পঞ্চাশ বছর পরের কথা
বছর পঞ্চাশ পর, ২০০১ সাল
ড্যাডা, তার মানে কি আমার এতদিনের পড়াশোনা, জার্মানি যাওয়া, এতগুলো বছর খরচা করা সব বেকার যাবে? তুমি বলে ভুলে যাচ্ছ ড্যাডা, আমি কারো তদ্বিরে যাইনি রীতিমতো একজাম ক্লিয়ার করে তবেই গিয়েছিলাম। এখন তুমি যদি আমাকে এক্সপোজার না দাও তাহলে ব্যবসা বাড়বে কিভাবে? আমার এত কন্টাক্টস বানালাম ইউরোপে, সব তো বেকার যাবে।
প্লিজ ড্যাডা, আমার কথাটা শোনো সবদেশে এখন ব্যবসার নানারকম নতুন নতুন প্রকার আসছে, বিজনেস স্টাডিজ-এর ক্ষেত্রটা শুধুমাত্র এই চোখের সামনে দেখা মার্কেট নয়।
তুমি এই বয়সে আমাকে মার্কেট দেখাতে এসো না। হ্যাঁ এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যে লোকসানের মুখোমুখি হয়েছি তাতে নতুন করে ব্যবসা ব্যবসা করার সমস্যা। কিন্তু ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ তুমি যদি এই হোটেল ব্যবসা শুরু করতে চাও। তাহলে বলব আমাদের সিমলার…..
বাবা সিমলা প্রপার্টি যেমন তুমি আর ব্রো দেখছো ওরকম থাক। এয়ারপোর্ট বা রিভারসাইড স্টার হোটেল নয় আমি নতুন কিছু চাইছি। ইউরোপে এটা বুমিং এখন। গ্রামের দিকের ক্যাসেলগুলোকে হোটেলে রূপ দেওয়া হচ্ছে। রাসটিক এটমোস্ফিয়ার, মানুষের লেইজার আই মিন অবসর যাপনের সাথে একটু বিলাসিতার সুযোগ করে দেওয়া। তার সাথে যদি একটু এগজোটিক রয়্যাল ফ্লেভার দেয়া যায়। মানুষ ছুটে আসবে। ইনফ্যাক্ট আমি দেখেছি ড্যাড লোকজন আসছেও। আমরা এখানে পাইনিওর হতে চাই, এই ট্রেন্ডের।
ধরুন ছোট গ্রাম্য নদী, তার পাশে একটা পুরনো আমলের রাজবাড়ি। সেই নদীর ঘাট বাঁধানো থাকবে রাজবাড়ির সাথে। মানুষ চাইলে বোটিং মানে নৌকাবিহার করতে পারবে। আশপাশে পাহাড়-জঙ্গল থাকবে। ভিন্টেজ কার থাকবে। মানুষ সেই কারে জঙ্গলে বেড়াতে বেরোবে বিকালে। নদীর ধারে বসবে।
দুর্দান্ত হারিয়ে যাওয়া সব রেসিপি পরিবেশন করা হবে। ছোট্ট মিউজিয়াম বানিয়ে নেব। ইউরোপের বহু ডিলার আছে, যারা এক্সাট ডুপ্লিকেট বেচে। একজন স্টোরি টেলার থাকবে যে দারুণ সব পুরানো দিনের গল্প বলবে বানিয়ে। সন্ধ্যায় কাঠের চুল্লি হবে আর ওয়াইনের কালেকশন রাখব। জানেনই তো কাঠের পিপে আর দুর্দান্ত কিছু বোতল দেখলেই মানুষ মজে, খোঁজখবরের ধার ধারে না।
সব মিলিয়ে একটা দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর পরিবেশ দেয়া হবে, কি বলেন?
