পর। লেক পার্কের এক কোনায় নারী পুরুষের আলাদা টয়লেট আগেই চোখে পড়েছিল। ইউরিনালের সামনে দাঁড়িয়ে হালকা হতে হতে ভাবতে লাগলাম এরকম একটা জায়গায় কী করছি আমি। সায়াকার সমস্যার সমাধানের জন্যে এত দূরে এসে পড়েছি?
টয়লেট থেকে বেরিয়ে লেকের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। শান্ত হয়ে এসেছে পরিবেশ, কিন্তু লেকের পানিতে কাঁপন ঠিকই উঠছে একটু পরপর। উল্টোদিকে ঘন বন। একদম কালো দেখাচ্ছে এখন।
“মনে হচ্ছে যেন দুনিয়ার সব রাক্ষসের বাস ওখানে,” সায়াকা কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টেরই পাইনি।
“এই প্রথম এত রাতে কোনো লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি।”
“রাতের সমুদ্রও ভয়ঙ্কর, কিন্তু এখানকার পরিবেশ অন্যরকম। মনে হচ্ছে যেন সময় ভিন্ন নিয়মে প্রবাহিত হয় এই এলাকায়।” টের পেলাম যে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সায়াকা। আমিও ওর দিকে ঘুরলে চোখাচোখি হলো দু’জনের। সাথে সাথে অন্যদিকে তাকালো ও।
“আমার জন্যে অনেক সমস্যা হচ্ছে তোমার,” বললো ও।
“নাহ। মাঝে মাঝে এরকম অ্যাডভেঞ্চার ভালই লাগে।”
“সত্যি বলতে এখানে আসার আগে ভাবিনি যে এত কিছু জানা যাবে।”
“কিন্তু তুমিই না বলেছিলে ওখানে গেলে হারানো স্মৃতি ফিরে পেতে পারি।”
“আসলে, নিজেকেই সাহস যোগাচ্ছিলাম। পরে যেন আফসোস না হয় যে স্মৃতি ফিরে পাওয়ার জন্যে কোনো চেষ্টাই করিনি…” শূন্য দৃষ্টিতে লেকের দিকে তাকিয়ে রইলো ও কিছুক্ষণ, এরপর বললো, “তুমি আমার সাথে না এলে আসা হতো না।”
ওর এই স্বীকারোক্তি ধন্ধে ফেলে দিল আমাকে। মনের গহীনে কোথায় যেন খুশির ডঙ্কা বাজছে। জোর করে চেপে রাখতে চাইলাম সেই অনুভূতিটা।
“ভেবেছিলাম এখানে এলে কিছু একটা হবে তোমার আর আমার মাঝে। হলে যে অখুশি হতাম, তা নয়। এমনকি এটাও ভেবেছিলাম অমন কিছু হলে দুঃখ ভুলে থাকতে পারব। কিন্তু তুমি কিছুই করোনি। বরং আমার সমস্যার সমাধানে রাজি হয়ে গেছ কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই। নাকি কিছু করার ইচ্ছে আছে সামনে?”
“না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলি। “শুরু থেকেই খেয়ালি ছিলাম যেন এমন কিছু না হয়।”
“সেটাই ভেবেছি,” মৃদু হেসে বলে সায়াকা। “তুমি আগের তুলনায় একদম বদলে গেছ। তখন সবসময়ই বলতে যে সেক্স গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।”
“এখন পরিস্থিতি এক নয়।”
“তা ঠিক, আমি বিবাহিত,” খানিকটা ঠাট্টার সুরে কথাটা বললো সায়াকা। পা দিয়ে মাটি খোঁচাচ্ছে। “আমাকে ঘৃণা করতে, তাই না?”
“মানে?”
“ব্রেকআপের পর?”
