ধুন্ধুমার – প্রথম দিকের কথা
প্রথম দিকের কথা
সামনের তিরন্দাজ বাহিনীকে পিছিয়ে আসতে বললেন বিশেণ। এবারে শার্ঙ্গধর বিশেষ পায়নে তৈরি তীরগুলিকে ব্যবহার করতে হবে। কুলকুরি বা ধুন্ধুগড় অবস্থানগতভাবেই দুর্গম। গিরিবর্ত্মের মাঝে এই দুর্গম দুর্গ অধিগ্রহণ করা অসম্ভব কিন্তু কুবলায়শ্ব দুর্জয় পুরুষ, আজকে এই দুর্গ তিনি দখল করবেনই। তার চাইতে বড় কথা এ অসুরকে বধ করা প্রয়োজন। সূর্যবংশী বা ইক্ষ্বাকু বংশের কুল গুরু হন বশিষ্ঠ অথচ কি ধৃষ্টতা বশিষ্ঠ-র* সাথে অসীম বা ধুন্ধু বিরোধ করে। আসলে এ বিরোধ, সত্যের বিরুদ্ধে অহংকারের। একে না জিতলে ইক্ষ্বাকু বংশের সমূহ সর্বনাশ। কারণ ইক্ষ্বাকুই এখন মানবকুলের ত্রাতা।
দেবতাদের ভোগ পৌঁছানোর আর কোনো উপায় থাকবে না। অসুরেরা যেদিন থেকে সপ্ত পাতালের অধিকার পেয়েছে প্রেত, যক্ষ, পিশাচ, সর্প সবাই তাদের আধিপত্য স্বীকার করে নিয়েছে কেবল মাত্র মানুষ ছাড়া। সেক্ষেত্রে এ যুদ্ধে পরাজয় হলে সমগ্র মনুষ্যজাতির সমূহ সর্বনাশ। আর তা ছাড়া বশিষ্ঠ তাদের জন্য অনেক করেছেন। কিন্তু এ যুদ্ধ জেতা প্রায় অসম্ভব অসুরেরা ক্রমশই তামসিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠছে। যাদুবিদ্যা ও মায়ায় তাদের সাথে পেরে ওঠা মুস্কিল। তবে আশার কথা একটাই কুরুওকের গণনা বলছে এই বংশের-ই এখন থেকে ৪৭ তম পুরুষ শ্রেষ্ঠ পুরুষ হবে, অতএব বংশগতি বিনাশের ভয় নেই। কারণ ৪৭-তম পুরুষকে যে আসতে হবে। বংশ শেষ হলে সে আসবে কোথা থেকে।
আর ভাবতে পারল না বিশেণ। কুবলয়াশ্ব তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্ফটিক এ চোখ রেখে কুবলয় বললেন সামনে যা দেখতে পাচ্ছি তাতে আমাদের খোঁজ সঠিক। ধুন্ধু এর প্রথম অবরোধ শৃঙ্গ ও কুব্জ। ভালো করে নিরীক্ষণ করো স্ফটিকটা নিয়ে… সত্যিই তাই সামনের অবরোধের চেহারা অনেকটা বৃষের ন্যায়। তার দুটি শৃঙ্গ আকৃতির শীর্ষে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বসানো আছে। সম্মুখভাগ বৃষের মুখের ন্যায় প্রলম্বিত সেখানে একটি বৃহৎ কটাহ। এই কটাহে ফুটন্ত তৈল রয়েছে নীচে আমাদের বাহিনী গেলেই ওরা তৈল নিক্ষেপ শুরু করবে। আরেকটু ভালো করে দেখো, দুই শৃঙ্গের মধ্যভাগে কুব্জটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কুব্জ বিন্দুটিই সবচাইতে দুর্মদ অবস্থান। একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছে। আমার বিশ্বাস ওখানে বসানো ক্ষেপণাস্ত্রটি দূরপাল্লার। সামান্য লৌহ খণ্ড নয় বরং ভারী প্রস্তরখণ্ড ক্ষেপণে সক্ষম।
—”তাহলে জয় কি অসম্ভব?”