আমি সবই বুঝতে পারছি। তোমার উদ্দেশ্যটাও। কিন্তু কি জানো তো তুমি যে জায়গাটার কথা বলছো সেই জায়গাটা আজ এতদিন বন্ধ করে আছে। তার কাগজপত্র আমরা দেখিনি। জানিনা তো এই বাড়িটার পুরোপুরি মালিকানা আমাদের আছে কিনা তবে এরকম একটা হোটেল প্রস্তাব মন্দ নয়। কিন্তু আমাদের পরিবারে ওই বাড়ি নিয়ে কাকে উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। বিশেষতঃ তোমরা তো জানোই তোমাদের ঠাকুরদাদার যিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি ওই বাড়িতে থেকেই পাগল হয়ে যান পরে তাকে যখন কলকাতায় আনা হয় তখন তিনি বদ্ধ উন্মাদ এবং শুনেছি ওইখানকার গ্রামের মানুষজন আমাদের উপরে খুব একটা খুশি নয়।
ড্যাড, আমি সব রেকি করেছি। জানি ওই গ্রামের কোনো উন্নতি হয়নি। একেবারেই বর্ডার সংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রাম। ম্যাপেও নামই নেই প্রায়, গভমেন্ট হিসাবেই ধরেনা ওদের। মানুষজন খুব দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে কাটাচ্ছে। পুরনো মানুষজন যারা আছেন আছেন, তাদের আমরা যদি খেতে পাওয়ার লোভ, একটা নতুন ইন্ডাস্ট্রির লোভ দেখাই, মানুষজন কিন্তু গলে যেতে বাধ্য।
তুমি অনুমতি দিলে কাগজপত্র আনার জন্য এবং দেখার জন্য, আমি একবার লোকজন নিয়ে যাই। তারপর আমরা বসে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করি।
—বেশ ব্যবসায় নামলে ভয় পেলে চলে না আর নিজেদের প্রপার্টি থেকেও তাকে ব্যবহার না করা মূর্খামি। তবে একটা সাজেশন নাও বেটা, তুমি এই ইংরাজিতে ট্যাশ ট্যাশ করে কথা না বলে মাতৃভাষা ব্যবহার কর। গ্রামের মানুষের সাথে সম্পর্কটা নরম করতে হলে ওইটা আগে যাই। নিজেকে একটু ভেঙে নাও। এটা তোমার বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।
দিন দশেক পর,
অনিকেত, গ্রামবাসীরা যেভাবে আমাদের দিকে এসেছিল আমিতো ভয় পেয়ে গেছিলাম, এই না মারাত্মক কিছু ঘটে। কিন্তু অদ্ভুত লাগল মানুষগুলো কিছু বলল না, মনে হল যে জমিদার বা পুরনো কথা এসব নিয়ে তাদের কোনো কৌতূহল-ই নেই।
-খিদে মনোজিতদা খিদে, বড় সাংঘাতিক জিনিস এই খিদে।
আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি, এই গ্রামে গত ৩০-৩৫ বছরে বিশেষ কেউ বাইরে যেতে পারেনি। এমনকি যারা পড়াশোনা করে বড় হয়েছে, তারা মাধ্যমিকের পর বাইরে গিয়ে কোনোমতে উচ্চশিক্ষা করেছে। হয়। গ্রামের বাইরেই থেকে গিয়েছে আর ফিরে আসেনি। নয়তো পরিবার নিয়ে শহরে উঠে গেছে। গ্রামটা একরকম নির্বান্ধব। আজকের রেডিও, টিভির যুগে ও দেখেছো অবস্থা, এখানে হুকিং হয়! কেউ খোঁজেও না।
একতো স্কুল বহুদূর, স্কুলে যাওয়াটাই দুষ্কর। আর বাকি সুযোগ-সুবিধা তো বাদই দাও। এম এল এ, মন্ত্রী কেউ আসেই না জিজ্ঞাসা করতে, এরা অভিযোগ জানাবে কি? এই গ্রাম এমন হল কেন কেজানে?
