ধুন্ধুমার – অধ্যায় ২
অধ্যায় – ২
।। অন্যদিকে। ওই সময়।।
গ্রামান্তরের শ্মশানে, রক্ষকের দুশ্চিন্তা
একমনে গল্প বলে যাচ্ছিলেন সাঁইদার কালিকা ভট্চাজ। হঠাৎ করেই থেমে গেলেন। আচমকাই মুখ তুলে নাক টানতে টানতে বললেন, তোমরা কিছু গন্ধ পাচ্ছো? সমাগত সবাই এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল বৃদ্ধ, কানা সাঁইদারের। সরপড়া ডান চোখটার আবছায়া মনি অস্থির ভাবে ঘুরছে অন্ধকারের দিকে। বিষয়টা ভালো ঠেকছেনা, কিছু হচ্ছে। বন্ধ শ্মশানে এই গন্ধ কেন? বসে আছো কেন যাও…. একবার উঠে দেখে আসো। চাফানটা বৃষ্টিতে পড়ে আছে।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে, উঠে পড়ল পাইক আর দুজন গামুই। পুরানপুরের শ্মশানের চালার ভিতরে কোনোমতে মাথা গুঁজেই বসে ছিল ৭-৮ জন গামুই আর পাইক। পুরানপুরের শ্মশানের একদিকে মা শ্মশান কালীর মন্দির লাগোয়া এই চালা। একটু ভিতরের দিকে সাঁইদার এখানেই থাকেন। পাশের আরেকটা চালায় বিশে ডোম পরিবার নিয়ে থাকে।
বহুদূর থেকে চাফান (সৎকারের নিমিত্ত মৃতদেহ) এসেছে। ভিনগাঁয়ের এক পুরুত মারা গেছেন। ব্রাহ্মণ মানুষ তাই এই দুর্যোগে ও সবাই নিয়ে এসেছে। কিন্তু শ্বাস ছাড়ল যখন, বাইরে তখন প্রকৃতিভাঙা ঝড়-ঝঞ্ঝা। কেউ বেরোতে পারেনি। একটু বৃষ্টি একটু ধরতেই ভরসন্ধ্যায় দেহ নিয়ে বাইরে এসেছে গামুইরা।
শ্মশানে দেহটি নামাতে না নামাতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। কোনোমতে কয়জন মিলে শ্মশানের চালার মধ্যে ঢুকে মাথা রক্ষা করেছে, বৃষ্টি থামার নাম নেই। মৃতদেহ যে একজন বসে থাকবে সেও পারা যাচ্ছে না। অবশ্য কালিকা সাঁইদারের শ্মশান বাঁধা আছে যতক্ষণ তিনি আছেন, তাঁর মা শ্মশানকালী আছেন। কোন অপশক্তি এখানে প্রবেশ করে সাধ্য কি……
সাঁইদার এতক্ষণ নানারকম গল্প বলছিলেন। বিশে দাঁড়িয়েছিল, একটু বৃষ্টি ধরলেই কাঠকুটো জোগাড় করবে। এমন সময় সহসাই এই অবস্থা।
* * *
মৃতদেহের সামনে এসে বিস্ময়ে, ভয়ে হতবাক হয়ে গেল উপস্থিত চারজন। এ কী দেখছে তারা! এ কী আদৌ সম্ভব! অনেকক্ষণ হয়ে গেছিল তাই টান আসতে পারে ভেবে মৃতদেহটা খাটিয়ার সাথে বেঁধে নিয়ে এসেছিল তারা। সেই বাধন ছিড়ে কীভাবে যেন বাম হাতটা খাটিয়ার দড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে ঝুলছে। আর সেই হাতের আঙুল চিবিয়ে খাচ্ছে কয়েকটা অদ্ভুত দর্শন চেহারার প্রাণী! আকারে শৃগালের থেকে অনেক বড়, গায়ের চামড়া দগদগে, বাদামি লোমে ভর্তি পুরো শরীর। তারা পরম আনন্দে ছিড়েখুঁড়ে খাচ্ছে হাতের মাংস, আঙুল। তাদের পদশব্দে মুখ তুলল প্রাণীগুলো। আর ঠিক সেই সময় দপ দপ করে নিভে গেল পেট্রোম্যাক্সটা। জালটা পুড়ে গেছে বোধহয়। নিকষ কালো অন্ধকারে টিপের মতো জ্বলে উঠল তাদের সবজেটে চোখগুলো। তারপর আচমকাই চিৎকার দিয়ে উঠল সবাই। এক অদ্ভুত আর্তনাদের মতো তাদের ‘হাহা’ রব ছড়িয়ে গেল শ্মশানের প্রান্ত থেকে প্রান্তে। কেঁপে উঠল পুরানপুর। এ কারা এল….
ছুটে এলেন সাঁইদার। জল হাওয়ায় কাঁপা কাঁপা মশালের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লোকটির হাতের চিহ্ন। বিড়বিড় করে উঠলেন বৃদ্ধ সাঁইদার, ‘মা মাগো, এ কোন অশনির সংকেত দিচ্ছ গো মা! এ কে এল?’
যাকে হত্যা করা হয়েছে সে পারিজাত বৃক্ষের রক্ষক। তার বামহস্তে সেই চিহ্ন বর্তমান। যাতে কেউ সে চিহ্ন বুঝতে না পারে তাই হত্যার পরেও ছাড় দেওয়া হয়নি। এই ভয়ঙ্কর জীবেদের পাঠানো হয়েছিল, সেটুকুও লোপাট করতে। বুঝতে পারলেন কালিকা ভট্চাজ সময় হয়েছে। এতদিন যার জন্যই তিনি বসেছিলেন, তিনি ফিরে এসেছেন।
পারিজাত বা কল্পতরু উঠে আসে মন্থনের তৃতীয় প্রহরে, কামধেনুর সাথে। কামধেনুর সাথে পারিজাত বৃক্ষ উঠেছিল বলে তাকেও স্বর্গীয় বৃক্ষ ধরা হয়। অপর নাম কল্পতরু। এরূপ পাঁচটি পারিজাত বৃক্ষ ইন্দ্র দ্বারা রোপণ করা হয়। পারিজাত বৃক্ষের ফল ও ফুল শুভ চিন্তাবর্ধক। সেই কাণ্ড দিয়েই তৈরি হয় সেই পাঁচখানি ভয়ানক একাঘ্নী বাণ। তারা ধুন্ধুর বাহিনিকে পরাস্ত করে আবার ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে পারিজাত বৃক্ষ এখনো আছে। সবার অলক্ষে তাদেরই মতো তবে অপেক্ষাকৃত নিম্নশ্রেণীর এক রক্ষকুল পারিজাত বৃক্ষ কে রক্ষা করে চলেছে— তারাই পারিজাত রক্ষক নামে পরিচিত। কিন্তু আজ এই রক্ষকের মৃত্যু এটা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে পারিজাত বৃক্ষ বিপদে পড়েছে। পারিজাত বৃক্ষ না থাকলে নতুন করে সেই অস্ত্র সৃষ্টি করা যাবে না, আর সেই অস্ত্র সৃষ্টি করা না গেলে বধ করা যাবে না তাদের। পাঁচটি কল্পতরুর কান্ড হতে নির্মিত সেই পাঁচ অস্ত্র। সর্বনাশ তাহলে কী সেই ছেলে ফিরে এসেছে।
চমকের পর চমক
সেই শয়তান তার মানে ফিরে এসেছে। এই ছেলের জন্মানোর সংবাদ পেয়েই নিদ্রা ভঙ্গ করে নীচে নেমে আসা। সে সময় তার আসার ইঙ্গিত ছিল না, তাদের ‘চক্রসিদ্বান্তিকা’ কিছুই বলেনি। কিন্তু সে রাত্রে উল্কাপিণ্ড দ্বয়ের সংঘর্ষ তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল আবার সে আসছে। কিন্তু তার জ্ঞাত মতে তার আসার আগে কিছু ঈঙ্গিত আসা উচিত। এরকম নিঃশব্দে জাগরণ হতে পারেনা। তবে বহুবছর ধরে মূর্তিতে সঞ্চিত থাকতে থাকতে ধুন্ধুর ক্ষমতা এখন অপ্রতিরোধ্য। অন্ধকের জাগরণ বুঝতেই পারেননি, তার উপলব্ধির গ্রাহ্যসীমাকে বিভ্রান্ত ও আড়াল করতে পেরেছে অন্ধক।
শুধু এটুকু জানতেন, ছেলেটি তুলা লগ্নের জাতক। লগ্নে শনি তুঙ্গ। কর্মপতি চন্দ্র লগ্নস্থ। রবিও কেন্দ্রে তুঙ্গ। বৃহস্পতি মিত্রক্ষেত্রে। তুলা লগ্ন জাতকের তুঙ্গস্থ শনি তাকে রাজযোগ এনে দিয়েছে। এই কুণ্ডলী নিয়ে পৃথিবীতে একজনই জন্মেছে; রাবণ এ জয়ী হবে। এই কুণ্ডলী জাতক ভয়ঙ্কর, অপ্রতিরোধ্য। আশা একটাই তার উপলব্ধি আসেনি। হয়তো এবারেও আসবে না। অন্যান্যবারের মতোই এ জন্মও সুপ্তই কাটবে। কিন্তু হায়রে অদৃষ্ট! এই প্রচণ্ড তামসিক শক্তি এত দ্রুত উত্থান হলে সেই পরাশক্তির যোদ্ধাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন তো তিনি?
সারারাত ধ্যানে বসে রইলেন কালিকা ভট্টাচার্য। স্মরণকে আজ্ঞায় (ষড়চক্রের সর্বোর্ধ চক্র) আনতে হবে। তাদের গ্রন্থের বাইরেও কিছু তথ্য থাকে। উদান (কণ্ঠ থেকে মস্তক অবধি চলা বায়ু) ও সমান (হৃদয় থেকে নাভি) বায়ুতে তার বাস, সে বায়বীয়, গ্রন্থিত নয়। কোনো রক্ষ আক্রান্ত হলে যাতে তথ্য সুরক্ষিত থাকে। তাই একে এভাবে রাখা। তাকে আজ্ঞায় কেন্দ্রীভূত করতে হবে।
প্রথমেই যেটা সমস্যা হয়। দীর্ঘ জীবনের জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো বড় আচ্ছন্ন করে। ইহশরীরকে সূক্ষ্মতায় আনতে দেয় না। প্রথম প্রহর নাগাদ তাঁর মনে হল তাঁর ইহশরীর ক্রমশ হালকা হচ্ছে। দরজা খুলছে তার।
কালিকা ভট্টাচার্যের বর্ণনা
সৃষ্টির আদিতে একে দেখেছিলেন তাঁর পূর্বসূরিরা। তারপর আনাতলিয়া, আসিরিয়াতে এই মূর্তি দেখেছিলেন তাঁর পূর্বসূরিরা। প্রাচীন সময় একেই দেখাচ্ছে অরোরুহ পুত্র, বৃত্তাসুরের ভ্রাতা দ্বিবৃত্তাসুর বা দুবৃত্তাসুর হিসাবে। ধুন্ধু নামেই সে পরিচিত। তার সেনানি করিৎ ও মরিৎ। তার গুরু অন্ধক। অদ্ভুত মায়া জানে, নিয়ন্ত্রণ করে চলে মানবকে! বারে নষ্ট করতে চায় জীবনগতি। রাগের থেকে ক্রোধে রূপান্তর। কামনাকে ধর্ষণে রূপান্তর। বাসনাকে যুদ্ধে রূপান্তর। এভাবেই মানুষকে শেষ করে সে এক অদ্ভুত চালক সে। নিজের সংকেত নিজেই বলে গেছে— মানুষ হল সেই সর্প নিজে নিজের লেজ খায়। আর এই দ্বিবৃত্তের এই আবর্তে সে অসীম। এই আবর্তেই পাক খেয়ে যায় ষড়রিপু। একটি সমান্তরাল জগৎ ছেয়েছিল ধুন্ধু। নিজের মতো তৈয়ার করিয়ে ছিল একটি কুৎসিত মূর্তি। তিন মাথা তার একটি মাথা গাভীর, একটি মাথা মানুষের এবং অপর মাথাটি একটি হিংস্র জীবের। সিংহাসীন। কিন্তু সেই সিংহের ডানা আছে। পায়ের থাবা পক্ষীর মতো। এই মূর্তিকেই সে সমান্তরাল ঈশ্বর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
সে সময় বশিষ্ঠের সহায়তায় অতিকষ্টে তাকে দমন করেছিল কুবলয়াশ্ব। তাই কুবলয়াশ্বের নাম হয়েছিল ধুন্ধুমার। লাভ হয়নি, অনেক ক্ষমতা লিপ্সুই তাকে চায়। মানুষের মনে চাওয়া-পাওয়ার যে বিষ সে ঢুকিয়ে দিয়েছিল তাতেই মানুষ জ্বলছে। ধুন্ধুও আসছে ফিরে ফিরে সাদা চোখে যুদ্ধ, মারী, বন্যা, যাই দেখি। সবই আসলে গণবলি। ধুন্ধু আসার আগের ও পরের দশা। চর্মবন্দুর বাইরে এভাবেই সে ফিরে আসে। আর তাই ফিরে আসতে হয় ওদেরও।
কালিকা ভট্টাচার্য কে?