“আরে… ওটা অনেক দিন আগের কথা।”
“তুমি কথা না বলতে চাইলে থাক।”
“না, বলো। সমস্যা নেই।” পকেটে হাত ঢুকালাম। চুইং গামের প্যাকেটটা এখনও রয়ে গেছে ওখানে। বের করে একটা মুখে দিলাম। সায়াকাকে সাধলে মানা করে দিল।
“তোমাকে কখনোই ঘৃণা করিনি আমি। দোষও দেইনি কোনো প্রকার, চুইং গামের প্যাকেটটা পকেটে ঢুকিয়ে বলি। “তবে আমরা প্রথমেই কথা বলে নিয়েছিলাম যে কেউ কাউকে জোর করবো না কখনো। প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম, এটা ঠিক। অবাকও হয়েছিলাম। এরকম কিছু যে ঘটবে, তা আসলেও আঁচ করতে পারিনি। তাই হুট করে যখন এসে বললে অন্য একজনকে ভালোবাসো, বিশ্বাস হচ্ছিল না।”
“বুঝতে পারছি,” কয়েক কদম এগিয়ে গেলো ও, এরপর ফিরলো আমার দিকে। দুই হাত পেছনে। “আসলে, অন্য কাউকে ভালোবাসতাম, এজন্যে ব্রেকআপ করিনি। প্রথমে আমাদের সম্পর্কটা ছিন্ন করতে চেয়েছিলাম। এরপর তোমার পরিবর্তে অন্য কাউকে খুঁজে নিয়েছি।”
“কেন ব্রেকআপ করেছিলে?”
“এটা ব্যাখা করা কঠিন। সহজ কথায় বললে, আমাদের স্বপ্নের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম।”
“সরি, বুঝতে পারছি না তোমার কথা,” তিক্ত হেসে বলি। “এটার মানে কী?”
“আমাদের সেই সময়কার আলাপগুলো মনে আছে? হেন কোনো বিষয় নেই, যেটা নিয়ে কথা হতো না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এমন দাঁড়াত যে, আমরা অনন্য, সবার চেয়ে আলাদা। সবাইকে গর্দভ ভাবতাম, ভরসা করতাম না কাউকে। যেন বোকার স্বর্গে আমি আর তুমিই কেবল চালাক।”
“হ্যাঁ, মনে আছে।”
পুরোনো চায়ের দোকান, কফি, সেভেন স্টার সিগারেট। স্বস্তা বার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই…
“তোমার সাথে থাকার সময়টা ভালো লাগতো ঠিকই, কিন্তু এটাও মনে হতো যে এভাবে জীবন চলবে না। আমাদের চারপাশে যারা আছে, তাদের সবাইকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া যায় না। শুধু দুইজনকে দিয়ে কি সমাজ চলে? ওভাবে চলতে থাকলে আমাদের দু’জনের জীবনই নষ্ট হয়ে যেত। তাই স্বপ্নটা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। সেই সময়ে এটাই মনে হয়েছিল আমার।”
“তো,” বলি আমি। “বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করেছিলে?”
“বলতে পারো।”
“ভবিষ্যত নিয়ে আমার চিন্তাভাবনাগুলো বোধহয় ঠিক ছিল না। বাস্তববাদী কাউকে খুঁজে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত ছিল তোমার জন্যে।”
“শুধু সেটাই না, কীভাবে বলি কথাটা…” ঘাড় একদিকে কাত করলো ও। “বাচ্চাদের মতন আচরণ ছিল আমাদের।”
“হ্যাঁ, এখন সেটাই মনে হয়।”
“তুমি বুঝতে পারছ আমি কী বলছি?”
“হ্যাঁ, কিন্তু এসব এখন অতীত।”
“ঠিক বলেছ। অতীত,” ঠোঁট ভেজায় ও। “শেষ একটা কথা বলি। তোমার কি মনে হয় না যে আমরা দু’জনই একদম একই রকম ছিলাম তখন? একটু বেশিই একই রকম। তোমাকে দেখলে মনে হতো যেন আয়নায় উঁকি দিচ্ছি। ব্যাপারটা যে কতটা অস্বস্তিকর, তা বলে বোঝাতে পারব না।”
“হুম,” পায়ের কাছের মাটিতে বুড়ো আঙুল দিয়ে নকশা কেটে বললাম। সেই সময়কার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। একটু পরপর সেক্স, মেকি গুরুগম্ভীর আলোচনা, অলীক সব স্বপ্ন।
হঠাৎই মনে হলো বুকের ওপর কেউ ভারী একটা পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।
“বৃষ্টির তেজ বাড়ছে আবার,” লেকের পানির অস্থিরতা খেয়াল করে বলে সায়াকা। ওর চুলও ভিজে গেছে।
“ফিরে যাই, চলো।”
৬
বৃষ্টির মধ্যেই ফেরার পথ ধরলাম আমরা। গাড়ি চালাতে চালাতে ওর স্বীকারোক্তির কথা ভাবছি। আমরা একটু বেশিই একই রকম কথাটা গেঁথে গেছে মনে। আমারও এমনটাই মনে হতো। শুধু যে আমাদের ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা ধরন আর মূল্যবোধের ব্যাপার সেটা, তা নয়। বরং আমাদের ভেতরকার যা কিছু আমাদের পরিচয় বহন করে, সবই ছিল একই রকম। সেই সময়ে আসলে বুঝতে চাইতাম না ব্যাপারটা। কিন্তু অবচেতন মনে ঠিকই জানতাম।
