অনিকেতের ছেলেবেলা
অনিকেতের মা মারা গেছেন তার জন্মের পর পর। দাদার সাথে ওর বয়সের ফারাক প্রায় সাড়ে আট বছর। অনিকেত যখন বড় হচ্ছিল তখন অতো বড়ো বাড়িতে তার জন্য কারুর সময় ছিল না।
দাদু, বাবার জন্য সকালে সাদা পর্দা দেওয়া গাড়ি আসত। তার আগে ব্রেকফাস্টটাই যা ওরা একসাথে করত। দাদু ফিরতেন বিকালে, এসে থেকে নিজের ঘর, ক্লাব এসব নিয়ে পড়তেন। বাবা সেই রাতে। আর ব্রো হল বাড়ির সব থেকে ব্যস্ত। কারণ তার সিনিয়র সেকেন্ডারি থেকে বাকিটা কেটেছেই লন্ডনে। তার আগেরটা পাহাড়ের একটা মিশনারিতে ফলে সে ছিল একা। একদম একা একটা ছানা।
জ্যাঠাদাদামণি ঘরের বাইরে যেতে চাইতো না। প্রায়দিন মেড ঘরে খাবার পৌঁছে দিত। কোন কোন দিন দাদু গিয়ে খাবার দিয়ে আসত। বাবা বলত দাদামণি পাগলা কিন্তু দাদামণিকে দেখে ওর কোনোদিন পাগলা মনে হয়নি বরং জ্যাঠামণি অনেক গল্প জানতো। ওর সঙ্গী ছিল মানুষটা।
তবে কি দাদামণি দাড়ি গোঁফ কাটাতে পারতো না তো নিজের হাতে, তাই মাঝে মাঝে দাঁড়ি গোফ বেড়ে ভয়ংকর লাগত। দাদামণির ডানহাতের কনুই থেকে কাটা ছিল। ভয়ংকর কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল জ্যাঠামণির।
দেশ বিদেশের কত গল্প বলতেন। কত আশ্চর্যের কথা শোনাতেন। কতদিন ওই ঘরে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। দাদামণিও গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস হত, ওই ঘরে ঘুমালেই ও কিছু অদ্ভুত স্বপ্ন দেখত, স্বপ্নগুলো আজকাল আর ভালো মনে করতে পারে না। আবছায়া যা মনে পড়ে, ও দেখত ঘরবাড়ি, ষাঁড় ছুটে আসছে। কিছু মানুষ তাদের হাতে তরোয়াল, বল্লম, কুঠার। প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। মানুষ কাঁদছে। তার মায়ের ছবির মতো অনেকগুলো মা সারা প্রান্তরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তারপর হঠাৎ করেই বড় বড় আগুনের গোলা এসে পড়ছে তাদের মাঝে। মানুষ চিৎকার করছে। আর কেউ একটা হাসছে, কি বিশ্রী সেই হাসি। হাসতে হাসতেই সব থেমে যেত আবার কোনোদিন দেখত, সার সার মানুষ মানুষ শুয়ে আছে। রোগা হাড়জিরজিরে চেহারা। ডাক্তার কাকার মতো কয়েকজন স্টেথোস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজনের পাশ দিয়ে যাবার সময়, সে চিৎকার করে রোজ তার পা-টা চেপে ধরত। সেটা একটা বাচ্চা, একদম তারই মতো দেখতে।
প্রথম প্রথম ভয়ে ভয়ে কিছু বলিনি তারপর একদিন দাদামণিকেই বলেছিলাম, দেখেছিলাম তাঁকে প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়ে যেতে। দাদামণি সাথে সাথেই আমাকে ওঁর ঘরের বাইরে বের করে দিয়েছিলেন। তারপর কি হয়েছিল জানি না কিন্তু আমাকে বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। বোর্ডিং থেকে বিদেশ। পরে রতন কাকার কাছে শুনেছে দাদামণি-ই নাকি বিদেশ পাঠাতে বলেছিলেন। দাদামণি-ই জেদ করে ওকে বোর্ডিংয়ে পাঠাতে চেয়েছিলেন। এসব সিদ্ধান্ত তাঁরই। ওর ও মনে হত শেষের দিকে যেন দাদামণি ওকে ভয় পেত।
মায়ের মৃত্যুর পর বাবা চেয়েছিলেন যে অন্তত একজন সন্তান তার কাছে থাকুক এবং সেটা উনি আমাকে বলেওছিলেন। কিন্তু দাদামণিকে না করার সাধ্য তার ছিল না। বাড়ির লোক ওনাকে পাগলা বললেও ওনার কথা না শোনার সাধ্য কারো ছিলনা, এটা আমি আগেও দেখেছি এমনকি দাদুর ক্ষেত্রেও। এর অর্থ আজও আমি বুঝিনি যে মানুষটাকে সবাই আড়ালে-আবডালে পাগলা বলে অথচ তার কথা ফেলার সহজ কারো হয় না!
