দ্য হাউস – ৪
চতুর্থ পৰ্ব
১
“এই লোকটার জন্যেও আসলে আমার একটু মায়া লাগছে,” বলি আমি।
“এতদিন পর বাসায় ফিরে ভেবেছিল কোথায় ছেলে হয়তো আপন করে নিবে, কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। দাদা এক প্রকার নাতির মগজধোলাই-ই করেছিল বলবো আমি। ইউসুকে নিজের বাবাকে দেখতেই পারত না। এক পর্যায়ে তাই তার মনেও দানা বাঁধে ঘৃণা।”
মৃদু হাসে সায়াকা। “আমার মতনই অবস্থা।”
“তোমার মতন মানে?”
“কোনো বাবা-মা’র পক্ষেই সন্তানের ঘেন্না সহ্য করা সম্ভব না,” বিষাদমাখা স্বরে বলে সায়াকা।
জবাবে কিছু না বলে চুপচাপ গাল চুলকালাম কিছুক্ষণ। আগের দিনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ও যখন এই বিষয়ে কথা বলে, তখন কোনো কিছু বলেই স্বান্তনা দেয়া সম্ভব না।
“তাই বলে বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলা যাবে না অবশ্যই…” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে সায়াকা।
“তুমি আর ইউসুকের বাবা একরকম নও,” অবশেষে বললাম। “আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্যও নেই।”
যেমনটা ভেবেছিলাম, আমার মন্তব্য আরো তাতিয়ে তুললো ওকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রসঙ্গ পাল্টাতে হবে। “যাইহোক, আমরা এখন পুরো পরিবারের একটা চিত্র দাঁড় করাতে পেরেছি। এখন জানতে হবে ইউসুকে কীভাবে মারা গেল এবং ওর বাবা আর দাদি এখন কোথায় আছে। সেজন্যে এখন সরকারি অফিসগুলোতে ঢু মারতে হতে পারে।”
“ইউসুকের বাবা আর দাদি…” সায়াকা বিড়বিড় করে বলে। “ওই ভদ্রমহিলা তো আসলেই মিসেস মিকুরিয়া, তাই না?”
“তোমার অ্যালবামে কিমোনো পরিহিত যাকে দেখেছি? হ্যাঁ, উনিই খুব সম্ভবত।”
“আমি যখন মাধ্যমিকের ছাত্রী, তখন মারা যান তিনি। সেটাও প্রায় পনেরো বছর আগের কথা। এর আগে কি এখানে থাকতেন তিনি?”
“২৩ বছর ধরে একই অবস্থায় আছে ইউসুকের ঘরটা, আমার মন বলছে এখানে থাকতেন না তিনি।”
“অর্থাৎ, ইউসুকের মৃত্যুর পরেই এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন?”
“সম্ভবত। আর সেটা ইয়োকোহামাতে হবার সম্ভাবনাই বেশি।” “ইয়োকোহামা? কেন?”
“তোমার বাবা-মা’ও তখন ইয়োকোহামাতেই ছিলেন, তাই না? তাই আমার ধারণা মিসেস মিকুরিয়াও সেখানেই যান। ইউসুকের বাবার ব্যাপারে অবশ্য কিছু বলতে পারব না।”
“আর যেখানেই হোক, এখানে থাকেনি,” চারপাশে নজর বুলিয়ে মন্তব্য করলো সায়াকা। “কেননা, এখানে কেউ বসবাস করলে কেইচিরো মিকুরিয়া আর ইউসুকের ঘরটা কখনোই আগের অবস্থায় থাকত না।”
“ঠিক বলেছ। সবকিছু বের করে দিতে হতো সেক্ষেত্রে।”
মাথার পেছনে হাত দিয়ে বসলাম। ইউসুকের ঘরে বিছানার উপরে আমি। কেমন যেন ধুলো ধুলো গন্ধ। জোরে হাই তুললাম।
সায়াকা আমার পাশে এসে বসলো। “ইউসুকের মৃত্যুর কারণ…”
“তোমার কোনো আন্দাজ আছে এই ব্যাপারে?”
“এটাকে আন্দাজ বলা যায় কিনা জানিনা। তবে আমার মাথায় কিছু বিষয় ঘুরছে।”
“বলে ফেলো ঝটপট।”
তবে তখনই কিছু বললো না ও। চেহারায় চিন্তার ছাপ। দ্বিধায় ভুগছে যে কথাটা বলা উচিত হবে কিনা। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা।
“আসলে আমি ভাবছিলাম…” পাক্কা দু’মিনিট পর অবশেষে বললো ও। “ইউসুকে’কে কি খুন করা হতে পারে?”
সোজা হয়ে বসলাম। “কে খুন করবে?”
“কে আর? ওই লোকটা, মানে ওর বাবা,” বলে সায়াকা।
“এটা কীভাবে সম্ভব। সম্পর্ক যতই খারাপ হোক, তাই বলে তো আর মেরে ফেলবে না নিশ্চয়ই?”
“বলা যায় না। হয়তো মারার উদ্দেশ্যে আঘাত করেনি, কিন্তু…” বুকের ওপরে হাত ভাঁজ করে কিছুক্ষণ ভাবলাম। “তুমি একটু ঘুমিয়ে নিবে নাকি?” সায়াকার চেহারা দেখে বলি।
“মাঝে মাঝে খুব ভয় হয় জানো? যদি মিহারুর ভালো-মন্দ কিছু একটা হয়ে যায়?” আমার প্রশ্ন উপেক্ষা করে বলে সায়াকা।
“আজকে অনেক কিছু জানতে পেরেছি আমরা। কিন্তু এখন বড্ড বেশি ক্লান্ত দু’জনেই। একটু বিশ্রাম দরকার, নাহলে মাথা কাজ করবে না। কাল সকালে উঠে দেখি কী করা যায়।”
দুই চোখের উপরে একবার হাত বুলিয়ে সামনে চলে আসা চুল পেছনে ঠেলে দিল সায়াকা।
“সরি। আসলে আমি এমন সব কথা বলে বসি…”
“ব্যাপার না।”
“তুমি এখানে ঘুমাবে?”
“হ্যাঁ। ধুলো অনেক, কিন্তু মেঝেতে ঘুমানোর চেয়ে ভালো অন্তত।”
“তাহলে আমি নিচের সোফাতে গিয়ে শুই।”
উঠে দাঁড়ালো ও।
একবার ভাবলাম ওকেও এখানেই থাকতে বলি। কিন্তু সেটা কি উচিত হবে?
“গুড নাইট,” খানিকক্ষণ ইতস্তত করার পর বললাম।
দরজার কাছে পৌঁছে গেছে সায়াকা। মুখ না ফিরিয়েই বললো, “গুড নাইট।”
“মোমগুলো নিভিয়ে দিও।”
“নিভাব।”
“আর…” আমার কণ্ঠে দ্বিধা।
“কী?”
“যদি বাথরুমে যেতে হয়, আমাকে বলো। সমস্যার কিছু নেই।”
“লাগবে না,” হেসে বললো সায়াকা।
“তাহলে তো ভালো।”
“ঘুমাও একটু।” দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল ও। মোমবাতির আলোটা কেঁপে উঠলো আলতো। উঠে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিলাম।
২
তিন ঘণ্টার মত ঘুমালাম। ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, কিন্তু সেটা বাজার আগেই চোখ খুলে গেল। বাইরে আলো ফুটেছে বেশ আগেই। টানা মানসিক আর শারীরিক ধকলের পর এই ঘুমের কারণে মাথাটা পরিষ্কার লাগছে।
জানালা খুলে বাইরে তাকালাম ॥ বৃষ্টি নেই। সামনের পাহাড়টার আড়াল থেকে উকিঝুকি দিচ্ছে সূর্য। চারদিকে গাঢ় সবুজের সমারোহ। আজ সারাদিন রোদই থাকবে মনে হচ্ছে।
তবে রুমের ভেতরটা বাইরের তুলনায় বেশ অন্ধকার। আগে ভেবেছিলাম বাড়িটা দক্ষিণমুখী বা পূবমুখী। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দক্ষিণপশ্চিম মুখী।
“দক্ষিণ-পশ্চিম…” বাইরের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম।
কী যেন একটা অন্যরকম লাগছে, ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। আমার বারবার মনে হচ্ছিল জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই সরাসরি সূর্যোদয় দেখতে পাব বুঝি। বাড়িটা পূবমুখী ধরে নেয়ার কোনো কারণ আছে নিশ্চয়ই। এমনি এমনি তো এরকম একটা ভাবনা মাথায় আসার কথা না।
বিছানার উপরে রাখা ইউসুকের ডায়রিটা তুলে নিলাম। এখানে কি বাড়িটা কোনো দিকে মুখ করা, সেই বিষয়ে কিছু লেখা আছে? কয়েক পাতা উল্টেই নিশ্চিত হলাম, এখানে সেরকম কিছু ছিল না।
কিছু একটা চোখে পড়েছে। কী সেটা?
চারপাশে নজর বুলালাম একবার। অস্থিরতা বাড়ছে ক্রমশ। ঠিক এমন সময় টেলিস্কোপটা চোখে পড়লো।
সেদিকে এগিয়ে পাশে রাখা বাক্সটা খুলে ভেতর থেকে রেকর্ড পেপার বের করলাম। জুলাইয়ের ২৫ তারিখ সকালে বুধ গ্রহ দেখতে পাওয়ার কথা লেখা আছে এখানে।
পেয়েছি! এটাই! এই লেখাটা দেখেই ধরে নিয়েছিলাম বাড়িটা পূবমুখী। জানালার কাছে গিয়ে আবারও বাইরে তাকালাম। নিশ্চিত হতে চাইছি যে ভুল হয়েছে কিনা। কোনো সন্দেহ নেই এবারে। বাড়িটা আসলেও ঈষৎ পশ্চিমমুখী। এদিক দিয়ে কোনোভাবেই সূর্যোদয় দেখা সম্ভব না।
এই অসঙ্গতির ব্যাখা কী?
আবারো গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মস্তিষ্কের চাকাগুলো ঘুরছে বনবন করে। দীর্ঘক্ষণ ভাবনার পর একটা দৃশ্যপট দাঁড় করালাম। পুরোটাই আন্দাজ অবশ্য।
লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে সিঁড়ির উদ্দেশ্যে দৌড় দিলাম বেইজমেন্টে নেমে এসে যে পথে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছি, সেই পথেই বেরিয়ে এলাম বাইরে।
বৃষ্টির কারণে চারপাশে কাদা কাদা হয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলে বাড়ির চারপাশে চক্কর লাগালাম একবার। আমার আন্দাজ মিলে গেছে একদম।
“আমি আস্ত একটা গর্দভ!” লম্বা শ্বাস ফেলে বলি।
ভেতরে ফিরে দেখলাম সায়াকা উঠে পড়েছে। লিভিংরুমের পর্দাগুলোও সরিয়ে দিয়েছে কোনো এক ফাঁকে।
“গুড মর্নিং,” আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে বললো ও। “বেশ আগেই উঠে পড়েছ দেখছি।”
“বাড়িটা দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী।”
কথাটা শুনে বিভ্রান্তি ভর করলো ওর চোখেমুখে। “কী?” কপাল কুঁচকে বললো।
জানালার দিকে ইশারা করলাম হাত দিয়ে। “দেখো, এই সকালবেলা ও ভেতরে রোদ ঢুকছে না। অর্থাৎ, বাড়িটা পশ্চিমমুখী।”
এবারে ও বুঝতে পারল কী নিয়ে কথা বলছি আমি। জানালার দিকে তাকিয়ে বললো, “হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?”
“এটা দেখো,” বলে টেলিস্কোপের রেকর্ড পেপারটা বাড়িয়ে ধরলাম ওর দিকে।
দেখলো ও, কিন্তু অর্থ বুঝতে পারলো বলে মনে হয় না। চেহারায় বিস্ময় ফুটলো আবারও। আসলে এই বিষয়টা সব প্রাথমিক স্কুলেই শেখানো হয়। কিন্তু প্রাত্যাহিক জীবনে ব্যবহার না থাকায় ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
“সৌরজগতের গ্রহ বিন্যাসের মনে আছে? বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল আর বৃহস্পতি। সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ হচ্ছে বুধ। কেউ যদি পৃথিবী থেকে বুধ গ্রহ দেখতে চায়, তাহলে কী করবে বলো তো?”
“কী করবে?”
“সূর্যের দিকে তাকাতে হবে। বুধ সবসময় সূর্যের কাছাকাছিই থাকে। “ওহ…”
“তবে দিনের বেলা দেখতে হলে বিশেষ যন্ত্রপাতির দরকার। সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে সূর্যের আলোয় কিছু দেখা যায় না। তাই বুধ গ্রহ দর্শনের সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। কারণ তখন রোদের তেজ সবচেয়ে কম থাকে।”
“তার মানে এখানে ভোরবেলা বুধ গ্রহ দেখার কথা বোঝানো হয়েছে।”
“হ্যাঁ। কেইচিরো মিকুরিয়া সূর্যোদয়ের সময় বুধ গ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। পূর্ব দিকে তাকিয়ে।”
“উপর তলার জানালা দিয়ে কি সূর্যোদয় দেখা যায় না?”
“না” মাথা ঝাঁকিয়ে বলি।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল সায়াকার। “এসবের মানে কী?”
“অনেকক্ষণ ভেবে একটা উত্তর বের করেছি। কিন্তু তুমি শুনলে হয়তো হাসবে। আমার নিজের কাছেই অদ্ভুত ঠেকছে।”
“না, বলো।”
“বিষয়টা আসলে অতও জটিল না। আগে বাড়িটা পূবমুখী ছিল।”
“আগে, মানে…
“এই বাড়িটা আবার নতুন করে বানানো হয়েছে।”
জমে গেল সায়াকা। আর যা-ই হোক, এরকম কিছু শুনবে ভাবেনি নিশ্চয়ই। ঠায় ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চারদিকে ঘুরে আমার উপরে এসে স্থির হলো ওর দৃষ্টি।
“কিন্তু ইউসুকের ডায়রিতে তো ওরকম কিছু লেখা নেই।”
“অর্থাৎ, ওর মৃত্যুর পর করা হয়েছে কাজটা।”
“তাহলে এই বাড়িটা আমরা যতটা পুরোনো ধরে নিয়েছি, অত পুরোনো নয়? কিন্তু কেউ থাকে না, এরকম একটা বাড়ি আবারও নতুন করে বানানো হবে কেন?”
“আমার কাছেও অদ্ভুত লেগেছে বিষয়টা। কিন্তু, বাড়িটা নতুন করে বানানো হয়েছে মেনে নিলে একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।”
“কী?”
“তুমি যে রহস্যময় ঘরটার কথা বলছিলে…” রান্নাঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বলি। “কালো ফুলদানি, সবুজ পর্দা এই বাড়িটার কোথাও নেই কেন? তোমার স্মৃতিতে তো ঠিকই রয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে ওটা ভিন্ন একটা বাড়িতে দেখেছ তুমি।”
জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগলো ও। “অসম্ভব! এই বাড়িটার কথাই মনে আছে আমার, একদম নিশ্চিত আমি।”
“তাহলে কালো ফুলদানি আর সবুজ পর্দার বিষয়টা কেবলই ভ্রম? এটাই বলতে চাইছ?”