মানুষগুলো নতুন কিছু হচ্ছে কাজকর্ম পাবে এই আশায় কিছু বলেনি। সে যাক ঘরগুলো কিন্তু ভালো আছে বলো। ইঞ্জিনিয়ার তো বলল, টেস্ট রিপোর্ট এ ড্যামেজ নেগলিজবল। আমিও দেখছি তাই এতদিন হয়ে গেছে কিন্তু সামান্য চুন-সুরকি খসে পড়া ছাড়া বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। ওই দেখো পুকুরের দিকে কয়েকটা হাট আছে! আরিব্বাস, এগুলোকে তো দারুণ চালানো যাবে তোমরা দেখো। আমি একটু ঘুরে আসি।
মিনিট দশেক পর,
থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিকেত। সামনের বীভৎস মূর্তিতে যেন একটু একটু করে সাড়া জাগছে। তার মনে হচ্ছে মূর্তির মাথার উপরে রাখার ঝোড়াটায় পৃথিবীটা ঘুরছে। মূর্তিটার ডানদিকে সিংহের চোখের পাতাটা বুঝি একবার পড়ল। বামদিকে নীলগাইয়ের শিংটা যেন নড়ে উঠল। টর্চের আলোটা মূর্তির নিগ্রোবটু চেহারার মানুষটার মুখের ওপর ফেলা ছিল আচমকাই মনে হল, নাকের পাটা ফুটে উঠল। সেইসঙ্গে একটা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলার আওয়াজ। হাতে টর্চটা নড়ে গেল অনিকেতের আর ঠিক তখনই মূর্তিটার বন্ধ হয়ে থাকা পাখাগুলো খুলে গেল। যেন ঝাপটিয়ে উঠল ডানা দুটো। সেই ডানায় অসংখ্য চোখ যেন পিটপিট করে উঠল তার দিকে তাকিয়ে। চমকে পিছন দিকে পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় পিছন থেকে একটা হাত এসে তাঁর কাঁধে পড়ল। এ হাত মনোজিৎ-এর। হাতের ঝুলতে থাকা চেইন ব্রেসলেট-এর ঠান্ডা ধাতব স্পর্শটা তাকে এক ঝাটকায় যেন ফিরিয়ে নিয়ে এল কোথাও থেকে।
বাগানের ঘরটা কেমন হবে ভেবে টর্চটা হাতে করে নিয়ে এসেছিল অনিকেত। ছোট্ট একেবারে কুঁড়ে বললে যা বোঝায় সেই রকম। বাইরে তালাটাও মরচে পড়ে গিয়েছিল হাত দিয়ে চাপ দিতেই খুলে এসেছিল। ঘরের ভেতরটা আসবাব নেই বললেই চলে প্রথমটা ঢুকে চোখটা থতিয়ে গিয়েছিল এত অন্ধকার ভিতরটা। আসলে দেওয়ালগুলোও কালো রং করা তাই হাতের টর্চের আলো বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। তারপর চোখ সয়ে যেতেই এই দৃশ্য।
মনোজিৎদা ও হাঁ করে তাকিয়ে ছিল দেয়ালের দিকে। এরকম বীভৎস মূর্তি সেও জীবনে দেখেছে কি না সন্দেহ?
ইউরোপের দেশ, এশিয়ার দেশ সবই তার মোটামুটি ঘোরা। এতদিন জীবনে চাপ বলে কিছু ছিলনা। পড়াশোনা আর ঘোরা ছাড়া বড়লোকি কোনো নেশা নেই তার। কিন্তু এরকম কিম্ভূতকিমাকার মূর্তি কোনো মিউজিয়াম কিংবা কোনো প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলি যেগুলিকে পর্যটক সাইটগুলোতে ও দেখেনি। দেখা মাত্রই যেন বুকের ভিতর অবধি কেঁপে ওঠে। কোনোমতে ঠোঁট ফাঁক করে তোতলিয়ে কথাটা বলল মনোজিৎ দা,’ এটা কি অনিকেত?’
