ধুন্ধুমার – অধ্যায় ১
অধ্যায় – ১
শয়তানের ফিরে আসা
১৯৪৩-এর এক সময়
স্টেশনে নেমে বুঝতে পারল যে আকাশ কালো করে এসেছে। নেমে এদিক-ওদিক গোরুর গাড়ির জন্য উঁকিঝুঁকি দিলে। ধুস কোথায় কী? সেই পিছনের কামরায় দু’জন নেমেছে। যখন ও গ্রাম ছেড়েছিল তখন এই ইষ্টিশানটা ছিল না।
ধীর পায়ে ঘাটে এল এখনো প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের পথ উজানে বাইতে হবে কিন্তু আকাশের যা অবস্থা ঘাটে আর নৌকা থাকবে তো? অবশ্য সে নৌকাডুবির ভয় করে না, নৌকাডুবিতে তার মৃত্যু নেই এটি নিশ্চিত। যখন ঘাটের মুখে এসে থামলো তখন আকাশটা কালো হয়ে প্রায় মাথার উপরে ঝুলে এসেছে। এই অবস্থায় কোনো মাঝি নৌকা ভাসাবেনা তা বলাই বাহুল্য। অগত্যা নিজেই সড়সড় করে নেমে এল ঘাটের পিছন দিকে। এখানে গাঁজাখোরের ঠেক আছে, ঝুপসি জঙ্গল থেকে গাঁজার গন্ধ তার নাকে আসছিল। পারলে এরাই পারবে, আজ সে ওই পাড়ে যাবেই।
গেঁজেল দুটো হাঁটু জোড়া হয়ে বসেছিল। বার দুই ডেকেও কাজ হল না। গাত্রোত্থান এর বিশেষ উদ্যোগ ছিল না, অগত্যা…..
দুখানা কাঁচা টাকার লোভ ছাড়া মুশকিল তাই নৌকা ভাসিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল সেই দুর্যোগের মধ্যেই। ততক্ষণে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ছই এর ভেতর বাক্সপ্যাঁটরা রেখে এসে মোহন দাঁড়াল নৌকার গলুই-এর কাছে। জলের পরিস্থিতি ভালো নয় জোয়ার তখন মাঝামাঝি। তার উপর বাদাবনের এই প্রচণ্ড জোলো হাওয়া।
মঘার নৌকাখানা নেহাত ছোট নয় আড়ে বহরে একখানা ভুলিয়ার (পূর্ণাঙ্গ যাত্রী নৌকা) সমান। কিন্তু সেই নৌকাখানা ঢেউয়ের প্রচণ্ড তাড়াসে যেন আছাড়ি-পিছাড়ি খেতে লাগল। মঘা মাঝি-র জীবন কেটে গেছে নদীতে। আজকের ঢেউ বলে দিচ্ছিল এত সহজে মুক্তি নেই। কিন্তু একটা ব্যাপার অদ্ভুত লাগছিল যে এই মানুষটা গলুই-এর উপর এসে একবার-দুবার দাঁড়ালেই হাওয়া যেন নৌকাকে আর টাল খাওয়াতে পারছিল না। নেশা তখন পুরোপুরি উবে গেছে, হালে শক্ত হাতে বসে আছে। ছই-এর ভিতরের বাবুর কোনো সাড়া নেই। অন্ধকারে এই মানুষটাকে দেখা যায় না। বিশুর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল বিশু একইভাবে মাথা নিচু করে দাঁড় টেনে যাচ্ছে। জলের ছাঁট থেকে মাথা বাঁচাতে।
সহসাই চোখটা গেল ভেতরের দিকে। ছই এর ভিতরটা আলোকিত হয়ে উঠছে। ওই বাবুর চারপাশটা কেমন যেন নীলচে আলোয় ভরে গেছে। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো, এ কাকে তুলেছে নৌকায়? তেনারা নয়তো? খুব কৌতূহল হচ্ছিল মঘার। ভিতরে গিয়ে একবার দেখে কিন্তু এই মুহূর্তে হাল ছেড়ে যাওয়ার অবস্থা নেই। ভদ্রলোক বাবুটি বাইরে বেরিয়ে এলেন, সেইসঙ্গে একটা প্রচণ্ড বুনো গন্ধ এসে সপাটে ঝাপটা মারলো। কেন জানিনা মনে হল নৌকাটা কেঁপে উঠল না ঢেউ এর তালে নয় অন্যকিছুতে। পাটায় পা রাখতেই, নৌকার সামনের গলুই একটু নীচের দিকে নেমে গিয়ে স্থির হল। মঘার দিকে তাকিয়ে জড়ানো ভাষায় কিছু একটা বললেন বাবুটি। মঘা বুঝতে পারল, লোকটির মুখ থেকেই ভীষণ দুর্গন্ধটা বের হচ্ছে। বাতাসের এই উৎকট গন্ধটা এই লোকটির মুখ থেকেই আসছে। মানুষটার কাছে যেতে ইচ্ছা হল না আর। লোকটার ধীরে ধীরে গলুই এর উপরে পা রাখল। নৌকাটা স্থির হয়ে দাঁড়াল, যেন বাইরের এই প্রচণ্ড উত্তাল