আজ কত নাম, কত আঙ্গিকে সে ছড়িয়ে আছে শ্যাটান, মাম্মন, অউরোবরস, অসিরস, আসমোদাস কত কি! যে যাই ছড়াক, এ আসলে সেই বৃত্ত, যে বজ্রের আঘাতের পরেও ফিরেছে। মানুষের প্রবৃত্তিকে ভর করে, মানুষকে দ্বিধার গোলকধাঁধা ফেলে। এ ধন্দ, এ অসীম এর মৃত্যু নেই। তবে তাঁরা একে বহু দূরে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এত নাম সৃষ্টি করে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতেন জানতেন সে আসবে। অবশেষে এসে গেল।
তারা রক্ষ। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যক্ষ মাতা খসাকে ভক্ষণই করে ফেলতেন, যদি না এই কনিষ্ঠ রক্ষ তাকে রক্ষা করত। সেই থেকে সমতা রক্ষার যে দায় তাদের মাথায় চেপেছে আজও তা বহন করে চলেছেন। পিতা কাশ্যপ তার প্রারব্ধ জ্ঞানের ৯টি ভাগ তাদের মধ্যে দিয়ে তাদের ছড়িয়ে দিয়েছেন। তারা ছড়িয়েই ছিল। তারা না চাইলে তাদের খুঁজে পাবার সাধ্য মানুষের নেই। কিন্তু গণনা বলছিল তার জেগে ওঠার সময় এসেছে। তাই নিজেরাই ধরা দিলেন রাজার কাছে।
দ্বিসহস্র পূর্বে এক নবচক্রের অবতারণা করেন এক সম্রাট। তাকে সব জানাতে হয়েছিল। তাঁর বংশেই আসছে সে। তাঁকে পূর্ব ইতিহাস স্মরণ করেই তিনি এই নবচক্র এর প্রতিষ্ঠা করানো হয়। অবশ্য ছিলই সব। তারা ৯জন ভ্রাতা, পিতার প্রজ্ঞা আর সমতা রক্ষার ভার নিয়ে ছিলই। নৃপতি অনুঘটকের কাজ করেছে মাত্র। কারণ তাঁর তৃতীয় পুরুষ বৃহদ্রথই একে জাগানোর চেষ্টা করল। একে জাগানো যায় তা কেউ কল্পনাতেই আনেননি অথচ ব্যাকট্রিয়দের হাত ধরে এই দেব-ই সামনে এল। তাদের চেপে রাখা দেবতাকে অন্যরূপে রাজা বৃহদ্রথ নিয়ে এল। গোমুখি যক্ষ জাগানোর, কুম্ভনের জাগরণের আড়ে আসীমা দেবা বা আদতে ধুন্ধুকেই জাগাচ্ছিল পাপীটা। ভেবেছিল বুঝবে না। ব্যাকট্রিয়দের হাত ধরেই আবার উঠে আসতে চাইল ধুন্ধু বা অসীমা দেবা। যেমন এবারে চাইছে…… সেবারে বহুদূরে তাঁরা তাকে নির্বাসনে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু পারলেন না। অন্ধকের পুনর্জন্ম হয়েছে সে ধুন্ধুকে ফেরাবেই।
আর চিন্তা করে লাভ নেই, ভায়েদের সাথে যোগ স্থাপন করতে হবে। অভিক্ষেপণই একমাত্র পন্থা। আজ মন বড় উতলা। মনঃসংযোগ করা যাবেকি? দ্বিতীয়বার ধ্যানে বসলেন কালিকা ভট্টাচার্য।
বারবার বিক্ষিপ্ত সব কথা মনে পড়ছিল, প্রাচীন গ্রন্থ ঘেঁটে তিনি যা পেয়েছেন বা তার পূর্বসূরিরা যা বলে গেছেন তাতে করে ইক্ষ্বাকু পৌত্র কুবলয়াশ্ব ধুন্ধু যিনি সাক্ষ্যাত অসুর সংহারক ‘ধুন্ধুমার’ তিনিও কিন্তু আসলে একে বধিতে পারেনি। একে শুধু ফিরত পাঠানো গিয়েছিল। পাঁচ সেরা যোদ্ধা সেবারে এসেছিলেন, ফিরে আসেন বারবার।
ষড়রিপু-র নিয়ন্তাকে সংহার সম্ভবও নয় সম্ভবত তাই আট পুরুষ পরে মান্ধাতার আমলে আসীমা দেবা-র আবার উত্থান হয়। সেসময় মান্ধাতা পারেননি কিন্তু তার পৌত্র ‘ত্রসদস্যু’ বলা হয় তিনিই কুবলয়াশ্বের পুনর্জন্ম ও তার চারসাথী পেরেছিলেন কেবল ফেরত পাঠাতে।
এর বহুপরে খট্বাঙ্গ পৌত্র রঘুবীর রাম রাবনের ন্যায় দুর্ধর্ষকে নিধন করলেও, অসীমা দেবাকে পারেননি। ধুন্ধু ততদিনে নাম বদলে অসীমা দেবা। তার অর্থাৎ রঘুবীরের মৃত্যুর পর আস্তে আস্তে ষড়রিপু প্রকট হতে থাকে। ত্রেতা থেকে অবনমন ঘটে দ্বাপরে। দ্বিতীয় থেকে অষ্টবিংশতি দ্বাপর অবধি বেদশিরা, গোকর্ণ, দারূক অবধি বিভিন্ন শিব এর সঙ্গে লড়াই করেছে। শিব মানুষের মধ্যেকার ভেদাভেদ তুলে হিংসাকে লঘু করেছেন। মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ঠিক-ভুলের স্বচ্ছ পর্দায় আড়াল করে একে নরম করেছেন। কিন্তু অসীম দেবা দুর্দমনীয়, প্রবৃত্তিকে সত্যিই বধা যায়না।
কালিকা সাধারণ রক্ষমাত্র, শুধু হিসাব করতে পারেন প্রকৃতির হৃদস্পন্দন। মা প্রকৃতির পরিবর্তনের স্তরে স্তরে অনুভব শক্তিকে চালনা করে উপলব্ধি করেন এক প্রচণ্ড অঘটন এগিয়ে আসছে। কারণ ধুন্ধুর জাগরণের আগে ও পরে গণবলি ও সমুদ্রের ন্যায় রক্ত স্রোত হয়। ধরা উত্তেজিত হয়।
গ্রন্থ বলেছিল অসুরহুড়া (সিংভূম), বন-আসুরিয়া (বাঁকুড়া) তাঁর আবার উত্থান ঘটতে পারে। লাড়াভূমির কোলেরা এখানেই সুপ্ত হয়ে গেছে। সুবর্ণরেখা তীরের গড়ের ধ্বংসাবশেষ তাকে এইখানে টেনে এনেছিল। এ ভূমি আজ বঙ্গদেশ, লাড়া বা রাঢ়ের অংশ। তাই যদি হয় এই যে অঞ্চলে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এইখান থেকেই তার উত্থান হওয়া উচিত।
সহসাই ভূকম্পনে কেঁপে উঠল বেদী। তাঁর সামনের দৃশ্যপট যেন ভেঙেচুরে যাচ্ছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চোখ খুললেন। আজকের রাত বড় কালো, তৈত্তিরীয় সংহিতা (১/৫৯/২) বলেই গেছে রাত্রি হল অসুরের। অসুর জেগেছে। তাঁকে সেখানে যেতেই হবে। তার স্মৃতি ফিরলে সে সব সামলে নেবে।
অন্যদিকে ওই সময়। মোহন চৌধুরীর ঘর
একটা টিমটিমে প্রদীপ জ্বলছে ঘরে। একটা ফড়িং ঢুকে পড়েছিল, খানিকটা ফরফর করে প্রদীপের শিখায় ঢুকে ছটফটিয়ে স্থির হল। পোড়া গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ বুজলেন মোহন চৌধুরী।
একটা শনশন শব্দ উঠল। একটা বিশাল তিনমাথাওয়ালা ছায়া পড়ল দেওয়ালে। চোখ খুললেন মোহন চৌধুরী। সাথেসাথেই সেই ছায়ার গায়ে অসংখ্য চোখ খুলে গেল একসাথে। যেন সারা দেওয়ালময় অসংখ্য চোখ, বারে বারে খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। উঠে দাঁড়ালেন। এক অদ্ভুত প্রশান্তি তার শরীরে মনে।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। অবশেষে পেরেছে। এই লোকটা পারিজাত বৃক্ষের রক্ষক ছিল। আজকে তাকে চিহ্নিত করতে পারছে। তার শক্তি, তার মায়া পুনরায় জাগরুক হচ্ছে। এবারে শুধু একটাই অপেক্ষা ধুন্ধুকে জাগিয়ে তোলা।
কদিন ধরে এই লোকটাকে চোখে-চোখে রেখেছিলেন তিনি। এই লোকটা চাল-চলন হাবভাব ঠিক সুবিধার নয়। ভিন গ্রামে থেকেও লোকটা তার গৃহে নজর রাখে। কদিন ধরেই তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তিনি যখন ধ্যানে বসেন তখন একটি বিপরীত শক্তি তার ধ্যান এর মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করে। অবশেষে তিনি নিজের মন বন্ধন করে, নিজের মায়াকে জাগরুক করে আক্রমণাত্মক হয়ে তবেই এই ভারুককে খুঁজে পেয়েছিলেন। ভারুক এক পারিজাত রক্ষক, তার তালুর চিহ্ন দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন। ভারুকের সাথে তার সংঘাত খুব শক্তিশালী কিছু সংঘাত ছিল না। তার মন যখন এই ভারুকের মনের দরজায় বারবার আঘাত করছিল তখনই ভারুকের মানসিক শক্তি ক্ষয় হয়েছিল। সেই পারিজাত রক্ষক একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এ নেহাতই নিম্নস্তরের রক্ষ। অথবা তার খোঁজ নেওয়ার জন্যই সম্ভবত এসেছিল অথবা অন্যান্য রক্ষের কোনো সন্ধি স্থাপনের জন্য সেটা বুঝতে পারেননি। তার আগেই রক্ষটি ধ্যানে বসে শরীরের বায়ুর আনাগোনা বন্ধ করে, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন থামিয়ে আত্মহত্যা করে। তার সূক্ষ্ম দেহকে বেরিয়ে যেতে দেখেও আটকাতে পারেননি। তার মায়া এখনো অতটা ও শক্তিশালী হয়নি। আক্ষেপ থেকে গেল যে পারিজাত বৃক্ষের পথদিশা পেলেন না।