—”না জয় সম্ভব তার জন্য আমাদের পন্থা বদল করতে হবে। আমাদেরকে ভাবতে হবে কীভাবে আমরা লড়াই দিতে পারি। তবে প্রথমে আমাদের এই প্রথম অবরোধের বৃষটিকে ভেদ করতে হবে।”
এমন সময় সংকেত শোনা গেল। স্ফটিকে চোখ রেখেই দেখল, দুটি শকট এসে থেমেছে পাকদণ্ডির মুখে। চালকদ্বয় রক্তবর্ণ কাপড়ে নিজেদের আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে। ঝটতি বাহনে উঠে সেদিকে অশ্বকে চালিত করল কুবলয়াশ্ব। কুবলয়-কে নামতে দেখেই তারা নতজানু হয়ে বসল।
মুখের অবগুন্ঠন সরাতেই প্রকাশ পেল আগন্তুকদের মুখ। সর্বনাশ, অসুর! কুবলয়ের সাথে কিছু ঘটতে পারে ভেবে তীর বেগে বাহন নিয়ে কুবলয়ের পিছে নীচে নেমে এলেন বিশেণ আর উঘনি উসনি তার সহযোদ্ধা যোগ্য সহধর্মিণী!
মৃদু হেসে এগিয়ে এলেন কুবলয়াশ্ব বললেন ”এরা মায়া ও কায়া”। অসুরদের মায়ার সাথে লড়তে গেলে মায়াই তো দরকার। ব্যূহে ধুন্ধুর অবস্থান ও তাড়ন পদ্ধতি জানতে হবে। মনে রেখো, ধুন্ধু কিন্তু সাক্ষাৎ মায়া। কোনো সাধারণ অসুর নয়। মানুষের কাম, ক্রোধ, বাসনা নিয়ে ধন্দ সৃষ্টি করতে পারে বলেই সে ধুন্ধু। আর তাই সে অসীম।
আরেক বিষয় চিন্তা করেছি, এই ব্যূহ ভেদ করতে হলে আমাদেরকে দূরপাল্লার শর নিক্ষেপ করতে হবে। আমাদের দ্বারা প্রস্তুত শরগুলি বহুদূর ছোটার জন্য পলকা। তদুপরি এই পাথরের ফাঁকফোকর দিয়েই যাবে। সেক্ষেত্রে পাথরের গাত্রে ঘর্ষণে তার সংহারক শক্তি অনেকখানি হ্রাস পাবে তাই আমাদেরকে বিশেষ কিছু ভাবতেই হত।
এরা এই শকটে এনেছে এক বিশেষ শর ও রাসায়নিক। যার পায়ন আমরা শিখিনি। কেবল অসুররাই পারে। আকন্দের আটা, হুড়ুবিষাণ (মেষশৃঙ্গ), কয়লা, পায়রা ও ইঁদুরের বিষ্ঠা একত্র করে তেল মাখিয়ে শস্ত্রের ধারে প্রলেপ দিয়ে তারপর তাকে হস্তি, অশ্বদুগ্ধ ও শিশ্ন তরলের মিশ্রণ দ্বারা পান দেওয়া। তারপর তাতে মিশ্রিত হয়েছে কুহক, কালীয় ও শঙ্খ নাগের বিষ। এ শর সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। পরিবর্তে এরা চায় ধুন্ধু বধ হলে, এরা মহাতল, সুতল ও রসাতলের স্বায়ত্তশাসনাধিকার।
১৮৫ খ্রীস্টপূর্বাব্দ
আকাশ ভেঙে পড়েছে দুর্যোগে। শেষ গ্রীষ্মের এ দুর্যোগের রাত উপভোগের। শ্রেষ্ঠীরা উপভোগ করে নগরনটীদের ক্রোড়ে শুয়ে, আর সাধারণ প্রজারা স্ত্রীর গ্রীবা বেষ্টন করে। ঘুম নেই কেবল একজনের চোখে। সে পৌঁছেও গেছে তার গন্তব্যে।
পর্বত গাত্রে অন্ধকার এক গুহার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন বৃষস্কন্ধ মধ্যবয়স্ক মানুষটি। তার বেণী বাঁধা চুল খুলে গিয়ে মুখ চাপা পড়েছে। আজ রাতের অন্ধকার যেন তাকে আড়াল করবার জন্যই। কিচ্ছুটি বোঝা যায়না। কেবল বিদ্যুৎ ঝলকালে কোমরের তরবারির হাতলের পান্নাটা ঝিকিয়ে ওঠে শ্বাপদের চোখের মতো। ভিতরে ঢুকলেন তিনি।