সায়াকার সাথে যখন আমার পরিচয় হয়, তখনকার জীবন নিয়ে ভাবতে খুব একটা ভালো লাগে না আমার। অনেকটাই ছেলেবেলার বিরক্তিকর সব ছবি ভর্তি অ্যালবাম দেখার মতন ব্যাপারটা।
বাবা একজন ডাক্তার। তবে কোনো বড় হাসপাতাল নয়, বরং মফস্বলের ছোট একটা ক্লিনিকের দায়িত্বে ছিলেন। আশপাশের এলাকাগুলো থেকে রোগী আসতো তার কাছে। দু’জন নার্স ছিল সেখানে, যাদের একজন আমার মা।
জুনিয়র হাইস্কুলের প্রথম বর্ষে থাকতে আমাকে জানানো হয় যে আমি তাদের আপন ছেলে নই। এরকম একটা কথা পুরো জীবন লুকিয়ে রাখা সম্ভব না, তাই তারা সঠিক সময় বুঝে আমাকে সত্যটা জানিয়ে দেন।
বিয়ের পর লম্বা সময় অতিবাহিত হলেও তাদের কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। তারা যখন কাউকে দত্তক নেয়ার কথা ভাবছে তখন কাকতালীয়ভাবে বাবার এক চাচাত ভাইয়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। কিছুদিন আগেই সন্তান হয়েছিল সেই দম্পতির। আমার পালক বাবা-মা’কে সেই নবজাতককে দত্তক নেয়ার প্রস্তাব দিলে সানন্দে রাজি হয়ে যায় দু’জনে।
আমাকে আদর যত্নে বড় করার জন্যে তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ ঠিকই, কিন্তু কষ্টও পেয়েছিলাম ভীষণ। তাছাড়া, এই তথ্যটা এমন সময় জানতে পারি যখন আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছিল যে বাবা-মা আমাকে নিয়ে কী ভাবে।
“তুমি আমাদেরই সন্তান, এই সত্যটা কখনোই বদলাবে না। সবকিছু আগের মতই থাকবে। এসব নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামিও না,” বাবা বলে আমার উদ্দেশ্যে। নীরবে কেবল মাথা নেড়েছিলাম তখন। এরকম একটা কথার প্রেক্ষিতে কী বলা উচিত, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না সেই মুহূর্তে।
বাবা যেমনটা বলেছিল, তেমনটা মেনে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়াই শ্রেয় ছিল। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। তারা যে আমার আসল বাবা-মা নয় এই কথাটা ক্ষতের সৃষ্টির করেছিল আমার মনে। দু’জনই খেয়াল করেছিল বিষয়টা। এরপর আর সহজ হতে পারিনি কখনো।
এর কিছুদিন পরেই স্কুলে যাওয়ার পথে একদিন এক মহিলা দেখা করে আমার সাথে। বুঝতে অসবিধা হয় না যে সে-ই আমার মা। কথা বলতে চাইলে মানা করিনি তাই। নিজের পরিচয় না দিয়ে আমার বাবা-মা, স্কুল-এসব বিবিধ বিষয়ে জানতে চায় সে। মাথা নিচু করে বিড়বিড়িয়ে কী বলেছিলাম সেদিন, তা আর মনে নেই।
দিন কয়েক পর বাড়িতে এসে উদয় হয় সেই নারী। আমাকে বাবা-মা নিজের ঘরে থাকতে বললেও লুকিয়ে লুকিয়ে সব শুনি।
ভদ্রমহিলা বলে সে তার সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। দৃঢ় কণ্ঠে তাকে মানা করে দেয় আমার পালক বাবা। তাদের কথা শুনে যা বুঝেছিলাম ওনার দ্বিতীয় বিয়েটা টেকেনি। এখন একাই থাকতে হয়, তাই ছেলেকে ফেরত চাচ্ছে।
“আমি আপনাদের সামনে হাতজোড় করছি, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। ওর জন্যে আপনারা যা খরচ করেছেন, তা আমি শোধ করে দিব,” কাঁদতে কাঁদতে বলে আমার জন্মদাত্রী মা।
“এখন আপনার এই কথা বলা মানায় না। ওকে এভাবে দিয়ে দেয়া সম্ভব না আমাদের পক্ষে,” চিবিয়ে কথাগুলো বলে বাবা। “তাছাড়া, শেষবার আমি আপনাকে বলেছিলাম ওর সামনে না আসতে, ভুলে গেছেন? কিন্তু আপনি কোনো প্রকার যোগাযোগ না করেই এভাবে বাড়িতে হাজির হয়েছেন।”
বাবার জবাব শুনে বুঝতে পারি কিছুদিন আগেই আমাকে সত্যটা জানানো আর ভদ্রমহিলার সাথে আমার দেখা হওয়া মোটেও কাকতালীয় নয়। ইচ্ছে করেই বলেছিল যেন আমার আসল মা এভাবে চলে এলে আকাশ থেকে না পড়ি।
লম্বা সময় আলাপ হয় তিনজনের। একটু পর তাদের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায় আমার কাছে।
“আমি কি তাহলে বাকিটা জীবন একাই কাটাবো?”