এতদিন তাদেরকেই শুধু প্রতারণা করা হয়েছে। দেবতারা ‘কল্পতরু ( পারিজাত) ‘র ফুল ফল ভোগ করে গেছে আর তাদের জন্য শুধু শিকড় আর ডাল। কেবল অমৃত নয় পদে পদে বঞ্চনার শিকার তারা। পারিজাত ফল, সৃত গোধূম কিছুই পাইনি অসুররা। এই স্বর্গীয় পারিজাত বৃক্ষের কাণ্ড দিয়ে সৃষ্টি করে গেছিল না সেই অস্ত্র। যে অস্ত্র দিয়ে আগেরবার তাদেরকে শেষ করে ফেলেছিল। একাঘ্নী সেই অস্ত্র তো সেবারেই শেষ। এবার কী করবে? সেই অস্ত্র তৈরি করতে দেবে না আর। পারিজাত বৃক্ষের রক্ষকটা গেছে কিন্তু বলে গেলনা। এবারে একে একে পাঁচটা বৃক্ষ খুঁজে বের করতে হবে। প্রথমে পারিজাত বৃক্ষ আর তারপর তার উপরে আঘাত হানলেই গোচরে আসবে রক্ষ সন্ধিরা। তাদেরকেও দুমড়েমুচড়ে শেষ করবে।
সেই যোদ্ধারা আর জানবে ও না তারা কারা! তাদের উপলব্ধি আসার আগেই ওদের হাতে শেষ হয়ে যাবে। তারপর আর কারও সাধ্যি নেই ওদের আটকায়। আবার মিলিত হবে ওরা আবার উত্থান ঘটবে সেই ভয়ংকর শক্তির। মানুষকে শেষ করে দেবতাদের পর্যুদস্ত করে দেবে।
লিখতে বসল মোহন। যদিও সুহৃদ ও শিষ্য ধুন্ধুকে বাধা দেবার সাধ্য কারুর নেই তবুও পূর্বে বহুবার অঘটন ঘটেছে। যদি না এই হাতে লেখা পুঁথিটা থাকত তাহলে একে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। রক্ষকরা আছে আশেপাশেই। সেইসাথে আছে সেই যোদ্ধারা। পুনর্জন্ম হতেই হবে। যোদ্ধার বলিতেই আসল উদযাপন। যারা দেবতার অবমাননা করেছে, তাদের রক্তেই জাগাতে হবে ওঁকে।
মোহনের কথা—
গ্রাম ছেড়ে আমার চলে যাওয়াটা ছিল অদ্ভুত। সেই ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলতে গেলে আগে যেটা বলতে হবে সেটা হল আমার জীবন।
আমার মতো অভাগা মানুষ পৃথিবীতে জন্মায়নি। একসময় মনে হত প্রতারিত হওয়ার জন্যই বোধহয় আমার জন্ম হয়েছিল। আমার জীবনটাই একটা প্রতারণা। জমিদার তারাপদ রায়চৌধুরীর হরণ করে আনা এক উপপত্নীর ঔরসে আমার জন্ম। মা মারা যায় জন্মের কয়েক বছর পরই। তারপর কোনো কারণে ভদ্রলোকের আমার উপর দয়া হয়। তিনি আমাকে নিজ গৃহে থাকতে দেন, অবশ্য তার কারণ বোধহয় রক্ত? নিজের রক্তের ধারাকে একেবারে বাইরে ফেলে রাখতে চাননি।
জমিদার বাড়িতে আমার জায়গাটা বোধকরি চাকরবাকরদের থেকেও নীচে ছিল। আমাকে রাখা হত আখড়ার মাঠে। পাইক আর বরকন্দাজদের সাথে থাকতে থাকতে যাতে করে আমি কড়া হয়ে উঠতে পারি। ভাবতাম জমিদারবাবু আমাকে তুলে এনেছিলেন দেহরক্ষী করার জন্য। তখন বুঝতে পারিনি পরে বড় হয়ে বুঝতে পারলাম। দূর থেকে জমিদারবাবু জ্যেষ্ঠ সন্তান আর আমি প্রায় একইরকম দেখতে। অতএব আমি তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হলাম। তখন দেশের অবস্থা টালমাটাল। ব্রিটিশরা শাসক হলেও এই সমস্ত প্রান্তিক গ্রামে তাদের বিশেষ জোরজুলুম চলত না। এইসব জমিদাররা ছিল স্বাধীন রাজার মতো। লুটতরাজ ডাকাতি লেগেই থাকত। তারাপদ রায়চৌধুরী ছিলেন ডাকাত শ্রেষ্ঠ।
ওনার এই জমিদারি কত মানুষের, এমনকি কত জমিদারের হাহাকার মিশে আছে তার ঠিক নেই। কত জমিদারকে তার রাজস্বের জমা দেওয়ার পথে লুট করে সর্বশান্ত করেছেন তার হিসেব লিখতে বসলে এই খাতাখানা শেষ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে সব মিলিয়ে আমি যে অবস্থায় পড়ে এসে পড়লাম, না খেতে পেয়ে মারা গেলে হয়তো এর চাইতে বেশি ভালোই হত। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময় জমিদার আমাকে দিয়ে প্রজাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করাতেন। নিজের লোকগুলোকে কোড়া মেরে মেরে টাকা আদায় করতে হত, না করে আমার উপায়ও ছিল না অন্যথায় গোটা গ্রামবাসীর অর্থমূল্যের ঘাটতির সমান কোড়া আমার পিঠে পড়ত।
সেই দিনটা আজও মনে পড়ে। বড় বড় দুটি বজরায় মাল বোঝাই হয়ে আসছিল। খবর ছিল যে ওটা নস্কর হাটের জমিদারবাবুর খাজনা। ডাকাতি ফেলা হয় রাতের আঁধারে কিন্তু খবরে কিছু ভুল ছিল। জমিদারবাবু জানতেই পারেননি, এই মাল কোতোয়াল সাহেবের। নতুন কোতোয়াল সাহেব বদলি হয়ে আসছেন আমাদের বাদাবনে। সপরিবারে আসছিলেন তিনি।
আমাদের দেখেই কোতোয়াল সাহেব আর ওনার দেহরক্ষীরা গুলি চালালেন। বাধ্য হয়েই আমাদেরকেও গুলি দিয়ে জবাব দিতে হয়েছিল। সেই গুলি বিনিময়ের মাঝে সাহেবের স্ত্রী মারাত্মকভাবে চোট পান। সাহেব রেগে খাপ্পা। এতদিন ডাকাতির অনেক অভিযোগ শুনেছিলেন আলগাভাবে, হয়তো জানতেনও কিন্তু নিয়মিত খাজনা পেতেন বলে কিছু বলেননি। আজ খেপে উঠলেন। জমিদারবাবুর জ্যেষ্ঠ সন্তানকে তো সাহেব চিহ্নিত করেই নিয়েছিলেন তাকে সাহেব বজরার সম্মুখে দেখেছিলেন।
এখানেই আমার দরকার পড়ল। কোতোয়াল সাহেবের সহকারীদেরকে প্রচুর উৎকোচ দেয়া হল আর সেই সাথে আমাকে জমিদারবাবুর জ্যেষ্ঠ সন্তান পরিচয় দিয়ে চালান করে দেয়া হল।
পরবর্তী একমাস আমার জীবন নরক করে দেয়া হয়েছিল। মেরে মেরে শরীরের প্রত্যেকটি অংশে দাগ ফেলে দেয়া হয়েছিল। আজও উন্মুক্ত বক্ষ, পৃষ্ঠ কাউকে দেখানোর সাহস হয়না, নিজেই তো দেখে শিউরে উঠি। কিন্তু সবারই অন্ধকার একদিন শেষ হয় আমারও হল। কোতোয়াল সাহেব নিজের সবটুকু রাগ ঝেড়ে দেবার পর শান্ত হলেন। মানুষটা খারাপ ছিলেন না।
তিনি তখনও আমায় জ্যেষ্ঠ কুমার ভাবছিলেন। আমি তার কাছে অকপটে সব খুলে বললাম। আমি যে আর যেতে পারব না, যেতে চাই না সেটাও বললাম কারণ আমি স্থির জানতাম আমি গেলে আমাকে হত্যা করা হত আর গা-ঢাকা দেয়া কুমারকে বের করে আনা হত প্রকাশ্যে।
এইবার তার প্রচণ্ড অনুশোচনা হল বোধহয়। তিনি জোর তদ্বির করে নিজের বদলি করালেন কেল্লায়। আমাকেও তিনি কেল্লায় নিয়ে গেলেন। অল্পবিস্তর শিক্ষিত করলেন তারপর আমাকে তার রক্ষীর নিযুক্ত করলেন।
এর মাঝে বড়কুমারকে তার গা ঢাকা দেবার আস্তানা থেকে বের করে এনে ফোর্ট উইলিয়ামের চত্বরে ফাঁসিতে চড়িয়েছে সাহেবরা। আমি কতকটা নিশ্চিন্ত হলাম।
এই ভাবেই বেশ চলছিল। নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছিলাম কিন্তু বাঁচা বোধহয় আমার কপালে ছিল না, কি জানি ভাগ্য কি খেলা রেখেছে আমার সাথে না হলে এই মূর্তি কি আর আমার কপালে জোটে? ফিরে আসে স্মৃতি?