আবছায়া আলো-আঁধারিতে স্তম্ভাকৃতি নয়টি ছায়া দেখা যায়। ঢুকতেই গমগমে স্বর ভেসে এল। আসুন, বিদিশা শ্রেষ্ঠ।
মাথা তুলতে গেলেন আগন্তুক কিন্তু মনে হল, মাথার উপর স্বচ্ছ চাঁদোয়ার ন্যায় কিছু আছে। মাথা তোলাই যায় না। ঘাড় নিচু হয়েই থাকে। সেভাবেই বললেন, ”মার্জনা করবেন, বিদিশা আমার পরিচয় নয় আমার পরিচয় আমি মগধের সেনাপ্রধান…”
কথা আটকে গেল। কোথাও থেকে ভেসে এল স্বর। কাঁপাকাঁপা নারী কণ্ঠ। এ স্বর রাজবাটীর সবাই চেনে। প্রধানা দাসী জম্ভৃ-র কণ্ঠস্বর—
‘রাজাকে এর জন্য মহিষীকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে সেই স্থান থাকবে সবার নজরের বাইরে পর্বত এর গাত্রে। ঋতুমতি পট্টদেবির সাথে লিপ্ত হতে চান তিনি …..’
যখন সেই কথা শেষ হল। তার মাথার উপর থেকে যে স্বচ্ছ অবরোধের চাপ সরে গেছে। উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেছে গুহা, তিনি দেখতে পাচ্ছেন তাঁদের।
আবার ভেসে এল সেই স্বর— মনে রেখো, এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়, মানুষের স্বার্থ — সমতার স্বার্থ। এর বাইরে কিছু নেই। এটুকু তো করতেই হবে। শুধু তোমার দ্বিধা কাটানোর জন্যই রাজদাসীর স্বরকে বিশেষ পদ্ধতিতে ধরে এনেছি। অনেকখানি শক্তি খরচ করতে হয়েছে।
* * *
কয়েকদিন পরে দেশজুড়ে এক প্রচণ্ড রাজদ্রোহ হয়। এই রাজদ্রোহকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের উত্থান বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় ইতিহাসে। শেষ মৌর্যকুলপতিকে পূজা কালে মন্দির সোপানে হত্যা করেন তারই ব্রাহ্মণ সেনাপতি; পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। সবাই একে বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ বিরোধ বলেই চেনে কিন্তু যে বৃহত্তর স্বার্থ পর্দার পিছনে রইল তা কেউ জানেনা। সম্রাট অশোক না থেকেও আরও একবার রক্ষা করে গেলেন।
পুষ্যমিত্র বুঝেছিলেন, অন্যায় লাগাম ছাড়ালে তাঁরা আছেন। তাদের কাছে কোনো ধর্ম ভেদ ছিলনা, স্বার্থ, পরিবার, আপন-পর ছিল না। ছিল মনুষ্য ধর্ম আর সমতা। সেই সমতার কাছে পরিবার, সন্তান ও কিছু নয়।
কেউ জানতেই পারল না যে মন্দিরের সোপানে রাজা বৃহদ্রথ-র বলিদান হল, সেই মন্দিরে চিরতরে চাপা দিয়ে দেওয়া হল এক সাংঘাতিক শক্তিকে। অনন্ত লোভ, অনন্ত ভোগ আর ক্ষমতার আশায় এক মহাশক্তিকে জাগাতে চেয়েছিলেন বৃহদ্রথ।
মাসাধিক কাল পর
সেদিনের সেই গুহায় আজ এক নতুন আগন্তুক। সেই নরস্তম্ভের মধ্যমটি নড়ে উঠল। গমগম করে উঠল স্বর।
—বলো, কি সংবাদ?