মূর্তিটা ঠিক কি দিয়ে বানানো বলা মুশকিল কারণ তার গায়ে অদ্ভুত একটা আঠালো তরল আছে। আঠালো বলার জন্য কারণ বহু মাছি, ডাঁশলা, পিঁপড়ে, শুঁয়াপোকা, তার গায়ে চিটিয়ে আছে। যেন এই সদ্য উঠে এসে চিটিয়ে গেছে। মূর্তিটার তিনটি মাথা— বামদিকেরটি অনেকটা নীলগাইয়ের মতো। অপরদিকেরটি কোন প্রাণীর বলা যায় না তবে অনেকটা হায়েনার সাথে মিল আছে। মাঝের মাথাটি নিগ্রোবটু এক মানুষ। মাথায় কোঁকড়া চুলের ফাঁক দিয়ে একটা গিরগিটির মতো কিছু প্রাণী ঝোলা সরু জিভ বের করে মুকুটের মতো বসে আছে। এক অদ্ভুত হিংস্রতা ফুটে উঠেছে মানুষটির চোখে-মুখে। তার সামনের হাতে একটি দণ্ড— অনেকটা লিঙ্গের মতো; কণ্টকময় লিঙ্গ বলা যেতে পারে। অন্যহাতে একটি সর্প। আশ্চর্য! এত নিখুঁত কোনো মূর্তি হতে পারে! যেন একটি জ্যান্ত শাঁখামুটি। সদ্য এসে হাতের ফাঁকে ঢুকে পড়েছে। টর্চের আলোয় তার আঁশের অংশটাও ঝিকিয়ে উঠল চিরিক করে। প্রাণীটি থুড়ি মানুষটি বসে আছে একটি সিংহের উপর, সিংহটি চেহারাও অদ্ভুত। এখনের সিংহ নয়, মিশ্র জীব। তার পিছনের সুদীর্ঘ লাঙুল ছাদ ছুঁয়েছে। আর কালো দুখানি ডানা চুপসে পেটের কাছে জড়ো হয়ে রয়েছে। এই ডানাটাই এখুনি…শিউরে উঠল অনিকেত।
মূর্তির মাথায় একটি ঝোড়া। সেখানে একটি বলের মতো কিছু রাখা। প্রথম দর্শনে লাল রং দেখে বল বলেই ভুল হয়। পরে বোঝা যায় সেটি বল নয় বরং গ্লোব এর মতোই কোনো বস্তু। একে তো অত্যন্ত পুরনো তায় তার উপর এই লাল পদার্থটির আস্তরণে তার সবুজ নীল ধূসর ঢাকা পড়ে গেছে।
বাইরে ততক্ষণে শ্রমিকদের আওয়াজ জেগেছে। সেই শুনে বেরিয়ে এল অনিকেত।
”মনোজিৎ দা এটা কি জানিনা। আমার মন বলছে, এটা কে না ঘাঁটালেই ভালো। তাছাড়া এইসব কিম্ভূতকিমাকার জিনিস দেখলে শ্রমিকরাও ভয় পেয়ে যেতে পারে। তাই ঘরটা বন্ধ করাই ভালো।’
চার বছর পর,
হোটেলের প্রজেক্টটা কমপ্লিট করতে করতে প্রায় বছর খানেক লেগে গিয়েছিল। পুরো জিনিস গুছিয়ে দাঁড় করাতে, ভালো করে চাকা গড়াতে আরো ছয় মাস। এখন ‘রাজতরঙ্গিনী’-তে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনি-রোববার অবধি মেলা লাগে। গমগম করে পুরো। বাকি সপ্তাহ একটু ধিমা তবে মানুষজন থাকে। তাই এই সপ্তাহের দিনেই এসেছে।
‘রাজতরঙ্গিনী’-র সাকসেস এর পর, এদিক-ওদিক লোন স্যাংশন। নতুন আরও দু’খানা রিসর্ট খোলা। তারমধ্যেই রুমনাকে বিয়ে। এইসব করে হোটেলে এসে ভালো করে নিজের মতো করে থাকার সুযোগ হয়নি আর….
পুষ্কর ওদের মধ্যপ্রদেশের রিসর্ট ম্যানেজার ছিল। কলকাতায় আসার জন্য বড়দার একটা আর্জি দিয়েছিল, দাদা গাঁইগুঁই করছিল। ও মওকা বুঝে ওকে এখানে ইনচার্জ করে পাঠিয়ে দিয়েছে। যেমন বিশ্বাসী সেরকম সৎ ছেলে। তায় রাজ্যে ফিরতে পেরে বকবক খুশি। সব কাজই সামলে নিয়েছিল।
****
বাগানে বনফায়ার শুরু হয়ে গেছে। কথক ভদ্রলোক গুছিয়ে গল্প বলা শুরু করেছেন। এদিকে ডাইনিং হল-এর কাছে যে কয়জন ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা আছেন তাদের সাথে রুমনা বেশ গুছিয়ে বসেছে। কি সেজেছে, বাপরে বাপ। গেস্টরাও তেমন? কেমন ফার্স্টলেডির মতো ভাব দেখাচ্ছে রুমনাকে দেখে। রুমনাও খানিকটা ওজন নিচ্ছে এইসব দেখে।