একটি জাহাজ কিছু প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে কলিকাতা হতে সুদূর আফ্রিকার বন্দরে যাবার কথা ছিল। তাতে তাতে কিছু রক্ষী যাওয়া স্থির করেছিল সরকার বাহাদুর। কারণ সে সময় অরক্ষিত জাহাজ যাওয়া বড় বিপদের ছিল। জীবনে প্রথমবার সমুদ্রযাত্রা করলাম। অবশ্য ভাটির গাঙের লোক নদী সমুদ্র আমরা ভালোই চিনি, তাই বোধহয় সুযোগটা হয়েছিল। তাছাড়া সাহেবই হয়তো সুযোগটা করে দিয়েছিলেন যাতে করে আমি একটা উচ্চতায় পৌঁছাতে পারি। তাঁর কর্তৃক আমার উপরে হওয়া অন্যায়টা একটা প্রায়শ্চিত্ত চাইছিলেন হয়তো। চাইছিলেন, আমি একটা উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছাই। ভাগ্য আমার সহায় হয়েছিল ছোটখাটো যে পরীক্ষাগুলি নেয়া হয়েছিল সেগুলিতে আমি অনায়াসে উত্তীর্ণ হলাম। নির্ধারিত দিনে যাত্রা করলাম। দেশ ছেড়ে মাটি ছেড়ে চিরতরে দূরে বহু দূরে আর কেউ আমার পিতৃপরিচয় নিয়ে আমায় খুঁটবে না। বেশ চলছিল। একের পর এক দেশের বন্দরগুলো যখন পেরিয়ে যাচ্ছিলাম ভারি আমোদ লাগছিল।
ইথিওপিয়ার জিবতা বন্দরের কাছাকাছি আসার পরেই বিপদ ঘটল। সমুদ্রের ঝড় যে কি হতে পারে তার সঙ্গে আমাদের তখনও পরিচয় হয়নি, এই প্রথম সমুদ্রের ঝড় দেখলাম। ঝড় যে এরকম সাংঘাতিক হতে পারে জানা ছিল না। মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল সব। কয়েকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল কিন্তু ছোট্ট বার্ক জাতীয় জাহাজ কতক্ষণ আর যুঝবে? টালমাটাল অবস্থায় কোনওমতে ডেক থেকে নীচে নামছি, ঠিক এই সময় মাস্তুল এর উপর থেকে ভারি একটা কিছু এসে ভেঙে পড়ল মাথায়। আমি জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমি একটা চ্যাটালো কাঠের ব্লক এর উপর ভেসে চলেছি। ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যাথা, গলা শুকিয়ে কাঠ। আবার জ্ঞান হারালাম। সকালে জ্ঞান ফিরল, নড়াচড়া করতে চাইলাম কিন্তু শরীর আড়ষ্ট। কত দূরে যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি কিছুই জানি না। শুধু এটুকু জানি আমি ভেসে চলেছি। ভাসতে ভাসতে চলেছি।
তারপরের গোটা একটা দিন বুঝি আমার গোটা হুঁশ ছিল না। যখন হুশ এল, আশেপাশে অসংখ্য মানুষ বিজাতীয় ভাষায় চিৎকার করে চলেছে। অদ্ভুত তাদের গঠন, লম্বা পাথরে গড়া কালো শরীর। কোমরে একখণ্ড করে কাপড় জড়ানো, গলায় মালা আর হাতে তীক্ষ্ন ধার লম্বা বর্শা।
কোনো প্রশ্ন নেই, কোন কথা নেই। সবকিছুর আগেই আমাকে কাঁধে করে তুলে তারা নিয়ে চললে। সোজা নিয়ে গিয়ে তুললে একটা কেল্লার মতো বাড়িতে। বাড়িখানা মাটির কিন্তু আকৃতিতে বিশাল। তিনদফায় রীতিমতো গড়ের চেহারা। একজন দীর্ঘদেহী মানুষকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম সাথে একজন অদ্ভুত দর্শন ব্যক্তি, টিয়াপাখি থেকে শুরু করে প্রায় সব রকম পাখির পালকই তার মাথার ঘাসের মুকুটে।
লোকটি এসে আমাকে শুঁকতে লাগল তারপর একটা আস্ত ব্যাঙ নিয়ে আমার উপর ছেড়ে দিল। ব্যাঙটি গায়ে পড়তেই আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু এতগুলো বর্শার সামনে সাহস হল না। ব্যাঙটা আস্তে আস্তে থপ থপ করে আমার শরীর বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। যতই ওপরের দিকে ওঠে, মানুষগুলোর অস্থিরতা ততই বাড়ে। একসময় ব্যাঙটা আমার ঠোঁটে এসে উঠল। ভয়ে ঘেন্নায় তখন আমার মরমর অবস্থা। মাথাটা ঝাঁকিয়ে ফেলেই দিতাম কিন্তু ব্যাঙটা ঠিক সেই সময় একলাফে আমার মাথাটা পেরিয়ে এল।
এবার আমাকে চমকে দিয়ে কঁক কঁক শব্দে ডেকে উঠল ব্যাঙটা। সমস্ত মানুষজন একযোগে উলু দিয়ে উঠল। সেইসাথে মাথা ঠুকতে লাগল মাটিতে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম ভাবলাম মৃত্যু সুনিশ্চিত। কিন্তু তারপরে বুঝলাম ব্যাপারটা। এই ব্যাঙ ওদের কাছে পবিত্র। এই ব্যাঙের পেরিয়ে যাওয়া আজকে আমাকে বাঁচিয়ে দিল।
এর পরের ইতিহাস আর বলার কিছু নেই। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে এই গোষ্ঠীর মানুষের সাথে আমি মিশে গিয়েছিলাম। এরা ইথিওপিয়ান জিভোরো-র মবুলা গোষ্ঠীর মানুষ। ইথিওপিয়ার মধ্য দক্ষিণ প্রান্তে এদের বাস। এরা রাজার অনুগত, রাজার বিশ্বস্ত সৈনিক। লম্বা লোকটি ছিলেন এদের সর্দার, আর ওই যে লোকটি যিনি ব্যাঙ ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন বোঙা অর্থাৎ ওঝা।
এই ব্যাঙটিকে এরা সিশি বা ঈশ্বরের দূত বলে মনে করেন ওরা। ঈশ্বর এর একবার প্রচণ্ড পেট ব্যথা হয় তখন তিনি সবকিছু উগরে দেন তাতে পৃথিবী, জল, বায়ু আসে আর সাথে উঠে আসে ব্যাঙ। সবশেষে আসে মানুষ। তাই ব্যাঙ অতি পবিত্র। তাই ব্যাঙের লাফিয়ে পার হওয়া ছিল অগ্নি পরীক্ষার মতো।
ওনারা আমাকে শত্রু ভাবে নিলেন না। আমার গায়ের রং না ছিল শ্বেতাঙ্গদের মতো না ছিল এদের মতো ঘন আবলুসে কালো। তাই আমি ওদেরই একজন হয়ে গেলাম। আমি থাকতাম রাজবাড়ি-র বাইরের স্তরে, বিশেষ রক্ষীদের কক্ষের পাশে।
এদের এখানে আমি বেশ কিছু মসজিদ, গির্জা দেখেছিলাম। এখানে মুসলিম, স্থানীয় উপজাতি এবং অবশ্যই খ্রীস্টানরা বহুদিন মিলে মিশে সহাবস্থান করছেন। অদি গুলই, গমা গমা, চিকাকুকা, অদি গর্জা, আবাবা প্রভৃতি গ্রামগুলিকে এই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় ডাকে মাদাগালা। আদতে ইথিয়পিয়া। যাই হোক দিব্যি চলছিল।
এইসব অঞ্চলে বিদেশি শত্রু অনেকদিন-ই দানা বাঁধছে। ছোটছোট ঝুটঝামেলা লেগেই থাকত। সেই সাদা মানুষরাই আসল সমস্যা। রাজার সাথে করা চুক্তি ভাঙতে শুরু করেছিল শ্বেতাঙ্গরা মানে এখানের রাজার মাথার উপরে থাকা ইতালির সাহেবরা।
শেতাঙ্গদের শুনেছিলাম দেশে দেশে নিজেদের মধ্যে দারুণ দ্বন্দ্ব। একদেশ অন্যকে তাতায়। এদেশের রাজাকেও রাশিয়ার জার আর ফ্রান্সের ডিউক উস্কাচ্ছিলেন। শহরে শুরু হল দারুণ রণসজ্জা, প্রায়শই গ্রামে লোকজন আসে শুনি যুদ্ধ বাধবে। দেশের রাজা বৃহত্তর যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন।
একদিন দেখলাম রাজবেশ পরা বেশকিছু হোমরা-চোমরা ভদ্রলোক গ্রামে এলেন। বিস্তর আলোচনার পর তাদের সাথে আনা ষাঁড়ে টানা গাড়ি থেকে বেশকিছু অস্ত্র নামানো হল। এ অস্ত্র আমি চিনি .৮৮নাজেট রাইফেল। এ অঞ্চলের লোকজন রাইফেল দেখিনি, রাইফেল দেখেই তারা রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। এই আগুন স্রাবী অস্ত্রকে তাদের দারুণ ভয়। অথচ তাদের সাহসের কমতি নেই, কেবল বর্শার ফলা হাতেই বাঘের সাথে লড়াই দেয়।
এই সময় আমি সাহস করে এগিয়ে গেলাম রাজার সেনার কাছে। একজন শ্বেতাঙ্গ এসেছিলেন, পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলতে দেখে ঘাবড়ে গেলেন। ইন্ডিয়ান দেখে গুপ্তচর ভেবে অনেক খোঁজ-খবর নিলেন। গৃহবন্দি রাখলেন দুই পক্ষকাল।
তারপর খোঁজখবর নিয়ে আমার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আমার বন্দুক চালানো পরীক্ষা নেওয়া হল আর এখানেই আমি আবারও উতরে গেলাম।
আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল গোটা গ্রাম থেকে অন্তত চারশত রাইফেলধারী তৈরি করে দেওয়ার জন্য। সেইসঙ্গে কর্তা ব্যক্তিদের প্রতিনিধিরাও রইলেন পুরো কাজ তদারকির জন্য।
একদিন শুনলাম আমাদের গ্রামে রাজা নিজে আসবেন। গ্রামে হইহই পড়ে গেল। আগে সর্দারের সারাদিনই দাওয়াত বা খাবার আয়োজন হত। পশুর হাড়, ছাল পড়ে থাকত রাস্তাঘাটে, এবার সব সাফ হল। সব ঝাড়াঝুড়ো হল। কুঁড়ে সর্দার যে বিশজোড়া পত্নী নিয়ে সারাক্ষণ শোবার ঘরের মাদুরে পড়ে থাকে, কালেভদ্রে গাত্রোত্থান করে। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে তদারক করতে লাগলেন। কোন দিন রাজাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি একবার কেল্লায় সেখানকার লাট সাহেকে দেখেছিলাম। আমিও বেশ উত্তেজিত ছিলাম। কেবল বোঙা কেন যেন প্রচণ্ড অস্থির আর খিটখিটে হয়ে পড়ছিল।
নির্ধারিত দিনে রাজা এলেন। এইবার রাজাকে দেখলাম। হাজার জন সশস্ত্র যোদ্ধা সহ রাজা আমাদের গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন। পিছনে অগণিত গরুর গাড়ি।
এখানকার মানুষের মতোই কালো। কিন্তু পোশাকে যেন সাহেবি আর মুসলিম রীতি মিলেমিশে গেছে। সোনার কাজ করা মখমলি আলখাল্লা, সোনার সুতোর নকশা, বাঁকানো সাহেবি টুপি, সোনার রাজদণ্ড, পায়ে ফিতে দেওয়া কুমির চামড়ার জুতো। দেখলেই একটা অদ্ভুত সম্ভ্রম জাগে। সাহেবরা দেশটাকে দখল করে রাখলেও রাজাকে নিজের মতো করে থাকতে দিয়েছেন। রাজাকে আয়ত্ত করে তারাই মূলত দেশ চালাচ্ছে। শেতাঙ্গদের অপশক্তির বিরুদ্ধে তাদের দেশীয়দের এই ক্ষোভ এবং এই যুদ্ধযাত্রা তাদের বিরুদ্ধেই অথচ অপরাপর শেতাঙ্গরাই সাহায্য করছে। কি অদ্ভুত না?