আগন্তুক— কার্য সম্পাদন হয়েছে প্রভু। বার বারিকম (বর্তমান করাচী) ও আরকেমেডু (বর্তমান পণ্ডিচেরী)তে ভূকম্প ও জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছিল ওর মায়া। কিন্তু আমরা পেয়েছি। তবে…
—তবে?
আগন্তুক— আমার সাথীদের ফিরিয়ে আনতে পারিনি। জলপোতে একমাত্র আমিই পৌঁছুতে পেরেছিলাম মূর্তিটি নিয়ে। আমাকে আড়াল দিতে গিয়েই ওরা…
মাথা নীচু করে নিল আগন্তুক। একটা দীর্ঘশ্বাস হাহাকারের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সেই ন’টা ছায়া আস্তে আস্তে অন্তর্হিত হল। এবার বিশ্রাম।
পটভূমি আফ্রিকা। ১৪৩৮
বনের প্রান্তে চিরআপকা আর তার ভাই বসে পশুর মল পুড়িয়ে নুন তৈরি করছিল। মাম্বোর রাজদরবারে এই নুনের দারুণ চাহিদা। আচমকাই একটা শব্দে পিছন ফিরল দুই ভাই।
সিভিকরো (আত্মা-পুরোহিত) সাবধান করেছিল এই রাত্রে কাজের ব্যাপারে। এই সময়টা নতুন ফসল তোলার পর রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই আগুন নিভিয়ে দেয়া হয়। আগুন জ্বলে কেবল রাজদরবারের চিরস্থায়ী অগ্নিকুণ্ডে। আগুন জ্বালাতে হলে এই অগ্নিকুণ্ড থেকেই মশাল জ্বালাতে হবে। অবশ্য কাজের জন্য কেউ কেউ নিজের চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালানোর সম্মতি পায়, যেমনটা তারা পেয়েছে। কিন্তু সিভিকরো বলেছে এই গভীর ঘন অন্ধকারে তারা নেমে আসে। আলো তাদের আকৃষ্ট করে। আলোর দিকেই তারা ছুটে আসে। তাই এই সময়টা কাজ না করাই বিধেয়।
ঝোপটা নড়ে উঠল দুবার আর তার পরেই আকাশ ফাটিয়ে সেই চিৎকার…. সেদিন নাভাহানার ঘরে সবাই চমকে উঠেছিল সেই প্রচণ্ড অমানুষিক চিৎকারে।
রাজদরবারে মাশোনা উপজাতিদের যোদ্ধারা কেঁপে উঠেছিল অস্ত্র হাতে। খোলা চত্বরে ভয়ংকর হায়েনার দলকে দেখেছিল সে রাতে। তাদের ঘিরে পাক খেতে। জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখ, কষ বেয়ে লালা নামছে, দগদগে গায়ে টকটকে বাদামী লোম। তাদের মাথার ওপর ভয়ানক শব্দে গোঁ গোঁ কালো ভ্রমরার দল। এ হায়েনারা পৃথিবীর নয়, নাহলে মাম্বোর ‘এম্বারি’ মন্দিরের এত কাছে তারা আসে কী করে?
ওদিকে মবাংগা মানে রাজা আজ গভীর রাতে একা বেরিয়ে গেছেন। এ কোন অশনি কে জানে?
এক বান্টু শিশুকে শোয়ানো আছে, এক আধা-অন্ধকার খড়ের ঘরে। ঘরের ভিতরটা অদ্ভুত কালচে। দেওয়ালের মাটিতে ছাই লেপে কালচে করা হয়েছে। যাতে প্রদীপের আলো খেয়ে নিতে পারে দেওয়াল। সামান্যই প্রতিফলিত হয়।
অদ্ভুতভাবে সেই আলো-আঁধারির মাঝে মাথা নাড়ছে অর্ধনগ্ন এক মানুষ। সেই সাথে তার জট পাকানো চুলগুলো অদ্ভুত ভাবে পাক খাচ্ছে ঘূর্ণির মতো। কি এক প্রচণ্ড অশৈলী যেন ঘটতে চলেছে।
শিশুটি কেঁদে কেঁদে এলিয়ে পড়েছে। কেঁপে কেঁপে ফুঁপানোর আওয়াজ আসছে। আচমকাই সরসর আওয়াজ উঠল ঘরের কোণে। শিশুটার গোঙানি থেমে গেল। ঘরের পরিবেশ কেমন যেন বদলাতে শুরু করেছে।
সরু সুতোর মতো একটা কিছু বেরিয়ে এলো ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে। আস্তে আস্তে প্রদীপের আলোয় স্পষ্ট হল চেহারাটা। একটি কালো সর্প! ফোঁস করলে ছোবল ঝোলাল। এই দেখা গেল তার পূর্ণাবয়ব। তার জিহ্বা চেরা নয়, জোড়া! অদ্ভুত কালচে সেই জিহ্বার রং। সর্পের নীলচে চোখদুটি ছাড়া সবই কালো। দেখলেই শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়, একি আদৌ সর্প! নাকি কোন…..