হাওয়া তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। বিশুর সাথে দাঁড়ে হাত লাগাল মঘা। হঠাৎই চোখ গেল বিশুর দিকে, বিশু দাঁড় টানতে টানতে খামচে ধরেছে মঘার পায়ের লোম। চিৎকার করে উঠতে গিয়েও সামলাল মঘা। বিশুর মুখ উপরের দিকে, ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে মুহূর্তে জমে গেল মঘা। এটা সে কি দেখছে! এই ঘোর বাদলাতেও আকাশের মধ্যে কালো বিন্দুর মতো শকুনের দল ঘুরপাক খাচ্ছে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে মুহূর্তে মুহূর্তে দৃশ্যমান হচ্ছে তাদের শরীর। আর ভালো লাগছিল না কোনোমতে মানুষটাকে নামে দিতে পারলে হয় অবশ্য নামে দিতে পারবে তো।
প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল কোথাও একখানা আবছায়া তিনমাথাওয়ালা অবয়ব ফুটে উঠল আকাশ জুড়ে যেন। আঁতকে উঠল মঘা, পা ভিজিয়ে গরম জলের ধারা নেমে এল ধুতি বেয়ে।
২
বাইরে আবার মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে। রসিক বাইরের বাতিগুলো জ্বালতে জ্বালতে বিড়বিড় করছিল জমিদারবাড়ির কি দিন ছিল, আর আজ কি দিন হয়েছে! গোটা বাড়িটায় এই কয়জন তারা থাকে। কর্তাবাবু চলে গেছেন আজ বহুকাল। দাদাবাবুরাও কেউ নেই। একটা আস্ত তিন মহলা বাড়ি, সন্তানহারা মায়ের মতো হাহা করে। বিড়বিড় করতে বারান্দা পেরিয়ে নামছিল রসিক। জমিদার বাড়িতে শনি লেগেছে, শনি। গিন্নিমারা সবাই কম বয়সে বিধবা হলেন। বাড়ির গোটাটাই অন্ধকারে ডুবে গেল। পাপ পাপ সব পাপ। মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে লম্ফ হাতে দেউড়ির কাছে এল রসিক।
লখাই দারোয়ান আজও পাহারা দেয়। তারই মতো এই বাড়ির নুন খেয়েছে। হাজারো দুর্দিনে বাড়িটাকে আর ছেড়ে যেতে পারেনি, তারাই এখন বাড়িটার মালিক বলা যায়। জমিতে চাষ দেওয়া। গিন্নিমাদের জন্য অল্প কিছু খাজনা আদায় করে আনা সব তারাই করে। কয়ঘর প্রজা এখনো নিয়মিত খাজনা দেয়। আশা একটাই মেজ দাদাবাবুর ছেলেটা কলকাতায় পড়াশোনা করছেন, তিনি এসে হাল ধরবেন। আবার আলোয় ভরে উঠবে বাড়ি।
বিড়বিড় করতে করতে বাগানের কাছে এসে চমকে উঠল রসিক। কে যেন দাঁড়িয়ে আছে আড়াল করে? পরমুহূর্তেই নিজেকে দুষল। এই তার এক বদগুণ হয়েছে, কথায় কথায় চমকে ওঠা। বয়সের দোষ যাকে বলে। এই পাশে খিড়কির দরজার ভাঙা পাল্লাটা রেখে দিয়েছিল। সেটাই রাতের অন্ধকারে অদ্ভুত মায়াময় হয়ে যায়। তার ফুটো ফাঁকফোকর থেকে আলো ঢুকে এমন ছায়া তৈরি করে যে মনে হয় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। হামেশাই চমকে ওঠে রসিক, জেনে-বুঝেই চমকে ওঠে। নিজেকে দুষে এগিয়ে যাচ্ছিল রসিক, তার আগেই সেই ছায়া কথা বলে উঠল, ‘রসিকদাদা আমায় দেখতে পাওনি!’
চমকে মুখ ফেরালো রসিক। আস্তে আস্তে আবছায়া থেকে একটা অবয়ব বেরিয়ে আসছে। লম্বা দোহারা চেহারা। হাতে ধরা লম্ফর আলোটা সরাসরি আগন্তুকের মুখে গিয়ে পড়েছে, অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলো রসিক, ‘বড় দাদাবাবু!’
ওদিকে রসিকের চিৎকার শুনে দেউড়ি থেকে ছুটে এসেছিল লখা, এসেই লোকটাকে দেখে উঁচিয়ে ধরেছিল তার বল্লম। সেদিকে হেসে আলোর ঘেরের দিকে আরেকটু এগিয়ে এল অবয়বটা। অবাক হয়ে গেল লখা, ‘বড়দাদাবাবু! বড়দাদা বেঁচে আছেন!’