“এজন্যেই তো বলেছিলাম ভালো কাউকে খুঁজে নিন। তাছাড়া, ওকে ছাড়া আমাদেরই বা আর কে আছে? এত যত্নে মানুষ করছি কেন? আপনি এভাবে এসে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না।”
অর্থাৎ, আমার জন্মদাত্রী মা আমাকে নিয়ে যেতে চাইছিল একাকীত্ব ঘোচানোর জন্যে আর পালক বাবা-মা চিন্তায় ছিল আমি না থাকলে তাদের উত্তরাধিকার কে হবে?
হ্যাঁ, শুধু এ দু’টোই যে মূল কারণ, তা বললে অন্যায় হবে। তিনজনই নিজেদের মত করে ভালোবাসত আমাকে। কিন্তু তের বছরের একটা ছেলের পক্ষে সেটা বোঝা কষ্টকরই বটে।
শেষমেষ তাদের আলোচনা শেষ হলো ‘কিছুদিন পর ও নিজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিবে’ এই কথার মাধ্যমে। আমার আসল মা অবশ্য খুব একটা খুশি হয়নি কথাটা শুনে। সে ধরেই নিয়েছিল আমি মানা করে দিব।
সেদিনের পর থেকে আমার প্রতি পালক বাবা-মা’র আচরণে বেশ পরিবর্তন আসে। পালক মা আগের তুলনায় আদর যত্ন বাড়িয়ে দেয়। বাবা ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। বলে, আমি যদি ডাক্তার না হতে চাই, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আমার যে বিষয়ে আগ্রহ, সেটাই পড়াবে। সেই সাথে বারবার ছোটবেলার নানা ঘটনার কথা বলতো বাবা। এক পর্যায়ে তো এটাও বলে যে আমাকে কত কষ্ট করে বড় করেছে দু’জনে; কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
আমার আসল মা প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর দেখা করতে শুরু করে আমার সাথে। কাছের একটা পার্কে বসে আলাপ করতাম আমরা। আসলে সে বলত, আমি শুনতাম। কথায় কথায় জানায় যে আমাকে নিজের কাছে রাখা সম্ভব ছিল না বলেই কাজটা করেছিল সে। ভীষণ আক্ষেপ হয় সেজন্যে। কথা বলার মাঝে টপটপ করে চোখ থেকে পানি ঝরতো।
এর এক সপ্তাহ পর আমার আসল মা আবারও আসে বাড়িতে। এবারে তাদের সাথে খাবার টেবিলে বসি আমি। বাবা তখন আমাকে বলে, “তুমি কার সাথে থাকতে চাও, এটা পুরোপুরি তোমার সিদ্ধান্ত। আমরা কেউ কিছু বলবো না।”
জুলুজুলু চোখে তিনজন তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। কিন্তু ততদিনে আমি আসলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। ‘আমি কী চাই’ সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে, আমি আসলে খুঁজেছি ‘সহজ সমাধান’।
“বাবা-মা’র সাথেই থাকবো,” জানিয়ে দেই।
পালক বাবা-মা’র মুখে হাসি ফুটলেও আমার জন্মদাত্রী মা মুষড়ে পড়ে। তবে যাওয়ার সময় শর্ত দিয়ে যায় যে মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করতে দিতে হবে। বাবা-মা বলে যে আমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি, চিন্তার কিছু নেই। কোনো রাখঢাক না করেই আমার আসল মা সম্পর্কে যা-তা বলে দু’জনে। এমনকি এটাও বলে যে আরেকটু হলে জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল আমার।