যাই হোক আমি যখন সিনিয়র সেকেন্ডারি পর বিদেশ খেলাম তখন জ্যাঠামণি দেহ রাখলেন।
আজ এতগুলো কথা বলা এই কারণেই, আজকে মাঝরাতে আমি আবার ওই ঘরেই ফিরে এসেছি। রুমনা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ও জানেইনা যে আমি বেরিয়ে এসেছি। সিকিউরিটি গার্ড অবাক হয়ে দেখছিল আমাকে কিন্তু মালিকের উপরে কিছু তো বলা যায় না।
আমি এখন সেই ছোট্ট ঘরটায়। রাত কটা জানি না কিন্তু আমি এই ঘরে আসার পর সব স্বপ্নগুলো যেন আবার স্পষ্ট হয়ে গেছে। সব মনে পড়ছে— কি দেখতাম, কি করতাম? আবার লিখতে ইচ্ছা করছে। সব জ্যাঠামণির খাতাটা খুলে লিখতে বসেছি। যেখানে জ্যাঠামনি শেষ করেছেন সেখান থেকে আমার লেখা শুরু করেছে।
খাতাটা পড়তে হবে আমার মন বলছে সামনে তিনি আছেন ইনি কোন দেবতা। এ এক পবিত্র মন্দির।
এই ঘট, স্বস্তিক, তিরকাঠি সবকিছু সরাতে হবে। ঘরের মধ্যে অস্বস্তির কারণ এইগুলিই। না হলে দেবতার মন্দিরে আমার অস্বস্তি হবে কেন।
২০২০, বর্তমান সময়
কঙ্খল আশ্রম
মাঝ রাতে ঘুমটা ভেঙে গেল মুক্তি ঠাকুরের। অবশ্য ঘুম আর কোথায়? সারারাত চুপচাপ শুয়ে মায়ের নাম নিয়েই কাটিয়ে দেন। তিনি জানেন তাঁর ডাক আসবে। আসতেই হবে।
সত্তরোর্ধ এই মানুষটাকে দেখলে কেউ বয়স আন্দাজ করতে পারে না। গায়ের রং এখনো আপেলের মতো টুকটুকে। সকালবেলা গঙ্গাবক্ষে দাঁড়িয়ে যখন স্তুতি করেন তখন আশেপাশের সাধু-সন্তরা তাঁর স্তুতিতে গলা মেলান, এতটাই গমগমে এখনো তাঁর গলার স্বর। নিজস্ব আশ্রম কঙ্খলে অথচ এই মানুষটা থাকেন ছোট্ট ঘরে। ঘর, গঙ্গাস্নান আর মায়ের মন্দির। সারাটাদিন মায়ের পূজায় পড়ে থাকেন, স্বপাক খান। অথচ বিশাল আশ্রম চৌহদ্দিতে অনেক ভক্ত-শিষ্য গমগম করছে।
ভক্তরা আসে নিজেদের কথা জানায় মাকে। নিজের মতো করে ডাকে, উনি কাউকে আটকান না। বিশ্বাস আর সমর্পণ-ই সব চাইতে বড় মন্ত্র।
গুরুদেবও তাই বলতেন, মা সবার। এ দুনিয়া মায়ের তৈরি। এ জগৎ মাকে আটকানোর সাধ্যি কি। উনি দেখে যান সবাই তাদের মতো করে মাকে পুজো দেয়। কারুর কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে, কারুর যন্ত্রণার অশ্রুতে সিক্ত হচ্ছে মায়ের চরণ। মা সবাইকে দেখে।