‘বটে তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি মরে গেছি? যদি মরেই যেতাম তাহলে দেখছ কাকে’? সন্দেহের ভ্রূকুটিতে তখনও রসিকের চোখেমুখে। বিশ্বাস করতে পারছে না যে বড় দাদাবাবু ফিরে এসেছেন। বড় দাদার মরার খবর অনেকদিন আগেই পাওয়া গিয়েছিল, তখন খোদ কর্তাবাবা বেঁচে আছেন। গিন্নিমা সেই শুনে সেই যে শরীর ছাড়লেন আর উঠলেন না। বড় বউদিমণিকে তার বাপের বাড়ির লোক নিয়ে গেল। তারপর দু-একবার বউদিমণির খোঁজ শুনেছিল। এরপরতো পাকাপোক্ত কাল গ্রাস করল সংসারে, একে একে সব গেল।
‘কিগো বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকব? ভিতর যাব না?’ আগন্তুক লোকটির আওয়াজে চমক ভাঙলো রসিকের। যতই হোক একে দেখতে বড়দাদার মতোই। আগের মতোই হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল কিন্তু মন সায় দিল না। পরিবর্তে বলল, ‘আজ্ঞে আপনারই ঘর আমি চাকর আর নিয়ে যাব কী? চলুন, দিন বাক্সগুলো আমার হাতে দিন। এই লখা নেরে দাদার হাত থেকে।’
* * *
সবে তখন ভোর হতে শুরু করেছে রসিকের দরজায় কড়া পড়ে। বড় দাদাবাবু তাকে ডাকতেছে। তার গলা পাওয়া যাচ্ছে। অনেকদিন পর মনে হল যেন সবকিছু আবার নিজের ছন্দে চালু হয়ে গেছে।
বৃষ্টিস্নাত মাঠের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের জমি-জিরেত আঙুল দেখাচ্ছিলো রসিককে। রসিক অবাক চোখে দেখছিল। দু-চারজন করে গ্রামবাসী তখন উঠে পড়েছে। অবাক চোখে নতুন লোকটাকে দেখছিল গফুর মিঞা। আরেকটু কাছে গিয়ে চিনতে পারল মানুষটাকে। সেই সাথে একটা প্রচণ্ড ভয় আঁকড়ে ধরল তাকে। জমিদারের যে স্বভাবের সাথে তারা পরিচিত তাই যদি হয় তাহলে আবার খারাপ দিন আসছে। পিছন দিকে ঘুরে পালিয়ে যাচ্ছিল গফুর। মোহন নিজে এসে তাকে আটকাল, সে তখন ঠকঠক করে কাঁপছে।
* * *
গফুর যখন গ্রামে চলল খবর দিতে। দারুণ ফুর্তি তখন তার মনে, জমিদার মোহন রায়চৌধুরী ফিরে এসেছেন এবং তিনি আগের থেকে অনেকখানি বদলে গিয়েছেন। যতই হোক গ্রামের একজন মাথার দরকার হয়। তাদের গ্রাম আর অভিভাবকহীন নয়।
জমিদার বাড়িতে নতুন করে হিড়িক পড়ে গেল। তাদের মনেও দারুণ আনন্দ, যতই হোক এতদিনের পর কেউ তো যোগ হল। এতদিন শুধু বিয়োগ মানে মৃত্যুই দেখেছে এ বাড়ি।
দিন দুই পর
‘বাবু বলছিলাম আপনি ফিরেছেন সেটা একবার খবর দিলে ভালো হত না। যতই হোক….. ‘
মাঝপথে থামালেন কুমার, ‘রসিকদা তুমি আছো। বউমারা আছেন দরকার কি বাড়াবাড়ির? তা ছাড়া যার জন্য শ্বশুর কুলের সাথে সম্পর্ক। সেই যখন নেই। তখন শুধু শুধু কি লাভ এসব করে।
বড় বউদিমণি অর্থাৎ বড়দাদার বউ বাপের বাড়ি যাবার দু-বছরের মধ্যেই মারা যান।
আমি প্রজাকল্যাণে মন দিতে চাই। জমিদারি আবার মুঠোয় নেব, আগের মতো। তুমি পুরাতন নায়েব, খাজাঞ্চিদের খবর দাও।
রসিকের সন্দেহ তবুও যায়না। কিছু যেন ঠিক নেই। বাবু এত ভুল করবে! নিজ সন্তানের মৃত্যু খবর ভুয়ো জানাবে, এ হতে পারে না। আর প্রতি রাতের এ আওয়াজটাই কীসের। মালি বলছিল পিছনের বাগানে ঘাসের জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে অনেক শালিক, চড়ুই এর দোমড়ানো মোচড়ানো দেহ পেয়েছে। লখা তো বলল, চড়ুই এর ঝাঁক! আর সব নাকি টাটকা, ঘাস আর উলুখড়ের নীচে নাকি বিছিয়ে আছে পাখিদের মৃতদেহ! অবশ্য সন্ধ্যা হলেই, লখা আর মালি একসাথে আফিম নেয়। তাই বিশ্বাস করেনি। তবে দেখতে হবে।
অন্যদিকে গুমঘরের প্রকোষ্ঠে
আজ তোমাকে এই প্রাণীদের বলি চড়ালাম। জট খোল অসীম। জট খোল। আস্তে আস্তে সচল হল কিম্ভূতকিমাকার মূর্তিটা। এই প্রমাণ মাপের মূর্তিটা যে কারিগররা করেছে তারাই এর প্রথম বলি হবে এই আসনে। আপাতত এখন রোজ একটা করে পাখির ঝাঁক। নিজের সম্মোহন ও মারণকে জাগ্রত করেছে সে। আজ করবে বশীকরণ। ছোট আদি মূর্তিটা কেঁপে উঠল একবার। তারপরই ঘরের সমস্ত দীপ নিভে গেল।
পরদিন
জমিদার বাড়ির ছোট বউটি সবচাইতে অভাগী। তার স্বামী সুখ বড়ই কম। বিয়ের সাতদিনের মাথায় ছোট কুমার সাপে কেটে মারা যান। ছেলেমানুষ বয়সেই বিধবা। নিজের মতো থাকে, নাইতে গেলে ঘণ্টা খানেক ধরে সাঁতার কাটে। দুপুরে পানের বাটা আর ছিপ নিয়ে খিড়কিপুকুরে যায়। মেজ গিন্নি কিছু বলেননা। আছেন তো ওই দুটি প্রাণ। বয়সে অভাগী ছোট বোনের মতো। বেচারাকে আর বলেন কি?