ভাবলে অবাক লাগে কোথা থেকে এসে কোন দেশের ভাগ্যের সাথে আমিও মিশে গেলাম। রাজা দুইদিন থেকে চলে গেলেন। উৎসব আর খাদ্যের ঝড় বয়ে গেল।
সবকিছুর আড়ালে আরেকটি জিনিস ঘটছিল। বোঙা একদিন যুবরাজকে নিয়ে গ্রাম থেকে দূরে চলে গেলেন। যুবরাজ তার সাথে অন্তত ত্রিশজন নারী নিয়ে এসেছিলেন সবাইকে রেখে যুবরাজ আর তিনজন গর্ভবতী নারীকে নিয়ে গ্রামের বাইরের তৈরি গৃহে আশ্রয় নিলেন। এতদিনে বুঝলাম গ্রামের বাইরে যে নির্মাণ কাজ চলছিল তা যুবরাজের থাকার জন্যই। বিষয়টি কী হতে চলেছে আমার ধারণা ছিল না। গ্রামের কোনো মানুষও এ বিষয়ে মুখ খোলে না। প্রথমে ভেবেছিলাম গর্ভবতী নারীদের এতো কষ্ট করে আসার কি ছিল, এখন বুঝলাম কিছু তো হচ্ছে।
কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখলাম। ওই অঞ্চলে হায়নার দলের উৎপাত বাড়ল। একটা দুটো করে প্রচুর শকুন আসে। মাঝে মাঝেই দু-একজন উধাও হয়ে যায় গাঁ থেকে। অথচ সর্দার নির্লিপ্ত। রাতে কেমন গরম হাওয়া বয়। একেকদিন খুব কাছেই সিংহের গর্জন শুনি। কোনওদিন মধ্যরাতে অজস্র মোরগ ডেকে ওঠে, ঘরের বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখি বাইরে থেকে হুড়কো দেওয়া। টের পেতাম ভয়ঙ্কর অশুভ কিছু জাগছে। অথচ মানুষগুলো নির্লিপ্ত। পথের কুকুরগুলি একে একে অদৃশ্য হল। সর্দারের একটি ল্যাংড়া কুকুর ছিল। আমার পাশে পাশে ঘুরত। মাঝে একদিন উধাও হয়ে গেল।
একদিন আমি মাছ ধরতে তটের দিকে গেছিলাম একদিন। দেখলাম এক গুহার মধ্যে কাকের ভিড়। সেইসাথে ভয়ানক দুর্গন্ধ। এত কাক দেখিনি, চিৎকারে মুখরিত করে রেখেছে পুরো স্থান। কৌতূহল শানল না, এগিয়ে যেতে যা দেখলাম, তাতে আমার হৃৎপিণ্ড গলার কাছে উঠে এল। গুহার সামনেই একটি প্রাণীর মৃতদেহ। পচেগলে তার মাংস ছেড়ে এসেছে, কাকেরা সেসব নিয়ে টানাটানি করছে। কাঠমাটা পরিষ্কার বোঝা যায়, তার সামনের একটা পা ছোট। এক্কেবারে ছোট। মুখ তুলে গুহার ভিতরে তাকালাম, গন্ধ টন্ধ তখন ভুলেছি। সেখানে সাদা হয়ে আছে হাড়। কিছু একটা ভয়ংকর নাড়াচাড়া করছে তার ভিতরে। সাবধানে পা ফেলে এগোতে যাব, হঠাৎ কাঁধে টান পড়ল। দেখি, বোঙ্গা! চোখ দুটো আঙরার মতো জ্বলছে। আমাকে টেনে ছুঁড়ে বালিতে ফেলে দিল। গুহায় যাবার আর সাহস করলাম না।
বিষয়টি বুঝতে পারলাম যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে, ইতালিও সৈনিকদের অস্ত্রশস্ত্র পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে প্রথম আক্রমণ এর আগেই রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। এত উন্নত অস্ত্র, কামানের সামনে আমাদের এই সামান্য বাহিনী লড়বে কী করে? তার উপর টানা চার দিন ধরে এই মানুষগুলো হেঁটে এসেছে। খাবার বলতে সিদ্ধ মাংস আর সামান্য ফলমূল। মাত্র শ’দেড়েক মানুষ বন্দুক চালাতে শিখেছে তাও তাদেরকে চৌখোস বলা যাবে না। বাকিরা সবাই ঢাল আর বর্শা। অথচ উলটো দিকের ইটালির সৈন্যরা মার্চ করা সুশিক্ষিত সুশৃঙ্খল সৈন্যদল। দেখে যা বুঝলাম রাজার শহরের সৈনিকরা আর এই রুশ ফ্রান্সের সাহেবরা-ই ভরসা। কিন্তু তখন আমার অনেক কিছু দেখার বাকি ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর যা দেখেছিলাম সে দৃশ্য কখনো দেখতে হবে ভাবিনি। মানুষগুলোর বর্শার দক্ষতা থেকেও যে জিনিসটা চোখে পড়েছিল সেটা একটা অস্বাভাবিকতা কিছু একটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে হয়েছে। কোন শক্তি এদেরকে সাহায্য করছে। এই প্রচণ্ড দানবীয় শক্তিতে কেউ লড়তে পারে না। এক একটি বর্শা তিন-চারজনকে একত্রে গেঁথে নিচ্ছে।
সামনের ক্যাভালরি পর্যুদস্ত হতেই পিছনের ইতালির গোলন্দাজ বাহিনী এগিয়ে আসছিল দ্রুত। হঠাৎ করেই আকাশ মেঘলা হয়ে গেল আর তারপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। মানলাম উড়ো মেঘের বৃষ্টি কিন্তু সেই বাহিনী তখন সংঘাতের স্থান থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে অথচ সে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা আমরা পেলাম না। বিপক্ষের গোলাবারুদ ভিজে চুপসে গেল। সে দিনের যুদ্ধে আমরা সহজেই ইতালিয়দের পেড়ে ফেললাম। ওদের ক্যাম্পের স্থলে আমরা ক্যাম্প করলাম।
ক্যাম্প বলতে গেলে অফিসারদের জন্য তাঁবু আর বাকিরা খোলা আকাশের নীচে। গভীর রাত্রে প্রচণ্ড চিৎকার আর আর্তনাদ আমাদের সচকিত করে দিল। দেখলাম কোবোম্বোর সুবিশাল তৃণভূমিতে আগুন লেগেছে, কীভাবে কী প্রকারে এই আগুন লেগেছে জানা নেই। রাশি রাশি ধোঁয়া আকাশ আচ্ছন্ন করে ফেলেছে আর তার মধ্যে থেকেই দলে দলে নীল গাই, হরিণ, হায়েনা, কিমোস, জেব্রা, কিভেটের দল ছুটে বেরিয়ে আসছে। মুহুর্মুহু বৃংহণ তুলছে হস্তির দল। নুম্বার কাতর চিৎকার শনৈ শনৈ নিকটবর্তী হচ্ছে। সর্বনাশ ওরা এদিকেই এগিয়ে আসছে তো! আশেপাশে লাম্বার গাছগুলোয় বিশ্রী হ্যাঁকো হ্যাঁকো শব্দে আওয়াজ তুলছে বেবুনের দল। জন্তুদের পায়ের ভারে মাটি কাঁপছে। আমরা তখন স্তম্ভিত হতচকিত, কি করব বুঝতে পারছি না ঠিক সেই সময় আমাদের থেকে কয়েকশ মিটার হয়তো ওরা তখন। আচমকাই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সারি সারি জমাট অন্ধকার আমাদের রক্ত উঠে এসেছে মুখে। আকাশের বুক ফালা ফালা করে বিদ্যুৎ চমকাল। পাশের মোটা বাওবাবটার মাথাটা উড়িয়ে দিল আগুনের ঝলকানি। মুখ ঘুরিয়ে প্রাণীর দল দৌড়াল ডানদিক পানে, ইতালিয় সৈনিকদের ক্যাম্পের দিকে। শুনেছিলাম সে রাত্রে ক্যাম্পের সমস্ত মানুষকে মাংসপিণ্ড পরিণত করে, মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল প্রাণীর দল।
এতটাই ভয়ানক অবস্থা হয়েছিল যে পরদিন আমরা অস্ত্রশস্ত্র খুঁজতে গিয়েও দেখেছিলাম সেগুলো গুঁড়িয়ে গিয়েছে।
শুনেছিলাম যুদ্ধেও রাজা জিতে গেছেন। কিন্তু এরপর থেকে গ্রামে একের পর এক অশৈলী চলতেই থাকল। গ্রামে হঠাৎ করেই যেন শকুনের উপদ্রব বেড়ে গেছে। মাঝেমাঝেই এক-আধজন উধাও হয়ে যায়। এর মধ্যেই শুরু হল ভয়ংকর জ্বরের প্রকোপ, সে প্রকোপ এমন-ই যে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়।
যুবরাজ চলে গেছেন আমি এর মধ্যে একদিন সেই ঘর থেকে ঘুরে এসেছি। রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আমি গিয়েছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার এই মন্দিরের বাইরে কোনো প্রহরী নেই অথচ বোঙ্গা অনেক জোরাজুরিতে আমাকে বলেছিল এটা মন্দির। আর এখানের যেকোনো মন্দিরেই প্রহরী থাকে। দরজাও ভেজানো বন্ধ নয়। মন্দিরে ঢুকে তোমার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল, এত অন্ধকার কোনো স্থান হয়! কোনোমতে কোমর থেকে চকমকির টুকরো বের করে ঠুকে মশাল জ্বালিয়েছিলাম আর তারপরেই দেয়ালে দেখেছিলাম দেবতার মূর্তি। অস্বীকার করব না প্রথম দিন বেশ ভয় পেয়েছিলাম। এমন ভয়ংকর রূপ দেখে ভয় পাবারই কথা। কিন্তু দেবতা আমাকে আকর্ষণ করতেন, স্বপ্নে যেন দেবতা প্রায়শই আমাকে ডাকতেন। তারপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম ওই ঘরে। একদিন বোঙ্গা বুঝতে পারল। ভেবেছিলাম বোঙ্গা আমাকে মারধর করবে কিন্তু সে সব কিছুই করল না। বরং শান্তভাবে বললে যেদিন ব্যাঙটা তোমায় পেরিয়ে গিয়েছিল সেদিন বুঝেছিলাম তুমি দেবতা প্রেরিত। তুমি সাধারণ নও। তোমার হাতেই উঠবেন। আর তাই তোমাকে আমি এড়িয়ে চলেছি। দেবতার স্থাপনার পর, অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছিল আমার গণনা।
তারপর বলেছিলেন এক অদ্ভুত কাহিনী শুনতে শুনতে আমার রূপকথা মনে হয়েছিল—
