দ্য হাউস – শেষকথা
শেষকথা
টোকিওতে ফিরে মিকুরিয়া পরিবার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলাম। অগ্নিকাণ্ডটা তেইশ বছর আগের ঘটনা, এটুকু জানতাম। তাছাড়া মিকুরিয়া নামটা খুব একটা প্রচলিত না হওয়ায় সেই সময়কার সংবাদপত্রে খবরটা খুঁজে পেতে সমস্যা হলো না। এক কলামের ছোট্ট একটা প্রতিবেদন।
‘ইয়োকোহামায় বাড়ি পুড়ে ভস্মীভূত; একই পরিবারের নিহত ৩।’
মাসাকা মিকুরিয়া, ইউসুকে আর হিসামির কথা বলা হয়েছে ভেতরে।
সেখান থেকে ঠিকানা টুকে নিয়ে কিছুদিন পর গেলাম আমি। মিকুরিয়াদের পুরোনো বাড়িটার জায়গায় এখন ছোট্ট একটা বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশের বাড়িগুলো নিশ্চয়ই তুলনামূলক নতুন। দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকায় থাকে, এমন একজনকে খুঁজতে লাগলাম তথ্যের আশায়। অবশেষে বয়স্ক এক লোককে পেলাম যার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটা পরিষ্কার মনে আছে।
“বাড়ির কর্তা মারা গিয়েছিল আগেই। ছেলেটা ছিল অকর্মার ধাড়ি। বাবার মৃত্যুর পর সুযোগ পেয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ওর কারণেই আগুন লেগেছিল নিশ্চয়ই। শুধু যদি কুলাঙ্গারটা মারা যেত, তাও আফসোস হতো না। কিন্তু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে দু’টোও মারা গেল। ভদ্রমহিলার অবস্থা হয়েছিল, ভেবে দেখ একবার?” কী
ভ্রু কুঁচকে কথাগুলো বললো লোকটা। ইউসুকের চেহারা আবছা মনে আছে তার, কিন্তু মেয়েটার চেহারা মনে নেই। যা বুঝলাম, এলাকার লোকেরা চামিকে খুব একটা দেখেনি। এজন্যে অদল-বদল সম্ভব হয়েছিল।
মাতসুবারা হ্রদের ধারের বাড়িটার (বাড়ি না বলে সমাধি বলেই শ্রেয়) বর্তমান মালিক মিকুরিয়াদের এক আত্মীয়। লোকটার নাম ইসোগাই। স্বস্তা বিদেশি মালামাল বিক্রি করে কিছুদিনের মধ্যেই প্রচুর পয়সা কামিয়েছেন ভদ্রলোক। এখন পুরো দেশজুড়ে অনেকগুলো চেইন শপ তার মালিকানাধীন। টোকিওতে ওনার অফিসে গিয়ে দশ মিনিটের মত কথা বলার সুযোগ হলো আমার।
আলাপের ফাঁকে মিস্টার ইসোগাই জানান মাতসুবারা হ্রদের ধারের বাড়িটা সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন, কিন্তু কখনো নিজের চোখে দেখেননি।
“ছুটি কাটানোর জন্যে ওখানে একটা বাগানবাড়ি করার ইচ্ছে ছিল মিকুরিয়াদের, সেজন্যেই জমিটা কিনেছিল। এরপর তো আগুনে পুড়ে মারা গেল পরিবারের তিনজন। বাগানবাড়ি আর করা হয়নি তাই। লম্বা একটা সময় খালিই পড়ে থাকে জায়গাটা। এক সময় মিসেস মিকুরিয়া হঠাৎ জানান, যে বাড়িটা পুড়ে গেছে, হুবহু সেরকমই একটা বাড়ি বানাবেন ওখানে। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়িটা পাই আমি। কিন্তু ওখানে পানি বা বিদ্যুতের কোনো সংযোগ ছিল না। আমাকে একজনের নাম দিয়ে বলা হয় বাড়িটা বিক্রি করতে চাইলে তার সাথে যোগাযোগ করতে।
সেই লোকটা কে ছিল, জানতে চাই। জবাবে সায়াকার বাবার নাম বলেন মিস্টার ইসোগাই। তিনি জানতেন না যে ভদ্রলোক মারা গেছেন।
কিন্তু অদ্ভুত ওই বাড়িটা কেন বানিয়েছিলেন মিসেস মিকুরিয়া? মিস্টার ইসোগাই যদি বাড়িটা আসলেও বিক্রি করে দিতেন, তাহলে এমনটা খুবই সম্ভব ছিল যে সায়াকা ওটার ব্যাপারে জানতে পারত। এই সম্ভাবনার কথা ভাবেননি তিনি?
ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা মিসেস মিকুরিয়ার সব খুলে বলার ইচ্ছে ছিল সায়াকা’কে। সেজন্যেই বাড়িটায় সবকিছু একদম যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ইউসুকের ডায়রিটাও।
আর ওই বাড়িটার কারণেই সায়াকা সত্যটা জানতে পেরেছে এতদিন পর। এখন ও নিজের আসল পরিচয় সম্পর্কে জানে। অবশ্য সেটা ওর জন্যে ভালো হয়েছে না মন্দ, তা বলা মুশকিল।
এই বাড়িটার কি আদৌ কোনো মূল্য আছে ওর কাছে?
যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে বলবো দীর্ঘদিন আগেই ওখানে মারা গেছে ও। তবে ওর মৃত্যুটা ‘সায়াকা’ নামের ওই আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মেয়েটার থেকে ভিন্ন। দুই দিনের ওই অভিযাত্রায় নিজের মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছিল ও। তেইশ বছর আগের সত্ত্বার মৃতদেহ। সেই অর্থে বাড়িটা আসলেও ওর জন্যে সমাধির মতই।
ওই ঘটনার পর থেকে প্রায়শই আমাদের পুরোনো বাড়িটার কথা মনে হতো আমার। আমাকে যারা লালন-পালন করে বড় করেছে, তাদের সাথে থাকতাম যে বাড়িটায়। যেখানে নিজের জন্মদাত্রী মা আর পালক বাবা-মা’র মধ্যে এক পক্ষকে চয়ন করতে বাধ্য হয়েছিলাম। যেখানে প্রতিনিয়ত মাবাবা’র বাধ্য সন্তানের ভূমিকায় অভিনয় করতাম আমি। যেখানে বুঝেছিলাম মানুষ আসলে একা।
বাড়িটায় তো আমারও মৃত্যু হয়েছিল, তাই না? আমার শৈশবের সত্ত্বার মৃত্যু ঘটে ওখানে। এতদিন ধরে আমার সেই মৃত আমি অপেক্ষা করে আছে আমার জন্যে। আসলে, সবার জীবনেই এমন একটা বাড়ি আছে, যেখানে তাদের মৃত্যু হয়েছে অতীতে। কিন্তু কেউ সেই মৃতদেহের মুখোমুখি হতে চায় না।
সেই বছরের শেষ দিকে সায়াকার কাছ থেকে একটা পোস্টকার্ড পেলাম। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসার পর সেটাই ছিল আমার সাথে ওর প্রথম যোগাযোগ।
কার্ডে খুব অল্প কথায় নিজের বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দিয়েছে সায়াকা। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মেয়ে দাদা-দাদির বাড়িতে থাকে। শেষে ও লিখেছে-
‘সবকিছুর জন্যে তোমার ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমি আসলে এখনও আগের মানুষটাই আছি। এই কথাটা মাথায় রেখেই বাঁচব সামনের দিনগুলোতে।’
প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা সায়াকা কুরাহাশি।
এরপর আর কখনো দেখা হয়নি ওর সাথে।
***