আজ ও একদফা নেয়ে উঠে ভিজে কাপড়ে ঘাটের শানে গোড়ালি মাজছিল নিজের মতো। হঠাৎই গলার কাছে নিশ্বাস পড়ল ফোঁস করে। চমকে পিছন ফিরল ছোট বউ। কোথাও কিছু নেই।
আবার গোড়ালি ঘষায় মন দিল। খানিকক্ষণ পর আবার, তবে এবার আর ঘাড় নয়। জল থেকে কিছু উঠে এল পা বেয়ে। চিৎকার দিয়ে উঠতে যেতেই চোখে পড়ল দৃশ্যটা। মুহূর্তে রাঙা হয়ে গেল মুখ। লাফালাফিতে গায়ের কাপড় খসে গেছে। দোতলার পিছনের জানালা দিয়ে ভাসুর ঠাকুর এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তার দিকে। জল থেকে সেই কিছু তখন উঠছে তার পা বেয়ে অদ্ভুত ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে শরীর।
* * *
দৌড়ে ঘরে এসেছিলেন খাজাঞ্চি মশাই। রাস্তা থেকে বাড়ি আসার পথে সর্বক্ষণ তাঁর মনে হচ্ছিল। কেউ যেন তার পিছু নিয়েছে। তার পিছু পিছু সে আসছে। পিছন ঘুরে একটা কানা ঘেয়ো কুকুর ছাড়া কিছুই দেখেননি। কিন্তু কিছুতেই অস্বস্তিটা কাটাতে পারেননি। এই কুকুরটাকে তো গ্রামে আগে দেখেননি! তার বাড়ি ঢোকার মুখে একটা মাদি কুকুর দিন কয় হল বাচ্চা দিয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘোষের মুদি দোকানের চালার পিছনে শুয়ে থাকে। ভেবেছিলেন মা কুকুর আনকোরা জানোয়ার দেখে গলা চড়াবে স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু পরিবর্তে ভয়ে কেঁউ কেঁউ করে উঠল মা কুকুরটা। ভয়ে যেন আরও কুঁকড়ে গেলেন খাজাঞ্চি বলরাম ভদ্র।
বাড়ি এসেও তার শান্তি হয়নি সর্বক্ষণ মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার ঘরের চারপাশে আছে। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো সন্ধ্যা নাগাদ বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল তার ভায়রাভাই। ব্যাটা গ্রামান্তরে যাবে মেয়ের বিয়ের কিছু জোগাড় করতে, রাতটা তার কাছেই কাটাবে তাহলে ভোর ভোর রওনা হওয়ার সুবিধা।
রাত্রে শোয়ার সময় জানলা দরজা ভালো করে বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন অবশ্যই বান্দরবান অঞ্চলে সাপের জন্য বর্ষাকালে লোকজন ভালোভাবে বন্ধ ছন্দ করে কিন্তু একটু বেশিই ব্যবস্থা নিতে দেখে ভায়রা অবাক হয়েছিলেন। প্রশ্নের বাণ ছুটিয়েছিলেন। কিন্তু কি বলবেন বলরাম ভদ্র, এমন তো কিছুই ঘটেনি যাকে তিনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন। সবই যেন তার মনের ভয়। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না।
গতকাল রসিক তাকে বলে গেছিল। আজ তিনি নতুন জমিদারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাদের বড় কুমার আবার ফিরে এসেছে। এটা খুব আনন্দের কথা, আবার ঠাঁটবাটের সঙ্গে তারা থাকতে পারবে। জমিদার ফিরে আসা মানে তাদের মতো কর্মচারীদের পোয়াবারো। খাজনা আদায়, খাতা সারার নামে বেশ দু-চার পয়সা উপার্জন করা যাবে। যাইহোক বড় বাবুকে দেখে সে বেশ খুশি হয়েছিল। গদগদ হয়ে আলাপ করেছিল। কিন্তু সমস্যাটা বেধেছিল এস্টেটের শিলের ছাপ দেওয়ার সময়। আঙুলের একটা দাগ নিয়ে।