না সাধনা সে অর্থে উনি করেননি। গুরু কালিকা ভট্টাচার্য ছোট্ট একরত্তি শিশুকে বুকে করে এনেছিলেন, তার শরীর তখন নীল। তাকে মায়ের পায়ে শুইয়ে দিয়েছিলেন। শিশু মায়ের পাদপদ্মে শুয়ে শিশুটি প্রথম কেঁদে উঠেছিল। গুরু ওকে নিয়ে এই কঙ্খল চলে আসেন। বলেছিলেন, মায়ের সেবা কর, সেবাই সাধনা। তোর ডাক আসবে।
সেই থেকে ডাকের অপেক্ষা করে আছেন। কে জানে, সেই ডাকই হয়তো সাধনা। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ওনাকে ছাড়তে হবে এই আশ্রম, ওনার অবগুন্ঠন। মায়ের জগতে আশ্রয় তো মা নিজেই। ১৯ বছর আগে একবার সেই ভূকম্প টের পেয়েছিলেন। তারপর আজ এই।
বর্তমান সময়, অনিকেতের হেরিটেজ রিসর্ট
অনেক পরিবর্তন ঘটেছে এই কয় বছরে। অনিকেত একটু একটু করে পেরেছে তাকে জাগাতে। এবার তার শেষ কাজ বলি চাই।
ফোনটা ঘোরাল অনিকেত, ওপার থেকে ভেসে এল বন্ধুর ভয়ার্ত স্বর। হোয়াং লী তার চিন দেশীয় বন্ধু। হোয়াং লী বহুদিন থেকেই তার সাথে যোগাযোগ রেখে চলছিল। একটা জিনিস চাই ওর। সেটা হোয়াং লি-ই আনতে পারে। এখনও সেভাবে কেউ জানে না। হোয়াংলির দেশ গত দুই মাস ধরে তাকে বয়ে বেড়াচ্ছে।
মাস তিন পর
দমদম এয়ারপোর্ট
তোমার ভয় করছেনা চোডুরি! আমি সম্ভবত ক্যারিয়ার। তুমি টন্ত্রা (তন্ত্র) দিয়ে সারাতে পারবে বলেই আমি এন্টি-ফিভার মেডিসিন নিয়ে আমাদের সারভিলেন্স ফাঁকি দিয়ে এদেশে এসেছি। আই ওয়ন্ট টু লাইভ চোডুরি। তুমি তন্ত্র করে আমাকে বাঁচাও।
মুখে চওড়া হাসি খেলে গেল অনিকেতের, গণবলি। মারি। উত্থান।
হপ্তা দুয়েক পরের ব্রেকিং নিউজ— ”আগামীকাল থেকে দেশজুড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। এই লকডাউনে বন্ধ থাকবে ইতিমধ্যেই দেশে করোনার বলি ৪২ জন। ইতালি, স্পেন প্রভৃতি দেশে রোজ আক্রান্ত হচ্ছেন গড়ে ১৮,০০০ মানুষ। তাই এই আগাম সতর্কতা।”
টিভিটা বন্ধ করে ‘হাটে’র দিকে গেল অনিকেত। গুমঘরে অনেক কাজ।