“ওটা…” মুখ নামিয়ে নিল সায়াকা।
ওর কাঁধে হাত রাখলাম।
“আসলে, এই বাড়িটায় পা রাখার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছিল কেউ কোনোদিন থাকেনি এখানে।”
আমার দিকে তাকালো সায়াকা। বলেই চললাম, “এই যেমন কার্পেটটার কথাই ধরো না। প্রচুর ধুলো, এটা ঠিক। কিন্তু ব্যবহারের কোনো চিহ্নই নেই। শুধু কার্পেটই নয়, ডায়নিং টেবিলের আশপাশের মেঝের দিকে তাকালে কোনো দাগ চোখে পড়বে না তোমার। সাধারণত চেয়ার টেনে সরালে কিন্তু এমনিই দাগ পড়ে যায়। বাকি সব কিছুর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। জিনিসগুলো নতুন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।”
“কোথায়… লোকে থাকতো, এই চিহ্ন আছে তো।”
“তাই?”
“হ্যাঁ। ইউসুকের ঘর, মিকুরিয়া দম্পতির ঘর। রান্নাঘরের ফ্রিজ।” “তাহলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই বাড়িটায় কোনো বাতি নেই কেন?”
“বাতি? মানে ফ্লুরোসেন্ট বাতির কথা বলছো? বিদ্যুৎই তো নেই।”
“না, বিদ্যুৎ নেই কথাটা ভুল। এখানে কখনো বিদ্যুৎ ছিলই না।”
কথাটা শোনামাত্র অভিব্যক্তিহীন হয়ে গেল সায়াকার চেহারা। কিছুক্ষণ পর বিস্ময় ভর করলো সেখানে।
“ভুল হচ্ছে তোমার…”
“না, ঠিকই বলছি। আমি গিয়ে দেখে এসেছি। তুমি নিজের চোখে দেখতে চাও?”
জবাব না দিয়ে মাথা ঝাঁকাতে লাগল সায়াকা।
“বিদ্যুৎ ছাড়া কীভাবে থাকা সম্ভব?”
“সম্ভব না,” বলি আমি। “অন্তত এরকম একটা বাড়িতে। আর সত্যটা হচ্ছে, এখানে কখনো বৈদ্যুতিক সংযোগই দেয়া হয়নি। এর একটাই অর্থকেউ কোনোদিন থাকেনি এখানে।”
“কেন থাকেনি?”
“জানি না আমি। যে বাড়িতে কেউ থাকবে না, এরকম বাড়ি বানানো অর্থহীন।”
সোফায় ধপ করে বসে পড়লো সায়াকা। দুই হাতে মাথা চেপে ধরেছে। রক্তিম চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
“এটা কী করে সম্ভব?” আবারও বললো ও। “ওগুলো কী তাহলে? ডায়রি, ইউসুকের টেবিলের বইগুলো, রকিং চেয়ার, উল বোনার সরঞ্জাম এসবের ব্যাখা কী?”
“কেউ নিশ্চয়ই প্রতিলিপি বানানোর চেষ্টা করেছে। ইংরেজিতে যাকে বলে রেপ্লিকা।”
“রেপ্লিকা?”
“হ্যাঁ, এই রুমটার কথাই ধরো না,” লিভিং রুমের চারপাশে নজর বুলিয়ে বলি। “তোমার স্মৃতির সাথে তো মিলে গেছে, তাই না?”
মাথা নেড়ে সায় দিল সায়াকা।
“এই পুরো বাড়িটাই আসলে একটা রেপ্লিকা। অতীতের নির্দিষ্ট একটা সময়ের অনুকরণ করে বানানো হয়েছে। কিন্তু কেন, সেটা বলতে পারব না।”
“আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না,” সায়াকার পুরো শরীর কাঁপছে এখন।
ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম। “এই রহস্য সমাধানের চাবি হচ্ছে তোমার স্মৃতির কালো ফুলদানি আর সবুজ পর্দার ওই ঘরটা। এই বাড়িটা যদি রেপ্লিকাই হয়ে থাকে, তাহলে ওই ঘরটা নেই কেন? এই প্রশ্নের জবাব পেলেই বাকিটুকু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সায়াকা।
“অর্থাৎ, আমার স্মৃতি ফিরে না এলে রহস্যটার কোনো সমাধান হবে না। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারছি না। কেউ যেন দেয়াল তুলে দিয়েছে মনে। সামনে এগোনো অসম্ভব।”
“কিন্তু দেয়ালটার মাঝে কোনো ফাঁকফোকর আছে নিশ্চয়ই। সেখান দিয়েই ঢোকার চেষ্টা করতে হবে তোমাকে,” বলে উঠে দাঁড়ালাম।
“যাচ্ছ কোথায়?”
“ঘরটা কোথায় উধাও হলো, সেটা দেখতে।”
৩
সায়াকা যে দেয়ালটার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা থাকার কথা বলছিল, সেখানে চলে এলাম। বোঝার চেষ্টা করছি কী ঘটেছিল।
যদি কেউ একটা পুরোনো বাড়ির প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা তৈরি করে একটা রুম বাদ দিতে চায়, তাহলে কী করবে? যদি রুমটা এক কোনায় হয়ে থাকে, তাহলে পুনঃনির্মাণের সময় না বানালেই চলবে। কিন্তু সেটা যদি একটা দেয়ালের একদম মাঝে হয়, তবে সমস্যা। এক্ষেত্রে একপাশে লিভিং রুম এবং আরেকপাশে তাতামি রুম।
পুরো বাড়িটার নকশার ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে তাতামি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জিনিসপত্র রাখার জন্যে তাকের মত করা আছে পাশের দেয়ালে। সেটার ঠিক উল্টোদিকে লিভিং রুমের পাশের দেয়ালে একটা ছোট কাবার্ড। খুব একটা চওড়া না। স্লাইডিং দরজাটা একপাশে সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। খালি। কোনো তাকও নেই।
এক পা পিছিয়ে এসে পুরোটা ভালো মত খেয়াল করলাম। একটু অদ্ভুত দেখাচ্ছে। সাথে সাথে একটা প্রশ্ন উদয় হলো আমার মনে। পুরো দেয়ালটার দৈর্ঘ্য প্রায় তিন মিটারের মতন। অর্থাৎ, কাবার্ডটার পাশে প্রায় দুই মিটারের মতন জায়গা খালি। পেছনে লিভিং রুমটা, তবুও অনেকখানি জায়গা ফাঁকাই পড়ে আছে।
দেয়ালটায় জোরে গুঁতো দিলাম হাত দিয়ে। ফাঁপা শোনালো শব্দটা।
তীব্র অস্বস্তি গ্রাস করলো আমাকে। দেয়ালটা আরো ভালো মতো দেখলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলো না। তাই আবারও কাবার্ডটার দিকে মনোযোগ দিলাম। ভেতরে একপাশে প্লাইউডের উপরে কোমর সমান উচ্চতায় দু’টুকরো বড় কাঠ পেরেক দিয়ে গেঁথে রাখা হয়েছে। চাইলে হাতল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে ওগুলো। একটা কাঠ ধরে সজোরে টান দিলাম। খুব সহজেই দেয়াল থেকে খুলে এলো প্লাইউড।
ভেতরে বেশ অনেকখানি জায়গা। যাবতীয় পুরোনো জিনিসপত্রের আখড়া। নিজেকে প্রত্নতাত্ত্বিক মনে হচ্ছে রীতিমত।
“টর্চটা নিয়ে এসো!” জোরে বললাম যেন সায়াকা শুনতে পায়।
একটু পরেই টর্চ হাতে ছুটে এলো ও। আমাকে কাবার্ডের ভেতরের গোপন কুঠুরিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল।
“এটা কী?”
“সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি,” বলে ওর হাত থেকে টর্চটা নিলাম।
ভেতরে পট, রান্নাঘরের সরঞ্জামাদি আর ধাতব জিনিসপত্রে ভর্তি। সবকিছু ধুলোমাখা।
“নতুন করে বানানোর আগে এটুকুও বাড়ির অংশ ছিল নিশ্চয়ই,” বলি আমি।
“আমি একটু দেখি,” এগিয়ে এলো সায়াকা।
সরে জায়গা করে দিলাম ওকে। সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিল সায়াকা। একটা লম্বা, সরু কালো ফুলদানি বের করে আনলো একটু পর। এটার কথাই বলছিল বারবার।
ফুলদানিটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘুরলো ও।
“রুমটা আসলেও ছিল।”
“তুমি নিশ্চিত যে এটাই সেই ফুলদানি?”
আবারও ফুলদানিটার দিকে তাকালো ও। হাত দিয়ে ধুলো মোছার পর সাদা ফুলের নকশা ফুটে উঠলো গায়ে। “হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত,” মাথা নেড়ে বলে সায়াকা। “এটাকেই আগে দেখেছি।”
“দেখি, একটু ভেতরে যাই।”
কাবার্ডের ভেতরে ঢুকে সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম আবার। শক্ত একটা ডুরালুমিনের বক্স চোখে পড়লো। ঢাকনা খুলে উঁকি দিলাম। একটা রাবার প্যাড ভেতরে। টেলিস্কোপের যাবতীয় সরঞ্জামাদি রাখার জন্যে ব্যবহৃত হতো নিশ্চয়ই। উপরতলায় যে রেকর্ড পেপারটা পেয়েছি, সেটার মতন আরো কয়েকটা রেকর্ড পেপার আছে এখানে।
“দেখে মনে হচ্ছে না যে পুড়ে গেছে?” এক পাশ থেকে উঁকি দিয়ে বললো সায়াকা। কাঠের একটা কাপ-পিরিচ সেট ওর হাতে। দেখতে কালো লাগছে, কিন্তু জিনিসটার আসল রঙ কালো নয়। পুড়ে যাওয়ার কারণে ওরকম দেখাচ্ছে।
“তাই তো।”
এবারে অন্য জিনিসগুলোতে পুড়ে যাওয়ার কোনো ছাপ আছে কিনা তা দেখতে লাগলাম। একটু পরেই প্লাস্টিকের একটা পুতুল খুঁজে পেলাম যেটার ডান হাত পুরোপুরি পুড়ে গেছে। এসব একটা দিকেই ইঙ্গিত করছে।
“আগুন লেগেছিল?” মাথা নেড়ে বলি। “আরেকটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল তাহলে।”
“কোন প্রশ্ন?”
“পুরোনো বাড়িটার কী হয়েছে। এখন আমরা জানি যে পুড়ে গেছিল সেটা। কিন্তু কেউ একজন ভুলতে পারেনি বাড়িটা, সেজন্যেই হুবহু একটা প্রতিরূপ বানিয়েছে।”
“কিন্তু প্রতিরূপ বানানোর সময়ে যে ঘরে ফুলদানিটা ছিল, সেটা আবার বানানো হয়নি কেন?”
“হয়তো ওই ঘর থেকেই আগুনের সূত্রপাত, সেজন্যে। গোপন একটা কুঠুরি বানিয়ে দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে। আসলে কুঠুরিটা হয়তো আগে থেকেই ছিল সেখানে। ঢেকে দেয়া হয়েছে আর কি। ভেতরের জিনিসগুলো আগের মতনই আছে।”
“আগুন লেগেছিল…”
ফুলদানিটার দিকে তাকিয়ে রইলো সায়াকা, যেন দূর অতীতের কোনো স্মৃতি রোমন্থনের চেষ্টা করছে। হয়তো আগুন শব্দটা শোনার পর কিছু একটা মনে পড়েছে ওর।
“তোমার বাবা-মা কি আগুনের ব্যাপারে কখনো কিছু বলেছিল?” “বলেছিল হয়তো,” দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে সায়াকা। “কিন্তু আমি ভুলে গেছি।”
“বুঝতে পেরেছি,” বললাম। পুরোনো বাড়ির আর কী কী পাওয়া যায়, সেটা দেখছি এখন। গোল একটা ছোট অ্যালার্ম ঘড়ি পেলাম। ধাতব শরীরে জং ধরে গেছে ওটার, কাঁচ ঘোলাটে, কিন্তু ডায়াল আর কাটাগুলো ঠিকই আছে।
ঘড়িটায় সময় দেখাচ্ছে এগারোটা দশ।
সায়াকাকে দেখালাম।
‘‘ ‘এগারোটা দশ’-এর মাহাত্ম্য এবারে বুঝতে পারছি। ওই সময়েই আগুন লেগেছিল নিশ্চয়ই।”
কয়েকবার চোখ পিটপিট করে শ্বাস ছাড়ল সায়াকা।
“তা বুঝলাম… কিন্তু এই বাড়ির সবগুলো ঘড়িতে কেন একই সময় করে রাখা হয়েছে?”
“হয়তো এটা নির্দেশ করছে বাড়ির ভেতরে সময় নির্দিষ্ট একটা মুহূর্তে থমকে আছে। সেই মুহূর্তেই সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল। শুধু ভেতরের এই জিনিসগুলো বাদে,” টর্চ দিয়ে ভেতরের কুঠুরিটা দেখিয়ে বললাম। এই সময় কিছু একটা চকচক করে উঠলো। দেয়াল ঘেঁষে রাখা জিনিসটা, প্রায় আমার উচ্চতার।
এবারে ভালো করে আলো এলে দেখলাম। একটা ক্রুশ। তবে বেইজমেন্টের ক্রুশটার মতন যেনতেনভাবে বানানো হয়নি। বরং, সুন্দর ধাতব নকশা গায়ে।
ক্রুশের ঠিক পাশে কিছু কথা লেখা হয়েছে দেয়ালে খোদাই করে। আঙ্গুল দিয়ে ধুলো মুছে পড়তে শুরু করলাম। এই কাজটা আনাড়ি কেউ করেছে খুব সম্ভবত।
সায়াকাকে ডাক দিলাম।
“এটা দেখো,” ক্রুশটার আশপাশে আলো ফেলে বললাম।
লেখাটা দেখেই একদম জমে গেল ও।
শান্তিতে ঘুমাও ইউসুকে, ফেব্রুয়ারি ১১।
৪
“আরেকটা প্রশ্নের উত্তর পেলাম আমরা,” টর্চ নিভিয়ে বললাম। “আগুনে পুড়ে মারা গেছে ইউসুকে। ওকে খুন করা হয়নি। আত্মহত্যাও করেনি।”
“ও কি ওই ঘরেই মারা গেছিল?” ফুলদানিটার দিকে ইঙ্গিত করে বলে সায়াকা। “যেখানে রাখা ছিল এই ফুলদানিটা?”
“খুব সম্ভবত।” চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়লাম। “রুমটা নতুন করে কেন বানানো হয়নি, বুঝতে পারছ তো? যাতে করে এই দুঃসহ স্মৃতিটা বারবার মনে পড়ে না যায়।”
“ক্রুশটা ওখানে বানানো হয়েছে কারণ…” সায়াকা ঘুরে বলে, “ইউসুকে এখানে সমাহিত?”