এই যে দেবতা দেখছ। ইনি অসিমদাই পক্ষান্তরে কাগরকুতে (রণদামামা) বা মৃত্যুদেবতা। এর উল্লেখ আমাদের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লোককথা বা উপকথায় নেই। ইনি আছেন অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পশ্চাতে আড়াল হয়ে। ইনি আমাদের বিপরীত দেবতা তুমি শুনলেই বুঝতে পারবে, এই দেবতা সব ধর্মে সব মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে আছেন। এঁকে দেবতা বলা হলেও তিনি আদতে মানুষের অশুভ শক্তি, মানুষের মধ্যেকার অমানুষ তাই এনার অবয়বকে এরকম বীভৎস রূপে গঠন করা হয়েছে, মানুষের অন্তরের পৈশাচিক বীভৎসতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে।
আদতে মানুষ নামের এই জাতির এক আদি দেবতা বা পিশাচ ইনি। রাজা সলোমনের নাম কে না শুনেছে? অবশ্য না শুনলেও আমার এ লেখা যখন পড়া হবে তখন আশা করব পৃথিবী অনেক এগিয়ে যাবে, রাজা সলোমনের নাম সবাই জানবে। না জানলেও ক্ষতি নেই, কাজ তো কেবল দেবতার ভাঙানো।
এই অঞ্চল ‘শেবা’র রানীর অধিকৃত আদি অঞ্চল। রানী আমাদেরই স্বজাতি। এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন তিনি রাজত্ব করেছেন। পরবর্তীতে রানী ও সলোমান রাজার মধ্যে বৈবাহিক বন্ধন স্থাপিত হয় এবং সেই দিক দিয়ে ধরলে এই অঞ্চলে রাজা সলোমান এর কর্তৃত্ব ছিল, তাদের বহু ধ্যানধারণার অনুপ্রবেশ ঘটে এখানে। কাগরকুতে হয় আসমোদাস বা অসীমদাই।
এর ফলে মূলত বহু ধ্যানধারণার পরিবর্তন হয় এবং সে পরিবর্তনের সাথে সাথে এই কালো শক্তি বিশ্বাসের গভীরে ঢুকে যায়। সলোমন রাজাই দেখিয়েছিলেন যে এই ভয়ংকর শক্তি অনেক কিছুই করতে পারে যুদ্ধজয় থেকে শুরু করে অনেক অসম্ভব কাজ সমাধা হয় ইনি তুষ্ট হলে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার প্রতি এনার তীব্র দ্বেষ। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি জল, মাছ, আলো এসব সহ্য হয় না। এনাকে তুষ্ট করতে হলে ঈশ্বরের মন্দির অপবিত্র করতে হয়। মন্দির গাত্র কালো করে ফেলতে হয়। কিন্তু তাও মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এনাকে জাগায়। আসলে মানুষের নিয়ন্তা ইনি। মানুষকে চালিত করেন। মানুষের কাঙ্ক্ষিত ভোগ, লোভ, লালসা সব চরিতার্থ করেন। আর মানুষকে মেটাতে হয় তার অসীম ক্ষুধা।
যুদ্ধের সময় বারেবারে এই দেবতাকে জাগ্রত করা হয়েছে। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন ভাবে করেছেন। কিন্তু দেবতার এমনই ক্ষুধা যে, একটি যুদ্ধে তার আশ মেটে না। মানুষে মানুষে আবার হানাহানি আবার কষ্ট আবার দ্বন্দ্ব তৈরি করেন উনি। আবারো কোন যুদ্ধ আবারো কোন ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ, মহামারীতে প্রাণ গেছে শত শত মানুষের। ঈশ্বরের তৈরি এই পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চান বারে বারে। তাকে একবার জাগানো হলে তাঁকে পুনরায় আবদ্ধ না করা অবধি, অন্ধকার পাতালে ফিরত না পাঠানো অবধি পুনরায় ফিরে ফিরে আসেন উনি। মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বশ করে, নিজের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চান।
সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রূপে তিনি পরিচিত, আমি এখানে যেটা দেখেছিলাম সেটা রাজা সলোমনের উল্লেখিত মূর্তির রূপ। কিন্তু পরবর্তীতে আমি জেনেছি সমগ্র আফ্রিকার মনোমাতাপা, মাতাবেলে প্রভৃতি অঞ্চলে বহু যুদ্ধের কালে দেব রূপী এই পিশাচকে জাগ্রত করা হয়েছে বারে বারে। এর উত্থান উত্তর বা পূর্বের কোনও ভূমিতে।
এই দেবতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। আদতে আমরা আমাদের প্রাচীন বিশ্বাসের মূর্তিকে পূজা করি। অন্তরের সমস্ত বীভৎসতাকে দিয়ে দেবতার অর্ঘ্য দিই। যা কিছু প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাই ওঁর অর্ঘ্য।
শুনতে-শুনতে ঝিম লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখলাম বোঙা ছুরি হাতে উঠে আসছে। হতচ্ছাড়া বোঙাটা বলছে, সে পুরোহিত কিন্তু তার মন কৃষি দেবতার কাছে নিবেদিত তাই রাজার চাপে পড়ে দেবতাকে জাগ্রত করলেও লোভ, কলুষতা তাকে ছুঁতে পারেনি। তাই এই অন্ধকার দেবতার পুজো করেও নির্মোহ থাকে। কিন্তু আমাকে দেখে নাকি তার বড় ভয় লাগে। আমি নাকি বদলে যাচ্ছি একটু একটু করে। আমার মধ্যে নাকি রক্ত পিপাসা জাগরুক হচ্ছে। আমি আজকাল গ্রামে জবাই, বলি দিয়ে বেড়াই। যত্রতত্র নারী সঙ্গম করে বেড়াই। আমি খারাপ। তাই আমার বদরক্ত সে বের করে দেবে।
”মানুষ ভেদে প্রবৃত্তির ভেদ হয় না ওই একটি জায়গায় সব মানুষ সমান আর তাই দেবতাকে আবার জাগ্রত করা হলে সেটাই সর্বনাশ হবে। যুদ্ধ নামক যে গণ বলি দিয়েছে দেবতা জাগ্রত হয় সে আবারও ফিরে আসবে,” বলেই বুড়ো বোঙা এগিয়ে এল।
আর কথা বলতে দিলাম না বুড়োকে। বুকের উপরে চেপে বসে গলাটা টিপে ধরে মেরে দিলাম। এই হত্যাটা করতে আমার খুব ভালো লেগেছিল, যে দেবতাকে দিয়ে আমি সব পেতে পারি তাকে নাকি বন্ধ করে দেবে। এতই সোজা আমি কি হতে দেব নাকি, দেবতা কি হতে দেবেন? বুঝতেই পারেনি বোঙা, যুদ্ধশেষে আদৌ সে দেবতাকে বোঙা ঘুম পাড়াতে পারেনি। আমি নীরবে বলি দিয়ে গেছি। আমার স্ত্রীদের পূতিরক্ত আর বীর্য দিয়ে প্রতিদিন অশুদ্ধ করে গেছি বেদি। দূরে দূরে বনের গভীরে ফেলে এসেছি বলি দেওয়া মৃতদেহগুলোকে। টুকরো টুকরো করে হায়েনাদের খাইয়ে দিয়েছি। দেবতাকে আর ফিরতে দিইনি। তিনি যে আমাকে ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন আমার প্রতিশোধ তিনি দেবেন। সব যন্ত্রণার হিসেব মিলিয়ে দেবেন। অনেক অনেক শক্তি পাব। আমি বেঁচে থাকব।
আমাকে ছেড়ে যেতেই হবে। আমাকে দেশে ফিরতে হবে, প্রতিষ্ঠা করতে হবে দেবতাকে। তার আগে আমাকে দেবতার সব কাহিনি জানতে হবে। ঋদ্ধ হতে হবে। দেবতার ছোটমূর্তিটা তুলে নিলাম। এই মূর্তির সাথে প্রতিষ্ঠা করব প্রাণ। তারপর বড় কায়া যার ছায়া ডানা ছড়িয়ে ঢেকে নেবে গড়। রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে এলাম আমি। টানা সাতদিন হেঁটে ‘শেবা’য় এলাম।
এই দেশটির বর্তমান রাজধানীর নাম ‘শেবা’। তবে রাজা মানেলিকের প্রধানা রানী বড় তেজিয়ান, শুনেছি তিনি নিজে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করেন, রাইফেল চালান, তিনিও আদিস আবা বলে একটি বড় নগরী তৈরি করছেন। ঘুরে ঘুরে দেখলাম দক্ষিণে যেতে হবে, জাম্বেসির তীরে মুনোমাতোপায় ৩০০ বছর আগে দেবতা জাগতে চেয়েছিলেন। সেখানে যেতে হবে। সে পুরোহিত দেবতার এক নিষ্ঠ ছিল। এই বোঙা-র মতো নয়। তার থেকে স্বত্ত্ব নিয়ে তাকে মুক্তি দিতে হবে।
স্বপ্ন ও আমি
যুদ্ধ হচ্ছে ভীষণ যুদ্ধ। আমি কি আছি এতে! হ্যাঁ এই তো আমি। রক্তাভা আঙরাখা আমার বসনে। হঠাৎ করেই আমায় বন্দী করার জন্য কয়েকজন ছুটে এল। আমি কিরীচ বের করলাম। ধরা আমি দেব না। আমি হারিয়ে যাব সব নিয়ে। ব্রাহ্ম হত্যার, আপনাকে হত্যা অর্থাৎ আত্মহত্যার অপরাধে আমি ফিরে ফিরে আসব। ফিরে আসবে আমার কামনা।
প্রচণ্ড ঘামে ভিজে উঠে পড়লাম ঘুম ভেঙে। স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ? নাকি অতীত? সব মনে পড়েছে। আশেপাশের মানুষগুলোকে দেখে করুণা হল।
আসলে এরা জানেওনা আমি কে? মূর্খ মানুষ যাকে দেবতা ভেবে পূজা দিচ্ছে সে আর কেউ নয় আমার প্রাণের সুহৃদ ধুন্ধু। সব সব মনে পড়েছে আমার। আমি এসেছি। আমি ফিরে এসেছি। আর ওকেও ফেরাব। সে রাতে সরাইখানাটা ত্রিশজন আবাসিক নিয়েই পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