বেরিয়ে এসেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথা দোলাতে লাগল সর্পটি। যেন হাত বাড়িয়ে কিছু পেতে চাইছে। অর্ধনগ্ন সাংগোমা (উপাসক) ছুরি হাতে উঠে গেলেন শিশুটির দিকে। শিশুটির নাকের কাছে ঝিকিয়ে উঠল সাদা বিদ্যুতের ঝিলিক আর তারপরেই একটা প্রচণ্ড আর্তনাদ আর গোঙানিতে ভরে গেল ঘরটা।
টপ করে সেই সর্পের সামনে শিশুটির কর্তিত নাকের টুকরোটা ফেলে দিলেন উপাসক! বুভুক্ষুর মতো আছড়ে পড়ল সাপটা। না ছোবল নয়, যদি কেউ দেখত শিউরে উঠত। চকচকে দাঁতের ফাঁকে তুলে নিল মাংসের টুকরোটা, যেন কোনো খাদ্যবস্তু। দাঁতের কষ বেয়ে নেমে এল বুদবুদের মতো ফেনা ফোঁটাফোঁটা হয়ে ঝড়ে পড়ল মাটিতে। সাপটি অদৃশ্য হয়ে গেল আঁধারের কোণে। আর তারপরেই ঝাঁকেঝাঁকে বেরিয়ে এল সাপের দল। ঝাঁপিয়ে পড়ল শিশুটির ওপর। আর্তনাদ আর হিসহিসে ভরে গেল ঘরটা। উপাসকের ঠোঁটে ফুটে উঠল কুটিল হাসি।
ঘরের অপর কোণের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেবতা আপনার ভোগ গ্রহণ করেছেন মাম্বো। এবার নিশ্চিন্ত মনে কার্যসিদ্ধি করুন আপনার হয়ে দেবতা লড়াই করবেন।’ এতক্ষণ বোঝা যায়নি ঘরের কোণে জমাট অন্ধকারে একজন স্থাণুর মতো দাঁড়িয়েছিল। এবার সেই অন্ধকারটা নাড়াচাড়া করল। আস্তে আস্তে প্রদীপের আলোর বৃত্তের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন একজন। আপাদমস্তক স্বর্ণালঙ্কারে ভরে আছে তাঁর শরীর। হাতে হাতির দাঁতের কারুকার্যমণ্ডিত তরবারি। এটাই গুরুহাস্যার মাম্বোর রাজদণ্ড, রাজার চিহ্ন। কিন্তু কেউই দেখল না পুরো ঘরটা ছেয়ে আছে ধোঁয়া ধোঁয়া একটা তিন মাথাওলা ছায়ায়। সে ছায়া দেখলে অতি সাহসী ও কেঁপে ওঠে।
কয়েকদিন পর একদিন খুব ভোরে দেখা গেল। জাম্বোসি নদীর গা বেয়ে ডান্ডি অঞ্চলে পঙ্গপালের মতো মাশোনা সৈন্যরা ভিড় করেছে। তাদের টিনের শিরস্ত্রাণ, চকচকে বর্শা ঝিকিয়ে উঠছে রোদে। সর্বাগ্রে সেদিনের সেই মূর্তি। কুঁড়েতে হাতির দাঁতের হাতলের তরবারি হাতে সেই মানুষটা। পার্থক্যের মধ্যে আজ তাঁর গায়ে তামার ভারী বর্ম। মাথায় বাজের নয় শকুনের পালক, মৃত্যদূতের সাজ। তাদের মুখে একটাই ধ্বনি ‘এনডেন্ডে ডান্ডি-লবণ আনতে ডান্ডি চলো।’ আসলে মানুষ যখন পশুর মাংস পুড়িয়ে খাওয়া বা সেদ্ধ করা খাবার থেকে ক্রমশ সরে আসছিল শস্যজাত খাবারের দিকে, তখন ক্রমশই নুনের চাহিদা বাড়ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শস্যজাত খাবারের চাহিদা ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। পশুর মল পুড়িয়ে যেটুকু লবণ পাওয়া যায় তাতে আর যাই হোক চাহিদা পূরণ হয়না ঠিক সেই সময় খবর পাওয়া যায়, জাম্বোসী পাড়ে টোঙ্গা আর টাভারো গোষ্ঠীর গ্রাম ডান্ডি-তে লবণের পশরা বসে আর এই পশরা নিয়ে আসেন আরব ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এই লড়াই সহজ ছিল না আর বিদেশ খাঁটি ইস্পাতের বাঁকানো তরবারিকে বেশি ভয় পেত মাশোনারা। সম্মুখযুদ্ধে এই তরবারি প্রাণঘাতী। আর তাই সেদিন সবার অলক্ষ্যে গভীর রাতে গিয়েছিলেন দেবতাকে জাগাতে। মৃত্যু দেবতা, যুদ্ধের দেবতা সেই অপশক্তিকে। লিম্পো থেকে জাম্বোসী, কিলাওয়া থেকে মোম্বাসা সর্বত্রই ফিসফিস করে সেই দেবতার কাহিনি।
ধমধম ধমধম…. প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠল শতশত ‘কাগার কুতে’ বা রণ দামামা। ঝাঁপিয়ে পড়ল মোশানা সৈনিকের দল। খড়কুটোর মতো উড়ে গেল প্রতিপক্ষ। ইতিহাস এই রক্তাক্ত যুদ্ধকে বুকে ধরে রেখে দিয়েছে ‘ডান্ডি যুদ্ধ’ নাম দিয়ে। সামান্য লবণ-এর জন্য সেদিন সহস্র মানুষের রক্ত লাল হয়েছিল জাম্বোসীর জল। সেই রন্দাল (কুঁড়ে)তে সেদিন যে বিভীষণকে জাগিয়েছিল মাম্বো মুতোতা তার খিদে তখনও মেটেনি। এ তো ছিল প্রাতরাশ মাত্র।
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েকবছর গুরুহাস্যা রাজ্য সেই রাজ্য আজ সুবিশাল ‘মনোমোতোপো’ সাম্রাজ্য নাম পেয়েছে। মুয়ানে অর্থাৎ লুঠেরা আর মুতাপা অর্থাৎ দল। সেদিনের সেই ডান্ডির অভিযান পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত করল এক শক্তিকে।
এই যুদ্ধে যে বীভৎসতা সে সময়ে সভ্যতা পরিলক্ষিত করেছিল তা বোধহয় অন্য কোনো যুদ্ধে দেখা যায়নি। ঢাল, তরোয়াল, বল্লম-এর মতো সাধারণ অস্ত্র নিয়ে দুই আদিম জাতির যুদ্ধ অথচ নৃশংসতা পরতে পরতে। সেই যুদ্ধের বীভৎসতা যেন বলে দিচ্ছিল কোনো এক শক্তিশালী শক্তির অথবা কোনো এক অশনির। যেন এক ভীষণ শক্তি তাকে জানান দিতে চাইছে। যার চোখ ছিল সে দেখেছে যার বোঝার ছিল সে বুঝেছে।
মনোমাতোপা বংশের বৃহত্তর গণবলির সূত্রপাত ছিল এই। সেই সাথে দঃ আফ্রিকার দূরাবস্থা।
—
* বশিষ্ট ও আশা-বশিষ্ট (সমান্তরাল তত্ত্ব-জেন্দাবেস্থা) আসমোদাসকে আশা-বশিষ্ট ভাবা হচ্ছে।