“শান্তিতে ঘুমাও ইউসুকে….”
কথাটা বলার সাথে সাথে মাথার ভেতরে যেন একশো ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বলে উঠলো। এই বাড়িটা কেন বানানো হয়েছে, সেটা বুঝতে পেরেছি খুব সম্ভবত।
“এজন্যেই কি তাহলে পুনঃনির্মিত হয়েছে বাড়িটা?”
“কী জন্য?”
জবাবে কিছু না বলে ছয় তাতামি ম্যাট দৈর্ঘ্যের ঘরটায় এমাথা-ওমাথা পায়চারি করতে লাগলাম। চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি মাথার ভেতরে। কিন্তু কাজটা কঠিন। এ বাড়িতে পা রাখার পর থেকে এতক্ষণ অবধি ছোটখাটো যতগুলো বিষয়ে খটকা লাগছিল, সবগুলো এসে জড়ো হয়েছে একসাথে। যৌক্তিক সমাধান দরকার সবগুলোর।
“ডায়রিটা কোথায়?” থেমে জিজ্ঞেস করলাম। “ডায়রিটা কোথায়?”
“কাল রাতে তুমিই তো দেখেছিলে। ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরে আছে নিশ্চয়ই।”
ছুটে বেরিয়ে এলাম তাতামি ঘরটা থেকে। সায়াকা আমাকে অনুসরণ করছে।
কিন্তু সিঁড়ি অবধি পৌঁছানোর আগেই দরজার কাছে থেমে গেলাম। জুতো রাখার কেবিনেটের ওপরে একটা পেইন্টিং ঝুলছে। খুব সম্ভবত একটা বন্দর আঁকা হয়েছে সেখানে।
“কোনো সমস্যা? কী হলো?” সায়াকা আমার আস্তিন টেনে বললো। “প্রথমবার এই ছবিটা দেখেই বোঝা উচিত ছিল,” পেইন্টিংটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম।
“কী বোঝা উচিত ছিল?”
“সব বলবো তোমাকে। আগে ডায়রিটা নিয়ে আসি।”
সিঁড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।
মিকুরিয়া দম্পতির ঘরে এসে ইউসুকের ডায়রিটা তুলে নিলাম। আমি যা খুঁজছি, সেটা প্রথম দিকের পাতাগুলোতেই আছে, যেখানে ইউসুকে লিখেছিল ও চাইনিজ বর্ণমালা খুব একটা ভালো পারে না।
“ঠিক যেমনটা আমি ভেবেছিলাম,” লেখাটুকু পড়ে বলি। সবকিছু এখন একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। “ঠিক আছে, এবারে চলো নিচে যাই,” সায়াকার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলি।
দরজার কাছে এসে দেয়ালে ঝোলানো বন্দরের ছবিটা দেখাই আবারো। “তোমার কাছে ছবিটা একটু অদ্ভুত লাগছে না?”
আমার প্রশ্ন শুনে লম্বা সময় সেদিকে তাকিয়ে রইলো সায়াকা। মাথা ঝাঁকিয়ে মানা করে দিল কিছুক্ষণ পর। “না তো। আমার কাছে তো ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে।”
“পেইন্টিংটার আলাদাভাবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এরকম একটা পেইন্টিং যে এই বাড়ির প্রবেশ পথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেটাই অদ্ভুত আসলে। পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত একটা বাড়িতে কি বন্দরের ছবি থাকার কথা?”
মাথা একদিকে কাত করে আবারও ছবিটার দিকে তাকালো সায়াকা।
“না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু কেউ ইচ্ছে করলে ঝোলাতেও পারে, তার ইচ্ছা।”
“তবুও একটু অস্বাভাবিকই বটে। আরেকটা ব্যাপার আছে, এখানে দেখো,” ডায়রিটা খুলে ইউসুকের একটা এন্ট্রি ওকে দেখাই। এন্ট্রিটায় লেখা-
‘১২ মে, প্রথমে মেঘ, পরে রোদ।
আজ খুব গরম। সবাই বারবার সৈকতে যাওয়ার কথা বলছিল। আমারও সাঁতার কাটতে খুব ভালো লাগে। বাসায় এসে ঠাণ্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। মা-ও হাতাকাটা জামা পড়ে ছিল দুপুরে।’
সায়াকা ডায়রিটা থেকে মুখ তুললে বললাম, “অদ্ভুত, তাই না? প্রথমবার পড়ার সময় মনে হয়েছিল কোনো একটা হিসেব মিলছে না, কিন্তু তখন গুরুত্ব দেইনি।”
ওর চোখেমুখে এখনও বিভ্রান্তি। তাই ডায়রিটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, “এই যে এখানে সৈকতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, দেখো। হ্যাঁ, বাচ্চারা গরমের সময় সৈকতে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাগানোতে, পাহাড়ের উপরে একটা এলাকায় সমুদ্র কোথায় পাবে তারা? বড়জোড় মাতসুবারা হ্রদে যেতে পারে।”
বিস্ময়ে হা হয়ে গেল ওর মুখ। “ওহ….”
“এবারে বুঝতে পারছ তো আমি কী বলছি?” ডায়রি বন্ধ করে বললাম। “এই বাড়িটা আসলে পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষের ওপরে বানানো হয়নি, বরং সম্পূর্ণ নতুন একটা জায়গায় রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে।”
“মূল বাড়িটা তাহলে…”
“আমার নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না তোমাকে। ওখানেই আগে থাকতো তোমার পরিবার, ইয়োকোহামায়। আর এই ছবিটা ইয়োকোহামা বন্দরের।”
“তুমি বলতে চাইছ ইয়োকোহামার বাড়িটার প্রতিরূপ এটা?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু এমনটা কেন করবে কেউ? তাও এরকম নির্জন একটা জায়গায়।”
বিষয়টা কীভাবে ব্যাখা করবো ভাবতে ভাবতে আনমনে হাত দিয়ে গাল স্পর্শ করলাম একবার। দাড়ি বেশ বড় হয়েছে, কিন্তু এই বাড়িতে শেভ করা সম্ভব না।
“নসসোস প্রাসাদের ব্যাপারে জানো?” একটু পর বললাম
“না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বললো সায়াকা। কপালে ভাঁজ পড়েছে বেশ কয়েকটা। এত কিছু থাকতে এই বিষয়ে কেন আলাপ শুরু করলাম, সেটাই ভাবছে নিশ্চয়ই।
“এই প্রাসাদ হচ্ছে মিনোয়ান সভ্যতার6 একটি অন্যতম পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর ভেতরে এমন একটা ঘর আছে, যেটা প্রত্নতাত্ত্বিকদের ঘাম ঝরিয়ে ছেড়েছিল। প্রথম দেখায় মনে হবে ঘরটা বুঝি রাজার শয়নকক্ষ, কিন্তু পরে বোঝা যায় যে অনেক হিসেবই মিলছে না। এই যেমন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। হ্যাঁ, দরকারি সবকিছু লাগানো আছে ঠিকই, কিন্তু ওগুলো মাঝপথে এসে থেমে যায়। এছাড়াও, নির্মাণ সামগ্রী নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেমন সিড়িগুলো এমন পাথরে তৈরি, যেগুলোকে সহজেই দরকারি রূপ দেয়া যায়। আবার ঠিক এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই পাথরগুলো ক্ষয়েও যায় তাড়াতাড়ি। কিন্তু সিঁড়িটা ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। লোকে ওঠা-নামা করলে কিছুটা ক্ষয় হওয়া তো স্বাভাবিক। কেউ যদি না-ই যায়, তাহলে ঘরটা বানানোর উদ্দেশ্য কী?”
“এমন একটা ঘর বানালো কেন?” আমার প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করলো সায়াকা।
“অনেক চিন্তা-ভাবনার পর গবেষকেরা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। ওটা আসলে একটা সমাধি। রাজার মৃত্যু পরবর্তী জীবনে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে ঘরটা।”
ফ্যাকাসে হয়ে গেল সায়াকার চেহারা। বুকের কাছে হাত নিয়ে বিস্ফারিত নয়নে চারপাশে নজর বুলালো কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে বিস্ময় রূপ নিল সন্তাপে।
“তাহলে এই বাড়িটাও… একটা সমাধি?”
“সব আলামত সেই দিকেই নির্দেশ করছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই, পানি নেই, জীবনের কোনো চিহ্নও নেই। এই বাড়িটা আসলে একটা রেপ্লিকা। কারো বসবাসের জন্যে বানানো হয়নি।”
“কিন্তু… এত এত আসবাব।”
“হ্যাঁ, তবে জরুরি অনেক কিছুই নেই। ইউসুকে আর কেইচিরো মিকুরিয়ার ঘরটা এমনভাবে সাজানো যেন তারা এখনও বেঁচে আছে, এটা তোমার কাছ অদ্ভুত লাগছে না? কেউ যদি আসলেই এখানে থাকতো, তাহলে ওগুলো অনেক আগেই পরিষ্কার করে ফেলত। বাড়িটা বানানোই হয়েছে মৃতদের জন্যে। পিলারে কত উঁচুতে দাগ কাটা, নিজের চোখেই তো দেখেছ। বেঁচে থাকলে ইউসুকে নিশ্চয়ই ওরকমই লম্বা হতো। সেটাই বোঝানো হয়েছে।” কথাগুলো বলে নিজের গায়েই কাটা দিল আমার।
“যদি সমাধিই হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত…”
“নাহ, আমার মনে হয় না অতিরিক্ত কিছু করা হয়েছে। এখানে জায়গার দাম খুব একটা বেশি না। পানি বা বিদ্যুতের সংযোগ নেই। শুধু নির্মাণ খরচ। এজন্যেই এরকম নির্জন একটা জায়গা বাছাই করা হয়েছে। অযাচিত কৌতূহল দেখাবে না কেউ। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ইউসুকের ঘরের বই আর পত্রিকাগুলো। বেছে বেছে সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের দোকান থেকে কেনা হয়েছে অতীতের কথা মাথায় রেখে। আসল বইগুলো নিশ্চয়ই আগুনে পুড়ে গেছে।”
“এজন্যেই বইগুলো এত পুরোনো,” আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলে সায়াকা। “এই ডায়রিটা তো পোড়েনি।”
“এটা?” ডায়রিটা উপরে তুললাম। “হয়তো বুকশেলফে বা, অন্য কোথাও যত্ন করে রেখে দেয়া হয়েছিল, এজন্য পোড়েনি।”
“চিন্তা করো, এরকম একটা জিনিসই বেঁচে গেল।”
“হ্যাঁ।” আরো কিছু সরঞ্জাম নিশ্চয়ই আগুনে পোড়েনি। ওগুলো ওই গুপ্ত কুঠুরিতে রেখে দেয়া হয়েছে কাবার্ডের ভেতরে। ডুরালুমিনের বাক্সের ভেতরে থাকায় টেলিস্কোপটাও বেঁচে গেছে।
“এমনটাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এই বাড়িটা কে বানালো?”
“দু’জন মানুষের পক্ষে এমন কিছু করা সম্ভব। ইউসুকের বাবা আর ওর দাদি। তবে যে লোক তার নিজের ছেলেকে ওভাবে অত্যাচার করে, সে এরকম একটা বাড়ি বানাবে, তা বিশ্বাস করা কষ্টের। কিন্তু এমনটাও হতে পারে যে ছেলেকে হারিয়ে হয়তো পিতৃত্ব জেগে উঠেছিল।”
“তাহলে এসবের সাথে আমার বাবার কী সম্পর্ক?” গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে সায়াকা। “সে প্রায় প্রায়ই এখানে আসত কেন?”
“এটা যদি আসলেও সমাধি হয়ে থাকে, তাহলে তো আসার একটাই উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তাই না? শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্যে।”
“ইউসুকের সমাধিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্যে?”
“হ্যাঁ।”
“ফ্রিজে কিন্তু জ্যুসের ক্যান, কর্নড বিফ রাখা দেখেছি আমরা। বাবার একদমই অপছন্দ এগুলো।”
“নিশ্চয়ই ইউসুকের প্রিয় খাবার ছিল গুগুলো,” শান্ত স্বরে বললাম। “মৃত কোনো আত্মীয়ের সমাধিতে যাওয়ার সময় কিন্তু আমরা এমন সব জিনিস সাথে নিই, যেগুলো একসময় খুব পছন্দের ছিল তার। “
মাথা নামিয়ে নিল সায়াকা। খানিক বাদে অদ্ভুত একটা শব্দ কানে এলো। সায়াকা যে কাঁদছে, তা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো।
“সামনের দরজাটা তো ভেতর থেকে আটকে রাখা হয়েছে,” আমার দিকে তাকিয়ে বললো ও।
“যাতে কেউ চুরি করে ঢুকতে না পারে,” জবাবে বলি।
“আচ্ছা…” দেয়ালে হেলান দিল সায়াকা। “তাহলে গতকাল থেকে একটা সমাধির ভেতরে আছি আমরা?”
“ভয় লাগছে?”
“একটু। কিন্তু…” সিলিংয়ের দিকে তাকালো ও। “যে-ই এই বাড়িটা বানিয়ে থাকুক না কেন, তার মনের অবস্থার কথা ভেবে দেখ। বিষাদে জর্জরিত নিশ্চয়ই।”
“কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারছি সেটা।”
আবারও লিভিং রুমে ফিরে এলাম আমরা। এই বাড়িটা যে একটা সমাধি, তা উপলব্ধি করার পর থেকে ধুলোমাখা সাধারণ দর্শন টেবিল আর সোফাগুলোকেও এখন অন্যরকম লাগছে।
“ইন্ডিয়ানা জোনস মনে হচ্ছে নিজেকে।”
“আসলেই,” মাথা নেড়ে বলি। এই সিনেমাটা একসাথে দেখেছিলাম আমরা।
“ভালো কথা, এটা যেহেতু একটা সমাধি, মৃতদেহ-ও কি সমাহিত আছে কোথাও?”
“মনে হয় না। সেক্ষেত্রে অনেক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো,” ঘাড় কাত করে বলি। “তবে পুরোপুরি উড়িয়েও দেয়া যায় না সম্ভাবনাটা।”
“সেটাই,” সায়াকা বলে। “এই সমাধিটা কোনো একটা উদ্দেশ্যে তো বানানো হয়েছে নিশ্চয়ই।”
“হ্যাঁ।”
“ইউসুকে’কে যদি এখানে সমাহিত করা হয়ে থাকে, তাহলে কি সেটা ওই গুপ্ত কুঠুরিটার নিচে?”
“হ্যাঁ, হতে পারে। ক্রুশটা তো ওখানেই।” একটা কথা মনে হলো এসময়। “বেইজমেন্টেও কিন্তু একটা ক্রুশ আছে, সেটা…”
“প্রবেশপথ নির্দেশ করা জন্যে?”