সারারাত কেঁদেছিলাম বিছানায় শুয়ে। দুঃখের কারণটা অবশ্য বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল, এটা ঠিক। হয়তো ধরতে পেরেছিলাম যে আমি আসলে জগতে একা।
এরপর আমার আসল মায়ের সাথে দেখা-সাক্ষাত একদমই কমে যায়। হাই স্কুলের প্রথম বর্ষে উঠে জানতে পারি সে তৃতীয় বিয়ে করেছে। নিজেই কথাটা আমাকে জানায় সে। পালক বাবা-মা’র বাসায় আগের মতনই চলতে থাকে জীবন। অন্যদের সামনে আমরা একদমই সাধারণ একটা পরিবার। কিন্তু আমার কেবলই মনে হতো যে তাদের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করছি কেবল। মা-বাবার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
এই পৃথিবীতে সবই আসলে ভ্রম। দিন শেষে মানুষ নির্জন দ্বীপের মতন একা- এরকম চিন্তা মাথায় নিয়েই দিনাতিপাত করতে থাকি। এরপরই দেখা হয় সায়াকার সাথে।
* * *
আবহাওয়া আরো খারাপ হয়েছে। উইন্ডশিল্ডে বৃষ্টির ফোটার শব্দ বাস্তবে নিয়ে এলো আমাকে। ওয়াইপারের গতি বাড়িয়ে দিলাম।
“ঘুম পেয়েছে নাকি তোমার?” জিজ্ঞেস করি।
“নাহ, এমনি চোখ বন্ধ করে আছি। ঘুমিয়েছিলাম তো একটু আগে।”
“খুব বেশি না।”
“কী ভাবছ তুমি?”
“জরুরি কিছু না।” রেডিও চালু করে দিলাম। একটা রক গান বাজছে। ব্যান্ডটা চিনিনা আমি, কিন্তু সায়াকার পরিচিত মনে হচ্ছে গানটা। তালে তালে মাথা দোলাতে লাগল।
আমরা একটু বেশিই একইরকম। ওর বলা কথাটা মনে হলো আবারও। ঠিকই বলেছিল। ওর সাথে পরিচিত হওয়া মাত্র আকর্ষিত হয়েছিলাম চুম্বকের মত। মনে হতো ও বুঝতে পারবে আমাকে। সায়াকাও একাকী ছিল সেই সময়ে। বাড়ির সাথে সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে তখন। যত দ্রুত সম্ভব ওখানে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম।
“তুমি কেমন যেন বদলে গেছ বাবা,” একদিন পালক মা বলে আমাকে। সম্ভবত লম্বা সময় ধরেই কথাটা মনের মধ্যে চেপে রেখেছিল সে। বলার চেষ্টা করেও পারেনি।
“তাই?”
“আমাকে আর মা বলে ডাকো না। ইচ্ছে করে না?”
“ওরকম কিছু না। যাই এখন,” দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি পালিয়ে বাঁচি যেন।
সত্যি বলতে পালক বাবা-মা’কে আসলেও বাবা-মা বলতে বাধছিল আমার। কেন, তা বলতে পারব না। হয়তো আর সুখী পরিবারের অভিনয় করতে পারছিলাম না।
সুখী পরিবারের অভিনয়?
ব্রেক কষলাম আচমকা। ভেজা মাটিতে কর্কশ শব্দ করে উঠলো চাকা। সায়াকার চোখে মুখে ভয়। “পাগল হলে নাকি?”
“আমরা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি। আসলে, ভুল বুঝেছি,” বলি আমি।
“ভুল বুঝেছি?”
“হ্যাঁ, ইউসুকের বাবার ব্যাপারটা। আগে বাড়িটায় যাই, চলো,” অ্যাকসেলেটর দাবানো মাত্র সামনে বাড়লো গাড়ি।
গন্তব্যে পৌঁছে এক দৌড়ে গিয়ে লিভিং রুম থেকে ইউসুকের ডায়রিটা হাতে নিলাম প্রথমে। দ্রুত পাতা উল্টে যেখান থেকে ওই লোকটার ব্যাপারে লিখতে শুরু করেছে ছেলেটা, সেখানে চলে এলাম।
“ভুল বুঝেছি বলছো কেন?”