বড় কুমারকে সে ছেলেবেলা থেকে দেখেছে। বিশেষ করে নিজে খুব ভালো বন্দুক চালাতে পারত বলে বড় কুমারকে বন্দুক চালানো সে-ই শিখিয়েছে। তখন এই হালের রাইফেল ওঠেনি। আগেকার বারুদ ঠাসা বন্দুক। সেই নিয়েই মাত্র সাত বছর বয়সে হাত পাকাতে শুরু করেন কুমার। এই বন্দুক বারুদের সমস্যা ছিল, মাঝেমধ্যেই ভিতরে ফেটে যেত। একবার তাই হয়েছিল, ট্রিগারটা আগুনের গরমে টকটকে লাল হয়ে যায়। কুমারের তর্জনীর কচি চামড়া পুড়িয়ে খাবলা করে দেয়। ঘা শুকিয়ে যাবার পরও সেই জায়গাটা খাবলা হয়ে কুঁচকে থাকত। সারাজীবনের মতো দাগ হয়ে গিয়েছিল। এনার হাতে সেটা নেই। সাদামনে সেই প্রশ্ন-ই করেছিল। কিন্তু এই প্রশ্নটায় এই মুহূর্তে যেন বদলে গিয়েছিল পরিবেশ। তখন ঝিমঝিম দুপুরে কাছারি ঘরে কেউ ছিলনা। সরে এসে তার গলা চেপে ধরেছিলেন কুমার। তার চোখ দুটো আঙরার মতো জ্বলছে। যতই তিনি ছটপট করতে করতে বলছিলেন ‘বাবু কি করছেন!’ ততই আঙুলগুলোও তার গলায় চেপে বসেছিল। শেষমেষ বাধ্য হয়েই ধাক্কা দিয়েছিলেন কুমারকে। ছিটকে ঘরের কোণে পড়ে গিয়েছিল কুমার। দপ করে একবার জ্বলে উঠে নিভে গেল চোখ দুটো, তখন দেখেছে নিকষ কালো দুটি চোখ। যেন আংরা পোড়া কয়লা মনিটাকে ঘিরে নিয়েছে।
ছুটে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। কিভাবে যে সদর, দেউড়ি পেরিয়ে রাস্তায় উঠেছিল তা সে নিজেও বলতে পারবে না। রাস্তায় উঠে ছুট মেরেছিল। জমিদারবাড়ির মোড়টা পেরোতেই এই কুকুরটা তার পিছু নিয়েছিল। এখন জানলা বন্ধ করার সময় দেখেছে কুকুরটা তার বাড়ির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিভটা একহাত বের করে তির তির করে গা কাঁপাচ্ছ।
মাঝরাতে বিষম হুলুস্থুলের তোড়ে গোটা গ্রামের লোক জেগেছিল। বলরামের বাড়ির দিক থেকেই চিৎকার-চেঁচামেচিতে আসছে।
বলরামের ভায়রা তাদের বাড়িতে এসেছিল। রাত্রে দুই ভায়রাভাই একসাথে শুয়েছিল। মাঝরাতের দিকে প্রাকৃতিক কারণে বলরামের একটু বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে ছিল। বলরাম ফিরে এসে দেখে কি, ভায়রা মশারির মধ্যে এলিয়ে পড়েছে। গাল থেকে গ্যাজলা উঠছে। গালের পাটিতে লতার দংশনের দাগ। মশারির ঝালরটা নীচে পড়েছিল ঘুম চোখে খেয়াল করেনি। সেখান দিয়েই প্রবেশ করেছে।
কী লতা, কী বিষয় ভালোভাবে জিজ্ঞাসা করার উপায় ছিল না। বলরাম কেমন যেন পাথর বনে গেছে। আসলটা হল পুরোটাই সে দেখেছে। সে দেখেছিল লতাটাকে, টকটকে হলুদ তার গাত্র বর্ণ, ভায়রার বুকের ওপর ঘাড় হেলিয়ে আঁকুশির মতো ফনা তুলে আছে। এরকম অদ্ভুত শিরশরে দৃশ্য দেখেই তার স্থাণুবৎ অবস্থা। প্রচণ্ড ছোবল মারতে দেখেও টুঁ শব্দটাও করতে পারেনি। জলনালি দিয়ে লতাটার লেজের ডগাটা মিলিয়ে যেতেই বাইরে কুকুরটা তীক্ষ্নস্বরে ডেকে উঠেছিল। তখনই সাড় ফেরে তার। চিৎকার শুরু করে। এখনো ঘোর কাটেনি।
এরকম প্রান্তিক পাড়াগাঁয়ে সাপের কামড়ে মৃত্যু একটা লেগেই থাকে তাই এ নিয়ে কেউই বিশেষ মাথা ঘামায়নি। আর খাজাঞ্চিও মুখ খোলার সাহস করেনি। কিন্তু রসিকের ধন্দ যাবার নয় বারে বারে কেন জানি মনে হত এই লোকটার মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা থেকে স্বাভাবিক নয়।
রসিকের চিন্তা
তাদের বড় কুমার ফিরে না এসে যদি সেই ছেলেটিও ফিরে আসত তাতেও তার কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ সেই ছেলেটা হাজার হোক এদের রক্ত এবং এদের চাইতে অনেক ভালো। এদের চার দেয়ালের মধ্যে যে অন্যায় অত্যাচার জমাট বেঁধে আছে, সেই অন্যায় অত্যাচার আবারো ফিরে আসবে যদি বড়কুমার-ই ফিরে আসেন। জীবনে নৃশংস মানুষ বহু দেখেছেন কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে তার বড়বাবু যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিলেন তা তুলনারহিত। কর্তা বাবাকে অবধি তার সামনে ভয় পেতে দেখেছে রসিক। শুধু নেমকহারাম হতে পারেনি তাই…