“হয়তো।”
কিন্তু বিষয়টা খোঁচাতে লাগল আমাকে। তাই টর্চ হাতে উঠে দাঁড়িয়ে নিচে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। সায়াকা এলো না এবারে।
বেইজমেন্টে এসে ক্রুশটা দেখলাম আবারও। কাঠের তৈরি। এবড়োখেবড়ো। এটাকে আরেকটু যত্ন নিয়ে বানালে কী হতো?
ওটার চারপাশে টর্চের আলো ফেলে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো সিলিংয়ের কাছে ছুরির ফলা বা ওরকম ছুঁচালো কিছু দিয়ে সিমেন্ট খুঁড়ে কিছু একটা লিখেছে কেউ।
পকেট থেকে রুমাল বের করে ধুলো পরিষ্কার করলাম। আমার আন্দাজ ঠিক প্রমাণিত হলো আবারও। আসলেও কিছু কথা লেখা হয়েছে এখানে।
৫
সিঁড়িতে সায়াকার পদশব্দ শোনামাত্র সরে গেলাম দেয়ালের সামনে থেকে।
“কিছু পেয়েছ?” জিজ্ঞেস করলো ও। “এতক্ষণেও ফিরছ না দেখে চিন্তা হচ্ছিল, তাই এলাম।”
“পেয়েছি, কিন্তু…” বলে টর্চটা বগলের নিচে রেখে দুই হাত থেকে ধুলো ঝারলাম। “ওরকম কিছু না।”
“ক্রুশটা দেখছিলে, তাই না? নতুন কিছু চোখে পড়লো?”
“হ্যাঁ, এখানেও কিছু একটা লেখা আছে,” জায়গাটায় আলো ফেললাম। “শান্তিতে ঘুমাও…। ফেব্রুয়ারি, ১১” দেয়ালে সিমেন্ট খুদে এটাই লেখা।
“উপরতলার ওই ক্রুশটার পাশেও একই কথা লেখা।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু দেখো, শান্তিতে ঘুমাও- এরপর কিছু একটা লেখা ছিল মনে হচ্ছে। ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে।”
“হ্যাঁ,” বললাম। “হয়তো ভুলে কিছু লেখা হয়েছিল।”
“হয়তো, কিন্তু…” সায়াকা এখনও লেখাটার দিকে তাকিয়ে আছে।
“এরকম একটা কথা লিখতে গিয়ে কি ভুল করার কথা? শুধু ‘শান্তিতে ঘুমাও’ লিখলেও তো হতো।”
কিছু না বলে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলাম। এই মুহূর্তে ওর প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা উচিত হবে না।
সায়াকার কাঁধ ঝুলে পড়লো একটু পর। শুকনো হেসে আমার দিকে তাকালো। “বুঝতে পারছি না। তুমি যেটা বললে, সেটাই ঠিক বোধহয়। ভুলে কিছু লেখা হয়েছিল হয়তো। পরে মোছা হয়েছে।”
সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল সায়াকা।
“আমরা তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে পড়ি টোকিওর উদ্দেশ্যে, কী বলো? আর তো কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না,” লিভিং রুমে ফিরে বললাম। “বাড়িটা কেন বানানো হয়েছে, সেটা জানি আমরা আংকেল মাঝে মাঝে এখানে কেন আসতেন, সেটাও জানতে পেরেছি। তোমার শৈশবে দেখা কিছু দৃশ্যের অর্থ এখন মোটামুটি পরিষ্কার। আমাদের এখানে আসাটা মোটামুটি স্বার্থক বলা যায়।”
“কিন্তু আমি তো আমার স্মৃতি ফিরে পাইনি।”
“সেটা জানি। কিন্তু এখানে থাকলেই যে স্মৃতিগুলো ফিরে আসবে, তা নয়। বরং মিকুরিয়া পরিবারের ব্যাপারে এখানকার চাইতে ইয়োকোহামাতে বেশি তথ্য জানা যাবে।”
কিছু না বলে পিয়ানোর দিকে এগোলো সায়াকা। ঢাকনা তুলে একটা কি’তে চাপ দিল। ভোঁতা একটা শব্দ হলো। আমি পিয়ানোর ব্যাপারে বলতে গেলে কিছুই জানি না, তবুও এটা বুঝতে পারলাম যে সুর ঠিক নেই।
“এই ঘরটায় বসে এক সময় পিয়ানো বাজাতাম। এখন মনে হচ্ছে যেন ভিন্ন এক জন্মের কথা,” সায়াকা বললো একটু পারলো।
“মানে আসল বাড়িটার লিভিং রুমের কথা বলছো।”
দুর্বল একটা হাসি ফুটলো ওর মুখে। “হ্যাঁ, পুরোনো বাড়িটায়।” “বাড়িটায় তো প্রায়ই যেতে তুমি, লিভিং রুমেও অনেকবার গিয়েছ। তাছাড়া ওই বয়সে সবকিছু নিয়েই কৌতূহল বেশি থাকে। তাই খেয়ালের বশে এরকম পিয়ানো-ও বাজিয়েছ নিশ্চয়ই।”
“খেয়ালের বশে…”
একটা চেয়ার নিয়ে এসে পিয়ানোর সামনে বসলো সায়াকা। দেখে মনে হচ্ছে এখনই বাজাতে শুরু করবে। ও যে পিয়ানো বাজাতে পারে, এরকমটা আমাকে আগে কখনো বলেনি।
তবে পিয়ানো না বাজিয়ে আমার দিকে ফিরলো।
“মনে হচ্ছে বাজাতে পারি,” বলে সায়াকা। “তোমার হয়তো হাস্যকর শোনাচ্ছে, কিন্তু এমনটাই মনে হচ্ছে আমার। অথচ কোথায় কী চাপ দিতে হবে জানি না।”
“ছোটবেলায় কম-বেশি সবারই পিয়ানো শেখার ইচ্ছা থাকে।”
“না, সেটা না। আমি আসলে… বোঝাতে পারছি না তোমাকে। একটা জিনিস মনে পড়তে গিয়ে না মনে পড়লে যেরকম লাগে, সেরকম লাগছে এখন।”
রাগত ভঙ্গিতে হাঁটুর উপরে একবার চাপড় দিল ও। এভাবে হতাশা ঝেরে লাভ হবে না বুঝতে পেরেই বোধহয় পরক্ষণে বললো, “আমি ফিরব না। এখানে থাকবো আরও কিছুক্ষণ।” দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর বুক চিড়ে।
“কিন্তু যা যা দেখার আছে, সব তো দেখেছি, তাই না?”
“ওই সিন্দুকটা কিন্তু খোলা যায়নি।”
“ওহ, হ্যাঁ,” এবারে আমার দীর্ঘশ্বাস ফেলার পালা। “কিন্তু কম্বিনেশনটা না জানলে খোলা অসম্ভব আমার পক্ষে।”
“কম্বিনেশনটা কেমন? কয় ডিজিট?”
“অনেকগুলো দুই ডিজিটের সংখ্যা। ডায়ালটা কেবল এক দিকেই ঘোরে। তাই আন্দাজে কিছু একটা চেপে খোলা যাবে বলে মনে হয় না।”
“কম্বিনেশন কোডটা নিশ্চয়ই কোথাও লেখা আছে। তোমার কি মনে হয়?”
“আমিও সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু কোথাও কিছু পাইনি।”
“সংখ্যা…” পিয়ানোর দিকে ঘুরে ঢাকনাটা বন্ধ করে দিল সায়াকা।
“যাইহোক, আমি থাকব আরো বেশ কিছুক্ষণ,” শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বললো ও।
“আচ্ছা। কিন্তু কিছু খেয়ে আসি নাহয়? ক্ষুধা পেয়েছে নিশ্চয়ই?”
“আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও নাহয়। আমি থাকি। বারবার মনে হচ্ছে এখান থেকে চলে গেলে স্মৃতিগুলো ফিরে আসতে গিয়েও আসবে না।”
“আচ্ছা, তাহলে কিছু কিনে আনি। স্যান্ডউইচ তো অনেক খেয়েছ। রাইসবল আর গ্রীন টি আনব?”
“কিছু একটা আনলেই হলো,” অন্যমনস্ক কণ্ঠে বলে সায়াকা। ওর যাবতীয় মনোযোগ এখন হারানো স্মৃতি ফিরে পাওয়ার উপরে নিবদ্ধ।
শহরতলীতে একাই ফিরে চললাম। গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছি ওর সাথে এখানে আসাটা উচিত হয়েছে কিনা। যতই বেশি ভাবলাম, ততই মনে হতে লাগলো যে ভুল করে ফেলেছি। হ্যাঁ, অনেক রহস্যের সমাধান হয়েছে, কিন্তু সায়াকার সেটায় কোনো উপকার হয়েছে কিনা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কেন যেন মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত মনটা ভেঙ্গে যাবে ওর। সায়াকা অবশ্য বিষয়টা বুঝতে পারেনি এখনো, কিন্তু সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
গত রাতে যে কনভেনিয়েন্স স্টোরটায় এসেছিলাম আমরা, সেটা খোলা আছে এখনও। কয়েক বক্স রাইস বল, সালাদ আর দুই ক্যান গ্রিন টি কিনলাম কেবল। বাড়িটায় খুব বেশিক্ষণ থাকা হবে না আর। বেশি কিছু নিলে নষ্ট হবে।
ফেরার পথে মাতসুবারা হ্রদের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এলাম। ছুটির দিন হওয়ায় দোকানপাটগুলোয় একটু প্রাণ ফিরেছে যেন। ট্যুরিস্টের অপেক্ষায় আছে সবাই।
বাড়িটায় ফিরে খাবারের ব্যাগ নিয়ে লিভিং রুমে চলে এলাম। কিন্তু সায়াকা নেই এখানে। তাতামি রুমটায় উঁকি দিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
ইউসুকের বাবা-মা’র ঘরে পেলাম ওকে। রকিং চেয়ারটায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। পায়ের আওয়াজ পেয়ে ফিরলো আমার দিকে।
“তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।”
“অপেক্ষা করছিলে, কেন?”
“একসাথে দেখব ভেতরে কী আছে।”
“কিসের ভেতরে?”
“সিন্দুকটা,” নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে ও।
“সিন্দুক?” আলমারিটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে সিন্দুকটার পেছনে এত ঘাম ঝরিয়েছি, সেটা খোলা। “কীভাবে খুললে?”
“কম্বিনেশন দিয়ে,” ডায়াল ঘোরানোর ভঙ্গি করলো ও।
“কোডটা জানতে?”
“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে বলে সায়াকা। “এই বাড়িতে কিন্তু আমরা ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কয়েকটা সংখ্যাই দেখেছি বারবার। ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ, ১১:১০। অর্থাৎ ০২, ১১, ১১, ১০।”
“তাই খুলে গেল?”
“হ্যাঁ,” সায়াকার কণ্ঠে গর্ব বা বিজয়ের কোনো ছাপ নেই।
“ধুর। আমি কিনা এত কষ্ট করলাম গাধার মতন।”
“ব্যাপার না। এসো এখন,” উঠে দাঁড়ালো সায়াকা। “ভেতরে কী আছে দেখি।”
“তুমি দেখোনি?”
“না,” জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে সায়াকা। “একটু ভয় লাগছিল আসলে।”
আমারও ভয় লাগছে, মনে মনে বললাম। এরপর হাত বাড়িয়ে দিলাম সিন্দুকটার দিকে।
ভেতরে একটা ধূসর রঙের এ-ফোর সাইজের খাম। আকৃতি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ভেতরে কাগজ বাদেও অন্য কিছু আছে। প্রাপকের ঠিকানায় লেখা- মিসেস ফুজিকো মিকুরিয়া। কেইচিরো মিকুরিয়ার স্ত্রী এবং ইউসুকের দাদি। খামটার পেছন দিকে লেখা- সোহাচি ওগুরা, কানাগাওয়া পুলিশ প্রিফেকচার।
“পুলিশের লোক পাঠিয়েছে…”
“কী আছে ভেতরে? খোলো।” তাড়া দিল সায়াকা।
আর দেরি না করে সাবধানে খুললাম খামটা। ভেতরে দু’টো কাগজ আর নীল রঙের একজোড়া গ্লোভস। দেখে মনে হচ্ছে কোনো বাচ্চার।
“নববর্ষের সময় একটা এন্ট্রিতে ডায়রিতে এই গ্লোভসটার কথাই লিখেছিল ইউসুকে। ‘বাইরে যাওয়ার সময় মা’র বোনা নীল গ্লোভসটা হাতে দিয়ে গিয়েছিলাম।’
একটা গ্লোভস আমার হাতের উপরে রাখলাম। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর অংশটুকু নেই। পুড়ে গেছে।
৬
কাগজের জাতের লেখা আর পানের ওপরের রাতের লেখা একই। পড়তে শুরু করলাম।
‘দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কাছে থাকা একটা জিনিস ফিরিয়ে দিচ্ছি আজ। আপনার মৃত নাতির সেই নীল গ্লোওস। আপনিই বানিয়ে দিয়েছিলেন বোধহয়। মাফ করবেন, কিন্তু তদন্তের খাতিরে নিয়ে আসতে হয়েছিল। গতকাল থানায় চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছি আমরা। প্রথমেই বলে দিচ্ছি রিপোর্টে আমরা লিখেছি এই অগ্নিকাণ্ড একটি দুর্ঘটনা। আগুনের সূত্রপাত হয় নিচতলায় মি. মাসাকাযু’র অফিস পরে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন ইদানিংকার শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অনেক জায়গাতেই এরকম দুর্ঘটনা হচ্ছে।
তবে ব্যাক্তিগতভাবে আমি এই রিপোর্টের সাথে একমত নই। অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব এখনও পাইনি, বিশেষ করে যে ঘর থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সেই ঘরে কেরোসিনের ক্যান পাওয়ার ব্যাপারটা সন্দেহজনক। এই প্রসঙ্গে আপনি বলেছিলেন যে হিটিং স্টোভ চালানোর জনো মি. নাসাকার বারবার বেজমেন্টে যেতে ভালো লাগতো না, তাই নিজের পরেই সবসময় কেরোসিন রাখতেন তিনি।
আপনাদের প্রাক্তন গৃহপরিচারিকা তামিকো কুরাহাপিত একইরকম স্বাক্ষ্য দিয়েছে।
তবুও, ব্যাখাটা মানতে কষ্ট হচ্ছে আমার। আমরা তদন্ত করে যা বুঝেছি মি, মাসাকাসুর অফিস পরটা দামি সব আসবাব আর শোপিসে সজ্জিত ছিল। এত সুন্দর একটা ঘরে কেরোসিন ক্যানের মত কিছু রাখা মানে সৌন্দর্য নষ্ট করা।
আমি এখনও আমার প্রাথমিক অনুমানের পক্ষেই সাফাই গাইব, যেটা শুনে আপনি রেগে গিয়েছিলেন। আগুনটা ইচ্ছেকৃতভাবে লাগানো হয়েছিল কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে। এরপর কোনো এক অজানা কারণে বাবাছেলে দু’জনেরই মৃত্যু হয়।
ঘটনাস্থলে খুঁজে পাওয়া ইউসুকের গ্লোভস সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে ওটা নিয়ে যাই আমি। বেশ কয়েক জায়গায় বাদামি দাগ ছিল গ্লোভসটার। ওটা যে জংয়ের দাগ, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলের গ্লোভসে ওরকম দাগ কীভাবে লাগল? নিশ্চয়ই কেরোসিন ক্যান থেকে, এটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত উত্তর। এই ধরনের ক্যানের হাতলগুলো হয় একদমই পাতলা। গ্লোভস পরিহিত হাতে তুললে দাগ লেগে যায়।
সেজন্যেই গ্লোভসটা নিয়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু ল্যাবরেটরিতে এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি যে ওটা কেরোসিন ক্যান পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই আলামত হিসেবে গুরুত্ব হারায় জিনিসটা।
আরো কিছু সন্দেহজনক কারণে আমার মনে হয়েছিল যে আগুনটা অসাবধানতাবশত লাগেনি। কিন্তু সেই দাবির সপক্ষে কোনো সূত্র খুঁজে পাইনি এখনও। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাই তদন্ত এখানেই থামাতে হচ্ছে। নতুন আরেকটা কেসে মনোযোগ দিতে হবে।
আপনার সাথে অদূর ভবিষ্যতে দেখা হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভালো থাকবেন।
বিঃদ্রঃ কিছুদিন আগে এক সাক্ষীর কাছ থেকে অদ্ভুত একটা রিপোর্ট পাই আমরা। ঘটনার দিন, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে কেউ একজন আপনাকে চিড়িয়াখানায় দেখেছিল। সেই মুহূর্তে সাথে কেউ ছিল আপনার। সময় বিবেচনায়, এটা তো অসম্ভব। কারণ আপনি বলেছিলেন সেই সময় একাই বাজার করতে গিয়েছিলেন। সাক্ষীকে কথাটা বলি আমি, কিন্তু সে বিশ্বাস করেছে বলে মনে হয় না। হয়তো অন্য কারো সাথে আপনাকে গুলিয়ে ফেলেছে।’
পুরোটা পড়ার পর সায়াকার হাতে তুলে দিলাম কাগজটা। আমার মতই মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলো ও। সেই সুযোগে খামে থাকা গ্লোভসটা দেখতে লাগলাম উল্টেপাল্টে। ডিটেকটিভ ওগুরা চিঠিতে যেমনটা বলেছে, আঙুলের জায়গাগুলোতে আসলেও বাদামি দাগ লেগে আছে।
“কীভাবে সম্ভব!” জোরেই বললাম কথাটা। ইউসুকের মৃত্যুর সাথে মানব চরিত্রের কুৎসিত দিকের সম্পর্ক আছে।
“দু’জনেই মারা গেছে,” ফিসফিসিয়ে বলে সায়াকা। “তাহলে আগুনটা দুর্ঘটনাবশত লাগেনি?”
“এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাবে না। পুরোটাই ডিটেকটিভ লোকটার অনুমান।”
“সে কিন্তু আরো কিছু সন্দেহের ব্যাপারে বলেছে, এই গ্লোভসটার মতনই,” বলে সায়াকা।
“যে ঘরে আগুনের সূত্রপাত, সেখানে কেরোসিনের ক্যান খুঁজে পাওয়াটা আসলেই সন্দেহজনক,” বলি আমি। “পুলিশের উচিত ছিল আরেকটু খতিয়ে দেখা।”
আমার কথা শুনে একটু অবাক হলো সায়াকা। “উচিত ছিল মানে?”
“মি. মিকুরিয়া তো একজন আইনজীবি ছিলেন। পুলিশ ফোর্সেও নিশ্চয়ই পরিচিত লোক ছিল তার। তাই, এটা আন্দাজ করলে বোধহয় ভুল হবে না যে পুলিশ ইচ্ছে করেই ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। মিসেস মিকুরিয়া বোধহয় অনুরোধ করেছিলেন যেন ডিটেকটিভ ওগুরা’কে খুব বেশি তদন্ত করতে দেয়া না হয়।”
“অর্থাৎ, ফুজিকো মিকুরিয়া জানতেন যে এটা নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়? সত্যটা জেনেও গোপন করতে চাইছিলেন তিনি?”
“হয়তো,” বলি আমি। “আবার এভাবেও চিন্তা করা যায় যে পুলিশ যেহেতু খুব বেশি তদন্ত করেনি, এটা আসলেও একটা দুর্ঘটনাই ছিল।”
চিঠিটা আরো একবার পুরোটা পড়ে মুখ তুললো সায়াকা। “আগুনটা যদি ইচ্ছে করেই লাগানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটা কার কাজ ছিল? কেইচিরো মিকুরিয়ার ছেলে মাসাকা? নাকি…
“ডিটেকটিভ ওগুরা ইউসুকে’কে সন্দেহ করছে। গ্লোভসের দাগগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করে।”
সায়াকা’ও এরকম কিছুই আশা করছিল। অবাক হলো না। বরং শঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হওয়ায় হতাশা ফুটলো ওর চোখেমুখে।
“আগুনের সূত্রপাত হয় সকাল এগারোটায়। ফেব্রুয়ারির এগারো তারিখ, সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় মাসাকায়ু মিকুরিয়া হয়তো তখনও বিছানাতেই ছিল। নিয়মিত মদ গিলত সে, খুব একটা সকালে ওঠার কথা না। ইউসুকে বোধহয় সেই সুযোগটাই নেয়ার চেষ্টা করেছে।”
“কীভাবে আগুন ধরালো ও?” ভয়ার্ত চোখে জিজ্ঞেস করে সায়াকা।
“যেভাবে সবাই ধরায়। ঘুমন্ত অবস্থায় শিকারের গায়ে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। একটা বাচ্চার পক্ষেও কাজটা করা সম্ভব, ওরকম কঠিন কিছু না।”
“এরপর নিজেও আত্মহত্যা করেছে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে?”
“সেটাই তো মনে হচ্ছে।”
কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো সায়াকা। “তুমি নিশ্চিত?” খানিক বাদে জিজ্ঞেস করলো।
“কেন, তোমার অন্য কিছু মনে হচ্ছে?”
“এরকমটা কি করা আদৌ সম্ভব? শুনেই তো কেমন লাগছে,” চিন্তিত স্বরে বলে সায়াকা।
“ইউসুকে’র উপরে ওর বাবা শারীরিক নির্যাতন চালাতো, ডায়রির লেখা থেকে এটা স্পষ্ট। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ অনেক সময় অবিশ্বাস্য সব কাজ করে বসে।”
“সেটা জানি আমি,” থুতনিতে হাত রেখে মুখটা হালকা ঘুরিয়ে ভাবতে লাগলো সায়াকা। ভুলতে পারছে না বিষয়টা।
গ্লোভস জোড়া খামে ঢুকিয়ে রাখলাম।
“যাইহোক, এর বেশি আর কিছু জানা সম্ভব না আমাদের পক্ষে। ইউসুকে যে ওর বাবাকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে, এটা পুরোপুরি ওই ডিটেকটিভের আন্দাজ মাত্র।”
“হ্যাঁ,” ক্ষীণস্বরে বললো সায়াকা। এখনও চিঠিটার দিকেই নজর ওর। বিঃদ্রঃ দিয়ে যে কথাগুলো লেখা আছে, সেটা খেয়াল করলো এবারে। “এটা আবার কেন লিখেছে?”
“জানি না। হয়তো একই রকম চেহারার কাউকে দেখেছে।”
“যদি সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু না হয়ে থাকে, তাহলে লিখল কেন?” “ভদ্রলোকের কাছে বোধহয় একটু অদ্ভুত লেগেছিল বিষয়টা।”
“মনে হয় না,” মাথা ঝাঁকায় সায়াকা। “তাছাড়া, এরকম একটা রিপোর্ট অদ্ভুত ঠেকেনি তোমার কাছে?”
“অদ্ভুত লাগবে? কেন?”
“কারণ…” ঠোঁট ভিজিয়ে নিল ও। কিছু চিন্তা করার সময় এমনটা করা মুদ্রাদোষ ওর। মনের মধ্যে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বললো, “বুঝলাম মিসেস মিকুরিয়াকে ঘটনার দিন চিড়িয়াখানায় দেখেছিল সেই সাক্ষী। কিন্তু সেটা পুলিশকে জানানোর কী দরকার ছিল? এমন তো আর নয় যে পুলিশের সন্দেহ ছিল মিসেস মিকুরিয়াই আগুন লাগিয়েছে। সেক্ষেত্রে তথ্যটা অ্যালিবাই হিসেবে ব্যবহৃত হতো নিশ্চয়ই। কিন্তু অমন কিছু ঘটেনি।”
ওর কথা শুনে নিচের লেখাগুলো আবারও পড়লাম। যুক্তি আছে সায়াকার কথায়।
“তোমার কাছেও অদ্ভুত লাগছে, তাই না?” জিজ্ঞেস করলো ও।
“বলা মুশকিল আসলে,” সাবধানে কথাটা বললাম। “তদন্ত চলাকালীন সময় লোকে তো অনেক উল্টোপাল্টা বিষয় জানায় পুলিশকে। যেগুলোর সাথে কেসের আপাত কোনো সম্পর্কই থাকে না। হয়তো এক্ষেত্রেও সেরকম কিছুই ঘটেছে। চিঠির শেষে বিষয়টা মনে পড়ায় ডিটেকটিভ ওগুরা উল্লেখ করে দিয়েছে আর কি।”
“তাই?”
“এছাড়া আর কী হতে পারে?” জিজ্ঞেস করলাম।
বুড়ো আঙুলের নখ কামড়াতে কামড়াতে জানালার দিকে ঘুরলো সায়াকা। ওভাবেই থাকলো প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড।
“চিড়িয়াখানা…” ফিসফিসিয়ে বললো একটু পর।
“কী বললে?”
আমার দিকে তাকালো ও।
“এই চিড়িয়াখানার বিষয়টা খোঁচাচ্ছে আমাকে। যেদিন আগুন লাগলো, সেদিনই চিড়িয়াখানায় যাওয়া। আগুন আর চিড়িয়াখানা…” অসংলগ্ন শোনাচ্ছে এখন সায়াকার কথা। দুই হাত দিয়ে চেপে রেখেছে মুখ। “কেন যেন মনে হচ্ছে দু’টোর মধ্যে কোনো সংযোগ আছে।”
জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। “তুমি আসলে একটু বেশিই ক্লান্ত। ছোটখাটো বিষয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছ সেজন্য।”
“আরে নাহ। কী যেন একটা মনে পড়তে গিয়েও পড়ছে না।” বেশ কয়েকবার ‘চিড়িয়াখানা’ শব্দটার পুনরাবৃত্তি করলো সায়াকা। যেন এই মন্ত্ৰ জপলে হারানো স্মৃতি ফিরে পাবে।
“চলো খেয়ে নিই। একটু চাপ কমবে মাথা থেকে।”
“চুপ করবে তুমি?” হঠাৎই রুক্ষ স্বরে বললো ও।
চমকে গেলাম। খামটা পড়ে গেল হাত থেকে। সেই শব্দে হুঁশ ফিরে পেল ও। লজ্জার হাসি ফুটলো মুখে। আমার সাথে ওভাবে কথা বলায় আফসোস হচ্ছে বোধহয়।
“সরি।”
“ব্যাপার না। আসলে সবকিছু নিয়েই এখন সন্দেহ হচ্ছে আমাদের।
“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে বললো সায়াকা। “ঠিক বলেছ। আসলেও কিছু খাওয়া দরকার। মাথা কাজ করছে না। কী এনেছ?”
“বেশি কিছু না,” প্লাস্টিকের ব্যাগটা তুলে নিলাম।
“চলো তাহলে নিচে গিয়ে খাই।”
“তুমি যাও, আমি সবকিছু একটু গুছিয়ে আসছি।”
“হ্যাঁ।”
রুম থেকে বেরিয়ে গেল সায়াকা। ও নিচে চলে গেছে, এটা নিশ্চিত হবার পর আলমারিটার সামনে গিয়ে নিচের ড্রয়ার থেকে বাইবেলটা বের করলাম।
সায়াকা বারবার চিড়িয়াখানা শব্দটা বলায় একটা কথা মনে পড়ে গেছে। গতকাল বাইবেলটার ভেতরে দু’টো টিকেট রাখা দেখেছিলাম। তখন অতটা মনোযোগ দেইনি বিধায় তারিখটা খেয়াল নেই।
বাইবেলের মাঝ বরাবর রাখা টিকেট দু’টো। একপাশে একটু ছেড়া, অর্থাৎ ব্যবহৃত হয়েছিল এটা নিশ্চিত। একটা টিকেট প্রাপ্ত বয়স্কদের আর অন্যটা বাচ্চাদের।
আর তারিখ…
লেখা ঝাপসা হয়ে এসেছে, তবে ‘ফেব্রুয়ারি ১১’ পড়া যাচ্ছে। বছরও মিলে গেছে।
এটা কাকতালীয় হতেই পারে না। ডিটেকটিভ ওগুরাকে কেউ একজন সত্যিটাই জানিয়েছিল তাহলে। ফুজিকো মিকুরিয়া সেদিন আসলেই গিয়েছিলেন চিড়িয়াখানায়।
আর সেখানে একা যাননি তিনি।
চিঠিটার নিচে ডিটেকটিভ ওগুরাও দু’জনের কথাই বলেছে। ‘প্রাপ্ত বয়স্ক’ লেখা টিকেটটা মিসেস মিকুরিয়ার। তাহলে বাচ্চাদের টিকেটটা কার? ইউসুকের না, এটা নিশ্চিত।
হঠাৎ মনে হলো কেউ বুঝি বরফ ঢেলে দিয়েছে আমার পিঠের মাঝ বরাবর। আরেকটু হলেই টিকেট দু’টা পড়ে যাচ্ছিল হাত থেকে।
ওগুলো আগের জায়গায় ঢুকিয়ে বাইবেলটা রেখে দিলাম ড্রয়ারে। এই সামান্য কাজ করতেও সময় লাগলো অনেকক্ষণ, কারণ হাত কাঁপছে আমার।
এসময় হঠাৎ একটা শব্দ কানে এলো পেছন থেকে। শ্বাস আটকে পেছনে ফিরে দেখি সায়াকা আমার দিকে তাকিয়ে আছে সন্দিহান চোখে।
“কী করছো তুমি?” জিজ্ঞেস করে ও।
“কিছু না,” উঠে দাঁড়িয়ে বলি। “ড্রয়ারের ভেতরে আবার একটু দেখছিলাম। পুরোনো একটা বাইবেল ছাড়া আর কিছু নেই।”
কথা বলার সময় আমার মাথায় ঘুরতে লাগল ও যদি এখন বাইবেলটা দেখতে চায় তাহলে কী বলবো। ঘাম জমলো কপালে।
“ওনারা তো বোধহয় খ্রিস্টান ছিল। বাইবেল থাকাটাই স্বাভাবিক, সায়াকা বললো একটু পর।
“তা ঠিক।”
“নিচে আসো এখন?”