“আমাদের বোকা বানিয়েছি ইউসুকে। অবশ্য ও নিশ্চয়ই আশা করেনি যে ডায়রিটা অন্য কেউ পড়বে, সুতরাং বোকা বানিয়েছে কথাটাও ভুল।” ডায়রিটা বন্ধ করে সায়াকার কাঁধে হাত রাখলাম। “চলো, দোতলায় যাই।”
ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরে এসে আরো একবার চিঠিগুলো পড়লাম ভালো মত।
“যেটা ভেবেছিলাম।”
“কী?”
“চিঠিগুলোতে কিন্তু কোথাও ইউসুকে’কে নিজের ছেলে বলে উল্লেখ করেননি কেইচিরো মিকুরিয়া। কারণ, তারা বাবা-ছেলে নয়। রক্তের গ্রুপ কেন মেলেনি, সেই ধাঁধার উত্তরও পেয়েছি।”
“তাহলে ইউসুকে কার ছেলে?”
“কেইচিরো মিকুরিয়ার ছেলের সন্তান ও,” জবাবে বলি। “তাকে কিন্তু চিঠিতে ছেলে বলেই উল্লেখ করেছেন কেইচিরো মিকুরিয়া। সে-ই ইউসুকের বাবা।”
“এটা কীভাবে সম্ভব… কিন্তু,” আঙুলে চুল পেচাচ্ছে আর খুলছে সায়াকা। “ডায়রিতে তো বড় ছেলেকে ‘ওই লোকটা’ বলে সম্বোধন করেছে ইউসুকে, তাই না?”
“হ্যাঁ, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই
“তাহলে সে ওর বাবা হয় কী করে?”
“তোমার এই কথা বলার কারণ হচ্ছে ইউসুকে ডায়রিতে অন্য একজনকে বাবা বলে ডেকেছে, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“এটা পরিষ্কার যে ডায়রিতে ইউসুকে যাকে বাবা বলে ডেকেছে সে হচ্ছে কেইচিরো মিকুরিয়া। কিন্তু উনি ওর আসল বাবা নন।”
“কী বলছো এসব?”
“কেইচিরো মিকুরিয়া হচ্ছে ইউসুকে মিকুরিয়ার দাদা। তেমনি, ও যাকে মা বলে ডাকে, সে আসলে ওর দাদি।”
বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে চোখ পিটপিট করছে সায়াকা।
“এই কথা বলছো কেন?”
“ইউসুকে যাকে বাবা-মা বলে ডাকে, তাদের বয়সের পার্থক্য অনেক বেশি। আর এই চিঠিগুলোয় দেখো, ইউসুকে হওয়াতে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন কেইচিরো মিকুরিয়া। ছেলে হওয়াতে উচ্ছ্বাসের পরিমাণও বেশি ছিল। এখান থেকে তার ছেলে আর ইউসুকের বয়সের পার্থক্যের বিষয়টা পরিষ্কার হয়। তারা দুই ভাই না, বরং বাবা-ছেলে। তাদের মধ্যকার বয়সের পার্থক্য থাকাটা তাই স্বাভাবিক।”
“কিন্তু ও দাদাকে বাবা ডাকত কেন?”
“কারণ তিনিই হয়তো ওকে বড় করেছেন। চিঠিতে লেখা ছিল যে দুই বছরের মাথায় প্রথম স্ত্রী মারা যায় কেইচিরো মিকুরিয়ার ছেলের। ততদিনে ইউসুকের জন্ম হয়েছে নিশ্চয়ই। একা একজন পুরুষের বাচ্চা দেখাশোনা করা কষ্ট বিধায় দাদা-দাদি নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল।”
“তা বুঝলাম, কিন্তু দাদাকে বাবা বলে ডাকা…” সায়াকা’কে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে না।
“পরিবারের দুরবস্থাই বোধহয় মূল কারণ। “
“…মানে?”