আমিই অন্ধক
আমি জন্মেছি আর পাঁচটা সাধারণ এর মতোই। ঋষি কর্তব্যর ঘরে আমার জন্ম কিন্তু জন্মের পর থেকেই পিতার চোখে আমার প্রতি অবহেলা দেখেছি। আসলে আমার জন্মের পরপরই আমার মাতা দেহ রাখেন এবং সম্ভবত সেই কারণেই বাবার চোখে এক অদ্ভুত ঔদাসীন্য চোখে পড়ত। যখন আমি অষ্টম বর্ষীয় হলাম সেই সময় আমাকে পিতার আশ্রম এর সহযোগী থেকে আশ্রমিক করে নেয়া হল। এই সময়ে প্রথম পরিচয় হল আমার যুবনের সাথে। যুবন আমারই বয়সি তায় মেধাবী ও সংবেদনশীল। সবাই তাকে ভালবাসে। বেদ থেকে শাস্ত্র সবেতেই দারুণ বুৎপত্তি। সে সময় তার সমকক্ষ আর কেউ ছিল না। আশ্রমে একমাত্র আমিই ছিলাম যে তাকে সামান্য হলেও প্রতিদ্বন্দিতা দিতাম। অবশ্য আমি ঋষি কর্তব্যের পুত্র সাধারণ ব্রাহ্মণ সন্তান নয়। পৈতৃকসূত্রে কিছু গুণাবলী আমার মধ্যে ছিল। সে পিতা আমার প্রতি উদাসীন থাকে না কেন, ক্রমশ আমি তাকে আমি ছাড়িয়ে যেতে থাকি।
আমাদের আশ্রম ছিল একেবারে খণ্ডকবনের প্রান্তে। সেখানে আমাদের পিতা দুটি পূর্ণ চন্দ্র অন্তর যজ্ঞ করতেন এবং সেই যজ্ঞের দ্বারা দেবতাদের নৈবেদ্য প্রদান করা হত। সেই যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের কাছে শস্যাদি, ভোগের নিমিত্ত গবাদিপশু পৌঁছে দেয়া হত এবং এই যজ্ঞের সময় যখন তাদের প্রতিনিধিরা এসে সেই খাদ্য গ্রহণ করতেন। যখন তাঁরা মর্ত্যে নেমে আসতেন। তখন তাদেরকে দেখার অধিকার কারুরই ছিল না অথচ নিজের মেধায় আর চাটুকারিতায় যুবন খুব সহজেই সেই অধিকার পেয়ে গিয়েছিল। ঋষি কর্তব্য তার পুত্রের প্রতি হয়তো শেষ অবধি উদাসীন হয়েও হতে পারেননি। হয়তো শেষ অবধি তাই আমাকেও নেয়া হত। সেখানে আমি দেখতাম কিভাবে দেবতার প্রতিনিধিদের চাটুকারিতা দ্বারা নিজের প্রতি বিশ্বাস উৎপাদন করাত। যুবন বড়ো উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল। আমার এই সমস্ত কাজগুলি খুব বিরক্তিকর লাগত। পিতাও সেই শিক্ষা দেননি। যুবন পিতার শ্রেষ্ঠ ছাত্র হয়েও এই ধরনের চাটুকারিতা দেখাতো এবং পিতা তার সেই ধৃষ্টতা সহ্য করে নিতেন। আমি ক্রমশই বুঝতে পারতাম যে শিক্ষা-দীক্ষায় সে নিজেকে বশিষ্ঠ পদের জন্য উপযুক্ত তৈরি করে নিতে চাইছে। সেদিনের কথাটা আমার পরিষ্কার মনে পড়ে। সেদিন নৈবেদ্যের জন্য যে ছাগ নেওয়া হয়েছিল সেইসব ছাগের শরীরে অর্বুদযুক্ত হওয়ায় দেব প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই ছাগগুলিকে আমি নিজে পোষ্য বানাতে চেয়েছিলাম। তাতে আপত্তিজনক কিছু ছিল না।
দুর্ভাগ্যবশত এদের মধ্যে একটি ছাগ ব্যাঘ্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করে। আমার খুব মাস ভক্ষণের ইচ্ছা হত কারণ মাস ভক্ষণ-এর মধ্যে আমি শাস্ত্রগতভাবে কোনো অপরাধ দেখিনি। কিন্তু হত্যার পরিপন্থী ছিলাম বলে আর আস্বাদন নেওয়া হয়নি।
এখন সেই মৃত ছাগটিকে ভক্ষণ করি। সেই প্রথম মাস ভক্ষণ আমার। এই পুরো বিষয়টাই যুবন দেখে ফেলেছিল। আমার পিতার কাছে যুবনের অভিযোগ যায় এবং সেটা যায় আমার-ই অজান্তে। সেইদিন আশ্রম-এ দেবপ্রতিনিধিদের সাথে স্বয়ং ইন্দ্রদেব এসেছিলেন। আশ্রমের বার্ষিক ইন্দ্রধ্বজ যজ্ঞ চলছিল। সেদিন সবার সামনে পিতা আমাকে বেত্রাঘাত করেন। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম এর সমস্ত ষড়যন্ত্র যুবনের রচিত।
ইন্দ্রদেবের সামনে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল অথচ তিনি একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন না। উপরন্তু আমার প্রতি ঘৃণাভরে তিনি যে দৃষ্টি দিয়েছিলেন তা আজও আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে। এত জন্ম পরেও আমি ভুলতে পারি না। পিতার বেত্রাঘাত, যুবনের ষড়যন্ত্র নয় ইন্দ্রদেবের সেই ঘৃণাভরা দৃষ্টি আমাকে আরও দূরে থেকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে।
শুনেছিলাম ইন্দ্রদেব সম্পর্কে আমার মাতুল হন। তাই যদি হয় তাহলে তো আপন ভাগিনেয়-র প্রতি তার একটা মমতা থাকবে। কিন্তু তাঁর চোখে ঘৃণা ছিল। এই ঘৃণা আমি জানি; তিনিও আমায় মাতৃহন্তারক ভাবেন।
ভূমিষ্ঠ হবার কালে পায়ে নাড়ি জড়িয়ে গিয়েছিল আমার। সেই অবস্থায় বাইর হইয়া আসি। মাতার প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয় ও মারা যান। এতে আমার দোষ কোথায়? অথচ সবাই কেবল ঘৃণাই করে গেল। আমি শুনতাম ওরা আমায় আড়ালে ”অসুর” বলে। সেদিনই আশ্রম ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। মর্ত্যের সীমানা পেরিয়ে যখন তলাতলে পা রাখলাম তখন দেখলাম এই অসুরকুল আমাকে অনেক বেশি আপন করে নিল।
এরপর বহু বছর অতিক্রান্ত। আমি হলাম অসুর গুরু। যুবন ততদিনে বশিষ্ঠ। ধুন্ধু তার সাথে আমার বিরোধকে শুধু নিজের করে নিল তা-ই নয়। সেই থেকে আমাদের লড়াই চলছে আমি ঋষি কর্তব্য স্তত্র নৈঋত হয়ে গেলাম অসুরাচার্য অন্ধক। অসুরদের মায়া ও তন্ত্রবিদ্যার গুরু। প্রতিটি ধনাত্মক শক্তির পিছনে একটি ঋণাত্মক আধার লুকিয়ে থাকে। যেমন যুদ্ধ জয়ের পিছনে রক্ত ও প্রাণক্ষয়। আমি আমার এ যাবৎকালের সমস্ত শাস্ত্র, বেদ, ন্যায় জ্ঞানের পিছনের অন্ধকারকে উন্মুক্ত করলাম।
প্রচণ্ড সংঘর্ষ ও বিরোধ এক সময়ে সংগ্রামের চেহারা নিল। যুগ যুগ ব্যাপী মহাসংগ্রাম। যার কোন অন্ত নেই। কখনও আমরা কখনও ওরা। শেষ সংঘাত ছিল প্রতিষ্ঠার। ততদিনে কাল্পনিক মূর্তিটা গড়ে ফেলেছি। ওই মূর্তিকেই ধুন্ধু মূর্তি বলে প্রচার চালানো হচ্ছে।
বলা হচ্ছে ঘরে ঘরে একে জপ। একে বানাও মৃৎশিল্পী, ভাস্কর দিয়ে। এর মধ্যে ঈশ্বর আছেন। যিনি সব পাইয়ে দেন। তার কাছে ন্যায়-অন্যায় নেই শুধু পাওয়া।
রাজা তার শত স্তত্র নিয়ে আক্রমণ করল ইন্দ্রের প্ররোচনায়, পরাজিত হল। আমাদের মনোবল বাড়ল। মানুষ বদলে যাচ্ছে। ষড়রিপু গ্রাস করছে তাদের। ধুন্ধু মূর্তির পূজা বাড়ছে।
শেষ সংগ্রামটায় সে এতো শক্তিশালী হবে দেবতা মদতপুষ্ট ইক্ষ্বাকু সৈন্যরা বোঝা যায়নি। আমারই ভুল। তাই আমি আত্মহত্যা করলাম। প্রেত যোনী প্রাপ্ত হয়ে ফিরে ফিরে আসি। চেষ্টা করি আবার তাকে তুলে আনার। বিশ্বাসঘাতক ছিল আমারই দুই শিষ্য। ধুন্ধুর সত্তাকে মূর্তির ভেতর চিরতরে বন্দী করার জন্য তারাই সাহায্য করলে। ধিক! বারে বারে দেবতারা ধুন্ধুকে পরাজিত করেছে। আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। আমি তাকে জাগরিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছি। ব্রাহ্মণ হয়ে আত্মহত্যা করে অভিশপ্ত হয়েছি। ধুন্ধুর সত্যকে গোপন রেখেছি। আমি জানি আমি পরব। আমাকে ঈশ্বর হতেই হবে। সে পৃথিবীর অধিষ্ঠাতা আমিই হব। জন্মান্তরে আমিই অন্ধকার, আমিই শুক্রাচার্য আবার আমিই কখনো লুসিফার।
সেদিনের পর দেবতা আর রক্ষরা মিলে আসল ধুন্ধুর মূর্তিটাকে গায়েব করে, আমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য দেশে দেশে ভিন্ন নামে কত যে শক্তি তৈরি করেছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ আসমোদাস, কেউ অসীমাদেবা, কেউ আশা বশিষ্ঠ কর্মের ছাঁচ একই শুধু নাম আলাদা। সেইসব বেশিরভাগ মূর্তিই অচল,প্রস্তরমূর্তি। প্রাণ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। এই ২২০০ বছরের প্রতিটা জন্ম শুধু খুঁজে গেছি। অবশেষে আমি পেয়েছি আমার কাগরকুতে উরফ আশা বশিষ্ঠ উরফ অসীমা দেবা উরফ ধুন্ধুকে। মূর্তির বাধন আলগা হচ্ছে। সে মুক্ত হচ্ছে।
কে ধুন্ধু?