হঠাৎ করে সেই ঘরটার কথা মনে পড়ল আর মনে হতেই কৌতূহলটা তাগড়া হয়ে উঠল। যেতে হবে একবার যেতে হবে। ঘরটাকে ওরা ইচ্ছে করেই পাঁচিল দিয়ে একটু আলাদা করে রেখেছে। সকাল অবধি যেতে ইচ্ছা করলনা আর, এখনই যাই। ঘরে ঢুকে টর্চটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অনিকেত।
পাঁচিলের গেটটা খুলে ঘরটার সামনে দাঁড়াল অনিকেত। এটা একদম উলটো দিকে, গ্রামও অনেক দূরে। যেন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। একটা দুটো টিমটিমে আলো। ওর উদ্যোগে গ্রামে নতুন পোল পড়েছে। কিন্তু এই বাওড় আর টিলা অঞ্চলে কত আলো আর দেবে সরকার। ফলে যেই কি সেই। অবশ্য টর্চ-এর সাথে আজ একটা ছোট ইমারজেন্সি এনেছে। ভালোভাবে দেখতে হবে সবটা। নতুন একটা তালা দেয়া ছিল, চাবি নিয়ে নিয়েছে পুষ্করের থেকে।
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। এত দিন হয়ে গেছে অথচ ঘরটা যেন একই রয়ে গেছে। সেই একই গন্ধ ঝাপটা মারল নাকে। একটা বাক্স মতো কিছু ছিল ঘরের কোণে। সেদিনও দেখেছিল। আজ সেই বাক্সের উপর ইমারজেন্সিটা রেখে এবারে দেয়ালের দিকে ভালো করে তাকালো অনিকেত। মূর্তিটা দেখে আরেকবার শিউরে উঠল— সেই একই বীভৎসতা তার চোখে-মুখে।
অদ্ভুত ব্যাপার এতদিন পড়ে আছে অথচ মূর্তিটার গায়ে কোনো ঝুল নেই। অবশ্য হবে কি করে, মাকড়সাগুলোই তো মরে সেঁটে আছে মূর্তিটার গায়। সেদিন যেটা দেখেনি আজ সেটা আর চোখে পড়ল।
মূর্তিটা ঘিরে পাঁচটি স্বস্তিক বসানো। সম্ভবত তামার তাদের লালচে হলুদ রং আর নীল ছোপ তাই -ই বলছে। আর প্রতিটা স্বস্তিক এর কেন্দ্রে একটি করে তীর বসানো। কোনোটা ফলা শঙ্খের ন্যায়, কোনোটার অর্ধেক চন্দ্রের ন্যায়, কোনোটা ত্রিকোণ! পাঁচটি স্বস্তিক পাঁচটি তির আর তাদের গায়ে অদ্ভুত কালো সুতা বেঁধে রাখা। এই পাঁচটি তিরেই পুরো মূর্তির বেদিটি ঘেরা। যেন ব্যারিকেড করা হয়েছে। আর এই স্বস্তিক-এর সামনে একটি স্থাপন করা আছে একটি মাটির ঘট।
কেমন একটা ভয় ভয় করছিল অনিকেতের বেরিয়ে আসতে চাইছিল। পিছন ঘুরতেই বাক্সটা যেন পথ আটকালো, একটু আগে দূরে ছিল এখন যেন সরে ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর বাক্সটাকে দেখেই অদ্ভুত একটা কৌতূহল আবার চাগাড় দিয়ে উঠল। দেখতে হবে বাক্সটা দেখতে হবে। অনিকেত আর ফিরতে পারল না উলটে ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে দিয়ে খুলে ফেলল বাক্সটা। খুলে ফেলার পর মনে হল এই বাক্সের ভেতরের গন্ধ সে চেনে, জ্যাঠাবাবু যে কদিন বেঁচে ছিলেন তার ঘরের কাছে গেলে এই গন্ধটা পাওয়া যেত, একটা অদ্ভুত নিম ফুলের মতো গন্ধ। ভিতরে কিছু নেই কেবল একটা বাঁধানো মোটা খাতা আর একটা কনুই থেকে কাটা হাতের কঙ্কাল। ভয়ে কুকড়ে যাওয়ার কিন্তু ভয় তার লাগছে না। বরং তার মনে হচ্ছে সে সব জানে তাকে এখন বইটা পড়তে হবে আর এইটা তারই জ্যাঠাদাদুর। এইগুলো এখানেই থাকা দরকার বরং এই ঘট এই তির, এগুলোই এখানে দরকার নেই। সব ফেলে দিতে হবে। তাকে যে পূজায় বসতে হবে।