“এটা আমার আন্দাজ বলতে পারো, এখনও কোনো প্রমাণ নেই,” বলি। “চিঠিগুলো থেকে এটা নিশ্চিত যে কেইচিরো মিকুরিয়া ভীষণ কড়া একজন মানুষ। ছেলেকেও শাসন করতেন নিশ্চয়ই। কিন্তু সে জজ হতে না পারায়, ভীষণ হতাশ হন তিনি। ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান।”
“হ্যাঁ, চিঠিতে ছেলেকে নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে সে বেশ কয়েকবার।”
“শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন কেইচিরো, কারণ ‘একটা গ্লাসে কেবলমাত্র এক গ্লাস পানিই আটবে।’ বিচারক হবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ব্যর্থ হবার পর শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতার পেশায় ঢোকে তার ছেলে। চিঠিগুলো থেকে এটাও স্পষ্ট যে কেইচিরো মিকুরিয়াই দেনদরবার করে ছেলেটার চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এরপর বিয়ে করে সে। স্ত্রী মা’র দিককার আত্মীয়। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি বিয়ের প্রস্তাবটা হয়তো ছেলের মা-ই পাঠিয়েছিল।” “ছেলেটাকে এখন চাবি দেয়া পুতুল মনে হচ্ছে।”
“একদম ঠিক বলেছ,” সায়াকার দিকে তাকিয়ে বলি। “এটাই বোঝাতে চাইছিলাম এতক্ষণ ধরে। ছেলের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন মি. মিকুরিয়া। ইউসুকে’কে তার নাতি ধরে নিলে সবকিছু একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। ওকে কেমন কড়া শাসনে রাখত, টের পেয়েছ?”
“ছেলেকে দিয়ে যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেটা নাতিকে দিয়ে করাতে চেয়েছেন। উনিই কিন্তু নাম রেখেছিলেন।”
“ছেলের উপরে যেরকম ছড়ি ঘোরাতেন ভদ্রলোক, নাতির নাম যে তিনিই রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক। পুত্রবধূও চুপচাপ স্বভাবের ছিল বিধায় কিছু বলতে পারেনি এই ব্যাপারে। নাতির পড়াশোনার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। এই পর্যায়ে পুত্রবধূ মারা যায়।”
“তখন ইউসুকে’কে নিজের কাছে নিয়ে আসেন।”
“ছেলে আপত্তি জানিয়েছিল কিনা, এটা জানি না। মি. মিকুরিয়া বাবার মতই ব্যবহার করতেন ইউসুকের সাথে। ‘বাবা’ বলে ডাকার জন্যে জোর করেননি হয়তো, ভুলটাও শুধরে দেননি। আসলে নাতির মুখে বাবা ডাক শুনতে ভালোই লাগত তার।”
কপালে ভাঁজ পড়ে সায়াকার।
“চিন্তা করেই কেমন যেন লাগছে।”
“মি. মিকুরিয়ার চোখে তার ছেলে একটা কুলাঙ্গার। তার অস্তিত্ব ভুলে যেতে পারলে খুশি হতেন। এজন্যেই চাইতেন যেন ইউসুকেও তার আসল বাবাকে ভুলে যাক। চিঠিগুলোয় যেখানে ছেলের জুয়ার আসক্তি আর চাকরি চলে যাওয়ার কথা লিখেছেন, সেখানে কিন্তু এটাও বলেছেন যে ইউসুকের উপরে এই ঘটনাগুলোর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, সেটা নিয়ে উনি চিন্তিত।”
“হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে…” ইউসুকের ডায়রিটা খুললো সায়াকা। “বড়দিনের উপহার নিয়ে রাগারাগির কারণ এবারে বুঝতে পারছি। ইউসুকের প্রকৃত বাবা উপহারগুলো পাঠিয়েছিল। ইউসুকে এখানে লিখেছে, ‘এই বছর আবার বড়দিনের উপহার পাঠিয়েছে সে, একটা বড় গাড়ি। গত বছর ট্রেন সেট পাঠিয়েছিল। বাবা বলে এসব খেলনা না দিয়ে বইও দেওয়া উচিত। সেজন্য ফোনে রাগারাগিও করেছে।”