ভূষণ কায়েত চার পুরুষ এর ভাগচাষী। ভাগচাষী বলতে বেতনভুক কর্মচারী। দেবোত্তর অংশ তাকে চাষের জন্য দেয়া হয়েছিল ওই জমিতে গন্ধ আতপ ফলানো হত। সেই গন্ধ আতপে দেবতার ভোগ হত। সেবারে কি একটা ধানের ফলন অন্যবারের মতো হয়নি। তার উপর ধান কাটার আগেই অসময়ের বৃষ্টি এসে সমস্ত ধান নষ্ট করে দেয়। ধান পেকে গিয়েছিল কাটলেই হত। তবে এই হিসেবটা ভূষণ করতে পারেনি যে ওরকম আচমকা বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত হবে। কিন্তু এর ফল হয়েছিল মারাত্মক। তাকে টানা তিন দিন খামারে বেঁধে রেখে চাবুক পেটা করেছিলেন জমিদারবাবুর পাইক আর তার আদরের বড়ছেলে। সেই চাবুক মারা ভুলে যাওয়ার কথা নয়, সারা গ্রামের লোক শিউরে উঠেছিল কিন্তু বলার ক্ষমতা কারও ছিল না। তারপর একদিন ভূষণ গায়েব হয়ে গিয়েছিল চট করে। কেউ জানত না তার কি হয়েছিল। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দির পিছনের একটেরে ঘরটায় যে কি হয় কেউ জানে না। কত হাহাকার, কত রক্ত যে ওই খুপরির মধ্যে তার হিসেব নেই। আজকাল মাঝে মাঝে ওইদিকের ঘরে আলো জ্বলে মনে হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে তন্দ্রা পড়েছিল রসিক।
আচমকাই ধপ ধপ করে একটা আওয়াজে চিন্তাজালটা ভেঙে গেল রসিকের। এত রাত্রে বাইরে তো কেউ যায় না। কান খাড়া করল না বাইরে নয়তো আওয়াজটা ক্রমশ সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। লন্ঠনের সলতেটা উঁচিয়ে করে সিঁড়ির দিকে এগুলো রসিক। একটু দেখে আসা দরকার। বড় কুমার ঘরের পাশ থেকে আসার সময় দেখল ঘরখানা ভেজানো। ভেতর থেকে আলো জ্বলছে, কি জানি বড় কুমার কেন বাইরের ঘরে থাকছেন। অবশ্য হতে পারে ভিতরে ঘরের সব বউমণিরা থাকেন। হয়তো তার খানিক দ্বিধা হয়।
উপরে উঠছে খানিকটা ঘাবড়ে গেল রসিক। ছোট বউমনি এত রাতে কি করে! তার কাছে আসতেই কতগুলো পাখি উড়ে গেল যেন। এত রাতে কী পাখি এগুলো…
‘কী চাই?’ ছোট বউমণি বাজখাঁই গলায় চিৎকার দিয়ে তারদিকে চেয়ে রইল। কুঁকড়ে গেল রসিক। অন্য সময় হলে জ্ঞান দিত নিশ্চয়ই। কারণ ছোট বউমণি তার কাছে মেয়ের মতোই। তার বিয়ে হলে এরকম বয়সি একটা মেয়ে থাকতো আজকে। আজকে দৃষ্টি বা গলার তেজ থমকে দিল রসিককে। এদ্দিন পর, নিজের ভেতরে চাকরসুলভ দৈন্যতাটা আবার ভেসে উঠল। ধড়ধড় করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল নীচে।
ভাগ্যিস নীচে নেমে এসেছিল, না হলে উপরের দিকে তাকালে দেখতে পেত চিলেকোঠার ছাদে একজন মানুষ বাঘের মতো ওৎ পেতে আছে। একটু বেচাল দেখলেই লাফিয়ে পড়ে তার ঘাড় মটকে ভেঙে ফেলতে। কেউই চায় না তাদের লাম্পট্যের কীর্তি চাউর হউক। দীর্ঘদিন পরে কামনা সুখ পেয়ে ছোট গিন্নির বোধহয় হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছিল। না হলে একজন মানুষ কীভাবে মুহূর্তে সরসর করে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে যেতে পারে। সেটুকু একবার ভাবল না। তার মনজুড়ে এখন শুধু একটাই চিন্তা, খিদে প্রচণ্ড খিদে।
দিন সাতেক পর
রাতের বেলা বাইরে বেরিয়ে ছিল বিষ্টু। রাতের দিকে বাইরে বেরোনো তার নিত্য দিনের অভ্যাস। বাইরে বেরিয়ে বাড়ির পিছন দিকটাতে এই কাজটা সারে। রাতবিরেতে আর মাঠে যাওয়ার ঝুঁকি নেয় না। সেদিনও বসেছিল এরপর থেকে টানা লম্বা জমিদারদের আবাদি ডাঙা বাড়ি। এখন ফাঁকা পড়ে আছে। ওই জমির আড়াআড়ি জমিদার বাড়ির পিছনটা দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে বসেই বিষ্টু দেখল গুমঘরে আলো জ্বলছে। ছ্যাঁত করে উঠল বুকটা। এতদূর থেকেও সেই স্থির, অকম্প ম্লান প্রদীপ শিখা ওকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল যেন।