অরোরুহ নামক অসুর যখন ক্রমশই মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন। তখন বাধ্য হয়েই অরোরুহকে হত্যা করতে উদ্যত হন ইক্ষ্বাকু রাজ বৃহদশ্ব। তার উপর ইক্ষ্বাকু বংশজদের উপর দেবতাদের প্রচ্ছন্ন হাত আছে। ফলে খুব সহজেই ধুন্ধুর পিতাকে হত্যা করেছিলেন বৃহদশ্ব। আর এই রাগ বয়ে বেড়াচ্ছিল ধুন্ধু। বংশ ধারায় সে ”মধু রাক্ষসে”র পৌত্র
তার ক্রোধানলে ঘৃতাহুতি দেয় ঈশ্বরের আরেক শত্রু অন্ধক। অন্ধকের প্রজ্ঞার ঔজ্জ্বল্য ততদিনে অন্ধকারে পরিণত হয়েছে। সেই অন্ধকার, মায়া, জাদুকে অসুরদের দৈহিক বলের সাথে মিশিয়ে সে এক দারুণ শক্তিধর সেনাবাহিনী তৈরি করল।
রাজত্ব ছেড়ে ঋষি উতঙ্কের আশ্রমে বাণপ্রস্থে আসা বৃদ্ধ বৃহদশ্বকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয় ধুন্ধু। তারপরই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
ধুন্ধু ক্রমশই মানুষকে কখনো বিপর্যয় দিয়ে, কখনো তার বাধ্য কীটপতঙ্গের বাহিনী পাঠিয়ে তাদের শস্যাদি নষ্ট করে, কখনো সর্পের বাহিনীকে পাঠিয়ে তাদের গবাদিপশুকে ঝাড়ে বংশে উজাড় করে, কখনো সরাসরি সৈনিক পাঠিয়ে তাদের গ্রামগুলিতে আক্রমণ করে, তাদের নারী অপহরণ করে পর্যুদস্ত করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে দিচ্ছিল।
এর উপর অন্ধকের নানারকম তামসিক ও জাদু প্রক্রিয়া মানুষের মন থেকে ক্রমশই ইশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হরণ করছিল। তার মায়া, ছদ্ম ঐশ্বর্য মানুষের লোভ, কাম, ক্রোধ ইত্যাদি প্রভাবকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মানুষরা ক্রমশ আসুরিক শক্তির দিকে, তমসার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিল। উপরন্তু মানুষের জীবন, সঞ্চয়াদি নষ্ট হওয়ার দরুন দেবতাদের নৈবেদ্যের পরিমাণ কমতে থাকল।
এদিকে ভৌমসর্গ দেবতাদের বাসস্থান বসবাসযোগ্য হলেও এক ঊষর ভূমি। তাদের ভোগ আসে মানুষের যাগ, যজ্ঞ, নৈবেদ্য হতেই। দেবতারা চিন্তায় পড়লেন একই সঙ্গে মানুষেরও অতি দ্রুত সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে সেদিন বেশি দূরে নেই যাতে মনুষ্য জাতি ও অপরিণত হবে তাই এগিয়ে এলেন।
তখন দেবতারা আর বসে থাকতে পারলেন না, বশিষ্ঠ’র সাথে সংযোগ স্থাপিত হল। সে সময়ে বশিষ্ঠ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ। ইক্ষ্বাকু থেকে পাঞ্চাল পরবর্তীতেও বহু রাজবংশের মূল মন্ত্রণাদাতা পদে তাকে অধিষ্ঠান থাকতে দেখা গেছে। অপরদিকে তিনি ঈশ্বর সন্তান অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিনিধি।
এদিকে ধুন্ধুকে হারানোর সহজ ছিল না। এই বংশের রাজারা এর আগেও দেবতাদের প্রভূত সাহায্য করলেও, ধুন্ধু হত্যা বা পরাজিত করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। আগেই বলা হয়েছে, রক্তের ধারায় ধুন্ধু ছিলেন নারায়ণ জাত অসুর মধুর পৌত্র এবং অরোরুহ পুত্র। একদিকে নিজের দৈহিক শক্তি অপরদিকে করিৎ ও মরিৎ নামক দুই দুর্দান্ত অসুরের সঙ্গ এবং সর্বোপরি অন্ধকের সহায়তা।
শব্দলিপি
ধুন্ধু আর অন্ধকের সম্পর্কটা পরিপূরকের মতো। কথা বলতে শুরু করলেন কালিকা ভট্টাচার্য। এই তথ্য তাকে স্বরে তুলে অন্য মাত্রায় ভাসিয়ে দিতে হবে। এ মহাসংগ্রামে তাঁর কিছু হয়ে গেলে যাতে তথ্য হারিয়ে না যায় তাই এই ব্যবস্থা। চোখ বুজে নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগলেন। ধোঁয়ার মতো একটা পর্দা উন্মোচিত হল। কিনকিন শব্দে ছড়িয়ে পড়তে লাগল শব্দ তরঙ্গ। পরবর্তী রক্ষের জন্য একে জমিয়ে রাখতে হবে। এই ”শব্দলিপি”ই তার পথপ্রদর্শক হবে। এরপর এই অন্ধক আশ্রমে থাকাকালীন পিতার অন্যতম শিষ্যের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর কর্তৃক তিনি লাঞ্ছিত হন এবং তখন তিনি ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সুকুমার বৃত্তি পরিত্যাগ করে নিজেকে অসুরে পরিণত করেন। পরবর্তীকালে তার পিতার সেই শিষ্য স্বীয়গুণে বশিষ্ঠ পদের অধিকারী হন তখন থেকে তার বিরোধ তুঙ্গে ওঠে তিনি বশিষ্ঠ তথা সমগ্র দেবকুলের শত্রু হয়ে ওঠেন। তাঁর স্বয়নে স্বপনে একটাই চিন্তা দেবতাদেরকে হটিয়ে আরেকটি দেবতা কুল তিনি তৈরি করবেন। তিনি হবেন সেই সমান্তরাল পৃথিবীর অন্যতম অধীশ্বর। ইতর জীব, মনুষ্য ও অসুরেরা তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
কিন্তু যেমন বলেছিলাম ধুন্ধুকে মারা সহজ কাজ ছিল না। কুবলায়শ্বের শতপুত্র মারা গেছে। কুবলয়াশ্ব যুদ্ধ করতে করতে যৌবনের এসে পৌঁছেছেন। এমত অবস্থায় ধুন্ধুকে হারানো অসম্ভব ছিল। তাই বশিষ্ঠের সহায়তায় এমন এক পরিকল্পনা তৈরি হল যে পরিকল্পনার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হল। তৈরি করা হল পাঁচ যোদ্ধাকে। যারা কিনা কে বধিতে পারে। খোদ দেবসেনাপতি কার্তিক তার জীবনের সঞ্চয় দিয়ে তাদেরকে শিক্ষা দিলেন। শাস্ত্র থেকে তুলে আনা শস্ত্র অর্থাৎ মন থেকে শরীর সবকিছুতেই তাদেরকে সুদৃঢ় করে তোলা হল। তারপরে সংঘটিত হল সেই ভয়ানক লড়াই। সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছিল কিন্তু অন্ধক হার মানেননি। যুদ্ধের অন্তিম পর্যায়ে তিনি আহত প্রায় নিহত ধুন্ধুর শরীরকে লুকিয়ে ফেলেন। অন্ধক চিরঞ্জীবী করে তোলেন তার অভিশাপে।
ধুন্দুর মৃতদেহ কেউ খুঁজে পায়নি। তার সত্ত্বাকে তিনি এক কিম্ভূতকিমাকার মূর্তির ভিতর লুকিয়ে রাখেন। তিনমাথাওয়ালা মূর্তির মূল হল একজন বিকট দর্শন পুরুষ। দুইপাশের দুই মাথা হায়েনা জাতীয় হিংস্র জীব ও নীলগাই-এর। এরা যথাক্রমে তাঁর দুই সহচর করিৎ ও মরিৎ। ধুন্ধু আসীন এক অর্ধ সিংহ-অর্ধ পক্ষী পশুর উপর। এই পশু খোদ অন্ধককে চিহ্নিত করে।
ধুন্ধুর মৃতদেহকে ধ্বংস না করা অবধি সে বারে বারে ফিরে আসবে, আবার এ মূর্তি ধবংস করেও লাভ নেই। সে আসবেই। মূর্তিছাড়া তাকে ফেরানোও মুস্কিল তখন মানুষের মানুষের সংঘর্ষ লাগিয়ে, হিংসা, কামনা, লালসার দ্বারা মানুষকে নিস্পেষিত করবে। উত্থানের আগে এবং পরে যুদ্ধ, মহামারী, বিপর্যয় ইত্যাদিতে বহু মানুষের প্রাণ বলি হবে। ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ঈশ্বরের বিশ্বাসকে একটু একটু করে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এর কিছু বিহিত সম্ভব ছিল না। প্রয়োজনীয় তামসী উপাচারে সবকিছুই তিনি স্থির করে যান। অন্ধকের মস্তিষ্কে প্রবেশ করার আগেই তিনি তার মস্তিষ্কের মধ্যে সমস্ত কিছুকে মুছে দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর থেকে অন্ধকের পুনর্জন্ম হয়। চাঁদের ক্ষয়ের মতো নির্দিষ্ট সময় পর তার পূর্বাপর স্মৃতি ফিরে আসে। প্রতি জন্মে চেষ্টা করেন ধুন্ধুকে ফিরিয়ে আনার। শেষবার সফল হয়েছিলেন যখন, তখন ভারতবর্ষে মৌর্য সাম্রাজ্যের এর শেষ সময়। তখন রাজত্বের সংকোচন ঘটে মগধেই এসে তিরতির করে কাঁপছে মৃৎপ্রদীপের মতো।
অপদার্থ সম্রাট বৃহদ্রথ রাজত্ব করছেন। আসন্ন ব্যাকট্রীয় আক্রমণের চিন্তায় প্রায় উন্মাদ অবস্থা সেই সময় আস্তে আস্তে তার মনকে অধিকার করে ধুন্ধুকে জাগানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন অন্ধক। সে জন্মের নাম ছিল মর্মগুপ্ত। কিন্তু সেবার রক্ষের তৎপরতায় এবং সেই যোদ্ধাদের পুর্ণজন্মে তাকে আটকে দেওয়া হয়।
তারপর সেই মূর্তি আরিকামেডু (পুদুচেরী), বারবারিকম (করাচী) বন্দর ছুঁয়ে চলে যায় বিদেশে। আসলে তাকে সবকিছুর বাইরে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিল সবাই কিন্তু তা সম্ভব ছিল না কারণ অন্ধক বলে গিয়েছিলেন তিনি বারে বারে ফিরে আসবেন, ধুন্ধুকে এখানেই প্রতিষ্ঠা করবেন। শোনা যায় এই বন্দরগুলির যে স্থানগুলি দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই স্থানে কখনো প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, কখনো প্রবল ভূমিকম্প ইত্যাদি দ্বারা প্রাণক্ষয় হয়েই চলছিল।
হারিয়ে তো গেল কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই মূর্তির কথা, সে শক্তির কথা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। লোভী স্বার্থান্বেষী মানুষ নানাভাবে তার পুজো করে চলেছে। যদিও সবাই তার নির্দিষ্ট নিয়ম বা উপাচার জানত না তবু নানাভাবে নানা দিকে তারা তাকে জাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। অন্ধকের ক্ষমতা অসীম। মানুষের মন গমনের ক্ষমতা ছিল তার। সে ক্ষমতা দিয়ে সে কখনো কারো স্বপ্নে উপস্থিত হত, তাকে উপাচার দিয়ে প্রলুব্ধ করত। নিজে দৈহিকভাবে না পারলেও চেষ্টা করত সেই মুর্তিকে জাগ্রত করার। অবশ্য অনেকগুলি সমান্তরাল তত্ত্ব ও মূর্তিকে তারা বানিয়েছেন লোককে আড়াল করার জন্য।
অন্ধক যেমনটা চেয়েছিল মানুষ মানুষকে মারবে, দ্বন্দ্ব করবে ঠিক তেমনি ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকে জাগানোর প্রয়াস চলতে থাকে। কোথাও যুদ্ধে জয়লাভের জন্য, কোথাও কোনো রমণীর প্রেম পাওয়ার জন্য, কোথাও সিংহাসনের জন্য এই অন্ধকার শক্তিকে মানুষের মধ্যে জাগানোর প্রয়াস চলতেই থাকে। কোথাও তার নাম হয় আসমোদাস, কোথাও তার নাম অসীম দেবা, কোথাও তার নাম আশা বশিষ্ঠ। (জেন্দাবেস্তা, বশিষ্ঠ বিরোধী)
যেখানে তার মূর্তি পড়েছিল। সেই স্থানে পরপর দুইটি মহাযুদ্ধ প্রমাণ করে দিচ্ছিল যে সেই মূর্তির জাগরণ ঘটছে। বহুদূরে রক্ষ বসেও কম্পন টের পেয়েছিলেন কিন্তু তারা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকার নামক মনোমোতাপা নামক এক সাম্রাজ্যের উত্থান ও আশেপাশের টাঙ্গা-টাভারো প্রভৃতি উপজাতিগুলোকে নৃশংসভাবে দমন প্রমাণ করে দিচ্ছিল কোন এক ভয়ানক শক্তির উত্থান ঘটছে। পরবর্তীতে আরও আরও পরে ইথিওপিয়ার যুদ্ধ সেই শক্তির উত্থানের কথাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছিল। এই উত্থানই ঈঙ্গিত দিল। উত্থানের সূত্র ধরেই পৌঁছাল অন্ধক। এই জন্মে নতুন নাম পেয়েছে সে। এক অসুর লগ্নে জন্মেছে খোঁজ। যে লগ্নজাতকেরা যুদ্ধজয়ী হয়। এজন্মে সে প্রভূত ক্ষমতাশালী। এতদিন সে যেটা পারেনি সেটা করে দেখালো। শেষে মূর্তিকে আনয়ন করল ও স্থাপনা করল। এবারে পালা মূর্তি জাগানোর। একটা একটা করে পরত খোলে একটু একটু করে জাগরুক হয় অন্ধকের মায়া। আসল তো অন্ধকই, ধুন্ধুকে সে তো মূর্তিই বানিয়েছে। মূলশক্তি সে-ই। দিন আর বাকি নেই, যখন এক নতুন ঈশ্বরের উত্থান হবে ১২০০০ বছর পর।
ওই সময়।। মোহনের ঘর
বাইরের ঘরে চুড়ির রিনরিনে আওয়াজ উঠল। কে? পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। এত চুড়ির আওয়াজ। একটা হাসি খেলে গেল মুখে। যুদ্ধ আসছে। সৈন্য বড় প্রয়োজন।