“ডায়রিটা যখন আমরা প্রথম পড়ি, তখন ভেবেছিলাম দাদা-দাদির কাছ থেকে উপহার পেয়েছে ইউসুকে, কিন্তু এখন দেখছি বিষয়টা আসলে পুরোপুরি বিপরীত,” তিক্ত হেসে বলি। “যাইহোক, এখানে কোথাও নিশ্চয়ই ছেলের সাথে কেইচিরো মিকুরিয়ার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ আছে।”
“এই যে, এটা পড়ো- ‘বাবা সবসময়ই বলে এসেছে যে লোকটা আস্ত একটা গর্দভ। আমাকে কোনো ভাবেই তার মতন হওয়া যাবে না।’
“নাতিকে ছেলের কাছ থেকে সবসময় দূরে রাখতে চেয়েছেন কেইচিরো মিকুরিয়া।”
“ছেলের পড়াশোনায় খেয়াল রাখতে পারেননি, তাই সাবধানি ছিলেন যেন নাতির ক্ষেত্রে আগের ভুলগুলো না হয়। ইউসুকের ডায়রি পড়েই বোঝা যায় যে কঠিন নিয়ম-কানুনের মধ্যে বড় হয়েছে। তবে ছেলেটা মেনে নিয়েছিল সেটা। যাকে বাবা বলে জানত, মন থেকেই সম্মান করতো তাকে। ইউসুকের সাফল্য নিজের সাফল্য বলে মনে করতেন মি. মিকুরিয়া।”
“মনে হচ্ছে যেন কোনো রোবট তৈরির কারখানা নিয়ে আলাপ করছো,” গাল ফুলিয়ে বলে সায়াকা।
“আসলেও তো শিক্ষিত করে তোলার নামে রোবট তৈরি করছিলেন ভদ্রলোক। যদি অসুস্থ না হয়ে পড়তেন, তাহলে সফলও হতেন শিঘ্রই।”
“ব্রেইন টিউমর।”
“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলি। “ইউসুকের পড়াশোনার মাঝপথেই চলে যেতে হবে, এই বিষয়টা নিশ্চয়ই ভীষণ পীড়া দিত তাকে। হয়তো আসন্ন মৃত্যুর চেয়ে এটা নিয়েই বেশি আফসোস হতো। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় ইউসুকে।”
“কারণ ওর পথ দেখানোর মত কেউ থাকে না। “
“শুধুমাত্র সেটা হলে কোনো ঝামেলা ছিল না। কিন্তু যে লোকটাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছে ওকে, সে ফিরে আসাতেই মূল সমস্যার শুরু।”
“হ্যাঁ…” সায়াকা নিজেও সেটাই ভাবছিল সম্ভবত। চোখের দৃষ্টিতে বিষণ্ণতা ওর।
“এবারে অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করি,” বলি আমি। “বড় ছেলের দৃষ্টিকোণ থেকে। যে বাবা লম্বা একটা সময় নিয়ন্ত্রণ করে গেছে তাকে, সে মারা গেছে কিছুদিন আগে। বাড়ি ফিরতে কোনো বাঁধা নেই। নিজের ছেলেও আছে ওখানে। তাই বিজয়ীর বেশেই ফিরেছিল নিশ্চয়ই। ছেলের সাথে যত দ্রুত সম্ভব ভাব করে নিতে চেয়েছে।”
“হুম…” বলে আবারও ইউসুকের ডায়রিতে বুঁদ হয়ে গেল সায়কা। “এখানে লিখেছে, দেখ- ‘বিকেলে আমি রুমে ছিলাম, তখন নক না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। আমি সাফ জানিয়ে দিয়েছি পড়াশোনার সময় আমাকে বিরক্ত না করতে। তখন চলে গেছে। এখন থেকে আমার ঘরে ঢুকলে এই কথাই বলবো’।”
“ছেলেকে কেবলই ফিরে পেয়েছে। কথা বলতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক 1 কিন্তু ইউসুকের ব্যবহার দেখলে? এরকম আরো অনেকবার ‘ওই লোকটা’র সাথে রুক্ষ্ম আচরণ করেছে সে। আসলে ছোটবেলা থেকে অন্য একজনকে বাবা বলে চিনত ছেলেটা, যে ওকে শিখিয়েছিল ‘ওই লোক’ থেকে সাবধানে থাকতে হবে। ছেলের মাঝে নিশ্চয়ই কেইচিরো মিকুরিয়ার ছায়া খুঁজে পেত ইউসুকের বাবা।”
“তোমার কী মনে হয়? নিজের বাবাকে ঘৃণা করতো সে?”
“হ্যাঁ। এজন্যেই তো ইউসুকে যখন তার সাথে মিশতে চাইত না, খারাপ ব্যবহার করতো, সে-ও পাল্টা ঘৃণা করতে শুরু করে ওকে।”
“এরপরই…..”
“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে বলি। “এরপরই শুরু হয় নির্যাতন।”