আবার কি জেগে উঠছে তবে গুমঘর! জমিদার বাড়ির ইতিহাস বড় কঠিন… এই ঘরে এত অত্যাচার হয়েছে সে জমিদারবাড়িতে মাও স্বয়ং স্থান নেননি। শোনা যায়, জমিদার মশায়ের পিতামহ একবার মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাঁর গৃহে। কিন্তু যতবারই প্রতিষ্ঠা করতে যান মায়ের মন্দির। কখনো চূড়া ভেঙে যায় কখনো মন্দিরের কোনো না কোনো ক্ষতি হয়। এটা ওটা বিপত্তি আসে। শেষমেষ কুল পুরোহিতকে স্বপ্নাদেশে দেবী বলেন, এই জমিদারদের হাতে এত রক্ত লেগে আছে যে এখানে মা থাকতে চান না। এদের হাতের পূজাও তিনি চান না। তাই এখানে মাকে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বহুদূরে শ্মশানে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এই সবেও জমিদারদের টনক নড়েনি তারা পুরুষের পর পুরুষ ধরে অত্যাচার চালিয়ে গেছে। আর তাদের এই সমস্ত অত্যাচারের স্বাক্ষী এই গুমঘর। মাঝখানে যখন বন্ধ ছিল প্রজারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচে ছিল। নতুন জমিদার ফিরে আসার পরেও একটা ভয় হয়েছিল কিন্তু তার ব্যবহার দেখে আশ্বস্ত হয়েছিল খানিক।
আজ আবার নতুন করে গুমঘরের ভেতরে আলো জ্বলতে দেখে প্রচণ্ড কৌতূহল পাক মারছে। পুকুর থেকে জল সোচ করে উঠে টেমিটা হাতে নিয়ে মাঠ এগোল জমিদার বাড়ির দিকে। পাঁচিল বা ফাটক ডিঙোনোর ব্যাপার নেই। কারণ এই গুমঘর জমিদারবাড়ি হাতার একদম বাইরে এক কোণে, নদীর কাছে। মাথা বরাবর কোনাকুনি হেঁটে গেলেই হল।
পা টিপে টিপে গুম ঘরের পিছনে এসে জানলা দিয়ে উঁকি মারলো। একটা আবছায়া আলো-আঁধারি ঘরটার মধ্যে। একটু চোখটা সয়ে যেতে বুঝতে পারল। কেউ একজন তার দিকে পাশ ফিরে বসে আছে। আদুল গায়ে অদ্ভুত কিছুর প্রলেপ। তার একটা ঝাঁঝালো গন্ধ উঠছে। তার গোটা শরীর ঘিরে মাছি আর ভ্রমরের দল জটলা পাকাচ্ছে। অদ্ভুত একটা আসনে বসে আছেন মানুষটা। এই আসনকে কি বলে তা বিষ্টু জানে না। ডান পায়ের মধ্যে দিয়ে হাত গলিয়ে বাম পায়ের বুড়ো আঙুল ধরে আছেন আর ডান হাত দিয়ে ধারা আছে এক অদ্ভুত দর্শন পাত্র। কাঠের তৈরি লম্বাটে আকারের বাটির মতো। লোকটির মুখ ভালো করে অন্ধকারে বুঝতে পারা যাচ্ছে না। সামনে কিছু আছে কি? কেমন একটা জমাট অন্ধকার নড়ছে যেন। চোখটা রগড়ে আরেকবার পাতল জানালায়।
তাকে চমকে দিয়ে লোকটি হঠাৎ করেই প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে গাল হাঁ করল। এইবারে লোকটির মুখ পরিষ্কার দেখতে পেয়েছে…. কিন্তু সেসব ভাবার সময় নেই। কোথা থেকে যেন কল কল করে জল পড়ার মতো আওয়াজ শুরু হল আর সেই সাথে বুকে এক প্রচণ্ড যন্ত্রণা। শিরা ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসছে। হৃৎপিণ্ডটা ফেটে গেছে বুঝি, গালের কষ বেয়ে নেমে আসছে রক্ত। বিষ্টু যন্ত্রণার মধ্যেও ঘরের মধ্যে শেষ বারের মতো দৃষ্টি দিল।
যেটা বুঝতে পারল পাত্রের মধ্যে আপনা হতেই কলকল শব্দে রক্ত ভরে উঠছে। কোনোমতে শরীরটাকে টেনে পালাতে চাইল বিষ্টু কিন্তু সেই মাছিরা তাকে ঘিরে নিয়েছে। ভ্রমরগুলো প্রচণ্ড গুঞ্জন তুলে তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে ওরা ঘিরে নিয়েছে।
মানুষটির হাতের রক্তের পাত্রের দিকে হাত বাড়াল একটা হাত। না ওটা কি, খটখটে শুকনো আঁশযুক্ত মুরগির পায়ের মতো চার নখ। আর ভাবতে পারলনা। প্রচণ্ড কাশির দমকে ভলকে ভলকে বেরিয়ে এল রক্ত। তার চোখ বুজে যাওয়ার আগে শুধু বুজতে পারল। মাছিগুলো তার মাথায় গালে বসেছে, তার রক্ত চাটছে সুড়সুড় করে।