“হ্যাঁ, চলো।”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম গোপনে। ওকে অনুসরণ করে বেরিয়ে এলাম ঘরটা থেকে।
৭
“সায়াকা, তুমি বিষয়টাকে যতটা অস্বাভাবিক ভাবছ, আসলে ততটা নয়,” কনভেনিয়েন্স স্টোর থেকে কিনে আনা রাইস বল চিবুতে চিবুতে বলি। “অনেকেরই কিন্তু শৈশবের কোনো স্মৃতিই মনে থাকে না।”
“তো?” আমার দিকে তাকালো সায়াকা।
গ্রীন টি দিয়ে মুখের রাইস বলটা গিলে নিলাম। “এই অভিযানের এখানেই নাহয় ইতি টানি আমরা? তাছাড়া মিকুরিয়া পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয়ে আর নাক গলানো কি উচিত হবে? বিশেষ করে সবকিছু ধামাচাপা দেয়ার জন্যে যখন এত কিছু করেছে তারা।”
আমার কথাটা অল্প হলেও প্রভাব ফেলল সায়াকার মনে। অপ্রস্তুত মনে হচ্ছে এখন ওকে। “এই সমাধির কথা বলছো?”
“হ্যাঁ। এটা এক অর্থে সমাধিই।”
বুকের ওপরে হাত ভাঁজ করে সোফায় হেলান দিল ও। “তুমি কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছো,” হঠাৎই বলে বসলো পরমুহূর্তে। চোখে সন্দেহ।
“অদ্ভুত? মানে?”
“কীভাবে বুঝাই… হুট করেই নেতিবাচক সব কথা বলতে শুরু করেছ। অথচ একটু আগেও তোমার মধ্যে উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। কী হয়েছে, বলো তো?”
“কিছু না। রহস্যের যেহেতু সমাধান হয়েছে, তাই ফিরে যেতে চাইছি। আর যেমনটা কেবলই বললাম, একটা সমাধির ভেতরে এভাবে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে বাধছে এখন।”
“ব্যস, এটুকুই?”
“হ্যাঁ, এটুকুই। আর কী কারণ থাকতে পারে?” ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর মুখ ফিরিয়ে নিল ও। “আমার মতে রহস্যের সমাধান এখনো হয়নি।”
“কিন্তু মিকুরিয়া পরিবারের ট্রাজেডির বিষয়ে যা যা জানার আছে, সব তো জানি আমরা। কেইচিরো মিকুরিয়া তার ছেলে মাসাকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন পুরোপুরি। নাতি ইউসুকে’কে সন্তানের মত বড় করেন। কিন্তু কেইচিরোর মৃত্যুর পর ছেলের উপরে অত্যাচার শুরু করে মাসাকায়ু। সেই অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যে গায়ে আগুন দিয়ে বাবাকে হত্যা করে ইউসুকে, পরে নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এসবই তো আমরা জানি, তাই না? আর কিছু কি জানা বাকি আছে?”
“আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে।”
“অতিরিক্ত ভেবে ফেলছ তুমি।”
“না,” সোফা থেকে উঠে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কয়েক পা সামনে এগোলো সায়াকা। পিয়ানোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এখন। “তুমি এতক্ষণ যা যা বললে, সেখানে আমি নেই কোথাও।”
“না থাকাই স্বাভাবিক,” শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললাম। “তুমি তো আর এই পরিবারের কেউ না। ইউসুকের অত্যাচারের শিকার হওয়া বা এই বাড়িটা পুড়ে যাওয়ার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
“তাই?”
“হ্যাঁ। কেন, তোমার কিছু বলার আছে?”
পিয়ানোর সামনে রাখা টুলটায় বসে লম্বা শ্বাস নিল সায়াকা। “আমি মনে হয় দেখেছি দৃশ্যটা।”
“কী দেখেছ?”
“বাড়িটা… পুড়ে যেতে,” ক্ষণিকের দ্বিধার পর বললো ও।
ঢোক গিললাম একবার।
“পুড়ে যেতে দেখেছ? মিকুরিয়াদের বাড়িটা?”
“জানি না। কিন্তু ওটাই তো হবার কথা। ধোঁয়া, লোকজনের ছোটাছুটি… আর পোড়া গন্ধ,” প্রায় চোখ বন্ধ করে বললো সায়াকা । “কেউ ছিল আমার সাথে।”
“তোমার মা-ই হবেন নিশ্চয়ই, ইউসুকের ওটাই আন্টি। আগুনের খবর শুনে এসেছিলে বোধহয় …”
চোখ খুলে আরেকবার লম্বা শ্বাস নিল সায়াকা। আশপাশে নজর বুলাতে বুলাতে থেমে গেল হঠাৎ। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম। কফি টেবিলটা দেখছে তন্ময় হয়ে।
“কী দেখছ?” একবার ওর দিকে, আরেকবার কফি টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললাম।
সামনে এগিয়ে একটা সি-উইড রাইস বল তুলে নিল ও। যেন ভীষণ দামি কিছু, এমন ভঙ্গিতে হাতের তালুতে রেখে দেখতে লাগলো।
“হ্যালো… শুনতে পাচ্ছ?” বলি আমি। কিন্তু ওর মধ্যে কোনো ভাবগতিক নেই।
হাঁটু গেড়ে বসে বিড়বিড় করে একমনে কী যেন বলে চলেছে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। “খাওয়ানোর দরকার নেই, বকবে কিন্তু। খাওয়াবে না-”
ওর কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকি দিলাম একবার। “কী হলো তোমার? সায়াকা?”
ক্রোধান্বিত চোখে আমার দিকে তাকালো ও। “ছাড়ো তো আমাকে! চলে যাও এখান থেকে,” রাগ সামলে বললো।
“তোমাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া সম্ভব না। কী চলছে তোমার মনে, বলো তো।”
“আমাকে দশটা মিনিট একা থাকতে দাও, প্লিজ। নাহলে পাঁচ মিনিট দাও অন্তত। তাই যথেষ্ট।”
মনের মধ্যে কুডাক দিল আমার। কিন্তু এই অবস্থায় ওকে মানা করা সম্ভব না।
“আচ্ছা, পাশের ঘরে আছি আমি। যদি দরকার পড়ে, তাহলে ডাক দিও। ঠিক আছে?”
নীরবে মাথা নাড়ল ও।
তাতামি ঘরটায় গিয়ে নিচে পা ভাঁজ করে বসলাম। আমার নিজেরও অস্থির লাগছে এখন।
‘খাওয়ানোর দরকার নেই।’
এটা পরিষ্কার যে স্মৃতিগুলো ফিরে আসছে সায়াকার। ওকে একা ফেলে আসা উচিত হলো কিনা বুঝতে পারছি না। এই বাড়িটা থেকে যত দ্রুত বেরুনো যায়, তত ভালো। কিন্তু সেটায় কি ওর প্রতি সুবিচার করা হবে?
হুট করে নেতিবাচক সব কথা বলতে শুরু করেছ’- এমনটাই বলেছিল সায়াকা। ওর মতন বুদ্ধিমান একটা মেয়ের সামনে অবশ্য অভিনয় করে পার পাওয়া যাবে না। আমার নেতিবাচক আচরণের কারণ আমি ভয় পাচ্ছিলাম।
হাতঘড়িতে দেখলাম তাতামি ঘরটায় আসার পর থেকে আট মিনিট পার হয়ে গেছে। পা টিপে টিপে লিভিং রুমটায় গেলাম। ও নেই এখানে।
“সায়াকা!” জোরে ডেকে উঠে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে দিলাম। কেইচিরো মিকুরিয়া আর তার স্ত্রী’র ঘরটার সামনে গিয়ে দেখি আলমারির নিচের ড্রয়ারটার সামনে উবু হয়ে বসে আছে ও।
স্লো-মোশন ভিডিওর কোনো চরিত্রের মতন আমার দিকে ফিরলো ও। ওর হাতে বাইবেলের ভেতরে থাকা চিড়িয়াখানার টিকেট দু’টো।
“সায়কা…” আবারও ডাকলাম একই স্বরে।
“কেন? যেদিন বাড়িটায় আগুন লাগল সেদিন মিসেস মিকুরিয়া চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু কেন?”
“কী কেন?”
“তার সাথে আমি চিড়িয়াখানায় গেলাম কেন?”
“তুমি? সেটা কী করে সম্ভব।” হেসে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম বিষয়টা, কিন্তু পারলাম না। মিথ্যেটা নিশ্চয়ই প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছে আমার চেহায়ার।
আমার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল সায়াকা। “হ্যাঁ, ওখানে গিয়েছিলাম আমি। এটুকু মনে পড়েছে। অনেক দিন আগের কথা সেটা। তখন একদম ছোট ছিলাম। একজন মহিলা ছিল আমার সাথে, কিন্তু তার চেহারা মনে করতে পারছি না। একটা কিমোনো পরেছিল সে। তবে সেটা যে মা ছিল না, তা নিশ্চিত।”
“তোমার কোনো ভুল হচ্ছে, সায়াকা।”
“তাহলে এটা কী? এখানে ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখের কথা লেখা আছে, দেখো। ওই দিনই তো আগুন লেগেছিল, তাই না? পূর্ণবয়স্ক দর্শনার্থীর একটা টিকেট, আরেকটা বাচ্চাদের। আর চিঠিতেও কিন্তু লেখা ছিল যে মিসেস মিকুরিয়াকে চিড়িয়াখানায় কেউ দেখেছে।”
কিছু বললাম না। ভালো একটা ব্যাখা খুঁজে বের করতে হবে এখন। কিন্তু এরকম চাপের মুখে সেটা এক প্রকার অসম্ভব।
“মিসেস মিকুরিয়া চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু কার সাথে? বাচ্চাটা যদি আমি না হই, তাহলে কে ছিল সেটা?”
মাথা নামিয়ে নিলাম আমি। ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাসের ঝাপটায় শব্দ করে বন্ধ হলো জানালা। পুরো ঘর কেঁপে উঠলো।
“তুমি জানতে এটা, তাই না? আমি আর মিসেস মিকুরিয়া একসাথে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। কিন্তু জেনেও আমার কাছ থেকে লুকোনোর চেষ্টা করছিলে। কেন?”
“তুমি কী নিয়ে কথা বলছো বুঝতে পারছি না।”
“মিথ্যে বলবে না!” তীক্ষ্ণ স্বরে বললো সায়াকা। “একটু আগে তুমি এই ড্রয়ার খুলেছিলে। তখন আমাকে টিকেটগুলো দেখাওনি। বুঝতে পেরেছিলাম যে কিছু একটা লুকাচ্ছ, কিন্তু তোমাকে টের পেতে দেইনি।”
“শান্ত হও। তুমি মনে হয় একটু বিভ্রান্ত।”
“একটু না, পুরোপুরি বিভ্রান্ত। কিন্তু…” হাতের টিকেটগুলোর দিকে তাকালো ও। “আমি বোধহয় স্মৃতি ফিরে পাচ্ছি। অল্প অল্প করে হলেও।”
“কীরকম?” জিজ্ঞেস করি।
ধীরে ধীরে মাথা তুললো সায়াকা। “অনেকটা সিনেমার ট্রেইলার দেখার মতন, কিছু কিছু দৃশ্য মনে পড়েছে। কিন্তু সেগুলো আসলেও ঘটেছিল কিনা, সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই আমি। আসলে, আমি চাই না ঘটনাগুলো সত্য হোক। কারণ-” হঠাৎ থেমে কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করলো সায়াকা। “ঘটনাগুলো বড্ড ভয়ঙ্কর।”
“সায়াকা…” সামনে এগিয়ে নিচু হয়ে বসে ওর হাতটা আমার হাতে নিলাম। “হ্যালুসিনেশনের মত হচ্ছে তোমার। শারীরিক আর মানসিক ক্লান্তির কারণে। আজকের মত এসব বাদ দিয়ে টোকিও ফিরে-”
“তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই,” আমার কথার মাঝেই বললো ও।
“কী?”
“ঠিকঠাক জবাব দিবে। মিথ্যে বলবে না, প্লিজ।”
“আচ্ছা,” দ্বিধান্বিত স্বরে বললাম একটু পর।
আমার চোখে চোখ রাখলো ও।
“বেইজমেন্টের ক্রুশটা…”
“হ্যাঁ?”
“‘শান্তিতে ঘুমাও’ লেখা আছে ওখানে। কিন্তু একটা শব্দ মুছে ফেলা হয়েছে।”
ঢোক গিলতে গিয়েও পারলাম না। গলা শুকিয়ে এসেছে আমার। “তুমি মুছেছ শব্দটা, তাই না?”
“না।”
“তোমার কাছে সত্যটা জানতে চেয়েছি আমি,” লাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে সায়াকা। “টর্চের এক পাশে সিমেন্ট লেগে ছিল। ওটা দিয়েই মুছেছ, তাই না?”
জবাব দিলাম না।
“আচ্ছা, কেন মুছলে সেটা বলতে হবে না। কী লেখা ছিল সেটা বলো।”
এবারেও চুপ রইলাম।
“আচ্ছা, অন্য ভাবে করি প্রশ্নটা। ওখানে কি কারো নাম খোদাই করা ছিল?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দেয়া উচিত আমার। কিন্তু মন সায় দিচ্ছে না। সায়াকার কাছ থেকে সত্যটা লুকানো মনে হয় না সম্ভব হবে।
“নামটা ছিল…” শান্ত স্বরে বললো ও। “সায়াকা… তাই না? ঠিক বলেছি?”
মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে হৃদয়টা ধরে চাপ দিয়েছে কেউ। ধীরে ধীরে সয়ে এলো অনুভূতিটা। ক্লান্তি ভর করলো চিত্তে। কথা বলার জন্যে মুখ খুললাম ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ বেরুলো না। আমার এই প্রতিক্রিয়া দেখেই যা বোঝার বুঝে গেল সায়াকা।
“এটাই তাহলে।” চোখ দিয়ে পানি ঝরছে ওর। মোছার চেষ্টাও করছে না। “অদ্ভুত, তাই না? শান্তিতে ঘুমাও, সায়াকা। তাহলে সায়াকা কুরাহাশি নামের ছোট্ট মেয়েটা মারা গেছে? তাহলে আমি কে? নিজেকে তো এই নামেই চিনে এসেছি সারা জীবন। হাইস্কুলে তো আমাকে এই নামেই ডাকতে, নাকি?”
জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও। বাইরে প্রচুর আলো, কিন্তু রুমের ভেতরটা অন্ধকার। ছায়াবয়বের মত দেখাচ্ছে ওকে আলোর বিপরীতে।
“চিড়িয়াখানায় গিয়ে হাতিদের রাইস বল খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলাম আমি। কিন্তু আমার সাথে যে গিয়েছিল, সে মানা করছিল বারবার। “খাওয়ানোর দরকার নেই। বকবে কিন্তু। খাওয়ানোর দরকার নেই, হিসামি।”
“হিসামি…”
“নামটা কীভাবে লিখতে হয়, সেটা আগে জানতাম। এখন ভুলে গেছি। তাছাড়া একমাত্র সে-ই আমাকে ওই নামে ডাকত। বাকিরা ডাকত আমার ডাকনাম ধরে। চামি। এটাই আমার ডাকনাম।”
৮
ইউসুকে ওর ডায়রিতে ওই লোকটা বলে যাকে সম্বোধন করেছে, মানে মাসাকা মিকুরিয়া যে ওর বাবা, এটা জানার পর প্রথম খটকা লাগে আমার। হিসেব মিলছিল না। আবার মাসাতসুগু নাকানো’কে কেইচিরো মিকুরিয়া যে চিঠিগুলো পাঠিয়েছিলেন, সেগুলোর একটায় লেখা ছিল-
আপনি যে দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে এত দ্রুত জানতে পেরেছেন, এটা শুনে অবাক হয়েছি। আসলে আমরা কাউকেই বলিনি তখন। মাফ করবেন সেজন্যে। যেহেতু এর আগে ছেলে হয়েছে, তাই এবারে ছেলে হোক বা মেয়ে, আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
প্রথম যখন চিঠিটা পড়ি, তখন আমাদের ধারণা ছিল মাসাকা মিকুরিয়া হচ্ছে ইউসুকের বড় ভাই। তাই ‘দ্বিতীয় সন্তান’ বলতে এখানে ইউসুকে’কেই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু মাসাকায়ু মিকুরিয়া যেহেতু ইউসুকের বাবা, তাই চিঠির কথাগুলোর অর্থ আমূল বদলে যায়। সেক্ষেত্রে ইউসুকে হচ্ছে প্রথম সন্তান, দ্বিতীয় সন্তান আর কিছুদিনের মধ্যে পৃথিবীর মুখ দেখবে।
ইউসুকের মা ওকে জন্মদানের কিছুদিন পরেই মারা যায়। তাহলে, দ্বিতীয় এই সন্তান খুব সম্ভব মাসাকায় মিকুরিয়ার দ্বিতীয় বিবাহের ফসল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দ্বিতীয় সন্তানের কী হলো? ইউসুকে সেই ব্যাপারে ডায়রিতে কিছু উল্লেখ করেনি।
আর এখানেই আমার খটকা লাগে।
কিন্তু এটারও ব্যাখা দাঁড় করানো যায়। কেইচিরো মিকুরিয়ার পাঠানো অন্য আরেকটা চিঠির তথ্যানুযায়ী মাসাকায়ু মিকুরিয়ার সাথে তার দ্বিতীয় স্ত্রী’র অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর সেটার কারণ বোঝাও কষ্টকর কিছু নয়। জুয়ার নেশার কথা স্কুলে জানাজানি হবার পর চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মাসাকা মিকুরিয়া। অনেকেই টাকা-পয়সা পেত তার কাছে। ডিভোর্সের পর হয়তো সন্তানকে নিজের সাথেই নিয়ে গিয়েছিল মাসাকায়ুর দ্বিতীয় স্ত্রী।
তবুও হিসেব মিলাতে পারি না। ইউসুকে’কে যেরকম যত্নে বড় করেছেন কেইচিরো মিকুরিয়া, দ্বিতীয় নাতিকেও সেভাবেই মানুষ করার কথা ছিল তার। অথচ ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রী যখন নাতিকে নিয়ে চলে গেল, তখন কিনা কিছুই বললেন না ভদ্রলোক?
কিন্তু সায়াকা’কে আমার এসব সন্দেহের ব্যাপারে কিছু বলিনি। আমার মনের মধ্যে একটা কন্ঠস্বর বারবার বলছিল, এই বিষয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে বিপদ হতে পারে।
বেইজমেন্টে ক্রুশটার পাশে লেখাগুলো পড়ে আরো নিশ্চিত হই এই বিষয়ে। যেমনটা সায়াকা বললো একটু আগে, ওখানে লেখা ছিল-
‘শান্তিতে ঘুমাও, সায়াকা। ফেব্রুয়ারি, ১১।’
এমনটা বলা যায় এখানে হয়তো একই নামের অন্য কারো কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা অসম্ভব। এই সায়াকা হচ্ছে, ইউসুকের ডায়রিতে উল্লিখিত সায়াকা।
নামটা দেখে ঘাবড়ে যাই আমি, অস্বীকার করবো না।
শুধু ইউসুকে আর মাসাকায়ু মিকুরিয়াই সেদিন আগুনে পুড়ে মারা যায়নি। ওটাই আন্টির মেয়ে সায়াকাও মারা গিয়েছিল। হয়তো বেইজমেন্টে খেলাধুলা করছিল সে। বাড়িটায় যে আগুন ধরেছে, তা বুঝতে পারেনি।
মোদ্দা কথা, এই বাড়িটা যে শুধু ইউসুকের সমাধি, তা নয়। সায়াকারও সমাধি।
সেক্ষেত্রে আমি যার সাথে এখানে এসেছি, সে কে? স্বাভাবিক যুক্তিতে, মিকুরিয়া পরিবারের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই, এটা বলা যাবে না। কারণ তাদের নিয়ে আবছা আবছা স্মৃতি আছে ওর।
সেই সময় থেকে মাসাকা মিকুরিয়ার দ্বিতীয় সন্তানকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি আমি। আমি যে সায়াকাকে চিনি, সে কি তাহলে ইউসুকের সৎ বোন?
ডায়রির লেখাগুলো মনে করার চেষ্টা করি। কোথাও কি দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে কিছু লেখা আছে?
তখন চামির নামটা মনে হয় আমার। বেশ কয়েক জায়গায় ইউসুকে লিখেছে-
‘লোকটা একটা বড় ট্রাকে করে তার মালপত্র নিয়ে এসেছে এখানে। নিচতলার বেডরুমটায় থাকার ইচ্ছা তার। ওখানেই রেখেছে সবকিছু। সে কেন আমাদের সাথে থাকবে, এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম মা’কে। তখন মা বলে যে আমাদের ভালোর জন্যেই নাকি লোকটা এসেছে। আমি আসলে বুঝতে পারছি না সেই ‘ভালো’টা কী হতে পারে। এরকম একটা লোককে বাসায় চাই না আমি। কিন্তু চামি অনেক কিউট, ওকে পেয়ে ভালো লাগছে। শুধু চামিকে আমাদের কাছে দিয়ে গেলে ভালো হতো।’
‘আজকে কাগজের বল বানিয়ে চামির সাথে খেললাম। প্রথমে বল ধরতে পারছিল না ঠিক মত, এখন একেবারে ওস্তাদ হয়ে গেছে।’
‘সন্ধ্যায় ওটাই আন্টি এসেছিল তার মেয়েকে নিয়ে। চামির সাথে নাকি দেখা করতে চায় সে, তাই ঘরে গিয়ে চামিকে নিয়ে আসি। মিস ওটাইয়ের মেয়ে এত মিষ্টি করে ‘হ্যালো, আমার নাম সায়াকা’ বললো!’
ইউসুকে আসলে এমনটা কোথাও বলেনি যে চামি একটা বিড়াল। কিন্তু আমরা সেটাই ধরে নিয়েছিলাম।
এই কথা মাথায় আসার পর টর্চ দিয়ে দেয়াল থেকে নামটা মুছে দেই আমি। ততক্ষণে মনের মধ্যে একটা ধারণা জেঁকে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যাটা নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না বলে সিদ্ধান্ত নিই। সায়াকা’কে এই বাড়িটা থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে যাওয়া যায়, তত ভালো।
কিন্তু সায়াকার যাওয়ার ইচ্ছে নেই। সিন্দুকের ভেতরে থেকে ওই চিঠিটা ওকে আরও বেশি সন্দিহান করে। কফিনের শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয় বাইবেলের ভেতরে থাকা টিকেট দু’টো।
ডিটেকটিভ ওগুরা’র চিঠি আর চিড়িয়াখানার টিকেট দু’টো দেখে মিকুরিয়াদের বাড়িতে সেদিন কী ঘটেছিল এবং সায়াকার সাথে পুরো ঘটনার সংযোগ কী হতে পারে, তা বুঝে গিয়েছিলাম আমি। টিকেটগুলো প্রমাণ করে যে মিসেস মিকুরিয়া সেদিন আসলেও চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ডিটেকটিভ ওগুরা চিঠির শেষে এটাও লিখেছিল যে, ভদ্রমহিলার সেই সময় চিড়িয়াখানায় থাকাটা অসম্ভব। মিসেস মিকুরিয়া বলেছিলেন, তিনি বাজারে গিয়েছিলেন, শুধুমাত্র এই কারণেই কি ওগুরা অসম্ভব বলেছেন? নাহ, এই কথা শোনার পর বরং তার সন্দেহ হবার কথা। অন্য কোনো ব্যাখা আছে নিশ্চিত।
হয়তো সমস্যাটা মিসেস মিকুরিয়াকে নিয়ে নয়, বরং তার সাথে থাকা বাচ্চাটাকে নিয়ে। সে-ও সেদিন চিড়িয়াখানায় গিয়েছিল, এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে মাসাকায়ু মিকুরিয়ার দ্বিতীয় সন্তানকে নিয়ে গিয়েছিলেন মিসেস মিকুরিয়া। অর্থাৎ নাতনির সাথে ঘুরতে বের হয়েছিলেন।
তখন মনে পড়ে যে বেইজমেন্টে আরেকটা মেয়ে মারা যায় সেদিন আর সেটা হচ্ছে ওটাই আন্টির মেয়ে সায়াকা।
কিন্তু পুলিশ ধরে নেয় বেইজমেন্টে যে মৃতদেহটা পাওয়া গেছে, সেটা হচ্ছে মাসাকায়ু মিকুরিয়ার দ্বিতীয় সন্তান। সেজন্যেই ডিটেকটিভ ওগুরা মিসেস মিকুরিয়ার চিড়িয়াখানায় যাওয়ার ব্যাপারটাকে অসম্ভব আখ্যায়িত করে।
কিন্তু মৃতদেহ সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সচরাচর ভুল হয় না পুলিশের। ওটা যে সায়াকা’র লাশ, সেটা ধরে নেয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে অবশ্যই।
তাছাড়া, নাতনির মৃতদেহ সনাক্তকরণের জন্যে নিশ্চয়ই মিসেস মিকুরিয়াকেই ডেকেছিল তারা। তিনি তখন নিশ্চিত করেছেন যে আগুনে পুড়ে তার নাতনিই মারা গেছে।
যে কারণে চামি মিকুরিয়াকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সায়াকার ব্যাপারে কেউ কিছু জানেনি।
এরপর চামি’র দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয় কুরাহাশি পরিবারকে। তারা ওখান থেকে অন্য জায়গায় চলে যায় যাতে প্রকৃত সত্যটা কেউ বুঝতে না পারে। কুরাহাশি দম্পতি চামিকে সায়াকা নামেই বড় করে। মেয়েটা স্মৃতি হারিয়ে ফেলায় তাদের আর বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয়নি।
কিন্তু এই অদলবদলের কারণটা কী? এই প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দেয়া এখন মুশকিল। আমার মতে, মিসেস মিকুরিয়া এটাতেই চামির মঙ্গল হবে ভেবেছিলেন। যদি মেয়েটা জানতে পারে যে পারিবারিক সহিংসতার জেরে তার ভাই আর বাবা মারা গেছে, তাহলে মানসিক আঘাত পাবে। তাছাড়া মাসাকায়ু মিকুরিয়াকে এমনিতেও কেউ খুব একটা কেউ পছন্দ করতো না।
আর কুরাহাশি দম্পতি তখন সদ্য নিজেদের একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে শোকে মোহ্যমান। সেই অবস্থায় তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী মিকুরিয়া পরিবারের ছোট্ট মেয়েটাকে দত্তক নিতে আপত্তি জানানোর কোনো কারণ ছিল না।
কিন্তু, তাদের কি এমনটা কখনো মনে হয়নি যে সেই মিকুরিয়া পরিবারই সায়াকার মৃত্যুর জন্যে দায়ী?
৯
“বলেছিলাম না এখানে খেলতে আসার কথা মনে আছে আমার? আর সেটা আমার বয়সি আরেকটা মেয়ের সাথে। ওই হচ্ছে সায়াকা, আসল সায়াকা।” আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, তার আসল পুরো নাম হিসামি মিকুরিয়া। ডাক নাম চামি। সে-ই বললো কথাটা।
“আমি চাইনি তুমি কষ্ট পাও। সেজন্যেই কথাটা বলিনি।”
“জানি আমি।”
“তাছাড়া, প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছুই শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভব না। পুরোটাই আমাদের কল্পনা।”
“হ্যাঁ, আমাদের নিশ্চিত হতে হবে,” রকিং চেয়ারটার হাতলে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো ও। অনেকক্ষণ ধরে পেন্ডুলামের মত দোল খেলো চেয়ারটা। “আমি-”
“কী?”
“আমি ভাবছিলাম মা কি আদৌ আমাকে ভালোবাসতো কিনা।”
“কী?”
“আমাকে ভালোবাসতে পারেনি সে। চেষ্টা করেছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু পারেনি শেষ পর্যন্ত।”
“এমনটা মনে হবার কারণ?”
“তুমি নিজেই বলো, প্রতিবার আমাকে দেখলে নিশ্চয়ই আগুনে হারানো মেয়ের কথা মনে পড়ে যেত তার। আসল সায়াকার কথা।”
কিছু না বলে ওর দিকে তাকালাম। দু’চোখে এখন কেবল বিষাদ। অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো হৃদয় ফুড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে নিশ্চয়ই।
“তাছাড়া, আমি আসলে ভালোবাসার উপযোগীও ছিলাম না।”
“এটা তোমার ভুল ধারণা…” নামটা বলতে গিয়েও বললাম না। সায়াকা বলবো নাকি চামি? কিছুক্ষন ভাবনার পর সারাজীবন যে নামে ডেকে এসেছি, সেই নামেই ডাকব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
“না,” মাথা ঝাঁকায় সায়াকা। “তুমি তো অ্যালবামটা দেখেছ। কোনো ছবিতে কি আমার মুখে হাসি ছিল?”