উপাচার শেষ করে আসন ভাঙলেন ভিতরের মানুষটা। দেবতার যখন ভোগের প্রয়োজন হয় দেবতা নিজেই নিয়ে নেয়। আগেরবার দেবতাকে জাগ্রত করতে পারেনি তাই অনেক ভুগতে হয়েছে। কিন্তু এই মাটি অপবিত্র, এখানে দেবতা নিজেই জেগে উঠেছেন। দেবতার ভোগের যখন প্রয়োজন হয় তখন মানুষ নিজে এসে ধরা দেয়।
* * *
পরদিন বলরামের বউয়ের আছাড়ি-পিছাড়ি কান্নায় জমিদারবাবু ছুটে এসেছিলেন। কোতোয়ালিতে খবর দিয়েছিলেন কারণ এমন ধারার মৃত্যুর একটা সুরাহা হওয়া উচিত। তবে এইসব অঞ্চলে কোতোয়ালি দারোগা একই রকম। দারোগা এসেই এরকম ঘাড় মটকানো, রক্তশূন্য মৃতদেহ দেখে সোজা বলে দিল ভূতের কীর্তি। রাতবিরেতে মাঠে গিয়েছিল ভূতের আর দোষ কী? গ্রামের লোক সমস্বরে বলে দিল, তারা এখানে আলেয়া দেখেছে বিস্তর। রাগে গা জ্বালা করছিল জমিদারের। ইচ্ছে করে আটকে নিল। এদের কিছুই হবে না এরা কুয়োর ব্যাঙ বাইরেরটা দেখিনি এখন অব্দি আটকে পড়ে আছে। একমাসে এদের শুধরানো অসম্ভব।
কয়েকমাস পর
এই ক’মাসে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে গ্রামে। জমিদারবাবুর কর্তৃত্ব গোটা গ্রামজুড়ে। জমিদার বাবু গ্রামে আসার পর ভীষণ রকম কলেরার প্রকোপ হয়েছিল। ঘরে ঘরে লোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার কেউ মরেনি। শ্বাস উঠে আসা রোগীও জমিদারের চিকিৎসায় ফিরে আসে।
মা বিষহরির স্যাঙাৎ কালাচও তাকে দেখে মাথা নামিয়ে চলে যায়। এই তো ক’দিন আগেই হয়েছে। মানুষ এখন তাকে অন্ধের মতো ভক্তি করে। দেব-দেউলের পূজার চেয়ে তার দরবারে ভিড় বেশি হয়। গ্রামে দু-একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু আজও হয় বটে। কিন্তু মানুষ এত সুখে আছে যে এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
আসলে ঘরের সুখ বড় সুখ। জমিদার নিজে মাঠে যান, প্রজাদের ভালোমন্দের খোঁজ নেন। প্রজারারা মাঠে থাকলে, চাষে থাকলে তাদের ঘরে যান। তাদের পরিবারের সুখদুখের খোঁজ নেন। চাষীবউ দুপুরে ক্ষেতে খাবার নিয়ে গিয়ে জমিদারের নামে মধু বর্ষণ করে। মুদি দুপুরে খেতে এলে মুদিবউ জমিদারের স্তুতি করেন। খাজাঞ্চি ঘরে গিয়ে দেখেন, জমিদার কখন এসে তার অসুস্থ ছেলের জন্য পথ্যি দিয়ে গেছে। অথচ সময় ছিল এই গ্রামের জমিদারের ভয়ে মেয়েরা আসূর্যস্পর্শা ছিল!
রসিকের অশান্তি
সবাই সুখে আছে কিন্তু রসিকের সুখ নেই। তার সর্বস্ব জ্বলছে। এক প্রচণ্ড পাপবোধে। এ কি করল সে, এ কোন কালকে প্রবেশ করাল সে। ওইদিন রাত থেকেই কেন জানি না ভালো ঘুম হল না রসিকের। প্রথমে গিন্নিমারা সবাই কেমন আড়ষ্ট হয়েছিলেন। স্বাভাবিক নতুন মানুষ বিশেষ করে, যে মানুষকে মৃত বলে ধরা হয়েছে। সে যদি এতদিন পর ফিরে আসে তাহলে তাকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়াটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সে-ই দ্বিধাটা কাটিয়েছিল। কিন্তু আজকাল তার মনে হয় বড় ভুল হয়েছে কথাও। খাজাঞ্চিও কেমন ধারা মরা মানুষের মতো হয়ে গেছে।
আজকাল কেমন একটা বুনো ঝাঁঝালো গন্ধের রসিকের জানলার কাছটা ভরে যায়। তার ঘুমের মধ্যে বারবার যেন মনে হচ্ছিল উঠোনের বাইরের ঘাসের জঙ্গলে কি যেন ছটফট করে হাঁটছে। প্রহরের পাখিগুলো যেন কেমন একটা অদ্ভুত স্বরে কুকিয়ে ডাকে। যেন এর মধ্যে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা নেই।