“নতুন একটা পরিবারে এসেছ তখন কেবল তুমি। নামও বদলে গেছে। একটু চুপচাপ থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
“শুধু সেটাই না। কোনো একটা বিষয় নিয়ে সবসময় ভীত থাকতাম আমি। এটা বলছি না যে কেউ ভালোবাসতো না আমাকে। বরং আমিই কাউকে ভালোবাসার সুযোগটা দিতাম না। মা আসলে বুঝত না কীভাবে আমার মন জয় করবে।” দুই হাতে মুখ ঢাকল ও। চোখ ইতোমধ্যে লাল।
কী বলে স্বান্তনা দেয়া যায় ভাবছি। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না। অসহায় ভঙ্গিতে রুমের অন্ধকার কোণের দিকে ঠায় তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছে যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো ধূলিকণার মতন আশ্রয় নিচ্ছে ওখানে।
লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ও। “সরি, আর বকবক করবো না।”
“আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর পাওয়া যাবে না।”
“হয়তো,” মাথা কাত করে বলে সায়াকা। “তবে আমি সবচেয়ে ভয় পাচ্ছি…”
“ফিরে যাই আমরা, চলো,” ওর কাঁধে হাত রেখে কথার মাঝেই বলি আমি। “অনেক তো থাকলাম।’
হাত দিয়ে কয়েকবার চুল ঠিক করলো সায়াকা। “হ্যাঁ, চলো।”
জানালাগুলো বন্ধ করে দিলাম ভেতর থেকে। অন্ধকার হয়ে উঠলো ঘরটা। সাথে সাথে টর্চ জ্বাললো ও।
“এই বাড়িটার কী হবে?”
“জানি না… তোমার উপরে নির্ভর করছে।”
আমার কথা শুনে একবার মাথা নাড়ল ও। সবগুলো দরজা জানালা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে বেইজমেন্টে চলে এলাম আমরা। বেরিয়ে যাব, এসময় থমকে গেল সায়াকা।
“সায়াকা এরকম একটা জায়গায় মারা গিয়েছিল,” বিষাদমাখা স্বরে ফিসফিস করে বললো ও।
“এটা মূল বাড়িটার একটা রেপ্লিকা,” বোঝানোর চেষ্টা করি ওকে। “সায়াকা হয়তো
এখানেই লুকাত।”
“একথা মনে হলো হঠাৎ?”
“তোমাকে তো বলেছি গল্পটা। বাবা-মা’র কাছ থেকে সেটা শুনেছিলাম। ছোটবেলায় একবার হঠাৎ একদিনের জন্যে উধাও হয়ে গিয়েছিলাম আমি মা-বাবা তো চিন্তায় শেষ। সব জায়গায় খুঁজে অবশেষে বাড়ির স্টোরেজ রুমে খুঁজে পায় আমাকে।”
“ওহ…”
“স্টোরেজ রুমটা নিশ্চয়ই বেইজমেন্টেই ছিল। তবে গল্পটা বোধহয় আমাকে নিয়ে না, আসল সায়াকাকে নিয়ে।”
“তুমিও সায়াকা,” না বলে পারলাম না।
চোখ সরু করে টর্চের আলোয় আমার দিকে তাকালো ও। “তোমার আসলেই এটা মনে হয়?”
“হ্যাঁ। আমার কাছে তুমি সায়াকাই।”
“ধন্যবাদ।”
“আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না…”
মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমি। পরমুহূর্তেই আবার তাকালাম ওর দিকে। এখনও আমাকেই দেখছে একমনে।
কোমরে হাত দিয়ে চট করে কাছে টেনে নিলাম ওকে। কোনো প্রকার বাঁধা দিল না সায়াকা। ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেলাম। সেই পরিচিত স্পর্শ। নিমেষে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো পুরো শরীরে। কতদিন এভাবে জড়িয়ে ধরিনি একে অপরকে!
দু’জনের ঠোঁট পৃথক হবার পর ওর বন্ধ চোখ জোড়ার দিকে তাকালাম। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে তাকালো, যেন আমার চাহনি অনুভব করতে পারছে। অন্ধকারে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম লম্বা সময়।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ ভীষণ রকম চমকে উঠলো সায়াকা। যেন কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে। কী হয়েছে সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। যেন আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে।
দুই হাতে মুখ চেপে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো ভয়ার্ত চোখে। টের পেলাম যে ও কাঁপছে।
“কোনো সমস্যা?” জিজ্ঞেস করলাম।
কিন্তু সায়াকা জবাবে কিছু বললো না। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল কয়েকবার। ত্রস্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল উপরে। মাঝপথে পা থেকে জুতো খুলে পড়লো, কিন্তু ওগুলো তোলারও প্রয়োজন মনে করলো না। আমি জুতোটা তুলে ওর পিছু নিলাম।
উপরতলায় উঠে দেখি ইউসুকের ঘরের দরজা খোলা। কান্নার শব্দ ভেসে আসছে ভেতর থেকে। করিডোরে দাঁড়িয়ে দেখলাম মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে। মুখটা চেপে ধরে রেখেছে ইউসুকের বিছানায়।
দরজার নবে হাত রেখেছি কেবল, ঠিক সেই মুহূর্তে মুখ তুলে বললো, “ভেতরে ঢুকবে না!”
হাত সরিয়ে নিলাম সাথে সাথে। লম্বা একটা সময় ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
অবশেষে মুখ তুললো সায়াকা। তবে আমার দিকে না, বরং দেয়ালের রেল ইঞ্জিনের পোস্টারের দিকে তাকিয়ে আছে।
“ওই ঘরটায়…” ফিসফিসিয়ে বললো। “আমার…”
“কী?” ভ্রু কুঁচকে বলি। “কোন ঘরে?”
“যে ঘরে কালো ফুলদানিটা ছিল। ওখানে লোকটা আমাকে ধরে…” এটুকু বলে বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সায়াকা। “টর্চটা নেভাও, প্লিজ।”
ওর কথামত কাজ করলাম। ঝপ করে নেমে এলো অন্ধকার।
“আমার,” বললো ও। “কাপড় খুলতো।”
মনে হলো কেউ বুঝি সপাটে চড় কষিয়েছে আমাকে। অন্ধকারেই কয়েক কদম সামনে এগোলাম।
“আমি যেন পালিয়ে যেতে না পারি, সেজন্যে শক্ত করে চেপে ধরতো বিছানাতে। গা থেকে মদের গন্ধ বেরুতো লোকটার সবসময়…” গলা ধরে এলো ওর। “আমি বারবার বলতাম ছেড়ে দিতে, কিন্তু ছাড়ত না। এমনকি বলতো ‘একমাত্র তুই-ই আছিস আমার পক্ষে। তুই কখনো আমাকে ঘৃণা করতে পারবি না। অন্যদের মতন আমাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলবি না।’ এরপর আমার…”
কিছুক্ষণের অসহ্যকর নীরবতা। এরপর আবার মুখ খুললো সায়াকা। “সারা শরীরে চুমু খেত।”
আরেক পা সামনে এগোতে গিয়েও থেমে গেলাম। মনে হচ্ছে যেন সায়াকার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াচ্ছে পুরো ঘরময়। ভীষণ অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি।
“প্রতি রাতে ঘটতো এমনটা। রাত হলেই ভয় লাগত আমার।”
“কাউকে কিছু বলোনি এই ব্যাপারে?” জিজ্ঞেস করি।
“বলতে পারিনি,” বলে সায়াকা। “কেন পারিনি, সেটা জানি হয়তো ভয় লাগতো; যদি এর চেয়েও খারাপ কিছু করে বসে।”
সেটা অসম্ভব কিছু না, মনে মনে বললাম। বেশিরভাগ শিশুই নির্যাতনের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারে না।
সায়াকা, মানে হিসামি হচ্ছে মিকুরিয়া পরিবারের একমাত্র সদস্য যাকে মাসাকার ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি কেইচিরো মিকুরিয়া। হয়তো নিজের ছেলের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভীষণ অপমানিত বোধ করতো মাসাকায়ু। নিজেকে বড্ড একা মনে হতো তার। সেই কারণে মেয়ের প্রতি ওরকম অস্বাভাবিক রকমের অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল।
‘কাল যা দেখেছি, আজ সারাদিন কিছু করতে পারিনি সেজন্যে। খুব বেশি অস্বস্তিকর একটা দৃশ্য। আজ রাতেও কি একই ঘটনা ঘটবে? প্রতিদিনই ঘটে? গতকাল রাতে বাথরুমে যাওয়ার জন্যে উঠে শব্দটা শুনতে পাই হঠাৎ। সাধারণত এই সময়ে উঠি না আমি, এজন্যেই হয়তো আগে খেয়াল করিনি। যদি এরকম জঘন্য একটা ব্যাপার আসলেও প্রতিদিন ঘটে থাকে! ভাবলেই বমি আসছে আমার। আজ স্কুল থেকে ফিরে দেখি বাগানে দাঁড়িয়ে আছে ও। দ্রুত চলে এসেছি ঘরে। কালকে কী করে ওর মুখোমুখি হবো কে জানে!’
ডায়রিতে ইউসুকে এমনটাই লিখেছিল। ছেলেটা কি প্রত্যক্ষ করেছিল সেই রাতে, এবারে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। পরদিন স্কুল থেকে ফিরে নিশ্চয়ই চামি, অর্থাৎ সায়াকা’কে দেখে অপরাধবোধ হয় ওর।
“থাক, এই ব্যাপারে আর কিছু ভেবো না। অনেক আগের কথা।” কথাটা বলামাত্র আফসোস হলো আমার। এরকম একটা সময়ে এমন কিছু বলা উচিত হয়নি একদমই।
অন্ধকারে যেন হালকা নড়ে উঠলো সায়াকা।
“সেদিন কী ঘটেছিল মনে পড়েছে।”
“সেদিন বলতে?”
“যেদিন আগুন লেগেছিল বাসায়। ইউ ভাইয়া…” থেমে লম্বা শ্বাস নিল ও। “হ্যাঁ, এই নামেই ওকে ডাকতাম আমি। আর ও আমাকে ডাকত চামি বলে। আগের দিন রাতে ইউ ভাইয়া এসে বলে- চামি, তুই নিশ্চয়ই ঘৃণা করিস ওই লোকটাকে? জবাবে হ্যাঁ বলি। তখন ভাইয়া বলে- তুই বললে ওকে মেরে ফেলব আমি।”
প্রায় গুঙিয়ে উঠলাম। অন্ধকারে অনেক বেশি জোরে শোনালো শব্দটা। “আমি বলি- মেরে ফেলবে মানে? তখন ভাইয়া বলে লোকটাকে চিরদিনের জন্যে উধাও করে দিবে। আরো বলে, ভাইয়া চাইলে নিজে পালিয়ে যেতে পারবে যে-কোনো মুহূর্তে। কিন্তু আমি সেটা পারব না। ওই লোকটা আমার সাথে যা করতো, সেটা প্রতিদিন সহ্য করতে পারব কিনা।”
“কী বলেছিলে তুমি?”
“বলেছিলাম, তাহলে মেরে ফেল।”
ওর গলার স্বর শুনে কেঁপে উঠলাম আমি। মনে হচ্ছে যেন কথা বলতে ভুলে গেছি।”
“ইউ ভাইয়া বলেছিল লোকটাকে কীভাবে মারতে হবে, সেটা জানা আছে তার। আমাকে পরামর্শ দেয় মা’র সাথে চিড়িয়াখানা থেকে ঘুরে আসতে। ততক্ষণে আমি সব সামলে নিব।”
“তাহলে আত্মহত্যার ইচ্ছে ছিল না ওর?”
“মনে হয় না। আমার জন্যে লোকটাকে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু গোটা বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে… সেই আগুনে পুড়ে ইউ ভাইয়াও মারা যায়। অর্থাৎ, আমার কারণেই মারা গিয়েছে ভাইয়া।”
আগের চেয়েও জোরে কাঁদতে শুরু করলো সায়াকা।
মনে হচ্ছে যেন অদৃশ্য একটা শক্তি জোরে চেপে ধরেছে আমাকে। একটা পেশিও নাড়াতে পারছি না।
এজন্যেই বোধহয় স্মৃতিগুলো লুকিয়ে ফেলেছিল ওর মস্তিষ্ক। প্রবল শোকে। ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর নিশ্চয়ই পাগলের মত হয়ে যায় সায়াকা ওরফে চামি।
“সায়াকা…” অবশেষে এক পা এগোলাম কোনোমতে।
“আসবে না…” কান্নার ফাঁকে বললো ও। “আর আমি সায়াকা না…”
আবারও ভাষা হারিয়ে ফেললাম। অসহায় বাচ্চাদের মতন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কান্না শুনছি কেবল।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল জানি না। এখন একটু শান্ত হয়েছে ও। “সরি,” সায়াকা বললো আমার উদ্দেশে। “তুমি চলে যাও।”
“কিন্তু…”
“আমাকে একা থাকতে দাও, প্লিজ।”
কিন্তু ওকে এভাবে একা রেখে যাওয়া সম্ভব না। নিজে নিজে বাড়ি ফিরতে পারবে, সেটা জানি। আসলে আমি ভিন্ন একটা কারণে চিন্তিত।
আমার মাথায় কী ঘুরছে, তা ধরতে পারল সায়াকা।
“চিন্তা কোরো না। আত্মহত্যা করবো না আমি।”
“না, সেটা না…”
“যাও এখন,” এই কথাটার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিল আমার এই বাড়িতে থাকার সময় ফুরিয়ে এসেছে।
“ঠিক আছে তাহলে,” অনিচ্ছাসত্ত্বেও বললাম। “যাচ্ছি আমি।”
“আর শোনো, জানি এখানে অন্ধকার… কিন্তু ঘরটা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে টর্চ জ্বালিও না, প্লিজ।”
“আচ্ছা।”
ঘরটা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারেই সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে এলাম। বেইজমেন্টের দিকে পা বাড়াতে যাব এমন সময়ে একটা শব্দ কানে এলো লিভিং রুমের দিকটা থেকে।
করিডোর পেরিয়ে লিভিংরুমে চলে এলাম। টর্চ জ্বালাতে ভুলিনি। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। ভেতরের বাতাস বদ্ধ এখন।
পিয়ানোটা যেদিকে রাখা, সেদিকে আলো ফেললাম। সায়াকা যে মিউজিক শিটটা দেখেছিল গতকাল, সেটা নিচে পড়ে গেছে। সামনে এগিয়ে ওটা তুলে রেখে দিলাম আগের জায়গায়।
এই সময় পুতুলটা নজরে এলো আমার। টর্চের আলোয় প্রতিফলিত হচ্ছে ওটার চোখে। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা বলতে চায় আমাকে। বাইরে পা রাখা মাত্র রোদে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। পুরো চোখ খুলতে সময় লাগল বেশ কিছুক্ষণ।
সায়াকার জিনিসগুলো গাড়ি থেকে বের করে বেইজমেন্টের প্রবেশ পথের সামনে রেখে দিলাম।
গাড়িতে উঠে উইন্ডশিল্ডের মধ্যে দিয়ে তাকালাম বাড়িটার দিকে। গতকাল যেরকম দেখেছিলাম, একদম সেরকমই দেখাচ্ছে এখন। ইঞ্জিন চালু করলাম।
গাড়িটা ঘোরাচ্ছি, এমন সময় মনে হলো যেন পিয়ানোর শব্দ ভেসে এলো ভেতর থেকে। ব্রেক চেপে কান পাতলাম। কিন্তু শব্দটা আর শুনতে পেলাম না।
অ্যাকসেলেটর চেপে চলে এলাম ওখান থেকে।
